ফসলের ডাক : মঈন শেখ

ধারাবাহিক উপন্যাস

চতুর্থ পর্ব

[মঈন শেখ। জন্ম : ২২ নভেম্বর ১৯৭৯, রাজশাহির তানোর উপজেলার পাড়িশো গ্রামে। পেশা শিক্ষকতা। গল্প ছাড়াও লিখেছেন উপন্যাস, প্রবন্ধ, কিশোর সাহিত্য, কবিতা ও গান। সম্পাদনা করেছেন কয়েকটি ছোট কাগজ। তিনি বাংলাদেশ বেতারের একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার।

মঈন শেখের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘কুসুমকথা’ ছাপা হয় ভারতের দেশ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ২০১৯ সনে (১৪২৬ ব.)। সেই বছরই কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা উপলক্ষ্যে কুসুমকথা বই আকারে প্রকাশ করে আনন্দ পাবলিশার্স। এই উপন্যাসের জন্য রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা-উর্দু লিটারারি ফোরামের সাহিত্য পুরস্কার-২০২০’ প্রদান করা হয় মঈন শেখকে। ‘ফসলের ডাক’ মঈন শেখের দ্বিতীয় উপন্যাস। কুসুমকথা আপাদমস্তক নিটল প্রেমের উপন্যাস। ‘ফসলের ডাক’ও তাই। তবে এই প্রেম সম্পূর্ণ আলাদা প্রেম। এ প্রেম ধানের প্রেম, ফসলের প্রেম। ফসল ফলানোর কষ্ট এবং আনন্দ যাদের বুঝবার কথা তারা বুঝতে না পারলেও ফসল কিন্তু তা ঠিকই বুঝতে পারে। কৃষকের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার হওয়া এবং তা ক্রমে ক্রমে পুঞ্জিভূত হওয়া ও তার বিস্ফোরণই এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য।]

॥ ছয় ॥

নাটকীয়তার যেন শেষ নেই। নাটক আর নাটক। জীবন্ত নাটক। সারা দেশ, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের সমস্ত অংশই যেন একই নাটকের মঞ্চ। স্টলে, ঘরে, জমির আলে, রাজনীতির পাড়ায় একই আলোচনা। যে-যার মতো বলে চলে ডায়ালগ। কেউ লম্বা কেউ খাটো। তবে ডায়ালগ তার থাকতেই হবে। হাততালি পড়ুক বা না পড়ুক।

আজ মঞ্চস্থ হলো অন্য নাটক। মানুষ কিছুটা আঁচ করলেও এমনটা ভাবেনি কেউ। একেবারে দু’জন একসাথে। নগদ আর বাকি; দু’দলের এমপি প্রার্থী ছুটে এল সেখানে। তারা যে বলা-কওয়া করেই এসেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। তাদের কথাবার্তায় তালে তাল রাখা আর খাপে খাপ খাওয়া থেকে তা বোঝা গেল। তারা এও চেয়েছিল, দুজনে নিরিবিলি কথা বলবে মাস্টারের সাথে। তাই দুজনে বহর নিয়ে আসেনি। তারপরও দু’জন মিলে একশ’টি মোটর সাইকেল, পাঁচ পাঁচ করে দশটি দামি গাড়ি এলো খড়কুটো উড়িয়ে। যে যাই বলুক, এমন মিলন এর আগে কেউ দেখেনি বা ভাবেওনি। ভাবনায় আসবার কথাও নয়। কারণ সদ্য প্রয়াত  কোনও নেতা তার মরণকালে কোন খাটে শুয়ে ছিল, সেটিও আসে উল্টো-পক্ষের সমালোচনায়। আলোচনায় বাদ পড়ে না, খাটটা সিঙ্গেল না ডবল ছিল। বউ ছিল না স্বামী ছিল, তবে সে মরার কালে সিঙ্গেল খাটে কেন ? আবার বউ বা স্বামী নেই, তবুও কেন ডবল ছিল। মুখ-ফেনায় বিরোধীপক্ষ। চরিত্র হরণ বলে কথা। খাট একটা হলেই হলো। তবে সাপ-নেউলে বলি আর দা-কুমড়ো বলি, আজ মিলন কিন্তু হয়েছে।

মাস্টারের মোড়ে এলেও মাস্টারের মজমায় সুযোগ পেল না তারা। আসলে ভিড়তে পারল না। না, মাস্টারের চোখ তারা দুজনের কেউ-ই দেখতে পায়নি। তবে উপস্থিত সকলের চোখ যেন দৈত্যের মত তাদেরকে গিলছিল। সবাই যেন কোকিলাক্ষী। স্বভাবে বাজপাখি। ভঙ্গিমা বড় ‘ছোঁ-পাগল’। এমন চোখ কাঁপন ধরানোর জন্য যথেষ্ট। শানানো আর চকচকে। সবার শরীরে একটা দ্যুতি খেলা করছে। মরচে ধরা চোখ, শরীর, অনুভূতি, কী করে হঠাৎ এমন শানিয়ে উঠল, তা বিশ্লেষণ করার সুযোগ পর্যন্ত পেল না তারা। বর্ষায় ফনফনিয়ে ওঠা ঘাসের ডগাতে কোনও মনুষ্য যেন নাড়া দিয়েছে। আর অমনি তরতরিয়ে জেঁকে বসেছে ঘাপটি মেরে থাকা জোঁকগুলো। আজ লবণকেও ডর নেই তাদের। আর দাঁড়াল না প্রার্থীদ্বয়। সোজা চলে গেল গ্রামের মধ্যে। তাদের যাওয়াতে প্রথমে লোকজন অবাক হলেও চমকটা ছিল পরে। না, তারা গ্রামের ও প্রান্তের পথ দিয়ে ফিরেও গেল না। তারা মাস্টারের বাড়ির উঠানের ঠিক মধ্যিখানে গিয়ে বসল।

প্রার্থীদ্বয়ের সম্মানের কোন কমতি রাখল না মাস্টারের দুই ছেলে। চেয়ারের ধুলো ঝেড়ে, পেছনে তোয়ালে ঝুলিয়ে গুছিয়ে বসতে দিল। এতে কিছুটা স্বস্তিও এল প্রার্থীদের। নির্ভার হলো মনে মনে। সাথের জনবল বাহিরে আছে। শুধু তারা দুজনে ভেতরে। পাতিরা বাইরে। তাদের সামনে একটি টেবিল এনে রাখতেই নিষেধ করল দুজনের একজন―‘না বাবা কিছু খেতে দিও না। বরং কাছে একটু বস।’ জড়সড় হয়ে মাস্টারের বড় ছেলে কাছাকাছি বসল। ছোটটাও বসল একটু দূরে, বারান্দায় পা ঝুলিয়ে। কথাটা প্রথমে নগদ প্রার্থীই ওঠাল―‘তোমার আব্বার অবস্থা এমনটা হয়েছে কতদিন ধরে ?’

‘স্যার, কুন অবস্থার কথা বলছেন ?’ কিছুটা থতমত হয়ে উল্টো প্রশ্ন করল মাস্টারের বড় ছেলে।

‘আরে বাবা তোমরা বুঝতে পারছ না, তোমার আব্বার অবস্থা মোটেও ভালো নয়। খুব তাড়াতাড়ি একটা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাও। তাছাড়া আমি অবাক হচ্ছি, তাসু মাস্টারের মতো অমন একটা জ্ঞানী মানুষ হঠাৎ এমনভাবে বিগড়ে গেলেন কেন ?’ অন্য প্রার্থী এক নাগাড়ে বলে ফেলল কথাগুলো। এই প্রার্থী একজন ব্যারিস্টার। তবে আইনের লোক যে এমনভাবে রোগও নির্ণয় করতে পারে, তা তাদের জানা ছিল না। অন্যদিকে নগদ প্রার্থী ব্যবসায়ী। সে ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলতে পারে না। স্বভাবের ঢঙে তাই সোজা সাপটা বলে ফেলল―‘শোন বাবা, তুমি কালকেই ঢাকা যাও। খবরদার, রাজশাহীতে দেখাবে না। না, টাকার জন্য ভেব না। প্রয়োজনে মাস্টার সাহেবকে ইন্ডিয়া নিয়ে যাও। আপাতত আমি পঞ্চাশ হাজার টাকা দিচ্ছি।’ নগদ দলীয় প্রার্থী তার পিএ কে ইশারা করতেই একটা বান্ডিল বড় ছেলের হাতে গুঁজে দিল। সে কিছু বলল না। নির্বাক আর নির্বোধের মতো আলগাভাবে টাকাগুলো ধরে রাখল মাত্র।

  এবার ব্যারিস্টার সাহেব ফিনিসিং টানল―‘শোন ছেলে, তোমার আব্বা আমাদের অহংকার। আমাদের কৃষকের অহংকার। কৃষি-সমাজে এমন জ্ঞানী মানুষ আমার জীবনে দ্বিতীয়টি দেখিনি। শেষ বয়সে তাকে মানুষের হাসির পাত্র হতে দিতে চাই না। আমরা চাই না তিনি একজন মানসিক রোগী হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাক। তিনি দীর্ঘদিন থাকুন আমাদের মাঝে।’ যেন একটা ছোটখাটো বক্তৃতা দিয়ে বসল ব্যারিস্টার। উঠানে মানুষ কম থাকলেও বাড়ির বাহির থেকে শত চোখ হামলে খাচ্ছে ভেতরটা। তাদের ইচ্ছা করল হইহই করে হাততালি দিতে, কিন্তু দিল না। অবশ্য তাদের আনন্দ ব্যারিস্টারের কথাতে নয়। তাদের আনন্দ মাস্টারের জন্য। ব্যারিস্টার যে গরগর করে মাস্টারের এতগুলো প্রশংসা-বাণী উচ্চারণ করল, এর জন্য। ব্যারিস্টারও তার পিএ-কে ইশারা করতেই সেও পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল মাস্টারের ছেলের হাতে গুঁজে দিল।

শেষ কথা বলল নগদপ্রার্থী।―‘শোন বাবা, এই এক লাখ টাকা নিয়ে কালই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিবে। আমার পিএ’র নাম্বারটা রাখো। তার সাথে যোগাযোগ করবে। সে-ই সব ব্যবস্থা করে দিবে। মাস্টারের যা অবস্থা দেখছি, তাতে দেরি করা মোটেও ঠিক হবে না।’

মাস্টারের ছেলে টাকা রাখবে না ফেরত দিবে তা বুঝতে পারল না। সে এখন পাথুরে মূর্তি। টাকার প্যাকেট দুটো এখনও তার হাতে। প্রার্থীদ্বয় উঠতে যাবে ঠিক এমন সময় একটা বিদ্যুৎ চমকালো। আকাশে মেঘ নেই, তবুও। তবে এই চমকাবার শব্দ শুধু প্রার্থীদ্বয় শুনতে পেল। তাদের উঠতে যাওয়া দেহ ধপ করে চেয়ারে বসে পড়া দেখে অন্তত তাই মনে হলো। বিদ্যুৎ নয়, জোরে গলা খেঁকারির শব্দ। বিদ্যুৎ-চমক না বলে একে গলা-চমক বলা যেতে পারে। তাসু মাস্টার বাড়িতে ঢুকল। বউ-বেটির অগোছাল কাপড় গোছগাছ করবার জন্য যেভাবে মানুষ গলা খেঁকারি দেয়, সেভাবে দিল মাস্টার। আর পাঁচ দিনের  মতো আজকেও দিল। তবে তার তাৎপর্য আজ ভিন্ন ঠেকল অতিথির কাছে, উপস্থিতির কাছে।

তাসু মাস্টার বাড়িতে ঢুকতেই প্রার্থীদ্বয় উঠে দাঁড়াল। মাস্টারই আগে সালাম দিল। কে একজন চেয়ার এনে দিতেই বসল মাস্টার। কুশলাদি বিশেষ তেমন হলো না। তাসুই শুরু করল; মুখে সৌজন্যের হাসি―‘আপনাদের জুতার ধুলো আমার বাড়িতে পড়াতে আমি কৃতার্থ। তাও আবার দুজন একসাথে এসেছেন, এ আমার সৌভাগ্য।’

‘না না স্যার, আপনি এভাবে বলছেন কেন ? বরং আপনিই আমাদের গর্ব।’ ব্যারিস্টার উঠে গিয়ে মাস্টারের পিঠ চাপড়াল। কয়েকটা হাততালির সমবেত আওয়াজ শোনা গেল। তারা নিজেকে খুব জোর করে এতক্ষণ আটকে রেখেছিল বোধহয়। এখন আর পারল না। একজন ব্যারিস্টার তাসুকে স্যার বলছে, এটা তাদের জন্য কম আনন্দের নয়। তাসু মাস্টার, এক বেড়ার ঘরের মাস্টার। তাও আবার অবৈতনিক মাস্টার। কয়েকদিন মানুষের গু পরিষ্কার করা মাস্টার। স্কুলটা স্কুল হয়ে ওঠার আগেই মাস্টার তার মাস্টারি জীবনে ইস্তফা দেওয়া মাস্টার। সেই তাসু মাস্টারকেই আজ সাবেক এক মন্ত্রী স্যার বলছে। যারা হাততালি দিল তাদের একজন নিজেকে আটকাতে পারল না যেন, জানালার যে রডটা ধরে উঁকি দিয়েছিল, তাতেই একটা জোর থাবড়ানি দিল। আর আস্তে করে হলেও বলে ফেলল―‘দ্যাখ শালা, কাদায় পড়া কাকে বলে।’ তবে এ কথা বাড়ির ভেতরে পৌঁছাল না।

‘যাই হোক, আপনারা এখানে যা যা করেছেন বা ঘটিয়েছেন, তার এ টু জেড আমি শুনেছি।’ নতুন করে গুছিয়ে আবার শুরু করল মাস্টার। প্রার্থীদ্বয় একে অন্যের দিকে বেভুল হয়ে তাকাল একবার―‘আপনারা আমাকে একটা জুতসই সার্টিফিকেটও দিয়েছেন। এক্ষেত্রে আপনারা যে মহান হবেন, তা আমি জানতাম। তাছাড়া যত সার্টিফিকেট দেবার গুরু দায়িত্ব তো আপনারাই নিয়েছেন। কে পাবে পাগলের, কে পাবে সন্ত্রাসীর, আর কে পাবে জঙ্গির। সে তো ঠিক করবেন আপনারাই। এমনকি প্রয়োজনে আইএস জঙ্গির তকমাও কারও ভাগ্যে জুটে যেতে পারে।’

‘দেখুন ভাই, আমরা কিন্তু একটা সহজ মন নিয়ে এখানে এসেছিলাম। আপনার মতো একটা জ্ঞানী মানুষ বিষয়টাকে এত প্যাঁচালোভাবে নিবে, তা মোটেও ভাবিনি।’ নগদ প্রার্থী তাসুর দিকে ঝুঁকে কথাগুলো বলল। ওদিকে ব্যারিস্টারের কপালে ভাঁজ। তবে ভেতরের চাপা ক্ষোভটা ভেতরেই চাপা থাকল, রুচিহীন হাসির আড়ালে।

‘সরি ভাই, পাগল মানুষ তো, পরিবেশের সাথে বোধহয় কথাগুলো মানালো না।’ মাস্টার ক্ষমা চাইবার ঢঙে বলল।

‘ছি ছি ওভাবে বলছেন কেন ?’ ব্যারিস্টার মাস্টারের হাতে হাত ঠেকাল। কিন্তু চট করে তাসু দাঁড়িয়ে তার বড় ছেলের কাছে গেল। টাকাগুলো হাত থেকে ছিনিয়ে নিল। এই বুঝি ছুড়ে ফেলে দিল তাসু। সেই মোতাবেক ঘরের চালার টুঁইয়ের দিকে কেউ কেউ তাকাল। কিন্তু তাসু টাকা ফেলল না। উল্টো ব্যারিস্টারের হাতে দিয়ে বলল―‘শুনুন ব্যারিস্টার সাহেব, চিকিৎসার জন্য টাকা আমার লাগবে না। কখনও যদি চিকিৎসা লাগে, তবে সেই সামর্থ্য আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। তাছাড়া টাকা যদি দিতেই চান, তবে তা দিতে হবে ভোটের মূল্য হিসেবে। আমি ভোটের মূল্য হেঁকেছিলাম দেড় লক্ষ টাকা। ব্যারিস্টার সাহেব, আপনি দু’ দু’বার মন্ত্রী ছিলেন, আর এই যে আপনি, এখন আমাদের এমপি। তাই দু’জনের সম্মানের কথা ভেবে ৫০ হাজার টাকা না হয় ছাড়ই দিলাম।’

এখন দু’চারজন বাড়ির মধ্যে ঢুকেছে। কারও মুখে কথা নেই। শুধু অপেক্ষার পালা; এরপর কী ঘটে। প্রার্থীরা দু’জনেই ক্ষেপেছে বোঝা যায়। যতটা রাগল ততটা প্রকাশ পেল না। নগদ প্রার্থী কী বলতে যাচ্ছিল, ব্যারিস্টার তাকে থামিয়ে দিল। সে জানে, নগদ প্রার্থী রাগ প্রকাশে কমতি রাখবে না। তাই তাকে থামিয়ে ব্যারিস্টারই বলল―‘মাস্টার সাহেব, আপনি জ্ঞানের মানুষ হয়ে কেন বেআইনি কথা বলছেন।

তাসু কিছুটা থমকাল। বোধহয় দম নিচ্ছে। তবে সে যে কাবু হয়ে থমকায়নি, তা ব্যারিস্টার বুঝে গেছে। যদিও তাসু কাবু হয়েছে ভেবে নগদ প্রার্থী মনে মনে হাসছে। তাসু ঝেড়ে কেশে নিল। জানালার ফাঁকে, দরজার চৌকাঠের গণ্ডিতে, উঠোনের চৌহদ্দিতে টানটান উত্তেজনা। পেছনের কোন ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ। এক বলে ৬ রান। একদিকে বল হাতে ইরফান পাঠান আর অন্যদিকে ব্যাট হাতে শহিদ আফ্রিদি। মনে মনে ভড়কে গেছে ব্যারিস্টার। তাসু পাঞ্জাবির হাতা কিছুটা গুটিয়ে চেয়ারে বসল। প্রার্থীদ্বয় দাঁড়িয়ে। তাসু বসতে বলল না। সকল সিদ্ধান্ত আজ তারই হাতে। যতটা আপমান বোধ করল ব্যারিস্টার, তার অধিক করল ব্যবসায়ী অর্থাৎ নগদ প্রার্থী। অথচ উপস্থিত সবাই এর মধ্যেই জয়মুকুট মাস্টারের মাথায় পরিয়ে দিয়েছে। তাসু আর একবার গলা ঝাড়ল। মনে হয় প্রার্থীদের এমন একটি কথার জন্য অপেক্ষা করছিল সে।―‘শুনেন ভাই, আমি আইনের ক্লাসে কোনওদিন পড়িনি। আইনের জ্ঞানে ঘাটতি থাকতেই পারে। কিন্তু আপনারা তো আইনের চাষ করেন, আইন তৈরি করেন। আপনারা কেন আইনের পোশাকে বেআইনি শরীর ঢেকে রাখেন ?’

‘কী বলতে চাচ্ছেন আপনি ?’ ব্যবসায়ীর চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। কথাতেও সেটি প্রকাশ পেল।

‘না আমি বলছিলাম, আপনারা কার ভোটে সংসদে যান ? শিল্পপতির নাকি কৃষকের ?’

‘দুজনেরই।’

‘তা শিল্পপতির ভোট বেশি, না কৃষকের।’

‘এখানে শিল্প বিপ্লব আবার কখন হলো ? কৃষকের ভোট বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক।’ রাগ আরও বেড়েছে নগদের। তবে ব্যারিস্টার এখন চুপ। এটাও হয়তো তার রাজনীতি। যা কানমলার তা মলে দিয়েছে। ব্যবসায়ী তুমি এখন লাফাও। শিল্প বিপ্লব না ঘটলেও এবার কিছু একটা যে ঘটতে যাচ্ছে, তা অনুমান করল ব্যারিস্টার। নগদ তুমি এখন লাফাও। এতে আমার পালে বাতাস লাগবে। লাগার সুযোগ আছে। তাসুর পালেও নতুন করে বাতাস লাগল। একপক্ষ যতটা রাগে, তো অন্যপক্ষ ততটাই ফুরফুরে হয়।―‘তাহলে কি এমপি সাহেব, শিল্পপতির এক ভোট সমান আমাদের, মানে কৃষকের এক হাজার ভোট।’

‘তা হবে কেন। ভোটমূল্য সবার এক। তাছাড়া শিল্পপতির ভোট কি আলাদা করে গণনা করা হয়? এটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, এখানে সবার ভোটাধিকার সমান। আমার জানা ছিল না যে, এই সহজ বিষয়টা আপনি জানতেন না।’ কিছুটা জ্ঞান ফলাল ব্যবসায়ী।

‘তাহলে সংসদে উল্টো হয় কেন ? যত বিল, যত আলোচনা, তা শিল্পপতিদের স্বার্থের বিষয় নিয়েই হয় কেন ?’

‘সংসদের ইতিহাসে কৃষকদের নিয়ে আলোচনা বা কোন বিল পাস হয়নি বুঝি ?’ ঠাট্টার মত শোনাল কথাগুলো।

‘অবশ্যই হয়েছে। তবে ভোটের অনুপাতে নয়, স্বার্থের অনুকূলে।’

‘মানে ?’

‘চমকে উঠছেন যে।’

‘আপনি কিন্তু কথাগুলো অন্যদিকে ঘোরাচ্ছেন।’

‘দেখুন মশাই…’

তাসুকে কথা শেষ করতে দিল না দু’জন। তারা তিড়িং করে লাফ দিল। যেন চেয়ার থেকে উঠল। যদিও তারা দাঁড়িয়েই ছিল। ঔৎসুক্য জনতা নিজেকে আর আটকাতে পারল না। একসাথে মুহুর্মুহু হাততালি দিতে লাগল। কেঁপে উঠল বাড়ি, কেঁপে উঠল গ্রাম। কাঁপল প্রার্থীদ্বইয়ের ভেতর দেশ। বাড়ির চালার মটকাতে কবুতর কতক বসে ছিল। তারাও বোধহয় পাখা-তালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল। উড়ে গেল আকাশী রঙের খোঁজে। এটাও প্রার্থীদ্বয়ের চোখ এড়াল না। তাদের মনে হলো, এ কবুতর উড়ে গেল তিতুমিরের বাঁশের কেল্লার টুঁই থেকে। কোন ফাঁকে দুজন সাংবাদিকও জুটেছিল সেখানে। তারা ছবি তুলতে ব্যস্ত। প্রার্থীরা বাহিরে চোখ ফেলতেই যা দেখল, তাতে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করল। ত্যাদড় ছোকরাদের প্রায় সবার হাতেই ঢাউস ঢাউস মোবাইল। তাতেই গিলছে পুরো দৃশ্য। এভাবে আসা কত বড় যে ভুল হয়েছে, তা দুজনেই মর্মে মর্মে বুঝল। এমন হিতে বিপরীত তাদের রাজনৈতিক জীবনে কখনও হয়নি। দু’জন দু’জনকে ইশারা করল। অর্থাৎ অনেক হয়েছে, চল যাই। তবু সৌজন্য বলে কথা। ব্যারিস্টার তাসুর পিঠে হাত দিয়ে কি যেন বলল। তবে জনতার  হইচইয়ে তা কেউ ঠাহর করতে পারল না। তারা বেরিয়ে গেল। তাদের পিএ তাসুর হাত থেকে টাকাটা আগেই নিয়েছে।

প্রার্থীদ্বয় গেল বটে কিন্তু জনতার ভিড় বাড়তে লাগল দ্রুত গতিতে। আরও দ্রুত গতিতে ভাইরাল হয়েছিল ঘটনাটা। শুধু তাসুর গ্রাম নয়, পাশের গ্রাম থেকেও আসতে শুরু করেছে মানুষ। কেউ শেষ দৃশ্য দেখতে পেয়েছে, আবার কেউ পায়নি। যারা পায়নি তাদের আফসোসের সীমা নেই। তাদের একমাত্র ঘোর বা ভরসা, খানিক আগে আসা শ্রোতা। উপস্থিতি এখন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বড়বড় আলোচনা করতে ব্যস্ত। তারাই বক্তা, তারাই শ্রোতা। আবার তারাই হাততালি দেয়, তারাই হুররে বলে বাতাসে কাঁপন তুলে।

॥ সাত ॥

যেন একটা সিনেমায় খুব দ্রুত ঘটে যাচ্ছে সব। কোন আর্টফিল্ম নয়, ঠিক ব্যবসা সফল ছবি। নাটকীয়তা আর নাটকীয়তা। এখন সিনেমাটা দেখছে সারা দেশ। বিশেষ ক্ষেত্রে বিশ্বও বলা যেতে পারে। ফেসবুক, ইউটিউব; সবখানে তাসু। তাসু মাস্টার। একটা জাগরণ। একটা বিশেষ শ্রেণির জাগরণ। এ জাগরণ কীসের ? চেতনার, সমতার, নাকি মজলুমের অধিকার আদায়ের। এভাবে যে যার মতো ব্যাখ্যা দিচ্ছে আর পোস্ট করছে নিজ নিজ পাতায়। বুঝে বা না বুঝে অতীতের অনেক ইতিহাস খ্যাত নেতার সাথে তুলনা করছে তাসুকে। ইচ্ছেমতো লিখছে ফেসবুকে। আইনের মধ্যে বা বাইরে; লিখছে ইচ্ছে মতো। তথ্য আইনও যেন দূরে বসে মিনি বিড়ালের মতো মিটিমিটি হাসছে। ভোটের আগে এমন একটা কাণ্ড ঘটবে, তা কারও অনুমানে ছিল না। স্থানীয় আসনের প্রার্থীরা তো বটেই, সারা দেশের কোন দল বা প্রার্থীরাও তা ভাবেনি। তবে সতর্ক হয়েছে সবাই। দেশের কোথাও কেউ যেন এটা নিয়ে কোন বিশৃঙ্খলা ঘটাতে না পারে। নেতাকর্মীরা যে যার জায়গা থেকে দায়িত্বে সটান।

মিনহাজ আর তাসু এখন এক সুতায় গাঁথা। এক সুরের সাধক। দু’জন কাজ করে দুই জায়গা থেকে। মিনহাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাসু গ্রামে। চলার পথ আলাদা, গন্তব্য এক। মিনহাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর একা নয়। সে এখন পরিণত হয়েছে একশতে। তার প্রধান সহচরী সেঁজুতি। মিনহাজ কাজ করে ছাত্রদের মধ্যে, সেঁজু ছাত্রীদের মধ্যে। আবার কখনও একসাথে। বিকালে বসে খোলা মাঠে। এক এক করে বাড়ছে তাদের কাজের পরিধি। যতটা পাগল মিনু, তার অধিক পাগল সেঁজু। সেঁজুর কাঁধে কী যেন ভর করেছে। এটা আর কেউ না বুঝুক, মিনু বুঝেছে তা ভালই। বিশেষ করে কাহারোল থেকে ফিরে সেঁজুকে এক পাগলামিতে পেয়েছে। এরমধ্যে তেভাগা’র ওপর লেখা একটা নিবন্ধও ছাপা হয়েছে স্থানীয় এক কাগজে। এখন অনেক কাজে বরং মিনহাজকেই সেঁজু পরামর্শ দেয়। তার পরামর্শ মিনুর যতটা না মনে ধরে, তার অধিক ধরে তাদের সাথে থাকা অন্যদের। মিনু বেশ উপভোগ করে সেগুলো।

অল্প ক’দিনেই তারা সব কাজ গুছিয়ে নিয়েছে। ক’দিন ধরে বিভিন্ন কমিটি উপকমিটিতে ভাগ হয়েছে। দেশের উত্তরের প্রায় প্রতিটি জেলার ছাত্রদের বেছে বেছে বের করে জেলা ভিত্তিক কমিটি করেছে। রাজশাহী আর রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজগুলো হলো পুরোদমে। কমিটি উপকমিটি নিজনিজ এলাকাতে গিয়ে যে যার মত উদ্বুদ্ধ করছে মানুষকে। সাড়াও দেয় মানুষ। কী বৃদ্ধ কী যুবক। কেউ আবার ঠোঁট উল্টায়। তবে এগিয়ে আসা মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের এই কাজকে আরও সহজ করে দিয়েছে বিভিন্ন মিডিয়া। জাবড় কাটতে কাটতে এতদিনে মিডিয়াগুলো যেন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। তারাই পারে অল্পতেই সারা দেশকে মাতিয়ে তুলতে। সে গুজবই হোক আর সত্য হোক। মাতিয়ে তুলবার মতো ঘটনা হলেই হলো। তা ছেলেধরা হোক, বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পানি পড়া হোক কিংবা চাঁদে মানুষ দেখাই হোক; খবর একটা হলেই হয়। হুজুক তোলা বলে কথা। বাঙালির রক্ত। হুজুকের আরকে সদা আসক্ত। তবে এবারের খবর মানুষকে জাগিয়েছে। যেভাবে জেগেছিল অতীতে, নিজের টিকে থাকার লড়াইয়ে। এবারও জাগল। রক্তক্ষরা নেই, আছে ক্ষরণ। পীড়ন নেই, আছে পোড়ানো। দাহ্য নেই, আছে দহন।

তাসুর কাছে এখন বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসছে দলে দলে। তাসুর কাছে নয়, তারা বরং আসছে আন্দোলনের শিকড়ে রসদ যোগাতে। যে যার মত করে এগিয়ে আসছে। অর্থ দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে সংহত করছে তাদের এই এগিয়ে যাওয়াকে। প্রতি শুক্রবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক দল ছাত্র-ছাত্রী আসছে তাসুর কাছে। মিটিং করে। আলোচনা করে তাদের পরিকল্পনা নিয়ে। তহবিল গঠিত হয় আগামীর জন্য। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে সবাই। মিনহাজের ভয়কাতুরে বাপও দিয়েছে মোটা অংকের চাঁদা। এদিক দিয়ে এগিয়ে আছে আরিফ মোল্লা। তার অর্থ, বুদ্ধি, সাহস আর গলা; সব কিছুতেই এগিয়ে আছে সে।

আজকেও বসেছে মিটিং। তবে আর পাঁচদিনের তুলনায় একটু ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএফআর গ্রুপের প্রতিটি উপকমিটির প্রধানরা এসেছে মাস্টারের উঠানে। দু’টি মাইক্রোবাস নিয়ে এসেছে তারা। নেতৃত্বে আছে মিনহাজ। তাসুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের প্রায় পঞ্চাশ জন মধ্যবিত্ত গোছের কৃষক আছে আজকের মিটিংএ। যুবক আছে আরও পঞ্চাশ জন। প্রায় দেড়শ জনের মিটিং। কয়েকটি রাজহাঁস জবাই হয়েছে। তাসুর বাড়ির পোষা হাঁস। বলা চলে অনেকটা গোপনেই হচ্ছে মিটিং। জানাজানি হলে নিশ্চিত উপচে পড়ত। তাদের আজ আলোচনা হবে জাতীয় নির্বাচনের আগের রোডম্যাপ নিয়ে। যা করবার তা এই ক’দিনের মধ্যেই করতে হবে।

সালাম ও নমস্কার নিয়ে প্রথমে শুরু করল তাসু মাস্টার। তার কণ্ঠে ছিল যথেষ্ট আবেগ। শক্ত মানুষটা ইদানীং বেশ আবেগপ্রবণ হয়েছে। একটুতেই বুকটা ভারী হয়ে উঠে। সে কখনও ভাবতে পারেনি, তার ছোঁড়া এই ছোট ঢিলটা এমন উথালপাথাল ঢেউ তুলবে। কাঁপাবে সমস্ত দেশ। নিজেকে সংবরণ করে বলল―‘আজ আমার মত সুখী ব্যক্তি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। এখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় খবর, তোমাদের মত যুবসমাজ এই কৃষকের কাতারে সামিল হয়েছ। আমাদের আর কেউ রুখতে পারবে না।’

‘দাদু, একটা সংশোধনী আছে। আপনি বললেন, আমরা কৃষকের কাতারে সামিল হয়েছি। আমরা আসলে নিজেদের কাতারেই নিজেরা সামিল হয়েছি। আমরা কৃষকের সন্তান, আমাদের রক্ত কৃষকের রক্ত। বলতে গেলে এতদিন আমরা কাতারবিহীন ছিলাম। আর সঠিক কাতার চিনিয়েছেন আপনি।’ একহাত উঁচিয়ে কথাগুলো বলল সেঁজুতি। কয়েকজন হাততালি দিয়ে সেঁজুতিকে বাহবা দিল। মাস্টার মনে মনে হাসে। হাসে সেঁজুর কথা শুনে। আবার হাসে সেঁজুর দাদু বলে ডাকাতে। কার সম্বন্ধে সম্বন্ধ মেলাল সেঁজুতি, এটা খুঁজে পেয়ে। এবার অনুমতি নিয়ে শুরু করল মিনহাজ―‘বন্ধুগণ, আমরা অনেকদূর এগিয়ে এসেছি, গন্তব্যে আমাদের পৌঁছাতেই হবে। এখন নির্বাচনের সময়। তাই হয়তো আমাদের ওপর খাড়া আসেনি। তবে আসতে পারে যে কোনও সময়। এর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। যা করবার নির্বাচনের আগেই করতে হবে। আপনারা ভয় পাবেন না, আর ভাববেন না আমরা একা। আমাদের পেছনে দাঁড়ানোর লোক এখন অনেকে হয়েছে। তবে এটাও ঠিক, পেছনে দাঁড়ালেও সবার কাঁধে হেলান দেওয়াযাবে না।’

‘তুমি ঠিক বলেছ ভাই। এখন আমাদের প্রতিটি ধাপ ফেলতে হবে খুব মেপে। তবে এটা ঠিক, বাংলাদেশের উত্তরের এই বরেন্দ্র অঞ্চল চিরদিনই কৃষক আন্দোলনে এগিয়ে ছিল। তেভাগা, আধি, কৃষক আন্দোলন সব হয়েছিল এই অঞ্চলেই। খুব বেশিদিন আগে নয়, দেশ স্বাধীন হবার পরেই ১৯৭৩ সালে আমাদের এই তানোর উপজেলাতেই হয়েছিল কৃষক আন্দোলন। এই আন্দোলনকে কখনও তারা বলেছে কৃষক আন্দোলন, কখনও তারা বলেছে খাদ্য আন্দোলন, আবার কখনও বলেছে গোলা দখল আন্দোলন। তাদের আন্দোলনের পথ সঠিক ছিল না হয়তো, তাই তাদেরকে মরতে হয়েছে। দেখবে এখনও তাদের গণকবর আছে শিব নদের ধারে। খাদ্য গুদামের পাশে। তবে আমাদের আন্দোলন সবার থেকে আলাদা। এটা সরকারের বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন নয়। আমরাও সরকারের সাথে থাকতে চাই। আসলে আমাদের সাথে সরকারকে নিতে চাই। আর এই বিষয়টা সরকারকে সঠিক পদ্ধতিতে জানান দেওয়াই আমাদের প্রধান কাজ।’ একটা লম্বা বক্তব্য দিয়ে ফেলল মাস্টার।

‘দাদার কথার রেস ধরে বলতে চাই, তাদের পথ আর আমাদের পথ সম্পূর্ণ আলাদা। আমি ক’দিন আগেই দিনাজপুরের কাহারোল গিয়েছিলাম। দেখে এসেছি তেভাগা চত্বর। শুনে এসেছি তেভাগা আন্দোলন চরমে পৌঁছেছিল কীভাবে; সেই সম্পর্কে। সেখান থেকে এসে আমি কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস যতটুকু সম্ভব পড়েছি বা এখনও পড়ছি। তাদের আর আমাদের বিষয় কৃষক হলেও আমরা আলাদা। তারা এক সময় রাজনীতিবিদদের পুঁজিতে পরিণত হয়েছিল। আমরা তা হতে চাই না। কারণ আমরা উঠতে চাই না রাজনীতির মঞ্চে। বরং রাজনীতিবিদদের সহযোগিতা করতে চাই। আমরা চাই কৃষকরা তাদের ফসল ফলাক আনন্দের সাথে। যে আনন্দ ছড়িয়ে থাকুক পরিবারের সকল সদস্যের মুখে।’ সেঁজুতির কথা শেষ হতেই সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। সবচেয়ে বেশি শব্দ হলো মিনহাজের তালিতে। এরপর এক এক করে আরও কয়েকজন বক্তব্য দিল। বক্তব্য দিল আরিফ মোল্লাও। তার বক্তব্য অবাক করল সবাইকে। উপস্থিতির অনেকেই ভাবতে পারেনি মোল্লার মত লোক এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে। কথা বলল অনেকেই। শুধু কথা নয়, তহবিলও গঠন হলো। খাতাতে তালিকা হলো, কে কত টাকা দিবে, কে কোন দায়িত্ব পালন করবে। সিদ্ধান্ত হলো তাদের দাবি, উদ্দেশ্য আর সাদামাটা কিছু কথা লিখে ছোট ছোট লিফলেট ছাপা হবে। যাতে আইনের পরিপন্থী বা সময়ের পরিপন্থী কিছু থাকবে না। সেটাই প্রচার হবে সপ্তাহ ধরে। তার পরে হবে সবাইকে নিয়ে এক মিটিং। মোল্লা নিজে থেকেই বলল, লিফলেট ছাপাতে যা খরচ হবে তার সব টাকা দিবে সে নিজে। এভাবে আরও কয়েকজন মোল্লা গোছের কৃষক নিজে থেকেই কিছু দায়িত্ব কাঁধে নিল।

॥ আট ॥

তাসু মাস্টার বুঝে গেছে খুব তাড়াতাড়ি কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। এটা আরও ভালো করে বুঝে গেছে বিএফআর গ্রুপের সবাই। এদিকে ঘটে গেছে আরও এক কাণ্ড। শুধু সরকারি দল ছাড়া বাকিরা এই আন্দোলনের পক্ষে সাফাই গাইছে। কেউ আকার-ইঙ্গিতে কেউ সরাসরি। বাম দলগুলোর অনেক নেতা সরাসরি এসে দেখা করে গেছে তাসু মাস্টারের সাথে। দেখা করেছে মিনহাজের সাথে; তার গ্রুপের ওপরের সাথে। তারা যেন ব্যর্থ সব আন্দোলনের  সফলতার সূত্র খুঁজছে এই জেগে ওঠার মধ্যে। প্রধান বিরোধী দল এখন বেশ সরে এসেছে নগদের কাছ থেকে। ক’দিন আগেও যারা তাসু মাস্টারের ব্যাপারে এক ছিল। আজ তারা সুর মেলায় তাসুর সুরে। কৃষকের এই দুর্দশার জন্য দায়ী করে নগদ সরকারকে। তারা ভুলে যায়, তাদের সময়ে কৃষক গুলি খেয়ে মরবার কথা। তাদের নির্বাচনী ইস্তিহারে নতুন করে যোগ করে কৃষকের ন্যায্য অধিকারের কথা। তারা ক্ষমতায় গেলে তাসুসহ সকল কৃষকের ন্যায্য দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া হবে। এভাবে হাজারো প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুখ ফেনায়।

জাতীয় নির্বাচনের আর ১৫দিন বাকি। যা করবার তা আগামী সাতদিনের মধ্যেই করতে হবে। আর এ বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই। এই মর্মে এক জরুরি মিটিং ডাকা হলো। এবার তাসু মাস্টারের বাড়ি নয়; মিটিং ডাকা হলো আরিফ মোল্লার বাড়ি। সিদ্ধান্ত হলো জনসভার, ঠিক হলো তারিখ। ভোটের সাতদিন আগে। উদ্দেশ্য জনসভা বা লোক সমাগম হলেও ব্যানারে পোস্টারে থাকবে অন্য। যা প্রশাসনের অনুমতি পেতে সহায়তা করবে তা। মিটিংএ উপস্থিত সবার কথার এক কথা হলো, লোহা গরম থাকতেই পেটাতে হবে।

তবে এটাও মনে মনে ঠিক করল, আগামী আট দশদিন অন্তত কিছু ঘটবে না। ব্যারিস্টার বলি আর ব্যবসায়ীই বলি, তারা অতটা কাঁচা কাজ করবে না। যতই খ্যাপা নেকড়ে হয়ে উঠুক না কেন, অতবড় ভুল তারা করবে না। এখন যেটাই ঘটুক, সব দোষ সরাসরি পড়বে তাদের ওপর। তাই তাসুদের যা করবার তা করতে হবে এই কদিনে মধ্যেই।

তাসুর ভোট-বিক্রির ক্যাম্প এখন আর নেই। তা হয়েছে আন্দোলনের ক্যাম্প। সেই মোড় এখন আন্দোলনকারীদের মোড়। কৃষকের মোড়। মোড়ের চেহারাতে এখন জৌলুস এসেছে। বিজলি বাতি ঝিলমিল করে জ্বলে উঠে সন্ধ্যা হতে না হতেই। ভাটা পড়েছে বাজারের মধ্যে। বাজারে লোকজন তেমন বসে না; যা বসে তা মোড়ে। মোড়ের দু’পাশে নতুন করে আরও দু’টো চায়ের দোকান বসেছে। তাসুকে বাইরে তেমন দেখা যায় না। বলতে গেলে বাড়িতেই থাকে। অবশ্য তাসু এখন কোথায় থাকে বা কী করছে সেদিকে কারও খেয়াল নেই। এখন যেন সবাই তাসু। তবে একটা ব্যস্ততা যে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, তা সহজেই বোঝা যায়। কার্তিক মাস। খেত-খামারে কাজ নেই। তাই এখন তারা নতুন কাজে ব্যস্ত। অন্তত এটুকু বোঝা যায়, যে যার দায়িত্ব নিয়ে শুধু ছুটছে আর ছুটছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র এসেছে এই গ্রামে। এই এলাকায়। এই থানায়। তারা যে সবাই এই এলাকার, তাও নয়। অন্য উপজেলার বা জেলারও। পরিকল্পনা এঁকে বিএফআর গ্রুপের অন্যদের সাথে এসেছে। এসেছে সামনের জনসভা সফল করতে। তারা ছুটছে দিগি¦দিক। দলীয় প্রার্থীদের কর্মীরা যেন বুঝে উঠতে পারছে না, এরা কী করছে আর কী করতে যাচ্ছে। এরা কখন মিটিং করছে আর কীভাবেই বা কাজ ভাগ করে নিচ্ছে। ৭৩-এ যেমন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্টদের কার্যক্রম মানুষ ঠাহর করতে পারেনি; ঠিক এখন পারছে না এদের। পার্থক্য শুধু এটুকু; তারা লুট করেছে থানা, লুট করেছে গোলা; আর এরা লুট করছে মানুষের মন।

॥ নয় ॥

ফেইসবুক, ইউটিউব, টুইটারে এখন একই বিষয়। বাংলাদেশ কৃষক অধিকার আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগ, নাট্যকলা বিভাগ ও অন্যান্য শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, যারা বিএফআর গ্রুপের সদস্য; তারা কেউ গান লিখেছে, কেউ গেয়েছে, কেউ অভিনয় করেছে, কেউ আবার এক মিনিটের বা ত্রিশ সেকেন্ডের ডকুমেন্টরি করে ছেড়েছে নিজ নিজ আইডিতে। ছেড়েছে বিএফআর গ্রুপের পাতায়। চায়ের দোকানে, মোড়ে, আড্ডায় এখন একই আলোচনা। কৃষক অধিকার আন্দোলন। যুবকরা বৃদ্ধকে দেখায় মোবাইল। বৃদ্ধ ডাকে আর এক বৃদ্ধকে। সবার এক কথা, যেতে হবে তাসু মাস্টারের মিটিংয়ে।

এভাবেই খবরটা ছড়িয়ে পড়ল দিগি¦দিক। খবরটা হয়তো প্রকৃতিও জেনেছে। প্রকৃতি আজ বড় ফুরফুরে। রোদ আছে, তাপ নেই। বাতাস আছে, তীব্র গতি নেই। যেভাবেই হোক সবাই জেনেছে। ফেইসবুকে হোক, টুইটারে হোক, মোবাইলের মাধ্যমে হোক আর বিভিন্ন কমিটি, উপকমিটির মাধ্যমেই হোক; জেনেছে সবাই। অতীতে জসীমউদ্্দীনের ‘বেদের মেয়ে’ কিংবা ‘মধুমালা’ নাটক রেডিওতে প্রচারের খবর যেভাবে ছড়িয়ে যেত সারা দেশে, ঠিক সেভাবে ছড়াল।

তারা এত অল্প সময়ে এত বড় এক আয়োজন যে করে ফেলবে, প্রার্থীদ্বয় বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারেনি চিকন মাথার রাজনীতিবিদরা। বুঝতে পারেনি টকশো করা বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই। ভাবতে পারেনি, মাঠ জুড়ে সার সার খুঁটি না পুঁতে, কাপড় না টাঙিয়ে, পুরো আসমানকে সামিয়ানা করে সভামঞ্চ, সভা-মাঠ সরগরম করে তুলবে। না আছে পোস্টার, না আছে মাইকিং। তবে মানুষ সবাই জেনে গেছে, আজকে সভা হবে। কৃষকের পক্ষের সভা।

থানা থেকে সভা করবার অনুমতিও তারা নিয়েছে। কোন তৃতীয় শক্তি এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছে। বিভীষণ সবখানেই থাকে। দেশে, দলে, মহলে, গোষ্ঠীতে কিংবা প্রতিষ্ঠানে। তাছাড়া জনসভা এমনটা হবারও কথা ছিল না। অনুমতি নেবার দরখাস্তে ছিল না তাসুর কথা। কথা ছিল, কৃষকের কিছু দাবি লিখিত আকারে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পেশ করবে। তার জন্যে কৃষকেরা একত্রিত হতে চায়। টিভি চ্যানেলগুলো বিভিন্ন অর্থবছরের বাজেটের সময় কৃষকদের নিয়ে যেমন আয়োজন করে, তেমন। স্থানীয় প্রার্থীরাও বিষয়টা নিয়েছে সহজভাবে। বাধা দেবার চেষ্টা করেনি। বরং মিটিমিটি হেসেছে। ভেবেছে তারা যা যা দাবি করবে তার সবটাই মেনে নেবে। প্রয়োজনে আরও দু একটি দাবি জোড়া দিবে। বলবে, এই দাবিটাও আপনাদের তালিকায় থাকা উচিত ছিল।

কৃষকসভার জন্য বেশ জুতসই জায়গা বেছে নিয়েছে তারা। জেলা পরিষদের রাস্তার সাথে লাগোয়া মাঠ। গ্রাম থেকে বাহিরে। বেশ সুনাম ছিল মাঠটার। এক সময় এই মাঠে জমকালো আয়োজনে হতো ফুটবল খেলা। খেলা হতো ওমুক গ্রামের মণ্ডলের দলের সাথে তমুক গ্রামের মণ্ডল দলের। খেলা হতো এক ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দলের সাথে পাশের ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দলের। জাতীয় দলের খেলোয়াড়ও কেউ কেউ নিয়ে আসত ভাড়া করে। মানুষ আর মানুষ। দূর থেকে কালো কালো মাথা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ত না। আর শোনা যেত হইচই। খেলা শেষ হবার পর দু’ঘণ্টা লেগে যেত আশপাশের রাস্তা ফাঁকা হতে। পরপর দুই বছর মারামারি হওয়াতে বন্ধ হয়ে গেল খেলাটা। এলাকাতে বলা চলে একটা শোক নেমে এসেছিল এতে। এতদিনে বোধ হয় সেই শোকটা কাটিয়ে উঠল মানুষ। সেই মাঠেই সাজানো হয়েছে মঞ্চ। এই মাঠের পাশে ছোট বাজার। সপ্তাহে একবার হাটও বসে। মফস্সলে এমন জনসমুদ্র এর আগে দেখেনি কেউ। হাজার হাজার মানুষ। মাঠ উপচে জমির আলে, রাস্তার ওপরে, হাট-চালার নিচে; মানুষ আর মানুষ। তিন-রাস্তার মাথায় উঁচু কালভার্ট। এর উল্টো দিকে মঞ্চ পাতা। পাকুর গাছে, খানিক বাদে গভীর-নলকূপের ছাদে, হাট-চালার টুঁইয়ে জোড়া জোড়া মাইক। খানিক দূরে ধানক্ষেতের মধ্যে আর একটা ছোট মাঠ। স্কুল মাঠ। স্কুল নেই; মাঠ আছে। একটা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল সেখানে। দলীয় কোন্দলে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি। দেয়ালের শেষ চিহ্ন এখনও আছে। সেই মাঠ এখন উপচে পড়ছে মানুষে। মাঠের চারদিক ধানক্ষেত। কার্তিক মাসের মধ্যভাগ। ধানে সোনালি রং। বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে ধান ধান খেলা। সবুজ আর সোনালী রঙের মান-অভিমান যেন তুঙ্গে। তৃতীয় কাউকে ডাকছে এই মান ভঞ্জনের জন্য। সবুজের মাথায় খেলে যায় আত্মহারা সোনালি ঢেউ। হাজারও কৃষক যেন এসেছে তাদেরই ডাকে সাড়া দিয়ে। অথবা কৃষকের এই জনারণ্যে সাড়া দিয়ে তারা মাথা দোলায়। ক্ষেতের আলে বা ক্ষেতের মধ্যেও মানুষ। ধান আর মানুষ একাকার। মানুষের চাপে ধানের থোপ১০ যে কিছু ভাঙছে না, তা নয়। ক্ষেতালরা১১ এতে বাধ সাধে না। বড় কিছু পাবার আশা বাধ সাধতে বাধা দেয়।

‘বন্ধুগণ, আজকের এই ঐতিহাসিক জনসভায় আপনাদের স্বাগতম…।’

এক এক করে মঞ্চে উঠতে লাগল নেতারা। কৃষক-নেতা। আজকে সবাই নেতা হয়ে উঠেছে। প্রতি ইউনিয়ন থেকে একজন একজন করে বলছে। তাদের বলবার ধরনে অবাক হয় সবাই। এরা যে নেতার মত কথা বলছে। বুকের দমকে সামাল দেবার সময় পায়ের গোড়ালি ওঠাবার ঢঙটাও চমৎকার। তর্জনী হাঁকিয়ে বলে চলে যে যার মতো। কেউ আবার ইচ্ছা করেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্টাইলটা ধার করতে চায়। কেউ তার কাছাকাছি গিয়ে ফিরে আসে। কেউ আবার ব্যর্থ হয় ষোলআনা। তবে এরা যে বেশ কাঁপন তুলছে, এটা ঠিক। কাঁপন তুলেছে মাটিতে, মঞ্চে, মাঠ ভরা ধানে আর মানুষের মনে। গ্রামের কৃষক এমন গুছিয়ে কথা বলা শিখল কবে ? সবার কপালে এখন ভাঁজ।

‘সম্মানিক কৃষক-জনতা। আপনারা জানেন, আজকের এই কৃষক-সভা, অধিকার আদায়ের সভা। এ সভা অনেকের বুকেই কাঁপন তুলেছে।…’

কোন উপস্থাপক নেই, আসন গ্রহণ নেই। নেই সভাপতি, প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি। তবু চলছে সভা। নিয়মের ব্যত্যয় কোথাও ঘটেনি। মঞ্চের সাজও বেশ পরিপাটি। তবে ভিন্ন মাত্রার। ব্যতিক্রম। ঝাড়বাতি নেই, লম্বা ঝারল নেই; তবু চোখ ধাঁধানো। মঞ্চের ওপরে চারদিকের বাঁশে ঝুলছে কোদাল, ডালি, ঝাঁটা, কাস্তে, নিড়ানিসহ সমস্ত কৃষি উপকরণ। যেন সাদা-কালো দিনের ‘সুজন সখী’ সিনেমার নায়িকার কোমরে বিছা ঝুলছে। কৃষি-বিছা। আধুনিক যন্ত্রপাতিও কিছু রাখা আছে সামনে। যে যার মত করে ছবি তুলছে; মঞ্চের, মঞ্চে দাঁড়ানো নেতার। স্ট্যাটাস দেয়, শেয়ার করে। বলতে গেলে লাইভ প্রোগ্রাম। মঞ্চে উঠেছে চারজন ছাত্র। সেঁজুতিও আছে তাদের মধ্যে। বাকি ছাত্ররা যে যার মত মোবাইল, ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত। কেউ ভিডিও করে, কেউ ছবি তোলে, কেউ আবার লাইভ দেখাতে ব্যস্ত।

‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা।…’ এবার উঠল সেঁজুতি।

জনতার মধ্যে থেকে একটা স্লোগান পরপর দুইবার উচ্চারিত হলো। জয় কৃষকের জয়। যেন কোন সম্রাটের আগমন ঘটল তার পরিষদে। তবে জয়ধ্বনি সম্রাটের নামে হলো না; হলো কৃষকের নামে।

‘বন্ধুগণ, আমি মেয়ে, তবে কৃষকের মেয়ে। আমার মা কৃষকের বউ, কৃষাণী। আমার শরীরে কৃষকের রক্ত। আমার শরীর ঘামলেও লবণ বের হয়। আমার দেশ কৃষকের দেশ। কৃষকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে আর কিছু লঙ্ঘিত হতে বাদ থাকে না। আমাদের দাবি একটাই, কৃষকের সম্মান ফিরিয়ে দিতে হবে…।’ বলে চলে সেঁজুতি। বলাতে ঝড়ের গতি।

প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়া, বিবিসি বাংলা থেকেও সাংবাদিক এসেছে। যে যার মত ব্যস্ত। কেউ ছবি তুলতে, কেউ রেকর্ড করতে, আবার কেউ ভিডিও করতে।  নিজ নিজ জায়গা থেকে সবাই ব্যস্ত। উপস্থিত জনতার সবাই যেন কোন না কোন দায়িত্ব নিয়ে এসেছে সেখানে। সবাই স্বেচ্ছাসেবক।

সেঁজুতির বক্তব্য শেষ হতেই একটা মিউজিক বেজে উঠল। মিউজিকের সাথে একটি কণ্ঠ। সুকান্তের কবিতা। আবৃত্তি শিল্পী যে বেশ নাম করা তা আবৃত্তিতে বুঝা গেল। মিউজিক আর আবৃত্তিতে এক মোহাবিষ্ট পরিবেশের সৃষ্টি হলো। মনে শিহরণ এনে শরীরের প্রতিটি পশম দাঁড়িয়ে গেল তরতর করে। কবিতা ‘এই নবান্নে।’

এই হেমন্তে কাটা হবে ধান

আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান―

পোষপার্বণে প্রাণ কোলাহলে ভরবে গ্রামের নীরব শ্মশান।

.. .. .. .. …

এবার নতুন জোরালো বাতাসে

জয়যাত্রার ধ্বনি ভেসে আসে,

পিছে মৃত্যুর ক্ষতির নির্বাচন―

এই হেমন্তে ফসলেরা বলে: কোথায় আপনজন ?

.. .. .. ..

এবার উঠল মিনহাজ। সালাম, নমস্কার, শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করলেও মানুষের মন এখনও কবিতার ঘোরে। অন্য সময় কবিতা তারা না বুঝলেও সময়, আয়োজন, বিষয় আর উপস্থাপনের জন্য কবিতা সবার মর্মে পৌঁছাল। কবিতা ও কৃষক, আবাদ ও ফসল, ফসলের মূল্য আর আজকের এই আয়োজন সব এখন একাকার।

মিনহাজের বক্তব্যে গতি বাড়ছে ক্রমশ। যারা তাকে চেনে, তারা বিশ্বাস করতে পারছে না, এ কোন মিনহাজকে দেখছে আজ।  এলাকার মধ্যে নামকরা ছাত্র সে। ভদ্র আর বড় সাদাসিধে বলে একটা পরিচিতিও আছে। কাছের কেউ কেউ জানে, তার কবিতা লেখার কথা। তারা জানে, মিনহাজ কোন রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। তবে এমন পাকা পাকা কথা, গোছাল কথা কী করে বলছে ? যেন তুখোর এক নেতা।

‘বন্ধুগণ, রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানরা কখনও ভাবেনি কৃষকেরা এক হতে পারেন। তারা অধিকার আদায়ের জন্য ফুঁসে উঠতে পারেন। কিন্তু তারা ভুলে গেছে কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস। ভুলে গেছে ভাসানীর কাগমারী সম্মেলনের কথা, ভুলেছে তেভাগা আন্দোলনের কথা।…’

মিনহাজ যেন কৃষক আন্দোলনের সংগ্রামী অধ্যায়গুলো এক এক করে পাঠ করতে লাগল। মিনহাজ জানে, সম্মেলনের উপস্থিতির জন্য এই কথাগুলো কিছুটা বেমানান। বেমানান তাদের আন্দোলনের সাথেও। তবুও বলছে। জনতা না বুঝলেও খবরের বাক্যগুলো শক্ত করতে হলে কথাগুলো দরকার। বিশ্বকে জানাবার গতি বাড়াতে কথাগুলো দরকার। তাছাড়া প্রতিটি আন্দোলনের গল্পের শেষটার সাথে তাদের আন্দোলনের একটা মিলন ঘটাতে থাকে মিনহাজ। এতে হাততালিও পড়ে মুহুর্মুহু। মাথা দোলায় তেঁতে ওঠা ক্ষেতের সোনালি ধান। ধাক্কা খায় এক শীষ অন্য শীষের সাথে। তারাও ফিসফিস করে কথা বলে হিসহিস শব্দে। যেন কুহুক এসেছে শীষে ও তার দুলুনিতে।

হঠাৎ একটা গুঞ্জরণ ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, কেউ মৌচাকে ঢিল ছুঁড়েছে অথবা মৌয়ালের তাড়া খাওয়া মৌমাছির ঝাঁক ছুটে আসছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। একে অন্যের দিকে কয়েকবার চাওয়া-চাওয়ি করতেই মঞ্চের দিকে সবার নজর ঠিকরে পড়ল। মঞ্চে তখন তাসু। তাসু মাস্টার। কোন ঘোষণা ছাড়াই স্পিকারে মুখ দিলো তাসু। এটাও হয়তো পরিকল্পনার অংশ। উপস্থিত জনতা যতটা অবাক হলো, তার অধিক অবাক হলো বিপরীত পক্ষ। একের পর এক বিজলি চমকাতে লাগল মঞ্চে। যদিও মঞ্চে বিজলি বাতি ছিল না। আকাশে ছিল না মেঘও। এগুলো চারদিক থেকে ভেসে আসা ক্যামেরার ঝলকানি। সাংবাদিকের ক্যামেরা। এবার চারদিক থেকে ভেসে এলো এক এক করে বিভিন্ন স্লোগান। বিভিন্ন আবাদীরা ভাগ ভাগ হয়ে সারা মাঠ জুড়ে বসেছে। সেটা বুঝা গেল তাদের স্লোগানে। মাঠের মধ্যে থেকে এল―জয় কৃষকের জয়। কোণা থেকে এল―জয় আলুচাষীর জয়। অন্য কোণা থেকে এল―জয় ধানচাষীর জয়। এভাবে এলো পটলচাষী, গমচাষীসহ আরও অনেক চাষীর স্লোগান।

‘ভাইয়েরা আমার। আমি তাসু…।’

তাসু শব্দটা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে পারল না। নিচের দিকে মুখ করে গামছা দিয়ে দু’চোখ কয়েকবার মুছল। ভেতরের কান্না যেন আর বাঁধ মানছে না। বুক ভর্তি কয়েকবার বাতাস ধরে আর ছেড়ে হালকা হবার চেষ্টা করল মাস্টার। স্পিকারটা একহাতে ধরে আবার শুরু করল―‘আমি তাসু।’

হাউমাউ করে আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল। পেছন থেকে মিনহাজ একগ্লাস পানি দিতেই দ্রুত খালি করল গ্লাসটা। চোখ দু’টো মুছতেই যেন একটা তাড়া অনুভব করল মাস্টার। এমন সময় আবার বেজে উঠল সেই আলো-আধারির মৃদু মিউজিক। তাসুর কণ্ঠে এবার উচ্চারিত হতে লাগল সুকান্তের ‘দুর্মর’ কবিতাটি। আবৃত্তি শিল্পীর মত কড়ায়-গণ্ডায় না হলেও মাস্টারের আবৃত্তি শুনে বোঝা যায়, সে অনেকদিন ধরেই এই কবিতাটি চর্চা করেছে। হয়তো আজকের জন্যই বেশি করে করেছে।

হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ

কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,

.. .. .. ..

হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন

জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,

গত আকালের মৃত্যুকে মুছে

আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ।

‘হয় ধান নয় প্রাণ’ এ শব্দে

সারা দেশ দিশাহারা,

একবার মরে ভুলে গেছে আজ

মৃত্যুর ভয় তারা।

.. .. ..

কবিতা শেষ হতেই ভেসে এলো স্লোগান―জয় কৃষকের জয়। এক মিনিট দম নিল তাসু। অবাক হলো সবাই। মঞ্চের ওপরের মঞ্চের নিচের। সবাই। তাসু শুরু করল আবার―‘কৃষক জনতা। আমি তাসু মাস্টার। মাস্টার না হয়েও আপনাদের কাছে আমি মাস্টার। আমি যেই সাইনবোর্ড টাঙিয়ে শুরু করেছিলাম, তা অনেক আগেই নিজ হাতে নামিয়ে ফেলেছি। আমি জানি সেটা সঠিক পথ ছিল না। তবে ভুল পথ দিয়েই আজকের এই সঠিক পথ খুঁজে পেয়েছি। আমরা আজ একই পথের পথিক। জয় কৃষক জনতার জয়।’ সবাই একইভাবে আকাশ, বাতাস আর ধানক্ষেত কাঁপিয়ে আবারও সমস্বরে বলল―‘জয় কৃষকের জয়’।―‘বন্ধুগণ, আমরা মন্ত্রী হতে চাই না। সংসদ নেতাও হতে চাই না। আজ আমরা প্রতারণার শিকার, শোষণের শিকার। প্রতারিত হচ্ছি যুগযুগ ধরে। ইংরেজ আমলে, পাকিস্তান আমলে এবং এখনও। বৃটিশ বেনিয়ারা আমাদের দিয়ে জোর করে নীল চাষ করিয়েছে। পাকিস্তান আমলে আমরা পাট চাষ করেছি; লাভ তুলেছে পশ্চিম পাকিস্তান। আর এখন লাভবান হচ্ছে রাঘব বোয়ালেরা। আমার বিশ্বাস, এখন থেকে আর এমনটি হবে না। জয় কৃষক জনতার জয়―বন্ধুগণ, বাসে আগুন লাগলে, কারখানায় আগুন লাগলে মালিকপক্ষের তেমন একটা ক্ষতি নেই। কারণ তাদের ইনসুরেন্স আছে। আর আমাদের হাজার একর জমির ফসল বন্যায় তলিয়ে গেলে, খরায় পুড়ে গেলে, শিলাবৃষ্টিতে ক্ষেতের ধান ঝাটা হলে, জমির আলে যতই ফিট হও, ডুকরে কাঁদো; এতে কারও কিচ্ছু যায় আসে না। কারণ আমাদের চাঁদায় তাদের পার্টি চলে না। আমাদের প্রয়োজন সে তো একবারই, ঐ নির্বাচনের সময়। আমরা ১০০ টাকায় বিক্রি হই। কিন্তু আর নয়। একবার অন্তত বিমুখ হই। বন্ধুগণ, তারা হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপি করলেও সেটা হয় সামান্য টাকা। আর আমরা হাজার টাকা দিতে না পারলে কোমরে দড়ি উঠে। ভাইয়েরা আমার, প্রত্যেক ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আমাদের কমিটি গঠন করতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় নির্বাচনে আমরা মনোনীত প্রার্থী দাঁড় করাব। আমরা রাজনীতির কাজে নাক সিটকিয়ে আর দূরে থাকব না। আমাদের সন্তানদের বলব না, খবরদার ঐ নোংরা কাজে তুমি যাবে না। রাজনীতি মানে ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য লড়া, মানব কল্যাণে লড়া, দেশ ও জাতি গঠনে লড়াই, বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য লড়াই। আমি থাকি বা না থাকি, এতে কিচ্ছু যায় আসে না। আপনাদের মাঝে যে দ্বিপ্ততা আজ দেখছি, তা কখনও নিভে যেতে দিবেন না।…’ চারদিক থেকে মাঝে মাঝে স্লোগান গর্জে ওঠে। কখনও জয় কৃষকের জয়, কখনও জয় কৃষি-বাংলার জয়, আবার কখনও জয় আজকের জনসভার জয়। তবে তাসু মাস্টার থামে না। বাঁধ ভাঙা গতি। বিশ মিনিট এদিকে পেরিয়ে গেছে। রাস্তায় যত মানুষ তত গাড়ি। চলন্ত পথিক যে যার যানবাহন নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সবাই অবাক বিস্ময়ে শুনছে তাসুর বক্তৃতা। সবচেয়ে অবাক হয়েছে মঞ্চে বসা কয়েকজন। মিনহাজ ভাবছে, আমরা কী লিখে দিলাম আর মাস্টার কী বলছেন! আমাদের ১৩ দফা গেল কোথায় ? মাস্টার যে সবকিছু একদফাতে নিয়ে আনল। তবে তাসুকে কেউ আটকায়নি। বলেই চলে তাসু। সে এখন নির্ভার। তার সামনে যেন শত কোটি জনতা। পৃথিবী বিখ্যাত জনসভাগুলোও যেন আজকের সভার কাছে হার মানে। আকারে, আয়োজনে, বিষয়ে, বক্তৃতায়। জয়ধ্বনি শুধু মানুষের মধ্যেই যেন নেই, ছড়িয়ে পড়েছে ভরা মাঠের প্রতিটি ধানের ডগায়। তারা কার্তিকের হাওয়ায় মাথা দোলায় স্লোগানের তালে তালে। তবে তারা বলছে একটু আলাদা কথা। বলছে―জয় তাসু মাস্টারের জয়। এমনটাই শুনছে তাসু। আর এই স্লোগানই তার শক্তি আর গতি বাড়ায়। ধান-ক্ষেত, ক্ষেতের পাখি, গাছপালা, হাটচালা, দোকানপাট, রাস্তায় দাঁড়ান গাড়ি, সবাই টগবগিয়ে ফুটছে তাসুর ভাষণে। তাসু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সেটি। তাসু কেন, আজ সবাই পাচ্ছে। শুধু কৃষকেরা যে এমন একটা সভা করতে পারে, তা তাদের জানা ছিল না। জানা ছিল না উপস্থিত সাংবাদিকদেরও। এখন দরকার কোন এক নির্মলেন্দু গুণের।

অকস্মাৎ মৌচাকে ঢিল পড়ল। বিকট শব্দ হলো দ্রিম-দ্রিম! হয়তো পটকা। মানুষ ভাবল অন্যকিছু। শব্দ দুটিই হলো। ছোটাছুটি শুরু হলো দিগি¦দিক। যে যেভাবে পারছে ছুটছে। পাকা ধানক্ষেতকে আর ধানক্ষেত মনে হলো না। মনে হলো সমানে রাস্তা। জান না থাকলে ধান দিয়ে কী হবে। এরধ্যেই দানবীয় গর্জন তুলে ছুটে এলো আইন-শৃংখলা রক্ষাকারীর গাড়িবহর। ততক্ষণে মাঠ প্রায় ফাঁকা। যা টিকে আছে, তা সাংবাদিকের ক্যামেরা হাতে ছোটাছোটি। মঞ্চে তখনও তাসু, মিনহাজ ও আরও কয়েকজন। নিচে নেতাগোছের শ’খানেক। ছাত্ররাও আছে। ছুটে এলো পুলিশের গাড়ি। গ্রেফতার করা হলো তাসু, মিনহাজ ও আরও দুজনকে। যারা উপস্থিত ছিল তারা স্লোগান দিয়ে বাধা দিতে চেয়েছিল; কাঁদানে গ্যাস আর লাঠিচার্জ হওয়াতে পারল না। এক এক করে তাদেরকে তোলা হলো পুলিশের গাড়িতে। সূর্য তখনও ডোবেনি। ডুবতে বসেছে। সূর্যের শরীরে তখন সিঁদুরে রং। তাপ নেই, তবে টগবগিয়ে যেন জ্বলছে। এ জ্বলা নিভে যাবার আগে দপ করে জ্বলে ওঠা নয়। অন্যকিছু। গাড়ি চলল থানা সদরের দিকে। তাসু তাকিয়ে থাকল সেই সূর্যটার দিকে।

[ চলবে ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares