গল্প : মাতৃত্ব : মুসা আলি

হালফিল সময়ে জামাইবাবা জীবনকে নিয়ে আমাদের সংসারে এক অভিনব বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। না-পারি ফেলতে, না-পারছি গিলতে। বাবা জীবনের বিড়ালভাবনায় যে বৈজ্ঞানিক চিন্তা রয়েছে, তা সত্যি সত্যি মনে রাখার মতো। আমাদের মধ্যে তা ঢুকিয়ে দিতে না-পারলে বাবা জীবন মনে মনে এতটুকু স্বস্তি পাচ্ছে না। তার সব জোর শ্বশুরবাড়ির উপরেই।

দু’চার মাস অন্তর অন্তর আমাদের বাড়িতে এলে যত্ন করা নিয়ে কোনও ত্রুটি রাখিনি। রাতে খেতে বসলেই নিজের বিড়াল-ভাবনা নিয়ে পর পর ফিরিস্তি দিয়ে যেতে এতটুকু ভুল করত না। আমরা নির্বাক শ্রোতা। বিড়ালের লালায় নাকি জলাতঙ্ক রোগের জীবাণু রয়েছে যা মুহূর্তে একটা শিশু-কিশোরের জীবন-বাতি নিভিয়ে দিতে পারে। মরা ইঁদুর গালে নিয়ে বিড়াল যেভাবে তক্তাপোষের নিচে ফেলে রাখে, তাতে নাকি মহামারি রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা কেউ জানি না, বিড়ালের লালায় করোনা ভাইরাস আছে কিনা। বিড়াল নিজের চলাফেরায় ঘর-বারান্দা মেঝে যেভাবে অশুচি করে তোলে, তাতে নাকি শুদ্ধভাবে ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ চালানো সম্ভব নয়।

এমনি-বিড়াল-ভাবনার পেছনে আরেকটা অভিনব স্পর্শকাতরতা ছিল। ওর বড় ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে, মাঝেমধ্যে মনের টানে আমাদের বাড়িতে চলে আসে। বড় ছুটি পড়লে তো কথাই নেই। ওই বয়সে যেকোনও কিশোর মামার-বাড়ির আদর পেতে চায়। জামাইবাবা জীবনের যত ভয় সেখানেই। কোথায় কী হয়ে যায়, তাই নিয়ে ভীষণ চিন্তায় থাকতে হয় তাকে। রবার্ট ব্রস রাজত্ব হারিয়ে যত না ভেবেছিলেন, ছেলেকে নিয়ে জামাইবাবা জীবনের দুশ্চিন্তা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। কত যে অতলস্পর্শী তা বেশ বুঝতে পারি। ছেলের চিন্তায়  দুই বেলা ফোন করে আমাকে বলত, রকিকে একটু দেখবেন। গলার কণ্ঠস্বরে দিব্যি বুঝতে পারতাম, শুধুমাত্র লজ্জার কারণে ‘আমার রকি’ বলতে পারল না বাবা জীবন।

কোনোদিন সন্ধ্যের শুরুতে কণ্ঠস্বর খাটো করে বলত, ওকে (একটু সাবধান করে দিয়েছেন তো ?

বিরক্তি বাড়লেও প্রতিবাদ করা সম্ভব হতো না। সজ্জন নাতি তখন আমার পাশে বসে মুড়িচানাচুর মস্তি করে খাচ্ছে। খাইখাই চানাচুর খেতে ও খুব পছন্দ করে। বললাম, এই তো পাশেই বসে আছে, দেব ওকে ?

তাহলে দিন, একটু কথা বলি।

কয়েক মিনিটের মধ্যে বাপ-ছেলের কথোপকথন জমে খির হয়ে যেত। কান পেতে শুনতাম, জামাইবাবা জীবন পর পর বিচিত্র প্রশ্ন করছে আর রকির সদুত্তর মুহূর্তে পৌঁছে যাচ্ছে বাবা জীবনের কানে।

হ্যাঁরে, বিড়াল-বাচ্চাগুলোকে ক’দিনে ক’বার চোখে দেখলি ?

কাল সকালে একবার দেখেছিলাম।

ওদের ধারেকাছে যাবি না।

এভাবে বলছ কেন ?

যা বলছি, শোন্ না, তোর পাশ দিয়ে একবারও কী হেঁটে গেছে ?

ঘরের বিছানায় শুয়ে বাচ্চাগুলোকে বারান্দা ধরে হেঁটে যেতে দেখেছি।

তাহলে তো সেফজোনে থাকতে পেরেছিস। এভাবেই সাবধানে থাকবি। মামার বাড়িতে গিয়েছিস ভালো ভালো খেতে, বিড়ালবাচ্চাদের নিয়ে পড়ে থাকার কী আছে ? মা বিড়ালটাকে দেখেছিস কোনদিন ?

চোখেই পড়েনি।

ইতর প্রাণি, ওদের মধ্যে প্রীতি ভালোবাসা বলে কিছু নেই রে।

রকি নিরুত্তর।

আমার জামাইবাবা জীবন কত বিচিত্র দেখুন। আমি কেমন আছি, তা নিয়ে কোনও কথা নেই, সব কথা বিড়ালকে নিয়ে, ছেলেকে সাবধান করা নিয়ে। সংযোগ ছিন্ন করার আগে বার বার সাবধান করে দিয়ে বলল, খুব সাবধানে থাকবি। এখনও ওই বাড়িতে বিড়াল নিয়ে ঠিকমতো সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। কাউকে কিছু বলিস না, আর তো কয়টাদিন থাকবি। ছুটিও শেষ হয়ে এল। তোর জন্যে দুশ্চিন্তা কিছুতেই মাথা থেকে সরছে না।

শুনতে শুনতে মনে হলো, ছেলের কারণে বাবা জীবনের মধ্যে বিড়ালভীতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। আদর্শ রক্ষার লড়াইয়ে বাবা জীবন যেন বড় বেশি বিপন্নতা বোধ করছে।

ক’দিন পরে আমাদের বাড়িতে এল ছেলেকে নিতে। রাতে খেতে বসে বিড়ালের কারণে বাড়ির পরিবেশ কীভাবে দুষিত হয়ে উঠছে তা শুনতে শুনতে আমার মধ্যে কেন যে বিড়াল-ভীতি এত তীব্র হয়ে উঠল, নিজেই তার ব্যাখ্যা খুঁজে পেলাম না। বার বার মনে হতে থাকল, বিড়াল নিয়ে বাবা জীবনের মননের গভীরতা সমুদ্রের মতো অতলস্পর্শী। ঠিক কথাই বলতে পেরেছে তো। এত বড় ফিলজফি কেন যে আগে জানা সম্ভব হয়নি, তা নিয়ে একটা প্রচ্ছন্ন খেদ মন্দগতির স্রোতস্বিনীর মতো মনের নদীতে বইতে শুরু করল। আধুনিক সমাজে বাস করে বিড়ালের মতো ইতর প্রাণীর কারণে কিছুতেই বাড়ির পরিবেশকে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। পুকুরে বিষ পড়লে যেমন মাছেদের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে, বাড়িতে বিড়াল থাকলে তেমনি পরিচ্ছন্নতা মরতে মরতে সুস্থ পরিবেশ শূন্য হয়ে যায়।

বাবা জীবনের বক্তব্যে যে যথেষ্ট ফ্লেবার রয়েছে, তা নিয়ে আমার মধ্যে আর কোনও সন্দেহ থাকল না। ভাবলাম, বাবা জীবনের তত্ত্বকথা ঠিকমতো নিতে পারলে নিজেও মাঝারি মানের পরিবেশ বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে পারি। আরও মনে হতে থাকল, বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে মা-বিড়াল কখনও মানবী মায়ের মতো স্নেহময়ী হয়ে উঠতে পারে না। ইতর প্রাণী, তাই সন্তানদের প্রতি মানুষের মতো মানবিক হয়ে ওঠা কিছুতেই সম্ভব নয়।

আমার মধ্যে নতুন ভাবান্তর শুরু হল। যেন তা কলকলে ছলছলে নদী। সামনে ছুটে চলার গতিতে মুখর। পাশের বাড়িতে রুনুর বিয়ে নিয়ে বিড়ম্বনার জটিল জাল মাথা থেকে সরতে সরতে একেবারে উবে গেছে। পড়শি নিয়ে এত ভাবতে যাব কেন ? সেই প্রশ্নও জেগেছ মনে।

এ নিয়ে নতুন বিপত্তিও শুরু হয়ে গেছে আমাদের সংসারে। শনিবার রাতে খেতে বসেছি, সাজির মৃদু প্রতিবাদ, জামাইয়ের এত কথা শুনে চুপ করে থাকা কী ঠিক হচ্ছে? ভেবেছিলাম, একটু প্রতিবাদ করবে তুমি। এখন দেখছি, তুমিও জামাইএর পথে হাঁটতে শুরু করেছ। তাহলে ইতর প্রাণীগুলো যাবে কোথায় শুনি ? সারা জীবন দেখে আসছি, কুকুর, বিড়াল, গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া মানুষের আশ্রয়ে থেকে বড় হয়ে উঠছে, কোন অসুবিধা হয়নি। এখন জামাইএর জন্যে নতুন করে ভাবতে হবে কেন ? ভাবসম্প্রসারণে পড়েছি, জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। কুকুর বিড়াল কী সেই জীবকুলের মধ্যে পড়ে না?

সাজির প্রতিবাদ শরীরের পাশ দিয়ে সোজা বের হয়ে গেল। আমি কেবল পড়ে আছি জামাইবাবা জীবনের অভিনব দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে। অন্য কিছু ভাবতে যাব কেন ? বাবা জীবনের দর্শন  নিয়ে যত চিন্তা করছি, মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম কোষগহ্বরে তত নতুন নতুন ভাবনা উঠে আসছে। নতুন প্রতিজ্ঞায় বার বার দুলতে বাধ্য হচ্ছি। আর কারুর কথা মাথায় নেওয়া যায় না। বাড়ি থেকে সব বিড়াল তাড়াতেই হবে। প্রথমে বাচ্চাগুলোকে, তারপর….। জামাইবাবা জীবন নিশ্চয় আমার কাছে মিথ্যে করে কিছু বলতে পারে না।

পৌষ মাসের পাঁচ তারিখ, খুব সম্ভব সোমবার। সন্ধ্যা উতরে গেছে কিছুক্ষণ আগে। বাড়িতে ঢুকে দেখি, বড় ছেলে একটা বিড়ালবাচ্চা হাতে নিয়ে আদর করছে, পুশ বুশি বলে নিজেই খুশি হচ্ছে। গজগজ করতে করতে বললাম, ঝগড়া না-করলে বুঝি আমার কথা শুনবি না তোরা।

বড় ছেলে বাংলায় অনার্স গ্রাজুয়েট। অন্য নানা প্রসঙ্গে ওর মধ্যে মননশীলতার সূক্ষ্ম জ্যাঠামি দেখেছি। স্তম্ভিত হয়ে আমার দিকে চোখ রেখে থেমে থেমে বলল, কী হয়েছে বলবে তো ?

বিড়াল বাচ্চাটাকে এভাবে হাতে ধরে রেখেছিস কেন ? কত বড় বিপদ হয়ে যেতে পারে জানিস ? দুবেলা ঘর-বারান্দাজুড়ে ওদের চলাফেরা, তাতে কী বাড়িতে পরিচ্ছন্নতা বলে কিছু থাকে ? সেই ঘর-বারান্দায় তুই হাঁটছিস, আমি হাঁটছি, তোর ভাগ্নেও হাঁটছে। বিড়াল পুষে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যতত্ত্ব ধরে রাখা যায় না রে। জামাইবাবা জীবন আর কতবার সাবধান করে দেবে বল্ তো ?

অ, এই কথা ?

কেন রে, আমার জামাইবাবা জীবন বুঝি মানুষ নয় ?

আমি কী তাই বললাম ?

তাহলে অ বললি কেন ? এক্ষুনি বাচ্চাগুলোকে কোথাও ফেলে দিয়ে আয়।

সাহেব চেহারার বড় ছেলে বারান্দার উপর থমকে দাঁড়িয়ে বলল, তাহলে কী ?

ও সব বাড়িতে রেখে লাভ কী বল্ তো ? শুধু শুধু অশুচি রোগে ভুগতে হয়। এদেশে করোনা ভাইরাস এসে গেছে।

ভাইকে একটু বুঝিয়ে বলতে পারলে তো কাজটা সহজ হয়ে যেতে পারত।

মেহেবুবের কথা বলছিস ?

মাথা নাড়ল বড় ছেলে।

মনে মনে ভাবলাম, সাজি এই একটা অদ্ভুত ছেলে পেটে ধরেছে। একেবারে ভিন্ন প্রকৃতির। বিড়াল বাচ্চার মুখে চুমু খেয়ে সুখ অনুভব করে। কোলে বিড়াল বাচ্চা বসিয়ে রাতের খাওয়া সারে। খাওয়া শেষ হলে বাচ্চাগুলোকে আবার কোলে নিয়ে সোনা-মানিক, পুশিবুশি বলে আদর করে। এসব না করলে নাকি রাতে ওর ভালো ঘুম হয় না। জামাইবাবা জীবনকে এতদিন সেসব জানতে দিইনি। জামাইয়ের গুড বুক- এ কোন্ শ্বশুর না-থাকতে চায়? এখন কিন্তু আমি কমবেশি প্রতিবাদী। জামাইবাবা জীবনের ফিলজফি নিয়ে যথেষ্ট ভাবতে শিখেছি।

বাচ্চাগুলো ধরার জন্যে বড় ছেলে তোড়জোড় শুরু করে দিল। ছোটকে উদ্দেশ্য করে বলল, হ্যাঁরে, গেলি কোথায় ?

ঘর থেকে বারান্দায় আসতে আসতে ছোটোর মন্তব্য, এখন তো বাচ্চাগুলো খুব ছোট, ঠিকমতো খেতে শেখেনি।

বড়োকে উদ্দেশ্য করে গলা চড়িয়ে বললাম, ও কী বলতে চাচ্ছে শুনি ?

সাজি রান্নাঘরে বসে ঢিল ছোঁড়ার মতো করে বলল, ও তো খারাপ কিছু বলেনি। ‘ওঠ ছুড়ি তো বে’ মনোভাব নিয়ে এসব করতে যাচ্ছ কেন ?

অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হলো, ছোটছেলে মায়ের কথায় কোন বল পেল না বরং আমার কথার ভারিক্কিতে চোখ মুছতে মুছতে বারান্দা থেকে উঠোনে নামল। ব্যাগটা হাতে নিয়ে বলল, বাচ্চাগুলো ভিতরে ঢুকিয়ে দে।

ঠ্যালার নাম বাবাজি। মনে মনে পুলকিত না হয়ে পারলাম না।

বড় ছেলে বাইকে স্টার্ট দিল, পেছনে উঠে বসল ছোট ছেলে।

গলার স্বর নামিয়ে পরামর্শ দিলাম, নিমপিঠ মিশনের পাশে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসতে পারিস, বাচ্চাগুলো অন্তত এটাওটা খেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে।

বিড়বিড় করে ছোট ছেলে বলল, তিনটি বিড়ালবাচ্চাকে খেতে দেওয়ার মতো সামর্থ আমাদেরও ছিল।

ওর কথা কানেই তুললাম না। আবার জামাইবাবা জীবনের বিড়ালতত্ত্বের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। সময় বাড়ছে পলে পলে। হাত ঘড়িতে রাত ন’টা। সন্ধ্যের বাঁকা চাঁদ ডুবে গেছে একটু আগে। চারদিক গাঢ় অন্ধকারে ডুবে আছে। আরও কিছু সময় পরে বাইকে দু’জন ফিরে এল বাড়িতে। ঘরে ঢুকতে গিয়ে ছোট ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সাজির এই সেই ছেলে যে বেশ কয়েকবার কাঠবিড়ালির বাচ্চা পুষে শেষ পর্যন্ত একটাকেও বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি।

সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ইতর প্রাণীর জন্য এভাবে কাঁদতে নেই রে।

বড়োর স্বগতোক্তির রঙবাজি, জানো বাপি, বাচ্চা তিনটা ছেড়ে দেওয়ার সময় ওর কান্না কিছুতেই থামাতে পারিনি।

এভাবে কান্নার কী আছে শুনি ? চারদিকে যেভাবে করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক শুরু হয়েছে।

কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দিল না ছোট ছেলে।

রাত দশটা। সামনের চত্বরে থিকথিকে অন্ধকার। দূর থেকে ভেসে আসছে ডাহুকের ডাক। মা বিড়াল এতক্ষণ কোথায় ছিল, কেউ জানি না। বাড়িতে ঢুকেই ডাকতে শুরু করল, ম্যাঁও। আবার ডাকল, ম্যাঁও।

বাচ্চাগুলোকে কী কাছে পেতে চাচ্ছে, নাকি খিদে পেয়েছে বলে ?

বাম পাশের ঘর থেকে বড় ছেলে বলল, ওমা, শুনতে পাচ্ছ? আলু ঝোল মিশিয়ে মা বিড়ালকে বেশি করে ভাত খেতে দাও। আজ তো মাংস রান্না হয়েছে। তিন পিস মাংস দিও। ভালো খেতে পেলে বাচ্চাগুলোর কথা আর মনে করতে পারবে না।

ডান পাশের ঘর থেকে একগুঁয়ে ছোট শুধু উঁ বলে বাঁকা উত্তর দিল।

ওর কথা কানেই তুললাম না বরং বড় ছেলেকে উৎসাহ দিয়ে বললাম, এক অর্থে ঠিক বলেছিস তুই, ইতর প্রাণি কখনও হারানো স্মৃতি ধরে রাখতে জানে না।

রাত সাড়ে দশটা। সাজি ডাইনিং টেবিলে ভাত-তরকারি সাজিয়ে ডাকল, খেতে আয় রে ছোট, দুজনে মিলে তো একটা যুদ্ধজয় সেরে ফেলতে পারলি।

ছোটর টিপ্পনি, জানি তো, এ বাড়িতে জামাই সব, আমরা কেউ নয়।

রাগে শরীর রি রি করে উঠল, বড়কে উদ্দেশ্য করে বললাম, ও কী বলতে চাচ্ছে রে ?

সাজির সান্ত্বনা, আহা, এভাবে বকছ কেন ? দুঃখ পেয়েছে বলেই তো।

বিড়ালের জন্যে দুঃখ কিসের শুনি ? ও কী মা-বিড়ালের ডাক শুনতে পায়নি ?

তাহলে কী স্বামী বিবেকানন্দ জীবপ্রেমের কথা বলে ভুল করেছেন ?

ওই সব বাজে কথা রাখো।

সাজি কিন্তু চুপ করে থাকল না, বলল, তুমি জানো না, ছোট ছেলে বাচ্চাগুলোকে কোলে নিয়ে কী ভীষণ আদর করত। নিজের চোখে এসব দেখেছি। ভাবছ কেন, ইতর প্রাণি বলে মা-বিড়ালের মধ্যে কোন মাতৃত্ব নেই।

ওরা শুধু শরীর নিয়ে বেঁচে থাকে, বুদ্ধি, মন বলে কিছু নেই, মনন থাকবে কী করে ?

সাজি আবার ডাকল, খেতে আয় রে ছোট।

কিন্তু ও কিছুতেই ডাইনিং টেবিলে এল না। বাধ্য হয়ে বড়কে সঙ্গে করে নিয়ে খেতে বসলাম। তখনও অর্ধেক খাওয়া হয়নি। ছোটর মন্তব্য ভেসে এল কানে, কয়টা বিড়ালছানাকে খেতে দিলে বুঝি আমাদের সব কিছু ফুরিয়ে যেত। মা বিড়ালের কষ্টের কথা কেউ ভাবল না।

রেগে কাঁই হয়ে সাজিকে বললুম, দেব ঘা দুই ? ও কী মানুষের চেয়ে ইতর প্রাণিকে বড় করে দেখছে ? আস্ত নির্বোধ কোথাকার।

সাজি সেকথায় কান না দিয়ে বড় ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল, হ্যাঁরে খোকা, ক’পিস মাংস দেওয়ার কথা বলছিলি ?

অন্তত তিন পিস দিতে হবে।

তাহলে তাই দিচ্ছি। ঝোল মেশানো ভাত রান্নাঘরের এক কোণে রাখতেই মা বিড়াল ডাকতে ডাকতে সেখানে এল কিন্তু মুখে ভাত তুলল না। শুনেছি, বিড়াল খুব মাংস রসিক কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই নমুনা দেখতে পেলাম না। সামনে দু’পা, পিছনে দু’পা বাড়িয়ে বাঘের মতো পাহারায় থাকল। খাওয়ার কোনো উৎসাহ দেখাল না। ততক্ষণে আমরা দু’জনে খাওয়া প্রায় শেষ করে ফেলেছি। একবার মুখ উঁচু করে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে দেখি, মা-বিড়ালটা মুখ ভার করে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে।

বুকের গভীরে ছ্যাক করে নতুন অনুভূতি ঢুকল কিন্তু সেকথা কাউকে বলতে সাহস পেলাম না।

বড় ছেলে বলল, খিদে বাড়লে রাতের দিকে সব খেয়ে ফেলবে বাপি।

ঠিক বলেছিস বাবা, পেটের দায় ইতর প্রাণী কখনও ফেলে রাখতে শেখেনি।

শুধু উঁ শব্দে ছোট ছেলের তির্যক উত্তর ভেসে এল কানে।

হ্যারে খচ্চর, জামাইবাবা জীবনের চেয়ে তোর কাছে মা-বিড়াল বড় হয়ে গেল? এতটুকু বিবেচনা শক্তি নেই ?

বড় নিরুত্তর, ছোট ভাই বলে কথা। মনে হল, ছোটর কাছে বিরাগভাজন হতে চাচ্ছে না। খাওয়া শেষ করে বেডরুমে চলে এসেছি। রাত বাড়ছে পলে পলে। একটা অচেনা দুর্বলতা ক্রমে আরও জোরে চেপে বসছে মনের ছবিতে। ভাবনার গভীরে দোল খাচ্ছি। বারবার ম্যাঁও শব্দ ভেসে আসছে কানে। ভেতরে ভেতরে কম্পিত না হয়ে পারছি না। এত ডাকাডাকির কী আছে ? খিদের সময় পেটপুরে খেয়ে নিলেই তো সব সমস্যা মিটে যায়।

কাঁচা ঘুম থেকে জেগে উঠে সাজির রোষ দেখানো প্রশ্ন, কয়টা দিন দেরি করলে কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত ?

গলার স্বর রাশভারী করে বললুম, এভাবে ছোটর পক্ষে ওকালতি করতে যেও না, জামাইবাবা জীবন কোন ভুল কথা বলেনি।

কোন উত্তর দিল না সাজি বরং কথার গজগজানির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখল। পাশের ঘর থেকে বড় ছেলের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মা-বিড়ালের ডাক শুনতে পাচ্ছ বাপি ?

রাগে শরীর রি রি করে উঠল। ক’দিন আগে জামাইবাবা জীবনের বাড়ি থেকে দামি প্যান্টজামার পিস উপহার পেয়েছে এই ছেলে। এসব ওর কাছে কিছুই নয় ? আরেকটু পরে মনে হল, সামনের বারান্দা মাড়িয়ে কে যেন থপথপ পায়ে এগিয়ে চলেছে। মা-বিড়াল নয় তো ? দরজা ঠেলে মুখ বাড়িয়ে সামনে ছায়ামূর্তি দেখতে পেয়ে গলা খাকারি দিয়ে বললুম, কে রে ওখানে ?

কোনো উত্তর না-দিয়ে চাপ চাপ পা ফেলে নিজের বেডরুমে ঢুকে গেল ছোট। আবার বিড়ালটা ডেকে উঠল ম্যাঁও। ব্লাক আউট চলছে। রাগ করে টর্চ হাতে হনহন পায়ে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দেখলাম, তখনও মা বিড়ালটা ঝোল মেশানো মাংসভাতে মুখ দেয়নি। সামনে দুপা বাড়িয়ে শিকারি বাঘের মতো অধীর অপেক্ষায় রয়েছে। ফিরে আসার সময় বিরক্ত হয়ে বললাম, এভাবে অপেক্ষায় থাকার কী আছে?

আরও কিছু সময় পার হলো। সারা শরীরে কেমন যেন অস্থিরতা। কিছুতেই দুচোখে ঘুম আসছে না। মা-বিড়ালটা আবার ডাকল, ম্যাঁও। ঘুমের ঘোরে পাশের ঘরে ছোট ছেলে ভুল বকছে, আমরা কী তিনটে বাচ্চাকে খেতে দিতে পারতাম না ? মা-বিড়ালটার কথা কেউ ভাবল না।

মনের বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করে বললাম, হ্যাঁরে খচ্চর, জামাইবাবা জীবনের চেয়ে তোর কাছে বিড়ালের মায়া বড় হয়ে উঠল ? গত মাসে বাবা জীবনের বাড়িতে গিয়ে বেশ তো কবজি ডুবিয়ে খেয়ে এলি। এত তাড়াতাড়ি সেসব ভুলে গেলি ?

শীতের রাত। ঘুমের আড়ষ্টতা বার বার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর জেগে থাকা সম্ভব হলো না। রাত একটার পরে আবার ঘুম ভেঙে গেল। মনে হলো, রান্নাঘরের ভেতরে কেউ যেন কৌটোগুলো নাড়ছে। ধানচাষের জন্যে বিষের পাত্রগুলো রেখে দেওয়া হয়েছিল রান্নাঘরের এক কোণে। ছোট ছেলে কী মনের দুঃখে ? বুকটা কেঁপে উঠল। বেচারা বাচ্চাগুলো ফেলে দিয়ে বাড়িতে ফিরে ভীষণ মন খারাপ করেছিল। সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় কী? আর শুয়ে থাকা সম্ভব হলো না। তখনও ব্লাক আউট চলছে। টর্চ মেরে দ্রুত পায়ে ওর শোবার ঘরের সামনে গিয়ে দেখলাম, দিব্যি ঘুমে অচেতন হয়ে আছে। মনে হলো, ধেড়ে ইঁদুর রান্নাঘরে ঢুকে এভাবে কৌটোগুলো নাড়ছিল। অন্ধকারে হাতড়ে খাদ্য অন্বেষণের বৃথা চেষ্টা। আগেও বেশ কয়েকবার এমনি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। সেরাত্রে বার বার ঘুম ভেঙে গেছে ধেড়ে ইঁদুরের দৌরাত্মে। পায়ে পায়ে শোবার ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শরীর মেলে দিলাম।

ভোর চারটা। রান্নাঘরে কৌটো নাড়ার শব্দে আবার ঘুম ভেঙে গেল। গেছো ইঁদুরের ফাজলামিতে না-হেসে পারলাম না। ইতর প্রাণী বলেই জানে না, যে কৌটো নিয়ে অন্ধকারে এভাবে খেলছে, তার একফোঁটা বিষে মুহূর্তে কত ইঁদুরের প্রাণ চলে যেতে পারে। ভাবনার ফাঁকে নরম বিছানার আরাম নিতে নিতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভোর পাঁচটা। বিছানা থেকে নেমে দ্রুত পায়ে বারান্দা পার হচ্ছি বাথরুমে ঢোকার উদ্দেশ্যে। একবার মুখ ঘুরিয়ে আবছা দেখতে পেলাম, ধেড়ে ইঁদুরটা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে রান্নাঘরের এক কোণে। মনে মনে ভাবলাম, বিষের ঘ্রাণ নিতে পারেনি বলেই বোধ হয়। বাথরুম থেকে বের হয়ে রান্নাঘরে ঢুকতেই সারা বুক জুড়ে সুনামির ঝড় বইতে শুরু করল, এ কী ? বিষের কৌটোটা কাত হয়ে পড়ে আছে রান্নাঘরের মেঝেতে। মুখের ছিপিতে বার বার কামড় দেওয়ার ফলে মাটির মেঝে ভিজে উঠেছে তরল বিষে। তার উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছে বাড়ির মা-বিড়ালটা।

স্তম্ভিত হয়ে ভাবছি। তাহলে কী কোন কিছুই পার্থক্য নেই! মননের বরণে হুবহু একই ?

লেখক : কথাশিল্পী (কলকাতা)

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares