গল্প : শীষ ফোটার ঘ্রাণ : আসাদুল্লাহ্ মামুন

খইমুদ্দির চায়ের দোকানে ভিড় বেড়েছে। নিজের মধ্যে ডুব মেরে বসে আছে মুকুল। সকাল থেকে সূর্যের মুখ মেঘে ঢেকে আছে। মাঝে মাঝে ঝিপ-ঝিপ বৃষ্টি হচ্ছে। শীত যাই যাই করে আবার পেছন ফিরে দেখছে। পুকুরে ডুব দিয়ে তাকালে যেমন ঘোলাটে আবছা দেখায়, মুকুলের চোখ এখন ঠিক তেমনই। সে এখন কোথায় বসে আছে, কিসের মধ্যে আছে, নিজেই ভুলে গিয়েছিল। একবার থুতনি তুলে জাগল, চারধারে তাকিয়ে বোঝাল, সে খুব স্বাভাবিক আছে। বাইরে বৃষ্টির কারণে শুধু বসে থাকা। হাটবারের জন্য দূরের হাটুরেরা চায়ের দোকানে ঢুকছে। খইমুদ্দির বেটা হিরু পেঁয়াজু ভাজছে, সেই পেঁয়াজুর সাথে চলছে চা। কড়াই থেকে ভাজা পেঁয়াজু উপচে পড়ছে। খবরের কাগজে করে হাটুরেরা পেঁয়াজু তুলে, ‘উস-আস’ শব্দ করে খাচ্ছে। আবার গরম তেলে ছাড়া হচ্ছে পেঁয়াজুর মাখনি। ছ্যাঁত ছ্যাঁত, ঝাঁ ঝাঁ শব্দ। দোকানের ভেতরের তিনটি বেঞ্চিই খদ্দেরে ভরা। হঠাৎ খইমুদ্দি মুকুলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, মাষ্টারের মনটা কি খুব খারাপ ? ‘মাস্টার’ শব্দটি শুনে আবার থুতনি তুলে তাকায় মুকুল। বলে, না না কী যে বলেন চাচা, সব ঠিক আছে, আরও এক কাপ চা দিও। প্রথমে এসেই এক কাপ চা খেয়েছে মুকুল। তারপর থেকে ঝিম মেরে আছে।―দিতেছি, বলে খইমুদ্দি চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

খবরটা কিছুক্ষণ আগে কানে এসেছে মুকুলের। সত্যি-মিথ্যা কতটুকু, জানে না। স্কুল বন্ধ, তাই দাড়ি কাটাও হয়ে ওঠেনি। আগে কখনও লুঙ্গি প’রে, চাদর জড়িয়ে, হাটের মধ্যে চা খেতে আসেনি। হাজার হলেও হাইস্কুলের শিক্ষক। মুকুল এখন নিজের মধ্যে থাকতে পারছে না। তার সম্পর্কে কে কী ভাবছে, তার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার না। এমন ছাই মেশানো শূন্যতার দিনে, ভেজা ভেজা ঠাণ্ডা বৃষ্টির মধ্যে, কেমন একটা দুঃখের অবসাদ, অবসন্নতা, অলসতা ভিড় করেছে যেন!

চা খেয়ে সিগারেটে টান দিতেই মুখটা তিতা হয়ে গেল। থু করে থুথু ফেলল মুকুল। কিন্তু সিগারেটটা ফেলতে ইচ্ছা করছে না। টুপটাপ বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চাল চুঁইয়ে পড়ছে বৃষ্টি। সেখানে বুদবুদ উঠছে, ফাটছে। মনে হচ্ছে সব বুদবুদ আসলে থুথু, সব যেন মুকুলের জন্য। বৃষ্টির কারণেই হাটটা দ্রুত হুড়মুড় করে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। লোকজন দ্রুত সরে পড়ছে। দুপুরের খাবার খেয়ে মুকুল এখানে এসেছে। বিকেল গড়িয়ে চলল, হাট ভেঙ্গে গেল, তবু উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মটরডাঙ্গার হাটটা সকাল থেকেই বসতে শুরু করে, দুপুর থেকে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে সন্ধ্যা। আজ বৃষ্টির কারণে বিকেলেই বিদায়ের সুর। হাটের পাশ দিয়ে সড়কটা শহরের উল্টোদিকে গহীন গ্রামের দিকে গেছে। যেতে যেতে বিভিন্ন গাঁয়ে হাত-পা ছড়িয়ে ঢুকে গেছে। এরই মধ্যে খইমুদ্দি হাজার দুয়েক টাকা বাক্সে ঢুকিয়েছে। তারপরও সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকান চলবে।

মুকুলের বুক পুড়েছে আজ। এটা সবাই জানে না। তাই সে আগুনটা বুকের মধ্যে নিয়ে তা দিয়ে চলছে। তাকে তার আর মানুষ মনে হচ্ছে না। সে অদ্ভুত এক জীব। যার নাম নেই গোত্র নেই। এমএ শেষ করে বড় কোন চাকরির জন্য দৌড়াদৌড়ি না করে গ্রামের হাইস্কুলে ঢুকে গেছে। এতে বাপের জমিজমার খবরও নেয়া হবে, আবার স্কুলও হবে। গ্রামে একটা এমএ পাশ ছেলের খুব দাম। পাশের গ্রামের সুন্দর মেয়ে কুলসুমকে দেখতে গিয়ে পছন্দ। তার বাপ খুব খুশি। এমএ পাশ জামাই। কুলসুমও খুশি। বিয়েতে খুব ধুমধাম হলো। বউটা ভালই পেল মুকুল। সংসারটা সুখে সুখে শুরু হয়েছিল। কিন্তু কিছু দিন যাবার পর খেয়াল হলো, তাদের বাচ্চা তো আসছে না। বছর, দেড় বছর, দু’বছর,  না বাচ্চা  আসে না কুলসুমের। ঘটককে দিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কুলসুমের এক ফুফু বন্ধ্যা ছিল। তাহলে কি কুলসুমও তাই ? বাপ-মা সবাই সন্দেহ শুরু করে, কুলসুম কি বন্ধ্যা ? মুকুল তাই একদিন একজন গাইনি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হলো। সব দেখেশুনে ডাক্তার বলল, না কোন সমস্যা নাই। মুকুলেরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো, ডাক্তার জানাল সমস্যা নাই। আল্লাহ যখন দিবেন তখন হবে। অধৈর্য্যরে কিছু নাই। শুনে মুকুলের বুক আশার অক্সিজেনে ভরে উঠেছিল। তারপর বাপ-মাকে বোঝাতে পেরেছে। কিন্তু অর্ধশিক্ষিত মা-বাপকে কয়দিন বোঝাবে।

দিন আরও গেল। মা বললেন, মুকুল তুই আরেকটা বিয়ে কর। মুকুল রাজি হলো না। কুলসুমকে সে ভালবেসে ফেলেছে। কুলসুমও তাকে খুব। তাই চুপ করে থাকে মুকুল। কুলসুম তো কেঁদে-কেটে একসা। বোঝাল মুকুল, বুঝল না। সে বলেই ফেলল, তুমি বিয়ে করলে আমাকে আগে তালাক দিবা, তারপর বিয়ে করবা। না হলে আমি মরব। এমন কথার পর আর কথা ফোটে না মুকুলের। মা-বাবা দ্বিতীয় বিয়ের জন্য চাপ বজায় রাখল। মুকুল বোঝাল, বিয়ে যদি করতেই হয় তবে দুই বউই বাসায় থাকবে। তাতেও কুলসুম রাজি নয়, সে থাকবে না। থাকবে না, থাকল না। একদিন সকালে উঠে বাপের বাড়ি চলে গেল। মাথায় বাজ পড়ল মুকুলের। বাপ-মাকে বোঝাল মুকুল। কুলসুম চলে যাওয়ায় তারা বরং খুশিই হলো। মুকুল দ্বিতীয় বিয়ে করবে না বলে গোঁ ধরে রইল। কুলসুমকে ফোন করে বোঝাল যে, সে দ্বিতীয় বিয়ে করবে না। কুলসুম বিশ্বাস করে না। কেননা মুকুল বাবা-মার কথা ফেলতে পারে না, এটা কুলসুম বেশ টের পায়।  ফলনহীন দিন, শুকনো শুকনো বাতাস মুকুলের শরীর মনে জড়িয়ে গেল।

একদিন সকাল সকাল কুলসুমের বাড়ি গিয়ে হাজির। কুলসুমের বাপ-মা অনেক করে বুঝিয়েও কুলসুমকে রাজি করাতে পারল না। এদিকে ভেতরে ভেতরে মুকুলের পিতামাতা তার খালাতো বোন দিলরুবার সাথে বিয়ের আনজাম করে ফেলেছে। কুলসুমের বাড়িতে থাকা অবস্থায় মুকুল ফোন পেল পিতার―তুই চলে আয়, মেয়ে ঠিক হয়ে আছে। কুলসুমের সামনে বসে থেকেই কথাটা মোবাইলে শুনল মুকুল। মাথায় আবারও বাজ পড়ল। তাহলে কুলসুমকে আর কোন যুক্তি দিয়ে সে বোঝাবে ? তারপরও শেষ বাক্যটি ছুড়ল মুকুল, মানুষের কি দুটো বউ হয় না ? তারা কি এক সাথে সংসার করে না  ? হঠাৎ কথার অন্য সুর শুনে কুলসুম চোখ বড় বড় করে তাকাল মুকুলের দিকে। সে চাহনিতে মুকুলের দেহ মন পুড়ে গেল। কুলসুম শেষ বাক্যে জানিয়ে দিল, আমি মরে গেলে, তারপর তুমি আরেকটা বিয়ে করো। সতিনের ঘর আমি করব না। আর যে কারণ তুমি দেখাচ্ছ, সেটা কোন কারণ না। আল্লাহ বাচ্চা দিলে হবে। না দিলে নাই। অবশেষে ভালবাসার কুলসুমকে রেখে, মুকুল মাষ্টার প্রথমে বিরান জমির আল ধরে, তারপর নৌকা করে ফিরে এল। কুলসুমকে রেখে ফিরে আসার পর থেকে তার আরেক দশা।

কদিন যেতে না যেতেই নতুন বউ দিলরুবা এসে গেল। দিলরুবার সাথে বিয়ের খবর কুলসুমের কানেও পৌঁছে গেল। তার এক সপ্তাহ পর এল তালাকের কাগজ। কুলসুম মুকুলকে তালাক দিয়েছে। এমন ঘটনায় বাড়ির সবাই খুশি―মা-বাবা, ভাই-বোন। নতুন বউ দিলরুবা খুশিতে যেন আটখানা। কিন্তু এই কাগজ হলো বুকের জ্বালা। মুকুল মাস্টারের দেহমনে এই কাগজ হলো তুষের আগুন। মা বলল, বাচ্চা আসুক দেখবি সব দুঃখ বাচ্চার মুখের হাসিতে ধুঁয়ে যাবে। কিন্তু মা বুঝল না, নতুন বাচ্চা হাসির চেয়ে কাঁদে বেশি। দিনে দিনে দিন গেল। মুকুল মাষ্টার স্বাভাবিক জীবনযাপনের কাছে যেতে চাইল। দুঃখের বাতাসে উজান হয়ে পড়ল সময়। ছোট ভাই মকবুল বিয়ে করেছে উঠতি যৌবনে। তার বউ বছর বছর বিয়ান দিয়ে চলেছে। সে মাঠে লাঙ্গল দিয়ে চাষ করে। ভালই পারে। তাই ঝিম মেরে বসে না থেকে, মকবুলের সাথে লাঙ্গল নিয়ে একদিন বের হলো মুকুল। মানুষ অনেক কথা বলল, মুকুলের গায়ে সে সব কথা বাঁধল না। সে ছোট ভাই মকবুলের মতো শক্ত হাতে লাঙ্গলের মুঠা ধরে মাটি ফাঁড়তে না পারলেও মোটামুটি পেরে উঠছিল। বাড়ির কৃষাণ ছোটবেলার বন্ধু মতি ট্রাকটর দিয়ে পাশের জমিতে চাষ দিচ্ছিল। সে বলল, আসেন ভাই আপনাকে ট্রাক্টর দিয়া চাষ করা শিখায়া দিই। মুকুল মতির কথামতো ট্রাক্টরে জমি চাষ শিখতে লাগল। কিন্তু লাঙ্গলে চাষ দেবার মত সুখ আর আনন্দ যেন ট্রাক্টরে নাই। মাটির কাছাকাছি হওয়া, ফসলের ঘ্রাণ, মাটির গন্ধ, জীবনের স্বাদ, যেন এই লাঙ্গলের চাষে। ঐতিহ্যের কাছে যেন সব সুখ। মুকুল তার গুমোট মনটাকে একটু বাতাস দিতে জমিতে কাজ করা শুরু করল। ধীরে ধীরে ফিরতে লাগল জীবনের কাছে। ভুলেই যাচ্ছিল যে, সে একজন স্কুল মাষ্টার। তার কাছে মনে হচ্ছিল সে যেন একজন আদিম কৃষক। ফসল ফলানোর যে স্বাদ, তা কোন কিছুতে যেন নাই। মাথায় গামছা বেঁধে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে, জমির সাথে আরও একটা সংসার গড়ে ফেলে মুকুল। তারপর ধান লাগায়, ধান ওঠে, নতুন ধানের ঘ্রাণে শরীর মন জুড়িয়ে যায়। এরাই যেন তার সন্তান। এটা কী তাহলে তার কুলসুমকে ভুলে থাকার প্রয়োজনে! জানে না মুকুল। তবুও তার ভালোলাগার দিন আর ফিরতে চায় না। কুলসুমকে দেখতে বড় ইচ্ছা করে। কিন্তু নতুন বউ দিলরুবা ? তার সামনে কুলসুমের কোন কথাই বলা মুশকিল। তাই মনের কথা মনের মধ্যে গুমরে মরে। মতির সাথেই মনের দু’চারটা কথা বলে মুকুল। মতি গান গায়, দুঃখের গান। ট্রাক্টর এর একঘেয়ে ঘরঘর-ঘ্যানঘ্যান শব্দে তার গান ঠিকমতো বাতাসে আসে না। তাই আইলের ধারে ছোট তাল গাছটার কাছে বসে মতির চাষ দেখে মুকুল। মতি কিছুক্ষণ পর ট্রাক্টর বন্ধ করে মুকুলের কাছে আসে, কি মাষ্টার ভাই, মনটাকে ভাল করতে পারো না ? মুখটা কেমন ম্যাঘের মুতন কইরা রাখ। মুকুল শুকনো হাসি হেসে, মতির দিকে তাকায়। মতি বলে, তুমি কি কুলসুম ভাবিকে ভুইলতে পাইরছ না।―তুই ঠিকই বুঝেছিস মতি। আমার একটা উপকার করতে পারবি ? মুকুলের কথা শুনে মতি হা-হা করে ফাঁকা মাঠে হাসে। হাসিটা মুকুলের ফাঁকা বুকে সাঁই সাঁই বাতাসের মতো ঢুকে পড়ে। বলে, কুলসুমের কোন খোঁজ এনে দিতে পারিস ? মতি মাজায় গামছা বেঁধে দাঁড়িয়ে যায়, শুদু বুইলাই দেখ না ?―তুই গিয়ে শুধু জিজ্ঞাসা করিস, সে ভাল আছে কিনা। মতি আবার হাসে―এই কথা! আজই বিকালে যাব, পথ তো বেশি দুরের লয়। যাওয়া আসা এক ঘন্টা―ঠিক আছে যা, কাকপক্ষীও যেন জানতে না পারে। মতি হেসে কথায় সাঁয় দেয়, আবার ট্রাক্টরে স্টার্ট দেয়। সেই একঘেয়ে ঘরঘর-ঘ্যানঘ্যান শব্দ ওঠে। মুকুল চলে আসে বাড়িতে।

বিকেলের শেষে বাইরের বারান্দায় বসে সিগারেট ধরায় মুকুল। ভিতর বাড়িতে খেলে বাপ মার সামনে হয়ে যায়, আর দিলরুবা তো সহ্যই করে না। বাইরের বারান্দায় বসে সিগারেটে টান দেয় মুকুল। কুলসুমকে তালাক দেওয়ার পর সিগারেট ধরেছে আর ছাড়তে পারছে না। বিকেলটা ঘোলাটে হয়ে এল। সন্ধ্যার অন্ধকার এবাড়ি-ওবাড়ির আড়াল থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে শূন্যতা ঢাকতে। খোলানে ভেজা খড়ে আগুন দিয়েছে মকবুল। ধোঁয়া উঠছে বাতাসে। থোকা থোকা অন্ধকার এখানে ওখানে দানা বাঁধছে। মতির কোন নাম গন্ধ নাই। মুকুলের মধ্যে যেমন বিষণ্নতা, তেমন উত্তেজনা জমাট বাঁধছে। সন্ধ্যা যখন ভরাট পোয়াতি, তখন ছায়ামূর্তি নিয়ে মতি খোলানে এসে দাঁড়াল। অন্ধকারে সিগারেটের  আগুনে ইশারা করতেই মতি দেখল মুকুলকে। ধীরে ধীরে বৈঠকখানায় উঠে বসে মতি।

মুকুল আবছা অন্ধকারে মতির বিষণ্ন মুখটা দেখতে পায়―কিরে মতি তোর মনের মতিগতি তো গুমোট দেখায় ঘটনা কি ? মতি আবছা সন্ধ্যার অন্ধকারে বারান্দায় মুকুলের পাশে বসে হাফ ছাড়ে। তারপর বলে, মুকুল ভাই তুমি কুলসুম ভাবিকে ভালবাসলেও কুলসুম ভাবি তুমাকে ভালবাসে না। মুকুল মতির কথায় থমকে তাকায়, কেন রে কি হয়েছে ? মতি দীর্ঘশ^াস ছেড়ে বলে, কুলসুম ভাবি পাশের গায়ের মজনু ভাইকে বিহা করেছে। মুকুল  থ মেরে মতির দিকে তাকিয়ে থাকে, মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয় না। মতিই বলে, বেশকদিন আগে বিহা হয়েছে। মজনু ভায়ের সাথে দেখা হইয়্যা ছিল সে-ই বুলল। কথা বলতে গিয়ে ঠোঁট কেঁপে ওঠে মুকুলের। আমি এতদিনেও জানলাম না! একটু থেমে বলে, ঠিকই তো করেছে, আমি যদি বিয়ে করতে পারি, তো কুলসুম করতে পারবে না কেন ? ঠিকই তো করেছে। এ কথার পর দুজনই বারান্দার আবছা অন্ধকারে বসে থাকে।

উঠানে এক ফালি চাঁদের আবছা জোছনা পড়েছে, সেই জোছনার আভায় অন্ধকার বৈঠক ঘরে বসে থাকা মতি আর মুকুলের মুখের বিষণ্নতা আরও তীব্র দেখায়। মুকুলের বুকটা আবার পোড়ে। সমস্যা শুধু সন্তান নয়। সমস্যা ভালোবাসাও। কিছুই ভাবতে পারে না মুকুল। শুধু বিড়বিড় করে, কুলসুমের মুখ, প্রথম বউ, তালাক! হায়-হায় করে ওঠে মুকুল।

নিজেকে ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শুরু করতে চেষ্টা করে মুকুল। একটা হাসি-খুশি বাচ্চার স্বপ্ন দেখে দিলরুবার কোলে। কিন্তু দিলরুবার মুখ ভাসে না, দেখে কুলসুমের কোলে বাচ্চা, কাঁদে হাসে। দিলরুবার মুখের উপর কুলসুমের মুখ লেগে থাকে। দিন যায়, দিলরুবার পেটেও বাচ্চা আসে না। বাবা-মা আবারও মুকুলের মুখের দিকে তাকায়। মুকুল বোঝানোর চেষ্টা করে, আসবে আল্লাহ যখন দেবেন তখন আসবে। কিন্তু দিনে দিনে দুশ্চিন্তা দানা বাঁধে মুকুলের মনে। দিলরুবারও কি বাচ্চা কাচ্চা হবে না ? তাহলে দোষটা কার ? দিলরুবার প্রতি তার কি ভালোবাসার ঘাটতি আছে! দুর্ভাবনা তাড়া করে। স্কুল বন্ধ থাকলেই মকবুলের সাথে, মতির সাথে, মাঠে কাজ করে মুকুল। জমিন-ভরা ফসল দেখে বুক ভরে যায়। আবার লাঙ্গল চলে, নিড়ানি দেয়। সেচ দেয়। মন ভাল রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু হায়, ফসলের কোন খবর সে পায় না। পিতামাতা এবার মুকুলকে সন্দেহের চোখে দেখে। মুকুল ভাবে দিলরুবার কোন দোষ নেই। বুঝি আমি সেই অক্ষম কৃষক। বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠে।

আবারও নিজের মধ্যে আত্মবিশ^াস জাগিয়ে তোলে মুকুল, না আমি ঠিক আছি। সময় হলে ফুল ফুটবে। আর ফুলের মধ্যে একটা বাচ্চার হাসি ফুটে উঠবে। শীতের শেষমেষ আকাশটা ধোঁয়াশা। টুপটাপ বৃষ্টিও পড়ছিল। গায়ে চাদর জড়িয়ে মুকুল মাঠের দিকে হাঁটতে যায়। মাঠে ফসল দেখে তার চোখেমুখে আনন্দের আভা ছড়িয়ে পড়ে। সেই আভায় মন ভাল করে ফিরে আসে মুকুল। আজ হাটবার। তাই হাটে যাবার দরকার ছিল। মটরডাঙ্গার হাটটা বাড়ির খুব কাছেই। তাই তাড়াহুড়ো নাই। সকাল গড়িয়ে দুপুর ধরতেই মুকুল বাড়িতে এসে পড়ে। দুপুরটা সকালের মতোই কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আছে। দিলরুবার মুখটায় হাসি হাসি রঙ। মুকুলের গুমোট মুখে আলোর রেখা ফুটবে কবে, সেই অপেক্ষায় আছে সে। কিন্তু হাসি আসে না, আসলেও মুহূর্তে নিভে যায়। এদিক দিয়ে দিলরুবাকে খুব সৎ মনে হয় মুকুলের। তাই, দুপুরে খাবার খেতে খেতে চেষ্টা  করে দিলরুবার মুখে হাসি ফোটানোর। এবার জমিতে ভাল ফলন হয়েছেরে দিলরুবা, দেখিস একদিন আমাদের জমিতেও ফসল ফলবে। দিলরুবা মুখ ঢাকে। বুঝতে পারে মুকুল কি বুঝাতে চাচ্ছে। খাওয়া ছেড়ে উঠতেই মতি ডেকে উঠে।

মুকুল বৈঠকখানায় গিয়ে দেখে মতি মন খারাপ করে বসে আছে।―কিরে মতি হাটে যাসনি ? মতি কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মুকুলের দিকে। যেন মতির চোখে সে এতিম, অভাগা, এক অপুরুষ। কিরে কি হয়েছে ? মতির চোখ ফেটে পানি আসে। মতি চোখ মুছে বলে, কুলসুম ভাবির পেটে বাচ্চা আসছে। ধক করে একটা ধাক্কা মুকুলের বুকটা চিরে ফেলে। চোখ ফেটে যেতে চায়। তবুও সে মতির মুখ চেপে ধরে বলে, আর কারও কাছে বলিস না মতি, কারও কাছে না। মতি ঘাড় কাত করে সম্মতি জানায়। মুকুল লুঙ্গি আর চাদর গায়ে দিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। পেছনে মতি জিজ্ঞাসা করে, কতি যাও মুকুল ভাই ? মুকুল বলে হাটে যাই। লুঙ্গি-চাদর গায়ে ? মুকুল পেছন ফিরে রূঢ় চোখে তাকায়, বলে তুই আমার সাথে আসিস না মতি। মতি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর অন্য দিকে হাঁটা ধরে।

সেই দুপুর থেকে মুকুল খইমুদ্দির দোকানে বসে আছে, এখন সন্ধ্যা। হাট ভেঙ্গে গেছে, সারাদিনের টুপটাপ বৃষ্টির সমাপ্তি ঘটেনি। আজ আর ঘটবে না বলে মনে হয় তার। আরও এক কাপ চা দিতে বলে খইমুদ্দিকে। গায়ে খুব জ¦র জ¦র ঠেকে। নিজেকে তার কাছে কোন  মানুষ মনে হয় না। অপুরুষ মনে হয়। নারী, পুরুষ, হিজড়া কোনটার মধ্যে সে পড়ে না। তাহলে সে কী, কে এই মুকুল ? মুকুলের ভাবনার মধ্যে গণ্ডগোল বেঁধে যায়। নিজেকে বোকা বোকা, অসহায়, নামহীন, গোত্রহীন, মনে হয়। তাহলে সে কি পালিয়ে যাবে ? এক সময় অসহায়ভাবে ভাবনাহীন, স্তব্ধ, পাথর হয়ে বসে থাকে। এখন সে কী করবে, কী তার করণীয়, পালিয়ে সে কোথায় যাবে ? চারদিকে সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠেছে।

খইমুদ্দি দোকান গুটাচ্ছে। মুকুলকে যেতে হবে। কিন্তু সে কোথায় যাবে! কিছুক্ষণ এভাবেই বসে থাকল মুকুল।  হঠাৎ করে দেখল চোখের সামনে মতির হাসিমুখ। মুকুলের মনে হলো এটা মতির আসল হাসি মুখ না। ভুল দেখছে সে। যখন বুঝল সত্যি মুর্তিমান মতি হাসছে, তখন মুকুলের শরীরের মধ্যে অসুরের শক্তি ভর করে। জোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল মতির মুখে। থাপ্পড় খেয়ে টাল সামলে মতি দাঁড়িয়ে যায়। 

হাসছিস কেন রে হারামজাদা ? আমার কষ্ট দেখে তোর মজা লাগে তাই না ?

মতি থাপ্পর খেয়ে অল্প সময়ের জন্য থ মেরে গেলেও মুখে হাসি ফিরে আসে। মতি এবার মুকুলকে হাত ধরে টেনে দোকানের পেছনে আলো-আধাঁরির সন্ধ্যায় নিয়ে যায়। মুকুল হ্যাঁচকা টান মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। বৃষ্টির দুই-এক ফোটা এখনও পড়ছে। আলোর ছটায় মুকুল আবার দেখল, মতির মুখে মৃদু হাসি―দিলরুবা ভাবি বমি করছে ভাইজান। খবর ভাল।

কথা শুনে মুকুলের চেতনা শিউরে উঠে। অবিশ^াস্য চোখে মতির দিকে তাকিয়ে বলে, কেন পেট কি খারাপ হয়েছে ?

উত্তরে মতি না-সূচক মাথা ঝাঁকায়।

হঠাৎ কুলসুমের মুখ মনে পড়ে যায়। মুকুল রেগে যায়, মতির গালে আরেকটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। ঠিক তখন হু হু বাতাস এসে মুকুলের চোখেমুখে লাগে।

মুকুল স্পষ্ট বুঝতে পারে, উত্তরের মাঠ থেকে উঠে আসা বাতাসে শীষ ফোটার ঘ্রাণ লেগে আছে।

 লেখক : গল্পকার

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares