‘মাতৃভাষা প্রতিটি মানুষের মানবিক অধিকার’ : সেলিনা হোসেন

সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৯৪৭) বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। তাঁর পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজিরপাড়া গ্রাম। সেলিনা হোসেনের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির গবেষণা সহকারী হিসেবে। এ কর্মস্থল থেকেই পরিচালক হিসেবে এক দশক আগে অবসরে যান। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। তাঁর মোট উপন্যাসের সংখ্যা ৩২টি, গল্পগ্রন্থ ১১টি, প্রবন্ধগ্রন্থ ৭টি, শিশুতোষ গ্রন্থ ২৮টি এবং অনূদিত গ্রন্থ ১০টি। উল্লেখ্যযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছে হাঙর নদী গ্রেনেড, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, কাঠকয়লার ছবি, ঘুমকাতুরে ঈশ্বর, লারা, ভূমি ও কুসুম, যাপিত জীবন, যমুনা নদীর মুশায়রা, পূর্ণ ছবির মগ্নতা, সোনালী ডুমুর ইত্যাদি। তিনি ১৯৬৯ সালে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক, ১৯৮০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮১ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে ফিলিপস্ সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৯ সালে একুশে পদক, ২০১০ সালে দিল্লির আইআপিএম কর্তৃক রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার, ২০১১ সালে দিল্লি সাহিত্য আকাদমী থেকে প্রেমচাঁদ ফেলোশিপ লাভ করেন। ২০১০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা থেকে ডিলিট উপাধি লাভ করেন। তাঁর গল্প-উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, হিন্দি, মারাঠি, উর্দু, মালয়ালাম, কানাড়ী, জাপানী, কোরিয়ান, ফরাসী, ফিনিস ইত্যাদি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ভারতের কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর উপন্যাস বাংলাদেশ পত্রে পাঠ্য।

স্বকৃত নোমান: আপনার জন্ম ও জন্মস্থান সম্পর্কে জানতে চাই প্রথমে।
সেলিনা হোসেন: আমার জন্ম ১৯৪৭ সালে, দেশভাগের উত্তাল সময়। ওই বছরের ১৪ জুন আমি জন্মগ্রহণ করি। আমার পৈতৃক নিবাস তৎকালীন নোয়াখালী, বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার হাজীরপাড়া গ্রামে। বাবা এ.কে.এম মোশাররফ হোসেন ছিলেন রাজশাহী রেশম শিল্প অফিসের পরিচালক। সপরিবারেই থাকতেন সেখানে। আমার জন্মস্থানও রাজশাহী। শৈশবের প্রথমার্ধ, স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়গুলো কেটেছে ওখানেই। এরপর বাবা বদলি হন বগুড়ায়। এখান থেকেই আমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু। আমাকে ভর্তি করানো হয় বগুড়া লতিফপুর প্রাইমারি স্কুলে। এখানে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করি। প্রাইমারি শিক্ষার পাঠ শেষ হলে পুনরায় বগুড়ার হাইস্কুলেই ভর্তি করানো হয়। বগুড়া ভিএম গার্লস হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণীর বেশি পড়তে পারিনি। কারণ বাবা পুনরায় বদলি হয়ে যান রাজশাহীতে। তাই আমাকেও ছাড়তে হলো বগুড়ার স্কুল। রাজশাহীতে গিয়ে পি.এন গার্লস হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হই। এ স্কুল থেকেই ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক পাশ করি।

স্বকৃত নোমান: আপনার ওপর কার প্রভাব বেশি, বাবার না মায়ের?
সেলিনা হোসেন: প্রভাব দুজনেরই আছে। বাবা ছিলেন রাগী মানুষ। পরিবারের সবাই তার ভয়ে কিছুটা ভীত থাকত। তবে বাবার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড আমাকে আলোড়িত করত ভীষণভাবে। ছুটির দিনে সারাদিন পুকুরঘাটে মাছ ধরা, দুপুরবেলা স্নান করতে পুকুরঘাটে যাওয়াÑ এ সময় বাবাকে ভয় পেতাম না। তখন বাবাকে এটা-ওটা এগিয়ে দিয়ে নিজেও খুব উপভোগ করতাম। আর আমার মা মরিয়মেন্নেসা বকুল। ছোটবেলায় তার কাছ থেকে আমি মোটামুটি প্রভাবিত হয়েছি। বুদ্ধিমতী, আত্মবিশ্বাসী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মাকে আদর্শ হিসেবে মানতাম আমি। মা কখনো সন্তানের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেননি। স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা, দুষ্টামি, খেলাধুলাÑ কোনো কিছুতেই বাধা দিতেন না। তবে পড়ার সময় তিনি হয়ে পড়তেন অন্য মানুষ। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। দিনের পড়া দিনেই পড়ে শেষ করতে হবে। তবে কঠোর শাসনের মাধ্যমে নয়, বরং ভালোবাসার মাধ্যমেই পড়ালেখার বিষয়টি আদায় করে নিতেন তার মা। এ রকম একজন মায়ের সংস্পর্শ আমার শৈশবকে করেছে রঙিন, আনন্দময়। মায়ের এ স্বাধীনতাই আমার শৈশবের সময়কে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।
ছোটবেলা থেকে প্রিয় বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি। শুধু বাবা-মা হিসেবেই নয়, আমি মনে করি তারা মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাধারণ। কারণ বাবা-মা প্রত্যেক মানুষেরই প্রিয় মানুষ হতে পারে। কিন্তু আমার শৈশবে বাবা-মা আমাকে যা দিয়েছেন তা আমি বলে শেষ করতে পারব না। বাবার জীবন ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। বাবা বন্দুক দিয়ে পাখি শিকার করতে যেতেন গলা পানিতে নেমে মাথায় লতাপাতা মুড়িয়ে। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। পুকুরে মাছ শিকার করতেন নানান আয়োজন করে। এসব বিষয় আমার মাঝে ভিন্নভাবে গেঁথে থাকে, যা আমাকে আজকের অবস্থানে আসতে সাহায্য করেছে।
আর মায়ের কাছ থেকে আমি পেয়েছি প্রচণ্ড মানসিক শক্তি, যা আমার সাহিত্যের ভুবনটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকগুণ। মা ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করতেন না। আবেগকে কখনোই প্রশ্রয় দিতেন না। মায়ের এসব বিষয় আমাকে খুব আলোড়িত করে, আমার ভেতরে তা নতুন মাত্রা পেতে থাকে। মায়ের সেই বিষয়গুলো আমাকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে।

স্বকৃত নোমান: শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো কেমন কেটেছে?
সেলিনা হোসেন: বাবার বদলির চাকরি ছিল বিধায় কিছুদিন পর পরই নতুন নতুন জায়গায় যেতে হতো। এ কারণে খুব ছোট বয়সেই বিভিন্ন জায়গা দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। মনে আছে, বাড়ির আঙ্গিনা ছাড়িয়ে এক দৌড়ে চলে যেতাম দূরে, বনের ভেতর। ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়াতাম বুনোফুল। কুড়িয়ে এনে ওগুলো দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা ছিল আমার নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। ছোটবেলা থেকেই আমার প্রিয়ফুল শিউলি ও বকুল। তখন অনেক হিন্দু পরিবার ছিল আমাদের বাড়ির পাশে। তারা পূজার জন্য বাড়িতে নানা ধরনের ফুল গাছ লাগাতো। আমি মাঝেমধ্যে পাশের গোঁষাই বাড়িতে গিয়ে ফুল নিয়ে আসতাম। তাদের সঙ্গে আমার সখ্যও ছিল দারুণ।
মা বলতন, কৈশোরে আমি কৌশলী ও বুদ্ধিমতি ছিলাম। অন্য ভাইবোনদের চাইতে কিছুটা ব্যতিক্রম, প্রাণবন্ত। সবার সঙ্গে হাসিখুশি ভাব। তবে যখন-তখন বেধে যেত ঝগড়া-বিবাদ। যে কোনো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আড়ি দেয়া কিংবা চড়-থাপ্পড়! এসব নিয়ে অনেক সময় দু-একদিন কথা বলা বন্ধ রাখা।
শৈশবে অন্য ভাইবোনদের চেয়ে আমি কিছুটা চঞ্চল প্রকৃতির ছিলাম। বাইরের কারও সঙ্গে সহজে ঝগড়া করতাম না। তবে আমার চাঞ্চল্য সবাইকে আকৃষ্ট করত। ঘরে বসে পুতুল খেলার চেয়ে বাইরে ছোটাছুটি করা বা অন্য খেলার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল বেশি। শামুকের ডিম আর প্রজাপতি ছিল আমার প্রিয় জিনিস।
তখনকার সময়ে মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলাফেরার ব্যাপারে অনেক বাধা-বিপত্তি ছিল। ইচ্ছে করলেই নিজের মতো করে চলতে পারত না। কিন্তু আমি এ ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। সবার আদর-সোহাগ ও ইচ্ছার স্বাধীনতা পাওয়ার কারণে শৈশবের সময়টা আনন্দেই কেটেছে। মাঠে-ঘাটে, প্রান্তরে, নদীতে ছুটে যাওয়া কিংবা গাছে চড়াÑ এগুলো করেছি নিজের ইচ্ছেমতো। দারুণ গাছ বাইতে পারতাম আমি। চোখের পলকে এ-ডাল ও-ডাল করতাম কেবল। একদিন আমার বোন শিরিনাসহ উঠলাম একটা জাম গাছে। জাম পাড়া শেষ হওয়ার পর নামতে গিয়ে বাধল বিপত্তি। লাল পিঁপড়া কামড়াতে শুরু করল দুজনকেই। আমাদের কান্না ও চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে কবির নামের আব্বার অফিসের এক পিয়ন আমাদেরকে গাছ থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন। এ রকম দুরন্তপনার মাঝেই কেটেছে আমার শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলো।
শৈশবের অনেকে স্মৃতি আছে। জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরা দেখতে যাওয়া ছিল আমার কৈশোরে শখের বিষয়। প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক খুব কাছ থেকে দেখেছি বলে এসব বিষয় এখনো আমার লেখালেখিতে খুব সহযোগিতা করে। আমার বাবা ওষুধ দিতেন গ্রামের মানুষকে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ তার কাছে আসতেন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। সেই মানুষগুলোর বিভিন্ন সমস্যার কথা বাবার পাশে বসে শুনতাম। আমি তখন ১০-১১ বছরের কিশোরী। মানুষে মানুষে সম্পর্কের এতসব জটিল বিষয় আমি বুঝতাম না। তবে এগুলো আমার মনে বেশ রেখাপাত করত। আস্তে আস্তে বয়স বাড়তে থাকে এবং এগুলো বোঝার ক্ষমতাও হয়।

স্বকৃত নোমান: বাবা-মায়ের শাসনও তো কম ছিল না নিশ্চয়ই…।
সেলিনা হোসেন: হ্যাঁ, সব কিছুর পরেও সতর্ক থাকতাম বাবার শাসনের ব্যাপারে। বাবা বাসায় আসার সময় হলে বা তাঁর উপস্থিতি কোনোভাবে টের পেলেই এক লাফে গাছ থেকে নেমে চম্পট। কারণ বাবার হাতে যদি কেউ একবার পড়ত তাহলে খুব সহজে ছাড়া পাওয়া যেত না। সহজে তিনি রাগতেন না সন্তানদের ওপর, কিন্তু কোনো কারণে একবার রেগে গেলে সহজে ক্ষান্ত হতেন না। সন্তানদের ওপর তার স্নেহ-ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। একবার সবার ছোট বোনটির কঠিন অসুখ হয়েছিল। অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েও কোনো ফল হচ্ছিল না। কোনো এক কবিরাজ বলল, ধানের উপর জমে থাকা শিশির এনে খাওয়ালে রোগ ভালো হতে পারে। তাই আমরা ধানক্ষেতের শীষ থেকে শিশির ঝরিয়ে বাটিতে করে নিয়ে আসতাম।

স্বকৃত নোমান: শৈশব-কৈশোরের বিনোদন কী ছিল?
সেলিনা হোসেন: কৈশোরে রেডিওতে গান শোনা ও ঢাকা থেকে আসা পত্রিকা পড়া ছাড়া বিনোদন বলতে আর বিশেষ কিছু ছিল না। কলেজে ওঠার আগ পর্যন্ত এভাবেই কেটেছে সময়। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে তেমন কিছু পড়ার সুযোগ হয়নি। কলেজে উঠে নতুন জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। পেয়ে যাই এমন একজন শিক্ষক, যিনি আমাকে প্রকৃত শিক্ষার জ্ঞান দিয়েছিলেন। সেই শিক্ষকের নাম অধ্যাপক আব্দুল হাফিজ। তার তত্ত্বাবধানেই লেখালেখির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমি হাত পাকাতে থাকি। সেই থেকে আজ অবধি লেখালেখি চলছে।

স্বকৃত নোমান: বই পড়তে শুরু করেন কখন?
সেলিনা হোসেন : বই পড়তে শুরু করি কলেজে উঠে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে।

স্বকৃত নোমান: গল্প-উপন্যাস লেখেন কেন? কবিতাও তো লিখতে পারতেন।
স্বকৃত নোমান: শৈশব-কৈশোরে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাতে আমার মনে হয়েছে যে এসব কথা আমি কবিতায় লিখতে পারব না, আমাকে গল্প বা উপন্যাসে আসতে হবে। শৈশবের অভিজ্ঞতাগুলো আমার ভেতরে খুব কাজ করত। আমি যে প্রকৃতি দেখেছি, আমার লেখায় যে গাছের কথা, পাখির কথা অনবরত আসেÑ এগুলো শৈশবের স্মৃতি থেকেই। পেছনে ফিরে তাকালেই দেখতে পাই পাখিটা উড়ে যাচ্ছে, গাছটা থেকে লাফ দিচ্ছে। কিংবা সেই নদীটা, সেই বার–য়া মাঝি খেয়া পারারপর করছে…। এসব অভিজ্ঞতা প্রবলভাবে আমার সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি গল্প লিখতে শুরু করলাম। ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় একটা গল্প প্রতিযোগিতায় দিয়ে প্রথম হয়েছিলাম।

স্বকৃত নোমান: প্রথম বই তো গল্পের?
সেলিন হোসেন: হ্যা গল্পের। আমি ’৬৮ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি পাস করলাম। তারপর চাকরি খুঁজছি। আমার শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুল হাফিজ, তিনি রাজশাহী মহিলা কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন আমাদেরকে। তিনি সেই সময় আমাকে এলেন্স গিন্সবার্গ পড়তে দিয়েছিলেন। মার্কস-এঙ্গেলসের বই তিনিই পড়তে দিয়েছিলেন। আমাকে তিনি সবসময় বলতেন, মেয়ে হয়েছ বলে নিজের গণ্ডিটাকে ক্ষুদ্র করো না। তোমাকে পুরো বিশ্বটাকেই দেখতে হবে, অনেক বড় জায়গা দেখতে হবে এবং সেই জায়গাগুলো দেখার চোখ তৈরি করতে হবে। তার শিক্ষাটা আমার কাছে অনেক বড় শিক্ষা।
মাস্টার্স পরীক্ষার পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, যে গল্পগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লিখেছ সেগুলো দিয়ে একটা বই করো। তাহলে তোমার সিভিতে একটা বই যুক্ত হবে। তাতে তোমার সিভিটা অন্যদের চেয়ে আলাদা হবে।
আমি বললাম, আমার বই কে ছাপবে স্যার?
তিনি সরাসরি বলে দিলেন, তোমার বই কে ছাপবে? কেউ ছাপবে না। বাবার কাছে যাও, টাকা আনো, বই ছাপো।
আমি তাই করলাম। নিজেদের উদ্যোগে বই প্রকাশ করলাম। স্যার কিন্তু চাকরি পাওয়ার সূত্রেই আমাকে বই করতে বলেছিলেন, লেখক হওয়ার জন্য নয়। কিন্তু এর কারণেই হয়ত আমার চাকরি হয়েছিল দুই জায়গায়। বাংলা একাডেমিতে এবং পিএসসিতে। পিএসসিতে হলো কলেজের চাকরি। ওই বইটা থাকার জন্যই হয়ত আমার দুটো চাকরিই হয়ে যায়।

স্বকৃত নোমান: আপনি বাংলা একাডেমীতে জয়েন করলেন?
সেলিনা হোসেন: হ্যাঁ। কারণ আমাকে পোস্টিং দিয়েছিল সিলেট এমসি কলেজে। তখন আমার মেয়ে লারার বয়স দুই মাস। সেই ’৭০ সালে এতটুকু বাচ্চা নিয়ে ওখানে গিয়ে আমার পক্ষে থাকা প্রায় অসম্ভব। নানা কিছু চিন্তা করে বাংলা একাডেমিতে জয়েন করলাম। একাডেমিতে জয়েন করার পেছনে আমার একটা প্রাণের টানও ছিল, যদিও বেতন কম ছিল। লেখালেখির প্রতি আমার একটা ঝোঁক আছে, একাডেমির প্রতি একধরনের ভালোবাসা আছে। এখানে যোগদানের পর আমার উপকার হয়েছে বটে। লেখক জীবনের নানা সুযোগগুলো আমি এখান থেকে পেয়েছি। সুযোগ বলতে প্রতিষ্ঠানের কারণে নিজের গণ্ডিটাকে বিস্তৃত করতে পারলাম।

স্বকৃত নোমান: পরবর্তী সময়ে প্রকাশকদের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?
সেলিন হোসেন: এ ব্যাপারে আমাকে সহায়তা করলেন সত্যেন সেন এবং রনেশদাস গুপ্ত। তারা বাংলা একাডেমিতে আসতেন। আমি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতাম, সেই সূত্রে তাদের সঙ্গে পরিচয়, যোগাযোগ। বাংলা একাডেমিতে এসে সরদার ফজলুল করিমের টেবিলে বসতেন তারা। ফজলুল করিমই তাদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। রণেশদা আমাকে বললেন, তুমি কি লিখছ। আমি আমার লেখালেখির কথা জানালাম। তিনি বললেন, ঠিক আছে, লেখা শেষ হলে আমাকে বলো। আমি প্রকাশ করার ব্যবস্থা করব। তিনি তাই করলেন। সেই ’৭৩ সালে প্রকাশক আমাকে পাঁচ শ টাকা রয়্যালিটি দিয়ে আমার পাণ্ডুলিপি নিলেন। আমি খুব বিস্মিত হয়েছিলাম। বই প্রকাশের জন্য আমাকে বেশি কষ্ট করতে হয়নি। এটা সম্ভব হয়েছে বাংলা একাডেমিতে চাকরির কারণেই। এ অর্থে লেখক হিসেবে আমি সৌভাগ্যবানই।

স্বকৃত নোমান: তখন তো সপরিবারে ঢাকায় থাকছেন তখন। আপনার স্বামী কী করতেন?
সেলিনা হোসেন: হ্যাঁ, ঢাকায়। তিনি সায়েন্স ল্যাবেরটরিতে কাজ করতেন। ’৭১-এর ২৪ ডিসেম্বর তিনি মারা গেলেন। পরে ’৭৪ সালে আনোয়ারের সঙ্গে আমার বিয়ে হলো।

স্বকৃত নোমান: আপনার উপন্যাসগুলো তো কিছুটা গতানুগতিক ধারার বাইরে। অনেক পাঠক তাই বলেন। আপনার কী মনে হয়?
সেলিনা হোসেন: এই ব্যাপারে আমি খুব সতর্ক থাকি। আমি সচেতনভাবে চিন্তা করি যে গতানুগতিক ধারায় আমি লিখব না। এবং বিষয়, চরিত্র নির্মাণের দিক থেকে একটা উপন্যাস যেন আরেকটার কাছাকাছি না হয়ে যায় সেই ব্যাপারেও সতর্ক থাকি। আমি শুরু থেকেই ভাবিনি আমি খুব সাধারণ বিষয় নিয়ে লিখব।

স্বকৃত নোমান: প্রথম দিকে আপনার বইগুলো কেমন বিক্রি হতো।
সেলিনা হোসেন: প্রকাশকদের কাছে শুনেছি, যে কটি ছাপা হতো সেকটিই বিক্রি হয়ে যেত। তখনও ৫ শ ১ হাজার ছাপত, এখনো তাই ছাপে। তবে এখন দ্রুত পরবর্তী মুদ্রর্ণ হয়।

স্বকৃত নোমান: এত অল্প বই বিক্রি হয়, এ নিয়ে আপনার মধ্যে কোনো হতাশা কাজ করত?
সেলিনা হোসেন: কখনোই না। বই বিক্রি করে টাকা রোজগার করব এটা আমার চিন্তায় ছিল না। আমার দৃষ্টি ছিল পাঠকের কাছে বইটা যাচ্ছে কিনা, পাঠক কতটা নিচ্ছে আমার বইটা। এদিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান যে, বাংলাদেশের উপন্যাসের আলোচনায় যেকোনোভাবে আমার যে কোনো উপন্যাস আসে। এটা সবচেয়ে আমার বড় প্রাপ্তি। পশ্চিমবঙ্গেও তাই। কলকাতায়, ত্রিপুরায়, আসাম ইউনিভার্সিটিতে আমার লেখা পাঠ্য হয়েছে। এর চেয়ে বড় ব্যাপার একজন লেখকের কাছে আর কী হতে পারে।

স্বকৃত নোমান: শুরুর দিকে বাংলাদেশের কোনো ঔপন্যাসিককে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হতো কিনা?
সেলিনা হোসেন: কাউকেই প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করতাম না। আমার নিজের মধ্যে একটা মগ্নতা আছে। আমি সবসময় ওই মগ্নতার মধ্যেই থাকি। তাছাড়া অন্যের ভালোটা স্বীকার করার সহজাত প্রবণতা আমার আছে।

স্বকৃত নোমান: নারী হিসেবে লেখক হতে গিয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন কি?
সেলিনা হোসেন: কখনোই কোনো প্রতিবন্ধকার মুখোমুখি হইনি। কেউ আমাকে বাধা দেয়নি। কেউ বলেনি যে লিখতে পারবে না। বরং সবাই উৎসাহ দিয়েছে। বাবা মা থেকে শুরু করে ভাই-বন্ধু সবাই আমাকে উৎসাহ দিয়েছে। আমি লেখালেখি করতে গিয়ে আমার পরিবারকে অবহেলা করিনি। সন্তানদের সব কিছুই আমি ম্যানেজ করেছি। ওরা বলতে পারবে না যে আমরা এই জিনিসটা আমার মায়ের কাছ থেকে পাইনি।

স্বকৃত নোমান: আপনি যখন লেখালেখি শুরু করলেন তখন বা তার দুই দশক পরেও বাংলাদেশে ভালো উপন্যাস লেখা হয়েছে। এখন কি আগের মতো হচ্ছে?
সেলিনা হোসেন: আগের মতো হচ্ছে বলা যাবে না। সিনিয়র লেখকরা কম লিখছেন। তরুণরা সময় নিচ্ছেন। এখন একটু কম হচ্ছে।

স্বকৃত নোমান: কম হওয়ার কারণ?
সেলিনা হোসেন: মনযোগটা ভাগ হয়ে গেছে। বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তির কারণে ভাগ হয়ে গেছে। সেদিন এক কবি বলল, কবিতা লেখার চাইতে আমার ফেইসবুকে আনন্দ বেশি। তার মানে সবাই ওখানে সময় দিচ্ছে বেশি। আবার সবাই যে ওখানে সময় দিচ্ছে হয়ত তা নয়। কিন্তু একজনের মুখে শুনলেই আমার মনে হয় যে, এই সময়টা লেখালেখিতে দেয়া যেত না? আমি বলছি না তথ্যপ্রযুক্তিকে আমরা অস্বীকার করব। গুগল সার্চ করলে বিশ্ব আমার কাছে খোলা হয়ে যায়। খোলা দরজা দিয়েও আমাকে ঢুকতে হবে। কিন্তু পূর্ণ সময় তো ওখানে দেয়া যাবে না।

স্বকৃত নোমান: কিন্তু কলকাতাতেও তো তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু আমরা তো দেখতে পাচ্ছি আমাদের এখানের চেয়ে বড় বড় কাজ হচ্ছে ওখানে। আপনার কী মনে হয়?
সেলিনা হোসেন: আসলে আমাদের বাঙালি মুসলমানের শিক্ষাটা অনেক পরে হয়েছে না! আমাদের আগ্রহের জায়গাটা, আমাদের কমিটমেন্টের জায়গাটার একটু অভাব আছে। আমরা কমিটমেন্টের জায়গাটা ঠিকমতো ধরি না। পশ্চিমবেঙ্গর লেখকরা অনেক সিরিয়াস। তথ্যপ্রযুক্তির মধ্যে থেকেও লেখালেখির জায়গাটা ঠিকই তারা তৈরি করেছে। বাদ দিয়ে অন্যকিছু করেনি।

স্বকৃত নোমান: তার মানে আপনি শুধু তথ্যপ্রযুক্তিকে দোষ দিতে পারবেন না?
সেলিনা হোসেন: না, পারব না। তথ্যপ্রযুক্তি একটা দিক। মূল কথা এটেনশান ডাইভার্ট হয়ে গেছে।

স্বকৃত নোমান: আসলে প্রকৃত লেখককে তো কোনো কিছুই ধ্যান ভাঙাতে পারে না।
সেলিনা হোসেন: তা পারে না। অনেক প্রবীন লেখকই আছেন যারা বলেন, আমি তো এসবের মধ্যে নেই। আমি নিজেও এসবের মধ্যে নেই। আমার পরবর্তী সময় থেকে কারা আছে জানি না। তবে এটা সত্য, এটা তো একটা জায়গা তৈরি হয়েছে। এটাকে অস্বীকার করা যাবে না। এটার মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে।

স্বকৃত নোমান: তাহলে যে অনেকে বলেন বাংলাদেশ হবে বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্যের রাজধানী। আপনি কি একমত?
সেলিনা হোসেন: এগুলো তো বক্তৃতা। আমরা পশ্চিমবঙ্গকে অতিক্রম করতে পারব কিনা জানি না। হয়ত পারব। আশাবাদকেও আমি উড়িয়ে দিতে পারি না। ভাষা আন্দোলন তো আমরা করেছি, মুক্তিযুদ্ধ তো আমরা করেছি। আমরা বিভিন্ন গণআন্দোলন করেছি। আমাদের সাহিত্যের উপাদান তো আছে। আমরা না পারলে কে পারবে?

স্বকৃত নোমান: মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সেরকম একটা উপন্যাস তো এখনো লেখা হলো না।
সেলিনা হোসেন: এক অর্থে আমি মনে করি এটা একটা কথার কথা। অনেকে না পড়ে এমন কথা বলেন। যা হয়েছে তার মূল্যায়ন করে কেউ কথা বলে না। এটা খুবই দুঃখজনক। তবে ভবিষ্যতে হবে না একথা বলা কি যাবে? ‘ওয়ার এন্ড পিস’ টলস্টয় কবে লিখেছিলেন? সেই নেপোলিয়নের যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পরে। কাজেই আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে দাঁড়াতেই হবে। ওরা হয়ত বড় কিছু করবে। হয়ত পঞ্চাশজন হবে না, পাঁচজন হবে। এত নিরাশ হবো কেন? আমি আশাবাদী হতে চাই। আমাদের মধ্যে এখন যারা কাজ করছে তাদের মধ্য থেকে হয়ত কেউ সেই কমিন্টমেন্টের জায়গাটা তৈরি করবেন। আমাদের এক শ জন সাহিত্যিক যদি থাকে, তার মধ্যে পাঁচজনও বেরুবে নাÑ এটা আমি বিশ্বাস করি না। কেউ না কেউ বেরুবেই। কাউকে না কাউকে বেরুতেই হবে।

স্বকৃত নোমান: আপনি তরুণ নারী লেখকদের লেখা পড়েন?
সেলিনা হোসেন: হ্যাঁ, পড়ি। অনেকে ভালো লিখছেন।

স্বকৃত নোমান: ভাতগল্পটা?
সেলিনা হোসন: হ্যাঁ। ওর ‘বৃহস্পতিবারের গল্প’ নামে একটা বই আছে। পড়ে খুব ভালো লেগেছে। ও সিলেটে থাকে। ও যদি সিরিয়াস হয় তাহলে ওর হাত দিয়ে ভালো কিছু বেরুবে। এ ছাড়া পাপড়ি রহমানের গল্প-উপন্যাসও আমার ভালো লাগে। ও উপন্যাস ‘বয়ন’, ‘পালাটিয়া’ ভালো লেগেছে। ওর মধ্যে কিছুটা কমিটমেন্ট আছে। আমার মনে হয় ওর হাত দিয়ে একটা ভালো উপন্যাস হতে পারে। নাসরীন জাহানের অনেক সম্ভাবনা আছে।

স্বকৃত নোমান: বাংলাদেশ জন্মের তেতাল্লিশ বছর গত হলো। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ-উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে করেন?
সেলিনা হোসেন: যতটা বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ততটা হয়নি। আমরা অনেকখানি পিছিয়ে গেছি। মৌলবাদের উত্থানই তো আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে গোলাম আযমকে তো দেশে আনার কোনো দরকার ছিল না। কেন তাকে আনা হলো? কেন শাহ আজিজুর রহমানে মতো একজন রাজাকারকে সরকার প্রধান করা হলো? কেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিদের ক্ষমতায় বসাতে হলো? জিয়াউর রহমানের মতো একজন মুক্তিযোদ্ধার হাত দিয়ে তো এই কাজগুলো হওয়ার কথা ছিল না। তার মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল। তাদেরকে কাজে না লাগিয়ে কেন এই রাজাকারদের দিকে ঝুঁকে গেলেন তিনি?

স্বকৃত নোমান: সেই ভুলের মাসুলই তো আমাদেরকে দিতে হচ্ছে, নয় কি?
সেলিনা হোসেন: হ্যাঁ, সেই মাসুলই তো দিচ্ছি আমরা। জিয়াউর রহমান যেটা করলেন পরবর্তী সময়ে তারই পার্টির লোকেরা সেই রাজাকারদের গাড়িতে পতাকা দিয়ে দিল। এই হিসেবে যদি আমরা দেখি তাহলে তো আমরা পিছিয়েই গেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের জীবনের বাতিঘর। একটা আদর্শের জায়গা, লক্ষ্যের জায়গা, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের জায়গা। সেই জায়গা থেকে তো আমাদের সরে আসা উচিত না। কোনো রাজনৈতিক দল যে আদর্শ নিয়েই দলটি গঠন করুক না কেন, তার তো ওই জায়গা থেকে সরে আসা উচিত না। আমরা কেন মৌলবাদীদের প্রশয় দিচ্ছি? এই প্রশয় দেয়ার তো কোনো দরকার ছিল না। বিএনপি তো একাই ক্ষমতায় আসতে পারে। এই দলটির তো একটা ভালো ভিত্তি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তাহলে আমরা কী করে বলব যে আমরা এগিয়েছি?

স্বকৃত নোমান: মৌলবাদের এই উত্থান, এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ কী?
সেলিনা হোসেন: কঠিন হাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে। সোজা কথা, কোনোভাবে এই কাজ থেকে পিছু হটা চলবে না। জাতিকে গ্লানি মুক্ত করতে হবে, এবং জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।
স্বকৃত নোমান: কে করবে এই কাজটা? আওয়ামীলীগ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু কই, গত পাঁচ বছরে তো একজন রাজাকারেরও ফাঁসি দিতে পারল না আ’লীগ।
সেলিনা হোসেন: আইনের প্রক্রিয়ায় থেকে কাজটি হচ্ছে। কাদের মোল্লার রায় কার্যকর হয়েছে। আরও হবে। আ’লীগ ছাড়া আর কার কাছে আশা করব আমরা? আর তো কেউ নেই। কিন্তু আমি আশাবাদী, তারা পারবে। তাদের সহযোগিতা করবে নতুন প্রজন্ম। নতুন প্রজন্ম জেগে উঠেছে। আমি শাহবাগে তাদের জাগরণ দেখেছি। তারা জেগে না উঠলে তো হয়ত কাদের মোল্লার ফাঁসি হতো না। তরুণদের দিকে তাকিয়ে আমি হতাশ হই না। তারপরও বর্তমানে যে অচল অবস্থা চলছে, শেষ পর্যন্ত কী হবে জানি না। যা দেখছি তা শুভলক্ষণ নয়। জানি না আমরা কোন পথে হাঁটছি। আলোর তো কোনো নিশানা দেখা যাচ্ছে না।
স্বকৃত নোমান: মৌলবাদের উত্থানের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা কি দায়ী নয়?
সেলিনা হোসেন: হ্যাঁ। দায়ী তো বটেই। বিশেষ করে ক্বওমি মাদ্রাসাগুলো। এসব মাদ্রাসায় যারা পড়ে তারা ভয়ঙ্কর হিংস্র। দেখলেন না মতিঝিলে গাছগুলোর কী করল, কীভাবে বায়তুল মোকররমে আগুন দিল। সরকার ইচ্ছে করলে পারত এদেরকে কঠিন হাতে দমন করতে। সরকার পারবে না কেন? সেই দায়িত্ব সরকার নেবে না কেন? এটা রাজনৈতিক ব্যার্থতা। তাছাড়া সরকারের দায়িত্ব এখন একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা।

স্বকৃত নোমান: এখন বাংলাদেশে যে ক্রাইসিস চলছে, এখন যদি সুশীলরা নিরপেক্ষ থাকে, তাহলে তো জামায়াত-শিবির উপকৃত হবে। সেক্ষেত্রে?
সেলিনা হোসেন: না, এই অর্থে সুশীল সমাজকে তো একটা পক্ষে থাকতেই হবে। সুশীলদের অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে থাকতে হবে। কিন্তু কোনো লোভ করবে না, দলবাজি করবে না, দলের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা পেতে চাইবে না।
স্বকৃত নোমান: বাঙালি মুসলমান কি সাম্প্রদায়িক? আপনার কী মনে হয়?
সেলিনা হোসেন: মোটেই না। এ দেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক। কতিপয় গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তুলছে এবং সেভাবে কাজ করছে। এদেশের মানুষ যদি অসম্প্রদায়িক না হতো তাহলে ইসলামের নামে যারা রাজনীতি করে তারা ক্ষমতায় চড়ে নানা কিছু করে ফেলতে পারত। কিন্তু কই, দেশ ভাগের পর গত তেষট্টি বছরে তো তারা ক্ষমতায়ও যেতে পারল না। সুতরাং এ দেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক। নিঃসন্দেহে অসাম্প্রদায়িক।
স্বকৃত নোমান: বাঙালি সংস্কৃতি কি আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে?
সেলিনা হোসেন: খুব বেশি হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। যেমন ধরুন, দেশে কয়টা মেয়ে জিন্স পরে? খুব তো বেশি না। পাঁচ-দশটা মেয়েকে দিয়ে তো আমি আমার সংস্কৃতি নির্ধারণ করব না। আমি দেখব আমার পয়লা বৈশাখ যথাযথভাবে পলিত হচ্ছে কিনা। আমি নবান্ন উৎসবের দিকে তাকাব। দেখব ঠিকমতো উদযাপিত হচ্ছে কিনা। বাঙালি সংস্কৃতি তার জায়গাতেই আছে। কিছু যুক্ত হয়েছে। যুক্ত হওয়াটা স্বাভাবিক। সংস্কৃতি গ্রহণ করে, বর্জনও করে। ইতিবাচকগুলো থেকে যায়, নেতিবাচকগুলো বেরিয়ে যায়। যারা আমাদের সংস্কৃতির জগতের হাল ধরে আছেন, তারা কিন্তু অনেক সচেতন। সচেতন বলেই নিজস্ব শিক্ষা-সংস্কৃতিতে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। সমস্যাটা হচ্ছে যারা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে তাদের নিয়ে। তারা নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে জানছে না, তারা নিজের মাতৃভাষাকে জানছে না। সরকার পারছে না একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে। পৃথিবীর কোথাও বহুধারার শিক্ষা ব্যবস্থা আছে বলে আমার মনে হয় না। সরকার কেন এটাকে কন্ট্রোল করতে পারছে না? ইংলিশ মিডিয়াম থেকে তো কিছু হচ্ছে না। যদি হতো তাহলে তো আমরা দেখতাম ইংরেজিতে ভালো ভালো সাহিত্য বের হচ্ছে। হচ্ছে না তো। যে কজন লিখছে তারা নিজের সংস্কৃতিকেও জানে না। তাদের লেখায় দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য নেই।
স্বকৃত নোমান: বাংলা ভাষাও তো দূষিত হচ্ছে?
সেলিনা হোসেন: হ্যাঁ, হচ্ছেই তো। হাইকোর্টকে রুল জারি করতে হলো দূষণ ঠেকাতে। এই দূষণ স্রেফ বাণিজ্য। এক শ্রেণীর মানুষ এটা করছে। নিজের অস্তিত্বকে নিয়ে বাণিজ্য করা উচিত না। আমি মনে করি মাতৃভাষা প্রতিটি মানুষের মানবিক অধিকার। আমি একবার গুলশান ক্লাবে গিয়েছিলাম মহিলাদের একটি সংগঠনে বক্তৃতা দিতে। বললাম, যারা ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মিডিয়ামে পড়িয়ে শুধু ইংরেজি শেখায়, মাতৃভাষা শেখায় না, তারা তাদের মানবাধিকার লংঘন করে। কারণ ওই ছেলে যখন পরবর্তী জীবনে একটা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে, তখন বলবে আমি আমার মাতৃভাষা কিছুই জানি না, তখন তো সে একটা রিফ্যুজিতে পরিণত হবে। তার কোনো রুটস থাকবে না, তার কোনো দেশ থাকবে না। এমন মানুষ বিশ্বে কেউ চায় না। কোথাও না। কাজেই পরিবারের দায়িত্ব মাতৃভাষা শেখানো। তারপর জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়া। গ্রহণ বর্জন সে করুক।
স্বকৃত নোমান: এখন কি লিখছেন?
সেলিনা হোসেন: ‘গেরিলা ও বীরঙ্গনা’ নামে একটা উপন্যাস লিখছি। আগামি বই মেলায় বেরুবে। লেখা প্রায় শেষ। এখন এডিট করছি।
স্বকৃত নোমান: দীর্ঘ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
সেলিনা হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares