লিটল ম্যাগ : নান্দীপাঠ : শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি-র পত্র : মনি হায়দার

স্বোপার্জিত স্বাধীনতায় বিকাশমান একটা জাতির অগ্রসরের প্রথম সোপান সংস্কৃতি।

সংস্কৃতির প্রধান প্রতিপাদ্য জাতির মনন নবায়ন করা, গড়ে তোলা এবং এগিয়ে নেয়া। এবং এসব করার বিশেষ স্তম্ভ―পত্রিকা। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির অগ্রসরের পথে মননসমৃদ্ধ রুচিস্নিগ্ধ সাহিত্য পত্রিকা প্রভূত দায় পালন করে। একই সঙ্গে চিন্তাশীল  লেখা প্রকাশ ও নিত্য নতুন ধারণার সঙ্গে সংযুক্তি গড়ে তোলাও দায়িত্বশীল পত্রিকার দায়। এই বাংলাদেশে এক সময়ে প্রচুর পত্রিকা প্রকাশিত হতো, যে পত্রিকার  স্রোতে তৈরি হতো নতুন নতুন লেখক। গড়ে উঠত নির্মোক খোলা মুক্ত বায়ুর লেখকসত্তার অনন্য বিকাশ। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত কণ্ঠস্বর, মীজানুর রহমান সম্পাদিত মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, আনওয়ার আহমদ সম্পাদিত রূপম…

কালের স্রোতে যেমন গড়ে ওঠে, তেমন হারিয়েও যায়। হারিয়ে গেলেই না শূন্যস্থানে নতুন ফলবান বৃক্ষের জন্ম হয়। সেই ফলবান বৃক্ষ নান্দীপাঠ। নান্দীপাঠ শিল্পসাহিত্যের নান্দনিক পত্রিকা। দীর্ঘ বছর ধরে, রুচির সঙ্গে বাঙালিয়ানার ঐতিহ্য গেঁথে চলছে নিজের মতো করে, খানিকটা অনিয়মিত কিন্তু যখন প্রকাশিত হয় নান্দীপাঠ, পাঠকেরা অবাধ আনন্দ-প্রসাদ লাভ করেন। পত্রিকাটা সম্পাদনা করেন সাজজাদ আরেফিন। সাজজাদ আরেফিন কবি। টুকরো টুকরো কবিতায় তিনি চলমান মুহূর্তকে চুম্বনের চুমুকে উপস্থাপন করেন। কবির বোধের সঙ্গে সম্পাদকের রুচির সম্মিলনে নান্দীপাঠ এই সময়ের গৌরবদীপ্ত  শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পত্রিকা, বাংলাদেশের তো বটেই, পৃথিবী জুড়েও।

অভিনব প্রক্রিয়া নান্দীপাঠের― কোথাও কোন সম্পাদকীয় নেই নান্দীপাঠে-র। সত্যিকার অর্থে প্রয়োজনই নেই―নান্দীপাঠ পাঠ করার পর সব লেখা পড়ে মনস্ক-পাঠক নিজেই নিজের নির্মাণ-ভাবনায় একটা সম্পাদকীয় সাজিয়ে নিতে পারেন। আর আমরা তো জানিই, এই বাংলায় একটা নান্দনিক, সুন্দর দৃশ্যকাব্যে প্রায়  সাড়ে পাঁচশত পৃষ্ঠার দৃষ্টিকাড়া পত্রিকা বের করা কত কঠিন। প্রথমত বিজ্ঞাপন পাওয়া আজকাল, হিমালয় জয় করার মতো ঘটনা। বিজ্ঞাপনের পর প্রয়োজন হয় সম্পাদকের রুচি ও সৌন্দর্যজ্ঞানের মানদণ্ডে ভালো ও নির্ভুল লেখার। লেখা অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু সব লেখা কি সম্পাদক ছাপতে পারেন?

এই দুঃসহ পরিস্থিতিতে সাজজাদ আরেফিন সম্পাদিত নান্দীপাঠ সংখ্যা : ৯, ফেব্রুয়ারি ২০২০ পাঠকদের হাতে পৌঁছেছে। সময়ের বিবেচনায় পত্রিকার ডেটলাইন পিছিয়ে পড়া স্বাভাবিক, যখন থমকে আছে কভিড আক্রমণে গোটা পৃথিবী এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ। এই দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যেও যে নান্দনিকতায় প্রকাশিত হয়েছে, সেটাই তো পরম পাওয়া। নান্দীপাঠ চলতি সংখ্যা উৎসর্গ করা হয়েছে  শিক্ষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে।

সূচির দিকে চোখ রাখলে, চোখ কপালে ওঠে―নান্দীপাঠের সংযুক্ত বিচিত্রবিহারী লেখা সম্ভারের তালিকা দেখে। লেখা ও লেখকদের এই তালিকাই প্রমাণ করে, সম্পাদকের দৃষ্টি ও সৃষ্টির রুচি এবং ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা। আমরা শুরুতেই প্রবন্ধ ও প্রাবন্ধিকের তালিকায় দৃষ্টি রাখলেই বুঝতে পারব, অতল গভীরতার সঙ্গে নান্দীপাঠ সম্পাদিত হয়। সকল প্রবন্ধ নেয়া হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্রেস্থ রেখে বিচিত্র অনুসঙ্গ-ধারনে-সাধনায়― ‘রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে সমাজ, স্বরাজ, স্বাধীনতা’ (গোলাম মুরশিদ), ‘ভুবন জোড়া আসনখানি’ (মনজুরে মাওলা), ‘মানবিক বিশ^ বিনির্মাণে রবীন্দ্রনাথ’ (মফিদুল হক),‘পারস্যে রবীন্দ্রনাথ : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা’ (বেগম আখতার কামাল), ‘প্রতিরোধের সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প’ (মাসুদুজ্জামান), ‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে ঔপনিবেশিক বাংলা এবং রবীন্দ্রনাথ’ (বিশ^জিৎ ঘোষ)  ‘উধাও হয়ে হৃদয় ছুটছে’ (কুমার চত্রবর্তী)।

কবিতা লিখেছেন―হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কামাল চৌধুরী, মাহমুদ কামাল, সিদ্ধার্থ হক, সৈয়দ তারিক, তারিক সুজাত, শামসুল আরেফিন, মতিন রায়হান, সরকার আমিন, মিহির মুসাকী, শাহেদ কামাল, আসাদ আহমেদ, জাহিদ সোহাগ। কবিতা কবির মননসত্তার অভিনব প্রকাশ, কবিতা শিল্প-সুষমার নির্মেদ নিবেদনের  সোনালী হরিণ―সেই কবির একটা বা দুটো কবিতা পাঠে পাঠকের তৃপ্তি মেলে? পাঠের পরও পাঠ করতে পিপাসা জাগে পাঠকের। সেই পাঠ তৃষ্ণার গোলক ছবি মনে রেখে, সম্পাদক কবিদের গুচ্ছ কবিতা ছেপেছেন। ফলে, পাঠক একজন কবির অনেকগুলো কবিতালোকে প্রবেশ করে, নিজেকে যেমন সৃমদ্ধ করতে পারবেন, বিপরীতে যাচাই করার একটা মহার্ঘ সুযোগ পাবেন। আরও কৌতুহল বা আগ্রহের বিষয়, নতুন ও প্রবীন কবিদের একসূত্রে গেঁেথ কবি সম্পাদক সাজজাদ আরেফিন সাজিয়েছেন, নান্দীপাঠ পত্রিকার কবিতার সংসার।

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সমর্পণ  কাব্য সম্পূর্ণ প্রকাশ করেছে নান্দীপাঠ। কবিতার জগৎ সংসার বা কবিতার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারুময়তার বিপণন নিয়ে কবির ভাবনা ও প্রকাশ অনন্য। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ‘সমর্পণ’ কবিতার জগতে নিজেকে সমর্পণ করেননি, অন্যকে নিজের কাছে বিসর্জন দিয়েছেন, কবিতাগুলোর মধ্যে প্রবেশ করলেই অনুধাবন করা যাবে। অনেক অনুক্ষণ পরিকল্পিত ভাবনার ফসল কবির এই সমর্পণ। কারণ, তিনি  পাঁচ লাইনে ভাগ করে নিবিড় চৈতন্য আঙ্গিকে লিখেছেন চল্লিশ পর্বের সুখ-অসুখের ভ্রান্তি বা ক্লান্তির কাছে নিবেদনের কবিতা। পবর্  চার : 

নাই যদি দণ্ড সরে, ভিত্তিভূমি তবু খোদ নড়ে

গণনায় উন্মোচিত আর্যদের সমূহ স্বভাব

আর উপাসনালয় নির্মাণের অন্তে পশুবলি

মর্মে মর্মে তাহার শরণ, সন্তুষ্টির নিত্য ধ্যান

 অভ্যন্তরে বিরাজিছে মগ্ন মৌন-অদৃশ্য আরশ

মানব স্বভাবের বিপরীত বৈশিষ্ট্য জীবনকে স্বীকার না করার প্রবল প্রবণতা। স্বীকার অস্বীকার―দুই মেরুর সুতায় ঝুলন্ত জীবনই গল্প। গল্প অশরীরী আত্মার প্রতীক। এক সঙ্গে যায় আবার ফিরে এসে পথের মোড়ে বিনা গর্তে মার্বেল খেলে যে ঘুঙুর, সেই খেলাই গল্প। গল্প ছাড়া জীবন হতেই পারে না। নান্দীপাঠ গল্প রেখেছেন তেরোটি, তেরোরকমের তো বটেই। গল্প ও গল্পকার : পরাগ চৌধুরী―‘কিতাব আলির একদিন, ‘কিন্নর রায়―‘রাবণ- গগনের ঁিসড়ি’, আহমদ বশীর―‘ঈশ^রের লজ্জা’, পারভেজ হোসেন― ‘যে আঁধার আলোর অধিক’, পাপড়ি রহমান― ‘জলময়ূরীর সংসার’, মনি হায়দার―‘ন্যাশন ৫৭০’, শাহনাজ মুন্নী―‘প্রত্যাবর্তন’, হামীম কামরুল হক―‘আয়না ভয়ংকর’, ইসরাত মেরিন―‘উত্তর বসন্তে’, স্বকৃত নোমান ‘চরজনম’, ফাল্গুনী তানিয়া― ‘আফসার আলীর অনিত্য যাপন’, খালিদ মারুফ― ‘কারাগার’, মোজাফ্ফর হোসেন―‘সময় থেকে বের হওয়ার পথে’।

তেরোটি গল্পের মধ্যে গল্পকারেরা হরেক রকম রান্নাবান্না করেছেন। স্বাভাবিকভাবে সব রান্নাই পাঠকদের কাছে একই রকম লাগবে না, লাগবে চেতনা-চৈতন্যর মায়াজালে বিম্বিত রূপকল্পে পোড়া গন্দমের স্বাদে। প্রতিটি গল্প জীবনের খেড়ো খাতার জমিন থেকে তুলে এনেছেন গল্পকারেরা, ফলে গল্প কেবলই গল্প নয়, হয়ে উঠেছে জল ও স্থলের কল্পিত রাজহাঁস।

মাহমুদুল হক আমাদের কথাসাহিত্যের একক পুরাণ। নিজেকে জ¦ালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে সেই আত্মভ্রমরের আগুনে নিজেকেই জ¦ালিয়েছেন, আলোয় যেমন, অন্ধকারেও তেমন। সর্বনাশের বাঁশি আর রাধার নৃত্য-জলের মাঠে তিনি ঘোড়সওয়ার। কলম-তরবারি এবং নিজের মগ্ন রসায়নে নিজের মতো করে গদ্য রচনার একটা মহাসড়ক তৈরি করেছিলেন কথাসাহিত্যিক মাহুমুদুল হক। প্রবল পরাক্রান্ত এই গদ্যকার জীবনের শেষ প্রান্তে নিজেকে নিঃশে^ষ  করেছেন― আত্ম সর্বনাশের কাঠগোলায়। সেই কাঠগোলার দরজা খুলে গল্পকার আবু হেনা মোস্তফা এনাম গ্রহণ করেছিলেন একটা সাক্ষাৎকার―২০০৩ সালে। নান্দীপাঠে পত্রস্ত্র অসামান্য স্থপতি মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার পাঠের মধ্যে আমরা পাই দিক-বলয়ের কাঁটা ও কম্পাস। মনে হয়, এই ‘খেলাঘর’, ‘অশরীরী’, ‘অনুর পাঠশালা, ‘জীবন আমার বোন’―উপন্যাসের জনক এখনও বর্তমান শব্দ ও সংলাপের দ্বৈরথে, আবু  হেনা মোস্তফা এনামের সঙ্গে― সাক্ষাৎকারটা এতটা জীবন্ত, প্রাণবন্ত আর  দ্রবণীয়। সাজ্জাদ আরেফিন নান্দীপাঠ সম্পাদনায় প্রতিটি সংখ্যায় পাঠকদের চমকে দিতে চান নতুন  কিংবা ডুবে থাকা কোন সিন্দুকের ডালা খুলে দিয়ে, এই সংখ্যায় যেমন মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার।

‘গল্প আর উপন্যাস তো এক জিনিস না, গল্পের ভাষা অনেক কম্প্যাক্ট। উপন্যাস  তো  তা না। এখানে অনেক কিছু ছড়ানো ছিটানো থাকে। উপন্যাসের ভাষাও এ জন্য আলাদা। আমি ভেবে দেখলাম―উপন্যাস লেখার জন্য একটা আলাদা ভাষা দরকার। তখন অনুর পাঠশালা লিখলাম।’ বলেছেন মাহমুদুল হক। কেন তিনি জলের মধ্যে অজস্রজনের সঙ্গে সাঁতার কেটেও অনন্য ও আলাদা―ওপরের বাক্যগুলো প্রমাণ রাখে।

নিজের মুখোমুখি হওয়ার জন্য সুবিধাজনক পথ―স্মৃতি  লেখা। স্মৃতি লেখা মানে, নিজেকে লেখা― আদ্যপান্ত। স্মৃতি অনেক সময়ে হন্তারক-প্রতারক, জেনেও অনেকেই প্রতারণার ফাঁদে হন্তারক হয়ে ওঠেন। যেমন হয়েছেন আবুল হাসনাত। আবুল হাসনাতের অনেক পরিচয়―কবিতা লেখার সময়ে মাহমুদ আল জামান তিনি। আবার সম্পাদনার সময়ে তুমুল একজন সম্পাদক। সব সময়ে থাকতে চেয়েছেন নেপথ্যে, আড়ালে। কিন্তু কাজ করে গেছেন গোপনে, নির্জনে। এই মানুষটি আবুল হাসনাত। জীবনের পরম্পরায় তিনি বিচিত্র, বহুমুখী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। অজস্র সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে―পত্রিকার পাতার সূত্র ধরে, বৈঠকি আড্ডার মজলিসেও। তিনি  লিখেছেন ‘স্মৃতিকথা’।

নিজের সর্ম্পকে আবুল হাসনাত জানিয়েছেন, ‘ঢাকায় আমার জন্ম… এক কথায় আমি ঢাকার আদিবাসী। গ্রামের সঙ্গে আমার পিতৃপুরুষের কোন সংযোগ ছিল না।’ সেকালের ঢাকা সর্ম্পকে তিনি আমাদের জানাচ্ছেন, ‘ঢাকা শহরের পরিধি ছিল ছোট, ফুলবাড়িয়া রেলক্রসিং ধরে হেঁটে কত সহজেই যাওয়া যেত বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত। পাটুয়াটুলি, ইসলামপুর, চকবাজার হয়ে লালবাগ এবং একটু ঘুরে নীলক্ষেত।’ এইসব অনবদ্য স্মৃতিসম্ভারের স্মৃতিকথা নিয়ে লিখেছেন  সৌভিক রেজা, ‘মাধুর্যময় রৌদ্র-ছায়ামাখা স্মৃতিকথা’ শিরোনামে। এই আলোচনা পাঠ করতে করতে পাঠকেরা একই সঙ্গে যাবেন আবুল হাসনাতের সঙ্গে, আবার যাবেন অতীতের ঢাকা শহরের বিচিত্র মানুষ  পরিবেশ, সংস্কৃতির সঙ্গে।

সম্পাদক সাজজাদ আরেফিন সাজাতে জানেন নান্দীপাঠ―জীবন সংস্কৃতির খেয়াঘাটের ‘পারানির’ সংযোগে। দীর্ঘ সম্পাদনার অভিজ্ঞতা-অভিঘাতে তিনি এখন পরিণত বৃক্ষ। একজন নিষ্ঠাবান সম্পাদকের বড় কাজ সময় ও সময়ের মানুষের পরিধি জানা ও মাপা। প্রতিটি সংখ্যা নান্দীপাঠ হাতে নেয়ার পর, লেখার তালিকার দিকে দৃষ্টি আনত হওয়ায় পাঠকের শরীরÑমন-বোধে ঝংকার ওঠে। রিজিয়া রহমান আমাদের কথাসাহিত্যের আরেক অনন্য অভিযাত্রিক। লিখেছেন, অসামান্য উপন্যাস―বং থেকে বাংলা, রক্তের অক্ষর,  একটি ফুলের জন্যসহ আরও উপন্যাস ও গল্প।

‘রিজিয়া রহমানের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস: ‘বিরুদ্ধ সময়ের পুননির্মাণ’ শিরোনামে বিশ্লেষণের মায়াবন্দনা লিখেছেন ফারজানা সিদ্দিকা। প্রাবন্ধিক ফারজানা সিদ্দিকা প্রত্নগবেষণায় রিজিয়া রহমানের অন্তস্রোতে ডুব দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধকালের ব্যবচ্ছেদ করে তুলে ধরেছেন মানস-প্রতিক্রিয়া এবং বাঙালির দুঃসময়ের মানচিত্র। অসম্ভব নিষ্ঠা আর প্রজ্ঞার যাদু-প্রেরণায় ফারজানা সিদ্দিকা উপস্থাপন করেছেন মহান রিজিয়া রহমানকে। তিনি রিজিয়া রহমানকে ধারণ করেছেন প্রতিসরণের  মর্মবাক্যে : রিজিয়া রহমানের দুটি উপন্যাস রক্তের অক্ষর (১৯৭৮) ও একটি ফুলের জন্য (১৯৮৬) মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের অপ্রত্যাশিত প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত। যে-কোন যুদ্ধই দুই ধরনের ক্ষত তৈরি করে। এই ক্ষতের প্রতিক্রিয়া একটি তাৎক্ষণিক, অন্যটি দীর্ঘস্থায়ী। একটি যুদ্ধ চলাকালীন ক্ষত অন্যটি যুদ্ধ শেষের ক্ষত। দুই ক্ষতের যন্ত্রণার রূপ ভিন্ন। দুই ক্ষতের শুশ্রƒষার প্রক্রিয়াও আলাদা। রিজিয়া রহমান যুদ্ধ শেষের ভিন্ন দুই ক্ষতকে তার দুই উপন্যাসে ধারণ করেছেন। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে এই দুই ক্ষতকে ঘিরে যে রূঢ় বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেই বাস্তবতাই শিল্পের আঙ্গিকে পুনর্নিমিত হয়েছে তাঁর উপন্যাসে।’

শিল্পময়তার সঙ্গে রিজিয়া রহমানকে  উপস্থাপন করেছেন এই প্রবন্ধে  ফারজানা সিদ্দিকা। 

‘শতবর্ষে সোমেন চন্দ’―প্রবন্ধ লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ‘চিন্তানায়ক আবদুল হক’―প্রবন্ধ লিখেছেন সৈয়দ আজিজুল হক। দুটি প্রবন্ধই নান্দীপাঠ পত্রিকাকে সমৃদ্ধতর করেছে।

আবদুল মান্নান সৈয়দ আমাদের সাহিত্যর সোনালি ভ্রমর। তিনি অজস্র অভিসারে রচনা করেছেন বিচিত্র সাহিত্য। তার একটা অগ্রন্থিত কাব্যনাটক নিয়ে লিখেছেন আবদুল মোহিত।

নান্দীপাঠ সাহিত্য-সংস্কৃতির বুনিয়াদ রচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। আমরা জানি, বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতায় সিরিয়াসধর্মী সাহিত্যপত্রিকা বের করা কত কঠিন পরিশ্রম ও সময়ের ভয়ানক হ্যাপা। আর বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করা তো অনেকটা দুঃস্বপ্নের যাত্রা। এতকিছুর পরও সমস্যা শেষ নয়,  সম্পাদকের মূল সমস্যা মানসম্পন্ন লেখা পাওয়া। সম্পাদকের দৃষ্টি ও রুচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে লেখা পাওয়ার  জন্য অপেক্ষা করতে হয় দিনের পর দিন। এতগুলো বেরিকেডের দরজা পার হয়ে পত্রিকা প্রকাশ করার জন্য দরকার গভীর মমতা আর দেশ-জাতির প্রতি গভীর নিবেদন। লিখতে দ্বিধা নেই,‘নান্দীপাঠ’  সম্পাদক সাজজাদ আরেফিন এই বাঁধাগুলো অতিক্রম করে সময় নিয়ে, তিলে তিলে তিলোত্তমায় তৈরি করেছেন―অসাধারণ সাহিত্য পত্রিকা ‘নান্দীপাঠ’। আমরা চাই, সময়ের সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বাঙালির জাগরণের প্রশ্নে  নান্দীপাঠ আরও  সমৃদ্ধ হয়ে আমাদের কাছে আসবে, প্রত্যাশা রাখি।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares