শোকাঞ্জলি : হাবীবুল্লাহ সিরাজী : আমৃত্যু সচেতন এক মৌলিক কবিকণ্ঠ : নাসির আহমেদ

হাবীবুল্লাহ সিরাজী (১৯৪৮Ñ২০২১), ষাটের দশকের সম্পূর্ণ এক স্বতন্ত্র কবিকণ্ঠ। বলতে গেলে, অকালেই চলে গেলেন তিনি ২৪ মে ২০২১-এ। এ দেশের গড় আয়ুর বিবেচনায় ৭১ খুব কম নয় বটে কিন্তু হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মত তারুণ্যখচিত আধুনিক রুচির একজন নিরন্তর সৃজনশীল আর কর্মঠ কবির এমন সক্রিয় থাকা অবস্থায় চলে যাওয়া, আকস্মিক মৃত্যুর বেদনা আমাদের অন্তর মথিত করেছে।  কারণ, কবিতায় তার দেবার আরও অনেক কিছু ছিল। প্রায় প্রতিদিন তিনি লিখেছেন। এই করোনাকালীন দুর্যোগসহ কত বিষয়েই না কবিতা লিখেছেন। এমন কোনও স্বনামখ্যাত প্রগতিশীল দৈনিক বা সাহিত্য পত্রিকা নেই  যেখানে তিনি নিয়মিত  লেখেননি। বিশেষ সংখ্যা, এমনকি, সাধারণ সংখ্যায়ও তার লেখা নিয়মিত পড়েছি। সেই যে ১৯৬৬ সালে কবিতার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন, সেই বন্ধন ছিল মৃত্যুশয্যায় যাবার আগের মুহূর্তেও অটুট। নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে কবিতাকে তিনি বহুমাত্রিক ভাবনা এবং বিচিত্র উচ্চারণে, নানা আঙ্গিকে প্রকরণে মূর্ত করেছেন প্রতিনিয়ত। তার ফেসবুকেও সাম্প্রতিকতম রকমারি কবিতার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। পেশাগত জীবনে প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘদিন দেশে এবং বিদেশে পেশা-যাপন করেছেন, কিন্তু কখনও কবিতার সাধনা থেকে নিজেকে বিরত রাখেননি। তাঁর জীবনে কবিতার আসন সব সময় ছিল তার  প্রকৌশল বিদ্যার ওপরে। সে কারণে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে সবাই চিনলেও প্রকৌশলী হাবীবুল্লাহ সিরাজী ছিলেন প্রায় অপরিচিত। ১৯৭০ সালে বুয়েটের স্নাতক  হাবীবুল্লাহ সিরাজী এই পরিচয় বা পদবী কখনও নামের সঙ্গে যুক্তও করেননি। কবিতার জন্য নিরন্তর নিজেকে বিবর্তনের প্রয়াস পেয়েছেন তিনি। যে কারণে বয়সে প্রবীণ হয়েও কবিতায় তিনি ছিলেন একেবারেই তরুণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ রকমের সাহসী তরুণ। এমনসব পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছেন কোন কোন কবিতায়, তা কবিতা বলে বিবেচিত হতে পারে কি না―এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যেও ফেলে দিয়েছেন তার অনেক পাঠককে। বিশেষ করে যারা বাংলা কবিতার ঐতিহ্য-পরম্পরার বাইরে ভাবতে পারেন না তারা তো বটেই।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় রাখলে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর অকাল মৃত্যু আমাদের শোকাভিভূত না করে পারে না। তার সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক সততাও তাকে সকলের কাছেই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় অভিষিক্ত করে রেখেছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে যখন সরকার তাকে বাংলা একাডেমিতে ৩ বছরের জন্য মহাপরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করে, তখন কারও কারও সংশয় ছিল, একজন কবি হিসেবে তার যে খ্যাতি তা একটি সরকারি সংস্থার শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কতটুক সমন্বয় করতে পারবেন, কে জানে! কিন্তু মাত্র আড়াই বছরের কম সময়ে বাংলা একাডেমিতে তিনি যে কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা বিস্ময়কর বললে বেশি বলা হবে না। বাংলা একাডেমির সাহিত্য পত্রিকা উত্তরাধিকার, শিশু-কিশোর পত্রিকা ধান শালিকের দেশসহ একাডেমির বিভিন্ন সাময়িক পত্রের প্রকাশনা নিয়মিত করার পাশাপাশি গুণে-মানে পত্রিকাগুলোর উৎকর্ষ সাধনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি ১০০টি গ্রন্থ প্রকাশের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তার নেতৃত্বে। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর জীবদ্দশায় এর এক-তৃতীয়াংশ বই বেরিয়ে গেছে। তার মৃত্যুর পর অনুজপ্রতিম সহকর্মীদের লেখায় বেরিয়ে এসেছে মানুষ হিসেবে তিনি কতটা উদার ছিলেন এবং প্রশাসক হিসেবে কতটা দক্ষ বা করিৎকর্মা ছিলেন। তপন বাগচী, মোজাফফর হোসেন, মতিন রায়হানসহ বাংলা একাডেমির যেসব কর্মকর্তা কবি-সাহিত্যিকের তাৎক্ষণিক লেখা পড়েছি তাদের মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী সম্পর্কে, তাতে সকলেই স্মৃতিচারণে তার আন্তরিকতা, অমায়িকতা এবং কাজ করিয়ে নেয়ার দক্ষতার প্রশংসা করেছেন। প্রশাসনিক বসের মতো প্রচলিত রাশভারী আচরণও করেননি, ছিলেন অগ্রজ এর মতো। কিন্তু তাতে মহাপরিচালকের মহিমাও ক্ষুণ্ন হয়নি। সে কারণেই সন্তানতুল্য কিংবা অনুজতুল্য সহকর্মীরাও তার সঙ্গে কাজ করে আনন্দ পেয়েছেন, বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। একাডেমির কাজে গতি এসেছে।

 সিরাজী ভাইয়ের আরেকটা বড় গুণ ছিল। সেটা তার সৌজন্যবোধ। তিনি একাডেমিতে আসার পরে এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও কখনও কারও টেলিফোন ইগনোর করেছেন বলে আমার অন্তত জানা নেই। অনেকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে দেখেছি, সবাই আমার মতই সবিস্ময়ে বলেছেন, তিনি তাৎক্ষণিক ফোনটি রিসিভ করতে না পারলেও পরে কল ব্যাক করেছেন।

এই সৌজন্যবোধের কারণেই সম্পাদকের কাছে কবিতা দিতে গিয়েও তিনি সারাটা জীবন এক আশ্চর্য বিনম্রতার পরিচয় দিয়েছেন। কবি আহসান হাবীবের সঙ্গে, মানে বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য সাহিত্য সম্পাদকের সহকারী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। বাংলাদেশের পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর এমনকি আশির দশকেরও অনেক  কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল দৈনিক বাংলায় হাবীব ভাইয়ের টেবিলেই। বিভিন্ন বয়সের লেখকদের নানা রকম আচরণ দেখেছি। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী এবং রফিক আজাদ ছিলেন বিনয়ের অবতার। হাবীব ভাইয়ের টেবিলে বলতে গেলে অনেকেই চা খেয়েছেন, কিছু সময় আড্ডা দিয়ে যাওয়ার সময় কবি আহসান হাবীবের হাতে নিজের লেখাটি তুলে দিয়ে এমন ভঙ্গিতে কেউ কেউ তাকাতেন, যেন আসছে সংখ্যাতেই লেখাটি ছাপা হয়। হাবীব ভাই নির্মোহ ভঙ্গিতেই বলতেন, আচ্ছা দেখব। কিন্তু আমি কোনদিন সিরাজী ভাইকে এবং কবি রফিক আজাদকে হাবীব ভাইয়ের হাতে লেখা দিতে দেখিনি। চা-টা খেয়ে বিদায় বেলায় হাবীব ভাই মুচকি হেসে হাত নেড়ে বিদায় দিতেন। কারণ যাওয়ার সময় এমন আড়াল করে নিজের লেখাটি টেবিলে রেখে যেতেন, যেন কোন অপরাধ করে যাচ্ছেন! এমন বিনম্রতা আজকাল সাহিত্যের অঙ্গনে বিরল প্রায়। শুধু তাই নয়, হাবীব ভাইয়ের মৃত্যুর  কয়েক বছর পর দৈনিক জনকন্ঠে যোগ দিই এবং প্রায় দেড় দশক পরে সমকালেও কাজ করেছি। জনকন্ঠ এবং সমকালে সিরাজী ভাই বিশেষ সংখ্যাসহ বিভিন্ন সংখ্যায় লিখেছেন। অনুরুদ্ধ হয়ে ডাকে যেমন পাঠিয়েছেন, লেখা নিয়ে কখনও অফিসেও এসেছেন। লেখা দিয়ে গেছেন কিন্তু সেই সঙ্কোচ তখনও ছিল তার মধ্যে। অর্থাৎ লেখাটি কোনও রকমে রেখে যাওয়া। নতুন কবিতার বই উপহার দিয়ে গেছেন নাম লিখে কিন্তু কখনও বলেননি আলোচনার ব্যবস্থা করবেন। অনেকেই তা বলেন। কবি না বললেও আমরা কখনও রিভিউ, কখনও পরিচিতি ছেপে দিয়েছি। কবিসুলভ এই বিনম্রতা এই স্নিগ্ধতা সম্পাদকের টেবিলে আজীবন বজায় রেখেছেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

এই বিনম্র মানুষটিই আবার উচ্চকণ্ঠ, দৃঢ়চেতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। অনেক সময় অপ্রিয় সত্য স্পষ্ট ভাষায় বলতেন এবং তা উচ্চকণ্ঠেই। এটা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে যেমন, জাতীয় কবিতা পরিষদেও তেমনই ছিল দৃশ্যমান। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ছিলেন সামনের সারির একজন নেতৃত্বদানকারী কর্মী। অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা আর সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার অমায়িক শক্তির গুণেই চারবার জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন দক্ষতার সঙ্গে। কেন্দ্র থেকে সংগঠনের তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তার দৃষ্টি। বাংলা একাডেমিতে যোগদান করেছিলেন তিনি ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলার মাত্র দু-মাস আগে। সেই মেলাকে এমন আকর্ষণীয়ভাবে সুন্দর, তাৎপর্যময় ছকে সাজিয়েছিলেন দক্ষ প্রকৌশলী-কবি-মহাপরিচালক, যা গণমাধ্যমে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। মুগ্ধ হয়েছিলাম আমরা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আসন্ন জন্মশতবর্ষের মহিমা মাথায় রেখেই ২০১৯ সালের বইমেলা সাজিয়েছিলেন তিনি। একদিকে ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ঐতিহ্য, অন্যদিকে জাতির পিতার মহাজীবনের মহিমা মূর্ত হয়ে উঠেছিল বইমেলার সে বছরের আয়োজনে। সেই বইমেলা সামনে রেখেই বিটিভির বার্তা বিভাগ থেকে প্রতিবেদক পাঠিয়েছিলাম মেলার প্রস্তুতি বিষয়ে নবাগত মহাপরিচালকের বক্তব্য জানতে। ভাষা আন্দোলনের বীর শহিদদের আত্মদানের ইতিহাস প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি জন্মশতবর্ষের আগমনী বার্তার প্রতীকী উপস্থাপনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী, ছাত্রজীবনে বুয়েট ছাত্রলীগের সম্পাদক পদধারী কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। কিন্তু কখনও কোথাও বলে বেড়াননি তার এই রাজনৈতিক অবস্থানের কথা। তরুণ কথাসাহিত্যিক মোজাফফর হোসেনকে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন তার সাহিত্যে আগমনসহ বাংলাদেশের কবিতার বিগত সত্তর বছরের নানা পর্যবেক্ষণের কথা। তিনি জানিয়েছেন, সাহিত্যে তাঁর আগমন ১৯৬৬ সালে। সেই ঐতিহাসিক সময়ের তাৎপর্যও বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল। পাকিস্তানি দুঃশাসন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা লেলিহান হয়ে উঠছে। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের দুঃশাসন থেকে বাংলার মানুষকে বের করে আনার লক্ষ্যে লাহোরে বসে বাঙালির বাঁচার দাবি ছয় দফা ঘোষণা করলেন। সেই বৈরী পরিবেশে ছয় দফা ঘোষণা ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর বিস্ফোরক ঘটনা।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী ষাটের দশকের তার অগ্রজ ও সতীর্থ কবিদের কবিতা সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা পোষণ করতেন।  চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের তথা সম-সময়ের কবিতার মূল্যায়নও ছিল তার আপন ভাবনায়। তার পূর্ববর্তীকালের কবিদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তিনি ষাটের দশকের কবিতায় আন্তর্জাতিকতা অন্বেষণ এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। ষাটের দশকের কবিতা প্রসঙ্গে তার ভাষ্য―আমাদের সামনে তখন একটা স্বপ্ন ছিল নতুন দেশ। সেই স্বপ্ন ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুই আমাদের দেখিয়েছেন। আমাদের স্বপ্ন ছিল, ভাষা আমরা নির্মাণ করব, আমাদের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেব।

সেই স্বপ্নের পথে যেতে যেতেই  হাবীবুল্লাহ সিরাজী তাঁর কবিতায় একের পর এক বাঁক বদল করেছেন। কবিতার নান্দনিকতা এবং নতুনত্ব অন্বেষণ তার প্রধান লক্ষ্য হলেও রাজনৈতিক সচেতনতাও নিবিড় পাঠকের দৃষ্টি এড়াবে না। এ প্রসঙ্গে বলতে হয় হাবীবুল্লাহ সিরাজী তার কবিতায় শিল্পের অন্বেষণ করেছেন এটা ঠিক―প্রতীকে, ইশারা-ইঙ্গিতে কবিতাকে চিত্রকলার মত নন্দিতকলা করতে চেয়েছেন, কিন্তু সেই শিল্প জনসাধারণকে উপেক্ষা করে না, মানবমুক্তি তথা আত্মমুক্তির অন্বেষাও ছিল তাঁর কবিতায়। এ কারণেই ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭০ এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের ইতিহাস একাকার হয়ে আছে তার কবিতায়। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে একটি কবিতায় তিনি লিখলেন :

তর্জনী তুলতেই

আকাশ আমাদের হয়ে গেল

পা ফেলতেই চৌহদ্দি নির্দিষ্ট হয়ে গেল

এবং তাকাতেই প্রবাহিত হতে থাকলো নদী

তার কণ্ঠস্বরে সূর্য ও সবুজ এক হলো, আমার সোনার বাংলা―

স্বপ্ন ডাক দিয়েছিল টুঙ্গিপাড়ায়

সাতচল্লিশে বনে বনে বাঘ

বাহান্নর কুমির ভেসে যায় ভাটায়

সুন্দরী কাঠের নাও পাল তুলতেই

পদ্মা-যমুনা মেশে বঙ্গোপসাগরে

ছেষট্টি ফরফর ওড়ে, চৌচির মাটি―

ঊনসত্তর পোড়ে মচমচে বুটে ও চকচকে বেয়নেটে

সত্তর পার হয় সাহসে

একাত্তরে কলস উপুড়-রক্ত ও ক্রোধের মধ্যে ঘৃণা,

‘শুয়োরগুলো খেদা’!

 বত্রিশ নম্বর এখন রক্তের গম্বুজ 

তার চূড়ায় মূল দলিল, নকশা আর পর্চা…

(ছোটকাগজ অনুভূতি/সম্পাদক রণী অধিকারী)

স্বল্পপরিসর একটি কবিতায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক উত্থান-পতন তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম-ইতিহাস এবং স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ইতিহাস কী সহজ নৈপূণ্যেই না হাবীবুল্লাহ সিরাজী তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায় এবং তা প্রতীকী ভাষাতেই।

ষাটের দশকে কবিতা লেখা শুরু হলেও তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ দাও বৃক্ষ দাও দিন প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে কিন্তু তিনি আলোচিত হন ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় কব্যগ্রন্থ মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি প্রকাশের পর। যদিও কবির নিজের ধারণা ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ হাওয়া কলে জোড়া গাড়ী’তেই তিনি নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। কবিতায় তার মৌলিক সৃজনকলা অর্জন বলতে তিনি নিজেকে খুঁজে পাওয়া বুঝিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা স্মরণ করতে পারি। আশির দশকের শেষ দিককার কথা। সনটা সঠিক করে বলতে পারব না, ১৯৮৮ বা ৮৯ সাল হতে পারে। আলাওল সাহিত্য পুরস্কার তখন খুব গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। একদিন সাহিত্য পাতার কাজ শেষে হাবীব ভাই রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে অফিস-ড্রয়ারের বন্ধ লকার থেকে দুটি কি তিনটি পাণ্ডুলিপি (এখন মনে নেই) বের করলেন, পাণ্ডুলিপি মুদ্রিত বইয়ের। কভারও নেই, ভেতরের ইনারও নেই। হাবীব ভাই বললেন, তাড়াহুড়া করবে না। ধীরে ধীরে টেনে টেনে পড়ো। আমি পড়ছি তিনি চোখ বন্ধ করে নিবিষ্টমনে শুনছেন। দু-একটি জায়গায় আবার পড়তে বলছেন। জানি না সেই পাণ্ডুলিপির মধ্যে ‘হাওয়া কলে জোড়া গাড়ি’ও ছিল কি না। আমি নিজেও জানতে পারিনি কার বই, কিসের জন্য নিজের কাছে রাখা―সাদা কাগজে কী করছেন আহসান হাবীব ! কিছুদিন পরে জেনেছিলাম সে সময় আলাওল সাহিত্য পুরস্কারের অন্যতম বিচারক ছিলেন কবি আহসান হাবীব এবং পুরস্কারটি অর্জন করেছিলেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সম্ভবত তার আগের বছর তিনি যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী শুরু করেছিলেন ছন্দ-প্রকরণ ও বাংলা কবিতার ঐতিহ্য-পরম্পরার আনুগত্য মনে রেখেই। তা সত্ত্বেও ষাটের কবিদের মধ্যে তিনি অনেক বেশি নিরীক্ষাপ্রবণ, তারুণ্য তার নিত্য সহচর। এই নিরীক্ষা-প্রবণতার কারণেই একের পর এক বাঁক বদল করেছেন সিরাজী। তাই তার তেত্রিশটি কাব্যগ্রন্থে নানামাত্রিক পরিভ্রমণ লক্ষ্য করি। কবিজীবনের প্রথম দিকে পড়েছেন ইংরেজি ও রুশ ভাষার কবিতা। অনুবাদও করেছেন অনেক কবিতা। নিজেই জানিয়েছেন ডিলান টমাসের কবিতা পড়েছিলেন খুব নিবিড়ভাবে। উইলিয়াম ব্লেকও পড়েছেন। কিন্তু নিমজ্জিত ছিলেন ডিলান টমাসেই। ১৯৭২ সালে শুরু করেছিলেন রসুল হামজাতভের কবিতার অনুবাদ। দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ৬৫টি অনুবাদ কবিতা নিয়ে সেই কাব্যগ্রন্থ বেরোল গত বছর বইমেলায়। সাধকের নিষ্ঠায় কবিতার সঙ্গে জীবনযাপন করেছেন সিরাজী। তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় বিদেশি কবিতার কিছু ছাপ পড়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন কবি। বাংলা কবিতার ঐতিহ্যকে ধারণ করেছিলেন সিরাজী তার অন্তরাত্মায়, কিন্তু বাক্য বিন্যাসে, শব্দ নির্বাচনে ছিল তার সচেতন প্রয়াস। বাক্যে হেঁয়ালি সৃষ্টি আর পরোক্ষে বলার প্রতি ঝোঁক বহু আগে থেকেই। কবি জীবনানন্দ দাশকে উপজীব্য করে লেখা ‘রূপসী পাণ্ডুলিপি’ শিরোনামের এই কবিতা মৃত্যুর মাত্র এক মাস আগে শব্দঘর, ইদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়। উদ্ধৃত করছি :

‘অনেক দূরে চিলের কোমল ডানা

ঘষা আলোয় জীবন হ’য়ে ওড়ে

বাবু, একটু কলম সরান

আকাশখানি ফর্সা ক’রে লিখি

মেঘের সাথে ছায়ার মিলনভূমি

ধানসিঁড়িতে জীবন-জোয়ার দেখে

বাবু ,একটু কলম থামান 

নদীখানি ছায়ার ভেতর আঁকি

বন ছিলো যে গোলপাতা―মৌ মিল

ক্যাম্পে পোড়ে জীবনবোধের গান

বাবু, একটু কলম নামান

সবুজ হাওয়ার  মান-অভিমান শুনি

মন খোলা আর নগর গাঁয়ের সন্ধি

পূব-পশ্চিমের দ্বন্দ্বে জীবনধারা

বাবু, একটু কলম গোছান

বরিশাল কী কলকাতাকে বুঝি

আপনার ওই চিল পাহাড় থেকে আসে

আপনার ওই মেঘ মালয় বাতাসে

আপনার ওই বন ঘাইহরিণীর পাশে

আাপনার ওই মন বাংলাদেশে ভাসে।’

এই কবিতাটি রূপসী বাংলার কবির নগর কলকাতা আর নিসর্গশোভিত বরিশালের ধানসিঁড়ি নদীতীরে আমাদের ভ্রমণ করিয়ে আনে। কবিতা শুনতে শুনতে আমরা চলে যাই জীবনানন্দের মানসভুবনে। এরকম ঘনত্বপূর্ণ ব্যঞ্জনাময় উচ্চারণ তার অনেক কবিতায় ছড়িয়ে আছে।

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর রাজনৈতিক চেতনা এবং কাব্য চেতনা মিলেমিশে একাকার হয়েছিল বলেই তার পক্ষে বলা সম্ভব যে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচির পথ ধরে আমরা আমাদের ভূগোল পরিবর্তনের অভিযান শুরু করি। আমাদের সেই যাত্রা ছিল ইতিহাস পরিবর্তনের অভিযান এবং ভাষার বিবর্তনের অভিযান, সার্বিকভাবে আমাদের সংস্কৃতির নতুন ইতিহাস সৃষ্টির পথেই আমরা পা বাড়ালাম। ১৯৪৭ থেকে একাত্তর পর্যন্ত বাংলা কবিতার যে বাঁক পরিবর্তন সেই পরিবর্তনের ইতিহাসও ছিল সিরাজীর কাছে সুস্পষ্ট। এমনকি স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫০ বছরের বাংলা কবিতার অভিযাত্রা, উত্থানপতন তিনি সচেতনভাবেই অবলোকন করেছেন। সেই অবলোকনের চিত্র আমরা তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এবং আলোচনায় পাই। পেশাগত জীবনে তিনি একজন যন্ত্র প্রকৌশলী হিসেবে দেশে-বিদেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যস্ত থেকেছেন, কিন্তু কবিতা থেকে দূরে সরে যাননি কখনও। বিশ্বসাহিত্য এবং বাংলা কবিতার ইতিহাস আত্মস্থ করেছেন সতর্ক পাঠকের নিষ্ঠা নিয়ে। নিজেও বলেছেন, মাটির রাজনীতিই তার কবিতায় ধরে রাখতে চেয়েছেন, একইভাবে আন্তর্জাতিকতাও সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। উচ্চারণে পরিমিতিবোধ আর প্রতীকধর্মী কবিতা সৃষ্টির পাশাপাশি শব্দ, এমনকি যতিচিহ্ন ব্যবহারেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। আগেই উল্লেখ করেছি, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মধ্যরাতে দুলে ওঠে গ্লাশ এর পর হাওয়া কলে জোড়া গাড়ি তে বড় একটা পরিবর্তন। আরেকটা ঝাঁকি দিয়েছেন সিংহদরজা এবং তারপর কৃষ্ণকৃপাণ―এসে বেশ বড় পরিবর্তন।

ইসলামের ইতিহাস এবং কিংবদন্তি থেকে চরিত্র বেছে নিয়ে তিনি যাত্রাপুস্তক নামে এক ধরনের নতুন কবিতা রচনা শুরু করেন। যেমন পৃথিবীর প্রথম মানব আদম, হযরত ইব্রাহিম, আবু লাহাব, হাবিল-কাবিল, নবী মুসা, ইউসুফ, ইউনুস প্রমুখ চরিত্র স্থাপন করে প্রতিটি পাঁচ লাইনের কবিতা রচনা করেছেন, যার শেষ চরণে রয়েছে তথ্য। কোরআনের বহু সুরার আশ্রয় নিয়েছেন তিনি এসব কবিতার বিষয় হিসেবে। আদমকে নিয়ে লেখা কবিতাটি এরকম :

‘সিজদাহ কর যাহাতে আমার সমর্থন আছে

আমিই মালিক আর তুমি মাটি, প্রথম মানব

হে আদম, উপভোগ কর যাবতীয় নেয়ামত

সীমা লংঘন এর শাস্তি অবশ্যই তোমার

যতদূর আমি জানি ততদূর তোমার অজানা’

তার কবিতায় পশ্চিমের প্রভাব যেমন আছে, তেমনই আবহমান বাংলার লোকাচার, জাদুটোনা, জুয়াখেলা ষাঁড়ের লড়াই জাদুকরের রহস্য, তাসখেলা ইত্যাদি লোকায়ত জীবনের ছবি বাঙময় হয়ে উঠেছে তার কবিতায়। আঞ্চলিক শব্দও এসেছে অনেক কবিতায়। জীবনের শেষদিকে এসে তিনি চেষ্টা করেছিলেন বাংলা কবিতার ঐতিহ্য-পরম্পরার সঙ্গে আধুনিক জীবনধারাকে মিলিয়ে কত অল্প কথায় প্রকাশ করা যায়। ‘মুহূর্ত’ শিরোনামে সম্প্রতি বেশ কিছু স্বল্পপরিসর কবিতা লিখেছিলেন। শিরোনামে তিনি ‘ভাগ’ ব্যবহার করেছেন। যেমন ‘মুহূর্ত : সপ্তম ভাগ’ :

কাফন হাতে নাও বান্দা

কাফন হাতে নাও

জলদি সরাও রঙের আয়না 

আকাশ ঢেকে দাও।

শ্রুতিতে সহজ মনে হলেও রঙের আয়না আর আকাশ প্রতীক গভীর গূঢ়ার্থের দিকে নিয়ে গেছে এই চার পঙক্তির ছোট কবিতাটিকে। আবার দেখুন ঠিক বিপরীত ধারার কবিতা। জাতির পিতা বঙ্গববন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ আর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে লেখা কবিতাটি।

‘বৃক্ষ হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ

কাণ্ডমূলে শুদ্ধ হাওয়া

শ্রাবণস্নেহে মেঘের স্রোতে

বৈঠাবিহীন নৌকা বাওয়া।

গাছ মানে তো প্রতিমানুষ

জোড়াপাতায় রোদের বিলি

আয়ুর আড়ে জন্ম রাখি

অদল-বদল হৃদয় লিলি।

বৃক্ষ হচ্ছেন শেখ মুজিবুর 

একাই করেন গরল পান

আকাশ উঁচু শাখা মেলে

বাংলাদেশের জীবনদান।’

কতটা প্রকৃতিমগ্নতায় তিনি বৃক্ষের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আর বঙ্গবন্ধুকে এমন নৈপুণ্যে মেলাতে পারেন। সমিল অথচ ওজস্বিতার গুণে পদ্যের সীমানা অতিক্রম করে প্রগাঢ় কবিতা হয়ে উঠেছে। ধর্ম-দর্শন, মরমিবাদ, অধ্যাত্মচেতনা―এইসব বিষয়েও তাঁর বেশ কিছু কবিতা রয়েছে। লালনকে নিয়ে লেখা একটি কবিতার কথা স্মরণ করছি। এই কবিতায় তিনি সৃষ্টিতত্ত্ব আর মরমি চেতনা নিয়ে এক ধাঁধা তৈরি করেছেন, লালনের গানে যেমন জীবন ও প্রকৃতির লীলা প্রকাশিত, সেরকমই ধাঁধার মধ্যে গভীর কথা উচ্চারণ করলেন হাবীবুল্লাহ সিরাজী প্রতীকের আশ্রয় পদ্মের ঢং এমন গভীর সাংস্কৃতিক বাণী রচনা করেন যা মরমী পাঠকের ভাবনা জাগাবে, আবিষ্কারের আনন্দ দেবে। হয়তো সেই অগ্রসর পাঠকের কথা চিন্তা করেই বর্ষীয়ান তরুণ হাবীবুল্লাহ সিরাজী লিখেছিলেন লালন দর্শনে প্রভাবিত হয়ে :

করুণা ও দয়া বোন

একান্ত আপন

নিত্য নয় মন

তারপরও প্রতিজন

সযতনে করে সমর্পণ

কর্মের সমন

একক লালন…

রহস্যময়তা আরও ঘনীভূত হয় যখন লেখেন :

করুণার মর্ম

আর দয়ার ধর্ম

সৃষ্টি গর্ভে মাতৃরূপে

সৃষ্টি শর্তে পিতৃরূপে

অপার আনন্দ ঘন

চিত্ত তীর্থ নিরূপণ

লালনের মন।

ছোট্ট কবিতায় গভীর রহস্যময় সৃষ্টিতত্ত্ব। উপলব্ধি দিয়ে নানামাত্রিক অর্থের সমন্বয় করে বুঝে নিতে হয়। হাবীবুল্লাহ সিরাজীর অনেক কবিতা আছে যা বলার, তার অর্ধেক প্রকাশিত, বাকি অর্ধেক অপ্রকাশিত, পাঠককে ভেবে নিতে হয়। উইট আর  হিউমারও কম নেই তার কবিতায়। সামরিক দুঃশাসনের যন্ত্রণা, পুঁজিবাদের আগ্রাসী থাবায় বিধ্বস্ত মানবসভ্যতা, এরকম বহু অসমঞ্জস বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতায়। কাফনের পকেট নাই জেনেও লুটেরা অর্থনীতি, ভোগবাদী অর্থনীতি মানুষকে কুটিল রকমের বিবেচনাহীন করে দেয়।

তার জীবনের শেষ দিকের একটি কবিতা উদ্ধৃত করা যেতে পারে :

‘যে ডালে পাখির বাসা সে ডালেই সাপ

যেই গল্পে পিপীলিকা সেই গল্পে পাপ

যে পাতায় অমাবস্যা সে পাতায় চাঁদ

যেই মূলে মুক্তধারা সেই মূলে ফাঁদ

যে বৃক্ষে নদীর টান সে বৃক্ষেই চর

যেই জলে নিজ স্বত্ব সেই জলে ডর

কাফনে পকেট নেই তবু রাজা জমায় সম্পদ

প্রজার পেয়ালা নেই তবু নাচে ক্ষুধার নারদ’

যতিচিহ্নহীন কবিতাটিতে এই মৃত্তিকারই প্রতীকী চিত্রকল্পে তিনি সমাজবাস্তবতার নির্মম ছবি এঁকেছেন তার কবিতায়। সবাই তার কবিতায় তারপরও প্রবেশ করতে পারেননি। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল বিপদে পড়েছিলেন হাবিবুল্লাহ সিরাজীর মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি কাব্যগ্রন্থ আলোচনা করতে গিয়ে। বেলাল চৌধুরী সন্ধানী পত্রিকার জন্য আলোচনা লিখতে বলেছিলেন। দুলালের ভাষায় রসকসহীন কবিতা, এক লাইন বুঝি, তো দুই লাইন বুঝি না। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ভাষাতেই বলি সিরাজীর কবিতা ছিল একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের। তিনি কাউকে অনুসরণ, অনুকরণ করে কবিতা লেখেননি, তার কবিতার স্টাইল ছিল―সিরাজী স্টাইল―এই স্বাতন্ত্র্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছেন।

এই কথাটাই আমাদেরও কথা। জীবনে তিনি হিসেব করে যেমন পানাহার করেননি, তেমনি পাঠকের হিসেব মাথায় রেখেও তিনি কবিতা লেখেননি। তিনি লিখেছেন তার আপন আনন্দে। গভীর বেদনা দুঃখ দহন বুকের মধ্যে চাপা রেখে যিনি হাসতে জানেন তার স্নায়ুর জোর অনেক। হাবীবুল্লাহ সিরাজী এমনই একজন কবি এবং ব্যক্তি, তার প্রখর এবং প্রগাঢ় অনুভূতি ছড়িয়ে আছে আপন লাবণ্য নিয়ে, বোঝা না বোঝার আলো-আঁধারিতে তিনি কথা বলেছেন। আবার কখনও সরাসরি স্পষ্ট উচ্চারণে।

মূর্ত আর বিমুর্ত কবিতায় তাকে খুঁজবেন হয়তো অনাগত কোন নতুন পাঠক আবিষ্কারের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হবে যা তার অনুজ কবিদের কারও কাছে কাঠখোট্টা আর রস-কসহীন মনে হয়েছিল বহু বছর আগে একদিন। হাবিবুল্লাহ সিরাজী তার নিজের কবিতা সম্পর্কে সচেতন থেকে লিখে গেছেন। সে কথা তিনি নিজেও স্পষ্ট করেছেন। কবির চেতন-অবচেতন প্রসঙ্গে বলেছেন―আমি অবচেতনে কিছু লিখিনি, সম্পূর্ণ সচেতনভাবে প্রতিটি শব্দ ব্যবহার করি। এরপরে আর বলার কিছু থাকে না এই কারণে যে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী সচেতন কবি। যে আধ্যাত্মিকতা এবং রহস্যময়তার কথা বলেছি সেটি তার সচেতন প্রয়োগ। যে কারণে জড় ও প্রকৃতির সঙ্গে পঞ্চভূতকে সংযুক্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন তাঁর কবিতায়। ছন্দে যেমন কবিতা লিখেছেন, তেমনি ছন্দে ভাঙচুর করেছেন, লিখেছেন গদ্যকবিতা, এমনকি বাইবেলিক ভার্সও। নানা বৈচিত্রে কবিতাকে সাজিয়েছেন তিনি। কবিতার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বর্তমানকে তিনি এড়িয়েই গেছেন বলতে হবে। ভবিষ্যতের কবিতা না ভাবলে এই সাহস তিনি কোথায় পান।

আগেই বলেছি অনেক গভীর বেদনাও নিভৃতে হজম করার শক্তি তিনি অর্জন করেছিলেন। ক্যান্সারের অনুষঙ্গে আক্রান্ত হয়েছিলেন অনেকদিন আগে কিন্তু পরিবারের দু-একজন সদস্য ছাড়া কাউকে তিনি জানাননি, হয়তো পাছে কেউ করুণার দৃষ্টিতে তাকায়, এমন ভাবনায় ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কার্ডিয়াক সমস্যা নিয়ে,তখন হাসপাতালে বেশিদিন থাকেননি। শুনেছি হার্টে  রিং পরানোর পর মার্চের প্রথম সপ্তাহে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি হলেন এই কর্কটের যন্ত্রণা নিয়ে। একমাসের অধিক মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।

কিন্তু জীবনতৃষ্ণ কবি জীবনে আর ফিরে আসতে পারলেন না, এটাই বড় বেদনার। এমন প্রাণখোলা উচ্ছল সিরাজী ভাই কিছু লুকাতে পারেন কোনোদিন বিশ্বাস হয়নি। আনন্দে উচ্ছ্বসিত হতেন, কষ্ট পেলে বিষণ্ন হয়ে যেতেন মুহূর্তে, কিন্তু নিজের দুঃখটাকে, নিঃসঙ্গতাকে তুলনাহীন সহিষ্ণুতায় হজম করে গেছেন। তার কবিজীবনের দিকে তাকালে, আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতির দিকে তাকালে বিস্মিত হই এমন রহস্যময় কবিসত্তার অধিকারী একজন হাবীবুল্লাহ সিরাজীর জন্য, যিনি কবিতার মতোই অস্পষ্ট কুয়াশায় ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাসে দীর্ণ জীবনটা লুকিয়ে রেখেছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে :

আমারে এত সহজে বোঝো তাই তো এত লীলার ছল

বাহিরে যার হাসির ছটা ভেতরে তার অশ্রুজল।

বিদায় সিরাজী ভাই, চিরবিদায়। পরপারে শরাবান তহুরার ভুবনে আপনার তৃষ্ণার্ত আত্মা খুঁজে পাক পরম তৃপ্তি, শান্তি আর স্বস্তির মতো অনন্ত প্রশান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে থাক আপনার ক্লান্তিহীন জীবন।

 লেখক : কবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares