অন্তর শুকায়েছিল বিষম অভিলাষে : আকিমুন রহমান

উপন্যাস

ভণিতা

আদিতে আমি আপনার বন্দনা গাই প্রিয় পাঠক।

এই বাক্যাবলি―এই পরস্তাব কথা―

আপনার জন্য গড়ে তুলতে তুলতে কত না কুণ্ঠা-কম্পমান হয়েছে এই অঙুলি!

আদৌ কী পারবে সে!

পরস্তাবের নিরলে লুকায়ে থাকা সুধা ও মাধুর্যকে শব্দ-বন্ধে সত্য-রূপ দিতে―!

যেই কান্নারা ছিল সেইখানে―যত নির্দয়তা ছিল―তুলে আনা কী সম্ভব হবে!

আপনার জন্য, হে পাঠক।

দ্বিতীয়ে বন্দনা গাই দেওভোগ গ্রামের―

জগতে সে অনামা―সব থেকে সামান্যা।

তবুও  মহানামা সে, শ্যামশ্রী অতুল্যা!

আমার এই তুচ্ছ অন্তর আর তুচ্ছ দুচোখ―শুধু এই জানে।

চিরকাল ধরে সে আমার সব-পেয়েছির দেশ!

একদিন দেওভোগ গ্রাম―

এই পরস্তাবরে আপন বক্ষে ধারণ করার ভাগ্য পেয়েছিল!

অন্তে বন্দনা দেই বঙ্গসাল ১৩৩০―মৌন মুখে সে এই পরস্তাবরে ঘটে যেতে দেখেছে একদিন!

আর, সমস্ত কথারে তন্নতন্ন করে স্মরণে রেখেছে সে।

তারপর অই কথা সকলরে দিয়েছে সে―দিয়েছে আমার অঞ্জলিতে!

সর্ব সভাজন, এই সহজ পরস্তাব কথা জুলেখা বিবির! এই পরস্তাবে আমরা ইসুফ মিয়ারেও পাবো! আর পাবো সেই অন্য আরেকজনরে! যে কিনা স্বেচ্ছায় নিজ জীবনরে ঠেলে দিয়েছে অপার আগুনে! নিজেরে পোড়াতে পোড়াতে সে, দগ্ধে দিয়েছে অন্য জীবনের শরীর―সুবোধ শান্তি আর গৃহস্থালী!

তার নাম ?

সেই নাম এখনই না বলি! সেই নাম তবে এই পরস্তাবে ক্রমে ক্রমে ব্যক্ত হোক!

কথারা―জাদুর কথারা এই আঙুলে আসীন হও! আমার আঙুলে তোমরা মায়া-থইথই কিচ্ছা হয়ে ধরা দাও!

আমি সহৃদয় সু-সভাজনরে অই সহজ পরস্তাবখানা শোনায়ে ধন্য হই!

এমত সকল স্তব শেষ করে আমি যেই না কিচ্ছা বলা শুরু করতে গেছি, তখন কোনও দূর থেকে―আচমকার ওপরে―দেওভোগ গ্রাম আমাকে ডাকা শুরু করে!

কী ব্যাপার!

সে তখন বলে, ‘এই পরস্তাবের চাক্ষুস সাক্ষী কে ? আমি এই দেওভোগে! তাইলে এই বিত্তান্তরে লোকের সামনে  পয়লা-পরথম কইয়া দেওয়ার কার হক বেশি ? এই আমি দেওভোগের।’

আচ্ছা তাহলে! দেওভোগ গ্রামই বরং অই কিচ্ছাখানরে প্রথমে বলা শুরু করুক!

‘আমার পরে আছে অন্য সাক্ষীয়ে! তারে কইতে না-দিলে কী শোভা হইব ?’

আচ্ছা! সে-ই না হয় তারপরে বলবে!

‘যে কিনা ঘটনাখান ঘটাইল! যে কিনা মূল পাতকী! তার জবানও তো শোনানোর কাম! নাকি ?’

ওহ! আরেকজনও তবে আছে ? তাহলে সে-ই আসুক দ্বিতীয় সাক্ষীর পরে!

আমি নাহয় চুপ-মুখে, এইবার, তাদের কথাই শুনে যাই―

১. একটা গহন গুপ্তকথা আছে! সেই কথারে খালি আমি জানি! আর জানে অন্য দুইজনে!

সেই এক গোপন কথা আছে! আমার চক্ষের ওপরে, ১৩৩০ বাংলা সনের চৈতমাসের দিনে ঘটছিল এই ঘটনা। আমি সেই ঘটনার কিছুটা জানি! সকল কিছুই তো আমারে জানতে হয়! হয়ই! আমি না জমিন ? যা ঘটে,আমার ওপরেই যে ঘটে! তয়, অইবারের অই গুপÍ ব্যাপারখানের পুরাটা জানার সুবিধা হয় নাই আমার!

কেমনে জানমু! সবটা ঘটনা কী আর আমার চৌহদ্দির ভিতরে―আমার চক্ষের ওপরে―ঘটছে ? ঘটে নাই! সেই কারণে না―আমি পুরাটা জানি না।

তবে আরেকজন আছে, সে অই গুপ্তিকথার অনেকখানি জানে! যে অত জানে, সে ছোটোমোটো এক পাতিকাউয়া! ঘটনা ঘটার কালে, সে তখন নিকটের বকুল বিরিক্ষির ডালে বসা! সে বিষয়খানরে―প্রথমে কোনও প্রকারে―কোনও আমলে আনার ব্যাপারই মনে করে নাই!

আমি তো জিন্দিগিতে পাতিকাউয়া কম দেখলাম না! কিন্তুক এইটার মতন এমুন ভাদাইম্মা জাতের বুদ্ধিনাশা পাতিকাউয়া আমি আর একটাও দেখি নাই! আমি এর কথা আর কী কমু! ঘটনার গোড়ার কালে সে বলে, বিষয়খানার দিগে একটু কোনও নজরসুদ্ধ দেয় নাই! সে তাইলে তখন কী করতেছিল ? সে তখন জান-পরান এক কইরা, বকুল পাতাগো ঝিরিমিরি খেইল দেখতেছিল!

শেষে নাকি আমার চিল্লান-গর্জান শুইন্না সে একটু হুঁশ পায়! তখন সে খেয়াল কইরা দেখে, বাপ্পুইসরে বাপ্পুইস! নিকটেই কেমুন এক অশৈলী কারবার ঘটতে যাইতেছে! দেখ, কেমুন আউলা-মাউলা শল্লা দিয়া দিয়া, কে জানি কারে ভেলকির তলে ফেলতেছে! কে জানি কারে তার মাও-বাপের কোলের তেনে ছিনাইয়া নিতেছে!

তবে, পাতিকাউয়ায় ভাদাইম্মা হইলেও একেবারে ভোন্দা না! সে কিন্তু অই গুপ্তি ব্যাপারখানের ভেদ ভাঙনের লাইগা করে কী―ঘটনার পিছে পিছে যাইতে ছাড়ে না! কিন্তু গেলে কী! বেশিদূর আ¹ানের উপায় সে দেখে নাই! একটু অল্প গেছে, কী যায় নাই,অমনেই দেখে যে, কী তেলেসমাতি কারবার! ঠনঠনা এক আগুনের বেড়া তার সামনে কেমনে জানি আইয়া খাড়া হইয়া গেছে! সেই বেড়াটারে একবার য্যান চক্ষে ঠাহর হয়! আবার য্যান ফুচ্ছুত দিয়া সেইটা গায়েব হইয়া যায়!

তখন আর সে কী করে! অতটুক এক কেউ-না-পক্ষী হইয়ানি সে আগুনের লগে যুজতে যাইতে পারে ? পুইড়া না ছাই হইয়া যাইব ?

কাজেই পাতি কাউয়ায়ও অই গুপ্তি বিষয়খানের পুরাটা জানোনের উপায় পায় নাই! তবে অনেকখানিই তার জানা হইছে! তাইলে কী হইল ? হইল এই―একখান গোপন বিষয়ের অল্প কিছুটা কিনা আমি জানি! সেই গোপনের বেশ কতকটা জানে আরেকজনে! সে হইল অই কাউয়া! তাইলে অন্যটুক কে জানে ? কে যে জানে, আমি সেইটা পরিষ্কার কইরা কিছুতেই ধরতে পারি নাই! তবে একটু য্যান আন্দাজ-অনুমান করতে ইচ্ছা হয়!

আমার মনে পুরা একিন আসে যে, এই গুপ্তিকথার বাকিখান একজনে ঠিকই জানে! দুনিয়ার আর কেউ না জানুক―সে জানেই জানে! আর সে খালি বাকি বিষয়টুকই জানে না―জানে আসলে পুরাটাই! সেইজনে পুরাটাই জানে!

সে তাইলে কে ?

সে সুরুজ! সে হইল আসমানের সুরুজ! সে একদিগে উদয় হইয়াই যদি চৌদিগ পশর কইরা দিতে পারে, তাইলে সে যখন চান্দি বরাবর থাকে, তখন কী আসমান-জমিনের কোনও কিছু তার অবিদিত না থাকতে পারে ? কিছুতেই পারে না! এই বিষয়খানও তো তাইলে তার নজরের বাইরে যায় নাই! যাইতে পারেই না।

কিন্তু তারে আমি অই বাকি গোপন কথাখান কওনের জন্য একটু কোনও খোসামদ করতে যামু না! সে হইল আচুইক্কা, আধা-খেচড়া স্বভাবের ঘাড়-তেড়া লোক! না তার মিজাজ-মর্জির কোনও ঠায়ঠিকানা আছে! না অন্যগো লগে তার আচার-ব্যভারের কোনও আগামাথা আছে! সেই কারণে অই গুপিÍকথা বিষয়ে তারে আমি কিছুই জিজ্ঞাসা করতে যামু না! সে যদি জাইন্না থাকে তো জানছে! সে জানলে ভালো, না-জানলেও ভালো!

আমি যেট্টুক জানি, সেট্টুক কিন্তু আমি-আমার ওপরে বসতকারী লোকসকলরে―একদম ঝারাঝারা কইরাই বলে দিতে চাইছিলাম! কিন্তু মানুষের কেমুন আজীব স্বভাব! আমি তাদের জানানি দিতে চাইলে কী! তাগো তো কোনও তাগাদা থাকতে হইব! নাকি ?

আমার ওপরে বসতঅলা একটা কোনোজনে- আমারে একটাবার- কিছু একটু জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করল না! নিজেরা নিজেরা তারা কত কান্দাকাটি করলো! কত হামদুম বিলাপ, কত খোঁজ-তল্লাশ-বিছরা-বিছরি,কত পুষ্কুনির পানির হাতেপায়ে ধরাধরি, কত কী-ই না করল! সেইসব কইরা কি তারা পাইল―তাগো হারানো নিধির সন্ধান ? পাইল না,না-ই!

তাগো কী নিধি হারাইছিল ?

সেই হারান্তির বিষয়খানা আমি আস্তে-মুস্তে ব্যক্ত করতেছি!

লোকেরা তো তাগো হারানো ধনেরে বিছরাইয়া পাগল পাগল হইল! সেইটা না-পাইয়া আরও পাগল পাগল হইল সকলের পরান! এদিকে, তারা যদি আমারে একটাবার একটু কিছু জিগাইতো! আমারে খালি কোনোরকমে একবার একটু জিজ্ঞাসা করলেই কিন্তুক আমি, নগদ ভেদের কথাখানরে ভাইঙ্গা দেই! কেমনে কেমনে কী হইল; তারবাদে কোনও পথ দিয়া কদ্দুর গেলে, কিছু হইলেও মীমাংসা পাইব তারা; সেইটাও কিন্তুক কইতে দোনামোনা করতাম না আমি! তবে, কেউই আমারে কিছু জিগাইল না! কোনও একজনেও আমার দিগে চাইয়া দেখল না! তারা থাকল তাগো আজাইরা হায়-হুতাশে!

অখন, এই কথা উঠতেই পারে, আমি ক্যান নিজের থেকে অই গোপন কথাটা লোকেরে কইয়া দিলাম না ? এইটা তো আমি করতে পারতাম! বা, কাউয়ায়ই বা ক্যান তার মুখ বন্ধ রাখল ? সে কইয়া দিলে কী হইত ?

এইবার তাইলে আমাগো সমাজের ভেদের কথাখান লোকসকলরে ভাঙ্গাই কওয়া লাগে দেখতেছি! আমাগো সমাজের মাটি বল, বিরিক্ষি বল, পক্ষী বল, বাতাস বল, আর চান্দ-সুরুজই বল, আমাগো সকলের জন্য―সেই এক বিধি! আমরা আপনা তেনে মুখ খুইল্লা―মনিষ্যি জাতেরে―কোনও কিছু জানানি দেওনের হক রাখি না! একটা কোনও টি টি আওয়াজ পর্যন্ত করার হুকুম নাই আমাগো! তবে, মনিষ্যিরা যদি মিনতি দিয়া কিছু বলে, যদি দোহাই দিয়া কিছু জিজ্ঞাসা করে, তাইলে কথা আলাদা! তখন, ভেদের কথা জানানি দেওনে নিষেধ নাই! বরং খোলাসা কইরা জানানি দেওয়াই তখন সহি পন্থা!

তাইলে তখন তো লোকেরা কোনোজনে আমাগো কেউরে কিছু জিজ্ঞাসা করেই নাই! আমাগো দিকে ফিরাও দেখে নাই! তেমন অবস্থায়, আমি বা কাউয়ায় বন্ধমুখে হায় হায় করে যাওয়া ছাড়া-অন্য আর কী করতে পারি, কন ? আমরা দোনোজনে গুপ্তি-ঘটনাখান ঘটার দিন থেকে―এই যে বন্ধমুখে― হায়-আফসোসের কারবারই তো করে যাইতেছি! শেষে না পাতি কাউয়াটায় আজকা আমারে―আমাগো সমাজের গুরুতর কথাখান স্মরণ করায়ে দিল! অতি গুরুতর সেই কথা!

কথা হইল এই―মাটি-পানি-বাতাস-আগুন! তোমাগো যে-কেউ যেই গুপ্তিকথাই জানতে পাও না ক্যান, সেইটারে কিছুতেই তুমি তিন-চান্দের বেশি তোমার নিজের ভিতরে রাখবা না। খবরদার! অই কালের মধ্যেই সেই গোপনরে তুমি অবশ্য-অবশ্যই অন্য দশকানে পৌঁছায়া দিবা। দিবাই দিবা! নাইলে আজাব-গজবের কোনও সীমা থাকব না! আসমানে মেঘের আনা-যানা বন্ধ হইয়া যাইব! দেওয়ায় ডাকতে ভুলব! বিষ্টির কোনও নামনিশানা থাকব না রে! দারুণ আকাইল্যা খরায় খরায় দুনিয়ার মাটি চৌচির হইয়া যাইতেই থাকব! বিয়ানো গাইয়ের দুগ্ধ-থইথই ওলান শুকাইয়া পোড়া কাষ্ঠ হইয়া যাইব!

‘অমন সর্বনাশরে নি তুমি সাধ কইরা তোমার ওপরে নামাইয়া আনতে চাও ? কি গো মা ?’ পাতি কাউয়ায় আমারে জিজ্ঞাসা করে! কী কয় এই কাউয়ার পোয়ে! আমি বুঝি তেমন গজব নামতে দিমু ? সেইটা নামার রাস্তা বন্ধ করার উপায় বুঝি আমার হাতে নাই ? আছে তো! এই তো আমি পরস্তাব-বলনেঅলারে থামাইয়া দিছি―দিয়া আমিই আগে আগে, অন্ধিগন্ধি সবখানি গোপনকথা কইয়া দিতাছি!

কে শুনব ? কে শুনব সেইসগল কথা ? আমার ওপরে বসতকারী দেওভোগ গেরামের একটাজনেও তো সেইটা শুনতে চাইল না! তাইলে কে ?

তাইলে আর কী! তাইলে আমার গাছগরানে শুনব, মাটির দুব্বারা শুনব, কাউয়া-কুলিয়ে শুনব, আসমানে শুনব, ঘন নিশিরাইতের তুক্ষার আন্ধারে শুনব, ইউরা-বিউরা টিকটিকি আর বেজীরা কোনওবো, দুপুইরা বেলার উড়ান-ঘুরুন্তি খাইতে থাকা চিলেরা শুনব! যদি এই তারা কোনোজনে এই পরস্তাবে কান দিতে না চায়, তাইলেও মুশকিলের কিছু নাই! একলা গায়েন হইয়া আমার কথা আমি কমু, আবার একলা সভাজন হইয়া আমিই আমার কথা আমি শুনমু! আর শুনব পাতি কাউয়ায়! ওইতেই হইব!

আমি কে ?

আমি দেওভোগ গেরাম!

আমি এক চৈতমাইস্যা দোপোরের এক আজব বিষয়ের এক বোবা সাক্ষী!

২. সেই দোপোররে কী বিস্মরণে দেওয়া যায়!

এই এখন ১৩৩০ বাংলা সন! এই সনের চৈত্রমাসের মাঝ বরাবরের দিনে, গমগমা দুপুরের কালে, গেরামের আবিয়াত কন্যা জুলেখা বিবি নিরুদ্দিশ হইয়া যায়! চৌদ্দ বচ্ছরে পাও-দেয়-দেয় অবস্থার আস্তা একটা সিয়ান-ডাঙর মাইয়া, দিন-দোপোরের কালে, আচমকা নাই হইয়া গেলো!

গেরামের সকলজনে তার হারান্তি-যাওনের সংবাদখানই কেবল জানলো! আর জানল যে, জুলেখারে ফিরা পাওনের কোনও লক্ষণ কোনও দিগে নাই! আর যে তারে ফিরত পাওন যাইব, এমুন কোনও আশা আর নাই! এইটুক কথাই সকলতে স্পষ্ট কইরা বুঝল!

কিন্তু কেমনে যে সোনার টুকরা,লক্ষ্মীর পুত্তুলি মাইয়াটায় নিখোঁজ হইল, সেই ভেদের কথাখানা তারা এক ফোঁটাও আন্দাজ-অনুমান করতে পারল না! কেমনে যে কী হইল সেইটার সবকিছু তাগো অগোচরেই রইয়া গেল!

একবার তাগো মনে ধন্দ জাগল যে, বাইদ্যানিরা নি ধুলপড়া দিয়া জুলেখারে বেবোধা বানাইয়া, তাগো লগে লইয়া গেছে গা! কিন্তু সর্ব-তল্লাশ দিয়াও গেরামের দশজনে―তাগো তল্লাটের কোনোদিগে―বাইদ্যানিগো আসার কোনও আলামত বিছরাইয়া পাইলা কই ? পাইল না-ই! কেমনে পাইব ? বচ্ছরের অই কালে, দেওভোগ গেরামের দিগে, বাইদ্যানীরা আসলে তো ? তারা আসে নাই। লোকে তাইলে কেমনে বাইদ্যানীগো সন্দেহ করবো ? তখন তেমন সন্দেহ করোনেরও কোনও উপায় থাকল না!

জুলেখায় গেরামের কোনও বাড়ির পুষ্কুনির পানিতে পইড়া যে মরে নাই, সেইটাও ক্রমে সকলের পরিষ্কার জানা হইয়া যায়! লোকে নিজ গেরাম দেওভোগের কোনও পুষ্কুনিতেই জাল ফালাইতে কোনও প্রকার ঢিলামি দেয় নাই! কিন্তুক দেওভোগের কোনও একটা পুষ্ক্নুীতে পইড়া জুলেখায় কেমনে মরব ? সবকয়টা পুষ্কুনির পানিই না অই চৈতমাইস্যা দিনে শুকাইয়া একেবারে হাঁটু সমান হইয়া আছিল ? পানি না কেবলই পেঁক-গোলা থকথকা এক বস্তু হইয়া আছিল। সেই পানিতে পইড়া একটা পাঁচ বছইরা পোলাপাইনসুদ্ধা – কিছু হওনের কথা না! সেইনে অমুন ডাঙর মাইয়ার কি হইব ? কোনও পুষ্কুনিতেই জুলেখার লাশ পাওয়া যায় নাই!

এমন কী যেই ভোমা, ভরপুরা পুষ্কুনির ঘাটলার তেনে অই মাইয়ায় নিখোঁজ হইয়া যায়, গেরামের দশজনে সেই পুষ্কুনির পানিতেও জাল ফেলোনের কোনও গাফিলতি রাখে নাই। দশ গেরামের ভিতরে নামডাকঅলা যেই জাউল্লার গুষ্টিটা আছে, তাগো খামোখা সংবাদ দিয়া আনছে তারা! আইন্না, তাগো দিয়া, অই বড়ো পুকুরখানে খেও দেওয়ানের কর্মখানা সারছে সকলে। কিন্তু সেইনেও জুলেখার লাশ মিলে নাই!

লোকে গেরামের মস্ত মস্ত গাছ-গরানের আগায় আগায়ও জুলেখারে বিছরানি দিতে ছাড়ে নাই! বান-বাতাসে যদি জুলেখারে অইখানে নিয়া ফালাইয়া রাখে! এই কথা ঢোকে ঢোকে লোকের মনে আসছে। কিনÍু কোনও গাছের আগায়ই জুলেখার তল্লাশ মিলে নাই! তাইলে আর কী করোন ? নিজেগো কপালে নিজে মারোন ছাড়া আর তো কিছু করোন নাই! তারবাদে তারা সগলতে―একেবারে ঠায়-ঠাটা―বিশ^াস করতে থাকে, জুলেখারে আর ফিরত তো পাওয়া যাইব না-ই! আর, অই মাইয়ার হারানি যাওনের বিষয়খানেরও কোনও মীমাংসা পাওন যাইব না! সেইটাও চির অগোচরিই থাইক্কা যাইব!

অমন আতকার ওপরে নিরুদ্দিশ হইল কেমনে, অই মাইয়ায় ? কী ভুল করছিল সে ? কী করছিল ?

সেই না-বুঝ কন্যায়, ময়-মুরুব্বি সকলের, অনেক কড়া এক নিষেধরে অগ্রাহ্য করে ফেলছিল! চৈত্রমাসের ভরভরা দুপুরের বেলায়, একলা একলা কিনা সে গিয়া হাজির হইছিল, এক আ-ঘাটায়! সেইটা একটা ছাড়াবাড়ি! এক্কেবারে লোকের কইলজার ভেতরে বিরাট ডর-জাগাইয়া দেওনের ছাড়াবাড়ি সেইটা!

যেমুন কঠিন নিঝ্ঝুম সুমসুমা সেই বাড়ি তেমুন থমথমা, তবদাখাওয়া, হু হু সেই বাড়ির মস্ত পুষ্কুনি আর তার শানে-বান্ধা ঘাটলাখান! সেইখানে অই মাইয়ায়, অমন দোপোরের কালে, একা-একলা যাওনের হিম্মতখান পাইল কই ? কেমনে পাইল!

সে জানে না, চৈতমাইস্যা দোপোরে অমন থুমথুমা নিরলে যাইতে নাই ? জানে তো! চৈতমাইস্যা দিনের তেমন সময়ে গ্রামের বেটা-মাতারি, পোলা-বুড়া কেউই নিজ নিজ ভিটির নামায় যাওয়া তো দূর, বাড়ির উঠানের সীমানা-চৌহদ্দির বাইরে পর্যন্ত একটা কদম দেয় না। একে তো ওই গরগরা রোদের তেজটারে সহ্য করা কঠিন, তার ওপর মুরুব্বিসকলের নিষেধখানা তো তাদের কলজার ভেতরে গেঁথে আছেই! সেই নিষেধখানাও লোকের পাও দুইটারে শক্ত রকমেই বান্ধা দিয়া রাখে।

মুরুব্বিরা কোনও নিষেধ দিয়ে গেছে ?

তারা বলে গেছে, চৈতমাইস্যা দোপোরের কালে নিরালা পাতরে যাইবা না! বাড়ির ঢালের দিগেও পাও বাড়াইবা না! গেরামের আলের-ঢালের বটগাছের দিকে, তোমরা ফিরাও চাইবা না! সাবধান! দিনের অমন বেইলে-দেশি গাবগাছের নিকটে যাওয়া তো দূর, তার নাম পর্যন্ত মুখে আনবা না! তারা এও বলে গেছে, শোনরে পোলাপাইন সকল! তোমরা এইসব নিষেধের লঘু-গুরু মাইন্না চলবা! যত তুমি অই সকল মানা-গোণা করে চলবা,ততো তুমি বান-বাতাসের কবল তেনে নিস্তার পাইবা! জানবা লঘুগুরু যে না মানে―ছারেখারে যায়!

কন্যায় কিন্তু অই সকল বিধি-বার্তা তন্নতন্ন করেই জানে! তাইলে, তারপরেও সেইদিন সে কেনো যুগ-জনমের নিষেধখানরে অগ্রাহ্য করতে যায় ?

সেই জুলেখায় এমনই কন্যা যে কিনা সপ্ত থাপ্পড়েও রাও কাড়তে জানে না! ঘরে-সংসারে আউল্লা-পাথারি কোনও গন্ডগোল ঘটানোর বান্দাই না সে! বিধি-নিষেধেরে ফাঁইড়া ফালানের জন্য উথাল-পাথাল হয়ে যাওয়ার মনিষ্যিও তো সে না! একেবারেই না! নিতান্ত সরল-সিধা, নরম সে এক মেয়ে! পানিভরা মাইট্টা কলসির মতন ঠায়-ঠান্ডা ! অন্তত বাইরে থেকে তারে দেখে লোকসকলের এমুনই মনে হয়ে আসতেছে চিরদিন! ভেতরে-অন্তরে সে কেমন, সেইটা কোনও কালে কারো জানা হয় নাই! গেরামের কোনোজনে জানে নাই, মাও-বাপেও না! মা-বাপে হয়তো জানতে পারত! কিন্তু জুলেখার মায়ে তার মাইয়ারে মুখ খোলার কোনও ফুরসতই দেয় নাই কোনও সময়!

মেয়ের বুঝ হবার পর থেকে দিনে-রাতে কেবল চিপে চিপে মায়ে নিজ কন্যারে শাসানি দিয়ে চলছে! ‘ খবরদার কইতেছি মাইয়া! মোখে মোখে চোপা করতে য্যান না দেখি! মাইনষে কইলাম বেলেহাজ কইব! কইব, বাপ-মায়ে কী ছাই-খাইয়া পালছে, এই মাইয়া ? হায়া-পর্দা শিক্ষা দেয় নাই! কেমনে মাইয়ারে এমুন বেশরম, চোপাঅলা বানাইয়া থুইছে! বাপ-মাওয়ের দিগে থু থু করব কিন্তুক লোকে! সগল সোম মাথা-নিচা কইরা-ময়মুরুব্বির হুকুম মাইন্না চলবা! মাইয়া মাইনষের জিন্দিগি কইলাম!’

এইমতে অই কন্যা নিজের মাও-বাপের কাছেও নিজ অন্তরের দুয়ার খোলার কোনও ফুরসত পাওয়া তো দূর, নিজের মুখখান খোলার অবস্থাও মোটের ওপরে পায় নাই! একেবারেই পায় নাই! এদিকে তার বয়স কিন্তু নিতান্ত কম না! এই সনে সে কিনা চৌদ্দ বচ্ছরে পাও দিয়ে ফেলবে! অই যে সামনে আষাঢ় মাস আসছে, সেই মাসে তার বয়স তেরো বচ্ছর পুরা হয়ে চৌদ্দ শুরু হবে! গ্রামে তার বয়সী আর একটা কোনও মেয়েই আবিয়াত নাই! আগে আগে―প্রতিটা জনেরই―বিবাহ হয়ে শেষ! সেই সকল বিয়াইস্তা কন্যার কারও কারও কোলেও দেখ গা পয়লা-প্রথম ছাওটাও আইসা পড়ছে!

এদিকে, এই ভিটির এইজনের কিসমতের কী লীলা! তার বিবাহের ফুল-ফোটার কোনও আলামতই নাই! এমন না যে, মেয়ে চেহারা-সুরতে নীরস! এমন না যে, সে ল্যাংড়া-টুন্ডা; বা, মুখে সে দেখতে কু-ছবি ! এমন না যে, গুটি বসন্তের ছাপে মুখখান তার আবড়া-জাবড়া হয়ে আছে! উল্টা যেনো তার মুখচোখের মায়ার কোনও কমা-কমতি নাই! যেন কচি নিমপাতার ঝলকখান মাখানো আছে সেইখানে! যেন বৈশাখ মাসের ডগবগা হেলেঞ্চা ঝোপের তাজা শ্রী-খান এসে জমা হইছে সেই মুখে; আর হাতে আর পায়ের পাতায়!

এমন ঢকের কন্যা-এই গ্রামে আর কয়জন আছে ? গ্রামের নিন্দুকের নিন্দুক বেটা-মাতারিও স্বীকার না করে পারে না যে, এমুন ঢক আর আদব-লেহাজের মাইয়া গ্রামে য্যান আর একটাও নাই! তাও ক্যান এই মাইয়ার এমুন আবিয়াত দশা ?

অড়শি-পড়শিরা একবাক্যে বলে, এই মাইয়ার এমুন ছিদ্দতের জন্য স্বয়ং মাইয়ার মাও-বাপে দায়ী! বাপ-মায়ে কিনা তাদের মেয়ের জন্য কোনও সম্বন্ধরে উপযুক্ত বলে মনে করতে পারে না! যে-কোনো সম্বন্ধরে তারা খালি―বাছে বাছে বাছে! কেবল বাছ-বিচার―করে করে করে! কিন্তু মতিস্থির আর করে উঠতে পারে না! শেষে একসময় সম্বন্ধখানরে বিদায় দেয়!

আবার ঘটক আসে। আবার মেয়েরে বাবুরহাটি কইচ্চা কাপড়খান পরায়ে, সম্বন্ধবাড়ির লোকের সামনে নেওয়া হয়! লোকে মেয়ের মাথার চুল দেখে। মেয়েরে হাঁটায়ে-নড়ায়ে তার পয়-অপয় যাচাই করে! চাইর কলেমা জিজ্ঞাসা করে! ডাইলের বাগাড় দেওনের নিয়ম-কায়দা বলতে বলে! শরবত-ফিন্নি খায়! কিন্তু যেই তারা বিবাহের দিন-ক্ষণ ধার্য করার কথা তোলা দেয়, অমনেই কন্যার বাবায় আগড়ম-টাগড়ম শুরু করে! মুখ-নকশা নরম করে সে তখন বলতে থাকে, ‘বংশের ময়-মুরুব্বি হগলতেরে জানান না-দিয়া তো কিছু করোনের উপায় নাই! মাইয়ার বাপে-মায়ে একটু তাগো জানান দিয়া লইতো ?’

সম্বন্ধবাড়ির লোকে তো এই কথায় কোনও দোষ দেখে না! সংসারে তো এমন করাই বিধি! মাইয়ার বাপেরে তো সেইটা করতে হইবই! তয়, সে য্যান জলদি জলদিই মুরুব্বি-জানান্তীর কর্মখান শেষ করে। সম্বন্ধবাড়ির মাইনষে এইমাসের ভেতরেই বিবাহের শুভ কামেরে শেষ কইরা নিজেগো বউরে নিজেগো ঘরে নিয়া যাইতে চায়!

মাইয়ার বাপে তখন গদগদা মুখ করে বলতে থাকে,‘সব আল্লার হুকুম! সব আপনেগো দোয়া! মাবুদের হুকুম হইলে আর ময়-মুরুব্বিগো দোয়া থাকলে শুভ কর্ম হইতে কতখোন!’ কিন্তু তারবাদে কী এক আজব বিত্তান্ত শুরু হয়! সম্বন্ধবাড়ির লোকেরা দেখে, মাইয়ার বাপে আর কিনা নিজের ময়মুরুব্বির ফায়সালা বিষয়ে একটা কোনও আওয়াজও দেয় না! ক্যান জানি মাইয়াগো মুরুব্বিরা―তাগো কন্যার সম্বন্ধ বিষয়ে―ভালা-বুরা কিছুই জানায় না ! ঘটকে আর কাঁহাতক লৌড়ালৌড়ি করতে পারে! শেষকালে ঘটকে তখন পোলার পক্ষরে নয়-ছয় কিছু একটা বুঝ দিয়া সম্বন্ধখানরে ভাঙানি দিয়া দেয়!

ক্যান মাইয়ার বাপের ময়-মুরুব্বিরা―তাগো মাইয়ার বিবাহ বিষয়ে-একটু কোনও হাঁচিটাও দেয় না ? জুলেখায় এই যে দিনে দিনে এমুন ধাম-ধুম সিয়ান কলাগাছ হইয়া যাইতাছে, তারে নিয়া তাগো কোনও চিন্তা হয় না নাকি ? বিবাহ কাম ফরজ কাম। কোন সাহসে তারা সেই ফরজ কর্ম পালন্তিতে গাফিলতি দেখায় ? বিষয় কী ?

বিষয়খান হইল এই, আদতে ময়-মুরুব্বির কোনও কারবারই এইখানে নাই। মাইয়ার বাপের কোনও কুলের কোনোজনই আর অখন জ্যাতা নাই! মাইয়ার মায়ের দিকেও সেই একই বিত্তান্ত! তাইলে এইনে ময়-মুরুব্বি বলতে আছে কে ? আছে খালি দুইজন! জুলেখার বাপে আর মায়ে!

সেই বাপে-মায়ে তাগো মাইয়ার জন্য কী চায় ? তারা একখান ঘরজামাই চায়। অল্প বয়সী, ছোটো-মোটো, একেবারে এতিম―এমন একটা পোলা যদি তারা পায়, তবেই তাগো বড়ো উপকার হয়। তারা দোনোজনে, প্রাণে ধইরা, নিজেগো এই কইলজার টুকরারে পরের বাড়িতে পাঠাইতে পারব না! পাঠাইলে, তারা নি তিষ্টাইতে পারব! আল্লা আল্লা! দিনে-রাইতে মাইয়ার মোখখান চক্ষের সামনে না দেইখা বুঝি তারা জানে বাঁচব! না না!

তাইলে নানা ছুতা-নাতা দিয়া দিয়া এমন-তেমন সম্বন্ধগুলারে তারা ভাঙানি না দিয়া আর কী করব ? অইসব সম্বন্ধের কোনও পোলায়ই তো ঘরজামাই হইতে আসব না! তাইলে এইসব সম্বন্ধরে জুলেখার মায়ে-বাপে কেমনে কবুল করব ?

এদিগে তারা তো এমুন দৌলতঅলা বড়ো মানুষ না যে, ঘটকরে তার মুখের ওপরে বিদায় দিয়া দিব! বা, একেবারে ঘটকের মুখের ওপরে কইয়া দিব, এমুন সব আজাইরা সম্বন্ধের কাম নাই তাগো।

জুলেখার বাপমায়ে হইল কোনওমতে চলাচলতি আর লড়ালড়ন্তি করা লোকমাত্র! তাগো নি অন্য মাইনষের মুখ বরাবরা কথা কইলে চলে! একদমই চলে না। তেমুন কইরা কথা কইতে গেলে না খোদায় বেজার হইব! আরেকদিগে, মাইনষে কী কইব ? মাইনষে কইব, যত বড়ো মোখ না, তত বড়ো কথা। আস্পদ্দা কত!

এমন যখন ছোটো অবস্থা তাগো, তখন কী নিজেগো আসল বাঞ্ছাখানেরে পরিষ্কার কইরা কওনের হক রাখে বাপে-মায়ে ? কোন মুখে তারা কইব, এমুন তাই-নাই সম্বন্ধের দরকার নাই তাগো ? তাগো লাগব একটা ঘরজামাই ? কোনও বাড়ির পুতে আইবো এই গরীব বাড়ির ঘরজামাই হইতে ? যত সম্বন্ধ আসছে,তাগো সকলের অবস্থাই তো দেখ- জুলেখাগো অবস্থার তেনে ভালা!

তাগো নি ঘরজামাই হওনের প্রস্তাব দেওনের কোনও রাস্তা আছে! কথাখান কানে গেলেই তো তারা চেইত্তা আগুন হইব! তার লগে লগে মাইয়ার মা-বাপেরেও অপমানি করোনের শেষ রাখব না! তারবাদে এইকথা অড়শি-পড়শিগো কানে গেলে তো আর বাঁচোনই নাই! তাগো চোপার কোপ খাইতে খাইতে তো জুলেখার মা-বাপের জ্যাতা থাকোনেরই সাধ মিট্টা যাইব গা নে!

তাইলে তারা এমুন নয়-ছয় কইরা, সকল সম্বন্ধরে ভাইঙা না-দিয়া আর কী করব ?

এমনে এমনে সম্বন্ধের কোনোটারে জুলেখার বাপে-মায়ে মোটের ওপরে আগাইতেই দেয় না। তবে ডর কী! আল্লায় মেহেরবান। ভাও-মতন একটা কোনও ঘর-জামাই কী মাবুদে মিলাইব না ? মাবুদে মিলাইবই! 

এইমতে যখন মাইয়ারে নিয়া ভেতরে ভেতরে বেধুম আটলা-পাটলা পেরেশানির মধ্যে আছে বাবা-মায়ে, তখন চৈত্রমাসের অই ঘরঘট্টা গমগপা দুপুরে, নিজেদের পুকুরে গোসল করতে যায় জুলেখা বিবি! নাম তার জুলেখা বিবি সত্য, কিন্তু হুজুরের দেওয়া সেই নামরে লোকে পারতে মুখে আনে না! কেবল খুবই ঠেকার কালে, বাপ-মায়ে সেই নামরে কেনোমতে একটু যেন স্মরণ করে! তারবাদে আবার তাগো সকলের মুখে ফিরে আসে ছোটো হয়ে আসা নামখানা―জুলি! অড়শি-পড়শি, খেশ-কুটুম, মা-বাপ-সকলের মুখে সেই এক ডাক, ‘জুলিয়ে কই গো! অ জুলি―’

সেই চৈত্রমাসের দুপুরের অই সময়খানেই, গোসলে যাওয়ার কোনও ইচ্ছাই ছিল না মেয়ের। তার ইচ্ছা ছিল, বরং নিজেদের উঠানে আরও কতখোন এক্কাদোক্কা খেলাটা চালায়ে যাবে সে। কিন্তু বাড়িতে কোনও কাজটাই বা সে নিজের মর্জিএত করতে পারে! কিছু কি পারে ? বাপ-মাওয়ের সামনাসামনি কোনও কিছুই সে নিজ মর্জিমাফিক করতে পারে না! সব করতে হয়, হয় বাপের ফরমাশ এত, নাইলে মায়ের হুকুম ধরে ধরে! কাজেই অই দুপুরের কালে এক্কাদোক্কা খেলার যত হাউসই তার হইতে থাকুক না কেন, সে সেই হাউসরে অন্তর তেনে এক ঝটকায় খেদারি দিয়া দেয়। তারবাদে মায়ের কথারে মান্যি দিয়া সে নিজেগো বাড়ির ঘাটলার দিকে ছোটে।

নিজেদের পুষ্কুনিখানা নামে মাত্র পুষ্কুনি! আদতে সেটা ছোটোমোটো এই এট্টুকখানি একটা ডোবা। চৈত্রমাসের শুকনা, খরখরা নিদাঘের দিনে তার পানি কী আর পানি আছে! পানি বলতে সেইখানে আছে ঘোলা থকথকা কতকখানি পেঁক! সেই বস্তুরে লোটা দিয়ে তুলে নি শরীরে ঢালা যায়! মায়ে যতাই কুঁদানি-হাক্কানি দিক, জুলেখায় কিছুতেই অই পেঁকেরে নিজের ওপরে ঢেলে দিতে পারব না―পারবই না!

তাইলে অখন গোসলের কী ব্যবস্থা হইব―গোসল কী তবে বন্ধ থাকব ?

ক্যান বন্ধ থাকব ? বুদ্ধি থাকলে কী আবার মাইনষেরে ঘরজামাই থাকা লাগে! জুলেখায় এই কথাটা জানে না নাকি ? জানে! সে জানে তো, মায়ের চোখরে এড়ানি দিয়া- কেমনে কেমনে- কোনোখানে যাইতে হয়! বাপেরে একফোঁটা জানানি না দিয়া, কেমনে কেমনে কী কী কইরা ফেলতে হয়―সেইটা জানে সে!

এই চৈতমাইস্যা দিনে শান্তিহালে গাও-গোসল করতে চাও ? সয়-শীতল পানির ঝাপটখান পাইতে চাও ? তাইলে শোন গো মা-সগল! তাইলে তোমারে যেইনে যাইতে হইব―সেইটা হইতেছে জমিদার-ঠাকুরের অন্দর বাড়ির পুষ্কুনি! এই তো, নিজেদের এই আউলা-ধাউলা দেওভোগ গ্রাম! তার এই তো একটু দূরের পশ্চিমে জমিদার বাড়িখান! সেই বাড়ি হইল বেহদ্দ হুমহুমা এক ছাড়া-বাড়ি! আজকা কতকাল যে হয়, সেইটা এমন একটা বিষম পতিত বাড়ি হইয়া পইড়া রইছে! ভাঙা-ঝুরঝুরা, চল্টা-ওঠা ঠাকুরদালান, কোঠাঘর, আর টইটুম্বুর, সদা পানি ভরভর মস্ত দুইখান পুষ্কুনি নিয়া সেই বাড়ি পইড়া রইছে!

সেই পুষ্কুনিরে মনে আসে জুলেখা বিবির! যদিও সেই ছাড়া-বাড়িতে একা-একলা যাওয়ায় নিষেধ আছে। মায়ে কথাখান জানতে পারলে সত্য-সত্যই জুলিরে আর আস্তা রাখব না! কিন্তু এক দৌড়ে সেইনে গিয়া, তারবাদে এক ঝটকার মধ্যে যদি জুলি নিজেগো ঘাটলায় ফিরা আসে, তাইলে কী মায়ে সেই ভেদের খবর জানতে পারব ? জানতে পারছে সে কোনোদিন ? পারে নাই। তাইলে আজকা কেমনে পারব ? আজকারটাও পারব না! তাইলে কিয়ের ডর ? এট্টুও কোনও ডর নাই―

চৌদ্দ বচ্ছর হয় হয় বয়সের আবিয়াত মাইয়া এই যে জুলেখার! তার অন্তর দেখ তারে এই বুঝ দেয়! তারবাদে পলকে সে জান-পরান হাতে নিয়া ঠাকুর বাড়ির পুষ্কুনির দিকে কঠিন একটা লৌড় দেয়! খালি হালকা কয়টা ডুবই আজকা দিব সে! এট্টুও সাঁতার দেওনের লোভ করব না আজকা। খালি সে কোনোমতে যাইব আর আইব। মায়ে খোঁজ করোনের আগেই না জুলিরে নিজেগো বাড়ির ঘাটলায় ফেরত আসতে হইব! তাইলে খর বিজলির ঝলকের মতন ঝাটকা-ছুট না দিয়া কী উপায় আছে জুলেখার ?

আহারে, মানুষের ছাও! মুরুব্বির নিষেধ নি এমতে অমান্যি করতে আছে! এমনে নি নিজেরে বিপদ দিতে আছে গো, কন্যা!

৩. তারপরে যা ঘটে!

তারপরে কী হয়, আমি এখন সেই কথা কই! এইটাই আসল কথা! সেই কথাও যে আমি কতখোন কইতে পারমু,    সেইটা আমার জানা নাই! যেইটুক দেখছি, সেইটুকই মনে করতে গিয়া আফসোসে আমি নান্দিনাশ হইয়া যাইতেছি! এই যে আমার পরানফাইড়া যাইতে চাইতেছে গা―

ওহো রে! কার কিসমত দেখ কে কাইড়া নেয়! রাজায়-গজায় দ্বন্দ্ব বান্ধায়। তার ফল রাজায়-গজায় পায়। সেইখানে দোনোজনেইসমান দোষে দুষি থাকে! কিন্তু এইখানে, এই মাটির সংসারে অমুন নির্দুষিরে নি বিনা কারণে এমুন দণ্ড দেওন যায়!

একজনেরে পুরা ঘুমের মধ্যে রাইখা নি তার কইলজার টুকরারে এমুন হরণ কইরা নিতে আছে! এমুন পাতকী কর্ম করতে পারে কেউ ? কিন্তু করলো তো! করতে দেখলাম তো আমি! আইচ্ছা করলি―করলি! কিন্তুক এই কর্মের কী পরিণাম ফলবো সেইটা একটু মাথায় আনলি না ? বিধিয়ে কী নাই ? সে কী জগতের তেনে পাপের সাজা পাওনের বিধানরে লুপ্ত কইরা দিছে ? আহা রে―!

দেখলাম তো―নিজ চক্ষে দেখলাম, সেইজনে কী করল! নিজ চিত্তের খায়েসরে পুরা করতে গিয়া ভালা-বুরা, নেক-বদ- সকলই বিস্মরণ হইল সে! আগুনে-পানিয়ে মিশ-খাওয়ানের লেইগা সে কেমুন ঘাড়-তেরা ঘাউরা-জিদ্দি হইয়া উঠল! সে কী অমন বেহিসাব,মাথা গনগনা গরম কেউ ? কই! এতকাল ধইরা তারে দেখতেছি আমি―কোনও সময় তো তারে এমন কাঠুইরা-দিলের হারামি মনে হয় নাই।

তারে দেখতে দেখতে আমার কেবল মনে হইছে, সাব্বাস রে সাব্বাস! এইজনের ধইজ্জরে তো তারিফ দিতে হয়! তার দরদরে তো বহুত সাবাসি দিতে হয়। আজকা কতগুলা দিন, মাসকে মাস, সে কিনা আড়ালে-আউইলে থাকনি দিয়া দিয়া আলগোচ্ছে এই মাইয়ারে চক্ষের দেখাটা খালি দেখছে! চুপ মুখে মাইয়াটার ভালা-বুরা তদারকি করছে! একবারও সামনে আইসা খাড়ায় নাই।

কোনোদিন মাইয়াটারে বুঝতে পর্যন্ত দেয় নাই, জগতে―সে একজন―কেউ বিরাজ করে! সেও আছে দুনিয়ায়! একবার সে নিজেরে জাহির করতে আসে নাই! চক্ষের সামনে অইসব দেখতে দেখতে আমার না শেষে তার ওপরে ভক্তি জন্মাইয়া গেছিল গা। মনে হইতেছিল, সে ভালার ওপরে ভালা! তার জুড়ি আর কেউ নাই।

সত্য বটে সে এই মাটির দুনিয়ায় বসত করে না! সে আমার আপনা কেউ না। পরদেশী একজন। বলতে গেলে অচিনার অচিনাই একজন। তারে শুধু চোখে দেইখা চিনি, তার ভেতরের আলো-কালো কিচ্ছু চিনি না। তাও তারে দেখলেই আমার ভিতরটা খুশিতে কিমুন ঠল্লাত দিয়া উঠত!

তার চক্ষের মণিতে দেখ, মাটির সংসারের এই আগলা-পাগলা যেই মাইয়া জুলেখা, তার লেইগা দেখ কেমুন মায়া, কেমুন যে বাসনা! সেই মায়া য্যান বান-কুড়ালির তাগড়া ঘূর্ণি হইয়া গোত্তা খাইয়া যাইতেছে তার চক্ষের মণিতে মণিতে! সর্বক্ষণ গোত্তা খাইয়া চলতেছে! কিন্তুক সেইটা সে একটা ঝলকের লেইগা জুলেখারে জানাইতে যায় না! কিছুই জানাইতে যায় নাই! সে খালি আউইলে থাকে! কেবল গোপনে থাকে, আর চাইয়া চাইয়া জুলেখারে দেখে! জুলেখারে দেখতে দেখতে য্যান তার মুখ-চক্ষে একদম একটা মায়ার দরিয়া হইয়া যাইতে থাকে!

সে অই বেখেয়ালি মাইয়াটারে এমন বাঞ্ছা করে! কিন্তু আমি কী জানি না, এই বাঞ্ছারে পূরণ করোনের কোনও উপায় এই খোদার দুনিয়ায় নাই ? সেইটা আমি যেমুন জানি, সেও তেমুন পরিষ্কার রকমেই জানে! জানে বলেই সে শুধু সকল সময়- আউলে-আউলেই থাকছে! আড়ালে থাইক্কাও, সে কিন্তু জুলেখার সকল ভালাইয়ের দিগে- টানটান নজর দিয়া রাখছে! যে এমুন নিঃস্বার্থ- তারে কী ফিরিশতা ছাড়া অন্য কিছু কওন যায় ? আমার তো তারে একেবারে পইল্লার তেনেই ফিরিশতা মনে হইছে!

দেখ রে দেখ! যারে অমুন ভালা মনে করতেছিলাম, সে কিনা আমার বিশ^াসের ঘরে এমুন চুরিটা করল ? করল তো করল, একেবারে আমার চক্ষের ওপরে খাড়াইয়াই করল! একবার এট্টু আমলে আনলো না যে, আমি কিন্তু তার সকল কর্মরেই দেখতাছি! তার অই হারামজাদা কীর্তি দেইখা আমার কইলজা তছনছ হইয়া যাইতে পারে। এই কথাখান তার বিবেকে জাগনা দিলো না ? একবারও না ? হায় হায়! তার অই নিদয়াপনায় না আমার ভেতরটারে ফাটাইয়া চৌচির কইরা দিলো! জিয়তে-না-মরা বানাইয়া দিলো আমারে! বিশ^াসের ঘরে এমুন চুরি ? হায় হায়!

আমি মাটি! আমি সকলেরে আমার কোলে ঠাঁই দেই ঠিকই, কিন্তুক আমি কি কেউরে জাবড়ানি দিয়া রক্ষা করোনের শক্তি রাখি ? সেই খেমতা তো আমার নাই! ডুকরাইয়া চিক্কুর পারোন ছাড়া আমার যে আর কিচ্ছু করোনের ক্ষ্যামতা নাই রে বিধি! তাইলে জুলেখা মাইয়ার অই বিপদ কালে হায় হায় করোন ছাড়া আমার আর করোনের কী আছিল ?

আমি হায় হায় করতে করতে জুলেখার কপালের লিখনরে সত্য হইয়া যাইতে দেখলাম! আহা! বিধিয়ে কিয়ের লগে কিয়ের জুড়ি লেখছে! নাকি এমুনটা হইব বইল্লাই মাইয়ার এমুন আবিয়াত দশা হইয়া রইছিল! কী জানি―বিধির মনে কী আছিল!

আচ্ছা! আমার হায়-আফসোস-কান্দন এখন এট্টু থামানি দেই। দিয়া, কিসের পরে কেমনে কী ঘটলো সেইটা খোলাসা করি―

ঝটকা কয়টা ডুব দেওয়ার জন্য তো জুলেখায় আইসা ঠাকুর বাড়ির ঘাটলায় খাড়া হইল, কিন্তু তারবাদে য্যান পলকে তার অন্তর তেনে অই ডুব দেওয়া-দেওয়ির বিষয়খান একেবারে নাই হইয়া গেল! সে য্যান নিজের চট-জলদি ডুব-দেওনের কথাটারে পুরা বিস্মরণ হইল!

তার চক্ষেরা তখন দেখে কী, আরে খোদারে! আসমানে-জমিনে দেখ কেমুন হলক-বলক রইদ! কত রঙের-কত বাহারের―কত কত রইদ রে! আর এদিগে, ঠাকুর বাড়ির নিরাছাড়া পুষ্কুনিতে খালি পানিই নাই! পানি তো আছেই! সেই টলটলা পানিতে কেমুন জানি এক প্রকার ফুলের গন্ধও ভাসতাছে! য্যান বকুল ফুলের গন্ধ ভাসতাছে! হইতেই পারে তো! ঘাটলার এই যে ওপরের চাতাল, তার এক দিগে একটা বকুল বিরিক্ষি আছে না ? আছে তো ঠিকই! কিন্তু সেই গাছটাতে নি―এইবার―এমুন চৈতমাসেই ফুল ছাড়ছে ? বৈশাখ মাসে না ফুল ফোটোনের কথা ? এইবার তাইলে আগেই হইছে ? ভালা হইছে! জুলেখায় ফুলের গন্ধ পাইতেছে! এই গনগনা দোপোরে কেমুন শান্তি শান্তি যে লাগতেছে তার! অনেক শান্তি শান্তি লাগতেছে!

ঠাকুর বাড়ির অন্দরের এই ঘাটলাখানারে এই দুপুরের রইদে কেমন যে মিঠা মায়া মায়া, আর তকতকা দেখাইতেছে―মা¹ো মা! এমন যে ভাঙাভোঙা সিঁড়িগুলা! একদিন, কোনও পুরানা আমলে, জমিদারেরা বানাইছিল! আজকা অখন আর সেই জমিদারেরা কেউ নাই! তাগো কোনও একজনেই আর নাই! কেবল পইড়া রইছে তাগো কোঠাবাড়ি, গাছগরান, উঠান-ঘাটলা-সিঁড়ি! একটা মানুষের চিহ্নসুদ্ধা নাই এই বংশে। ইস!

এইখানের এই শান-বান্ধানো ঘাটলার সিঁড়িগুলাও যে কেমন কেরামতির জিনিস! য্যান এই সিঁড়িগুলার কোনও আর শেষ নাই! কোনও ওপরের চাতাল থেকে সেইগুলা এই কোনও নিচায় আইসা নামছে! একে একে নাইম্মা আসছে নাইম্মা আসছে একদম পুষ্কুনির পানির কাছে। সেইটা নাহলে হইল!

কিন্তুক সেইখানেই তো শেষ না। এই সিঁড়িগুলারে নিয়া জমিদার ঠাকুরেরা কেমুন যে এক তেলেসমাতি কারবার কইরা থুইছে গেছে! আচানকের কথা এই যে, এই ঘাটলার সিঁড়িরা পানির কাছে আইসা-ই শেষ হইয়া যায় নাই!

ক্রমে একের পর এক সিঁড়ি একে একে পানির কোনও গহীনে কোনও অতলে জানি নাইমা গেছে! সেইটার হদিস জুলেখায় জানে না! সে খালি জানে―যত তুমি পানির ভিতরে নামতে চাও―নামো। তুমি কিন্তু বরাবরই তোমার পাওয়ের নিচে সিঁড়িরে পাইতেই থাকবা। কোনও প্রকারেই পুষ্কুনির তলের কোনও পেঁক-মাটি তোমার পাওরে ধরতেই পারবনা! তোমার পাওরা খালি পাইব শ্যাওলা-পিছল শান-বান্ধাইন্না সিঁড়ি!

কী জানি কী আছিল জমিদার ঠাকুরগো মনে! ক্যান তারা পানির এত তলেও এমুন বেহিসাব-সিঁড়ি বানাইয়া থুইছে  সেইটা খালি তারাই কইতে পারব! এখনকার দেওভোগের প্রজা রায়তরা এই যে জুলেখার বাপ চাচারা, তারা কেউই এই ধন্দের দিগে কোনও দিন কিছুমাত্র নজর দেয় নাই! সংসারে কি তাগো ঝুট-ঝঞ্ঝাটের কোনও কমতি আছে ? সেইসব ফালাইয়া নি তাগো অখন জমিদার বাড়ির পুষ্কুনির সিঁড়ির আগামাথার হিসাব করতে বইতে হইব ? কোনও ঠেকা―?

খালি একলা এই জুলেখারই ঠাকুরগো ঘাটলার এই সিঁড়ি-তেলেসমাতিখানের মীমাংসা করার অনেক বাসনা হয়! বহুতদিন ধইরাই অই বাসনাটা হইতেছে তার! কিন্তু কেমনে যে সেইটার মীমাংসা করোন যাইব, জুলেখায় সেই রাস্তার কোনও খোঁজ করতে পারে নাই!

ওপরের থেকে নাইমা আসার এই যে এত সিঁড়ি! এই যে এমুন গায়-গায় সিঁড়ি! তারা কোনোটাই আর অখন পুরা আস্তা, অভাঙা নাই! এইখানে এক খাবলা সিঁড়ি যদি শান বান্ধানো পাওয়া যায়, তো দেখ গা বাকি অংশটুকের কী হাল হইয়া রইছে! হইয়া রইছে একেবারে ভাঙা-খরবরা অবস্থা! ভাঙা জায়গাগুলায় এখন ইট-সুরকির চিহ্নসুদ্ধা নাই! সেইখানে অখন আছে খালি খাবলা খাবলা মাটি! আর, সেই মাটিতে জাগনা দিয়া আছে কাঁটানটের ঝোঁপড়া-ঝাপড়ি! অতি অতি তাগড়া-তোগড়া ঝোপড়া-ঝাপড়ি!

সেই ঝোপড়া সবুজেরে এই রঙজ¦লা লাল, ভাঙা সিঁড়িগুলাতে কেমুন সোন্দর যে দেখায়―জব্বর সোন্দর! আজকা জুলেখার নজর য্যান অইগুলার কাছ তেনে আর সরতেই চাইতেছে না। খালি সেইগুলার দিকে চাইয়া থাকতে ইচ্ছা হইতেছে তার। সে না তার মায়েরে জানানি না দিয়া, একদম গোপনে এইনে আসছে! সে না আসছে খালি কয়টা জলদি ডুব দিয়া যাওনের লেইগা ? তাইলে কী তার অখন কাঁটানটের ঝেঁপড়া নিয়া আহ্লাদ করলে চলব ? আজকা তেমুনটা করোনের দিন ? না তো!

নিজেরে অই প্রকারে বুঝ দিতে দিতে জুলেখায় পুষ্কুনিটার দিকে চায়। কালা চকচক্কা পানিতে ছোটো এট্টু-এট্টু ঢেউ! তিরতিরা ঢেউ! তাও পুষ্কুনিটারে একেবারে য্যান থির-ধীরই দেখায়! কত যে সোন্দর! কিন্তু তাও কী এইনে জ¦ালা-পাওনের কোনও শেষ আছে ? এই যে পায়ের তলের ভাঙা-টুকরা সিঁড়ি! এই টুকরাগুলার কোনও একটাতেও যে জুলেখায় শান্তিহালে পাও রাখব, সেইটার তো দেখি আজকা কোনও উপায় নাই!

চৈতমাইস্যা দোপোরের দগর-বগর রইদে কী করছে দেখ! এই রইদে অই ভাঙাচুরা সিঁড়ির টুকরাগুলারে করছে কী―জাহান্নামি তপ্ত বানাইয়া থুইছে! একদম য্যান তা-পোড়া তা-পোড়া গরম-তাওয়া বানাইয়া ফালাইছে! মা¹ো মা! একটা দন্ডের জন্য সেই গনগনা আবড়া-জাবড়া ভাঙাগুলাতে পাও দিয়া রাখার নি কোনও ভাও আছে এখন!

‘তাইলে অখন জুলেখায় কী করব ?’ নিজেরে জিগায় সে!

‘কী আবার করব ? নিজের পাও দুইটারে―এই এক্ষণ নিয়া―পানিতে চুবানী দিতে হইব! ভালা মতন চুবচুবা করে ভিজানী দিয়া রাখতে হইব!’

‘সেইটা না কইরা, জুলেখায় ক্যান এমনে তবদা দিয়া খাড়াইয়া রইছে ? সে কি এক লৌড়ে পানির দিগে নাইমা যাইতে পারে না ? ’ নিজের পায়ে খনখনা, তপ্ত শানের ছ্যাকা খাইতে খাইতে―এইমতে নিজেরে জিজ্ঞাসা করে জুলেখায়! জিজ্ঞাসা করতে করতেই সে আবার নিজের সঙ্গে নিজে হেসে কুলুকুল হইয়া যাইতে থাকে! ‘ দ্যাখছো! কেমুন মগার মগা আমি! ঠেকার কামটা তগনগদ কইরা ফালানের কতা নি আমার মনে আহে!’

হাসতে হাসতে, তড়ং তড়ং জোর লাফানি দিতে দিতে, জুলেখায় পানির নিকটে আসে! তারবাদে ঝটজলদি সে নিজের পাও দুইটারে পানিতে নামায়ে দেয়। আহারে! পানির ওপরে-ভিতরে কেমুন গরম-শীতলের কারবার চলতেছে দেখ! কেমুন আরাম হইতেছে দেখ! জুলেখার একেকটা পাও―অল্পে অল্পে পানি-চুবা, পানি-চুবা হইতে থাকে, আর তারা নিজেরা নিজেরাই য্যান পানিতে দোল দিতে থাকে! পায়ে পায়ে ঝাপট দিয়ে দিয়ে―একটু একটু য্যান ঢেউও জাগাতে থাকে! ধীর-ঢিলা ঢেউ! একদম জুলেখার নিজের বানানো ঢেউ!

কত যে আরাম লাগতে থাকে তার। পানির অই পরশখান,খালি তার পা দুটারেই জুড়ানি দিতে থাকে না। গরমে ধগপগা জুলেখার পুরা শরীরটারেও যেন মিহিন শীতল করে দিতে থাকে। আর যেন আস্তে করে তার মন ভুলে যেতে থাকে, কেন সে এই নিরালা দুপুরের কালে, এই ছাড়া-বাড়িতে, এমন একা এসে হাজির হইছে! ভুলে যেতে থাকে, কোন কর্মখানা চক্ষের ঝলকে সেরে নিয়ে, তারবাদে বনবনায়ে ছুট দিয়ে―নিজেদের পুষ্কুনির ঘাটলায় ফিরে যাওয়ার কথা তার! সেই কথা তার ―একদম মনেও আসে না আর!

বরং পা ভেজাতে ভেজাতে তার মনে হতে থাকে, ‘আলা এইবার এট্টু বসি আমি। এইনে ইট্টু বইয়া জিরাই অখন। পানির ওপরের সিঁড়িত এট্টু লেপট দিয়া বই। পাও দুইটা এমুন পানিতেই চুবাইননা থাকুক, থাকুক।’ এই ভাবনা তার দেহখানার মধ্যে―কেমন একপ্রকার ঢিলা আলসেমি আর শান্তি নিয়া আসে। জুলেখার মন কেমনে জানি মায়ের বেধুম গালি আর ঠোকনা পাওয়ার ডরটারে ভুলে যায়। জলদি করে বাড়িতে ফেরত যাওনের ঠেকাটারে বিস্মরণ পায়। এই যে সে এইখানে এই ঠাকুর বাড়ির ঝুম থুমথুমা পুষ্কুনিটার কাছে―এইখানেই বা সে ক্যান আসছে―সেই কথাখানও য্যান আর তার স্মরণে আসে না!

জুলেখার ধীর দেহখান আস্তে করে ঘাটলার সিঁড়িতে বসে পড়ে। লেট দিয়ে বসে পড়ে। তার পায়ের পাতা দুইখান পানিতে চুবানো! পানির নিচে অই তো কতগুলা সিঁড়ি! ধাপের পর ধাপ নেমে গেছে―অই কোন নিচে! এই অন্দর বাড়ির পুষ্কুনির কোন গহীন অতলের দিকে নাইমা গেছে। অতো গহীনে জুলেখায় কোনোদিন যায় নাই! এই পুষ্কুনিতে সে ডুব-ডাব যা-ই দেয়, কোমর পানি বরাবর সিঁড়িতে খাড়া হয়েই দেয়! অখন পর্য›ত তেমনই দিয়েছে!

পানির তলের এই সিঁড়িরা কত নিচে পর্যন্ত যে গেছে সেইটা খালি মাবুদই জানে! কোনোদিন সে তো মাঝ পুষ্কুনি বরাবর এমন কী সাঁতার দেওয়ার সাহসটাও করে নাই। চিরকাল ধইরা এমুন বাঘা থমথমা, টলটল পানি ভরপুরা যেই পুষ্কুনি―তার মাইঝ বরাবর যাওনের হিম্মত তার কেমনে হবে! তার লগে যদি কোন সময়-একজন দুইজন মানুষও থাকত, জুলেখায় একবার অন্তত একটা লম্বা সাঁতার দেওনের চেষ্টা করতো! কিন্তু কোনও সময়ই তো সে অন্যরে জানানি দিয়া―এইখানে আসে নাই! অন্য কাউরে জানানি দিলে কী সে আসতে পারত ? দিত তারে কেউ এইখানে,এই পুষ্কুনিতে, আইতে ? দিত না!

কাজেই একা একাই তারে পলাইয়া-লউড়াইয়া আসতে হইছে এইখানে! সকল সময়ে এমন একা একাই আসছে সে! অন্যরা এই ঠাকুর বাড়িতে আসার কথা শুনলেই ডরায়ে কুল পায় না! জুলেখার মায়েরও সেই একই ডরানের দশা! সকলেই এইখানে আইতে ডরায়। আরে, ঠাকুর বাড়ি নিয়া ডরানের আছে কী! এইটা একদিন জমিদার হুজুরের বসতভিটা আছিল। সেইটাতো কোন এক সময় আছিল। অখন তো আর তাগো কেউ নাই। বংশেই কেউ নাই। ছাড়া বাড়ি পড়ে আছে ধু ধু বিরান! সেই বাড়িরে ডরানের কিছু আছে! কিচ্ছু নাই! জুলেখায় একা-একলা এইখানে আইসা আইসা দেখছে তো। ঠাকুর বাড়িরে ডরানের কিচ্ছু নাই।

উল্টা আরও এই বাড়িতে আসতে পারলে―পরানের ভিতর তেনে―ডর তো নাই হয়ে যায়-ই, লগে অন্তরের দুঃখগুলা সুদ্ধা নাই হয়ে যায়। জুলেখায় নিজে এর প্রমাণ। সগলতে মনে করে, অই তো অই বাড়ির জুলিয়ে এমুন বোবা মুখের মাইয়া। মাও-বাপের আদরের পুতলা। অয় বোঝেই বা কী। অর আবার দুঃখ বা কী।

 তয়, জুলেখায় নিজে খালি জানে। তার অন্তরে কোন আগুন-পোড়ন চলতাছে! কত পিঁপড়ার কামড়ের মতন জ¦ালা-জ¦লুনি নিয়া তার পরান কেবল দপদপাইতাছে। এই চৌদ্দ বচ্ছর হয় হয় জুলির কপালে খোদায় এত ছিদ্দত রাখছে। এমুন ছারকপালী। এমুন পোড়া কপাইল্যা।

এই তো আজকা―অনেক ভোর-সকাল কইরা বাজানে বাড়ির তেনে বাইর হইয়া গেলো। ও আল্লা! এমুন বিয়ান বিয়ান বাজানে কই যাইতাছে ? বাজানে যাইতাছে কাইক্যার টেক। কোন দূরের দূর-কোন এক দেশ! সেইটার নাম বোলে কাইক্যার টেক!

ক্যান গেলো ?

তাগো ঝিয়ের লাইগা ঘরজামাই বিছরাইতে গেলো!

এই যে জুলেখার লাইগা কত দুনিয়ার সম্বন্ধ আসতেছে―এই যে প্রায় নিত্যি নিত্যি এরা-তারা জুলিরে দেখতে আইতাছে! এইডা জুলির ভালা লাগে ? ভালা লাগে না তো। কত এমুন করোন যায়! কত এমুন কইরা কইরা―লোকের সামনে গিয়া―হাজিরা দেওন যায়! কত!

এই যে এই বিষয়খান জুলেখার এমুন বেজুইতের লাগে, এমুন অপমান অপমান লাগে! সেইটা কি বাপে-মায়ে একটু গোনায় ধরার ব্যাপার মনে করে ? করে না। জুলেখার পরানের ওঠা-নামারে হেরা গনাই ধরে না! একটা কোনও বিষয়ে যে জুলেখার ঘিন-পিত থাকতে পারে―এইটাই তো ঘরের কোন জনের খেয়ালে আসে না! হেরা চায়, জুলেখায় য্যান বোবা মুখে বাপ-মায়ের হুকুম তামিল করে। যেমনে মায়ে কইবো, জুলিয়ে তেমনে তা করব! যেমনে বাজানের যেই বুঝ হইব, তাগো জুলেখায় সেই বুঝমাফিক পাও বাড়াইব!

করে সেইটা জুলেখায়। মুখে কোনও টু আওয়াজও তোলে না সে। খালি ফরমাশ মাফিক কদম দিয়া যায়। যা করতে বলে, তা-ই করে সে।

আইচ্ছা, মাও-বাপের ফরমাশরে মান্যি দিয়া―কর্ম করতে কি জুলেখার চেত ওঠে ? অনেক চেত ওঠে ? না না। তেমুন বহুত কোনও চেত ওঠে না তার! তয়, তার খালি মনে হয়―হেরা এত বাছাবাছি করতাছে ক্যান! ক্যান করে ? আর, দূরের গেরামের মাইনষেরেই খালি তাগো নজরে আসে ক্যান ? দুনিয়ার আর কাউরে চক্ষে পড়ে না হেগো ? দুনিয়ায় আর কোনও একটা পোলা নাই ? ভিটির কাছের একজনও কী নাই ? আছে তো। সেইজনের লগে জুলেখার সম্বন্ধ করোনের চিন্তা আসে না ক্যান, তাগো দিলের ভিতর ? একটাবার তো সেইজনের নামটা তারা মনে আনতে পারে ? দেখ কী ব্যাপার! তার নামটা পর্যন্ত কেউ মুখে আনে না! জুলেখার লগে সেইজনের সম্বন্ধের কথাখান-কোনো একটা মাইনষে মাথায়ও আনে না! কিছু হউক আর নাই হউক, সেইজনের লগে যে জুলেখার বিয়া-শাদীর বিষয়ে―একটু হালকা-পাতলা কথাও তো উঠতে পারে। কারও মনই সেই বিষয়ে লড়েচড়ে না।

নিজের মাও-বাপের মনে যে অমুন সম্বন্ধের বিষয়খান লড়ালড়ি করবো না, সেইটা জুলি বোঝে! করব কোন হিসাবে ? হেরা হইল এই দেওভোগ গেরামখানের চিরকালের বড়োলোক! আর জুলেখার বাপে ? সে কোনও মতে ঝি-বৌরে নিয়া টিমটিমাইয়া দিন পার করে! না আছে তার টেকার জোর, না আছে খেশকুটুমের জোর! তাইলে এই গরীব জুলেখার বাপে―সেই বড়ো মাইনষের বড়ো পোলার দিকে―কোন হিম্মতে চোখ দিবো ?

অড়শী-পড়শীরাও তো এমুন সম্বন্ধের কথা তুলবোই না! সেই দৌলতঅলার বাড়িতে এমুন গরীব ঘরের মাইয়ার সম্বন্ধ নিয়া গিয়া―শেষে পোলার বাড়ির মাইনষের গালি খাইবো নি লোকে! কার এমুন ঠেকা পড়ছে! কেউইর কোনও ঠেকা পড়ে নাই!

এই সম্বন্ধের কথাখান বললে বলতে পারে শুধু দুইজন মানুষ।এই দেওভোগ গেরামের সগলতের মধ্যে―খালি অই দুইজনেরই―সেই আন্ধাগোন্ধা সাহসখান আছে! এক হইল ফালানীর মা ফুপু। আরেক হইল মসজিদের ইমাম হুজুরে। কিন্তু তারা যে এইটা নিয়া কথা কইবো, সেইটা তো তাগো ধরায়া দিতে হইব,নাকি ?

অখন, কে সেইটা তাগো ধরাইয়া দিবো ? দুনিয়ায় জুলেখাগো এমুন বান্ধব কে আছে ? যে কিনা ফালানীর মা ফুফুরে এই বিষয়খান নিয়া লড়ালড়ি করতে বুদ্ধি দিবো ? বা ইমাম হুজুররে গিয়া মিনতি করবো, ‘হুজুর! দেহেন তো! অমুকটা হয় নিকি ?’

না। সম্বন্ধ আগানি-পিছনির বিষয় তো বহুত দূর, খালি এমুন একটু মুখের কথা তুইল দেওনেরও আপনা কেউ নাই জুলেখা গো!

জুলেখার চক্ষে পানির ঝাপটা বাড়ি পড়ে! আচমকার ওপরেই শক্ত রকমে বাড়ি খায়―তার চক্ষের মণিরা! আহা রে! একটা কেউ নাই! কোনও একটা আপনা মানুষ নাই রে! একটু খালি সেই সম্বন্ধের কথাখান তুইলা দেয়―এমুন কেউরেই দেয় নাই খোদায়! জুলেখাগো দেয় নাই!

এই যে এত এতখান তেনে সম্বন্ধের আনা-যানা চলতেছে―এই যে আজকে জুলেখার বাপে―ঘরজামাই সাব্যস্ত করার কঠিন নিয়ত করেই ঘরের বাইরা হইছে! আজকা যদি সম্বন্ধখান পাকা হইয়া যায় ? যদি বিয়ার দিনতারিখ ধরাধাজি কইর্ইা―জুলেখার বাপে বাড়িত ফিরে ? তাইলে ? তাইলে কী হইব ? চক্ষের পলকে জুলেখার বিয়া-শাদী হইয়া শেষ হইব!

হউক! হউক সেইটা!

আরেক জনের দিলে যদি―জুলির লাইগা মায়া-বাসনা না-জন্মাইয়া থাকে, তাইলে জুলেখায় আর কী করবো! আরেক জনের পরানে যদি―জুলেখারে ঠাঁই দেওনের বাঞ্ছা না জাগে, ছারকপালি জুলেখার তাইলে আর কী করোনের আছে! এক পারে সে কাঁদতে। আরেক পারে গলায় ফাঁস নিতে,নাইলে পানিত ডুবতে!

না না । এমুনটা কোনদিন করোন যাইব না। এমুন কিছু করোনের কোনও হক নাই তার। মাও-বাপের জিন্দিগী তাইলে ছারেখারে যাইব গা। হেরা কেমনে দুনিয়ার ওপরে খাড়া থাকব! এই জুলেখায়ই না তাগো আশ-শ^াস! তাগো না নয়নের নিধি এই মাইয়ায় ? এই দুইজনের মাইয়াখানরে ছাড়া―দুনিয়া পুরা আন্ধার দেখে! হেগো কইলজায় দাগা দিতে পারব না―পারব না এই মাইয়ায়!

তাইলে জুলেখায় আর তবে কী করতে পারে ? সে তবে কাঁদতে পারে! কাঁদতে কাঁদতে সে নিজের চোখ দুইখানরে আন্ধা কইরা ফালাইতে পারে! দিনে দিনে এমন কইরা নিজেরে শেষ কইরা দিতে তো পারেই! তাইলে সেইটাই করবো সে! তিলে তিলে নিজেরে দগ্ধাইয়া মারবো! তাও আঁতকা মইরা নিজ বাপ-মায়ের দিলে দাগা দিবো না জুলেখায়!

এইমতে কত বেদনার কথা ওঠাপড়া করতে থাকে জুলেখার অন্তরে! কত রকমের পানিও না নামতে থাকে চক্ষের ভিতর থেকে! এই এক ঝলক পানি জাগনা দেয়! সেই পানি তিরতিরা। হালকা নহরের পানি! তারে মুছলেও চলে, না মুছলেও চলে! আবার সেই তিরতিরা পানিরে একটা থেবড়া দিয়া সরাইয়া দিয়া, হড়ম-ঘড়ম একটা তেজি ঢল যেন আচমকা বওয়া শুরু করে! হায়রে জুলেখার চোখ! এত কান্দন তুমি―কই পালানি দিয়া রাখো ? ঘরের মাইনষের সামনে―কেমনে তুমি নিজেরে শুকনা খরখরা রাখো ? কেউ দেখি এক বিন্দু পরিমাণ আন্দাজও করতে পারে না, তোমার অন্তরে কোন আগুন জ¦লতাছে! কেমনে তুমি এতখানি পারতাছো গো জুলি ?

কাঁদতে কাঁদতে ধুম ফোঁপানী আর হিক্কা উঠতে থাকে জুলেখার। আইচ্ছা! এমনে এমনেই মইরা যাইব গা তাইলে জুলেখায়! কাঁদতে কাঁদতেই যাইব গা! মায়ে ধরতেও পারবনা। কোন বালাইয়ে জুলিরে এমনে নিলো গা! বাজানে আন্দাজও করতে পারবনা! কী বিমারে ধরছিল তার মাইয়ারে! থাকুক সেই দৌলতদারের পুতে চির আন্ধা, বেখেয়াল হইয়া! সুখে থাকুক সে। খোদায় জুলেখার নসীবে কান্দন লেখছে, সে কাঁদতে কাঁদতেই জনম শেষ করবো। দুনিয়ার কাউরে কিচ্ছু কইবো না জুলিয়ে! কিচ্ছু কইবো না!

আজকা জুলেখার কী হয়! কাঁদতে কাঁদতে সে একেবারে বিস্মরণ হয়। নিজের মায়রে ফাঁকি দিয়া এই ভরা দুপুরে―এমুন আজায়গায় আসছে! আসছে এই পতিত-বাড়ির ঘাটলায়! আসছে কেবল তুরুত কইরা দুই তিনটা ডুব দিতে। আর, তারবাদে তুফাইনা বাতাসের মতন এক ঝটকায় তারে ফিরতি যাইতে হইব নিজে গো ঘাটলায়।

অন্যদিন সে যেমনে যেমনে এক লৌড়ে চুপেচাপে যা করে। আজকাও তেমনে তেমনেই সব করতে হইব তারে। সেই অতি দরকারি কথাখানই কিনা একেবারে ভুইলা যায়! দুনিয়ার সকল কিছুরেই য্যান তার পরানে―একবারে ভুইলা যায়!

 খালি একটা কথাই তখন তার মনে থাকে। খালি সেই একজনের কথা। যেই পাষাণে দেখ গা―জুলেখারে এট্টু মনেও আনে না! সেইজনের কথাই মনে আসতে থাকে তার। এমনই নিদয়া সে! যে বুইজাও কিছু বুজলো না! যে জুলির মুখের দিগে একবার চাইয়াও দেখল না! এট্টুও চাইয়া দেখল না। হের লাইগা জুলেখার পরান ফাইট্টা যাইতেছে! মাবুদ গো, জুলির পরান দেখ ফাইট্টা টুকরা-মুকরা হইয়া যাইতেছে! ইসুফ মিয়াভাইয়ের লাইগা জুলেখায়―পুইড়া আংড়া হইয়া যাইতেছে গো খোদা!

এমন তেজী ধারার চক্ষের পানিরে কতোক্ষণ আর হাত দিয়া মুছুনি দেওয়া যায়! কত আর এমনে তারে সামলানি দেওয়া যায়! বেতালা কান্দনরে ভালোরকমে শুকানি দেওয়ার জন্য জুলেখায় শেষে নিজের অঞ্চলের আগাখানা এনে চোখের ওপরে চেপে ধরে! নে এখন, পানির নহর! কত পড়বি পর!

এমন সময় জুলেখায় শোনে কী, কে জানি হাইট্টা আসতেছে! তাগো গ্রাম থেকে ঠাকুরবাড়ির অন্দর-পুষ্কুনিতে আসার যেই চিপা পথটুক আছে না, সেই পথে য্যান কার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়! ‘আল্লা! কে আহে!’ মেয়ের কলজা ধড়ফড়ায়ে ওঠে! ‘মায় নি জুলেখারে বিছরাইতে আইয়া পড়ছে ? হায় হায়! মায় তো আউজকা তাইলে জুলেখারে আর আস্তা রাখব না! ও আল্লা!’

ঘাটলার এই একেবারে নামার দিকের সিঁড়িতে বইসা―কিছুতেই বোঝা যাইব না কেটায় আসতেছে! চিপা পথটুকুর দুই মুড়ায় না খালি ঝোপড়া-ঝাপড়া ? গাছে-গরানে একেবারে ঠাসঠাসা সেই রাস্তাটুক! আর ছেমায় ছেমায় আবছা কালা আন্ধার!

কে আইতেছে সেইটা ভালামতন বুঝতে হইলে―জুলেখারে তো খাড়া হতে হবে! কেটায় আইতেছে ? মায়ের আবার এইখানে আইয়া―জুলেখারে শাসন করোনের কোন কাম ? জুলেখায় বাড়িত যাইব না ? যাইব তো! বাড়িত যাওনের পরে আলা―যতো খুশি পিছা-জোতা মারার মারবো নে মায়! জুলেখায় এট্টুও চিক্কুর দিবো না! এক ঢলক চক্ষের পানি সুদ্ধা সে ফালাইবো না তহন! অহন, মায়রে আর এইখানে আইয়া কাম নাই! এইখানে এট্টু খালি জুলেখায় একলা থাকুক ? এট্টু খালি অই পাত্থর-দিলের ছেড়াটার লাইগা―চক্ষের পানিটুক ফেলোনের―কিসমতখান হউক অর ?

এইএত কত ভাবনা পলকে-ঝলকে জুলেখার অন্তরে নড়ামোড়া দিয়া ওঠে! ওদিগে দেখ তো কেমুন কারবার! অই পন্থে হাঁটার আওয়াজ পাওয়া যাইতাছে ঠিকই, কিন্তু কাউরে তো ঘাটলা বরাবর আইসা পৌঁছানি দিতে দেখা যাইতেছেই না। একটুই তো পথ পাড়ি দিতে এতখোন লাগে নি ? জুলির ওপরে চেতের ঠেলায় -আউজকা কী মায়ের পাওয়ের বিষ-বেদনা বাইড়া গেলো ?

বিষয় বিত্তান্তখানা পরিষ্কার রকমে বুঝতে তো হয় তাইলে! জুলেখায় তখন ঠেলে-ধাক্কায়ে নিজেরে কোনোরকমে খাড়া করে। তারবাদে তুকতে তুকতে ওপরের চাতালে উঠে আসে সে। কিন্তু কই! এখন তো অই চিপা পথে কোনও আওয়াজ নাই! তাইলে জুলি কী ভুল শুনল! স্পষ্টই তো আওয়াজ পাইলো সে। হাঁটার আওয়াজ।

নাকি গ্রামের কারও গরু-বাছুরের কারবার এইটা ? সেইটায় দেখ গা খুঁটা খুইলা আপথে আইসা পড়ছে। এমুনই হইছে মনে হয়! যাউক গা, জুলেখায় তাইলে নিজের কর্ম শেষ কইরা―এইবার বাড়ির পথ ধরুক। এইবার তাইলে সে হুমদুম কইরা কয়টা ডুব দিয়া লউক।

এই মনে কইরা সেই মাইয়ায় ওপরের সিঁড়ি থাইকা―পুষ্কুনির পানির দিকে নামা শুরু করে। নামতে নামতে হঠাৎ য্যান তার মনে হয়, অই ত্তো! কে জানি আইসা অই ঘাটলার ওপরের শান-বান্ধানো চাতালে খাড়া হইছে! সেইজনের কাপড়ের খসর-খস আওয়াজ য্যান জুলেখার কানে আইসা বাড়ি দিতাছে! একবার তার মনে হয়, সে ভুল শুনতেছে! আন্দাজেই ধোকা খাইতাছে! তার পিছনে আদতে কেউ আইসা খাড়ায় নাই! মনের ভুলে সে-কী না কী বুঝতাছে! আরেকবার তার মন বলে, না না। ভুল না। অইহানে হাছাই কেউ আইয়া খাড়াইয়া রইছে!

কেটায় ? কে ?

পানির দিকে নামতে নামতে―জুলেখার পাও আতকার ওপরে থামানি দিয়া ফেলে! ‘কেটায় আইছে ? নাকি মনের ধন্দ ?’ মনের এমত ধাক্কার চোটে―জুলেখায় আর তবে―পানিতে নামে কী প্রকারে ? সে চট্টাস করে ঘুরে যায়। আছে কেউ ওপরের সিঁড়িতে ?

আল্লা গো! কে একজন তো সত্য সত্যই আইসা খাড়া হইয়া রইছে অইহানে! সত্য তো!

কিন্তু অইটা কে ? অইটা কে আইসা খাড়া হইয়া রইছে অইখানে! জুলেখায় যা দেখতেছে-সত্য দেখতেছে ? জুলেখার আজীবনের স্বপন―অইটা কেটায়! সে কেমনে জানলো জুলেখায় এইখানে! কেমনে তল্লাস পাইলো! তার দিলে তাইলে জুলেখারে সত্যই সন্ধান করে!

জুলেখায় যা দেখতেছে, হাছা দেখতেছে তো ? নাকি দুপুইরা রইদের তেজের ধাক্কায়―জুলির চক্ষুরা ভুয়া দেখতেছে। নাকি সত্য দেখতেছে।

অইটা কে ? কে ?

অই যে তারে―একদম তার মতনই―দেখাইতাছে ! সে-ই তো দেখি, আজকা এমন ক্ষণে আইসা অই যে ঘাটলায় ওপর মুড়ায় খাড়াইয়া রইছে! অইটা ইসুফ মিয়া ভাইরে তো দেখতেছে জুলেখায় ?

তারেই সত্য সত্য দেখতেছে জুলেখায় ? সত্যিই অইটা ইসুফ মিয়াভাই ?

৪. ‘ হিয়ার পরশ লাগি সে-হিয়া কান্দে’

অন্য অন্য সময়, দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, কথাবার্তা যা-কিছু কওয়ার, মিয়া ভাইয়েই কইতে শুরু করছে! সে-ই কথা কইছে, আর জুলেখায় কেবল মিয়াভাইয়ের কথার পৃষ্ঠে মাথা নাইড়া গেছে। নাইলে জুলেখায়―নিজের ঘাড়-মাথারে মাটির দিকে নামানি দিয়া―কোনোমতে ইসুফ মিয়ার কথার আধামাধা জবাব দিয়া গেছে। টুকরা-টাকরা, ঝাপসা-হালকা কথা দিয়া দিয়াই সে, উপস্থিত শরমটারে সামলানি দিয়া গেছে।

ইসুফ মিয়ার কাছেও জুলেখার সেই শরম পাওয়াখান গোপন থাকে নাই। সেই কারণে যা-কিছু বলা-কওয়ার কর্ম আছে, সেই সকল ঠেকা ইসুফ মিয়ায় নিজেই – সেরে নিছে! বরাবর এইটাই হইছে। ইসুফ মিয়ায় একটাবারও কথা কওনি নিয়া―জুলেখারে পেরেশানি পাইতে দেয় নাই!

তবে আজকা এমন থমথমা দুপুরের কালে। এই নিরালা ঠাকুরবাড়ির ঘাটলা, সেইখানে জুলেখায় এমুন গোপনে পলানি দিয়া―একলা আসছে! সেইটা ইসুফ মিয়াভাইয়ে কেমনে জানলো ? সে আজকা তার কর্মে যায় নাই ? নিত্যি ভোর-সকালেই না মিয়াভাইয়ে―নিজেগো গদীতে যায় গা ?

আর, এমুন নিরালায় তো মিয়াভাইয়ে কোনওদিন আসে না! জুলিরে দেখতে হইলে―হয় মিয়াভাইয়ে গিয়া জুলেখাগো ভিটির কোনও মুড়ার ঢালে আইসা খাড়ায়! নাইলে আসে বাড়ির পুব মুড়ার তেঁতুল গাছের কাছে! সেইটাও তো সে বেশীরভাগ বৈকাল কইরাই আসে!

নাইলে আসে বিয়ানের সময়ে, গদিতে রওনা দেওনের আগে। কোনও দিন একেবারে ঠেকার ব্যাপার হইলে, সন্ধ্যার মুখেও আসছে সে। আইসা জুলির লগে দুই-দশটা কথাও শেষ করে নাই। তগনগদ গেছে গা। কী জানি কেটায় আবার দেখে! কোনও কুকথা না শেষে কওন ধরে মাইনষে! বিনা দোষে-জুলিরে বদনামের ভাগী করবো নি, ইসুফ মিয়ায়।

অত্ত কথা কওনের কোনও ঠেকা যে পড়ে না মিয়াভাইয়ের, সেইটা জুলিয়ে ভাল কইরাই বোঝে। কওয়ার মধ্যে তো খালি―এই-সেই, কেমুন আছিলি,আজকা তরে দেখতে আহে নাই ? কি রে ছেড়ী ?―এমুন তেমুন ছুটাছাটা কথা কইয়া, জুলির কলাবেণীতে একটা-দুইটা ঝাটকা টান দিয়া, মিয়াভাইয়ে তখন নিজেগো বাড়ির পথ ধরছে!

 সেই মিয়াভাইয়ে―আজকা এমুন নিরালায় আইসা―এমনে খাড়া দিয়া আছে ? দেওভোগের কোনও একজনে আইয়া যদি এইটা দেখে, কী কইবো তখন! কী হইল আজকা ইসুফ মিয়াভাইয়ের ? জুলেখায় না এইখানে একলা গোসল করতে আসছে! এখন, মিয়াভাইয়ে এমনে খাড়াইয়া থাকলে, জুলেখায় সেইটা করতে পারব ? ইছ! তোবা তোবা! পারবনা তো! সেই বিষয়খান দেখি আজকা মিয়াভাইয়ের―খেয়ালেই নাই!

আর এদিকে দেহো, শরমে জুলেখার নিজের ভিতরটা আর বাহিরটায় কেমুন কাঁপোন কাঁপতাছে ! দেহো তো! মিয়াভাইরে দেখলেই এমন হইতে থাকে তার! ভেতরে ভেতরে বহুত আহ্লাদ হইতে থাকে! আর বাইরে দিয়া শইল কাইপা শেষ হইতে থাকে! কেমুন যে লাগে!

এই যে এখনও তেমনই তো হইতেছে!

কিন্তু দেখ রে ব্যাপার! জুলেখায় কতক্ষণ―এমনে খাড়া দিয়া থাকব! ঘাটলার সিঁড়ির কোন নিচে জুলেখায়! আর কোন ওপরের চাতালে মিয়াভাইয়ে দাঁড়ানো। কারও মুখে কোনও একটা কথা নাই। সে না হয় পুরুষপোলা। নিলাজ হইয়া চাইয়া থাকতে পারে। জুলেখায় কেমনে নিজেরে অমুন বেশরমা বানাইবো! সে কি মিয়াভাইয়ের দিকে চাওন দিয়া থাকতে পারব! তোবা তোবা!

কিন্তুক এমুন ঘাড় নামাইয়াই বা জুলেখায় কতক্ষণ থাকব ?

 থাক গা! থাকুক গা গোসল করা! জুলেখায় অক্ষণ বাড়িত যাইব গা! একদণ্ড আর সে এই ছাড়াবাড়ির ঘাটলায় থাকব না। মায় জানলে মাইরা ফালাইবো! আইচ্ছা তাইলে, জুলেখায় বাড়িতেই যাইব গা অখন!

 নিজের কাঁপতে থাকা শরীরখানারে জুলেখায়―কোনওমতে সিঁড়ি বাওয়ার কর্মে ঠেলে দেয়! ওপরে উইঠা কোনোরকমে খালি মিয়াভাইরে পার হইব সে। তারবাদে খিচ্চা একটা দৌড় দিবো। বাড়িতে গিয়া,নিজেগো পুষ্কুনির পেঁক-গোলা পানি দিয়া যা পারে করব নে সে!

এদিকে, অই যে নামার দিকের সিঁড়িতে―জুলেখার হাতে করে আনা―কাঁসার লোটাখানা পইড়া থাকল, তার লগে পইড়া থাকল রঙ-জ¦লা লাল গামছাখানা! সেইগুলাও যে হাতে করে ফেরত নিয়ে যেতে হবে, সেইটা জুলেখার খেয়ালেও আসলো না!

ওপরে ওঠার শেষ সিঁড়িটা পার হইলেই তো―শানে বান্ধা চাতালখান! বকুল গাছের ছেমায় ছেমায় শীতল হয়ে থাকা চাতালটা। সেইটাতে বাম কদমখান তুলতে যাবে জুলেখায়, তখন সে শোনে, মিয়া ভাইয়ে কী জানি কয়! কী কয় ইসুফ মিয়াভাইয়ে!

‘বাম পাও না,বাম পাও না! এইবার তুমি ডান কদম তোলবা! তোলো!’

 ওম্মা! এইটা আবার কোন আউলা-পাথাইলা কথা কয় মিয়াভাইয়ে! সিঁড়ি ডিঙ্গাইতে আবার ডাইন-বাওয়ের হিসাব করে মাইনষে ? কী যে কয়!

‘দেও! ডাইন পাওখান আগায়া দাও!’

আইচ্ছা আইচ্ছা! ওপরের চাতালটায় ওঠোনের লাইগা―আগে ডাইন কদম দিতে কইতাছে তো মিয়াভাইয়ে ? দিলো নাইলে জুলেখায়―তার ডাইন কদমটাই! মিয়াভাইয়ের কথার ওপরে কী জুলির কিছু কওনের আছে ?

কিন্তু ওপরের চাতালের দিকে―ডাইন পাও বাড়াইয়া দিয়াও তো দেহি―জুলেখায় সেইটাতে ওঠার হুকুম পায় না! এই যে মিয়াভাইয়ে আরও কী একটা জানি করতে বলতাছে! দেখ তো মিয়াভাইয়ে কী করে! সে তার ডাইন হাতখানরে―এই তো জুলেখার দিকে বাড়াইয়া দিছে! অই হাতেরে ধরতে হইব! আগে সেইটারে ধইরা, তারবাদে ডাইন পাও আগে দিয়া, তবে উঠতে হইব! ও মা!

আজকা এইসব কী করতাছে মিয়াভাইয়ে! এট্টুক সিঁড়িটার থাইকা নাকি জুলেখায়―একলম্ফে উইট্টা যাইতে পারে! সেই জন্যে মিয়াভাই তার হাত বাড়াইয়া দিছে! সেই হাত না ধরলে, ওপরের চাতালে পাও রাখোনের, হুকুম পাইব না জুলেখায় ? দেখ তো মিয়াভাইয়ে কেমুন আউলা, অচিন আচরণ করতাছে আজকা! এমুন বুঝি আগে সে কোনোদিন করছে ? এমুন তো সে আগে কোনোদিন করে নাই!

এখন, অই বাড়ানো হাতখানরে নিয়া জুলেখায় কী করে! ধরবো ? ধরবো নি ? ধরতে ইচ্ছা হইতেছে তার! আবার শরমও যে লাগতাছে! জুলেখায় বুঝি নিজে নিজে―এইটুক উঠতে পারবনা! পারবতো!

শেষে বেদিশা মুখ নিয়া জুলেখায় করে কী, সে মাটির দিকে চোখ নামায়ে রাখে! আর,একদম থির হয়ে দাড়ানি দিয়া ফালায় সে! না সে আর মুখখান তোলে, না সে ওপরে ওঠার জন্য একটুও নড়ে ! ইসুফ মিয়াভাইয়ের হাতের দিকে নিজের হাতেরে তো সে আগায়ে দেয় না-ই! ভালা হইছে আলা! অখন মিয়াভাইয়ে বুঝুক! জুলিরে এমুন হুদা কামে―শরম দিতে থাকলে জুলির যে কষ্টটা হয়, জুলির যে বেদিশা বেদিশা লাগে, সেইটা বুঝুক অখন মিয়াভাইয়ে!

এই যে জুলি, ইসুফ মিয়ার বাড়ানো হাতখানের ডাকের দিকে―ফিরাও দেখল না! এই যে সে এমুন আচমকার ওপরে মুখ নামায়ে, তার চলা বন্ধ কইরা ফালাইল, তাতে কী ইসুফ মিয়ার পরানখান বেজার হইয়া গেলো না ? তার মুখখান কী পলকে কালাকুষ্টি হইয়া গেলো গা ? সে কী তখন তার বাড়ানো হাতেরে সরায়ে নিলো ?

না! ইসুফ মিয়ার পরান ঝটকার ওপরে বেজার,কালো হয়ে যায় কিনা, সেইটা সেই পরানেই জানে! তবে অই পোলার মুখে―কালা আন্ধার-বেজারের কোনও চিহ্নই ―জাগনা দেয় না! সেই মুখে যেমন মিটিমিটি হাসি ভাসান দিয়া আছিল, তেমন ভাসান দিয়াই থাকে! নিজে হাতখানারে সে যেমন বাড়ায়ে রাখছিল,তেমন বাড়াইয়া রাখে! সেই হাতরে একটুও নড়ায় না সে! একবারের জন্যও নামায় না! নিজের বেথির হাতখানেরে- কেবল জুলেখায় দিকেই আগানি দিয়া রাখে সে।

‘মিয়াভাইয়ে আজকা জানি কেমুন অচিন ব্যভার করে!’ আবার কথাটা মনে আসে জুলেখার; ‘ এমুন তো তারে কোনও সময়ে করতে দেখে নাই জুলেখায়! এমনে সে ক্যান নিজের হাতখানরে আজাব দিতাছে! হাতটায় কাতর হইতেছে না ? ক্যান মিয়াভাইয়ে জুলিরে এমুন শরম দিতাছে আজকা! দেহো তো!’

‘শরম দিতাছি না!’ মিয়াভাইয়ে দেখ আজকা জুলেখার অন্তরের কথাগিলিরেও―কেমনে জানি ধইরা ফালাইতাছে! মাবুদ! দেহো তো!

‘এই যে হাতখান, ধরো তারে!’ ইসুফ মিয়ার গলাটারে কেমন য্যান ঝিরিঝিরি বাউলা বাউলা লাগতে থাকে ! কেমন একটু বেচইনও য্যান লাগে সেই গলারে! আজকা সেই গলায় কোনও খুশী নাই ক্যান! অন্য সকল সোম তো থাকে!

জুলেখায় হাত ধরতে দেরি করতেছে দেইখা বুঝি―মিয়াভাইয়ে বেজার হইতেছে! এদিকে জুলির যে শরম হইতেছে, সেইটা তো তার আজকা য্যান খেয়ালেই নাই! কিন্তু অন্তরে অন্তরে কী মিয়াভাইয়ের হাতখানরে ধরোনের বাঞ্ছায়―জুলেখায় মইরা যাইতাছে না ? যাইতাছে তো! তাইলে মিয়াভাইয়েই তো জুলেখার হাতটারে ধরতে পারে ? সেই ধরুক না ? বরাবরের মতন সেই ধইরা ফালাক ?

‘এই হাতখানরে আজকা―তোমারেই আগে ধরতে হইব! ধরো! আমার আখের-আউয়াল,জীয়ন-মউতের হিসাব হওনের দিন আজকা! আমার আর কিচ্ছু করোনের নাই! তুমি রাখলে-আমার নসীবে থাকব বাঁচন! জলজলাট বাঁচন! তুমি না-রাখলে―এই জখমী জিন্দিগী―তাইলে ধুলা ধুলা হইব! আমারে দিয়া তাইলে আর আমার কোনও দরকার নাই’।

দেখ! আজকা জানি মিয়াভাইয়ের কী হইছে! কেমুন কেমুন প্যাচঅলা―বড়ো বড়ো কথা সে বলতাছে! জুলেখায় বুঝি―এমুন ভারী ভারী কথাগো ধরতে পারব ? পারতাছে না তো! খালি এট্টুক বুঝতাছে যে, কোনও কারণে জানি মিয়াভাইয়ের অন্তরটায় আজকা বেদনা পাইতেছে! অনেক বেদনা হইতেছে মিয়াভাইয়ের!

কী হইছে তার ? হেগো গদিতে কোনও ঝামেলা হইছে বুঝি ? না জানি হের বাজানে হেরে কোনও গালিটা গাইলাইছে! সেই কারণেই মনে হয়, তারে অখন এমুন কাতর দেহাইতাছে! নাইলে এমুন আথালি-পাথালি কথাবার্তা বলতাছে সে ক্যান! জিন্দিগিতে কবে আর মিয়াভাইয়ে এমুন ভারী ভারী কথা কইছিল জুলেখার লগে ? এমুন কইরা নি কোনওদিন কথা কইছে সে―কয় নাই তো! জুলেখারে আবার কবে সে তুমি-আপনে কওয়া ধরছে ? ক্যান সে এমনে কথা কয় আজকা ? এমুন কইরা কথা কয়! তারে য্যান অচিনা অচিনা লাগে!

এতসব কথার নড়ানড়ি মনের ভিতরে নিয়াই জুলেখায় করে কী, ইসুফ মিয়ার বাড়ায়ে রাখা হাতখানরে আলগোচ্ছে ধরে নেয়! প্রথমে ডাইন হাত দিয়া মিয়াভাইয়ের ডাইন হাতখানরে ধরে সে! তারবাদে জুলেখার বাম হাতখানও আইসা ইসুফ মিয়ার হাতখানরে জাবড়ানি দিয়া ধরে!

‘আল্লা আল্লা আল্লা! অগো জুলেখা! অরে মাইয়া―ধরে না ধরে না! অই হাত তুমি ধরতে যাইয়ো না গো মা! খটাখটা আগুনের ভেলকি অইটা! ভেলকি। ভেলকি। আগুনের বাঞ্ছা আগুনে পুরা করুক গা! তুমি মাটির মানুষ। আগুনে-মাটিয়ে কবে মিশ গেছে ? কোনও দিন যায় নাই! ওরে ঝি! মাটির মাইনষেরে অই ভেলকির হাত ধরতে হয় না। থাম থাম রে তুই মাইয়া! জুলিগো, ধরিস না―ধরিস না!’

বাবাসগল! আমি দেওভোগে―এইমতে―মাইয়াটারে কত না বারণ দিলাম! কত না ডাক-চিক্কুর পাড়লাম! কিন্তু বেকুব মাইয়ার কানে আমার একটা ডাকও গিয়া পৌঁছাইল না! কেমনে পৌঁছাইব!

মাটির ওপরে বসত কইরাও মাটির দিকে চাইয়া দেখনের কথা কবে তোমাগো খেয়ালে আছিল রে মানুষ ? তার ডাক শোননের কোনও ঠেকা কী তোমাগো আছে ? আছিল কোনও কালে ? মুরুব্বিরা যা করে নাই, তাগো ছাও-পোলাপাইনে সেইটা করার হুঁশখান কোত্থেইক্কা পাইব ? জুলেখায় যে আমার ডাক কানে নিতে পারল না, সেইটা কী খালি তার একলার বয়রামির কারণে ? অই বয়রামি সে আতকার ওপরে পাইছে ? জুলেখার আগের আগের অন্য সকলতে কী বয়রা না ?

আলক্ষ্মী মাইয়ায় এইটা কী করলো! না বুইজা, না জাইনা, সিধা-সোজা বিশ^াসের টানে সে গিয়া দেখ ভুল হাতখানরে জাবড়ানি দিয়া ধরল! মাটির না-বুঝ হাতখানে গিয়া ধরল কিনা খিবলি-জিবলি বিজলীরে! আর নি কোনও সর্বনাশরে আটকানি দেওনের কোনও রাস্তা থাকল! ওহো রে মাবুদ!

৫. এইবার তাইলে আমি আমারটুক কই! আমি সেই পাতিকাউয়ায়!

মা-খাগি দেওভোগের চরণে শতকোটি সেলাম থুইয়া, এইবার তবে আমি আমারটুক কওয়া ধরতাছি! সেইটুক কওনের আগে আমি হাজার সেলাম থুইতাছি বাতাসের কদমে। সে আছে বইলাই না আমাগো পক্ষীজাতের এমত শতপদের উড়ালখান আছে। আরও সেলাম জানাইতেছি আমি বিরিক্ষি কুলেরে! তাগো ডালে ডালেই আমাগো মরোন-বাঁচোন! আরও সেলাম রাখলাম আমি পানি-কাঞ্জির দিকে! তিয়াসের কালে তারে এক ঢোক পাই বইলাই না অখনও জীয়ত আছি! আরও লাখো লাখো সেলাম দিতাছি আমি এই আমার ভাগ্যের চরণে! ভাগ্য না হইলে কী অমুন আচরিত বিত্তান্তরে নিজ চক্ষের সামনে ঘটতে দেখা যায় ? যায় না!

আমি কথা একটু বেশি কইয়া ফালাই, সেইটা সত্য! কিন্তু চক্ষে যা দেখি, সেইটা কিন্তু আন্ধা-ধান্ধা, উল্টা-বেঁকা দেখি না! পরিষ্কার রকমে সঠিকরে দেখি! কাজেই একটা কথা আমি আদিতেই খোলাসা কইরা রাখতেছি! আমি কিন্তু বেফজুল কোনও কথা কওনের কেউ না! সেইটা য্যান জগতবাসী হিসাবে রাখে!

আরও কথা এই, দেওভোগ মায়ে অই যে পয়লার দিগে কইল না, ঘটনাটা ঘটোনের গোড়ার কালে আমি বলে বকুল পাতাগো ঝিরিমিরি খেইল দেখা নিয়া মউজে আছিলাম ? অইটা কিন্তুক সে সঠিক বলে নাই! আমি বকুল বিরিক্ষির ডালে বওয়া আছিলাম তখন,সেইটা সত্য! তয়, আমি তাকানি দিয়া আছিলাম ভাঙা সিঁড়িতে রাখা কাঁসার লোটাটার দিকে!

তাকানি দিয়া থাইকা আমি বুঝতে চেষ্টা করতেছিলাম, অইটার মদ্যে নি কোনও খাওন রাখা আছে ? হইতেও তো পারে―ঘাটলায় বইয়া চাবানের লেইগা জুলেখা বইনে আজকা লোটায় কইরা কতগুলা খই লইয়া আইছে ? নাকি সে আনছে কয় মুষ্টি বুটভাজা ? বইনে যেই পাগলা কিসিমের মাইয়া! সে এমুনটা করতেই পারে! কিন্তু বাতাসে তো সেইসব খাওনের জিনিসের কোনও মিঠা গন্ধ উঠতেছে না! নাকি সে গন্ধছাড়া কোনও জিনিস আনছে ? আনছে কোনও খাওনের দ্রব্য ? নাকি আনে নাইকা কিছু ?

এই-তাই চিন্তা নিয়া একটু ভেজালে আছিলাম বইলাই কিন্তু ঘটনার পইল্লা-পরথম দিগের কিছু বিষয়ে আমার নজর থাকে নাই! তয়, ঘাটলার ওপরে ঘটা ঘটনাটারে আমি কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই ঠিকই ধইরা ফালাইছি। তারবাদে ক্রমে ক্রমে আরও তো কত কী ঘটছে! আফসোস! আমি সেইসবের সবটারে নিজ চক্ষে দেখনের আর উপায় পাই নাই!

কেমনে পামু ? আগুনের দুনিয়ার লোকে যে আমার সামনে একখান আগুনের বেড়া তুইল্লা দিছে!

আইচ্ছা, সেই কথা পরে হইব নে! আগের কথা তো আগে শেষ করি!

 সেই প্রথমে, মা-খাগি দেওভোগের ডাক-চিক্কুর না শোনলে কিন্তু আমার নজরেই আসতো না যে, ঘাটলার সিঁড়ির ওপরে একটা আচরিত ঘটনা ঘটতে যাইতাছে!

কী সেই ঘটনা ?

জুলেখা বইনে একটা মানুষের হাত ধরতে যাইতাছে!

তা, মায়া-বাসনার সম্পর্ক যেইনে থাকে, সেইনে যদি কেউর মনে চায় যে সে অন্যজনের মাথায় হাত দিব! তেমুনটা করতে মন চাইলে করব! সেইটাতে দোষের কী ? কোনও দোষ নাই। নাইলে যদি একটা কোনও হাতে- অন্য কোনও হাতরে নিজের মধ্যে পাওনের হাউস পায়, সেই হাউস জাগলে দোষ কী! কোনও একটা হাতে যদি-বাঞ্ছার হাতরে ধরতে পায়, সেইটাতে কিয়ের ভেজাল ? ভেজালের কিছু নাই তো এইনে! তাইলে মা দেওভোগে চিল্লাইতাছে ক্যান ? এমুন নিষেধই বা দেওনের কী হইল ?

‘হইছে হইছে মা! আলা তোমার আজাইরা খেঁকানি বন্ধ করো তো!’ আমি এইকথা বলার জন্য খালি মুখটা খুলছি, তার মধ্যেই আমার জবান বন্ধ হইয়া, চউখ উল্টানি খাইয়া, একদম আমার দম আটকানির দশা হইয়া যায়! সেইটা হইব না ক্যান ?

মা-খাগির দিগে তাকাইতে গিয়া আমার চোখ কিনা ঢট্টস কইরা জুলেখা বইনের মুখ বরাবর খাড়াইয়া থাকা বেটার দিগে তাকাইয়া ফেলছে! আমি তো ধরাধাজ্জি জানতাছিলাম যে, অইটা ইসুফ মিয়ায়!

হায় হায়! এইটা তো সে না! এইজনে ইসুফ মিয়ার সুরত ধইরা রইছে, কিন্তু সে তো জালি! জাল জাল! আসোল লোক না এইটা! অই দেখ, এইটার পাও মাটির এট্টু ওপরে ভাসান দিয়া রইছে! দেখ দেখ! তার পাও মাটি ছোঁওনের হক রাখে না! এইটা কইলাম মানুষের জাত না! ও বইন জুলেখা! হুঁশে আহো! হুঁশে আসো গো! ধইরো না ধইরো না অইটার হাত! জুলেখা!

কিন্তুক আমি হইলাম কাউয়ার কাউয়া! আমার কথা আর কোনও মাইনষে খেয়াল করে! কে-ই বা আমার ডাকেরে অন্তর দিয়া বোঝোনের চেষ্টাটা নেয়! কেউই না! সগলতেই শোনে, আমি খালি কা কা করি! খালি কুডাক ডাকি! খালি কটকটা, কড়ড় কড়ড় আওয়াজ কইরা লোকের কানাপট্টি বয়রা করতে থাকি!

কী জানি! এইবারও তো আমি আমার জান-পরান এক কইরা জুলেখা বইনেরে সাবধানি দিতে থাকলাম! সে তো আমার আওয়াজের দিগে তার ঘাড়টাও এট্টু কাইত করলো না! বরং সে য্যান সেই জালিয়াতের হাতেরে ধরোনের লেইগা একেবারে বেজাহানি হইয়া গেলো! ঘপ কইরা সেই হাতরে ধইরা শেষ!

জুলেখা বইনে সেই জালির পুত জালিয়াতের হাতখান তখন ধইরাও সারে নাই, অমনেই দেখি কী, কেমুন এক অতি আচানক ঘটনা ঘটা শুরু হইছে! দেখি যে, সেই অমাইনেষের হাতের তেনে কী জানি একটা কিছু জুলেখা বইনের শইলে ঢুইকা যাইতাছে! কী এইটা ? য্যান অতি কড়া লাউ পাতার বরনের একটা কিছু য্যান! এও এক প্রকারের রইদ নাকি মেঘের কইচ্চা বিজলী জুলেখা কন্যার ভিতরে ঢুকে যাইতাছে! অতি অতি তুরুত রকমে ঢুইক্কা যাইতাছে!

ও খোদাতাল্লা গো! এই নিদয়ার ঘরের নিদয়ায় দেহি মাইয়াটারে বিজলী-পড়া দিতাছে! আমি জানি যে, শুধু ধুল-পড়া পাইলে মানুষে কেবল বেবোধ মাত্র হয়! পুরা জাগনা থাকে, কিন্তু হিত-অহিতরে আর বিবেচনা দিতে পারে না! হাঁটে-চলে সব করে। খালি বোঝে না, কই যাইতেছে! ক্যান যাইতেছে! সেই ধুল-পড়ার দোষও অল্পের ওপরেই কাটানি দেওন যায়!

কিন্তু এই জালিয়াত যে আরও বিষম সব্বনাশ করোনের রাস্তা ধরছে! বিজলী-পড়া কী যাহা-তাহা কোনও বেপার! না না! না রে! যারে বিজলী-পড়া দেওয়া হয়, সে বেবোধ হয় না! অহিত-হিতেরে বাছাই করার খেমতা হের নষ্ট হয় না! কিন্তু তার তেনে শতগুণ বেশী সব্বনাশখান হয়!

তখন, দুনিয়ার সবকিছুরে ভালা লাগতে থাকে! নেকেরে ভালা লাগতে থাকে! বদেরে তো আরও ভালা লাগতে থাকে! সর্পের দংশনরে লাগতে থাকে! য্যান শীতকাইল্যা খেঁজুইরা রসের মজা! উষ্টারে আরামের লাগতে থাকে! খালি তখন মনে হইতে থাকে, কী ঝিরিঝিরি কী ফুরফুরা এই দিন-দুনিয়া!

অই ত্তো! জুলেখা বইনে কেমুন করতাছে, দেখ! অই দেখ! জুলেখা বইনের মনের ভিতরে―কোনও আউলামি শুরু হইছে! অই তো তার অন্তরে য্যান খুশি ঢলকাইয়া উঠতেছে! ইসুফ মিয়াভাইয়ের জন্য যেই পাগল পাগল কান্দনখান এতদিন সে চুপেচুপে সহ্য কইরা গেছে, সেইটারে য্যান আর লুকা-ছাপি করোনের কিছু নাই! এমুন কথাখান মনে আসতেছে তার!

মনে হইতেছে, এইবার পরানের সকল কান্দনরে আসমান-জমিনে উড়াইয়া-বিছাইয়া দিতে পারে জুলেখায়! অখন তার সবদিকে খালি শান্তি―খালি শান্তি! আর ডর নাই! আর এট্টুও ডর নাই! সব ডর মুছাইয়া দিতে পারে যে, এই ত্তো সে তার হাতরে জুলেখার কাছে সইপ্পা দিছে!

অখন, জুলেখায় মরলেও আর কোনও কষ্ট নাই! না না! জুলেখায় আর ক্যান মরোনের নাম মুখে আনব ? মিয়াভাইয়ের লগে জিন্দিগির মাটিতে থাকব অখন সে! জিন্দিগির আগুনে পানিতে থাকব, জিন্দিগির নুনে আর তেঁতুলে থাকব! খই-উখরা-উড়কি-বাতাসায় থাকব! পানির দিনে থাকব, পানির কষ্টের দিনেও থাকব। জারে থাকব ঠাটা পরোনের সময়েও! একলগে―একলগে পুরা জনম! মিয়াভাইয়ে জুলেখারে হের লগে রাখব না ?

জুলেখা বইনের ভিতরে এই সগল কথা নড়ে-কাঁপে, আর চক্ষে তার ফোঁটায় ফোঁটায় পানি জমতে থাকে! সুখের পানি! আশার পানি! আর দেখ সেই সব্বনাশার পুত সব্বনাশায় কী করে! সে খালি বিজলী পড়া দিয়াই দেখ খান্তি দেয় না! ঢঙ্গার ঘরে ঢঙ্গা! উয়ে আরও কত কেরামতি দেখাইতাছে দেখ! এইটুক মাইয়া এই আমাগো জুলেখায়!

দেখ, এই ভেলকিবাজে কেমুন জাদুর জালটা দিয়া আমাগো বেবুঝ মাইয়াটারে বাইন্ধা নিতাছে! আর নি মাইয়ায় সেই জাল ছাড়াইতে পারব! দেখ! কেমুন আলগোচ্ছে অই সব্বনাশায় জুলেখার চক্ষের সেই একফোঁটা পানিরে মুইচ্ছা দিতাছে! লগে কেমুন যে একখান কায়দা করতাছে! তার মুখ য্যান নীরবে বলতেছে, এই এক ফোঁটা পানিরে মুইচ্ছা দেওনের লেইগা দরকারে সে য্যান নিজের জান কবুল করতে রাজি।

মা মা! এই আগুইন্না জীবেরা তো দেহি বহুত খেইল-কলা, বহুত ছলাবলা জানে! ঘটনাটুক দেইখা তো আমার কাঠুইরা অন্তরটায়ও আতকার ওপরে চ্ছল্লাৎ কইরা উঠতে নিছিল! আমিও এইটারে প্রায় সত্য দরদ বইলা বিশ^াস কইরা ফালাইতাছিলাম! সব্বনাশায় করে কী, নিজের থরথর আগুন আঙুল দিয়া সে জুলেখার চক্ষের পানি মোছে তো মোছেই, আবার দেখ সে ইসপিস কইরা কইরা জুলেখা বইনেরে কী জানি কয়ও!

কী কয় ?

কয় কী, “এমনে হুদামিছা কানলে মেঘের পানি ফুরাইয়া যাইব! তাইলে বিষ্টি কেমনে হইব ? এমনে কান্দতে হয় না!”

এইকথা শুইন্না জুলেখা বইনে কী হাসির হাসি! কিন্তু অইটা কী তার হাসি আছিল ? এতকাল চুপ-মুখে ঘরসংসারের যত ধাক্কা-গুঁতা তারে সহ্য করতে হইছিল, সেইগুলাই য্যান অইমতো হাসির আকারে বাইর হইয়া গেল! আমি য্যান এমনই বুঝলাম! তখন আমার বড়ো ধন্দ হইতে থাকল!

এই জালিয়াতরে তাইলে কেমনে খালি খারাপই কওয়া যাইব ? এইটার ভেতরে তো জুলেখা বইনের লেইগা দরদ-বাসনাও লড়তে দেখা যাইতাছে! মন্দের ভিতরে এমুন সত্য-তাজা-দরদ থাকোনের কথা নি ? নাকি আমারেও ভেলকিয়ে ধইরা ফালাইলো!

না না! কে বলে অইটায় সুবিধার লোক ? অভেজাইলা, সাদা লোক ? সেইটাই যদি হইব, তাইলে সে ইসুফ মিয়ার ভেক ধরতো নিকি ? সে তো তাইলে নিজ স্বরূপে আইতো! আইতো না ? আইতো! তাইলে দুর দুর দুর! এমুন ভেলকিঅলারে মার শত পিছা!

আমি তাইলে নিজেগো মাইয়াটারে রক্ষা করোনের শেষ উপায়টা দেখি! দেখ, কেমনে কেমনে দেওভোগ মা আর আমার চক্ষের সামনে দিয়া নিজেগো পরানের পুতলায় অমুন ধাপ্পাঅলার খপ্পরে যাইতাছে গা! হায় হায়! আর নি তারে ফিরানের রাস্তা আছে! হায় হায়!

আইচ্ছা! আর কিচ্ছু না পারি জুলেখা বইনেরে তো আমার ডেনা দিয়া কয়টা ঝেপটা আমি দিতে পারি ? পারি তো! সেই ঝাপটের চোটে বিজলী পড়ার গুণটা কী এট্টুখানিও নষ্ট হইয়া যাইতে পারে না ? তাইলে কী এট্টু হইলেও হুঁশটা ফিরব না ? জুলেখা বইনের সত্য হুঁশখান ফিরব না ?

দেখি ? দেখি একবার চেষ্টাটা দিয়া ? এই কথা মনে নিয়া বকুল গাছের ডাল থেকে আমি একটা জোর লম্ফ দেই! শক্ত, কঠিন উড়াল-লম্ফ! সেইটা দেই একেবারে জুলেখা বইনের ডাইন ডেনা বরাবর! ঝপাস একটা ঝাপট য্যান হয় সেইটা! দয়াল! এই ঝাবড়া ধাক্কাখান য্যান বইনেরে হুঁশ দেয়!

কিন্তক কী কমু! পাক পরোয়ারদিগারের কাছে অই মিন্নতি দিতে দিতে আমি জুলেখা বইনের দিগে তুখার ঝম্প দিয়াও সারি নাই, অমনেই ভেলকিঅলায় তার বাম হস্তের তর্জনীখান আমার দিগে তোলা দেয়! তার ডাইন হস্তে তো জুলেখা কন্যার ডাইন হাতরে ধরা!

আর কী আজব কারবার! য্যান সেই তর্জনীটায় চক্ষের পলকে ঝিড়িম কইরা একপ্রকার খর-বিজলীর তুফান হইয়া গেলো! সেই তুফানে করল কী পল্লাট দিয়া আইসা আমারে কঠিন একটা বারি দিলো! সেই এক বাড়ির চোটেই আমার কী বেহাল অবস্থা! তুফানটায় আমারে ঝাটকা দিয়া উড়াইয়া আইন্না একেবারে থুবড়াইয়া ফালাইয়া দিলো! ফালাইবো আর কই ? ফালাইলো সেই বকুল গাছের ডালখানাতেই! কা কা কা! কী অপমানি! কী অপমানি! কেমুন অসম্মানি!

নিজেরে একটু সিজিল-মিছিল কইরা, তারপরে আমি আবার উড়াল দেওয়ার চেষ্টা ধরি! ওম্মা! কিয়ের উড়াল কিয়ের কী! আমি এইবার যতই না উড়াল দেওয়ার চেষ্টা করি! দেখি যে, কীসে জানি আমারে জাতা দিয়া ধইরা রাখছে! আমার আর নড়ন-চড়নের কায়দা নাই! আমারে আটকানি দিয়া রাখছে তো রাখছেই, আবার কানের কাছে ফিচির ফিচির কইরা কী জানি বলতাছেও!

কী বলে ?

বলে , ‘যা দেখতাছো, দেইখা যাও! অশান্তি বাড়াইতে যাইয়ো না! পুইড়া যাইবা!’

আমি নি অই হাবিজাবি ধামকিরে ডরানের বান্দা! কিন্তু কী করমু ? আমি কী প্রকারে লড়মু ? আমারে যে বজ্র-পাশ দিয়া অচল বানাইয়া থুইছে! চাইয়া চাইয়া জুলেখা বইনের বিপদেরে দেইখা যাওন ছাড়া আর যে কিছু করোনের নাই রে আমার!

তয়, সব্বনাশায় আমারে অচলের অচল করলে কী, আমার জবান তো বন্ধ করতে পারে নাই! আমার জবান তো সচল আছে! আমি তাইলে দেখি না ক্যান, ডাক-চিক্কুর দিয়া যদি বইনের হুঁশরে ফিরত আনোন যায় ? তখন করি কী, আমি ধুম চিল্লানি শুরু করি, ‘জুলেখা বইন! হোনো গো বইন! জলদি লৌড় দেও! জলদি বাড়ির দিগে লৌড় দেও! তোমারে ভেলকিঅলায় ধরছে! বইন! লৌড় দেও গো! কা কা কা! কা কা!’

তারবাদে কেমনে জানি দেওভোগ গেরামবাসিগো কথা আমার স্মরণে আসে! তাগো নি একটাবার ডাক দিয়া দেখমু ? তারা কেউ একজনেও যদি আইয়া পড়ত এইনে অখন! আহা গো! জুলেখারে তাইলে ভেলকিঅলার হাত তেনে রক্ষা করা যাইত! ‘ক্কা ক্কা ক্কা ক্কা! গেরামবাসি সগলতে গো! ত্বরা কইরা ঠাকুর বাড়ির ঘাটলায় আসেন গো সগলতে! জুলেখা বইনেরে অচিনা ভেলকিঅলায় কইলাম ভোন্দা বানাইয়া ফালাইছে! তারে বাঁচান গো! ক্কা ক্কা ক্কা ক্কা ক্কা ক্কা!’

হায় হায়! এত যে আমি ডাক-ডাকানি দিলাম। এমন চিক্কুরের ওপরে চিক্কুর। কিন্তু কে শোনো কার চিক্কুর! গেরামের সকলে নাইলে দূরে আছে, সেই কারণে শোনে নাই! কিন্তু জুলেখা বইনে তো এই এইখানেই খাড়া! সে তো আমার ডাকরে গোণায়ই ধরলো না!

এই মাইয়ায় কাউয়ার ক্কা ক্কা ক্কা ক্কা-র দিগে খেয়াল দিবো ? মানুষের জাতের কে কবে কোনও দিন এমুনটা করছিল ? হেরা কাউয়ার কথারে দাম দিতে শিখছে ? শিখে নাই! তারা খালি জানে কাউয়ার গুষ্টিরে নিন্দা করতে! আমরা কাউয়ারা কুসাইদ্ধা, খরাপ, কুলক্ষইন্না! গিরস্থের গাছে বইয়া বইয়া আমরা কী করি ? আমরা গিরস্থের ডালে বইসা বইসা ডাক পারি! সেই ডাকের চোটেই বোলে গিরস্থের দুয়ারে অমঙ্গল আইসা থান পাতে! এইমতে আমরা নিকি তাগো জন্য ভেজালরে টাইনা আনি! এই-ই তো চিরকাল ধইরা আমাগো নামে কইয়া চলছে তারা! ভালা হইছে। আমরা খরাপ। অহন দেখ, তোমাগো মাইয়ার কী হাল হইতে যাইতাছে!

নাহ! একটা কোনোজন আমার চিক্কুইর কানে তোলে না! এদিকে কিনা চিক্কুরের ওপরে চিক্কুর দিয়া দিয়া আমি আমার গলাটারে ফাঁইড়া শেষ করলাম! আর, দেওভোগ মায়ের অন্তরটায় একলা একলা খাবিজাবি খাইয়া গেলো! জুলেখা বইনেরে বাঁচাইয়া নেওনের কোনও উপায়ই হইল না। আহ্হারে!

ওদিগে দেখ দেখ! অই দেখ! না-বুঝ ছেড়ি জুলেখায় কেমনে খয়-খুশিহালে নিজেরে পাওয়ে নিজে কুড়াল মারতাছে!

ছোবানাল্লা ছোবানাল্লা! মাবুদ! গায়েবের মালিক তুমি! তুমি দেইখো! আমরা দোনোজনে চেষ্টার কমতি রাখি নাই! কিন্তু কী জানি কেমুন ভাগ্যের লিখন দিছো তুমি অই ছেড়িরে! অই দেখ! সেই মাইয়ায় কী করতাছে!

৬. বন্ধুরে! অন্তরের কান্দনরে লুকানি দেওন দায়!

শরম-থতমত নিজের ডান হাতখানরে তো হুড়াহুড়ি করে ইসুফ মিয়ার ডান হাতের দিকে পাঠায় জুলেখায়! তারপর সেই হাত দিয়া সে ইসুফ মিয়ার হাতটারে নিজে ধরব কী, কোনোমতে সে যেন নিজের হাতখানরেই ইসুফ মিয়ার হাতের ভেতরে গুঁজে দেয়! দেখ, তারপর জুলেখার কেমন লাগতে থাকে!

য্যান মনে হইতে থাকে, জুলেখার হাতখান আতকার ওপরে অখন তুষের আগুনভরা মিঠা-তপ্ত আগুনভরা আইল্লাটার কাছে আইসা পড়ছে! এইটা চৈতমাস। তাও য্যান ঘন শীত। মাঘমাইস্যা জারের কালে আইল্লাটারে ধইরা ধইরা আরামের আরাম পায় তো জুলেখায়! কত যে আরাম তখন! তখন জারেরে আর কিয়ের ডর! আগুন ভরা আইল্লাটা আছে না জুলির নিকটে ? অখন আর জারেরে নিয়া আর কোনও ডর ? আর কোনও চিন্তা! এট্টুও চিন্তা নাই।

এই চৈতমাইস্যা দোপোরের সময়ে, অমন মাঘ-মাইস্যা আরাম আরাম, কোনখান থেইক্কা আসে ? কেমনে আসে ? জুলেখার অন্তরের ভেতরটা চক্ষের পলকে অমুন ডরছাড়া ডরছাড়া হইয়া গেলো কেমনে ? ইসুফ মিয়াভাইয়ের হাতখানের ভিতরে ঠাঁই নিয়া, এমুন নিশ্চিন্তি লাগতাছে ক্যান! কেমনে এমুনটা লাগতাছে!

 আর দেখ, মিয়াভাইয়ে কী জুলেখার হাতখানরে একেবারে জাবড়ানি দিয়া ধরছে ? না না। তেমুন তো লাগতাছে না। মনে হইতেছে য্যান, একটা হাতে আইসা আরেকটা হাতেরে ধরে নাই। য্যান মায়ে আইসা জুলেখারে তার কোলের মধ্যে নিয়া নিছে! আর য্যান কইতাছে, ‘ডরায় না! ডরায় না! মায়ে আছি না ? কিয়ের ডর, কিয়ের ডর ?’ জুলেখার চোখ-মুখ, পুরাটা শরীর আতকার ওপরে ডুকরানি দিয়া ওঠে, ‘মিয়াভাই! মিয়াভাই! বাজানে আমার লেইগা সম্বন্ধ করতে গেছে আজকা! অনেক কিরা-কসম খাইয়া গেছে! এই সম্বন্ধরে এইবার বোলে হেরা আর ছাইড়া দিব না! মিয়াভাই! আপনে কিছু করেন না ? একটা কোনও কথা তো কন না আমারে! দিনের পর দিন যাইতাছে গা! ক্যান কিছু করতেছেন না আপনে ? আমি আর কত কান্দমু ? আর কত ডরামু ? মিয়াভাই!’ সেই অল্প ডুকরানিটা পলকে একপ্রকার কঠিন গোঙানি আর গলা-চাপা-দেওয়া চিক্কুর হয়ে যায়! ইসুফ মিয়ার হাতখানের ভেতরে নিজেরে পুরা সঁপে রেখেও হাঁটু ভেঙে হুড়মুড় মাটিতে থেবড়ে পড়ে জুলেখায়! আর, কঠিন কান্দন কানতে থাকে!

তখন সেই ভেলকিঅলায় কী করে ? ভেলকিবাজের কইলজারে হায় হায় বিলাপ পাড়তে শুনতে পাইতে থাকি! আমি কাউয়ায় হাছা কইতাছি! অইটায়ও সেই সময়ে বিলাপ পাড়তেছিল! কী অবিশ^াসের কথা! কেমনে কী হইতেছে রে!

জালিয়াতের অন্তরে নিকি জুলি বইনের লেইগা এমুন চিপা বিলাপ দিতেছে―‘হায় রে হায়! দেখ রে দেখ! যারে জাবড়ানি দিয়া পরানের ভেতরের ভেতরে ঢুকাইয়া রাখোনের লেইগা আমার দেহখান দাপায়ে শেষ হয়ে যাইতেছে, সেই চান্দের টুকরারে কিনা আমি এমনে কান্দতে দিতেছি! এমনে এই ভাঙা সিঁড়ির ওপরে লুটাইয়া পইড়া কান্দতে দিতে হইতেছে! আমার কিছু করোনের নাই ? আর কত পরীক্ষা ? আরও কতখানি ?’ মনে মনে জালিয়াতে এই কথা কইতে থাকে, আর বিলাপ দিতে থাকে―।

একদিগে, জুলেখা কন্যায় চক্ষের পানির তোড়ে য্যান ভাইস্সা যাইতে থাকে! আরেকদিগে, এই জালিয়াতে নিজের ভেতরে ভেতরে দাপানি দিতে দিতে য্যান নিভ্ভা যাইতে থাকে।

এইটা তাইলে কেমুন জালিয়াত ? কেমুন জাতের ঠগ ? মাইয়াটার লগে ভেলকিগিরি করতে আইয়া সে নিজেই কিনা কাইন্দা জারজার হইয়া যায় ? আবার দেখ, সে যে কানতেছে, সে যে জুলেখা বইনের লেইগা এমুন উতলা হইয়া যাইতেছে, সেইটা সে জুলেখারে তো বুঝতে দিতেছে না। পুরা গোপনি রাখতাছে! এইটা আবার কেমুন কারবার ? আমি সত্য কইতেছি, আমি আমার কাউয়া জিন্দিগিতে এমুন গণ্ডগোলে বোঝাই কোনও জালিয়াত আর দেখি নাই! এইটা কেমুন জাতের কী ?

অই দেখ, সে কী করে! কান্দনে লায়লুট হইয়া যাইতে থাকা জুলেখার হাতখানা অতি যতনে নিজের দুই হাতের পাতার মধ্যে ধইরা, সে আলগোচ্ছে জুলেখার পাশে বসে। না! অই কন্যার মতন জমিনে লেপট দিয়া কিন্তু বসে না সে! সে য্যান জমিনের ওপরে ভাইস্সা থাকে! ভাইস্সা থাকতে থাকতেই জুলেখার হাতখানরে আরও শক্ত রকমে জড়ানি দেয় সে। তারবাদে সে জুলেখারে বলে, ‘আমি অভাইগ্যার লগে যাইবা তুমি ?’

তার গলারে তখন কেমুন জানি শোনাইতে থাকে! য্যান সেইটা কোনও মানুষের গলা না! য্যান সেইটা কোনও পক্ষীরও কলোমলো না! য্যান সেইটা এক বাতাসের শনশন! য্যান বাঁশ পাতার ভিতর দিয়া বৈশাখমাইস্যা তুফানের চলা-চলতির আওয়াজ সেইটা! হু হু শুপ শুপ শুপ! য্যান ভরা পুষ্কুনির পানিতে জাগনা দেওয়া ঢেউয়ের ছল-ছল্লাত!

সেই গলা শুইনা জুলেখা বইনের ক্যান জানি আরও বেশি কইরা চিক্কুর আহে হায় রে! কী কয় মিয়াভাইয়ে! কারে সে কী জিগায়! কী জিগায়! ক্যান সে কিছুই বোঝে না! ‘আপনে ক্যান কিচ্ছু বোজেন না ? ক্যান বোজেন না ?’

‘আমার লগে যাইবা তুমি ? লও,যাইগা ?’

ইসুফ মিয়াভাইয়ে দেখ কী বলে! কী বলে সে! এত্তা বড়ো আশারে কী নিজ অন্তরে ঠাঁই দেওনের সাহোস আছে জুলেখার! জুলেখার পরানে অমুন আশা করলে কী, জুলি কী জানে না সে নিচাঘরের কন্যা ? মিয়াভাইরা হইল কোনও উঁচা ঘর!

মিয়াভাইয়ে কী এইটা সত্য সত্যই জিগায় ? না, সে জুলির লগে তামশা করে, তামশা করে ? এমুন তামশা নি করতে আছে! জুলেখার পরানের বাঞ্ছারে নিয়া নি এমুন তামশা করতে আছে ? হ। জুলেখার লগে তো এমুন হেলা-তামশাই করোন লাগবো তার! জুলেখায় কী মিয়াভাইয়ের গোনায় ধরোনের কোনো জন ? জুলেখায় কেউ না―মিয়াভাইয়ের কেউ না তো!

‘কারে তুমি এমুন পাষাণ দেখতেছো ? আমারে ? এমুন বে-দিল হওন যায় নি গো ?’

‘তাইলে ক্যান এমনে জিগান, মিয়াভাই ? আপনে বোজেন না ? ক্যান কিচ্ছু বোজেন না ?’

‘আমার লগে যাইবা তুমি ? লও, যাই ?’

আইচ্ছা! মিয়াভাইয়ে যদি তার লগে যাওনের লেইগা ডাক দেয়, তাইলে কি জুলেখায় না গিয়া পারব ? পারব ? পারব না! আর জুলেখারে নিয়া কোনখানেই বা যাইব মিয়াভাইয়ে! গেলে তো যাইব সেই নিজেগো গেরামে, যে যার বাড়িতে! এমুন এইটুক পথ বুঝি আগে একলগে যায় নাই তারা দুইজনে ? কতই তো গেছে! তাইলে আজকা অখনের এই যাওনখান আবার নতুন কী ?

‘যামু মিয়াভাই! যামু তো, চলেন।’ আরও অনেক বেশি চক্ষের পানিতে নিজেরে ভাসাতে ভাসাতে আগানো শুরু করে জুলেখায়। তার লগে লগে অই তো ইসুফ মিয়ায়ও আ¹াইতে থাকে―!

কিন্তু জুলেখা বইনে দেখে, আজকা তার ইসুফ মিয়াভাইয়ের মুখের জবানই খালি কেমুন আউলা-মাউলা না! মিয়াভাইয়ের চলা-চলতিরও কোনও য্যান আগামাথা নাই! জুলেখা বইনের খেয়ালে আসে কিন্তু বিষয়টা! কিন্তু সেই বিষয়খান তার খেয়ালে আসা মাত্র সার! বেপারখানরে আঞ্জা দিয়া ধইরা, তারবাদে বেপারখানরে ভালা কইরা বোঝোনের কোনও শক্তি কী আর তার আছে! তারে না বিজলী-পড়া দিয়া পুরা বেতালা কইরা থুইছে ভেলকি অলায়।

সেই কারণেই জুলেখা বইনে অখন খালি ফুলুক-ফুলুক আহ্লাদ পাওনের দশায় আছে। এই কান্দে এই হাসে অবস্থায় উথাল-পাথাল করতেছে সে। খালি তিরিক-তুরিক শরমে আর খুশিতে লাফা-ধাফা করতাছে তার পরান! অই যে ভেলকিবাজে। সে বইনের হাতখানরে জাবড়ে ধরে আছে যে আছেই। জুলেখায় সেই কারণে খুশির ওপরে খুশিতে তো আছেই, কিন্তু তারপরেও কেমুন জানি শরমের টনটনানি পাইতাছে সে!

তার মনে হইতেছে, অই ত্তো! আট্টু আ¹াইলেই নিজেগো দেওভোগের ভিটিবাড়ি, ক্ষেতিখোলা, নানান বাড়ির নামা, ঢাল, পুষ্কুনি! আরেকটু আ¹াইলেই তো সেই সবকিছুর সামনে গিয়া পড়ব দুইজনে। তখন, গেরামের দুই-চাইরটা মানুষও কী সামনে না পড়ব ? পড়ব তো! তাইলে মিয়াভাইয়ে ক্যান জুলেখার হাতখানরে এমনে জাবড়াইয়া রাখছে! সে ক্যান আলা অখন জুলেখার হাতটারে ছাইড়া দেয় না ? মাইনষে দেখলে শরম না ? অগো দুইজনের মুখের ওপরেই না, মাইনষে, কত কুকথা কইতে থাকব ? থাকব তো!

‘মিয়াভাই, হাত ছাইড়া দেন। মাইনষে দেখবো কিন্তুক।’

‘কেউঅই দেখবো না।’

‘মিয়াভাই! কোনও ভিটির কেটায় না-জানি দেইখা ফালাইবো! হাতটা সরাইয়া নেই ?’

‘এই যে হাতরে যে ধরছি, যুগ-জনমের লেইগা ধরছি। মউতে ছাড়া দোনোজনের হাতের এই বন্ধনরে আর তো ছেদ করোনের কেউঅই নাই!’

জুলেখায় সেই কথা শোনে। কিন্তু ক্যান যে আজকা মিয়াভাইয়ে এমুন উঁচা উঁচা আর ভারী ভারী কথা কইতাছে! এমুন কইরা কথা তো আগে সে কয় নাই কোনও কালে! একেবারে নয়া নয়া লাগতে থাকে অই কথারে। কিছু য্যান বোঝা যায়, কিছু বোঝা যায় না। তাও য্যান জুলেখার চিত্ত আহ্লাদে থইথই করতে থাকে।

আহ্হারে! আমগো মাইয়ায় যদি চেতনে থাকত, তাইলে সে ঠিকই বুঝত যে, এইগুলা এই ভেকধারীর আবড়া-জাবড়া বেহুদা প্যাঁচাল না। এইমতে ঠারেঠোরে আদতে অই ভেলকিঅলায় নিজের আসোল পরিচয়খানই জুলেখা বইনেরে দিতে চাইতেছে! সেইটা দেখ আমি যে আমি―যে এমুন নাই-তাই এক পাতি কাউয়া―কিন্তু ধরতে পারতেছি। কিন্তু বইনে সেইটা ধরতে পারতেছে না। কেমনে সে এইটা খেয়ালে আনতে পারব ? অই জালির পুতে আউজকা জুলেখারে তুক কইরা থুইছে না ? তাইলে মাইয়ায় তো এমুন খোয়ারিতেই থাকব! নাকি ?

জুলেখা বইনের ভোন্দাগিরি দেখতে দেখতে প্রথমে কিন্তুক আমার বহুত চেত উঠতে আছিল। সে ভেলকিঅলার কথারে আমলে আনতাছে না ক্যান ? কী বেপার রে! তক্ষণ তক্ষণই কিন্তুক আমার নিজের ভেতরে হুঁশটা আইসা যায়। আরে! আমি কার ওপরে চেত করি ? জালিয়াতে না বইনেরে বিজলী-পড়া দিয়া বেঘোর, বেতোবা, হুঁশছাড়া বানাইয়া থুইছে! তাইলে বইনে আর অন্য কী করব ? এমুনই তো করব। হায় রে পরোয়ারদিগার! এমুন ভালামানুষ মাইয়াটার কিসমতে এই নিকি লেখতে হাউস হইছিল তোমার ? এই নি আছিল জুলেখার কপালের লিখন ?

‘মিয়াভাই, বাবায় কইলাম আজকা কাইক্যারটেক গেছে। ঘরজামাইয়ের সম্বন্ধ ধরাধাজ্জি করতে গেছে, মিয়াভাই―আপনে অক্ষণ কইলাম আমারে লইয়া মা-র কাছে যাইবেন। না গেলে হইব না কিন্তুক। জেঠিরেও কিন্তুক অক্ষণ অক্ষণই কইবেন! আপনের মায়েরে। জেঠি নি আমারে না-পছন্দ করবো, মিয়াভাই ?’

চলতে চলতে আতকার ওপরেই হাঁটা বন্ধ করে জুলেখায়। কেমনে আর সে কদম বাড়ায়! তার কইলজার ভেতরটা যে কেমুন ধগধগাইয়া উঠতেছে! কড়া রকমের একটা ডরে কিনা তার পাও দুইখানরে দেখ আচমকাই কেমুন বেড় দিয়া ধরছে!

‘আল্লা গো মাবুদ! জেঠিয়ে কি জুলেখারে পছন্দ করব ? কোনোদিন তো হেয় জুলেখার দিগে খুশিহালে চাইয়াসুদ্ধা দেখে নাই! দেখে নাই তো! জুলেখায় ভালা, না বুরা―জুলেখায় ফেকফেকা ফেটকা বরনের বউন্না ফুলের লাহান আকামের কিছু, না চক্ষেরে তবদা-খাওয়াইন্না কালা-ভুতি―একজন জেঠি সেই কথা সাফসাফা কইরা কইতে পারব ? হেয় কোনোদিন নজরে আনছে জুলেখারে ? আনে নাই। তাইলে আজকা মিয়াভাইয়ে গিয়া নিজের মায়েরে কইলেই কি সেই মায়ে মানবো ? জুলেখারে ঘরে নিতে রাজি হইব তার মায়ে ? যদি সে অরাজি হয়! হেরা যেই দৌলতঅলা ঘর! জুলেখাগো লাহান বেড়ার ঘরের দিকে নি হেরা চাইয়া দেখবো ? হায় হায়! তাইলে কেমনে কী করব মিয়াভাইয়ে! খোদা-মাবুদ! কেমনে কী হইব!’ জুলেখার মাথার তালু-ঝটক দিয়া তপ্ত হইয়া যায়! এমুন তপ্ত-তাপোড়া-তাপোড়া হইয়া যায় যে, জুলেখার মনে হইতে থাকে, এক্ষণ তার তাউল্লা ফাইট্টা টুকরা-টুকরা হইয়া যাইব! এক্ষণ অই ফাটা ঠকঠকা মাথা নিয়া সে মইরা যাইব গা! আল্লা! এমন ছিদ্দতও তুমি রাখছো, জুলেখার নসিবে!

তাইলে আর সে মিয়াভাইয়ের হাত ধইরা রাখে ক্যান! ক্যান বা সে আর মিছা মায়া বাড়ানির আস্পদ্দা করে! থাউক থাউক! কিসমতের বেশি পায় কে,আর রিজিকের বেশি খায় কে! থাউক। লাগবো না জুলেখার কিছু! কেউরে লাগবো না! জুলেখায় এই এক্ষণই তো ফাঁস লইয়া নিজের দগ্ধানির তেনে নিজেরে রেহাই দিতেই পারে!

কিন্তু আপনা মাও-বাপের মোখের দিগে চাইয়া নিজেরে সে সেই নিস্তার দিতে যাইব না! জনম ভইরা আগুনে ভাজা ভাজাই হইব সে! এমনেই তাইলে শেষ হইব নে তার জিন্দিগি! হউক হউক! জুলেখায় এইবার নিজের হাতখানরে ছুটায়ে নেওয়ার জন্য একটু শক্ত কইরা টান দেয়। যদি কিসমতে না থাকে,তাইলে আর সে ক্যান মায়া বাড়ায়!

‘বহুত পাকনা পানা করা হইছে এতখোন! বহুত বড়ো বড়ো চিন্তা করা শেষ করছেন আপনে! এইবার এট্টু জিরানি দেন ?’ জুলেখার হাতরে আরও একটু শক্ত করে জাবড়ায়ে ধরে অই ভেলকিঅলায়! কয়, ‘অখন,বাদবাকি যত কিছু করোনের আছে, সে-ই আমারে করতে দেন আপনে! আমারে এট্টু খালি বিশ^াস করতে পারবেন ? পারবেন করতে ? এইটুক পারলেই আমারে বাঁচাইয়া দিবেন আপনে! অন্য ভালা-বুরার সকল চিন্তা আমি দেখমু নে।’

ও মা! কোনও তুফানরেই যদি মিয়াভাইয়ে তুফান মনে না করে, তাইলে জুলেখায় আর কী করব! জুলেখায় তাইলে খালি কান্দব! কান্দব সে! যাউক গা আলা দুনিয়া-দোজগের আগুনের তলে যাউক গা! জুলেখায়ও ডুইব্বা যাক!

কিন্তু ঠাকুরবাড়ির অন্দর পুষ্কুনির কিনার-ঘেঁষা যেই রাস্তাটুক, সেইটা তো অন্য অন্য সময়ে চোখটা ফিরাইতে না ফিরাইতেই ফুরাইয়া যায়। তারবাদে হুপ কইরা আইসা পড়ে পতিত ক্ষেতি-খোলারা। সেই ক্ষেতে ক্ষেতে আপনা-আপনি জন্ম নেওয়া খেঁজুর গাছের কোনও সীমাসংখ্যা নাই! হাজারে-বিজারে জংলা খেঁজুর গাছ। তার এ-মুড়ায় সে-মুড়ায় আকন্দ, বন তুলসী আর শিয়ালমূত্রার ঝোপ! বেহিসাব ঝোপঝাপ। সেইসবের ভিতর দিয়া দিয়াই দেওভোগে পৌঁছানের বাকি আঁকলানো-বাঁকলানো রাস্তাটুক। পায়ে হাঁটার চিলতা একটু পথ! জোর কদমে হাঁটোন দিলে, সেইটাও শেষ হইতে বেশিক্ষণ লাগে না। কোনও সময়ই লাগে না। ধীর কদমে হাঁটলেও সেই পথ পার হইতে অল্প সময়ই লাগে।

কিন্তু আজকা ক্যান এই পতিত ক্ষেতিখোলারে এমুন ক্রোশ ক্রোশ লাম্বা লাগতাছে! রাস্তা য্যান ফুরায়ই না! জুলেখার এমুন ক্যান মনে হইতেছে!

‘ফুরাইবো! এই ত্তো, আর অল্পই বাকি!’ জুলেখার মনের নিরালা কথাখানও আজকা আর মিয়াভাইয়ের অগোচরি থাকব না ? অন্তরের কথারে মোখে আনোনের আগেই কেমনে সে ধইরা ফালাইতেছে!

অন্য সকল সময়ে তো এই ক্ষেতির ওপরে থাকে গনগনা রইদ! হইলে হউক গা সেইটা শীতের দিন, নাইলে হউক গা সেইটা বাইরা মাস! এইনে মাথার ওপরে খোলা রইদ-খটগটা রইদ, নাইলে মেঘ। ভিজা-কালা মেঘ, সাদাশুকনা মেঘ! নাইলে আসমান! নীলা বরনের নাইলে ছাই বরনের আসমান―সকল সোম! আজকা য্যান সেই ক্ষেতিরে ঘন এক ছেমায় ঢাকা পড়া ঢাকা পড়া লাগতাছে! জুলেখার কাছে সকল কিছুরে আজকা এমুন লাগতাছে ক্যান!

লোকসগলরা গো! অই দুইজনরে আমি সেই ছেমায়-ছেমায় হাইট্টা যাইতে দেখি! যাইতেছে তো যাইতেছেই! না না। দেওভোগের বসতিগুলার দিগে যাইতাছে না তারা। জুলেখা গো ভিটির দিগেও না। ইসুফ মিয়াগো বাড়ির দিগে তো না-ই! তাইলে কই যায়―কই যায় ?

অই ভেলকিঅলায় জুলেখা কন্যারে কই লইয়া যায় ?

জুলেখা বইনের লেইগা তরাসে আমার প্রাণখান শুকাইয়া চৌচির হইতে থাকে! আহারে! মাওয়ে জানল না, বাপে বুঝল না, জগতের একটা কোনজনরে সাক্ষী না রাইখাই তাগো ঝিয়ে এমনে নিরুদ্দিশ হইয়া যাইতেছে! আহ্হারে! নাইলে আছেই এইটা জুলেখার কপালের লিখন! কিন্তু মাইয়ার ভালা-বুরার খোঁজখান কী কেউর গোচরে থাকব না ?

ভেলকিঅলায় কী এই আমারে―এই আমি কাউয়ারে―চিরতরে অচল থাকোনের বান দিয়া থুইছে ? এই বকুলগাছের ডাইলায় থাইক্কাই তবে আমারে আয়ু শেষ করতে হইব! নাকি ? আইচ্ছা! আমার যা হওনের হইব নে। জুলেখা বইনেরে এই জালিয়াতে কই লইয়া যাইতাছে গা ? সেইটা অখন কেটায় দেখব ? কারে আমি সেইটা দেখনের লেইগা ডাক দিমু ? কারে দোহাই দিমু রে অখন ? আমি তো তবদা-লাগা,বান-খাওয়া!

‘একবার তুই উড়ালটা দেওনের চেষ্টা তো দেইখা লবি!’ মা-খাগি দেওভোগে আমারে য্যান খেঁজি দিয়া ওঠে, ‘জালির পুত জালিয়াতে ঠাঁই ছাড়ছে না ? এইন তেনে সইরা গেছে না উয়ে ? তাইলে অখন অর বিজলী-পড়ার গুণটা কী নষ্ট হইয়া যায় নাই ? গেছে কিনা সেইটা একবার দেখ ? দেখ রে কাউয়া! অখন মাবুদের কী মরজি!’

ও মা, মা! ডেনায় ঝাপট দিতে গিয়া আমি কী দেখি এইটা! দেখি যে, আমি সোন্দর উড়াল দিতে পারতেছি! কোনোদিগে কোনও আটকানি নাই, ঝাপট নাই, থাবড়া নাই! তাইলে অখন আমি কি করমু ? আমি বইনের পিছে পিছে ছুটমু! আমি বুঝি চোট্টার পুত চোট্টার অই সগল বিত্তান্তের সাক্ষী হইতে যামু না ? বাঁচোন-মরোন পরের হিসাব, আগে তো ভেলকিঅলার কীর্তির সাক্ষী হই Ñ!

দেওভোগ মায়ে চিল্লাইতে থাকে, ‘অরে যা! যা যা! পাতি কাউয়া ধনরে! উড়াল দে অক্ষণ! আর দেরি হইলে কইলাম ভেলকিঅলায় কই না কই যাইব গা নে! আর তার হদিস পাবি না রে!’

দেওভোগ মায়ের চিল্লানির ঠেলায়ই হউক, বা নিজের মনের ভিতরের চিপা ডরের কারণেই হউক, উড়ালটা দিতে দিতে আমি করি কী চৈতমাইস্যা সুরুজরে আমার লগে যাওনের জন্য ডাক দেই! আমি একলা আর কট্টুক চাক্ষুস করমু। এই পাতিকাউয়ার চক্ষেরা আর কতটুকই বা দেখনের হেটাম রাখে!

কিন্তু অই যে সুরুজ, সে হইল বাঘার বাঘা! সগল গুণের গুণী! সীমাছাড়া শক্তিঅলা। সেও যদি আমার লগে লগে থাকে, তাইলে নি বইনেরে রক্ষার কোনও রাস্তা মিলতে পারে। আইচ্ছা, পথ মিললে মিলবো, নাইলে না-ই! কিন্তু আমার লগে লগে আরেকজনে―এই সত্য-সুরুজও, এই সর্ব-আচরিত―এই বিত্তান্তের সাক্ষী থাকুক!

‘আমি না পইল্লার তেনে আগাগোড়া আছি ?’ সুরুজ আমার লগে ছুটনি দিতে দিতে আমারে উত্তর করে!

যাইতে যাইতে যাইতে কত পন্থ যে পাড়ি দিয়া দেই! সেইটা আর হিসাবে থাকে না। পিছনে পইড়া থাকে দেওভোগ গেরামটায়। কোনও সুদূরে পইড়া থাকে ঠাকুর বাড়ির ঘাটলা। মা¹ো মা! এইটা কী বিত্তান্ত! কোনোদিগে দেহি জুলেখা বইনের নাম-নিশানাটুকও নাই! হায় হায় বিষয় কী!

ভেলকিঅলার পিছে পিছে মেলা দিতে তো আমরা দোনোজনে দেরি করি নাই। আর, উড়াল দেওনের সময়ও তো আইলসামি কইরা ঢিলা রকমের কোনও উড়াল দেই নাই! দিছি অতি তুখার জোর উড়াল। তাইলে হেগো দোনোজনের কোনও চিহ্ন দেখি না ক্যান কোনোখানে ?

কই গেল ? ইয়া মাবুদ!

হরদিশা হইয়া আমি কিনা কোনও একটা গাছে না বইসা, এক ঝটকায় মাটিতে গিয়া বসি। আমাগো এমুন করোনের বিধি নাই। আমাগো বসতে হইলে সোজা গিয়া বসতে হয় কোনও না কোনও বিরিক্ষির ডালে। হুড়ুম কইরা গিয়া মাটিতে বসা দেওয়াটা আমাগো কাউয়া জাতির জন্য কোনও সঠিক কর্ম না―একেবারে অকর্ম! তবে এইবার য্যান সেইটা কইরাই একটা অতি ভালা কর্ম করলাম। অনেক ভালো!

পাগল পাগল হয়ে আমি মাটিতে পড়েও সরি নাই, অমনেই দেখি, অই তো একটু দূরে জুলেখা বইনেরে য্যান দেখা যায়! অইখানে কী করে তারা দুইজনে ? অইখানে য্যান কী এক ঠাসকি-খাওয়াইন্না, নয়া বিত্তান্ত হইতে দেখা যাইতেছে!

তবে অই নয়া বিত্তান্তের কথাটা কওয়ার আগে, অন্য আরেকটা ধন্দের মীমাংসা কইরা লইতে হইব আমারে। অই যে জান-পরান খিচ্চা লইয়া, আমি জুলেখা বইনের খোঁজে উড়ালটা দিলাম, অই উড়াল দিয়া শেষে আমি কই আইলাম! এই যে এইটা কেমন এক জায়গা! এরে ঠিক আমাগো নিজেগো দেশ বলে কিন্তু মনে হইতেছে না! এমুন জায়গারে য্যান আগে কোনও সময় দেখছি―এমনটা তো মনে হইতেছে না! এই জায়গার লগে আগের থেকে আমাগো চিন-পরিচয় আছে এমনও তো লাগতাছে না! কী আজবের কারখানা! নিত্যির চিন-পরিচয়ের দেওভোগের ওপর দিয়া না উড়তে ছিলাম ? চেনা মাটির ধুলায়, সেইনে, চিনা-জানা সব গাছগরান। সেইখানের বাতাসও আমার চেনা। বাতাসের গন্ধও তো চিরদিনের চেনা!

তারমধ্যে কেমনে আচমকা কোনখানে আইসা পড়লাম! মাটিরে য্যান এইখানে মাটির মতন দেখায় না! তারে য্যান সাদা তুলাতুলা দেখাইতাছে! আসমানেরে লাগে য্যান লাল লাল! কইচ্চা পাতার ঘেরের ভেতরে পাকনা মরিচরে যেমুন খনখনা লাল দেখায়! এইনের আসমানটায় য্যান তেমুন লাল! কেমুন ভেলকির কারবার দেখি!

এইখানে তাইলে সেই ভেলকি অলায় করেটা কী ?

সে এক আজব কর্ম করতাছে―!

অই তো সামনে তুলাতুলা সাদা মাটির একটুকরা ক্ষেত। ভেলকিবাজে অই তো জুলেখা বইনের হাত ধইরা, অই যে সেই সাদা তুলার বরন ক্ষেতের মধ্যে দাঁড়ানো। কত কথা দুইজনের মুখে, কত কান্দন দুইজনের চক্ষে, কত হাসি দুইজনের শইলে।

হাসতে হাসতে, কান্দতে কান্দতে ভেলকিঅলায় বলে, ‘এইবার তাইলে মাটিয়ে তোমারে গোসলখান দেউক!’

‘মিয়াভাই!’ জুলেখায় থতমত খেয়ে ওঠে,‘ আমি বাইত গিয়া গোসল করমু নে!’

‘বাড়িত যাওনের আগে, এইনে এক ঝটকা এক ডুব দিয়া লইলে দোষ নাই।’

‘ আপনের সামনে, না না!’

‘আমি চোউখ বন্ধ দিয়া থুমু। একেবারে বন্ধ দিতাছি।’

‘না মিয়াভাই! না! আমার শরম লাগতাছে! বাইত যাই গা চলেন!’

‘এই ডুব না-দেওয়া গেলে যে বাইতে যাওনের উপায় নাই।’ এইকথা বইলা ইসুফ মিয়ার ভেকধরা অই জালিয়াতে করে কী, আস্তে কইরা জুলেখার হাতখানরে ছাইড়া দেয়। তারবাদে নিজের ডাইন হাতটারে নিয়া জুলেখার মাথার ওপরে রাখে।

তারপর সে জানি কারে কারে ডাক পাড়া শুরু করে! কী ঠাটাপোড়া কটকট্টা ভাষায় যে সে অই ডাকাডাকি দিতে থাকে! ডাকই দেয়, না অন্ত্র-তন্ত্র-মন্ত্র পড়তে থাকে, কে জানে ? আমি সেইসবের কিচ্ছু বুঝতে পারি না। তবে, আশ্চর্যের কথা এই, সেইসব আবড়া-খাবড়া ডাক-মন্ত্র কেমনে জানি পুরা আমার মাথার ভিতরে গেঁথে যায় গা।

সেইগুলার অর্থ আমি একবিন্দু বুঝতে পারি না, কিন্ত কেমনে জানি হুবহুব কইতে পারতে থাকি আমি! কেমনে কী অয় রে! এইটা অই চোট্টার কর্ম না-হইয়া পারে ? সেই অই সবেরে আমার মাথার ভেতরে গাইত্থা দিছে। অই চোট্টায় কারে ডাকে ?

‘আসো ক্ষিতি। আসো তুমি মাটি। মাটির মানুষেরে ঠাঁইদায়িনী তুমি এই কন্যারে একবার ঢেকে নেও। অবগাহন দেও, স্নান দেও। তারে মুক্তি দেও―মুক্তি পাইতে দেও―’

সেই ডাক শুনতে শুনতে পাওয়ের তলের মাটি য্যান কেঁপে উঠতে থাকে! ধীরে, অতি ধীরে একটু একটু করে কাঁপুনি পেতে পেতে, হঠাৎ সেই মাটি য্যান উড়ুক করে একটা লাফ দেয়! পানি-পেঁকে ঘলঘলাটে এক প্রকারের বস্তু ছলবলায়ে ফাল দিয়া ওঠে জুলেখার দিকে!

ওম্মা রে ওম্মা!

কিয়ের তেনে কী হইয়া যাইতাছে রে!

সত্য সত্যই তো দেখ, মাটি আইসা জুলেখারে ঢাইক্কা নিল দেখি!

অই তো জুলেখার পেঁক-কাদায় মাখামাখি পুরা শরীরখান―

কেমুন তবদা খাইয়া খাড়া হয়ে আছে! এইটা কিয়ের আলামত! ভেকঅলায় কী করতাছে এইসব!

অই তো পেঁক-কাদায় আইসা জুলেখারে মাইখা নিল! তারবাদে এখন কী উপায় ? এর তেনে নিষ্কৃতি আইবো কেমনে ?

ভেলবিঅলায় অই দেখো―আবার য্যান সেয় অন্য কারে ডাক দিতাছে!

‘আসো অপ! আসো গো জল! মাটির মানুষের তিয়াস নিবারণী তুমি! এই কন্যারে শুচি কর! তারে শুচিরুচি দেও! তারে মুক্তি পাইতে দেও!’

অমনেই পায়ের তলের মাটি ফাইট্টা য্যান―পানির নহর জাগনা দিয়া দেয়! হুড়দুড় কইরা কইরা, ঝাটকাইয়া ঝাটকাইয়া ―কালা কুচকুইচ্চা পানির ঢেউ য্যান―উপরের দিগে উঠতে থাকে! পানি উঠতে থাকে! উঠতে থাকে! ক্রমে ক্রমে জুলেখার চাইরদিকে য্যান―পানি ভরপুরা একটা পুষ্কুনি―জন্ম নিয়া নেয়! তারবাদে সেই পানিয়ে করে কী―একেবারে য্যান জুলেখারে ঢাইকা নেয়! পানিয়ে নিজে নিজেই তারে য্যান ডুব সিনান করাইয়া দিতে থাকে! তেজী ধারার পানিয়ে য্যান জুলেখারে ভাসাইয়া-ডুবাইয়া উথালপাথাল করতে থাকে!

আরে বাপ রে বাপ! এইটা কী কারবার! এমুনও হয়!

এমন হুড়াত-ছুড়াত কইরা কইরা পানিয়ে তো কতক্ষণ জুলেখারে সিনান দেয়, তারপর আচমকাই পানিয়ে―হুড়মুড় কইরা য্যান পাতালে ঢুইক্কা যায়! তারবাদে দেখো, অই যে মাটি! সাদা তুলার রঙা মাটি, যেমন ঠনঠনা শুকনা আছিলো, তেমন খটখটা ঠনঠনা পইড়া আছে! কেবল চক্ষের সামনে অই যে জুলেখায়, ভিজা জুবজুবা হয়ে― অই তো খাড়া হয়ে আছে!

এই যে এমন এমন ঘটনা―জুলেখারে নিয়াই ঘটে যাইতাছে, সেইটার বিষয়ে তার কী একটু হুঁশ আসবো না ? একটু কী জাগনা পাইবো না সেই কন্যায় ? ইইইস!

ভেলকীঅলায় তক্ষণ তক্ষণই আবার কী করা শুরু করে দেখো! সে তার দুই হাতেরে―নিজের দুইপাশে মেইলা দেয়! এমনে মেইলা দেওয়ার কারণ কী! এইটা আবার কী ? অই তো দেখো, আরেক কারবার! আস্তে আস্তে য্যান দুইদিগে ছড়ানো তার দুই হাত―লম্বা হইয়া যাইতাছে! লম্বা হইয়া যাইতাছে! লম্বা হইতে হইতে য্যান তারা দুই মুড়ার আসমানের দুই কিনাররে―প্রায় ছোঁয় ছোঁয় অবস্থায় চইলা গেছে! বাপ রে!

‘আসো মরুৎ! আসো গো বায়ু! মাটির মানুষেরে প্রাণদায়িনী তুমি! এই কন্যারে মুক্ত করো! সকল পশ্চাৎ-টান থেকে মুক্তি দেও তারে! উড়ায়া-ঝুরায়া নিয়া যাও হে! কন্যার পুরানা জীবনের মায়া বাসনার শিকল-বন্ধন! সব নিয়া যাও! বিস্মরণ দেও তারে! জনমের তরে তাই দেও!’

অই তন্তর-মন্তর বলা শেষ করে। সেই ভেকদারে নিজের হাত দুইটারে পুরা গুটায়েও আনে নাই। অমন কালেই দেখো―আসমান ঘোর ঘুরঘুট্টি কইরা দিয়া য্যান―তুফানে ছুট দিয়া আইসা পড়ে! কালা তুফান! কী তার জোর কী তার ডাক-হুঙ্কার! হুম হুম হুম হুম গুড়ুম গুম্মুর গুড়ুম! হুই হুই হা হা- হাম হাম হাম!

আল্লা আল্লা আল্লা! আমার কাউয়া জীবনের কোনোকালে তো―এমুন মারকুট্টা বাতাসেরে আমি চক্ষে দেখি নাই! এই বাতাস কেমুন বাতাস রে! সেই বাতাসে হুমদুমাইয়া ছুটে আইসা―রমরমাইয়া জুলেখারে ঘিরান্তী দিয়া দেয়! তারবাদে কড়া ঘুরুন্তী ঘুরতে থাকে! জুলেখারে পাঁক দিয়া দিয়া ঘুরতেই থাকে ঘুরতেই থাকে!

সেই ঝঞ্ঝার ঝাপটে ঝাপটে জুলেখার চুলেরা শূন্যের দিগে উড়াল দিতে থাকে! হুড় হুড়,হুড় হুড়, শা শা উড়াল! ওড়া শুরু করে জুলেখার কাপড়ের আঞ্চলখানে! পাতাস পাতাস পাত পাত! আচমকা য্যান জুলেখার পুরা দেহখানেই উড়তে আরাম্ভ করে! জুলেখারে তখন আর ঘরের এক ঝি বলে মনে হয় না! তারে তখন লাগে য্যান সে হইয়া গেছে―ডরুক কুপির কাতর সলিতাখান ! এই খাবি খেতে খেতে―কোন তলের দিকে য্যান নেমে যাইতাছে! এই য্যান নিভ্ভা যায় যায়! আবার এই য্যান―সেই সলিতার শিখায়―ধড়ফড়ি দিতে দিতে জ¦লজ¦লাইয়া জ¦ইল্লা উঠতাছে! য্যান তার ভিতরটা তার ভিতরে নাই! সেইটা শুকনা পাতা হইয়া তার শইলের এক পাশে ভাসতেছে! ঝাপটা বাড়ি খাইতেছে!

হায় হায় হায়। মাইনষের ঘরের অই সিধা-সহজ মাইয়াখানে কিয়ের নজরে পড়ছে। এ্ইটা কে ? ইসুফ মিয়ার ভেক নিয়া কিয়ে আইয়া―জুলেখারে ধরছে ? ক্যান উয়ে জুলেখার উপরে এমন গজব ঢালতেছে! খোদার দুনিয়ায় কী একটা কেউ নাই, যে আইসা অখন অরে থামানি দিতে পারে ? মাবুদ !

অই দেখো, আবার জানি কিয়েরে ডাক পাড়তেছে অই শনিয়ে!

‘আসো তেজ! আসো হে তাপ! মাটির মানুষেরে রক্ষাকারিণী তুমি! এই কন্যারে মুক্তি দেও! পুরান জীবনখানারে দগ্ধ করো হে আগুন! কন্যারে চির বিস্মরণ নিদ্রা দেও! তারবাদে তারে নয়া জাগরণ দেও! আসো তুমি নব অগ্নি! কন্যার চিত্তে আমারে গ্রহণের-বাসনা জাগানি দেও! এই যে আমি! অন্য একজন! এই আমারে গ্রহণের তিয়াস জাগ্রত করো তুমি! তারে চিত্তে আমার জন্য তিয়াস দেও! না-ফুরুনি নব তিয়াস!’

এইবার এই ডাক ডাকতে ডাকতেই য্যান অই ঠগের শইলের সকল শক্তিই―একেবারে নিংড়ানী খাইয়া যায়! অই ত্তো সে অখন জুলেখার একদম সামনা-সামনি খাড়াইয়া আছে । একদম থির, হিম ঠান্ডা হইয়া খাড়া দিয়া আছে। তার দুইহাতের পাতা নিজ বুকের সামনে এনে রাখা। একটা হাতের পাতার সঙ্গে অন্য হাতের পাতাটা―জোড় বেঁধে রাখা আছে এইবার। কখন সেয় তার চোখ বন্ধ করে নিছে―কে জানে! তার অমন থোম দিয়া দাঁড়াইয়া থাকার ফল কী ?

জুলেখায় তাইলে কী করে এখন ?

এই যে দেখো রে! জুলেখারও তো দুই চক্ষু―শক্ত রকমে বন্ধ হয়ে আছে! য্যান সে ঘুম-পড়া পাওয়া একজন এখন! তারে কালঘুমে গেরাস কইরা নিছে গা য্যান এখন! সেই কালনিদ্রায় জুলেখা বইনে খাড়াইয়া আছে।

অই বুজরুকে আর কতো বুজরুগি দেহাইবো! আরো কতো ? ঘিন্নায় নিজের ভিতরে নিজেই খিবলি-জিবলি খাইতে থাকি আমি। অমন সময়ে, দেখো, খোদার কী মর্জি! আমার মাথার ভিতরে মাবুদে কোন বুদ্ধি জাগানী দিয়া দেয়! আরে আমি এমনে ঠাটার মরার মতন হইয়া রইছি ক্যান ? এই ত্তো সুযোগ― আমার পাঙ্খার ঝাপট দিয়া দিয়া―জুলেখা বইনেরে হুঁশে ফিরাইয়া আনোনের এই ত্তো সুযোগটা যাইতাছে!

বুজরুকের ঘরের বুজরুকে থাকুক আলা চউখ বুইজ্জা! চক্ষু বন্ধ কইরা সেয় অখন―যতো মনে লয়, খাড়া দিয়া থাকুক! এই ফাঁকে আমি নিজেগো মাইয়াটারে বাঁচানের চেষ্টাটা দেখি! ঠিক তক্ষণেই কী এক তাজ্জবের বিত্তান্ত যে ঘটতে শুরু করে!

কী মস্ত এক তাজ্জবের বেপার! সেইটারে চক্ষে দেখেও য্যান বিশ^াস করার সাহস হয় না! খালি ধন্ধ লাগে-ধন্ধ লাগে! দেখি কী, ভেকধারীয়ে তার ডান হাতের তিনটা আঙুল সোজা জুলেখার কপালের দিকে নিলো!

কপালের কোনখানে ? কপালের দুই ভুরুর মাঝখানে! সেই আঙুলেরা কিন্তু জুলেখার কপালরে ছুঁইলো না! আঙুল আর জুলেখার কপালের মধ্যে থাকল এই এক সুতা পরিমাণ ফাঁক! আঙুলেরা সেইখানে গিয়া, পলকের মধ্যে, পাটা-পুতার মতন থির হইলো! তারবাদে, সেই তিন তিনটা আঙুল হয়ে উঠলো তিনটা আগুনের শিখা! সেই আগুন খটখটা তাজা! তার কোনো ধোঁয়া নাই! কোনো রকমে টেমটেমাইয়া জ¦লে যেই আগুন সেই গরিবি হালের আগুন না এইগুলা!

সেই শিখাগুলির একটার বরন য্যান সুরুজের আলোর মতন! তড়তড়া কড়কড়া সোনার বরন! আরেকটা শিখা য্যান কড়া কচি সবুজ লাউয়ের বরনের! অন্য আগুনটা বাগুনি বরনের! বেগুন গাছে গাছে―যেমন বাত্তি বাত্তি বেগুন দেখা যায় না ? অই বাত্তি বেগুনের কড়্ড়া রঙখান য্যান ঝিলকি দিতাছিলো এইখানে!

এই তিন আগুন―ঝাম ঝাম ঝাম ঝাম করতে করতে য্যান―জুলেখার ভিতরে ঢুকতে শুরু করলো! দুই ভুরুর মাঝখানের জায়গাটুক দিয়া তিন তিনটা শিখা সাঁই সাঁই কইরা য্যান ঢুকে গেলো!

ও! তাইলে এই বেটায়-এই যে জুলেখারে―অই আগুনটুক দিলো! সেইটা সেয় নিজের ভিতর থেকে দিলো ? হের ভিতরে আগুন আছে ? তার আঙুলে আগুন আছে ? কিন্তু সেইটা কেমনে হয় ? কেমনে এমনটা হইতে পারে ? মাইনষের শইল্লে কী আগুন আছে নি ? কবে আছিলো ? মাইনষের ভিতরে তো আগুন নাই!

তাইলে এই ভেকঅলার ভিতরে সেইটা আছে কেমনে ? সেয় তাইলে কেমুন মানুষ ? নাকি সেয় মানুষ না! সেয় তাইলে কেটায় ? মানুষের ভেক ধইরা এইটা কে ?

তবে, আমার এতো কথার জব কে দিবে ? সেইটা দেওয়ার তো কেউই নাই এইখানে! আমি বুঝি যে, এইখানে এখন সব ভেদের মীমাংসা নিজেরেই নিজের দিতে হইবো! আইচ্ছা থাকুক ভেদের মীমাংসা-অমীমাংসার বিষয়খানা! তারপরে কী ঘটতে যাইতাছে, সেইটা আগে খেয়াল তো করি!

তারপরে কী ?

তারপরে সেই তিন আগুন যেই না জুলেখার দুই ভুরুর মাঝখান দিয়া ঢুকলো, অমনেই মাইয়ার মুখ-চোখ ঘুমে একেবারে ঢুলুঢুলু হয়ে শেষ! আর যেনো সেয় খাড়া হয়ে থাকতে পারতাছে না! খাড়া থেকে থেকেই য্যান একদিকে কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে সে―অই ত্তো!

নাকি পলকের মধ্যে মাইয়ার দমখান বাইর হইয়া গেলো গা ? ভেলকীঅলায় তো ছেড়ীটারে কম ভোগান্তী দিতাছে না!

জুলেখার দমখান যদি বাইর হইয়া গিয়া থাকে, তাইলে আমি তো―অই ভেকধারীরে―এমনে এমনে ছাইড়া দিমু না! আর কিছু না পারি, দুইটা ঠোক্কর-আঁচড় কী দিতে পারমু না ? পারি আর না-পারি, সেইটা করোনের লাইগা আরেকবার আরেকটা চেষ্টা তো নিয়া দেখি!

অই তো ভেকঅলায়! সে তো অখন, জুলেখার ঘুমে টলটলান্তী শরীরখানরে সিজিল-মিছিল করার হুজ্জোতে আছে! এই বেলা তাইলে এই বেটার ঘাড়ে-গর্দানে খিচ্চা কয়টা ঠোক্কর দিয়া লই! আর তো কিছু পারার সাধ্য আমার নাই! বিধি যুদি আমারে চিল বানাইতো,তাইলে এইটার দশা না আমি অখন আতা-পাতা কইরা ছাড়তাম!

আমি তখন করি কী, অই ভেকঅলার ঘাড় বরাবর শক্ত একটা ঝম্প মারি ! ঘাড় তার একেবারে নোয়ানো।  জুলেখার ঘুম-অবশ দেহখানরে অতি যতনে বসানোর ব্যবস্থা নিতাছে! অখন কেবল অই কাজেই সকল খেয়াল দিয়া থুইছে! অন্য কোনো কিছুরে আর যেনো তার মনে নাই! এই-ই আমার একটা সুযোগ যায় তাইলে! খাড়াও তাইলে ঠগীর ঘরের ঠগী! মাইনষে গো মাইয়ারে একলা পাইয়া―এমনে জুলুম করোনের আহ্লাদটা বাইর করতাছি! আমি জানি তো আমার আর কট্টুক শক্তি ? তাও! অই অল্প এট্টুক হইলেও, সাজা তুই পাবিই পাবি!

আমি হুম্মুত করে গিয়া অই খারাপের ঘাড়ের উপরে পড়ি! তারবাদে তুরুত কইরা তার ঘাড়ে ঠোকর দিতে থাকি! গপ গপ্পর গস, গপ গপ্পর গস গপ গপ্পর গস! কিন্তু কী তাজ্জবের ব্যাপার! আমি না জান-কইলজা এক করে, তার ঘাড়ে ঠোকর দিতাছি ?

 কিন্তু কী বেপার! কোনো ঠোকরই অই লোকের ঘাড়ের মধ্যে গিয়া বিন্ধতাছে না! আমি তার ঘাড়েরেই ঠোকর মারি, কিন্তু আমার মনে হইতে থাকে; য্যান আমি শূন্যে ঠোকর ফালাইতাছি! য্যান আমি বাতাসরে ঠোকর দিতাছি! অই বেটার এইটা তবে কেমুন দেহ ? বাতাসে-গড়া শইল নিকি তার ? অই শরীর চক্ষের সামনে এমুন থাইক্কাও নাই-শরীর হইয়া গেছে কেমনে ? কেমন কারবার এইসব!

হায় হায়! এইটা কী বিত্তান্ত! ভেকধারীয়ে তাইলে কী! কে সে ? এইটা কী ? দেওভোগ গেরামের ইসুফ মিয়ার চেহারা নিয়া কে আইসা খাড়াইছে―জুলেখার সামনে ? হায় হায়!

‘শোনো রে পইখ! এতক্ষোণ তোমারে আমি যা দেখতে দিছি; সেইটা বিনা কারণে দেই নাই!’ আমি শূন্যে ঠোক্কর দিতে দিতে―সেই ধোঁকাদারের কথা শুনতে পাই; ‘সাক্ষী না রাইক্ষা কিছু করোন আমার ধর্মে নাই! তোমারে আমি এই পর্যন্ত বিত্তান্তের সাক্ষী রাখলাম! আরো অনেকক্ষণ এইনে তোমারে রাইক্ষা আর ভেজাল বাড়ানের ফুরসত আমার নাই রে, পইখ! তুমি আলা বিদায় লও! যাও গা তুমি!”

এই বলতে বলতে সেই লোকে বাও হাতে একটা ঝটকানা দেয়! অই তো সে তার ডাইন হাত দিয়া জুলেখারে ধরে আছে! অতি তরিজুত করে ধরে আছে! বাও হাতখান আমার দিকে―এক ঝটক তোলে কী তোলে না সে, দেখো তগনগদ তগনগদ কী হইয়া যায়! আমার সামনে ধীরে। অনেক অনেক ধীরে। একটা কেমন য্যান বেড়া জাগনা দিতে থাকে! মাটির কোন পাতাল তেনে য্যান একটা আগুনের বেড়া। মাথা উঁচাতে থাকে! আস্তে আস্তে মাথা তুলতে থাকে!

আর আমি শূন্যে যেমন ঝুলন্ত আছিলাম, তেমন ঝুলতেই থাকি! সেই লোকের ঘাড়-গর্দানের কোনো চিহ্ন আমার সামনে আর নাই!

সেই লোক কই ?

সেই লোক জুলেখারে যতন করে! জুলেখারে জাগানের জন্য। কতোমতে ডাক পাড়ে দেখো সেয়! “ ওঠো কন্যা, জুলেখা গো! কতো নিদ্রা যাও! চক্ষু মেলো গো কন্যা! অই যে দেখো, তোমার আপনা পুরী তোমারে ডাক পারতাছে! তোমারে নিতে আসছে! লও,এইবার! আমরা যুগলে কদম বাড়াই! সুক্ষণরে বিনাশে যাইতে দিতে নাই! জাগো গো তুমি!”

আগুনের বেড়ায় মাটির তল তেনে ক্রমে আমার দৃষ্টি বরাবর জাগনা দিতাছে, দেউক! আমার নজর পুরা ঢাকা পড়ে যাওনের আগে আজব কারবারের যতোটা পারা যায়, দেইক্ষা লমুই লমু আমি!

এই দুশমনে কোন পুরীর কথা কয় ? সেয় কোন দ্যাশ তেনে আসছে ? কোন পুরীর আসোনের কথা কইতাছে সেয় ? সেই পুরী কেমনে আসতাছে ? আমি চোখা-নজরের পাতিকাউয়া হইয়াও সেই বিষয়টারে ধরতে পারতাছি না ক্যান ? ক্যান ?

তেমন সময়ে, যখন কিনা আগুনের বেড়াখান, প্রায় আমার মুখ বরাবর উঠে আসছে; আতকা আমার নজর যায় সামনের আসমানের দিকে! অই যে আসমানে অইটা কী ? কী দেখা যায় ? বিশাল কাঁসার থালের মতন কী জানি একটা দেখা যায়! অই যে পশ্চিম আসমানের শেষ কিনারে সেইটা দেখা যাইতাছে! একটা য্যান থাল! সেইটা আসল কাঁসার থালের মতন সোনা-ঝকঝকা না! কাঁসার থালের মতন এট্টুু ছোটো কিছুও না এইটা! খোদাতাল্লা খোদা!

কী আজদাহার আজদাহা একটা কিসে জানি-আমাগো আসমানের লগে আইসা ভিঁড়ছে! অইটা কী জিনিস! আহ্হারে! আগুনের বেড়াটায় আমার মাথার উপরের দিকে উঠে যাইতাছে গা! আর তো তাইলে কিছুই দেখতে পারলাম না! জুলেখায় জাগনা পাইলো নিকি! না, কোন সব্বনাশের কালঘুমে দংশাইছে অরে, জনমকার মতন! আহ্হারে!

আমার অন্তরের হায়-আফসোসের ধাক্কা খাইয়াই হোক, নাইলে অই ধোকাদারের যতনের ঠেলায়ই হোক, তক্ষণই জুলেখায় জাগনা পেয়ে যায়! ‘ মিয়াভাই!’ আমি জুলেখার আহ্লাদী গলাখানরে শুনতে পাইতে থাকি, ‘মিয়াভাই! অই দেহেন―আসমানের কিনারে অইটা কী!’

“অইটা আমাগো দেশ! তোমার নয়া দেশ! অইনে তোমার-আমার বাড়ি! আমরা এইরপর তেনে আমাগো বাকি জিন্দিগী অইনে থাকমু!” আমি ধোকাদাররে এই কথা বলতে শুনি!

‘মিয়াভাই!’ জুলেখায় ক্যান জানি হাসতে শুরু করে, তামশা দেইক্ষা লোকে যেই ফুরফুরা-হালকা হাসি হাসে, তেমুন আমোদের হাসি জুলেখার গলায় বেজে উঠতে থাকে! ‘ মিয়াভাই! লন আলা, বাইত যাই গা!’

‘এইবার তোমারে আসল সত্যখানা কওনের সুক্ষণ আইসা হাজির হইছে! শোনো কন্যা, আমারে দেখতে তার মতন দেখাইতাছে সত্য, কিন্তুক আমি সেয় না! আমি অন্য একজন! আমি অন্য!’

‘মিয়াভাই! আইজকা পুরাদিন কইলাম আপনে বহুত রঙ্গ করতাছেন! কেমুন কেমুন কইরা কতা তো কইতাছেনই, আবার অখন কেমুন উল্টা-সিধাও জোড়াইছেন! আমার কইলাম ভালা লাগতাছে না। আপনের এই এমুন-তেমুন কুয়ারা! আমি এইরপর কানমু কিন্তুুক!’ কানতে কানতে তারবাদে য্যান জুলেখায় গিয়া, সেইজনের ডেনাখানেরে জাবড়ানী দিয়া ধরে!

তারবাদে কী যে ঘটে, আমি তার কিছুরই সাক্ষী হইতে পারি নাই! আমার সামনে তখন জ¦লন্ত আগুনের বেড়াখান খাড়া হইয়া যায়! বেড়ার অইপাড়ে অই বাটপাড়ের গুষ্টিয়ে আর জুলেখায়! এইপাড়ে আমি! তড়পানি খাইতে খাইতে বেদিশা আমি তখন ডাক-চিক্কুর পারা শুরু করি! জুলেখা গো! আমার ডাক কি তুমি শোনো গো বইন ? ওগো জুলেখা! কিন্তু জুলেখায় হুমুইর দেয় না! আর তার কোনো সাড়া মিলে না! আমি আর তখন কী করমু! নিজের কপালে নিজে পিছা মাইরা, দেওভোগের কাছে ফিরত আসোনের পথের সন্ধান করতে থাকি!

৭. সত্যই আমি ঠগ জালিয়াত! ভেলকিবাজও আমিই!

শোনেন, শোনেন। আপনেরা সকল মান্যজনে শোনেন। এই যে আজকার এই চৈত মাইস্যা দিন। শোনেন দেওভোগ গেরাম। শোনেন এই গেরামের কাউয়া-কুলি। বিরিক্ষি-পানি-আসমান । সকলে শোনেন।

এই যে আমি―আমি এখন আপনেগো সর্বজনের কাছে। আমার বিত্তান্তখানরে নিবেদন দেওয়ার নিয়ত করছি। এক অর্থে ধরতে গেলে―এই বিত্তান্তখানা এমন কিছু আহা-তাহা। এমন কিছু আজদাহা গুরুতর কিছু না। আপনেগো জগতে-সংসারে এমুন কতোই তো ঘটতাছে!

কিন্তু মাথা স্থির কইরা এইটারে ধরতে পারেন যুদি তাইলে বুঝবেন! এইটা কোনো সামান্য বিত্তান্ত না! এমুন বেপার, যুগ-জনমেও একবার ঘটে কিনা সন্দেহ! যেই বেপার আমি ঘটাইলাম! কোনোদিনও কিন্তু এমুনটা ঘটতে দেখা যায় নাই!

এখন এই বিষয়রে যুদি আপনেরা পরস্তাব বইল্লা মানেনÑ তো এইটা পরস্তাব! আর যুদি এইটারে সত্য বলে গ্রাহ্য করেন। তাইলে এইটা সত্য বেপার। যেমতেই এরে নেন না কেনো, আমি অভাইগ্যায় তাইতেই ধন্য হমু!

হইতে পারে আমার জবানেরে বোঝতে। আপনেগো অনেক ঝামেলা হইতাছে! এমনও হইতে পারে,আমার কথা-হয়তো আপনেগো কাছে আবড়া-জাবড়া কিছু একটা মনে হইতাছে! অ্যারে একেবারে পরিষ্কার কিছু বলে―মনেই হইতাছে না! এমনও তো হইতে পারে।

তবুও আমার দীলের সকল ঢেউরে―আপনেগো কাছে জমা না রেখে তো, আমার আর অন্য উপায় নাই! এইসবেরে আপনাগো কাছেই আমারে জমা রাখতে হবে! কারণ, এই কথাগিলিরে নিজের ভিতরে রাইক্ষা, আমার নিজের মুল্লুকে, আমি একটা কদম পর্যন্ত দিতে পারমু না! অইখানের বিধিই এই! মাটির দুনিয়ার পাওনা-দেনারে মাটির সীমানায় রাইক্ষা, তবেই আগুনের মুল্লুকে ঢুকতে পারা যায়। নাইলে না। নাইলে কিছুতেই না!

আমার জবানের এই নড়বড়া দশারে, আমার না পারুন্তীরে, আমার এই অক্ষমতারে; মাফ কইরা নিয়েন!

একে তো আপনেগো মনুষ্যের ভাষায়, আমার কোনোপ্রকার দখল নাই! আমার মুল্লুকের ভাষা অন্য! চলাচলতির বিধি-ফায়সালা অন্য! রাজকর্মের ভাষার রেওয়াজ ভিন্ন প্রকারের! অইখানের আশনাই-ইশকের জানান্তী দেওয়া-নেওয়ার রীতিপ্রকারও একেবারে অন্য!

আমার সেই নিজ জবানেরে। চলন-বলনের- রীতি-কায়দারে―স্ব ইচ্ছায় ত্যাগ দিছি আমি! নিজের সবকিছুরে বিস্মরণে নিছি গা! আর দিনে দিনে দন্ডে দন্ডে আয়াত্ত করছি আপনেগো জবান,আপনেগো চলাচলতি! পলে পলে নিজেরে প্রস্তুত করছি আমি, আপনেগো একজন হওনের জন্য!

এইটা ঠিক যে, আপনেগো একজন হইয়া, আপনেগো ঘরের লগে ঘর ব্ইান্ধা, বসত করোনের উপায় আমার নাই! আমি যাগো ফরজন্দ। আমার সেই পিতা-মাতা অখনও জীবিত আছেন! খোদা মালিকের হুকুম হইলে, হয়তো তারা দোনোজনেই আরো কয়েক হাজার বচ্ছরেরই পরমায়ু পাইবো! তবে তাগো পরমায়ু যেইটাই হোক না ক্যান, আমারে থাকতে হইবো তাগো দোনোজনেরই কাছে!

একে আমি ছাড়া তাদের আর কোনো সন্তানাদি নাই! দুই আমি ছাড়া আমার পিতার মুল্লুকের ভালামন্দ দেখোনেরও কেউ নাই!

মুল্লুক চালানের লেইগা উজির নাজির, সিপাহসালার সিপাই কোতোয়াল, কাজী পেয়াদা―অনেকই আছে অইখানে! কিন্তু তাগো সকলতেরে উচিত রকমে সামলানী দিয়া, সর্বকর্ম করাইয়া নেওয়ার, শক্তি আছে কেবল একজনের! সে আমার পিতা! সে একা এক বাদশাহ!

তারে দরদ কইরা পাশে আইসা খাড়ায়। এমন একটা জনপ্রাণী―সেই মুল্লুকে নাই! অথচ এইখানে লাখে লাখে লোক আছে! একেবারে নগণ্যজন আছে সহস্র সহস্র! আবার আছে অযুত অযুত আমীর-ওমরাহ! তারপাশে বাদশা হুজুরের নিকট আত্মীয়ের তো কোন লেখাজোকা নাই-ই! কিন্তু সেইখানে সাদা-সদাশয় দিলের এমন একটা প্রাণী নাই। যেয় কিনা আমার পিতা বাদশাহ হুজুরের কান্ধে―নিঃস্বার্থ এক মুষ্টি ছায়া দিবো! সেই ছেমাটুক দেওনের জন্যও মালিক-মাওলায় য্যান―আমারেই সাব্যস্ত কইরা থুইছে! আমার পিতা-হুজুরের পিছে গিয়া খাড়ানের কে আছে ? আছে খালি একজন! এক পিতার একজন মাত্র ফরজন্দ-ছাওয়াল! এই আমি!

তাইলে এমন যখন অবস্থা। তখন কী অই একলা জনেরে ফালাইয়া―আমি মাটির দুনিয়ায় আপনেগো লগে ঘরবসত করতে পারি ? কী প্রকারে পারমু ? হয় সেইটা ?

আপনেরা এইখানে কইতেই পারেন। দুনিয়ার লোকেগো কোনোজনে তো, এইখানে থাকোনের লেইগা―আমারে কোনো মাথার কিরা দেয় নাই! কেউই তো কয় নাই, আমারে এইখানে বসত করোন লাগবোই লাগবো! তাইলে আমি ক্যান অই থাকাথাকি বেপাররে নিয়া এমন কথা বাড়াইতাছি ?

হ! এমুন ঠেস-মারা কথা আপনেরা নিশ্চয়ই কইতে পারেন!

সত্য বটে, আপনেগো দুনিয়ায় থাকার জন্য আমারে কেউই সাধে নাই! কিন্তু ভেজালটা যে আমি নিজে- নিজের জন্য বান্ধাইয়া থুইছি! আমার সর্বনাশ কেউ করে নাই! সেইটা ঘটাইছি আমি স্বয়ং! এই যে আজকা দশের চক্ষে―আমারে এমুন অসাধু দেখাইতাছে, তার লেইগা অন্য কেউই দায়ী না! দায়ী আমি নিজে!

কাউয়া পক্ষীটায় যে আমারে ভেকধারী ভেলকীবাজ বলছে, সেয় কিন্তু কিছু ভুল কয় নাই!

আমি-আসমান-জমিন সকলেরে―হাজির-নাজির করে কইতাছি,আমি ভালা কেউ না! আমি বিশ^াসের ঘরে চুরি করুইন্না একজন! আমি পাতকী-ঠগ! ছল-ছুতাধারী জালিয়াত আমি! সত্য সত্য জালিয়াত! আমারে আপনেরা চোর কইতেই পারেন! আমি ভালা কেউ না। ভালা কেউ না! আমি নিজ স্বরূপ গোপন কইরা, অন্যের রূপ ধারণ করছি! এক সরলা কন্যারে ধোকা দিছি। আমি ধোকাদার। আমি ভালা কেউ না। ভালা কেউ না।

আমি কেমনে ভালা কেউ থাকমু ? কেমন করে ভালাটা থাকমু ? আমার ভাগ্যেই যে আমারে মাইর দিয়া থুইছে! কেমন করে আমি নিজের সাদা-সত্যটারে দিয়া, আমার বাঞ্ছাধনেরে নিজের জিন্দিগীতে পামু ? আমার আসল পরিচয়রে জানার পরে আমারে আপনেগো কাছে খাড়াইতে দিতেন ?

এখনও যখন আমার আসল পরিচয়খান। আমি আপনেগো দিয়া উঠমু। তখন কী আমার কথা শোনতে চাইবেন ? আমারে বিশ^াস করবেন ? আমি পরিষ্কার জানি। করবেন না! আমারে বুঝ দেওয়ার জন্য নানামতে―এখন আপনেরা নানা কিছু মিঠা কথা বলবেন। আমি জানি সেইটা। কিন্তু সেইসবেরে আমি বিশ^াস করি না। বিশ^াস করোনের কোনো ঠেকা নাই আমার। যেমন আমারে বিশ^াস করোনের কোনো ঠেকা আপনেগো নাই।

যাক আমার কথা। আমি বরং অই কাউয়া পক্ষীটার কথাই আরেকটু মনে করি। এমন নাতি-পাতি ক্ষুদ্র দেহখানা নিয়া―সে অমন দরদঅলা আর সত্য বুঝনেঅলা হইলো কী প্রকারে ?

আমার মনে হইতাছে অইটারে আমি আমাগো দুইজনের লগে―আরো কিঞ্চিৎ থাকতে দিতেই পারতাম! তারে আমার ঘটনা-ঘোটনা গুলার সাক্ষী একটু বেশি করে রাখতেই পারতাম! ও আমারে বেধুম জ¦ালাইতাছিলো সত্য। কিন্তু ওইটার ব্যাপার-ঠেপাররে আমার কাছে অনেক রঙ্গের বিষয় বলেই মনে হইতাছিলো! রঙ্গ কী ফেলনা কোনো বেপার ? তা তো না!

এই যে, এই যে কন্যা। সে তো কাউয়া পক্ষীর কোনো আত্মীয় না। নিজ জাতেরও তো কেউ না। তাও দেখো তো এই কন্যারে―অই পক্সক্ষীয়ে কেমন দরদ করতাছে! তারে রক্ষা করার জন্য কী পাগল পাগলই না হয়ে উঠছে অই কাউয়ায়। ক্যান ? এই যে জাত ছাড়া পক্ষী। সেও এমন করতে জানে ? এই মাটির দুনিয়ার পক্ষীও এমুন দরদবান!

বিষয়খানা ধরতে পেরে আমার বিষম অশান্তি লাগতাছিলো! আমার মাথার ভিতরে আজব মাপের একটা চেত উঠতাছিলো! আমার মুল্লুকে তো এমন কিছু কোনোদিন হইতে দেখি নাই আমি! আমার দুনিয়া এই মাটির দুনিয়ার থেকে উচ্চ জাতের না ? নিশ্চয়ই উচ্চ জাতের!

তাইলে সেইখানে যা নাই এইখানে থাকে কেমনে ? কেনোই বা থাকবো ? আবার এমন রকমের মায়া-বাসনা-দরদ এই মাটির দুনিয়াতেই আছে! সেই বিষয়খানা এতোদিন আমার নজরে পড়ে নাই কেনো ? এতোকাল তাইলে আমি কী যাচাই-বাছাই করলাম ? কী চিনলাম ?

আমি জানি এইখানে―এই ভিন দুনিয়ায় আমারে দেখতে কেবলই একটা আউলা মুসাফিরের মতনই লাগে! আমি জানি সেইটা। আমার বংশ-পরিচয়ও জানার কেউ এইখানে নাই। আমার শান-শওকত দেখারও কেউ নাই এইখানে! তবে সেইসবকিছুরে এইখানের লোকেরা কেমনেই বা দেখবো ?

এই মাটির জগতের লোকেদের চোখ আছে! সেই চোখেরা তাগো নিজেগো শক্তিমতো নানা কিছুই দেখে! তবে আজবের কথা হলো এই, তাদের চোখেরা―আমাদের কোনোজনেরে, আমাদের দুনিয়ারে, আমাগো কোনোকিছুরেই দেখোনের শক্তি রাখে না। তাগো চক্ষের সেই ক্ষ্যামতাই নাই!

এদিগে আমরা তাদের আদি-অন্ত, প্যাঁচ-ঘোচ সব কিছুরেই দেখতে পাই। রাইতেও দেখতে পাই―দিনে তো পাই-ই!

এগো চোখ আমাদের দেখতে পায় নাÑ তাগো কান আমাদের চলা-নড়ার আওয়াজ শুনতে পায় না! অথচ তারা সগলতে কী করে ? তারা খালি আমাদের নিয়া গপ্প বানায়! কতো শতজাতের গপ্পই না তারা বানায়া যাইতাছে! আন্দাজে- অনুমানে আমাগো নিয়া কতো আবলা-জাবলা কথাই না রটাইয়তেছে চিরযুগ ধইরা! আমাদের নিয়া কতো কথা তাগো কতো না ডর। আমাগো নামে মনিষ্যি সকলতে খালি ডর খায়―অকাজে-অকারণেই ডর খাইতে থাকে! বুঝে না বুঝে তারা আমাদের ডরাইতে থাকে। ঘিন্না করতে থাকে। অথচ আমরা কিন্তু তাগো বৈরী কেউ হইতেও চাই না। তাগো বৈরী কোনো কর্ম করতেও চাই না।

যাক, এইসব অকামের কথা―এই যে কন্যায় এখন কল্পবিরিক্ষির দেহে ঠেস দিয়া নিদ্রা যাইতাছে! এই যে আমি এখন তার দক্ষিণ হস্তরে আমার ডাইন হাতে ধরে আছি। এইটা আমার অতি সুখের এক প্রহর না ? অতি নিশ্চিন্তিরও তো ক্ষণ। অতো সাধ্যি-সাধনার রাস্তা পাড়ি দিয়া―আমি এখন আমার দীলতাজরে পাইতে যাইতাছি! আর অল্প একটু ক্রিয়াকর্ম করতে হইবো। আর অল্প খানিক বিধিরীতি পালন করতে হইবো শুধু। তারপরেই সে আমার। যুগজীবনের লেইগা আমার। অই বিধিনিয়ম পালন করা মাত্রই―কন্যারে নিয়া আমি আমার মুল্লুকে পাও দেওনের অবস্থাটা পামু। আর বেশী বাকি নাই। আর অল্পই বাকি।

এমুন শান্তির কালে, আমার চিত্তের নিরালায়, মনস্তাপের তরঙ্গরে য্যান নড়তে-চড়তে দেখতাছি আমি! ক্যান এমন হইতাছে ? অমনটা আসে কেমনে ? আমার কী এখন কোনোপ্রকার মনস্তাপেরে―গ্রাহ্য করোনের কোনো অবস্থা আছে ? আমি তো জিয়ন-মরণের আশা-স্বপনেরে, সত্য কইরা তোলোনের কর্মে আছি ? তাও মনস্তাপ আসে ক্যান ?

আমার যেই মুল্লুক, সেইখানে আমি কে ?

সেইখানের সকলে আমারে নিখুঁত কর্মকারি বলেই মান্যি দেয়। সেইখানে ক্ষণে ক্ষণে কেবল আমার জয়ধ্বনি ওঠে―কেবলই আমার জয়জয়কার! কেনো ? কারণ আমি হইলাম আমি। বুদ্ধিঅলা, বুঝঅলা, সাধু বিবেকঅলা, অগ্র-পিছন উত্তম রকমে বিবেচনা করনেঅলা একজন! সেইখানে আমিই তো একমাত্র এমন জন। আমার পিতার গৌরবের পুত্রধন। আপনারা বুঝতে পারবেন আশা করি।

সেই আমি, সেই আমিই কিনা―এইখানে এই মাটির দুনিয়ায় আইসা হইয়া উঠলাম একটা মাথামোটা ঠগ। একটা বুদ্ধিনাশা বেকুব! এমনই বেকুব যেয় একটা কাউয়াপক্ষীর দিলের ওঠানামার হদিস নিতেও ভুল করে। আমার তো অইটাও নজরে রাখা উচিত আছিলো। কী করে সেই উচিতরে ভুইল্লা গেলাম!

আমার মুল্লুকের দশজনে জানলে তারা আর কুর্নিশ দিতে আসবো ? না, আসবো না। নিজ চিত্তের ভিতরে নিজেরে নিয়া এমন শরমিন্দা হতে হতেই অই কাউয়ারে অতোক্ষণ আশপাশে থাকতে দিছি। এইখানের সামান্য পইখ-পাখালীয়েও এমন মমতা করতে পারে! আজব কথা না ? তাইলে সেই মমতার লগে তো অনেক ভালা রকমে চিনাজানা হইতে হইবো। আমার সাধ-সুখ-আহ্লাদ সবই যে এখন পইড়া রইছে―এই মাটির সংসারে!

এই কাউয়া পক্ষীয়ে এমন কেনো ? এই কন্যায়ও তো পক্ষীর খাস-কুটুম কেউ না। তারপরেও সে তারজন্য এমন বেদিশা। এমন কাতর। এইখানের একটা পক্ষী যদি এমন মায়াদার হইয়া থাকে, এইখানের এক দিলে যদি অন্য দীলের জন্য টান লাগে, তবে কেমন দরদ থাকবো ? কতোখানি থাকব ? এমন জিজ্ঞাসা আসতাছে―আমার মনে! সঙ্গে সঙ্গেই আবার আমার অন্তরটা টনটনায়ে উঠতাছে। একটা গুপ্ত বেদনায়, একটা চোরা কষ্টে ভিতরটা ঘুরঘুট্টা হয়ে আসতাছে।

আমি এই কন্যারে বাঞ্ছা করি, সেইটা সত্য। যারে আমি বাঞ্ছা করি কিন্তু সেয় তো আমারে বাঞ্ছা করে না। আমার কথাই জানে না। আমারে তো চিনেই না। আমার লেইগা তার দিলে কী কইরা বাসনা জন্মাইবো ? সেয় কী জানে আমার কথা ? জানে না। সেয় কী আমারে কোনোবার চাক্ষুস দেখছে―কোনোদিন দেখে নাই! আমারে সে জানে না চিনে না। অথচ এদিগে তার চরণের কাছেই কিনা আমার দিলে গিয়া পইড়া রইছে।

আমারে চিনলে-জানলে কী তার মনে―আমার লেইগা দরদখান জাগনা দিতো ? দিতো ? কী জানি!

এইসব কথা আমার মনে আসতে থাকে, আর আমি কাউয়াপক্ষীরে খেদানী দিতে―দোনামোনা পাইতে থাকি। পরে এক সময় মনে হইলো, থাকুক না পক্ষীয়ে! আমার অন্যায্য কর্মের আরেকটা সাক্ষী হইয়া। অন্তত কন্যার মা-বাপেরে জানানি দেওয়ার কেউ তো থাকুক!

আমি যা করলাম সেইটা কী কোনো ন্যায্য কর্ম হইছে ? কোনো বিধি দিয়াই কী সেইটারে ন্যায্য কর্ম বইল্লা চালাইয়া নেওয়া যাইবো ? কিছুতেই যাইবো না। আমি তো ন্যায়-অন্যায়ের কোনো ধার ধারি নাই গো।

আমি যা করছি এইটা করা ছাড়া কি আর কোন রাস্তা আছিলো ? ছিলো না! এইটাই আমারে করতে হইতো। নাইলে কন্যারে আমি কেমনে পাইতাম ? পাইতাম না। কাজেই আমি যা করছি, সেইটাতে আমি কোনো দোষ দেখি না। কোনো ভুল দেখি না।

আমি,আমি কী করছি ?

আমি মানুষগো মাইয়ারে চুরি কইরা আনছি! ছলছুতা দিয়া, ভালামানষির ভেক ধইরা, আমি এক কন্যার বিশ^াসের ঘরে চুরি করছি। খালি সেইটাই তো না। আরো আছে। আমি নিজের চেহারা গোপন কইরা অন্য একজনের চেহারা-সুরত ধইরা, কন্যাটারে আমি ভেলকী দিছি। তারবাদে আমি অই কন্যারে হরণ করছি। সত্য সত্যই হরণ করছি!

তবে সোলায়মান পয়গম্বরের কসম খাইয়া কইতাছি, এই কন্যারে আমি মাথার তাজ বানানের লেইগাই নিতাছি। এই কন্যা আমার জিন্দিগীর রোশনাই। আমার আগুন-শইল্লের জ্যোতি। তার বিহনে আমি আমার অতো নাম-যশ-শওকত-দৌলত দিয়া কী করমু ?

এই যে আমি তারে কৌশলে ছিনাইয়া নিতাছি, এমনটা করা ছাড়া অন্য কোনভাবে এই কন্যারে সম্মানটা দিতে পারতাম ? আমার হাতে অন্য কোনো নিদান আছিলো ? আর যে কোনো নিদান নাই রে আমার!

আমি তারে হরণ করে আনছি। কিন্তু দেখো, এই যে এখন পর্য›তও তার নাম ধরে ডাকার ভাগ্যটা পর্যন্ত পাই নাই! আমি নাম ধরে ডাকমু সেইটা কোনো আলগা-পাতলা বিষয় তো না! আমার জন্য সেইটা একটা মস্ত কিসমতের ব্যাপার! একটা বিশেষ সুক্ষণ আসলে,তবেই আমার কিসমতের দরোজা খুলবে। সেই সুক্ষণেই আমি প্রথমবার তার নাম ধরে ডাকতে পারবো। তার আগে কিছুতেই না। আমি সেই ক্ষণের জন্য বার চাইতাছি।

আমাগো দুনিয়ার রীতিনিয়ম তো আর মাটির এলাকার মতন না। সেইখানে বহু বিধি রাস্তা পার হইতে হয়। বহু শোধন-কানুন করার আছে। বহু দিনক্ষণ বাছবিচার আছে। একে একে তার সবগুলাই আমারে কইরা নিতে হইবে! নাইলে আতকার ওপরে তো আগুনে-পানিয়ে মিশ খাওয়ানোর কোনো রাস্তা মিলবো না! কোনোদিন মিলে নাই তো।

পারতাম,আমি পারতাম আমার জাতের বিবেকছাড়া পাষাণগুলার মতন হেন-তেন কুকর্ম করতে পারতাম আমি। এই কন্যার সঙ্গে যদি আমার জাতের কারো কারো মতন বেজাতের ক্রিয়া-কারবার করতে যাইতাম, তাইলে আমার নিজ গুষ্টির কেউ আমারে দুষতো না। মাটির সংসারের লোকেগো আমারে ধরার ক্ষ্যামতা নাই। কোনোকালে আছিলো না। অখনও নাই।

এই কন্যারে নিয়া কী না করতে পারতাম! এমন আগল-পাগল কিসিমের এই কন্যা। ঘরের মুরুব্বিগণের চক্ষু ফাঁকি দিয়া দিয়া কতো নাই কর্মই না করছে। দিনে-রাতে- সন্ধ্যায়-সকালে তারে আমি যেকানো দিন, যেকানো সময়ে, কানাঅলার ফান্দে ফালাইয়া নিরালা ক্ষেতিখোলায় নিয়া যাইতে পারতাম! সে বেভুলা হয়ে ঘুরতে থাকতো। আর আমি বিরলে বইস্যা বইস্যা তারে দেখতে থাকতাম। অদৃশ্যে থাকোন্তী দিয়া দিয়া-এই কন্যারে স¤েভাগ করলেই বা আমারে ঠেকাইতো কে ?

ইচ্ছা হইলে আমি এরে বানকুড়ালী ঘূর্ণি দিয়া ঝাপটা বাড়ি মাইরা―পাতরের বিশাল গাবগাছের মগডালে কী তুলে নিতে পারতাম না ? পারতাম। সেই ভোপড়া গাবের ডালে এরে অচেতন কইরা শোওয়াইয়া রাইক্ষা আমি এর মুখের সুরতের দিগে কী চাইয়া থাকতে পারতাম না ? পারতাম, খুবই পারতাম। আমার জ্ঞাতি-গুষ্টির মরদেরা বা জেনানারা এমন তো আকছার করে যাইতাছে!

৮. ‘যেমতে অন্তরে ফুটিল মোর সোনার কমল!’

কিন্তু আমি কেমনে সেইটা করবো! এই কন্যার সাথে যেইদিন আমার পয়লা দর্শন হইলো, সেইদিনে সেই ক্ষণেই, বিজলির ঝিলিক পড়োন্তীর মতন একটা ঝিলিক জাগনা দিলো আমার সবখানে। আমার দেহে আমার দিলে। একটা শুধু আচম্বিত ঝিলিক। কঠিন,বিশাল। লগে লগে আমি বুঝতে পারলাম, আমার ভিতরে-এইটা কোন ভেজালে জন্ম নিতাছে!

আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না কইরাই, আমার দিলে এইটা কী করতাছে ? আমার দেহের আগুনে আগুনে আশনাইরে জন্ম দিতাছে! ও হো রে দিল! এইটা কী করতাছো তুমি ? তুমি যে আমারে জব্বর বেপালটে, জব্বর যাতনায় ফালাইয়া দিতাছোরে,দীল। নিভাও নিভাও এই ইশকেরে। এই ইশক আমারে শোভা পাইবো না।

ওরে দীল! আমারে ফৈজতের তলে―কলঙ্কের তলে―নিয়ো না দীল।

কিন্তু আমি অতো তোয়াজ-খোসামদ করলেও দীলে আমার কথারে কানে তোলার গর্জ দেখাইলো না! সেয় আমার কথা, বিবেচনা না-কইরা, আমারে কেমন এক জিল্লতীর দিকে-অসম্মানীর দিকে―তুফানের দিকে ঠেলে দিলো! একটা বিজলীর ঝিলিক পড়ার থেকেও কম সময়ের মধ্যে। আমারে কেমন এই যাতনার গর্তে ফালাইয়া দিলো।

অসম্মানী না ? আমি না বাদশাহজাদা ? আমার পিতার মুল্লুকের আগামী বাদশাহ কে ? আমি! সেই আমারে এখন কী করতে হইতাছে ? নিজের শানশওকত সকলই লুকায়া রাইক্ষা, নিজের তেজ-গরিমা সকলই সরায়া থুইয়া, আমারে অন্য একজনের ভেক ধরতে হইছে। নিজেরে দিয়া এইটা কী করাইয়া নিতাছি। ক্যান করাইতাছি! ক্যান করাইতাছি ?

আমার গতরের যে কাঠামোটা আছে, তার বরন সোনালী। মাটির দুনিয়ার রইদের ঝলকের মতন সোনালী! কন্যারে যেইদিন প্রথম দেখলাম―সেই তক্ষণ তক্ষণই আমি দেখতে পাইলাম, মুর্হূতের মধ্যে আমার সোনার বরনের উপরে, অন্য আরেকটা বরন আইসা ঝম্প দিয়া পড়তাছে! তারপর ঝটল-পটল করে এক বর্ণ অন্য বর্ণের লগে মিশ খাইয়া যাইতাছে! নয়া সবুজের একটা ঢেউ য্যান―সোনালী বরনটার উপরে ঝিলিক দিয়া নিজেরে জাহির করে চলতাছে। আমার আগুনের মধ্যে এই নতুন বরনখানের জন্ম নেওয়ার কারণ ?

কারণ একটাই। আমারে আশনাইয়ে পাইছে। সত্য গহন মহব্বতে ধরছে। সত্যকারের আশনাইয়ে যখন আমাগো কেউরে ধরে, তহন এমনটাই হয়! যুগে যুগে আমাগো গোত্রে এমনই ঘইটা আসতাছে।

কিন্তু কেমনে আচম্বিতে আমারে আশনাইয়ে পাইলো! এই কন্যার দিকে তাকানী দিয়া থাকতে থাকতে―ব্যাপারখানা ধরার চেষ্টা করতে থাকি আমি। কিন্তু তখন আমি কিছুই ধরতে পারি নাই।

শুধু ক্ষণে ক্ষণে একটা বেহুদা কথা ধাক্কা দিতে থাকলো। এই কন্যা আমার কিসমতের লিখন। এই কন্যা আমার আগুনের তেজ। আমার অতি লম্বা হায়াতের সমস্ত শান্তি ? তাইলে তো এইজনে আমার আশরত করার কেবল ফূর্তি-আমোদ করার সঙ্গী মাত্র না! ফূর্তি-আমোদের হুজ্জোত দিয়া এরে তো বেইজ্জত করা যাবে না। আমিই এই কন্যার চির আব্রু। আবার, এরে চিরকাল আমারেই রক্ষা দিয়ে যেতে হবে।

আমি আগুন! এই কন্যায় তো আমার জাতের কেউ না। সেয় হইলো কতকটা পানি কতকটা মাটি কতকটা হাওয়ার মিশ্রণ। আর অল্প খানিকটুক হইলো সে তেজের মিশাল। এই দুই আলাদা জাতের মিলনের কী উপায় ? মিলন সম্ভব ?

না না। বিচ্ছেদের কোনো কথাই আসতে দিবো না আমি। মিলন হইতে হবেই। হয় এরে নিয়া আমি দীওয়ানার দীওয়ানা, রাহে মুসাফির হইয়া যাবো। নাইলে এর সঙ্গে বাদশাহজাদার জিন্দিগী গুজরান করা হইবো আমার। এর বাইরে অন্য কিচ্ছু হইতে দেওয়া যাবে না। আমি দিবো না।

এদিকে এমনই কিসমত―এই যে যার জন্য এমন বেচইন দশা, সে এইসবের কিছুই জানে না! সে আমারে চেনে না পর্যন্ত! আমি যে এক মুল্লুকজাদা। এই কন্যার জন্য বেতালা। কোন দুনিয়ায় বিরাজ করি। সেই সকল কিছুই এই কন্যার অজানা।

না জানে না-জানুক সেয়। আমি তারে সকল বিষয়ই ক্রমে ক্রমে জানায়ে নিবো নে। একদিন তো সব কথা খোলাসা করে দিতে হবেই। আমি সেই পয়লা দিগে দিলের লগে এই কথাই সাব্যস্ত কইরা নিই।

প্রথম যেদিন দেখা হয়, সেইদিন দুনিয়াভরা রইদ আর রইদ! আমার মুল্লুকের রইদ না সেইটা। সেটা হইলো মাটির দুনিয়ার রইদ। এই যে এখন যেমন চৈতমাস যাইতাছে, সেইটাও তখন ছিলো চৈতমাইস্যা দিন। দিনের একেবারে দোপোরের ক্ষণ। একেবারে মাঝ দোপোর।

দেওভোগ গেরামের পুবে আছে এক গাব গাছ! বিশাল ঝাকড়া মস্ত লম্বা সেই এক গাছ! সেই গাছের অতি উঁচায় বইসা―বাঁশিতে হালকা একটা ফুঁ দেওনের জোগাড় ধরছি। মাটির জগতের এই প্রহরটারে আমার বহুত পছন্দ হয়। আমাগো মুল্লুকে এমন ক্ষণ দেখা যায় না। সেইখানে সুরুজ আসমানের এক কিনারে একটুখানি উঁকি দেয়! তারবাদে সে সেইনেই থাকে। এক কিনারে একটু ফুক্কি দিয়া সেইখানেই রইয়া গেল যুগ-জনম ভর।

আমার মুল্লুকে কোনোদিন দোপোর আসে না! সুরুজে কোনো সময় ডুবুন্তীতেও তো যায় না! সকল সময়ে সে আসমানের পুব কিনারে! কেবলই পুব কিনারে! সেই কারণেই কিনা কে জানে―মাটির দুনিয়ায় অই দোপোররে আমাগো মুল্লুকের সগলতের এমুন ভালা লাগে! এইখানে সুরুজে মাথার উপরে যায়! এই যাওয়ার ঘটনাটা―আমাগো মুল্লুকের সগলতেরে অতি পাগল বানাইয়া রাখছে! দলে দলে সগলতে না―এইটা দেখতেই―এই মাটির জগতে আইসা হানা দিতাছে! যুগ যুগ ধইরা অই-ই কইরা যাইতাছে!

আমাদের সকলে আবার আসে মাটির দেশের সন্ধ্যার সময়ে। তখন এইখানের সুরুজ ডুবতে থাকে। সেইটাও তো আমাগো লাইগা যাহা-তাহা সামান্যি ব্যাপার না―অতি আশ্চর্য ব্যাপার!

দেওভোগ গেরামের দুপুরে আসি দুই কারণে। এক হইলো সুরুজের খেইলরে দেখা। দুই হইলো শা›িত হালে বংশী বাজানো। আমি তখন সদ্য সদ্যই বংশী বাজানো শুরু করছি। আমি বাদশাহজাদা! আমারে ঢাল-তলোয়ারের কায়দা-কানুন শিক্ষা করলেই তো খালি চলে না! বাদশাহজাদারে কিতাব-কালামও বিস্তর রকমেই শিক্ষা করোন লাগে! তবে এইসবের বাইরে―বাদশাহজাদায় যদি অন্য আরো কিছু শিক্ষা নিতে চায়―তা সে করতে পারে।

আমার তখন সাধ জাগলো―আমি মাটির সন্তানগো মতন বংশীবাদন শিক্ষা নিমু। তখন তিন বিজলীর মিশাল দিয়া আমাগো বংশী কারুকারে আমার জন্য বংশী বানাইলো! কিন্তু সেই বংশীতে আমি আর কিছুতেই সুর বান্ধতে পারি না, পারিই না!

এইটা কী প্রমাদ রে! বাদশাহজাদায় বোলে বংশীরে দখল করোনের হ্যাটাম রাখে না! আমার পিতা-হুজুরের পাত্রমিত্ররা হাসাহাসির তুফান ছেড়ে দেয়! সবকিছু বুঝেশুনে শেষে আমার ওস্তাদে কয়, এই বংশীতে যদি বাদশাহজাদায় সুর ধরতে চায়,তবে তারে মাটির দুনিয়ায় গিয়া শিক্ষা-কসরত করতে হইবো। নাইলে অন্য আর কোনো উপায় নাই!

আমি কিছু একটারে শিক্ষা করতে চাইছি , সেইটারেও আয়ত্তে আনতে পারি নাই! এমুন ব্যাপার আবার হয় নিকি ? এমনটা হইছে কোনোদিন ? হয় নাই! আমি তখন করলাম কী, ওস্তাদের হুকুম মাথায় নিয়া―তগনগদ আইসা হাজির হইলাম―অই মাটির দেশে!

আমি বাদশাহজাদা! মাটির দেশের যেইখানে আমি পাড়া দিমু, সেইখানে কেবল আমারে একলাই উপস্থিত থাকোনের বিধি! আমার মুল্লুকের আর কারো সাধ্য নাই―সেইখানে গিয়া হাজির হয়! তাইলে সেইটা হয়ে যায় ঘোর বেদ্দবী! কাজেই দেওভোগে থাকার মধ্যে থাকলাম কেবল আমি। আমার মুল্লুকের আমি একজনে বাদশাহজাদায়!

আমি গাবগাছে গিয়া, নিজেরে সটান বিছান্তী দিয়া, একা একলা কসরত-মকসো চালানো শুরু করলাম। এমনে আমি ক্রমে― যতোক্ষণ মন চায় কায়দা-কসরত করি। যহন মন চায় নিজ মুল্লুকে ফিরা যাই।

সেইদিন ভরভরা দোপোর! গাবগাছের নিজ্জুম উঁচার ডালে বইসা, তখন আমি খালি বংশীতে ফুঁ দেওয়ার ব্যবস্থাটা নিছি মাত্র। তখন দেখি এ কী বিষয়রে! মাটির সংসারের এক কন্যায় গাবগাছের তলে খাড়া। এমন বেলায় ? এমন বেলারে মাটির মনুষ্যি ডরাইয়া-মরাইয়া চলে। বেলার এই সময় ভিটির নামায় যাইতেই ডরায়। আর এই কন্যা, এই সময়ে এইখানে ?

আইচ্ছা, তার রকমে সে এইখান থেইকা চইল্লা যাক। তারপরে আমি কসরত শুরু করমু নে। এমন ভাবনা মনে নিয়া―আমি ঝুম দিয়া বইসা থাকি! মানে মানে আলা যাউক গা সে। কিন্তু দেখো কারবার! কন্যায় তো যাওয়ার নামও নেয় না! বরং সে গাবগাছের উঁচা ডালগুলা বরাবর উল্টা-সিধা লম্ফ দিতে থাকে! বার বার লম্ফ দিয়া কোন ঠাইল্লাই নাগাল পায় না। তাও সেয় লম্ফ দিতেই থাকে!

আরে কী ব্যাপার! মানুষগো কন্যায় এমন আচুইক্কা লম্ফ দেয় ক্যান ? বেপারখান ভালোরকমে বোঝার জন্য আমি এক ঝলকায় নিচে নাইম্মা আসি। কী চায় কন্যায় ?

সেয় চায় গাব পাড়তে। এই চৈতমাইস্যা দিনে। গাবগাছের ডালে ডালে হাজারে-বিজারে গাব! গাছ-পাকনা সব গাব! ডালে ডালে গমগমা সোনা-হলুদ বরনের গাব। পাকনা গাবের গন্ধে আশপাশের ক্ষেতিখোলা, বাতাস-জমিন কেমন ফুরফুরাইতাছে! এই কন্যায়ও গাবের সন্ধানে আইছে ? গাব পাইতে চায় সে ?

আইচ্ছা নেউক সে কতো নিবো। তারবাদে সে এইহান তেনে বিদায় হউক। আমার তো কসরতের বিলম্ব হইয়া যাইতাছে।

আমি তখন গাবগাছের ঠাইল্লায় একটা জোর ঝাঁকুনী দিয়া দেই। গাবেরা ছড়ছড়াইয়া নিজেগো বোটার তেনে তখন খইস্সা পড়তে থাকে। ঝরঝরাইয়া পড়তে থাকে! সেইটা দেখতে দেখতে―সেই কন্যার মুখে কী হাসি! কেমুন হাসি যে বাইজ্জা ওঠে তখন! ঝিমির ঝিমির ঝিম! ছিমির ঝিমির ঝিম-ঝিম ঝিম!

মালিক সাঁই! এইটা কী শুনি আমি! এইটা কী মানুষগো কন্যার হাসির আওয়াজ ? নাকি আমার বংশী বেজে উঠছে ? আপনা তেনে বংশী বাজে নাকি কন্যায় হাসে!

হাসতে হাসতে সেই কন্যায় তো গাব টোকায়ে টোকায়ে তার কোচড়ে নিতে থাকে, সে কী সেইসবের লগে লগে আমার দিলও নিজ কোচড়ে ভইরা নেয়। সে কিছুই জানলো না। আমার দিল-জিন্দিগী-বাঁচোন-মরণ সব তার কোচড়ে নিয়া―অই দেখো সে যাইতাছে গা!

তারপর দিন যায় দিন যায়! কিন্তু আমার দিন য্যান আর যাইতে থাকে না! আমার চিত্তের ভিতরে কেবল এক চিন্তা! এই কন্যারে পাওয়ার কী উপায় ? এরে আমার সংসারে ঠাঁই দেওনের কী উপায় ? এর হস্তে আমার হস্তখানরে সইপ্পা দেওয়ার কী উপায় ? আছে কোনো উপায় ?

আর দেখো কী বিপদ! কী বিষম বিপদ!

এই কন্যা নিষ্কণ্টক রকমে তো আমার জন্য না। তার চাহনেঅলা আছে একজন। সেইজনে বড়ো বেতালা-রকমের এক চাহনেঅলা! অনেক বিষম রকমের মাশুক―সেইজনে! তার নাম ইসুফ মিয়া। এই কন্যার অন্তরও কিনা সেই চাহনেঅলার লাইগা―ইসুফ মিয়ার লাইগা―ধড়ফড় ধড়ফড় কইরা শেষ হইয়া যাইতাছে!

আরে! আরে! এইটা তো হতে দেওন যাইবো না! এইটা হবে না! একদম হবেই না! এই কন্যা আমার! এই কন্যা আমার! সেই চাহনেঅলার সকল মায়াবাসনার পরেও, এই কন্যা আমার! চাহনেঅলার জন্য―এই কন্যার দিলে অতি তেজী-টানের পরেও-এই কন্যা আমার! এই কন্যার জীবনে―সে আমার! এই কন্যার মরণেও―কন্যায় আমার! এই কন্যা আমার!

কিন্তু তারে পাওনের উপায় কী ? কেমনে ? কীপ্রকারে ? কীভাবে ?

নাকি আমি এই দেওভোগ গেরামে এক বজ্রভরা মেঘ দিয়া, ঠাটার কোপ দিয়া দিয়া, ছিঁড়া বান্না বান্না কইরা ফালামু ? নাকি আমি স্বয়ং আগুন হইয়া সকল ভিটিরে পোড়া-আংড়া বানাইয়া দিমু ? আমি কী করবো ? কী করবো ?  কেমনে আমার বক্ষে পাবো ? আমার হাতের ঘেরে পাবো ? কেমনে ?

কন্যার জন্য আমার চিত্ত যতো বেতালা হয়―ততো য্যান আমার ক্রোধ শীতল হইতে থাকে! ততো য্যান আমার দিলে আমারে বলতে থাকে, ‘ যে কিনা মুল্লুকজাদা হয় সে কী কোনো জীবেরই অনিষ্টি করতে পারে ? সে না রক্ষাজাদা! সে ক্যান কলের কাম করতে যাইবো ? সে কলের কাম-কলেই করবো! সে কোনো-না কোনো বুদ্ধি-কৌশলের রাহা দিয়াই―নিজের জিতুন্তী জিতবো! জিতবোই সে! জিতোনের উপায় বিছরাও মুল্লুকজাদা। খোঁজো নিদানেরে, খোঁজো।’

সেই উপায় বিছরাইতে বিছরাইতে আইজকা এক বচ্ছর গেলো!

এই যে আমার সেই বাঞ্ছাধন কন্যায়, এখন আমার সম্মুখে! তার হাতে এই হাতখান তুলে দেওয়ার জন্য―কতো না রাস্তা বিছরাইতে হইছে আমারে! কতো না উপায় খুঁজতে খুঁজতে―কাতরের কাতর হইতে হইছে আমারে!

যদি আমি এই কন্যারে নিয়া তাগো ধুলা-মাটির দুনিয়ায়ই থাকার নিয়ত করতাম, তাইলে আমি আগ বাড়ায়া তার হাত ধরে নিলে ভেজালের কিছু আছিলো না। কিন্তু আমার নিয়ত তো সেইটা না। আমার নিয়ত কন্যারে নিয়া নিজ মুল্লুকে ফিরত যামু।

এই কন্যায় জানুক বা না জানুক। আমি তো জানি। সে আমার জিন্দিগীর অংশ। এরে নিয়া নিজ মুল্লুকে ফিরত যাইতে হবে। আমি যদি বাদশাহজাদা হই। এই কন্যার মর্যাদা তাইলে কী হয় ? এই কন্যায় হয় তাইলে মুল্লুকজাদী! তারে তো মুল্লুকজাদীর মর্যাদার আসনখানে নিয়া ঠাঁই দিতে হইবো। নাইলে আমার শান দৌলত রোশনাই দিয়া আমি কী করমু ? এই কন্যারে ছাড়া কিয়ের রোশনাই ? সেইটা হয় না! হয় না!

বেদিশা আমি খালি তড়পানি খাই। তড়পানি খাই। কী করি, কী করি! কেমনে আমি নিদানের খোঁজ পাই। কেমনে কোনো একটা রাহার সন্ধান পাই ? কে আমারে সেই রাহার খোঁজখানা দেয়। আগে তো আমি নিদানের সন্ধান পাইয়া নেই, তারবাদে সকল কথা পিতা হুজুররে জানাইতে কতোক্ষণ ?

শেষে কিনা একদিন আপনা থেকেই আমার মনে আসে, আমার মুল্লুকে তো আছে একজন। সত্যকারের উপকারী একজন। পথের ফায়সালা দেখানের একজন আছে তো। এক সাধু আছে। সেই এক সত্য-পীর! কামেলদার বুজুর্গ!

আমি তার কাছে গিয়া হত্তা দিয়া পড়লাম। পড়লাম একদম তার পাওয়ের কাছে। হইতে পারি আমি বাদশাহজাদা। কিন্তুক এইজন তো বুজুর্গের বুজুর্গ! তার নূরানী কলবের সামনে আমি কে। তার সামনে খাড়ানের লায়েক নিকি আমি!

৯. পন্থে পন্থে কতো না কণ্টক!

বুজুর্গরে আমি কইলাম,‘আমারে রক্ষা দেন!’

‘এমুন অসম্ভবরে যুক্ত করাইতে যাইয়েন না শাহজাদা!’ বুজুর্গে আফসোসে চির চির হইতে হইতে কয়; ‘ আপনে না-বুঝ হইলে বুঝতাম! কিন্তুক আপনের বুঝ-বিবেচনার সুখ্যাতি সপ্ত মুল্লুকরে ছাপাইয়া গেছে! সেই আপনের এ কী না-বুঝপনা বাদশাহজাদা ?’

‘আমারে রক্ষা দেন বুজুর্গ। পন্থের নিদান দেন।’

‘আগুনে-মাটিয়ে কিঞ্চিৎ আশনাই হইলে হইতেও পারে শাহেনশাহ পুত্র।’ বুজুর্গের গলারে কাতর হয়ে উঠতে শুনি আমি ‘কিন্তু আগুন-মাটির সেই আশনাই তো চির মিলনের কিসমত পায় না! এমুন বিধান নাই! এমন মিল-মহব্বতের কোনো উপায় এইনে নাই! আপনে এইটা কেমুন অসাধ্যিরে―সত্য বানাইতে চান মুল্লুকজাদা! এইটা স্বপন মাত্র!’

‘আমারে পন্থের খোঁজ দেন বুজুগ। আমারে রক্ষা দেন।’

‘বাদশাহজাদা! আরেক হইতে পারে, মাটির দুনিয়ায় এই কন্যারে আপনে আপনার মাশুকা বানাইয়া, মাটির দেশেই তারে ফালাইয়া রাখতে পারেন! তারবাদে আপনে যেকোনো ক্ষণে তার সামনে গিয়া হাজির হন। তারে রতি দেন। নিজে রতি নেন। তারবাদে নিজেরে নিজ মুল্লুকে ফিরাইয়া আনেন।’ বুজুর্গ বেদিশামুখে ফায়সালা দেয়।

‘আমি তো অমন কুমীমাংসারে কানে নিমু না বুজুর্গ! আপনে জানেন, মাটির মনুষ্যের লগে মুল্লুকের বহুজনে অই-ই করে আসতাছে। সকল যুগে-জনমে। আপনে আমারে হিত-পন্থের খোঁজ দেন। আমারে রক্ষা দেন।’

‘মাটির কন্যারে মাটির-সংসারে রাইক্ষা, আশনাই বহাল রাখাই আরামের,শাহজাদা।’ বুজুর্গ পেরেশান মুখে বলে, ‘এমন হইলেই সবদিক রক্ষা! মুল্লুকের বাদশাহজাদারও সেই রাহা নেওয়া ছাড়া অন্য গতি নাই!’

‘এইটা কোনো সহী মীমাংসা হইলো না বুজুর্গ!’ আমি তার কদম মোবারকের উপরে নিজেরে পুরা ঢাইলা দেই। ‘বুজুর্গ উপায় দেন, আমারে সহী উপায় দেন।’

‘রাস্তা একটা আছে বাদশাহজাদা! কিন্তু সে বড়োই জিল্লতির রাস্তা! সেই পথে একবার রওনা হইলে―যাত্রা শেষ করতেই হয়। মধ্যপথ তেনে ফিরতি আসোনের―কোনো উপায় এইখানে নাই! পারবেন স্ইেটা করে যাইতে ?’

‘পারমু বুজুর্গ।’

তারপর বুজুর্গের দেখানো রাস্তা ধরে ধরে এই এক বচ্ছরকাল ধইরা চলতাছি আমি। যাত্রা শুরুর কালের সাধন-যাচন যা যা করার আছিলো, করছি আমি। কিন্তু সত্য বলতাছি সেই সাধন-যাচন আমি শান্তিহালে করতে পারি নাই্ অন্তর ভরা শান্তি নিয়া কিছুই করতে পারি নাই আমি।

কেমনে পারমু ? যেই কন্যার লাইগা―দুই ভিন্ন মুল্লুক-তাল্লুক ছিঁড়া-ফাইড়া নান্দীনাশ করে দিতাছি। সেই মাইয়ায় কী একটুও কিছু জানলো ? জানলো কোনো কথা ? সে তো পুরা আন্ধারে-অজ্ঞানে পইড়া থাকলো! সে তো আমারে চিনলও না, জানলও না! সেয় তো কেবল ইসুফ মিয়ার লাইগা তেনাতেনা হইতে থাকলো!

তাইলে কিসের জন্য কী করতেছি আমি ? এমন দুরন্ত ভাবনায় আমার দিল কী ফালাফালা হয় নাই ? হইছে―ক্ষণে ক্ষণে হইছে।

গোপনে গোপনে, সেই কন্যারে পাহারা দিয়া থাকতে থাকতে, একেকবার আমার বাঞ্ছা হইছে, একবারের জন্য তারে দেখা দেই ? এক ঝটকার জন্য তারে দেখা দিয়া বলি যে, ‘ওগো কন্যা! এই দেখো কে আমি ?’

কিন্তু সেইটা তো হওয়ার না। বুজুর্গের নিষেধ আছে যে। সেইটা তাইলে মহা এক সর্বনাশের কর্ম হইয়া যাইবো। অমন করোন যাইবোই না।

আরো নিষেধ আছে। বুজুর্গ বলছে, যতোদিন এই কন্যা―তার নিজ হাত বাড়াইয়া―বাদশাহজাদারে গ্রহণ না করবো, ততোদিন পর্যন্ত কন্যারে নাম ধরে ডাকা যাবে না!

যতোদিন পর্যন্ত এই কন্যার চিত্তে বাদশাহজাদার জন্য ইশক না জন্মাইবো,ততোদিন পর্যন্ত বাদশাহজাদার হাতরে কন্যার হাতের দিগে বাড়াইয়া দেওয়া যাইবো না!

যেইদিন কন্যায় শাহজাদার হাতরে নিজ হস্তে ধারণ করবে। সেইদিনই কন্যারে নিয়া নিজ মুল্লুকের দিকে যাত্রা করার সুক্ষণ পাবে বাদশাহজাদায়! তবে যাত্রাপথে, কন্যারে পঞ্চ সিনান দান করে নিতে হবে! সবশেষে,কন্যার কপালে অগ্নিমঙ্গল করানো গেলে, তবেই কন্যার দেহখানা বাদশাহজাদার মুল্লুকে ঢোকোনের শুিদ্ধ লাভ করবো।

না না। আমি কোনোদিন নিজের আশনাইয়ের জোশ নিয়া কন্যারে যাতনা দেই নাই। আমি কেবল অগোচরে থাইক্কা তারে আগলাইয়া রাখছি। সে যখন চুপেচাপে। সকল জনের আড়ালে-আউলে। ইসুফ মিয়ার লগে গপসপ করে। সেইখানে আমি একটু তফাতে বইসা তারে নজরের উপরে রাখছি।

ইসুফ মিয়ায় প্রায় প্রায়ই কন্যার বেণীতে ঝটকা টান দিয়া দিয়া―কন্যারে সোহাগ দেখাইতে গেছে! তখন কতো সময় আতকা টানের চোটে―কন্যার চোখ দিয়া পানি ঝরা শুরু করছে! আর সেই আবালে কন্যার চক্ষের পানির দিকে ফিরাও দেখে নাই! আপনা খেয়ালে নিজের রাস্তা দিয়া হাইটা গেছে!

তখন এক হস্ত পরিমাণ দূরে খাড়াইয়া কে ঝুরঝুরা বাতাস কন্যার দিকে পাঠাইয়া দিছে ? কে কন্যার চক্ষের পানি মুছাইছে ? সেই তো আমি!

রাত্রি নিশিকালে কন্যায় নিদ্রা গেছে। আমি ঘরের দরজা বরাবর দাঁড়াইয়া তারে পাহারা দিয়া গেছি।

কুপির মিটমিটা আলোয় সেই মুখের মায়ারে দেখতে দেখতে―আমার আগুন চক্ষে কী পানি আসে নাই ?

পিতা-হুজুরে বারংবার ডাক পাঠাইছে, ‘ বেটা ফিরা আয়’।

আমি কী তাও সাধন-যাচন ছাড়ছি ? এক চুল সইরা গেছি ? যাই নাই।

এখন এই কন্যার অই হাত আমার হাতের মুষ্টির মধ্যে! এই মুষ্টি কী আর এই জনমে খুলতে দিমু আমি ? এই জনমে দিমু না! আমি জানি তো আমার জন্য কোনো প্রকার বাঞ্ছাই―কন্যার পরানে জাগে নাই! সেইটা জাগাইয়া দেওয়ানো সম্ভব হয় নাই! আমার যেই আগুন-সুরত! সেইটারে যদি আমি তার নয়ন-গ্রাহ্য কইরা আনতাম,তাইলে কী সে সহ্য করতে পারতো ? পারবো কোনোদিন ? পারবো না! পারবো না!

তাইলে আমি আর কী করতে পারি ? কী করতে পারি গো মালিক সাঁই ?

করার মধ্যে কেবল একটা কর্মই করা যাইতে পারে! আমি তো সেই বেগানা নাদান মাশুক―ইসুফ মিয়ার সুরত নিজ অঙ্গে নিয়া নিতে পারি! আমি ইসুফ মিয়ার ভেক তো ধরতে পারি! বচ্ছর ভইরা দন্ডে দন্ডে এই কথা আমার মাথায় আসছে! দন্ডে দন্ডে আমি নিজের মনেরে বুঝ দিছি! মনরে সম্মত করাইছি!

সেই ভেকই তো এখন ধরে আছি আমি। সেইটা নিয়া আমার অন্তরে কোনো ঘিন-পিত হয় নাই। যেই সুরতেই থাকি না কেনো আমি তো আমিই। আমি আমিই!

কন্যা আমার জিয়নে-মরণে। আমার সুক্ষণে। আমার ঘোর দুষ্কালেও সে আমার।

সাধন-যাচনের অন্য সকল বিধি পালনি শেষ করছি আমি। এখন খালি একটা গুরুতর কর্ম করার আছে। জুলেখা কন্যার অন্তরে মায়া সৃজন করতে হবে! এই যে আমি! এই আমার জন্য মায়া!

আমি থাকলাম নাইলে চিরকাল ইসুফ মিয়ার সুরত নিয়াই থাকলাম। কন্যার সম্মুক্ষে থাকলাম নাইলে সেই বেশ ধইরা। কিন্তু একটু পর জাগনা পাইয়াই তো সে জানবো আমার সত্য পরিচয়! তখন ? তখন আমার লাইগা মায়া জাগবো তো তার পরানে ? যদি না জাগে ? তাইলে ?

তাইলে এইবার আমারে একটা নিদয়া কর্ম করোন লাগবো! লাগবোই!

কন্যার অন্তরে ইসুফ মিয়ার জন্য যেই বাসনাখান আছে, সেই বাসনারে আমার দিগে টেনে আনতে হইবো! সেই ইসুফ মিয়ার লাইগা―যেই কান্দন কন্যার পরানে কুলুকুলু বইয়া যাইতাছে, অই স্রোতখানরে―এই এক্ষণ থেইকা―এই আমার দিকে বওয়াইয়া দিতে হইবো!

যাও! যাও রে মন্ত্র! কন্যার বাঞ্ছারে ভুল পন্থের ভেজাল তেনে সরাইয়া আনো! আনো আমার দিগে! আসো রে কান্দনঢেউ! অরে গম্ভীরা ঢেউ! এই আমার দিগে বওয়া শুরু করো তুমি! কন্যার অন্তরের বাঞ্ছাঅগ্নি রে! তুমি এই আমার লাইগা ফলক দিয়া ওঠো! এই এক্ষণ থেইক্কা Ñআমার লাইগা জ¦লো রে তুমি!

এই কথা কয়টারে আমি, তেজালো তুরুত বিজলী বানায়ে জুলেখার অন্তরের দিকে, এই যে পাঠায়ে দিলাম! যাও! যাও রে বিজলী! তার পরানরে আমার পরানের লগে জোড় বান্ধাইতে যাও!

ওগো কন্যা, আর কতো নিদ্রা যাইবো! জাগো এইবার! এই যে ঠা ঠা পোড়া দুপুরখান যাইতাছে গা! সেইটারে যে বিফলে যাইতে দেওয়া যাইবো না!

এই তো আজকা সন ১৩৩০।

চৈত্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের কাল যায়! আজকা যায় মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীর তিথি―এমন পূর্ণা তিথিতেই কেবল সর্বাংশে সিদ্ধিযোগ হয়।জাগো কন্যা―কিরপা দেও। এই অভাইগ্যার হাতখান তুমি ধরলাই যদি―তবে এইবার তুমি তার অন্তরের দিকে একটু চাও! এট্টু তাকাও! এই তোমার চক্ষের মণিতেই এই পাগলের জীয়ন-অজীয়ন! এই সত্য তুমি কবে জানবা! জানলেও কী পুরাটা বুঝবা। বুঝবা নি ? কী হাছা করলাম, কী মিছা করলাম সেই বিছার পরে হইবো নে গো!

ওলো মনুষ্যের ঝি!

এই অগ্নি যে তোমারে বাঞ্ছা কইরা পুইড়া ফুরাইয়া যাইতেছে গো! এইবার জাগো লো তুমি! এমন কইরা ডাকলে,স্বয়ং মেঘেও না বিষ্টি হইয়া ধরা দিয়া দেয় ? আর জুলেখায় তো ছাই এক মাটির মাইয়া। সে জাগনা না পায় কেমনে ? সেও জাগনা পায়। এই তো চক্ষের সামনে ইসুফ মিয়া ভাইয়ে।

কিন্তু এইটা জুলেখায় কই আইয়া পড়ছে―কোনখানে ?

‘অই আমার বাপের তাল্লুক-মুল্লুক গো কন্যা! অই যে সামনে! আমাগো যুগ-জিন্দিগির বসত¯থল!’

অই যে সামনে, আসমানের একদম কাছে, মস্ত কাঁসার থালের মতন―

অইটা কী জাগনা দিয়া আছে ?

অইটার কথাই কইতাছে মিয়াভাইয়ে ? অইনে যাইতে হইবো ? কিন্তু ক্যান ? অইনে ক্যান ?

নিজেগো বাইত যাইবো না তারা দোনোজনে―

দেওভোগে!  

 [হরণ পর্বের এখানেই সমাপ্তি।]

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares