শোকাঞ্জলি : কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর : স্মৃতি ও পদ্যসান্নিধ্য : তপন বাগচী

হাবীবুল্লাহ সিরাজী কবি। পেশায় প্রকৌশলী হয়েও কবি। কবি হয়েও ছড়াকার। প্রথম পাঁচটি কবিতাগ্রন্থ দাও বৃক্ষ দাও দিন (১৯৭৫), মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি (১৯৭৭), মধ্যরাতে দুলে ওঠে গ্লাশ (১৯৮১), হাওয়া কলে জোড়া গাড়ি (১৯৮২), নোনা জলে বুনো সংসার (১৯৮৩) তাঁর উত্থানপর্বের স্মারক হয়ে আছে। এর পরেও তিনি যেসব কবিতাগ্রন্থ রচনা করেছেন, তা একই পথেরই সম্প্রসারণ। তবু তাঁর পোশাক বদলের পালা (১৯৮৮) এবং বিপ্লব বসত করে ঘরে (১৯৯৯) সরল ভাষায় তীব্র প্রতিবাদী কবিতা ধারণ করে বাংলাদেশের কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করে আছে। কিন্তু তুচ্ছ (২০০৩) কবিতাগ্রন্থে এসে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ভাষার বদল দেখে আমরা আশান্বিত হই। হ্রী (২০০৫), কাদামাখা পা (২০০৬), যমজ প্রণালী (২০১১), আমার জ্যামিতি (২০১২) প্রভৃতি কবিতাগ্রন্থে আমরা একেবারেই ভিন্নরকম এক কবিকে পাই।

হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে পেয়েছি দুইভাবে―অগ্রজ কবি ও প্রশাসক হিসেবে। জাতীয় কবিতা পরিষদের কর্মকাণ্ড ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং দেশের বাইরে দিল্লিতে নানান কাব্যযাত্রায় সঙ্গী হয়েছি। ফরিদপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থা থেকে প্রদত্ত আলাওল সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে বিশেষ অতিথি হিসেবে গিয়েছি। আলাওল পুরস্কারকে ধরা হতো বাংলা একাডেমি পুরস্কারের অব্যবহিত আগের পুরস্কার। কারণ আলাওল পুরস্কার পাওয়ার ২/১ বছর পরেই বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ১৫/১৬ জন সাহিত্যিক। তার মানে, তারা সনাক্ত করতে জানে, এবং পুরস্কার প্রদানের জন্য একাডেমির দিকে তাকিয়ে থাকে না। প্রায় একযুগ পরে সেই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের তোড়জোড় শুরু হলো। সংস্থার সভাপতি আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজ ভাই ঢাকায় এসে আমাকে নিয়ে ঢুকলেন ডিজির কক্ষে। প্রধান অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ স্যার প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি! পুরস্কার নিতে যাচ্ছেন হরিশংকর জলদাস, আলতাফ হোসেন, রফিকুর রশীদ, আসাদ চৌধুরী, সুকুমার বিশ^াস আর ওয়াসি আহমেদ দেশের বাইরে থাকায় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি।

অনুষ্ঠানের দিন ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর স্যারের বাসায় সকালের নাস্তা সেরে স্যারের গাড়িতে রওয়ানা হই। সঙ্গে কবি পিয়াস মজিদও যুক্ত হন। পথে যুক্ত হন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। তিনিও এক পর্বের প্রধান অতিথি।  হুদাভাই এ শহরে নতুন নন। এই আলাওল পুরস্কারে ধন্য হতে তিনি এসেছেন অনেক আগে সেই আশির দশকের মাঝামাঝি। ১৯৮৫ সালে। তখন আমি রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র। হুদা ভাইয়ের সঙ্গে পরিচায় আমার তখন থেকে। সিরাজী স্যারও এই পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৮৭ সালে। আজ এলেন দিতে। এই সংস্থা তথা ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর প্রতি স্যারের কিছুটা অভিমান ছিল। তাঁরা স্যারকে কেমন করে ডাকেননি। এবার ডাক পেয়েও সেই অভিমান মুছে চলে এলেন। আমরা সার্কিট হাউসে পৌঁছাতেই ছুটে এলেন আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজ, শহীদুল্লাহ সিরাজী, আবু সুফিয়ান চৌধুরী কুশল, সিরাজই কবির খোকন, আসশা আখতার মুক্তা প্রমুখ। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিবন্ধু মোস্তফা তারিকুল আহসান এলো।  বিকেলে উদ্বোধন করেই স্যার ঢাকায় ফিরে গেলেন। স্যারের সঙ্গে এই ভ্রমণ একটি আনন্দময় স্মৃতি হয়ে রইল।

২.

একবার স্যারের সঙ্গে দিল্ল্ িগেলাম কবিতা পড়তে। স্যার তখন মহাপরিচালক হননি। শামসুজ্জামান খান স্যারের মেয়াদ শেষের দিকে। আমরা দিল্লি যাই কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার নেতৃত্বে সার্ক লিটারেচার ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে। তখন বাতাসে ভাসছিল যে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা হতে পারেন পরবর্তী মহাপরিচালক। জিজ্ঞেস করলাম হুদা ভাইকে। তিনি মুচকি হেসে বললেন, তোমাকে এইটুকু বলতে পারি, এখন দিল্লিতে বাংলা একাডেমির যে কজন ফেলো আছেন, তাঁদের মধ্য থেকে কেউ হয়ে বসে আছেন। আমাদের সঙ্গে তখন সেলিনা হোসেন, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, ফখরুল আলম, আবুল মোমেন―এই  পাঁচজন ফেলো আছেন। চমৎকার এক ধাঁধা দিয়েছেন হুদাভাই। আমি মহাভাবনায় পড়ে গেলাম। ঢাকায় আসার কিছুদিন পরেই জানতে পারি যে মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দিচ্ছেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী বাংলা একাডেমিতে এসে একরকম গতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। বাংলা একাডেমি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা ২০২১ গেজেটভুক্ত করেছেন। এর ফলে একাডেমিতে পদোন্নতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজতর হবে। এই কাজটি একাডেমির জন্য খুবই বড় কাজ। তিনি এসে উত্তরাধিকার পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশ নিশ্চিত করলেন। ধানশালিকের দেশ পত্রিকাটিও নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা নিলেন। নতুন দুটি পত্রিকা বাংলা একাডেমি ফোকলোর পত্রিকা ও বাংলা একাডেমি অনুবাদ পত্রিকা চালু করার কৃতিত্ব তাঁর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিক গ্রন্থমালা থেকে ৩৪ টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর আমার দেখা নয়াচীন বই প্রকাশ ও এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশেও তাঁর অবদান রয়েছে। প্রায় পনের বছর বন্ধ থাকা গাজী শামছুর রহমান স্মৃতি গবেষণা বৃত্তি, ফেরদৌস খাতেমন গবেষণা বৃত্তি ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক গবেষণা বৃত্তি চালু করেছেন তিনি। এই তিনটি গবেষণা তহবিলের সদস্যসচিব হিসেবে তাঁকে দেখেছি তরুণদের গবেষণাকর্মে নিয়োজিত করার প্রতি অত্যন্ত দরদি মন ছিল। তিনি আমাকে দিয়ে আরও তিনটি গবেষণা বৃত্তি চালুর জন্য নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্বও দিয়েছিলেন। অফিস খোলার পরে এই তিনটি বৃত্তির বিষয়ে কার্যনির্বাহী পরিষদের অনুমোদন নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি বরাবরই বাংলা একাডেমির নিজস্ব গবেষণার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তাই একাডেমির পিএইচডি উপাধির কর্মকর্তাদের ইনক্রিমেন্ট দিয়েছেন। রবীন্দ্র-পুরস্কারের মতো নজরুল-পুরস্কার প্রবর্তনের কথা ভেবেছিলেন। বাংলা একাডেমির ঐতিহ্যবাহী পুকুরটি সংস্কারের কাজেও হাত দিয়েছিলেন। অনুবাদের একটি কর্মশালার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অনেক কাজই রয়ে গেছে অসমাপ্ত। একজন কবির জন্য ৭২ বছর বয়সটাই তো অসমাপ্ত! তবু এইটুকু জীবনে তিনি সাহিত্যচর্চা ও বাংলা একাডেমির জন্য যতটুকু কাজ করে গেছেন, পরবর্তী প্রজন্ম তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

আজকাল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক কিংবা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য তথা প্রতিষ্ঠান-প্রধানদের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির যে ভয়ঙ্কর সংবাদ দেখি, তা থেকে একেবারেই মুক্ত ছিলেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। এর আগে যাঁরা বাংলা একাডেমি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ আর কাজী মুহম্মদ মনজুরে মওলা বাদে সকলেই এসেছেন অধ্যাপনা পেশা থেকে। শামসুজ্জামান খান দুটি প্রতিষ্ঠানের  মহাপরিচালক হওয়ার পরে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হলেও, শুরুতে তিনি অধ্যাপনা পেশাতেই ছিলেন। সেক্ষেত্রে হাবীবুল্লাহ সিরাজীই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এসেছেন ‘কবি’ পরিচয় নিয়েই। অনেকর আশঙ্কা ছিল, কবি হিসেবে এই গুরুদায়িত্ব তিনি কতটা সফলভাবে করতে পারবেন! কিন্তু সব আশঙ্কার গুড়ে বালি দিয়ে তিনি সফলভাবেই এই দায়িত্ব পালন করলেন। তাঁর কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন আপত্তি ওঠেনি। তিনি হাসতে হাসতে এসেছিলেন, হাসতে হাসতেই তিনি অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছেন। আমার সামনে জেগে আছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সেই হাসিমুখ ! তাঁর সান্নিধ্য-স্মৃতি আমার জীবনের পরম পাওয়া !

৩.

হাবীবুল্লাহ সিরাজী শেষ ষাটের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে নন্দিত হলেও ব্যক্তিগত স্মৃতিগদ্য এবং ছড়াপদ্য রচনাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। কবিতা ও ছড়া রচনা তাঁর সমান্তরাল চলেছে। কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে অনুরুদ্ধ হয়ে কিংবা সখের বশে ছড়া লিখতে আসেননি। প্রথম দুটি কাব্য দাও বৃক্ষ দাও দিন (১৯৭৫) আর মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি (১৯৭৭) প্রকাশের পরেই আমরা হাতে পাই তাঁর ছড়াগ্রন্থ ইল্লিবিল্লি (১৯৮০)। কবিতার দম ফুরিয়ে যাওয়ার পরে অভ্যাসবশত কলম চালাতে গিয়ে ছড়া লেখার ব্যর্থ চেষ্টা যে কবিরা করেন, হাবীবুল্লাহ সিরাজী তাঁদের দলে নন। তিনি সচেতনভাবে কবিতা ও ছড়াকে পাশাপাশি রেখেই পথ চলেছেন। তাঁর নাই পাই, রাজা হটপট, ফুঁ, ফুড়ুৎ, মেঘভ্রমণ, রে রে, ছয় লাইনের ভূত প্রভৃতি ছড়াগ্রন্থ তাঁর স্বতন্ত্র ছড়াকার-সত্তারই পরিচয় বহন করে।

ইল্লিবিল্লিতে কবি চেষ্টা করেছেন আমাদের লোকছড়া আর আধুনিক ‘ননসেন্স রাইমের’ মিশ্রণে নতুন এক ধারা সৃষ্টি করার।

 দিল্লি থেকে মোরগ এলো

                বোম্বে থেকে পান

পিকিং থেকে ঝাল-মশলা

                মস্কো থেকে পান।

                     (বিয়ে)

এই হচ্ছে বিয়ের আয়োজনের ফিরিস্তি। প্রথম পাঠে একে কেবলি ‘ননসেন্স’ ছড়া ভাবার অবকাশ রয়েছে। দিল্লি বোম্বে, পিকিং, মস্কো থেকে বিয়ের খাবার-দাবার এলো। পরে যুক্ত হয়েছে ইরান, কঙ্গো, কাবুল, জেদ্দা, লস এঞ্জেলস ও ঢাকা শহরের কিছু উপকরণের নাম। বিয়ের আভিজাত্য বোঝাতে এইসব পরিচিত শহরের কথা বলা হয়েছে। অন্তত ভূগোলের জ্ঞানটুকু অর্জনে সহায়ক হবে এই ছড়া।

‘সূর্যমুখী’ ছড়ায় সূর্যমুখী ফুলের পরিচিতি, ‘টুপকি’ ছড়ায় হরীতকী, জামরুল, পেয়ারা, আমড়া প্রভৃতি ফলের কথা আছে। ‘আষাঢ় মাসের ছড়া’-য় চমৎকার কিছু অনুষঙ্গ রয়েছে :

দেশের মধ্যে পুঁয়ের বাথান

                শাকসবজির রাজা

দশের মধ্যে স্বাদের খাদ্য

                ব্যাঙের চোখ-ভাজা।

শাকসবজির মধ্যে সেরা শাক হচ্ছে ‘পুঁই’, স্বাদুখাদ্যের মধ্যে সেরা হলো ‘ব্যাঙের চোখ-ভাজা’—এরকম মজার অনুষঙ্গ নিয়ে ছড়াটি সাজানো। ছড়ার ছন্দ হলো স্বরবৃত্ত। সবচেয়ে বেশি ছড়া লেখা হয় স্বরবৃত্তে। মাত্রাবৃত্তেও অসাধারণ ছড়া রচিত হয়েছে। কিন্তু অক্ষরবৃত্তে ছড়া লেখার প্রবণতা কারও ছড়াতেই দেখা যায় না। কেউ কেউ অক্ষরবৃত্তে ছড়ার লেখার নিরীক্ষা করলেও যুগ্মশব্দ এড়িয়ে ছন্দের মাত্রা ঠিক করার চেষ্টা করেছেন। যুগ্মশব্দ রেখে অক্ষরবৃত্তে ছড়ার সাবলীলতা  রক্ষা করা কঠিন জেনেও হাবীবুল্লাহ সিরাজী লিখেছেন :

ইলিশ বালিশ পেতে শুয়েছে এ-ঘরে

পাঁতিহাস পাতিকাক খুঁজে-খুঁজে মরে!

জরু ও গরুর নাকে ইলিশের ঝোল

উল্টো ব’সে খুঁটে দেয় বুড়োর অম্বল।

(বুড়োর অম্বল)

‘ইলিশের বালিশ পেতে শোয়া’ প্রভৃতি শব্দবন্ধে কাব্যের ছোঁয়া থাকায় একে ঠিক ছড়ার গোত্রভুক্ত রাখতে অনেকেই হয়তো সম্মত হবেন না। কিন্তু কবি একে ছড়াগ্রন্থেই ঠাঁই দিয়ে অক্ষরবৃত্তে রচিত ছড়ার নমুনা হিসেবে দাখিল করেছেন। মাত্রাবৃত্ত ছন্দেও তিনি একাধিক ছড়া লিখেছেন এই গ্রন্থে :

১.            ‘পুশকিন ছিলো বড়ো

                বাঁজখাই লিখিয়ে,

গল্পের দড়ি ধ’রে

                খেতো পানি কিনিয়ে’।

(নামের ছড়া ১)

২.           কসকর তস্কর তিনখোড়া লশকর

হাত নেই মুখ নেই তবু হাতি ফস কর

                                (তস্কর)

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর নাই পাই ছড়াগ্রন্থে একেবারেই শিশুতোষ ছড়া যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বক্তব্যধর্মী বড়দের ছড়া। ছোটদের জন্য চমৎকার ছড়া লিখেছেন মুখে মুখে ছড়া কাটার মতো :

কাঠঠোকরা

তুই ছোকরা

চুল কোঁকড়া

                মাথায় দিলি ঝাঁকি,

লাল কাঁকড়া

খেয়ে পাকড়া

চুল ঝাঁকড়া

                পালিয়ে যাওয়া খাকি।

                (কাঠঠোকরা)

বড়দের উপযোগী করে লিখেছেন :

সূর্য যখন একলা থাকে

দূর পাহাড়ের ঢালে,

ঝর্না ঝুঁকে বাজায় তালি

পাথরগুলোর গালে :

ঘুমকাতুরে রাত্রিগুলো

জৌাৎস্না পেয়ে ওড়ে,

আকাশ-সীমা উবু হ’য়ে

সাগর টেনে ধরে!

(যখন কিছু নাই)

এসব ছড়ার মধ্যে কবিতার আমেজ রয়েছে। তিনি যে প্রকৃতি বিচারে কবি, ছড়াতেও তার স্বাক্ষর রয়েছে। রাজা হটপট ছড়াগ্রন্থে মা, ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি ছড়া লিখেছেন, যাতে গভীরভাবে ফুটে উঠেছে দেশপ্রেম। ‘শিশিরে শিশিরে লেখা কুসুমের ভাষা/ আমার মায়ের নাম বাংলা ভাষা’ প্রভৃতি চরণ হয়ে উঠেছে চিরকালীন উচ্চারণের যোগ্য। ফুঁ ছড়াগ্রন্থেও রয়েছে দেশপ্রেমের বাণী। :

এই বাতাসে মায়ের গন্ধ এই বাতাসে মন

এই বাতাসে ভুবনমোহন স্নেহের সিংহাসন

এই বাতাসে পদ্মসুবাস এই বাতাসে বল

এই বাতাসে ছুটছে নদী বাজিয়ে রুপোর মল’।

(এই বাতাসে)

লাল কালো নামে একটি সংলাপধর্মী ছড়া রয়েছে। একে নাট্যছড়াও আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। ফুড়ুৎ নামের ছড়াগ্রন্থে কবি  লোকছড়ার আধুনিকায়ন করেছেন :

মেঘের গায়ে বোটকা গন্ধ

                তেল-মশলার দাগ

                ফাটাফাটি কাঁটা-ছুরি

                                পিত্ত-প্লীহা ভাগ!

মেঘের ছেলে হুপিং কাশি               গলাচিপায়

মেয়ের মায়ের কান পেকেছে        চন্দ্রকোণায়

মেঘের বাবা বাতে কাবু    তেঁতুলিয়ায়

মেঘের মেয়ে রাতে কানা                জৈয়ন্তিয়ায়!

                (মেঘে-মেঘে)

কবিতায় নিরন্তর নিরীক্ষার মাধ্যমে হাবীবুল্লাহ সিরাজী নিজের জন্য স্বতন্ত্র পথ নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তেমনি ছড়াতেও তিনি অব্যাহত নিরীক্ষা পরিচালনা করেছেন। ২০১১ সালে তিনি ছয় লাইনে ভূত নামে ২০টি ছড়ার একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাতে অজস্র ভূতের নামে তিনি প্রতীকীভাবে সমাজের কিছু চরিত্রের ছবি এঁকেছেন। প্রথম ছড়ায় :

হেকো ভূত          টেকো ভূত

নোনা ভূত                           বোনা ভূত

                ভূতের আওয়াজ পায়

চেলা ভূত                             ঢেলা ভূত

এঁটো ভূত                            লেটো ভূত

তর্জনী নাচায়।

এই গ্রন্থে ১৬০ রকমের ভূতের নামকরণ করেছেন। ভূতের ছড়ার ক্ষেত্রে তো বটেই, ছড়াসাহিত্যের ক্ষেত্রেও এই গ্রন্থ এক অভিনব সংযোজন। ফশা ভূত, মশা ভূত, কায়দা ভূত, ফায়দা ভূত, আড্ডা ভূত, বাড্ডা ভূত, থুড়ি ভূত, গুঁড়ি ভূত এরকম হরেক নাম রয়েছে ভূতের। তবে ভূত কেবল নামসর্বস্ব ভূত নয়, প্রতিটি ভূতের নামের ভিন্ন অর্থও রয়েছে। এই ছড়াগ্রন্থে কবির কৃতিত্ব এখানেই। একটি ছড়া বেশ তাৎপর্যময় :

গুপ্ত ভূত                              টোনা ভূত           

দাদা ভূত                              চাঁদা ভূত             

                ভূতের চৈত্রমাস

লম্বু ভূত                জম্বু ভূত              

ক্ষেত্র ভূত            নেত্র ভূত

ফসকা গেরোয় আঁশ।

এখানে ভূতের যেসকল বিশেষণ প্রযুক্ত হয়েছে, তাতে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। ছোটরা কেবল ভূতের নাম আর ছন্দ-অন্ত্যমিলের দোলায় দুলবে, কিন্তু বড়রা পাবে ভূতের বিচিত্র চরিত্রের হদিশ। ভূতের ছড়া লিখেও যে কবিত্ব প্রদর্শন করা যায়, ছয় লাইনের ভূত তারই প্রমাণ।

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর ছড়াসাহিত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি এই সৃষ্টিকে বলেছেন ‘ছড়াপদ্য’। এই ছড়াপদ্য তাঁর কবিত্বশক্তিরই সম্প্রসারিত রূপ। এই পদ্যসান্নিধ্য লাভে যে কেনো পাঠকই ধন্য হতে পারে।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares