ধারাবাহিক জীবনকথা : যে জীবন আমার ছিল : ইমদাদুল হক মিলন

চতুর্থ পর্ব

একদিন বিকেলের দিকে পিয়ার খাঁ নানার বাড়ির ওদিক থেকে ফিরছি। আমার তখন সাত আট বছর বয়স হবে। মোতালেব মামা আছেন সঙ্গে। গ্রামের নাম কুমারভোগ। পিয়ার খাঁ নানার বাড়িটা আমার মায়ের নানাবাড়ি। সম্ভবত বুজির চাচাতো ভাই হতেন পিয়ার খাঁ। ওই বাড়িতে বুজির কিছু অংশ ছিল। বাড়ি ভর্তি নানারকমের গাছপালা। আমগাছ আর ঝোপজঙ্গল অনেক। দুটো জীর্ণ ধরনের টিনের ঘর। পিয়ার খাঁ নানার ছেলেদের নাম আমজাদ, খোকা। আমরা তাদের মামা ডাকতাম। খুবই আদর করতেন আমাদের। আম পাকার দিনে হাজামবাড়ির রব হাফিজদ্দিদের নিয়ে, মজিদদা ছানাদা সেন্টুদাকে নিয়ে বুজি তার ভাগের আম পেড়ে আনতে যেতেন। পিয়ার খাঁ নানা অতি সজ্জন মানুষ। নানিও নরম নিরীহ ধরনের। সেই বাড়িতে গেলেই আমাদের গুড়মুড়ি খাওয়াতো। দক্ষিণমুখী বাড়িতে ঢোকার মুখে আম, জাম, কদম, আর তেঁতুলগাছ ছিল। সামনে ছোট একটা পুকুর। পুকুরের অর্ধেক জুড়ে কচুরি আর বাকি অর্ধেক পরিষ্কার। পানিটা এত স্বচ্ছ সেই পুকুরের, ভাল করে তাকালে তলার দুয়েকটা মাছও চোখে পড়ে।

বেশ মাছ পড়তো পুকুরটায়। ‘মাছÑপড়া’ ব্যাপারটা হচ্ছে, বর্ষায় এই অঞ্চল একদম ডুবে যায়। পুকুরগুলো ভেসে যায় বর্ষার জলে। বাড়িগুলো হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আশ্বিন মাসের শুরুতে পানি নামতে লাগলে গৃহস্থলোক গাছের ঝাপড়া ডালপালা কেটে পুকুরে ফেলে রাখে। সেই ডালপালা হচ্ছে মাছের আশ্রয়। ফলে তখনকার দিনের পুকুরগুলোতে প্রচুর মাছ পড়ত। শোলÑগজার, বোয়ালÑচিতল, নলাÑসরপুুঁটি, শিংÑমাগুর, কই, ফলি, টাকি, পাবদা, ট্যাংরা, পুুঁটি, বেলে, ভেদা, বহু রকমের মাছ। রুইÑ কাতলÑমৃগেলও পড়ত। রুই আর নলার মাঝামাঝি সাইজের মাছটার নাম ‘গরমা’। গরমাও পড়ত অনেক। কালবাউশ পড়ত।

পিয়ার খাঁ নানার পুকুরে শীত গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে একদিন মাছ ধরা হতো। বুজিও সেই মাছের ভাগ পেতেন। তখনকার দিনের মানুষের মধ্যে এত লোভ লালসা বা কাউকে ঠকানোর প্রবণতা ছিল না। যেদিন মাছ ধরা হবে তার আগের দিন বিকেলবেলা খোকা মামারা বুজিকে এসে জানিয়ে যেত। পরদিন ডুলা নিয়ে আমি আর আজাদ, সঙ্গে হয়তো হাজামবাড়ির শফি হাফিজদ্দি রবদের নিয়ে যেতাম। আমরা গিয়ে মাছ নিয়ে আসতাম।

জেলে ডেকে মাছ ধরা হতো। পুকুর ফাঁকা করে সব মাছ তুলে ফেলত জেলেরা। বাড়ির উঠান রাখা হতো মাছ। প্রথমে দুই ভাগ হতো সেই মাছ। একভাগ নিয়ে যেত জেলেরা। আরেকভাগ আবার হতো দুইভাগ। একভাগ পিয়ার খাঁ নানার। একভাগ আমার বুজির। বুজির ভাগের মাছ চার-পাঁচ ডুলায় আটত না। বড় মাছগুলো আমরা ছালার-বস্তায় ভরে মাথায় করে আনতাম।

কুমারভোগের ওই দিকটায় পিয়ার খাঁ নানার বাড়ির দক্ষিণে আরেকটা বাড়ি। বাড়িটা পুবে-পশ্চিমে লম্বা। গাছপালা ঘর-দুয়ারে জমজমাট বাড়ি। অনেক মানুষের বাস। ওই বাড়িটাও ছিল বুজির আরেক চাচার। তার ছেলেমেয়েরা থাকতেন। তাঁদের কথা আমার পুরোপুরি মনে নেই। বুজির সঙ্গে মাঝে মাঝে যেতাম সেই বাড়িতে। বড় একটা টিনের ঘরে গিয়ে বসতাম। বাড়ির মাঝামাঝি সেই ঘরটা। মাঝখানে উঠোন আর চারদিকে চারটা ঘর। দক্ষিণমুখী বড় ঘরটায় গিয়ে বসতাম আমরা। সেই ঘরে উঁচু পুরনো পালঙ্কের ওপর বয়স্ক অহঙ্কারী ধরনের একজন মানুষ শুয়ে থাকতেন। বুজির কোনও চাচাতো ভাই হয়তো। ভদ্রলোক সম্ভবত অসুস্থ ছিলেন। অসুখÑবিসুখে কাতর। অন্যের সাহায্য ছাড়া বিছানা ছাড়তে পারতেন না। তবে তাঁর গলায় বেশ জোর ছিল। শুয়ে শুয়ে অহঙ্কারী ভঙ্গিতে কথা বলতেন। মানুষকে খুবই তুচ্ছÑতাচ্ছিল্য করতেন। বুজি তাঁকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। তবু অসুস্থ মানুষটাকে মাঝে মাঝে দেখতে যেতেন। সঙ্গে ছায়ার মতো যেতাম আমি।

পিয়ার খাঁ নানার বাড়ি থেকে পুবÑদক্ষিণে হামিদ মামা মোতালেব মামাদের মামাবাড়ি। সেই বাড়িতে খুব সুন্দর একটা দোতলা ঘর। তিন-চারটা বড় বড় ঘরঅলা বাড়িটা দেখলে মনে হতো তারা বেশ অবস্থাপন্ন। হামিদ মামা মোতালেব মামাদের সঙ্গে সেই বাড়িতেও গেছি অনেকবার। ছোট নানির সঙ্গেও গেছি।

বাড়িতে আটকে থাকতে আমার ভালো লাগত না। বাড়ির কেউ কোথাও যাচ্ছে শুনলেই তার পিছু নিতাম। হামিদ মামা মোতালেব মামাদের মামাবাড়ির ওদিকটা ছাড়িয়ে পদ্মাতীর পর্যন্ত ক্ষেতখোলা মাঠ। বাড়িঘর নেই। পদ্মাতীরে বাঙ্গি, তরমুজ, ক্ষীরাইয়ের চাষ হতো। কোনও কোনও বিকেলে সেদিকটায় চলে গেছি। পদ্মা তখন সমুদ্রের মতো। এপারÑওপার দেখা যায় না। মাঝনদী দিয়ে বড় বড় পাল তোলা নৌকা পুবে-পশ্চিমে যায়। লঞ্চ যায় দুয়েকটা। সদরঘাট থেকে ছেড়ে মুন্সিগঞ্জ চাঁদপুর হয়ে লৌহজং মাওয়া ভাগ্যকূল ছুঁয়ে গোয়ালন্দ। পদ্মাতীরে দাঁড়িয়ে কোনো কোনো বিকেলে নৌকা আর লঞ্চ দেখতাম। একদিন হলুদ আর কালো রংয়ের মিশেল দেওয়া বিশাল একটা স্টিমার দেখেছিলাম। স্টিমারের সিটি শুনেছিলাম। সমুদ্রের মতো নদী থেকে আসত পাগল-করা হাওয়া। ফুরফুর করে উড়ত মাথার চুল। কেমন এক উদাসীনতা যে ছিল সেই হাওয়ায়! মন চলে যেত কোন সুদূরে!

হামিদ মামা মোতালেব মামাদের সেই মামাবাড়ির একটি ঘটনার কথা মনে আছে। ওই বাড়ির একজনের সঙ্গে হামিদ মামার এক খালাতো বোনের বিয়ে হয়েছিল। বোনটি অপূর্ব সুন্দরী। গায়ের রঙ চাঁদের আলোর মতো। টানা টানা চোখ। মাথায় লম্বা ঘন কালো চুল অমাবশ্যা রাতের মতো। তাকিয়ে থাকার মতো মেয়ে। যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে সে হামিদ মামার মামাতো ভাই। অর্থাৎ মামাতোÑফুফাতো ভাইবোনে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু ফুফাতো ভাইটির সম্ভবত কোন শারীরিক সমস্যা ছিল। সুন্দরী মেয়েটি কিছুতেই এই স্বামীর ঘর করবে না। তুমুল ঝগড়াঝাটি চলছে। ছোট নানি গেছেন হামিদ মামা মোতালেব মামাকে নিয়ে ঝগড়া মেটাতে। আমিও গেছি সঙ্গে। মেয়েটি তুমুল চিৎকার করছে। স্বামী করছে হম্বিতম্বি। এক পর্যায়ে মেয়েটিকে তার স্বামী দোতলা ঘরে ঢুকিয়ে দিল। দরজা টেনে বাইরে থেকে শিকল লাগিয়ে দিল যেন মেয়েটি বেরিয়ে উঠানে নামতে না পারে।

বন্ধ-ঘর থেকে মেয়েটি তুমুল চিৎকার আর কান্নাকাটি করতে লাগল। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখছি পরির মতো সুন্দরী একটি মেয়ে কী রকম হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। পারলে দরজাÑজানালা ভেঙে বেরিয়ে আসে। আর মুখে তুবরির মতো ছুটছে গালাগাল। খুবই অশ্লীল ভাষা। এমন কিছু শব্দ স্বামী সম্পর্কে সে ব্যবহার করছে, যা কানে তোলা যাচ্ছিল না। ছোট নানি কানে কম শুনতেন। তিনি বেশ নির্বিকার। হামিদ মামা মোতালেব মামা আমাকে নিয়ে একটু দূরে সরে গেলেন। বাড়ির মুরব্বি নারীপুরুষ মাথা নিচু করে উঠানে দাঁড়িয়ে আছে কেউ, বসে আছে কেউ। ছেলেপুলেরা নির্বিকার ভঙ্গিতে বাড়ির নামার দিকে ছুটোছুটি করছে। বাইরে দাঁড়ানো মেয়েটির স্বামী, তার পরনে লুঙ্গি ও স্যান্ডোগেঞ্জি। মাথা তেল দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ানো। উঠানে দাঁড়িয়ে সেও একসময় তার প্রবল পৌরুষ প্রকাশ করার চেষ্টা করল। সেই প্রথম আমি লক্ষ্য করলাম শারীরিক ব্যাপারে অক্ষম স্বামীরা স্ত্রীর ব্যাপারে কী রকম অযথা অহঙ্কারে নিমজ্জিত হয়। যেন স্ত্রীকে সুখী করতে তারচে’ সমর্থ পুরুষ জগৎ সংসারে দ্বিতীয়টি আর নেই।

ওই বয়সে এসব বুঝিনি বা বোঝার কথাও না। বুঝেছি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর। যখন ঘটনাটা নিয়ে ভেবেছি।

শেষ পর্যন্ত মেয়েটি ওই স্বামীর ঘর করেনি। তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে হামিদ মামা তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে বিয়ে দিলেন। সেই ঘটনার অনেক বছর পরের কথা। হামিদ মামা তখন নিউমার্কেটের এক কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করে খুবই হাসিখুশি এবং আনন্দে ডুবে থাকা এক যুবক। লেখাপড়া হয়তো করেছে ক্লাস সেভেন-এইট পর্যন্ত। কিন্তু ফুটফাট ইংরেজি বলতে পারত। বেশ স্মার্ট যুবক। তার নামটা আমার মনে নেই। বিক্রমপুরের বিখ্যাত এক গ্রামে তাদের বাড়ি। গ্রামের নাম বজ্রযোগিনী। এই গ্রামে এক হাজার বছর আগে জন্মেছিলেন শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। সেই মহাজ্ঞানীর বাড়িটিকে সবাই বলত ‘পাগলা পণ্ডিতের ভিটা’। 

হামিদ মামা তাঁর সেই বন্ধু কিংবা বোনজামাইয়ের বাড়িতে আমাকে একবার নিয়ে গিয়েছিলেন। দু-তিন দিন সেই বাড়িতে আমরা ছিলাম। হামিদ মামার বোন খুবই আদর আপ্যায়ন করেছিল। মেয়েটির সন্তানাদি হয়নি। আগের চেয়েও সুন্দর হয়েছে দেখতে। শরীর ফেটে পড়ছে যৌবন। মুখ দেখে মনে হচ্ছিল তার চেয়ে সুখী নারী এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।

হায়রে মানুষের জীবন!

বজ্র্রযোগিনী গ্রামের সেই সুখী গৃহবধূটির দ্বিতীয় সংসারও টিকেনি। তার সন্তানাদি হয়েছিল কিনা জানি না। কিন্তু হতদরিদ্র একেবারে রাস্তার ভিখিরির চেহারায় সেই সুন্দরী মেয়েটিকে পঁচিশ-তিরিশ বছর পর আমি একদিন দেখলাম মৌছামান্দ্রা গ্রামে। আমার মিনু খালার শ্বশুরবাড়ি এই গ্রামে। স্বামীর নাম নজরুল ইসলাম খান। ডাকনাম বাদল। এলাকায় তিনি বাদল খাঁ নামে পরিচিত। বড় ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। এলাকার প্রভাবশালী লোক। বিস্তর টাকার মালিক। তাঁর বাড়ির দক্ষিণে বিশাল মাঠ। জাকাতের কাপড় দিতে গেছেন তিনি। তাঁর বড় বোনের মেয়ে আমার স্ত্রী। আমার স্ত্রী আর আমিও গেছি। জাকাতের কাপড়ের আশায় গ্রামের দিনদরিদ্র অসহায় নারীরা সার ধরে বসে আছে। সেইরকম এক সারিতে দেখি হামিদ মামার সেই বোনটিও আছে। আমি কিন্তু তাকে চিনতে পারলাম। সে আমাকে চেনেনি। তবে তাকে দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল আমার। কোথায় তার সেই আগুনের মতো রূপ ? কোথায় সেই তেজিয়াল ভাব ? এ যেন শুকিয়ে যাওয়া লাল গোলাপ। জীবনস্রোত মানুষকে যে কোনদিকে টেনে নিয়ে যায়, কেউ তা জানে না!

যে বিকেলের কথা বলছিলাম সেই বিকেলটা অত্যন্ত মনোরম ছিল। খরালিকাল। চৈত্রমাসের শুরুর দিক। পিয়ার খাঁ নানার বাড়ির লাগোয়া উত্তরÑপশ্চিম দিকটায় হাতখানেক লম্বা এক ধরনের ঘাসে ভরা একটা জমি। জমির মাঝখান দিয়ে পায়েচলা পথ। আমি আর মোতালেব মামা পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছি মেদিনীমণ্ডলের দিকে। হঠাৎ মোতালেব মামা আমার হাত ধরে থমকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, মার মার মার। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। কী হইছে মামা ?

ওই যে দ্যাখ দাড়াইশ সাপ।

আমি ভয় পেয়ে তাকিয়েছি। কিন্তু সাপটা দেখতে পেলাম না। শুধু ঘাসবনের নড়াচড়া দেখে বুঝলাম সাপটা ছুটে পালাচ্ছে। ভয়ে অনেকক্ষণ বুক ধুকপুক করল।

মোতালেব মামা বললেন, সাপ দেখলে তিনবার মার মার মার বলতে হয়।

তারপর সাপ নিয়ে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেই ঘটনা মনে পড়লে এখনও পিঠ শিরশির করে। শীতল অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় পিঠে। গলা শুকিয়ে আসে।

ঘটনা ঘটেছিল ঠাকুরবাড়িতে।

দুপুরের দিকে আমরা তিনজন গেছি ঠাকুরবাড়িতে। মিন্টু আলমগির আর আমি। বৈশাখ গিয়ে জ্যৈষ্ঠ মাস পড়েছে। আম পাকার সময় হয়ে এল। আমাদের বাড়িতে একটা বৈশাখী আমের গাছ ছিল। সেই গাছের আম বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই পাকতে শুরু করেছে। বৈশাখ মাসে পাকে বলেই গাছটির নাম ‘বৈশাখী’। অন্য গাছের আম পাকতে শুরু করেনি। জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হয়েছে, এখন নিশ্চয় পাকবে। ঠাকুরবাড়ি ভর্তি আমগাছ। সোয়াশÑদেড়শ গাছ তো হবেই। অন্য গাছেরও অভাব নেই। লিচু, জাম, সফেদা গাছ আছে। পেয়ারা-বরই গাছ আছে। কলা গাছের ঝোপ আছে। গাব গাছ, তেঁতুল গাছ আছে, বাঁশঝাড় আছে অনেকগুলো। বাড়ির পশ্চিমের অংশটাকে আমরা বলতাম ‘চদরি বাড়ি’, অর্থাৎ চৌধুরী বাড়ি। সেই বাড়ির উত্তর কোণে বিশাল এক গাব গাছ আর কয়েকটা বাঁশঝাড়। এমন গা-ছমছমে পরিবেশ, একা আমরা কেউ ওদিকটাতে যেতামই না। গাব গাছ, বাঁশঝাড় আর তেঁতুল গাছ―এসব গাছ নিয়ে গ্রামে অনেক কুসংস্কার। ওইসব গাছে ভূতপেতনি তো থাকবেই। নির্জন দুপুরে কিংবা ম্যাটম্যাটে জ্যোৎস্না রাতে কেউ কেউ নাকি চদরি বাড়ির গাবতলায় আর বাঁশঝাড়ের ওখানটায় সাদা শাড়িÑপরা নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। কেউ কেউ দেখেছে ওই বাড়ির গাব গাছের মাথায় এক পা আর পুরান বাড়ির তোতা মামাদের তালগাছে আরেক পা দিয়ে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে, যার মাথা গিয়ে ঠেকেছে আকাশে।

এসব শুনে ভয়ে আমরা জড়সড় হয়ে থাকতাম। আমাদের খুব ভূতের ভয় ছিল। আমার তো ছিলই, আজাদেরও ছিল। আমার কখনও কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না, হয়ও নি। আমার বড়ভাই আজাদের তিনটা অভিজ্ঞতার কথা আমার মনে আছে। একরাতে সে বারান্দার টেবিলে বসে পড়ছে। বারান্দা মানে তো একটা কামরা। হারিকেনের ম্লান আলোয় সে পড়ছে। টিনের বেড়ার বাইরে থেকে কে তাকে ফিসফিস করে ডাকল, আজাদ, ওই আজাদ।

শুনে দাদা এত ভয় পেল, পড়া ফেলে দৌড়ে এল খাটালে। চোখমুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আমি বসে আছি বুজির সঙ্গে। ভয়ার্ত গলায় সে বুজিকে বলল, বুজি, কে জানি আমার নাম ধইরা ডাকলো!

শুনে আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে বুজির কোলের কাছে চলে গেলাম। বুজিও চিন্তিত হলেন। আমাদের বাড়িতেও তো ওইসব জিনিসের আনাগোনা আছে। হাত-পা ধোয়ার জন্য পুরোনো একটা বালতিতে এক বালতি পানি রাখা হতো দক্ষিণদিককার দরজার বাইরে। এক গভীর রাতে বুজি বা আম্মা শুনতে পেলেন, ওই বালতির পানি গরুতে খাচ্ছে। গরুর পানি খাওয়ার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তারা বুঝতেই পারলেন না, এতরাতে কার গরু গোয়াল থেকে ছুটে এসে আমাদের বালতির পানি খাচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে পানি খেয়ে চলে গেল গরু। সকালবেলা দেখা গেল বালতির পানি একফোটাও কমেনি। যতটুকু ছিল ততটুকুই আছে। তাহলে গরুর পানি খাওয়ার শব্দটা এল কোত্থেকে ?

এই ঘটনা নিয়ে কিশোর উপযোগী ভূতের গল্প লিখেছিলাম। ‘ভূত এসে পানি খেয়েছিল’।

তবে সেই রাতে দাদাকে ডাকার রহস্যটা কিছুক্ষণ পরই ভেঙে গেল। বারান্দার দিককার দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে সেন্টুদা বেশ জোরে জোরে দাদাকে ডাকলেন, আজাদ, দরজা খোল।

সেন্টুদার গলা পরিষ্কার আমরা চিনি। প্রায়ই ছানাদা, সেন্টুদা বা মিন্টু আমাদের ঘরে এসে থাকে। ওদের ঘরে এত ভাইবোনের জায়গা হয় না। আর আমাদের তো স্টিমারের মতো বিশাল ঘর। থাকার লোকই নেই।

হারিকেন হাতে দাদা গিয়ে দরজা খুলে দিল। সেন্টুদা ঢুকে বললেন, কতক্ষণ আগে তরে না আমি ডাক দিলাম আজাদ ? তুই দিহি দরজা খুললি না ?

দাদার ভয় পাওয়ার রহস্য সঙ্গে সঙ্গে শেষ।

তবে তার অন্য দুটো ভৌতিক অভিজ্ঞতা মারাত্মক। গোয়ালিমান্দ্রার হাট থেকে দুপুরবেলা দাদা ফিরছে। ওই হাট বসে মঙ্গলবার। করিম ডাক্তারদের বাড়ির ওখান থেকে অর্থাৎ কাজির পাগলা বাজার ছাড়িয়ে অনেকখানি পশ্চিমে এসে সড়কটা চলে গেছে তালুকদার বাড়ি পর্যন্ত। ওই রাস্তা দিয়েও মেদিনীমণ্ডলে ফেরা যায়। আবার করিম ডাক্তারদের বাড়ির দক্ষিণ দিক দিয়ে যে পায়েচলা পথ চলে গেছে সোজা পদ্মাতীরের দিকে, মানে কুমারভোগ গ্রামের দিকে, ওই রাস্তার কিছুদূর এসে ধানি মাঠের ওপর দিয়ে আরেকটা পথ চলে গেছে মেদিনীমণ্ডলের দিকে। সেই পথে কিছুদূর এগোলে নির্জন কলাগাছে ভর্তি একটা ছাড়াবাড়ির পাশে, ধানি মাঠের ধারে বিশাল এক শিরীষ গাছ। দাদা বড় একটা গজার মাছ কিনেছে হাট থেকে। সে বোধ হয় তখন ক্লাস ফোরে বা ফাইভে পড়ে। তার এক হাতে চিকন সুতলি দিয়ে আংটার মতো করে ঝোলানো গজার মাছ, অন্য হাতে হাট সদাইয়ের চটের ব্যাগ। দুপুর হয়ে গেছে। ধানি মাঠের দিকে খাঁ খাঁ নির্জনতা। ওই গাছটার তলা দিয়ে আসার সময় গাছের ওপর থেকে নাকি স্বরে কে বলতে লাগল, ‘মাঁছঁটাঁ দিঁয়াঁ যাঁ। ওঁইঁ ছ্যাঁমঁড়া, মাঁছঁটাঁ দিঁয়াঁ যাঁ।’

কাউকে দেখা যাচ্ছে না অথচ কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। দাদা প্রচণ্ড ভয় পেল। এক দৌড়ে চলে এল আমিন মুন্সির বাড়ির কাছে। বয়স্ক এক গৃহস্থ কাজ করছিল তার ক্ষেতে। সেই লোক দাদাকে এসে জড়িয়ে ধরল, কী হইছে বাজান ? এমনে দৌড় পারতাছ কেন ?

দাদা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘটনা বলল। ভয়ে ঠিকমতো কথা বলতে পারছিল না। গলা শুকিয়ে খরালিকালের মাঠ হয়ে গেছে। সেই গৃহস্থ যা বোঝার বুঝলেন। দোয়া পড়ে দাদার মাথায় ফুঁ দিয়ে দিলেন।

বাড়িতে আসার পর সব শুনে বুজি খুব দিশেহারা হলেন। ভয় পাওয়া শিশু-কিশোরদের লবণপানি খাওয়াতে হয়। দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দিতে হয়। সবই বুজি করলেন। তারপরও দাদার ভয় কমে না। রাতে জ্বর এসে গেল। সেন্টুদাকে পাঠিয়ে খাইগোবাড়ির মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে     পড়াÑপানি এনে খাওয়ানো হল। জ্বর আর এল না দাদার।

পরের ঘটনা। আমিনুল মামাদের বাড়ির পুবদিককার নামায়, মিয়াদের ছাড়াবাড়ির সীমানায় গলাগলি করে দাঁড়িয়ে আছে দুটো হিজল গাছ। একটার ফুল হত গোলাপি, আরেকটার সাদা। হিজল গাছ দুটোর তলা দিয়ে আমিনুল মামাদের বাড়ির দক্ষিণ দিককার ছোট পুকুর থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার একটা নালা আছে। জৈষ্ঠি মাসের শেষদিকে যখন শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি, তখন বর্ষার আগমন ঘটে। মাওয়ার ওদিককার জেলেপাড়া ঘেঁষে যে খাল ঢুকেছে গ্রামের দিকে, পদ্মার পানি উপচে সেই খাল দিয়ে বিপুল স্রোতে ঢুকতে থাকে গ্রামে। একদিকে অবিরাম বৃষ্টি অন্যদিকে খাল বেয়ে আসা পদ্মার পানি, পুকুর ডোবা উপচে পানি উঠে যায় খেতখোলা মাঠে। ছোট ছোট বহু মাছের তখন প্রজননকাল। আর তখন মাছও ছিল! খাল বিল পুকুরভর্তি মাছ। ওই সময়টাকে আমরা বলতাম ‘জোয়াইরা দিন’ অর্থাৎ জোয়ারের দিন। ওই সময়কার মাছকে বলতাম ‘জোয়াইরা মাছ’। এই মাছের সঙ্গে কত কুসংস্কার। সিঁদুরপড়া অতিকায় বোয়ালমাছ ম্যাটম্যাটে জ্যোৎস্না কিংবা অন্ধকার জোয়ারের রাতে মাছের নেশায় মত্ত হয়ে থাকা মানুষকে বিলÑবাওরে নিয়ে ডুবিয়ে মারে। সিঁদুর পরা বোয়াল কিংবা গজার মাছ আসলে মাছ না। শকসো। ভূত।

এই বিষয় নিয়ে জীবনের দ্বিতীয় গল্পটা লিখেছিলাম আমি। বড়দের গল্প হিসেবে দ্বিতীয়। ১৯৭৪ সালের কথা। গল্পের নাম ‘জোয়ারের দিন’। ছাপা হয়েছিল কলকাতার অমৃত পত্রিকায়। সেই গল্প পড়ে অমৃত পত্রিকার চিঠিপত্রের পাতায় চিঠি লিখলেন বিখ্যাত গল্প লেখক বরেণ গঙ্গোপাধ্যায়। ‘খুবই সার্থক ছোটগল্প হয়েছে ‘জোয়ারের দিন’। বিষয়বস্তুর কারণে অসাধারণ,’ এরকম প্রশংসাভরা চিঠি।

মিয়াদের ছাড়াবাড়ির সেই জোড়া হিজল গাছতলায় নালার মুখে জাল পেতে মাছ ধরত আমিনুল মামা ছানাদা সেন্টুদা আর আজাদ। অনেক সময় রাত দশটা এগারোটা পর্যন্তও ধরত। একটু বেশি রাতে জোয়ারের মাছ বেশি নামতে থাকে। একরাতে ওই চারজন মাছ ধরছে। ভেসালের মতো ছোট্ট জালটি পাঁচ মিনিট পরপর তুলছে। প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে। গুড়াগাড়ি মাছই বেশি। পুঁটি, ট্যাংরা, পাবদা, টাকি, কই, শিং, ফলি, নলা, সরপুঁটি―সঙ্গে দুয়েকটা ছোট বোয়াল বা শোল গজার। ডুলা ভরতে সময় লাগছে না। একদিকে তুমুল বৃষ্টি, অন্যদিকে গভীর অন্ধকার রাত। সঙ্গে হারিকেন আছে। গা দিয়ে কেউ না কেউ বৃষ্টি থেকে হারিকেন বাঁচাবার চেষ্টা করছে। এসময় প্রবল একটা দমকা হাওয়া এল মিয়াদের ছাড়াবাড়ির ভেতর থেকে। বাড়িটা উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। ওরা মাছ ধরছে উত্তর দিকে বসে। হাওয়ার সঙ্গে দক্ষিণ দিক থেকে যেন বিশাল এক অশরীরী কেউ হা হা হা হা শব্দ করতে করতে ছুটে এল। মুহূর্তে হারিকেন নিভে গেল। সেই হা হা শব্দ যেন নালার ওপারে এসে দাঁড়াল। চারজন ভয়ে মাছ জাল হারিকেন সব ফেলে চিৎকার করতে করতে আমিনুল মামাদের বাড়িতে এসে উঠল। তারপর আর রাতে ওখানটায় কেউ জোয়ারের মাছ ধরতে যেত না। মাছ ধরার বেজায় নেশা ছিল দাদার। কিন্তু বুজি তাকে আর রাতের বেলা বেরোতে দিতেন না।

এই ঘটনা একটু অন্যরকম করে লিখেছিলাম অধিবাস উপন্যাসে। দেশভাগের পর গ্রামে গলাগলি করে থাকা হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে রাতারাতি যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই বিভেদ ধরবার চেষ্টা ছিল উপন্যাসে। উপন্যাসের মূল চরিত্র ছিলেন ‘মনীন্দ্র্র ঠাকুর’। এই মানুষটি আমার বহু লেখায়, বহুভাবে এসেছেন। তাঁকে নিয়ে লেখা প্রথম গল্প ‘জীবনযাত্রা’। ছাপা হয়েছিল কলকাতার চতুরঙ্গ পত্রিকায়।

এই মনীন্দ্র ঠাকুরের বাড়িতেই ঘটেছিল সাপের ঘটনা।

তখন দেশগ্রামে বিস্তর সাপ ছিল। কত রকমের যে সাপ! দুই রকমের জাতসাপ। কালজাত, খৈয়াজাত। দাড়াস সাপ, ঢোঁড়াসাপ, মেটেসাপ। জাতসাপ আসলে ‘গোখরো সাপ’। ভয়ঙ্কর রাগী ও বিষধর। কামড়ালে আর উপায় নেই।

ঢোঁড়াসাপকে আমরা বলতাম ‘ধোরাসাপ’। অনেক রকম ঢোঁড়াসাপ ছিল। কালো রঙের ঢোঁড়ার নাম ‘কালঢোঁড়া’। মেটেসাপকে বলতাম ‘মাইট্টাসাপ’। ঢোঁড়া আর মেটে নিরীহ সাপ। পানিতে কচুরিপানার তলায় থাকে। মাছ খায়। ব্যাঙ খায়।

মানুষের বাড়িঘরে থাকত শঙ্খিনী নামে এক ধরনের সাপ। কালোর ওপর হলুদ ডোরাকাটা। শুনেছি এই সাপের নাকি দুটো মুখ। দুই মুখ একত্র করে কাউকে কামড় দিলে তার আর রক্ষা নেই। সাপটি আসলে বাস্তুসাপ। জীবনে একবার এই সাপ আমি দেখেছিলাম। হাওলাদার বাড়ির দক্ষিণের অংশে দুই ভাগ। পুবদিককার ভাগ সেরুদাদের। অর্থাৎ আমার বড়খালার। মায়ের সৎ বোন। বাড়ির এই অংশটুকু ছিল আমার নূরজাহান উপন্যাসের মরনি চরিত্রের বাড়ি। মান্নান মাওলানার মুখে থুতু ছিটিয়ে নূরজাহান যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। মজনুর খালারবাড়ি। কিশোরী বয়সে যে ছেলেটিকে নূরজাহানের একটু একটু ভাল লাগত।

পশ্চিমদিককার অংশে উত্তরের ভিটি আর দক্ষিণের ভিটিতে দুটো বড় বড় ঘর ছিল। একটা আলাউদ্দিনদের, আরেকটা সুরুজদের। আলাউদ্দিনের তৃতীয় ভাইটা ছিল শারীরিক প্রতিবন্ধী। দ্বিতীয় ভাইটা ছিল রাজপুত্রের মতো দেখতে। তার নাম ছিল মিলন।

সেই ছোট বয়সের পর সুরুজদেরকে আমি আর দেখিনি। বাড়িঘর বিক্রি করে ওরা বোধ হয় অন্যত্র চলে গিয়েছিল।

দুই ঘরের মাঝখানে সুন্দর উঠান। তার পশ্চিমে একটা ঘর ছিল। ঘর ভেঙে নেওয়ার পর জায়গাটা ফাঁকা। মাটির ভাঙাচোরা ভিটি পড়ে আছে। তার পেছনে একটা পুকুর। ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া পুকুরের দিকটায় আগাছার জঙ্গল গভীর হয়ে আছে। টোসখোলা নামের একটা আগাছা আমরা চিনতাম। টোসখোলা ছিল প্রচুর। আর ছিল ছিটকি ঝোপ। ‘ছিটকি’ যে একটা আগাছার নাম সেই ছেলেবেলায় শোনার পর একটি বিখ্যাত উপন্যাসে এই ছিটকি নামের আগাছাটির হদিস পেয়েছিলাম। উপন্যাসের নাম তিতাস একটি নদীর নাম। লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ। উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। এই উপন্যাসের কোনও তুলনা হয় না। ঋত্বিক ঘটক ছবি করেছিলেন। ছবিটিও অতুলনীয়।

আলাউদ্দিনকে আমরা ডাকতাম ‘আলা’। বয়সে বড় বলে আলার সঙ্গে ‘দা’ যুক্ত করেছিলাম।

একদিন দুপুরের মুখে মুখে আমি মিন্টু আলমগির জাহাঙ্গির কি কারণে ওই বাড়িতে গেছি মনে নেই। ওই বাড়ির ছেলেরাও সব জুটেছে আমাদের সঙ্গে। আমার খালাতো ভাই তাজুল আমার বয়সি। টকটকে ফর্সা সুন্দর ছেলে। আমার সঙ্গে খুব খাতির। ভেঙে নেওয়া ঘরটার ভিটির ওখানটায় দৌড়াদৌড়ি ছোটাছুটি করছি সবাই। মিন্টু নেমে গেছে পুকুরের ঢালে জন্মানো আগাছা বনের দিকে। হঠাৎই ছিটকে সরে এল সে। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। ভয়ার্ত গলায় বলল, জঙ্গলের মধ্যে বিরাট সাপ।

শুনে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। তারপরও উঁকিঝুকি মেরে সাপটা দেখার চেষ্টা করলাম। কুণ্ডুলি পাকিয়ে পড়ে আছে সাপ। কালোর ওপর হলুদ ডোরা। মিন্টু বলল, আল্লায়ই জানে কী সাপ ?

ততক্ষণে বাড়ির বড়দের মধ্যে খবর হয়ে গেছে। বাড়ির আরেক শরিকের নাম ভাসান গাছি। তার ছেলের নাম নুরু। তিন চারটা ঘর তার সীমানায়। আথালে অনেকগুলো গরু। তার বোধ হয় চার পাঁচটি মেয়ে ছিল। আমার চেয়ে ছোট বয়সী মেয়েটি একটু মোটা ধাঁচের। ভাসান গাছি কি কাজে ওই দিকটায় আসছিল। সাপের কথা শুনে ঝোপের ভেতর উঁকি মেরে দেখল। দেখে বলল, তরা এদিক থেইকা সইরা যা। এই মিহি আর আহিস না। এইটা সানকি সাপ। বাড়িতে সানকি সাপ থাকন ভাল। সাপটারে বিরক্ত করিস না।

কত গিরগিটি আর ইঁদুর ছিল তখন। ব্যাঙ ছিল অনেক রকমের। সন্ধ্যা হলেই কুনোব্যাঙগুলো বাড়ির উঠানে নেমে লাফাত। বর্ষার শুরুতে মাঠে যখন গোড়ালি ডোবার মতো পানি তখন দেখা যেত অজস্র কোলাব্যাঙ। কোলাব্যাঙেরও বোধ হয় তখন প্রজননকাল। তোকমা-দানার মতো কালো কালো ডিম ছাড়ত পানিতে। আর দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডেকেই যাচ্ছে। পানিতে থাকা কাছির মতো ঢোঁড়াসাপগুলো থাবা দিয়ে ব্যাঙ ধরত। গেরস্তবাড়ির উঠানেও কুনোব্যাঙ ধরে খেতে আসতো ম্যাটম্যাটে জ্যোৎস্নারাতের আততায়ী জাতসাপ। সাপে ব্যাঙ ধরার পর ব্যাঙের এক ধরনের করুণ আর্তনাদ শোনা যেত। নূরজাহান উপন্যাসে মান্নান মাওলানার বাড়ির পুবদিককার অংশে এরকম একটা সাপ একরাতে দেখেছিল মুকসেদ চোর। লোকে তাকে ডাকত, ‘মুকছেইদ্দা চোরা’।

গুই ছিল অনেক। উদবিড়াল থাকত বড় পুকুরগুলোতে। কত কাছিম, কত কচ্ছপ পুকুরভরা।

একবার বুজির একটা কড়াই পড়ে গেছে ঘাটের কাছে। আমাদের বড় পুকুরে। বুজি আমাকে ডেকে বললেন, মিয়াভাই, পাইনতে নাইমা কড়াইটা ওঠাইয়া দেও।

তখনকার দিনে বেশিরভাগ গেরস্তবাড়ির পুকুরঘাটগুলো ছিল পাড় থেকে পাঁচ-ছয় হাত পুকুরের ভেতর পর্যন্ত লম্বা এবং হাত-দেড়েক চওড়া একটা কাঠ ফেলে অনেকটা কাঠের পুলের মতো একটা ব্যবস্থা। ওরকম ঘাটে বসে আমরা লোটা-বদনায় পানি তুলেও মাঝে মাঝে গোসল করতাম।

বুজি বলার পর লাফ দিয়ে নামলাম পানিতে। কোমর সমান পানিতে নামার পরই পায়ের কাছে কড়াইটা ঠেকল। উপুড় হয়ে দুহাতে টেনে তুললাম। তুলে দেখি কিসের কড়াই! আমি ধরে আছি মাঝারি সাইজের একটা কাছিমের পেছন দিককার দুটো ঠ্যাং। খাইছে আমারে, বলে কাছিম ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম পুকুরপাড়ে। বুজি এসে আমকে জড়িয়ে ধরলেন। ডরাইছো মিয়াভাই ? থাউক তোমার কড়াই উঠান লাগব না। আলফু আইসা ওঠাইব নে।

দুই ধরনের গিরগিটির কথা মনে আছে। হালকা লালচে রংঙের গিরগিটিকে আমরা খুব ভয় পেতাম। পুরোনো গাছের কোমর বরাবর স্থির হয়ে থাকত। ঘনঘন পেট ওঠানামা করছে। ওই গিরগিটিকে আমরা বলতাম রক্তচোষা। দূর থেকে নাকি মানুষের রক্ত চুষে নিতে পারে, এরকম কুসংস্কার ছিল। রক্তচোষা দেখলে দৌড়ে পালাতাম। আরেকটা গিরগিটি ছিল একটু স্বাস্থ্যবান, তাগড়া ধরনের। ওটা নিরীহ গিরগিটি। নাম ছিল ‘আরজিনা’। মানুষ দেখলেই শুকনো পাতার ওপর দিয়ে সরসর করে দৌড়ে পালাত। আমার প্রথম উপন্যাস যাবজ্জীবন শুরু হয়েছিল প্রকৃতির বর্ণনা দিয়ে। শুরুর কয়েক লাইনের মধ্যেই আরজিনার ছুটে যাওয়ার বর্ণনা ছিল।

খাটাশ ছিল অনেক। শিয়াল তো ছিলই, বাগডাশও ছিল। একদিন শেষ বিকেলে বহ্নিছাড়ার ওদিক দিয়ে তাজুলের সঙ্গে ফিরছি। গিয়েছিলাম বহ্নিছাড়া ছাড়িয়ে দক্ষিণ দিকে যে খাল সেই খালের ওপারে মজনুদাদের বাড়িতে। মজনুদা হচ্ছে তাজুলের চাচাতো ভাই। সেই বাড়ি থেকে নেমে মাত্র হালটের মোড়ে এসেছি, হঠাৎ কালোমতো একটা বিড়াল সাইজের জীব পুবদিককার মাঠ থেকে পশ্চিমদিককার ধানক্ষেতে তিরের মতো ছুটে গেল। অবাক হয়ে তাজুলকে জিজ্ঞেস করলাম, ওইটা কী রে ?

তাজুল হেসে বলল, তুই চিনস না ? আরে ওইটা হইলো খাডাস।

বুঝলাম এই হচ্ছে খাটাশ। 

ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণ দিককার অংশে একসময় একটা বড় দালান ছিল। আমার জন্মের বহু আগে সেই দালান ধসে পড়েছিল। উঁচু মাটির ভিতটা ছিল আর চারপাশে ছিল পুরোনো ভাঙাচোরা ইটের ধসে যাওয়া গাঁথনি। চারপাশে আমগাছ। বাড়ির মাঝখানকার পুকুরটার দিকে বেতবন। ওই পুকুরটাই ভিতের পশ্চিম দিকে। পুবদিকে আরেকটা পুকুর। সেই পুকুরের ওপারে গুহের বাড়ি। পুবদিককার ভিতে দাঁড়ালে অনেকখানি নিচে পুকুরপাড়টায় প্রচুর ঝোপঝাড় আগাছার জঙ্গল। হিজল গাছ আছে বেশ কয়েকটা। বরুন গাছটাকে আমরা বলি ‘বউন্না গাছ’। সেই বউন্না গাছ আছে অনেকগুলো। ভিতের ঠিক দক্ষিণ কোণায় বিশাল একটা লিচু গাছ। আমের দিনে ওই লিচুতলায় দুপুরের দিকে বেশ আড্ডা জমত। পাড়ার শিশু-কিশোররা তো থাকতই, অনেক সময় বড়রাও থাকত―জহুদা, নজুদা, আইয়ুবদা, হামিদমামা, রবমামা, মোতালেবমামা। আমার বড়ভাই আজাদ। তাদের দলটা আলাদা।

‘চদরি’ বাড়ির গাবতলায়ও দুপুরের দিকে এইরকম একটা আড্ডা জমত। পাশের বাঁশঝাড়গুলো উতল হাওয়ায় শন শন করছে। গাবের পাতায়ও হাওয়ার খেলা। অনেক ছেলেপান একত্রে হওয়ায় গাÑছমছমে ভাবটা আর নেই। কাঁচা আম পেড়ে এনে কাসুন্দি দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া হতো। গাবতলার পরিষ্কার মাটিতে গুলি খেলা হতো। গভীর আনন্দের সময়।

আমার ধু ধু মনে আছে, পশ্চিম দিক থেকে চদরি বাড়িতে ঢোকার পর কিছুটা জায়গা পেরিয়ে গেলে সবুজ ঘাসে ভরা একটা উঠান। তারপর পশ্চিমমুখী একটা টিনের ঘর। ঘরটা অতি পুরোনো এবং জীর্ণ। মাঝারি সাইজের। পড়ো পড়ো অবস্থা। ভেতরটায় ঝুপসি অন্ধকার। দক্ষিণ দিকে একটা জানালা ছিল। সেই জানালার পাশে একটা চৌকি। চৌকিতে ধীরেন চৌধুরীকে মাঝে মাঝে বসে থাকতে দেখতাম। আরেকটা বুড়ি ছিল ঘরে। অথর্ব ধরনের। অতিকষ্টে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটত। চদরির রান্নাবান্না করত। এই ঘরের পেছনেই বাড়ির মাঝখানকার পুকুরটা। চদরির অংশে আমাদের বাড়ির মতো পুরোনো একটা কাঠের ঘাট ছিল। পুকুর ভর্তি কচুরিপানা আর জলজ উদ্ভিদ। চারদিক থেকে পুকুর জলে নেমে গেছে বেতবন, ছিটকি আর টোসখোলার ঝোপ। ছায়া ফেলে রেখেছে বড় বড় গাছপালা। উত্তর দিকে বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে ছমেদ খাঁ নানার পুকুরের সঙ্গে একটা চওড়া নালাকাটা। বর্ষায় এই নালা দিয়ে পানি ঢুকত পুকুরে। সঙ্গে মাছও ঢুকত প্রচুর। ধোয়া-পাকলার কাজে পুকুরঘাটে গিয়ে পানিতে পড়েছিল অথর্ব বুড়িটি। আর উঠতে পারেনি। পরে তার লাশ ভেসে উঠেছিল।

চদরির ঘরের পশ্চিম দিকে, উঠানের পর খেজুর পাতার মতো পাতাঅলা সুন্দর দুটো গাছ ছিল। কী গাছ আমি জানি না। শৌখিন মানুষ বাড়িতে এইসব গাছ বুনত। একটু বড় হওয়ার পর চদরির ঘরটা আমি আর দেখিনি। হয়তো ভেঙে পড়া ঘর বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। সে এসে থাকত ঠাকুরের রান্নাঘরে। ঠাকুরের রান্নাবান্না করত। আর হাজামবাড়ির মজিদ ছিল ঠাকুরের নৌকা বাওয়ার লোক, বাড়ির অন্যান্য কাজ করার লোক।

ধীরেন চদরিকে নিয়ে আমার একটা মজার স্মৃতি আছে। ঠাকুর চদরির বাড়ির আমগুলো মাত্র ডাগর হতে শুরু করেছে। জহুদা, নজুদা, আইয়ুবদা―ওরা এক দুপুরে চদরি বাড়িতে ঢোকার মুখে একটা আম গাছতলায় বসে আছে। কিছু আম পাড়া হয়েছে। টিনের একটা থালা আছে সঙ্গে। একটু কাসুন্দি আছে। একজন আম ছিলছে। কাসুন্দি দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া হবে। আমি কেমন কেমন করে মিশেছি তাদের সঙ্গে। আইয়ুবদা আমাকে বললেন, নুন আনতে ভুইল্লা গেছি রে মিলু। চদরি রানতে বইছে, যা তার কাছ থেকে নুন লইয়া আয়।

এ কথা শুনে জহুদা নহুদা দেখি মিটিমিটি হাসে। কী কারণ, আমি তো আর বুঝতে পারিনি! এক দৌড়ে গেলাম ঠাকুরের রান্নাঘরে। সরাসরি ঘরে ঢুকে চদরিকে বললাম, একটু নুন দেন।

সঙ্গে সঙ্গে চদরি হই হই করে লাফিয়ে উঠল। ভয়ঙ্কর মারমুখী ভঙ্গি। পারলে আমাকে মারে। তেড়ে এসে বলল, যা যা বাইর হ।

আমি ভয় পেয়ে দৌড়ে ফিরে এলাম। মুখচোখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। দৌড়ে আসার ফলে হাঁফাচ্ছি। আইয়ুবদা হাসতে হাসতে বললেন, নুন দেয় নাই ?

না। আমার ওপরে চেইত্তা গেছে।

তিনজন হা হা করে হাসতে লাগল। ব্যাপারটার আগামাথা আমি কিছুই বুঝলাম না। থালার দিকে তাকিয়ে দেখি কাসুন্দি দিয়ে আম মাখা হয়ে গেছে। আইয়ুবদা লুঙ্গির কোচড় থেকে কাগজে জড়ানো লবণ বের করে মাখা আমের ওপর ছিটিয়ে দিচ্ছে।

আরে লবণ তো ছিলই! তারপরও আমাকে আনতে পাঠাল কেন ?

পরে শুনেছি, ব্রাহ্মণদের রান্নাঘরে মুসলমান ঢুকলে সেই রান্না তারা নাকি আর খায় না। এই জন্যই চদরি এমন তেড়ে উঠেছিল।

আম মাখা খেয়ে সেদিন আমি আর স্বাদ পেলাম না। বুক ধুকপুক ধুকপুক করছে। নিশ্চয় চদরি বা ঠাকুর গিয়ে বুজির কাছে আমার নামে বিচার দেবে। আর বুজি নিশ্চয়ই আমাকে বকবে। দু-তিনটা দিন খুবই উৎকণ্ঠায় থাকলাম। কিন্তু ঠাকুর বা চদরি কেউ এসে কোনও বিচার দিল না।

এই ঘটনার কথা লিখেছিলাম কেমন আছ, সবুজপাতা উপন্যাসে।

একদিন দুপুরে লিচুতলায় আড্ডা জমেছে। পুবদিককার পুকুরপাড়ের আম গাছে আম বড় হল কিনা, কে যেন আমাকে দেখে আসতে বলল। গেছি ওদিকটায়। হ্যাঁ গাছের আম বড় হয়েছে। গাছের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ই শুনি, অনেকখানি নিচে পুকুরপাড়ের ঝোপঝাড়ে কী রকম যেন একটা হুটোপুটির শব্দ। চমকে তাকিয়েছি। তাকিয়ে বুকটা ধড়াস করে উঠল। তিনটি বাঘের বাচ্চা হুটোপুটি করছে ঝোপঝাড়ের মাঝখানকার ঘাসে ভরা একটুখানি খোলা জায়গায়। দেখে আমার দম প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক পলক দেখলাম দৃশ্যটি। তারপর পা টিপে টিপে লিচুতলায় ফিরে এলাম। ঘটনা বললাম সবাইকে। সৈয়দমামা নাকি দুলাল বা তাজুল কে যেন বলল, বাঘের বাচ্চা দেখছস ? এখানে বাঘ আইবো কই থিকা ? ল তো দেখি!

সবাই দলবেঁধে পা টিপে টিপে গেলাম। গিয়ে দেখি তখনও একই দৃশ্য। তিনটি বাঘের ছানা হুটোপুটি করছে। তবে আমাদের পায়ের শব্দ বোধ হয় বাচ্চাগুলো পেয়ে গেল। মুহূর্তে ঝোপের ভেতর উধাও।

দুলাল হাসতে হাসতে বলল, এডি বাঘের বাচ্চা না। বাগডাশার বাচ্চা।

আরেকবার বাগডাশ দেখলাম আমাদের বাগানের ওদিকটায়। বুজি অনেক হাঁস মুরগি পালতেন। প্রায়ই শেয়ালে কিংবা বাগডাশায় দিনের বেলায় হাঁস-মুরগি ধরে নিয়ে যেত বাগান থেকে। হাঁসগুলো হেলেদুলে যেত পুকুরের দিকে। পুকুরে চড়ে গুড়াগাড়ি মাছ খেয়ে পেট ফুলিয়ে আয়েশ করে বসে থাকত পুকুরপাড়ের ঝোপঝাড়ের ছায়ায়। ওত পেতে থাকা শেয়াল কিংবা বাগডাশ অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাঁস মুখে নিয়ে পালাত। অন্য হাঁসগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ত পানিতে। একটা হুড়োহাড়ি হইচই পড়ে যেত বাড়িতে। মুরগিও ধরে নিয়ে যেত একই কায়দায়। বাগানের তিন দিকেই তো  কমবেশি ঝোপঝাড়। কাশ, টোসখোলা, ছিটকি, হাগড়া আর কত নাম-না-জানা আগাছার ঝোপ। বাগানের পরিষ্কার মাটিতে চড়ত মোরগ মুরগিগুলো। ঝোপের আড়ালে ওত পেতে থাকত বাগডাশ, শেয়াল, খাটাশ।

বাড়িতে সব সময়ই বারান্দার বড় চৌকিটার তলায় চাঙারিতে খড়-নাড়া দিয়ে বা চুলার ছাঁই দিয়ে মুরগির ডিম পাড়ার ব্যবস্থা করা হতো। পেটভরা ডিম নিয়ে মুরগি ঠিক ওই চাঙারিটায় গিয়ে বসত। দশ-বারোটা-পনেরোটা করে ডিম দিত। ওখানে বসেই ডিমে তা দিত, বাচ্চা ফুটাত। ওমে-বসা মুরগিকে আমরা বলতাম, ‘উমা মুরগি’। উমা মুরগি খুব খ্যাপাটে ধরনের হয়। সামনে গেলে ওমে-বসা অবস্থাতেই ঠোঁকর দেয়। তারপর একসময় ডিম খুঁটে খুঁটে বাচ্চা ফুটায়। বাচ্চাগুলোর কুন কুন, কুন কুন এক ধরনের শব্দ পাওয়া যায়। পনেরোটা ডিমের মধ্যে হয়তো তিনÑচারটা নষ্ট হয়ে যায়। বাকিগুলো থেকে ছানা বের হয়। হালকা হলুদ-সাদা রংয়ের মিশেল দেওয়া তুলার পুতুলের মতো ছানাগুলো নিয়ে মুরগিটা একসময় উঠান-পালানে চড়তে বেরোয়। ছানাগুলোর তখন বড় শত্রু আকাশের চিল আর দাঁড়কাক। অনেক সময় পাতিকাকও। এই পাখিগুলো তক্কে তক্কে থাকে কখন ছোঁ মেরে মুরগিছানা তুলে নেবে। মা মুরগি ব্যাপারটা টের পেলে ওরকম আততায়ী চিল দাঁড়কাক কিংবা পাতিকাক দেখলে মাথা উঁচু করে সাবধানী ভঙ্গিতে এক ধরনের শব্দ করে। সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ছানাগুলো মায়ের পালকের নিচে এসে লুকায়। তারপরও সব ছানা রক্ষা করা যায় না। কোনও কোনওটা ছোঁ মেরে নিয়ে যায় কাক-চিলে। কখনও কখনও এরকম ধরে নেওয়া মুরগিছানা টুপ করে আবার পড়েও যায় কাক চিলের মুখ থেকে। সামান্য আহত হলেও সেগুলোর কোনও কোনওটা বেঁচে যায়।

এরকম এক মুরগিছানার কথা লিখেছি নূরজাহান উপন্যাসে। মরনির বাড়ির আঙিনায় দাঁড়কাকের মুখ থেকে পড়েছিল। পরে ভারি তেজিয়াল মুরগি হয়ে ওঠে সেটা।

একদিন দুপুরের দিকে আমাদের বাগানে চড়া মোরগ-মুরগিগুলোর মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা। কক কক করে সাবধানী ডাক ডাকছে আর পালাবার চেষ্টা করছে। দাদা গেছে বাগানের দিকে। গিয়ে আবছামতো কিছু একটা ছুটে যেতে দেখল আমাদের বাড়ি আর মিয়াবাড়ির মাঝখানকার ঝোপজঙ্গলে গভীর হয়ে থাকা জায়গাটার দিকে। সরু বাঁশের লম্বা একটা লাঠি নিয়ে সে গেল ওদিকটায়। সঙ্গে আমিও আছি। বুজি, ফতির মা, আম্মা সবাই এসেছে বাগানে। দাদা বলল, কী জানি একটা ঢুকছে এই জঙ্গলে। শিয়াল খাডাশ নাইলে বাগডাশ। এর লেইগা মোরগ মুরগিগুলো ডরাইতাছে। বলেই হাতের লম্বা বাঁশটা দিয়ে ঝোপের মধ্যে একটা বাড়ি দিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা বড় সাইজের বাগডাশ মিয়াবাড়ির বাঁশঝাড় আর চালতাতলার দিকে দৌড় দিল। সেই প্রথম পরিষ্কার একটা বাগডাশ আমি দেখলাম।

কত রকমের পাখি ছিল তখন গ্রামে। সেইসব পাখির কোনও কোনওটা হয়তো এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মিয়াবাড়ির চালতাতলা আর বাঁশঝাড়ের তলার দিককার কথা মনে পড়লে একটা পাখির কথা মনে হয়। সেই পাখির নাম ‘কুক্কা’। সন্ধ্যার দিকে বেরোত পাখিটা। ওড়ার চেয়ে পায়ে হাঁটত বেশি। বড় সাইজের পাতিকাকের সমান। পাখা দুটো জমাট বাঁধা রক্ত রঙের। তেমন ডাকাডাকি করত না। নিঃশব্দ ছিল তার চলাফেরা। এই পাখিটাকে গ্রামের লোকজন ‘হাইড়া কুক্কা’ বলেও ডাকত। জানি না সেই পাখি এখন আছে না বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

কত ডাহুক ছিল! সারারাত আর নির্জন দুপুরে ডাহুকÑডাহুকির ডাক শোনা যেত। বর্ষাকালে কালো তুলা দিয়ে তৈরি, এমন দেখতে ছোট ছোট ডাহুকছানা মায়ের সঙ্গে ভেসে বেড়াত পানির ওপর। সামান্য শব্দ পেলেই কোথায় যে লুকাত, বোঝাই যেত না।

কার্তিক মাসে ধানের ছড়া খাঁচায় ঝুলিয়ে ডাহুক শিকার করত অনেকে। জবাই করে খেত। বকও শিকার করত কেউ কেউ। অনেক রকমের বক ছিল দেশগ্রামে। মজনুদাদাদের বাড়ির ওদিককার এক লোক ফাঁদ পেতে বক ধরেছে। সেই বক বাড়িতে এনে পলো দিয়ে আটকে রেখেছে। জবাই করে খাবে। বাড়ির একটি দুরন্ত ছেলে পলোর মুখে চোখ লাগিয়ে বক দেখছে। তার চোখের নড়াচড়া দেখে বক ভাবল, বোধ হয় পানির তলায় কোনও মাছ নড়াচড়া করছে। দিল এক ঠোঁকর। চোখ তুলে ছোট মাছ গিলার মতো গিলে ফেলল। সেই ছেলে জীবনের তরে কানা।

গুইকে আমরা বলতাম, ‘গুইসাপ’। কত গুইসাপ ছিল তখন। গুইসাপে মুরগিছানা ধরে নিয়ে যেত। আমাদের বাগান থেকে মুখে মুরগির ছানা নিয়ে পালাতে দেখেছি গুই।

গুই এখনও আছে, তবে পরিমাণ কমেছে অনেক। সেই ছেলেবেলার বহু বহু বছর পর, আমি ষাট পেরিয়েছি, কালের কণ্ঠ দৈনিক অফিসরুমে বসে কাজ করছি। আমার রুম দোতলায়। রুমের দক্ষিণ দিকটায় স্বচ্ছ কাচের দেয়াল আর দরজা। দরজার বাইরে চমৎকার রেলিং দেওয়া বারান্দা। তার দক্ষিণ পাশে দু-আড়াইশ ফিট চওড়া একটা লেক। পানিটা স্বচ্ছ না, ময়লা। তবে চলমান। সেখানে বক এসে বসে মাছ ধরার লোভে। মাছরাঙা বসে। ঘুঘু পাখি শালিক পাখি, দোয়েল আর চড়ুই তো আছেই। বুলবুলিও আছে। ওই লেকটায় মাঝে মাঝে ঢোঁড়াসাপ দেখি এপার-ওপার করছে। ইঁদুর-বেজিও দেখতে পাই। তিন-চারটা গুইও আছে ওখানে। পানিতে সাঁতার কাটতে দেখি, এপার-ওপার করতে দেখি। খুব ভাল লাগে আমার। ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে।

একদিন দুপুরের পর নিজের টেবিলে বসে কাজ করছি। চোখ গেছে কাঁচের দরজাটির দিকে। আশ্চর্য হয়ে দেখি, একটা বেশ বড় গুই বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে গভীর মনোযোগ দিয়ে আমাকে দেখছে। অদ্ভুত দৃশ্য। কল্পনাই করা যায় না। ওই রেলিংঘেরা বারান্দা থেকে পশ্চিমে নেমে গেছে একটা সিঁড়ি। তিরিশ-চল্লিশ ফুট হবে নিচ পর্যন্ত। সেই সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে নিশ্চয়ই খাবারের সন্ধানে গুই উঠে এসেছে বারান্দায়। জানি আমি, এখন নড়াচড়া করলেই সে পালাবে। আমি চুপচাপ তাকে দেখতে লাগলাম, সেও আমাকে দেখতে লাগল। কিছুটা সময় সে আমাকে ওভাবে দেখে নিঃশব্দে ফিরে গেল।

তারপর থেকে ওই বারান্দায় আমি পাখিদের খাবার দিই। ছয়টা ঘুঘু পাখি আসে খাবার খেতে। চড়ুই আসে শ’খানেক। শালিক বুলবুলি আর দোয়েল আসে। প্লাস্টিকের বড় একটা গামলায় পানি দেওয়া হয়। দুপুরের দিকে একটা দোয়েল এসে সে গামলায় নেমে ভারি আনন্দ নিয়ে গোসল করে। দৃশ্যটির কোনও তুলনা হয় না।

ঢাকায় একবার আমি একটা সাপ মারলাম। গেন্ডারিয়া দীননাথ সেন রোডে আমার বন্ধু মানবেন্দ্রদের বাড়ি। ওই বাড়ির দক্ষিণদিককার বাড়ির ছেলে মুকুল আমার পরিচিত। বাড়িটায় গাছপালা আছে, ঘাস আছে, কিছু ঝোপঝাড় আছে। পুরোনো ধরনের বড় একটা দালানে মুকুলরা থাকে। সেই দালানের দক্ষিণে একটু দূরে এক কামড়ার একতলা একটা দালান। আমার বন্ধু পান্নার কী রকম যেন আত্মীয় হয় মুকুলরা। আশির দশকের শুরুর দিকে নাকি আরও আগে, আমার ধারণা সাতাত্তর আটাত্তর সাল হবে, পান্না মাঝে মাঝে এসে ওই ঘরটায় থাকত। বাড়ির মেয়েটির সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়েছে। পরবর্তীকালে সেই মেয়েই পান্নার স্ত্রী। পান্নার পুরো নাম মুকাদ্দেসুর রহমান। জীবন কাটিয়ে দিল ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করে। একসময় লেখালেখিও করত।

মুকুলদের বাসায় পান্না আছে জেনে এক বিকেলে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গেছি। গিয়ে দেখি পান্না আর মুকুল খুবই উত্তেজিত। বাড়ির মহিলারা বড় দালানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে উঁকিঝুকি মারছে। পান্নার হাতে একটা চেলাকাঠ। কী ব্যাপার ? পান্না উত্তেজিত গলায় বলল, সাপ ঢুকছে ঘরে। বিরাট সাপ।

সাপের কথা শুনলেই আমার বুকটা ধক করে ওঠে, পিঠটা শিরশির করে ওঠে। তবু বললাম, কী সাপ ?

চিনি না। তবে বড় সাপ। ওই যে দেখ।

আমি ঘরের ভিতরে উঁকি মেরে দেখি ঘরের খাট যেখানে তার ঠিক উল্টোদিকে দেয়ালের কোণে আধপ্যাঁচা হয়ে আছে একটা সাপ। মাঝারি ধরনের মোটা। পেটের দিকটা হলুদ রংয়ের। পিঠটা মাটির মতো। চিনলাম। মেটেসাপ। বেশ বীরত্বের ভঙ্গিতে পান্নার হাত থেকে চেলাকাঠটা নিলাম। কাছাকাছি গিয়ে প্রথমে মাথাটা থেঁতলে দিলাম। তারপর কোমরটা। সাপটা নির্জীব ধরনের ছিল। সহজেই মারা পড়ল।

এই সাপ মারতে মারতে আমি চলে গিয়েছিলাম স্মৃতির ভেতরে। ঠাকুরবাড়ির সেই ঘটনা মনে পড়েছিল।

আম পাকার দিন শুরু হলো কিনা জানার জন্য আমি মিন্টু আর আলমগির গিয়েছিলাম ঠাকুরবাড়িতে। জৈষ্ঠি মাসের দুপুরবেলা। আম পাকার খবর প্রথম পায় কাকেরা। কোন গাছের পাতার ফাঁকে পেকে হলুদ কিংবা লাল হয়েছে আম, কাকপক্ষীর তা চোখে পড়বে। সে এসে ঠোঁকর দেবে পাকা আমে। কয়েক ঠোঁকর হয়তো খাবে, তারপরই আমটি খসে পড়বে গাছতলায়। আমরা জেনে যাব আম পাকার দিন শুরু হয়েছে। একটার পর একটা গাছে আম পাকতে শুরু করবে এখন। বোঁটা আলগা হয়ে ঝড়ে পড়বে গাছতলায়। পাড়ার ছেলেমেয়েরা ভোরবেলায় আসবে আম কুড়াতে। আমিও আসব।

 সেদিন আমরা তিনজন ঠাকুরবাড়িতে ঘুরছি। একটা কাক উড়ে গিয়ে বসল লিচু গাছটির ওদিককার একটা গাছে। কা কা করে পাকা আমে ঠোঁকর দিল। আধখাওয়া আমটা পড়ল নিচে। আমরা তিনজন ছুটে গেলাম। সেই আম দেখে বুঝলাম, আম পাকার দিন এসে গেছে। দুয়েকদিন পর থেকেই আম কুড়াতে আসা যাবে। দিন পনেরো-বিশেক চলবে এই আম কুড়ানো। আম একবার পাকতে শুরু করলে শুধু পাকতেই থাকে। আর বোঁটা আলগা হয়ে টুপটাপ পড়তে থাকে গাছতলায়।

এক সকালে আমার ঘুম ভেঙেছে একটু বেলা করে। উঠেই ছুটে গেছি ঠাকুরবাড়িতে। হাফপ্যান্ট পরা খালি গা। হাতে চটের একটা ছোট ব্যাগ। আজ হয়তো আম তেমন পাওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই এতক্ষণে সব আম কুড়িয়ে নিয়ে গেছে পাড়ার ছেলেমেয়েরা। তবু গেছি। এদিক-ওদিক ঘুরে কোথাও কোনও আম পেলাম না। শেষ পর্যন্ত এলাম ঠাকুরের ঘরের পিছন দিকটায়। এখানে একটা বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের সঙ্গে গলাগলি করে আছে দুটো আম গাছ। পায়ের তলায় ঘাসের সঙ্গে আছে শক্ত অচেনা ধরনের লতা গাছ। বাঁশঝাড়তলায় একেবারে ছেয়ে আছে। হাঁটতে হাঁটতে গেছি ওদিকটায়। হঠাৎই স্বপ্নের মতো চোখে পড়ল দৃশ্যটা। হলুদ বেশ বড় সাইজের পাকা একটা আম পড়ে আছে গাছতলায়। ছুটে গিয়ে মাত্র ধরব, তার আগে সাঁ করে ফণা তুলল কুচকুচে কালো এক সাপ। ফণাটা স্থির হয়েছে। চোখ দুটো খোসা ছাড়িয়ে নেওয়া বেতফলের মতো। সুতার মতো গোলাপি রংয়ের দুখানা জিভ বার বার বেরোচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে আমার আর হিতাহিত জ্ঞান নেই। কোথায় পড়ে রইল আম আর কোথায় পড়ে রইল আমার হাতের ব্যাগ। দিলাম প্রাণপণে দৌড়। খানিক দৌড়ে যেতেই সেই শক্ত লতায় জড়িয়ে গেল পা। মুখ থুবড়ে উপুড় হয়ে পড়লাম। কয়েক সেকেন্ড মাত্র। তারপরই টের পেলাম আমার খোলা পিঠের ওপর দিয়ে বরফের একটা মালা যেন মুহূর্তেই পিছলে গেল। পড়া অবস্থায়ই মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি আমার পিঠ ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে কালোসাপ। অচেনা একটা ঝোপের ভিতর ছ্যাল ছ্যাল করে ঢুকে যাচ্ছে। আমি তখন বেঁচে আছি, না মরে গেছি বুঝতেই পারছি না। অদ্ভুত এক অনুভূতি।

পরে বুঝেছিলাম, আমাকে দৌড় দিতে দেখে সাপটাও ছুটেছিল আমার পিছু পিছু। আমি উপুড় হয়ে পড়েছি সেটা সে বোঝেনি। আমার পিঠের উপর দিয়ে পার হয়ে গেছে।

বাড়িতে এসে কাঁপতে কাঁপতে বুজিকে বললাম ঘটনা। শুনে বুজি একেবারে আঁতকে উঠলেন। সর্বনাশ! কও কী মিয়াভাই! তোমারে তো আমি আর আম টোকাতে যাইতে দিমু না। যদি সাপে ঠোঁকর দিত, তাইলে কী হইত!

আমাকে লবণপানি খাওয়ালেন। দোয়া পড়ে মাথায় বুকে ফুঁ দিলেন।

এই সাপের ঘটনা লিখেছিলাম, আমার তৃতীয় উপন্যাসে। উপন্যাসটির নাম দুঃখ কষ্ট। মূলত কবি রফিক আজাদকে নিয়ে লেখা। সঙ্গে আমার সত্তর দশকের জীবন। উপন্যাসের প্রতিটি চ্যাপ্টার শুরু হয়েছিল রফিক আজাদের একেকটি কবিতার লাইন দিয়ে। আটাত্তর সালের কথা। রফিক আজাদের সঙ্গে গিয়েছিলাম জামালপুরের সাহিত্য সম্মেলনে। কৃষি বিভাগের রেস্ট হাউসে আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছিল। রেস্ট হাউসের পাশে বিশাল সূর্যমুখীর ক্ষেত। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছিল রাতটি। আমি আর রফিক ভাই প্রায় সারারাত বারান্দায় বসে সূর্যমুখী ক্ষেতের ওপর পড়া জ্যোৎস্না মুগ্ধ হয়ে দেখলাম। আর কত গল্প, জীবনের কত কথা বললাম দুজনে। এই রাতের বর্ণনা ছিল উপন্যাসে।

তারপর কতদিন কতভাবে যে সেই সাপে তাড়া করার ঘটনাটি আমার মনে পড়েছে! মনে পড়লেই পিঠ শিরশির করে উঠত। পিঠের ওপর দিয়ে সেই বরফমালা পিছলে যাওয়া অনুভূতিটা ফিরে আসত। আর মনে হতো, সারাজীবন ধরেই কী একটা সাপ আমাকে তাড়া করছে!

[চলবে]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares