শোকাঞ্জলি : জামানস্যার : রাজীব চক্রবর্তী

জামানস্যারের সঙ্গে আমার পরিচয়ের বয়স এক দশক চার মাস। প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ-এর কাজে প্রথম বাংলা একাডেমি গেলাম ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর। সেই প্রথম ওঁকে দেখি। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার মোহরকুঞ্জে বাংলাদেশ বই মেলায় তাঁর সঙ্গে শেষবার দেখা (যদিও গত ১৯ নভেম্বর, ২০২০ তারিখে বিস্তার: চিটাগাং আর্টস কমপ্লেক্স এর আন্তর্জালিক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে শেষ বার দেখা ও কথা হয়)। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘স্যার, কেমন আছেন ?’ বললেন, ‘কেমন থাকা উচিত বলো!’ বললাম, ‘তরুণ! টগবগে!’ বললেন, ‘তাই তো আছি! বয়স আমার আর কত ? সবে তো আশি!’ ২০১৯-এ আশিতে পা দিতে চলা তরুণ যে ২০২১-এ আশি পার করেই তড়িঘড়ি করে চলে যাবেন সে কথা গত ১৪ই এপ্রিল দুপুরে তাঁর প্রয়াণের খবর পাওয়ার আগের মুহূর্তেও ভাবনার অতীত ছিল।

যে উপলক্ষ্যে তাঁকে নিয়ে এই লেখা সে উপলক্ষ্য এত তাড়াতাড়ি এসে যাবে এমনটা আশা করিনি। তাঁকে নিয়ে নির্মোহ, নৈর্ব্যক্তিক লেখা আমি লিখতে পারব না। তাঁর প্রয়াণে যে শূন্যতার বোধ তৈরি হলো তাতে করে সে কাজ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আমার ব্যক্তিগত বেশ কিছু স্মৃতিতে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল, বা বলা ভালো, আমার স্মৃতির বৃত্তে তাঁর উপস্থিতি আমার পক্ষে গৌরবময় হয়ে রয়েছে। সেরকম কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং তাঁর একটি মূল্যবান কাজ―যা আমাকে বিভিন্নভাবে ঋণী করেছে তাঁর কাছে―তা-ই এই লেখায় সমৃদ্ধির খোরাক জোগাবে।

গত দশ বছরে জামানস্যারকে আমি কাছ থেকে দেখেছি কিছুটা ভয় মেশানো শ্রদ্ধাতেই। সে-ভয়ের কারণ তাঁর প্রবল ব্যক্তিত্ব। আমার প্রতি তাঁর স্নেহ-দৃষ্টি ছিল না সে কথা বলতে পারব না। কিন্তু বরাবর দেখেছি আবেগের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশই তাঁর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে বাংলা একাডেমিতে গিয়েছি একটি সভায়। আমন্ত্রণ ছিল আইক্যান এর (ICANN) তরফে। বর্তমানে আমরা আন্তর্জাল ব্যবহার করার জন্য যে ঠিকানার সাহায্য নিই (যেমন https://www.facebook.com/ ev http://www.btrc.gov.bd) সেগুলি আন্তর্জাতিক স্তরে যাঁরা অনুমোদন দেন বা অনুমোদনের নীতি নির্ধারণ করেন সেই সংস্থার নাম আইক্যান। জামানস্যার তখনও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক।

সভার শেষে, বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় যে ব্যাগ দেওয়া হয়, তাই তিনি দেবেন সভায় উপস্থিত সমস্ত বিদেশি অতিথিদের। অন্যদের সঙ্গে আমারও সে ব্যাগ পাওয়ার কথা। আমার সামনে এসেই সামান্য হেসে বললেন, ‘তোমাকে দেব না, তুমি পাবে না।’ আমি কিঞ্চিৎ ছদ্মবিস্ময় প্রকাশ করলাম। বললেন― ‘তোমার অনেক শুভানুধ্যায়ী এখানে, তুমি তো ওদের কাছ থেকেই জোগাড় করে নিতে পারবে।’ শুনেই আমি মহাপরিচালকের ঘর থেকে বেরিয়ে, একাডেমির আমার এক বন্ধুকে অনুরোধ করি আমাকে একটা ব্যাগ দিতে, অন্যথায় সম্মান যায় প্রায়। একাডেমির সে বন্ধু সম্মান রক্ষা করলেন। সে ব্যাগ নিয়ে তাঁর ঘরে ঢুকতেই হেসে বললেন―‘জানি তো তুমি পাবে, সে জন্যই তো দিইনি।’

তাঁর স্নেহের প্রকাশ কখনও উচ্চকিত ছিল না, কিন্তু তার ওমটুকু পাওয়া যেত। ঢাকাতে যতবার দেখা হয়েছে ততবারই নিজের সদ্য প্রকাশিত বই তুলে দিয়েছেন হাতে। একবার বিশ্বকাপ ফুটবলের উপরে লেখা ওঁর একটি অসামান্য মূল্যবান বই আমাকে লিখে উপহার দিলেন। পরে ওঁর মনে হয়েছিল যে বইতে যা লিখে দিয়েছিলেন তা ঠিক লেখা হয়নি। সে কথা ফোন করে জানান আমার এক বন্ধুকে, আমাকে জানাতে বলেন, সে বই পরের দিন যেন ওঁর কাছে নিয়ে যাই। নিয়ে গেলাম। আরেকটি বইতে ঠিক করে লিখে দিলেন, আগের দিনের বইটি ফেরৎ নিলেন। বললেন―ভাষার মানুষকে কি ভুলভাবে লেখা বই দেওয়া যায়! এমনই খুঁতখুঁতে ছিলেন তাঁর নিজের কাজের ব্যাপারেও। ওঁর সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত বাংলা সন ও পঞ্জিকার ইতিহাস-চর্চা এবং বৈজ্ঞানিক সংস্কার বইটি হাতে দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করেছিলেন, সে বইয়ের কী কী এবং কোথায় সংশোধন জরুরি। নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা দেখিয়ে দেখিয়ে সে সংশোধনের কথা উল্লেখ করেছিলেন―বলেছিলেন, সে বইয়ের একটি সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশের আসন্নতার কথাও। তাঁর এইভাবে হঠাৎ চলে যাওয়া অনেক কাজের মতো এই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজটিকেও অসম্পূর্ণ করে রাখল।

প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণের কাজে তিনি আমাকে সামিল করেছিলেন। যখন সে কাজে যোগ দিই, ঠিক কীভাবে কী কাজ করতে হবে সে সম্পর্কে ধারণা যে খুব স্পষ্ট ছিল তা নয়। কিন্তু সে ধারণা একটা পরিষ্কার চেহারা নিয়ে সামনে আসতে থাকল কিছু দিনের মধ্যেই। ব্যাকরণ-কারখানার কনিষ্ঠতম সদস্য হিসাবে আমার অন্তর্ভুক্তির জন্য জামানস্যারের প্রশ্রয় আমাকে কৃতজ্ঞ করে রাখবে তাঁর কাছে। এই কাজে আমি জুড়ে গিয়েছিলাম আমার মাস্টারমশাই অধ্যাপক পবিত্র সরকারের প্রণোদনায়। আর জামানস্যার এই কাজে আমাকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। আমাদের কাজ শুরু হয়েছিল একাডেমির প্রেস ভবনের দোতলায় মহাপরিচালকের দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে। তাঁর সতর্ক দৃষ্টি এবং সযত্ন অভিভাবকত্ব প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণকে রেকর্ড সময়ে শেষ করার ব্যাপারে একটা দৃষ্টান্ত হিসাবে খাড়া করেছে। প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ প্রকল্প হাতে নেওয়া এবং যে কোনও মূল্যে তার একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার জন্য তাঁর জেদ এবং নিষ্ঠা বাঙালি জাতিকে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ করে রাখবে। বহুদিন থেকে বহু বিদগ্ধ মানুষ আধুনিক বাংলা ভাষার একটা নিজস্ব ব্যাকরণ লেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। কিন্তু প্রয়োজন বোধ করা এক কথা, আর তাকে বাস্তবায়িত করা আরেক ব্যাপার।

বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস―এ সবের একত্র উপস্থিতি তাঁর মধ্যে যে ছিল সে তো প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ-এর নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশই প্রমাণ করে। দুই বাংলার (ঘটনাক্রমে তা দুটি আলাদা রাজনৈতিক ভূখণ্ডের অংশ) ভাষা ও ব্যাকরণ বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করে এরকম কাজের উদাহরণ সারা পৃথিবীতেই খুব কম। এই কাজে যখনই কোনও প্রশাসনিক জটিলতা (তা সে আমাদের কলকাতা-ঢাকা যাতায়াতের ব্যাপারই হোক, ঢাকাতে আমাদের দীর্ঘ সময় থেকে কাজ করার ব্যাপারই হোক, এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সম্মানীর ব্যবস্থা করাই হোক, বা ঢাকাতে আমাদের অবস্থানকালে সাপ্তাহিক বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ছুটির দিনে একাডেমিতে কাজ করার সমস্ত রকম ব্যবস্থা করাই হোক) এসেছে নীরবে তিনি সে সবের সমাধান করেছেন, আমাদের তার কোনও আঁচ পেতে না দিয়েই। সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোয় এধরনের কাজ করা যে কতখানি সাহস ও জেদের প্রয়োজন হয় সেকথা আর আলাদা করে উল্লেখ করা বাহুল্য মাত্র। এই কাজে দুই বাংলার প্রায় সমস্ত ভাষাচিন্তকদের তিনি একত্র করতে চেষ্টা করেছেন। আমরা জানি বাঙালির জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে এ কাজ খুব সহজ নয়। মতান্তর এবং মনান্তরে কাজ প্রায়ই পণ্ড হয়। কিন্তু জামানস্যারের প্রখর ব্যক্তিত্ব এক্ষেত্রে প্রধান হাতিয়ার ছিল। যে কোনও পরিস্থিতিতে কোনওভাবেই যাতে কাজ বন্ধ ও পণ্ড না হয় তা তিনি নিশ্চিত করেছেন। এই প্রকল্প তাঁর বহু বছরের স্বপ্নের প্রকল্প।    

নীরস জ্ঞানচর্চায় তাঁর আগ্রহ ছিল না। প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ-এর কাজের একঘেয়েমি কাটাতে তাঁর সযত্ন দৃষ্টি ছিল। একাডেমিতে যখনই কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন ব্যাকরণের কারখানায় তাঁকে নিয়ে আসা চাই। কথায়, গল্পে ব্যাকরণের জটিল আবর্ত থেকে খানিকটা মুক্তি পেয়ে আমরাও বাঁচতাম। প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ এবং প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ এর অন্যতম প্রধান সম্পাদক জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তো তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধে আমাদের জারিত রাখতেনই সর্বদা। জামানস্যারও সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। মনে পড়ে একবার তিনি তাঁর পারিবারিক পরিচয় লিপিবদ্ধ করে রাখা খাতা নিয়ে এসেছিলেন, যেখানে তাঁর বিগত কয়েক পুরুষের জন্মকথা লেখা রয়েছে। বাঁধাই করা সে বিরাট খাতার পাতা খুলে খুলে আমাদের দেখিয়েছিলেন। সেদিন তাঁর সঙ্গে অধুনা প্রয়াত কবি বেলাল চৌধুরীও ছিলেন―আমার ক্যামেরায় সে ছবি ধরা পড়েছিল। এভাবেই কখনও কবি আসাদ চৌধুরী তাঁর পানের ডিবে নিয়ে এসেছেন―পানাহারে তিনি ব্যাকরণকে ঋদ্ধ করেছেন। এসেছেন খ্যাতিমান গায়িকা পাপিয়া সারোয়ার, লেখক সেলিনা হোসেন, তৎকালীন মাননীয় অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল মুহিত, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, করুণাময় গোস্বামী, কবি অসীম সাহা, অধ্যাপক ফকরুল আলম, কবি-অধ্যাপক খোন্দকার আশরাফ হোসেন, আরও কত মানুষ। আর এই প্রকল্পের অন্যতম উপদেষ্টা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের উপস্থিতি তো আমাদের দিনযাপনের গ্লানি থেকে মুক্তি দিত―আমাদের সামনের পথ প্রশস্ত করে দিত। প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ এবং পরে প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ নিয়ে তাঁর নিজের উৎসাহ যতখানি ছিল, গর্বও ছিল ততখানি। গর্বিত পিতার মতোই তাঁর এই দুই সন্তানকে তিনি সকলের সঙ্গে পরিচিত করাতে ভালোবাসতেন।

এ কথা এখানে স্বীকার করে নিতেই হবে যে আমাদের ব্যাকরণ-প্রকল্পের সম্পাদনা পরিষদের সদস্য (প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক পবিত্র সরকার; সহযোগী সম্পাদক অধ্যাপক মাহবুবুল হক, অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী, অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার এবং বর্তমান নিবন্ধের লেখক), সম্পাদনা সহযোগী (একাডেমির সহকারী পরিচালক জনাব কাজী রুমানা আহমেদ সোমা, সায়েরা হাবীব এবং এই প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক একাডেমির পরিচালক জনাব ড. আবদুল ওয়াহাব) এবং অন্যান্য সহকারী (জনাব আল আমিন)―এই সকলে মিলে যেন একটা বৃহৎ পারিবারিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে পেরেছিলাম আমরা। সেখানে মতান্তর হতো, কিন্তু তা কখনও মনান্তরে শেষ হয়নি। আজ সে কাজ শেষ করার প্রায় এক দশক অতিক্রান্ত হতে চললেও সে যোগাযোগ এবং সম্প্রীতির বন্ধন শিথিল হয়নি। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তো জামানস্যারের―তিনি এরকম একটি পরিকল্পনা করেছিলেন এবং আমাদের কাজের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন বলেই এ কথা আজ বলতে পারছি। স্বীকার করতেই হবে প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ এবং প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা―এই কাজ আমার সারস্বতচর্চার অভিজ্ঞতাকে পূর্ণতর করেছে, আমার বন্ধুবৃত্তকে বিস্তৃততর করেছে।   

মাঝে মাঝে বেশ ঘটা করে আড্ডার আয়োজনও হত। পবিত্রস্যার আর আমার ঢাকায় এই পর্বে দীর্ঘ সময় থাকার ব্যবস্থা হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইমিং পুলের উল্টোদিকে বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি চত্বরের সেন্টার অব এক্সেলেন্স এর প্রশস্ত এবং আরামদায়ক আন্তর্জাতিক অতিথি নিবাসে। জামানস্যারের উৎসাহেই এখানে মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় আমাদের চা আর আড্ডার আসর বসত। সে আসরের অতিরিক্ত প্রাপ্তি হত পবিত্রস্যারের গান গাওয়া। এমনিতে ব্যাকরণের কাজের ফাঁকেও গানের অভাব ঘটত না―হয় পবিত্রস্যারের গাওয়া গান, নয়তো আমার ল্যাপটপ থেকে গান শোনা। ২০১১ সালের জুলাই মাসের কোনও এক সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির প্রেস বাড়ির মহাপরিচালকের সংলগ্ন সম্মেলন কক্ষে প্রমিত বাংলা ব্যাকরণের কাজ চলছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে অক্লান্ত ধারায় সেই বিকেল থেকে। ব্যাকরণের কুশীলবেরা কেউই বেরোতে পারছেন না। সঙ্গে মহাপরিচালকও বৃষ্টিতে অবরুদ্ধ। বৈয়াকরণেরা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ক্লান্ত, অবসন্ন। কাজ আর এগোয় না। মহাপরিচালক জামানস্যার মাঝে একবার এলেন সম্মেলন কক্ষে। একটু পরে শাহবাগের বিখ্যাত পরোটা আর সবজির গন্ধে সম্মেলন কক্ষ, আমাদের নাসারন্ধ্র ম-ম করতে লাগল। কাউকে কিছুই জানাননি, ফোন করে সকলের জন্য খাবার আনিয়েছেন। এরকমভাবে কতবার যে উদরপূর্তি হয়েছে! খাদ্য রসিক ছিলেন নিজে, তাই খাওয়াতেও ভালোবাসতেন। শ্যামলীতে তাঁর বাড়িতে আপ্যায়িত করেছেন ভুরিভোজে। আমাদের ঢাকা-বাসের সময় ঢাকার প্রায় সমস্ত বিখ্যাত খাবার এবং খাবারের দোকানের সঙ্গে তাঁর সৌজন্যেই পরিচিত হয়েছি। একবার তো গোটা ব্যাকরণের টিম নিয়ে (সেবার পবিত্রস্যারের স্ত্রী অধ্যাপক মৈত্রেয়ী সরকারও ছিলেন আমাদের দলে) পুরোনো ঢাকার ‘নিরব’ হোটেলে গেলেন দুপুরে খাওয়ার জন্য। আজ এ কথা লিখতে বসে মনে হচ্ছে যেন গতকালের স্মৃতি―এতটাই টাটকা। সেদিনের আমাদের দলের তিনজন আজ   নেই―জামানস্যার নেই, ওয়াহাবস্যার নেই, মৈত্রেয়ী জেঠিমাও নেই।    

জামানস্যারের প্রতি আমার পছন্দের প্রথম এবং প্রধান কারণ ওঁর পরিমিতি বোধ। কথা বলতেন কম শব্দে, সহজ ভাষায়। ছোট বাক্যে। কথা বলতেন, কিন্তু শুনতেনও। বর্তমান পৃথিবীতে আমাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো আমরা শুনি কম, বলি বেশি। তাঁর প্রথম বক্তৃতা শুনি ২০১১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সে বক্তৃতা শুনে চমৎকৃত হয়েছিলাম। কম কথায় কীভাবে অনেক কথা বলা যায় সে একটা শেখার ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল। যে কোনও সমস্যার একদম মূলে পৌঁছতে জানতেন সরাসরি। শূন্যগর্ভ কথার বাগাড়ম্বর তাঁর মুখে শুনিনি। তাঁর পাণ্ডিত্য আর কাজের পরিধির বিস্তার পরিমাপ করার চেষ্টা করা ধৃষ্টতা হবে আমার পক্ষে। কিন্তু বিস্মিত হয়েছি প্রবল প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলে চিন্তার এতখানি অবসর তিনি কীভাবে পেতেন সে কথা ভেবে!

স্বাধীন বাংলাদেশের ফোকলোর (এই শব্দটিকেই তিনি বাংলাতে ব্যবহার করতে চাইতেন) চর্চাকে তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করেছেন―সারা পৃথিবীর ফোকলোর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় সে সাক্ষ্য বহন করে। বাংলা একাডেমি থেকে বাংলাদেশের জেলা ভিত্তিক লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা (৬৪ খণ্ডে) এবং ফোকলোর সংকলনের যে বিশাল কাজ (৬৪ খণ্ডে) তিনি হাতে নিয়ে তার একটা প্রায় পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে গিয়েছেন, কোনও প্রশংসাই তার জন্য যথেষ্ট নয়। বাঙালির জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (প্রথম সংস্করণ ২০১১, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১২), প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ (২০১৪) এর পাশাপাশি এই জেলাওয়াড়ি ফোকলোর সংগ্রহের কাজ আগামী বহুবছর পথ দেখাবে গবেষকদের। এরই পাশাপাশি তাঁর নেতৃত্বকালীন সময়ে তিন খণ্ডে প্রকাশিত (প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ, সহযোগী সম্পাদক অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার) বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান (২০১৩) বাঙালির সারস্বতচর্চার ধারায় আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দুটি বাংলা ব্যাকরণ এবং বিবর্তনমূলক অভিধানের এই তিনটি প্রকল্প বাঙালির দীর্ঘ দিনের অভাব পূর্ণ করেছে। সময়ের নিয়মে এই কাজ দুটির পরিমার্জনার প্রয়োজন হবে, হয়তো কাজ দুটির নানা ত্রুটি আমাদের সামনে আসবে, এমনকি ভবিষ্যতে নতুন চিন্তার আলোতে এই কাজ বাতিল বলেও গণ্য হতে পারে। কিন্তু এই কাজের মধ্যে একজন বাংলা ভাষাপ্রেমী মানুষ হিসাবে জামানস্যারের যে দূরদৃষ্টির পরিচয় অনুসৃত আছে তা বোধ করি মুছে যাওয়ার নয়। এমন সিরিয়াস কাজের পরিকল্পনা করেন যে মানুষ, তিনিই আবার ঢাকাই রঙ্গরসিকতা, দুনিয়া-মাতানো বিশ্বকাপ এর মতো শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা করেন। বোঝা যায় যে ঊষর নয়, সরস জ্ঞানচর্চাই তাঁর ধারা।

দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে এই লেখা। জামানস্যারের প্রসঙ্গ এলে রাশ টানা কঠিন হয়। এরই সঙ্গে তাঁর অন্য ধরনের একটি কাজের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এই লেখার ইতি টানব। বাংলা গানের ধারাবাহিক ইতিহাস অনুসন্ধান আমার একটি নিরন্তর চর্চার বিষয়। তাঁরই উপহার দেওয়া বাংলা গণসংগীত (২০১৫, কথাপ্রকাশ সংস্করণ) বইটি আমার এই চর্চাকে ঋদ্ধ করেছে। এক খণ্ডে এমন একটি বিষয়ের তন্নিষ্ঠ উপস্থাপনা আমাদের সংগীতের ইতিহাসে নেই। এ বিষয়ে আরও দু-একটি কাজ যে হয়নি তা বলা যাবে না, কিন্তু শামসুজ্জামান খানের এই কাজ বাংলা গণসংগীতের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চিত্র হাজির করে আমাদের সামনে। এই বইতে পাণ্ডিত্যের স্পর্শ আছে, কিন্তু ঝাঁঝ নেই। জামানস্যারের চিন্তা এবং কথার মতোই তাঁর লেখা সহজ, ভণিতাহীন। সাধারণ উৎসাহী পাঠক এই বই হাতে নিয়ে বঞ্চনার বোধে আক্রান্ত হবেন না। আধুনিকতম সংস্করণের তিরিশ বছর (১৯৮৫) আগে এই বই প্রথম দিনের আলো দেখে। বোঝা যায় এই বিষয় তাঁকে ভাবাচ্ছে তারও আগে থেকে। কাজেই প্রায় চার দশকের চিন্তাভাবনার ফসল এই সংস্করণ।

সাধারণত দেখা যায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত বইতে বাংলাদেশের গণসংগীত এবং তার বিবর্তনের কথা প্রায় উপেক্ষিত থাকে, বা নামেমাত্র তার উল্লেখ থাকে। অন্যদিকে একই অনুযোগ বাংলাদেশের বইয়ের জন্যও প্রযোজ্য―বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের সময় থেকেই যেন তার পথ চলা শুরু। কিন্তু জামানস্যার এই বইতে বাংলা গণসংগীতের ধারাকে ১৯৩০-৪০-এর উত্তাল সময়ের উত্তরাধিকার হিসাবে দেখিয়েছেন। এমনকি অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শাতকের লোকগানের স্বাক্ষরও অনুসন্ধান করেছেন। পলাশির যুদ্ধের অনুষঙ্গে তৈরি গণজাগরণের গানের পাশাপাশি শিবনাথ শাস্ত্রী, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, মুকুন্দ দাস, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল হয়ে বয়াতিদের গান, নিবারণ পণ্ডিতের গান, রমেশ শীল, অজিত পাণ্ডে, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, মাইজভাণ্ডারী-মাদর ফকিরি পন্থা অবলম্বনকারী, আলতাফ মাহমুদ, আবদুল লতিফ, ফকির আলমগীরদের গানের একটা দীর্ঘ পথ তিনি পরিক্রমণ করেছেন এই বইতে। গণসংগীতের সংজ্ঞা, সূত্র এবং উৎস বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি একজন সমাজ বিজ্ঞানীর মতোই নির্মোহ―‘সংস্কৃতি ও রাজনীতি সচেতন নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষই এ গানের উদ্ভাবক ও স্রষ্টা এবং তারাই প্রধানত এর ভোক্তা।’ সারা পৃথিবীর গণসংগীত আন্দোলনের সূত্রে তৈরি হওয়া গণসংগীতের সঙ্গে বাংলার গণসংগীতের ঐতিহ্যের সম্পর্ক নির্ণয় তাঁর এই কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা এক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে এইভাবে এই ব্যাপারে আলোকপাত করতে। আশা করা যায় এই বইয়ের ধারা অনুসরণ করে ভবিষ্যতের কোনও গবেষক একে আরও বিস্তৃততর রূপ দেবেন।

জামানস্যারের স্মৃতির প্রতি আমার শ্রদ্ধা―। তাঁর ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া আমার আনন্দময় স্মৃতি হয়ে থাকবে। অত্যন্ত ব্যস্ত প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কাজকর্মের সঙ্গে সঙ্গে নবীনদের কাজের প্রতি তাঁর দৃষ্টি ছিল। গত ১৯ নভেম্বর বিস্তার এর আন্তর্জালিক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে যখন শেষবারের মতো কথা হলো, লক্ষ্য করলাম, বাংলা গান ও ধ্বনিমুদ্রণের ইতিহাস নিয়ে আমার কাজের ব্যাপারে তিনি ওয়াকিবহাল। ওই দিন তাঁর কাছে যে উৎসাহব্যঞ্জক কথা শুনেছিলাম তা আমার আগামীর পাথেয় হোক।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares