আনোয়ারা সৈয়দ হক

ছেচল্লিশের দাঙ্গা

ছেচল্লিশের দাঙ্গার ভেতর হুমড়ি খেতে খেতে

বড় হয়ে উঠলাম

মানুষের কিছু নমুনা চেনা গেল।

ব্রাহ্মণ কায়স্থ নমশুদ্র কাহাদের বলে

আর ডোম জোলা মুসলিম কারা

কোথায় পা দিলে গোবর ভোজন করতে হয়

শুদ্ধতার সিঁড়িতে আপ্রাণ রিলে-রেস,

কপালের রঙে কারা এয়োতি

কারা বিধবা ঐ যাদের সিঁথিতে সমুদ্র খেলা করে

শুধু জল আর জল

খুব ভালো সবক পেলাম বটে আটে বাটে ঘাটে

যা দিয়ে পরবর্তী পিএইচডি খেতাব হলো।

হিন্দু আর মুসলমান, জাত আর বেজাত,

নমশুদ্র ও জোলা, ছুৎ ও অচ্ছ্যুৎ,

ধর্ম হিন্দু ও ধর্ম মুসলমান,

নেড়ে আর মালাউন

দূর দূর দূর!

জীবন মাত্রই একটাই

তাকেই করে গেলাম দলাই মলাই,

মানুষের কাছে তো যাওয়া আর হলো না।

এই ফাঁকে লালন একেবারে বোকার মতন

গেয়ে গেল তাঁর গান,

এমন মানব জীবন আর কি হবে-

২০১৫


শিহাব সরকার

পাহাড়ে, বৈসাবিতে

ঐ যে দ্যাখো, মেয়েরা মাতে সাঙ্গুর পাড়ে

ওপারে ছেলেরা সব সারি সারি

কলাপাতায় পাহাড়চূড়ার পত্রালি, লতা-গুল্ম-ফুল,

তরুণীদের নববর্ষের অর্ঘ্য

স্নানশেষে চন্দনমাখা বাহারে

অঞ্জলিতে সুধা চেখেছে গিয়ে পাড়ার সব বাড়ি বাড়ি।

করোনা মহামারি নিয়ে তুমুল তর্ক

বৈসাবির ভোরে দৈত্য-দানোরা ভুলেও

আসবে না সাঙ্গুর কিনারে,

এরকম ভোরে পাখির কলরোল ঝাউ আর চিনারে

দৈব ধূলিকণা আজ খোপার চুলেও।

নদীতে, ঝোরার জলে কলাপাতা ভেসে যায়

যেও না ভেসে নারী গুপ্তস্রোতের টানে

তোমরা সকলে ফুলবালা

জেগেছে তরুণেরা কাকভোরে বৈসাবি-গানে

গূঢ় গূঢ় শ্লোকে করোনারা ফালা ফালা।

উঠানে নৃত্য, ভুল সৈকতে হায় হায়

থাকো সাবধানে, করোনারা হানাদার

মৌতাতে না ভেসে থাকো গভীরের নিরালায়।

হাসানাত লোকমান

রেশমি রুমাল

ভালোবাসার মায়াবী ঘূর্ণিতে চূর্ণ হয়েছে তাবৎ কষ্টের দিন,

সমূহ সর্বনাশের আগেই তুমি এলে বলে

দুলে উঠলো পৃথিবী আমার

পুষ্প সৌরভে শোভিত হলো আমার আঙিনা, বিশ্বসংসার!

আমার আনন্দ আজ উপচানো দুধের মতো…

এই দেখো, অন্তর অঞ্জলি নিয়ে তোমার ভালোবাসার সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়েছি ভিক্ষুক হয়ে,

মরুর মাটির মতো পিপাসায় মরেছি

কতদিন ধরে

পিপাসা মেটাও…

বুকের দুর্ভিক্ষ মুছে দাও রেশমি রুমালে।

এইতো আমি-

আমার আমিত্ব ভুলে

সবকিছু নিয়ে তোমার কাছে…তুমি নাও,

যেভাবে যেমন চাও সব নাও,

এসো ভালোবাসার জলে সাঁতার কাটি,শুদ্ধ হই

মুছে ফেলি সব অপ্রয়োজন, এসো বাকিটা জীবন

কেবল ভালোবাসার ঘরে বাস করি।

সৌভিক রেজা

রক্তের ভাষা-

ঘুমের মধ্যেই ডাকাডাকি শুনে উঠে বসি; আম্মা একটু ধমক দিয়ে

বললেন, তোমার বন্ধুরা রাস্তায় মার খাচ্ছে আর তুমি বাবা এখনও

ঘুমোচ্ছো ? আরও কী যেসব বলেন ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। খানিকটা

শরমই পেলাম, বন্ধুরাই তো আমার প্রকৃত স্বজন। তাঁরা যখন পুলিশের

লাঠিতে-লাঠিতে নীল হতে থাকেন তখন আর আমার সুস্থ থাকা! ছাদে

দুপদুপ শব্দ। আজকাল আমাদের পুরনো ছাদেও দু-চারটে ঘুঘু

কাঠবেড়ালি, খরগোশের ছানা, গুইসাপ

হাঁটাহাঁটি করে বেড়ায়। একান্ত চুপিসারে গাছ থেকে ঝরে পড়ে পাতা; নির্লিপ্ত

দুপুরে বিছানায় বসে ভেবে ঠিক করি : বিকেলে ঠিকই

মিছিলে যাবো

তমিজ উদ্দীন লোদী

শুধু লকলকে আঙ্গুল থাকবে না

যে আঙ্গুল তুমি তুলেছো আজ তার দিকে

শাসাচ্ছো নির্দয়ভাবে

সে আঙ্গুলই একদিন ফিরে যাবে তোমার দিকে

এখন যেমন কড়িকাঠ, কার্ণিশ আর দেয়ালগুলো

এখন যেমন জানালা, বৃক্ষ ও দূরন্ত আকাশ

দেখছে তোমার লকলকে আঙ্গুল

সেদিনও দেখবে

এই আকাশ, এই কড়িকাঠ, এই কার্ণিশ

বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে যে দীর্ঘশ্বাস

যে চাপাকান্না, যে অশ্রুজল

খামচেধরা হৃদপিণ্ড, তার ধুকপুক কিংবা লাভডব

একদিন ঠিকঠিক তাই বুমেরাং হবে

সেদিনও থাকবে এই বৃক্ষ, এই আকাশ হয়তোবা দেয়ালগুলো

শুধু তোমার ওই লকলকে আঙ্গুল থাকবে না।

শিহাব শাহরিয়ার

চোখে ঝরে ডুমুরপুর

আমাকে চিনতে পারলি না বেলাল ?

আমি তোর খেলার সঙ্গী দুরন্ত দিপু

একদিন কলিম কাকুর কলতলায়

পড়ে গেলে―তুই বল্লি, এ কী করলি বাপু ?

চিনবি কী করে ? তিরিশ বছর আগে

ঝিকিঝিকি ট্রেনে চলে গেছি কোনো এক মাঘে

তোর মনে নেই ?

ডুমুরপুর স্কুলে―ক্লাসে আমি ছিলাম এক

তুই ছিলি দুই―দিনগুলো কেটেছে হই হই হেই!

দুপুরবেলা ফর্সা হেলেনা ফুফু

আমাদের ডেকে বলত

এই চিঠিটা শরিফকে দিও

ফিরে এসে আমার কাছ থেকে

আমের ভর্তা খেয়ে যেও

ভুলে গেছিস―বেলাল ?

সাপের জিহ্বার মতো সাঁই সাঁই করে ডুমুরপুরে

ঢুকে ছিল চুয়াত্তরের বন্যার ভয়াবহ জল ?

ডুবে গিয়েছিল আঁতুরঘর, উঠোন, কলতলার কল ?

সেই বার খাবার নেই দেখা দিল আকাল

কচুডগা খেলো কেউ কেউ, কেউ কেউ গেল মরে,

আমাদের শৈশব থেকে হারিয়ে গেল একটি সকাল

বেলাল―মজনুকে খুব মনে পড়ে!

তুই, মজনু আর আমি মিলে

মকবুলের পালা শুনেছি সারারাত

বাড়ি ফিরে মা’র কাছে হয়েছি কুপোকাৎ

এক জ্যোৎস্না রাতে জমিলার চিৎকারে

উঠল জেগে ডুমুরপুর ?

কী হলো কী হলো ? কী আর হবে ?

ধরা পড়ে গেল জামিল জমিলার ভ্রুণ চোর

বেলাল তোর মনে নেই ?

কতদিন একসঙ্গে হেঁটেছি

বকুলতলা, রেল লাইন

ছোট ছোট গলি

সুখ সুখ মফস্সল, কিশোরী আঁচল

অথচ মায়ের ছায়ারা বুকের ভেতর

বাড়িয়েছে কেবল দুঃখজল

কিন্তু দ্যাখ, কত সহজেই

ছোঁয়া যেত ব্রহ্মপুত্রের  অথৈ জল

বাবা, এখন বয়স যার নব্বই বছর

আমায় বললেন, ডুমুরপুরের গল্প শেষ কর ?

বল তো বেলাল ?

এখানে আর নেই আমাদের ঘর

চলে গেছে বাম দিকের সব সূত্রধর

ডান দিকে ছিল হেলাল

মরে গেছে মৃগি নদী―কুমোর পাড়া

লাউয়ের-ডাটা, সজনেফুল, ধনেপাতা

মরে গেছে কুপিবাতি, গোল্লাছুট, নলখাগড়া

এই ধূলোপথে হাঁটতেন―মাথায় দিয়ে ছাতা

ঐখানে ছিল আম গাছ―বৈশাখে আসত বৌল

তাহলে বল, আমি কী করে লিখব গল্প―স্বপ্নফুল

বাবার এখন জীবন সায়াহ্ন ?

রাতভর দুই হাতে খোঁজেন ডুমুরপুরের স্মৃতিচিহ্ন

কান নেই, তাঁর চোখের ডুমুরপুর

হয়ে গেছে এখন অচিনপুর

বল বেলাল, চাঁদ-খচিত জ্যোৎস্নায়

ফুটবে কী আর সেই স্বপ্নপুর ?

মেহেদী ইকবাল

ছাই

ব্যাটারিচালিত ঘড়ি

থেমে গেছে হঠাৎ

তাই বলে থামবে না চলমান তারিখ!

আমি দাঁড়িয়েছি একটা সেতুর উপর

নীচে ঘাসেরা অপেক্ষায় আছে জোয়ারের

কয়েকটি হাঁস যাচ্ছে হেঁটে ডোবার মতো আটকে থাকা জলে।

ভাবছি করুণ মুহূর্তগুলোর কথা

অপহৃত আনন্দগুলো আর হাসি

অন্যায় অপদস্থ হওয়া কত না বেদনার!

সবুজ হাতে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে ধানগাছগুলো

একটা অচেনা পাখি শিস্ দিয়ে ডাকছে আমাকে, হ্যালো!

আমার ছেঁড়া ঘুমগুলো দেখতে পাচ্ছি

অদূরে দেখা যাচ্ছে ধোঁয়া

পুড়ছে তবে জঞ্জালগুলো!

আমি তবে অপেক্ষায় থাকি

খানিক বাদেই জানি

আসবে উড়ে ছাই!

রেজা শামীম

নগ্নতাটুকুই মৌলিক

নগ্নতাটুকুই মৌলিক আমার নগ্নতাটুকুই শুধু মৌলিক, বাকিটা মুখোশ

রোদচশমায় ঢেকে রাখি চোখের সমুদয় ভাষা

ঢেকে রাখি রোদের দহন, খলবলিয়ে ওঠা দুঃখের জল

নির্ঘুম রাতের গল্পগুলো থেকে যায় অদৃশ্য অপাঠ।

পোশাক আর কতটা লজ্জা আড়ালের

তার চেয়েও বেশি বিলাস ও বৈভবের।

আমাকে কেউ চেনে না

অর্বাচীন আমি সবার কাছেই ভুল মানুষ।

একাকিত্বের মুহূর্তগুলোতেই আমি কেবল স্বকীয়

নীরবতাই আমার মাতৃভাষা

আমার তাই ভুলভাল হয়ে যায় বৈশ্বিক ভাষায়।

তোমাদের মতো করে হাঁটতে শিখিনি ঠিকঠাক

ব্যাকরণ মেনে হাসতেও পারি না তোমাদের মতো করে।

আমি কারও প্রিয় হয়ে উঠিনি

ঘরে ও মঞ্চে প্রতিদিনই আমার শুধু ভুল অভিনয়!

দিলরুবা শাহাদৎ

অপেক্ষা

নিস্তব্ধ রাত্রির বুকে যদি ভালোবাসা নদী হয়ে যায়

জ্যোৎস্নার প্লাবন যদি সমুদ্রে হারায়,

বৃক্ষের পাতায় যদি সূর্য আনে সভ্যতার মায়াবী প্রহর

বাতাসের বুকে যদি বিষাদের পরিবর্তে আনন্দের ঝড়

তাহলেই শতাব্দীর তাবৎ যন্ত্রণা মুছে যেত

প্রতিটি নির্ঘুম রাত্রি নিদ্রা খুঁজে পেত।

সেদিন রোদের প্রেমে প্রকৃতি স্তব্ধতা ভেঙে আনন্দে উচ্ছল

উত্তাল ফাগুন হাওয়া মুছে দিত দুচোখের জল।

সেদিন পাখিরা গেয়ে উঠো শ্রেষ্ঠতম আনন্দ-সংগীত

সেদিন রোদেলা ভোরে আমার আহতস্বপ্ন নিশ্চয়ই সংবিৎ

ফিরে পেয়ে পৃথিবীকে শোনাবে গভীর ভালোবাসার আহ্বান

আমাদের আদ্যোপান্ত মায়াবী প্রহর ছুঁয়ে বেজে উঠবে গান।

অপেক্ষায় আছি কবে পদ্মা-মেঘনার বুকে বয়ে যাবে শস্যভরা নাও

দুঃখ হবে চিরতরে আনন্দে উধাও।

ফেরদৌস নাহার

আগুনমুখার জন্ম

নদীরা আমার সহোদরা, জন্ম থেকে জানে সব কথা

পূর্ণিমা এলে পরে এই যে আমি উন্মাদ হয়ে যাই

সে-কথা গোপনে রেখেছে তারা, ভালোবাসে তাই

তবু চাই, সকলেই জানুক সেই উন্মাদ উদ্যাপন

অস্বীকৃত নৃ-গোষ্ঠী অকুণ্ঠ উচ্চারণে বলুক সেকথা  

একঘেয়ে চরাচরে জন্মেছে যে উদগ্রীব ভিন্নস্রোত-বাঁক

মোহনায় মোহনায় তারই প্রতিধ্বনি ঘুরে বেড়াক 

ছুটে আসে আগুনের-হল্কা রহস্য বিদিত চিৎকার!

যদিও এসব ভুলে যাই, তবু মনে রাখার আছে আগ্রহ

ভিন উপগ্রহে উড়ছে পাড়ি দেয়া দিন, কিছুটা রঙিন

আবার প্রাচ্যকলার ভোর তাড়া দেওয়, আছিস নাকি!

সব মিলে একাকার আরাধ্য জীবন। কখনও অন্যমনে

ভুলেছি নদীর আহ্লাদ, গলা ধরা সহস্র আবদার

শীতের প্রবল ছোবল দিয়ে গেছে যুক্তিহীন অম্লান স্বাদ

জাদুকর, কোথায় গেলে তুমি! পারো নাকি এইসব

জমে থাকা বরফস্তূপ থেকে আগুনমুখার জন্ম দিতে!

সৈকত হাবিব

বসন্ত দিনে

বসন্ত খেলব আজ

        তোমার বসন্ত দিনে

ফুরফুরে ঘাসে হু হু হুররে

বসন্ত লাগাব এই

                শীতউষ্ণ দিনে

করো শরীর কবোষ্ণনীল

                       লীলাময়ী

খোলো হাওয়ায় আপেলবাগান

মৃত্তিকাসবুজে বিছানা পেতে

   করাবো তোমাকে স্নান

                          বীর্যঝরনাজলে

আহা, এ বসন্ত দিনে…

আশরাফ হাসান

মানুষের মিছিলে

আমি সাধারণের মধ্যবিত্ত-বোধ তুলে এনেছি

যাপিত দিনের ঠোঁটে

ভাঙা আর্তনাদের মতো নির্ঘুম রাত্রির ঔরসে।

বিবাগী পাখির কান্নার ওম

আমাকে আশৈশব শিখিয়েছে ব্যর্থদের পরিভাষা।

আমি স্বপ্নের চাষা শব্দের অজর প্রেমিকদের

ভাঙাচোরা শব্দের সাথে মিশে যেতে যেতে

কিছু অস্ফুট ফুলের ঘুম ভাঙাতে ভাঙাতে

সাধারণের ভেতর মিশে যাই সন্তর্পণে।

আমি সাধারণ মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস নিতে নিতে

অসাধারণ হয়ে উঠি…

মেঘের রাখাল কিংবা পরিযায়ী বলাকার

ঘামগন্ধ টেনে নিতে নিতে

দুহাতে উড়িয়ে দিই সম্প্রীতির প্রতীতি-পতাকা।

আমার পড়শী হয় শব্দের মজুর

ব্যর্থবর্ণে যারা বাঁধতে চায় হৃদয়সংসার

দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুনতে চায় ভালোবাসার মায়াজাল

আমি তাদের সহপাঠী একজন ।

বিশ্বাস করো এইসব স্বপ্নের রাজ্যপাট

গরিব নির্মাণশ্রমিক আজন্ম বাক-পরাধীন

বুভুক্ষু প্রেম-নাবিকদের ফেলে

আমি কোথাও যেতে পারব না

উঠতে পারব না কোনো অহমিকার স্বর্ণশিখরে।

নৈরাজ্যের সীমানা পেরোনো

কোনো আত্মমগ্ন মানবশিশুর মতো

আমি চিরকাল জেনেছি হতবঞ্চিতরাই আমার শ্রোতা;

কাগজের বুকে নিঃশব্দ কালির দহনের মতো

আমি আরও একবার মিশে যাই মানুষের মিছিলে।

শিউল মনজুর

গৃহপঙ্খি উড়ালপঙ্খি 

এক.

দূরের শহরে মৌনতার ভূগোলে একা একা ঘুরে ঘুরে দূরবীনে চোখ রেখে ছবি আঁকি স্বদেশের; সেই শহর সেই গ্রাম সেই গাঁয়ের মেঠোপথ সেই নদী সেই ঝর্না সেই পাহাড় সেই ফেব্রুয়ারি সেই মার্চ সেই ডিসেম্বর সেই ঈদ সেই পার্বণ সেই বোশেখ সেই শিশির স্বিগ্ধ ভোর সেই রিমঝিম বর্ষা―কেউ যেন অতল গভীর ক্যানভাসে, স্বপ্ন ও জাগরণে ছবি এঁকে যেতে থাকে প্রতিদিন।

দুই.

তারা বলে আমার নাকী হোম সিক। হতে পারে, জানি না; এ পথে ও পথে ঘুরে ফিরে দেখি এ দেশের বৃক্ষরা বছরে দীর্ঘ সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকে; শেকড়ে-বাকলে-শাখায়-প্রশাখায় ক্ষরা মৌসুমের বেদনাচিহ্ন লিখে রাখে। পাতা ও ফুল ক্ষণস্থায়ী ও গন্ধবিহীন। ভারী জ্যাকেট আর জাম্বুবুট লাগিয়ে অর্ধবছর বরফ সংবাদ পরিবেশন করে শোকাচ্ছন্ন আবহাওয়া অফিস।

তিন.

বরফ দিন শেষে এই শহরে যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধিপায়, বৃক্ষরা সবুজে আচ্ছাদিত হয় সাময়িক। কখনও কখনও বৃষ্টি শেষে পাতার পাঠশালা যদিও রঙ বদলায় কিন্তু গৃহপঙ্খি ও উড়ালপঙ্খিরা তারচেয়েও বেশি শৃঙ্খলহীন…, একই সুতোর গল্পে বন্দি হয় না এক জায়গায়, এক বৃত্তে। বাসা বদল ও দিক পরিবর্তন করে প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে অথবা প্রজননে; তারা দ্রুত সুখ খুঁজে নিতে জানি পারদর্শী। অন্যদিকে জনারণ্যে নিঃসঙ্গ ও মাতালের সংখ্যাই মনে হয় যেন বেশি।

চার.

এই শহরের একজন সাধারণ পর্যটক ছাড়া আমি আর কিছুই নই। ঋদ্ধ আলোয় জেনে গেছি বাংলার আকাশ অনেক বেশি উজ্জ্বল, বাংলার মাটি প্রতিদিন যুদ্ধে যুদ্ধে অতিপবিত্রময়। বিজয়ের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মানচিত্রময় আকাশ-বাতাস-মাটি ক্লান্তিহীন ছুঁয়ে আছে এই সাধারণ জীবন।

মনসুর হেলাল

স্বভাবের সুতো

আম্রকাননের নৈবেদ্য তলায়

তুমি বসেছিলে। পাশে ছিল পুতুলের সমান বয়সী

তোমার আত্মজা।

তোমার সংহত ছায়াকে নির্ভার করেছিল এক

তামাটে পুরুষ; কে সে ?

অথচ একাকী আমি নিঃসঙ্গ উজান ঠেলে

নিয়ে গেছি বৈতরণী শূন্য পারাপারে।

যেখানেই গেছ তুমি তোমার প্রতিটি পদচ্ছাপ

পৈশাচিক হাঙরের মতো এই বুকে বেধড়ক

আঁচড় ফেলেছে। কিন্তু কিছুই দেখনি তুমি

মৌনতার ধ্বনি তুলে বাতাসে উড়ালে শুধু

বিবর্ণ রুমাল।

স্বভাবের সুতো যদিও নৈঃশব্দ্যে আলগা করে

বুকের বাঁধন। ত্রস্তরিত আঙুলের মিহিন ছোঁয়ায়

ধসে পড়ে সংবর্তে দেহের দেয়াল।

হাতে হাত ঠোঁটে ঠোঁট পারম্পর্য এই দৈহিক কথন

উদ্গীরিত হয় তীব্র লাভার দংশনে।

বিম্বি^ত আর্শিতে তার প্রতিসরণের দায়

কেবল বিম্বিত করে দেহজ প্রকৃতি।

.

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares