‘তুমি রবে নীরবে’ : হরিশংকর জলদাস

উপন্যাস

এক.

বিভাসের প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে চিৎকার

করে কেঁদে উঠল শর্মিষ্ঠাÑমা রে!

‘ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখোÑ

 তোমার মনের মন্দিরে।’

রিংটোন বেজে যাচ্ছে।

ধরছে না কেউ।

প্রথমবার তো নয়, দ্বিতীয়বারও ধরল না কেউ।

তৃতীয়বার করব! পর পর তিনবার ফোন করা তো নীতিবিরুদ্ধ! ভাবল বিভাস।

মন বলল, আরেকবার করে দেখ না। ভদ্রতার চেয়ে ফোনটা জরুরি।

মনের কথা শুনল বিভাস। তৃতীয়বার ফোন করল।

ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনেÑঝট করে মোবাইল অন হলো।

‘হ্যালো! কে বলছেন ?’ ওপাশে তরুণী কণ্ঠ।

কী আশ্চর্য! কে ফোন ধরল! ফোনটা তো তরুণীর না! তাহলে ও কেন কথা বলল!

এ পাশ থেকে কথা বলবে সে ? তার কথা বলা কি উচিত হবে ?

বিভাসের দোনমনার মধ্যে তরুণী আবার বলল, ‘কী আশ্চর্য! চুপ করে আছেন কেন! ফোন করেছেন অথচ কথা বলছেন না!’ তরুণীর অসহিষ্ণু কণ্ঠ।

‘না মানে, মানে…।’ বিভাসের কণ্ঠস্বরে ইতস্ততা।

‘কী মানে মানে করছেন ?’

বিভাস বলল, ‘আপনি কে ?’

ওপাশে তরুণীটি এবার হেসে উঠল। বলল, ‘ফোন করলেন আপনি, জানতে চাইছেন আমি কে!’

‘না, আমি যাকে ফোন করেছি, সে আপনি নন। তার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। আপনার সঙ্গে কোনওদিন কথা হয়নি বলে চিনতে পারছি না। তাই আপনার পরিচয় জিজ্ঞেস…।’

মুখের কথা কেড়ে নিল তরুণী। বিভাসের গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবং ধীরস্থিরভাবে কথা বলার ভঙ্গি তরুণীকে একটু ভড়কে দিল বইকি!

কণ্ঠ নরম করে এবার তরুণী বলল, ‘আমি এ বাড়িতে অতিথি। আমি ছাড়া এই বাড়িতে আর একজন নারী…।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ!’ বিভাস কিছু একটা বলতে চাইল।

‘আপনি কাকে চান, স্পষ্ট করে বলুন তো!’ বলল তরুণী।

বিভাস বলল, ‘আমি বিনুর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’

‘বিনু! বিনু আবার কে!’ অবাক হয়ে বলল তরুণী।

তরুণী আবার বলল, ‘এই বাড়িতে তিনজন নারীÑবিনোদিনী, শর্মিষ্ঠা আর পুটুমাসি। এই তিনজন ছাড়া আর কোনও নারী নেই এই বাড়িতে। আপনি বুঝতেই পারছেনÑবিনু বলে এখানে কেউ থাকে না।’

‘থাকে।’ একটু কৌতুক করতে ইচ্ছে করল বিভাসের।

‘থাকে! থাকে মানে, কে থাকে!’

‘বিনু থাকে।’

বিস্মিত কণ্ঠে তরুণী আবার বলল, ‘কী বলছেন আবোল-তাবোল!’

‘আমি আবোল-তাবোল বলছি না শর্মিষ্ঠা।’ বলল বিভাস।

‘শর্মিষ্ঠা! শর্মিষ্ঠা কে! আপনি আমার নাম জানলেন কি করে ?’

‘নাম শুনে। বিনোদিনীকে আমি চিনি। আর নাম শুনে মনে পড়েছে পুটুমাসির কথা। সুতরাং তুমি শর্মিষ্ঠা।’

‘তুমি! শর্মিষ্ঠা!’ শর্মিষ্ঠার কণ্ঠ আটকে গেল।

‘শুধু তা-ই নয়। তুমি বিনোদিনীর কন্যা। ঢাকায় থাক। সরকারি কলেজের শিক্ষক। বাংলা কলেজে ইংরেজি পড়াও।’

শর্মিষ্ঠা এবার থমকে গেল। সে অনুধাবন করলÑওপাশের যিনি, তিনি মায়ের পরিচিত। শুধু পরিচিত নন, বিশেষভাবে পরিচিত। নইলে তার সম্পর্কে এত কিছু জানলেন কি করে!

বিভাস বলল, ‘বেড়াতে এসেছ বুঝি বাপের বাড়িতে ? পিনাকি এসেছে সঙ্গে ? না কাজের চাপে আসতে পারেনি ?’

শর্মিষ্ঠা এবার চুপসে গেল। এখন তার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে ভদ্রলোক এই পরিবারের অনেক কিছুই জানেন। তার হাজবেন্ডের নাম পর্যন্ত যিনি জানেন, তিনি এই পরিবারের ঘনিষ্ঠজন না হয়ে পারেন না!

ম্রিয়মাণ কণ্ঠে শর্মিষ্ঠা বলল, ‘হ্যাঁ সবাই এসেছি আমরা। বিশেষ প্রয়োজনে আসতে হলো।’

‘কী প্রয়োজনে!’

‘সে আপনাকে এই মুহূর্তে বলা যাবে না।’ একটু থেমে শর্মিষ্ঠা জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা বিনুটা কে!’

এবার মৃদু শব্দে বিভাস হেসে উঠল। বলল, ‘আসলে আমি বিনোদিনীর সঙ্গে কথা বলতে চাইছি। তোমার মায়ের সঙ্গে। আমি তোমার মাকে বিনু বলে ডাকি।’

হু হু করে কেঁদে উঠল শর্মিষ্ঠা।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ফোনের এপারে বিভাস অপেক্ষা করতে থাকল। সে বুঝে উঠতে পারছিল না, মায়ের কথা জিজ্ঞেস করায় কেন এরকম আকুল হয়ে কেঁদে উঠল শর্মিষ্ঠা!

সে ঠিক করলÑশর্মিষ্ঠার কান্না না থামা পর্যন্ত কানে ফোন লাগিয়ে অপেক্ষা করবে।

বহুক্ষণ পরে কান্নার ফাঁকে ফাঁকে শর্মিষ্ঠা জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে, বলবেন ?’

শর্মিষ্ঠার কথা শুনে এইরকম বিমূঢ় অবস্থাতেও বিভাসের মধ্যে অভিমান পাকিয়ে উঠল। প্রথম প্রথম যখন ফোন করত বিভাস, বিনোদিনী বলত, ‘কে বলছেন ?’

বিভাস বলত, ‘‘কী আশ্চর্য! আর কতবার নিজের পরিচয় দেব তোমায়! নম্বরটা সেইভ করে রাখলে ‘কে বলছেন’Ñএই কথাটা বারবার শুনতে হতো না আমায়।’’

‘পাগলার খুব অভিমান হচ্ছে, না! শোন, তোমার নম্বরটা যদি মুখস্থ না রাখতে পারলাম, তাহলে আমি কীসের বিনু হলাম ?’

‘‘বুঝতেই তো পারছি, মুখস্থ আছে বলেই তো আমাকে ‘কে বলছেন’ শুনতে হচ্ছে!’’

‘ওরে পাগল, আমি এখন রোদে দাঁড়িয়ে আছি! উঠানে! গাছ থেকে আম পাড়াচ্ছি। এই সময় তোমার ফোন। আচ্ছা তুমিই বল, ঝলসানো রোদে মোবাইল স্ক্রিন কি পড়া যায় ?’

বিভাস তখন অভিমান ভুলে তাড়াতাড়ি বলে উঠত, ‘এই বয়সে তুমি ঝাঁ ঝাঁ রোদে কেন! ছায়ায় যাও, ছায়ায় যাও। মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে বসবে আবার!’

বিনোদিনী গলা ছেড়ে হেসে উঠত। হাসতে হাসতেই বলত, ‘যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। শুধু আমার কথা ভাবলে চলবে! নিজের স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখছ তো!’

‘সে দেখা যাবে ক্ষণ। রোদ থেকে সরেছ কিনা বল!’

‘আরে বাবা, সরেছি সরেছি, এই সরলাম! গাছের ছায়ায় এসে দাঁড়ালাম।’

তখন অভিমানী গলায় বিভাস বলত, ‘নামটা সেইভ করে নিয়ো বিনু। তাহলে বারবার আমি কে বলতে হবে না।’

বিনোদিনী বলল, ‘আমি কিছুতেই নম্বরটা মোবাইলে সেইভ করব না। বুকে সেইভ করা আছে নম্বরটা ০১৬৭৭৬৭….।’

‘থাম থাম বিনু! বাচ্চা মেয়ে!’ বলে হা হা করে উঠল বিভাস।

সিরিয়াস গলায় বিনু বলল, ‘তোমাকে আমি নম্বর দেখেই চিনে নেব। আর কোনওদিন বলব না, কে ? বলব, কী রে বিভাস, এতদিন পরে ফোন করলে!’

বিনোদিনী তার মোবাইলে কখনও বিভাসের নামটা সেইভ করে রাখেনি। ফোন করলে নম্বর দেখে চিনে নিত। নাম সেইভ করা নেই বলে শর্মিষ্ঠা আজ বিভাসকে চিনতে পারল না।

বিভাস বলল, ‘আমি বিভাস। বিনোদপুরের বিভাস চন্দ। এবার তোমার মাকে ফোনটা একবার দেবে ? নিশ্চয়ই তোমার মায়ের মুখে আমার নামটা শুনে থাকবে ?’

বিভাসের প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল শর্মিষ্ঠাÑমা রে…!

এই সময় পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল। ‘কী হয়েছে, কী হয়েছে, শর্মিষ্ঠা! এরকম আকুলিবিকুলি করছ কেন মা!’

বিভাসের বুঝতে অসুবিধা হলো না, এ অভিরামবাবুর গলা। অভিরাম মিত্র, বিনোদিনীর স্বামী।

দুই

তারপর দেশভাগ হয়েছে। ইস্কুলে ইস্কুলে পাকিস্তানি

হাওয়া লেগেছে। শিক্ষকদের লেবাস যেমন

বদলেছে, ছাত্রদের পোশাকেও রূপান্তর এসেছে।

বিনোদিনীর সঙ্গে বিভাসের প্রথম দেখা বিনোদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

বিভাসের স্পষ্ট মনে আছে, প্রথম শ্রেণিতে পড়বার সময় নয়, ক্লাস টু-তে এসে ভর্তি হয়েছিল বিনোদিনী। ওয়ান পর্যন্ত সে বাড়িতেই পড়েছিল। তার মা-ই তাকে বাড়িতে পাকা করে তুলেছিল। ফলে দ্বিতীয় শ্রেণির পড়াশোনাতে সে সড়গড় ছিল। বাংলা, ইংরেজি, অঙ্কÑকোনও সাবজেক্টে তার খামতি ছিল না।

অঙ্কে অবশ্য সবার বাড়া ছিল না বিনোদিনী। ক্লাসে এমন একজন ছিল, যে অঙ্কে তার চেয়ে অধিক দক্ষ। সে বিভাস।

বিভাস আসত ধোপাপাড়া থেকে। আর বিনোদিনী আসত জমিদারবাড়ি থেকে। বিনোদপুরের ক্ষয়াটে দীর্ণ-জীর্ণ জমিদার বাড়িটি থেকে রোজ বইখাতা বুকে চেপে স্কুলে আসত বিনোদিনী চৌধুরী।

বিনোদপুর মস্তবড় গ্রাম। গাঁয়ের মাঝখানে হিন্দুপাড়াটি। পূর্বপাড়া আর পশ্চিমপাড়ায় বিভক্ত। ছড়ানো ছিটানো। অনেক বড় জায়গা নিয়ে জমিদারবাড়িটি। বনেদি এবং সাধারণ মানুষের বসবাস এই পাড়াটিতে। প্রত্যেক বাড়ির সামনে উঠান। অন্য তিন দিক খোলামেলা। পাড়াটির মাঝখানেই জমিদার বাড়িটি। কোনও এককালে বাড়িটির গায়ে জৌলুস থাকলেও এখন নেই। গোটা বাড়ি এখন জরায় আক্রান্ত। ভাঙো ভাঙোÑপড়ো পড়ো। বাড়িটি একসময় বিনোদপুরের শোভা ছিল। এখন বাড়িটি তার মনোহরত্ব হারিয়ে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। বিনোদিনী ওই বাড়িরই মেয়ে।

পাড়াটি আয়তক্ষেত্রিক। পূর্ব পশ্চিমে লম্বা। গাছগাছড়ায় ভরতি। পাড়াটির দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে পুবের কর্ণফুলীর পাড় পর্যন্ত চওড়া একটা রাস্তা চলে গেছে। মেটে রাস্তা। যে-সময়ের কথা, সে-সময়ে বিনোদপুরের কোনও রাস্তায় ইট বিছানো হয়নি, পিচ তো দূরের কথা! এই রাস্তা বেয়েই পাড়ায় ঢুকতে হয়। পাড়ায় ঢোকার ছোট-বড় চারটি পথ। বড় পথটি জমিদার বাড়ির ফটকে গিয়ে থেমে গিয়েছে।

এই বড় পথটির ধারেই বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুল। মাটির দেয়াল, ছনের ছাউনি। পাঁচটি বড় বড় কক্ষ। প্রতিটি কক্ষে জানালা। অলিন্দটিও বেশ চওড়া। এই অলিন্দ ধরেই বড় গোঁফের হেডমাস্টার চন্দ্রভূষণ দত্ত পায়চারি করেন। অনতিদূরে শিক্ষকদের বিশ্রাম-কক্ষটি। চৌচালা। মাটির। এই কক্ষেরই এক পাশে আড়াল মতন জায়গায় হেডমাস্টারের টেবিল। অন্য শিক্ষকরা টানা-টেবিলের দু’পাশে মুখোমুখি বসেন।

স্কুলটি কবেকার, হলফ করে বলা যাবে না। ঘাঁটাঘাঁটি করলে শিক্ষা অফিস থেকে সন-তারিখের একটা হদিস হয়তো মিলবে। তবে এটা অনুমান করলে ভুল হবে না, বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলটি বহু বহু বছরের পুরোনো। হয়তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা আন্দোলনের ফসল এটি। বিদ্যাসাগর এই অঞ্চলে আসেননি কোনওদিন, কিন্তু তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের যে সঞ্চালনা শুরু করেছিলেন, তার ঢেউ নিশ্চিতরূপে এই বিনোদপুরে এসে আছড়ে পড়েছিল। সেই সময়ে হিন্দুপাড়াটির গা-ঘেঁষেই স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর এই পাঠশালায় প্রথমদিকে হয়তো সংস্কৃত টুলোপণ্ডিতেরা পড়াতেন। তখন হয়তো বাংলা ইংরেজির চেয়ে সংস্কৃতচর্চার প্রাধান্য ছিল। টিকিওয়ালা পণ্ডিতেরা সামনের টেবিলে পা তুলে দিয়ে ছাত্রদের ‘পড় পড়’ বলে নয়ন মুদে ঘুমে মগ্ন হতেন। ‘নর’, ‘গরু’, ‘নদী’Ñএসবের ধাতুরূপ মুখস্থ বলতে না পারলে ছাত্রদের বেত্রাঘাতে জর্জরিত করতেন। বিনোদপুরের এই পাঠশালাটির বারান্দা দিয়ে হেড-পণ্ডিত গম্ভীর মুখ করে এমাথা-ওমাথা হেঁটে বেড়াতেন। তার পায়ে তখন বিদ্যাসাগরি চটির চটাং চটাং আওয়াজ, পরনে সাদা থান ধুতি, গায়ে থানের চাদর।

তারপর একটা সময়ে হয়তো এই পাঠশালায় বিদ্যাসাগরের প্রভাব জেঁকে বসেছে। সংস্কৃতের প্রাধান্যকে হটিয়ে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক পাঠ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছে। টুলোপণ্ডিত জায়গায় আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষকরা পাঠদান শুরু করেছেন। ক্লাসে ক্লাসে ছাত্ররা মনোযোগ দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ প্রথমভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ পড়তে শুরু করেছে। নিচু ক্লাসের ছাত্ররা ঊ-তে ঊষা, এ-তে একতারা, ও-তে ওল পড়ছে। তারপর পড়ছে কর খল ঘট জল অচল অধম কপট গরল অলস জগৎ, এর পর জল পড়িতেছে, পাতা নড়িতেছে। উঁচু শ্রেণির ছাত্ররা পড়ছে বর্ণপরিচয় দ্বিতীয় ভাগ। সেখানে নানা গল্পের সমাবেশÑ‘সুশীল বালক’, ‘যাদব’, ‘নবীন’, ‘মাধব’, ‘পিতামাতা’। এসব গল্পে পড়ুয়ারা ভবিষ্যৎ-জীবনের নানা রসদ খুঁজে পাচ্ছে।

তারপর দেশভাগ হয়েছে। ইস্কুলে ইস্কুলে পাকিস্তানি হাওয়া লেগেছে। শিক্ষকদের লেবাস যেমন বদলেছে, ছাত্রদের পোশাকেও রূপান্তর এসেছে।

সকালকে ফজর, জলকে পানি, বইকে কেতাব শেখানো শুরু হয়েছে। ‘পাকসার জমিন সাদ বাদ’ মুখস্থ করার দায় বর্তেছে ছাত্রদের ওপর। স্কুলের সামনে বংশদণ্ড আগায় চাঁদ-তারা মার্কা পতাকার পত-পতানি। পাঠ্য বইয়ের তালিকা থেকে বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় পরিত্যক্ত হয়েছে। সেখানে স্থান পেয়েছে সবুজসাথী।

ছাত্র-ছাত্রীরা সুর করে পড়ছেÑপুদিনা আনিও, পুবদিকে সুরুজ ওঠে। এই সময়েই ছাত্রদের সঙ্গে ছাত্রীরা এসে যুক্ত হচ্ছে। তারাও বই-শ্লেট-পেন্সিল নিয়ে স্কুলের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। মুসলমান পরিবারগুলোতে কন্যাদের পড়ানোর ব্যাপারে তেমন করে আগ্রহ তৈরি হয়নি। হিন্দুপ্রধান এলাকার স্কুলগুলোতে হিন্দু ছাত্রীরা উপস্থিত হতে শুরু করেছে ব্যাপকভাবে।

বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলটি  আগাপাছতলা বদলে গেছে। সেখানে এখন নানা বেশভূষার শিক্ষক। কেউ পেন্টালুন-শার্ট পরছেন, কেউ-বা পুরনো ধাঁচের ধুতি-ফতুয়া। কারও পায়ে সেন্ডেল, কারও পায়ে চটি। কেউ ইংরেজি পড়াচ্ছেন, কেউ বাংলা, কেউ অঙ্ক শেখাচ্ছেন, আবার কেউ হিন্দুধর্ম বা ইসলাম ধর্ম।

পাকিস্তান আজাদি পাওয়ার পর তেরো-চোদ্দ বছর কেটে গেছে। বিনোদপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি তখন ছাত্রছাত্রীতে ভরভরন্ত।

ওই সময়ে বিনোদিনী এসে ভর্তি হলো স্কুলে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে। বিভাসও তখন ওই ক্লাসের ছাত্র। সে বসত পেছনবেঞ্চে। বসত মানে তাকে পেছনবেঞ্চে বসতে বাধ্য করা হয়েছে। অজিত চক্কোত্তি স্যারই বলে দিয়েছেন পেছনের বেঞ্চিতে বসতে।

বলেছেন, ‘নমুপাড়ার ছাওয়াল তুমি। আসো রজকপাড়া থেইকে। সেন-চৌধুরী-দত্ত-চক্কোত্তির ছেইলে-মেইয়ের কাছ থেইকে তোমার দূরে বসা ভালা।’

ক্লাস টু-র ছাত্র বিভাস। চক্কোত্তি স্যারের ইঙ্গিত বোঝার বয়স হয়নি তখন তার। মা-বাবা শিখিয়েছেÑসর্বদা শিক্ষকের আদেশ মানিয়া চলিবে; যোগেন চক্কোত্তি স্যারের আদেশ মাথায় তুলে নিয়েছিল বিভাস। পেছন বেঞ্চিতে গিয়েই বসেছিল।

গ্রামে বেশ সুপরিকল্পিতভাবে নানা সম্প্রদায়ের পাড়া গড়ে তুলেছিলেন বিনোদপুরের আদি জমিদার মহাশয়। নাপিত-ধোপা নিত্যদিনের প্রয়োজনীয়। তাই হিন্দুপাড়াটির অনতিদূরে নাপিত আর ধোপাদের আবাসস্থল নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিলেন। হিন্দুপাড়া থেকে সামান্য দক্ষিণে ধোপাপাড়া। দশ-বারো পরিবার নিয়ে রজকপাড়াটি। তার অনেকটা গা-ঘেঁষেই নাপিতপাড়া। নাপিতপাড়া জমজমাট। হিন্দুপাড়া থেকে মাইলখানেক পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের একেবারে লাগোয়া কৈবর্তপাড়া। উত্তর-দক্ষিণ-পূর্বে দূরে দূরে ছড়ানো মুসলমানপাড়া । হিন্দুপাড়ার বা নাপিত-ধোপাপাড়ার সন্তানরা যখন বইখাতা নিয়ে বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলে যাচ্ছে, মুসলমান ছেলেরা তখন মক্তব-মাদরাসাগামী। ঘরে মৌলবি রেখে কন্যাদের আল কোরানের সুরা মুখস্থ করাচ্ছে তখন অভিভাবকরা।

ঠিক এই সময়টাতে আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলটি। আগে স্কুলটির ছাত্রছাত্রীদের সবাই ছিল বর্ণহিন্দু। নমঃশূদ্রদের পড়ার অধিকার ছিল না ওই স্কুলে। দেশভাগের পর সেই আগলটা ভাঙতে শুরু করল। নমুপাড়ার ছেলেরা স্কুলে আসা শুরু করল। কিন্তু স্কুলে আসতে শুরু করলে কী হবে, ক্লাসে তাদের আসন নির্ধারিত হলো পেছন বেঞ্চিতে। শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই তাদের ঘৃণা-অবহেলার চোখে দেখেন। শিক্ষকদের প্রায় সবাই তখন উঁচু বর্ণের। উঁচু জাতের ছাত্রদের সঙ্গে এক বেঞ্চিতে বসে নমুদের বিদ্যার্জনকে ওঁরা সহজভাবে মেনে নিতে পারলেন না। মেনে নিতে অভ্যস্ত নন তাঁরা। কারণ তাঁদের রক্তে যে হাজার বছরের দলনপীড়নের সংস্কার! তাই রজকপাড়া থেকে বিভাস চন্দ যখন বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলে পড়তে এলো, তার বসার স্থানটি নির্ধারিত হলো সবার পেছনে।

কিন্তু একদিন এই অনিয়মের প্রতিবাদ হয়েছিল। প্রতিবাদ করেছিল আর এক উঁচু বর্ণের কন্যা বিনোদিনী।

তিন

প্রবীণ বয়সে সতীশের ভীমরতি চাগিয়ে উঠেছিল। দাসী

বিমলার সুন্দরী কন্যাটিকে বিয়ে করে বসেছিলেন।

বিনোদিনীর বাবা ক্ষিতীশ চৌধুরী।

ক্ষিতীশ চৌধুরী বিনোদপুরের বিধ্বস্তপ্রায় জমিদারবাড়ির শেষ প্রতিনিধি। পোশাকে-আশাকে বা গায়েগতরে জমিদারিত্বের কোনও চিহ্ন ছিল না ক্ষিতীশবাবুর। শুধু চৌধুরী পদবিটাই ভরসা।

তবে তার এরকম নাজুক অবস্থা হবার কথা ছিল না। তিনি অর্থ আর দাপট হারিয়েছেন সৎভাইদের চক্রান্তে এবং বাহুবলের কারণে। ক্ষিতীশ চৌধুরীর বাবার নাম সতীশ চৌধুরী। জমিদারিত্ব গেলেও জমি যায়নি সতীশ চৌধুরীর। ইংরেজদের সঙ্গে আঁতাত করে সতীশ চৌধুরীর পিতা অনেক জমি নিজের দখলে রাখতে পেরেছিলেন। ফলে আয়ও ছিল প্রচুর। পিতার প্রাচুর্যের মধ্যেই বড় হয়ে ওঠা সতীশ চৌধুরীর। নারী-মদের জীবন ছিল সতীশের। পিতা বিয়ে করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে। সেই ঘরে ক্ষিতীশের জন্ম।

প্রবীণ বয়সে সতীশের ভীমরতি চাগিয়ে উঠেছিল। দাসী বিমলার সুন্দরী কন্যাটিকে বিয়ে করে বসেছিলেন। সেই ঘরে চার সন্তানÑদুই ছেলে, দুই মেয়ে। বড় হলে দীপেন-নৃপেন মারকুটে হয়ে ওঠে। কথায় কথায় ক্ষিতীশের ওপর চড়াও হতে শুরু করল ওরা। সতীশ চৌধুরী তখন ঠুঁটো জগন্নাথ। বাড়ির সকল ক্ষমতা চলে গেল দীপেন-নৃপেনের হাতে। ক্ষিতীশ অসহায় হয়ে পড়লেন। মূল বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন একদিন। তখন তিনি বিবাহিত। দীপেন-নৃপেনের কাছে অসহায় হলেও সতীশ চৌধুরী ক্ষিতীশের হাতে মোটা অঙ্কের টাকা দিলেন। বেশ কিছু জমি-জিরাতও লিখে দিলেন। ক্ষিতীশ জমিদার বাড়ির উল্টো দিকে বাড়ি তুললেন। সেটি মূল জমিদার বাড়ির সমতুল্য না হলেও একেবারে ফেলনা হলো না। ইটের তৈরি দ্বিতল বাড়িটি দেখে গাঁয়ের মানুষ থমকে না-দাঁড়িয়ে পারল না। গ্রামবাসী এর নাম দিল নতুনবাড়ি।

ওপাশের জমিদার বাড়িটির তখন রমরমা অবস্থা। দীপেন-নৃপেন সুদের কারবারে নেমেছে। সুদের টাকার ঝলকানিতে মূল জমিদার বাড়িটি তখন দীপ্তি ছড়াচ্ছে। যারা সুদে টাকা লগ্নি করে, গ্রামে তাদের মহাজন বলা হয়। কালক্রমে মূল জমিদার বাড়িটির নাম হলো সতীশ মহাজনের বাড়ি।

আলোর নিচে যেমন অন্ধকার, সুখের তলাতেও তেমনি অসুখ দিব্যি শেকড়বাকড় বিস্তার করতে থাকে। তেমনি সতীশবাবুর সুখের ঘরেও অস্বস্তির অবস্থান। সেই অস্বস্তি সতীশ চৌধুরীর দ্ইু কন্যাকে ঘিরে।

লতিকা-যূথিকা বড় হলে দেখা গেল তারা ‘সাঁঝান্ধ’। গোটা দিন তারা দেখতে পায়, সন্ধ্যা নামতে শুরু করলে তাদের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে শুরু করে। রাতের দিকে একেবারে অন্ধ হয়ে যায় লতিকা-যূথিকা। যমজ ওরা।

লতিকা-যূথিকা অসাধারণ রূপময়ী। তাদের গৌর দেহবর্ণ। দেহসৌষ্ঠব আকর্ষণীয়। যেকোনো যুবকের হৃদয়ে মুহূর্তেই আলোড়ন তোলবার সক্ষমতা আছে ওদের রূপ-যৌবনে। কিন্তু ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি তাদের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দু’চারটা বর-ঘর যে আসেনি, এমন নয়। প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়েছে তাদের। কিন্তু ভেতরের খবর জেনে প্রত্যেকটি পরিবার পিছিয়ে গেছে। সতীশবাবুর এককথাÑবরপক্ষের কাছে কোনও কিছু গোপন করা যাবে না। প্রাথমিক বৈঠকে উপযাচক হয়ে তিনি জানিয়ে দেÑলতিকা-যূথিকা ‘সাঁঝান্ধ’।

শেষ পর্যন্ত সতীশ চৌধুরী কঠোর এক সিদ্ধান্ত নেনÑলতিকা-যূথিকার জন্য ঘরজামাই আনবেন। এমন জামাই আনবেন, যে দুবোনকেই বিয়ে করতে রাজি হবে।

সতীশবাবু সিদ্ধান্ত নিলে কী হবে, তেমন বর তো পেতে হবে! যে একাধারে শিক্ষিত, মার্জিত, সুন্দর। এবং সাঁঝান্ধ দুই বোনকে বিয়ে করে জমিদার বাড়িতেই ঘরজামাই হিসেবে থাকতে সম্মত। কোন শিক্ষিত যুবক নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন দিতে চায়! এখানে বিয়ে করলে ধনসম্পদের অধিকারী হওয়া যাবে ঠিকই, কিন্তু ঘরজামাইয়ের কলঙ্কটি মাথার মুকুট করে সারাজীবন বিনোদপুরে বসবাস করতে হবে যে!

অনেক খোঁজাখুঁজির পর সতীশ চৌধুরী একদিন সুকুমারকে পেয়ে গেলেন। সুকুমাররা দাশ, একটু নিচু বংশ। তাতে কী! ছেলে তো দিব্যকান্তি। একেবারে গোরাদের মতো দেখতে। শ্রীগৌরাঙ্গ যেন! তার চেহারার জন্য গাঁয়ের লোকেরা সুকুমারকে লালু বলে ডাকে। লালুর দেহসৌন্দর্যের সঙ্গে আরেকটা গুণ জড়িয়ে আছে। ভালো কীর্তন গাইতে পারে লালু দাশ। তার সুর মর্মছোঁয়া, দেহভঙ্গি বিমুগ্ধকারী।

একদিন ইন্দুভূষণ আচার্য সংবাদ আনলÑসোনাতলাতে একটা ছেলে আছে। সুকুমার নাম। তাকে দেখে আপনার পছন্দই হবে।

সতীশবাবু আমতা আমতা করেন। বলেন, ‘ঘটকঠাকুর, ছেলের মা-বাপ কি রাজি হবে ? ওকে যে ঘরজামাই হতে হবে! তাছাড়া…।’

‘তাছাড়া কী চৌধুরীমশাই ?’ ইন্দুভূষণ জানতে চায়।

‘তুমি তো জানো ইন্দু, মেয়ে দুটো আমার সাঁঝান্ধ। দিনের আলো নিভতে থাকলে ওদের চোখের আলোও কমতে থাকে। দুজনের জন্য দুটো জামাই সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব। ঠিক করেছি, দুই মেয়েকে এক বরের কাছেই সঁপে দেব আমি।  তাই বলছিলাম, এতগুলো শর্ত কি মানবে সুকুমার ? তার মা-বাবাও কেন রাজি হবে ছেলেকে অন্ধ মেয়ে বিয়ে করাতে!’

ইন্দুভূষণ বলে উঠল, ‘এটা কোনও সমস্যা নয় চৌধুরীমশাই। মা-বাবা ছাপোষা মানুষ। নিতান্ত দরিদ্র পরিবার। সুকুমারের আরও ভাইবোন আছে। আপনি একটু উদার হলে, মানে ওদের অভাবটা মিটিয়ে দিলে সুকুমারকে ছাড়তে ওরা রাজি হয়ে যাবে।’

‘আর সুকুমার সম্মত হবে কেন এই বিয়েতে!’ সতীশ চৌধুরীর ইতস্ততা কাটে না।

ইন্দুভূষণ বলল, ‘খবর নিয়েছি আমি, সুকুমার খুবই ভালো ছেলে। মা-বাবার ভীষণ অনুগত। ওরা যা বলবে, তা-ই মেনে নেবে সুকুমার। এছাড়া…।’ বলে থেমে গেল ঘটকঠাকুর।

সতীশ চৌধুরী কিছু না বলে ইন্দুভূষণের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

ইন্দুভূষণ আবার বলল, ‘বিয়াদবি মাফ করবেন চৌধুরীমশাই, আপনার কন্যা দুটি রূপে স্বর্গের অপ্সরী। এরকম সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করতে কোন তরুণ অরাজি হবে বলুন!’

তারপর জমিদার বাড়িটির চারদিকে একবার চোখ বোলাল ঘটকঠাকুর। তারপর বলল, ‘শুধু কন্যা দুটিকে  বিয়ে করা তো নয়, সঙ্গে এই বিশাল বাড়িতে থাকা-খাওয়ার সুযোগ! আমার একবারও মনে হচ্ছে না, লালু এই বিয়ের বিরোধিতা করবে।’

‘লালু! লালু আবার কে ?’ দ্রুত জানতে চাইলেন সতীশ চৌধুরী। ইন্দুভূষণ এতক্ষণ ধরে বরের নাম সুকুমার সুকুমার বলছিল, হঠাৎ সুকুমারের স্থলে লালুর নাম কেন উচ্চারণ করল, ভেবে কূল পান না সতীশ চৌধুরী।

এবার গলা ছেড়ে হেসে উঠল ইন্দুভূষণ আচার্য। বলল, ‘ভয় পাবেন না চৌধুরীমশাই। লালু মানে সুকুমার। ছেলেটা দেখতে খুব সুন্দর বলে পাড়ার মানুষেরা তাকে লালু বলে ডাকে।’

‘অ…। তা-ই বলো!’ হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন যেন চৌধুরীমশাই।

কণ্ঠকে একটু চিকন করে ইন্দুভূষণ বলল, ‘আরেকটা কথা চৌধুরীমশাই। সুকুমাররা কিন্তু দাশ। আপনাদের তুলনায় অনেক নিচু বংশ।’

‘তাতে কী হয়েছে ইন্দু! জাত ধুয়ে ধুয়ে কি পানি খাব ? উঁচু জাতের দোহাই দিয়ে আমি কি আমার মেয়ে দুটোকে ঘরে আইবুড়ো করে রাখব ? আমি আমার মেয়েদের সুখ দেখতে চাই, আনন্দ দেখতে চাই। তুমি ব্যবস্থা নাও ইন্দু। ওই ঘরেই আমি মেয়েদের বিয়ে দেব। আমার শর্তের কথাগুলি তো তুমি শুনলে! সুকুমারের মা-বাবাকে রাজি করাও।’

সুকুমারের মা-বাবা রাজি হয়ে গিয়েছিল। সতীশ চৌধুরী তাদের ভরিয়ে দিয়েছিলেন।

সুকুমার সতীশ চৌধুরীদের বাড়িতে এসে দিব্যি সবার সঙ্গে মিলেমিশে গেল। লতিকা-যূথিকাও এরকম একজন স্বামী পেয়ে খুশি হলো। সবচাইতে বেশি তৃপ্তি পেল দীপেন-নৃপেন। এরকম নির্ভেজাল, দিব্যকান্তি সর্বগুণে গুণান্বিত বোনজামাই কজনের হয় ?

কালক্রমে ক্ষিতীশ চৌধুরীর সঙ্গেও সুকুমারের গভীর প্রীতিময় সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল।

চার

এই নামের সঙ্গে তোমার জন্মভূমির নামও জড়িয়ে থাকল, তোমার

পূর্বপুরুষের নামটাও বেঁচে থাকল বিনোদিনী নামের মধ্যে।

কিন্তু মহাজন বাড়ির সঙ্গে নতুন বাড়ির অপ্রীতিকর সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হলো দীপেন-নৃপেন।

দীপেন-নৃপেনের চাপে ক্ষিতীশকে আলাদা করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন সতীশ চৌধুরী। কিন্তু ক্ষিতীশের প্রতি নিবিড় ভালোবাসা পোষণ করতেন তিনি। হাজার হলেও প্রথম ঘরের প্রথম সন্তান ক্ষিতীশ! কিন্তু ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখত না দীপেন-নৃপেন। নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে ক্ষিতীশ চৌধুরীকে ঠেকাবার এবং ঠকাবার ব্যবস্থা নিত। সবসময় যে দীপেনদের চাল থেকে নিরাপদে ক্ষিতীশ বেরিয়ে আসতে পারতেন, তা নয়। ওদের ফন্দিফিকিরে ক্ষিতীশের ভরাডুবিও হতো মাঝেমধ্যে।

একদিন, সতীশ চৌধুরী তখন বার্ধক্যে জরজর, দীপেন-নৃপেন ক্ষিতীশ চৌধুরীর পাঁচকানি জমি গ্রামের উঠতি ধনী আবুল বশরের কাছে বেচে দিল। আবুল বশর জমির দখল নিতে গেলে ক্ষিতীশ চৌধুরী জানতে পারলেন, এ জমি দীপেন-নৃপেনই বিক্রি করেছে আবুল বশরের কাছে।

ক্ষিতীশ চৌধুরী যতই বলেন, ‘এ জমি আমার। বাবা আমার নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন। এ জমি দীপেন-নৃপেনের বিক্রি করার হক নেই।’

আবুল বশর ততই বলেন, ‘সে তো আমি জানি না। আপনার ভাইয়েরা আমার কাছে জমি বেচে টাকা বুঝে নিয়েছে। আপনি ওদের সঙ্গে বোঝাপড়া করেন।’

ক্ষিতীশ চৌধুরী দীপেন-নৃপেনের সঙ্গে দেখা করে বলেন, ‘একী করলে তোমরা! আমার জমি তোমরা বেঁচে দিলে!’

দীপেনের চেয়ে নৃপেন বেয়াড়া। কর্কশ গলায় বলল, ‘বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে সব জমি লিখিয়ে নিয়েছ। অই জমি তোমার না, আমাদের।’

‘কথাটা ঠিক নয় নৃপেন। পৃথক হওয়ার সময় বাবা আমাকে যে জমিজমা দিয়েছেন, তা তোমাদের তুলনায় অতি সামান্য। সেই সামান্য থেকেও তোমরা কেড়ে নিতে চাইছ!’

‘হ্যাঁ চাইছি। কী করতে পার, কর গে!’ চোখ পাকিয়ে নৃপেন বলল।

গত্যন্তর না দেখে মামলা করতে বাধ্য হয়েছিলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। সেই মামলা ক্ষিতীশ চৌধুরীকে সর্বনাশের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘস্থায়ী মামলা করতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। মামলার টাকা জোগাবার জন্য অন্যান্য জমিও বিক্রি করে দিতে হয়েছিল তাঁকে।

শেষ পর্যন্ত মামলায় জিততে পারেননি ক্ষিতীশ চৌধুরী। বার্ধক্যে জর্জরিত সতীশ চৌধুরীকে দীপেন-নৃপেন এমন একটা কাগজে সই করতে বাধ্য করেছিল, যেখানে লেখা ছিল, ওই জমি তিনি ক্ষিতীশকে দেননি। ক্ষিতীশ ফ্রডবাজি করে ওই জমি নিজের নামে করে নিয়েছে। ওটা কোর্টে দেখানোর পর মামলাটি দীপেন-নৃপেনের অনুকূলে চলে যায়।

এই স্বাক্ষর দেওয়ার পর মাত্র কয়েকটা দিন বেঁচেছিলেন সতীশ চৌধুরী। মর্মযাতনা তাঁর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছিল।

এরপর দিনকে দিন ক্ষিতীশ চৌধুরী গরিব হতে শুরু করেছিলেন। আর তেজারতি ব্যবসার বদৌলতে মহাজন বাড়ি দিনে দিনে ফুলে ফেঁপে উঠেছিল।

নতুন বাড়িতে ক্ষিতীশ চৌধুরীর দরিদ্রজীবন শুরু হলো। যে দু’চার-দশকানি জমি আছে, তার আয় দিয়ে সংসার চলে না। তিনি গাঁয়ের আনাচে-কানাচের খাস জমি বেচা শুরু করলেন। এটা করা ছাড়া তখন তাঁর অন্য কোনও উপায় নেই। তখন তাঁর ঘরে চার চারটি সন্তান।

বড়টি কন্যাÑনন্দিনী। পরের কন্যাটির নাম রাখতে গিয়ে বেশ ক’দিন দোনমনায় ভুগেছিলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। পরের কন্যাটির কী নাম রাখবেন!

স্ত্রী রোহিনীকে বলেছিলেন, ‘ঝোঁকের মাথায় প্রথমটির নাম আমিই রেখেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝেছি, ওই নামে গলদ আছে।’

‘গলদ! কীসের গলদ! নন্দিনী তো বেশ মিষ্টি নাম! এই নামে দোষ কোথায় বুঝতে পারছি না!’ বলেছিলেন রোহিনী চৌধুরী।

ক্ষিতীশ চৌধুরী হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আচ্ছা রোহিনী, বলো তো নন্দিনী অর্থ কী ?’

রোহিনী বলেন, ‘নন্দিনী মানে তো কন্যা বলেই জানি। কন্যা মানে দুহিতা আর কী!’

‘তাহলেই দেখ, আমাদের মেয়ের নাম নন্দিনী রেখে কত বড় ভুল করেছি!’ আফসোসের কণ্ঠে ক্ষিতীশ চৌধুরী বলেন।

রোহিনী চোখ কপালে তুলে বলেন, ‘আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, এ নামে ত্রুটি কোথায়! নিজের কন্যাকে নন্দিনী বলে সম্বোধন করব, তাতে অসঙ্গতি কোথায়, বলবে একটু!’

এবার ক্ষিতীশ চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘আমরা ডাকছি ঠিক আছে। নন্দিনীকে যখন বিয়ে দেব, তার স্বামী তাকে কী বলে ডাকবে ?’

রোহিনী বললেন, ‘কেন, নন্দিনী বলে ডাকবে!’

‘এখন যদি তোমাকে আরেকবার জিজ্ঞেস করি নন্দিনী অর্থ কী ?’ করুণ চোখে বলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী।

স্বামীর কথা শুনে থমকে যান রোহিনী। তাঁর মুখে রা ফোটে না। সত্যি তো, স্বামী তাহলে তাকে কন্যা বলেই তো ডাকবে! কন্যা মানে আত্মজা। স্বামী কী করে স্ত্রীকে আত্মজা বলে সম্বোধন করবে! লজ্জিত চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া রোহিনীর আর কোনও উপায় থাকল না।

রোহিনীর লজ্জাবনতার ব্যাপারটি বুঝতে পারলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। পরিবেশ হালকা করবার জন্য উচ্ছ্বাসের গলায় ক্ষিতীশ চৌধুরী বললেন, ‘প্রথমবার বিরাট ভুল করে ফেলেছি আমি। দ্বিতীয়বার করতে চাই না। চাই না বলেই তোমার কাছে এসেছি রোহিনী। তুমি দ্বিতীয় মেয়েটির সুন্দর একটা নাম দাও।’

‘আমি! আমি কী নাম দেব মেয়ের!’ তারপর কণ্ঠকে নরম করে বললেন, ‘তুমি শিক্ষিত মানুষ। প্রচুর জ্ঞান তোমার। ভেবেচিন্তে ভালো একটা নাম রাখো মেয়ের।’

‘আহা রোহিনী, আমি পারছি না বলেই তো তোমার সাহায্য চাইছি!’

‘আমার সাহায্য চাইছ! আচ্ছা বলো তো, আমার কতটুকু লেখাপড়া! সামান্য বিদ্যে নিয়ে তোমার ঘর করতে এসেছি।’

‘ওসব বলে ব্যাপারটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করো না রোহিনী। সত্যি, মনের মতো নাম খুঁজে পাচ্ছি না বলে তোমার শরণাপন্ন হয়েছি।’

এবার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন রোহিনী। ব্যাপারটা নিয়ে তাঁর স্বামী সত্যি সত্যি যে বেকায়দায় পড়েছেন, অনুধাবন করতে পারলেন। আচমকা তাঁর মাথায় একটা আইডিয়া এলো।

তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, আমাদের গ্রামের নাম কি ?’

‘কেন, বিনোদপুর!’

‘গ্রামের নামের সঙ্গে কার নাম জড়িত ?’

‘আমার জ্যেষ্ঠ প্রপিতামহ বিনোদনারায়ণ চৌধুরীর নাম। তা এসব জানতে চাইছ কেন তুমি ?’ ক্ষিতীশ চৌধুরী বললেন।

স্বামীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রোহিনী বললেন, ‘আমাদের মেয়ের নাম বিনোদিনী রাখলে কেমন হয় ?’

‘বিনোদিনী!’ অবাক হয়ে বলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী।

‘এই নামের সঙ্গে তোমার জন্মভূমির নামও জড়িয়ে থাকল, তোমার পূর্বপুরুষের নামটাও বেঁচে থাকল বিনোদিনী নামের মধ্যে।’ ধীরে ধীরে বলে গেলেন রোহিনী।

ক্ষিতীশ চৌধুরী প্রথমে নির্বাক হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে নৃত্য করে উঠলেন। নৃত্য থামিয়ে বললেন, ‘আমি এতদিন তোমার সম্পর্কে তেমন করে ভাবিনি রোহিনী! মাফ করো আমায়। সত্যি তুমি জিনিয়াস! আমার এই মেয়েটির নাম আমি বিনোদিনীই রাখলাম।’

নন্দিনী আর বিনোদিনীর মাঝখানে আরও দুজন ছেলে জন্মেছিল ক্ষিতীশ চৌধুরীর। জমজ। জমজ সন্তান জন্ম নেওয়ার রেওয়াজ এই বংশে আগে থেকেই ছিল। লতিকা-যূথিকা তার উদাহরণ। জমজের তালিকায় কানু-ভানুর নাম যুক্ত হয়েছিল সেবার।

নন্দিনী আর বিনোদিনী লেখাপড়ায় মনোযোগী হলেও কানু-ভানু হয়নি। নানা রকমের বেয়াড়াপনা তাদের মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।

কানু-ভানু যেন দীপেন-নৃপেনেরই পরবর্তী সংস্করণ। অন্যকিছুকে এড়ানো সম্ভব হলেও কুরক্তের ধারাকে এড়ানো কিছুতেই সম্ভব নয়।

পাঁচ

তুমি আমার সংসারের অভাব মিটিয়ে দাও প্রভু।

আমার স্বামীকে আয়ের একটা পথ দেখাও।

আমার সন্তানদের ভদ্রভাবে বেঁচে থাকবার

সুযোগ করে দাও ঈশ্বর!

স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নাজুক অবস্থা ক্ষিতীশ চৌধুরীর।

ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, পোশাক, ডাক্তার-বদ্যির খরচ মিটিয়ে সামান্য টাকাই হাতে থাকে তাঁর। ও দিয়ে পরিবারটাকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ল। চালটা ঘরে আছে ঠিক, কিন্তু একটা পরিবারে খাবার উপকরণ শুধু তো চাল নয়! চাল ছাড়া আরও কত কিছু লাগে সংসারে! ডাল-লবণ-তেল-আটা-আনাজপাতি আরও কত কী! মাছ ছাড়া ভাত খেতে চায় না বাচ্চারা। কানু-ভানু মাঝেমধ্যে মাংসের আবদার করে। নন্দিনী-বিনোদিনী মুখে কিছু না বললেও মাংসের প্রসঙ্গ যখন ওঠে, খুশিতে চিকচিক করে ওদের চোখমুখ। সংসারের এসব চাহিদা মেটাতে গলদঘর্ম হন ক্ষিতীশ চৌধুরী। তখন লজ্জায় মুখ ঢাকতে ইচ্ছে করে তাঁর। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি।

স্বামীর অসহায়তা দেখে মাথা নিচু করেন রোহিনী। কী বলবেন তিনি! কী পরামর্শ দেবেন স্বামীকে! একই পিতার সন্তান হয়ে দীপেন-নৃপেন আজ রাজার হালে জীবন কাটাচ্ছে। মহাজন বাড়ির শানশওকত আজ গ্রামবাসীর চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। কোনও কিছুর অভাব নেই তাদের। ওই বাড়ির বাচ্চারা দু’বেলা পেট পুরে খেতে পাচ্ছে, রঙবেরঙের জামাকাপড় পরতে পারছে। আর তাঁদের ছেলেমেয়েরা ঠিকঠাক মতন দু’বেলা খেতেও পারছে না। দামি জামাজোড়ার কথা দূরে থাক। এ যদি নিয়তির শাস্তি হয়, তাহলে এরকম শাস্তি পাওয়ার মতো তো পাপ তাঁর স্বামী করেননি! পাপ যদি কেউ করে থাকে, করেছে দীপেন-নৃপেন। জোর খাটিয়ে অন্যায়ভাবে তারা তাঁর স্বামীকে মূল বাড়ি থেকে বিতাড়িত করেছে। শুধু তো তা নয়, শ্বশুরের দেওয়া জমিটুকু পর্যন্ত কৌশলে কেড়ে নিয়েছে। তাঁর স্বামীকে মামলায় জড়িয়ে নিঃস্ব করে ছেড়েছে। হে ঈশ্বর, এটা কি পাপ নয় ? যদি পাপ হয়, তাহলে এই অন্যায়ের প্রতিকার করছ না কেন তুমি ? কেন দীপেন-নৃপেনের বিচার করছ না ? থাক ঈশ্বর, আমি দীপেন-নৃপেনের শাস্তি চাই না তোমার কাছে। আজ না হলে কাল, কাল না হলে পরশু, যুবক বয়সে না হলে প্রবীণ বয়সে, প্রবীণ বয়সে না হলে বৃদ্ধ বয়সে তারা নিজেদের অন্যায় কাজের মর্মার্থ বুঝতে পারবে। তখন তুমি না হয় ওদের শাস্তি দিয়ো। আজ, এই মুহূর্তে ঠাকুর তোমার কাছে আমার একটিমাত্র প্রার্থনা। তুমি আমার সংসারের অভাব মিটিয়ে দাও প্রভু। আমার স্বামীকে আয়ের একটা পথ দেখাও। আমার সন্তানদের ভদ্রভাবে বেঁচে থাকবার সুযোগ করে দাও ঈশ্বর!

এরকম করে রোহিনী চৌধুরী ভাবেন আর প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা করেন আর জোড়হাত বারবার কপালে ঠেকান।

কিন্তু রোহিনী যতই আকুলিবিকুলি করুন, যতই ভগবানের চরণে শতকোটি প্রণাম জানান, ঈশ্বর কিন্তু চোখ মেলে রোহিনীর দিকে তাকান না। ফলে ক্ষিতীশ চৌধুূরীর অর্থনৈতিক অবস্থা যেই-কে-সেই থেকে যায়। উপরন্তু দিনে দিনে তাঁর পরিবারের ওপর অভাবের ঝাপটা প্রবল হতে থাকে।

একদিন সকালে ক্ষিতীশ চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল তাঁর। কাঁচাপাকা। ব্যাকব্রাশ করা। আগার দিকে গিয়ে চুলগুলি মহাভারতের ভীষ্ম-দ্রোণাচার্যের চুলের মতো বেঁকে গেছে। দীর্ঘ শ্মশ্রু। দু’গাল জুড়ে। গোড়ালি-ছোঁয়া ধুতি। ফিনেফিনে। গায়ে দু’পাশে দুই জেবের ফতুয়া। কখনও-বা পাঞ্জাবি। ফতুয়া বা পাঞ্জাবির গায়ে বুকপকেট। সেই পকেটে সর্বদা দামি কলমটি। এই কলমটি বহু বছর আগে বাবা সতীশ চৌধুরী তাঁকে দিয়েছিলেন। যেদিন এন্ট্রান্সের রেজাল্ট বেরিয়েছিল, বড় খুশি হয়েছিলেন সতীশ চৌধুরী। পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। পকেট থেকে নতুন কেনা বিদেশি কলমটি বের করে ক্ষিতীশের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুই আমার বংশের গৌরব রে বাবা! তোর আগে এই বংশে কেউ এন্ট্রান্স পাস করেনি! তুই-ই এই বংশের সবেধন নীলমণি, একমাত্র উচ্চশিক্ষিত। এই কলমটি সঙ্গে সঙ্গে রাখিস বাপ। কলমটি তোকে আমার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।’ সতীশ চৌধুরী ক্ষিতীশকে এই ভালোবাসাময় কথা যখন বলছেন, তখনও দ্বিতীয় বিয়ে করেননি তিনি।

পরে এই কলম দিয়ে লিখেই বিএ পাস করেছিলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। উচ্চশিক্ষিত হয়েও কোনও চাকরি করেননি তিনি। জমিদারের ছেলে চাকরি করবে! এ তো বড় আজব ব্যাপার! জমিদারপুত্ররা মানুষকে চাকরি দেবে, অন্যের চাকরি করবে না। এই মিথ্যে অহং-এর ঘেরাটোপে পড়ে ক্ষিতীশ চৌধুরী কোনওদিন চাকরিই করলেন না! ওই মিথ্যে ভড়ং থেকে সেদিন যদি তিনি বেরিয়ে আসতেন, তাহলে আজ অভাবের নোনাজলে তাঁকে ডুবসাঁতার দিতে হতো না। দহনের কাল অতিক্রম করতে হতো না আজ তাঁকে।

ধুতির গোছা বাম হাতে ধরে ক্ষিতীশ চৌধুরী গাঁয়ের পথে হাঁটেন, দূর থেকে দেখে মনে হয় মহাভারতকালের কোনও চরিত্র বুঝি দীপ্ত পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছেন। শুধু তীর ধনুক সঙ্গে নেই, এই যা!

ব্যক্তিত্ব এবং চেহারার জন্য আলাদা করে চেনা যায় তাঁকে। তুলনায় দীপেন-নৃপেনকে ছ্যাঁচড় বলে মনে হয়। ক্ষিতীশ চৌধুরী যতই দারিদ্র্যের মধ্যে থাকুন না কেন, বনেদিয়ানা তাঁকে ঘিরে থাকে। আর দীপেন-নৃপেন যতই স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে জীবন কাটাক, ছ্যাঁচড়ামি তাদের চোখেমুখে লেপ্টে থাকে। ওরা যে দাসীপুত্র, ইতরÑসেটা থেকে মুক্তি পায়নি কখনও তারা।

ক্ষিতীশ চৌধুরী গাঁয়ের পথে যখন হাঁটেন, সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে হাঁটেন। রাস্তার বাঁ-পাশ ধরেই হাঁটেন তিনি। লোকেরা প্রণাম জানালে পুরু লেন্সের চশমার ওপর দিয়ে তাকান। স্মিত চোখে তাকিয়ে সামান্য মাথা নাড়েন।

বিনোদপুরে এত সম্মানের পাত্র হয়েও শেষ পর্যন্ত একটা অন্যায্য কাজে নিজেকে নিয়োজিত করলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। তিনি ভাবলেন, না খেয়ে মরে যাওয়ার চেয়ে, সন্তানদের কাছে ব্যর্থ পিতা হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার চেয়ে এই কাজটি কোনওমতেই অন্যায় নয়।

সেই সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বিনোদপুরের জায়গাজমির ছিটটা হাতে তুলে নিলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। দুপাশের জেবে ঢুকালেন কাঠপেন্সিল, কাঁটা কম্পাস আর আতস কাচ। কয়েক প্রস্ত সাদা কাগজও গুটিয়ে নিলেন ছিটের সঙ্গে।

এরপর তিনি ঘরের বাইরে পা রাখলেন।

পেছন থেকে রোহিনী বললেন, ‘এই সাতসকালে কোথায় যাচ্ছ ? কোথাও যাচ্ছ!’ কথার শেষাংশটা নরম সুরে বললেন রোহিনী।

ক্ষিতীশ চৌধুরী একটু থতমত খেলেন যেন! কিছু একটা লুকাতে চাইলেন। তার বিচলিত ভাবটা রোহিনী দেখতে পেলেন না। তিনি যে ক্ষিতীশ চৌধুরীর পেছন দিকে দাঁড়িয়ে!

নিজেকে দ্রুত সংযত করলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, ‘তেমন কোথাও না। এই, গ্রামটা একটু ঘুরে দেখতে যাচ্ছি। একা একা গ্রামটা ঘুরিনি অনেকদিন।’

ক্ষিতীশ চৌধুরী কথাটা যতই সহজ কণ্ঠে বলতে চাইলেন না কেন, সংশয় এবং সংকোচ তাঁর কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল।

বুঝতে পারলেন রোহিনী। বললেন, ‘আমাকে বলতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। তবে আমি স্পষ্ট বুঝছি, বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে তুমি আজ বেরোচ্ছ!’

স্ত্রীর কাছ থেকে লুকোছাপার ব্যাপারটি ক্ষিতীশ চৌধুরীর আর ভালো লাগল না। তিনি মনে মনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেনÑরোহিনীকে সব খুলেমেলে বলবেন।

তিনি বললেন, ‘দেখ রোহিনী, বহু বছর আগে আমাদের জমিদারিত্ব চলে গেলেও এই গাঁয়ের আনাচে-কানাচে অনেক জমি রয়ে গেছে, যেগুলো সরকারের দখলেও যায়নি আবার আমাদের দখলেও নেই। এইসব জমি হয়তো রাস্তার পাশে, খালের ধারে বা কারও ভিটেবাড়ি বা ধানি জমির সীমানায় পড়ে আছে। মালিকানা সূত্রে সেই খাস জমিগুলো আমাদের। যেগুলো বিক্রি করার পুরো হক আমার আছে।’

‘আমাদের শব্দটির মধ্যে কিন্তু দীপেন-নৃপেনের নামটিও আছে।’ বললেন রোহিনী।

‘জানি আমি। কিন্তু ওরা তেজারতি করে এখন এমন প্রাচুর্যের মধ্যে আছে যে, এসব খাল-নালের দিকে নজর দেওয়ার সময় ওদের নেই।’

‘তা ওইসব খাস জমি দিয়ে তুমি কী করতে চাও!’ উৎসুক রোহিনী জানতে চান।

ক্ষিতীশ চৌধুরী বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘খাল-নালের ওই খাস জমি আমি বিক্রি করা শুরু করব।’ একটু থেমে বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে ক্ষিতীশ চৌধুরী আবার বললেন, ‘তাতে আমার পরিবারের অভাব যাবে। স্বাচ্ছন্দ্য আসবে আমার ঘরে।’

ছয়

বয়সের অভিজ্ঞতায় গুরুপদ বুঝতে পারল, নারায়ণের

জায়গায় ভেজাল আছে। নইলে কত্তামশাইয়ের মতো মানুষ

তার বাড়ির পাশে এইরকম মাপামাপি করবেন কেন ?

ক্ষিতীশ চৌধুরীর কথা একেবারে মিথ্যে হয়ে যায়নি।

খাসজমি বেচা শুরু করলে তাঁর পরিবারের অভাব অনেকটা মিটে গিয়েছিল।

সেই সকালে তিনি কৈবর্তপাড়ায় উপস্থিত হয়েছিলেন। নারায়ণ কৈবর্তের বাড়ির পাশে মাটিতে ছিট বিছিয়েছিলেন।

নারায়ণ কৈবর্তের পূর্ব-পশ্চিমে লম্বাটে ভিটেবাড়ি। উত্তর পাশে খাল। খালের দক্ষিণ পাড়েই নারায়ণের বাড়িটি।

ওই খালপাড়ের শুকনোমতন জায়গায় ছিট বিছিয়েছিলেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। শুধু ছিট বিছানো তো নয়, ছিটের ওপর স্কেল ফেলে কাঁটা কম্পাস দিয়ে রীতিমতো মাপজোখ শুরু করেছিলেন তিনি।

এত বড় মাপের একজন মানুষ কৈবর্তপাড়ার নোংরা খালপাড়ে কী করছেন! পথচলতি মানুষেরা উৎসুক হয়ে উঠল। অন্যদের তুলনায় জেলেদের ব্যগ্রতা বেশি। এক দুইজন করে করে বেশ কিছু মানুষ জুটে গেল সেখানে।

ক্ষিতীশ চৌধুরীর কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। যেন তাঁর সামনে কেউ নেই, যেন তিনি আবর্জনাময় স্থানে কিছুই করছেন না! সবাইকে সবকিছুকে উপেক্ষা করে আপনমনে দীর্ঘক্ষণ ধরে তিনি ছিট দেখে দেখে সাদা কাগজের ওপর আঁকজোক করলেন। তারপর মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

সকলে প্রায় এক সঙ্গে বলে উঠল, ‘পেন্নাম কত্তামশাই।’

ক্ষিতীশ চৌধুরী স্বাভাবিক থাকার জোর চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। প্রণামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা ওই বাড়িটি তো নারায়ণের ?’

‘হ্যাঁ কত্তামশাই। তা কুনু গোঁজামিল আছেনি নারায়ণের ভিডাবাড়িতে ?’ বলল গুরুপদ কৈবর্ত। নারায়ণের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো নয়। বেশ কিছুদিন ধরে গুরুপদের মেয়ের বিয়েতে ভাঙানি দিয়ে যাচ্ছে নারায়ণ। বয়সের অভিজ্ঞতায় গুরুপদ বুঝতে পারল, নারায়ণের জায়গায় ভেজাল আছে। নইলে কত্তামশাইয়ের মতো মানুষ তার বাড়ির পাশে এইরকম মাপামাপি করবেন কেন ?

ক্ষিতীশ চৌধুরী কিন্তু গুরুপদের প্রশ্নের কোনও জবাব দিলেন না।

শুধু বললেন, ‘নারায়ণকে একটু ডেকে দিতে পারো।’

গুরুপদ কিছু বলার আগেই দশ-বারো বছরের এক বালক নারায়ণের বাড়ির উদ্দেশে দৌড় দিল।

হেঁটো ধুতির খুঁটটা পেছনে গুঁজতে গুঁজতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল নারায়ণ। উদোম গা তার, খালি পা। কোনও ‘জুতোজাতা’ পায়ে দেয় না নারায়ণ, কিন্তু খালি গায়ে কখনও সে বাড়ির বাইরে বের হয় না। বালকটির কাছে কত্তামশাইয়ের কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল সে। শোনামাত্র হাতের কাজ ফেলে এরকম করে ছুটে এসেছে সে।

কৈবর্তপাড়ায় কিছু টাকাকড়ি যে ক’জনে গাঁটে বাঁধে, তাদের একজন এই নারায়ণ কৈবর্ত! বঙ্গোপসাগরে দুই দুইখান মাছমারা নৌকা ভাসে নারায়ণের। দিনে দু’বার মাছ আসে তার উঠানে। কানিকয়েক ধানিজমিও আছে। বাড়িটিও তার বেশ বড়। অন্য জেলেরা তার বাড়ির বহর দেখে চোখ মটকায়।

এই নারায়ণের বাড়ির উত্তর পাশ জুড়ে দুই গণ্ডা মতন খাস জমি আছে। নারায়ণের বাপ এই খাসজমি নিজের ভিটের সঙ্গে একাকার করে নিয়েছিল একদা। মরার আগে নারায়ণকে বলেও গিয়েছিল সে-কথাটা। ওই সময় থেকেই নারায়ণের মনে খচখচানি। চারদিকে জায়গার দাম যে হারে হু হু করে বাড়ছে, না জানি কে কোনদিন বাড়ির পাশের ওই নালজায়গায়টা কিনে নেয়! তারও কিনে নেওয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু কার কাছ থেকে কিভাবে কিনতে হবে, জানা নেই নারায়ণ কৈবর্তের। সেই সময় থেকে বুকের তলায় ভয়টা নিয়ে জীবনযাপন করে যাচ্ছে নারায়ণ। আজ কত্তামশাইয়ের ডাক পেয়ে সীমানার ওই গোঁজমিলের জায়গাটির কথাই প্রথমে মনে পড়ে গেল তার।

ক্ষিতীশ চৌধুরীর সামনে এসে কোলগুঁজো হয়ে নারায়ণ বলল, ‘পেন্নাম কত্তামশাই।’

‘হ্যাঁ, নারায়ণ তোমার সঙ্গে আমার একটু কথা ছিল।’ বললেন কত্তামশাই।

উপস্থিত মানুষেরা কত্তামশাইয়ের কথায় কীসের যেন একটা গন্ধ পেল! রহস্য রহস্য! তাদের ঔৎসুক্যের সীমা থাকল না। তারা আরও ঘন হয়ে দাঁড়াল।

কিন্তু ক্ষিতীশ চৌধুরী তো বিচক্ষণ মানুষ! সমবেতদের আগ্রহে জল ঢেলে দিলেন তিনি।

বললেন, ‘তুমি তো আমাকে তোমার বাড়িতে নাওনি কোনওদিন! আজ তোমার বাড়িতে যেতে চাই। নেবে ? এক গ্লাস জল খাব।’

নারায়ণের ভিরমি খাবার অবস্থা হলো। কত্তামশাই তার বাড়িতে জল খাবেন! কৈবর্ত বাড়িতে! তা কী করে হয়! জমিদার বাড়ির সন্তান জেলেদের ছোঁয়া-জল খাবেন! তা তো কখনও হবার নয়! নিশ্চয়ই কত্তামশাইয়ের কথার অন্য কোনও মানে আছে! আর সেই মানেটা মানুষের সামনে বলতে চান না তিনি। তাই জলের বাহানা! অশিক্ষিত হলে কী হবে, চুল তো পেকেছে! বয়সের অভিজ্ঞতায় কত্তামশাইয়ের কথার ইঙ্গিতটা ধরতে পারে নারায়ণ।

কুঁজো হয়ে নারায়ণ বলল, ‘আমার বাড়িত আপনার চরণধুলা পইড়লে বহুত খুশি হইবাম কত্তা।’

কত্তামশাই বললেন, ‘তাহলে আমাকে নিয়ে চল নারায়ণ।’ এরই মধ্যে ছিট-কম্পাস-স্কেল-পেন্সিল গুটিয়ে ফেলেছেন ক্ষিতীশ চৌধুরী।

নারায়ণ বলল, ‘চইলেন কত্তা।’

ক্ষিতীশ চৌধুরী হাঁটা শুরু করলেন। তাঁর দু’কদম পেছনে নারায়ণ। নারায়ণের পেছনে উৎসুক মানুষের দল। দলের আগে আগে গুরুপদ।

ক্ষিতীশ চৌধুরী প্রমাদ গুণলেন। কথা বলার সময় যদি এত মানুষ উপস্থিত থাকে, তাহলে তাদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ বাগড়া দেবে! কৈবর্তরা এরকমই। এদের চিনতে ক্ষিতীশ চৌধুরীর বাকি নেই। এটা তার দ্বিতীয় জীবনের প্রথম অভিযান। এই অভিযানটি ব্যর্থ হলে তাঁর সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে। তিনি উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। আর যদি আজকের অভিযানে তিনি জিতে যান, তাহলে সামনে তার জন্য প্রাচুর্য অপেক্ষা করছে। নাহ্্! প্রথম চেষ্টাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই।

থমকে দাঁড়ালেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। নারায়ণ এগিয়ে এলে চাঁপা কণ্ঠে বললেন, ‘নারায়ণ, এই এক হাট মানুষকে তো ঠেকাতে হবে! যে কথাটা তোমাকে বলতে চাই, তা ওদের সামনে বললে তোমার ক্ষতি হয়ে যাবে।’ নারায়ণকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য কণ্ঠস্বরে রহস্যময়তা মেশালেন তিনি।

তারপর কণ্ঠকে আরও চিকন করে বললেন, ‘যেকোনোভাবে ওদের থামাও তুমি। তোমার বাড়িতে ঢুকতে দিয়ো না ওদের।’

নারায়ণ কত্তামশাইয়ের কণ্ঠের চেয়ে নিজের কণ্ঠকে আরও চিকন করে বলল, ‘অই লইয়া আপনি ভাইববেন না কত্তামশাই। সময়মতো ওদের আমি ঠেকাইয়া দিবাম।’

নারায়ণের চার চারটি জোয়ান ছাওয়াল। উঠানে পৌঁছে ছাওয়ালদের কী একটা ইঙ্গিত করল নারায়ণ। ছেলেরা মুহূর্তেই তৎপর হয়ে উঠল। তাদের খবরদারিতে কেউ উঠানে ঢুকতে পারল না। দূর থেকে গুরুপদের কথা ভেসে এলো, ‘যতই গুজর-গুজর কর না ক্যান নারায়ণ, একদিন না একদিন কথাখান আমি বাইর কইরবামই।’

কত্তামশাইয়ের দিকে একটা নড়বড়ে চেয়ার এগিয়ে দিল নারায়ণ। তিনি বসলেন না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় কথা সারলেন তিনি। নারায়ণের পাশে তখন তার ছেলেরা। বিষয়টা খোলামেলাভাবে বুঝিয়ে বললেন ক্ষিতীশ চৌধুরী।

শেষে বললেন, ‘দেখ নারায়ণ, জায়গাটা তোমার না হলেও দীর্ঘদিন ভোগদখল করছ তুমি। জায়গাটা কেনার প্রথম হক তোমার। আর ওই জায়গার মালিক যে চৌধুরীবংশ, সেটা না বললেও তোমার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। আর জমিদারবংশের আমি প্রথম সন্তান। বিক্রি করার সকল অধিকার আমার আছে।’ বলে থামলেন চৌধুরীমশাই।

তারপর আবার বললেন, ‘জায়গাটা তুমি আমার কাছ থেকে কিনে নাও নারায়ণ। আর একটা কথা, ব্যাপারটা দশ কান করো না। তাহলে তোমারই ক্ষতি হবে। দেখলাম, প্রথম থেকে গুরুপদ তোমার বিরোধিতা করে যাচ্ছে।’

নারায়ণ হাতে স্বর্গ পেল। সেদিনই সে কত্তামশাইকে জানিয়ে দিল, যেকোনো দামে খাসজমিটা সে কিনবেই কিনবে।

কিনলও।

ক্ষিতীশ চৌধুরী পরবর্তী ছিট বিছালেন নাপিতপাড়ার গগন শীলের বাড়ির পাশে। তারপর Ñ পর পর Ñ আরও অনেক জায়গায়। শ্যামল পালের উঠানের দক্ষিণে, নেতাই হালদারের জমির আইলের ধারে, নুর মোহাম্মদের পুকুরপাড়ে, ইছহাকের বাগানে।

এভাবে ক্ষিতীশ চৌধুরীর অভাব কেটে গেল একদিন।

সাত

সমাজ থেকে বামুনের টিকির জোর তখনও

কমে যায়নি। টিকির সঙ্গে টিকটিকির লেজের

তুলনা করা শুরু করেনি তখনও মানুষেরা।

এইরকম সময়ে বিনোদিনী বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলে এসে ভর্তি হয়েছিল, ক্লাস টু-তে।

মাথার দু’পাশে দুটো বেণি। হলুদ ফিতে দিয়ে বাঁধা। পরনে হলুদ ফ্রক। স্কুলে কোনও নির্ধারিত ড্রেস ছিল না। তাই যে যেরকম ইচ্ছে, পরে আসত। বয়সের তুলনায় একটু লম্বাটে ছিল বিনোদিনী।

মজার ব্যাপার এটা যে, বিনোদিনীর গায়ের রং কালো। তেল চকচকে কালো। বিনোদপুরের জমিদারবংশের কারও সঙ্গে মিল নেই বিনোদিনীর দেহরঙের। জমিদারবাড়ির অপরাপর মানুষেরা গৌরবর্ণী।

শুধু অন্যরা কেন, বিনোদিনীর যে মা রোহিনী চৌধুরী, তাঁর গায়ের রঙও দুধে আলতা মেশানো। আর ক্ষিতীশ চৌধুরীর চেহারা তো গোরা সাহেবদের মতো! বিনোদিনীর বোন-ভাইয়েরা পেয়েছে মা-বাবার দেহরঙ; কিন্তু বিনোদিনী কেন যে কালো হয়ে জন্মাল, কে জানে!

দেখতে কালো হলে কী হবে, বিনোদিনী অপরূপ সুন্দরী। অদ্ভুত এক লাবণ্য তাকে ঘিরে। স্নিগ্ধ কোমল মাধুর্য তার সেই কালোরঙের দেহে। টানা টানা মায়াময় দুটো চোখ দিয়ে সে চারপাশটা আপন মনে দেখে যায়। ভীষণ মিষ্টি কণ্ঠে কথা বলে বিনোদিনী।

সেদিন অজিত চক্কোত্তি ক্লাসে ছিলেন। বিনোদিনীকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, এ ক্ষিতীশ চৌধুরীর মেয়ে। ক্ষিতীশ চৌধুরী বিনোদিনীকে ক্লাস-অবধি পৌঁছে দিতে এসেছিলেন।

অজিত চক্কোত্তি ক্লাস টু-তে বাংলা পড়ান। পড়া থামিয়ে উচ্ছ্বাসের গলায় বলে উঠেছিলেন, ‘আইসো আইসো। এই কেলাসে তোমারে স্বাগতম।’

তারপর ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমরা সকলে দেইখা রাখ, এই হইল গিয়া আমাগো গেরামের বনেদি পরিবারের মাইয়া।’ চাপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কী নাম যেন তোমার ?’

বিনোদিনী বলেছিল, ‘বিনোদিনী।’

গলা উঁচিয়ে চক্কোত্তি স্যার আবার বলেছিলেন, ‘বিনোদিনী, হ বিনোদিনী হের নাম। এর শইলে জমিদারবংশের রক্ত।’

ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ওসবের কী বোঝে! সুযোগ পেয়ে হইচই করতে শুরু করে তারা।

বাচ্চাদের কলরোলকে উপেক্ষা করে চক্কোত্তি স্যার বিনোদিনীকে বললেন, ‘এইখানে বইসবে তুমি। প্রত্যেক দিন এই সামনের বেঞ্চিতেই তুমি বইসবে।’

ভালো করে সবকিছু না বুঝলেও চক্কোত্তি স্যারের কাণ্ড দেখে বিনোদিনীর বেশ লজ্জা করতে লাগল। মাথা নিচু করে সে প্রথম বেঞ্চিতে বসে পড়ল।

টু-এর বছরের অনেকটা সময় পার করেই বিনোদিনী ভর্তি হয়েছিল স্কুলে।

ভর্তির ব্যাপারে বাপের মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। পারবে তো! ক্লাস টু-এর পড়াগুলো কব্জা করতেÑপারবে তো বিনোদিনী! যদি না পারে, যদি বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করে বসে, তাহলে লজ্জার সীমা থাকবে না। স্ত্রীকে বলেছিলেনও ক্ষিতীশ চৌধুরী মনের দ্বন্দ্বের কথাটি।

বলেছিলেন, ‘বিনু পারবে তো পাস করতে! বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি…।’

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রোহিনী বলেছিলেন, ‘তুমি এত উদ্বিগ্ন হচ্ছ কেন ? যদি না পারে তাহলে গেল দু’বছর ঘরে কী পড়ালাম আমি! তুমি দেখে নিয়ো বিনু ক্লাস টু ঠিকই উতরে যাবে।’

স্ত্রীর কথাতেও ক্ষিতীশ চৌধুরীর মনে আস্থা জাগে না। তাঁর দোনমনা ভাবটা কিছুতেই কাটে না।

আমতা আমতা করে বলেন, ‘এই বছরটাও ঘরে পড়ালে ভালো হতো না! বলছিলাম কী, এই বছরের বেশ কটি  মাস তো চলেই গেছে, এই রকম সময়ে ভর্তি করিয়ে দিলে আবার সংকটে না পড়ে যায় মেয়েটি!’

রোহিনী বলেন, ‘তুমি আর ইতস্তত কর না তো! আজকেই বিনুকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দাও।’

তারপর মুখটা উজ্জ্বল করে বললেন, ‘দেখ আমাদের বিনোদিনী কী ভালো রেজাল্টাই না করে!’

স্ত্রীর কথা আর ফেলতে পারেননি ক্ষিতীশ চৌধুরী। বিনোদিনীকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন।

না, বাবাকে লজ্জায় ফেলেনি বিনোদিনী। বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম দ্বিতীয় হতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু সব বিষয়ে ভালো রেজাল্ট নিয়ে ক্লাস টু পাস করেছিল। তবে বার্ষিক পরীক্ষায় সে জানান দিয়েছিল, আগামী পরীক্ষাগুলোতে কাউকে ছাড় দেবে না।

ক্লাস টু-এর সময়টা চিনপরিচয় হতেই কেটে গিয়েছিল। সবার সঙ্গে তেমন করে পরিচিত হবার আগেই বার্ষিক পরীক্ষা এসে গিয়েছিল। সবার সঙ্গে সেধে কথাও বলে না বিনোদিনী। এ তার অহংকার নয়, এ তার স্বভাব। চুপচাপ বসে থাকে ক্লাসে। যারা কথা বলতে চায়, হেসে কথা বলে তাদের সঙ্গে।

ক্লাস থ্রি-তে উঠে চারদিকে চোখ মেলে তাকাল বিনোদিনী।

কক্ষ বদল হয়েছে, বসার সিস্টেমের পরিবর্তন হয়নি। দু’চারজন ঝরে গেছে। সামনের কয়েকটা সিট খালি পড়ে আছে। কিন্তু বিভাসের সামনের দিকে এগিয়ে বসার উপায় নেই। অজিত চক্রবর্তী স্যারের কড়া নজর তার ওপর। নমুপাড়ার ছেলে হিন্দুপাড়ার ছেলেমেয়ের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসবে! এতে যে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে! ধোপাপাড়ার ছেলেটি উঁচু বর্ণের ছেলেমেয়ের সঙ্গে বসবেই-বা কেন, পেছনে খালি বেঞ্চি থাকতে! ক্লাস থ্রি-তেও বাংলা পড়ানোর দায়িত্ব পড়েছে অজিত চক্কোত্তি স্যারের উপর।

সমাজ থেকে বামুনের টিকির জোর তখনও কমে যায়নি। টিকির সঙ্গে টিকটিকির লেজের তুলনা করা শুরু করেনি তখনও মানুষেরা। দেবদ্বিজে ভক্তির ব্যাপারটা তখনও সমাজ থেকে একেবারে ইলোপ হয়ে যায়নি। তখনও পথেঘাটে টিকিওয়ালা বামুন দেখলে মানুষেরা হাত জোড় করে প্রণাম জানায়। অজিত চক্রবর্তী সেই টিকিওয়ালাদের একজন। পশ্চিমপাড়ায় বাড়ি তাঁর। বিনোদিনী প্রাইমারি স্কুলে তো পড়ানই, নানা পার্বণে দক্ষিণার লোভে বাড়ি বাড়ি পুজোও করান। তখন টিকির আগায় দূর্বা-তুলসীপাতা বাঁধেন তিনি। কোঁচা-নামা ধুতি পরে পাড়ার অন্যান্য ব্রাহ্মণের সঙ্গে দৌড়ের প্রতিযোগিতায় নামেন। শাস্ত্রীয় এবং অশাস্ত্রীয় উভয় বিদ্যা তিনি অর্জন করেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই বিদ্যা তাঁর ভেতরকার অন্ধকার দূর করতে পারেনি। ছোটজাতের লোকদের তিনি দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। নমুর পোলারা কেন যে স্কুলে পড়তে আসে, তা ভেবেও কূল পান না তিনি! তাই বিভাসের ওপর বেজায় খাপ্পা অজিত চক্রবর্তী। সুযোগ পেলেই বিভাসকে হেনস্তা করেন।

ধোপাবাড়ির ছেলে হলে কী হবে, বিভাসের চেহারাটা বেশ আদুরে। লম্বা ঝাঁকড়া চুল তার। চোখ দুটো মায়া মায়া। ফরসা রঙ। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে।

নটবর স্যার ক্লাস থ্রি-র অঙ্কের টিচার। চেহারাখানা নাদুসনুদুস। তার ওপর বিশাল পেটের বহর। পেটের ভারে থপথপিয়ে হাঁটেন। ফরসামুখে কালো তাগড়া গোঁফটি ঝকমক করে। ক্ষণে ক্ষণে গোঁফে হাত বোলান নটবর মজুমদার। ঢলঢলে পেন্টালুনের ওপর টাইট শার্ট গায়ে দেন। পেটটি তাঁর তখন বিকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

প্রধান শিক্ষক বরেন বাড়ুজ্জে নটবরবাবুকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তাগড়া গোঁফটার ওজন এবার একটু কমান নটবরবাবু। কদিন পর তো ছাত্রছাত্রীরা চেতনা হারাবে আপনার গোঁফের আড় দেখে!’

নটবর মজুমদার বলেন, ‘আর যা কিছু নিয়ে অভিযোগ করেন স্যার, মেনে নেব। কিন্তু আমার মোচের ওপর নজর দিবেন না স্যার। ও-ই ছাড়া আমার অহংকার করার আর কিছু নেই স্যার।’

নটবরবাবুর কথা শুনে কক্ষের সব শিক্ষক হেসে উঠলেন। টিফিন আওয়ারে খোশগল্প চলছিল তখন। এমনকি গুরুগম্ভীর হেডপণ্ডিত মোহনবাঁশি গাঙ্গুলিও না হেসে পারলেন না।

বরেন বাড়ুজ্জে চটজলদি বললেন, ‘কী বলছেন নটবরবাবু! গোঁফটি ছাড়া আপনার অহংকারের আর কিছু নেই! কেন, আপনার আর একটা বস্তু আছে না! যার জন্য গোঁফের চেয়ে অধিক গর্ব করতে পারেন আপনি!’

সকল শিক্ষক একসঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা কী স্যার ?’

প্রধান শিক্ষক আজ তার গাম্ভীর্যের খোলস থেকে বেরিয়ে এসেছেন। আজকে তাঁকে রসিকতায় পেয়ে বসেছে।

হাসতে হাসতে তিনি নিজের বক্তব্যকে আরও রহস্যময় করে তুললেন। বললেন, ‘কেন নটবরবাবু, সেই বস্তুটা কখনও নজরে পড়েনি আপনার ?’

নটবরবাবু হেডস্যারের কথা বুঝতে না পেরে চোখ পিটটিট করে তাকিয়ে থাকলেন।

অজিত চক্কোত্তি ধৈর্য হারিয়ে বললেন, ‘বস্তুখান কী, কইয়া ফ্যালান না ছার।’

এবার হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন বাড়ুজ্জেমশাই। চাপা কণ্ঠে বললেন, ‘প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়ান না নটবরবাবু! আপনার আধমনি উদরটা আপনার নজরে পড়ে না ? ওটাও তো আপনার মূল্যবান সম্পদের একটি!’

প্রধান শিক্ষকের মন্তব্য শুনে সকল শিক্ষক স্থান-কাল-পাত্র ভুলে হুল্লোড়ে মেতে উঠলেন। আর নটবর মজুমদার কাঁচুমাচু হয়ে শিক্ষকদের স্ফূর্তি দেখে যেতে লাগলেন।

আট

তোমরা জাইন্যা রাখÑরবীন্দ্রনাথের

বাপের নাম হইল দ্বারকানাথ ঠাকুর।

এই নটবর মজুমদার ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক করাতে করাতে হঠাৎ করে থেমে যেতেন। চকটা টেবিলের ওপর রেখে পেছনবেঞ্চির দিকে সরে আসতেন।

বিভাসের ফোলাফোলা গাল দুটো ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে টিপে বলতেন, ‘কী রে লালটুস, অঙ্কটা বুঝতে পারছিস ?’

বিভাস মাথা নেড়ে বোঝাত, অঙ্কটা সে দিব্যি বুঝতে পারছে।

নটবরবাবু বলতেন, ‘ভালো ভালো। অঙ্কে তোর মাথা আছে রে বিভাস! বড় হয়ে তুই অঙ্ক নিয়েই পড়িস!’ বলতে বলতে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে যেতেন তিনি।

তারপর অঙ্কটার আরও কিছু অংশ করিয়ে ছাত্রছাত্রীদের দিকে ফিরতেন নটবর মজুমদার। বলতেন, ‘অঙ্কটা মাথায় ঢুকছে তো তোমাদের ?’

নির্মল দাঁড়িয়ে বলত, ‘বুঝতে পারছি না স্যার। কঠিন অঙ্ক।’

নির্মলের কথা শুনে বিভাসের দিকে একপলক তাকাতেন নটবরবাবু। এক ফালি হাসি তাঁর চোখেমুখে ঝলকে উঠত। তারপর ছাত্রছাত্রীদের অঙ্কটি বোঝাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতেন।

একদিন ক্লাসে ঢুকে নটবরবাবু বললেন, ‘আজকে তোমাদের একটা জটিল অঙ্ক করাব।’

বিভাসরা তখন ক্লাস ফোরে। ফোরেরও অঙ্ক-টিচার নটবরবাবু। নটবর স্যারের কথা শুনে ক্লাসে আফসোসের আওয়াজ উঠল।

ছাত্রছাত্রীদের ‘উহু’ ধ্বনিকে উপেক্ষা করে ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে গেলেন নটবরবাবু। অঙ্কটা লিখলেন। বললেন, ‘পারবে ?’

সবাই বলল, ‘না স্যার। আপনি করে দেন।’

একটু কী যেন ভাবলেন নটবর মজুমদার। তারপর অঙ্কটির সমাধান করতে লাগলেন। লাইন ছয়েক লিখে হঠাৎ তিনি বিভাসের দিকে এগিয়ে গেলেন। বললেন, ‘বিভাস, তুই অঙ্কটা বুঝছিস।’

আস্তে করে উঠে দাঁড়াল বিভাস। মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘অঙ্কটা আমি করে ফেলেছি স্যার।’

চোখ কপালে তুলে নটবরবাবু বললেন, ‘করে ফেলেছিস! করে ফেলেছিস মানে কী রে! এত জটিল অঙ্কটি তুই করে ফেলেছিস মানে কী!’

তারপর বিস্ময়কে একটু সংযত করে নটবরবাবু বললেন, ‘এখন করলি! এই ক্লাসে বসে!’

বিভাস ওপরে-নিচে সামান্য মাথা নেড়ে অঙ্কখাতাটা নটবর স্যারের দিকে এগিয়ে ধরল।

খপ করে খাতাটা নিলেন নটবর মজুমদার। দ্রুত চোখ বোলালেন খাতার ওপর। নিজ চোখে দেখার পরও নিজকে বোঝাতে পারছেন না নটবরবাবু। এ তো ভারী, একটা কঠিন অঙ্ক! ক্লাস ফোরের কোনও ছাত্রছাত্রীর পক্ষে এ অঙ্ক করা সম্ভব নয়। সম্ভব যদি না হয়, তাহলে বিভাস করল কী করে! সেও তো ফোরেরই ছাত্র! বিস্ময়কে বাগে আনতে পারছেন না নটবরবাবু। তিনি আবেগি গলায় বললেন, ‘তুই করলি! এই ক্লাসে বসে! এখনই! আমি করার আগে!’

বিভাস আর কী বলবে! মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। ক্লাসসুদ্ধ ছাত্রছাত্রীরা অবাক বিস্ময়ে বিভাস আর স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকল।

হঠাৎ নটবর স্যার বিভাসকে জাপটে ধরলেন। বুকের কাছে টেনে নিয়ে চেপে রাখলেন কিছুক্ষণ। তারপর হইচই করে উঠলেন, ‘বিভাস রে, তুই আমার অহংকার রে বিভাস! তুই আমাদের স্কুলের মান বাড়াবি রে বিভাস!’

ধীর পায়ে সেদিন ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে এসেছিলেন নটবর স্যার। হাত-ইশারায় বিভাসকে ডেকেছিলেন।

বিভাস কাছে গেলে চকটা তার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘অঙ্কটা তুই ব্ল্যাকবোর্ডে করে দে।’

সেদিন অঙ্ক-ক্লাস শেষ হলে বিনোদিনী বিভাসের বেঞ্চির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

ক্লাসের অন্য পড়ুয়ারা আঁতকে উঠেছিল। বিভাসের কপালে নিশ্চয়ই দুঃখ আছে। নইলে বিনোদিনী তার সামনে গিয়ে চোখ গোল করে দাঁড়িয়েছে কেন ? বিনোদিনী সম্পর্কে সতীর্থদের ধারণা ভালো নয়। তারা মনে করেÑবিনোদিনী ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাড়ির মেয়ে হলে কী হবে, ভেতরে ভেতরে দেমাগ তার টগবগ করে। যার-তার সঙ্গে কথা বলে না বিনোদিনী। সামনের বেঞ্চে বসে। ক্লাসে টিচার না থাকলে বাহির দিকে তাকিয়ে থাকে। এগুলোকে কি দেমাগ বলে না ? সেই অহংকারী বিনোদিনী আজ বিভাসের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে! নিশ্চয়ই সে কোনও অঘটন ঘটাবে আজ! তার হাতে বিভাস নির্ঘাত অপমানিত হবে। তাই অবাক চোখে সবাই বিনোদিনীর দিকে তাকিয়ে থাকল।

বিনোদিনী দুম করে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘তুমি অঙ্কে এত ভালো কী করে ?’

একটু কেঁপে উঠল বিভাস। এ কীসের কাঁপন বুঝতে পারল না সে। ভয়ের না আনন্দেরÑদ্বন্দ্বে পড়ে গেল বিভাস। তবে বুকের তলায় খুশির যে একটা ঢেউ উতরোল তুলল, বিভাসের তা অনুভব করতে অসুবিধা হলো না। বিনোদিনীর কথাটা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে সে। প্রশ্নটা যে খুব কঠিন, তেমনও নয়। কিন্তু বিনোদিনীর প্রশ্নের কী উত্তর দেবে বা কীভাবেই দেবে, ঠিক করতে পারছিল না বিভাস। যে উত্তরই দিক, তার আবার কী মানে করে বসে বিনোদিনী, তার তো কোনও ঠিক নেই! হাজার হলেও জমিদার বাড়ির মেয়ে!

বিভাস তৎক্ষণাৎ মনে মনে ঠিক করল, কোনও উত্তর দেবে না। কিছু না বলে খাতায় এলেবেলে আঁকিবুকি করতে থাকল বিভাস।

বিনোদিনী হতাশ হলো না। বিভাসকে নিরুত্তর দেখে নিজের বেঞ্চিতে ফিরে গেল না। বিভাসের বাহুতে আলতো ঠেলা দিয়ে বলল, ‘এই বিভাস, তোমাকে বলছি, শুনতে পাওনি।’

এবারও বিভাসের মুখে রা ফুটল না। তবে ওপরে-নিচে মাথা দোলাল সে। তার মানে বিনোদিনীর কথা সে শুনতে পেয়েছে।

তখন বিনোদিনী চোখ বড় বড় করে বলল, ‘তাহলে! জবাব দিচ্ছ না যে!’

এবার ত্রস্ত ভঙ্গিতে বিভাস বলল, ‘কী জবাব দেব!’

‘কেন! ওই যে জিজ্ঞেস করলামÑএত কঠিন কঠিন অঙ্ক তুমি পারো কী করে!’ বিনোদিনী বলল।

বিনোদিনীর দিকে এবার সোজাসুজি তাকাল বিভাস। মৃদু গলায় বলল, ‘জানি না। এমনি এমনি।’

‘কী জানো না! কী এমনি এমনি!’ বিভাসের ছন্নছাড়া উত্তর শুনে উঁচু গলায় বলে উঠল বিনোদিনী।

বিনোদিনীর উচ্চকণ্ঠ সবাই শুনতে পেল। সবাই ধরে নিলÑবিভাসকে বুঝি এখনই ঠেঙাবে বিনোদিনী। ওরা তো ওদের আগের নিম্নস্বরের কথপোকথন শুনতে পায়নি!

বলাই বলে উঠেছিল, ‘কী হয়েছে রে বিভাস!’

বলাইয়ের কণ্ঠে যে স্পষ্ট ব্যঙ্গ, বুঝতে বেগ পেতে হলো না বিভাসকে। কিন্তু বলাইয়ের ব্যঙ্গকে আমলে নিল না সে। বিনোদিনীকে লক্ষ্য করে বোকা কণ্ঠে বলল, ‘কী করে যে কঠিন অঙ্কগুলি হয়ে যায়, জানি না। অঙ্ক করতে শুরু করলে এমনি এমনি হয়ে যায়।’

অন্য মেয়ে হলে বিভাসের এরকম খাপছাড়া উত্তর শুনে খিল খিল করে হেসে উঠত। কিন্তু বিনোদিনী হাসল না। বিনোদিনী শক্ত ধাঁচের মেয়ে। সহজে হাসে না, ক্লাসে বসে সহপাঠীদের সঙ্গে হইচইও করে না। খট খট করে কথা বলে। শিক্ষকের ভুল ধরিয়ে দিতে ভয় পায় না।

একদিনের কথা মনে পড়ে যায় বিভাসের। সেদিন অজিত স্যার ছুটিতে। তাঁর পরিবর্তে রহিম স্যার এসেছেন বাংলা ক্লাস নিতে। সেদিনের পড়া ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতাটি। রহিম স্যার এই স্কুলে ইসলাম ধর্মশিক্ষার ক্লাস নেন। নোয়াখালির দিকে বাড়ি। আপ্রাণ চেষ্টাতেও আঞ্চলিক ভাষার টানটা এড়াতে পারেন না।

রহিম স্যার বাংলা বইটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘আইজ আঁই তোঙ্গরে এমন একখান কবিতা পড়ামু, যা হুইনলে তোঙ্গ চোখে একটা নদী ভাইস্যা উইঠব। কিন্তু কথাখান হইল য্যান, কবিতা পড়নর আগে কবিরে জানন দরকার। এই কবির নাম রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ ভারতের কবি। আমাগো দ্যাশের কবি কিন্তুক কাজী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথের কবিতা কীয়ল্লাই তোমাগো পাইঠ্য বইয়ে ঢুকাইছে কইতে পারুম না।’ থামলেন রহিম স্যার।

দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘থাউক গই। হিয়ান লই বিচার করনের আমরা কেউ না। বইয়ে ঢুকাইছে যহন পইত্তে তো হইবই! তো রবীন্দ্রনাথের পরিচয় জানন দরকার। তোমরা জাইন্যা রাখ রবীন্দ্রনাথের বাপের নাম হইল দ্বারকানাথ ঠাকুর।’

রহিম স্যারের উল্টাপাল্টা কথায় চটে গিয়েছিল বিনোদিনী। শিক্ষক বলে চুপ করে ছিল এতক্ষণ। শেষের কথায় আর চুপ থাকতে পারল না।

ফুঁসে উঠল বিনোদিনী, আপনি ঠিক বলছেন না স্যার।’

নয়

পরদিন ক্লাসে ঢুকতেই দরজার মুখে

বিভাসকে আটকে দিয়েছিল বিনোদিনী।

বিনোদিনীর কথা শুনে রহিম সাহেবের চক্ষুগোলক বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো!

এক টুকরা মেয়েটি বলে কী! ভুল বলেছেন তিনি! তিনি মাদরাসায় লেখাপড়া করেছেন ঠিকই, কিন্তু কে না জানে, রবীন্দ্রনাথের বাপের নাম দ্বারকানাথ!

চোখ কপালে তুলে রহিম উদ্দিন বললেন, ‘কী কও তুমি মাইয়া! আমি ঠিক কইতাছি না! বিঘতখানেক মাইয়া তুঁই আঁর ভুল ধর! বয়স কত অইল তোমার! আমার ভুল ধর! কী জান তুমি, আঁর ভুল ধইত্তে আইচ।’

একটু থামলেন রহিম উদ্দিন। তারপর রেগেমেগে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে বললেন, ‘দেইখছনি তোমরা, হে ধরে আমার ভুল! কেলাস ফোরের মাইয়া অইয়া আলেম পাস রহিমের ভুল ধরে!’

রহিম উদ্দিনের কথা শুনে সমস্ত ক্লাস নীরব থাকে। কেউ কথা বলবার সাহস করে না। শুধু বিভাস অস্থির হয়ে ওঠে। কিছু একটা বলতে চায়। আবার কী বুঝে নিশ্চুপ থাকে।

বিভাস নিশ্চুপ থাকলে কী হবে বিনোদিনী চুপ থাকে না।

সে সতেজে বলে, ‘হ্যাঁ স্যার, আপনি ঠিক বলেননি। আমাদের ভুল শেখাচ্ছেন আপনি।’

রহিম উদ্দিন তো বিনোদিনী সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না! ইসলামধর্মের শিক্ষক তিনি। মুসলমান ছাত্রদের তিনি পড়ান। হিন্দু ছাত্রছাত্রী সম্পর্কে তার তেমন করে জানা নেই। বিনোদিনী সম্পর্কে তো নেই-ই।

বিনোদিনীর কথার মধ্যে বেতমিজি খুঁজে পেলেন তিনি! তাঁর হঠাৎ মনে হলো, এই মেয়েটি ইচ্ছে করে তাঁকে অপদস্থ করছে। একে তো ছাড় দেওয়া যায় না! একে উচিত শিক্ষা না দিলে ভবিষ্যতে তাঁর কোনও দাম থাকবে না এই স্কুলে।

রোষে জ্বলে উঠলেন রহিম উদ্দিন, ‘তুই কনরে মাইয়া! বাড়ি কোন পাড়ায় তোর! তোর বাপের নাম কী রে!’

স্যারের কথা শুনে বিনোদিনীর বড় রাগ হলো। এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে কোনও টিচার তার সঙ্গে তুই-তোকারি করেননি। সেটা তার পিতৃপরিচয়ের কারণে হোক বা সে ভালো ছাত্রী বলে হোক। কিন্তু এই স্যার তাকে আজ অপমান করলেন। বিনোদিনীর বাবার নাম জানার কথা নয় রহিম স্যারের। তিনি অন্য জেলার লোক। এই স্কুলে বদলি হয়ে এসেছেন বেশিদিন হয়নি। ক্ষিতীশ চৌধুরীর নাম না জানা তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক। তিনি তার পিতার নাম জিজ্ঞেস করতেই পারেন। কিন্তু এইভাবে! এরকম অপমানজনক ভঙ্গিতে!

মা-বাবার অপমানে কোন ছেলেমেয়ে রাগ না করে! বিনোদিনীরও রহিম স্যারের ব্যঙ্গে খুব খারাপ লাগল। রাগ হলো স্যারের ওপর।

স্পষ্টভাষী বিনোদিনী বলল, ‘আগে রবীন্দ্রনাথের বাপের নাম ঠিক করে বলেন স্যার। তারপর আমার বাপের নাম জানবেন।’

কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে থাকলেন রহিম উদ্দিন। তারপর তাঁর হাতের বেতটি বাতাসে সাঁই সাঁই শব্দ তুলল। ক্ষেপে বিনোদিনীর দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।

রহিম স্যার কিছু করবার আগেই পেছনবেঞ্চি থেকে বিভাস বলে উঠল, ‘রবীন্দ্রনাথের পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। দ্বারকানাথ নয়।’

চট করে বিভাসের দিকে চোখ ফেরালেন রহিম উদ্দিন। তিনি তাঁর ইতিকর্তব্য ভুলে দ্রুত পায়ে বিভাসের দিকে এগিয়ে গেলেন। বিভাসের মাথার ওপর বেত তুলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাইলে দ্বারকানাথ কেডা ? রবীন্দ্রনাথের জেডা নি ?’

বিভাস অকম্পিত কণ্ঠে বলল, ‘জেঠা নন স্যার। দ্বারকানাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা।’

‘ঠাকুরদা! ঠাকুরদা আবার কী জিনিস!’ উপহাস ছলকে উঠল রহিম স্যারের কণ্ঠে।

ওদিক থেকে বিনোদিনী বলে উঠল, ‘ঠাকুরদা মানে পিতামহ।’

ক্লাসের সবাই একসঙ্গে বলল, ‘পিতামহ মানে বাপের বাপ। পিতামহরে ঠাকুরদা কয়।’

রহিম উদ্দিনের মাথা আউলাঝাউলা হয়ে গেল। চিৎকার করে বললেন, ‘এই কেডা রে! কেডা কথা কইল ?’

সবাই একসঙ্গে আবার বলল, ‘আমরা চেয়ার।’

একেবারে ম্রিয়মাণ হয়ে গেলেন রহিম স্যার। ধীর পায়ে নিজের চেয়ারের কাছে সরে এলেন। রোলকলের খাতাটি নিয়ে মাথা নিচু করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সেই থেকে রহিম উদ্দিনকে দেখলে ছাত্ররা আওয়াজ দিতে শুরু করলÑরবীন্দ্রনাথের বাপের নাম কী রে!

ওইদিন অঙ্ক ক্লাসশেষে বিভাসকে বিনোদিনী বলেছিল, ‘তুমি এত ভালো ছাত্র! পেছনে বসো কেন ?’

বিভাস বলেছিল, ‘এমনি এমনি!’

‘তোমার সবতাতেই কি এমনি এমনি! অঙ্কে ভালো কেন ? এমনি এমনি! পেছনে বসো কেন ? এমনি এমনি!’ অভিমানে বলে উঠেছিল বিনোদিনী।

বিভাস কি সাধে পেছন-বেঞ্চিতে বসে! অজিত চক্রবর্তী স্যার যে তাকে পেছন-বেঞ্চিতে বসতে বলেছেন। তাতে যে উঁচুজাতের ছাত্রছাত্রীদের মান বাঁচে! কিন্তু সেই কথাটি বিনোদিনীকে বলতে চাইল না বিভাস। তাই তো বিনোদিনী বলল, এমনি এমনি বসে সে এখানে, ইচ্ছে করেই বসে।

বিনোদিনীর কথাতে কোনও কিছু বলল না বিভাস। মাথা নিচু করে নিজের বেঞ্চিতে বসে থাকল।

হঠাৎ বিনোদিনী বলল, ‘কাল থেকে তুমি সামনের বেঞ্চে বসবে। আমার পাশে বসবে।’

এবার বেশ অবাক হলো বিভাস। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘না না। তা হয় না।’

‘কী তা হয় না ?’ জিজ্ঞেস করল বিনোদিনী।

‘আমি সামনের বেঞ্চে বসব না। তোমার সঙ্গে বসব না।’

‘ঠিক আছে, আমার পাশে না বসো। কিন্তু সামনের বেঞ্চে বসবে না কেন ?’

‘তা তোমাকে বলা যাবে না।’

‘কেন, কেন বলা যাবে না ?’

বিনোদিনীর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল বিভাস।

ইংরেজি টিচার আসার সময় হয়ে গেছে। নিজের বেঞ্চে ফিরে যাওয়ার আগে বেশ দৃঢ় কণ্ঠে বিনোদিনী বলে গেল, ‘কাল থেকে তুমি আমার পাশে বসবে।’

বিভাস কিছু বলার আগেই নিজ জায়গায় ফিরে গিয়েছিল বিনোদিনী।

পরদিন ক্লাসে ঢুকতেই দরজার মুখে বিভাসকে আটকে দিয়েছিল বিনোদিনী।

নিজের পাশের জায়গাটি দেখিয়ে বলেছিল, ‘এখানে বসো!’

আঁতকে বিনোদিনীর মুখের দিকে তাকিয়েছিল বিভাস। কাল না হয় বলেছে, আজকে কেন বলছে বিনোদিনী তার পাশে বসতে! পাগলি নাকি! মেয়ের পাশে সে বসবে! ক্লাসে যে ছেলেমেয়ে পাশাপাশি বসে না, তা নয়। তাই বলে বিনোদিনীর পাশে সে বসবে! জমিদারবংশের মেয়ের পাশে!

পাশ কাটাতে চাইল বিভাস। সামনের দিকে এগোতে চাইল। কিন্তু পথ আড়াল করে দাঁড়িয়ে বিনোদিনী বলেছিল, ‘তুমি এখানেই বসবে। আজ থেকে। আমার পাশে। দেখি কে কী বলেন!’ এর মধ্যে বিনোদিনী ভেবে ফেলেছে বিভাসের পেছন-বেঞ্চিতে বসার পেছনে কোনও শিক্ষকের ভূমিকা আছে।

আগের কথাগুলো আগে একবার বলেছে বিনোদিনী। কিন্তু শেষের কথাটি কেন বলল বিনোদিনী! অজিত চক্কোত্তি স্যারের কথা কি সে জেনে গেছে! তার তো জানার কথা নয়! সে তো টু-তে এসে স্কুলে ভর্তি হয়েছে! চক্কোত্তি স্যারের কথাটি তো তারও আগের! এরকম সাতপাঁচ ভাবছিল বিভাস।

হঠাৎ তার বইখাতায় হেঁচকা টান পড়ল।

ততক্ষণে ফ্রকপরা লম্বাটে বিনোদিনী বিভাসের হাত থেকে এক ঝটকায় বইখাতা কেড়ে নিয়েছে। থপ করে হাই বেঞ্চিতে ওগুলো রেখে বলেছে, ‘আজ থেকে তুমি আমার পাশেই বসবে বিভাস। আমার খু-উ-ব ভালো লাগবে।’

উপায় না দেখে বিনোদিনীর পাশে জড়সড় হয়ে বসে পড়েছিল বিভাস। কিন্তু এই বসার জন্য তাকে খেসারতও দিতে হয়েছিল।

ক্লাসসুদ্ধ ছেলেমেয়ের সামনে অপমানিত হতে হয়েছিল তাকে।

বিভাসকে বিনোদিনীর পাশে দেখে খেপে গিয়েছিলেন অজিত চক্রবর্তী। জাত-গরিমা খলবলিয়ে উঠেছিল তাঁর মস্তিষ্কে। অপমানে চুরমার করে দিতে চেয়েছিলেন তিনি, বিভাসকে। তাতে তিনি সহজে পার পেয়ে যাননি।

অজিত চক্কোত্তিকে তোতলা করে ছেড়েছিল একজন, সে বিনোদিনী চৌধুরী।

দশ

কী নমুর পোলা বিভাস, আইজ যে

এইখানে! এক্কেবারে সামনের বেঞ্চিতে!

ওইদিন অজিত চক্রবর্তী ক্লাস নিতে এসে একেবারেই বিমূঢ় হয়ে পড়লেন।

তাঁর হুঁশজ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে গেল যেন! পড়ানোর কথা ভুলে গিয়ে বিভাসের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। বিভাস জুবুথুবু। মাথা নিচু তার। পেছন থেকে কে যেন কেশে উঠলÑখুল্লুত। বিহ্বল চোখ দুটো দিয়ে ওদিকে একবার তাকালেন তিনি। অন্যদিন হলে তেড়ে উঠতেন। এই ইচ্ছাকৃত কাশির জন্য ছাত্রটিকে শাস্তি দিতেন। কিন্তু কী আশ্চর্য, আজ কিছু করলেন না অজিত চক্রবর্তী। তাঁর দিশেহারা চোখ দুটোকে আবার বিভাসের ওপর ফিরিয়ে আনলেন। অজিত স্যারের চোখ নিষ্পলক, ক্রোধের ঘূর্ণি সেখানে।

বেশ কিছুক্ষণ পর হুঁশে ফিরলেন অজিত চক্কোত্তি। কণ্ঠকে বিদ্রƒপে ভাসিয়ে বললেন, ‘কী নমুর পোলা বিভাস, আইজ যে এইখানে! এক্কেবারে সামনের বেঞ্চিতে! সেপাইয়ের মাইয়া নয়, কোতোয়ালের মাইয়া নয়, এক্কেবারে রাজকইন্যার পাশে! চাঁদ হাতে পাইতে ইচ্ছা কইরেছে বুঝি তোর! বান্দরের গলায় মুক্তার…।’

বিভাস হাই বেঞ্চের সঙ্গে নিজের মাথাটা মিশিয়ে দিতে পারলে বাঁচে। তার ইচ্ছে করলÑহাই বেঞ্চের তলায় লুকিয়ে যায়। অপমানে-অভিমানে মরে যেতে ইচ্ছে করল তার।

কিন্তু ফুঁসে উঠল বিনোদিনী। বলল, ‘স্যার, এগুলি কী বলছেন! আমার এপাশে শেফালি বসেছে। তার পাশে মৃণাল। আর আমার ডান পাশে বসেছে বিভাস। মৃণাল যদি শেফালির পাশে বসতে পারে, বিভাস আমার পাশে বসেছে বলে আপনি এরকম বিশ্রীভাবে বলছেন কেন ? আমি কি রাজকন্যা নাকি স্যার ?’

ছোট্ট মেয়েটির মুখে এতগুলো কথা শুনে চক্কোত্তির ভিরমি খাওয়ার অবস্থা হলো। দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। পূর্বের ব্যঙ্গমিশানো কণ্ঠে বললেন, ‘মৃণাল সেন বইসেছে শেফালি দত্তের পাশে…।’

পুরোপুরি বলতে দিল না বিনোদিনী। হঠাৎ তার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। মা সর্বদা তাকে শিখিয়ে এসেছেÑঅন্যায়কে কখনও মেনে নিবি না বিনু; সে যেই হোক, তোর বাপ বা টিচার, প্রতিবাদ করবি। মায়ের এসব কথা আর যুক্তি সেই ছোটবেলা থেকে বিনোদিনীর কথায় এবং চিন্তায় প্রভাব ফেলেছে। সমবয়সী অন্যদের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে থেকেছে সে।

তাই শিক্ষকের অযৌক্তিক কথার প্রতিবাদ করতে দ্বিধা করল না বিনোদিনী।

সতেজে বলল, ‘আর নমুর পোলা বিভাস চন্দ বসেছে বিনোদিনী চৌধুরীর পাশে! এইখানেই তো আপনার আপত্তি স্যার ?’

অজিত চক্রবর্তী পিছিয়ে গেলেন না। ক্রোধে জ্বলে উঠে বললেন, ‘হ, ঠিক তাই। ছোডজাতের পোলা উঁচুবর্ণের মাইয়ার পাশে বসে কোন সাহসে!’

‘তাহলে আপনিই বলেছেন স্যার, বিভাসকে পেছনে বসতে ?’

‘হ কইছি তো! ভুল কইরছি নি ? জাত-ধর্ম বইলে একখান কথা আছে তো! পইড়তে আইছে বইলে আমাগো জাত নষ্ট কইরব নি নমুন পোলা!’

বিনোদিনীর আজ কী হলো কে জানে, অজিত স্যার রাগ করবেন কিনা বা তিনি গিয়ে হেডস্যারকে নালিশ করবেন কিনা, ভুলে গেল বিনোদিনী। সরোষে বলল, ‘আপনি জাত নিয়ে কথা বলছেন কেন স্যার ? বিভাস ধোপাবাড়ির ছেলে বলে ও মানুষ নয়, আর আপনি ব্রাহ্মণ বলে আপনি দেবতা ?’

নিজের কথা শুনে নিজেই অবাক হয়ে গেল বিনোদিনী। এ যেন তার কথা নয়! এ যেন তার মা রোহিনী তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নিলেন!

অজিত চক্রবর্তী স্যারের অক্ষিগোলক দুটি বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। মাথার ভেতরটা খালি খালি লাগতে শুরু করল। তাঁর হাত নিশপিশ করতে লাগল। কী করবেন, ওই সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না তিনি।

হঠাৎ পেছনবেঞ্চি থেকে কে একজন হাততালি দিয়ে উঠল। তার দেখাদেখিতে গোটা ক্লাস হাততালিতে ভরে গেল।

অজিত চক্কোত্তির ওপর ছেলেমেয়েরা ক্ষুব্ধ ছিল। কারণে-অকারণে পেটান তিনি, অকারণে কুবাক্যে অপমান করেন ছাত্রছাত্রীদের। আজ সুযোগ পেয়ে সবাই সেইসব অপমানের শোধ নিল।

অজিত চক্রবর্তীর দৃষ্টি তীক্ষè। তাঁর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে আজকের এই অপমানজনক হাততালির সূচনা করেছে নেপোলিয়ন মজুমদার। বুঝতে পেরেও নেপোলিয়নকে কিছু করলেন না অজিতবাবু।

আজ তাঁর দুঃসময়। তাঁর বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে সমস্ত ক্লাস আজ তাঁর বিরুদ্ধে। এই সময় নেপোলিয়নকে নিয়ে নতুন একটা অধ্যায়ের সূচনা করতে চাইলেন না তিনি। আজকের নেপোলিয়নের ব্যাপারটি অন্য একটা দিনের জন্য তোলা থাকুক। আজ বিনোদিনীর ব্যাপারটি থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসা জরুরি। ভাবলেন অজিত চক্রবর্তী।

বিনোদিনীর দিকে চোখ ফেরালেন অজিত চক্রবর্তী। জলঢালা গলায় বললেন, ‘তাইলে তুমি বইলছ বিভাস আইজ থেকে তোমার পাশে বইসবে।’

‘আপনার আপত্তি আছে স্যার ?’ বিনোদিন কণ্ঠকে শক্ত করে বলল।

‘না আপিত্তি থাইব ক্যান ? তুমি যদি ধোবার পোলারে পাশে বসাইয়া কেলাস কইত্তে চাও, আমি আপিত্তি কইরলে ধোপে টিকব নি!’

কথাটা যে কী গভীর অপমান বুকে চেপে রেখে অজিত চক্রবর্তী বললেন, কাউকে বুঝতে দিলেন না। আজ তিনি যেন কিল খেয়ে কিল হজম করলেন।

কিল হজম না করে কোনও উপায়ও নেই অজিত চক্রবর্তীর। এই মুহূর্তে তাঁর হাত যে ভারী একটা পাথরের তলায়! ক্ষিতীশ চৌধুরীর হাতে যে তাঁর প্রাণভোমরাটি বন্দী!

অজিত চক্রবর্তীর বাড়ি ভিন্ন জেলায়। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের চাকরিতে ঢুকে এই বিনোদপুরে তাঁর প্রথম পোস্টিং। এই গ্রামের জলহাওয়া, এই গ্রামের মানুষজন তাঁর ভালো লেগে গেল। তিনি মনস্থ করলেনÑবিনোদপুরেই থেকে যাবেন সারাজীবন। বদলির জন্য তদবির না করলে কর্তৃপক্ষ বদলি করে না। দীর্ঘ দীর্ঘ সময় একই স্কুলে থেকে যাওয়া যায়। সেভাবে অজিত চক্রবর্তীও থেকে গেলেন এই গ্রামে। পশ্চিমপাড়া থেকে বিয়েও করলেন। সন্তানাদি ঘরে এলো তাঁর।

শেষের দিকে ক্ষিতীশ চৌধুরীর কাছ থেকে একটুকরা জায়গা কিনেছেন তিনি। ঘরও তুলেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন হয়ে গেল জায়গাটির রেজিস্ট্রি নিতে পারেননি। আজ দেব কাল দেব করে করে কেবলই ঘোরাচ্ছেন ক্ষিতীশ চৌধুরী।

এই সময় ক্ষিতীশ চৌধুরীর মেয়ে বিনোদিনীকে খেপালে তাঁর সমূহক্ষতি হয়ে যাবে।

এ কারণে রগচটা স্বেচ্ছাচারী হিংস্র অজিত চক্রবর্তী চুপ করে গেলেন।

সেদিন তিনি পড়ালেন বটে, কিন্তু ক্লাসটা জমল না। শিক্ষক-কমনরুমে এসে ঝিম হয়ে বসে থাকলেন অজিতবাবু। কীরকম যেন অবসাদগ্রস্ত, কীরকম যেন ম্রিয়মান! পাশের চেয়ারে বসা নটবরবাবু খেয়াল করলেন তা।

বললেন, ‘কী অজিতদা, এরকম মাথায় হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন যে!’

হঠাৎ অজিতবাবুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, ‘আর কইয়েন না, ফোরের কেলাসে আইজ জুইত কইরতে পাইরলাম না।’

ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসার সময় অজিত চক্রবর্তী মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আজকের ঘটনাটা কাউকে বলবেন না। কিন্তু নটবরবাবুর প্রশ্নে কী হলো কে জানে, মুখ থেকে ফস করে কথাটা বের করে ফেললেন।

নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নটবরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন, কী হয়েছে ? কোনও…!’

মুখের কথা কেড়ে নিলেন অজিত চক্রবর্তী। বললেন, ‘দুই একজন বেয়াড়া ছেইলে-মেইয়ের উদ্ভব হইছে অই কেলাসে।’

পাশে বসা রহিম উদ্দিন বলে উঠলেন, ‘আর কওন নো পড়িব, আঁই জানি। একখান বিচ্ছু মাইয়া আছে হেই কেলাসে। বিভাস নামে এক হারামজাদাও আছে। হেদিন কেলাসে আঁরে বেইজ্জত করি ছাইড়ছে!’

নটবরবাবু একবার রহিম উদ্দিন, আরেকবার অজিত চক্রবর্তীর মুখের দিকে তাকালেন। মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘আসলে কী হয়েছে ?’

‘কী হইয়েছে পুরাপুরি আপনারে বইলতে পাইরব না, তবে আপনি জাইনে রাখেন, বদলা আমি নিমুই। হরেন্ডর পোলা নেপোলিয়নের বিষদাঁতখান আমি ভাইঙ্গা হাতে ধরাই দিমুই!’

তাঁকে বিব্রত করার ঘটনাটির সূত্রপাত বিনোদিনী করলেও তাঁর সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল নেপোলিয়ন মজুমদারের ওপর।

নেপোলিয়নই হাততালির সূচনা করেছে। চোখ এড়ায়নি অজিত চক্রবর্তীর।

এগারো

বাবার একমাত্র মেয়ে বেলার বিয়ে বলে

কথা। আলোতে আলোতে সমস্ত বাড়ি ভরিয়ে

তুলেছিল তোমার ঠাকুরদা নকুলচন্দ্র।

নেপোলিয়ন পূর্বপাড়ার হরেন্দ্র মজুমদারের ছেলে।

ঢ্যাঙ্গা। টিনটিনে। পেছনদিকে বসে সে। প্রথম প্রথম সামনের দিকে বসত। পেছনরা বলত, ‘এই লম্বু, তোর জন্য বোর্ড দেখতে পাচ্ছি না।’

সহপাঠীদের কথা গায়ে মাখত না নেপোলিয়ন। শেষে একদিন সিদ্ধান্ত নিলÑপেছন-বেঞ্চিতেই বসবে। তাতে দুটো সুবিধে, বন্ধুদের আওয়াজ শুনতে হবে না আর শিক্ষকদের কথা সুবোধ বালকের মতো হাঁ-করে না শুনে পার পাওয়া যাবে।

খ্যাংরা কাঠির মাথায় ছোট একটা গোল কুমড়ো বসিয়ে দিলে যেরকম দেখতে হয়, নেপোলিয়নের চেহারা দেখতে সেরকমই। স্কুলসুদ্ধ ছেলেরা তাকে ন্যাপলা বলে ডাকে। সুযোগ পেলে তার মাথায় চাঁটি মেরে বলে, ‘এই তালপাতার সেপাই, ভাত খাস না তুই ? এইরকম কাঠির মতন চেহারা কেন তোর ?’

বন্ধুদের কথা শুনে মন বড় খারাপ হয়ে যায় নেপোলিয়নের। অন্য ভাইবোনেরা তার মতো শুকনো কাঠ নয়। গোলগাল, নাদুসনুদুস। তার মায়ের দেহটাও বেশ ভারী। তার বাবা হরেন্দ্র মজুমদারের চেহারাটাও মন্দ নয়। দোহারা। কালোও নয়। তবে তার চেহারাখানা কেন এরকম হলো, বুঝে কুলিয়ে উঠতে পারে না নেপোলিয়ন।

হরেন্দ্রের বাপ নকুলচন্দ্র চাষবাস নিয়ে থাকত। ছেলে হরেন্দ্রকে নিয়ে তার মনে অনেক আশা। ছেলেকে চাষি বানাবে না, পড়াবে। স্কুলে পাঠিয়েছিল হরেন্দ্রকে, নকুলচন্দ্র। পড়াশোনাতে খারাপ ছিল না হরেন্দ্র। একটু মাথা তোলা হলে হরেন্দ্রের মাথায় একটা ঝোঁক চাপল। গান শিখবে সে। প্রথম প্রথম খালি গলায় সা রে গা মা, পরে পরে আমার হিয়ার মাঝে, আরও পরে আমি যার নূপুরের ছন্দ এবং শেষে চোখ বান্ধিবি মুখ বান্ধিবি মন বান্ধিবি কেমনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও গানই কণ্ঠে তুলে নিতে পারল না হরেন্দ্র। বেছে নিল মৃদঙ্গকে। সুর তার কথা না শুনলেও মৃদঙ্গ কথা শুনল। বিনোদপুরে মৃদঙ্গ বাজিয়ে হিসেবে বেশ একটা নাম হয়ে গেল হরেন্দ্রের। মেট্রিকটাও ফেল করে বসল হরেন্দ্র। বাপ কিন্তু খেপল না। অশিক্ষিত চাষার ঘরে নন-মেট্রিক ছেলে মন্দ কী! বরঞ্চ গৌরবেরই তো! এই বিনোদপুরে ক’জনের ছেলে মেট্রিক পাস! ছেলেকে প্রশ্রয় দিল নকুলচন্দ্র। তাই বলে হরেন্দ্র বিপথে গেল না। যেখানে গান-কীর্তন, সেখানেই হরেন্দ্র মৃদঙ্গ নিয়ে হাজির হতে থাকল।

স্ত্রীর জোড়াজুড়িতে হরেন্দ্রের বিয়েটাও করিয়ে দিল নকুলচন্দ্র। ভরা সংসার নকুলচন্দ্রের। কিন্তু মনে সুখ নাই। ঘরে যে বেলা! বেলা নকুলের মেয়ে। হরেন্দ্রের বড়। বয়স হয় বেলার। ঘর আসে না। যা-ও দু’একটা ঘর আসে বেলাকে দেখে ফিরে যায়। ঘটক লাগায় নকুল। ঘটকের প্রভাবে যারা আসে তারা হয় দোজবর, না হয় তেজবর। নকুলের এককথাÑবেলাকে ‘দোজবরে-তেজবরে’ বিয়ে দেবে না। শেষ পর্যন্ত বেলার বিয়েই হলো না।

বেলার বিয়ে না হওয়ার পেছনে কারণ আছে। কেউ যে ভাঙানি দেয়, এমন নয়। আবার পড়শি কোনও ছেলের সঙ্গে বেলার যে ইয়ে আছে, তাও নয়। বেলার অঙ্গ-খুঁতই তাকে সারাজীবন কুমারী করে রেখেছে। বেলা দেখতে কালো। সামান্য দাঁত-উঁচু তার। একটু পা টেনে টেনে হাঁটে।

মরার আগে হরেন্দ্রকে প্রতিজ্ঞা করায় নকুলচন্দ্র, ‘বল বাপ হরু, বেলাকে কখনও অবজ্ঞা করবি না। দিদিকে সারাজীবন মর্যাদা দিবি।’

হরেন্দ্র বলে, ‘বাবা, বেলাদি আমার মায়ের সমান। মা মারা যাওয়ার পর থেকে দিদিকে আমি মায়ের সমান জ্ঞান করি। স্বর্গে গিয়ে তুমি নিশ্চিন্তে থেকো বাবা, বেলাদির কোনও অসম্মান হবে না এ বাড়িতে।’

বড় খুশি হয়েছিল নকুলচন্দ্র। পরম তৃপ্তি নিয়ে চোখ বুজেছিল।

হরেন্দ্রের বউ অলকাও কোনওদিন অমর্যাদা করেনি বেলাদিকে। বেলাদির হাতে সংসারের সকল দায় গছিয়ে দিয়ে বছর বছর সন্তান বিইয়ে গেছে অলকা। বেলাদি নেপোলিয়নকে বড় তো করেছে করেছেই, স্নেহ-যত্নে বর্ণ-শব্দ-বাক্যকেও লালনপালন করেছে।

প্রথম সন্তান হবার পর হরেন্দ্র গোঁ ধরেছিল, ছেলের নাম রাখবে নেপোলিয়ন। ছাত্রাবস্থায় ইতিহাস পড়তে পড়তে বারবার ফরাসি বীর নেপোলিয়নের কথা মনে পড়ত হরেন্দ্রের। নেপোলিয়ন যেমন ছিলেন বীর, তেমনি ছিলেন সাহসী। তিনি ফ্রান্সের সম্রাট তো ছিলেনই, বাড়তি ইতালির রাজাও ছিলেন। দেহে অনেক শক্তি রাখতেন নেপোলিয়ন। আলেকজান্ডার নন, শিবাজি নন, নেতাজি নন, আকবরও নন, ভিনদেশি এই যোদ্ধাটিই শেষ পর্যন্ত হরেন্দ্রের হিরো হয়ে গিয়েছিলেন।

তাই প্রথম সন্তানের নাম রাখার সময় যখন এল, ওই নেপোলিয়নকেই বেছে নিল হরেন্দ্র।

কিন্তু হরেন্দ্রের দুর্ভাগ্য, তার ছেলে নেপোলিয়ন সম্রাট নেপোলিয়নের মতো হলো না। না চেহারায়, না দেহগঠনে, না মেধায় বীর নেপোলিয়নের পাশে ঘেঁষতে পারল না নেপোলিয়ন মজুমদার। ভেতো, খ্যাংরাকাঠির নেপোলিয়ন হয়েই থাকল।

পরের পরের সন্তানদের নাম রাখার অধিকারটা ছিনিয়ে নিল বেলা মজুমদার। বেলা মজুমদার ততদিনে বেলাপিসি। বেলাপিসি হরেন্দ্রের পরের সন্তানদের নাম রাখলÑবর্ণ, শব্দ, বাক্য।

হরেন্দ্রও আপত্তি করল না। সে জীবনে গায়ক হতে পারেনি, কিন্তু গানের বর্ণ-শব্দ-বাক্য তো তার চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে!

হরেন্দ্রের স্ত্রী স্থূল শরীর নিয়ে হাঁসফাঁস করে। সংসারের একটা কাজ শেষ করতে তার শঙ্খ-ঘণ্টা বাজে। বেলাপিসি হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। ভাইবউকে রান্নায় সাহায্য করে। রান্নাশেষে হরেন্দ্রের সন্তানদের খাবার দেয়। অন্যরা খেলেও শব্দের বায়নাক্কার অবধি নেই। পিসির হাতে ছাড়া খাবে না। শুধু খাওয়া হলে কথা ছিল, খাওয়াতে খাওয়াতে গল্পও বলতে হবে পিসিকে।

অগত্যা পিসি খাবারের থালা নিয়ে শব্দের সামনে বসে। কখনো রাজকন্যা-রাজপুত্রের গল্প, কখনো রাক্ষস-খোক্কসের কাহিনি বলে। সেই কাহিনির ভেতর নিজের জীবনকথাও ঢুকিয়ে দেয় পিসি।

গতদিনের গল্পের রেশ ধরে শব্দ জিজ্ঞেস করে, ‘সেই সন্ধ্যায় বুঝি তোমার বর এলো পিসি ?’

শব্দের মুখে এক গরাস ভাত ঠেলে দিয়ে বেলাপিসি বলে, ‘বুঝলি, বর এলো তো বটে, কিন্তু সময়মতন এল না।’

‘কখন এলো পিসি ?’

‘এল বেশ রাত করে।’

‘কেন, এত রাত করে এল কেন ? বরের বাড়ি বুঝি বেশ দূরে ছিল ?’

‘দূরে ছিল ঠিক, কিন্তু বরযাত্রীরা রওনা দিয়েছিল আগেভাগে।’

‘তাহলে বিয়েবাড়িতে পৌঁছাতে এত দেরি হলো যে!’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে শব্দ।

বেলাপিসি বলে, ‘আর বল না, আধেক পথে গরুর গাড়ির একটি চাকা ভেঙে পড়ল! ওটাতে করেই তো বর আসছিল আমাদের বাড়িতে!’

‘তখন বিয়েবাড়িতে অনেক লোক, তাই না পিসি ?’

‘ঠিক বলেছ তুমি। আমার মামাবাড়ির আত্মীয়স্বজন, আমার বাবার দিকের কুটুম্বরা, পাড়াপড়শিরা বিয়েবাড়িতে উপস্থিত তখন। মানুষে মানুষে একেবারে গিজগিজ।’ শব্দকে খাওয়াতে খাওয়াতে বলে যায় বেলাপিসি।

শব্দ বলে, ‘অনেক অনেক আলো তখন আমাদের বাড়িতে, না পিসি ?’

‘বাবার একমাত্র মেয়ে বেলার বিয়ে বলে কথা! আলোতে আলোতে সমস্ত বাড়ি ভরিয়ে তুলেছিল তোমার ঠাকুরদা নকুলচন্দ্র।’

‘খাবারের ব্যবস্থা কেমন করেছিল ঠাকুরদা ?’

‘তা আর বলতে! এক্কেবারে যজ্ঞির আয়োজন করেছিল বাবা!’

‘তুমি অনেক সেজেছিলে বুঝি পিসি ?’ শব্দ জিজ্ঞেস করে।

শব্দের মুখে ভাতের গরাস তুলে দিতে দিতে বেলাপিসি বলে, ‘জব্বর সেজেছিলাম রে শব্দ! গয়নাগাঁটিতে জবরজঙ অবস্থা তখন আমার!’ পিসি বলে, ‘ঝুমকো, সাতনরি, সিতাহার, টিকলি, বালা, চুড়, কঙ্কন…।’

‘রানির মতো দেখাচ্ছিল না তখন তোমাকে ?’

‘সে আর বলতে! আত্মীয়দের সামনে কী যে লজ্জা লাগছিল আমার!’

‘শেষ পর্যন্ত বরের সঙ্গে তো দেখা হলো তোমার ? প্রথম দেখাতে কী বলল বর তোমাকে ?’ শব্দ জানতে চায়।

বেলাপিসি হঠাৎ বলে, ‘বেলা যে পড়ে এল শব্দ! তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। তোমাকে খাইয়ে আমি খাব। তার পর থালাটি ধুতে যাব পুকুরে। পুকুরের জলের সঙ্গে চোখের জল মিশাব।’

শব্দ বলে, ‘কী বললে পিসি! চোখের জল!’

‘ও তুমি বুঝবে না শব্দ। খাওয়াটা শেষ কর বাবা।’ আঁচলে মুখ লুকিয়ে বলে বেলাপিসি।

বারো

এই কথাখান তোর বাপেরে গিয়া কবি।

পরে যারা হইব, তেনাদের নাম রাইখতে

কবিÑস্তবক, পৃষ্ঠা, বই, উপন্যাস,

কবিতা, ছোটগল্প।

একদিন নেপোলিয়নের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন অজিত চক্রবর্তী।

অন্যদিন ত্রস্ত হলেও সেদিন কিন্তু ভয় পেল না নেপোলিয়ন। মুখস্থ করতে দেওয়া কবিতাটি দাঁড়ি-কমাসহ শিখে এসেছে। পড়া বলতে পারলে স্যারের হাতে হেনস্থা হবে কেন সে!

কিন্তু অজিত স্যার পড়ার দিকে গেলেন না।

হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর নাম তো নেপোলিয়ন ?’

ওপাশের বেঞ্চি থেকে বলাই বলে উঠল, ‘ন্যাপলা স্যার।’

বলাইয়ের কথা কানে তুললেন না অজিত চক্রবর্তী। বললেন, ‘তোরা ভাইবোন কজন করে!’

মুখ কাঁচুমাচু করে উঠে দাঁড়াল নেপোলিয়ন। বলল, ‘আমিসহ চারজন।’

‘তা তেনাদের নাম কী কী ? খাড়া খাড়া, আমি কইতেছি।’ বলে সারা ক্লাসের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন অজিত চক্রবর্তী। তারপর বললেন, ‘আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খাঁ, হিটলার।’

নেপোলিয়ন দ্রুত নিজের ভেতরটা শক্ত করে ফেলল। নরম গলায় বলল, ‘না স্যার।’

‘তাইলে নাম কী ? যুধিষ্ঠির, ভীম, দুর্যোধন ?’

‘আমার ভাইবোনের নামÑবর্ণ, শব্দ, বাক্য।’

‘কী কইলি! শব্দ, বর্ণ, বাইক্য! আর কোনও ভাইবোন নাই তোর ?’

‘না স্যার।’

‘শোন তোরে একখান কথা কই। এই কথাখান তোর বাপেরে গিয়া কবি। পরে যারা হইব, তেনাদের নাম রাইখতে কবিÑস্তবক, পৃষ্ঠা, বই, উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প।’

ক্লাসজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। অজিত চক্রবর্তীর মনে শান্তি ফিরে আসতে শুরু করল। কিন্তু অত অল্পতে থেমে গেলে তো চলবে না! প্রতিশোধের এখনো যে অনেকটাই বাকিÑভাবলেন অজিতবাবু।

‘তা তোরে তো সবাই ন্যাপলা বলে ডাকে ? তাই না ?’ জিজ্ঞেস করলেন অজিত স্যার।

বলাই আবার বলে উঠল, ‘হ স্যার।’

অজিত চক্রবর্তী নিজ জায়গায় ফিরে এলেন। সবাই শুনতে পায়Ñসেইমতো করে গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘আইজ থেইকে তোরে আমি একখান সোন্দর নাম দিতাছি।’

বিভাস-বিনোদিনী অবাক চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকল। তাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে ওইদিনের বদলা নিচ্ছেন স্যার, নেপোলিয়নের ওপর। প্রথমে হাততালি দিয়ে উঠার প্রতিশোধ!

‘আইজ থেকে তোর নাম হইবে নেপো।’

ওপাশ থেকে গিরীন বলে, ‘নেপো! ন্যাপলাই তো ভালো ছিল স্যার।’

‘এইডা আরও ভালা রে! সংক্ষেপ। ডাইকতে সুবিধা! ন্যাপলা থেইকে নেপো।’

বিভাস আর থাকতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার আজকে একটা কবিতা মুখস্থ করে আসতে বলেছিলেন। পড়া নেবেন না স্যার!’

প্রশান্ত চোখে ব্যঙ্গ মিশিয়ে অজিত চক্রবর্তী বললেন, ‘এইডাও পড়া রে! বাংলাপড়া। শব্দ বিচার। শব্দের মাইনে জানার কেলাস আইজকে। আইচ্ছা বিভাস, তুই ক দেখি নেপো মাইনে কী ?’

বিভাস মাথা নিচু করে বলল, ‘জানি না স্যার। নেপো শব্দের অর্থ আমি জানি না।’

‘এত ভালা পোলা তুই, মেধাবান! ইস্কুলের গৌরব! তুই জানস না নেপো মাইনে কী!’

বিনোদিনী কী একটা বলতে চাইল। চট করে ডান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন অজিত চক্রবর্তী। বললেন, ‘পড়ানোর মাঝখানে কোনও কথা কইবে না তুমি। চুপ কইরে শুইনে যাবে শুধু। তোমার পালা আইলে তোমারেও জিগামু।’

অজিতবাবু ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকালেন। চোখের কোনায় তাঁর প্রতিশোধের জ্বালা চিকচিক করছে।

‘তোমরা জান কি কেউ, নেপো মাইনে কী!’ ব্যঙ্গ ঝলসে উঠল তাঁর কণ্ঠে।

সমস্ত ক্লাস চুপচাপ। যাকে নিয়ে এত কাণ্ড, সেই নেপোলিয়ন ঘেমে একশা।

‘শোন, নেপো মাইনে বিড়াল। বিলাই আর কী।’ বললেন অজিত চক্রবর্তী।

ছাত্রছাত্রীদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে একটা শব্দের মিথ্যে ব্যাখ্যা দিলেন অজিত স্যার। তিনি জানেন, নেপো মানে ধূর্ত ব্যক্তি। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য শব্দটির প্রকৃত অর্থটি ছাত্রছাত্রীদের জানালেন না তিনি। বললেন, নেপো অর্থ বিড়াল।

অজিত চক্রবর্তী ততক্ষণে প্রতিশোধের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। তিনি রাতেই ঠিক করে নিয়েছিলেন অপমানের শোধ নিতে হবে পিটিয়ে নয়, অপমানে-উপহাসে জর্জরিত করে। আগামীকালের টার্গেট নেপোলিয়ন মজুমদার। তারপর বিভাস চন্দ। এরপর ভাঙাজমিদার কইন্যা বিনোদিনী চৌধুরী। শেষের দুজনের মানসিক নির্যাতন ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইল।

তাঁর আজকের মিশন সার্থকতার চূড়ায় পৌঁছাচ্ছে। আর সামান্য একটু কাজ বাকি। ওটা সম্পন্ন হলেই মনে বড় সুখ পাবেন অজিত চক্রবর্তী।

কণ্ঠকে সুরেলা করে অজিতবাবু বললেন, ‘তোরা এই কথাখান শুনস নাই কখনও ?’ বলে একটু থামলেন তিনি। কেউ কিছু বলে কি না বুঝতে চাইলেন। সমস্ত ক্লাস নিশ্চুপ।

তিনি গলা ছেড়ে আবৃত্তির ঢঙে বললেন, ‘ঠাকুরঘরে মা ব্যস্ত, নেপোয় মারে দই। মাইনে হইলÑমা ঠাকুরঘরে পূজা দিতাছে, এই সুযোগে বিলাই রান্ধনের ঘরে ঢুইকে দই সাবাড় কইরে দিল।’

পেছন থেকে কে যেন আওয়াজ দিল, ‘মিঁয়াউ…।’

অন্যদিন হলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন অজিত চক্রবর্তী। আজ ছাত্রটিকে প্রশ্রয় দিলেন। কেননা, এটা যে তাঁর উদ্দেশ্য সাধনের বহিঃপ্রকাশ।

‘তাইলে কী বুইঝলা তোমরা ?’ জিজ্ঞেস করলেন অজিতবাবু।

চার-পাঁচজনে সুর করে বলল, ‘মিঁয়াউ…।’

ব্যঙ্গের গাঢ় হাসি সারা মুখে ছড়িয়ে গট গট করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন অজিত চক্রবর্তী।

বিভাস-বিনোদিনী বা তাদের মতো আরও অনেকে অজিত স্যারের বিদ্রƒপে নিপীড়িত হলেও নেপোলিয়ন কিন্তু শক্ত হয়ে নিজ আসনে বসে থাকল। উদাস চোখ তার। সেই উদাসী চোখের কোনায় কীসের যেন খেলা চলছে তখন। তার চোখের ভাষা কেউ বুঝতে পারল না সেদিন।

বুঝল পরদিন বাংলাক্লাসে।

আজ অজিত চক্রবর্তী প্রতিশোধ নেওয়ার মিশন শেষ করবেন। কাল ছিল ক্লাইম্যাক্স, আজ নাটকের উপসংহার টানবেন।

চেয়ারে বসে অজিতবাবু গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘এই নেপো, গতকালকের কবিতাখানা মুখস্থ ক দেখি।’

নেপোলিয়ন দাঁড়াল, কিন্তু একটি শব্দও উচ্চারণ করল না।

চট করে ডাস্টার হাতে উঠে দাঁড়ালেন অজিত স্যার। দ্রুত পায়ে নেপোলিয়নের নিকটে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রে, শিখ্যা আসস নাই কবিতাটি ?’

নেপোলিয়ন দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘না।’

‘কীÑ’ বলে ঘটাং করে ডাস্টার দিয়ে নেপোলিয়নের মাথায় একটা ঠোকা দিলেন।

ঠোকাটা তেমন করে নেপোলিয়নের মাথায় লাগেনি। কিন্তু নেপোলিয়ন একটা কাণ্ড করে বসল। ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল সে। পড়েই দাঁতকপাটি। প্রথমে একটু গোঙানি। তারপর মুখে গ্যাজলা। গোটা ক্লাসে হই চই পড়ে গেলÑকী হয়েছে, কী হয়েছে, ন্যাপলা মরে গেছে। মুখে ফেনা! কী নিষ্ঠুরভাবেই না ঠোকাটা দিলেন অজিত স্যার!

অজিত স্যার পাথর যেন! তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে এসেছে। কী করলেন তিনি! ছেলেটাকে মেরে ফেললেন নাকি! দিশেহারা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন অজিত চক্কোত্তি। থর থর করে কাঁপতে শুরু করলেন। কখন ধুতির গিঁট আলগা হয়ে গেছে, টের পাননি। তাঁর মালকোঁচা খুলে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মুহূর্তে গোটা স্কুলে জানাজানি হয়ে গেলÑঅজিত স্যার নেপোলিয়নকে মেরে ফেলেছেন।

হেডস্যার দিশে হারালেন না। ধরাধরি করে নেপোলিয়নকে শিক্ষক কমনরুমে নিয়ে আসা হলো। বড় টেবিলটিতে নেপোলিয়নকে চিত করে শুইয়ে দেওয়া হলো। তারপর চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগলেন হেডস্যার বরেন বাড়ুজ্জে।

বহুক্ষণের জলচিকিৎসায় চোখ খুলল নেপোলিয়ন। একটু দেরি করেই চোখ দুটো খুলল সে। অজিত চক্রবর্তীর অবস্থা যখন মরো মরো পর্যায়ে, তখনই চোখ খুলল ন্যাপলা।

এই ঘটনার পর ওপর-শ্রেণির ক্লাসগুলো অজিতবাবুর কাছ থেকে কেড়ে নিলেন বরেন বাড়ুজ্জে।

তেরো

একদিন শশাঙ্ক চৌধুরীর খোঁজা শেষ

হলো। তিনি যাঁকে খুঁজে ফিরেছেন

এতদিন, তাঁকে পেয়ে গেছেন।

শশাঙ্ক চৌধুরী।

পশ্চিমপাড়ায় বাড়ি তাঁর। কবিরাজ রাজকমল ঘোষের পাশের বাড়িটিই শশাঙ্ক চৌধুরীর বাড়ি। দার পরিগ্রহ করেননি তিনি। চিরকুমার। মূল জমিদারবাড়ির সঙ্গে একসময় সম্পর্ক ছিল এ বাড়ির পূর্বপুরুষের। বহু বছর গত হলো, সেই সম্পর্ক ঘুচে গেছে। চৌধুরী পদবিটা ছাড়া এবাড়ির শশাঙ্ক চৌধুরী আর কিছু বহন করেন না ওবাড়ির। সেই সূত্রে দীপেন-নৃপেন বা ক্ষিতীশ চৌধুরী শশাঙ্ক চৌধুরীর কোনও আত্মীয় নন।

সেই বাড়ির মানুষেরা ছিলেন ইংরেজ সরকারের পা-চাটা। এ বাড়ির চৌধুরীরা ইংরেজবিরোধী। শশাঙ্কের বাবা প্রথাসিদ্ধ ইংরেজবিরোধী ছিলেন।

শশাঙ্ক ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবের পক্ষে। মাস্টারদা সূর্যসেন ছিলেন শশাঙ্কের স্বপ্নপুরুষ। ছাত্রাবস্থা তখন তাঁর। উঁচু ক্লাসের ছাত্র। এই সময় বিপ্লবী সূর্যসেনের কথা শশাঙ্কের কানে আসে। তখন কলকাতায় ‘যুগান্তর’ দল গঠিত হয়ে গেছে। মাস্টারদা চট্টগ্রাম শাখার প্রধান। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়বার সময়ে সূর্যসেন বৈপ্লবিক আদর্শে দীক্ষিত হন। যুগান্তর নামের বিপ্লবী দলে নাম লেখান। চট্টগ্রামে ফিরে আসেন সূর্যসেন। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবীদল গঠন করেন। নিজের কর্মকাণ্ডকে আড়ালে রাখবার জন্য ন্যাশনাল স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেই থেকে সবার কাছে তিনি মাস্টারদা।

সেই মাস্টারদার সঙ্গে একদিন দেখা করেছিলেন শশাঙ্ক। তাঁর মনের ক্ষোভ-ক্রোধ খুলেমেলে ধরেছিলেন মাস্টারদার সামনে। মাস্টারদা এই ছেলেটির মধ্যে স্ফুলিঙ্গ দেখতে পেয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন সঙ্গে সঙ্গে রেখেছিলেন।

একদিন বলেছিলেন, ‘যা শশাঙ্ক, গ্রামে ফিরে যা।’

‘গ্রামে ফিরে যাব!’ অবাক হয়ে বলেছিলেন শশাঙ্ক।

‘তোর এখানকার ট্রেনিং শেষ। তোর এখন গ্রামে যাওয়া দরকার।’

‘আমি যে আপনার কাছে থাকতে চাই। ইংরেজদের বুকে গুলি চালাতে চাই মাস্টারদা।’

‘ইংরেজের বুকে গুলি চালানোই শেষ কথা নয় রে শশাঙ্ক! এর চেয়ে বাড়া কিছু কাজ আছে।’

‘বাড়া কাজ!’

‘হ্যাঁ, বাড়া কাজ। বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে মানুষদেরও জাগাতে হবে। বাঙালিরা এখনও ঘুমে। অগ্নিমন্ত্রে তাদের ঘুম ভাঙাতে হবে। ইংরেজদের অত্যাচার-কুশাসনের বিরুদ্ধে গ্রামের সাধারণ লোকদের সচেতন করে তুলতে হবে। আর সেটা সশস্ত্র বিপ্লবের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। তাছাড়া…।’ বলে থেমেছিলেন মাস্টারদা।

শশাঙ্ক বলেছিলেন, ‘তাছাড়া!’

মাস্টারদা উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘মুষ্টিমেয় ক’জন তরুণ দিয়ে বিশাল ইংরেজবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য চাই মুঠো মুঠো রক্তজবা, চাই তাজা প্রাণের অজস্র তরুণ। এই তরুণরা দল বেঁধে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিলে আমাদের জয় অবশ্যম্ভাবী।’ এক সময় মাস্টারদা নিজের আবেগ আর উত্তেজনার উচ্চমাত্রার ব্যাপারটা অনুভব করলেন।

কণ্ঠ নরম করে শশাঙ্কের উদ্দেশে বললেন, ‘তুই গ্রামে গিয়ে তোর গ্রামের তরুণদের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত কর। গ্রামের মানুষদের স্বাধীনতার মাহাত্ম্যটুকু বুঝা। তাতেই বিপ্লবের অর্ধেকটা সম্পন্ন হবে।’

শশাঙ্ক বিস্ফারিত চোখে মাস্টারদার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

মাস্টারদা বললেন, ‘সাথে সাথে সামাজিক কাজও করবি।’

‘সামাজিক কাজ!’

‘হ্যাঁ, সমাজ-উন্নয়নের কাজ। গরিব ছেলেমেয়েদের পড়ানোর ব্যবস্থা নিবি। ভাঙা রাস্তা মেরামত করবি। দলবেঁধে নতুন রাস্তা তৈরি করবি। ও হ্যাঁ, তোদের দিকে কি বাউড়ি-বাগদি-মুচিÑএরা আছে ?’

‘এরা নাই। তবে কৈবর্তপাড়া, ধোপাপাড়া, নাপিতপাড়া আছে।’

‘তুই এইসব পাড়ায় গিয়ে লেখাপড়া করবার জন্য উৎসাহ দিবি। নিজেদের বাড়ির চারপাশটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কথা বলবি। দেখবি তাতেই মানুষেরা তোর দিকে আকৃষ্ট হবে।’

মাস্টারদার পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলেন শশাঙ্ক চৌধুরী।

শশাঙ্কের মাথায় হাত রেখে মাস্টারদা বলেছিলেন, ‘তুইও একজন সূর্যসন্তান রে শশাঙ্ক! সূর্যের আগুনে ইংরেজদের একেবারে ছারখার করে দিতে হবে।’

বিনোদপুরে ফিরে এসেছিলেন শশাঙ্ক। মাস্টারদার কথামতো কাজও শুরু করেছিলেন।

ঠিক সেই সময়েই মারাত্মক ঘটনাটা ঘটে গিয়েছিল।

১৯৩৩ সালের সেই দিনটি এলো। ১৬ ফেব্রুয়ারি। দিনটি ছিল বিবর্ণ, মেঘে ঢাকা। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রামের পাহাড়তলির ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণ চালান। গুলিবিদ্ধ হয়ে ধরা পড়ার আগে সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন প্রীতিলতা।

এই ঘটনার পর মাস্টারদা পটিয়ার পার্শ্ববর্তী গৈরালা গ্রামে আত্মগোপন করেন। কিন্তু গ্রামবাসীদের একজন মাস্টারদার গোপন বাসস্থানের সন্ধান পুলিশকে জানিয়ে দেয়। ১৯৩৩-এর ১৬ ফেব্রুয়ারি একদল গোর্খা সৈন্যের হাতে ধরা পড়েন সূর্যসেন। পরে ১৯৩৪-এর ১৪ আগস্ট মাস্টারদাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

মাস্টারদার সঙ্গী-সাথীরা যে যেখানে ছিলেন, অ্যারেস্ট হলেন। কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে গেলেন।

সূর্যসেনের এই বিপ্লব একেবারে ব্যর্থ হয়ে যায়নি। চট্টগ্রাম কয়েকদিন স্বাধীন ছিল। সেই বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, ইংরেজরা ভারত থেকে কুইট করতে তখনও বারো-তেরো বছর বাকি। সেই হার্মাদীয় সময়ে চট্টগ্রামের জনগণ অন্তত কয়েকদিনের জন্য হলেও স্বাধীনতার পবিত্র বাতাস নিজেদের ফুসফুসে টেনে নিতে পেরেছিলেন।

মাস্টারদা তিরোহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অগ্নিমন্ত্র স্তব্ধ হয়ে যায়নি। পুলিশের চোখ এড়িয়ে তাঁর অনুসারীদের যাঁরা বেঁচে ছিলেন, তাঁরা তাঁদের পাঁজরের তলায় মাস্টারদার সেই বীজমন্ত্রটি সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সেই বীজমন্ত্রের প্রভাবেই হয়তো নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের আবির্ভাব ঘটেছিল।

১৯৩৩ সালের সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর শশাঙ্ক চৌধুরীও আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। বিনোদপুরের মানুষ তাঁকে পুনরায় দেখতে পেলেন বারো বছর পরে। তখন ভারতবর্ষে স্বাধীনতাকামী মানুষদের রক্ত-উদ্্যাপন চলছে। এর কিছুদিন পরে ভারতবর্ষ ভাগ হলো। স্বাধীন হলো। ভারত আর পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবার দুটো অংশ পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান। দলে দলে হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে গেল। বিনোদপুর থেকেও অনেক হিন্দু দেশত্যাগী হলো।

অন্যরা গেলেও শশাঙ্ক চৌধুরী গেলেন না। এই দেশে, এই বিনোদপুরে থেকে গেলেন শশাঙ্ক চৌধুরী। তাঁর জন্মস্থান বিনোদপুরের হিন্দুপাড়াটি ছেড়ে, এ পাড়ার গাছগাছড়া-পুকুর-দিঘি ছেড়ে, এ গাঁয়ের চেনা পথঘাট ছেড়ে, এ পাড়ার ভাঙাচোরা চেহারার বর্ণহীন অভাবী নিরাপত্তাহীনতায় অস্থির মানুষকে ত্যাগ করে কোথায় যাবেন তিনি ? কেনই-বা যাবেন ?

বিনোদপুরের মাটি আঁকড়ে থেকে গেলেন তিনি।

শশাঙ্ক চৌধুরীর তখন অন্যরকম চেহারা। শুভ্র লম্বা চুল। ব্যাকব্রাশ করা। বুকসমান দাড়ি। সৌম্য মায়াময় চোখ দুটো ঘিরে পুরু লেন্সের চশমা। গায়ে ফতুয়া। নিম্নাঙ্গে ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরা। পায়ে সস্তা চপ্পল।

গত বারো বছর তিনি কোথায় ছিলেন, কেউ জানে না। তিনিও নিজ থেকে কাউকে কিছু বলেননি। কিন্তু এই বারো বছরে তিনি ভিন্ন একজন মানুষে রূপান্তরিত হয়ে গেছেন। তাঁর কথায় এখন মাস্টারদার সেই অগ্নিঝরানো তেজ নেই, তাঁর মনে চারপাশের সবকিছুকে জ্বালিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায় নেই। তাঁর মনের হিংস্রতা দূর হয়ে গেছে। তাঁর ভেতরের ক্ষোভ-ক্ষুব্ধতা কোথায় তিরোহিত হয়ে গেছে!

শশাঙ্ক চৌধুরী এখন একজন নরম মনের মানুষ। তাঁর মনের সৌম্য পবিত্র ভাব এখন তাঁর চোখেমুখে দৃশ্যমান। পথ দিয়ে যখন হাঁটেন তিনি, মাথা নিচু করে হাঁটেন। হাঁটতে হাঁটতে তীক্ষè দৃষ্টিতে কী যেন খুঁজে ফেরেন!

কী খোঁজেন তিনি ? কেউ জানে না। সবাই শুধু এইটুকু বোঝেÑএক সময়ের তাজা তরুণটি আজ আর নাই। আজকে চোখের সামনে তারা যে বয়স্ক শশাঙ্ক চৌধুরীকে দেখছে, তিনি অন্য জগতের একজন মানুষ। কী অদ্ভুত এক জ্যোতি তাঁর চারদিকে! মানুষের মধ্যে তিনি অন্য এক মানুষের সন্ধান করে ফিরছেন।

একদিন শশাঙ্ক চৌধুরীর খোঁজা শেষ হলো। তিনি যাঁকে খুঁজে ফিরেছেন এতদিন, তাঁকে পেয়ে গেছেন। তিনি আর কেউ নন, স্বামী স্বরূপানন্দজী।

চৌদ্দ

গুণ তো কখনও চাপা

থাকে না হরেন্দ্র।

তাই বলে শশাঙ্ক চৌধুরী আধ্যাত্মিকতায় মগ্ন হয়ে পড়েননি। জাগতিকতাকে ভোলেননি কখনও তিনি।

পাড়ার মানুষের সংকটে-হাহাকারে, বেদনায়-অভাবে পরমাত্মীয়ের মতো পাশে এসে দাঁড়ান তিনি। বিপদগ্রস্ত মানুষেরা তাঁকে পাশে পেয়ে মনে জোর পায়। পরামর্শ বা অর্থÑযার যা প্রয়োজনÑদিয়ে তাকে বিপদমুক্ত করেন শশাঙ্ক চৌধুরী।

শশাঙ্ক চৌধুরীর সামর্থ্যরে অভাব নেই। বাবা ছেলেদের জন্য বেশ কিছু সহায়-সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন। গ্রামজুড়ে কানি-কানি জমি। শশাঙ্ক চৌধুরীর আত্মগোপনের সময় ভাই দেবাঙ্ক চৌধুরী এসব রক্ষা করে গেছে। আজ ভাইটি নেই। কিন্তু তার ছেলেসন্তানরা আছে। শশাঙ্ক চৌধুরী ফিরে আসার পর ভাইপোরা অবহেলা দেখায়নি। তারা বাড়ির একটা অংশ জেঠাকে ছেড়ে দিয়েছে।

তিনি ভাইপোদের ডেকে বলেছেন, ‘দেখ বাবারা, জমি-জমার ওপর আমার কোনও লোভ নেই। তোমরা জান, তোমরা ছাড়া আমার অন্য কোনও উত্তরাধিকারীও নেই। আমার অংশের মালিক আমার অবর্তমানে তোমরাই হবে। তবে তোমাদের কাছে আমার একটা জিনিস চাওয়ার আছে।’

ভাইপোরা সমস্বরে বলেছে, ‘কী করতে হবে জেঠা আমাদের বলুন।’

‘আমি যতদিন বাঁচি, আমার যাতে খাওয়া-পরার অভাব না হয়।’

‘কখনও হবে না জেঠা।’

‘আমার কখনও দানধ্যান করবার ইচ্ছে জাগলে বাধা দিতে পারবে না তোমরা।’

‘আপনার সম্পত্তি বা অর্থ আপনি দান করবেন, তাতে আমরা বাধা দেব কেন জেঠা!’

‘আর আমি আলাদা খাব। তেল-ঝোলের খাবার এখন আমার সয় না বাবারা। তোমরা আমার জন্য একজন পাচকের ব্যবস্থা কর।’

‘তাই হবে জেঠা।’ বড় ভাইপো প্রভাত বলল।

‘দেবহাটায় আমাদের বিধবা এক মাসি আছে জেঠা। কষ্টে আছে মাসিটি। আপনি যদি তাকে আশ্রয় দেন, তাহলে মাসি বেঁচে যায়। মাসি আপনার রান্না করা থেকে ঘরকন্নার সকল কাজ করবে।’ ছোট ভাইপো নীরঞ্জন বলল।

শশাঙ্ক চৌধুরী বললেন, ‘তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই।’

একটু থেমে আবার বললেন, ‘আর হ্যাঁ ভাইপোরা, আমার মৃত্যুর পর আমার সকল সম্পত্তি তোমাদের। মরার আগে তোমাদের লিখে দিয়ে যাব আমি।’

জেঠার কথা শুনে ভাইপোদের মন তৃপ্তিতে ভরে গেল।

শশাঙ্ক চৌধুরীও কম আনন্দিত হলেন না। তিনি যেন আজ ভারমুক্ত হলেন। জগদ্দল একটা পাথর তার বুক থেকে নেমে গেল যেন! দীর্ঘ জীবনে সামান্য জায়গাজমি, কিছু টাকার জন্য ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দেখে আসছেন তিনি। স্বার্থান্ধ সহোদররা সহোদরত্ব ভুলে যায় তখন। তিনি তো সহোদর নন, নীরঞ্জনদের জেঠা। একদিন না একদিন তাদের সঙ্গেও তার মনোমালিন্য হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আজকে সেই সম্ভাবনার মূল উৎপাটিত করে ফেললেন তিনি। ভাইপোদের জানিয়ে দিলেন, তিনি কখনও ওদের স্বার্থহানী ঘটাবেন না। উপরন্তু তাঁর সকল সহায়-সম্পত্তি তাদেরকে এক প্রকার বিলিয়েই দিলেন। তাতে তার প্রশান্তির অবধি থাকল না। নিজের মধ্যে অপার উৎফুল্লতা অনুভব করলেন শশাঙ্ক চৌধুরী।

একদিন তিনি হরেন্দ্রকে ডেকে বললেন, ‘হরেন্দ্র, তুমি ভালো মৃদঙ্গ বাজাও শুনেছি।’

হরেন্দ্র বলল, ‘একটু-আধটু পারি কাকা।’

শশাঙ্ক চৌধুরী বললেন, ‘কিন্তু আমি শুনলাম, তুমি বেশ মৃদঙ্গ বাজাও!’

হরেন্দ্র কিছু না বলে মাথা নিচু করল। গ্রামের অন্যদের মতো সে-ও শশাঙ্ক চৌধুরীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে। তার শ্রদ্ধাটা অন্যদের তুলনায় গভীরতর। হিন্দুপাড়ার অন্যরা কী বোঝে কে জানে, হরেন্দ্র বোঝেÑইনি এক অন্য ধরনের মানুষ। প্রায় দুশো বছরের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন এই মানুষটি। এ অঞ্চলের মানুষেরা যখন ইংরেজ শাসনকে নিয়তি মেনে দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে না-খেয়ে দিনাতিপাত করছিল, তাদের মধ্য থেকে হঠাৎ এক কিশোর স্বাধীনতার জয়ধ্বনি মুখে তুলে নিলেন। স্বাচ্ছন্দ্যের, সচ্ছলতার জীবন ত্যাগ করে, সুখময় ভবিষ্যতের কথা না ভেবে মৃত্যুর অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিতে দ্বিধা করলেন না। তাঁর বয়সী পাড়ার অন্য কিশোর বা তরুণরা যখন নিজেদের জীবন দিয়ে ব্যস্ত, তখন এই শশাঙ্ক চৌধুরী অগ্নিপুরুষ সূর্যসেনের সঙ্গে গিয়ে মিশলেন। তারপর তো বিবর্ণ, বন্ধুর, এলোমেলো জীবন! মাস্টারদার ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পরও বিদেশে গেলেন না তিনি। হ্যাঁ, রক্তরঞ্জিত পথ থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নিলেন ঠিক, কিন্তু অমৃত জীবনের পথ থেকে তিনি সরে গেলেন না। পাড়ার সাধারণ দরিদ্র মানুষদের তিনি আঁকড়ে ধরলেন। তাদের জীবনোন্নয়ন ঘটাতে হবে। বিয়েও করলেন না তিনি। হয়তো ভেবেছিলেন − সশস্ত্র বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়েছেন, কখন মারা যান, ঠিক নেই। এরকম অবস্থায় একটা মেয়েকে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে মেয়েটির জীবনটাকে অনিশ্চয়তায় ভরিয়ে তুলবেন কেন ? হরেন্দ্র এরকম করে ভাবে আর শশাঙ্ক কাকা সম্পর্কে তার বুকের নিচে একদলা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জমতে থাকে। শ্রদ্ধাবান এই মানুষটি যখন তার বাদনের কথা জিজ্ঞেস করেন, প্রশংসা করেন তার, তখন মাথা নিচু করে থাকা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না হরেন্দ্রের।

শশাঙ্ক কাকার কথা হরেন্দ্রের কানে আসে, ‘তা শুনলাম, তুমি নাকি সুকুমারের কীর্তনের আসরটা বেশ জমিয়ে তোল। আমি তো তোমার বাজনা কখনও শুনিনি, লোকের মুখে তোমার গুণপনার কথা শুনেছি। গুণ তো কখনও চাপা থাকে না হরেন্দ্র।’

হরেন্দ্র এবার নরম গলায় বলে, ‘খুব যে ভালো বাজাই, তা নয় কাকা, শ্রোতারা আমাকে ভালোবাসে বলে এরকম করে বলে। সুকুমারদা প্রাণ খুলে গায়, তখন আমি তার সঙ্গে সঙ্গত করি আর কী!’

শশাঙ্ক চৌধুরী বলেন, ‘আচ্ছা হরেন্দ্র, আমি আমার বাড়িতে একটা গানের আসর বসাতে চাই, তুমি কি সেই আসরে বাজাবে ?’

‘গানের আসর! আপনার বাড়িতে!’ কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে হরেন্দ্র। লোহার মতো শক্ত আর পাথরের মতো জমাট এই মানুষটি আবার গানও পছন্দ করেন নাকি ?

‘হ্যাঁ গানের আসর, তবে তা অন্যরকম গান। গানের মাঝখানে একটু প্রার্থনা থাকবে।

‘কোন প্রার্থনা, কার প্রার্থনা!’ জিজ্ঞেস না করে পারে না হরেন্দ্র।

সারা মুখে স্নিগ্ধ আভা ছড়িয়ে শশাঙ্ক চৌধুরী বলেন, ‘ঈশ্বরের প্রার্থনা। সেই প্রার্থনায় কোনও আড়ম্বর নেই, কোনও লম্ফঝম্ফ নেই। মনকে শান্ত করে শুধু স্রষ্টাকে ডেকে যাওয়া।’

‘তার জন্য তো মন্দির আছে কাকা!’

‘মন্দির আছে ঠিকই। তবে এই প্রার্থনা মন্দিরে বসে করতে হবে, এমন কোনও ধরাবাঁধা নেই। ঘরে ঘরে এরকম প্রার্থনা করা যায়।’

‘ভালো করে বুঝছি না কাকা।’ বলে হরেন্দ্র।

‘আমি একজন মহামানবের সন্ধান পেয়েছি। তাঁর নাম স্বরূপানন্দজী। মানুষের কল্যাণের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি। তাঁর বাণীসমূহের মূলকথা মানুষে মানুষে কোনও ভেদাভেদ নেই। সপ্তাহে দুদিন আমার আঙিনায় বসে অই মহান মানুষটির বাণীসমূহ পাঠ করব, সঙ্গে থাকবে প্রার্থনামূলক কিছু গান। সেই গানে তুমি বাজাবে হরেন্দ্র। কী, বাজাবে তো হরেন্দ্র ? আমি পাড়ার আরও কিছু মানুষকে ডেকেছি। তুমিও আগামী পরশু এস হরেন্দ্র, আমার বাড়িতে। মানুষের মঙ্গলের জন্য এই প্রার্থনাসভা।’ ধীর কণ্ঠে বলে গেলেন শশাঙ্ক চৌধুরী।

হরেন্দ্রের ভেতরে কিছু একটা পরিবর্তন হয়ে গেল যেন! উচ্ছ্বাসভরা গলায় বলল, ‘আমি আসব কাকা।’

পনেরো

আপনার শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয়।

খড়খড়ে গলায় বলে ফেলল প্রভাতি।

বিভাসরা এখন ক্লাস ফাইভে।

ক্লাসের অনেকে ঝরে পড়েছে। কেউ কেউ পিছিয়ে গেছে। ফোর পাস করতে পারেনি। নেপোলিয়নকে ফোরেই থেকে যেতে হয়েছে। বার্ষিক পরীক্ষায় তিন সাবজেক্টে গাড্ডা মেরেছে সে। হরেন্দ্রের এক কথা − সব সাবজেক্ট পাস করেই ফাইভে উঠতে হবে নেপোলিয়নকে। অচিন্ত্য, নিখিল, দুলাল পড়া থামিয়ে দিয়েছে। এখন তাদের কেউ বাবার সঙ্গে ক্ষেতে যায়, কেউ-বা বাবার মুদির দোকানে গিয়ে বসে।

মেয়েদের অবস্থা আরও খারাপ। একঝাঁক মেয়ে ওয়ানে এসে ভর্তি হয়েছিল। ফাইভ পর্যন্ত মাত্র তিনজন টিকে আছেÑবিনোদিনী, শেফালি আর প্রভাতি।

বিনোদিনী প্রাইমারি স্কুলে মুসলমান ছাত্রছাত্রী নেই বললেই চলে। মাইলখানেক পূর্বে তালুকদার প্রাইমারি স্কুল। স্কুলটি মুসলমানপাড়ার মাঝখানে। ওই স্কুলের অধিকাংশ পড়ুয়া মুসলমান। শিক্ষকদের অধিকাংশই মুসলমান। তাই বলে বিনোদিনী স্কুলে মুসলমান ছেলে বা তালুকদার স্কুলে হিন্দু ছেলে পড়ে না, এমন নয়। ঠেকায় পড়ে কেউ কেউ বিদ্যালয় পরিবর্তন করে। যেমন বিনোদিনী স্কুলের দামোদর ক্লাস ফোরে তালুকদার স্কুলে চলে যায়। ওই সময় দামোদরদের এক আত্মীয় বিনোদিনী স্কুলে প্রধান শিক্ষক হয়ে এলেন। পারিবারিক দ্বন্দ্ব ছিল। সুযোগ পেয়ে দামোদরকে অপমান করে বসলেন সেই হেডস্যার। দামোদরের বাবাও কম যাবেন কেন ? এক ঝটকায় বিনোদিনী স্কুল থেকে ছাড়িয়ে তালুকদার স্কুলে নিয়ে গেলেন দামোদরকে। এরকম দু’চারটি পারিবারিক বা পাস-ফেল সংক্রান্ত ঘটনায় জড়িয়ে কেউ কেউ স্কুল ছাড়ে বটে, কিন্তু অলিখিত প্রথা ওটা যে বিনোদিনীতে হিন্দু, তালুকদারে মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে। শিক্ষকদের বেলাতেও অনেকটা ওই নিয়ম। এখানে হিন্দু টিচার তো, ওখানে মুসলমান শিক্ষক। তবে এর যে ব্যতিক্রম হয় না, এমন নয়। উদাহরণ বদিউর রহমান। বিনোদিনীরা যখন ফাইভে, তখন বদিউর রহমান বিনোদিনী প্রাইমারি স্কুলে যোগদান করলেন। বদি কালাকোলা, চৌকষ, ধুরন্ধর। হেডস্যারকে অনুরোধ করে ফাইভের অঙ্ক সাবজেক্টটা চেয়ে নিলেন বদিউর।

বদিউর রহমান যে অঙ্কে দক্ষ, তেমন নয়। অন্তত নটবর মজুমদারের মতন নন। বদিউরের ওপরচালাকিতে বিভ্রান্ত হয়ে হেডস্যার তাঁকে ফাইভে অঙ্কটিচার করেছেন।

ক্লাসে ঢুকে ব্ল্যাকবোর্ডে নজর না দিয়ে ছাত্রীদের দিকে তাকান বদি। প্রথমে ক্লাসজুড়ে এক চক্কোর ঘুরে আসেন। তারপর পাশাপাশি বসা বিনোদিনী-শেফালি-প্রভাতির কাছ ঘেঁষে দাঁড়ান তিনি। কিছু না বলে পলকহীন চোখে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাঁর চোখে তখন কিছু একটা খেলা করে। সেই খেলাটা বুঝতে পারে না ছাত্ররা। কিন্তু ছাত্রীরা বুঝতে পারে। এ ব্যাপারে তাদের প্রকৃতিদত্ত জ্ঞান টনটনে। তিনজনেই যে সমান বুঝতে পারে, এমন নয়। প্রভাতি একটু বেশি বুঝতে পারে। বেঞ্চের মাথাতেই বসে প্রভাতি। বদি তার কাছটায় বেশি ঘেঁষে দাঁড়ান।

একদিন প্রভাতি স্পষ্ট গলায় বলে বসে, ‘আপনি সরে দাঁড়ান স্যার।’

বদি যেন তৈরি হয়েই এসেছিলেন। বললেন, ‘কেন, কাছে দাঁড়ালে সমস্যা কী তোমার ?’

প্রভাতি বলে, ‘সমস্যা আছে স্যার।’

‘কী সমস্যা! একজন টিচার ক্লাসের অভিভাবক। তিনি ক্লাসের যেখানে ইচ্ছা দাঁড়াতে পারেন।’

প্রভাতি এবার হিসহিস কণ্ঠে বলে, ‘না, একজন টিচার যেখানে সেখানে দাঁড়াতে পারেন না। যেভাবে সেভাবে দাঁড়াতে পারেন না। আর আপনি তো পারেনই না।’

‘কেন, কেন আমি দাঁড়াতে পারি না ?’

‘আপনার শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয়।’ খড়খড়ে গলায় বলে ফেলল প্রভাতি।

তার কথা শুনে গোটা ক্লাস হেসে উঠল। কারও কারও হাসি মাত্রা ছাড়িয়ে গেল।

প্রভাতির এ ধরনের কথার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না বদিউর রহমান। ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে ফ্যাল ফ্যাল চোখে প্রভাতির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। নিজের অজান্তে ডান হাতটা শুঁকলেন। তবে তিনি জ্বলে উঠলেন না। অজিত চক্রবর্তীর মতো হইচইও করলেন না। নীরবে আলতো পায়ে ব্ল্যাকবোর্ডের নিকটে সরে এলেন। নির্বিকার ভঙ্গিতে বোর্ডে অঙ্ক করাতে শুরু করলেন।

প্রভাতি ডাক্তার পূর্ণেন্দু সেনের মেয়ে। পূর্ণেন্দু এমবিবিএস নন, এলএমএফ। বিনোদপুরে তাঁর বাড়া ডাক্তার নেই। কবিরাজিতে যেমন রাজকমল ঘোষ ধন্বন্তরি, অ্যালোপ্যাথিকে পূর্ণেন্দু সেন শুক্রাচার্য।

রাস্তার ধারেই ডাক্তারবাবুর বাড়িটি। দ্বিতল। মাটির। সেই সময় এই এলাকায় ইটের বাড়ি খুব কমই ছিল। জমিদারবাড়ি বাদ দিয়ে যা ছিল, তা সব মাটির। মধ্যবিত্তদের টিনে-ছাওয়া একতলা মাটির ঘর। ধনীদের দোতলা। পূর্ণেন্দু সেন এ গাঁয়ের ধনীদের একজন। ডাক্তারবাবু অত্যন্ত রুচিবান মানুষ। বাড়ির সামনে বেশ কিছু জায়গা নিয়ে ফুলের বাগান। সেখানে নানা ফুলের গাছ। মালি নিয়মিত বাগানের পরিচর্যা করে। বিকেলের দিকে বাগানে হাঁটেন ডাক্তারবাবু। অত্যন্ত ফরসা চেহারা তাঁর। দীর্ঘদেহী। পাতলা চুল। সুপুরুষ যাকে বলে, সেরকমই তিনি। তাঁর স্ত্রীকে সাধারণের কেউ কখনও দেখেনি। তবে ছেলেমেয়ে দেখে লোকেরা অনুমান করে, পূর্ণেন্দু ডাক্তারের স্ত্রী অত্যন্ত রূপসী। তাদের অনুমান মিথ্যে নয়। প্রভাতি তার উদাহরণ। প্রভাতি রূপময়ী। বারো বছর বয়সে প্রভাতির দেহলাবণ্য প্রমাণ দিচ্ছে―ভবিষ্যতে সে এক অপরূপ সুন্দরীতে রূপান্তরিত হবে।

বদিউর প্রভাতির রূপলাবণ্যে মজেছেন। তাই তিনি ক্লাসে ঢুকে চক্কর শেষ করে প্রভাতির কাছ ঘেঁষে দাঁড়ান। কিন্তু প্রভাতি যে কী, আন্দাজ করতে পারেননি বদিউর রহমান। তাই শিক্ষকের আদর্শ ভুলে প্রভাতির প্রতি দুর্যোধনের আচরণ শুরু করেছেন। প্রভাতির মধ্যে যে সাপিনীর ছোবল আছে, জানতেন না বদিউর।

বনেদি পরিবারের মেয়ে প্রভাতি। মা-বাবা-ভাই-বোনের মধ্যে প্রীতিময় সম্পর্ক। প্রভাতি আর অরুন্ধতী দুই বোন। একটু মাথাতোলা হলে ডাক্তারগিন্নি কন্যাদের বাস্তবজীবনের অন্ধকার জগৎ সম্পর্কে সজাগ করেছেন। কথাচ্ছলে পুরুষদের লালসার কথা বলতেও দ্বিধা করেননি তিনি। প্রভাতির এই যে বিস্ফোরণ, তা মায়ের শিক্ষারই ফলশ্রুতি।

ধাক্কা খেয়ে বদিউর রহমান পাল্টাননি। কথায় বলে নাÑকুকুরের লেজ শত বছর ধরে চোঙায় পুরে রাখলেও সোজা হয় না, চোঙা থেকে বের করলে যেই-কে-সেই! বদিউরও ঠিক সেরকম। প্রভাতি দ্বারা অপমানিত হয়ে বিনোদিনীর দিকে চোখ ফেরালেন বদিউর।

কিন্তু বিনোদিনীর খুব কাছে যেতে পারেন না বদিউর। সে বসে বেঞ্চির মাঝামাঝি। তার বাঁ পাশে প্রভাতিরা, ডানপাশে বিভাস। বদি আর বিনোদিনীর মাঝখানে একটা আড়াল থেকেই যায়।

একদিন সাজানো ক্রোধ চোখেমুখে ঢেলে বদিউর রহমান বলেন, ‘এই ছোকরা, ছেলে হয়ে তুই মেয়েদের পাশে বসেছিস কেন ?’

বিভাস অনেকটা স্বগত কণ্ঠে বলে, ‘ছোকরা বলে।’

বদিউর বিভাসের সবকথা ঠিকঠাক মতো শুনতে পেলেন না। তবে কিছুটা আন্দাজ করলেন। উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, ‘কী বললি তুই!’

উঠে দাঁড়াল বিভাস। স্পষ্ট গলায় বলল, ‘অনেকদিন ধরে এইভাবে বসে আসছি স্যার। কোনও স্যার কোনওদিন আপত্তি করেননি। একজন করেছিলেন স্যার। ঘষা খেয়েছিলেন।’

শেফালি বলে উঠল, ‘যে স্যার আপত্তি করেছিলেন, তাঁর লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছিল স্যার।’

বিনোদিনী বলল, ‘স্যার, আপনি আমাদের অঙ্ক করাতে এসেছেন। কিন্তু ক্লাসের আমরা সবাই দেখছি, অঙ্ক করানোর দিকে আপনার মন নেই।’

পেছন থেকে বলাই বলে উঠল, ‘মন অন্য কিছুতে।’

অরুণ বিকৃত গলায় বলল, ‘অঙ্ক করান স্যার। আমাদের বার্ষিক পরীক্ষার আর বেশি দেরি নাই।’

ছেলেমেয়েদের কাণ্ডকারখানা দেখে এবং চোখা চোখা কথা শুনে বদিউর রহমান একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়লেন। ঘামতে শুরু করলেন তিনি। শার্টের নিচের গেঞ্জিটা ভিজে চপচপ, টের পেলেন বদিউর রহমান। হঠাৎ তাঁর খুব তৃষ্ণা পেল। তলপেটে প্রবল চাপ অনুভব করলেন তিনি। তাঁর হিসি পেয়েছে। এখনই বুঝি প্যান্ট ভিজাবেন তিনি। দ্রুত পায়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন বদিউর রহমান।

ক্লাসভর্তি ছাত্রছাত্রীদের প্রচণ্ড ঘৃণা তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল।

ষোলো

যত বেশি দলাইমলাই, জামাকাপড়

তত বেশি পরিষ্কার। বাজারে

পীতাম্বর ধোপার নাম আছে যে!

বিনোদিনী বিভাসের জন্য কতকিছু যে নিয়ে আসে!

ডাঁসা পেয়ারাটা বিভাসের হাতে গুঁজে দিয়ে বলে, ‘খাও। আমাদের গাছের।’

‘তোমাদের গাছের!’

বিনোদিনী বলে, ‘কেন বিশ্বাস হচ্ছে না ? আমাদের বাড়িতে পেয়ারা গাছ নাই বলে মনে হচ্ছে তোমার!’

‘না, বলছিলাম কী!’ বিভাস কিছু একটা বলতে চাইল।

বিনোদিনী বলল, ‘শুধু পেয়ারা গাছ নয়, আরও কত ফলের গাছ যে আছে!’

বিভাস কিছু না বলে বিনোদিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

বিনোদিনী বলে যায়, ‘আম গাছ, জাম গাছ, আতা গাছ, কাঁঠাল গাছ, নারকেল গাছ, বরই গাছ।’

‘বরই গাছও আছে বুঝি!’ বলে ওঠে বিভাস।

বিনোদিনী বলে, ‘আছে না! দুইটা বরই গাছ। বরইয়ের দিনে আমি আর আমার দিদি বরই গাছেই তো থাকি।’

‘বরই গাছে থাক! কী যে বল না বিনু!’ বিভাস ইদানীং বিনোদিনীকে বিনু বলে ডাকে।

বিনু বলে, ‘বিশ্বাস হয় না বুঝি তোমার ?’ বলে বিভাসের আরও একটু পাশ ঘেঁষে বসে বিনু। তারপর বলে, ‘ছুটির দিনে আমি আর নন্দিনী…।’

কথার মাঝখানে বিভাস বলে উঠে, ‘নন্দিনী!’

‘ও হো, তোমাকে তো কোনওদিন আমার দিদির নাম বলিনি। নন্দিনী আমার দিদি।’

বিভাস জিজ্ঞেস করে, ‘ছুটির দিনে তুমি আর তোমার দিদি কী কর ?’

‘কাগজ মুড়িয়ে লবণ আর গুড়া মরিচ নিই। তারপর তরতর করে বরই গাছের আগায়।’

‘কাঁটা লাগে না গায়ে ?’

‘লাগে তো! পাত্তা দিই না। দুই বোনে গাছের ডালে বসে বসে যত ইচ্ছা বরই খাই। খেতে খেতে পেট যখন ডোল হয়ে যায়, গলা দিয়ে ঢেঁকুর ওঠে, তখন গাছ থেকে নেমে আসি।’

‘তোমার বাবা কিছু বলেন না ?’

‘ওরে বাবা! বাবা যতক্ষণ ঘরে থাকে, আমরা দুজন তো লক্ষ্মী মেয়ে! বাবা বেরিয়ে গেলে দুষ্টের শিরোমণি। বাবা প্রতি সকালে জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে যায়। তখন তখনই আমরা বাঁদরামি শুরু করি।’

‘আর তোমাদের মা ?’ মৃদু গলায় বিভাস জিজ্ঞেস করে।

‘আমার মাকে তুমি না দেখলে বিশ্বাস করবে না। আমার মায়ের মতো ভালো মা আর কারও নেই রে বিভাস!’ অহংকারের কণ্ঠে বলে বিনু।

ফ্যাল ফ্যাল করে বিনুর দিকে তাকিয়ে থাকে বিভাস। হঠাৎ নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যায় বিভাসের। বড় খিটখিটে মেজাজ মায়ের। আজান-ভোরে ঘুম থেকে উঠে যায় তার মা। উঠে যায় মানে উঠে যেতে হয়। বোঝা-বোঝা কাপড়চোপড় তখন দাওয়ায়। ওগুলো যে ধুতে হবে! গামলাতে দলাইমলাই করে দিলে তার বাবা পুকুর ঘাটে নিয়ে যায় কাপড়গুলো। ভালো করে ধুয়ে দড়িতে টাঙিয়ে দেয়। শুকানোর পর দোকানে নিয়ে যায় বাবা। তারপর ইস্তিরি করে। সন্ধের দিকে কাস্টমাররা নিজের নিজের কাপড়জামা নিতে আসে।

মায়ের আগেই বাবা পীতাম্বর বিছানা ছাড়ে। গামলাতে বালতি বালতি পানি ঢালে। তারপর ওই পানিতে সাবান নেড়ে নেড়ে ফেনা করে। এর মধ্যে মা চুলায় বড় ডেকচিতে জল বসায়। ডেকচির জল গরম হয়ে উঠলে গামলার ঠাণ্ডা জলে ঢেলে দেয়। তারপর বারান্দায় ডাঁই-করা জামা-প্যান্ট-শাড়ি- পাঞ্জাবি-পাজামা গামলার জলে চুবায়। এরপর মা গামলার মধ্যে নেমে পা দিয়ে জামাকাপড় মাড়াতে থাকে। বহুক্ষণ ধরে একাজ করে যেতে হয় মাকে। যত বেশি দলাইমলাই, জামাকাপড় ততবেশি পরিষ্কার। বাজারে পীতাম্বর ধোপার নাম আছে যে!

এরপর চার-পাঁচজন ভাইবোনের খিঁচাখিঁচি। বাপ তো কাপড় নিয়ে পুকুর ঘাটে চলে যায়। মাকেই ছেলেমেয়েদের খিঁচড়ামি সহ্য করে যেতে হয়। শুধু তো তাই না, ওদের সকালের খাবার, বইখাতার গোছগাছ, স্নানের জন্য তাগাদা, রান্নাবান্নাÑএসব করতে করতে মায়ের কালঘাম ছুটে যায়। এক ফাঁকে দৌড়ে গিয়ে দড়িতে শুকাতে দেওয়া আধভেজা কাপড়গুলো উল্টে-পাল্টে দিয়ে আসতে হয় মাকে। না হলে দিনশেষে যে ওগুলো শুকাবে না! বাবা পীতাম্বর তখন বাড়ি বাড়ি ধোয়াযোগ্য কাপড়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সংসারের এতসব ঝুটঝামেলা পোহাতে পোহাতে মায়ের মেজাজ খাপছাড়া হয়ে যায়। সন্তানের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার মনটা নষ্ট হয়ে যায় মায়ের। কী রকম যেন খিঁচানো ভঙ্গিতে মা সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে। বিভাস তার মাকে কোনওদিন তাদের সঙ্গে সহজভাবে কথা বলতে দেখেনি। এতে প্রথম প্রথম বিভাসের মন খারাপ হতো। পরে যখন সে একটু বড় হলো, মন খারাপ হতো না তার। সে বুঝত, সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর মায়ের মনমেজাজ ঠিক থাকার কথা নয়। তাই তো মা তাদের সঙ্গে ওরকম করে কথা বলে! মায়ের প্রতি কোনও রাগ থাকে না তখন বিভাসের।

বিভাসদের পাড়ার ঘরগুলি ঠাসাঠাসি করে দাঁড়ানো। একজনের ঘরের সঙ্গে আরেকজনের ঘর লাগানো। একচিলতে জায়গা নেই যে ঘরগুলো একটু শ্বাস ফেলবে। প্রত্যেক বাড়ির সামনে উঠান নামের একফালি জায়গা। ওই জায়গাতে দড়িদড়া, বাঁশের খণ্ড, মটকা-গামলা। সাবানজলে জায়গাটা থিকথিক। জন্মের পর থেকে কোনও ধোপাবাড়ির উঠানে বা বাড়ির পাশে কোনও ফল-ফুলের গাছ দেখেনি বিভাস। কারও বাড়িতে যে আম-জাম-নারকেল-পেয়ারা-বরইয়ের গাছ থাকতে পারে, বিভাসের ধারণার মধ্যে নেই। তাই বিনু যখন নিজেদের গাছের পেয়ারা বলে ডাঁসা পেয়ারাটা তার হাতে গুঁজে দেয়, বেশ অবাক হয় বিভাস।

ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন হারিয়ে যায় সে। বিনুর কথায় সংবিতে ফিরে।

বিনু বলে, ‘কী রে বিভাস, পেয়ারাটা হাতে নিয়ে বসে আছ যে! এখনই ক্লাস শুরু হবে। খেয়ে নাও।’

বিভাস বলে, ‘এখন খাব না বিনু। দুপুরছুটিতে খাব। তখন খিদে লাগে খুব।’

কিছু না বলে মায়াভরা চোখে বিভাসের দিকে তাকায় বিনোদিনী।

আরেকদিন ক্লাস শুরুর আগে কলাপাতায় মোড়ানো কী একটা বিভাসের হাতে দিয়ে বলে, ‘খাও বিভাস।’

বিভাস অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কী এটা!’

বিনু বলে, ‘পাটিসাপটা পিঠে। সকালে মা বানিয়েছে। তোমার জন্য পাঠিয়েছে।’

পিঠে হাতে নিয়ে হেসে দেয় বিভাস। সেই হাসিতে যে অবিশ্বাস, বুঝতে পারে বিনু। বলে, ‘মা তোমাকে চিনে।’

‘আমাকে চেনেন!’

বিনু বলে, ‘তোমাকে না দেখেও মা তোমাকে চেনে। শুধু চেনে না, ভালোও বাসে তোমাকে।’

বিভাস বলে, ‘কী যে বল না!’

বিনু বিভাসের কথাকে গায়ে না মেখে বলে, ‘তোমাকে নিয়ে মায়ের কাছে আমি এত কথা বলি, শুনতে শুনতে তোমাকে নিয়ে মায়ের একটা ধারণা হয়ে গেছে।’

‘কী ধারণা!’

‘তুমি ভালো ছেলে। মেধাবান ছাত্র। মাকে বলেছি তো ক্লাসে তুমিই আমার একমাত্র শত্রু। অন্যরা কেউ না।’

বিভাস চমকে উঠে জিজ্ঞেস করে ‘শত্রু!’

বিনু বলে, ‘শত্রুই তো! পরীক্ষায় তোমাকে ডিফিট দেওয়ার জন্য আমাকে কী পরিশ্রমই না করতে হয়। তারপরও তো শত্রুকে দমন করতে পারি না।’

বিভাস জিজ্ঞেস করে, ‘পার না ?’

‘না, পারি না তো! কোনও কোনও পরীক্ষায় তুমি যে ফার্স্ট হয়ে যাও!’ দুষ্টুমির হাসি বিনোদিনীর সমস্ত মুখে ছড়িয়ে থাকে।

তারপর হঠাৎ করে বলে, ‘মা তোমাকে একদিন আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে বলেছে। যেতে হবে কিন্তু!’ বিভাস আস্তে করে ডান দিকে মাথা কাত করে।

সতেরো

বাহ! খুব বিউটিফুল তো! একেবারে আপেলের

মতো গাল! মেয়ে না ছেলে রে ?

একদিন গিয়েছিল বিভাস, বিনোদিনীদের বাড়িতে।

গিয়েছিল মানে, বিনু নিয়ে গিয়েছিল বিভাসকে। স্কুলছুটির পর।

আগের দিন বিনোদিনী বলেছিল, ‘কালকে তোমার মাকে বলে এসো বিভাস, স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হবে।’

বিভাস বলেছিল, ‘দেরি হবে! কেন, দেরি হবে কেন ?’

‘কাল ছুটির পর তুমি আমাদের বাড়িতে যাবে।’

‘না না। আমি তোমাদের বাড়িতে যাব না। আমার ভয় করে।’

‘তুমি কথা দিয়েছিলে আমাদের বাড়িতে যাবে বলে। আর ভয় কীসের!’

‘আমি কোনওদিন জমিদারবাড়িতে যাইনি।’

হি হি করে হেসে দেয় বিনোদিনী। বলে, ‘জমিদারবাড়িতে বাঘ আছে না ভালুক আছে ? তোমাকে খেয়ে ফেলবে!’

‘তারপরও আমার ভয় করে।’

‘কাকে ভয় করে ?’

‘তোমার বাবাকে।’

‘দেখেছ কখনও আমার বাবাকে ?’

‘দেখেছি না! তোমার ভর্তির দিন স্কুলে এসেছিলেন তো তোমার বাবা!’

‘আমার বাবার চেহারা কি ভয়ের ?’

বিভাস ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ে।

বিনোদিনী বলে, ‘বাবা ছোটদের খুব আদর করে। তোমাকেও আদর করবে বাবা।’

একটু থেমে বিনোদিনী আবার বলেছে, ‘মা খুব করে বলেছে, কাল তোমাকে নিয়ে যেতে। তুমি না গেলে মা খুব দুঃখ পাবে। আমরা মাকে দুঃখ দিই না।’

বিভাসের আর কী করা! চুপ করে যায়।

পরদিন স্কুলছুটির পর বিভাসকে বিনোদিনী নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যায়। মায়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলে, ‘মা, বিভাস। আমার সঙ্গে পড়ে। তোমাকে বলেছি।’

রোহিনী ‘ও মারে’ বলে বিভাসকে জড়িয়ে ধরেন। ‘এত সুন্দর! এরকম একটা সুন্দর ছেলে তোমার সঙ্গে পড়ে বিনু!’ বলতে বলতে বিভাসকে বুকের আরও কাছে টেনে নেন রোহিনী।

বিনুর মায়ের কাণ্ড দেখে বিভাস তো হতভম্ব! কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না সে। বিনুর মায়ের বুকের তলায় উসুখুসুও লাগছিল বেশ। শিশুকালের কথা মনে নেই, বালকবেলায় তার মা কখনো আদর করে এরকম করে বুকের কাছে টেনে নেয়নি। তার মা তাকে যে আদর করে না, তা নয়। সে আদর অনেকটা নিষ্প্রাণ। কেজো। তফাতে দাঁড়িয়ে মায়ের সে আদর খুব করে উপভোগ করতে পারে না বিভাস। বুকের নিকটে টেনে-নেওয়া স্নেহ পাওয়ার অভিজ্ঞতা বিভাসের জীবনে নেই বললেই চলে। তাই আজ বিনুর মায়ের অকৃত্রিম স্নেহ-সোহাগে বিহ্বল হয়ে পড়ল বিভাস। বিনুর মাকে প্রণাম করতে ভুলে গেল।

জীবনের এত অভাব-কষ্টের মধ্যেও মা বিভাসদের বারবার করে শিখিয়েছেÑগুরুজনদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে হয়। তাতে গুরুজনের প্রশান্তি আশীর্বাদ হয়ে তোমাদের ওপর ঝরে পড়ে।

মায়ের কথা হঠাৎ মনে পড়ল বিভাসের। বিনুর মায়ের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে ঢিপ করে রোহিনী চৌধুরীকে প্রণাম করল বিভাস।

তাতে রোহিনীর আনন্দ দেখে কে ? পারলে বিভাসকে এখনই বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলেন।

আহ্লাদ একটু কমে এলে রোহিনী বিনোদিনীকে বলেন, ‘আরে বিনু, দাঁড়িয়ে থাকলি যে! বিভাসকে নিয়ে কলতলায় যা। বইখাতাগুলো টেবিলে রাখ আগে। কলতলা থেকে ভালো করে হাতমুখ ধুয়ে আয়। আমি দুজনকে ভাত দিচ্ছি।’

বিনু বলল, ‘যাচ্ছি মা। এসো বিভাস, আমার সঙ্গে এসো।’

বিভাস বেঁকে বসল, ‘সে ভাত খাবে না।’

বিনু চাপা স্বরে বলল, ‘কেন ভাত খাবে না বিভাস! জানো, আজ তুমি আসবে বলে সকালে হেঁশেলে ঢুকেছে মা। যত্ন করে রেঁধেছে। তুমি না খেলে মা কী রকম কষ্ট পাবে ভেবে দেখেছ ?’

তারপরও বিভাসের দোনমনা কাটে না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

ওই সময় হেঁশেল থেকে রোহিনীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, ‘বিনু, কলতলায় গেলি ? বেলা পশ্চিমে কতটুকু গড়িয়েছে খেয়াল করেছিস ? ছেলেটা যে খিদেয় কষ্ট পাচ্ছে!’

রোহিনীর কথায় বিভাসের সকল দ্বিধা কেটে যায়। কলতলায় হাতমুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসে। চেয়ারে বসে ডাইনিং টেবিলে ভাত খাওয়া বিভাসের জীবনে এই প্রথম। কীভাবে খেতে হয়, খাওয়ার সময় খাবার গায়ে পড়বে না তোÑএসব ভাবতে গিয়ে অস্থির হয়ে উঠে বিভাস। কিন্তু বিনু পাশের চেয়ারে এসে বসলে বিভাসের সকল অস্থিরতা কেটে যায়। এর মধ্যে রোহিনী জলের গ্লাস আর ভাতের থালা দুজনের সামনে রেখে গেছেন। ভাত-তরকারি ভেতর দিকের রান্নাঘর থেকে আনতে একটু সময় লাগছে তাঁর।

এই সময় বিভাস নিচু গলায় বিনুকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার দিদি কোথায় ? নন্দিনী দিদি ?’

বিনু বলে, ‘দিদি তো এখন আর এখানে থাকে না।’

‘থাকে না ? তাহলে কোথায় থাকে ?’

‘মামার বাড়িতে।’

‘কেন, তোমাদের এত বড় বাড়ি! তারপরও তোমার দিদি মামাবাড়িতে থাকে!’

এবার বিনোদিনী কষ্টের একটা শ্বাস ত্যাগ করে। মøান কণ্ঠে বলে, ‘আমাদের গ্রামে যে মেয়েদের হাই স্কুল নেই! আমাদের মামার বাড়িতে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় আছে। দিদি মামাবাড়িতে থেকে ওই স্কুলে পড়ে এখন।’

‘তুমিও কি ফাইভ পাস করে মামাবাড়িতে চলে যাবে!’ বিপুল কিছু মূল্যবান বস্তু হারানোর কণ্ঠ বিভাসের।

বিনু গলা ছেড়ে হেসে উঠে। বলে, ‘এখনো ফাইভ পাস করিনি আমি।’

তারপর মুখকে কাঁচুমাচু করে বলে, ‘মামাবাড়িতে আমার যাওয়ার সম্ভাবনা কম। এক বাড়িতে দুই বোনকে রাখায় সমস্যা আছে। মা-বাবা হয়তো আমাকে অন্য কোনও আত্মীয়-বাড়িতে পাঠাবে!’

অজানা একটা কষ্ট গলা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে বিভাসের। কিছু একটা বলতে চাইছে সে, কিন্তু বলতে পারছে না।

এই সময় রোহিনী বাটি বাটি তরকারি আনতে শুরু করলেন। ভাত-তরকারি দুজনের পাতে তুলে দিয়ে পাখা হাতে বিভাসের পাশের চেয়ারে বসলেন। বললেন, ‘খাও বাবা। লজ্জা করো না। নিজের বাড়ির মতো করে খাও।’ বলে বিভাসের গায়ে-মাথায় হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগলেন রোহিনী।

বিনোদিনী হি হি করে হেসে উঠল।

রোহিনী বললেন, ‘এরকম করে হাসলি যে!’

বিনোদিনী বলল, ‘এমনি এমনি।’

‘ওরে শয়তান, তোর হাসির অর্থ আমি বুঝি নাই মনে করেছিস ? বুঝেছি।’ তারপর কণ্ঠস্বরকে খাদে নামিয়ে বললেন, ‘এরকম একটা দিব্যকান্তি ছেলেকে ভালো না বেসে কি পারা যায় ? তুই-ই বল, পারা যায় ?’

ঠিক এই সময় কানু আর ভানু কোত্থেকে ঘরে এসে ঢুকল। কানু-ভানু বিনোদিনীর দাদা। জমজ। একই রকম দেখতে। পনেরো-ষোলো বছরের কিশোর। দুজনেরই লম্বা চুল। বয়সের তুলনায় দীর্ঘদেহী। ফরসা। দুজনের নাকের-মুখের গড়ন এমন যে পাশাপাশি দাঁড়ালে বাইরের কেউ কে কোনজন বলতে পারবে না। বিনোদিনীরা বুঝতে পারে। কানু একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে। ভানু সামান্য গুঁজুটে।

বিনু চাপা স্বরে বলল, ‘আমার দাদা। ভয় পেয়ো না।’

রোহিনী কিছু বলবার আগে কানু ধেয়ে এলো। ডান হাতের আঙুলগুলো দিয়ে বিভাসের ফোলা ফোলা গাল দুটো টিপে ধরে বলল, ‘বাহ! খুব বিউটিফুল তো! একেবারে আপেলের মতো গাল! মেয়ে না ছেলে রে ?’

হঠাৎ গরজানো গলায় রোহিনী বলে উঠলেন, ‘আহ কানু! ছেলেটা ভাত খাচ্ছে! এঁটো মুখ! অসভ্যতা কর না।’

মায়ের দিকে হিংস্র চোখে তাকাল কানু। এই সময় ভানু বলে উঠল, ‘চল রে কানু, রাস্তার মোড়ে ওরা দাঁড়িয়ে আছে।’

সেই বিকেলে বুকের মাঝে অপার আনন্দ নিয়ে বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল বিভাস।

আঠারো

তোরা একদিন আইএ বিএ পাস করে বিনোদপুরে ফিরে

আসবি। তখন আমাদের বাড়িতে গিয়ে দেখবিÑকাঠফাটা

রোদে উঠানের চুলায় শেফালি চোঙা দিয়ে ফুঁ দিচ্ছে।

সেদিন দুপুরে ক্লাস ফাইভের রেজাল্ট বেরোল।

শুধু ক্লাস ফাইভের কেন, ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত সকল ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকে স্কুলমাঠ গমগম। গোটা মাঠ উচ্ছ্বাসে উৎফুল্ল। অন্যান্য ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের আনন্দ বাঁধনছাড়া। নতুন বছর, নতুন ক্লাস, নতুন টিচার, নতুন বই। নতুন নতুন বন্ধুও। তুলনায় ফাইভ-পাসদের মন বিষণ্ন। শুকনো মুখ তাদের। জটলা থেকে দূরে দূরে তারা। তারা কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু কেমন যেন নিষ্প্রাণ তাদের ভাবভঙ্গি! বয়সে ছোট হলেও তাদের প্রত্যেকের ছোট্ট একটা মন আছে। সেই মনে আজ গভীর বেদনা। তাদের ছোট মনগুলো ঘিরে আজ হারানোর কষ্টটা বড় বেশি।

ক্লাস ফাইভের ছাত্রছাত্রীরা আজ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বিচ্ছিন্নতার বেদনা সবার মনে। ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের মনে এই কষ্টের ভার বেশি। ছাত্ররা না হয় বিনোদপুর হাই স্কুলে পড়বে, কেউ-বা তিন মাইল দূরের বেগমজান হাই স্কুলে ভর্তি হবে, অথবা যে যে অভিভাবকের সামর্থ্য আছে, তাঁরা তাঁদের প্রতিপাল্যকে শহরের কোনও নামকরা স্কুলে ভর্তি করাবেন। কিন্তু মেয়েদের কপালে তো ওসব কিছু লেখা নেই! এই তল্লাটে মেয়েদের কোনও হাই স্কুল নেই বা যে বয়েজস্কুলটি আছে, সেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক পড়ার অনুমতি নেই। তাই বিনোদপুরের অধিকাংশ কন্যা, ধনী-অভাবগ্রস্ত নির্বিশেষে ফাইভ পাস। ব্যতিক্রম যে নেই, এমন নয়। যারা আরও পড়তে চায়, গ্রাম ছাড়তে হয় তাদের। কেউ মামাবাড়ি, কেউ পিসিবাড়ি, কেউ-বা মাসিবাড়িতে চলে যায়। সেখানে যে মেয়েদের মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সুযোগ আছে!

এই বিচ্ছিন্নতার বেদনাটা বেশি করে বাজছে বিনোদিনী, শেফালি আর প্রভাতির মনে। বিনোদিনী নিশ্চিত জানে, তাকে গ্রামছাড়া হতেই হবে। মা-বাবা তাকে ঘরে বসিয়ে রাখবেন না। বিশেষ করে তার মা রোহিনী তো নাছোড়!

সেদিন রাতদুপুরে মায়ের কথা কানে এসেছিল বিনোদিনীর। মা বলছিলেন, ‘দু’চার দিনের মধ্যে তো বিনুর রেজাল্ট দেবে। মাধ্যমিকটা কোথায় পড়বে সে ?’

বাবা আমতা আমতা করে বলেছিলেন, ‘বুঝতে পারছি না রোহিনী। নন্দিনীকে তো বাপের বাড়িতে পাঠিয়েছ, বিনুকেও কি সেখানে পাঠানো উচিত ?’

রোহিনী দ্রুত বলে উঠেছিলেন, ‘না। তা কী করে হয়! আমার দু’দুটো মেয়ের বোঝা ভাইয়েরা টানবে কেন ?’

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্ষিতীশ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘তুমি বলার অনেক আগে থেকে ভেবে যাচ্ছি, বিনোদিনীর পরের পড়াশোনা কীভাবে হবে!’

কোমল গলায় রোহিনী বলেছিলেন, ‘তুমি অত দুশ্চিন্তা করো না। সুনীতাকে আমি চিঠি দিয়েছিলাম, বিনুর ব্যাপারে। ও তো আনন্দে আটখানা! বড়দির মেয়ে তার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করবে, এর চেয়ে আনন্দের কী আছে! উত্তরে জানিয়েছে সুনীতা আমায়। নিঃসন্তান সুনীতা আর তার স্বামী বিনুকে তাদের বাড়িতে অযত্নে রাখবে না। লিখেছেÑতার বাড়ির পাশেই মেয়েদের স্কুল। ঠাকুরপাড়া থেকে হেঁটেই স্কুলে যেতে পারবে বিনু।’

সে-রাতেই বিনোদিনী নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে ফাইভের রেজাল্টের পর তাকে তার মাসিরবাড়ি কুমিল্লাতে চলে যেতে হবে। সেই রাত থেকেই বিনোদিনীকে বিষণ্নতায় পেয়ে বসেছে।

মনমরা হয়ে বিনোদিনী কাঁঠালচাঁপা গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে প্রভাতি আর শেফালি।

শেফালি বলল, ‘বিনুর কথা তো জানি। তুই কোথায় যাচ্ছিস প্রভাতি ?’

প্রভাতি হেসে বলল, ‘দিদি যেখানে গেছে। ভারতেশ্বরী হোমস-এ।’

শেফালি বলল, ‘তোর বাবার তো অনেক টাকা। যেখানে ইচ্ছা মেয়েদের পড়ানোর ক্ষমতা রাখেন।’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল শেফালি।

এতক্ষণ চুপ থাকা বিনু এবার বলল, ‘তোর কী হবে রে শেফালি ? তুই কোথায় পড়বি ?’

মøান একটু হেসে শেফালি বলল, ‘আমার আর পড়াশোনা! বাবার অবস্থা তো জানিস! রাস্তার মাথায় মুদির দোকান আমাদের। বাবা সেখানে দিনরাত পরিশ্রম করে। মা অসুস্থ। এবার আমাকে পুরোপুরিভাবে হেঁশেলে ঢুকতে হবে রে বিনু!’

‘তাহলে তুই আর পড়বি না!’ অবাক চোখে প্রভাতি জিজ্ঞেস করে।

শেফালি প্রভাতির কথার কোনও জবাব দেয় না। শুধু বলে, ‘তোরা একদিন আইএ বিএ পাস করে বিনোদপুরে ফিরে আসবি। তখন আমাদের বাড়িতে গিয়ে দেখবিÑকাঠফাটা রোদে উঠানের চুলায় শেফালি চোঙা দিয়ে ফুঁ দিচ্ছে।’

শেফালির এই কথার কী উত্তর দেবে, বিনু বা প্রভাতিÑদুজনের কেউই ঠিক করতে পারে না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল চোখে শেফালির দিকে তাকিয়ে থাকে।

ওই সময় সেখানে বিভাস আসে। মনমরা চোখে তিনজনে বিভাসের দিকে তাকায়। তাদের এরকম তাকানো দেখে ভড়কে যায় বিভাস। ইতস্তত করে। কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যায়।

প্রভাতি বলে, ‘তারপর বিভাস, আজকে তো সব শেষ হতে যাচ্ছে।’

মরা গলায় বিভাস বলে, ‘শেষ হতে যাচ্ছে মানে!’

শেফালি বলে ওঠে, ‘এই স্কুলে আজ আমাদের শেষ দিন। কে কোথায় চলে যাবে! দেখা হবে না কারোর সঙ্গে কারোর।’

‘কেন, দেখা হবে না কেন ?’ বলে বিভাস।

বিনু বলে, ‘তোমার বোকামি আর যাবে না বিভাস! আমরা তো আর স্কুলে আসব না। প্রভাতি চলে যাবে ময়মনসিংহে আমি হয়তো কুমিল্লায়। শেফালির কথা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।’

‘তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না!’

‘শেফালির সঙ্গে দেখা হতে পারে তোমার কিন্তু আমাদের দুজনের সঙ্গে আজকেই শেষদেখা।’ প্রভাতি বলল।

‘তাহলে!’ বিবশ কণ্ঠে বিভাস বলল।

‘তাহলে আর কী রে বিভাস! যদি কখনো আমরা ফিরে আসি গ্রামে এবং তখন যদি তুমি গ্রামে থাকো, তাহলে হয়তো তোমার সঙ্গে আমাদের দেখা হবে।’

‘তখন দেখা হবে!’

‘হ্যাঁ তো!’ প্রভাতি বলে উঠল। তারপর গলায় উচ্ছ্বলতা ঢেলে বলল, ‘যাবে নাকি তুমি আমার সঙ্গে ভারতেশ্বরীতে ?’ বলেই খলবল হেসে উঠল প্রভাতি। শেফালি প্রভাতির সঙ্গে যোগ দিল।

বিভাস এদের হাসির কারণটা ধরতে পারল না। কারণ ও তো জানে নাÑভারতেশ্বরী হোমসে শুধু মেয়েদের পড়ানো হয়। তাই ভ্যাবাচ্যাকা মুখ নিয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকল বিভাস।

সহপাঠিনী দুজন হাসাহাসি করলেও বিনোদিনী কিন্তু হাসল না। কীরকম অদ্ভুত এক মুখ করে মৃদু গলায় বিনোদিনী বলল, ‘আমি তোমাকে ভুলব না বিভাস।’ বলেই হন হন করে হাঁটা দিল বিনোদিনী।

পেছন থেকে জোর গলায় প্রভাতি-শেফালি বলল, ‘এই বিনু, কোথায় চললি ? দাঁড়া। আমরাও যাব তোর সঙ্গে।’ বলতে বলতে দৌড় লাগাল দুজনে।

উদাস চোখে ওদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকল বিভাস।

বিনোদপুর হাই স্কুলে সিক্সে ভর্তি হলো বিভাস। ভর্তির পর পরই রোজার জন্য ছুটি হয়ে গেল স্কুল। দীর্ঘ এক মাস পর স্কুল খুললে বিভাস জানতে পারলÑবিনোদিনী তার মাসির বাড়ি কুমিল্লাতে চলে গেছে। সুরঞ্জনই খবরটা দিল তাকে। বিনোদিনীদের বাড়ির পাশেই সুরঞ্জনদের বাড়ি।

সংবাদটা বিভাসের বুকে খুব করে বাজল। কেন এরকম লাগল, বুঝতে পারল না বিভাস। কিন্তু তার এটা মনে হলো যে তার সবচাইতে প্রিয় ছিল বিনু। তার সঙ্গে বসতে, তার সঙ্গে কথা বলতে তার যে অপার আনন্দ হতো! এই আনন্দের কার্যকারণ সম্বন্ধে কোনও কিছুই জানে না বিভাস। শুধু বুঝতে পারছেÑ বিনোদিনী তার খুব বন্ধু ছিল।

তার যেমন লাগছে, বিনুরও কি তা-ই লাগছে ? জানে না বিভাস।

উনিশ

হিন্দুস্তান যার নাম! তাদের নামেই তো ওই

দেশের নাম! ওখানেই তো থাকে ওরা!

১৯৬৫। সেপ্টেম্বর।

পাকিস্তান আর ভারত যুদ্ধে জড়াল। আগে আগে ছোটখাটো দ্বন্দ্ব হয়েছে। সীমান্তে গোলাগুলি হয়েছে। উভয়পক্ষের সৈন্য হতাহত হয়েছে। উত্তেজনা স্তিমিতও হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের উত্তেজনা কমল না। বৃদ্ধি পেল। আগের আগের বছরের তিনটি বিবদমান ঘটনারই পরিণতি যেন সেপ্টেম্বরের পাক-ভারত যুদ্ধ। এই যুদ্ধ রক্তক্ষয়ী, বীভৎস এবং বিধ্বংসী। মূল সমস্যা কাশ্মীর। এ বলে, কাশ্মীর আমার, ও বলে, কাশ্মীর আমার। ১৯৪৮ সালে কাশ্মীরযুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে কাশ্মীরের কিছু অংশ পাকিস্তানের দখলে আসে, জম্মুসহ কাশ্মীরের অধিকাংশ অঞ্চল চলে যায় ভারতের অধীনে। এতে পাকিস্তান বড় নাখোশ হয়। বছরের পর বছর সীমান্ত-সংঘর্ষ জিঁইয়ে রাখে। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানের প্ররোচনায় ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ বাধে।

কাশ্মীর ছাড়াও আরেকটা অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে বিরোধ ছিল। কুচের রান অঞ্চল। এটি মরুময় এবং জলাভূমি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ’৬৫-র ৯ এপ্রিল রান অঞ্চলে জোর করে ঢুকে পড়ে। বিরোধ তুঙ্গে ওঠে।

যুদ্ধ মারাত্মক রূপ নেয়। উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাকিস্তানপক্ষের ক্ষতি বিপুল। পাকিস্তানের তিন হাজার আটশ সেনা হতাহত হয়। সাতশ কুড়ি বর্গমাইল ভূখণ্ড ভারতের কাছে হারিয়ে বসে পাকিস্তান। বিশাল ক্ষতির বোঝা মাথায় নিয়ে পাকিস্তানকে হার স্বীকার করে নিতে হয়।

’৬৫-র যুদ্ধ সংঘটিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত জুড়ে। পূর্ব পাকিস্তান থাকে যুদ্ধমুক্ত। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের আইয়ুবের তীক্ষè খড়গ নেমে আসে। এই খড়গের প্রথম আঘাতটি পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের ওপর।

আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানে ছোট-বড় নানা ধরনের কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। খান-শাসকের নির্দেশনা ছিলÑএইসব কলকারখানা নির্মিত হবে হিন্দুপ্রধান এলাকায়। মানে যেখানে যেখানে সংখ্যালঘুদের বসবাস, সেখানেই স্থাপন করা হবে সার কারখানা, স্টিল মিল, জিএম প্ল্যান্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। কিন্তু কীভাবে ? ওসব স্থানে যে হিন্দুদের ঘরবাড়ি, পাড়ামহল্লা, গাঁগেরাম! ওসব উচ্ছেদ করেই এসব কারখানা স্থাপন করা হবে। বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ তো বিসর্জন দিতেই হবে! ওসব হিন্দুবসতির স্থানগুলো যে কারখানা স্থাপনের জন্য যথেষ্ট উপযোগী! ওরা কোথায় যাবে ? পুরুষানুক্রমে বসবাস করে আসা শত শত বছরের গ্রাম-পাড়া-মহল্লা ছেড়ে সংখ্যালঘুরা কোথায় যাবে ? কেন, নতুন জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপন করবে! তাছাড়া এদের তো চলে যাওয়ার দেশ আছে! কোন দেশ ? কেন, ভারত! হিন্দুস্তান যার নাম! তাদের নামেই তো ওই দেশের নাম! ওখানেই তো যাবে ওরা! কিন্তু যে যে হিন্দুগ্রাম বা সংখ্যালঘুদের পাড়া অ্যাকোয়ার করে ওইসব কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার, ওসব পাড়ার চারপাশে তো বিশাল বিশাল খালি জায়গা পড়ে আছে! হিন্দুবসতিগুলি বাদ দিয়ে ওসব বিরান জায়গায় কারখানাগুলো স্থাপন করা যায় না ? না, যায় না। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য তো পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের বাস্তুচ্যুত করা। শুধু বাস্তুচ্যুত নয়, এদেশ থেকে ওদেশে এসব মালাউনদের বিতাড়িত করা। মালাউনরাই তো পশ্চিম পাকিস্তানে আমাদের বহু জায়গা দখল করে নিয়েছে, আমাদের বহু জোয়ানকে হত্যা করেছে, আমাদের অনেক যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, কামান ধ্বংস করেছে! তার প্রতিশোধ নিতে হবে না ? তাই পূর্ব পাকিস্তানে বড় বড় কারখানা স্থাপনের অজুহাত দেখিয়ে হিন্দুদের জায়গা দখল করে নিচ্ছি আমরা। তাই খালি অনুর্বর জায়গাগুলোর প্রতি নজর নেই আমাদের। আমাদের সকল দৃষ্টি এখন মালাউনদের বসতি, তাদের উর্বর জমিজিরাতÑএসবের উপর।

কেন্দ্রের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের পা-চাটা শাসকরা হিন্দুপ্রধান অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করা শুরু করল। চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়াটি শুরু হলো ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের পরপরই।

বিনোদপুরে একদিন খবর এলÑএখানে মস্তবড় একটা কারখানা স্থাপন করা হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের আইয়ুবি শাসকদের কাছ থেকে এই নির্দেশ এসেছে। কীসের কারখানা হবে ? বিদ্যুৎ উৎপাদনের জেনারেটর তৈরির কারখানা। বাব্বা! তাহলে তো বিশাল একটা স্থানের দরকার হবে!

হিন্দু-মুসলমানÑউভয় সম্প্রদায়ের মনে শঙ্কা জাগল। কারখানা হবেÑঠিক আছে। কারখানা মানে তো উন্নয়ন। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন! আর অনেক মানুষ তো চাকরিও পাবে ওই কারখানায়! এর চেয়ে আনন্দের আর কী বার্তা থাকতে পারে! আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিতও হলো অনেকে। কারখানাটা হবে কোথায় ? মুসলিমরা বলল, আমাদের পাড়ায় নয় তো! হিন্দুরা ভাবল, আমাদের পাড়াটি উচ্ছেদ করে নয় তো! অনেকে হেসে উড়িয়ে দিলÑআরে ভাই, তোমরা শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছ! এই বিনোদপুরে এত বিপুল খালি জায়গা পড়ে থাকতে হিন্দু বা মুসলমানপাড়ার দিকে কুনজর দেবে কেন সরকার ? তোমরা ভয় পেয়ো নাÑপাশের ওই বিরান ভূমিতেই কারখানাটি স্থাপিত হবে। বসতি উচ্ছেদে তো অনেক টাকা লাগবে! অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে যে বাস্তুচ্যুতদের! তোমরা নিশ্চিত থাকোÑওরকম কিছুই হবে না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওরকম কিছুই হলো। বিনোদপুরের হিন্দুপাড়ায় সংবাদ এলÑএই হিন্দুপাড়াটি উচ্ছেদ করেই জিএম প্ল্যান্টটি স্থাপিত হবে।

শশাঙ্ক চৌধুরীর দহলিজে সবেমাত্র প্রার্থনার কাজটি সমাপ্ত হয়েছে। প্রার্থনা মানে দুহাত জোড় করে স্রষ্টার উদ্দেশে সুর করে দু’চারটা কথা বলা। সে বন্দনাগীতির মধ্যে থাকে নিজের কল্যাণ কামনা, জগতের মঙ্গল আকাক্সক্ষা। আর থাকে সকল প্রকার অন্যায্য কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারার আত্মশক্তি সঞ্চয়ের বাসনা। এর পর শশাঙ্ক চৌধুরী নিজ থেকে জাগতিক জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কিছু কথা বলেন, সমবেতরা কিছু প্রশ্ন করে, তিনি প্রশ্নগুলোর উত্তর তাঁর মতো করে দেন। সবার শেষে বসে গানের আসর। এই গানের টানে পাড়ার অনেক মানুষ আসে। সুকুমারও একদিন এসে মিলেছে এই আসরে। হরেন্দ্রই বলেছে বোধহয় একদিন সুকুমারকে! সুকুমারের গানের আসরে হরেন্দ্রই তো মৃদঙ্গ বাজায়! উভয়ের মধ্যে বেশ খায়খাতির!

হয়তো হরেন্দ্র একদিন বলেছে, ‘জামাইবাবু, আমাদের পশ্চিম পাড়ায় গান-প্রার্থনার আসর বসে সপ্তাহে দুদিন।’

সুকুমার জিজ্ঞেস করেছে, ‘কার বাড়িতে ?’

হরেন্দ্র বলেছে, ‘শশাঙ্ক কাকা, মানে শশাঙ্ক চৌধুরীর বাড়িতে।’

সুকুমার কোমল স্বভাবের মানুষ। দিব্যকান্তি তার। গৌর অঙ্গের ওপর সর্বদা হলদেটে একটা শাল রাখে। ধুতি-ফতুয়াতে বেশ মানায় সুকুমারকে। তার ভেতর আর বাহির সমান। মনে কোনও জটিলতা নেই। সব মানুষই তার কাছে ভালো মানুষ, তার কাছে সবাই শ্রীচৈতন্যের অংশ। কোনও মানুষ খারাপ হতে পারে, জগতের অকল্যাণ করতে পারে কোনও মানুষ, বিশ্বাস করে না সুকুমার। সবার প্রতি তার সমান ভালোবাসা, সমান শ্রদ্ধা।

শশাঙ্ক চৌধুরীর নাম শুনে শ্রদ্ধায় বিগলিত হলো সুকুমার। জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘তিনি একজন মহান মানুষ। শুনেছিÑসূর্যসেনের সঙ্গে দেশোদ্ধারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।’

হরেন্দ্র বলল, ‘তুমি মিথ্যে শোননি জামাই। মাস্টারদার ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর বহুদিন অন্তর্ধানে ছিলেন শশাঙ্ক কাকা। ফিরে এসে মানুষের সেবায় লেগেছেন। মানুষের আত্মোন্নয়নের জন্য তিনি একটা প্রার্থনাসভার আসর বসান নিয়মিত, তাঁর দহলিজে। গান হয় ওখানে। গানটাই মুখ্য। তুমি যাবে নাকি বাবা ওখানে ? তাহলে ওই আসরে একেবারে প্রাণের বন্যা বয়ে যাবে!’

‘যাব তো! যাব বই কি! কোনদিন যাব বলেন!’ বলেছিল সুকুমার।

একদিন সুকুমারকে নিয়ে এসেছিল হরেন্দ্র, শশাঙ্ক চৌধুরীর প্রার্থনা-আসরে। বড় খুশি হয়েছিলেন শশাঙ্ক চৌধুরী।

সেদিনও সুকুমারের কণ্ঠে ‘হাত বান্ধিবি, পাও বান্ধিবি মন বান্ধিবি ক্যামনে’ গানটি শেষ হয়েছে। সবার মন আপ্লুত। কারও কারও চোখ বোজা।

এই সময় আসরে হুমড়ি খেয়ে পড়ল অনন্ত। চিৎকার করে বলল, ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে রে জেঠা, আমরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি!’

কুড়ি

নিজেদের ঘরবাড়ি, পুকুরঘাট, উঠানঘাটাÑআর

তোমাদের নিজেদের থাকবে না লক্ষ্মণ।

অনন্তের মর্মন্তুদ হাহাকার শুনে আসরের সবাই ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে গেল।

অনন্ত আর্তনাদ করনেওয়ালা স্বভাবের নয়। শক্ত-সমর্থ দেহ তার। দীর্ঘ দেহ। শালপ্রাংশু যাকে বলে, অনেকটা সেরকম। আটাশ-ঊনত্রিশ বছরের এই যুবকটির ভেতরটাও বহিরঙ্গের মতো কঠিন-পোক্ত। সহজে ভেঙে পড়ার যুবক নয় অনন্ত। আগে আগে এই হিন্দুপাড়ার ওপর দিয়ে অনেক ঝড়জল বয়ে গেছে। সেইসব সংকটের দিনে বাঘা বাঘা স্বভাবের মানুষেরা যখন ভেঙে পড়েছেন, অনন্ত কোমর সোজা রেখে সেইসব ঝড়ঝাপটার মোকাবেলা করে গেছে। সব ঝঞ্ঝাকে সে যে রুখে দিতে পেরেছে এমন নয়, তবে প্রতিপক্ষকে জানান দিয়েছেÑবিনোদপুরের হিন্দুপাড়ায় অনন্ত দাস বলে একজন আছে, এই পাড়ার কোনও অকল্যাণ করতে চাইলে অনন্তকে অতিক্রম করেই করতে হবে। সেই শক্তপোক্ত স্বভাবের অনন্ত যখন চূর্ণবিচূর্ণ কণ্ঠে হা-হুতাশ করে ওঠে, তখন অন্য সবাই হতভম্ব তো হবেই!

অনন্ত পুবপাড়ার লক্ষ্মণ দাসের ছেলে। ক্ষিতীশ চৌধুরীর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে লক্ষ্মণ দাসের বাড়িটি। লক্ষ্মণ চাষাভুষা মানুষ। তার ভিটে-বাড়িটা মন্দ নয়। সমতল থেকে বেশ উঁচু বসতভিটে। বাড়ির চারপাশে গাছগাছড়া। সামনে মস্ত একটা পুকুর। জমিজমারও অভাব নেই লক্ষ্মণের। অভাব শুধু বিদ্যের। নিজের পড়াশোনা তেমন নেই বলে ছেলেদের স্কুলে পাঠিয়েছিল। অনন্ত কিছুটা এগোলেও ললিত ফাইভ পাসের পর আর পড়লই না। বাপের সঙ্গে চাষবাসে মন দিল। অনন্ত হাই স্কুল অবধি পড়ল বটে, কিন্তু চাকরিবাকরিও করল না, হালচাষেও মন দিল না। হিন্দুপাড়ার মঙ্গলামঙ্গলের সঙ্গে নিজেকে বেশ করে জড়িয়ে নিল অনন্ত।

তরতর করে গাছে ওঠা, সারাদিনমান পুকুরের জলে দাবড়িয়ে বেড়ানো শরীর অনন্তের। সবল সতেজ। মনটাও সেরকম তার। আনন্দে ভরপুর। আবার কর্তব্যকর্মে অনড়।

বাপ লক্ষ্মণ বিয়ে করাতে চাইলে বলেছে, ‘এখনও সময় হয়নি বাবা। আরও কয়েকটা বছর সময় দাও আমায়।’

বাপ বলেছে, ‘আর কত! বয়স তো কম হলো না তোর!’

‘কিছু কাজ যে এখনও বাকি বাবা!’

‘তোর এমন কী কাজ বাকি পড়ে আছে যে, বিয়ের বয়সে বিয়ে করতে চাইছিস না ?’

বাবার জিজ্ঞাসার কোনও উত্তর দেয় না অনন্ত। চুপ করে থাকে। আস্তে করে বাপের সামনে থেকে সরে পড়ে।

পাড়ার কার কোথায় কী অসুবিধাÑঅনুসন্ধান করে ফিরে অনন্ত। কারও কোনও রোগশোক হলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডাক্তার ডাকা থেকে আরম্ভ করে ওষুধপথ্য কিনে আনা, প্রয়োজনে রাত জেগে রোগীর সেবা করাÑসবই দুই হাতে করে যায় অনন্ত। দুই ভাইয়ের মধ্যে জায়গাজমি নিয়ে মনকষাকষি হলে, বউ-শাশুড়িতে ঝগড়া লাগলে, তা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য পাড়ার আর কেউ না থাক, অনন্ত আছে।

এই অনন্তই একদিন মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ল। অনন্ত জড়িয়ে পড়ল মানে অনন্তের বাবা লক্ষ্মণ দাসকে জড়িয়ে ফেলল দীপেন আর নৃপেন।

তেজারতিতে দীপেন-নৃপেন ফুলেফেঁপে একাকার। টাকা রাখার জায়গা নেই, এমন অবস্থা দুই ভাইয়ের। বাবা সতীশ চৌধুরীর মৃত্যুর পর, দাদা ক্ষিতীশ চৌধুরীকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করবার পর দীপেন-নৃপেন বেপরোয়া হয়ে উঠল। সুদের ব্যবসায় কাউকে চোখ রাঙাতে হয়, কাউকে ঘাড়ে ধরতে হয়, কারও আবার ঘরবাড়িও দখলে নিতে হয়। অনেকে প্রয়োজনের সময় ভিটেবাড়ি বন্ধক রেখে দীপেন-নৃপেনের কাছ থেকে টাকা নেয়। এই টাকা চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে অপরিশোধিত হয়ে যায়। তখন বাড়িটি এই দুই ভাইয়ের অনুকূলে ছেড়ে দিতে হয়। এভাবে হিন্দুপাড়ার বেশ কয়েকটি বাড়ি দীপেন-নৃপেনের দখলে চলে এসেছে।

হঠাৎ দুই ভাইয়ের মধ্যে অন্য একটা লোভ জেগে উঠেছে। মিথ্যে দলিল বানিয়ে পাড়ার হতদরিদ্র বা সহজসরল অশিক্ষিত মানুষের পুকুর বা খাই নিজেদের বলে দাবি করা। রাজেন্দ্র হালদার নামের এক উকিলকে এই কাজের জন্য নিয়োগ করেছে তারা। রাজেন্দ্র পুরনো ছিট-দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে এক একটা জালদলিল তৈরি করে, সেই জালদলিলের জোরে দীপেন-নৃপেন ওই পুকুর-খাই দখল করে নেয়। গরিব আর অসহায় বলে ভুক্তভোগীরা আদালতে যায় না। জালদলিলকে মেনে নেয়।

ইদানীং দীপেন-নৃপেনের নজর পড়েছে লক্ষ্মণ দাসের সেই বিরাট পুকুরটির ওপর। পরিকল্পনা মাফিক জালদলিলও তৈরি করেছে রাজেন্দ্র। পুকুরের দখল নিতে গেলে অনন্ত বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্মণ দাস ধনী নয় বটে, কিন্তু সচ্ছল। সে নিজে অশিক্ষিত সত্যি, কিন্তু অনন্ত নামে তার শিক্ষিত একজন ছেলে আছে। ভেজাল দলিলের বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা ঠুকে দিয়েছে লক্ষ্মণ। সেই মামলার তারিখ ছিল আজ আদালতে।

মামলাটাকে দীর্ঘস্থায়ী করবার জন্য দীপেন-নৃপেন কেউই আদালতে হাজির হয়নি আজ। রাজেন্দ্র তাদের হয়ে অন্য একটা তারিখের জন্য পিটিশন দিয়েছে।

হতাশ হয়ে ফিরে আসবার সময় তাদের উকিল রশিদ সাহেব বলেছেন, ‘যে পুকুরটির জন্য লড়ছ, তা তো বৃথা যাবে রে অনন্ত!’

লক্ষ্মণ দাস ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করেছে, ‘কেন উকিল সাহেব, আমরা হেরে যাব নাকি!’

রশিদ উদ্দিন বলেছেন, ‘আরে শুধু তুমি না, তোমাদের হিন্দুপাড়ার সবাই হেরে যাবে।’ বলে মাথা নিচু করেছেন রশিদ সাহেব।

অনন্ত ত্রস্ত কণ্ঠে বলেছে, ‘কী হয়েছে উকিল সাহেব! আপনার কথার মানেটা বুঝতে পারছি না।’

‘আরও ক’মাস পরে বুঝতে পারবে, যখন ঘাড়ের ওপর খড়গ নেমে আসবে।’

লক্ষ্মণ দাস নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। হাহাকার করে বলে উঠল, ‘খোলসা করে বলেন না উকিল সাহেব!’

‘বিনোদপুরের সকল হিন্দুর সর্বনাশ হতে যাচ্ছে! নিজেদের ঘরবাড়ি, পুকুরঘাট, উঠানঘাটা আর তোমাদের নিজেদের থাকবে না লক্ষ্মণ!’

অনন্ত প্রায়-চিৎকার করে বলল, ‘কী বলছেন উকিল সাহেব!’

রশিদ উদ্দিন দ্রুত অনন্তের মুখে হাতচাপা দিলেন। বললেন, ‘চুপ চুপ! চিৎকার কর না। আমি আজ একটা অতি গোপনীয় ফাইল দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই ফাইল থেকে জেনেছি।’

‘কী জেনেছেন ?’ রশিদ উকিলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ছটফটানো কণ্ঠে বলে উঠল অনন্ত।

‘শোন অনন্ত, ব্যাপারটা আপাতত খুবই গোপনীয়। হ্যাঁ, দু-তিন মাস পরে তোমরা জানতে পারবে। এখন গোপন রাখা হয়েছে যাতে আগাম তোমরা সংগঠিত হতে না পার। দুম করে জানিয়ে একসময় তোমাদের ছত্রভঙ্গ করে ফেলার পরিকল্পনা আছে সরকারের।’ একেবারে চাপা কণ্ঠে রশিদ সাহেব বলে গেলেন।

মরা কণ্ঠে অনন্ত জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাপারটা কী উকিল সাহেব ?’

বাপ-ছেলেকে একপাশে টেনে নিয়ে গেলেন রশিদ সাহেব। তারপর অনন্তের কানের কাছে মুখ চেপে বললেন, ‘শিগগির তোমাদের পাড়াটি উচ্ছেদ করা হচ্ছে অনন্ত। সরকারি সিদ্ধান্তÑতোমাদের মানে হিন্দুদের উচ্ছেদ করে সেখানে বড় একটা কারখানা গড়ে তুলবে সরকার। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত এটি।’

লক্ষ্মণ দাস ধপাস করে মাটিতে বসে গেল।

অনন্ত জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে আমাদের উপায়!’

‘কোনও পথ খোলা রাখেনি আইয়ুবি সরকার। অন্তত ফাইলটি দেখে আমার তা-ই মনে হয়েছে।’

‘আমরা কী করব তাহলে!’ দীপেন-নৃপেনের জাল দলিলের কথা ভুলে, মামলার হয়রানির কথা ভুলে হতাশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল অনন্ত।

‘একটা কাজ তোমরা করতে পার। সবাই একত্রিত হয়ে একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে পার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে যদি তোমাদের সঙ্গে যুক্ত করতে পার, তাহলে সবচাইতে ভালো হয়। আর হ্যাঁ, এই ব্যাপারটা নিয়ে এখনই আন্দোলনে নেম না। কারণ তোমরা এ ব্যাপারে কিছু জান না। আমার কথা কাউকে বল না।’

অনন্ত প্রার্থনাসভায় সবিস্তারে সকল ঘটনা সবাইকে খুলে বলল।

শশাঙ্ক চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এখন আমরা কী করব জেঠা ? আমরা যে পথের ফকির হয়ে যাব রে জেঠা!’

আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ল অনন্ত।

একুশ

এত যে পোড়খাওয়া মানুষ

শশাঙ্ক চৌধুরী, তিনিও কীরকম

যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন!

বিনোদপুরের হিন্দুরা মিলে আন্দোলন একটা করেছিল।

কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি। বিনোদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেহ জহুর আর ভূমিমন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি জিয়াউদ্দিনের কারসাজির জন্য এই আন্দোলন ভেস্তে গিয়েছিল।

সেরাতে কথাটা খুব বেশি চাউর হয়নি। যে কয়েকটা পরিবারের মানুষ প্রার্থনা-আসরে এসেছিল, শুধু তারাই জেনেছিল, সর্বনাশের বিবরণটি। অন্যরা জেনেছিল পরদিন সকালে।

অনন্তের মুখে ঘটনাটি শুনে আসরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমন নিস্তব্ধ যে প্রত্যেকের শ্বাস পড়ার শব্দ প্রত্যেকে শুনতে পাচ্ছিল। তারপর মহিলারা ডুকরে উঠেছিল। আর পুরুষেরা যেন নিথর পাথর! কেউ কথা বলছে না। শুধু স্থির দুটো চোখ দিয়ে অনন্তের দিকে চেয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে একেবারে-সামনে বাঘ দেখার আতঙ্ক! তারা হাহাকার-আর্তনাদ করতেও ভুলে গেছে।

অনন্ত কথা বলল, ‘জেঠা, এখন আমাদের উপায় কী!’

এত-যে পোড়খাওয়া মানুষ শশাঙ্ক চৌধুরী, তিনিও কীরকম যেন ভেবাচেকা খেয়ে গেছেন! যে লোক ব্রিটিশরাজের পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি, যে শশাঙ্ক মাস্টারদার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে জীবনবাজি রেখে দেশমাতৃকা উদ্ধারের শপথ নিয়েছিলেন, আজ সেই শশাঙ্ক চৌধুরী যেন নির্জীব-নির্বীর্য হয়ে পড়েছেন। এত বড় সর্বনাশ! এত বড় বিপদের কথা তো তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি! এ তো একটা পরিবারের বিনাশের কথা নয়, এ তো কয়েকজন মানুষের সর্বস্বান্ত হবার সংবাদ নয়, এ যে বহু শত বছরের পুরোনো বনেদি গোটা একটা হিন্দুবসতির ধ্বংসের সংবাদ! এই পাড়ায় তো দু-দশ-ত্রিশটা পরিবার বাস করে না, বিনোদপুরের এই হিন্দুপাড়ায় তো আড়াইশো পরিবারের পুরুষানুক্রমিক বসবাস! এতগুলো পরিবার সরকারের এক নোটিশেই বাস্তুহারা হয়ে যাবে! এতগুলো মানুষ কি পথের ধারে আশ্রয় নেবে! কী বলবেন, কী করবেন দিশা পেলেন না শশাঙ্ক চৌধুরী। ফ্যাল ফ্যাল চোখে অনন্তের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

অনন্ত আবার বলল, ‘জেঠা, আপনি এরকম করে চুপ মেরে থাকবেন না। সর্বগ্রাসী এই ধ্বংস থেকে আমাদের বাঁচান জেঠা!’

এতক্ষণে শশাঙ্ক চৌধুরী কথা বললেন, ‘তুমি শান্ত হও অনন্ত। অধৈর্য হয়ো না। বিপদে অধৈর্য হওয়া ঠিক নয়। তাতে বিপদ আরও বাড়ে।’ বলে থামলেন তিনি। পাশে রাখা জলের গ্লাসটা তুলে কয়েক ঢোঁক  জল খেলেন। উত্তরীয় দিয়ে আস্তে করে মুখটা মুছে নিলেন শশাঙ্ক চৌধুরী।

তারপর বললেন, ‘তোমরা যারা আজ এখানে আছ, সবাইকে বলছিÑএ ক্ষতি শুধু তোমাদের নয়, আমারও। তোমরাই শুধু ভিটেবাড়ি হারাবে না, আমিও হারাব। আমার ভাইপোরাও হারাবে, আমার পাড়াপড়শিরা হারাবে, পাড়াজুড়ে আমার যেসকল আত্মীয়স্বজন, তারা সবাই উদ্বাস্তু হয়ে যাবে। পশ্চিম পাড়ার প্রান্তে আমাদের যে শ্মশানটি, সেখানে শত শত বছর ধরে আমাদের পরমাত্মীয়দের দাহ করা হয়েছে। সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তে আমরা সবকিছু হারিয়ে বসব।’

হরেন্দ্র বলে উঠল, ‘হারিয়ে বসব! এই ঘরবাড়ি, ধানের গোলা, পুকুরঘাটা, বাড়ির পাশের জমিটি, আম-কাঁঠালের গাছগুলিÑসবই আমরা হারিয়ে বসব!’

শশাঙ্ক বললেন, ‘উতলা হয়ো না হরেন্দ্র। আমরা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি। পাড়ায় তো গণ্যমান্য মানুষের অভাব নেই! রাজকমল আছেন, ডাক্তার পূর্ণেন্দু আছেন, ক্ষিতীশ চৌধুরী আছেন। দীপেন-নৃপেনও তো আছে। আরও আছে শত শত নারী-পুরুষ। ওঁদের সঙ্গে আমরা কথা বলি। ওঁরা কী বলেন দেখি।’

একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন শশাঙ্ক চৌধুরী। ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বললেন, ‘এখন তোমরা যার যার বাড়িতে ফিরে যাও। আর অনন্ত তোমাকে বলছি, সকালে তো তেমন কাউকে পাবে না, আগামীকাল বিকেলে প্রাইমারি স্কুলের মাঠে সবাইকে একত্রিত করতে পার কি না দেখ। ওখানেই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।’

পরদিন সকালে বিনোদপুর হিন্দুপাড়াটির প্রতিটি বাড়ি আর্তনাদে উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল। সকালের কাজ ফেলে প্রতিটি নারী বিলাপ করতে শুরু করেছিল, প্রতিটি পুরুষ নিত্যদিনের কাজ ভুলে গালে হাত দিয়ে দাওয়ায় বা গাছের নিচে বসে পড়েছিল। প্রতিটি বাড়িতে যেন কোনও পরমাত্মীয় মারা গেছে! সেই পরমাত্মীয়ের মৃত্যুশোকে পরিবারের সবাই যেন মুহ্যমান! নারীদের ক্রন্দনে-বিলাপে, পুরুষদের মর্মন্তুদ আর্তচিৎকারে হিন্দুপাড়ার আকাশ-বাতাস আর্দ্র হয়ে উঠেছে।

 সে বেলা অনেক বাড়িতে রান্না হলো না। দলে দলে মানুষেরা পরস্পরে আলাপে রত হলো। আলাপের একটাই বিষয়Ñআমাদের কী হবে! কোথায় যাব আমরা! এই পথঘাট, খেলার মাঠ, ওই মন্দিরটি, বছর বছর দুর্গাপূজা, পাড়ার মাঝখানের ওই বিশাল বটগাছটি − সবকিছু হারিয়ে যাবে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে! আর আমাদের সন্তানরা! তাদের কী হবে! কোথায় পড়বে তারা! সর্বস্বান্ত হয়ে মেয়েটার বিয়ে দেব কী করে! আর ওই যে বুড়ো মা-বাপ দুজন, যারা চলৎশক্তি রহিত, ওদের নিয়ে আমি কী করব! কোথায় রাখব আমি আমার জননীকে! আমার জন্মদাতা বাপটি কি শেষজীবনে রাস্তার ধারের ঝুপড়িতে কাটাবে!

এই করে করে সকাল কাটল, দুপুর গড়াল, বিকেল এলো। খুব বেশি জনসংযোগ করতে হয়নি অনন্তদের। আপনাতেই দলে দলে মানুষ এসে জড়ো হলো বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলের মাঠে। গণনীয়-অগণনীয় সবাই এল। সবাই নিজেদের মতামত দিল। কারও কণ্ঠ হতাশায় ভরা, কারও গলা আবার দ্রোহে উত্তেজিত।

দীপেন বলল, ‘আচ্ছা, ঘটনাটা সঠিক কিনা, তা তো আমরা জানি না! কোথাকার কে কী শুনে এলো কোর্ট থেকে, তাতেই উত্তেজিত হয়ে হইচই করা কি ঠিক হবে ?’

দীপেনের কটাক্ষের ব্যাপারটি সবাই বুঝল। সবাই জানেÑঅনন্তদের সঙ্গে দীপেনদের মামলার কথা। সুযোগ পেয়ে দীপেন যে অনন্তকে আঘাত করছে, বুঝতে কারও অসুবিধা হলো না।

কিন্তু যে উত্তেজিত হয়ে উঠার কথা, সেই অনন্ত স্থির থাকল।

দৃঢ় কণ্ঠে সবার উদ্দেশে সে বলল, ‘আমি ভুল শুনিনি, মিথ্যা তথ্য দিইনি। আর আমাদের উকিল রশিদ সাহেবের এমন কী স্বার্থ যে মিথ্যেকথা বলে বিনোদপুরের হিন্দুদের বিভ্রান্ত করবেন ?’

দীপেন আবার বলল, ‘কোথাকার ছাপোষা কোন উকিল! রাজেন্দ্রবাবুর মতো নাম করা কোনও উকিল হলে না-হয় একটা কথা ছিল!’

সমবেতদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। বেশিরভাগই দীপেনের সমালোচনামূলক। গুঞ্জন ধীরে ধীরে কোলাহলে রূপ নিতে যাচ্ছিল। ডাক্তার পূর্ণেন্দু সেন উত্তেজনার রাশ টেনে বললেন, ‘আপনারা সবাই একযোগে কথা বললে আমাদের আসল উদ্দেশ্যটাই ভেস্তে যাবে।’

তারপর দীপেনের দিকে ফিরলেন ডাক্তারবাবু। বললেন, ‘দেখো দীপেন, ঘটনাটা সত্য কিনা এ বিষয়ে তোমার সন্দেহ আছে, বুঝছি। কিন্তু ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়, দু’মাস পরে যদি সরকারি নোটিশটা আমাদের কাছে আসে, তখন কিন্তু দিশেহারা হয়ে পড়ব আমরা! অনন্ত যে সংবাদটা এনেছে, সেটাকে সত্য ধরে আমরা এগোলে ভুল হবে না। বরং উপকার হবে। আর শেষ পর্যন্ত যদি অনন্তের খবরটি মিথ্যে হয়, তাহলে তো পাড়াবাসির কোনও ক্ষতি হলো না। আমার মতে প্রস্তুতিটা নিয়ে রাখা ভালো।’

ডাক্তারের মন্তব্যকে সবাই মেনে নিলেন। সবাই বললেনÑপরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে তা-ই বলুন।

শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো, আগামীকাল সবাই মিলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেহ জহুরের সঙ্গে দেখা করবেন। তিনি জনপ্রতিনিধি, সরকারেরও অংশ তিনি। তিনি অবশ্যই একটা পথ দেখাবেন বিনোদপুরের হিন্দুদের।

বাইশ

আমি জানতে চাইছিÑরামায়ণ বইটি

বাল্মীকি ঠাকুর কখন লিখলেন ?

পরদিন সকাল দশটা নাগাদ হিন্দুপাড়ার গণ্যমান্যরা ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হয়েছিলেন।

তার আগেই চেয়ারম্যান ছালেহ জহুর পৌঁছে গিয়েছিলেন। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিন দশটায় চেয়ারম্যান তাঁর অফিসে এসে বসেন। এত বড় বিনোদপুর ইউনিয়ন! লোকজনের সংখ্যাও তো কম নয়! হাজারো লোকের হাজারো সমস্যা। সব সমস্যা তো আর পারিবারিকভাবে মিটে যায় না। অনেক সমস্যা ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত গড়ায়। ওই সকল সমস্যা-বিরোধ চেয়ারম্যানকেই মিটাতে হয়। তার জন্য প্রচুর সময়ের দরকার। এজন্য নিয়ম করে প্রতিদিন দশটায় অফিসে চলে আসেন ছালেহ জহুর।

শুক্রবার অফিসে আসেন না তিনি। জুম্মার দিন। নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। ওই একটা দিনই স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে ভালো করে কথা হয়। সুখাসুখের বার্তা বিনিময় হয়। অন্যান্য দিন যথাসময়ে নামাজ পড়তে না পারলেও জুম্মার নামাজটায় ঠিকঠাক সময়ে মসজিদে উপস্থিত হন চেয়ারম্যান।

জনগণের ভালোর দিকে ছালেহ জহুরের কড়া নজর। জনপ্রিয় চেয়ারম্যান তিনি। পর পর তিনবারের চেয়ারম্যান তিনি এই বিনোদপুর ইউনিয়নের। বিপদের দিনে হিন্দুপাড়ার লোকজন তাঁর কাছে ছাড়া কার কাছে যাবেন! তাই তাঁরা আজ চেয়ারম্যানের কাছে এসেছেন। তাঁরা মনে করছেন, এই মহাবিপদ থেকে কেউ যদি তাঁদের রক্ষা করতে পারেন, তিনি আর কেউ নন, চেয়ারম্যান ছালেহ জহুরই।

চেয়ারম্যান ছালে জহুর নাভিতে তেল দিয়ে ঘুমান না। ইউনিয়নবাসীর ওপর তাঁর তীক্ষè নজর। গ্রামের কোথায় কী হচ্ছে, তার সংবাদ রাখার জন্য চেয়ারম্যানের নিজস্ব কয়েকজন লোক আছে। তারাই চেয়ারম্যানকে আগাম সংবাদ এনে দেয়। কাল বিকেলের হিন্দু-সম্মিলনের খবরটি আজিজের মাধ্যমে গত সন্ধ্যাতেই জেনে গেছেন চেয়ারম্যান। মুসলিম লীগ করা মানুষ তিনি। বুদ্ধিতে ঝানু। আগামীদিনের ব্যাপারটার কীভাবে মুখোমুখি হবেন, বাড়িতেই মনে মনে ট্রায়াল দিয়ে রাখলেন চেয়ারম্যান।

এতজন হিন্দুকে একসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হতে দেখে বেশ অবাকই হলেন ছালেহ জহুর। বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, ‘কী ব্যাপার, এত মানুষ আজ আমার অফিসে! আরে আসেন আসেন শশাঙ্কবাবু, আসেন ডাক্তারবাবু। আরে চৌধুরীমশাইও তো উপস্থিত দেখি! কী রে হরেন্দ্র, তুমিও এসেছ দেখছি। আস আস, বস। আরে তাজ্জব কী বাত, দীপেনবাবুও এখানে! বসেন আপনারা সবাই, ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেন চেয়ারে।’

শশাঙ্ক চৌধুরী বললেন, ‘আপনি ব্যস্ত হবেন না চেয়ারম্যান সাহেব। আমরা একটা বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।’

‘বিপদ! কী বিপদ!’ হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে বসলেন চেয়ারম্যান। তাঁর চোখেমুখে ভয়ের আভা। তবে যাদের দেখার চোখ আছে, তাদের বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে চেয়ারম্যানের চোখমুখের এই ত্রাস কৃত্রিম। বিপদগ্রস্ত হিন্দুপাড়ার কেউ চেয়ারম্যানের মুখের ভাষা বুঝতে পারলেন না।

শশাঙ্ক চৌধুরী সংক্ষেপে অনন্তের বরাত দিয়ে সকল কথা চেয়ারম্যানকে খুলে বললেন। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে গোটা হিন্দুপাড়া আতঙ্কগ্রস্ত, এই দুঃসংবাদ শোনার পর অনেকে যে নাওয়াখাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, বলতে ভুললেন না শশাঙ্ক চৌধুরী।

শেষে শশাঙ্ক চৌধুরী বললেন, ‘আমরা কোথায় যাব, কী করব বলুন চেয়ারম্যান সাহেব ?’

সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন ছালেহ জহুর। তারপর দমফাটা হাসিতে ফেটে পড়লেন। অনেকক্ষণ হেসে গেলেন তিনি। উপস্থিত সবাই চেয়ারম্যানের হাসির বহর দেখে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন।

হাসি থামিয়ে চেয়ারম্যান দুম করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, আপনাদের রামায়ণ রচিত হয়েছিল কখন ?’

চেয়ারম্যানের প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়ার জন্য নিজেকে উপযুক্ত মনে করলেন ডাক্তার পূর্ণেন্দু সেন। অবসর সময়ে তিনি বেশ করে রামায়ণ-মহাভারত পড়েন।

ডাক্তার বললেন, ‘রামায়ণ রচনার সময় নিয়ে তো মতভেদ আছে। কেউ বলেন, তিন হাজার বছর আগে, কেউ বলেন দুই…।’

মুখের কথা কেড়ে নিলেন ছালেহ জহুর। বললেন, ‘ডাক্তারবাবু, আমি রামায়ণ রচনার সন-তারিখের কথা বলছি না।’

ডাক্তার আমতা আমতা করে বললেন, ‘তাহলে!’

‘আমি জানতে চাইছিÑরামায়ণ বইটি বাল্মীকি ঠাকুর কখন লিখলেন ? এই বইয়ের নায়ক তো রামÑতাই না ?’

ডাক্তারবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ। অবতার রামই এই মহাগ্রন্থের কেন্দ্রচরিত্র।’

চেয়ারম্যান এবার বললেন, ‘বাল্মীকি রামায়ণ বইটি রামের জন্মের আগে লিখেছেন, না জন্মের পরে লিখেছেন ?’

এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা সুকুমার দাশ বলে উঠল, ‘শাস্ত্রকাররা তো বলেন, রামের জন্মের বহু আগেই ঋষি বাল্মীকি রামকে নিয়ে রামায়ণ গ্রন্থটি রচনা করেছেন।’

‘ঠিক তাই। আমিও জানি সেরকম। এবং সেটাই বোধহয় সত্য, কী বলেন শশাঙ্কবাবু ?’ থেমে থেমে বলে গেলেন চেয়ারম্যান।

ছালেহ জহুরের কথার ধরনভঙ্গি বুঝে উঠতে পারছেন না শশাঙ্ক চৌধুরী। নিয়ে এলেন মস্তবড় বিপদের সংবাদ, বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় জানতে চাইলেন চেয়ারম্যানের কাছে, চেয়ারম্যান সেদিকে না গিয়ে রামায়ণের রচনাবৃত্তান্তের কথা ফেঁদে বসলেন! ইতস্তত করতে শুরু করলেন শশাঙ্ক চৌধুরী।

শশাঙ্ক চৌধুরীর উত্তরের অপেক্ষা না করে ছালেহ জহুর বললেন, ‘বাল্মীকির বহু দূরদৃষ্টি ছিল, তাই তিনি রামের জন্মেরও বহু বহু বছর আগে রামায়ণ লিখে ফেলেছিলেন। বাল্মীকি এমন বিচক্ষণ ছিলেন যে পরবর্তীকালে রামের জীবনে সংঘটিত প্রত্যেকটি ঘটনা রামায়ণের ঘটনার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।’ বলে চেয়ারম্যান নিশ্চুপ হয়ে রইলেন।

উপস্থিত সবাই প্রায়-হতভম্ভ। চেয়ারম্যান সাহেব কোন কথাটি কোন দিক থেকে ঘুরিয়ে বলতে চাইছেন, বুঝতে পারছেন না কেউ।

হঠাৎ চেয়ারম্যান আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আপনাদের হিন্দুপাড়ায় নতুন করে কোনও বাল্মীকি জন্মেছেন নাকি ?’

ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন, ‘মানে!’

মানে বাল্মীকির মতো হিন্দুপাড়া-উচ্ছেদের রামায়ণ রচনা করে আপনাদের শোনাল, আর আপনারা তা বিশ্বাস করে রাতের ঘুম হারাম করলেন, খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিলেন, বিকেলবেলা স্কুল মাঠে মিটিং করলেন এবং আজ হা-হুতাশ করতে করতে চেয়ারম্যানের কাছে চলে এলেন!’

অনন্ত দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘এই কথা মিথ্যে নয় হুজুর। আমি নিজ কানে শুনে এসেছি।’

চেয়ারম্যান এবার গরম গলায় বললেন, ‘রাখ তোমার মিথ্যে না হুজুর আর নিজ কান! আনকথায় কান ভারী করে গোটা হিন্দুপাড়ায় একটা ত্রাস সৃষ্টি করেছ তুমি অনন্ত। এটা মোটেই ভালো করনি তুমি।’

তারপর সবার দিকে মুখ ফেরালেন ছালেহ জহুর।

কণ্ঠে আবেগ ঢেলে বললেন, ‘আমি আপনাদের যেমন চেয়ারম্যান, পাকিস্তান সরকারেরও প্রতিনিধি। আমার এলাকায় এত বড় একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, আমাকে জানাবে না সরকার! আর জানালে, তা হতে দেব কেন ?’ একটু খাঁকারি দিলেন চেয়ারম্যান।

তারপর বললেন, ‘শুনেন সবাই, এরকম কোনও ঘটনা এই গ্রামে ঘটবে না। এরকম কোনও খবর আমার জানা নেই। এরকম উচ্ছেদের কথা স্বপ্নেও ভাববেন না আপনারা। নিশ্চিন্তে বাড়িতে ফিরে যান। এরকম উচ্ছেদের ঘটনা আমার জান থাকতে হতে দেব না বিনোদপুরে।’

হঠাৎ দীপেন চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘ওই হারামজাদা অনন্ত আমাদের মিথ্যে সংবাদটা দিয়েছে চেয়ারম্যান সাহেব। সকল গণ্ডগোল-অশান্তির মূল ওই অনন্তই।’

ক্ষিতীশ চৌধুরী বললেন, ‘তুমি অনন্তকে এভাবে অপদস্থ করতে পারো না দীপেন। ও যে মিথ্যে খবর এনেছে, তা তো প্রমাণিত হয়নি এখনও।’

দীপেন বলল, ‘রাখো তোমার উপদেশ আর মহান বাণী।’

এইভাবে হিন্দুপাড়ার মানুষেরা দুভাগ হয়ে গেলেন। কেউ দীপেনের পক্ষে গেলেন, কেউ অনন্তের পক্ষে। প্রায় ঝগড়া করতে করতেই ইউনিয়ন পরিষদ ত্যাগ করলেন বিনোদপুরের হিন্দুরা।

ওঁরা কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে মুচকি একটু হাসলেন চেয়ারম্যান ছালেহ জহুর।

তেইশ

পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পূর্ব

পাকিস্তানের হিন্দুদের বোবা করে ফেলেছে।

এই ঘটনার তিন মাস পরে নোটিশটা এলো।

হিন্দুপাড়া অ্যাকোয়ারের সরকারি নোটিশ। ঠিকদুপুরের আগে আগেই এলো নোটিশটা। এগারোটা সাড়ে এগারোটা তখন। কিছু কিছু বাড়িতে দুপুর-খাবারের রন্ধন-প্রক্রিয়া শেষের দিকে। বেশির ভাগ বাড়িতে রন্ধনের প্রস্তুতি চলছে। চাষবাস করে যারা, মাঠে চলে গেছে। দু’চারজন যারা চাকরি করে, তারাও কর্মক্ষেত্রে। প্রাইমারি স্কুল থেকে কচি কণ্ঠের কলরব উত্থিত হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। বিনোদপুর হাই স্কুলের কোনও কোনও শ্রেণিকক্ষ থেকে বেতের সপাং সপাং ভেসে আসছে। হিন্দুপাড়াটির গাছে গাছে তখন দোয়েল-চড়ুাই-টুনটুনির লাফাঝাপি। উঠোনে উঠোনে কবুতরের বাকুম বাকুম।

বর্ষা কেটে গেছে। শরৎ এলো বলে। আর ক’দিন পরেই দুর্গাপূজার ঢাক বেজে উঠবে। পাড়ার দুর্গামন্দিরে প্রতিমা বানানোর কাজ শুরু হয়েছিল, বেশ আগে। মাটির প্রলেপের কাজ শেষ। আরেকটু শুকালেই যোগেন পাল হাতে রঙতুলি তুলে নেবেন।  গত কুড়ি বছর ধরে যোগেন পাল বিনোদপুরের এই দুর্গামন্দিরে প্রতিমা বানিয়ে আসছেন। তাঁর বাবাও এই মন্দিরে প্রতিমা বানিয়ে গেছেন সারাজীবন। এ তল্লাটে, আশপাশের গ্রামে আরও আরও দুর্গোৎসব হয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই হিন্দুপাড়ার দুর্গা প্রতিমা শ্রেষ্ঠ বলে প্রশংসিত হয়।

গণেশ ঠাকুরের গাত্র-মাটি শুকিয়ে গেছে। যোগেন পাল মনস্থ করেছেন, আজ ঠাকুরের গায়ে রঙের প্রথম পোঁচটি দেবেন। রঙের ভাণ্ডে রঙ গুলছেন তিনি। তাঁকে ঘিরে পাড়ার কৌতূহলী শিশুরা।

ঠিক এই সময় নোটিশটা এলো। সঙ্গে মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন। তাঁর সঙ্গে একজন পিয়াদা। সরকারি গাড়িটা মূল রাস্তায় রেখে কিছুটা পথ হেঁটে এসেছেন জিয়াউদ্দিন। গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে তেমন কাউকে খুঁজে পাননি জিয়াউদ্দিন। শুধু আট-দশটা বালকবালিকা গাড়িটার চারদিকে ঘুরে যাচ্ছিল। তাদের চোখেমুখে অবাক বিস্ময়। এই বিনোদপুরে কদাচিৎ দু’একটা গাড়ি আসে। তাও যখন তখন নয়, কখনও সখনও। কলের গাড়ি এলে শিশুদের বিস্ময়ের অবধি থাকে না। আজও চোখেমুখে অপার বিস্ময় নিয়ে শিশুগুলি জিয়াউদ্দিনের গাড়িটি দেখে যাচ্ছিল।

কাউকে না পেয়ে ভেতরটায় বেশ অস্থিরতা বোধ করতে শুরু করলেন জিয়াউদ্দিন। নির্দেশ আছেÑপাড়ার মানুষদের ব্যাপারটা অবগত করিয়ে গণ্যমান্য কাউকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নোটিশের এক কপি অফিসে জমা দিতে হবে।

ব্যাপারটা যে বিপজ্জনক, সম্যক অবগত আছেন জিয়াউদ্দিন। এরকম ক্ষেত্রে এলাকাবাসী ক্ষেপে যায়। হিংস্র হয়ে ওঠে তারা। বাস্তুহারানোর ভয় তাদেকে মারমুখী করে তোলে। অধিকাংশ সময় আক্রমণ করে বসে। তখন নোটিশ বহনকারীর প্রাণসংশয় হয়। এরকম অভিজ্ঞতা জিয়াউদ্দিনের আছে। রসুলপুরে এরকম একটা জায়গা অ্যাকোয়ারের নোটিশ নিয়ে গিয়ে এলাকাবাসীর ধাওয়া খেয়েছিলেন। ওরা ছিল মুসলমান। ভরসার ব্যাপার এটা যে আজকে যাদের নোটিশ দিতে এসেছেন, তারা হিন্দু। হিন্দুরা মারমুখী নয়। এদেশের আইন তাদেরকে কুঁঁজো করে দিয়েছে। পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের বোবা করে ফেলেছে।

এখানে অন্তত আক্রান্ত হবেন নাÑএই ভরসাটুকু বুকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন জিয়াউদ্দিন। এই নোটিশের সারমর্ম এলাকার মানুষদের অবগত করাতেই হবে, কাউকে না কাউকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিতে হবেÑএরকমই সরকারি নির্দেশ আছে তাঁর ওপর। ছলেকৌশলে এই হিন্দুপাড়াটি অ্যাকোয়ার করতেই হবে। এই স্থানের দখল নিয়ে জিএম প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতেই হবে। মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনকেই এই পাড়া উচ্ছেদের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। বলা হয়েছেÑএটির সার্থকতার ওপর তোমার প্রমোশন নির্ভর করে জিয়াউদ্দিন। যদি সাকসেসফুল হও, তাহলে সরাসরি ঢাকাতে পোস্টিং হবে তোমার। ভূমিমন্ত্রণালয়ের উচ্চপদ পাবে তুমি। ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো চক চক করে উঠল জিয়াউদ্দিনের। খোলা চোখে চারদিকে আবার তাকালেন তিনি। কিন্তু বয়স্ক কাউকে খুঁজে পেলেন না। হঠাৎ তাঁর মনে পড়লÑপ্রত্যেক হিন্দুপাড়ায় দু’একটি সর্বজনীন মন্দির থাকে। সেইসব মন্দিরে সর্বদা কেউ না কেউ থাকে। অন্তত পুরুত ঠাকুর তো থাকেই। ওখানে গেলে কাউকে না কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে।

কৌতূহলী শিশুদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, এ পাড়ার মন্দিরটি কোথায় বল তো।’

শিশুরা সবাই একযোগে বলে উঠল, ‘আমি বলি, আমি বলি!’

জিয়াউদ্দিন চোখেমুখে স্নেহ ছড়িয়ে বললেন, ‘তোমরা সবাই একসঙ্গে কথা বলো না। একজনে বলো।’

মাথাতোলাটি বলল, ‘আমি বলি ?’

জিয়াউদ্দিন বললেন, ‘বলো।’

ছেলেটি ডান হাতটাকে উঁচু করে তুলে বলল, ‘ও-ই দিকে।’

মিষ্টি করে হাসলেন জিয়াউদ্দিন। বললেন, ‘ওইদিকে বললে তো আমি চিনব না খোকা। আমাকে মন্দিরে নিয়ে যেতে পারবে ?’

আবার সমস্বরে সবাই বলে উঠল, ‘পারব। আমাদের সঙ্গে চলেন।’

এবার জিয়াউদ্দিন তাদের বাধা দিলেন না। ওদের মতো গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘চলো।’

সবাই দলবেঁধে আগে আগে হাঁটতে শুরু করল। পরস্পরে ঠেলাঠেলি করে এগোতে লাগল তারা। প্রতি প্রত্যেকে জিয়াউদ্দিনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার নেতৃত্ব নিতে তৎপর। কেউ কেউ পেছন ফিরে জিয়াউদ্দিনকে বলছে, ‘আসেন, আমার সঙ্গে সঙ্গে আসেন। আমি মন্দির চিনি।’

অন্যজন বলছে, ‘আমিও চিনি। আপনি আমার সঙ্গে আসেন।’

ছোট্ট শিশুরা তো আর জানে না, তারা খাল কেটে তাদের পাড়ায় কুমির ঢোকাচ্ছে! ওরা তো আর জানে না, কী সর্বনাশের বার্তাবাহককে পথ দেখিয়ে পাড়ার ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে!

শিশুরা পরস্পর গুঁতোগুঁতি আর কোলাহল করতে করতে এগোচ্ছে আর তাদের পেছন পেছন মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন। তাঁরও পেছনে মরণবাণ হাতে পিয়াদাটি। পিয়াদাটির হাতে নোটিশের ফাইলটি।

দুর্গামন্দিরে পৌঁছে গেলেন জিয়াউদ্দিন। যোগেন পালকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। অন্তত একজন বয়স্ক মানুষকে তো পাওয়া গেল!

কোটপ্যান্টপরা সাহেবকে দেখে যোগেন পাল ভড়কে গেলেন। কী করবেন, বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি। বহুক্ষণ পরে রা ফুটল তাঁর। বললেন, ‘বসেন বসেন।’ মন্দিরে পড়ে থাকা একটা একপা-ভাঙা চেয়ার এগিয়ে দিতে দিতে বললেন যোগেন পাল।

জিয়াউদ্দিন বসলেন না। বললেন, ‘আপনি কি এই পাড়ার লোক ?’

যোগেন পাল বললেন, ‘আমি এ পাড়ার না, এই বিনোদপুরেরও না। আমার বাড়ি কুমিল্লার বিজয়নগরে। ওখান থেকে আমি বছরে একবার এই বিনোদপুরে আসি, প্রতিমা বানাবার জন্য।’

জিয়াউদ্দিনের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, লোকটি সহজ ধরনের এবং অধিক কথায় অভ্যস্ত। নইলে একটি প্রশ্নের এত দীর্ঘ উত্তর কেন ?

‘আচ্ছা, আমি এ পাড়ার মাননীয় কেউ একজনের সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ জিয়াউদ্দিন মৃদু গলায় বললেন।

এবার যোগেন পাল আমতা আমতা করে বললেন, ‘এই দুপুরবেলায় তো কাউকে পাবেন না! তবে হ্যাঁ, একজনকে পেতে পারেন।’

‘কে তিনি ?’

‘শশাঙ্ক চৌধুরী। এই পাড়ার সবাই তাঁকে মানে।’

‘কীভাবে তাঁর দেখা পাবো ?’

যোগেন পাল উত্তর দেওয়ার আগে শিশুর পাল চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘ডেকে আনি দাদুকে ? বেশি দূরে নয় দাদুর বাড়ি।’

জিয়াউদ্দিন যোগেন পালের তোয়াক্কা না করে বললেন, ‘ডেকে আনো।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই শশাঙ্ক চৌধুরী দুর্গামন্দিরে উপস্থিত হলেন। তাঁর চোখেমুখে গভীর উৎকণ্ঠা।

শশাঙ্ক চৌধুরীর মন বলছেÑওই লোকটি ভীষণ একটা খারাপ সংবাদ নিয়ে এখানে এসেছে।

চব্বিশ

সবাই বুঝলÑএতক্ষণ বিনয় দেখালেও জিয়াউদ্দিন

এখন পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে। তারা এও বুঝল যে লোকটি

আকারে ছোটখাটো হলেও বিশাল ক্ষমতা রাখে।

উদ্বেগ চেপে শশাঙ্ক চৌধুরী বললেন, ‘আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন কেন ?’

উত্তর না দিয়ে জিয়াউদ্দিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি শশাঙ্ক চৌধুরী ?’

‘হ্যাঁ, তাই। আপনি ?’

‘আমি জিয়াউদ্দিন, মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন।’

‘ওÑ। আচ্ছা, এই ঠিকদুপুরে আমার সঙ্গে আপনার কী কাজ ? মানে কী দরকারে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন, বুঝতে পারছি না!’

‘অফিস থেকে ঠিক সময়ে রওনা দিয়েছিলাম। এই গাঁয়ের রাস্তা যে এত খারাপ জানতাম না। গাড়ি প্রায় চলছিলই না। তাই পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশ দেরিই হয়ে গেল।’ বিনীত কণ্ঠ জিয়াউদ্দিনের।

‘কোন অফিস থেকে এসেছেন! এই পাড়াতেই-বা কেন এসেছেন!’ হঠাৎ শশাঙ্ক চৌধুরীর মন কু ডেকে বসল।

‘আমি ভূমিমন্ত্রণালয়ের অফিস থেকে এসেছি। পাকিস্তান সরকারের একটা নোটিশ আছে আপনাদের জন্য।’

‘আপনার পরিচয় ?’ মরা গলায় শশাঙ্ক চৌধুরী জানতে চাইলেন।

‘আমি ওই মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদের কর্মকর্তা। এই ব্যাপারটার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছে সরকার।’

‘কোন ব্যাপারটার ?’

জিয়াউদ্দিনের মুখ দিয়ে ফস করে বেরিয়ে এলো, ‘এই পাড়াটা অ্যাকোয়ারের ব্যাপারটার।’

‘অ্যাকোয়ারের! মানে হিন্দুপাড়া উচ্ছেদের!’ নিজের অজান্তে চিৎকার করে উঠলেন শশাঙ্ক চৌধুরী।

কণ্ঠকে গদ গদ করে জিয়াউদ্দিন বললেন, ‘আপনি উত্তেজিত হবেন না। ধৈর্য ধরুন। আমি নিমিত্তমাত্র। সরকারের বার্তাবাহক ছাড়া কেউ নই আমি।’

গলা ফাটানো আর্তচিৎকারে ফেটে পড়লেন শশাঙ্ক চৌধুরী, ‘আপনি বার্তাবাহক নন, আপনি যমদূত। আমাদের মৃত্যু-পরোয়ানা নিয়ে এসেছেন আপনি।’

জিয়াউদ্দিন ভেবেছিলেন, সহজে কাজটা হয়ে যাবে। নোটিশটা কোনও রকমে কাউকে গছিয়ে দিয়ে আঙুলের টিপ বা সই নিতে পারলেই দায়টা মিটে যাবে। কিন্তু শশাঙ্ক চৌধুরী নামে যাঁকে ডেকে আনা হলো, বাহির থেকে তাঁকে শান্ত-সৌম্য দেখালেও ভেতরে তো দেখা যাচ্ছে অগ্নিকুণ্ড! শশাঙ্ক চৌধুরীর চিৎকারে ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন জিয়াউদ্দিন। তিনি পলকহীন চোখে শশাঙ্ক চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

ইতোমধ্যে পাড়ার যারা বেকার বা বৃদ্ধ অথবা তরুণ-কিশোর, তারা মন্দির চত্বরে চলে এসেছে। শশাঙ্ক চৌধুরীর কথা শুনে তারা অনুমান করতে পারল যে কিছুদিন আগে উচ্ছেদের ব্যাপার নিয়ে স্কুলমাঠে যে মিটিং হয়েছিল, এটা তারই জের। আর ওই লোকটি ভীষণ কোনও ক্ষতিকর খবর নিয়ে এসেছেন। দ্রুত তারা ঘরে ঘরে ছুটে গেল, ক্ষেতের দিকেও চলে গেল কেউ কেউ।

অল্প সময়ের মধ্যে শশাঙ্ক চৌধুরী আর জিয়াউদ্দিনকে ঘিরে মানুষের জটলা তৈরি হয়ে গেল। সবার মুখ হিংস্র, মারমুখী। এদের চোখমুখ বলছেÑযে কোনও সময় মস্তবড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে এরা। কারও ইঙ্গিতের জন্য বোধহয় এরা টগবগ করে ফুটছে।

অনন্ত চিৎকার দিয়ে বলল, ‘কী, কী হয়েছে জেঠা ? এই লোকটি কেন এসেছে ?’

শশাঙ্ক চৌধুরী চোখ বুলিয়ে দেখলেনÑওই একপাশে দীপেন দাঁড়িয়ে মুখ লুকাচ্ছে। পূর্ণেন্দু, হরেন্দ্র, ক্ষিতীশ, রাজকমলÑসবাইকে দেখতে পাচ্ছেন শশাঙ্ক চৌধুরী।

শশাঙ্ক চৌধুরী স্থির কণ্ঠে বললেন, ‘শান্ত হও অনন্ত। মানুষ রাগে মাগে।’

সবাইকে শান্ত থাকার কথা বলে শশাঙ্ক চৌধুরী জিয়াউদ্দিনকে লক্ষ করে বললেন, ‘বলেন, আপনি কী বলতে এসেছেন ?’

জিয়াউদ্দিন একটু ভরসা পেলেন। তিনি জানেনÑএখন তাঁর সংকটময় সময় এবং সংকট উত্তরণের কাল। এই সময় চালে একটু ভুল করলেই জীবনসংশয় হতে পারে তাঁর। সংকট উত্তরণের প্রধান অস্ত্র সহিষ্ণুতা আর বিনয়। বিনয়ে বিনম্র হলেন জিয়াউদ্দিন। চোখেমুখে অশেষ সহানুভূতির প্রলেপ ছড়িয়ে দিলেন।

নরম গলায় বললেন, ‘দেখুন, আমি একজন সরকারি কর্মকর্তা ছাড়া আর কেউ নই। কেন্দ্রীয় সরকারের একটা নির্দেশনা আপনাদের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাকে। ওই বার্তাটা জানানোর জন্য আমি এসেছি।’

কণ্ঠকে সমতলের সমান করে চোখ ছলছলিয়ে জিয়াউদ্দিন আরও বললেন, ‘আপনারা তো জানেন, পাকিস্তানের সকল ক্ষমতা এখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে ছোটবড় সকল সিদ্ধান্ত ওই রাওয়ালপিন্ডিতেই নেওয়া হয়। আমরা পূর্ব পাকিস্তানিরা আই মিন বাঙালিরা ওদের হাতের পুতুল ছাড়া কিছুই নয়।’ ইচ্ছে করে থেমে গেলেন জিয়াউদ্দিন। তাঁর মনভোলানো ভাষণে মালাউনের পুতরা কী রকম কুপোকাত হয়ে যাচ্ছে, চোখ মেলে দেখতে ইচ্ছে করল জিয়াউদ্দিনের। দেখলেনÑঅনেকে তাঁর কথায় মুগ্ধ। অনেকের অবয়ব থেকে হিংস্রভাব তিরোহিত।

আবার বলতে শুরু করলেন জিয়াউদ্দিন, ‘আমি যে নোটিশটা নিয়ে এসেছি, তা আপনারা গ্রহণ করুন বা না করুন, শুনতে তো আপত্তি নেই। আর নোটিশের নির্দেশনাগুলো আপনাদের মানতে হবে, তেমনও তো কথা নয়! আপনাদের যদি শক্তি-সামর্থ্য থাকে, লড়ে যাবেন। আর লড়বেন না-ই-বা কেন ? এত এত জায়গা থাকতে হিন্দুবসতি উচ্ছেদের পরিকল্পনা কেন ? আপনারা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলবেন।’

অনন্ত বলে উঠল, ‘আরে, এ লোক তো আমাদের রামায়ণ শুনিয়ে যাচ্ছে! ভেতরে ভক্তিভাব জাগিয়ে প্রত্যেককে রামভক্ত হনুমান করে তুলল যে! আপনারা এই লোকটির বুজরুকিকে বিশ্বাস করবেন না। আগে আমার কথা বিশ্বাস না করে কী ভুল করেছেন, এখন টের পাচ্ছেন তো আপনারা ? শোনেন জিয়াউদ্দিন কী ফিয়াউদ্দিন, তোমার ওই ধান্ধাবাজিকথা ছাড়, কিছু একটা অঘটন ঘটে যাওয়ার আগে এখান থেকে কেটে পড়।’

গাঁয়ের সামান্য এক যুবকের দুর্ব্যবহার বড় বেশি করে জিয়াউদ্দিনের বুকে এসে লাগল। কিন্তু অনন্তের অপমানকে সয়ে নিলেন তিনি।

বললেন, ‘দেখ অনন্ত, তুমি শুধু শুধু উত্তেজিত হচ্ছ, আমাকে অপমান করছ। হ্যাঁ, তোমরা এই মুহূর্তে আমার গায়ে হাত তুলতে পার। কিন্তু পরিণাম ভেবে দেখেছ ? পুলিশে পুলিশে লাল হয়ে যাবে পাড়াটি। কতজন যে আহত হবে এবং কতজন যে অ্যারেস্ট হবে, তার হিসেবে দিতে পারব না আমি। এসব না করে আমার কথা শোন, নোটিশের সারমর্মটা শোন।’

সবাই বুঝলÑএতক্ষণ বিনয় দেখালেও জিয়াউদ্দিন এখন পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে। তারা এও বুঝল যে লোকটি আকারে ছোটখাটো হলেও বিশাল ক্ষমতা রাখে।

শশাঙ্ক চৌধুরী এই সময় বললেন, ‘শোনান নোটিশের সারমর্ম। তবে আপনাকে সাফ জানিয়ে দিচ্ছিÑআমরা কেউ ওই নোটিশে স্বাক্ষর করব না বা নোটিশটি গ্রহণও করব না।’

‘ঠিক আছে, স্বাক্ষর না করার অধিকার আপনাদের আছে।’ বললেন জিয়াউদ্দিন।

‘তাহলে এখন শোনাই পাকিস্তান সরকারের নোটিশের সারাংশটা ?’ বললেন জিয়াউদ্দিন। তিনি ইচ্ছে করেই বারবার পাকিস্তান সরকার, পাকিস্তান সরকার বলছেন। কারণ তিনি জানেন, এই হিন্দুজাতটা পাঞ্জাবিদের নাম শুনলে কোঁতা হয়ে যায়।

এরপর জিয়াউদ্দিন যা শোনালেন, তার সারমর্ম এইÑপশ্চিমের সরকারি রাস্তা থেকে পূর্বের কাউয়া পন্ড মানে পুকুর, আর দক্ষিণের সরকারি রাস্তা থেকে উত্তরের বিরান জলাভূমির ধার পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার বিশেষ ক্ষমতা বলে দখল করল। বড় একটা কারখানা স্থাপনের জন্য এই দখল। এতে পাকিস্তান সরকার আন্তরিকভাবে দুঃখিত। সরকার প্রত্যেক পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেবে। অল্পদিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের ষাট শতাংশ পরিশোধ করবে সরকার। বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলটি অ্যাকোয়ারের বাইরে থাকবে।

জিয়াউদ্দিনের কথার অর্ধেক পথেই দীপেন ‘ও মারে’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠল। ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল সে। বেহুঁশ অবস্থায় তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো।

পঁচিশ

নোটিশটা আমি ওই সরকারি প্রাইমারি স্কুলের

দেয়ালে সেঁটে যাচ্ছি। ওখানে আপনাদের কোনও হাত

নেই। ওটা সরকারি সম্পত্তি, এটা সরকারি নোটিশ।

হইচই একটু স্তিমিত হয়ে এলে জিয়াউদ্দিন বললেন, ‘এছাড়াও আপনাদের জানানোর মতো আরও কিছু কথা আছে এই নোটিশে।’

এতক্ষণের স্তব্ধতা ভেঙে ক্ষিতীশ চৌধুরী বললেন, ‘শোনান আর কী কী আছে।’

জিয়াউদ্দিন বললেন, ‘মাপজোখ শেষে প্রত্যেক পরিবারকে বর্তমান সরকারি বাজারদর হিসেবে জমি-ভিটের দামের শতকরা ষাটভাগ নগদ দিয়ে দেওয়া হবে।’

‘এই কথা তো আগে একবার বলেছেন!’ শশাঙ্ক চৌধুরী বললেন।

অনন্তের রাগ তখনও পড়েনি। চিৎকার করে বলল, ‘বারবার টাকার লোভ দেখাচ্ছে, বুঝছেন না ? টাকার লোভ দেখিয়ে আমাদের কাবু করতে চাইছে! মামদোবাজির আর জায়গা পাচ্ছে না!’

জিয়াউদ্দিন তার শীতল চোখ দুটো তুলে অনন্তের দিকে পলকের জন্য তাকালেন।

ডাক্তার পূর্ণেন্দু সেন জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাদবাকি চল্লিশ পার্সেন্টের কী হবে ?’

‘ওটাও বাকি থাকবে না। অ্যাকোয়ার সম্পন্ন হলে চেকের মাধ্যমে বাকি চল্লিশ পার্সেন্ট দেওয়া হবে।’

‘মানে ষাট টাকা দিয়ে একশ টাকার মাল লুটে নেবে সরকার। আর এই লুটেরার তাঁতিদার এই জিয়াউদ্দিন। এই হারামজাদাকে এখনই তাড়ান আপনারা, না হলে মস্তবড় বিপদ হবে আমাদের।’ অনন্ত গলা ফাটিয়ে বলল।

জিয়াউদ্দিন নিজেকে বুঝ মানালÑধৈর্য ধর জিয়া। গালি, চোখ রাঙানিÑসব হজম করে যাও। অনন্তের কথার প্রতিবাদ কর না। তাহলে তোমার মিশন ভণ্ডুল হয়ে যাবে।

শান্ত গলায় জিয়াউদ্দিন বললেন, ‘আমি লুটেরা নই, সংবাদবাহক। আমি পাঞ্জাবি বা বেলুচ নই, বাঙালি। আমার সকল টান আপনাদের দিকে।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। পরের কথাগুলো বলে যান।’ বললেন ক্ষিতীশ চৌধুরী।

‘বড় বড় গাছগাছড়া কেটে নিয়ে যেতে পারবেন না। তবে অব দ্য রেকর্ড আপনাদের বলি, সরকারি খুঁটি পোঁতার আগে বড় বড় গাছটাছ বেচে দেবেন। এতে আইনত অনিয়ম হলেও সেই অনিয়ম ধরতে আসবে না কেউ।’ বললেন জিয়াউদ্দিন।

জিয়াউদ্দিনের কথা শুনে উপস্থিত মানুষদের মধ্যে কীরকম যেন ঝিমুনিভাব চলে এলো। শুধু অনন্ত তড়পে যেতে লাগল।

অনন্তকে তোয়াক্কা না করে জিয়াউদ্দিন আবার বললেন, ‘পাকাঘর ভাঙতে পারবেন না। কাঁচা বা মাটির ঘরের সরঞ্জামাদি সরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।’

জিয়াউদ্দিনের কথা শুনে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ক্ষিতীশ চৌধুরীর বুক চিড়ে বেরিয়ে এল। অনেক কষ্টে দ্বিতল ইটের ঘরটি তিনি বানিয়েছিলেন। আরেকজন থাকলে সে হয়তো আর্তনাদ করে উঠত, সে দীপেন চৌধুরী। দীপেনদের দোমহলা দ্বিতল ইটের বাড়ি। জৌলুশে এই জমিদারবাড়ির তুলনীয় এ তল্লাটে আর কোনও বাড়ি নেই। অন্য সবাই চুপ করে থাকল। কারণ তাদের ঘরদোর ইটের নয়।

শশাঙ্ক চৌধুরী মৃত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কিছু আছে জিয়াউদ্দিন সাহেব ?’

জিয়াউদ্দিন বললেন, ‘আছে।’

‘তাহলে চুপ করে আছেন কেন ? সেগুলোও বলে ফেলুন। রামায়ণের উত্তরকাণ্ড সমাপ্ত হয়ে যাক।’ বললেন পূর্ণেন্দু সেন।

জিয়াউদ্দিন বললেন, ‘জি, আপনার কথা বুঝলাম না।’

‘ও আপনার বোঝার দরকার নেই। আর বুঝে উঠতে পারার এলেমও নেই আপনার।’ ক্রোধ আর ঘৃণার মেশামেশি ডাক্তারবাবুর কণ্ঠে।

পূর্ণেন্দু সেনের কথার ইঙ্গিতটা ধরতে না পারলেও জিয়াউদ্দিনের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে ভদ্রলোকের কথায় ঘৃণা মিশে আছে। ঘৃণাকে গায়ে মাখলেন না তিনি। এই মুহূর্তে ঘৃণা গায়ে মাখলে ভুল হবে। দিন আসবে। তখন সুদাসলে আদায় করা যাবে।

জিয়াউদ্দিন বললেন, ‘আজ ১৯৬৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। আপনাদের এক বছর সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ১৯৬৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আপনাদের কাছ থেকে এলাকাটা বুঝে নেবে সরকার। অবশ্য এর মধ্যে আপনাদের পাওনাগণ্ডা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’

জিয়াউদ্দিনের কথা শুনে সবাই খেই হারিয়ে ফেললেন। এমন যে শশাঙ্ক চৌধুরী বা হরেন্দ্র, এমন যে কবিরাজ রাজকমল বা পূর্ণেন্দু সেন অথবা বিচক্ষণ ক্ষিতীশ চৌধুরীÑসবাই কথা হারিয়ে বসলেন। কীরকম যেন ফ্যাল ফ্যাল চোখে জিয়াউদ্দিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন সবাই।

সবাই লা-জবাব হয়ে গেলেও অনন্ত কিন্তু দমল না। পাগুলে কণ্ঠে সে চিৎকার করতে থাকল, ‘আমার প্রাণ যাবে, তারপরও আমি আমার জন্মভিটে ছাড়ব না। আমাদের উঠান, পুকুর, আম গাছ-কাঁঠাল গাছÑএগুলোর কী হবে ? আমাদের উঠানের কোনায় যে ছোট্ট মন্দিরটা আছে, সেটা কি ভেঙে দেওয়া হবে ? চোখের সামনে আমাদের এই দুর্গামন্দির চুরমার করা হবে ? ওই পুকুরটা কি ভরিয়ে ফেলা হবে ? কেন, কেন আপনারা এটা হতে দিচ্ছেন! অ মা গো, মারে! আমি কোথায় যাব রে মা! তোকে ছেড়ে আমি কোন অরণ্যে মুখ লুকাব রে মা!’

অনন্তের কথা শুনে সমবেত সাধারণ মানুষেরা ডুকরে উঠল। সবাই বিলাপে বসল। তাদের প্রলাপে-বিলাপে চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

এই ফাঁকে গুটি গুটি পায়ে নোটিশটা নিয়ে জিয়াউদ্দিন শশাঙ্ক চৌধুরীর কাছে এগিয়ে গেলেন। চাপা কণ্ঠে বললেন, ‘সইটা একটু দেবেন স্যার ?’ এতক্ষণের কথায় জিয়াউদ্দিন শশাঙ্কবাবুকে একবারের জন্যও স্যার বলে সম্বোধন করেননি। এখন করলেন। তিনি ঝানু লোক। জানেন, কোন সময় কোন শব্দটি বললে শ্রোতার মন ভিজবে।

কিন্তু জিয়াউদ্দিনের স্যার সম্বোধনে শশাঙ্ক চৌধুরীর মন ভিজল না। চুলদাড়ি কি তাঁর এমনি এমনি পেকেছে ? বয়স আর বিচক্ষণতাতেই তো পেকেছে! স্বাক্ষরটার মধ্যেই যে জিয়াউদ্দিনের প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে এবং স্বাক্ষরটা যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সেটা বুঝতে বেগ পাওয়ার কথা নয় শশাঙ্ক চৌধুরীর। বেগ পেলেনও না।

স্মিত চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘হইচই, কান্নাকাটির ফাঁকে কামটা হাসিল করে নিতে চাইছেন ?’

‘না না। আপনি এভাবে বলছেন কেন ? আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন কেন স্যার ?’ দ্রুত বলে উঠলেন জিয়াউদ্দিন।

শশাঙ্ক চৌধুরী বললেন, ‘দেখেন জিয়া সাহেব, আমার গা-গতরের চামড়া কি এমনি এমনি কুঁচকেছে ? এই যে সাদা চুল দেখছেন, ওগুলো কি এমনি এমনি পেকেছে ? শুনুন, স্বাক্ষর আমরা দেব না, ওই নোটিশে।’

‘তাহলে নোটিশটা মন্দিরের দেয়ালে সেঁটে দিয়ে যাই ?’

‘তাও হতে দেব না।’

জিয়াউদ্দিন এবার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘নোটিশটি আমি ওই সরকারি প্রাইমারি স্কুলের দেয়ালে সেঁটে যাচ্ছি। ওখানে আপনাদের কোনও হাত নেই। ওটা সরকারি সম্পত্তি, এটা সরকারি নোটিশ।’

জিয়াউদ্দিনের যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে শশাঙ্ক চৌধুরী চুপ মেরে গেলেন।

পিয়াদাকে নিয়ে বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলের দিকে এগিয়ে গেলেন জিয়াউদ্দিন। হিন্দুপাড়ার মন্দিরে উপস্থিত সবাই স্তম্ভিত হয়ে জিয়াউদ্দিনের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

গ্রামছাড়ার আগে জিয়াউদ্দিন চেয়ারম্যান ছালেহ জহুরের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ওঁদের দুজনের মধ্যে একান্তে দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল।

গাড়িতে ওঠার আগে চেয়ারম্যানকে লক্ষ্য করে জিয়াউদ্দিন বলেছিলেন, ‘অনন্ত নামের ছেলেটা বড় বেয়াড়া, বড়ই বিয়াদব।’

ছাব্বিশ

না, আমি মানব না। আমি আন্দোলন গড়ে

তুলব। তাতে আমার প্রাণ যায় যাক।

‘আমি জানি জিয়া সাহেব। অনন্ত নামের ছেলেটা বদ। বেল্লিক, একরোখা সে। অন্যদের চেয়ে বেশি বোঝে। চাষার ছেলে। লেখাপড়ার সামান্য এলেম আছে।’ জিয়াউদ্দিনের কাছ ঘেঁষে চাপা স্বরে বললেন চেয়ারম্যান ছালেহ জহুর।

জিয়াউদ্দিন গাড়িতে উঠলেন না। ছালেহ জহুরের দিকে ফিরলেন। বললেন, ‘দেখে শুনে মনে হলো, ও পাড়ার লিডার। বয়সে বড়রাও তার বিশৃঙ্খল আচরণের প্রতিবাদ করে না। বরং তাকে মালাউনরা প্রশ্রয় দেয় বলে মন হলো।’ সাম্প্রদায়িক শব্দটি উচ্চারণ করতে দ্বিধা করলেন না জিয়াউদ্দিন।

ছালেহ জহুর বললেন, ‘আপনার অনুমান মিথ্যে নয়। আপনার আসার আগে দলবেঁধে সবাই একবার আমার অফিসে এসেছিল।’

‘তাই নাকি!’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন জিয়াউদ্দিন।

‘এই অনন্তই কোর্ট না কোত্থেকে তিন মাস আগে সংবাদ নিয়ে এসেছিল। হিন্দুপাড়া অ্যাকোয়ারের সংবাদ। আমার কাছে উপায় জানতে এসেছিল।’

‘আপনি কী করলেন ?’

জিয়াউদ্দিনের প্রশ্নকে এড়িয়ে ছালেহ জহুর বললেন, ‘আমি তো জানতাম, পাড়াটির উচ্ছেদের কথা। ঢাকার আমার এক বন্ধু, মুসলিম লীগের পাওয়ারফুল নেতা সে, আমাকে বহু আগে জানিয়ে দিয়েছিল এই হিন্দুপাড়া অ্যাকোয়ারের ব্যাপারটি। জেনেও চুপ করে ছিলাম। কারণ আমাদের সরকারের নেওয়া ডিসিশন সঠিক বলে মনে হয়েছিল আমার।’

‘তো ওদেরকে কী বললেন আপনি, ওই সময় ?’ কৌতূহলীচোখে জানতে চান জিয়াউদ্দিন।

‘আমি অভিনয় করে গেলাম। চমৎকার এবং বিশ্বাস্য অভিনয়। ওই অভিনয়ের জোরে মালাউনদের বোঝাতে পেরেছিলাম যে অনন্তের আনা খবরটি ডাঁহা মিথ্যা।’

‘বিশ্বাস করেছিল ?’

‘করেছিল মানে! বিশ্বাস করেছিল বলেই তো আপনি আজ কোনও সংগঠিত আন্দোলনের মুখোমুখি হননি। এই জাতটা একতাবদ্ধ হলে যে কী হিংস্র ও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে, তা আপনি অনুমান করতে পারবেন না।’

‘আপনার কথা ঠিক। একজনই চেঁচামেচি করেছে, ওই অনন্তই। আরও দু’একজন ছিল। তবে তাদের কণ্ঠ ম্যাড়মেড়ে। প্রতিবাদ ছিল তাদের কণ্ঠে, তবে সেই প্রতিবাদ অনন্তের মতো বেপরোয়া নয়।’

‘আপনি বোধহয় শশাঙ্ক চৌধুরী, ক্ষিতীশ চৌধুরী, পূর্ণেন্দু সেনÑএঁদের কথা বলছেন ?’

‘এরকমই হবেন। সবার নাম তো আমি জানি না। তবে হ্যাঁ, সরকারি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নে কেউ যদি বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সে হবে ওই অনন্ত।’

‘আপনি ঠিক বলেছেন।’ বললেন ছালেহ জহুর।

দুপুরে সকল বাধাবিপত্তি পেরিয়ে স্কুলের দেয়ালে নোটিশের একটা কপি যখন সেঁটে দিতে পারলেন, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন জিয়াউদ্দিন। সরকারি আইনই আছে, এই ধরনের নোটিশে এলাকার কেউ সই না করলে ওই এলাকার কোথাও নোটিশটি টাঙিয়ে দিতে পারলেই হলো। তাতে নোটিশ গছানোর কাজটি সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে।

সঠিক সময়ে শশাঙ্ক চৌধুরীকে সঠিক চালটা দিয়ে কুপোকাত করেছিলেন জিয়াউদ্দিন। সরকারি নোটিশ আর সরকারি স্কুলের প্রসঙ্গটি তুললে চুপ মেরে গিয়েছিলেন শশাঙ্কবাবু।

কাজ সমাধা করে গাড়িতে উঠলে ড্রাইভার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোথায় যাব স্যার ?’

‘চেয়ারম্যানের বাড়ি। মানে লোকাল চেয়ারম্যান ছালেহ জহুরের বাড়ি যাব।’ বলেছিলেন জিয়াউদ্দিন।

‘চেয়ারম্যানের বাড়ি তো আমি চিনি না স্যার!’

‘তুমি আগে গাড়ি মেইন রোডে তোল। তারপর কাউকে জিজ্ঞেস করে নেবে।’

‘ঠিক আছে স্যার।’ ড্রাইভার বলেছিল।

গতকালকেই চেযারম্যানকে ফোন করেছিলেন জিয়াউদ্দিন। আদ্যপ্রান্ত জানিয়েছিলেন। গণ্ডগোল হলে সাহায্য করতে হবে, ছালেহ জহুরকে বলেছিলেন।

বলেছিলেন, ‘আমি আসছি সরকারি কাজে, আপনি সরকারের প্রতিনিধি। পাকিস্তান সরকারের এই উন্নয়ন কাজে সহযোগিতা করবেন, আশা করি।’

বিনয়ে বিগলিত হয়ে ছালেহ জহুর বলেছিলেন, ‘অবশ্যই সহযোগিতা করব। আমাদের এলাকারই তো উন্নয়ন! তাছাড়া সরকারের নির্দেশনা, না মানার উপায় আছে ? বহু লোকসানের বিনিময়ে আজাদি পেয়েছি আমরা। এই আজাদিকে ঝুটা হতে দেব না।’

ছালেহ জহুরের কথা শুনে টেলিফোনের ওপারে জিয়াউদ্দিন একটু ভিরমি খেলেন। অ্যাকোয়ারের কথায় পাকিস্তানের আজাদির প্রসঙ্গ টেনে আনলেন কেন ছালেহ জহুর, বুঝতে পারলেন না। এসব মেঠো নেতারা এরকমই হয় বোধহয়Ñভাবলেন জিয়াউদ্দিন।

‘তাহলে এই কথাই রইল, কাল আমি আসছি। প্রয়োজনে সাহায্য চাইব। প্রস্তুত থাকবেন।’ টেলিফোন ছাড়তে চাইলেন জিয়াউদ্দিন।

ছালেহ জহুর তড়িঘড়ি করে বললেন, ‘তা তো অবশ্যই। আর হ্যাঁ স্যার, কাল দুপুরে আমার এখানে খাবেন আপনি।’

‘খাওয়াবেন ? আলহামদুলিল্লাহ! ’ বলেছিলেন জিয়াউদ্দিন।

গতকালকের দাওয়াতের জের ধরেই চেয়ারম্যানের বাড়িতে এসেছিলেন জিয়াউদ্দিন। তাছাড়া অন্য একটা গভীর উদ্দেশ্যেও তাঁর ছালেহ জহুরের বাড়িতে আসা। সে অনন্তের ব্যাপারে একটু একান্ত আলাপ। খাওয়া শেষে গাড়িতে উঠার সময় প্রসঙ্গটা তুললেন জিয়াউদ্দিন। বড় অফিসারদের ওটাই টেকনিক। খাওয়ার সময় নানা মানুষজন থাকে, তাছাড়া হোস্ট আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকেন। আলাপে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না। এছাড়া গোপন কথার জন্য নির্জনতা দরকার। জিয়াউদ্দিন গোপন কথার জন্য গাড়িতে উঠার সময়টাকে বেছে নিয়েছিলেন।

বাঁ হাতে গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে জিয়াউদ্দিন বলেছিলেন, ‘আপনার কী মনে হয়, অনন্ত বড় কোনও ঝামেলা পাকাবে ?’

‘আমার তো তা-ই মনে হয়! যেদিন ইউনিয়ন পরিষদে এসেছিল ওরা, ওই অনন্তই বাঁকা বাঁকা কথা বলেছিল।’

‘দেখেন ছালেহ সাহেব, কাজটা আমি নির্ঝঞ্ঝাটে করতে চাই। সরকারও চায় না কোনও হুজ্জত হোক। বিদেশি সাংবাদিকরা ওত পেতে আছে, এসব সংখ্যালঘু অত্যাচারের ব্যাপারে সংবাদ সংগ্রহের জন্য। তিলকে তাল করে ওরা। আমি চাই, ব্যাপারটায় যাতে কোনও হই হাঙ্গামা না হয়।’

‘তাহলে!’ বলেন ছালেহ জহুর।

‘দেখেন একটু চেষ্টা করে, অনন্তকে থামিয়ে দেওয়া যায় কিনা।’ বলেই গাড়িতে উঠলেন জিয়াউদ্দিন।

ড্রাইভারকে বললেন, ‘চলো।’

পেছন থেকে ছালেহ জহুরের কণ্ঠস্বর জিয়াউদ্দিনের কানে ভেসে এলÑআসসালামুলাইকুম।

ওইদিনের পর থেকে অনন্ত বসে নেই। বাড়ি বাড়ি ঘোরে আর অ্যাকোয়ার বিরোধী কথা বলে। বয়স্কদের সঙ্গে কথা বলে সে, তরুণ আর যুবকদের জাগাতে চায়। বলে, ‘আমরা রুখে দাঁড়ালে পাকিস্তান সরকার পিছু হটতে বাধ্য হবে।’

বড়রা বলেন, ‘অনন্ত, এই রুখে দাঁড়ানোতে প্রাণসংশয় হতে পারে।’

‘দু’চারটা প্রাণ গেলে যাবে! আমার প্রাণ উৎসর্গ করতে আমি প্রস্তুত। দু’একটা প্রাণের বিনিময়ে যদি এই হিন্দুপাড়াটি, আমাদের জন্মভিটেগুলো বেঁচে যায়, তা হলে তো অনেক পাওয়া হবে আমাদের!’ সতেজে বলে যায় অনন্ত।

বয়স্করা বলেন, ‘আর হাঙ্গামা কর না অনন্ত। মেনে নাও।’

‘না, আমি মানব না। আমি আন্দোলন গড়ে তুলব। তাতে আমার প্রাণ যায়, যাক।’ বলেছিল অনন্ত।

বুড়োরা চুপ মেরে গিয়েছিলেন।

অনন্ত তরুণ-যুবকদের নিয়ে বড় একটা দল তৈরি করে ফেলেছিল। এরা অ্যাকোয়ারের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। লড়াই মানে আন্দোলন, ভূমিরক্ষা আন্দোলন।

ছালেহ জহুর সব খবর রাখেন। অনন্তের তড়পানোর সকল কথা তাঁর কানে আসে।

সাতাশ

যে প্রতিবাদ করত, তাকে তো পুকুরজলে খেয়েছে!

এক গভীর রাতে অনন্ত খুন হয়ে গেল।

সে আরও মাসছয়েক পরের ঘটনা।

পুকুরের পানিতে চুবিয়ে মারা হয়েছিল অনন্তকে। সেই পুকুরটায়, যেটার জলে শৈশবে সাঁতারকাটা শিখেছিল অনন্ত! যে পুকুরে নিত্যদিন স্নান করে পরিষ্কার ও পবিত্র হতো অনন্ত! যে পুকুরটা ছিল নিজেদের! যে পুকুরটার মালিকানা নিয়ে মিথ্যা দলিল করে দীপেন-নৃপেন অনন্তের বাপ লক্ষ্মণ দাসকে ফাঁসিয়েছিল! যে পুকুরের মালিকানাস্বত্ব নিশ্চিত করার জন্য বাপ-বেটায় লড়ে যাচ্ছিল! সেই পুকুরটার জলে শেষ পর্যন্ত প্রাণ গেল অনন্তের।

উঠানের দক্ষিণপাশ ঘেঁষে বাহ্যকর্মের স্থানটি। রাত-বিরাতে ঘরের মানুষেরা ওখানেই বাহ্যকর্ম সারে। রাতের বেলা মেয়েরা যখন বের হয়, হাতে একটা চেরাগ থাকে, সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কেউ। পুরুষদের ক্ষেত্রে ওঠার প্রয়োজন হয় না। একা একাই বের হয় তারা। চেরাগ নেওয়ার বালাই থাকে না। তাদের সাহসটাই চেরাগের কাজ করে তখন। বিশেষ প্রয়োজন না হলে লক্ষ্মণের বাড়ির মেয়েরা সাধারণত রাতের বেলায় বাহ্যকর্মে বের হয় না। কিন্তু পুরুষদের একবার না একবার বেরোতেই হয়। বাহ্যকর্মের জন্য যেমন, বাড়ির আনাচ-কানাচ একবার দেখে নেওয়ার জন্যও তেমনি। এ পাড়ার মাঝেমধ্যে চুরি হয়। এবাড়ি, ওবাড়ি। তাই পাড়ার সব গৃহস্থই সজাগ থাকে, তাদের বাড়িতে যাতে চোর না ঢোকে।

অনন্তও রাতের বেলা একবার বের হতো। এটা তার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। এই অভ্যেসের কথা ঘাতকরা জানত। বেশ কিছুদিনের পর্যবেক্ষণের ফলে অনন্তের এই অভ্যেসের কথা জেনে গিয়েছিল তারা। তাই হত্যার দিন ঘাতকদের কাজ সহজ হয়েছিল। বেগ পেতে হয়নি। শুধু প্রস্রাবে রত অবস্থায় পেছনদিক থেকে মাথায়-মুখে গামছা জড়িয়ে ছেঁচড়িয়ে পুকুরঘাট পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়েছিল অনন্তকে। টুঁ করার সুযোগ মেলেনি তার। চারজন ঘাতকের সঙ্গে তার পেড়ে ওঠার কথা নয়। পেড়ে ওঠেওনি। ঘাতকরা পানিতে মাথাটা দাবিয়ে রেখেছিল। একসময় শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অনন্তের। মৃত্যু নিশ্চিত করে গভীর জলের দিকে দেহটা ঠেলে দিয়েছিল হন্তারকরা।

সেদিন জিয়াউদ্দিন চলে যাওয়ার পর নোটিশটার পাশে পাড়া ভেঙে মানুষ জড়ো হয়েছিল। পড়ুয়াদেরও কেন জানি ক্লাসে আর রাখা যাচ্ছিল না। ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু চারদিকে নৈঃশব্দের রাজত্ব। কেউ কথা বলছিল না। অথচ তাদের খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়ার হাহাকার কথা হয়ে প্রতি-প্রত্যেকের মুখ থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল। কিন্তু কেউ কথা বলছিল না। সবাই যেন নির্বাক, সবাই যেন নিথর পাথরখণ্ড! বোবা চাহনি নিয়ে সবাই ওই দেয়ালে সাঁটা মৃত্যুপরোয়ানার দিকে তাকিয়ে থেকেছিল।

সবাই নিশ্চল নিথর থাকলেও একজন কিন্তু ছটফট করে যাচ্ছিল। সে অনন্ত দাস। হিন্দুপাড়া উচ্ছেদের ব্যাপারটি সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পর পর সে চিৎকার দিয়ে উঠছিলÑমা, মা গো! আমাদের কী হবে! কোথায় যাব আমরা!

একটা সময়ে ভিড় হালকা হয়ে এসেছিল। যার যার বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল সবাই। শুধু থেকে গিয়েছিল অনন্ত। তার থেকে দশ কদম পেছনে আরেকজনও ছিল। লক্ষ্মণ দাস। এই অবস্থায় ছেলেকে একলা রেখে যায় কী করে লক্ষ্মণ!

ওই নোটিশে মাথা ঘষে ঘষে খুব কাঁদছিল অনন্ত। বড় বড় শ্বাস ফেলছিল। আর কিছুক্ষণ পর পর ‘মা, মা গো’ বলছিল।

মৃদু পায়ে হেঁটে গিয়ে ছেলের পিঠে হাত রেখেছিল লক্ষ্মণ। গভীর ভালোবাসায় বলেছিল, ‘এরকম কর না অনন্ত। ধৈর্য ধর। এরকম করলে পাড়াটি ফিরে পাবে না।’

চট করে বাপের দিকে ফিরেছিল অনন্ত।

লক্ষ্মণ বলেছিল, ‘পাড়াটিকে দখল থেকে বাঁচাবার জন্য দরকার একতা এবং আন্দোলন। সেই চেষ্টাই কর তুমি। পাড়ার সবাইকে একতাবদ্ধ করবার চেষ্টা করো। আন্দোলন গড়ে তোল।’

দু’হাততে চোখের জল মুছে স্পষ্ট চোখে বাপের দিকে তাকিয়েছিল অনন্ত।

মিষ্টি একটু হেসে লক্ষ্মণ বলেছিল, ‘আমি ভুল বলছি না বাপ। ভূমি উদ্ধারের একমাত্র উপায় আন্দোলন। এখন বাড়ি চল অনন্ত। স্নানটান করে মাথা ঠাণ্ডা কর। তারপর ভেবেচিন্তে কর্মপন্থা ঠিক কর।’

বাপের কথা শুনেছিল অনন্ত। বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, বাপ লক্ষ্মণ দাসের কথাই ঠিক− পাড়ার মানুষদের এক ছাতার নিচে আনতে হবে, যুবসমাজকে জাগাতে হবে। একমাত্র তারাই পারবে বসতবাড়ি উচ্ছেদের সরকারি সিদ্ধান্তটিকে রুখে দিতে।

পরদিন থেকে তা-ই শুরু করেছিল অনন্ত। বাড়ি বাড়ি ঘুরে বোঝাতে আরম্ভ করেছিলÑআন্দোলন ছাড়া বাঁচার কোনও পথ নেই। তরুণ আর যুবকরা বেশ সাড়া দিয়েছিল তার কথায়। শশাঙ্ক চৌধুরীও পিছিয়ে থাকেননি। স্বরাজি তিনি। তাঁর দেহের রক্তকণিকা নেচে উঠেছিল। একসময় ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন তিনি। সেই বিদ্রোহের বীজ শশাঙ্ক চৌধুরীর মনোভূমিতে মাথা তুলল। তিনি এই আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা হয়ে গেলেন। তাঁর পরামর্শে অনন্ত আন্দোলনের নাম দিলÑভূমিরক্ষা আন্দোলন। শক্তপোক্ত কয়েকজনকে নিয়ে ‘বিনোদপুর হিন্দুপাড়ার ভূমিরক্ষা কমিটি’ গঠন করা হলো। আন্দোলন দিনকে দিন তীব্র হতে লাগল। পাড়ায় মিটিং, রাস্তায় মিছিল করতে শুরু করল হিন্দুপাড়ার লোকেরা।

পূর্ব পাকিস্তানের দিকে দিকে বাঙালিরা তখন জেগে গেছে। বাঙালিরা তখন বুঝে গেছে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বোলচালের ব্যাপারটি। বাংলা ভাষার ওপর হামলা হয়ে গেছে। স্থানে স্থানে বাঙালিরা তখন লাঞ্ছিত হচ্ছে। অধিকার সচেতন বাঙালিরা তখন ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। বাঙালির নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তখন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকেও পদে পদে নাজেহাল করছে পাকিস্তানিরা। মিথ্যা অজুহাতে তারা শেখ মুজিবকে আ্যরেস্ট করেছে। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটাচ্ছেন তখন নেতা। তাঁর মুক্তির জন্য বাঙালিরা তখন ফুঁসে উঠেছে। রাস্তায় গলিতে নেতার মুক্তির জন্য তখন মিটিং মিছিল করে যাচ্ছে তারা।

আর এদিকে বিনোদপুর নামের অজপাড়াগাঁয় মুষ্টিমেয় কিছু হিন্দু তাদের অস্তিত্বের জায়গাটির জন্য, তাদের জন্মভিটে রক্ষার জন্য মরণপণ আন্দোলনে নেমেছে।

ছালেহ জহুরের কাছে সব সংবাদ আসে। সেই সংবাদ ছালেহ জহুর পাচার করেন জিয়াউদ্দিনকে। জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে ছালেহ জহুরের ঘন ঘন ফোনালাপ হয়। জিয়াউদ্দিন সব কথা শোনেন, কিছু নির্দেশনা দেন।

একদিন ছালেহ জহুরকে তিনি বলেন, ‘মালাউনদের এই আন্দোলন যদি সাকসেসফুল হয়ে যায়, পাকিস্তান সরকার যদি ওখানে কারখানাটি করতে না পারে, আমার চাকরি তো যাবেই যাবে, আপনার অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাবে। সরকার ধরে নেবে, আপনি ওদের লোক। নইলে আপনার মতো একজন চেয়ারম্যান থাকতে ওরা আন্দোলন গড়ে তোলে কী করে ? আপনার যে এই আন্দোলনে ইন্ধন আছে, সরকার বিশ্বাস করে বসবে। যদি এরকম হয়, আপনার চেয়ারম্যানগিরি কোথায় যাবে একবার ভেবে দেখেন।’

ভড়কানো গলায় ছালেহ জহুর জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তাহলে আমি কী করব স্যার!’

জিয়াউদ্দিন একটা বাগধারা বলে টেলিফোন ছেড়ে দিয়েছিলেন, ‘দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।’

পরদিন মুকবুলকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ছালেহ জহুর। মুকবুল ষণ্ডা। ছালেহ জহুরের ডান হাত। কুকর্মের সাঙ্গাত। ছালেহ জহুর মুকবুলকে অনন্তের ব্যাপারটা সংক্ষেপে বলেছিলেন।

শেষে বলেছিলেন, ‘চেরাগটা নিবিয়ে দে মুকবুল।’

যা বোঝার মুকবুল বুঝে গিয়েছিল।

দিনসাতেক পরে অনন্তের মৃতদেহটি তাদেরই পুকুরের জলে ভাসতে দেখল গ্রামবাসী।

না, এ নিয়ে পুলিশি কোনও হাঙ্গামা হয়নি। ‘এ যে অপঘাতে মৃত্যু’ বলেছিলেন চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান দেখতে এসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ঘাটে পা পিছলে পুকুরে পড়ে গিয়েছিল অনন্ত। উঠতে পারেনি। সাঁতার জানত না বোধহয়। ঘাটের ধাপগুলিতে বেশ শেওলা জমেছে দেখছি।’

হিন্দুপাড়ার সবাই অন্যকিছু ভাবলেও চেয়ারম্যানের কথার প্রতিবাদ করতে সাহস করেনি কেউ। প্রকৃতপক্ষে প্রতিবাদ করার কেউ ছিলও না তখন ও-পাড়ায়। যে প্রতিবাদ করত, তাকে তো পুকুরজলে খেয়েছে!

প্রথম পর্ব সমাপ্ত

লেখক : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares