শোকাঞ্জলি : শঙ্খ ঘোষের গদ্য: মামুলি এক ভূমিকা : পবিত্র সরকার

একজন মানুষ, যিনি মুখ্যত কবি, তিনি যখন গদ্য লেখেন তখন নিশ্চয়ই তাঁর এমন কিছু বলার কথা থাকে যা তিনি কবিতায় বলার সম্ভাবনা নাকচ করেন। অতি মামুলি ওই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলি, কবিতা মূলত এক ধরনের মাধ্যম, গদ্য আরেক ধরনের। এ তো সবাই জানেন যে, কবিতায় ছন্দে, মিলে, স্তবক-বন্ধে, কিংবা সে সব বর্জন করেও রূপকে চিত্রকল্পে শব্দব্যঞ্জনায় মূলত আবেগের উৎস থেকে পাঠকের আবেগ-আন্দোলনের লক্ষ্যে কবির রচনা ধাবিত হয়। তার কিছুটা অংশ পরে চিন্তায় রূপান্তরিত হতেই পারে, কিন্তু তার সম্মুখের দরজাটা হল আবেগ।  কিন্তু গদ্য, যখন তা কবিতার লক্ষ্যকে পরিহার করে, তখন তা লেখকের চিন্তার কথা পাঠকের চিন্তার পরিসরে পৌঁছে দেবার জন্য রচিত হয়। এ কথাও জানা যে, কবিতা কখনও গদ্যের এই লোক-প্রসিদ্ধ কাজের দায়িত্ব তুলে নিতে পারে।  পাঠকের মনে পড়বে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত-র চৈতন্য আর রামানন্দ রায়ের সাধ্য-সাধনতত্ত্ব বিচারের অংশটি, কিংবা রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী-র ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতায় যাত্রাভিমুখী গৃহকর্তার সঙ্গে গৃহিণী কী কী জিনিস গুছিয়ে দিয়েছেন তার তালিকা। সেখানে আবেগের ভূমিকা প্রধান নয়, গৌণ, যদিও তা একেবারে অনুপস্থিত নাও হতে পারে।  আবার গদ্যও কখনও কবিতার কাজ নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন তা আবেগের দোলা দিয়েই আমাদের কাছে আবেদন তৈরি করে। কাজেই, দেশি-বিদেশি ‘অথরিটি’র উদ্ধৃতি না দিয়ে, বহু পুরোনো কথাই আবার সংক্ষেপে পুনরাবৃত্তি করি―কবিতার আবেদন আবেগ ও কল্পনার কাছে, গদ্যের আবেদন সাধারণভাবে জ্ঞান ও যুক্তির কাছে। অর্থাৎ সরল বাইনারি বা দ্বিসম্ভবের সূত্রে কবিতা আর গদ্যকে আলাদা করা চলে না। দুইয়ের মধ্যে ফাঁক নেই, বরং একটা পরম্পরা বা পর্যায় আছে। তাতে শূন্য থেকে বহু সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করাও হয়তো সম্ভব। 

শঙ্খ ঘোষ যখন গদ্য লেখেন তখন গদ্যের এ সব শর্ত তো তাঁকে মানতেই হয়। তবু পাঠকেরা জানেন যে, গদ্যের নানা ধরন আছে। নিছক সংবাদের যে গদ্য, আইনি দলিলের যে গদ্য, বিজ্ঞানের প্রবন্ধের যে গদ্য, তার ধরন আলাদা। এই যে চর্চার পরিসর অনুযায়ী আলাদা আলাদা গদ্যের চরিত্র, তাকে ভাষাবিজ্ঞানে register বলা হয়, ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক হ্যালিডে এই পরিভাষাটি সৃষ্টি করেছেন। সংজ্ঞা হল, Language according to use. আমরা ‘রেজিস্টার’-এর বাংলা করেছি ‘নিরুক্তি’। এও মামুলি কথা যে, মান্য চলিত গদ্যও, একজন লেখকের লেখা হলেও, এক রকম হতে পারে না। ব্যক্তিগত শৈলী বা স্টাইলের মুদ্রণ সব জায়গাতেই থাকবে, তবু স্মৃতিচারণের গদ্যের নিরুক্তি এক হবে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওকাম্প-র সম্পর্কের বিবরণ ও বিশ্লেষণের গদ্যের নিরুক্তি একটু অন্যরকম হবে, কবিতা রচনার মুহূর্তগুলি স্মরণের গদ্য আরেকটু অন্যরকম হবে, কবিতা সেখানে গদ্যকে আক্রমণ করবে এসে―এ তো বলাই যায়। এ সব মেনে নিয়েই আমরা শঙ্খ ঘোষের গদ্যের কিছু সাধারণ লক্ষণ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব। আমাদের মূল লক্ষ্য হবে শঙ্খ ঘোষের গদ্যশৈলীর কতকগুলি চিহ্ন স্থির করা। সেগুলি কোথায় অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে যায়, কোন কোন সূত্র থেকে আমরা বলতে পারি যে, এসব শঙ্খ ঘোষেরই লেখা, অন্য কারও নয়। অবশ্যই শঙ্খ ঘোষের কবিতার মতো গদ্যও অনেক অনুজ লেখকের গদ্যকে প্রভাবিত করেছে, ‘প্রভাবশালী’ লেখকের কাছে সেটাই প্রত্যাশিত। হয়তো শঙ্খ ঘোষও তাঁর পূর্ববর্তী বুদ্ধদেব বসু বা এই ধরনের কারও ব্যক্তিগত গদ্যশৈলীর দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হয়ে থাকবেন। আমরা সবাই জানি যে, এর মূলে একটা সজ্ঞান নির্বাচন বা choice থাকে। সেটা কবিতা বা গদ্য উভয় ক্ষেত্রেই। খুব দুর্বল বা খেয়ালি লেখকেরা হয়তো ‘আমি ওমুকের মতো লিখব’ ভেবে শুরু করেন, ইংরেজ চ্যাটার্টন যেমন করেছিলেন। কিন্তু বেশির ভাগ আত্মসচেতন লেখক একটা সময়ে অন্তত ‘আমি আমার মতোই লিখব’―এরকম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। তখন তাঁর মধ্যে একটা ব্যাপক বাছাই চলে। কবিতার ক্ষেত্রে কবিরা যেমন, গদ্যলেখকেরাও তেমন তাঁদের পছন্দের একটা বৃত্ত তৈরি করেন। এটা তো বোঝাই যায় যে, শঙ্খ ঘোষ কবিতায় তিরিশের বছরগুলির যাঁরা সব ‘দুর্বোধ্য’ অথচ নিঃসন্দেহে শক্তিশালী কবি, তাঁদের শৈলী বর্জন করেছিলেন, তেমনই গদ্যেও বিষ্ণু দে বা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের গদ্যকে আদর্শ মনে করেননি। কবিতা বা গদ্যে তাঁর সহজ লক্ষ্য ছিল ব্যাপক সাধারণ পাঠকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন। এই সিদ্ধান্ত সকলে নেন না, নিশ্চয়ই তার পেছনে ব্যক্তিগত কোনও কারণ থাকে। শঙ্খ ঘোষ নিয়েছিলেন। সচেতন শৈলীর চেয়ে সংযোগ, অস্মিতার চেয়ে তার অতিক্রমণ তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছিল। সেই দিক থেকে তাঁর গদ্যের সাফল্য বা ব্যর্থতা (!) বিচার করতে হবে। যেহেতু পাঠকমুখী আগ্রহ এক ধরনের আবেগ, যা তাঁর গদ্যে শৈলীর সৃষ্টি করেছে, আবার লেখার উদ্দেশ্য অনুসারে তার মধ্যে নানা ভাঁজ-বিভঙ্গও আছে। জানি না আমাদের এই দ্রুত এবং অসম্পূর্ণ (সব লেখা এখন হাতের কাছে নেই, সংগ্রহ করা কঠিন) পরিক্রমায় তার কতটা দেখানো সম্ভব হবে। এই লেখায় তাঁর গদ্যের কিছু ভাষাতাত্ত্বিক লক্ষণ আমরা দেখাব, পরে হয়তো তা যে মায়া সূষ্টি করে তার অন্যান্য কারণ অনুসন্ধান করব।

কিন্তু তারও আগে, শঙ্খ ঘোষের গদ্য লেখারও একটা ভূমিকা করে নিতে হবে। সিটি কলেজে অধ্যাপনা করতে ঢুকেছেন, পড়াতে ভালোই লাগছে। বেতন মাসে একশ পঁচিশ টাকা। সেইসঙ্গে সাড়ে সতের যোগ সাড়ে সতের টাকা অনুষঙ্গ। কিছু অতিরিক্ত পাওয়া যেত সান্ধ্য ক্লাসে পড়িয়ে, শঙ্খ সেটা ছেড়ে দিয়েছেন।  ইউজিসি স্কেলের একটা শর্ত হচ্ছে, বিদ্যাভিত্তিক গদ্য প্রবন্ধ লেখা, জানি না তখনি ইউজিসি মার্কিন-দেশের Publish or perish দর্শনের প্রতি প্রণতচিত্ত হয়েছিল কি না। সে জন্য হোক, বা নিছক জ্ঞানচর্চার নিজস্ব তাগিদ থেকে হোক, সহকর্মীরা নানা গ্রন্থরচনা করছেন। শঙ্খ নানা স্থানে নিজেকে অলস বলেন, (বড়োকাকা বলতেন, অলস যদি দেখতে চাও তো তাকিয়ে দেখো ওকে, পৃথিবীর সেরা’―এখন সব অলীক) জানি না গদ্য লেখায় অনীহা তার চিহ্ন ছিল কি না। এক সহকর্মী এসে চুপি চুপি পরামর্শ দিয়ে গেলেন যে, ইউজিসি স্কেলের জন্য কিছু গদ্য-প্রবন্ধ লেখা দরকার। কিন্তু তাঁর গদ্য লিখতে ইচ্ছে করে না। বেশ কিছুদিন কেটে যাবার পর বিভাগীয় প্রধানের অসন্তোষের খবর জানালেন সহকর্মী ক্ষেত্র গুপ্ত, শঙ্খ ঘোষের প্রতিক্রিয়া, আমরা উদ্ধৃত করি :

‘সে কী, কেন ?’

বলেছেন, এইভাবে ডেকে তো নিলাম। কিন্তু ক্লাসে পড়ানো ছাড়া কিছুই তো করছে না ও; ছ-মাস বলে বলে একটা প্রবন্ধ পর্যন্ত লেখাতে পারলাম না।’

মর্মাহত, চুপ করে থাকি।

কোনোরকম গদ্য যে কিছুতেই লিখতে ইচ্ছে করে না, কেমন করে সেটা বোঝাই ওকে। ভাবি, একটি-দুটি লেখা অন্তত লিখতেই হবে, নইলে অসম্মান করা হবে ওঁর আস্থাকে। ১৯৬৫ সালে সিটি কলেজ ছেড়ে আসবার আগে একটি-দুটি গদ্যলেখা লিখতেই হলো তাই।’

(গদ্যসংগ্রহ ১, পৃ. ১৯৭) 

সেই গদ্যের সংগ্রহ এখন তেরো খণ্ডে বেরিয়েছে। তাঁর গদ্য লেখার দ্বিধা কেটেছিল বলে আমরা খুশি। তবে করোনার কারণে আমরা তার সবগুলি খণ্ড দেখে উঠতে পারিনি।  

এবার আমরা তাঁর গদ্যের আলোচনায় যাব, সেই মানুষটির, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছে যাঁর শৈশবে হাতেখড়ি হয়েছিল।

গদ্যের লক্ষণগুলি

ক. প্রশ্ন ও তার ব্যবস্থাপনা 

স্মৃতিচারণ কিছুটা আত্মজীবনীর অংশ, ভ্রমণকাহিনিও তাই। দুইই কিছুটা অতীতে আশ্রিত, যে-অতীতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও সময়ের প্রলেপে উপশান্ত হয় এবং কিছু পরিমাণে লেখকের মমতা লাভ করে। মমতা এই দিক থেকে যে, সে ঘটনাগুলিকে লেখক পুনরুদ্ধার করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার কথা ভাবেন, এবং তাতেই আমরা জানতে পারি যে, সেই ফেলে-আসা অভিজ্ঞতাগুলি এখনও তাঁর কাছে মূল্যবান। 

গদ্যসংগ্রহের একেবারে প্রথম বই বইয়ের ঘর এর প্রথম লেখার প্রথম বাক্য থেকেই আমরা শঙ্খ ঘোষের গদ্যের একটা প্রধান লক্ষণের সঙ্গে পরিচিত হই―তা হলো, পাঠকের সঙ্গে যতটা না-হোক, তার চেয়ে বেশি করে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন। নিজেকে তিনি প্রশ্ন করেন বারবার, যেমন ‘হাতপাবাঁধা হনুমান’ এর প্রথমেই ‘আবারও কি হারিয়ে ফেললাম বইখানা ?’ এ প্রশ্নটা অবশ্যই তাঁর নিজেকে। কিন্তু সবসময় নিজেকে প্রশ্ন করেন না তিনি। তাঁর মনে সবসময় এক পাঠকের প্রিয় উপস্থিতি থাকে, তাঁর মনে হয় তাঁর লেখা পড়তে পড়তে পাঠকের মনেও একাধিক প্রশ্নের উদ্রেক হতেই পারে। তিনি নিজে সেই প্রশ্নটি উচ্চারণ করার দায়িত্বও নেন―যেমন এই লেখার নানা স্থানে। একটা কৃত্তিবাসি রামায়ণ হারিয়ে গেছে বলে লেখক প্রায় হাহাকার দিয়ে শুরু করেছেন লেখা, কিন্তু পাঠকের মনে জাগতেই পারে এই প্রশ্ন যে, আরেকটা বই কিনে নিলেই তো হয়, এত হাহাকার করার কী আছে ?  সেই প্রশ্নটা তিনি নিজেই তুললেন, তৃতীয় অনুচ্ছেদে একাধিকবার―কেন এত খোঁজা ?  কত কত রামায়ণে তো ভরে আছে ঝলমলানো দোকানগুলি। সেসব বই থেকে অনেক কিছু কি বেশি ছিল সেই আমার রামায়ণে ?’

এই বহু-বহু প্রশ্ন, কখনও নিজেকে (পাঠককে সেটা জানতে দিতে তাঁর আপত্তি নেই), কখনও পাঠকের মনের প্রশ্নের অনুমান ও উচ্চারণ, এবং প্রবল আন্তরিকতায় তার উত্তরদান ও ব্যাখ্যান। যেমন, ‘বই যখন শরীর পায়’ নামক রচনায় বালক বয়সে কোনও একটা পরীক্ষায় বসার তাগিদে, মূলত তাঁর বাবার প্ররোচনায়, ‘পড়তে হলো রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ বই।’ ওই অপরিণত বয়সে ‘বড়দের’ কবিতা পড়ছেন, পাঠকের মনে এই প্রশ্নের পূর্বানুমান করে তিনি সে প্রশ্ন উচ্চারণ করলেন―‘কিন্তু কবিতা পড়া ? ‘চৈতালি’ ‘ক্ষণিকা’ ‘উৎসর্গ’ ‘পলাতকা’-র কবিতা পড়া ?  তার কি কোনও অভিভব হবে বালকমনে ?  হওয়া সম্ভব ?’

পরের অনুচ্ছেদেই উত্তর আসে একটু প্রতিপ্রশ্ন দিয়ে―‘কেনই বা নয় ?’ ‘চৈতালি’র টুকরো টুকরো জীবনছবি, গ্রামীণতায় ভরা; দুলকিলাগা ছন্দে ‘ক্ষণিকা’র ফুরফুরে মেজাজ, ‘পলাতকা’র কারুণ্যময় মেয়েদের কথা! কেনই-বা এরা মুঠোয় নিতে পারবে না কোনও অল্পবয়সীর হৃদয় ?’

এ যেন প্রায় মুখোমুখি কথোপকথনের গদ্য, যেখানে এক অদৃশ্য পাঠক (নিশ্চয় পাঠিকাও) হাজির লেখকের সামনে। দ্বিতীয় জনের কথা বলার সুযোগ নেই, কিন্তু পাছে সে নিজেকে বঞ্চিত বোধ করে এ জন্য সংবেদী লেখক নিজেই তার প্রশ্নগুলিকে ধরেন এবং তার সুরাহা করেন। এই গদ্যে একেবারেই কোনও প্রভুত্ব নেই, তাতে নিজের কথা শোনানোর ব্যাকুলতা আছে, সেই সঙ্গে পাঠকের অনুচ্চারিত প্রশ্ন যে তাঁর লেখাকে এগিয়েও দিচ্ছে তারও স্বীকৃতি আছে। খুব কম লেখকই তাঁর লেখায় পাঠককে এভাবে উৎকীর্ণ করেছেন। তাতে পাঠকও কি একটু খুশি হন লেখকের লেখায় তাঁর আমন্ত্রণ আছে দেখে ?  শঙ্খ ঘোষের মতো করেই আমরা নিক্ষেপ করি প্রশ্নটা। কিন্তু এখানে আমরা ব্যাকরণের একটা লক্ষণের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তা হলো প্রশ্নবাক্যের যথেচ্ছ ব্যবহার। তা একটা উপায়, কিন্তু কীসের উপায় তার আলোচনা আমরা আগে করেছি, একটা দ্বন্দ্ব বা dialectics তৈরির।  নিজের সঙ্গে, পাঠকের সঙ্গে।  ফলে পাঠককে মুশকিলে ফেলে, এমন শব্দ বা অন্বয় তিনি ব্যবহারই করেন না।

খ. ক্রিয়াপদের অগ্রাধিকার 

তাঁর গদ্যের আরেকটা ব্যাকরণগত লক্ষণ যা চোখের সামনে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে আসে তা হলো তাঁর বাক্যে ক্রিয়াপদের ব্যবহার। সকলেই আমরা জানি যে, বাংলায় ক্রিয়াপদ বাক্যের শেষে আসে, সেটাই তার স্বাভাবিক জায়গা। কিন্তু শঙ্খ ঘোষের গদ্যে সে নিয়ম ব্যতিক্রমের দ্বারা সম্মানিত। ‘এখন সব অলীক’ থেকে একটা অনুচ্ছেদের অংশ উদ্ধার করি :

‘কলেজের ছাত্রদের নিয়েই তৈরি হয়ে উঠত কলেজের বাইরেও এক-একটা দল, তৈরি হতো হয়তো কোনো স্টাডি সার্কল, কখনও বা নাম হতে পারত তার ‘প্রগতি পরিষদ’, সেখানে আলোচনা হতো সাহিত্য নিয়ে রাজনীতি নিয়ে মার্ক্সবাদের নানা তত্ত্ব নিয়ে, পিছন থেকে উৎসাহ দিতেন মাস্টারমশাইরা। ইতিহাসের অধ্যাপক মামুদ সাহেব থাকতেন পার্কসার্কাস ট্রামডিপোর ঠিক পিছনে, একা মানুষ তিনি, তাঁর ফ্ল্যাটেই হতে পারত বেশিরভাগ বৈঠক।  প্রথম দিকটায় তিনি থাকতেন শ্রোতা, আর তারপর তর্কের আসরে নেমে পড়তেন তিনি নিজেই। সেখানে কখনও আহ্বান থাকত ননী ভৌমিকের জন্য, কখনও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, কখনও বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ? তিনি কি আসবেন আমাদের ডাকে ? বরানগরের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে বোঝাবার ভার পড়ল একজনের ওপর। রাজি হয়তো হবেন না, কিন্তু মুখোমুখি কথা বলবার এই সুযোগটা কি ছাড়া উচিত ?  সেই সুযোগ আঁকড়ে ধরে চলল সেই একজন তাঁর ডেরায়, বহুক্ষণের সাধনায় বশেও আনতে পারল তাঁকে, আর সেই অবিশ্বাস্য সফলতার আনন্দে বরানগর থেকে কলেজ স্ট্রিট পর্যন্ত পায়ে হেঁটেই চলে এল সে, যেন উড়তে উড়তে হালকা হাওয়ায় একটা পাখির মতো।’২ 

যে সব পাঠক এ সব বিষয় লক্ষ্য করেন তাঁরা জানেন যে, বাংলা সাধুভাষায় কদাচিৎ ক্রিয়াপদের এই এগিয়ে আসা ঘটত। সাধারণ বিবৃতিমূলক রচনায় এর দৃষ্টান্ত খুব বেশি না থাকাই সম্ভব। হাতের কাছের একটি বই থেকে।৩ একটি অনুচ্ছেদ তুলি :

‘এই নবজিজ্ঞাসা বা নবচেতনার প্রাথমিক পর্বে তিনটি অস্ফুট পরিবর্তনের চিহ্ন আমাদের চোখে পড়ে। মানুষ নিজের ওপর বিশ্বাস কিছুটা ফিরে পাওয়ায় পুরোপুরি দেবনির্ভর বাঙালি জীবন কিছুটা মানবমুখী হয়ে উঠল― সমকালীন বাংলা সাহিত্যেও তার ছাপ পড়ল। সাহিত্যে দেবদেবীর মাহাত্ম্যপ্রচার অব্যাহত থাকলেও, তা ঠিক দেবমুখিতা থাকল না। স্মরণীয়, বৃহত্তর অর্থে যাকে মানবিকতা (humanism) বলা হয়, তার অর্থ যদি করি, বঞ্চিত নিপীড়িত মানবের প্রতি মমতা, তাদের দুঃখ নিরসনের সচেতন প্রয়াস, তাহলে উনিশ শতকের সূচনায় খুব কম জনই তাঁদের কথা ভেবেছেন, বা তাঁদের দ্ঃুখ দূর করে সম্মান দিতে প্রয়াসী হয়েছেন। যে কারণে উনিশ শতকের এই নবজিজ্ঞাসা বাংলার বৃহত্তর জনজীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি। যা কিছু জিজ্ঞাসা, যা কিছু সংশয়, তা শহর অঞ্চলের (বিশেষ করে কলকাতার) সামান্য সংখ্যক শিক্ষিতের মধ্যেই সীমাবব্ধ রইল, পল্লি অঞ্চলে তার প্রভাব যথেষ্ট পড়েনি।’

আমরা এমন বলি না যে, এই ক্রিয়ান্তিক বাক্যের মধ্যেও ব্যক্তির কোনও মুদ্রণ আনা সম্ভব নয়, কিংবা বিবৃতিমূলক গদ্যেও ক্রিয়াপদকে তার বাক্যশেষের অবস্থান থেকে সরানো হয় না। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ যখন তা করেন তা বাংলায় চলিতভাষা প্রয়োগের যে ব্যক্তিগত ব্যাকরণ সেই ১৯১৪-র সবুজপত্র থেকে তৈরি হয়েছে তার দীর্ঘ ঐতিহ্য মেনেই করেন। সেই সময়ে প্রমথ চৌধুরী এবং রবীন্দ্রনাথের চলিত গদ্য ক্রিয়াপদকে বাক্যের নানাস্থানে সরিয়ে এনে সেই গদ্যে এক ধরনের ব্যক্তিকতা যোগ করা শুরু করেন। এতে, আমাদের মতে, বাক্যে যে সংবাদ দেওয়া হয় তাতে কিছুটা মৃদু নাটকীয়তার সঞ্চার করা যায়। এই কারণে যে, বাক্যের মূল সংবাদবাহক যে বন্ধ বা phrase-গুলিকে মুক্ত করছে, কী করছে, কীভাবে করছে সেগুলি পরে আসছে, যেন পাঠকের কৌতূহলকে খানিকটা ঘনীভূত হতে দিয়ে লেখক খবরটা একটু দেরিতে দিচ্ছেন। বাক্যে ক্রিয়া শেষে থাকলে ওই হালকা চমকটা থাকে না। 

গ. ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটিয়ে মধ্যে অন্য খবর গুঁজে দেওয়া

এও একটা অন্বয় বা বাক্যগঠনের কায়দা, এবং এর জন্য আমরা ইংরেজি গদ্যের কাছে ঋণী। বাক্যের মধ্যে বাক্য গুঁজে দিয়ে বাক্যের গঠন জটিল করে তোলা। এই ‘জটিলতা’ পরিণত ভাষাব্যবহারকারীর কাছে কোনও সমস্যা নয়, কারণ সে নিজেও এই ধরনের জটিলতা প্রতিমুহূর্তেই সৃষ্টি করছে তার কথায়। তবু গদ্যে এই ধরন মূলত ইংরেজি গদ্যের থেকে এসেছে, যা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অনেক আগেই লক্ষ্য করেছেন। যেখান থেকেই আসুক, ইংরেজি ভাষাভিজ্ঞ বুদ্ধদেব বসু, পরে অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র প্রভৃতির রচনায় তা বাংলার সাহিত্যিক গদ্যের এক স্থায়ী লক্ষণ হয়ে গেছে। যেমন এই বাক্যগুলি :

‘বস্তুত, গত পঁচিশ বছর জুড়ে, বা হয়তো আর একটু বেশিও হতে পারে, আমরা আমাদের চারপাশে যে মিডিয়ার ফেঁপে-ওঠা চেহারা দেখতে পাচ্ছি, রেডিও টেলিভিশন আর কাগজের পর কাগজের যে প্রকাশোল্লাস, মনের ওপর তার একটা প্রভাব নিশ্চয়ই আছে।’৪

কিংবা―

‘এ-অভিযোগকে উপেক্ষা করবার আগে গোটা পৃথিবীর দিকে খোলা চোখে তাকাতে হয় একবার―যেখানে মানুষ একই সঙ্গে চাঁদে উড়ছে আর অসহায় মাটিতে এমন বোমা ছুঁড়ে ফেলছে যার স্পিøন্টার শরীরের (‘এমনই’) মধ্যে ঢুকে গেলে এক্সরে দিয়েও তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না আর, মানুষ তৈরি করছে ভব্যসভ্য সমাজ, চালচলনে নিখুঁত, যেন আনুষ্ঠানিকতার ঈষৎ স্খলন হলেই ধসে যাবে সব―আর তার পাশেই সাপ্তাহিক ‘টাইম’-এ খবর ছাপা হচ্ছে ‘এ হেল্থি রাইজ ইন রেপ’ এ কি প্রহসন না সর্বনাশ ?’৫

এই গদ্যের মধ্যে একটা দৌড় আছে, এক সূত্রে বেঁধে এক সঙ্গে বলে ফেলার একটা ইচ্ছা আছে, উনিশ ও আদি বিশ শতকীয় সাধু গদ্যের মন্থরতার সঙ্গে এর পার্থক্য সহজেই ধরা য়ায়। না, জয়েসীয় চেতনা-প্রবাহের মতো অত বিশৃঙ্খল নয় এ গদ্য, তবু বোঝা যায়, চেতনাপ্রবাহের মধ্যে গদ্য এক ধরনের বেপরোয়া মুক্তি না পেলে এই গতি আসত না পৃথিবীর গদ্যে, এ ব্যাপারে বাংলা সাহিত্যে তাঁর আগেই একটি ঐতিহ্য হয়তো তৈরি হয়েছিল।  

২ শৈলীর বাইরে : নানামুখিতা, বহুপঠন

কবি এবং সাহিত্যের অধ্যাপক, কাজেই শঙ্খ ঘোষের রচনায় সাহিত্যে ও কবিতার প্রসঙ্গই বেশি থাকবে তাঁর স্মৃতিচারণের বাইরে, তা অস্বাভাবিক নয়। রবীন্দ্রনাথ তো বটেই―তাঁর গদ্যসংগ্রহ-এর তিনটি খণ্ডের অনেকটা জুড়ে তিনি হাজির।  কিন্তু এ সব গদ্যে একটা ব্যাপার দেখি যে, দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া শঙ্খ ঘোষ অধ্যাপকের একাডেমিক অভ্যাস গ্রহণ করেন না। এক ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ―বইয়ে তাঁকে দেখি উৎস-নির্দেশ, পাদটীকা ইত্যাদি দিয়ে গ্রন্থটির একটি প্রগাঢ় বিদ্যায়তনিক চেহারা দিতে। আরও দু-এক জায়গায় পাদটীকা যোগ করেন তিনি। কিন্তু অন্য লেখাগুলিতে তা করেন না, তা সত্ত্বেও তাঁর বহুমুখী পঠনের বিষয়টা চূর্ণ চূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে থাকে।  হঠাৎ চলে আসে ডি এইচ লরেন্সের একটা কথা, স্পেন্ডার, মধুসূদন, এলিয়ট, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কীয়ের্কেগাড, ঋগে¦দের রাত্রিস্তোত্র, জাক মারিত্যাঁ, কোলরিজ, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, গিন্সবার্গ, টোমাস মান, আর্জেন্টিনার ভাবুক এজেকিয়েল মার্টিনেথ, মালার্মে, মণিভূষণ ভট্টাচার্য, বিমলচন্দর সিংহ, আঁদ্রে জিদ, জঁ ককতো, গেস্টালট সাইকোলজি, এডমন্ড উইলসন, তেইয়া দ্য শারদ্যাঁ. ওয়ালেস স্টিভেন্স―কী নেই ? কবিদের কবিতা শুধু নয়, ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস শুধু নয়, তাঁদের নানা গদ্যরচনার নানা ছত্র তাঁর অভাবিত স্মৃতি তাঁর মুখে পৌঁছে দেয়।  শুধু তাঁর জার্নাল পড়লেই তাঁর পাঠ্যের আভাসে স্তম্ভিত হতে হয়। এত নাম যে করেন তা কি কলেজে যৌবনে তাঁর শিক্ষক ক্ষুদিরাম দাসের এই বকুনি থেকে যে, কোনও এক পরীক্ষার খাতায় শঙ্খের ‘ঋষি বলেছেন,’ বলে একটি উদ্ধৃতি দেওয়ায যিনি লাল কালিতে পাশে লিখে দিয়েছিলেন, ‘কোন্ ঋষি ?  চালাকি কোরো না।’ পরে ‘ঐতিহ্যের বিস্তার’ তাঁর পাঠ ও মনোযোগের পৃথিবীকে আরও কোন কোন দিগন্তে পৌঁছে দেবে আমাদের তার হিসেবই থাকবে না। কিন্তু তা থেকেই বুঝতে পারি, পাণ্ডিত্যের চেনা প্রকাশ্য ছকে নিজেকে না স্থাপন করেও এই মানুষটির অধ্যয়ন অনেক পণ্ডিতের চেয়েও বেশি, এবং বহুমুখী। 

এতেই প্রকাশিত হয় তাঁর সর্বতোমুখী এক গ্রহিষ্ণুতা। তাঁর একটা রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল, নিজের নিরীশ্বরবাদের কথাও তিনি বার বার বলেন, কিন্তু তবু তিনি শোনেন অরবিন্দের দর্শনের কথা।

তাঁর নানা লেখা পড়লে পাঠকের আরেকটা জিনিস মনে হয়। অল্প কয়েকটি বাক্যে এক-একটি চরিত্র তৈরি করে দিতে পারেন তিনি, মানুষটার ভেতর-বাইরেটা দেখিয়ে দিতে পারেন। বন্ধুর, অধ্যাপকের, টাঙ্গাওয়ালার, ভুটানের ড্রাইভারের। পরিপার্শ্ব বর্ণনাতেও তাঁর জুড়ি নেই। অবশ্যই ছোটদের জন্য একটি-দুটি উপন্যাস লিখেছেন তিনি, কিন্তু তার বাইরে বড়দের জন্য গল্প-উপন্যাসের উদ্যম কেন তাঁর হলো না, এই প্রশ্ন আমাদের মতো পাঠককে পীড়িত করে। তাঁর মানুষকে দেখা, পৃথিবীকে দেখার মধ্যে যে গভীরতা ছিল তা গল্পে-উপন্যাসে বিস্তারিত হলে কতই না সম্পদ সৃষ্টি হত। আমাদের মনে হয়, তিনি বাংলা সাহিত্যকে এই দিক থেকে বঞ্চিত রাখলেন। পাওয়ার হিসেব অবশ্য আমাদের কিছুটা প্রবোধ দেয়।

তৃতীয় আর-একটা কথা। একটা ছোট উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করি :

‘১৯৫২ সালের দোসরা এপ্রিল। পার্ক সার্কাস ময়দানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিস্ময়বিমুগ্ধ একজন তরুণ দেখছে : কোনাকুনি পথ ভেঙে দীর্ঘ পদক্ষেপে বিশাল প্যান্ডেলের দিকে ওই এগিয়ে চলেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়; তুর্কি কবি নাজিম হিকমতরের কবিতার টাইপ-করা ইংরেজি স্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় ইন্টারভিউ দিচ্ছেন এক অবাঙালি সাংবাদিকের কাছে, প্রেস-চিহ্নিত ঘেরাওয়ের মধ্যে বসে বিবরণী লেখার জন্য তৈরি হয়ে আছেন মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, মঞ্চ থেকে সভাপতিমণ্ডলীর নাম ঘোষিত হচ্ছে একের পর এক―ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, উদয়শঙ্কর, যামিনী রায়, মামা ওয়রেরকার, সুমিত্রানন্দন পন্থ, ভাল্লাথোল, মুল্ক্রাজ আনন্দ, কৃষণ চন্দর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, পৃথ্বীরাজ কাপুর…’

এর মধ্যে একটা বিষয় হলো প্রত্যক্ষতা, যেন শুধু কবির নয়, পাঠকেরও চোখের সামনে ঘটছে ঘটনাটা। শঙ্খ ঘোষের স্মৃতিকথার এটা একটা বড় লক্ষণ। যে জন্য তাঁর কথাসাহিত্য রচনার বিষয়ে আমাদের অভাববোধ থেকেই যাবে। আরেকটা বিষয় হলো, সবাই বলে কবিরা সাল-তারিখের বিষয়ে অমনোযোগী, কবিরা নিজেরাও নিজেদের সম্বন্ধে এই সংস্কার ছড়াতে এবং পোষণ করতে ভালোবাসেন। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ মোটেই তা নন। তিনি আখ্যানের ধরনে স্মৃতিচারণ করেন, তার রসটা ইতিহাসের নয়, গল্পের। কিন্তু চারপাশে ছড়িয়ে রাখেন সন-তারিখ। কবে বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলন শুরু হয়েছিল, কবে কলকাতায় সোমেন চন্দের হত্যার ধিক্কারসভা হলো, কিংবা শুরু হলো কলকাতা পুস্তক মেলা―বস্তুতপক্ষে ১৯৫০ এর পর কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনের একটা ইতিহাসই যেন উঠে আসে তাঁর লেখায়। কাজেই ভবিষ্যতের ঐতিহাসিকেরা শঙ্খ ঘোষের স্মৃতিচারণাগুলিকে কবির লেখা বলে তুচ্ছ করতে পারবেন না। আমি জানি না তিনি নিজে কোনও ডায়েরি রাখতেন কি না, কিন্তু তাঁর আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি আমরা নিজেরাও প্রত্যক্ষ করেছি নানা সূত্রে।

দ্বিতীয়ত, তাঁর রচনায় প্রশ্নবাক্যের বাহুল্য আছে বলে আমরা দেখিয়েছি, তা সকলেরই চোখে পড়ে, কিন্তু তাঁর নিজের মধ্যেও যে অনন্ত প্রশ্ন আছে, তা তাঁর জার্নাল-এর লেখাগুলি পড়লে বোঝা যায়। কারও বক্তৃতা শুনছেন, কারও সাক্ষাৎকার পড়ছেন, কারও সঙ্গে কথোপকথন চলছে, এ সব তাঁর ভালো লাগছে তা জানাতে তাঁর দ্বিধা নেই, কিন্তু সেই ভালো লাগার মধ্যেও প্রশ্ন থাকে, সংশোধন থাকে, যদিও সেটা যে সংশোধন তা বুঝতেই দেন না তিনি। যেমন অমিয় চক্রবর্তী আর কবিপত্নী হৈমন্তী বললেন, তাঁদের নবজাত শিশুকন্যা সেমন্তীকে (জন্মের দুদিন বাদে) দেখেই রবীন্দ্রনাথের ‘শিশুতীর্থ’ লেখার কথা মনে হয়েছিল। শঙ্খ ঘোষ তার পরেই যোগ করেন, কিন্তু কেমন করে বুঝব আমরা সেকথা ?  লেখা যে শুরু হলো এর দুমাস পর, জার্মানির এক প্যাশন প্লে৬ দেখে, সে তো অমিয়বাবুরই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ! ঠিক সেই মুহূর্তেই তো দেশে তিনি চিঠি লিখেছিলেন তাঁর সে-অভিজ্ঞতার বিবরণ জানিয়ে ?’

এই হলো শঙ্খ ঘোষের বিদ্যায়তনিক বা অ্যাকাডেমিক আলোচনার এক চেহারা। তিনি দৈনন্দিন নানা উপলক্ষ্যে তাঁর প্রশ্নাকুলতা তৈরি রাখেন, সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকেন নিজে, কোনও জ্ঞানের প্রসঙ্গ এলেই তার সত্যাসত্য নির্ধারণের বিষয়ে।  

৩. গদ্য বলেন যখন

তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা অবশ্যই মূলত লিখিত ভাষণ হতো, যার সংগঠনে একটা পারিপাট্য থাকত, আর থাকত সুনির্বাচিত শব্দ, যা শুধু তাঁর চিন্তাস্রোতকে বহন করত না, তাঁর আবেগকেও উন্মুখ করত, দুইই আমাদের স্পর্শ করত। তাঁর উচ্চারণের মধ্যে ওই একটা সংযত গাম্ভীর্য ছিল, কিন্তু কবিতার আবৃত্তির মতোই তা ছিল আবেদময়।  সেটা তাঁর বক্তৃতা যাঁরা শুনেছেন তাঁরা সকলেই জানেন। কিন্তু আমরা দেখেছি, যখন তিনি অপ্রস্তুতভাবেও কিছু বলতে উঠেছেন তখনও তাঁর কথা একটা চমৎকার সংগঠন পেয়েছে। তাঁর ক্লাসে পড়ানোও ছিল ওই রকম। জানি না, তাঁর ওই অপ্রস্তুত বক্তৃতা কোথাও ধরা আছে কি না। থাকলে তাতে কথ্য গদ্যের আরও নানা মাত্রা বিচার করা সম্ভব হতো―তার উচ্চারণ, শব্দের নির্বাচন, তাতে জোর দেওয়া না-দেওয়া, এবং তাতে কীভাবে একটা সম্পূর্ণতা দিতেন তিনি!  

৪. কিছু উচ্চারণ 

‘নতুন শব্দের সৃষ্টি নয়, শব্দের নতুন সৃষ্টিই কবির অভিপ্রায়।’

‘আজকের দিনে কবিসমাজের যে আবহাওয়া তৈরি হয়েছে―শুধু কবিতাসমাজ নয়, গোটা সমাজেরই―তাতে সংখ্যার হিসেব আর প্রত্যক্ষতার হিসেবকেই ধরে নেওয়া হয় প্রতিভার পরিমাপ, সেই হলো কবি-পরিচয়ে বেঁচে থাকবার হিসেব। প্রকৃতির চেয়ে পরিমাপ আজ বড়। অন্তরাল সহ্য করা কবিদের পক্ষে আজ অসম্ভব হয়ে উঠেছে তাই। কবি আজ অনুষ্ঠাতা, প্রবহমান অনুষ্ঠাতা।’ 

‘পদ্যছন্দকে খুলতে খুলতে গদ্যকবিতার দিকে পৌঁছান রবীন্দ্রনাথ, আর গদ্যকেই কবিতার সাজ পরিয়ে নিতে গদ্যছন্দকে ধরতে চান অবনীন্দ্রনাথ।’

‘সেমিনার ব্যাপারটার এই এক মুশকিল। ঔৎসুক্যের চেয়ে কৌতূহল সেখানে বেশি, জানবার ইচ্ছের চেয়ে যাচাই করবার ইচ্ছেটাই যেন বড়। এমন সেমিনার অল্পই দেখেছি, যেখানে বিজ্ঞ শ্রোতারা কোন বিনয় নিয়ে আসেন, নিজের গুরু-গরিমা ভুলে কেবল বিষয়টির তদগত আকর্ষণেই আসেন। সেমিনার হলে পণ্ডিতদের টুপিতে আরও একটি পালক গুঁজবার খেলা, বায়োডাটার ভল্যুম বাড়ানো। ‘যিনি বলছেন তাঁর চেয়ে আমিই-বা কী কম জানি’ এই হচ্ছে এখনকার পণ্ডিতদের আত্মজিজ্ঞাসা।’

‘আর আজ, ঢুকছি যখন ভবনে, তখন এই লোকটি আমাকে বিমূঢ় করে দিয়ে বলেছে : ‘ভিজলেন তো ? ঠাণ্ডা লাগেনি তো ? লাগে না বেশি ঠাণ্ডা। আর তাছাড়া, আমি কাল বাড়ি ফিরে প্রার্থনাও করেছি আপনাদের জন্য, যেন ঠাণ্ডা না লাগে।’ দাতারাম বাল্মীকি এর নাম। 

এই হলো আরেকরকম মানুষ। মানুষ, যেমন হতে পারত। মানুষ, যেমন হবার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে আমরা এমন হলাম কেন ?’

‘…দেখতে পাই প্রাণনার সমস্ত মহলেই―জীব বা উদ্ভিদ―একের দিকে অন্যের বিসর্পিত অভিমুখিতা, অভিমুখী সেই টানটারই অন্য নাম ভালোবাসা। যে মনে করে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে প্রকৃতি থেকে, সর্বস্ব থেকে, এমনকী সেও যুক্ত হয়ে আছে, থাকতে চায়, তার মুহূর্তের সঙ্গে, প্রবাহণের সঙ্গে। যোগ ছাড়া কিছু নেই, আর সেই যোগেরই অন্য নাম ভালোবাসা।’

টীকা

১. শঙ্খ ঘোষের গদ্যসংগ্রহ ১, কলকাতা, দে’জ পাবলিশিং, ২০০২, পৃ. ১৭, ৩১।

২. গদ্যসংগ্রহ ১, পৃ. ১৬৫-৬৬।

৩. স্বপন বসু, বাংলায় নবচেতনার ইতিহাস, কলকাতা, পুস্তক বিপণি, পৃ. ৮।

৪. গদ্যসংগ্রহ ৩, পৃ. ২৬৬।

৫. ওই, পৃ. ১৪৬।

৬. জার্মানির ওবেরআম্মেরগাউ গির্জায় অনুষ্ঠিত দশ বৎসরান্তরে অনুষ্ঠিত প্যাশন প্লে, রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০-এ তা দেখেছিলেন।

 লেখক : ভাষাতত্ত্ববিদ; সাবেক উপাচার্য,

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares