প্রবন্ধ : অন্নদাশঙ্কর রায় : পত্র-মানসের সন্ধানে : আবুল আহসান চৌধুরী

রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) পর বাংলায় পত্রসাহিত্যের কোনও ঋদ্ধ ধারা গড়ে ওঠেনি। প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) ও অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪-২০০২) ছাড়া এক্ষেত্রে আর তেমন উল্লেখযোগ্য কারও নাম স্মরণে আসে না। কেজো-চিঠি বা জবাবি-চিঠি ছাড়া মন-মতের পরিচয়চিতি চিঠি, যা-স্বভাবতই বক্তব্যপ্রধান, তার সন্ধান মেলে এঁদের চিঠিতেই। এঁদের মধ্যে আবার অন্নদাশঙ্কর নানাকারণে স্বতন্ত্র।

দুই.

বাংলা সাহিত্যে যাঁরা লেখক হিসেবে আবির্ভাবেই চমক লাগিয়ে স্বীকৃতি-সমীহ আদায় করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্নদাশঙ্কর রায়ের নাম মনে না-পড়ে উপায় নেই। আরও একটি ব্যাপারে তাঁর কথা বলতেই হয়, এমন লেখকের সংখ্যাও বেশি নয় যাঁরা সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই সমান দক্ষতা নিয়ে বিচরণ করেছেন। আর অন্তত এই দৃষ্টান্তও বিরল যে বাংলা-ওড়িয়া-ইংরেজি এই তিন ভাষাতেই তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন। লেখার জন্যে অকালে পেশা-ত্যাগÑএমন উদাহরণও অতি দুর্লভ। মুক্ত মন, উদার দৃষ্টি, স্বচ্ছ ধারণা, স্পষ্ট ভাষণ, ঐতিহ্যপ্রীতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনাÑতাঁর জীবন ও সাহিত্যকে এক ভিন্ন ধাঁচে গড়ে তুলেছে। সমর্পিত ছিলেন সত্য-সুন্দর-কল্যাণ-আনন্দের চেতনায়।

উৎকলের এক প্রবাসী বাঙালি-পরিবারের সন্তান তিনি। তাঁর জীবনে নাটকীয়তার ব্যাপারী কম নেই। অল্পদিনের পরিচয়ে প্রেম, তারপর চটজলদি বিয়ে করেন বিদেশিনি অ্যালিস ভার্জিনিয়া অর্নডর্ফকেÑনাম দেন লীলা, যিনি হয়ে ওঠেন তাঁর শিল্প-সহচরী-বেশে-ভাষায়-মূল্যবোধ-রুচিতে হয়ে ওঠেন পুরোদস্তুর বাঙালি। তাঁকে নিয়ে ঘুরেছেন তামাম বাংলা মুলুক। দেশভাগের আগেই বাংলার পূর্বাংশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রচিত হয় কর্মের সূত্রে। ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক গভীর হয়Ñএই অঞ্চলের মাটি ও মানুষের প্রতি এক আত্মিক টান অনুভব করেন। এর ফলে একসময় গভীর আবেগ-অনুরাগ-আকর্ষণে বলেছিলেন : ‘আমার শেষজীবন কাটাতে চাই কুষ্টিয়ায়, বাংলাদেশের হৃদয় যেখানে’। কিন্তু বাধ সাধল দেশভাগ। তবুও বন্ধনের সুতো ছিঁড়ে যায়নি কখনও। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের তিনি ছিলেন অকৃত্রিম সমর্থক। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম তাঁর মনে নতুন করে আবার আশা জাগায়। ছিলেন প্রবলভাবে বাংলাদেশপ্রেমী, আন্তরিক অনুরাগী ছিলেন বাংলাদেশের মানুষ ও সাহিত্যের। বাংলাদেশ নিয়ে লেখা হয় তাঁর অসামান্য ‘ট্রিলজি’ : শুভোদয় (১৯৭২), বাংলাদেশে (১৯৭৯) এবং কাঁদো, প্রিয় দেশ (১৯৭৬)। শেষের বইটি বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর অন্তরমথিত শোকাঞ্জলি।

তিন.

আট দশক আগে চিঠি-লেখা সম্পর্কে নিজের কিছু বক্তব্য পেশ করেছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায় ‘চিঠির কথা’ নামে এক নিবন্ধে। ১৯৪১ সালে লেখা এই নিবন্ধটি প্রথমে জীয়নকাটি (১৯৪৯), পরে তাঁর সাহিত্যিকের জবানবন্দী (১৯৯৬) বইয়ে সংকলিত হয়। বলছেন তিনি : ‘আমার কোনও কোনও চিঠি বন্ধুজনের নির্বন্ধে মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর থেকে আমার বিশ্বাস জন্মেছে যে চিঠিরও সাহিত্যিক মূল্য থাকতে পারে। তেমনি ভয়ও জেগেছে যে আমার যে সব চিঠি ছাপবার মতো করে লেখা নয়, ফুর্তি করে লেখা সে সব চিঠিও একদিন ছাপার হরফে উঠতে পারে। এখন চিঠি লিখতে বসলে অমনি সতর্ক হই, পাছে এমন কিছু লিখি যা ছাপার হরফে ধরা পড়লে আমাকে সুদ্ধ ধরা পড়িয়ে দেবে। পাঠকরা ভাববেন, ‘কই, এঁর বই পড়ে যেমন মনে হয় চিঠি পড়ে তো তেমন হয় না।’ এতদিনের সাধনায় আমার যে সাহিত্যিক রূপটি দেশের পাঠকদের চোখে পরিচিত হয়ে এসেছে একখানি চিঠি তাকে একদিনেই ধুলিসাৎ করতে পারে। অতএব শতং বদ মা লিখ। এই লেখায় চিঠিপত্র সম্পর্কে অন্নদাশঙ্করের ভাবনাটি স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। চিঠি পাওয়ার আনন্দ, চিঠি লেখার উৎসাহ-আলস্য-সতর্কতা, চিঠির রকমফের, সাহিত্যিকের চিঠি লেখার সমস্যা-এইসব বিষয় নিয়ে তিনি খোলা মনে তাঁর নিজের মতামত অকপটে তুলে ধরেছেন ‘চিঠির কথা’য়।

চার.

অন্নদাশঙ্কর তাঁর ৯৮ বছরের দীর্ঘজীবনে অজস্র চিঠি লিখেছেন নানাজনকে নানা প্রয়োজনে। এর একদিকে যেমন রয়েছে পেশাগত জীবনে দাপ্তরিক কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনের চিঠিপত্র, সৌজন্যসূচক জবাবি চিঠি,Ñঅপরদিকে তেমনি আছে কোনও বিষয়ে নিজের মতামত জানিয়ে লেখা চিঠিÑসেসব চিঠি আবার কখনও বিতর্কমূলকও। বলেছেন তিনি : ‘চিঠি লিখতে বসলে আমি হয় ভদ্রলোক নয় ভাবুক।’ কেজো বা দরকারি চিঠি বাদ দিলে তাঁর চিঠিগুলো মূলত সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্য-রাজনীতি সম্পর্কিত বক্তব্য নিয়ে লিখিত। তবে এই জাতীয় চিঠিপত্রের মধ্যে দেশ ও সমাজের সমস্যা সম্পর্কে আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। এর ভেতর দিয়ে সমাজমনস্ক অন্নদাশঙ্করকে সহজেই আবিষ্কার করা যায়। অনেক চিঠিরই জন্মÑতাঁর ভাষায়Ñ‘তর্কের ঝোঁক’ ও ‘মত জাহির করার’ মানসিকতা থেকে।

পত্র-লেখক যদি সাহিত্যিক হন তা হলে তাঁর নিজের নামের প্রতি সুবিচারের প্রয়োজনে পত্র-রচনায় তাঁকে যথেষ্ট সতর্ক ও সচেতন থাকতে হয়। এ-বিষয়ে অন্নদাশঙ্করের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট : ‘সাহিত্য রচনার একটি উৎকর্ষমান আছে, সেই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হবার একটা প্রয়াস আছে, সে প্রয়াস তো চিঠির বেলায় স্থগিত রাখতে পারিনে। দরকারি বা সরকারি চিঠি হলে অন্য কথা, কিন্তু যে চিঠি কেবলমাত্র পড়বার জন্যে লেখা হয়েছে তা সাহিত্যের স্বজাতি, কেননা সাহিত্যও কেবলমাত্র পড়বার জন্যে লেখা। তা হলে সাহিত্যের মান চিঠির ওপরও আরোপিত হয়, চিঠিও হয়ে ওঠে সাহিত্য।’ এই কথার রেশ ধরে তিনি আবার বলেছেন : ‘যদি আমি রবীন্দ্রনাথ হতুম তবে যাই লিখতুম তাই হতো উৎকৃষ্ট, কিন্তু আজ যা লিখি কাল তা পছন্দ হয় না। সেইজন্যে আমার চিঠি যেদিন লেখা হয় সেদিন ডাকে না গেলে পরদিন ছেঁড়া কাগজের টুকরিতে যায়। যাঁরা আমার চিঠি পান তাঁরা জানেন না যে হয় ও চিঠি কোনওমতে ডাকঘরে গিয়ে জান বাঁচিয়েছে, নয় ওর বহু জন্ম অতীত হয়েছে। তা সত্ত্বেও সে চিঠি হয়তো আমার মনের মতো হয়নি। কী করি, একেবারে জবাব না দিয়ে তো পারিনে।’

অন্নদাশঙ্কর চিঠির জবাবদানের ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক, নিয়মনিষ্ঠ ও সৌজন্যপরায়ণ। এ-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর আদর্শ। যদিও তিনি উল্লেখ করেছেন : ‘আমাকে চিঠি লিখলে আমি তিন মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত নিরুত্তর থাকি।’ তাঁর এই বক্তব্যকে নিছকই রহস্য করে বলা কথার কথা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। কেননা চিঠি লিখে তাঁর কাছ থেকে কেউ জবাব পাননি এমন ঘটনা বিরলÑএই ভূমিকা-লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে এ-কথা অনায়াসেই বলা চলে।

পাঁচ.

কোনও মানুষকে অন্তরঙ্গ ও অকৃত্রিমভাবে চেনা-জানা-বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় তাঁর চিঠিপত্র। স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনীর চাইতেও চিঠিপত্রের সাক্ষ্য বেশি নির্ভরযোগ্য। এখানে সংকলিত অন্নদাশঙ্করের লেখা কুড়িটি চিঠি সম্পর্কেও এ-কথা সত্য। চিঠিগুলো নানাসময়ে পাঁচজনকে লেখা : আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), শিবনারায়ণ রায় (১৯২১-২০০৮), কায়সুল হক (১৯৩৩-?), সুরজিৎ দাশগুপ্ত (১৯৩৪-২০১৯) ও আবুল আহসান চৌধুরীকে (জ. ১৯৫৩)।

আবদুল কাদির যেমন কবি, তেমনি প্রাবন্ধিক, গবেষক, ছান্দসিক ও সম্পাদক হিসেবেও বিশেষ পরিচিত ও খ্যাতিমান। ১৯২৬ সালে ঢাকায় বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলনের সংগঠন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা। ছন্দচর্চা এবং নজরুল, রোকেয়া, মাশহাদী, শিরাজী, ইমদাদুল হক, এয়াকুব আলী, আবুল হুসেন প্রমুখের রচনা সংকলন ও সম্পাদনায় বিশেষ নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। তাঁর কবিতা রবীন্দ্রনাথের, ছন্দবীক্ষণ প্রবোধচন্দ্র সেনের এবং গদ্যরচনা সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও অন্নদাশঙ্কর রায়ের প্রশংসা অর্জন করে।

শিবনারায়ণ রায় সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও মূলত মুক্তমনের সমাজমনস্ক মননশীল প্রাবন্ধিক হিসেবেই পরিচিত। তাঁর মনন-মানসে মানবেন্দ্রনাথ রায় (এম. এন. রায়)-এর গভীর প্রভাব পড়েছে। বাংলা ও ইংরেজি, দুই ভাষাতেই লেখক হিসেবে তাঁর সমান দক্ষতা। অনেক বিশ^-মনীষীর সঙ্গেই তাঁর পরিচয় ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলÑবার্ট্রান্ড রাসেলের শংসাপত্র তার অন্যতম নিদর্শন। তাঁর সমাজবীক্ষণ, সাহিত্যবিবেচনা, শিল্পবোধ, ইতিহাসদৃষ্টি স্বাতন্ত্র্যচিতি। শিবনারায়ণ রায়-সম্পাদিত পত্রিকা জিজ্ঞাসা বাঙালি সমাজে একালে ব্যতিক্রমী প্রগতিপত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম-এর তত্ত্ব বাদে অন্নদাশঙ্কর চিন্তা-চেতনায় ছিলেন শিবনারায়ণের প্রায়-সমানধর্মা। নানা প্রসঙ্গে উভয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অনেক চিঠিপত্রের আদানপ্রদান হয়।

কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যবোদ্ধা ও সাময়িকপত্র-সম্পাদক কায়সুল হক পাকিস্তান-কালপর্বে দুই বঙ্গের সাংস্কৃতিক-সেতুবন্ধ ছিলেন-এই মন্তব্য যে কোনওক্রমেই অতিকথন নয়Ñতার প্রমাণ মিলবে তিরিশের কালের প্রধান কবি ও লেখকদের সঙ্গে তাঁর নিরন্তর পত্র-বিনিময়ের ভেতরে। তাঁর স্বচ্ছ রুচি, আধুনিকতার বোধ, স্নিগ্ধ শিল্পনির্মাণের পরিচয় মেলে শব্দের সাঁকো বা রবীন্দ্রনাথের নিরুপম বাগান কবিতার বই এবং অধুনা, কালান্তর বা শৈলী নামের সম্পাদিত পত্রিকায়।

সাহিত্যবোদ্ধা সুরজিতের পরিচয় কবি-কথাশিল্পী-প্রাবন্ধিক- শিশুসাহিত্যিক-সাংবাদিক-সাময়িকপত্র-সম্পাদক, চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে। নানা পেশার মানুষেরÑবিশেষ করে তাঁর সময়ের লেখকদের সঙ্গে চিঠিপত্রে আলাপ-পরিচয় গড়ে তোলায় খুব আগ্রহী ছিলেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় থেকে জীবনানন্দ দাশ, ধীরাজ ভট্টাচার্য থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্র-কার সঙ্গে না তাঁর চিঠি-চালাচালি চলত! বলা চলে, পত্র-যোগাযোগ ছিল তাঁর প্রধান শখ। সুরজিৎ ছিলেন অন্নদাশঙ্করের ঘনিষ্ঠজন ও একান্ত অনুরাগী।

ছয়.

এখানে সংকলিত অন্নদাশঙ্করের চিঠিগুলো মোটের ওপর বক্তব্যপ্রধান। কোনও-কোনওটি তো দীর্ঘ-কলেবরের পত্র-প্রবন্ধ যেন। এসব চিঠিতে অন্নদাশঙ্করের মন-মত-মর্জি-মেজাজের পরিচয় মেলে। কখনও নিজের সাহিত্যভাবনা, লেখার ধরনধারণ, মনোদ্বন্দ্ব, কখনও অনুজ সাহিত্যসেবীদের রচনা সম্পর্কে স্পষ্ট মতামত প্রকাশ এবং কখনও সামাজিক-রাজনৈতিক বা অন্য কোনও বিষয়ে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে তর্কের ঝোঁক লক্ষ করা যায়। তাঁর জীবনঅন্বেষা, সমাজচিন্তা ও সাহিত্যভাবনার স্মারক এই চিঠিগুলো। চিঠিতে তাঁর টুকরো কিছু মন্তব্য যেন সুভাষণ-প্রবচনের মর্যাদা লাভের যোগ্য-এখানে সেসবের সামান্য দু-চারটে পেশ করলে তাঁর চিন্তার গভীরতা, যুক্তির কৌশল ও বাক্্বৈদগ্ধ্যের পরিচয় মিলবে :

১. আমার নিজের কাজ হলো সাহিত্যের কাজ। আমি রসের সাগরে তলিয়ে যেতে চাই, তুলে আনতে চাই এমন কিছু যা আমার অথচ সকলের। আমার হাত দিয়ে সকলের (৭.৭.১৯৫১)।

২. বিপ্লব ঘটে যখন অগ্রসর হওয়ার আর সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় (২৫.১.১৯৫২)।

৩. আমি চবড়ঢ়ষব এর জন্যেই লিখি, কিন্তু People এখন তৈরি নয় আমার লেখা পড়তে বা পড়ে মর্মগ্রহণ করতে। সুতরাং আমাকে ধৈর্য ধরতে হবে, হয়তো আরও পঞ্চাশ বছর (৫.১১.১৯৫২)।

৪.           যে উপন্যাস লিখছি তাতে পূর্ণ সত্য থাকবে, সকলের জন্যই থাকবে, কিন্তু তাতে জল মেশানো হবে না। অপরপক্ষে তার জল মেরে দিয়ে ক্ষীর করা হবে না (৫.১১.১৯৫২)।

৫. আমার মনের বহু অংশ জুড়ে রয়েছে ‘সমাজমন’ অর্থাৎ আমার সামাজিক আমি সর্বক্ষণ আমার ব্যক্তি আমিকে তাগাদা দিচ্ছে, নিষেধও করছে, ঘুম পাড়াচ্ছে, জাগিয়েও তুলছে। কিন্তু সৃষ্টি করবে যে সে আমার ব্যক্তি আমি, রস সৃষ্টি ব্যক্তি আমির কাজ। সে স্বাধীনতা দাবি করবেই (৫.১১.১৯৫২)।

৬. কবিতার ওপর টান আমার বাল্যকাল থেকেই। একদিন আমি কবি ছিলুম। এখন যে কেউ আমাকে কবির পর্যায়ে ফেলে না, বড় জোর ছড়ার জন্যে স্মরণ করে, এটা আমার জীবনের অন্যতম আফসোস (২৪.১০.১৯৫৪)।

৭. বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে ভেবে দেখেছি, তাঁকে liberal বলা চলে না, কিন্তু humanist বলা চলে (১৫.৬.১৯৫৫)।

৮. কার্যক্ষেত্রে বহু অন্যায় সহ্য করলেও খ্রিস্টীয় জীবনাদর্শ গোড়া থেকে সব মানুষের সমান সত্যতা স্বীকার করে এসেছে। কিন্তু সবার ওপর মানুষ সত্য বলেনি। সেক্ষেত্রে রেনেসাঁসের বৈশিষ্ট্য (২৩.৫.১৯৫৬)।

৯. … সমাজে রাষ্ট্রে অর্থনীতিতে রাজনীতিতে সুনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে (২৩.৫.১৯৫৬)।

১০. পূর্ববঙ্গে যুক্ত নির্বাচন প্রবর্তিত হওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বৈপ্লবিকও বলা চলে (১৩.১০.১৯৫৬)।

১১. বাংলাসাহিত্য কোন্খান থেকে কোন্খানে এসেছেÑকত অল্পসময়ের মধ্যে এসেছেÑগল্পে, গদ্যে, কাব্যে, উপন্যাসে এই এক শ দেড় শ বছরের মধ্যে কী পরিমাণ বিবর্তন হয়েছে তা যখন হিসাব করি তখন সর্বপ্রকার মূঢ়তা ও প্রতিক্রিয়াপরায়ণতা সত্ত্বেও স্বীকার করতে বাধ্য হই যে, বিবর্তনমার্গে এর চেয়ে অগ্রগতি সাধারণত হয় না (৬.১২.১৯৫৬)।

১২. বইখানিতে [শঙ্করের ‘চৌরঙ্গী’] অনেকগুলো মুখ, কিন্তু মুখের পেছনে যে মন সে মন একটুখানি ঘোমটা সরায় শুধু। অল্পই তার দেখতে পাই। তারপর আবার ঘোমটা দেয়। একজন মানুষের পক্ষে অতগুলো মনের অন্তরঙ্গ হওয়া সম্ভব নয়। শঙ্কর অন্তরঙ্গ হতে সময় পাননি। বোধহয় দুরাশা বলে চেষ্টাই করেননি (২৩.১০.১৯৬২)।

১৩. বাংলার কবিতার ভাষা এ পারে ও পারে দু’পারেই কথ্য ভাষার সঙ্গে আপনাকে মিলিয়েছে (১৮.৫.১৯৬৮)।

সাত.

অন্নদাশঙ্কর রায়ের হাতের লেখা এমনিতেই দুষ্পাঠ্য, শেষজীবনে তা আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাঁর হস্তলিপি থেকে চিঠির পাঠনির্ণয় যথেষ্ট সময় ও শ্রমসাপেক্ষ ব্যাপার, অনেকাংশে দুরূহও বটে। দু-এক জায়গায় যেখানে পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, সেই ছাড়ের জায়গায় বন্ধনীর মধ্যে […] চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে। চিঠিগুলো প্রাপকভেদে কালক্রম অনুসারে বিন্যস্ত হয়েছে। আশা করি এক অসামান্য বাঙালি সৃজনশিল্পী ও মননচিন্তকের সঙ্গে পাঠকের অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটবে এই পত্রালির ভেতর দিয়ে।

পত্রাবলি

পত্র : ১

আবদুল কাদির-কে

২৩৩ যোধপুর পার্ক

কলকাতা ৩১

১৮ মে ১৯৬৮

শ্রদ্ধাস্পদেষু,

আপনার কাব্যগ্রন্থ উত্তরবসন্ত পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। আপনাকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

ছান্দসিক হিসেবে আপনি অল্পবয়সেই নাম করেছিলেন। সে সময় আপনার কবিতায় একটি classic মেজাজও ছিল। আপনার দিলরুবা আমাকে মুগ্ধ করেছিল।

তারপর আপনার কবিতা আবার এই গ্রন্থে দেখছি। ছন্দের হিল্লোল এখনও তেমনি আছে। কিন্তু ভাষা এখন archaic মনে হচ্ছে। হয়তো কবিতাগুলোর রচনাকাল অনেক দিন পূর্বে অতীত হয়েছে।

বাংলার কবিতার ভাষা এ পারে ও পারে দু’পারেই কথ্য ভাষার সঙ্গে আপনাকে মিলিয়েছে। আপনাকেও যুগধর্ম স্বীকার করে যুগের সঙ্গে পা ফেলে চলতে বলব। কিন্তু তা যদি আপনার স্বধর্ম না হয় তবে আপনি যেমন লিখছেন তেমনি লিখে চলুন। আমরা পড়ব।

ধ্বনি পত্রিকায় পূর্ব পাকিস্তানের পুরস্কার তালিকায় দেখলুম ১৯৬২-৬৩ সালে প্রবন্ধর পুরস্কার পেয়েছিলেন আবদুল কাদির। ধরে নিচ্ছি যে আপনিই তিনি। আমার অভিনন্দন জানবেন।

ও পারের বই এ পারে আসে না। তবু মাঝে মাঝে পাই। আপনারা বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে যা দিয়ে যাচ্ছেন তা আমাদেরও ধনবান করছে। এখন এখানে যথেষ্ট আগ্রহ জেগেছে আপনাদের লেখা সম্বন্ধে। কিন্তু বই আসার পথ খুলে না গেলে লাইব্রেরিতে রাখা যাচ্ছে না।

আমার প্রীতি ও শ্রদ্ধা জানবেন। ইতি।

আপনার

অন্নদাশঙ্কর রায়

আমি এখন কলকাতায় থাকি। শান্তিনিকেতন থেকে চলে এসেছি।

পত্র : ২

শিবনারায়ণ রায়-কে

শান্তিনিকেতন

৫.১১.৫২

প্রিয়বরেষু,

আপনার চিঠি পেয়ে আনন্দ জানাচ্ছি। আয়ুষ্মান অমিতাভের আবির্ভাব কেবল তার জনক জননীর নয়, আত্মঘাতী মানবজাতির সুখ শান্তি ও মৈত্রীর অন্যতম কারণ হোক।

আমার ওই প্রবন্ধটিতে অনেক কথা না বলা থেকে গেল। প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে আমার differnce  বোঝান হয়নি। কিন্তু এখন আর ও নিয়ে নাড়াচাড়া করব না। পরে যদি ‘বিনুর বই দ্বিতীয়’ লিখি ও সব কথা খুলে বলব। আমি বরাবর ভেবেছি-বলেছিও-যে আমি People এর অভিমুখে halfway যাব, Peopleও আমার অভিমুখে halfway আসবে। আমিই ষোলো আনা পথ তাদের দিকে যাব আর তারা যেখানে আছে সেখানে বসে থাকবে, কিম্বা তারাই ষোলো আনা পথ আমার দিকে আসবে আর আমি যেখানে আছি সেখানে বসে থাকব-এ ধরনের কথা কোনওদিন আমি স্বীকার করিনি, করব না। টলস্টয়ের সঙ্গে এইখানে আমার মতভেদ, বিপরীত অর্থে প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে এই নিয়ে আমার পথভেদ।

আমি People  এর জন্যেই লিখি, কিন্তু People এখন তৈরি নয় আমার লেখা পড়তে বা পড়ে মর্মগ্রহণ করতে। সুতরাং আমাকে ধৈর্য ধরতে হবে, হয়তো আরও পঞ্চাশ বছর। তারা তৈরি নয় বলে আমার কোনও নালিশ নেই, কিন্তু তা বলে আমি তাদের জন্যে সত্যকে ছেঁটেকেটে সত্যের একটা শিশুপাঠ্য সংস্করণ সৃষ্টি করব না। পূর্ণ সত্য পূর্ণ বয়স্কদের জন্যে দিয়ে যেতে হবে। যখন বয়স হবে তখন বুঝবে। অপরপক্ষে তাদের ওপর অভিমান করে সবসময় ছাদে উঠে বসে থাকতেও চাইনে। আমার গজদন্তের গম্বুজে বসে আমি বেহালাটি বাজাব, কেউ শুনুক না শুনুক, বুঝুক না বুঝুক-এমন উঁচু কপাল আমার নয়।

যে উপন্যাস লিখছি তাতে পূর্ণ সত্য থাকবে, সকলের জন্যই থাকবে, কিন্তু তাতে জল মেশানো হবে না। অপরপক্ষে তার জল মেরে দিয়ে ক্ষীর করা হবে না। শেষ বয়সে টলস্টয় যেমন জনকল্যাণ করবেনই বলে কোমর বেঁধেছিলেন আমার মতিগতি সেরকম নয়। অপরপক্ষে আমি amoral  নই। আমি যা তাকে লোকে  immoral বলে ভুল করতে পারে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে যা সত্য, যা সুন্দর, তা শিব না হয়ে পারে না। যদিও হাতে হাতে প্রমাণ দেওয়া সম্ভব নয়।

‘ব্যক্তিমন’, ‘সমাজমন’ প্রভৃতি abstraction নিয়ে কেন ভাবছেন ? আমার মনের বহু অংশজুড়ে রয়েছে ‘সমাজমন’ অর্থাৎ আমার সামাজিক আমি সর্বক্ষণ আমার ব্যক্তি আমিকে তাগাদা দিচ্ছে, নিষেধও করছে, ঘুম পাড়াচ্ছে, জাগিয়েও তুলছে। কিন্তু সৃষ্টি করবে যে সে আমার ব্যক্তি আমি, রস সৃষ্টি ব্যক্তি আমির কাজ। সে স্বাধীনতা দাবি করবেই। পাবেও। সমাজ যদি স্বাধীনতা না দেয় সমাজ কাকে দিয়ে সৃষ্টির কাজ করিয়ে নেবে ? না সৃষ্টির কাজে তার দরকার নেই ? সাময়িক মতিভ্রমের পর সমাজকেও স্বীকার করতে হবে যে শিল্পী মাত্রই free man বা free spirit..

আজ এই থাক। আপনারা তিনজনে আমার প্রীতি ও স্নেহ নিন। প্রসূতির কুশল, নবজাতকের কুশল চাই। ইতি।

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ৩

শিবনারায়ণ রায়-কে

শান্তিনিকেতন

২৩ শে মে ১৯৫৬

প্রীতিভাজনেষু,

আপনার সাহিত্য চিন্তা পেয়ে আনন্দিত হয়েছিলুম। ইতোমধ্যে পড়তে আরম্ভ করে দিয়েছি। কবে শেষ হবে তার জন্যে অপেক্ষা না করে দু’চার কথা আজকেই লিখতে বসেছি।

আপনি বাংলা সাহিত্যে আসার আগেই আপনার নাম আমার কানে আসে। প্রথমে পড়ি আপনার ইংরেজি রচনা। আপনি যে বিদেশি সাহিত্য সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল তা তখনি লক্ষ করেছিলুম। সঙ্গে সঙ্গে আপনার স্বকীয় চিন্তাশীলতার পরিচয় পেয়েছিলুম। পরে আপনার বাংলা রচনা পড়ে আশ্বস্ত হই যে, আপনাকে বাংলা সাহিত্যের দরবারে পাওয়া যাবে। কিন্তু আপনার তখনকার বাংলা বোধ হয় ইংরেজিতে ভাবা। তাই বাংলার স্বাদ তাতে পাইনি। এ দোষ ইতোমধ্যে কেটে গেছে। এখন আপনার বাংলা রচনার প্রসাদগুণ যে কোনও লেখকের পক্ষে গৌরবের। মনে হয় বাংলাতেই ভাবা। কিন্তু এখনও তার মধ্যে রসসঞ্চার হয়নি। হলে আপনার লেখা একাধারে সারবান ও ধারবান হবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র পুষ্টিকর নয়, রসনাতৃপ্তিকরও হবে। প্রমথ চৌধুরী মহাশয় এর দৃষ্টান্ত।

বিদেশি সাহিত্যের ওপর লিখতে আমিও চেষ্টা করেছি। বিদেশি সাহিত্য অনেক সময় বিশ^সাহিত্য। সুতরাং আমাদেরও সাহিত্য। আমাদের সেই বিশ^মানবিক উত্তরাধিকার বুঝে নেওয়া সকলেরই কর্তব্য। কিন্তু কিছু দিন চেষ্টা করে আমার এই শিক্ষা হলো যে বিশল্যকরণী তুলে আনতে হলে গন্ধমাদনও বয়ে আনতে হয়। বিদেশি সাহিত্যের পটভূমিকা যাদের জানা নেই তাদের কাছে পটভূমিকাটাও উপস্থিত করা দরকার। ইংরেজি বা ফরাসি বা জার্মান সাহিত্য কীভাবে বিবর্তিত হলো, কোন্ ধারার পর কোন্ ধারা এল, কাকে বলে রেনেসাঁস, কাকে বলে রোমান্টিসিজ্ম্্, ঝড়ঝাপটার যুগটাই বা কী ও কেন, এসব আনুপূর্বিক বর্ণনা করলে পরে বিচার করা সহজ হয়। অথচ অত বর্ণনা করার সময় কই আমার। তাছাড়া পাঠকের হাতের কাছে বই কোথায় যে সে মিলিয়ে নেবে। বাংলাভাষায় এখনও যথেষ্ট অনুবাদগ্রন্থ নেই, ইতিহাসগ্রন্থ নেই। তা যতদিন না হয়েছে বাঙালি পাঠক বরং ইংরেজি প্রবন্ধ পড়বে, তবু বাংলা প্রবন্ধ পড়বে না। আমার বাংলা উপন্যাস সম্বন্ধে কারা নাকি মন্তব্য করেছিল, এই যদি পড়তে হয় তবে ইংরেজি নভেল পড়ব না কেন ? বাস্তবিক বেচারাদের ওপর আমি বড় বেশি দাবি করেছি। আপনিও করছেন। কোথায় পাবে তারা অত রেফারেন্সের বই ? কী করে মিলিয়ে নেবে আপনার মতামত ? আপনার যদি উৎসাহ থাকে আপনাকে ইতিহাস লিখতে হবে প্রবন্ধের পটভূমিকা হিসাবে।

রেনেসাঁস কথাটি আজকাল সর্বত্র শুনতে পাই। আপনি সে সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ লিখে ক্ষান্ত হননি, অন্যান্য প্রবন্ধেও তার অবতারণা বা উল্লেখ করেছেন। বুঝতে পারছি সেটি আপনার একটি প্রিয় শব্দ। আপনার সঙ্গে মোটামুটি একমত হলেও আমার নিজের কিছু বক্তব্য আছে। রেনেসাঁস মানে নবজন্ম। কিসের নবজন্ম ? ইউরোপে যখন রেনেসাঁসের সূচনা দেখা দেয় তখন ইউরোপের লোক প্রাচীন গ্রিক জীবনাদর্শের সূত্র হারিয়ে ফেলেছিল। রেনেসাঁস হলো নতুন করে প্রাচীন গ্রিক জীবনাদর্শের সূত্রপাত। তা বলে খ্রিস্টীয় জীবনাদর্শের অন্তর্ধান ঘটল না। এত দিনেও ঘটেনি। ঘটবার কোনও লক্ষণ নেই। খ্রিস্টীয় জীবনাদর্শের একচ্ছত্র রাজত্ব গেল, তার একজন পরাক্রান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জুটল, এই পর্যন্ত বলা যায়। দীর্ঘকাল ধরে ইউরোপের আকাশে যুগল সূর্য বিরাজমান। তাদের সহ-অস্তিত্ব এত দিনে লোকের সয়ে গেছে। রেনেসাঁসের জীবনাদর্শ ও খ্রিস্টীয় জীবনাদর্শ দুই নিয়ে সাহিত্য। অবশ্য কোনওটাই অবিবর্তিত থাকেনি। একে অপরকে প্রভাবিত করেছে। কোন্ উৎস থেকে যে কোন্ স্রোতটা এসেছে তা ইতোমধ্যে লোকে ভুলে গেছে। এই যেমন ক্রীতদাস প্রথার উচ্ছেদ। আপনার ধারণা এটা রেনেসাঁসের অন্যতম সুফল। কিন্তু রেনেসাঁসের মূলে যে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা তার ভিত্তিশিলা ছিল ক্রীতদাস প্রথা। প্রাচীন গ্রিসে কেউ এর জন্যে লজ্জিত ছিল না, কোনও আদর্শবাদী কল্পনাও করেনি যে দাসহীন সভ্যতা সম্ভবপর। পক্ষান্তরে কিংডম অব গড বলতে আদিষ্ট খ্রিস্টীয় সাধক বা ভাবুকরা যা বুঝতেন তাতে সবাইকেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজকার খোরাক রোজ অর্জন করতে হতো। সমাজের শেষতম ব্যক্তিরও মজুরিতে সমান অধিকার। রাসকিন ও টলস্টয়ের বইগুলো পড়ে দেখবেন। কার্যক্ষেত্রে বহু অন্যায় সহ্য করলেও খ্রিস্টীয় জীবনাদর্শ গোড়া থেকে সব মানুষের সমান সত্যতা স্বীকার করে এসেছে। কিন্তু সবার ওপর মানুষ সত্য বলেনি। সেক্ষেত্রে রেনেসাঁসের বৈশিষ্ট্য।

‘সবার উপর মানুষ সত্য’ এ যদি হয় রেনেসাঁসের মর্মবাণী তবে খ্রিস্টীয় জীবনবেদের সারতত্ত্ব হচ্ছে ‘সব মানুষই সমান সত্য’। ক্রীতদাস প্রথা এর সঙ্গে খাপ খায় না। তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েছেন যাঁরা তাঁরা সাধারণত বিবেকী খ্রিস্টান। কোনও রেনেসাঁসপন্থিদের সংগ্রামের ক্ষেত্রে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এখানে আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই যে, খ্রিস্টীয় চার্চ ও খ্রিস্টীয় জীবনাদর্শ এক জিনিস নয়। চার্চ ক্রীতদাস প্রথা সমর্থন করতে পারে, যীশু স্বয়ং তা পারতেন না। এমনি আরও উদাহরণ দেওয়া যায়। মোট কথা রেনেসাঁসপন্থিরা প্রকৃতির ওপর মানুষকে জিতিয়ে দিয়েছেন, মাথার ওপর ঈশ^র বলে কাউকে রাখেননি, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের নৈতিক দ্বন্দ্ব যেখানে সেখানে তাঁদের জীবনাদর্শ উদাসীন। কারণ সে আদর্শ amoral. অপরপক্ষে খ্রিস্টীয় আদর্শ moral. রেনেসাঁসের কিছুকাল পরে ইউরোপের কয়েকটি দেশে রেফরমেশন বলে আরও একটা অধ্যায় শুরু হয়। এর প্রতিষ্ঠাভূমি রেনেসাঁস নয় বা উভয়ের মূলে প্রাচীন গ্রিস নয়। এটা খ্রিস্টীয় জীবনাদর্শেরই স্বয়ং-সংশোধন। যেসব দেশে কেবলমাত্র রেনেসাঁস হয়েছে সেসব দেশের চেয়ে যেসব দেশে রেনেসাঁস ও রেফরমেশন দুই হয়েছে সেসব দেশ অনেক বেশি অগ্রসর। বলা যেতে পারে ইংল্যান্ড ও জার্মানি রেফরমেশনের ভিতর দিয়ে গেছে বলেই ইতালি ও স্পেনের চেয়ে অগ্রসর। আর ফ্রান্সের প্রোটেস্টান্টরা সংখ্যাধিক না হলেও তাদের অস্তিত্বের দরুন ফ্রান্স ইতালির চেয়ে অগ্রসর হয়েছে। আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে রেনেসাঁসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু রেফরমেশনের গুরুত্ব উপেক্ষণীয় নয়। রেফরমেশন বাদ দিয়ে এলিজাবেথের ইংল্যান্ড কল্পনা করা যায় না। ডেমোক্রেসি যে দুটি দেশে সব চেয়ে সক্রিয়Ñইংল্যান্ড ও আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রÑসে দুটি দেশের শক্তির সোপান রেফরমেশন। প্রোটেস্টান্টরা সন্ন্যাসী নয়, অথচ নৈতিক। বিবেকচালিত প্রতিরোধকারীও তারাই।

আমাদের এ দেশের রেনেসাঁসের নায়ক বলে যাঁদের গণ্য করা হয় তাঁদের প্রায় সকলেই সঙ্গে সঙ্গে রেফরমেশনেরও নায়ক। আমাদের রেনেসাঁস ও রেফরমেশন একই কালে আরম্ভ হয়। উভয়েরই অগ্রদূত রামমোহন। উভয়েরই মধ্যমণি রবীন্দ্রনাথ। লক্ষণীয় এই যে, এঁরা কেউ প্রাচীন গ্রিসের জীবনাদর্শে বিশ^াসবান নন, পেগান নন, ‘amoral’ নন। আমাদের রেনেসাঁসে তাই ইউরোপীয় রেনেসাঁসের মূল সুরটি বাজেনি। আমরা বরং রেনেসাঁস কথাটি ব্যবহার করেছি আমাদের স্বকীয় জীবনাদর্শের নবজন্ম দ্যোতনা করতে। আমাদের স্বকীয় জীবনাদর্শ বলতে আমরা বুঝে থাকি উপনিষদের যুগের জীবনাদর্শ। সে আদর্শ পৌরাণিক আদর্শের দ্বারা আচ্ছন্ন ও ইসলামী আদর্শের দ্বারা অবলুপ্ত হয়েছিল। সম্প্রতি বৌদ্ধ জীবনাদর্শেরও পুনরুদয় দেখা যাচ্ছে। আমাদের রেনেসাঁসের এটাও অঙ্গ। ঠিক ইউরোপীয় অর্থে রেনেসাঁস এ দেশে কোনও দিন হয়েছে কি না সন্দেহ। কিন্তু হলে মন্দ হয় না। তারও প্রয়োজন আছে। কারণ শিল্প ও বিজ্ঞান চায় ‘amoral’ দৃষ্টি। যে দৃষ্টি নীতি দুর্নীতির বাইরে বা ঊর্ধ্বে। বলা বাহুল্য সে দৃষ্টি দুর্নীত নয়, ‘immoral’ নয়। তফাৎটা ভালো করে বুঝতে ও বোঝাতে হবে। নয়তো ‘immoral’ বলে ‘amoral’-কে দ্বীপান্তরে পাঠানো হবে।

অপর পক্ষে, সমাজে রাষ্ট্রে অর্থনীতিতে রাজনীতিতে সুনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেসব ক্ষেত্র নীতি দুর্নীতির বাইরে বা ঊর্ধ্বে নয়। আধুনিক ইউরোপ ঠিক এই জায়গায় ভ্রান্ত। যেখানে ‘মরাল অর্ডার’ চাই সেখানে যারা ‘আমরাল’ দৃষ্টির পক্ষে তারা ক্ষমতাসীন থাকলে মহতী বিনষ্টি। সত্যাগ্রহ সেখানে অবশ্যকর্তব্য। পেগান তা পারে না। সঙ্গে সঙ্গে শিল্পে ও বিজ্ঞানে ‘আমরাল’ দৃষ্টির জন্যে ঠাঁই করে নিতে হবে। এ এক কঠিন সিন্থেসিস। এটা কিন্তু একেবারেই অসম্ভব হবে যদি আমরা ‘আমরালে’র জন্যে জীবনের সব কটা ক্ষেত্র দাবি করতে যাই। কিংবা ‘আমরাল’কে ছাড়িয়ে গিয়ে ‘ইম্্মরালে’র পর্যায়ে উঠি। ইউরোপে তাও দেখছি। অসীম প্রাণশক্তির সঙ্গে উৎকট বিষ, অমিত স্বাস্থ্যের সঙ্গে অসাধ্য রোগ, অপূর্ব রূপলাবণ্যের সঙ্গে প্রচ্ছন্ন জরাÑএই হচ্ছে আজকের ইউরোপ। যত রকম বিচার বিকৃতি বাতিক ছিট সব কিছু জীবনে এসেছে। জীবনে এসেছে বলে সাহিত্যে এসেছে। এদের প্রতি নরম হতে যাওয়া মিছে। এ জিনিস পেগান নয়, ‘আমরাল’ নয়। পেগান হলো প্রকৃতি। এ হচ্ছে বিকৃতি। পেগান হলো যৌবন। এ হচ্ছে জরা।

আমাদের দেশের লোক পশ্চিম সম্বন্ধে প্রেজুডিসগ্রস্ত বলে আমাদের কর্তব্য তাদের সেই প্রেজুডিস দূর করা। তা বলে পশ্চিমের ভিতরে যে বিষক্রিয়া চলেছে তার সমর্থন করতে পারিনে। পশ্চিমের মধ্যে যা বিশ^জনীন বা চিরন্তন তা যেমন পাশ্চাত্য বলেই  হেয় নয়, তেমনি পশ্চিমের মধ্যে যা ক্ষয়িষ্ণু বা পচা তা উন্নতের সঙ্গে মিশ্রিত বলেই শ্রেয় নয়। আধুনিক ইউরোপে যুদ্ধ ও বিপ্লবের গোলমালে এমন একটা মূল্যবিভ্রাট ঘটেছে যে, যার যা দর নয় সে তাই পাচ্ছে, যার যা দর সে তা পাচ্ছে না। মাথা একদম গুলিয়ে গেছে। অন্তঃসার, অন্তঃসৌন্দর্য, এসব যেন কিছুই নয়। যেন বাইরের ও ভিতরের নরকটাই বস্তুসত্তা। হিউমানিজম যেন ইনহিউমান বা অ্যান্টিহিউমান। আমার তো মনে হয় সামনের পঞ্চাশ বছর কেটে যাবে প্রকৃতিস্থতা ফিরিয়ে আনতে।

এ দেশ বহু শত বছরের জরাগ্রস্ত অবস্থার পর সবে একটু তরুণ হতে আরম্ভ করেছে। এ দেশের লেখক আমরা এই নবলব্ধ তারুণ্যকে আরও সত্যিকার করব। নয়তো এ হবে পাকাচুলে কলপ লাগানোর মতো ব্যাপার। ধোপে টিকবে না। ইউরোপের দৃষ্টান্ত আগে আমাদের কাজে লেগেছে, আমাদের চিন্তানায়করা ইউরোপের সাহায্য না পেলে প্রাচীন ভারতকেও পুনরাবিষ্কার করতে পারতেন না। এখনও ইউরোপের দৃষ্টান্ত আমাদের সহায় হতে পারে। সেদিক থেকে আপনার উদ্যম সার্থক। লোকের নিন্দা-প্রশংসা মাথায় রেখে আপনি নিজের কর্তব্য করে যান। তবে অতি সহজেই আপনি লক্ষ্যভ্রষ্ট হবেন যদি নির্বোধদের নির্বুদ্ধিতার আতিশয্য দেখে তিক্ত বিরক্ত হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্র-ফ্যানাটিকদের উন্মত্ততার উত্তরে যদি গ্যয়টে-ফ্যানাটিক হয়ে ওঠেন। গ্যয়টে বা রবীন্দ্রনাথ কেউ মানবাত্মার চূড়ান্ত অভিব্যক্তি নন, চরম সত্য কারও ভাণ্ডারে নেই, এখনও অনেক দূর যেতে হবে, যাত্রীরা হবে আত্মদীপ। এঁদের কে কতটুকু প্রেরণা জোগাতে পারেন সেইটেই জানতে হবে, জানাতে হবে। আমি সকলের দ্বারস্থ হয়েছি। গ্যয়টেরও। টলস্টয়েরও। রবীন্দ্রনাথেরও। ধনী হয়েছি।

আমার নমস্কার জানবেন। গীতা দেবীর নিরাময় প্রার্থনা করি। ইতি।

ভবদীয়

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ৪

শিবনারায়ণ রায়-কে

শান্তিনিকেতন

১১/৭/৫৬

প্রীতিভাজনেষু,

আপনার চিঠি পেয়ে আনন্দিত হয়েছি।

আপনি এখানে এসে কিছু দিন থাকতে ও লেখার জন্যে মাল-মসলা সংগ্রহ করতে চান। আপনার এই সংকল্পে আমার পূর্ণ সহানুভূতি আছে। কিন্তু এখানকার গেস্ট হাউসে ওরা কাউকে একনাগাড়ে তিনদিনের বেশি থাকতে দেয় না। তার জন্যে Vice-Chancellor এর বিশেষ অনুমতি লাগে। নতুন Vice-Chancellor শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ বসু মাত্র দশ দিন হলো এসেছেন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ বুঝে নিতে ব্যস্ত রয়েছেন। তাঁর কাছে আপাতত এরকম কোনও প্রস্তাব করতে স্বতঃই আমাদের দ্বিধা বোধ হয়। আরও কিছু দিন যাক। দ্বিতীয়ত, এখন বাইরে থেকে এত বেশি লোকজন আসছে যে আপনাদের দুজনের জন্যে আস্ত একখানা ঘর তিন দিনের জন্যেও রিজার্ভ করা যায় না। অগ্রাধিকার বিশ^ভারতী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। স্বতন্ত্র ঘর মাত্র তিনখানা।

বাসস্থান সমস্যাই একমাত্র সমস্যা নয়। মাল-মসলা লাইব্রেরিতে পাবেন না। সেখানে বইপত্র যা আছে তা কলকাতার তুলনায় নগণ্য। পাবেন ‘রবীন্দ্রসদনে’। কিন্তু সেটা এখন অগোছাল। তার একভাগ এখানে, এক ভাগ ওখানে, এমনি তিন চার জায়গায় ছড়ানো। গোছগাছ করতে কে জানে কতকাল লাগবে! শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ বসুর মনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে। আমি তো আজকাল বিশ^ভারতীয় কর্মসমিতিতে বা সংসদে নেই। আমি বাইরের লোক।

তারপর আর একটি দুঃখের কথা আপনার গ্যয়টে ও রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে প্রবন্ধ পড়ে (বা না পড়ে) রবীন্দ্রভক্তরা আপনার ওপর অপ্রসন্ন হয়ে রয়েছেন। কিছুদিন লাগবে আপনাকে বুঝতে। তার আগে তাদের সহযোগিতা পাওয়া যাবে না। এই সব কারণে আপনার শান্তিনিকেতন আসা মাস কয়েক পিছিয়ে যাওয়াই সমীচীন। ইতোমধ্যে আপনি আরও দু’একটা প্রবন্ধ লিখে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আপনার বক্তব্য আরও পরিষ্কার করে নিন।

আপনার থিসিস বা সন্দর্ভ আমি নিজে দেখে দেব। সেটি লিখতে বসার আগে আপনি আমার সঙ্গে কয়েকদিন ধরে আলোচনা করবেন। ভালো জিনিসও খারাপ হয়ে যায় যদি values ভুল হয়। আপনার  values একটি বিশেষ ideology-র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সে ideology সাহিত্যরসকে মুখ্য না করে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সমাজনৈতিক স্থিতি ও গতিকে মুখ্য করে। সাহিত্যরস যে স্বাধীন ও স্বনিয়ন্ত্রিত এটা আমাদের জন্মকালেও স্বতঃসিদ্ধ ছিল। আজকাল হাওয়া এমন বদলে গেছে যে সাহিত্যকরাই এটা মানছেন না। আপনি নতুন হাওয়া থেকে একটুখানি সরে না দাঁড়ালে আপনার বিচারফল রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র প্রমুখ সাহিত্যিকদের স্বরূপে প্রতিষ্ঠা করবে কি না সন্দেহ। আমাদের তো কথাই নেই। কাজেই আপনার সঙ্গে গোড়ায় কিছু তর্ক-বিতর্ক হয়ে যাওয়া দরকার। শুধু তর্কবিতর্ক নয়, আমার উপলব্ধিও আপনাকে জানাতে চাই। আমার বাসায় জায়গা থাকলে আপনাকে ও গীতা দেবীকে আমাদের সঙ্গে কয়েকদিন কাটাতে বলতুম। কিন্তু আমি এই মাসেই বাসা বদল করছি। যে বাসায় যাচ্ছি সেটা আরও ছোট। দেখা যাক কবে কোথায় দেখা হয়।

আপনারা উভয়ে আমাদের উভয়ের প্রীতিনমস্কার নিন। আশা করি গীতা দেবী এখন নিরাময়। ইতি।

ভবদীয়

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ৫

শিবনারায়ণ রায়-কে

শান্তিনিকেতন

৬/১২/৫৬

প্রীতিভাজনেষু,

আপনার চিঠি ও লেখা দুই পেয়েছি। খুশি হয়েছি আপনি আমাকে দেখতে দিয়েছেন বলে। কিন্তু দেখে খুশি হইনি। প্রায় প্রত্যেক লাইন সম্বন্ধে আমার বক্তব্য আছে, সে বক্তব্য আপনার সঙ্গে মেলে না অনেক স্থানে। এসব মুখে বলাই সমীচীন। লিখতে বসলে আর কিছু লেখার সময় পাব না। Fact এর ভুল, বানানের বা ছাপার ভুল বড় কম নয়। ‘সবুজ’ কথাটা ফারসি থেকে এসেছে। সুতরাং পণ্ডিতী বানান হবে ‘savuj’ ‘নয়’ ‘sabuz’ আর অপণ্ডিতী বানান ‘sabuj’। ভারত সচিবের নাম Montague নয় Montagu. ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের সমসাময়িক বা সমবয়সীÑএ কি কখনও হতে পারে ? তাঁর জন্ম ১৮৪৭এ, মৃত্যু ১৯১৩য়। তিনি রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বয়সে বড়, প্রায় বঙ্কিমের সমসাময়িক। নামগুলো সংক্ষিপ্ত করে Jatin Sengupta, D. L. Roy ইত্যাদি লেখা অনুচিত।

আসল কথা এটা সাহিত্যের প্রবন্ধ নয়। রাজনীতির বা সমাজদর্শনের হতে পারে। সাহিত্যের স্বাদ এতে পেলুম না। সাহিত্য সম্বন্ধে যারা জানতে চায় তারা বাংলা সাহিত্যের পরিচয় পাবে না, কেবল কতকগুলো force  এর নাম শুনবে-যেমন nationalism বা Hindu revivalism এবং শুনবে কয়েকজন লেখকের নাম। আপনার সিদ্ধান্তগুলিও আজব-‘ Why the impact of the West failed to bring about a social and cultural renaissance in modern Bengal!’ ‘The new philosophy did not evolve from within’! ‘… the tragedy of modern civilisation in Bengal’!…

এ সব যদি আমেরিকানদের জন্যে লেখা হয়ে থাকে তাদেরই মনের মতো করে, তাদেরই চশমা পরে তাহলে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হবে। অথবা যদি Radical Humanist নামক সম্প্রদায়ের থিসিসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তা হলে আরও শোচনীয় হবে। আমি এর মধ্যে গবেষণার বা সত্যনিষ্ঠার বা সাহিত্যবোধের কোনও নিদর্শনই পেলুম না। আমার মনে হয় আপনি অকারণে নিজের আয়ুক্ষয় করছেন। এ জিনিস কোথাও চলবে না। না এ দেশে, না ও দেশে। যেসব ইউরোপীয় এ দেশে সারাজীবন কাটিয়েছেন তাঁদেরও সিদ্ধান্ত এ ধরনের নয়। একজন মার্কিন মহিলা এদেশে ২৬ বছর বাস করছেন ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। তাঁরও সিদ্ধান্ত এর অনুরূপ নয়।

আপনার এ চেষ্টা ছেড়ে দেওয়াই ভালোÑআর নয়তো সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করে গুরুজনের কাছে শিক্ষা করা ভালো। একার মন বা মর্জি বা খেয়াল বা খুশির ওপর নির্ভর করে একটা ভাষাকে এভাবে misrepresent করা যায় না। আপনি নিজের বিপদ নিজের ঘাড়ে টেনে আনছেন। আমেরিকায় কেই বা এসব পড়বে। পড়লে পড়বে দেশের লোকই। তারা পড়লে এমন মর্মাহত হবে যে আপনার নাম সইতে পারবে না। অথচ এটা সত্যের জন্যে দুঃখ বরণ নয়। সত্য এর থেকে অনেক দূরে। বাংলা সাহিত্য রুশ সাহিত্যের মতো দেরিতে জেগেছে। রুশের মতো বিরাট দেশের না হয়ে ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের সাহিত্য বলে এর মধ্যে তেমন বিশালতা আসেনি, কিন্তু এ সাহিত্য নিশ্চয়ই আধুনিক চীনা, জাপানি, আরবি, ফারসি, হিন্দি, উর্দু সাহিত্যের চেয়ে কীর্তিমান। এর record এশিয়ার যে কোনও সাহিত্যের চেয়ে এক ধাপ ওপরে। এর যাঁরা লেখক তাঁরা আজকের দিনের রুশ জার্মান সুইডিশ ডাচ স্প্যানিশ পর্তুগিজ ইত্যাদি লেখকের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন। এই মুহূর্তে ইংরেজ, ফরাসি ও আমেরিকান ভিন্ন তাঁদের ওপরে বিশেষ কেউ নেই। আমরা ওঁদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পারব না, তার অনেক কারণ আছে, কিন্তু বাদ বাকির সঙ্গে নিশ্চয়ই পারব। এমন কি রুশ জার্মানের সঙ্গেও। যদি না আমাদের মাথায় communism বা Nazi-ism এর ভূত চাপে। অথবা Radical Humanism এর।

বাংলাসাহিত্য কোন্খান থেকে কোন্খানে এসেছে-কত অল্প সময়ের মধ্যে এসেছে-গল্পে, গদ্যে, কাব্যে, উপন্যাসে এই এক শ দেড় শ বছরের মধ্যে কী পরিমাণ বিবর্তন হয়েছে তা যখন হিসাব করি তখন সর্বপ্রকার মূঢ়তা ও প্রতিক্রিয়াপরায়ণতা সত্ত্বেও স্বীকার করতে বাধ্য হই যে, বিবর্তনমার্গে এর চেয়ে অগ্রগতি সাধারণত হয় না। ইউরোপীয় Renaissanceও ছোট একটি ভূখণ্ডে এক শ দেড় শ বছরে এই পরিমাণ অগ্রগতি দেখায়নি। Revolutionও না। যেখানে দেখা যাচ্ছে সেখানে চার শ-পাঁচ শ বছরের সাধনা সাহায্য করেছে। তাছাড়া Renaissance কেনই বা সব দেশে একই প্রকৃতি অনুসরণ করবে ? ইউরোপের এক এক ভূখণ্ডে এক এক রকম হয়নি কি ? চার শ পাঁচ শ বছরের record জাপানে বা জার্মানিতে এমন কি মহামূল্য হয়েছে ? বিচার যদি তুলনামূলক হয় বাংলার পক্ষে রায় মোটের ওপর অনুকূলই হবে।

প্রীতি নমস্কার উভয়কে উভয়ের। ইতি।

ভবদীয়

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ৬

কায়সুল হক-কে

শান্তিনিকেতন

১৪.৮.৫২

সবিনয় নিবেদন।

আপনার পোস্টকার্ড পেয়ে আপনি অসুস্থ জেনে অত্যন্ত দুঃখিত হলুম। আপনি যে সময় নির্দেশ করেছেন তার মধ্যে নতুন একটি প্রবন্ধ রচনা করা সম্ভব নয়। সেই জন্যে হাতে মজুত একটি অপ্রকাশিত প্রবন্ধ পাঠাতে বাধ্য হচ্ছি। এটি লেখা হয়েছিল কাজী আবদুল ওদুদ সাহেবের অনুরোধে ‘ওতন’ নামে একটি নতুন পত্রিকার জন্যে। পত্রিকাটি ভূমিষ্ঠ হলো না, তার পরে কাজী জিজ্ঞাসা করলেন প্রবন্ধ নিয়ে কী করবেন। আমি উত্তর দিলুম, ছিঁড়ে ফেলুন। তিনি জানালেন, জো আতা হ্যায় উনোকো আনে দো। আমি জানালুম, আচ্ছা তা হলে অন্য কোনও কাগজে দিয়ে দিন। এর পরে মাস দুই কেটে গেছে। তিনি বোধ হয় অন্যত্র দেননি। দিলে খবর পেতুম। এখন আপনি ভেবে দেখুন এটি প্রকাশ করা উচিত কি না। যদি মনে দ্বিধা থাকে তা হলে আমাকে ফেরৎ পাঠাবেন ও আর এক মাস সময় দেবেন। তা হলে আর কিছু লিখতে চেষ্টা করব।

আদাব জানবেন। ইতি।

কুশলপ্রার্থী

অন্নদাশঙ্কর রায়

জনাব কায়সুল হক সাহেব

সমীপেষু

নজরুলের সঙ্গে আমার পত্র ব্যবহার হয়নি। চিঠি নেই।

পত্র : ৭

কায়সুল হক-কে

শান্তিনিকেতন

২০/১১/৫২

প্রীতিভাজনেষু,

তোমার চিঠি ও পোস্টকার্ড একে একে পেয়েছি। প্রথমেই বলে রাখি যে আমি অতিশয় ব্যস্ত। লেখা কোনও মতে লিখতে পারি, কিন্তু অন্য পাঁচজনের কাছ থেকে জোগাড় করে দিতে পারিনে। এমন কি তাঁদের খোঁজখবরও দিতে পারিনে। একমাত্র শ্রীমতী লীলা রায় আমার হাতের কাছে। তিনি তো বাংলা লেখেন না। তাই ইংরেজি রচনা যদি অনুবাদ করতে ইচ্ছা তাঁর আপত্তি নেই-যেটি ‘কবিতা’ ‘American Number এ বেরিয়েছিল তার উপরে তাঁর কিছু বলবার নেইও।’

এখানকার একটি ছাত্রের নাম দিচ্ছি। তাকে চিঠি লিখলে সে হয়তো এই ধরনের কাজে সাহায্য করতে পারবে। অর্থাৎ ঠিকানা ও লেখা জোগাড় করে দিতে। সে একখানি পত্রিকার সম্পাদক। পত্রিকাটি জলপাইগুড়ি থেকে বেরোয়, ছেলেটি এখানে পড়ে।

শ্রী সুরজিৎ দাশগুপ্ত,

(সম্পাদক ‘জলার্ক’)

শিক্ষাভবন,

শান্তিনিকেতন

ঢাকায় আমার ও মাহবুব সাহেবের ‘আলাপ’ ছাপা হচ্ছে শুনে কৌতূহলী হলুম।

প্রীতিপূর্ণ আদাব। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ৮

কায়সুল হক-কে

শান্তিনিকেতন

১৩/১০/৫৬

কল্যাণীয়েষু,

পূর্ববঙ্গে যুক্ত নির্বাচন প্রবর্তিত হওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বৈপ্লবিকও বলা চলে। ১২ অক্টোবর একটি স্মরণীয় দিন। আমি আনন্দিত হয়েছি। ‘সংবাদ’ আমার কাছে রোজ আসে। যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে এমন জোরালো লেখা আর কোথাও দেখিনি। জনমত যে কত দূর অগ্রসর হয়েছে তা দূর থেকে আন্দাজ করতে পারি।

কিছু দিন আগে শ্রীমতী লীলা রায় একটি প্রবন্ধে জিব্রাইলের ডানার উল্লেখ করেছেন। পরে কোনও এক সময় বোধ হয় সূর্যদীঘল বাড়ীর সুখ্যাতি করবেন। ‘অধুনা’ পেয়ে আমি তোমাকে চিঠি লিখেছিলুম, পেয়ে থাকবে।

আমার আদাব জেনো। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ৯

কায়সুল হক-কে

শান্তিনিকেতন

১০ মার্চ ১৯৬৪

প্রীতিভাজনেষু,

বহু দিন পরে তোমার চিঠি পেয়ে বিশেষ আনন্দিত হয়েছি। শ্রীমান্্ শামসুর রাহমানের পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার প্রাপ্তিতে আমি উল্লসিত। আমার গৃহিণীও উল্লাস বোধ করছেন। কবি শামসুর রাহমানকে আমরাও এখান থেকে মনে মনে সংবর্ধনা করছি। তাঁকে আমাদের আন্তরিকতম অভিনন্দন জানাবে। তাঁর যাত্রাপথ জয়যুক্ত হোক।

শামসুর রাহমানের ‘রুপালী স্নান’ কবিতাটির ইংরেজি তর্জমা ‘World-Asian Culture’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তার একটি কাটিং আমাদের কাছে ছিল। সেটি বার করে দেখা গেল শেষের দুটি লাইন অন্য পৃষ্ঠায় ছিল, সে পৃষ্ঠাটি নেই। অনুবাদিকা ‘World-Asian Culture’ কে চিঠি লিখেছেন। পত্রিকাটি উঠে গেছে কি এখনও আছে জানিনে। তাঁরা যদি নকল পাঠান আমরা কবিকে সেটি পাঠাব। নতুবা নতুন করে ও দুটি লাইন তর্জমা করতে হবে। তার জন্যে চাই মূল কবিতাটি। সেটি আমাদের কাছে নেই।

শামসুর রাহমানের আরো কয়েকটি কবিতা এখানে সেখানে বেরিয়েছে-আমাদের কাছে আছে। কিন্তু আমরা চাই তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। যদি ও দুটি তিনি আমাদের পাঠাতে পারেন তা হলে খুবই ভালো হয়। আমরা ইচ্ছামতো কয়েকটি কবিতা বেছে নিয়ে তর্জমা করব। ‘আমরা’ মানে আমার better half. গৌরবে বহুবচন। অনুবাদ করে কবিকে দেখানো হবে। তার দরুন যদি কিছু পাওয়া যায় কবিকে পাঠানোর চেষ্টা করা যাবে। কিংবা তার পরিবর্তে তাঁকে অন্য ভাবে কিছু দেওয়া যাবে।

 তোমার কবিতার বইও সেই সঙ্গে পাঠিয়ো। সম্ভব হলে তোমার কবিতাও তর্জমা করা যাবে। আরও কয়েকজন পূর্ব পাকিস্তানি কবির কবিতাও তর্জমা করতে লীলাদির ইচ্ছা। আজকাল আমরা আর ‘সমকাল’ পাইনে। ওখানকার অগ্রসর চিন্তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কী করে পুনঃস্থাপন করা যায় ?

স্নেহ জেনো। কবি শামসুর রাহমানকে স্নেহ ও শুভকামনা জানিয়ো। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ১০

কায়সুল হক-কে

২৩৩ যোধপুর পার্ক

কলকাতা ৬৮

৭.৯.৭৪

প্রীতিভাজনেষু,

তোমার সঙ্গে এবার ভালো করে কথা বলার সুযোগ পাওয়া গেল না। ‘জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র’ থেকে প্রকাশিত লালন শাহ ফকিরের জন্ম দ্বিশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ পেয়ে ও পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। এ বিষয়ে একটি বিস্তৃত প্রবন্ধ লিখে আনন্দবাজার পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় দিয়েছি। লালন দ্বিশতজন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এটাই বোধহয় এপারে প্রথম প্রবন্ধ। লোকের আগ্রহ দেখলে দ্বিশতবার্ষিকী অনুষ্ঠান করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু ওপার থেকে বাউলদের আনিয়ে নেওয়া শক্ত। দেখা যাক কতদূর অগ্রসর হতে পারি। বাউলদের বাদ দিয়ে অনুষ্ঠান করলে জমবে না। গানটাই তো আসল।

‘বই’ মাঝে মাঝে পাই। Bangladesh Times প্রত্যহ নিই। বিচিত্রা আজকাল পাঠায়। এই বন্যার জন্যে আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আর কত মার খাবে তোমরা। তবে সব ভালো যার শেষ ভালো। শেষে মঙ্গল হবে।

রংপুর থেকে আমাকে যাঁরা নিমন্ত্রণ করেছিলেন তাঁদের চিঠিখানি খুঁজে পাচ্ছিনে। তাঁদের বলবে আমার পক্ষে কোথাও যাওয়া আপাতত সম্ভব নয়। বড় উপন্যাসে হাত দিচ্ছি। প্রীতি জেনো। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ১১

কায়সুল হক-কে

২৩৩ যোধপুর পার্ক

কলকাতা ৬৮

১১/২/৭৫

প্রীতিভাজনেষু,

জাপান থেকে ফিরে তুমি আমাকে যে চিঠি লিখেছিলে সে চিঠি আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমার ‘জাপানে’ বই লেখা সার্থক।

এত দিন তোমাকে আমি চিঠি লিখিনি। খবরটা পাকা হবার অপেক্ষায় ছিলুম। কাল খবর পেয়েছি যে এবারেও শহিদ দিবস উপলক্ষে একটি সেমিনার হচ্ছে ও এবারেও আমরা দু’জনে নিমন্ত্রিত। আমরা ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা রওনা হব। কোন্ flight এ সেটা পরে জানা যাবে। কলকাতা থেকে মোট ১২ জন যাবার কথা, কিন্তু কয়েক জন নানা কারণে যেতে পারবেন না। মনোজ বসু, মৈত্রেয়ী দেবী, নরেশ গুহ এঁরা যাবেন। সম্ভব হলে আমরা এক সঙ্গে যাত্রা করব।

অধ্যাপিকা নীলিমা ইব্রাহিমকে আমি আলাদা চিঠি লিখছি। তা হলেও তুমি তাঁকে টেলিফোনে জানিয়ো। আজকাল চিঠিপত্র দেরিতে পৌঁছয়, কিংবা আদৌ পৌঁছয় না।

সেমিনারে যোগ দেওয়া আমাদের প্রথম কাজ। কিন্তু সেই সব নয়। আমরা ওখানকার সাহিত্যিকদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপ করতে চাই। সে রকম ব্যবস্থা তুমি সেবার করেছিলে। এবারও কি পারবে ? তুমি একটা programme তৈরি করে রাখতে পার। ঢাকায় পৌঁছে, তোমার সঙ্গে কথা বলে পাকাপাকি করা যাবে। সেমিনারের সঙ্গে যাতে অসামঞ্জস্য না হয় তার ওপর দৃষ্টি রাখবে।

তরুণ ও প্রবীণ উভয় শ্রেণির লেখক লেখিকার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছা। কোনও একটা বিশেষ গোষ্ঠীর নয়, বিভিন্ন গোষ্ঠীর।

আমরা পুরো সাত দিন থাকতে পারব কি না সন্দেহ। এ দিকে কাজ পড়ে রয়েছে।

প্রীতি জেনো। ইতি।

জনাব কায়সুল হক

শুভাকাক্সক্ষী

সমীপে-

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ১২

কায়সুল হক-কে

Annada Sankar Ray

233 Jodhpur Park

Calcutta-68

9th October 1975

প্রীতিভাজনেষু,

তোমাকে কাল যে চিঠি লিখেছি এটি তার পুনশ্চ।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে তোমার সঙ্গে কথাবার্তার সময় ছিল কম। সেইজন্যে ভালো করে আলাপ আলোচনা হয়নি। ফিরে এসে চিঠি লেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু হাতে নানান কাজ ও মাথায় নানান ভাবনা। চিঠির পাহাড় জমে গেছে, উত্তর দেওয়া হয় না। বইয়েরও পাহাড় আমার সামনে। পড়া হয়ে ওঠে না।

আমার বয়স এখন একাত্তর পেরিয়েছে। কে জানে আর ক’দিন বাঁচব! বুদ্ধদেব বসু, নরেন্দ্রনাথ মিত্র আরও কম বয়সে চলে গেলেন। তাই আমার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করাই আমার কাছে জরুরি। তার জন্যে চিন্তিত। একটা বড়ো উপন্যাসে হাত দেবার জন্যে তৈরি হচ্ছি। ঢাকা থেকে ফিরে এসেই শুরু করে দেবার কথা ছিল। অন্যান্য লেখার চাপে বার বার পেছিয়ে দিতে হয়েছে। ভাবছি এই বার আরম্ভ করব।

এই উপন্যাসের পটভূমিকা ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৮। মহাযুদ্ধ ঘোষণা করার সময় থেকে গান্ধীজীর প্রয়াণ পর্যন্ত কাল। জগতের পক্ষে, ভারতের পক্ষে, আমার নিজের পক্ষে সেটা একটা সঙ্কট কাল। সঙ্কটের ভিতর দিয়ে ঘটবে renewal বা পুনর্নবীকরণ। এই সূত্রে প্রেমের কথা, সৌন্দর্যের কথা, চিরন্তন সত্যগুলোর কথাও থাকবে।

আমরা শান্তিনিকেতনে একটি বাড়ি তৈরি করাচ্ছি। আশা করছি জানুয়ারিতে উঠে যেতে পারব। অবশ্য কলকাতার পাট একেবারে তুলে দেওয়া হবে না। অনেকগুলো বাঁধন রয়েছে এখানে। ছেলে-মেয়ে নাতি নাতনি।

কিন্তু লেখার জন্যে চাই ধ্যান আর ধ্যানের জন্যে পরিবেশ। বিশেষত এই বয়সেÑযখন সংসার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে হয়। নিজেকে আমি গুটিয়ে নিচ্ছি।

অনেক কথাই ইচ্ছে করে তোমাদের বলতে। তোমরা আর আমরা রাজনীতির নিরিখে ‘বিদেশি’ হলেও পরস্পরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কোন্্টা যে অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, কোন্টা যে নয়, তা এক কথায় নির্দেশ করা যায় না। এই যে মুজিবনিধনে আমি এতখানি বিচলিত হয়েছি এ কি কখনও বিদেশির পক্ষে সম্ভব হতো ? পনেরো ষোলো দিনের মধ্যে পাঁচটা প্রবন্ধ ও তিনটে কবিতাই লিখে ফেললুম কিসের প্রেরণায় ?

তবু সতর্কতার প্রয়োজন আছে। কে জানে কে কী ভাবে নেবে! সরকারকে বিব্রত করা উচিত হবে না। এ সব লেখা তোলা রইল। পরে একটা বইয়ের শামিল হবে। বাংলাদেশ বেড়িয়ে এসে আমি যতগুলো প্রবন্ধ লিখেছি সব একত্র করলে একখানা বই হয়। বছর দুইয়ের মধ্যে বেরোবে।

তার আগে আমার বাংলাদেশে যাওয়া বোধহয় সম্ভব হবে না। তোমরাই এপারে এলে দেখা হবে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে ও পার থেকে ৮ জন বাউল আসবেন ও তাঁদের সঙ্গে চারজন সাহিত্যিকÑযাঁরা বাউলতত্ত্ব বোঝাতে পারবেন। আমরা এখনও দিন ধার্য করতে পারিনি। সেটার আগে রবীন্দ্রভবন বা সেই রকম কোনও আসর জোগাড় করতে হবে। পূজার ছুটির পরে আমরা একখানে বসে এ বিষয়ে পাকাপাকি করব ও ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসকে জানাব। টেলিফোনে এ খবরটা তুমি ডক্টর জালালুদ্দীন সাহেবকে জানিয়ে রাখতে পার। অধ্যাপক মনসুরউদ্দীন সাহেবকেও। তিনিই বাউলদলের নেতা হয়ে আসবেন। সম্ভব হলে বাউলদের আমরা শান্তিনিকেতন ঘুরিয়ে আনব। পূর্ণ বাউল সে ভার নেবেন। আশা করছি ডিসেম্বর মাসেই লালন দ্বিশতবার্ষিকী হবে।

আমাদের প্রীতি জেনো। ইতি।

তোমাদের

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ১৩

সুরজিৎ দাশগুপ্ত-কে

শান্তিনিকেতন

৭.৭.৫১

কল্যাণীয়েষু,

আমি কলকাতা ছেড়েছি এক মাস আগে। এখনও এখানে ভালো করে গুছিয়ে বসতে পারিনি। তুমি কলকাতায় আমার খোঁজ করেছিলে কিন্তু দেখা পেলে না শুনে দুঃখিত হলুম। আসছে বারে কখনও কোথাও দেখা হবে।

প্রত্যয় নামে যে প্রবন্ধগুলোকে একত্র করা হয়েছে সেগুলো গান্ধীজীর মৃত্যুর পর গান্ধীকৃত্য হিসেবে লেখা। তাঁর কাজ তিনি অসমাপ্ত রেখে গেলেন, সে কাজ আমাদের সকলের কিছু কিছু করা উচিত, এই ঔচিত্যবোধ থেকে সেগুলো লেখা হয়েছে। কিন্তু কত কাল এ কাজ আমি করতে পারি! এ তো আমার নিজের কাজ বা স্বধর্ম নয়। আমার নিজের কাজ হলো সাহিত্যের কাজ। আমি রসের সাগরে তলিয়ে যেতে চাই, তুলে আনতে চাই এমন কিছু যা আমার অথচ সকলের। আমার হাত দিয়ে সকলের। সুতরাং প্রত্যয় ঐখানেই শেষ হয়ে গেল। গান্ধীজীর কাজ আমার দ্বারা ঐটুকুই হলো। এর পরে অনেকে আমাকে বলেছেন গান্ধীচরিত লিখতে। পারব কি না জানিনে। এখন তো নয়।

কমিউনিস্টরা রুশ চীনে অসাধ্য সাধন করেছে, কিন্তু প্রাণ খুলে তাদের আশীর্বাদ করতে পারছিনে, কেননা তারা হিংসার জন্য একটুও অনুতপ্ত নয়, মিথ্যার জন্যে একটুও লজ্জিত নয়। তা বলে তাদের অভিশাপ দিতে পারব না, ধ্বংস করতে বলব না। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা তাদের কীর্তির ওপর পরমাণু বোমা ফেলা আমার সমর্থন পাবে না।

তোমার পত্রিকা চোখে দেখিনি। তোমাদের পলিসি না জেনে উপদেষ্টামণ্ডলীতে যোগ দেওয়া ঠিক হবে না। আমার কাছে কী উপদেশ চাও, সে উপদেশ পালন করবে কি না এসব আমার জানা চাই। আমার মনে হয় ও সবের দরকার নেই। আমাকে বা আর কাউকে উপদেষ্টা বলে ঘোষণা করে ফল যা আশা করছ তা পাবে না। গ্রাহক অন্য জিনিস চায়।

স্নেহ জেনো। ইতি।

শুভার্থী

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ১৪

সুরজিৎ দাশগুপ্ত-কে

শান্তিনিকেতন

২৫.১.৫২

স্নেহের সুরজিৎ,

তোমাকে কয়েকখানা চিঠির জবাব একসঙ্গে দিচ্ছি। যে ফোটোখানা পাঠাচ্ছি সেখানা এক ভদ্রলোক মেলার সময় তুলেছিলেন, আমার ও প্রবোধকুমার সান্যাল মহাশয়ের একসঙ্গে। হাতের কাছে আর কোনও ফোটো নেই।

না, আমি গান গাইতে পারিনে। সঙ্গীত বিষয়ক প্রবন্ধ আমি লিখিনি, সে বিষয়ে আমি অজ্ঞ। আমার পরবর্তী উপন্যাস পর্যায়ের পটভূমি সম্বন্ধে চিন্তা করছি। ইচ্ছা ছিল পটভূমি হবে ত্রিশ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রাম। কিন্তু খুব সম্ভব কোনও রকম পটভূমি থাকবে না।

বিপ্লব ঘটে যখন অগ্রসর হওয়ার আর সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। হিরণ্যকশিপুর মতো যারা ভাবে তারা সবাইকে মারবে কিন্তু তাদের কেউ মারতে পারে না, তারা সব পথঘাট বন্ধ করে রেখেছে, নৃসিংহ অবতারের মতো কোন্খান থেকে বিপ্লব আসে তাদের নিপাত করতে। আসে অকস্মাৎ। যখন আসে তার আধ ঘণ্টা আগেও কেউ জানে না। বিপ্লবীরা নিজেরাই জানে না।

বিপ্লব যে সফল হবেই এমন কোনও কথা নেই। হিরণ্যকশিপু গেলেও দানব বংশ অত সহজে যাবার নয়। প্রতিবিপ্লবও ঘটে। অনেক সময় প্রতিবিপ্লবের সঙ্গে বল কষাকষি করতে করতে বিপ্লবের অন্তঃসার উবে যায়। রাশিয়ায় যা আছে তা বিপ্লবের সার নয়। লেনিনের সঙ্গে সঙ্গে সেটা গেছে। রাশিয়া ও বিপ্লব সমার্থক নয়।

রুশের সমাজব্যবস্থা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষার পর ঠিক কী পরিমাণ অবশিষ্ট থাকবে বলা শক্ত। ওদের কৃষি পদ্ধতি অচল। কৃষকরা ওতে সুখী বা সন্তুষ্ট হতে পারে না। কেবল শ্রমিকের বা নাগরিকের স্বার্থে রাষ্ট্র চালাতে গেলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। এদেশেও কৃষিব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে কলকাতার ও industrial area রাশিয়া যদি সতর্ক হয়, তার সমাজব্যবস্থার এই দুর্বলতা সময় থাকতে যদি সারায়, তবে তাকে বহু পরিমাণে decentralise করতে হবে। তখন সে ব্যবস্থা প্রায় গান্ধীবাদী ব্যবস্থার কাছাকাছি যাবে।

না, উদ্দেশ্য মুখ্য ও উপায় গৌণ নয়। উপায়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্কটকালে উদ্দেশ্য মুখ্য হতে পারে, কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে উপায়ও মুখ্য হতে পারে।

Jan Christophe আমার জীবনে প্রভাব রেখে গেছে।

‘দু’কান কাটা’ আমার নিজের বিচারে সেরা গল্প। কবে আবার অমন একটা গল্প লিখতে পারব বিধাতা জানেন। ‘হাসন সখী’ ওর সমগোত্রের।

আশা করি পরীক্ষার পড়া জোর চলছে। স্নেহ জেনো। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ১৫

সুরজিৎ দাশগুপ্ত-কে

শান্তিনিকেতন,

২৪.১০.৫৪

স্নেহের সুরজিৎ,

কাল রাত্রে বড় একটা সিদ্ধান্ত নিলুম। যত দিন না রত্ন ও শ্রীমতী শেষ হচ্ছে তত দিন অন্য কোনও কাজ হাতে নেব নাÑব্যতিক্রম কেবল কবিতা, ছোটগল্প ও সাহিত্যিক প্রবন্ধ (সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রবন্ধ নয়)। সাত আট বছর এইভাবে চলবে।

তার পরে আমার প্রধান বাহন হবে কবিতা বা কাব্যনাট্য। ও ছাড়া আর যা হাতে নেব তা ছোটগল্প, সাহিত্যিক প্রবন্ধ ও বিনুর বই দ্বিতীয় তৃতীয় খণ্ড।

‘গান্ধী’ সম্বন্ধে চিন্তা করে দেখলুম যে ও বই রত্ন ও শ্রীমতীর সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলতে পারে না। যদি লিখতেই হয় তবে পরবর্তী বয়সে। লিখবই যে এমন কোনও জেদ আমার নেই। যদি আর কেউ লিখতে রাজী হন ও আমার সাহায্য চান তা হলে সেই হবে সব চেয়ে ভালো। তা না হলে আমাকেই লিখতে হবে, কিন্তু আপাতত সাত আট বছর নয়, তার পরে রয়ে সয়ে, কাব্যের ফাঁকে ফাঁকে।

কবিতার উপর টান আমার বাল্যকাল থেকেই। একদিন আমি কবি ছিলুম। এখন যে কেউ আমাকে কবির পর্যায়ে ফেলে না, বড় জোর ছড়ার জন্যে স্মরণ করে, এটা আমার জীবনের অন্যতম আফসোস। কিন্তু এখন আমার কাব্যে ফিরে যাবার সময় আসেনি, আমাকে উপন্যাসের রাজ্যে সৌন্দর্যের অন্বেষণ করতে হবে। তা ছাড়া কবিতা লিখতে বসলেই তো লেখা আপনি আসবে না, কবিতার যা আবশ্যকীয় গুণ-স্বতঃস্ফূর্তি বা abandan তা বহু ভাগ্যে আসে। তার জন্যে সবুর করব, মাঝে মাঝে দুটো একটা লিখব। তবে গোটা তিনেক বা চারেক বড় কবিতা লেখার পরিকল্পনা আছে, তাতে থাকবে আমার জীবনদর্শন বা ‘নিশ্চিতি’। বলতে পার আমার Book of Faith বা affirmations. এর জন্যে কিছুমাত্র ত্বরা নেই। উপন্যাসটা আগে। বিশ বছরের পুরোনো এনগেজমেন্ট।

দেখতেই পাচ্ছ এসব ভাবনার সঙ্গে তোমার সেই চিরন্তন জিজ্ঞাসা- dictatorship না অন্য কিছু-একেবারে বেখাপ। এসব জিজ্ঞাসার উত্তর কেউ তোমাকে দিতে পারে না। Aristotle এর সময় থেকে লোকে এই নিয়ে তর্ক করে আসছে। তবে এইটুকু তোমাকে বলতে পারি। box এর নিরাপত্তায় dictatorship হবে না, তার জন্যে  bullet লাগবে। যারা মরতে ভয় পায় তারা dictatorship এর স্বপ্ন দেখলে স্বপ্ন কখনও সত্য হবে না। সেরে ওঠো। স্নেহ জেনো। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর রায়

Nature তোমাকে warning দিয়েছে। সে warning মাথার ওপর ঝুলছে।

পত্র : ১৬

সুরজিৎ দাশগুপ্ত-কে

শান্তিনিকেতন,

১৫/৬/৫৫

স্নেহের সুরজিৎ,

তোমার চিঠি ও ‘দীপিকা’ পেয়েছি। প্রবন্ধটি ভালোই হয়েছে। আশা কোরো না যে তোমার শেষ সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত হব। একটা কথা আমার বিশ্রী লেগেছে। Concerbine শব্দটা ওখানে খাটে না। গ্যয়টের অন্য একজন সহধর্মিণী থাকলে Christiana কে ‘concerbine’ বলা চলত। কিন্তু গ্যয়টে আর কাউকে বিয়ে করেননি-আগেও না, পরেও না। ইউরোপে এরূপ স্থলে বলা হয় ‘Common Law Wife’ অর্থাৎ লোকাচারসম্মত পত্নী। উচ্চশ্রেণি নিম্নশ্রেণি বিবাহ তখনকার দিনে অচিন্তনীয় ছিল। নইলে তাঁদের আইনত বিবাহে কোনও বাধা ছিল না। তাছাড়া সেকালে civil marriage প্রচলিত হয়নি, গির্জায় গিয়ে বিয়ে করতে গ্যয়টের আপত্তি ছিল। তিনি nutralism এর বিপক্ষে। এখন পর্যন্ত কেউ গ্যয়টে-সঙ্গিনীকে ‘Concerbine’ বলেননি। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। তুমি কি ইতিহাস সৃষ্টি করবে ?

বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে ভেবে দেখেছি, তাঁকে liberal বলা চলে না, কিন্তু humanist বলা চলে। তা যদি বলো তবে মধ্যযুগীয় বলা অযৌক্তিক। বঙ্কিমচন্দ্র যে সব ধর্মগ্রন্থ লিখেছেন তার কোনওটিতে পূর্বসূরিদের authority মেনে নেননি। স্বাধীন মত দিয়েছেন। মধ্যযুগে এটা অসম্ভব ছিল। এ শুধু আধুনিক যুগেই সম্ভব। বঙ্কিমের উপন্যাসের অধিকাংশ নায়কনায়িকা কায়স্থ কিংবা রাজপুত। ব্রাহ্মণ বড় একটা দেখিনে, যাদের দেখি তারা ‘superior’ নয়। বরং শরৎচন্দ্রের লেখায় বামুন ও বামনীই বেশি। ছোটলোকও বড় একটা নেই। থাকলেও ‘inferior’ নয়। ব্রাহ্মণ প্রাধান্য তাঁর লেখায় উঁকি মারছে না। তবে সন্ন্যাসীকে তিনি বড় ভক্তি করতেন। জ্যোতিষ মানতেন। জানতেন না যে ওটা গ্রিস থেকে আমদানি। ভারতের নয়। হিন্দুরও নয়। মুসলমানের অত্যাচারে তিনি বিরক্ত ছিলেন, কিন্তু মুসলমানদের প্রতি তাঁর বিশেষ টান ছিল। এত রকম মুসলমান চরিত্র কোনও মুসলমানও আঁকেননি। আত্মসম্মানবোধ থেকে তিনি ইংরেজের ওপর বিরূপ ছিলেন, কিন্তু ইংরেজি শিক্ষা ও সাহিত্য থেকে দু’হাতে ঐশ্বর্য সংগ্রহ করেছেন। উপন্যাসের বেলা ইংরেজের লেখা ইতিহাস ও Tod এর লেখা ‘রাজস্থান’ তাঁর সম্বল। দেশি পুঁথি নয়। তাঁর মূল্যবোধ মোটের ওপর পশ্চিমমুখী ছিল। এক বিধবাবিবাহ ভিন্ন তাঁর সঙ্গে তাঁর সমসাময়িক সংস্কারকদের তেমন কোনও মতবিরোধ ছিল না। বহুবিবাহের ছবি তিনি এঁকেছেন ঐতিহাসিক উপন্যাসে। আধুনিক উপন্যাসে বহুবিবাহের বিরুদ্ধতা করেছেন। মূর্তিপূজা নিয়ে কোথাও বাড়াবাড়ি নেই। রামকৃষ্ণভক্ত ছিলেন না।

মধ্যযুগীয় হিন্দু গোঁড়ামি এল বঙ্কিমের পরেÑবঙ্কিমকে সামনে রেখে। এর জন্যে বঙ্কিমের দায়িত্ব বেশি নয়। বঙ্কিমকে যারা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে তারাই দায়ী।

তোমার লেখায় ও চিঠিপত্রে এত বেশি Marx Engle ইত্যাদি থাকে যে তোমাকে Marxist ভেবে তোমার বন্ধুদের সঙ্গে জড়িয়ে ‘তোমরা’ বলা আমার পক্ষে স্বাভাবিক। তবে তুমি যখন offence নিচ্ছ তখন ‘তোমরা’ প্রত্যাহার করলুম।

আমার ও-গল্প লেখার সময় Theker এর কথা মনে ছিল না, কোনও সম্বন্ধ নেই ‘Darling’এর সঙ্গে। ওটা বাউল থেকে পাওয়া ভাবের ওপর কল্পনা ফলানো।

নন্দু এইখানেই I.Sc. পড়বে। তোমার অভিনন্দনের জন্যে ধন্যবাদ। স্নেহ জেনো। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ১৭

সুরজিৎ দাশগুপ্ত-কে

শান্তিনিকেতন,

২৩/১০/৬২

স্নেহের সুরজিৎ,

তোমার ও মঞ্জুর চিঠি ও কার্ড পেয়ে খুশি হয়েছি। তোমরা ওখানে গিয়ে আনন্দে আছ তা জেনে আমিও আনন্দভাগী।

আজ আমাদের বিয়ের ৩২ বছর পুরো হলো। এতখানি পথ অতিক্রম করতে তোমাদের ৩১ বছর কয়েক মাস লাগবে।

চিন্তাটা এখনও সাহিত্যমুখী হয়নি। কিন্তু হবে মনে হচ্ছে। আপাতত চিঠিপত্র লিখছি, বইপত্র ঘাঁটছি। কাল শঙ্করের ‘চৌরঙ্গী’ পড়লুম। তোমার বই হাতের কাছে রেখেছি। পড়ব।

‘চৌরঙ্গী’ তো আজকাল খুব বাজার চলতি বই। শঙ্করের sale আমার সুপারিশের অপেক্ষা রাখে না। বইখানি উপহার পাঠিয়েছেন কেন তা হলে ? বোধ হয় বিশুদ্ধ সাহিত্যবিচারের জন্যে। (আশা করি পুরস্কার প্রত্যাশায় নয়।)

ভাবছি কী তাঁকে লিখব। বইখানিতে অনেকগুলো মুখ, কিন্তু মুখের পেছনে যে মন সে মন একটুখানি ঘোমটা সরায় শুধু। অল্পই তার দেখতে পাই। তারপর আবার ঘোমটা দেয়। একজন মানুষের পক্ষে অতগুলো মনের অন্তরঙ্গ হওয়া সম্ভব নয়। শঙ্কর অন্তরঙ্গ হতে সময় পাননি। বোধ হয় দুরাশা বলে চেষ্টাই করেননি। সেইজন্যে অনেকগুলো character পাওয়া যায়, কিন্তু এক একজনের একটিমাত্র দিক বা aspect. ক্বচিৎ কখনও আরেকটা দিক। সেটাতে  বাঁচিয়ে দেয়। মোটের ওপর তিনি মানবদরদি, humanist. সেইজন্যে তাঁকে আমার ভালো লাগে। সাফল্য বা সংসার তাঁকে নষ্ট  করেনি। আশার কথা।

তুমি তো জানো মেলার সময় এখানে কেমন ভিড় হয়। মেলার দু’তিন সপ্তাহ থেকে লোক আসতে আরম্ভ করে। বাড়ির মালিকরা অনেক বেশি আদায় করে নেন। মাস হিসেবে না দিয়ে দিন হিসেবে ভাড়া দেন। মাস হিসেবে যেখানে ৫০ টাকা লাগত দিন হিসেবে সেখানে তিনগুণ লেগে যায়। কাজেই এখানে আসতে হলে ডিসেম্বরে এসো না। মঞ্জুকে এ কথা বলবে। সে ডিসেম্বরে আসতে চায়।

প্রবন্ধ সঙ্কলনের পাত্তা নেই। তুমি নভেম্বরে ফিরলে একবার খোঁজ নিয়ো।

আমাদের স্নেহ জেনো দু’জনে। দাদাকে ও শম্ভুবাবুকে প্রীতিনমস্কার। ছোটদেরকে স্নেহ। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর

পত্র : ১৮

সুরজিৎ দাশগুপ্ত-কে

২৩৩ যোধপুর পার্ক

কলকাতা-৩১

১৮/১০/৬৮

স্নেহের সুরজিৎ,

বেজবরুয়া জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নিমন্ত্রিত হয়ে আসামের বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়ে ফিরে তোমার চিঠি পেয়ে পরম আশ্বস্ত হলুম। তোমরা নিরাপদে আছ, তোমার মা নিরাপদে আছেন, তোমার দাদা বৌদিও নিরাপদ (যদিও কোথায় আছেন জানা নেই)Ñএ সব খবর শোনার জন্যে আমি আসাম সফরের সময় বেশ উদ্বেগ বোধ করছিলুম। বিশেষ করে তোমার মার জন্যেই ভাবনা ছিল বেশী। তোমার মাসিমার কথা লেখনি। আশা করি তিনিও নিরাপদে আছেন।

আসাম সফর খুব ভালো লেগেছে। এমন স্বতঃস্ফূর্ত সানুরাগ সম্বর্ধনা আর কোথাও পাইনি। চোখে জল এসে গেল। লিখেছিলুম ওই একটি প্রবন্ধ-‘ড্রাগনের দাঁত’। তার থেকেই এত। একটি লেখার পুরস্কার কেউ কখনো এমন ব্যাপকভাবে পেয়েছে কি ?

ভাবছি আসামযাত্রার উপর একটি প্রবন্ধ লিখব। অনেক কথা বলবার আছে। আসামের লোক আমাদের থেকে কতক বিষয়ে ভিন্ন। প্রবন্ধটায় নাম রাখতে চাই (বেজবরুয়ার গান থেকে) ‘অ’ মোর আপোনার দেশ’ কিংবা ‘অ’ মোর চিকুণী দেশ’। (চিকুণী কথাটার মানে জানো ? আন্দাজ করো। বলব না।) শুধু বল কেমন শোনায়।

তোমার ইংরেজী প্রবন্ধ পেয়েছি। কয়েক লাইন পড়েছি। পরে পড়ব।

তোমরা কবে কলকাতা আসছ ?

একটু জিরিয়ে নিয়ে ‘গান্ধী’ লিখতে বসব। আপাতত আর কোনও বই না। তবে খুচরো লেখা কয়েকটা লিখতে হবে। ‘আর্টে’র শেষ অধ্যায় বাকি।

বিজয়ার স্নেহ ও শুভকামনা জেনো তোমরা। তোমার মাকে বিজয়ার প্রীতি নমস্কার। তাঁর যে গুরুতর ক্ষতি হলো তার জন্যে তাঁকে সমবেদনা জানিয়ো। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর

পত্র : ১৯

আবুল আহসান চৌধুরী-কে

২৩৩ যোধপুর পার্ক

কলকাতা-৬৮

৭/১০/৭৮

স্নেহাস্পদেষু,

তোমার চিঠি পেয়ে সুখী হয়েছি। আমার প্রকাশককে বলেছি তোমাকে আরও এক কপি পাঠাতে। তুমি নিঃসঙ্কোচে সমালোচনা করবে। ভুলভ্রান্তি দেখিয়ে দেবে। তিনটি গান সম্বন্ধে আমার মনে সন্দেহ ছিল। ভাষা কুষ্টিয়া অঞ্চলের নয়। শুধু মনসুরউদ্দীন সাহেবের ওপর নির্ভর করে ও তিনটি বাছাই করি। পরের সংস্করণে বাদ দেব। যদি সংস্করণ হয়।

ও পার থেকে বাউলদের আনার ব্যাপারটা এখনও অনিশ্চিত। দেশের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে আবার চেষ্টা করা যাবে। এখন তো বন্যার কবলে। তোমাদের ও দিকে বন্যার দাপট তেমন নয় আশা করি। স্নেহ জেনো। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর রায়

পত্র : ২০

আবুল আহসান চৌধুরী-কে

অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী                                                              

CALCUTTA-700019

কুষ্টিয়া                                                                                  

২১/১২/৯০

কল্যাণীয়েষু,

তোমার চিঠি পেয়ে সুখী হয়েছি। আমি জানতুম যে বর্তমান পরিস্থিতিতে তোমার আসা অসম্ভব। কিন্তু এমন যে হবে তা টেলিগ্রাম পাঠানোর সময় টের পাইনি।

রবীন্দ্রভারতী উপাচার্যকে অনুরোধ করছি… একটি লালন তিরোধান শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে। তিনি রাজী হন তোমাকে লিখব আবার … কয়েকজন বাউল নিয়ে আসতে। আমরা আতিথেয়তার ও যাতায়াতেরও ভার বহন করব।

তোমাকে ‘যুক্তবঙ্গের স্মৃতি’ পাঠাব। দেখবে তোমার বাবার কথা আছে। ‘লালন ও তাঁর গান’ এখন out of print. নতুন সংস্করণের ভার নিচ্ছে এবার ‘মিত্র ও ঘোষ’। ওরা একটা নতুন নামকরণ চায়। ‘লালন স্মরণ’ নাম দিলে কেমন হয় ?

স্নেহ ও শুভেচ্ছা জেনো। ইতি।

শুভাকাক্সক্ষী

অন্নদাশঙ্কর রায়

পুনশ্চ-

Carol Salomon কে খুব ভালো লেগেছে। বই ও চিঠি তাঁর হাতেই পাঠাচ্ছি।

তোমার ‘লালন শাহ’ গ্রন্থের আর একখানি কপি পেয়ে খুব খুশি হয়েছি। তোমাকে আমার অভিমত যত শীঘ্র পারি জানাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares