গল্প : জয়নুদ্দিনের পুত্রধন : দিলারা মেসবাহ

লজ্জাবতী রোদ একবার চানমুখখান দেখায় আর একবার মেঘের ওড়নায় মুখ লুকায়। মণ্ডল বাড়ির উঠানজুড়ে লাল টুকটুকা শুকনা মরিচ। আর রোদের এই কানামাছি খেল!…

বিবি কোকিলার আজ কঠিন কোমর ব্যথা। চিলিক দিয়া দিয়া ওঠে। যেন জল্লাদে গরম শিক দিয়া খোঁচা দিতাছে। বয়েস কী আর তেমন! আপন শরীরটারে টানতে নিজেরই কাহিল লাগে। বছর কয় আগে মহল্লার সকলে কইত, ‘মোমিন সদাগরের মেয়াডা লাগে আসমানের পরিডা।’ সেই হুড়াসাগর পাড়ের পরিডার রূপের জোনাক সাধু পাড়ার জঙ্গলে ঢুকল, তাগরে আর ফেরার নিশানা নাই।

জয়নুদ্দিন কন্ডাকটরের পুতলা বিবি। যদি কওয়া যায় বান্দা বান্দি, তাও সই। দিনরাত চুলা গুতান, কামলা কামিন নিয়া রগরগা গেরস্থি।

জয়নুদ্দিনের চক্ষু দুইডা আজকাইল আগুনের গোলা যেন! রক্তের পুটলি দুইডা। কোকিলা কোমরের বেদনা কয়ডা বড়ি গিলে সয়ে নেয়,কিন্তু মনের কামড় ?

বৈঠক ঘরের পাশ ঘেঁষে মণ্ডলের একলার ঘর, সেখানে ছাতা নাতা কত কিছু।…

‘শুনছেন একখান জরুরি কথা আছিল।’

বিবির চিকন গলার স্বর। যেন-বা বের হয়া আবার শামুকের খাসলতে গলার মধ্যে ঢুকবার চায়। চার চারজন মেয়ার পর একটাই ছাওয়াল তার! লবঙ্গ পড়া, পানি পড়া তাবিজ কবজ দরগায় মান্নতের পর আল্লাপাক খুশি হয়া কৈলজা জুড়াইছে।

কোকিলার পুরানা বিষকামড়ডা চিন চিন করে ওঠে কেনবা। কন্ডাকটর কইছিলেন, ‘এইবারও যুদি মেয়া পয়দা হয়, তাইলে একখান হিসাব করা লাগবেনে। জয়নুদ্দির সয় সম্পত্তি দালান কোঠায় বাত্তি দিবে কেডা ? মান ইজ্জ্বতের সওয়াল।’

মাঘমাসের হিম রাতে বড় খায়েশের ছাওয়াল আসল কন্ডাক্টরের ঘর উজালা করে।

নিকারি পাড়ার মালদার জোনাবালি তার বেটার নাম রাখছে রাজা। জয়নুদ্দির পায়ের তলা জ্বলে খাক। এখন আসচে সুদিন। বেটার ডাক নামডা রাখা হইল মুকুট। রাজার মাথায় পেসাব করবে বেটা তার।

আবার বিবি গামারি কাঠের নক্সি দরজায় কড়া নাড়ে। ‘শুনছেন, একখান দরকারি কথা আছিল।’…

কড়া নেশার মৌতাত থেকে বের হতে নিমরাজি মণ্ডল। কোনমতে চোখ খোলে কর্তা। এমন সময় কোকিলা বিবিরও তার খাস কামরায় ঢোকা নিষেধের উপ্রে নিষেধ।

‘কও কী কইবা কইয়া ফেলাও। আর সুময় পাইলা না! হুঁশ বুদ্দি আর  হৈব কোনকালে ?’

নিজেরে সামলায়ে নেয় মুকুটের মা।

‘আমাগের ছাওয়ালের চলন বলন জুতের ঠেকতেছে না। বেটা রাতভর শুধা প্যাচাল পারে। কী সব ছাই ছাতু কয়।’

‘কী কয় ?’

‘গতরাতে লিটুরে কইতাছিল, মুন্সিবাড়ির হাবিবারে তুইলা আনব।’

‘জব্বর খবর একখান।’

কেরু কোম্পানির বোতলডা গলায় ঢালে ছাওয়ালের বাপ। কোকিলা আজ নাছোড়বান্দা। তিন রাত সে ঘুমায় না।

তোতলা তোতা, শ্যামলি পাড়ার মাস্তানের বাপ। ছাওয়ালের জানের জান সে।

দিনরাত সমান। মুবাইল একখান কান থেকা খসে না।

ঐ ডাগরডোগর হাবিবা সুন্দরীরে যদি বাগে আনতে না পারি তো আমার নামে কুত্তা পালিস। ছেমরি কয়, ‘দশহাত দূর দিয়া হাঁটেন। ঘরে মা বুন নাই ?’ দেহিস ওরে কেমনে সাইজ করি। এক্কেবারে ফানা ফানা। বুঝলি দোস্ত, জোয়ানকি ফাল পারতাছে। ধর হাবিবারে ধরবার পারলাম না। ওর বু’ন সাবিহা,সেইডাও মাল একখান। আর খালতো বু’ন নুরি না হুরি সেওডাও রসগোল্লা।’

বিবির হাত কাঁপে, পাও কাঁপে। বিবি নড়ে না। তালগাছের লাহান খাড়া।

‘ছাওয়াল আমার এমুন করতাছে! আপনে বাপ, কিছু একডা করেন।’

জয়নুদ্দি হাসব না কানব বোঝে না। এইডা তো তার রক্তের বেছন। দিনকাল মন্দ। খানিক হিম্মত, খানিক হুঁশ থাকা লাগে!

মেয়ামানুষ সাইজ বানান আর তার উপরে সিমেন্ট মারা কন্ডাক্টরের দুই আঙুলের তুড়ি। আছিল সেইসব লারেলাপ্পা দিন। তার খানিক ভাব দশা। বেটার বয়স গণনা করে। হয় হয় এই জোয়ান বয়স কালে তারও ছিল জোয়ারের কাল। মহল্লার সতী মেয়েছেলেরা তারে দেখলে দুয়ারে খিল দিত। তার বেটা এহন জোয়ানকির গরম দেখায়। এমুনই হইবে। বাপের বেটা। গেলাসে লাল পানি টলমলা। বালিশের ওয়াড়ে সান্ধাইছে গাঞ্জার চালান। ভাদ্র মাসের চড়া দুপুর। পিরের জলার ঐ পাড় থেকা বহুত সোর জোর শোনা যায়। ঐ পুবের ভিটায় কোকিলার মামাতো বুন মোমেনার ভিটা। তারও তিনডা বেটি। একডার চেয়া আরেকডা সোন্দর। মাঝল্যাডা তো পদ্মফুলডা! বেটিগুলা আদব লেহাজ  পর্দা পুসিদায় পয়লা নম্বর। বাতাসে ভাসে হাজারো কথা। মাইঝল্যা বেটি হাসনা হেনার সব্বোনাশ হইছে!

কোকিলা হিজাবডা কোনরকমে বাইন্ধা জঙ্গলের চিপা রাস্তা দিয়া মোমেনার ভিটায়। হায় আল্লাপাক! হাসনা হেনারে ইশকুলের গেট থেকা তুইল্যা নিছিল দাড়ি হজরত আলি, ট্যারা ছক্কু, কিসলু মাস্তান। আল্লাপাক আসমানডা ভাইঙ্গা পড়ে না কেন ?

মেয়াডারে ভর্তা বানাইছে তিন শুয়ারের বাচ্চা। হাসনা কথা কয় না। খালি ড্যাবড্যাবাইয়া চায়া রইছে।

মেয়াডারে দেখলে চক্ষুর পানি ধইরা রাখা যায় না।

মুকু ছুইটা গেছিল তোতলা তোতার বাড়িত। তার হুঁশ নাই। দোস্তগর বিপদ আপদে সে নীরব থাকে কেমনে ? ফেরনের কালে কেমনে জানি বাম পাওডা মচকাইছে। ‘শালার পাও!’ মনে মনে গজরায় সে।

কোলবালিশের উপরে ঠ্যাং উঠাইয়া রাতভর দুনিয়ার প্যাচাল। খ্যাক খ্যাক করে হাসে আবার আগুনন্যা রাগে গুল্লি ফোটায়।

কোকিলার  নিদ হারাম। ছাওয়ালটারে বাদ্য বাজাইয়া বিয়া দিব, নাতি নাতকুরগ খলবলানি দেখব। কত সাধ আহ্লাদ জিইয়া রাখছিল গোপনে। বৌবেলা থেকা স্বামীধনের গেলাসের বাজনা শুন্যা শুন্যা মনডার মধ্যে বিছুটির জ্বালা। কওনও যায় না, সওনও যায় না। তিন মাস্তানই মুকুটের দলের মানুষ, পিয়ারের দোস্ত। ট্যারা ছক্কু এক্কেবারে বাপের বেটা।

মুকু তার হিম্মতের তারিফ করে, ‘হাসনারে সাইজ বানাইছ দোস্ত। গেদিগুলার বুঝ নাই। আল্লার মাল এমুন রূপ জোয়ানকি সিন্দুকে ভইরা রাখার জিনিস না। তোগরে শুক্কুর পালোয়ানের হোটলে বিরিয়ানি খাওয়াবোনে। প্যাট চুক্তি। চালায়া যা। দিন কইল আমাগ। ওই করোনা ফরোনায় কী করব ?  ওই গুলা বুড়া হাড্ডি গো গেলে। তার বাদে কই দিন কয় সারয়াকান্দি বা হাটিকুমরুল যা। দোস্ত দিন কয়। তার বাদে সব ফরসা,ফকফকা। একখান কথা শুইনা রাখ। হাবিবার শরীরে টাচ করবি না। কিরা কসম। হেই মেয়াডা আমার মাল।ওর ছোট সাবিহা, নুরী রসগোল্লা, হেই আনার বেদানাগুলাও আমার, আমার জিম্মায়।’

দুইদিনে মুকুটের পাও টনটনা। ফজলু ডাক্তার প্রত্যেক দিন সাইকেলের বেল বাজাইয়া আসেন। জয়নুদ্দির বেটার পাও বলে কথা। হাবিবা কোচিং-এ যায়। মাটির সাথে এত কী পিরিতি তার। সুন্দরীর ওড়নায় টান পড়ে আচমকা। ‘বিউটিকুইন, আমারে চিনছ ? রূপের ডালি নিয়া আন্ধারে বন্দি থাকলে চলবে নানে। ভালোয় ভালোয় ধরা না দিলে উঠাইয়া নিতে পাঁচ মিনিট।’

হাবিবার জানে পানি নাই। সেই মহল্লার বড় ইবলিসটা। দিশা না পেয়ে বাতাস কাঁপায়া চিক্কুর দেয় সে। নিশক্তি পাও দুইটা নাড়াতে চেষ্টা করে মুন্সি। গলার রগ ফুলায়া বাপেও চিল্লায়, ‘কী হইছে রে মা ?’

‘কিছু না আব্বা। ভয় খায়ো না। একটা পাগলা কুত্তা পিছ নিছিল। এহন ভাগচে।’ গলা পর্যন্ত ভয় গিলে অসুস্থ বাপকে অভয় দেয় হাবিবা।

‘খাড়াও, তোমারে নস্ট করব আমি,বাপের বেটা যদি হই।’

পুবপাড়ায় মোমেনার ভিটায় থানার ওসি নিয়ামুল বাশার আসছেন। আগে পিছে রাইফেল কাঁধে একদল পুলিশ। গ্রামের মানুষ গিজগিজ করে। হাসনার মা দুইডা কথা কইয়া দাঁতে দাঁত ফিট। ক্ষিপ্ত উল্লাপাড়ার মানুষজনকে ওয়াদা দিছেন তিন আসামি অ্যারস্ট হবেই হবে। চান্দুরা কোথায় চাঁনমুখ লুকাবে! র‌্যাব পুলিশ তৎপর। ওয়াদা করছেন ওসি সায়েব। দাড়ি হজরত ভাঙ্গুরা ইস্টিশান থেকা, ছক্কু আর মোমিন হাটবারের দিন ‘মেঘমল্লার’ হোটেল থেকা হাতকড়া লোহার ডান্ডা বেড়ি পরছে। তারা এহন ঝমঝমাইয়া হাঁটতাছে। তাগর বাপ মায়েরেও থানায় নিছে। শোনা যায় কঠিন শাস্তি হোবে। নিস্তার নাই। পাড়া মহল্লার জনতা আগুন খেপা খেপছে।

মকবুল মাস্টার সাব কইছেন নুতুন আইন পাস হইছে। ফাঁসির দণ্ড বিধান হইছে। মুখে মুখে ফিরতাছে কথাগুলা। ছক্কুর বাপ বুড়া বয়সে গরুর দুধ বেইচা কোনরকমে সংসারডা খাড়া রাখছে। ওসি সাহেবরে সে কইছে, ‘ওই ছাওয়ালরে তাজ্য করসি ওসি সায়েব। ওরে মাইরা কাইটা মাটিত পুইত্যা ফেলান। আমার চক্ষু শুকনা থাকব।’ পাড়ার বাতাস আগুন গরম। ছাওয়ালের তার বিকার থামে না!..

রাতভর খালি প্যাচাল।

তোতার সাথে কথা কয়, ‘হাবিবারে তুইলা নিবো। এহেবারে ময়দা ময়ান। বাপের নামডাও ভুলায়া দিব। মানুষ চিনে নাইক্কা।’

মায়ের মাথা চক্কর দেয়। মনে হয় ছাদ ইট সুড়কি ড্যাগ ডেকচি তার মাথায় ভাইঙ্গা পড়তাছে। ছাওয়ালডার সাথে কোন কথাই কওয়া যায় না। খালি গরম দেহায়। মনে হয় দরজা জানলা ভাইঙ্গা ফ্যালাইব।

মান সম্মানের মামলা। বড়ো বড়ো হিম্মতি কথাগুলা এহন বাতাসে গোত্তা খায়। দপদপায় মুকু।

মুকুট ভাইবা দিশ পায় না। দাড়ি হজরত এমুন হাজারডা কেস সারাইছে। ফান্দে পড়ে নাই। মালটারে গুম করলে মামলা ডিসমিস। এহন মনে কয়, তিনটারে পাইলে খালি চটকান খালি চটকান! কী শিখলো এতকাল। ভ্যাদা মাস্তানগুলা। বিবি আর পারে না। ছাওয়ালডা তার বেঘোরে মরণের জন্যে জন্মায়ছিল!..

জয়নুদ্দিনের খাস কামরার পোক্ত দরজায় কড়ায় ঠকঠকানি। আথালিপাথালি। বেশুমার। বোঁটকা গন্ধ খাস মহলে। যত দিন যায় তত যেন মানুষটা নেশার খেসারত দিবার নিছে। সুরুজ ব্যাপারি আবার কোন সময় জানি এইগুলা যোগান দিয়া গেছে। সন্ধ্যা লাগতেই মানুষটা দুনিয়ার বাইর। টেবিলে ভাং, চরশ, বিলাতি গাঁজায় সয়লাপ। গেলাস হাতে সে আউলা চাউনি নিয়া চায়া রইছে।

কোকিলার গলা খানিক চড়া। মাথার ঘোমটার ঝুল খসে পড়ছে।

‘তুমি যে বেপাড়ায় যাও, সেখানে ছাওয়ালডারে রাস্তা চিনায়া দেও। মেয়ামানুষডার নাম শুনছিলাম বিজলি। সেহানে যাকগা ছাওয়াল তোমার। হেগরে তো খাতায় নাম আছে। সেহানে গেলি জেল হাজত ফাঁসির ডর নাই। একটা বিহিত করাই লাগব।’

কোকিলা আজ স্বামীধনরে ‘তুমি’ ডাকছে।

গেলাসের লাল পানি ছলকায়। জয়নুদ্দি আচানক বিষম খায়। বিড়বিড় করে, ‘হের সাতে আমগ বেটার বয়সের মিল খাইব না। যদিও মানুষটার শরীলের ডিল নক্সা আছে এহনও। তাইলে হের মেয়া চুমকি একেবারে মাখন। গান বাজনা শিকতাছে। সেই মেয়াছেলের সাথে বেটার মিল খাইব।’

চুমকির জন্মের আগ থেকা জয়নুদ্দি তার মায়ের কাছে রাত কাটাইছে। কম মেয়েছেলে তো চেনে নাই সে। শেষমেশ ঝিলিকরে রাখছে বান্ধা। মনের ভিতরে একটা বুরবুরানি ওঠে। চুমকি মেয়াডা…

‘গোল্লায় যাকগা।’ ঝিমুনি ধরে তার। ভাবনা চিন্তার জো নাই। ঘিলুর মধ্যে কাদামাটি।

জয়নুদ্দিন কেরুর বোতল জাপটে ধরে কান্দে আর কান্দে।

 লেখক : গল্পকার

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares