ইদ্দতকালে ভিন্ন স্বর : মিলটন রহমান

উপন্যাস

পুরো শরীরে রি রি করা সুখ। আহা, মোস্তফা এ কি মন্ত্র দিল। খোলা বিল বেয়ে দক্ষিণের হাওয়া ঢেউ হয়ে খেলে গেল পুরো শরীরে। কোমরে শক্ত গিঁট না হলে শেষ রক্ষার কোনও উপায় ছিল না। হাত ছোঁয়ালেই সুখ। মোস্তফা তাড়া দিলে, হাতের গতি আরও বেড়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই পুরো শরীর কয়েকচক্কর ধাক্কা দিলে চোখ বুজে থাকে নিতাইচান। একি রহস্য! মাথার ওপরে বটের পাতারা সর সর করে মগজের ভেতর ঘাঁই দিয়ে যায়। ওই বটের খোদলার ভেতর থাকা কালন্তর সাপটি জিহ্বা বের করে লালা ছেড়ে যেন ঝেড়ে ফেলছে বিষ। আহা কি শান্তি। প্রত্যন্ত ঘোরের ভেতর মগ্ন হয়ে যায় নিতাইচান। এমন তো আগে কখনও হয়নি। মোস্তফা কীভাবে জানল এ সুখের খবর!

সেই প্রথম শরীরের খবর জানল নিতাই। বয়স সবে এগারো। মক্তবে হুজুর বলতে শুনেছে, নাপাক শরীরে থাকলে গুনাহ হয়। সে সঙ্গে কিছু ব্যাখ্যাও ছিল। তাতে প্রশ্রাবের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু কোনও উপাদানের কথা ছিল না। তারপরও দাদার কথা কানে বাজে। তার কাছে শুনেছে মানুষের পাপ গণনা হয় বার বছর বয়স থেকে। এখনও আরও এক বছর বাকি। এখন যা করবে তার কোনও হিসাব মুনকার-নাকির লিখবে না। মোস্তফা বলেছে, এই হাড়ি পুকুরপাড়ে প্রতিদিন নতুন এই সুখের খেলা জারি থাকবে। আরও এক বছর অন্তত। কিন্তু নিতাই এক বছর পরে এই খেলা থেকে সরে যেতে চায় না! তাতে কি পাপ হবে ? আর পাপ বিষয়েই বা সে ভাবছে কেন। দৃশ্যকল্প দাঁড় করালে পাপের আদল কেমন ? এর পরিমাপ কি ? পাপগ্রস্ত কোনও একজন মানুষের চেহারা স্মরণ করার চেষ্টাও করে। ট্রেনে এক পা কাটা পড়ে এখন পঙ্গু জীবন যাপন করছে মকবুল। তাহলে কি মকবুল মানে পাপ ? পাপ যারা করে তাদের কি পা থাকে না ? শিউড়ে ওঠে নিতাইচান। পা না হলে হাড়ি পুকুর পাড়ে আসবে কি করে ? এত সুখের খেলা, এমন রি রি ঝিক ঝিক অনুভব। এ থেকে কোনও মতেই রেহাই পেতে সে চায় না। আবার ভাবে মকবুল নয়, হুজুরই বলতে পারবেন পাপ দেখতে কেমন। মক্তবের হুজুর নিশ্চই পাপের আদল দেখেছেন। তিনি যেভাবে বর্ণনা করেন, তাতে করে না দেখেও পাপ বিষয়ে একটি ভীতি কাজ করে। এ মুহূর্তে মোস্তফা তার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। সে বলেছে, ওই হাত চালানোর সময় নিজের দেখা সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটিকে কল্পনায় রাখতে হবে। কিংবা হতে পারে আলিফ লায়লার শাহজাদি গোলাপশাহ। প্রতি বুধবার বাজারের ক্লাবে বিটিভিতে আলিফ লায়লা দেখা ছিল মাদকের মতো নেশা। ওই নেশা এখন সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত উস্কে দিবে। এ ভাবনা নিতাইয়ের শিরায় শিরায় রতিগ্রস্ত মিউজিক ঢেলে দিচ্ছে। সে নেচে নেচে ওঠে। ভাবতে থাকে কেমন হতে পারে সেই মুহূর্ত। নিজেকে আলাদিনের মতো ভালোবাসার আগুনে পতঙ্গই মনে হচ্ছে। যেভাবেই হোক ঘোৎ ঘোৎ করে ওঠা সাপের বিষ ঝাড়তে মোস্তফার মন্ত্রের বিকল্প নেই তা জেনে গেছে সে। নিজের গ্রামটিকে এখন অন্য রকম মনে হয় তার। সবকিছু নতুন। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের আড়াল ছেড়ে স্বর্ণথালার মতো উঠে আসা ভোরের সূর্যের মতো মনে হয় সব। বাড়ির পাশে রেল লাইনে দাঁড়ালে বহুদূর যেন দেখা যায়। দৃষ্টি ওই দূরের লাইটপোস্ট ছেড়ে আরও অনেক দূর চলে যায়। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়োয় জেগে থাকা বৃক্ষগুলোকে অনেক কাছের মনে হয়। মনে হয় ওই উঁচুতে উঠতে এখন আর তার তেমন বেগ পেতে হবে না। পুকুরে স্নানের সময় জলেরা আগের চেয়ে অনেক বেশি কামড়ে থাকে শরীরে। ঢেউয়ের তোড়ে পৎ পৎ করে ভাসতে থাকে কৈশোর। জলের ছোঁয়ায় শক্ত হয়ে ওঠে। জলে ভাসা পানকৌড়ির ঠোঁটের মতো ধারাল মনে হয়। যেন হাত ছোঁয়ালেই জল কেটে কেটে দেখা দেবে তীব্র সন্তরণ। নিজেকে তার অনেক চতুর এবং বুদ্ধিমান মনে হয়। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেকে ভাবুক হিসেবেও ভাবতে শুরু করেছে নিতাই। শিশুত্ব পেরিয়ে কৈশোর বিজয়ী নিজেকে বড় ভাবতেও কোনও বেগ পেতে হচ্ছে না তার। তার এই পরিবর্তন কারও দৃষ্টি এড়ায় না। সবাই মনে করে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিতাইচান স্বাভাবিক মনে করে না। নিজেকে অস্বাভাবিক এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। উত্তরপাড়ার ছবি কেন অচেনা একজনের সঙ্গে পালিয়ে গেল, সে বিষয়েও তার ভাবতে ইচ্ছে করে। রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় বেড়া টপকে কানে আসা কবির চাচা ও চাচির চাপা গোঙানি এখন তার কাছে পরিচিত মনে হচ্ছে। আরও এক বছর আগে তীব্র শীতে কাথার নিচে কিচ্চা শোনার সময় বিনু আপার হাত কেন বার বার আসা যাওয়া করেছিল তাও এখন বুঝতে পেরে আগামী শীতের জন্য অপেক্ষা তাকে অস্থির করে তোলে।

নিতাইচান তার নাম নিয়েও বিস্তর ঝামেলায় পড়েছে। ওই মক্তবের হুজুরই এই ঝামেলায় ঘি ঢেলেছেন। বলেছেন নিতাই আবার সঙ্গে চাঁন কারও নাম হবে কেন ? মুসলমানের নাম নিতাই কেন হবে ? সন্তানের নাম সম্পর্কে সে ব্যাখ্যা মিরচান বহুবার উপস্থিত করেছেন। বলেছেন নিতাই অর্থ নিত্যানন্দ। প্রতিদিনের আনন্দ। তার সঙ্গে হিন্দু ধর্মের সম্পর্ক কোথায়। সেই সঙ্গে চাঁন তো রয়েছেই। এতে আপত্তির কি আছে। আচ্ছা সে না হয় বুঝলাম যে হিন্দু ধর্মের নিতাই বা নিত্যানন্দ প্রভু ছিলেন, শ্রীকৃষ্ণের অগ্রজ বলরামের অবতার। তিনি বৈষ্ণবীয় পঞ্চতত্ত্বের একজন।  নিতাইয়ের নামের সঙ্গে তো প্রভু নেই আছে চান। আর নিতাই বা নিত্যানন্দ শব্দের ওপর কোন ধর্মীয় দলিল আছে বলে মনে করেন না মিরচান। জন্মের পর পর নিতাই নাকি দেখতে একেবারে ফর্সা ছিল। সাদা কাগজের মতো ধবধবে। একেবারে নতুন। তাই তার নাম রাখা হয়েছিল নিতাইচাঁন। এতো ব্যাখ্যার পরেও গ্রামের কোনও কোনও মানুষের বোধগম্য হয় না। তারা এ বিষয়ক তর্ক মসজিদে পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে নাম পরিবর্তনের বিচারিক রায়ও আদায় করে রাখে। কিন্তু মিরচান তাতে রাজি নন। নিতাইচাঁন তো নয়ই। ইদানীং দৃশ্যমান আচরণ তাকে ওই শ্রেণির কাছে আরও উপাদেয় সমালোচনার পাত্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। যে হাড়ি পুকুরপাড়ে দিনের বেলায় যেতে মানুষের ভয়ের অন্ত নেই সেখানে মোস্তফা আর নিতাই কোনও সাহসে যায়! ওই পুকুর ঘিরে জ্বিন-ভূতের নানাবিধ কাহিনি পুরো গ্রামের মানুষকে সন্ত্রস্ত করে রাখে। সন্ধ্যার পরে ওই পুকুরের পাড় ঘেঁষে যে রাস্তা বিলে নেমে গেছে তাতে ভুলেও কেউ পা রাখে না। প্রতি রাতে নাকি পুকুরের জলে আকাশ থেকে তীব্রবেগে আগুনের গোলা পড়ে। কখনও কখনও ছোট্ট শিশুর কান্না শোনা যায়। হাড়ি পুকুর ঘিরে গ্রামবাসীর বুকে যে ভীতির সঞ্চার, সন্ধ্যার পর শিয়ালের ডাকে সেই ভীতি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। হাজারি তালুক গ্রাম তখন সেঁধিয়ে যায় ভয়ংকর ভীতির পেটে। সেই পুকুরপাড়ে নিতাই আর মোস্তফা কি করে যায়! সেখানে যাওয়া আসা শুরুর পর থেকে দু’জনের আচরণ সন্দেহজনক বলে মনে করে গ্রামবাসী। বাজারে চা দোকানে এখন গরম আলোচনার বিষয় এরা দু’জন। কি হতে যাচ্ছে গ্রামে ? শ্রোত আছে, হাড়ি পুকুর থেকে এক সময় স্বর্ণের ডেক উঠত। ওই ডেক জইক্কার ধন। এই গ্রামে হাতেগোনা কয়েকজন এই ডেক প্রাপ্তির সুযোগ স্বপ্নে দেখেছে। বালির মা আর বাপ তাদের মধ্যে সেই সৌভাগ্যবান। স্বপ্নে দেখেছে জইক্কা বলেছে, ডেক পেতে হলে মেজবান দিতে হবে।  একশ’ মানুষ খাওয়াতে হবে। মসজিদে সিন্নি দিতে হবে। বুঝাই যায় এই জইক্কা মুসলিম প্রজাতির। হাড়ি পুকুরপাড়ে সখিনা খতম পড়াতে হবে। নতুন বাড়ি তৈরির পর এই তল্লাটে সখিনা খতম পড়ানোর রীতি রয়েছে। স্বর্ণের ডেক পাওয়া মানেও নতুন কিছু পাওয়া। তাই এ ক্ষেত্রেও সখিনা খতম আবশ্যক। আরও নানাবিধ শর্ত দেয়া হয়েছিল বালির বাবা-মা’কে। কিন্তু দরিদ্র এ দম্পতি গ্রামের জহুরুল থেকে টাকা ধার করে ওইসব শর্ত পূরণ করতে চেয়েছিল। তাতে রাজি হলো না জইক্কা। কারণ এতে শর্ত ভঙ্গ হয়েছে। জইক্কা স্বপ্নে স্বর্ণের ডেক দেবে বলে খবর দিলে তা দ্বিতীয় কাউকে বলা যাবে না। এমন শর্ত অলিখিতিই কিন্তু দলিলের চেয়েও কড়া এর বাধ্যবাধকতা। জহুরুলের কাছে টাকা ধার চাওয়ার সময় কারণ বলে দিয়েছিল বালির বাবা। তাই ঘাটে অর্ধেক উঠেও স্বর্ণের ডেক আবার তলিয়ে যায় পুকুরে। বালির বাবা-মা সেই কিচ্ছা পাড়াময় বলে বেড়ায়। বহু বছর ধরে তাদের কাছে ওই গল্প শোনার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে মানুষ। স্বর্ণের ডেক না পেলেও ওই গল্প শুনিয়ে ওই বুড়ো দম্পতি ভালোই কামায় করে। বালির মা মানুষকে যে গল্প শুনায় তা এরকম―

একদিন ঝুপ করি নামি আইল আন্ধার। মাঘ মাইয়া মেঘে দইনের বিলে জুনি হোকের ছামাও দেখা ন যার। সামনের মুই আত বাড়াইলেও দেওয়া ন যার, এত্তো গুটগুইট্টা আন্ধার। ওমা অন কি কইত্তাম, খোয়ারের মুই রেনি দেখি ছাগল তো আয়ে ন! অনগা কি করমু এঁ! হিঁয়লে খাইল না চোরে লইগেল নাকি হাড়ি হইরে বলি লইলাইল কিছু তো বুঝিয়ের না। হেতাইন, মানি বালির বাপ কোঁরেইত্তে শক্ত করি গামছা বাঁধি অন্ধারিত্তে বাইর অই গেলগৈ। আঁই এত ডাইকলাম হিছেত্তুন, হেতাইন হুইনল না। ছাগলেরে হেতাইন বেশি বেশি হছন্দ করে। আঁর তো ডরে কইলজা উল্ডি যাইবের জোগাড়। মনে অর হেতাইনরে ভূতে ধইচ্ছে। ঘরেত্তোন বাইর অইবের লগে লগে অন্ধারেইত্তে মিলি গেলগৈ। আঁই তার কোনও আলাপ-জোলাপ হাইলাম না আর। আঁইও সাহস করি বাইর অইগেলাম হেতাইনের হিছে হিছে। ঘাটার সামনেদি রাস্তাত উইটবের আগে রওন্না আম গাছের তলেদি যাইবের সময় হুরা গাছ কাঁপাই মস্ত বড় কি ইকগে উড়ি গেলগৈ। আঁই পষ্ট হুইনলাম বালির বাপে আঁরে ডাইকল। কিন্তু আন্ধারিত্তে কিছু তো দেইয়ের না। ডাক দিলাম, কইলাম তুঁই কনডে … ? কোন উত্তর হাইলাম না। হনত্তে আঁই বুইঝতাম হারিয়ের না যে রাস্তা দি আঁডিয়ের না বিলেদি। হাঁতরের কাছে যখন হইচ্ছি দেখি ধানটান ভাঙ্গি কিয়ে ইকগা যারগৈ হছিনমুই। লগে লগে আঁই পষ্ট হুইনলাম ছাগলে মেঁ গরি ডাকদি উডিল। কিন্তুক কনমুই কিছু দেখা যার না। হর হর আরও দুইবার হুগমুইত্তোন ডাক হুইনলাম। আঁই হেমুই আইটতে শুরু কইল্লাম। কিন্তুক ছাগলের আর কোনও ডাক হুইনলাম না। এককানা হরে হইরের হারেততোন ডাক হুইনলাম বালির বাপের। কইল, ও বালির মা তুঁই কনানে ? হইরের ঘাটে আইয়। আঁই দম্বুরি গেলাম হইরহারে। ওমা দেখি হইরেত্তে কি একখান ভাসের। হিয়েনেত্তে চেরাগ ইকগা জ্বালি বই রইছে বালির বাপ। লগে আর একজন বইরইছে। কিন্তু তারে চিনে যার না। নৌকার মতোন কালা জিনিস হিয়ান একবার হানির ভিতরে যারগৈ আবার উড়ি আইয়ে। হঠাৎ করি দেখি জির গাছেততুন লম্বা কি ইকগা নামি বালির বাপেরে গাছের উরফে লই গেলগৈ। আঁই খালি চাই রইলাম। কতক্ষণ হরে দেই হেতাইনরে জির গাছের উরফেত্তো হালাই দিল হানিত। ওমা দেই অজগর হাফের মতো জন্তু ইকগা আই হেতাইনরে হানিততুন ঠেলি হইরের হারে তুলি দিল। এর হরে আর কিছু দেখা গেল না। আবার আন্ধার অইগেল চারিমুই। আঁই আতাই আতাই হেতাইনরে তোয়াই লই কইলাম বাড়িত চল। হেসময় বালির বাপ কাঁপের। কনমতে আডি বাড়িত আইনলাম আর ঘরের ভিতরে ঢুকি মাত্র মাডিত হরি গেলগৈ হেতাইন। কনমতে আঁই কেঁতা এককান গাতদেয়াই দি, আঁইও ঘুম গেলাম গৈ। বেয়ানে উডি কইল হেতাইন খোয়াব দেইখছে। হুইনবের হরেত আঁই বেকুব অইগেলামগৈ। কইলাম আঁইওতো আমনের মতো এক্কই খোয়াব দেইখলাম। জইক্কা আঁরেও স্বন্নের ডেক দিব কইছে।      

এসব ঘটনার কারণে হাড়ি পুকুর পুরো গ্রামে আতঙ্কের নাম। সেখানে দিন দুপুরেও কেউ পা ফেলে না। কিন্তু নিতাই আর মোস্তফার প্রিয় স্থান হাড়ি পুকুর পাড়। পাড়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের তাল গাছ আর জিরগাছ তাদের আশ্রয়। জিরগাছের খোদলায় জড়ুল মেরে বসে থাকা কালন্তর আর জওড়া সাপের চেয়ে নিজেদের বেশি ক্ষমতাবান মনে করে তারা। 

দুই.

অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। নিতাই পাস করেছে। নবম শ্রেণিতে পড়তে পারবে। ফলাফল কি হয়েছে তা নিয়ে ওর কোনও চিন্তা নেই। সিনেমা, তার নায়িকা এবং সিনেমার গল্প নিয়ে সে নিজেকে ভাবুক করে তুলেছে। এমনকি পরিচালক  নায়িকার পোশাক আরেকটু খোলামেলা করল না কেন, কিংবা এত বেশি দেহ প্রদর্শন ঠিক হলো কি না, গল্পটা আরেকটু মোচড় দিয়ে যেতে পারত, এসব নিয়ে রীতিমতো দার্শনিক হয়ে উঠেছে নিতাই। তাদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। সে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় এল একটি সাদা-কালো টিভি। পুরো গ্রাম ভেঙে পড়ার জোগাড়। প্রতি শুক্রবার বিকালে একটি সিনেমা দেখানো হয়, তা দেখার জন্য পুরো গ্রামের মানুষ ভিড় করে তাদের বাড়িতে। রাতে আটটার সংবাদের পর দেখানো হয় ধারাবাহিক নাটক। বুধবার রাতে প্রচারিত হয় সাপ্তাহিক নাটক। সেই প্রথম টেলিভিশন নাটকের সঙ্গে নিতাইয়ের পরিচয়। এর আগে গ্রামে চুরি করে নাটকের রিহার্সাল দেখেছে স্কুল মাঠে। হারিকেন জ্বালিয়ে চলছিল নাটক ‘হিংসার পরিণাম’ এর রিহার্সাল। বাড়িতে কাউকে না বলে গিয়েছিল রিহার্সাল দেখতে। পরে যেদিন বিলের মাঝখানে স্টেজ করে নাটকটি মঞ্চস্থ হলো সেদিনও গিয়েছিল। ওই নাটকে দরবেশের অভিনয় তার ভালো লেগেছিল। নাটকের প্রধান চরিত্র বিপদে পড়লেই কোথা থেকে সাদা আসকান পরা দরবেশ এসে গান শুরু করে দিত। সবার চোখে পানি টলমল করত। নিতাই বার বার চোখ মুছত।

তবে বাড়িতে টিভি আসার পর ধারাবাহিক নাটক ‘ঢাকায় থাকি’, ‘এসব দিনরাত্রি’, ‘সংশপ্তক‘, ‘বহুব্রীহী’, কোথাও কেউ নেই’, দেখতে দেখতে নিজেকে কখন সে পাল্টে ফেলেছে নিজেই বুঝতে পারেনি। সে এখন আর সিনেমা হলে যায় না। তার কাছে ওসব ফ্যাকাসে মনে হয়। সিনেমার গল্পগুলো প্রচণ্ড বানোয়াট মনে হয়। কলা-কুশলীদের অভিনয় আগে যেভাবে তার মস্তিষ্কের কোষে আলোড়ন তুলত এখন সেরকম হয় না। বরং অঞ্জু ঘোষের বুক ও কোমর দোলানো অশৈল্পিক এবং ভীষণ অরুচিকর মনে হতে শুরু করে। সুচরিতা আর রোজিনার কান্না কিংবা নাচের দৃশ্য অদক্ষ অভিনয়ের ক্ষত বলেই মনে হয়। এখন সে বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে স্থাপন করেছে। টেলিভিশনের নাটকে যে গল্পগুলো নাটক হচ্ছে তা দেখে খুব আপন গল্প বলে মনে হয় তার। যেন কোথাও কোথাও নিজেকেই দেখা যায়। অনেকদিন নাটক শেষে রাতে ঘুমোতে পারত না নিতাই। টিভি  নাটকের কত লাইন যে তার ডায়রিতে লেখা হয়েছে তা পাতা ওল্টালেই বুঝা যায়। শুধু নাটকের লাইন নয়, লাইনের বহুবিদ ব্যাখ্যাও সে লিখে রাখে। নিতাইয়ের বাবা-মা সন্তানের এ পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করেন। বাবা মিরচান ছেলেকে বইপাঠে উৎসাহ দিতে শুরু করেন। কিছু বইয়ের নাম বলেন। মা নিতান্তই সরলা গৃহিণী হলেও সন্তানের পঠন-পাঠনের দিকে নজর রাখেন। তিনি আবার স্কুলের পড়াকেই বেশি গুরুত্ব দেন। চার সন্তানের মধ্যে সবার ছোট নিতাই। বড় ছেলে বাবুলচান শহরে চাকরি করে। সপ্তাহ শেষে শুক্রবার বাবুল বাড়ি এলে ভালো-মন্দ পরিকল্পনা করেন মা জহুরা বিবি। বড় ছেলেকেই হাতের লাঠি মনে করেন তিনি। মিরচান সামাজিক কাজে নিজেকে এত বেশি যুক্ত করে নিয়েছেন যে, নিজের সংসারের দিকে তার নজর রাখার ইচ্ছে থাকলেও সুযোগ হয় না। দশজনে মান্যগণ্য করে। কারও কোনও সুবিধা-অসুবিধায় তিনি একমাত্র ভরসা।  সঙ্গে স্থানীয় বাজারে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তিনি। এ সামান্য আয় এবং বড় সন্তানের আয়ে চলে বিশাল  সংসার। তবে অর্থের জোর কম হলেও গ্রামে তাদের সম্মানের কোনও কমতি নেই। মিরচান সামাজিক অসঙ্গতি ও সংস্কারে নিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। স্কুল-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে একটি শিক্ষিত সমাজ গড়ার জন্যই তার বিবিধ কর্মকাণ্ড। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পর তিনি সাধারণ বিমা কর্পোরেশনে চাকরি করতেন। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনের জন্য সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন মিরচান। মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ছিল তাঁর বাড়ি। মুক্তিযোদ্ধাদের নানান খবরা খবর এবং নির্দেশনা দিতেন। এ খবর পাক বাহিনী জানার পর তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। কি বুঝে কিছুদূর নিয়ে গিয়ে আবার পাক বাহিনিরা মিরচানকে ছেড়ে দেয়। বাবার এই যে মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা, সামাজিক কর্মকাণ্ড, সম্মান এসব ভাবতে ভাবতে নিতাইয়ের বুক ফুলে ওঠে। ভাবে, বাবার মতো হতে পারবে তো সে ? সেই প্রথম একজন মানুষ, যে কি না তার পিতা এবং সেই সঙ্গে একজন আদর্শ মানুষ নিতাইয়ের সম্মুখে মডেল হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তিত্ব, সততার গুণে একজন মানুষ কতটুকু দৃঢ়চেতা হতে পারে সেই প্রথম অনুভব করতে পারে নিতাই। মিরচানের একটাই কথা ছিল ছেলে- মেয়েদের প্রতি―

আমি তোমাদের কোন অর্থবিত্ত দিতে পারব না। তাই পড়াশোনাটাই তোমাদের প্রধান সম্পদ। ধন-সম্পত্তির ভাগ অন্যরা পাবে কিন্তু পড়াশোনার ভাগ কেউ পাবে না। তাই পড় এবং পড়। পড়াশোনা করে বিত্তের মালিক না হলেও তুমি চিত্তের মালিক হবে। ওই চিত্ত টাকার মূল্যে কিনতে পাওয়া যায় না।

বাবার এ কথাগুলো চিন্তার কোষে কোষে বিঁধে যায় নিতাইয়ের। সব সময় কানে বাজে। হঠাৎ করে বাবা একদিন তাকে এবং সেজ ভাই রবিচানকে পয়সা দিলেন। বললেন, পরাগ সিনেমায় ‘দাতা হাতেমতাই’ ছবি চলছে, তোমরা দেখে আসো। যে কথা সে কাজ। পরের দিন দুই ভাই মিলে গেল সিনেমা দেখতে। বাড়িতে টেলিভিশন আসার পর থেকে আর সিনেমা দেখা হয় না। বহুদিন পর সিনেমায় যাওয়া। সব নতুন নতুন লাগছে। সিনেমার দারোয়ান, টিকিট কাউন্টারেও নতুন নতুন মানুষ। আগে সিনেমা দেখতে আসলে টিকিটের জন্য ঠেলাঠেলি করত। এখন তাও করার ইচ্ছে নেই। লাইনে দাঁড়িয়ে নিয়মমতো টিকিট নিয়ে দুইভাই ‘দাতা হাতেমতাই’ দেখলো। বাড়ি ফিরার পর বাবা জিজ্ঞেস করলেন কি দেখল। নিতাই, সিনেমার পুরো গল্পটাই বলল। বাবা পুরো গল্পের মোরাল অব দ্য স্টোরি বুঝালেন দু’জনকে। বাবার এ গুণটির কথা জানা ছিল না নিতাইয়ের। মনে মনে ভাবে তিনিও নিশ্চয় ছাত্র জীবনে সিনেমা দেখতেন। এখন অবশ্য টিভিতে নাটক দেখেন। তবে থিয়েটার এবং ফুটবল খেলার প্রতি যে বাবার আগ্রহ আছে সে খবর নিতাই জানে। একবার সুকোমল স্যার বলেছিলেন, বাবা খুব ভালো ফুটবলার ছিলেন। ওনার খেলা দেখার জন্য অনেকেই মাঠের পাশে বসে থাকতেন। মঞ্চে নাটকে অভিনয়ও করতেন, সে খবর কে যেন একবার বলেছিল ঠিক মনে করতে পারে না। মিরচান এখন একেবারে অন্য মানুষ। অতীত যেন তাঁর সম্মুখে কোনওভাবেই ভেসে ওঠে না। নষ্ট হয়ে যাওয়া ছবির নেগেটিভের মতো সব অতীত কালো হয়ে গেছে। নিজের সঙ্গে বড় বড় মানুষের ওঠাবসা ছিল এবং এখনও আছে। একবার গল্পচ্ছলে বলেছিলেন, তিনি ভাসানী ও এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। টেরিআইন স্কুলের মাঠে মওলানা ভাসানীর জনসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন, তখন ওনার বয়স ছিল পনেরো কী বিশ। একে ফজলুল হকের সঙ্গে জনসভায় পাশে দাঁড়িয়ে মাগরিবের নামাজ পড়ার গল্পও করেছেন। বলেন, ফজলুল হক যখন সেজদায় যেতেন তখন মাটিতে যেন বিশাল দেহি কিছু একটা পড়ত। কেঁপে উঠত মাটি। এরকম আরও অনেকের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সংস্পর্শ ছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে নিজ এলাকা থেকে তিনি আন্দোলন জোরদার করেছিলেন। তাঁর সেই সময়ের বক্তব্য নিয়ে এলাকায় এখনও গল্প শেনা যায়। শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকেই তিনি নিজের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি তৈরি করেছিলেন। নিজের এবং পরিবারের জন্য চিন্তা করেননি। ভেবেছেন নতুন একটি দেশের কথা। সে দেশ পেলেন। কিন্তু দেশ স্বাধীনের মাত্র কয়েক বছর পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার বিষয়টিতে তিনি প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হন। দেশ সম্পর্কে হতাশা দানা বাঁধতে থাকে। বলেন, যে মানুষটি নিজের সারা জীবন দিয়ে একটি স্বাধীন দেশ এনে দিল, তাকে সপরিবারে যে দেশের মানুষ হত্যা করতে পারে, সে দেশ সম্পর্কে আশাহত না হয়ে উপায় কি! একেইভাবে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়েও বাবাকে মন্তব্য করতে শুনেছে নিতাই। বলেছেন, যে দেশে কয়েক বছরের ব্যবধানে দুইজন রাষ্ট্রপ্রধান খুন হয় সে রাষ্ট্র তো অকার্যকর হতেই পারে। তার কোনও মানবিক দিক আছে কি না সে কথা ভাবারও কোনো দরকার নেই। মিরচাদের একথাগুলো খুব ভাবায় নিতাইকে। সে তখনও বোঝে না রাষ্ট্র কি কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকা কী। কেবল বোঝে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া দেশ বাংলাদেশ। এর রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই তার। 

তিন.

টিনের চালে বাতাস চেপে বৃষ্টি নেমেছে। শব্দ এত প্রচণ্ড যে পাশের কেউ কথা বললে তা বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। শুধু শোঁ শোঁ শব্দ। কারও কোনও কথা বোঝা যায় না। দিনের বেলায় এমন অর্শ্ববেগি বৃষ্টি উপভোগ করে নিতাই। কিন্তু গভীর রাতে এমন বৃষ্টির শব্দে কাথা মুড়ি দিয়ে কান খাড়া করে রাখে। গা ছম ছম করে। ঘরের উত্তর পাশের কাঁঠাল গাছের ডাল বারবার টিনের চালে ধাক্কা দিয়ে যায়। এক একবার সেই শব্দ বিপুল শব্দে আঁচড়ে পড়ে। কখনও কখনও মনে হয় টিনের ওপর দিয়ে কে যেন ধুপ-ধাপ শব্দে হেঁটে যায়। এমন রাতে দাদির কাছে শোনা গল্প মনে হয় তার। নিতাইদের বাড়ি ছিল এ অঞ্চলের জমিদারের। জমিদারের নাম ছিল রামলাল হাজারি। এলাকায় সবাই রাম বাও (বাবু) বলে ডাকত।  জমিদারের নামেই ছিল গ্রামের নাম হাজারি তালুক। রামলাল দেখতে বেশ সুদর্শন ছিলেন। পুরো তালুকের বাসিন্দারা তার অনুকম্পা পেলেও কখনও তার সম্পর্কে অন্যায় অত্যাচারের কথা শোনা যায় না। অবস্থাসম্পন্ন এই হিন্দু পরিবারে উৎসব-পার্বণ লেগেই থাকত। বাড়ির উত্তর পাশে একটি বিশাল আমগাছ ছিল। সেই গাছের গুঁড়ি ঘিরে ছিল সিমেন্টের সান বাঁধান আসন। তাতে যত পূজা-ভোগ-অর্চনা সম্পন্ন হতো। তখন এই অঞ্চলে গুজব ছিল, ওই আমগাছের নিচে রাতের অন্ধকারে বিশাল দেহি এক দৈত্যাকৃতির কি যেন নেমে আসত। ফলে বাড়ির উত্তর পাশ ঘেঁষে যে রাস্তাটি রেল লাইন টপকে পাহাড়ের দিকে চলে গেছে সে রাস্তা ধরে সন্ধ্যার পরে খুব প্রয়োজন না হলে কেউ হাঁটত না।  নিতাইয়ের প্রপিতামহ আলি আহম্মদ মাস্টারের সঙ্গে ছিল রামলালের গলায় গলায় ভাব। আলি আহম্মদ মাস্টার সেই ফেনি থেকে চট্টগ্রাম শহর পর্যন্ত এক নামে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে বেশ নাম ডাক ছিল তাঁর। ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সঙ্গেও নাকি মাস্টারের বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। রামলাল জমিদার হলেও এলাকার মানুষের সঙ্গে ভালো সখ্য ছিল তার। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে দু’জনের অংশগ্রহণ নিয়ে এলাকায় অনেক গাল-গল্প ছিল। মাস্টার দা সূর্য সেনের সঙ্গে তাদের ছিল নিত্য যোগাযোগ। কিন্তু ১৯৪৬ সালে সব এলোমেলো হয়ে গেল। ওই বছর ১৬ আগস্ট কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে চার হাজারের বেশি হিন্দু-মুসলিম নিহত হয়। সেই উত্তেজনা এসে কালো থাবা মেলে হামলে পড়ে রাম বাবুর এলাকায়। চারদিকে থমথম অবস্থা বিরাজ করছে। সবার চোখে মুখে আতঙ্কের রেখা। তবে কোনও দাঙ্গা-হাঙ্গামা যাতে নিজ এলাকায় না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে এলাকার কিছু মানুষকে সারাক্ষণ দায়িত্ব দিয়ে রাখে রামবাবু ও আলি আহম্মদ মাস্টার। কিন্তু পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক হতে চায় না। ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে  উত্তেজনা। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েকমাস পরেই অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ভয়াবহ হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় নোয়াখালিতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হয়। এ ঘটনার পর মহাত্মা গািন্ধ নোয়াখালি গিয়েছিলেন পরিদর্শনে। তারপর নানান ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভেঙে উত্থান ঘটে পাকিস্তান রাষ্ট্রের। পূর্ব বাংলা ধর্মের ভিত্তিতে চলে  যায় পাকিস্তানের সঙ্গে। সে সময় থেকে হিন্দুদের দেশ ছাড়ার শুরু। সে সময় মাস্টারের বড় সন্তান ওয়াহিদুন্নবী স্ত্রী আর তিন সন্তানসমেত কলকাতায় থাকতেন। তিনি সেখানে রেলওয়ের কর্মকর্তা ছিলেন। দেশ ভাগের পরপরই চলে আসেন চট্টগ্রামে। যোগ দেন রেলওয়ের চট্টগ্রাম অফিসে। হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গ মুখি হলেও রামলাল হাজারি যাননি। জমিদার হিসেবে তিনি এলাকায় সবার প্রিয় ছিলেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটল ১৯৫০ সালে। সে সময় ব্রিটিশ প্রণীত প্রায় দেড়শ’ বছরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাতিল করে পূর্ব বঙ্গ থেকে বিলুপ্ত করা হয় জমিদারি প্রথা। এ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। সে সময় বাংলার বাঘ খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের সরকার বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। তারই ধারাবাহিকতায় জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি। জমিদারি হারানোর পর পূর্ববঙ্গে থাকার আশা ছাড়তে শুরু করেন রাম বাবু। ধীরে ধীরে নিজের সম্পত্তি একটু একটু করে বিক্রি করতে থাকেন। সে সময় তিনি আলি আহম্মদ মাস্টারকে বলেছিলেন বাড়িটি তার কাছেই বিক্রি করবেন। মাস্টারকে রামবাবু পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ার কথা বলতেই মুষড়ে পড়ে দু’জন। কতদিনের সম্পর্ক, এভাবে এক মাটি থেকে দু’জন চলে যাবে ভিন্ন ভিন্ন মাটিতে। এ জীবনে তারা এমন ভাবেনি কখনও। মাস্টার যদিও বারবার রামলালকে বলেছিল, কেন তার যেতে হবে ? এ দেশ তার। এখানে তার বাড়ি-ঘর, ধন-সম্পত্তি সব রয়েছে। কিন্তু রামলালের সন্তানেরা পিতাকে আর পূর্ববঙ্গে রাখতে চায়নি। তারা আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গে থাকত। পিতা-মাতাকে তারা এবার সেখানেই নিয়ে যেতে চায়। আলি আহম্মদ মাস্টার কোনও মতেই বন্ধুকে যেতে দিতে রাজি নয়। কিন্তু রাম বাবু এত বড় জমিদার হয়েও নিজের ভিটেয় আর নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। তিনি ধীরে ধীরে সম্পত্তি কমাতে থাকেন, প্রস্তুতি নিতে থাকেন চলে যাওয়ার। তারপরও থেকে থেকে মাস্টারের সঙ্গে না যাওয়ার বাসনাই প্রকাশ করেছে। দু’জনে একান্তে চোখের জল মুছেছে। কত স্মৃতি, কত চিরন্তন দৃশ্য তাদের যেন আলাদা হতে দেয় না। এভাবে কেটে যায় আরও কয়েক বছর। এরই মধ্যে হঠাৎ ১৯৫৪ সালে মৃত্যুর সারথী হয়ে অন্যপাড়ে চলে যান আলি আহম্মদ মাস্টার। রামলাল শোকে ঝড়ো হাওয়ায় নেতিয়ে পড়া সুপোরি গাছের মতো অঝোরে অশ্রুপাত করে। রামলাল মুষ্টিবেঁধে ফেলেন এবার আর নয়, চলে যাবেন সন্তানদের কাছে। একদিন খবর দেন মাস্টারের বড় ছেলে ওয়াহিদুন্নবিকে। নবি দেখা করার পর হাজারী বাড়িটি মাস্টারের কাছে বিক্রি করার যে ওয়াদা করেছিলেন তা জানান। নবি এত বড় বাড়ি কেনার জন্য তখন প্রস্তুত ছিল না। রামলালের এক কথা টাকা জোগাড় করে হলেও বাড়ি তাকে রাখতে হবে। তিনি ওয়াদা খেলাপ করতে চান না। নবি কিছু দিনের সময় নিয়ে টাকা জোগাড় করে দেখা করেন রামবাবুর সঙ্গে। দিনক্ষণ ঠিক করে রেজিস্ট্রি হয়। তবে শর্ত থাকে তিনি আরও তিনমাস এ বাড়িতে থাকবেন। সেজন্য তার যাবতীয় খরচ, থাকা খাওয়া সব নবিকে বহন করতে হবে এবং বাড়ির উত্তরে একটি আলাদা ঘর করে দিতে হবে তিন মাসের জন্য। সে ঘরেই তিনি থাকবেন। মূলত রামবাবু নবিকে এ বাড়িতে পুরোপুরি স্থাপন করেই রওয়ানা দিতে চান। নবি আশ্বস্ত করে এবং বলে  যদি তিনি কোনওদিন ফিরে আসেন  তাহলে তার বাড়ি-জমি সব ফেরত দেয়া হবে। রামলাল শেষবারের মতো পুকুর ঘাটে বসে নবির সঙ্গে নানান সময়ের স্মৃতিচারণ করে আর হাউমাউ করে কেঁদে বুক ভাসায়। পুকুরের মাছ, বাড়িময় বিচরণশীল পাখি, বাংলো ঘরের সম্মুখে একটানা বিলাপরত কবুতর আর কুকুরের একটানা আহাজারি সবই রাম বাবুর নিজস্ব। নবিকে বলে এদের যেন সে দেখে রাখে। পুরো গ্রামে জানাজানি হয়ে যায় রাম বাবু পরিবারসহ কলকাতা চলে যাচ্ছেন। পরের দিন বাড়ি ভরে যায় গ্রামের মানুষে। সবার চোখে প্রশ্ন কেন চলে যাচ্ছেন ? কেউ একজন ভিড় থেকে বলে ওঠে, ‘চলে যান তাড়াতাড়ি, সময় ভালো নয়। পূর্ব পাকিস্তান মুসলমানের।’ কথা শুনে চোখ কপালে তুলে তাকান রাম বাবু। যে মানুষটি তার বাড়িতেই মনিষ খেটে সংসার চালিয়েছে সেই কালু মিয়া এমন কথা বলতে পারে ? নবি কালুকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়, চিৎকার করে বলে রামবাবু কোথাও যাবেন না। এ ভিটে-বাড়ি তার। এসব ছেড়ে তিনি কোথায় যাবেন। নবি চিৎকার করতে করতে বুক চাপড়াতে থাকে। আর বলে একি হলো, এ কেমন দেশ ভাগ! আমি মানি না, মানি না। আমি তো ওনার ভেতর আমার বাবার ছায়া খুঁজি। তিনি চলে গেলে সে ছায়াও সরে যাবে। রামলাল নীরবে কেবল চোখের পানি মোছে। 

রামলালের পশ্চিমবঙ্গে পাকাপাকি চলে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসছে। তিনি প্রায় প্রস্তুত। এমন সময় ১৯৫৫ সালের ১৪ অক্টোবর আরও একবার হোঁচট খেলেন তিনি। পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো পূর্ব পাকিস্তান। তিনি আর এক মুহূর্তও থাকতে চাইলেন না। পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগে কলকাতার পথে রওনা দেন রাম বাবু। নবি স্ত্রী জমিলাকে নিয়ে অন্ধকার ভেঙে পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে বেঁধে দেওয়া ঘরের সম্মুখে  হাজির হয়। রাম বাবুর স্ত্রী হেমাঙ্গিনী, জমিলাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মালপত্র সব গরু-গাড়িতে উঠে গেলে শেষবারের মতো আম গাছের নিচে যান হেমাঙ্গিনী। সেখান থেকে কি যেন কুড়িয়ে শাড়ির আঁচলে একটি পুটলি বেঁধে নেয়। আর জমিলাকে বলে একটি নিয়ে গেলাম, আরেকটি কোনও মতেই যাবে না। তুমি দেখে রেখো জমিলা। এ বাড়ি তোমার, এর সবকিছুই আজ থেকে তোমার। জমিলা তখন কিছুই বুঝতে পারেননি। যাওয়ার মুহূর্তে বুকে জেগে ওঠা সেই যে তীব্র হাহাকার তারমধ্যে আর অন্যকিছু খেয়াল করতে পারেননি তিনি। সপরিবারে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন রাম বাবু। আর ফিরে এলেন না। নবি সেই বাড়ি আমৃত্যু একইরকম রাখার চেষ্টা করেছেন। যদি কখনও রাম বাবু কিংবা তার সন্তানরা কেউ ফিরে আসে টাকা ফেরত নিয়ে বাড়ি দিয়ে দেবে। জীবদ্দশায় নবির আর সে ইচ্ছে পূরণ হয়নি।

দাদি নিতাইকে এ পর্যন্ত গল্প বলে একটু জিরিয়ে নেন। একটু পানি পান করে আবার বলতে শুরু করেন―

ওই যে হেমাঙ্গিনি চলে যাওয়ার সময় আম গাছের নিচ থেকে পুটলিতে কি নেওয়ার পরে বলেছিল একটি রেখে গেলাম, সে যেতে চায় না। তার মাহাত্ম্য বুঝতে পারলাম আরও পরে, এক পূর্ণিমার রাতে। দেখি পুরো আমগাছের চতুর্দিকে জোনাকি পোকা থই থই করছে। সেই আলোয় বিশালদেহি কালো কি যেন একটি নাচছে। আমি তোর দাদাকে ডাকতেই মিলিয়ে গেল। সেই রাতে হেমাঙ্গিনী আমাকে স্বপ্নে দেখা দিল। বলল, ভয় নেই, তোমার বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য তাকে রেখে এসেছি। এরপর বহুরাত এই জন্তুটির পায়ের শব্দ শুনেছি, কিন্তু কখনও আমাদের কোনও ক্ষতি করেনি। একরাতে আমাদের বাড়ির উত্তর পাশে একটি মৃতদেহ পাওয়া যায়। সবাই চিনতে পারল, সে ছিল হোসেন ডাকাত। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হলো তা পুলিশ এমনকি ময়নাতদন্ত করেও জানা গেল না। সেই থেকে বিশেষ করে রাত আটটার পর কেউ এই পথে হাঁটার সাহস করত না।  

ঝড়ো বৃষ্টির রাতে কিংবা ভর অন্ধকার রাতে এই জন্তুটির উপস্থিতি মাঝে মাঝে ঘটে এমনটি মনে করতে চায় নিতাই। এই যেমন বৃষ্টির মধ্যে টিনের চালে যে বজ্রসম শব্দ হচ্ছে তা গাছের ডালের আঁচড়ে পড়ায় হওয়ার কথা নয়। পরিষ্কার কারও ভারী পায়ে হাঁটার শব্দ। তবে সে যে কারও ক্ষতি করবে না, সে কথাটি মনে হলে নিতাই কিছুটা আশ্বস্ত হয়। কিন্তু শ্যাওলাজমা বস্তাসদৃশ হাত পা আর রোমশ শরীরের কোনও এক অদৃশ্য জন্তু কল্পনা করে নিতাই কাঁথার ভেতর মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ে।

দাদার মৃত্যুর পর নিতাইয়ের বাবা মিরচাদ এ বাড়ির প্রধান কর্তা। তিনিও নিজের পিতার সেই চিন্তাই লালন করেন। তবে এও ভাবেন, রাম বাবুদের কেউ আর ফেরত আসবে না। তারপরও এই ভেবে সান্ত¦না পায় যে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে তাঁর বাবা নবি সাহেব বাড়িটি কিনেছিলেন। নিতাই স্কুলে যাওয়ার সময় মাঝেমধ্যে এসব ঘটনা লাইজু আর মাজেদার সঙ্গে বলে। ক্লাসের অন্য বন্ধুদেরও বলে, তবে লাইজু আর মাজেদাকে বলার মতো সুখ পায় না। এই দুই কিশোরী অবাক বিস্ময়ে নিতাইয়ের কথা শোনে। আর ভয়  পেয়ে কাছে এসে যে ভীতির আড়মোড়া ভাঙে তার উষ্ণতা যেন নিতাইয়ের গায়ে লাগে। এসব গল্প বলতে বলতে নিতাই তার প্রপিতামহ আর রাম বাবুর ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা, ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ, রাম বাবুদের মাটি ছেড়ে যাওয়া, একটির পর একটি ঘটনা এভাবে গুছিয়ে নেয়। ভাবতে থাকে এই যে ভাঙন এর উৎস কি এবং কোথায় ? বাবার মুখে শোনা স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, তিরাশি দিনের সরকার প্রধান খন্দকার মোস্তাক এবং জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ। চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড। সবই নিতাই’র চোখের সামনে মাঝে মাঝে ঝুলে থাকে। কখনও কখনও তা এত বেশি শক্ত অবস্থান নেয় যে হাত দিয়েও সরিয়ে দেওয়া যায় না। তখন নিতাই এসব ঘটনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা খুঁজতে শুরু করে। সে তখন আর গ্রামে বেড়ে ওঠা অন্য দশটি ছেলের মতো স্কুলপাঠ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই যে অতীতের ঘটনা সম্পর্কে তার জিজ্ঞাসা, তা জানবার জন্য কৌতূহলি হয়ে ওঠে। একই সময়ে চলছিল স্বৈরাচারী এরশাদের ক্ষমতা। চতুর্দিকে মানুষের মধ্যে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেওয়ার হিড়িক। তা না হলে বাড়ি থাকতে পারছে না, গ্রেফতার হচ্ছে। এসময়ে গ্রামের নুরুদ্দিন নিতাইকে বলল তার সঙ্গে শহরে যেতে। আরও মানুষ যাবে। স্থানীয় এমপির বাসায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। গেল আরও অনেকের সঙ্গে। যাওয়ার পর নিতাই বুঝতে পারল সবাই জাতীয় পার্টিতে যোগ দিতে এসেছে। নিতাই কিছুতেই তালিকায় নিজের নাম দিল না। সবার যোগদান শেষে বাড়ি ফেরার পথে নুরুদ্দিন তাকে বলল, ককটেল বানানো শেখাবে। নিতাই ভাবে মন্দ হয় না। এ সময়  বাজারের জিন্টিয়ার বাপের চুল কাটার দোকানের কথা মনে হয় তার। ওই সেলুনের দেয়ালে কতগুলো ছবি আর কবিতা বা ছড়ার লাইন ঝোলানো রয়েছে। একটি ছবিতে গোল চশমা চোখে মাথায় একটি চোখা টুপি পড়া সুদর্শন একটি মানুষ হাত টান টান করে বসে আছেন ধাবমান ঘোড়ার পিঠে। আরেকটি ছবিতে একটি কিশোর দাঁড়িয়ে আছে ফাঁসির মঞ্চে এবং আরও দু’টি ছবিতে লেখা, ‘ মা নাই গৃহে যার, সংসার অরণ্য তার’, ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’।  বাবাকে জিজ্ঞেস করার পর বলেছিলেন, ঘোড়ায় বসা ওই সুদর্শনের নাম নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। আজাদ হিন্দ ফোর্স ও সরকারের প্রতিষ্ঠাতা। আর ওই কিশোর যে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর নাম ক্ষুদিরাম। ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহিদ বিপ্লবী। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট আঠারো বছর আট মাস আট দিন বয়সে যার ফাঁসি হয়েছিল। ক্ষুদিরাম নাকি ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে শেষ ইচ্ছে পোষণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, সে যে বোমা বানাতে জানে, তা ভারতবাসীকে শিখিয়ে দিয়ে যেতে চায়। নুরুদ্দিনের বোমা বানানো শেখার কথা বলতে সে কথাই মনে হলো নিতাইয়ের। নুরুদ্দিনের সঙ্গে কথা পাকা হলো পরের দিন হাড়িপুকুর পাড়ে ওই জির গাছটার নিচে স্কুল থেকে আসার পর ককটেল বানানো হবে। আসার সময় রেল লাইন থেকে কিছু নুড়ি পাথর আনতে হবে। পরের দিন স্কুল থেকে ফিরেই নিতাই ভোঁ দৌড় দিল হাড়ি পুকুরের দিকে। গিয়ে দেখে নুরুদ্দিন তার জন্য অপেক্ষায়। কয়েকটি জর্দার কৌটা, মোড়ানোর টেপ এবং একটি প্লাস্টিকের প্যাকেটে হলুদ মসলাজাতের কিছু গুঁড়ো। খুব সাবধানে একটি কৌটাতে কিছু নুড়ি পাথর দেওয়ার পর সামান্য মসলা ছিটিয়ে দেয়। এভাবে তিন-চার স্তরে পাথর আর মসলা দেওয়ার পর মুখা লাগিয়ে টেপ দিয়ে পুরো কৌটাটি মোড়াতে থাকে। শেষ হলে নুরুদ্দিন বলে এটাই ককটেল। সাবধানে নাড়াচাড়া করতে হবে, না হয় হাতেই ব্লাস্ট হবে। নিতাই নিজে কয়েকটি ককটেল তৈরি করল। সব তৈরি শেষ হলে ককটেলগুলো জমা রাখার দায়িত্ব দেওয়া হলো নিতাইকে। নিতাই সাবধানে সেগুলো নিয়ে পড়ার ঘরের বড় ড্রয়ারে সেগুলো লুকিয়ে রাখে। তারপর খবর দেয় উত্তর পাড়ার বন্ধু সেলিমকে। দু’জনে মিলে রাত আটটার দিকে রেল লাইনে গিয়ে পর পর দুটো ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাল। সেকি শব্দ! পুরো গ্রামে হইচই পড়ে গেল। ওরা দু’জন চুপ করে পাশের ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকে বেশ কিছু সময়। সবাই চুপচাপ হয়ে গেলে বেরিয়ে যে যার মতো বাড়িতে চলে যায়। ককটেল তৈরি করা আর ফুটানোর উন্মাদনা তাদের মধ্যে বহুদিন স্থায়ী ছিল। পরে অবশ্য রেল লাইনে না করে পাহাড়ে গিয়ে বিস্ফোরণ কাজ সারত। কিছুদিন পর নুরুদ্দিন যখন তৈরি ককটেলগুলো চাইল আর দিতে পারল না। এর পর থেকে নুরুদ্দিন আর ককটেল পায় না। জানেও না যে মসলাগুলো কোথায় পাওয়া যায়। তারপর মোহভঙ্গ হতে শুরু করে। এর ক’দিন পরেই শুরু হলো পুলিশের ধড়-পাকড়। চতুর্দিকে জোরালো হয়ে উঠছে স্বৈরাচার পতন আন্দোলন। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধ হয়ে এরশাদ পতন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বাবা বাড়িতে যে খবরের কাগজ নিয়ে আসে এবং বিটিভিতে খবর দেখে এসব বিষয় জানতে পারে নিতাই। স্কুলেও শিক্ষকগণ এ বিষয়ে মাঝে মধ্যে কথা বলতে শুনেছে। বন্ধুরাও এ আন্দোলন নিয়ে আলোচনায় সরব। কে এই এরশাদ তা নিয়েও তার আগ্রহের কমতি নেই। জানে এরশাদ রাষ্ট্রপতি। কিন্তু তাকে কেন স্বৈরাচার বলা হচ্ছে কিংবা কেন এত আন্দোলন। আবার বাবার শরণাপন্ন হলো নিতাই। প্রশ্ন শুনে তার বাবার চোখমুখ আলোকময় হয়ে ওঠে। ছেলের জানার আগ্রহটাকে তিনি উস্কে দিতে বলতে শুরু করেন―

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর পর ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ১৯৮২ সালে তিনি শারীরিক অক্ষমতার অজুহাতে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান। একই বছরের ২৪ মার্চ চতুর জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতা দখল করেই ফরমান জারি করে যে, কেউ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে। চলতে থাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচার-জেল-জুলুম। তার ক্ষমতা দখলের দিন থেকে পুরো দেশে ফুঁসে ওঠে ছাত্র সমাজ।

বাবা সাত্তারকি আসলেই অসুস্থ ছিল, নাকি তাকে এরশাদ হুমকি দিয়ে নামিয়ে দিয়েছিল ?

 শোনা যায় সাত্তারকে কৌশলে এরশাদই চাপে রেখেছিল। কারণ এরশাদ অনেক আগে থেকেই ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনায় ছিল।

তাহলে কি তুমি বলতে চাচ্ছ জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে এরশাদের হাত রয়েছে ?

তা সরাসরি ছিল কি না সে প্রমাণ নেই। তবে পরোক্ষভাবে ছিল বলেই মনে করা হয়। যেমন শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের হাত ছিল বলে মনে করা হয়। কারণ মেজর ডালিমরা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা পরিকল্পনা করার সময় জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছিল। জিয়াউর রহমান বলেছিল তোমরা যা করতে চাও কর। এতে আমাকে জড়ানোর দরকার নেই। তখন জিয়া চাইলে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড থামাতে পারতেন।

 নিতাইয়ের মাথা গোলাতে শুরু করে। একি কাণ্ড। একের পর এক হত্যাকাণ্ড। সবই ক্ষমতা দখলের জন্য। বাবা আবার বলতে শুরু করেন―

তারপর যে কথা এরশাদ সম্পর্কে বলছিলাম (মিরচাদ যেনো পারছেন না মুহূর্তেই ছেলেকে সব বলে শেষ করেন)। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে রক্তঝরা এক অধ্যায়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শুরু। সেদিন সারাদেশে অনেকে ছাত্র পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এভাবে ১৯৮৫ সালের ১৩ ফ্রেব্রুয়ারি, ১৯৮৬ সালের ৭ মে এবং ১৯৮৭ সালের ২২ জুলাই অসংখ্য ছাত্র ও সাধারণ আন্দোলনকারী নিহত হয়।

বাবার কাছে  কথাগুলো শোনার পর বেশ ক’দিন ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দেয় নিতাই। স্কুলে যায়, ঠিক মতো ক্লাস হয় না। শিক্ষামন্ত্রী জমির উদ্দিন সরকারের নতুন পরীক্ষা পদ্ধতির বিরুদ্ধে দানা বাঁধে আন্দোলন। তাতে নিতাইও যোগ দেয়। হঠাৎ একদিন খবর আসে চট্টগ্রাম শহরে ব্যাপক গণ্ডগোল হচ্ছে। চলছে গোলাগুলি। মানুষ পালাচ্ছে শহর ছেড়ে। অলিতে গলিতে পুলিশ গুলি চালাচ্ছে। সেদিন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার জনসভা চলছিল। সেখানে গুলি চালাচ্ছে পুলিশ। সন্ধ্যায় খবর এল সীতাকুণ্ডের ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন শামিম শহিদ হয়েছে পুলিশের গুলিতে। শামিমের বাড়ি নিতাইদের স্কুলের পাশেই। প্রতিদিন দেখা হতো। কি দূরন্ত স্মার্ট একটি যুবক হেটে চলে যেত কলেজের দিকে। তাকে আর দেখা যাবে না। একথা ভাবতে ডুকরে কেঁদে ওঠে নিতাই। সেদিন আরও অনেক ছাত্র-আন্দোলনকারী নিহত হয়েছিল। এ হত্যাকাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে এরশাদ তখন দিব্যি কবিতা রচনা করতে শুরু করলেন। প্রেমিক কবি হিসেবে তার নামও জুটে গেল। মুষ্টিমেয় পদলেহনকারী কবি পরিচয়ধারী এরশাদকে কবি তকমা উপহার দিলেন। সেই সঙ্গে সুন্দরী পরিবেষ্টিত এরশাদকে নিয়ে মুখরোচক খবরেরও অন্ত নেই। সেই সুন্দরী তালিকায় শিল্পী-সাহিত্যিকরাও রয়েছেন। এ খবরের সঙ্গে সঙ্গে নিতাই মোস্তফার কথা মনে করে। মনে হয় মোস্তফার শিখিয়ে দেওয়া পন্থার মধ্যে সততা আছে। এরশাদের পন্থা তো বিষক্রিয়াযুক্ত পাপ। 

১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ে স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের অন্যতম কর্মী ডা. মিলনকে হত্যা করে এরশাদের লেলিয়ে দেওয়া বাহিনী। পুরো দেশে ছড়িয়ে গেল সে খবর। জ্ব’লে উঠল আন্দোলনের বহ্নিশিখা। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেও ক্ষমতায় আর টিকে থাকতে পারল না এরশাদ। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে ৬ ডিসেম্বর (১৯৯০) এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ে। এবার কে ক্ষমতা চালাবে ? আরেকটি আর্মি ক্যু যাতে না হয় তা নিয়েও দলগুলো সতর্ক। ঠিক হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। কিন্তু কে হবেন প্রধান। অনেকের নাম আসতে থাকে, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কারও বিষয়েই মতৈক্যে পৌঁছাতে পারে না। নাম এল প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের। তিনিই পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নিতাই ভাবে, মাত্র বিশ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশ। এ সময়ের মধ্যে কোনও উত্থান নেই। আছে খুন, ক্ষমতা দখলের অপকৌশল। একটি দশ টাকার নোট পকেট থেকে বের করে দেখে নিতাই। তাতে লেখা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’। অথচ প্রজাদের নেই কোন অধিকার, নিরাপত্তা।

চার.

ফেব্রুয়ারি ১৯৯১। বেশ কয়েকমাস ধরে নির্বাচনী উৎসব চলছে শহর-বন্দর-গ্রামে-গঞ্জে। এ মাসে এসে তা বিপুল জৌলুসের আকার ধারণ করেছে। নিতাই চারদিকের প্রচার-বাদ্যি বেশ উপভোগ করে। ঘুরে ঘুরে নির্বাচনী প্রচার ক্যাম্পগুলো দেখে। কোথাও কোথাও চা-বিস্কিট খাওয়া হচ্ছে। তার ভাগ্যেও জোটে কোনও কোনও ক্যাম্পে। এরমধ্যে ক্লাসের কয়েকজন বন্ধু জুটে গেছে। তাদের সঙ্গে মাঝে-মধ্যে বের হয়। রঙিন সজ্জায় চলছে নৌকা আর ধানের শীষের মিছিল। আরও ছোট-বড় কিছু দলের মিছিলও দেখা যায়। অবাক কাণ্ড হলো সদ্য ক্ষমতাচ্যুত এরশাদের দল জাতীয় পার্টিও নির্বাচন করছে।  এই ডামাঢোলের টানে চলে আসে ২৭ ফ্রেব্রুয়ারি। ভোর থেকেই সরব নগর। মানুষ ভোট কেন্দ্রে যাচ্ছে। লম্বা লাইন পড়ে যাচ্ছে ভোটারের। সারাদিন ভোট চলল। মানুষের মনে বিবিধ স্বপ্ন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। জেলে-কামার-কুমার, দিনমজুর, কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক সবার চোখে কি যেন উস্কে উঠছে। সবার চোখে-মুখে নতুন কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। নতুন ভোটার হওয়া তরুণীদের লাইনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নানান উসিলায় একটু থামে নিতাই। আহা, তারা ভোটের মধ্য দিয়ে কি চায় ?  খুব জানতে ইচ্ছে করে। শুনেছে এরশাদ সরকারের সময় নাকি পার্কে ছেলে-মেয়েরা প্রেম করতে পারত না। ছেলেদের চুল একটু লম্বা দেখলে ধরে কেটে দেওয়া হতো। মেয়েরা কি তবে অবাধে প্রেমের অধিকার চায় ? কিংবা প্রেমিকের লম্বা জুলফির চুল ? একথা সে কোনও একজন তরুণীকে জিজ্ঞেস করতে চায়, কিন্তু সাহসে কুলায় না। কেবল চেয়ে চেয়ে দেখে লাইনে দাঁড়ানো মেয়েরা তার দিকে চেয়ে মৃদু মৃদু হাসে। বন্ধু জহিরকে দেখায়, সেও সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারে না কেন হাসছে কিংবা কেন ভোট দিচ্ছে। জহির ও নিতাই পাশের আরেকটি লাইনে গিয়ে ডুকে পড়ে। ওই মেয়েদের পাশাপাশি লাইন এগিয়ে যায়। ভোট দেবে। জহির জিজ্ঞেস করে নিতাইকে কীভাবে ভোট দিবে, তারা তো কেউ ভোটার না। নিতাই এমন ভাব করে যেন কোনও ব্যাপার না। ভোট দিয়ে দেবে। শুনেছে এরশাদ নাকি হাঁ না ভোট দিয়ে ক্ষমতায় টিকে ছিল। একটা জাল ভোট না হয় দিলোই আজ। কিন্তু সে ভুলও ধরিয়ে দিল জহির। জাল ভোট দিতে হলেও তো কারও না কারও নামের ভোট দিতে হবে। কারও নাম তো তারা জানে না। নিতাই জহিরের মুখ চেপে ধরে।

বেশি কথা বলিস। একটু লাইনে থাকি। পাশে পাশে হাটতে তো মন্দ লাগছে না।

তাই বল। আমারও মন্দ লাগছে না।

মেয়েগুলো দু’জনের দিকে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে টান মেরে ঢুকে গেল ভোটের বুথে। নিরুপায় দুই তরুণ হতাশায় চোয়াল ঝুলিয়ে বের হয়ে গেল লাইন থেকে। নিতাই সারা দিন বন্ধুদের সঙ্গে এই করেছে। ভোট গ্রহণ শেষে চলছে গণনা। ভোটারদের ঊর্ধ্বশ্বাস অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটে ভোট গণনা শেষে। জানা গেল জাতীয়তাবাদী দল বেশি আসন পেয়েছে। তিনশ’টি আসনের মধ্যে ১৪২টি আসন তারা পেয়েছে। আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৮৮টি আসন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে কারচুপি বিষয়ে মৃদু অভিযোগ তুলল। তা মাঝেমাঝে উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু মানুষ চায় একটি গণতান্ত্রিক সরকার।

নির্বাচন শেষ। সবকিছু স্বাভাবিক। শুরু হয়েছে ক্লাস। নিতাই পড়াশোনার প্রতি কিছুটা মনোযোগী হতে চায়। ক্লাস নিয়মিত করছে। লাইজুর কথা মাঝে মধ্যে মনে হয়। কিন্তু এখন ক্লাসে আরও মনোহর মেয়েরা তা বেশি সময় টিকতে দেয় না। ক্লাস শেষ হলেই তার দৃষ্টি না চাইলেও চলে যায় মেয়েদের কমনরুমের দিকে। সেখানে কাকে যেন সে খোঁজে। কাকে খোঁজে ? একদিন হঠাৎ সে বুঝতে পারল কলি নামের একটি মেয়েকে সে খোঁজে। যার সঙ্গে পরিচয় নেই, কথা হয়নি কোনওদিন। কেবল একদিন অন্য একজন তার নাম ধরে ডাকতে শুনেই জেনেছে ওর নাম কলি। একই ক্লাসের। গ্রাম থেকে আসা নিতাই এখনও ভেজা বেড়ালের মতো ক্লাসে বসে থাকে। মেয়েদের কমনরুমের আশেপাশে কুঁই কুঁই করে ঘোরে। মেয়েদের শরীরের গন্ধ নেয়। এতেই তার সুখ। দোস্ত মোস্তফা কেনো যে আর পড়াশোনা করল না। করলে সে তো আজ এখানেই তার সঙ্গে পড়তে পারত। সে থাকলে কত কাজ সহজ হয়ে যেত। শুনেছে মোস্তফা নাকি গ্রামে কোনও একটি মেয়ের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছে। পারেও  বটে। মোস্তফার সেই হিম্মত নিজের ভেতর আনতে চায় নিতাই। ঠিক করে কলিকে বলতেই হবে। লাইজুকে না বলতে পারার কষ্ট সে কলিকে দিয়ে মুছতে চায়। কিন্তু বলবে বলবে করেই চলে গেল কয়েক মাস। এরমধ্যে নতুন সরকার গঠন করল বিএনপি। এককভাবে তো সরকার গঠন সম্ভব হলো না। সঙ্গে নিল জামায়াতে ইসলামিকে। তারা পেয়েছে আঠারোটি আসন। যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামিকে সংসদে মন্ত্রিত্ব দিল। এসব নিয়ে চতুর্দিকে ব্যাপক আলোচনা। কলেজে তার প্রভাব এসে শান্তি হরণ করল। প্রতিদিন ছাত্রলীগ আর ছাত্রদল মিছিল-মিটিং করছে। ক্লাস ছুটি দিয়ে সবাইকে জনসভায় নিয়ে যাচ্ছে। এসবের উৎপাতে কলিকে ক্ষণকালের জন্যও হাতের নাগালে পায় না নিতাই। কি করে তাকে বলবে একথা। বলতে না পারার বিষয়টি ভীষণ যন্ত্রণায় রেখেছে তাঁকে। বন্ধুদের কারও সঙ্গেও বিষয়টি বলতে পারে না। কখনও কখনও একটু কাছে পায় কলিকে, কিন্তু তখন কেন যেন তার মনে হয় কথাটি বলতে হলে আরও কাছে পেতে হবে তাকে। লাইজু তো কতদিন একসঙ্গে স্কুলে হেঁটে গিয়েছে, তারপরও বলতে পারেনি। এখন একটু সময়ের দেখায় বলা কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। এসবের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের এমপিদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। এ দৃশ্য নিতাইকে ভীষণ ব্যথিত করে। তার বন্ধু সাজ্জাদ আর লিমনও এ বিষয়টি মেনে নেয়নি। ওই মেনে না নেওয়া পর্যন্তই, কি করতে পারবে তারা। বাসায় এসে ভগ্নিপতির সঙ্গে এক আধটু আলোচনা করে। একদিন ভগ্নিপতি তালেব পেছনের ইতিহাস বলতে শুরু করে।

শোনো এই যে জামায়াত ইসলামিকে বিএনপি ক্ষমতার স্বাদ দিল তা হুট করে হয়নি। বিএনপি এ রাস্তা অনেক আগেই তৈরি করেছে।

কীভাবে ?

শোনো একটু আগে থেকে বলি। তাহলে তোমার বুঝতে সুবিধা হবে।

তা তো জানি, ওই রাজাকাররা পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করেছিল।

আরে তা তো আছে। আরেকটু পর থেকে বলছি। মুক্তিযুদ্ধ শেষ। দেশ স্বাধীন হলো। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন হলো। কিন্তু ওই যে যুদ্ধাপরাধী তাদের তো বিচার হতে হবে। এই বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি পাস করা হয় দালাল আইন। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই আইনের আওতায় দুই হাজার আটশ’ চুরাশিটি মামলা দায়ের করা হয়। এই আইনবলে তখন প্রায় ৩৭ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। বিভিন্ন আদালতে তাদের বিচারও শুরু হয়।

কই কোনও যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে বলে তো আমার জানা নাই।

হয়েছিল। শোনো বলছি। বিচার প্রক্রিয়া চলছিল। সে সঙ্গে সদ্য স্বাধীন একটি দেশকে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছিলেন শেখ মুজিব। আমি তোমাকে সংক্ষেপেই বলছি ঘটনা।

তাই বলুন। আমি পরে পড়ে জেনে নেব বিস্তারিত।

হঠাৎ নেমে এল ঘোর অন্ধকার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে একদল বিপদগামী আর্মি অফিসার সপরিবারে হত্যা করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। মাত্র চার বছরের স্বাধীন একটি দেশ বাংলাদেশ। যে মানুষটি নিজের জীবন বাজি রেখে দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে স্বাধীন করলেন দেশ, তাকেই নৃশংসভাবে খুন করা হলো।

পনের আগস্টের ঘটনা তো জানি। জানেন শেখ রাসেলের ছবি দেখলেই আমার কান্না পায়।

ঘাতকরা ওই অবুঝ শিশুটিকেও বাঁচতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তারই বিশ্বস্ত খন্দকার মোশতাক আহমেদ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়। যদিও এই মোশতাক ছিল পুরোপুরি একজন বেঈমান। মাত্র আড়াই মাসের মতো দায়িত্বে ছিল মোশতাক। এরমধ্যে খন্দকার মোশতাক একই বছরের ২৬ সেপ্টম্বর ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বেকসুর খালাস দেওয়ার লক্ষ্যে। যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ৩১ অক্টোবর বাতিল করে দালাল আইন! এরপর জেল থেকে গ্রেফতারকৃত যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

কি বলছেন এসব ? একটু আগে বললেন শেখ মুজিবের বিশ্বস্ত মোশতাক। আবার বলছেন বেঈমান। আবার বলছেন শেখ মুজিবের খুনিদের মাফ করার জন্য বিল জারি! কিছু বুঝতে পারছি না।

খন্দকার মোস্তাক সেরকমই ধাঁধা তৈরি করার মানুষ ছিল। সে যাই হোক। তার কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে নিলেন সেনা প্রধান জিয়াউর রহমান। যাকে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বীরোত্তম উপাধি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই জিয়াউর রহমানই ক্ষমতা গ্রহণ করে ১৯৭৯ সালে সংসদে ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ বিলটি অনুমোদন করে। সে বছর ৯ জুলাই সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর পর এ আইনটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা সবাই বুক চেতিয়েই বাংলায় বহাল থাকে।

কি সব বলছেন বুঝতে পারছি না। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নিয়েছিলেন কীভাবে ?

সে তো আরও ঘটনাবহুল এবং নাটকীয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার কয়েকদিন পর ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট জিয়াউর রহমান চিফ অব আর্মি স্টাফ নিযুক্ত হন। তার কিছুদিন পর ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ এক ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটান। যার ফলে ৬ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। এর পরেই জিয়াউর রহমানকে চিফ অব আর্মি স্টাফ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং তাকে বন্দি করে রাখা হয় ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে। সে সময় ঘটে সিপাহি বিদ্রোহ। বিদ্রোহীরা মুক্ত করে নিয়ে আসে জিয়াকে। আর ওইদিনই দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোয়ানদের হাতে খুন হন মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এটিএম হায়দার। এঁরা তিন জনই বীর উত্তম।

কি বলছেন আপনি এসব! একের পর এক কেবল খুনের ঘটনা!

শোনই না। সিপাহি বিপ্লব জিয়াকে টানতে থাকে রাজনীতির দিকে। রাজনীতি ডাকে ক্ষমতার দিকে। ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর জিয়াকে আবার আর্মির চিফ অব স্টাফ পদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে ক্রমান্বয়ে নানান উত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত সায়েমের উত্তরসূরি হিসেবে রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ করেন। আর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে ৩ জুন নির্বাচনে হ্যাঁ না ভোটে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে গা থেকে সেনা পোশাক খুলে ফেলার চেষ্টা চালান এবং বহু দলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেন।

হুম।

শুধু তাই নয় জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর ১৯৭৮ সালে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফেরত আসে। বাংলাদেশে এসেছিল স্বল্পকালীন ভিসা নিয়ে। কিন্তু পরে জন্মসূত্রে বাংলাদেশে থাকার অধিকার আছে দাবি করে, আর ফিরে যায়নি পাকিস্তান।

জিয়াউর রহমান না বীর উত্তম ? তাহলে তিনি যুদ্ধাপরাধীকে দেশে থাকতে দেয় কি করে!

তা তো তুমি ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ বিলটি অনুমোদন কেন করল তার মধ্য দিয়েই জবাব পেয়ে গেছ।

হুম তাই। কি এক জটিল ধাঁধার মধ্যে ফেলছেন আমাকে বুঝতে পারছি না। মানুষের এত পরিবর্তন, এত ক্ষমতার লোভ। কেন ?

তো সেই জিয়াউর রহমানও ক্ষমতায় বেশিদিন টিকে থাকতে পারলেন না।

হে তা তো জানি। তাঁকেও খুন করা হয়েছিল। বাবার কাছে শুনেছি।

কোথায় কীভাবে খুন হয়েছিল জানো ?

চট্টগ্রামে।

হুম, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে ১৯৮১ সালের ৩০ মে  সামরিক বাহিনীর কিছু অফিসার তাকে খুন করে।  তারপর আরও অনেক ঘটনা। এরপর বিচারপতি সাত্তার এবং সামরিক সরকার এরশাদের আগমন। এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ কেন বিএনপি জামায়াতে ইসলামিকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এল। তাদের সম্পর্ক তো পুরোনো।

তো সেই বিএনপি তো আবার ক্ষমতায় এল।

হুম, শুরুতেই তো জিয়াউর রহমানের আদর্শের বাস্তবায়ন দেখা গেল জামায়াত ইসলামিকে সঙ্গে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।

আমি বুঝলাম আপনার কথা। কিন্তু প্রশ্ন জাগে কেন শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। জিয়াউর রহমানকেই-বা কেন হত্যা করা হলো। এই সময়ের মধ্যে আরও অনেককেই হত্যা করা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের কারণ কি ?

তুমি তো আবার আমাকে পিছনে নিয়ে যাছে। তোমার প্রশ্নের উত্তর জটিল। তারপরও সংক্ষেপে বলছি  শোনো।

সংক্ষেপেই বলুন।

শেখ মুজিবুর রহমান-হত্যাকাণ্ডটির সঙ্গে যুক্ত ছিল দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্র। মানে যেসব বিদেশি শক্তি একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করেছিল তারা।  

শেখ মুজিবকে হত্যা করে বিদেশি শক্তি কি অর্জন করতে চেয়েছিল ?

নিয়ন্ত্রণ বুঝলি, নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের কিছু মোড়ল আছে তারা অন্য দেশগুলোকে বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।

বল তাহলে কারা তারা ?

ঘটনার ইঙ্গিত তো অনেক। এই ধর যদি বাম রাজনীতিকদের কথা বলি। সে সময়ে উদীয়মান বামপন্থিরা এ হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সে সময় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ছাত্রলীগ ত্যাগীরা প্রতিষ্ঠা করেছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ। এ দলের সশস্ত্র গণবাহিনী আওয়ামী লীগ সদস্য এবং পুলিশ হত্যার মাধ্যমে অভ্যুত্থান শুরু করে। অন্যদিকে ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি মাওবাদী নেতা সিরাজ সিকদারকে হত্যার ঘটনাও বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। দেশের অনৈক্য অস্থিতিশীলতা দূর করতে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করলেও তা নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়।

এর সঙ্গে বিদেশি চক্রান্তের সম্পর্ক কি ?

এত সব গোলমালের মধ্যেই বিপথগামী আর্মি অফিসাররা সরকার উৎখাতের সবুজ সংকেত পায় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে। পরিকল্পনা চলে সামরিক সরকার গঠনের। তারা এও বুঝতে পেরেছিল, শেখ মুজিবকে হত্যা করা ছাড়া সেনা সরকার গঠন সম্ভব হবে না।

আচ্ছা ওই যে বললেন বিদেশি গোয়েন্দা, তারা কারা, কি নাম সেই গোয়েন্দা সংস্থার ?

বলা হয় তো আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)। যদিও বিশ্ব নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ১৯৪৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এই সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে কি নিরাপত্তা নিশ্চিত করল সিআইএ ?

শোনো নিজের সুবিধা ভুলে কে কার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ? তারা নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই চেয়েছে। যদিও হত্যাকারীরা একে ধর্মীয় লেবাস দিতে চেয়েছিল।

কী রকম ?

হত্যাকারীদের একজন মেজর ফারুক এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, তারা চট্টগ্রারে আন্ধা হাফেজ নামের এক হুজুরের ঈঙ্গিতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছে। ইসলামের স্বার্থে। যদিও সেই হুজুর সাপ্তাহিক বিচিন্তায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি তেমন কিছু বলেননি। 

ওই যে সাংবাদিক বললেন তিনি কে ?

ওহে তিনি বেলজিয়ামের নাগরিক কিন্তু সংবাদিকতা করতেন পাকিস্তানে। নাম অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। তাঁর দু’টো গ্রন্থ আছে ‘দি রেপ অফ বাংলাদেশ (১৯৭১)’ এবং ‘বাংলাদেশ : এ লিগেসি অব ব্লাড(১৯৮৬)’। এ গ্রন্থ দু’টো অবশ্যই পাঠ্য বলে আমি মনে করি। তাতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বিষয়ে অনেক তথ্যই রয়েছে। অ্যান্থনি ১৯৮৬ সালে লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন।

তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাই শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার নকশা তৈরি করেছিল।

তোমাকে আগেও বলেছি, অনেকগুলো ঘটনা একসঙ্গে হয়েছিল, সে সুযোগ নিয়েছিল সিআইএ। বৃহৎ বিদেশি শক্তির ইন্ধন পেয়ে হত্যা পরিকল্পনাকারীরা সাহসী হয়ে ওঠে। আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মতো। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ছিল শুক্রবার। ঢাকায় আমেরিকান এম্বাসি সাধারণত বন্ধ থাকে রোববারে। কিন্তু সেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিন শুক্রবার আমেরিকান এম্বাসি বন্ধ ছিল।

নিতাই এবার বেশ ধাক্কা অনুভব করে। সব কেমন যেন সিনেমাটিক মনে হয়। আমেরিকার এত শক্তি! পুরো বিশ্বে তার খরবরদারি। কি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, কোথায় সেই আমেরিকা!

পাঁচ.

নিতাই পড়াশোনায় নিজেকে যুক্ত করার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। ‘রাজনীতি’ তার মগজে টগবগ করে ফুটতে থাকে। বোঝার চেষ্টা করে রাজনীতি কি ? এটা কি একটি পরিবারের মতোই কোনও বিষয় ? তার বাবা যেভাবে পরিবারের সকল নির্দেশনা দিয়ে যান সে রকম কিছু ? নাকি কলেজে ছাত্র নেতারা যেসব আদর্শের কথা বলে সেসব ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিতাই কিছু বইপত্র পাঠ করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার বাদ দেয় সে চিন্তা। ভাবে কিছু সময় লাইজুদের নিয়ে ভাবা যাক। ভোটের লাইনে দেখা সুন্দরীদের পীনোন্নত স্তন আর উর্বর ঊরুসন্ধির কথা ভাবতে তার ভালো লাগছে। ওইসব খুনাখুনি থেকে রমণীদের নিয়ে কল্পনা করাই ভালো। মন ভালো থাকে। এরকম ভাববার সময় নিতাই নিজেকে কবি মনে করে। এ সময় যেসব কথা তার মগজে ঘাঁই দেয় সে সব মাঝে মধ্যে লিখে রাখে। পরে পাঠ করে সুখ পায়। ভাবে সে তো কবি হয়ে যাচ্ছে! রাজনীতি নিয়ে চিন্তা না করে রমণীদের ভেবে কবি হয়ে যাওয়া মন্দ হবে না। এসব ভেবে ভেবে পায়চারি করছিল নিতাই। এসময় কে যেন ফিস ফিস করে বাইরে থেকে তাঁকে ডাকে। হলকা টানে দরজার কাছে গিয়ে কান পাতে সে। শুনে কোন এক মেয়েলি কণ্ঠ। ডাকছে তাকে।

নিতাই, দরজা খোল। আমি।

তুমি … মানে আপনি কে  ?

আরে খুলেই দেখো না আমি কে।

নিতাই ঝট করে সিটকিনি খুলে বাইরে দেখে চোখ ধাঁধানো এক সুন্দরী বাইরে দাঁড়িয়ে। কোথা থেকে এক ঝলক আলো এসে নিতাইয়ের চোখে হামলে পড়ে। নিতাই চিনতে পারে না তরুণীকে। কিন্তু ততক্ষণে তরুণী নিতাইকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়েছে ঘরে।

তুমি আমাকে চিনতে পারছ না তাই তো  ?

আমি কি তোমাকে কখনও দেখেছি আগে  ?

দেখনি হয়তো, কিন্তু শুনেছ।

মানে কি  ?

মানে তুমি আমার কথা শুনেছ, কিন্তু দেখনি।

তোমার নাম কি বলো আগে।

নাম জানা খুব প্রয়োজন কি  ?

অবশ্যই প্রয়োজন। তুমি আমার ঘরে এত রাতে চলে এলে, তোমার নাম, পরিচয় জানতে হবে না  ?

দেখো কি বিস্ময়, তুমি আমি একই বাড়িতে এতদিন একসঙ্গে থেকেছি, অথচ তুমি আমাকে চেনো না, আমি কিন্তু তোমাকে চিনি। তোমার নাম জানি।

কই আমাদের বাড়িতে তোমাকে তো কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

দেখনি কিন্তু শুনেছ।

কি বলতে চাও পরিষ্কার করে বল। এত রাতে এসব ভালো লাগে না।

আচ্ছা এই যে তুমি ‘রাজনীতি’ বিষয়ে জানতে চাইছ, কেন ? কারণ তুমি একে সরাসরি কখনও দেখনি। মনে কর আমিও তাই।

আমি রাজনীতি সম্পর্কে জানতে চাইছি তা তোমাকে কে বলল। আর আমি এখন সে বিষয়ে জানতে চাই না। আমি এখন আমার রমণীদের বিষয়ে বেশি ভাবাবেগে আছি।

আমিও তো রমণী। আমার বিষয়ে তোমার আগ্রহ থাকতে পারে। আর শোনো, তুমি রাজনীতি বিষয়ে জানতে চাও, কিন্তু এই সময়ের জটিল রাজনীতি সম্পর্কে তুমি জানতে চেয়েও নিজেকে সরিয়ে নিতে চাচ্ছ। তা তো সম্ভব নয়। এই যে রমণী এখানেও রাজনীতি আছে। ট্রয় নগরীর হেলেনের কথা নতুন করে বলার কি আছে!  শোনো, প্লেটোর নাম শুনেছ ? ওই দেখো তোমার দুলাভাইয়ের বুক শেল্ফে তাঁর রিপাব্লিক বইটি রয়েছে। প্লেটো ‘শিপ অব স্টেট’ নামের একটি রাজ্যের বর্ণনা করেছেন। সেই যে জাহাজ, তার মালিক সকল যাত্রীদের চেয়ে নিজেকে বেশি ক্ষমতাবান মনে করেন। কিন্তু তার শ্রবণ ক্ষমতা কম। বলতে পার সে অনেকটা প্রতিবন্ধী, জাহাজ কোন্ পথে নিয়ে যাবে সে পথ নির্দেশনা সম্পর্কেও তার তেমন ধারণা নেই। তারপরও সে নিজেকে অনেক ক্ষমতাবান মনে করে। আবার সে জাহাজের নাবিক যারা আছে তাদেরও জাহাজের গতিপথ সম্পর্কে তেমন কোনও ধারণা নেই। সে নাবিকরা মালিককে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার জন্য সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যিকারের অধিনায়ক বা জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার যোগ্যতা যে রাখে, তাকে নিতান্তই গৌণ মনে করা হয়। তাকে একপাশে ঠেলে রাখা হয়। এবার বুঝতে পেরেছ এই হচ্ছে রাজনীতি এবং আজকে তোমরা যাকে ‘গণতন্ত্র’ বলছ।

নিতাই রমণীর কথা শুনে মজে গেল। ভাব এই মধ্যরাতে কোথা থেকে দার্শনিক নেমে এল! সে রমণীর আরও কাছে ঘেঁষে বসে।

আচ্ছা বলত তুমি কে  ?

কেন এতক্ষণে আমার পরিচয় পাওনি ?

কি করে পাব, তুমি তো বলনি। বলেছি। শোনো এদেশে জমিদার প্রথা বাতিলের পর আমার বোন চলে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। আমি যাইনি। আমি তোমাদের সঙ্গেই থেকে গিয়েছি। তোমাকে এতক্ষণ যা বলেছি, সেই রাজনীতি আমাদের ভাগ করে দিয়ে গেছে।

তুমি কীভাবে এলে এখানে ?

আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম এখনও আছি।

দাদির মুখে আমি যে গল্প শুনেছিলাম সে হিসেবে তুমি তো মানুষ হওয়ার কথা নয়।

মানুষ কাকে বলে জান ?

কেন এই যে আমি, আমিই তো মানুষ। এই যে তুমি,  তুমিই তো মানুষ।

তুমি ঠিক বলছ তো। আরেকেটু আগেই তো বললে আমি তো মানুষ হওয়ার কথা নয়।

হ্যাঁ ঠিক তাই তো বলেছি।

দেখো, তুমি ঠিক জানো না, কে মানুষ কে নয়।

আমি এতক্ষণে এও বুঝেছি তুমি আমার সৌন্দর্যের কাছে মাথা গুঁজে দিয়েছ। তাই নয় কি।

তুমি কি করে বুঝলে ?

আমি তোমাকে বুঝি বলেই এখানে এসেছি। যখন প্রয়োজন আমাকে পাবে। তুমি ডাকতে হবে না, আমি নিজেই হাজির থাকব।

আমি কিন্তু ধাঁধার মধ্যেই আছি। তুমি সেই দেশ ভাগ, জমিদার প্রথা বাতিলের সময়ের মানুষ। তুমি এখনও এমন সুন্দরী তরুণী রয়ে গেলে কি করে ?

আমাদের বয়স বাড়ে না। আমরা ইতিহাসের একটি পাতায় ঠিক দাঁড়িয়ে থাকা দলিল। আমাদের বয়স বাড়বে কি করে!

তুমি আমাকে কিসব বলছ বুঝতে পারছি না।

বুঝবে সময় হলে বুঝবে।

আমি যে সব জটিল সময়ে ভেতর দিয়ে যাচ্ছি তার কিছুটা উত্তর তোমার কাছ থেকে পেয়েছি। কিন্তু কথা হচ্ছে অযোগ্যরা যদি জাহাজের মালিক হয় তাহলে, সে জাহাজ তো ডুবে যাবে। আবার জাহাজের নাবিকরা যদি নির্বোধ হয় তাহলে উপায় কি ?

এটাই গণতন্ত্র, পুঁজিবাদের আপন ভাই!

কি বলছ এসব। পুঁজিবাদ মানে ?

দেখছ না পশ্চিমারা গণতন্ত্রের কথা বলছে। সন্ত্রাস নির্মূলের নামে পুরো বিশ্বকে কব্জা করে রেখেছে। এর সবই পুঁজির বিস্তার। গণতন্ত্র তাদের পথ সুগম করছে।

শোনো এসব কথা রাখো। তোমার সঙ্গে অন্য গল্প করি আসো। বরং চলো কাল তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাই।

প্রস্তাব মন্দ নয়। কোথায় যেতে চাও চলে যেও। আমি তোমাকে খুঁজে নেব।

কেন একসঙ্গে চলো।

একসঙ্গেই যাব। তুমি তোমার মতো যেও।

হঠাৎ ঘরের আলো নিভে গেল। নিতাই কেবল দেখল একটি ডানাসদৃশ কিছু উড়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। সে প্ল্যাটোর রিপাবলিক হাতে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে।

ছয়.

দেশে এখন সংসদীয় গণতন্ত্র চলছে। মানুষ এমনই তো চেয়েছিল। পাকিস্তানকে হঠাতে নয় মাস লেগেছিল, আর এরশাদের আসন টলাতে লেগেছিল নয় বছর! এত খুন, এত রক্ত, মানুষের নির্ঘুম রাত এর সবই তো ছিল মানুষের স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের জন্য। তো সে কাল তো এসেছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা নাকি জিয়াউর রহমান। তারই দল এখন ক্ষমতায়। অথচ বছর না যেতেই পুরো দেশে শুরু হয়েছে আন্দোলন। গাড়ি ভাঙচুর, হরতাল, অবরোধ দিন দিন সবদিকে অসহনীয় পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। চলছে শ্রমিক অসন্তোষ। কথায় কথায় শ্রমিকরা মিল-কারখানায় হরতাল ডাকছে। রাস্তায় ব্যারিকেট দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি আটকে রাখছে। তারা ন্যায্য বেতন-ভাতা দাবি করছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-রাজপথে চলছে মিছিল-মিটিং। মিছিলের প্রধান স্লোগান হলো, খালেদার গদিতে আগুন জ্বালো একসঙ্গে। সব ক’টি দল পুরো দেশের মানুষ তাদের বলে দাবি করছে। আওয়ামী লীগ বলছে, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া সব তাদের। সব জনগণ তাদের সঙ্গে। সেই যে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী দল জাসদ, তাদের কর্মীদের মারমুখী অবস্থান সেই এরাশাদ সরকারের সময় থেকে। খুন-রাহাজানিতে এগিয়ে তারা। অথচ এ দলের নেতারা আবার পত্র-পত্রিকায় বড় বড় কলাম লিখে চলেছেন। তাতে নিজস্ব ইজমের সঙ্গে দেশ গড়ার নানান ফিরিস্তি উগরে দিচ্ছেন। বাসদ-ছাত্রফ্রন্ট একেবারে জামায়াতে ইসলামি কায়দায় ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতিতে ব্যস্ত। তফাৎ জামায়াত আল্লাহর নাম নিয়ে রাজনীতির মাঠে সরব আর বাসদ-ছাত্রফন্ট মার্কসবাদী। ছাত্রফ্রন্টের বয়স খুব বেশি নয়। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করতে বাসদের এই ছাত্রসংগঠন জন্ম নেয় ১৯৮৪ সালের ২১ জানুয়ারি। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর জন্মও বেশি আগে নয়। ১৯৮০ সালের ৭ নভেম্বর। পুঁজিবাদ নির্মূল এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্য। দলীয় মুখপত্র ‘ভ্যানগার্ড’এর মাধ্যমে তথ্য বিপ্লব ঘটাতে চায় তারা। পাড়ায়-মহল্লায়, স্কুল-কলেজে কর্মীরা বোগলদাবা করে বিক্রি করে চলে ভ্যানগার্ড। এ পত্রিকাটি দৃষ্টি কেড়েছিল নিতাইয়ের। কলেজে কয়েক বন্ধু এ পত্রিকাটি বিক্রি করত। একটি পত্রিকা নিতাই কিনে নিত। তো সামনেই দলটির জাতীয় সম্মেলন ঢাকায়। বন্ধুরা নিতাইকে আমন্ত্রণ জানালো। নিতাই মনে মনে খুশিই হলো। ঢাকা কখনও যায় নি সে। এই সুযোগ বিনা পয়সায় ঘুরে আসা যাবে। কথাবার্তা পাকা। রেলের বগি রিজার্ভ করা হয়েছে। রাতে সবাই বটতলি স্টেশন থেকে দল সমেত সেঁধিয়ে গেল রেল-বগির পেটে। রেল চলতে শুরু করে আর ইঞ্জিন ও চাকার ক্যাচ ক্যাচ শব্দ ছাপিয়ে রোনাজারির মতো ভেসে ওঠে স্লোগান, দুনিয়ার মজুদর এক হও লড়াই করো। রেল চলছে আর থেকে থেকে সেই স্লোগান। রেল বগির বাইরে ঝুলছে একটি দলীয় ব্যানার। জাতীয় সম্মেলন-১৯৯২। এ দলটিও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলে, ব্যক্ত করে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়। তো সারারাত রেল চলল। শীতের ভোর, চারদিকে কুয়াশা। কুয়াশার পর্দা ফুঁড়ে সবে একটু আলো বেরুবে বেরুবে করছে। তাতেই ভেড়ার ওলান ঠেলে শাবকের মাথা বের করে দেওয়ার মতো রেল তার ইঞ্জিন বের করে দেয় কমলাপুর রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে।  ক্যাচ ক্যাচ শব্দে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে রেল থেমে যায়। নিতাই সঙ্গের বন্ধু শহিদকে ঠেলে ঘুম থেকে জাগায়। পুরো শরীরে কেমন পুলক অনুভব করে। জীবনে এই প্রথম রাজধানী ঢাকা শহরে আসা। নিতাই আর বন্ধু শহিদ বুদ্ধি করেই এসেছে, কিসের সম্মেলন। দু’জন ঢাকা শহর ঘুরে দেখবে সে পরিকল্পনা করেই আসা। টেলিভিশনে ঢাকা শহরের কত রঙিন দৃশ্য দেখেছে, সেসব দিব্য চোখে এখন দেখবে। বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা, যাদুঘর, টেলিভিশন ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা পার্ক আরও কত কি! কিন্তু একদিনে কি এতসব দেখা সম্ভব হবে ? এসব ভাবতে ভাবতে রেল থেকে নেমে পড়ে নিতাই ও শহিদ।  হঠাৎ দলের নেতা ইমরান নিতাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিলেন বিশাল এক ছবি। তাকিয়ে দেখে ছবিটি ভ ই লেলিনের। সে ছবি দুই হাতে নিজের সম্মুখে প্রদর্শন করতে করতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউমুখি হাঁটতে থাকে নিতাই ও দলের কর্মীরা। নিতাই লাইনের একেবারে সম্মুখে। ফলে নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ মনে হয় তার। চোখে তখনও ঘুমের রেশ কাটে নি। পেটে খিদেও বেশ চাউর হয়ে উঠেছে। কিন্তু কিছু করার নেই। পায়ে হেঁটেই মিছিলসমেত সবাই এসে পৌঁছাল বঙ্গবন্ধু এভিনিউর পার্টি অফিসে। ছবি, ব্যানার ফেস্টুন পার্টি অফিসের একপাশে রেখে কেউ কেউ চেয়ারে বা কোনও এক কোনে নিজেকে ঠেলে দিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। নিতাই বুঝতে পারে তারও ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু পার্টি অফিসটি মুরগির খোয়াড় সদৃশ। সেখানে দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। তার চেয়ে ভালো বাইরে চলে যাওয়া। বন্ধু শহিদকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসে নিতাই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাজধানী ঢাকার আলো দেখে দু’জন। আহা এ তাহলে ঢাকা শহর। একটু হেঁটে দু’জন এসে দাঁড়ায় জিরো পয়েন্টে। অবাক হয়ে তাকায়। এই জিরো পয়েন্ট নামেই তো একটি নাটক কয়েকদিন আগে বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল। আব্দুল্লাহ আল মামুন তাতে অভিনয় করেছিলেন। নিতাইয়ে চোখ থেকে ঘুম ছুটে যায়। শহিদকে নিয়ে পাশের একটি ঝুপড়ি হোটেলে ডুকে চোখে-মুখে পানি দিয়ে টেবিলে এসে বসে। ক্ষুধা এত বেশি চাউর হয়েছে আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না। পরাটা আর ভাজি অর্ডার করে। দু’জনে খেয়ে বাইরে এসে সিগারেটে টান দেয়। নিতাই ও শহিদ ইদানীং ধূমপানে আসক্ত হতে শুরু করেছে। গুলিস্তানে সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দেয় আর সিনেমার পোস্টার দেখে। তবে সিনেমার পোস্টার দেখে আগের মতো তৃপ্তি পায় না নিতাই। নায়িকার পাহাড়সম নিতম্ব, বিকট লাউরের সাইজের বক্ষযুগল তার মগজে বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়।  তারচেয়ে বরং অন্য কোথাও ঘুরে আসা দরকার। হাতে সময় একেবারে কম। সম্মেলন শুরু হবে বিকাল চারটায়। তার আগে ঢাকা শহরটা চক্কর দিতে চায় সে। একটা রিকশা ডেকে বলে চিড়িয়াখানায় যাবে। রিকশাওয়ালা তো চোখ কপালে তুলে বলে―

চিড়িয়াখানা অনেক দূর। হ যামু। তই ভাড়া অনেক বেশি।

কত ?

বিশ টাকা।

কি বল। এত টাকা ?

হ, অনেক দূর চিড়িয়াখানা।

শহিদ ঈশারায় বলে, চল। আর লাফ দিয়ে উঠে পড়ে রিকশায়। রিকশা চলতে থাকে। নিতাই চোখ ভরে দেখে রাজধানী। অনেক কিছুই তার পরিচিত মনে হয়। সবই দেখেছে টেলিভিশনে। প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে হাইকোর্ট হয়ে রমনা পার্ক ঘেঁষে তাদের রিকশা পড়েছে শাহবাগে। এই পুরো পথ ও আশেপাশের সবকিছু যেন খুব পরিচিত মনে হয় নিতাইয়ের কাছে। শেরাটন হোটেল পার হওয়ার সময় চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে নিতাই। বন্ধু শহিদ তার বিস্ময় প্রকাশ করে শেরাটন হোটেলের বাহ্যিক বর্ণনায়। নিতাই হঠাৎ খেয়াল করে তার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। চোখ আর খোলা রাখতে পারছে না। দেশলাই ঠুকে একটা সিগারেট ধরায়। গোল্ডলিপে টান দিতে দিতে চোখ টেনে টেনে শহর দেখে। মাঝে মাঝে শহিদুলও টান দেয় সিগারেটে। ফার্ম গেটে ওভারব্রিজ পার হয়ে একটা টং দোকানে দাঁড়ায় রিকাশা। তেলতেলে নাইলনের  মাফলারটা কোমর থেকে খুলে মুখ মুছতে মুছতে একটা বন নিয়ে চিবাতে থাকে রিকশাচলক।

ভাই সকালের নাস্তা কইরা লই। বহুত খিদা লাগছে। আপনেরা একটু বহেন।

টং দোকানের চা ক্যাটলি থেকে ফর ফর করে পানির বুদবুদ আর ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ঘুমকাতুরে চোখে তাকাতে তাকাতে নিতাই শহিদকে চা পান করার ইচ্ছে প্রকাশ করে। শহিদুল লাফ দিয়ে নেমে দু’টো বন হাতে নেয়।

ভাই আমাদের দু’টা চা দেন।

আপনের বন্ধুরে এইহানে আইতে কন। রিকশায় চা দেওন যাইব না।

দোকানির কথা শুনে নিতাই নামে রিকশা থেকে। কৃষি ভবনের ঠিক উল্টো দিকে টং দোকানটির সামনে দাঁড়িয়ে দেখে ফার্ম গেইট। এই ভোরেও কত ব্যস্ত! মানুষ দৌঁড়াচ্ছে। এত মানুষ কোথায় যাচ্ছে ? কি তাদের এত ব্যস্ততা! সবার চোখে মুখে কি যেন নেই। কি নেই ? নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তর পায় না নিতাই। পাশে দাঁড়ানো রিকশা চালকের দিকে তাকায়। বাঁশের কঞ্চির মতো সরু অথচ বিদ্যুতের তারের মতো রগ বেরুনো হাতে বান রুটি খাচ্ছে। মনে হচ্ছে কত দিন কিছু খায়নি সে। ঘামে ভেজা পাতলা গেঞ্জি ছাপিয়ে উঠে আসতে চাইছে পাঁজরের হাঁড়। পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের এক বছর হতে চলল। কিন্তু এখনও ফার্মগেটসহ পুরো ঢাকা শহরে বিএনপি সরকার কে অভিনন্দন জানিয়ে ঝুলছে অজস্র ব্যানার-পোস্টার। আন্দোলন, রক্ত কত কি হলো স্বৈরাচার পতনের জন্য। অথচ এরশাদকে অভিনন্দন জানিয়েও ব্যানার ঝুলছে কৃষিভবনের সম্মুখে। যাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার জন্য এতো উত্তাল ছিল পুরো দেশ, সে এরশাদের জাতীয় পার্টিও পঁয়ত্রিশটি আসনে জয়লাভ করেছে! কারণ কি ? এই যে স্বৈরাচার পতন আন্দোলন হলো তা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। এখন তো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলো। কে স্বৈরাচার, কে রাজাকার তা বিবেচ্য বিষয় নয়। বিএনপি হলো বহু দলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দল। স্বৈরাচার-রাজাকার সবাই নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। রাজাকার সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচনে জয়লাভ করেছে আঠারোটি আসন!

নিতাই চায়ে চুমুক দিতে দিতে এসমস্ত চিন্তায় গোল্লার মতো ঘুরতে থাকে। শহিদুলের ডাকে রিকশায় গিয়ে ওঠে। এখন চোখে আর ঘুম ভাব নেই।

আচ্ছা শহিদুল, এরশাদের দল এতগুলো আসন জিতল। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী কেবল আসন জিতেনি মন্ত্রিত্বও পেয়েছে! তাদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। অথচ এ পতাকা তারা চায়নি!

এ তরিকার নাম বহু দলীয় গণতন্ত্র বন্ধু।

রিকশা তখন সংসদ ভবন সম্মুখে মানিক মিয়া এভিনিউতে পরেছে। ফুরফুরে বাতাস। সংসদ ভবন দেখে কিছু সময়ের জন্য রিকশা দাঁড় করায়। লুই কানের এই স্থাপত্যের আদ্যোপান্ত পাঠ্য বইয়ে জেনেছে। বেশি সময় হাতে নেই। চিড়িয়াখানা দেখে আবার যোগ দিতে হবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বাসদের সম্মেলনে। কিন্তু সংসদের দিকে তাকিয়ে নিতাই ভাবে এ সংসদ এখন বহুদলীয় গণতন্ত্রীদের। গণতন্ত্র আর বহুদলীয় গণতন্ত্র কি ? এখানে এসে তার চিন্তায় প্যাঁচ লেগে যায়। এক দলীয় গণতন্ত্র কি হয় ?

শহিদুল একদলীয় গণতন্ত্র হয় নাকি রে ?

মানিক মিয়া এভিনিউতে মুক্ত শ্বাস নিতে নিতে রিকশায় উঠে প্রশ্ন করে নিতাই।

তা হয় তো, হবে না কেন ? এরশাদ। তিনি তো পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রে একক ক্ষমতা বহাল রাখার পক্ষে তার যুক্তির অন্ত ছিল না।

কথা ক’টি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে হা হা করে হাসতে থাকে শহিদুল।

আচ্ছা, চায়না সম্পর্কে কি জানিস ?

ভালো বলেছিস, চায়নাও তো ‘পিপলস রিপাবলিক অব চায়না’। একদল চাইনিজ কমিউনিস্টি পার্টি চালিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র!

শহিদুল নতুন বিতর্কে যাইস না। আমাদের অবস্থা বল।

আমাদের অবস্থা কি, আমরা তো এখন বহু দলীয় গণতন্ত্রের দেশ। যা ইচ্ছা বলো। এই যে দেখছিস শেরে বাংলা নগর। জানিস তো কে এই শেরে বাংলা ?

রিকশা তখন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পার হচ্ছিল।

-হুম, পড়েছি। যুক্তফ্রন্ট নেতা। পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আরও অনেক কিছু।

রিকশা শেওড়া পাড়া হয়ে গিয়ে পরেছে মিরপুর দশ নাম্বার গোল চক্করে। নিতাই খেয়াল করল, রাজধানীতে এসে অনেক বিষয় পাওয়া গেল চিন্তা করার মতো। চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রনেতা মাস্টার দা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারদের স্মৃতিও ঠিক মতো রক্ষা করা হয়নি। রাজধানীতে এসে অনেক কিছু পাওয়া গেলো, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, মানিক মিয়া এভিনিউ, চন্দ্রিমা উদ্যান এখন পরিচিত জিয়া উদ্যানে, শেরে বাংলা নগর আরও কত কি। আসার সময় ফার্মগেটে যে দেখল কৃষি ভবন। এটি এ রাজধানীতে হওয়া কি জরুরি ছিল ? এটা তো হতে পারত কৃষি প্রধান অঞ্চলে। রাজধানী মানেই কি সব কেন্দ্রীভূত করা এক জায়গায় ? তাহলে গণতন্ত্র যে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে সেটি কি ? ধুর আবার প্যাঁচের মধ্যে প্রবেশ করতে বিরক্ত লাগছে নিতাইয়ের। তারচেয়ে ভালো রাস্তায় মানুষ দেখা। রাজধানীর মানুষ বলে কথা। ততক্ষণে রাস্তায় মানুষের সমাগম বেড়েছে। সুন্দরী সুন্দরী মেয়েরা স্কুলে-কলেজে যাচ্ছে। এই সুন্দর দেখার মধ্যে নিশ্চয় এক নায়কের মতো কোনও ব্যাপার নেই। সবাই দেখতে পারবে। সনি সিনেমার ব্যানারে ঝুলছে অঞ্জু ঘোষ! বাহ কি বিশাল অবয়ব! মনে হচ্ছে ডাউস তরমুজ। আবার বেদের মেয়ে জোস্না! এ সিনেমা দুই বছর আগে সাতবার দেখেছে নিতাই। ছয়বার সিনেমায় আর একবার স্বপ্নে! কাউকে বললে হাসে। স্বপ্নে কীভাবে সিনেমা দেখা যায়! যায়, নিতাই দেখেছে। সেই বেদের মেয়ে জোস্না আবার চলছে মিরপুরের সনি সিনেমা হলে। পকেটের অবস্থা ভালো না। তাই দেখার ইচ্ছে থুথুর সঙ্গে ফেলে দেয় নিতাই। শহিদুলকে গল্প শুনায়, কেন সে এতবার এই ছবি দেখেছে। বলতে বলতে রিকশায় হেসে গড়াগড়ি। গ্রামের বন্ধু মোস্তফার কথা বলে। বলে সেই ঝিম ধরা মজা নিতে হলে উপলক্ষ দরকার হয় তো। সে জন্যই বারবার অঞ্জু ঘোষের ছবি দেখার ইচ্ছে তার বেশি রকমের ছিল বলে শহিদুলকে জানাল।

বন্ধু তুই বল, এই যে সম্মেলনে এলাম, কি হবে তাতে ? কিছু বক্তব্য শুনব, যা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। বক্তারা কি বলবেন তাও জানা আছে। ভ্যানগার্ডে এসব বক্তব্য কথা পাঠ করা যায়। এসব গাল কপচানো কথা কত শোনা সম্ভব।  তার চেয়ে নির্মল আনন্দ নেওয়াটা মঙ্গল নয় কি। তোর মন মেজাজ খিটখিটে হবে না। কেবল শান্তি।  

শহিদুল নিতাইয়ের কথা শুনে হাসে। রিকশা ততক্ষণে চিড়িয়াখানা গেইটে এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষজন তেমন নেই। এখানে সেখানে ছোট ছোট কিছু জটলা। গেটের পাশেই একটি খুপরি মতো জানালায় লেখা ‘টিকিট’। রিকশা ভাড়া চুকিয়ে দু’টি টিকিট কিনে দ্রুত প্রবেশ করল চিড়িয়াখানায়। বিটিভির অনেক নাটকে দেখা চিড়িয়াখানার সঙ্গে মিল খোঁজে নিতাই। কিছুদূর যেতেই দেখল বিশাল একটি খাঁচায় উড়ছে অল্প ক’টি পাখি। এত  বৈচিত্র্যময় পাখি এর আগে দেখেনি নিতাই। গ্রামে দেখেছে বাওত্তামনা, ধেওচ্ছা, চইরগা, কঅল, গুখাইয়ামনা এসব। ও হে নিতাইয়ের মনে পড়েছে দোয়েলের কথা। পাশাপাশি কয়েকটি পাখির খাঁচায় কোথাও দোয়েল চোখে পড়ল না। মনে মনে ভাবল একটা জাতীয় চিড়িয়াখানা, অথচ জাতীয় পাখি নেই। আবার এতসব ভাবনা শহিদের সঙ্গে বলাও যাচ্ছে না। শহিদ বলে আরে এত কথার সুযোগ নেই। সময় কম। তাড়াতাড়ি আবার ফিরে সম্মেলনে যোগ দিতে হবে। দু’বন্ধু পা চালিয়ে চিড়িয়াখানা দেখা প্রায় শেষ করে আনে। তবে তৃপ্তি পায় না। ভেবেছিল ডিসকভারি চ্যানেলে দেখা চিড়িয়াখানাগুলোর মতোই হবে ঢাকা চিড়িয়াখানা। তা হলো না। বাংলার বাঘের যা অবস্থা দেখা গেল তাতে হাসিই পেল নিতাইয়ের। হাড় মোড়ানো চামড়ায় যে বাঘ তাকে বিড়ালই মনে হচ্ছিল। আর সিংহের তো লোম ঝরে চামড়ায় ঘা ধরে গেছে। সব কাকতালীয়। সমগ্র বাংলাদেশ আট টন! চিড়িয়াখানার পশুরাই যেন দেশের স্বাস্থ্যবার্তা জানিয়ে দিচ্ছে। শহিদ নিতাইকে আবার তাড়া দেয়। দু’জন বেরিয়ে সময় মিলিয়ে দেখে আর বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখা হবে না। হাতে আছে এক ঘণ্টা। পৌঁছোতে হবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। এবার বাসে উঠে গেল। ভাড়াও কম। কেবল বাকল ওঠা টিন ঝিরঝিরে বাস এই আর কি। যেতেই পারলেই হলো। কিছুদূর যেতেই বাসে আর নিঃশ্বাস রাখারও স্থান নেই। মনে হচ্ছিল মুড়ির টিন ভেঙে মানুষগুলো ছড়িয়ে পড়বে দিগি¦দিক। এতো ভিড়ের মধ্যেও হকার তার কাজ সারতে দেরি করছে না। অনেকটা অক্টোপাসের মতোই বাসের হাতল ধরে একটানে ফাঁক গলে নিজেকে চালান করে দিল ভিড়ের মধ্যখানে। ‘আগা চিকন গোড়া মোটা, সময় মতো খাড়ায় না, প্রস্রাবের সময় শরীর রি রি করে। কোনও চিন্তা করবেন না জনাব আমি হাফিজালি আপনার কাছে হাজির। চ্যালেঞ্জ দিলাম, আমার এই মলম ব্যবহার করে যদি মর্দামি না ফলাইতে পারেন, তাইলে আমার আল্লার কসম, ব্যবসা ছাইড়া দিমু। যদি এক ফোঁটা তেলে কাম না হয় আমি নিজের মর্দামি কাইটা ফালামু। প্রমাণিত জনাব। শত শত রোগী আমার চিকিৎসায় এখন আনন্দ ফুর্তিতে আছে।’

দেখা গেল মর্দামি প্রত্যাশী মানুষের সংখ্যা কম নয়। হাফিজালি ফটাফট তেল আর মলম চালান করে পকেটে টাকা ভরে নেমে গেল বাস থেকে। বাস তখন আসাদ গেট পার হয়ে বিজয় সরণির কাছাকাছি। এবার শোনা গেল থুবড়ি ফাটিয়ে দুই মহান বোদ্ধা রাজনীতির শ্রাদ্ধ করছেন। বিএনপি কেন ক্ষমতায় এল, আওয়ামী লীগ কেন নয় ? এই হলো আলোচনার বিষয়। একজন শেখ মুজিবের গোষ্ঠী উদ্ধার করছেন অন্যজন জিয়াউর রহমানের। বেশ উত্তেজিত। জামায়াতে ইসলামী সরকারে জুটল কেন এ নিয়ে একজনের বিষোদগার আরও কয়েকজনকে যোগ করল বিতর্কে। মাথায়, চোয়ালে টুপি-দাঁড়ি আছে তাদের। যুক্তি জামায়াতই পারবে দেশে কোরআনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। অন্য জনের কথা হলো বাংলাদেশ সংবিধানের কোথাও তো বলা নেই যে কোরআনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাকিরা মানতে রাজি নয়। তারা ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা তখনি করতে যেন বদ্ধপরিকর। পুরো বাসের আর কেউ সংবিধানের পক্ষের মানুষটির টোনের সঙ্গে যোগ দিল না। তারপরও তিনি বলেই যাচ্ছেন, দেশ স্বাধীন হয়েছিল চার নীতিতেÑগণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। তাহলে এখানে ইসলামি শাসনের কথা আসছে কেন ? বিপক্ষ এত যুক্তি মানতে রাজি নয়। তারা ইসলামি শাসন চায়। বিএনপি সমির্থিত ব্যক্তি আর কোনও কথা বলে না। বিজয়ের শ্লাঘা বুকে নিয়ে বাস থেকে ফার্মগেট নেমে ফস করে একটি সিগারেট ধরিয়ে সুখটান দিতে দিয়ে চলে যায়। নিতাই আর শহিদুলের চোখ মৃত মাছের মতো শীতল, নাকি শিখাদিপ্ত বুঝা যায় না। কিছুক্ষণ পর নিতাই মুখ খোলে।

আচ্ছা শহিদুল, ইসলামি শাসনের কথা আসছে কেন ?

আরে এত সহজ না। এটা বাংলাদেশ। ত্রিশ লক্ষ মানুষ ইসলামের জন্য প্রাণ দেয়নি। প্রাণ দিয়েছিল দেশের জন্য।

আচ্ছা বুঝলাম, কিন্তু এ দেশ কার ?

কার আবার, তোর-আমার, আমাদের। ভুলে গেছিস ক্লাসে বাংলার স্যার কি বলেছিলেন ? এই মাটি হচ্ছে সকল ধর্মের মানুষের। মাটি হচ্ছে বাউল-ফকিরের। এই মাটিতে এককভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবে কি করে। এ মাটি, এ দেশ, সকল ধর্মের।

কেন আমাদের দেশে তো মুসলিম বেশি।

তাতে কি হয়েছে। প্রত্যেক দেশেই কোনও না কোনও ধর্মের মানুষ বেশি। সেজন্যে দেশটি ওই ধর্মের বলা কি ঠিক ?

নিতাই কোনও কথা বলে না। প্রেসক্লাব ছাড়িয়ে বাস বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কাছাকাছি। জিরো পয়েন্টের কাছেই বাস থেকে নেমে পড়ে দু’জন। নেমেই মাইকের আওয়াজে আশেপাশের কিছুই শুনতে পায় না। সম্মেলনের মঞ্চ থেকে ভেসে আসছে বাঁধ ভাঙার গানের কোরাস। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে মানুষে মানুষে একাকার। পুরো দেশ থেকে বাসদের কর্মীরা এসেছে সম্মেলনে যোগ দিতে। ভিড় ঠেলে মাঝামাঝি একটি জায়গায় বসে পড়ে নিতাই ও শহিদুল। একটু পরেই বক্তব্য শুরু করেন বাসদ নেতা কমরেড কাজী খলিকুজ্জামান। অনর্গল মুখস্থ বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষা, কৃষি, শিল্প-সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, শিল্প-কারখানা কোনও বিষয় আর বাদ যাচ্ছে না। সব পরিসংখ্যানও যেন তাঁর মগজে লেখা। নিতাই মুগ্ধ হয়ে বক্তব্য শোনে। কৃষক কেন পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে না। শ্রমিকের ঘামেভেজা উৎপাদনে পুঁজিপতি ফুলে ফেঁপে ওঠে অথচ শ্রমিকের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন হয় না। এমন অজস্র দাবি খলিকুজ্জামানের বক্তব্যে। মাত্র এক বছর আগে ভেঙে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন। পুরো বিশ্বে সমাজতন্ত্রের ধস। সে বিষয়েও আলোকপাত করলেন এ নেতা। প্রায় দুই ঘণ্টা টানা বক্তব্য রাখলেন তিনি। সম্মেলন শেষ হওয়ার একটু আগেই পূর্ব পরিকল্পনামতো সবাই জড়ো হলো বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে। সেখান থেকে একযোগে যাত্রা কমলাপুর স্টেশনের দিকে।

সাত.

আবার চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা। নাওয়া-খাওয়া নেই, সবাই উঠে পড়ে মুতের ভুরভুরে গন্ধময়  তূর্ণা নিশিথায়। নিতাই একটি পাউরুটি আর ক’টি কলা না খেয়ে বেগে রেখে দিয়েছিল। খিদে পেলে খাবে। তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, তারপরও মুখে ঝুলে আছে কিছু প্রশ্ন। বাসদের সম্মেলনে এসেছে মূলত ঢাকা বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। এ রাজনীতির কোন নীতি-আদর্শের সঙ্গে তার তেমন কোনও সখ্য নেই। তবে সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া-এসব নিয়ে নিতাই আগ্রহ বোধ করে। ট্রেনে কিছুক্ষণ পায়চারি করে। মনে পড়ে নিজাম উদ্দিনের কথা। চট্টগ্রামের বাসদ নেতা। অন্ধকার বগির পেটে কে কোথায় হজম হয়ে আছে বোঝা মুস্কিল। তাছাড়া সারাদিনের ক্লান্তি একেকজনকে ঝড়ো গাছের মতো কুঁজো করে রেখেছে। তারপরও বিড়ালের চোখের মতো জ্বলে নিতাই’র চোখ। খোঁজে নেতা নিজামকে। একটু খুঁজতেই বগির শেষ মাথায় পাওয়া গেল তাঁকে। নিতাই নিজামের পাশে গিয়ে বসে। নিজামের বয়স যে খুব বেশি হবে তা নয়। তবে মাথার চুল সবই সাদা। চুল সাদা হলে কি মানুষ বুদ্ধিদীপ্ত হয় ? নিতাই নিজেকে প্রশ্ন করে। দেখা যাক কি জানা যায় তার কাছ থেকে।  নিতাই পাশে বসেছে দেখে প্রশ্ন করেন নিজাম―কি কেমন লাগল সম্মেলন ?

নিজাম ভাই কিছু প্রশ্ন আছে আমার।

কি প্রশ্ন বল ?

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাগ হয়ে গেল মানে কি ?

আরে ভাই তুমি তো বিশাল কাহিনি শুনতে এসেছ। সারাদিন অনেক ধকল গেল।

তা বুঝতে পারছি। আপনাকে পরে আবার কোথায় পাই, সংক্ষেপে বলুন না।

সোভিয়েত ইউনিয়ন কবে ভাগ হয়েছে জানো তো ?

তা জেনেছি সম্মেলনে, গত বছর মানে ১৯৯১ সালে।

একটু পেছন থেকে বলি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে দু’টি মতবাদ প্রধান হয়ে ওঠে একটি পুঁজিবাদ, অন্যটি সমাজতন্ত্র। উভয় পক্ষই মনে করত নিজেদের মতবাদই মানব মুক্তির মন্ত্র।

সমাজতন্ত্র কি ?

ভাইরে তোমাকে তো বললাম সে অনেক কাহিনি আজ থাক।

আচ্ছা বলুন না একটু সংক্ষেপে।

সমাজতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যে, উৎপাদনের সামাজিক মালিকানা ও সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। এটি একটি রাজনৈতিক মতবাদ। যাতে সম্পদ ও অর্থের মালিক রাষ্ট্র।

আর পুঁিজবাদ ?

বিশ্বে পুঁজিবাদের আগ্রাসন বহু পুরোনো। পাঁচশ বছরের কম হবে না। এর মূল বক্তব্য হচ্ছে, বাজার অর্থনৈতিক মুনাফা, কলকারখানা এসবের মালিকানা ব্যক্তিবিশেষের।

আরেকটু খোলাসা করা যায় কি ?

মানে পুঁজিবাদ বলছে, একজন ব্যক্তি তার অর্থ সম্পদের একক মালিক তাতে কারও কোনও অধিকার নেই। হোক ওই ব্যক্তি এ সম্পদ বৈধ কিংবা অবৈধ পথে অর্জন করেছে।

বলেন কি কোনওটার সঙ্গেই তো একমত হতে পারছি না!

কি বলছ তুমি ? আজকের সম্মেলনে কেন এলে তুমি, কিছুই কি তোমার মতের পক্ষে পাওনি ?

তা পেয়েছি, কৃষকের অধিকার, শিক্ষা, শিল্প-কারখানা, সম বণ্টন, এসব তো ভালোই লেগেছে। কিন্তু কোথায় যেন একমত হতে পারছি না।

অন্য এক সময় কথা বলব তোমার সঙ্গে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন ভাগ হলো বললেন না তো ?

নিজাম, উঠে গিয়ে দরজার পাশে খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট ধরায়। ট্রেন রাজধানী ঢাকা ছেড়ে সম্ভবত কুলাউড়া জংশনও পেরিয়ে গেছে। বগির পেটে সব যাত্রীরা হজম হয়ে গেছে। শহিদুলও যে কোন্ দিকে কাত হয়ে পড়েছে নিতাই জানে না। পুরো বগিতে কেবল জেগে আছে নিজাম আর নিতাই। জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে বাইরে ক্ষীণ আলো দ্রুত সরে সরে যায়। অন্ধকার দু’ভাগ করে তূর্ণা নিশিথা দ্রুতগতি সাপের মতো এগোতে থাকে। ঢাকা চট্টগ্রাম দীর্ঘ পথে আশপাশের কোনও কিছুই দেখা হয়নি তাদের। কাল রাতেই পার হয়েছে এই পথ, আজ আবার রাতেই সে পথে ফিরছে। অন্ধকারে কেবল স্টেশন ছাড়া লোকালয়ের কিছুই দেখতে পায় না নিতাই। নিজামকে আবার প্রশ্ন করে নিতাই। নিজাম সিগারেট শেষ টান দিয়ে নিজের জায়গায়  চোখ বন্ধ করে বসে পড়ে। নিতাই বুঝতে পারে তিনি আর কোনও কথা বলবেন না। এসময় পিঠে কারও মৃদু স্পর্শ অনুভব করে সে। কিছুটা ইতস্তত নিতাই, কেঁপে ওঠে। কারণ কেউ জেগে নেই বগিতে। কে তার পিঠে হাত রেখেছে! পেছন ফিরে মৃদু আলোয় দেখে গোফ-দাঁড়ি ভরাট মুখে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে মাঝ বয়েসি এক লোক। চোখা নাক, কপালে ভাজ দেখে আঁচ করা যায় বয়স ষাটের ঘর পেরিয়েছে।

আসো বাকি ইতিহাস আমি বলব।

কিন্তু আপনি কে ? আপনার কাছে আমি কেন গল্প শুনব ?

তোমার তো সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন ভাঙল তা জানা প্রয়োজন। আমি তোমার সে প্রয়োজন মেটাতে পারলেই তো হলো।

আপনাকে তো এ বগিতে দেখিনি যখন উঠেছি। তাছাড়া আমরা যারা সম্মেলনে গিয়েছি তারা ছাড়া এ বগিতে অন্য কেউ নেই। এ বগিটি আমাদের রিজার্ভ করা।

ধরো আমি কুলাউড়া জংশন থেকে উঠেছি। ভুল করে তোমাদের বগিতে উঠে পড়েছি। অসুবিধা আছে ?

না তা থাকবে কেন।

শোন, সে বহু বছর আগের কথা। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনয়ন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।

ইতিহাস বলতে শুরু করেন লোকটি। মৃদু আলোয় তাঁর চোখ জোড়া জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। কণ্ঠ কিছুটা কাঁপা কাঁপা। বয়সের ভার হয়তো। তবে বেশ সম্প্রতিভ, প্রতিটি শব্দের প্রতিটি নোট পরিষ্কার লাগছে। রেলের চাকার শব্দের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে না কোনও কথা। নিতাই কান পেতে শোনে। টের পায় লোকটি তার আরও কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। লোকটির শরীরের কোনও গন্ধ পাওয়া যায় না। কেবল টের পায়  লম্বা গড়নের একটি মানুষ একেবারে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি কথা বলেই যাচ্ছেন।

রুশ বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটে ১৯২২ সালে বলশেভিকদের রাশিয়া দখলের মাধ্যমে। ধীরে ধীরে আশপাশের সমচিন্তার বিভিন্ন রিপাবলিকগুলো যোগ দিতে থাকে। ১৯৪০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করে। এরপর যথাক্রমে ভøাদিমির লেনিন, জোসেফ স্টালিন এবং নিকিতা ক্রশ্চেভ সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিশ্বের বুকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলে। যার আয়তন ছিল এক কোটি চব্বিশ লাখ বর্গ কিলোমিটার।

আপনি তো বলছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনের কথা। আর আমি জানতে চাই কেন ভাঙল এই ইউনিয়ন।

একটু গোড়া থেকেই বলছিলাম, সে যাক―আসো ভাঙনের কথা বলি। ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতায় আসে মিখাইল গর্বাচেভ। এ সময়েই পৃথিবীর মহাশক্তিধর এই ইউনিয়ন ভেঙে পনেরোটি রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে যায়।

কি কারণে ভাগ হলো ?

বলছি শোনো। মিখাইল গর্বাচেভ ছিলেন অতীতের শাসকদের চাইতে চিন্তা ভাবনায় কিছুটা ভিন্ন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন কেবল কমিউনিস্ট চিন্তায় নয়, তার সঙ্গে কিছুটা পুঁজিবাদের সংমিশ্রণ করতে চাইলেন। চায়নার মতো। কিন্তু ততদিনে কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছে জনগণ। তারা কমিউনিজম থেকে পরিত্রাণ চাইল। গর্বাচেভের কোনও সংস্কারে আর তারা আস্থা রাখতে চাইল না।

কেন এতদিন তো জনগণ মেনেছিল, হঠাৎ বিগড়ে যাওয়ার কারণ কি ?

কারণ বহুবিধ, তবে প্রধান কিছু কারণের মধ্যে ছিল রাজনৈতিক অবিচার, অন্যায়ভাবে গ্রেফতার-জুলুম, যার ফলে মানুষ বিভিন্ন স্থানে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করার প্রস্তুতি নেয়।

কেবল এসব কারণেই ভেঙেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন ?

না তোমাকে আগেই বলেছি, এর সঙ্গে অনেক কারণ জড়িয়ে ছিল। আমি তোমাকে অন্যতম প্রধান কারণগুলো বলছিলাম। এর মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি নেতাদের সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ, দুর্নীতি এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, তারা নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বুঝতে রাজি ছিল না। ফলে মিখাইল গর্বাচেভের সংস্কারের চেষ্টা সাধারণ মানুষের কাছে আর টিকল না।

কি হয়েছিল ?

জনগণের অনাস্থায় কমিউনিস্ট পার্টি দুর্বল হয়ে পড়ল। ১৯৮৯ সালে পোল্যান্ড সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে প্রথম নতুন রাষ্ট্র গঠন করল। একেই সঙ্গে বেরিয়ে আসে হাঙ্গেরি এবং অস্ট্রিয়া। ওই সময়েই বার্লিন ওয়াল পতনের মধ্য দিয়ে দুই  জার্মানের এক হওয়ায় সোভিয়েত ক্ষমতা হ্রাস পায়। সেই সঙ্গে বাল্টিক অঞ্চলে অবস্থিত সোভিয়েত রিপাবলিকগুলো স্বাধীনতার জন্য শক্ত অবস্থানে দাঁড়ায়। এভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

তার মানে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিশেবে আর কার্যকর নয় ?

তাই তো প্রমাণিত। দেখা যাচ্ছে সোভিয়েত কিংবা মাওবাদী চিন্তায় আর সমাজতন্ত্র দাঁড়াতে পারছে না।

আমাদের এখানে, মানে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের কি অবস্থা ?

দেখো, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর কমিউনিস্টরা আর নিজেদের ওপর নিজেরাই আস্থা রাখতে পারছে না। গত নির্বাচন তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি পেয়েছে মাত্র পাঁচটি আসন। পুরো বিশ্বে হাতেগোনা কয়েকটি দেশে এখন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তাও পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক বলা যাবে না। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণতন্ত্র কিংবা পুঁজিবাদ।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় কি পুরো বিশ্বের সুবিধা হলো না অসুবিধা ?

শোনো, যুক্তরাজ্যসহ পুরো পশ্চিমা বিশ্ব সমাজতন্ত্রের বিরোধী। এখন সেসব দেশের জন্য সুবিধাই হয়েছে বলা যায়। তাছাড়া এত বিশাল একটি শক্তি ধুলোয় মিশে যাওয়া পশ্চিমাদের জন্য সৌভাগ্যেরও বটে!

তাহলে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ কোনও কিছুই কল্যাণকর নয়!

শোনো গণতন্ত্র হচ্ছে পুঁজিবাদীদের তৈরি একটি তন্ত্র। গণতন্ত্রই শোষণের পথ সুগম করে দেয়। পুঁজিপতিদের আরও পুঁজি এনে দেয় আর দরিদ্রকে টেনে নামায় আরও দারিদ্র্র্যের নিম্নস্তরে।

তাহলে উপায় কী ?

উপায় তোমরাই বের করতে পারবে। তোমাদের কাছেই তো আমরা নতুন দিনের আশা নিয়ে বসে আছি। সব খোলস ভেঙে ফেলতে হবে। নতুন মতবাদ চাই। রৌদ্রের মতো তীব্র এবং তীরের মতো তীক্ষ্ম।

লোকটির কথা শুনতে শুনতে নিতাই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল টেরই পায়নি। ভোরের সূর্যরশ্মি চোখে খেলে যেতেই জেগে ওঠে। চোখ কচলাতে কচলাতে লোকটিকে ইতস্তত খোঁজে। কোথাও নেই। বগির আগা-পাছা কোথাও নেই। ভাবে কোনও স্টেশনে নেমে পড়েছে হয় তো। হঠাৎ টের পায় বুকে কি যেন খোঁচা দিচ্ছে। বুক পকেটে হাত দিয়ে দেখে একটি ভিজিটিং কার্ড। কে দিয়েছিল মনে করতে পারে না। কার্ডে কোনও নাম নেই। কেবল একটি ঠিকানা, ৫৩ পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০। ঠিকানার উপরে বাঁকা তিরের মতো একটি লোগো। নিতাই কার্ডটি যত্ন করে ব্যাগে রেখে দেয়। মনে মনে ভাবে কোনও সময় ঢাকা গেলে যাবে এ ঠিকানায়।          

আট.

কেরানিহাট থেকে সরু রাস্তা একটানে বান্দরবান শহরে নিয়ে যাওয়ার আগেই ‘মেঘলা’। জলে উচ্ছলতা নেই। যে তরুণী কখনও প্রসাধন না নিয়েও সকলের বুক ঢিপঢিপের কারণ হয়, মেঘলাও সে রকম একটা লেক। নগরের মিছিল-বোমার উৎপাত-শঙ্কা সব মেঘলার জলে ডুবিয়ে দিয়ে পাড়ে একা বসে আছে নিতাই। টানা হরতাল চলছে। কয়েক বন্ধু মিলে একটা টেম্পো ভাড়া করে চলে এসেছে এখানে। অন্যরা শহরের দিকেই গেল। নিতাই এই লেকের গল্প শুনেছে আগে। রাস্তার পাশে মেঘলার সাইনবোর্ড দেখেই নেমে পড়েছে। লেকের বুকে ঝুলতে ঝুলতে একটি সেতু চলে গেছে অন্য পাড়ে। মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায় নিতাই। স্বচ্ছ জলে মাছেদের আনাগোনা, মাঝেমাঝে ডিঙি নৌকো চলে যাচ্ছে জলসন্তরণে। হঠাৎ সব ছাপিয়ে একটি গান ভেসে আসে কানে। গানের প্রথম কয়েক লাইন বুঝা না গেলেও কাছে যেতে যেতে পরের ক’টি লাইন শোনা যায়―‘ভালো লাগে না কোনও কিছু, এই সমাজের উঁচু নিচু। এই জনপদ শহর ছেড়ে, এই কোলাহল বসত ছেড়ে, চলো না অনেক দূরে যাই …। শুনতে শুনতে সেতু পার হয়ে গায়েনের সম্মুখে দাঁড়ায় সে। ষাটোর্ধ্ব গায়েন গেয়েই চলে। সম্মুখে একটা জ্যান্ত মানুষ দাঁড়িয়ে সেদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। গান শেষে ঠিকই প্রশ্ন করে―

বাবু এখানে কি নতুন এসেছেন ?

হ্যাঁ আজই এসেছি। আমার নাম বাবু নয়, নিতাই।

ওই হলো, আমাদের কাছে সবাই বাবু।

কীভাবে ?

মানুষের রোয়াবি কি আর চিরস্থায়ী হয় গো বাবু। কত মানুষ আসে এখানে। সবার করুণায় বেঁচে আছি। সবাই আমার বাবু। চোখে আলো নেই। আপনারাই আমার অন্নদাতা।

নিতাই এতক্ষণে বুঝতে পারল লোকটি অন্ধ। অথচ মনে হচ্ছে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সব দেখছে।

আপনি কি কিছুই দেখন না ?

দেখলে কি আর ভিক্ষে করতে হয় ?

আপনি ভিক্ষে করছেন কই, আপনি তো গান গাইছেন।

গান না গাইলে তো কেউ ভিক্ষে দেবে না। পথের ধারে কত মানুষই তো পড়ে থাকে। সব ধুলো, ময়লার মতো উড়ে উড়ে যায় এখান থেকে সেখানে। কেউ তাদের দেখে না। এই দুনিয়া এমনই, উঠে না দাঁড়ালে কেউ দেখে না।

নিতাই লোকটিকে নতুন করে দেখার চেষ্টা করে। কে এই লোক! তার কথায় কি যেন প্রকাশ হতে চায়। চোখে দৃষ্টি না থাকলেও খোলা চোখ আর চোখা চোয়াল থেকে বাঁকা কাস্তের মতো প্রতিটি কথা মাটিতে আঁচড়ে পড়ছে। তার কথা মেঘলার জলের মতো স্বচ্ছ হলেও তলদেশের খোঁজ পাওয়া যায় না।

আপনার নাম কি ?

বাবু, নামের কথা বলছেন, আমাদের অনেক নাম। কেউ ডাকে অন্ধ ফকির, কেউ অন্ধ গায়েন, আর কেউবা হরিহর, কেউবা ডাকে নীলাঞ্জন বাউল।

নীলাঞ্জন বাউল! বাহ সুন্দর নামতো।

সুন্দর কেমন তা তো জানি না। নীলগিরিতে থাকি তাই আমাকে কেউ কেউ সেই নামে ডাকে। এত নামের ভিড়ে আমার নাম যে কি আর মনে করতে পারি না। নাম দিয়ে কি আর হয়।

নীলগিরি কোথায় ?

দূর আছে বাবু। এখান থেকে পঁয়তাল্লিশ মাইল হবে। আমার যাওয়ার সময় হলো। পরে আবার চান্দের গাড়ি পাওয়া যাবে না।

আমাকে নেবেন ?

কোথায় যাবেন ? কেউ কাউকে কোথাও নিয়ে যেতে পারে না। কোন দিন পারেনি। সব ভবা পাগলার ইচ্ছা। 

নিতাই মানুষটিকে আরেকটু বুঝার চেষ্টা করে। কি সব বলছে। তার ভিতরে প্রবেশ করতে পারেছে না সে। তবে মনে মনে ঠিক করে এই লোকের সঙ্গে যেতে হবে।

আচ্ছা আপনাকে অনুসরণ করি।

লাভ কি বাবু, আমি তো ভবের কেউ নই। আপনাকে কোথায় নিয়ে যাব!

আপনি যেখানে যান।

চলেন। আর বেশি সময় নেই। রুমা থেকে চান্দের গাড়ি ধরতে হবে।

চলুন।

রুমা জিপ স্টেশন থেকে চান্দের গাড়িতে উঠে বসে দু’জন। নিতাই মনে মনে ঠিক করে লোকটিকে হরিহর বলেই ডাকবে। একেবারে শেষ জিপটিই ধরেছে ওরা। বিকাল পাঁচটায় নীলগিরির দিকে শেষ গাড়ি। গাড়ি টান দিয়ে শহর ছেড়ে উঠে পড়ে সাপের মতো বাঁকা পথে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। জিপে দু’পাশের লম্বা সিটের ডান পাশে একেবারে শেষটায় বসেছে হরিহর। পাহাড়ের উঁচু-নিচু, ধনুকের মতো বাঁকা পথ চান্দের গাড়ির কাছে কিছুই নয়। যেনো সব ছিঁড়ে ছুটছে। সব ছাপিয়ে হরিহরের হাতের যন্ত্রটি বেজে ওঠে টুং টাং। ঠিক একতারা নয়, তারই আদলে কাঠ আর বাঁশের খোল দিয়ে তৈরি এক ধরনের যন্ত্র। হরিহরের আঙুলের ছোঁয়ায় সেখান থেকে যে সুর ভেসে আসছে তা যেন এই পাহাড়ের বহুদিনের চেনা। প্রকৃতি ও এর মেজাজ কোনও এক সূত্রে গাঁথা। যন্ত্রের সঙ্গে জেগে ওঠে হরিহরের কণ্ঠ। সন্ধ্যোর আগমনে তার গান যেন নতুন কোনও বার্তা দিতে চাইছে-ঘরের কেবা ঘুমায়, কেবা জাগে, ওরে মন―ওরে মন―ওরে মন, মন আমার। ঘরের কেবা ঘুমায় কে বা জাগে, কে তারে দেখায় স্বপন, এ বেলা তোর ঘরের খবর জেনে নেরে মন। চান্দের গাড়ির গতি হরিহরের গানের কাছে যেন নেতিয়ে পড়ছে। চালক গাড়ির হুইল ধরে বসে আছে। উঁচু-নিচু, বাঁকা পথে গাড়ি কীভাবে মোড় নিচ্ছে কোথায় ছুটছে সেদিকে যেনও কোনও খবর নেই তার। কান খাড়া করে গান শুনছে আর সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে। এভাবে কতক্ষণ চলেছে চান্দের গাড়ি নিতাই ঠিক টের পায় না। হঠাৎ চালকের ডাকে গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠে। চোখ মেলে দেখে হরিহর নেই পাশে। ধড়মড় করে নেমে পড়ে গাড়ি থেকে। চতুর্দিকে অন্ধকার। তারপরও পুরো আকাশজুড়ে আলোচ্ছটা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি তখনও ঝরছে। পাহাড়ের গায়ে মাখামাখি করছে মেঘ। কিন্তু হরিহর কই ? হরিহর, হরিহর কয়েকবার ডেকে দেখে হরিহর পাশেই দাঁড়িয়ে।

কি হলো আপনি কোথায় গেলেন ?

কই আমি তো আপনার সঙ্গেই রয়েছি।

আমি তো গাড়ি থেকে নেমেই আপনাকে খুঁজছি।

আপনি দেখেন নি বাবু, আমি আপনার পাশেই ছিলাম। চাইলেই তো আর সব দেখা যায় না।

আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।

বুঝতে বুঝতেই তো সময় গেল। এক জনমে কি আর বোঝা যায় বাবু। কত কিছুই তো বুঝলাম না। সংসার, সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষ কিছুই তো বুঝলাম না।

নিতাই অন্ধকারের পেটে হজম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে হরিহরের পাশে। সে কি আসলেই দেখতে পায় না ? যদি নাইবা দেখে থাকে আমার আশেপাশে থাকছে কি করে। এসব ভাবতে ভাবতে নিতাই টের পায় তার ভীষণ খিদে পেয়েছে।

আচ্ছা হরিহর, খাবার কোথায় পাওয়া যাবে ? আমার অনেক খিদে পেয়েছে।

এখানে আর্মিদের একটা ক্যান্টিন আছে, আমি সেখান থেকে খুঁজে খেয়ে আসি। আপনি বাবু মানুষ কীভাবে বলি। বরং এক কাজ করুন আপনি আর্মিদের অফিসে গিয়ে বলুন, বেড়াতে এসেছেন, রাতে খাবেন কোথায়, জানেন না, হয়তো তারা আপনাকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করবে।

অতিথি, আমি তো এখানে অতিথি হতে আসিনি। আমি আপনার সঙ্গে থাকতে এসেছি।

থাকা না থাকা সবই ভবের খেলা বাবু।

বরং আপনি এক কাজ করুন, আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসুন, দু’জনে ভাগ করে খেয়ে নেব।

তা কি হয়, আপনি আমার সঙ্গে খাবেন।

কেন, হরিহর আমি তো আপনার সঙ্গে এসেছি, সঙ্গে খেতে পারব না কেন।

খায় না বাবু, খায় না। আমরা হচ্ছি অচ্ছুৎ মানুষ। আমাদের সঙ্গে কেউ খায় না, কেউ বন্ধুত্ব করে না।

কি বলছেন হরিহর, আপনি আমার বন্ধু নয়, এই অল্প সময়ে তার চেয়েও বেশি আপন হয়ে উঠেছেন।

হা হা হা, কি যে বলেন বাবু। আপনি বসুন এই টুলটাতে। দেখি খাবার কিছু পাওয়া যায় কি না।

নিতাই এতক্ষণে বুঝতে পারে সব পাহাড় ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়ায় বসে আছে সে। দূরে কোথাও কোথাও মৃদু আলো জ্বলছে-নিভছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা চিঁ চিঁ ডাক না থাকলে অন্ধকার হয়তো আরও ভারী হয়ে যেত। মাঝে মাঝে দু’একটা মশার কামড় সেই সঙ্গে মশা তাড়ানোর ঠাস ঠাস শব্দ নিস্তব্ধ পাহাড়ের ধ্যানে যেন ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। নিতাই হঠাৎ টের পায় হরিহর তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আর ঠিক তখনই মনে হলো, অন্ধ হরিহর কীভাবে অন্ধকার ভেঙে আর্মিদের ক্যান্টিনে গেল!

ক্যান্টিনে যেতে আপনার কোনও অসুবিধা হয়নি তো ?

আরে না।

আপনি তো পথ দেখেন না। এই অন্ধকারে গেলেন কি করে ?

আমি পথ দেখি না কিন্তু পথ তো আমাকে দেখে বাবু।

মানে ?

সব কিছুর কি আর মানে জানা যায় ? আমি এই নীলগিরির মানুষ। আমার বাপ-দাদা এই নীলগিরির মানুষ। আমার মা এখানে মিশে আছে। কথা পরে হবে বাবু, আসুন খেয়ে নিই।

নিতাইকে নিয়ে পাশের একটি সরু পথ ধরে ঝুপ করে নিচে নেমে যায় হরিহর। নিতাই তাকে অনুসরণ করে। প্রায় মিনিট দশেক হাটার পর একটি ছোট্ট উঠোনমতো জায়গায় এসে দাঁড়ায় নিতাই। বাঁশ আর সনের ছাউনি দেওয়া একটি ছোট্ট ঘরের দাওয়ায় রাখা কুপিটা জ্বালে হরিহর। বাতির আলোয় পাথরের মতো জ্বলে ওঠে হরিহরের অন্ধ দু’চোখ। সে চোখে অন্যরকম দিপ্তি। ঠিক যেমনটি নিতাই আগে কখনও দেখেনি। ঘরের দাওয়ায় বসেই মাটির সানকিতে ভাত আর তারকারি ঢেলে খেয়ে নেয় দু’জন। ভীষণ খিদে পেয়েছিল নিতাই’র। খাওয়া শেষে ফস করে বিড়িতে আগুন দিয়ে টানতে থাকে হরিহর। নিতাই বিড়িতে অভ্যস্ত না। তারপরও একটি চেয়ে নেয় । গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজে কিছুটা ঠাণ্ডা অনুভব হচ্ছে। সিগারেটে টান দিয়ে কান পেতে শোনে এক ঝাঁক শিয়ালের ডাক। তবে যে ডাক শুনছে তাতে কোথায় যেন একটা গরমিল মনে হচ্ছে। নিতাই কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে। নিজেদের গ্রামেও তো শিয়াল ডাকে। কিন্তু আজ শেয়ালের ডাকে এ কি ভিন্নস্বর!

আচ্ছা এই যে শেয়াল ডাকছে। তার মধ্যে অন্য একটি স্বরও শোনা যাচ্ছে। আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন হরিহর বাবু ?

নিতাইয়ের কথা শুনে সিগারেটের শেষ টান দিয়ে নিজের ভেতর থেকে নিজেই যেন টান দিয়ে উঠে আসে। লকলকে কেরোসিন শিখার মৃদু আলোয় তার চোখের পাতা ন’ড়ে উঠে থির হয়ে যায়।

না বাবু, নাহ। আপনি শেয়ালের ডাক কোথায় শুনছেন। এত মানুষের কান্না। আহা অন্ধকারে কীভাবে বিলাপ জুড়ে কাঁদছে মানুষগুলো। বাবু আপনি কি কয়েকটি শিশুর কান্না শুনতে পাচ্ছেন ? আহারে দেবতার মতো শিশুগুলোও রেহাই পেল না।

নিতাই প্রচণ্ড বিস্ময় চোখে ঝুলিয়ে কপাল কুঁচকে হরিহরের আরও কাছে গিয়ে বসে। ঠিক তার চোখের ওপরে রাখে চোখ। হরিহর কাঁদছে। চোয়ালে বেয়ে গড়িয়ে পড়া লোনাজল কুপির আলোয় চিক চিক করে। তাতে মনে হয় সে জল জ্বলে উঠছে, বিদ্রোহী হয়ে উঠছে।

আচ্ছা হরিহর বাবু এত রাতে মানুষগুলো কাঁদছে কেন ? চলুন একবার দেখে আসা যাক।

কোথায় যাবেন, কোথায় পাবেন তাদের! ওরা তো ওই হেমান টিলায় ঘুমিয়ে আছে। শুধু তাদের আত্মাগুলো রাত হলে জেগে ওঠে। আমি তাদের জন্যই এই নির্জন পাহাড় ছেড়ে কোথাও যেতে পারি না। গেলেও থাকতে পারি না। কত শহর বন্দরে গেলাম, কোথাও আমার ঠাঁই হয় না। এই পাহাড় আমার স্বর্গ। 

নিতাই কোথা থেকে হরিহরের কথার মাজেজা খুঁজে নেবে ভেবে পায় না। কে এই হরিহর! আবার সেই প্রশ্ন। একচালা ছোট্ট এই কুঁড়েঘরের বাইরে লেপ্টে আছে অন্ধকার। আশপাশে কোনও জনমানবের অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। হরিহর বিলাপের সুরে গুন গুন করে গান গাইছে―‘ওরে পানির তলে লাগল আগুন রে, ওরে শূন্যে দৌড়াদৌড়ি। ওরে বাবার বিয়ার তারিখ নিয়া ছেইলা, চইলছে মামার বাড়ি রে … পানির তলে লাগল আগুনরে। চোরায় গেল চুরি কততে, মালিক পড়ল ধরা, হাইকোটেতে যাইয়া দেখি হাকিম তিনজন মরা’। এবার হরিহরকে কেমন অচেনা মনে হয়। নিতাই খুব কাছে থেকে তাকে দেখার চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে গানের কথাগুলো গোঙানির মতো হয়ে যেন গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। আবার সেই ডাক। এবার সেই ডাক যেন পুরো পাহাড়ে প্রচণ্ড ঝড়ের মতো সব কিছু ভেঙে দিতে চাইল। ডাক শুনে বুক টান টান করে দাঁড়ায় হরিহর। একটা চট দিয়ে আড়াল করা দরজাটা একপাশে সরিয়ে দিয়ে অন্ধকার ভেদ করে কি যেন দেখছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো হরিহর তো চোখে দেখে না। তাহলে এই বিটুমিনের মতো গলে গলে পড়া অন্ধকারে কি দেখে! নিতাই বুঝতে পারে না তাকে এ মুহূর্তে ডাকা ঠিক হবে কি না। হঠাৎ মাটিতে বসে বিড় বিড় করে কি যেন বলে। আর কান্নার কোনও শব্দ পাওয়া যায় না। কান্না থেমে যাওয়ার পর নিতাই বুঝতে পারে। আগেও সে কান্নাই শুনেছিল। ভুল করে মনে হয়েছিল শিয়ালের ডাক। আবার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পাল্টা প্রশ্নও করে, কান্নাই কি ছিল, নাকি শেয়ালের ডাক ? এ নিয়ে নিজের ভেতরে এক ধরনের দ্বন্দ্ব টের পায় নিতাই।

হরিহর।

জি, ও আপনি, আপনি এখানে ?

হ্যাঁ আমি তো এখানেই ছিলাম। আপনিই তো আমাকে নিয়ে এলেন।

কেউ কাউকে আনা নেওয়া করতে পারে না বাবু। সব ওই মাওলার ইচ্ছা। আমি কে আপনাকে এখানে আনার। তিনিই এনেছেন।

আচ্ছা হরিহর। এই যে মানুষের কান্না শোনা গেল। এত রাতে এরা কারা ?

সে তো অনেক কথা গো বাবু।

যদি আপনার সময় হয় একটু বলুন।

বাবু ওই ভবাপাগলা জানে কেন এত বিভেদ, কেন এত শোষণ আর শাসনের জাল মানুষে জন্য। তো বলি শুনুন।

গল্পটি শুরু করার আগে হরিহর আবার একটি বিড়ি ধরায়। লম্বা টান মেরে পাঁজর টান টান করে সোজা হয়ে বসে। যেন এই গল্প বলতে অনেক শক্তি এবং সাহসের প্রয়োজন। তার সেই অভিনব বাদ্যযন্ত্রটি পাশে টেনে নেয়। এসময় অন্ধ চোখ জোড়া থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আলোর গতি যেনো দূর থেকে খুঁজে আনতে গেল কিছু। নিতাই গল্প শুরুর আগে হরিহরের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। চাঁটগাঁয় শাসন শুরু করল। সেই অনেক আগের কথা। আমার বাবার মুখে শুনেছি সেটা ১৭৬০ সালের দিকে হবে। ব্রিটিশরা সে সময় কং হ্লা প্রু কে এই পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাজ থেকে খাজনা আদায়ের দায়িত্ব দেয়। সেই সঙ্গে বোমাংদের স্বীকৃতি না কি বলে তাও দিল ইংরেজরা। সেই থেকে শুরু হলো বোমাং রাজ্য। একের পর এক রাজা গেল, রাজা এল। সবাই ওই ইংরেজদের হুকুম তালিম করল। সেই যে শোষণের শুরু হলো তার আর শেষ হলো না। ১৯৩৩ সালে  রাজা হলো ক্য জ সাইন বোমাংগ্রী। সে সময় ওই হেমান টিলায় ছিল হেরি মং প্রু’র বাড়ি। অবস্থাসম্পন্ন। রাজ পরিবারের সঙ্গে তাই হেরি পরিবারের ছিল বিরোধ। রাজা কোনও অন্যায় আবদার করলেই প্রতিবাদ করত হেরি মং।

নিতাই খেয়াল করে এ পর্যন্ত এসে হরিহর একটা দীর্ঘ শ্বাস নেয়। হাতে থাকা নিভে যাওয়া বিড়ির শেষটা ফেলে নতুন আরেকটা ধরায়। কেরোসিনের কুপিটার মৃদু আলোয় সিগারেটের ধোঁয়া এঁকে বেঁকে একটা শরীরী আদল নিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। হরিহর বলে চলছে―

হেরি রাজ পরিবারেরই মানুষ। কিন্তু শোষণের বিরুদ্ধে সব সময় প্রতিবাদ করায় পরিবারে তার থাকা হয়নি। পরিবার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় তিনি থেকেছেন। এক সময় এসে এই হেমান পাহাড়ে বসত গাড়েন। তারপর থেকে রাজ পরিবারের সঙ্গে প্রায় সব সময় তার যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। দাঙ্গা-হাঙ্গামায় এই পাহাড়ি অঞ্চল অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। হেরির পরিবার ছিল অনেক বড়। সাত ছেলে দুই মেয়ে। সবাই একই বাড়িতে থাকত। ছয় ছেলে বউ-বাচ্চা ও দুই মেয়ে স্বামী সংসার এখানেই শুরু করেছিল। কেবল ছোট ছেলে মিন প্রু থাকত চাঁটগাঁ শহরে। ছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের কর্মী। আত্মগোপনে কাটছে সময়। একে একে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন কর্মীরা ধরা পড়ছে। মারা যাচ্ছে। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি ফাঁসি দেওয়া হলো নেতা মাস্টার দা সূর্য সেন ও বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারকে। আরও উত্তাল হয়ে ওঠে আন্দোলন। মিন প্রু আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনে সক্রিয় থাকে। ইত্যবসরে তিনি খবর পেলেন, হেমান টিলায় হেরি প্রু’র পুরো বাড়ি ভস্ম হয়ে গেছে আগুনের লেলিহান শিখায়। কে বা কারা গত রাতে পুরো টিলায় আগুন ধরিয়ে দেয়। আশপাশের বনজঙ্গল, পুরো হেরি পরিবার সেই আগুনে পুড়ে কোনও চিহ্নের লেশমাত্র আর নেই। খবর পেয়ে মিন প্রু ছুটে আসে হেমান টিলায়। পাগলপ্রায় মানুষটি কোনও মানুষের আস্তিত্ব খুঁজে পায় না। পরিবারের কারও দেখা পেলেন না। যারা এই ছাইভস্ম দেখতে এসেছে তারা বলছে, হেরি পরিবারের সবাই জ্যান্ত মরেছে। কেউ বাঁচেনি। কারা আগুন দিল সে বিষয়ে কেউ জানে তেমন টের পাওয়ার কোনও উপায়ও ছিল না। সবার চোখে-মুখে ভস্ম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য আফসুস দেখা দিলেও রাজ পরিবারের সঙ্গে হেরি প্রু’র বিরোধে যাওয়া কেন দরকার ছিল না সে বিষয়ে কেউ কেউ বিশদ ব্যাখ্যার অবতারণা করে। অন্যদিকে রাজ পরিবারের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশসহ বলা হলো এই অগ্নিকাণ্ডে তাদের কোনও হাত নেই। তারা গভর্নরকে জানিয়েছে বিষয়টি। ততক্ষণে রাজ পরিবারের লোকজন পুরো হেমান টিলা পরিষ্কার করে দিল। সেখানে যে একটি বিশাল বাড়ি ছিল তার কোনও অস্তিত্ব আর থাকল না। সব ঠেলে ফেলে দেওয়া হলো চার পাশের গভীর কান্নালে। মিন প্রু একা দাঁড়িয়ে থাকেন বিশাল হেমান টিলায়। পাগলের মতো গভীর কান্নালের দিকে নেমে, জঙ্গল ভাঙতে ভাঙতে খোঁজাখুঁজি করে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায় কি না। বায়ান্ন সদস্যের পরিবার। কেউ কি নেই! ছয় ভাইয়ের ছেলে-মেয়েরা কেউ ছিল কৈশোর পার করবে এমন। আর বাকিদের বয়স ছিল চার থেকে ছয় বছরের মধ্যে। এতগুলো শিশু আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল! মিন প্রু আর ভাবতে পারে না। উন্মাদপ্রায় মানুষটি সেই পোড়ো ভিটা ছেড়ে কোথাও যায় না। সেখানেই বসে থাকে। গভীর রাতে হঠাৎ শুনতে পায় কান্না। এই যে কিছুক্ষণ আগে যে কান্না আমরা শুনলাম সেই কান্না! যেদিক থেকে কান্না ভেসে আসে সেদিকে ছুটতে থাকে মিন। কিছুদূর গেলে শুনতে পায় ওদিকে নয় কান্না ভেসে আসছে টিলার অন্যপ্রান্ত থেকে। প্রায় উন্মাদ মানুষটি কান্না ধরতে ধরতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকল সেই ভিটার ওপর। ভোরে হুঁশ ফিরে এলে ভিটা ছেড়ে পা বাড়ায় ফিরতি পথে। বহু বছর আর হেমান টিলায় যায়নি মিন প্রু। আমাকে যখন এসব গল্প বললেন, তখন আমার বয়স আট।

আপনার সঙ্গে কি পরিচয় ছিল হেরি প্রু’র।

(হরিহর মৃদু হাসে)। ছিলই তো। তার সঙ্গে আমার আজন্ম পরিচয়।

তিনি আপনার আত্মীয় ছিলেন ?

মানুষটি ছিলেন আমার ঈশ্বর। আমার পিতা।

মানে আপনি মিন প্রু’র সন্তান ?

হ্যাঁ, আমাকেই তো দয়াল তার ঘরেই পাঠিয়েছিল। তিনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজেকে চিনতে হয়। বলতেন নিজেকে না চিনে তুমি দয়াল চিনবে কি করে! তুমি মানুষ চিনবে কি করে! সেই থেকে আমি মানুষের খোঁজে কত পথ ঘুরলাম, মানুষ তো খুব দেখি না!

তো হেরি প্রু মানে আপনার বাবা আর কখনওই এই হেমান টিলায় ফেরত আসেননি ?

এসেছিল। আমার আট বছর বয়সে। আমাকে পুরো ঘটনা বলার পর, আমিই জোর করে একদিন নিয়ে এসেছিলাম। বাবা-মা আর আমি এমনি আশ্বিনের এক বৃষ্টির রাতে এসেছিলাম। আমার মা ছিলেন মুসলিম। দোয়া-দরুদ, তসবিসহ নানান অশরীরী আত্মা তাড়ানোর মন্ত্র পাঠ করতে করতে আসলেন মা। আমরা প্রথমে ওই আর্মি ক্যাম্পেই আশ্রয় নিয়েছিলাম। বৃষ্টি দেখে সেখানে আমাদের ওঠার সুযোগটাও পাওয়া গেল সহজে। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। নীলগিরি, চিম্বুক, কেওক্রাডাং সবই মেঘে ঢাকা। আমরা যেন মেঘের ওপরে কোনও ভিনগ্রহে বসে আছি। এমন সময় এক আর্মি জওয়ান আমাদের জন্য রং চা নিয়ে এলেন। তাকেই জিজ্ঞেস করলাম, হেমান টিলা চিনে কি না। বলল নাম শুনেছে। সেখানে কেউ নাকি যায় না। ভূত-প্রেত কি যেন আছে। কি দিন কি রাত ওই পথ কেউ মাড়ায় না। আমাদেরকে সাবধান করে দেওয়া হলো সেদিকে যেন না যাই। আর্মি ক্যাম্প থেকে সেদিকে না যাওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে বলেও জানিয়ে দেওয়া হলো আমাদের। আমাদের টিনের একচালা একটি ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। আমরা শুয়ে পড়েছি। হঠাৎ মধ্যরাতে বাবা উঠে মা’কে ডাকে।

এই শুনছ, তুমি কি কান্না শুনতে পাচ্ছো ? সেই কান্না, যে কান্না আমি শুনেছিলাম আমাদের বাড়ি পুড়ে যাওয়ার পর।

আমি ও মা ধড়মড় করে উঠে বসলাম। মাও কান্না শুনতে পাচ্ছেন আমিও। অথচ আমাদের কার, চোখে-মুখে ভীতি বা ভয়ের লেশমাত্র দেখা গেল না। ভয়ের বদলে বরং আমরা সে কান্নাই শুনতে চাচ্ছিলাম। বাবার চোখ গড়িয়ে চিক চিক করছে জল। মা একটু পর পর মুছে দিচ্ছিলেন। আমিও সম্ভবত বাবার কান্না দেখে কেঁদেছিলাম। বাবা হঠাৎ চলো-বলেই হাঁটতে শুরু করেন। আমিও ও মা তাকে অনুসরণ করতে করতে অন্ধকার চিরে ঢুকে পড়ি আরেক অন্ধকারে। ঝোপঝাড় ঠেলে বাবা এগিয়ে যাচ্ছেন। বোঝা গেল তিনি পুরনো পথ ভুলে যাননি। যেদিক থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে আমরা সেদিকে হাঁটতে থাকি। প্রায় বিশ মিনিট হাঁটার পর বাবা দাঁড়ান একটি বিরান পাহাড়ের ওপরে। চতুর্দিকে এত এত গাছ, ঝোপ-ঝাড়, জঙ্গল, অথচ আমরা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি তার আশপাশে সেসবের কোনও চিহ্ন নেই। নিকষ অন্ধকারেও পরিষ্কার দেখা গেল কোথাও কোনও ঘাসের অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই। আমরা এসে থামার সঙ্গে সঙ্গেই কান্না থেমে গেল। আমি কান পেতে শোনার চেষ্টা করেও আর শুনতে পাই না, কান্না। আমি বাবাকে পরিষ্কার দেখতে পাই এই অন্ধকারে। কোথা থেকে আলোর দীপ্তিতে ভরে গেল তার মুখ। চোখে-মুখে হেরে যাওয়া এক বিপ্লবীর তীব্র ক্ষোভ। সেই সঙ্গে জয় করতে না পারার অবসাদে যেন নেতিয়ে পড়তে চাইছিলেন তিনি। আমি বাবাকে ধরে দাঁড়িয়ে থাকি।

এই দেখ এটাই আমাদের বাড়ি। এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, অথচ পুরো বাড়ির জায়গাটি এখন পরিপাটি। কোথাও কোনও ময়লা জমে নেই। আর দেখ আমরা আসার পর কান্নাও গেছে থেমে!

বাবা কথাগুলো দম না নিয়ে টানা বললেন। মা আর আমিও খেয়াল করলাম, প্রতিদিন একটি বাড়ি ঝাড়-পোঁছ করলে যেমন পরিপাটি থাকে ঠিক তেমন।

আমার বাবা ছিলেন বিপ্লবী। রাজ পরিবারের সদস্য হয়েও সুযোগ নেয়নি। বরং এই এলাকা থেকে অন্যায়ভাবে খাজনা আদায়ের প্রতিবাদ করেছেন। কেবল রাজ পরিবার নয় বারবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রোষের মুখেও পড়েছেন। তারপরও থেমে থাকেননি। আমিও জড়িয়ে পড়ি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে। এই ছিল আমাদের অপরাধ। পুরো বাড়ির মানুষগুলোকে পুড়িয়ে মারল।

আমরা সারা রাত সেখান থেকে ফিরে আসিনি। মা’রও খুব ইচ্ছে ছিল দিনের আলোয় চারপাশ ঘুরে দেখবেন। সবে মাত্র রাত ঘষে-মেজে ভোরের আলো দেখা দিতে শুরু করেছে। মা চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। কাকে যেন দেখেছেন, কে যেন মা’কে ডাকছিল। বার্মিজ ডোয়া কাপড় পড়া, লম্বা চুল, বয়সি কোনও এক মহিলা। সব শুনে বাবা কিছুই বলে না।

আমার ভুল হয়ে গেছে। এত দিন না আসা ঠিক হয়নি। আমার মা এখনও এখানে ঘোরাফেরা করেন। নিশ্চয় অন্য সবাই আছে। আমি এখন থেকে প্রতিবছর একবার আসব। আমার মৃত্যুর পর তোমরা আসতে ভুল কোরো না। তখন তোমরা আমাকেও এখানে পাবে!

বাবা কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ততক্ষণে দিনের আলো এসে গেছে। আমরা শহরে ফিরে যাওয়ার জন্য যাত্রা শুরু করি। কিছুদূর আসতেই আবার সেই কান্না। আমার ঠিক মনে নেই, আমরাই কি কান্না থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম, না, কান্না আমাদের কাছ থেকে।

হরিহরের কথা শুনতে শুনতে নিতাই নিজেই যেন ঘুরে এলো সেই হেমান টিলা থেকে।

এর পর থেকে কি আপনি প্রতিবছর এখানে আসতেন ?

না আমি আর আসিনি। আমি জড়িয়ে পড়ি রাজনীতিতে। কলেজে পড়ি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন শেষে ধীরে ধীরে আমরা স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে হাঁটতে থাকি। আমার গুরু ছিলেন বসন্ত বাউল। আমাদের কোনও দল ছিল না। শেখ মুজিবের বক্তব্য শুনি, ভালো লাগে।

হরিহরের কথা এবার অন্য এক পর্বে প্রবেশ করছে, টের পায় নিতাই।

তারপর ?

আমার গুরু বলতেন, দেশ আর মা এক। এই অঞ্চল মানুষের, কোনও ধর্মের না। মা’কে রক্ষা করার জন্য কোনও দল লাগে না। এই বুক, এই সাহস থাকলেই হবে। কোন বুলেট এখানে বিঁধবে না গো। এখানে তো মায়ের হাত আছে।

আপনি কি যুদ্ধ করেছিলেন ?

শেখ মুজিবের সাত মার্চের ভাষণের পরে, আমি গুরু বসন্ত বাউলের সঙ্গে ভারতে যাই ট্রেনিং নিতে। ফিরে এসে চাঁটগাঁর পাথর ঘাটা ক্যাম্পে যোগ দিই আমি আর আমার গুরু। একটা গামছা দিয়ে অস্ত্র বেঁধে আমরা দু’জন একতারা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় গান গাইতাম। আমাদের ক্যাম্পে খবর দিতাম, হানাদারদের অবস্থান জানিয়ে। এক সময় পাক আর্মিরা জেনে গেল আমরা মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন ছিল নভেম্বর মাসের ২২ তারিখ। ফিরিঙ্গি বাজারের গলির মুখে আমি আর আমার গুরু আটক হলাম হানাদার বাহিনীর হাতে। আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় কর্ণফুলী নদীর পাড়ে এক ক্যাম্পে। বুঝতেই পারি আমাদের মেরে ফেলা হবে। গভীর রাতে গুরু বসন্ত বাউলকে নিয়ে গেল দুই নওজোয়ান এসে। যাওয়ার সময় গুরু বলেছিলেন, ‘বিপ্লবীর মৃত্যু হয় না। আবার দেখা হবে।‘ গুরুকে ওরা টেনে হিঁছড়ে নিয়ে গেল। আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি। কতক্ষণ পর আমাকে আরও দুই আর্মি এসে নিয়ে গেল ব্রিজঘাটায়। ঠিক ব্রিজের ওপর দাঁড় করিয়ে আমাকে গুলি করে। প্রথম গুলিটি আমার কপালে লাগার সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁপ দিই নদীতে। এর পর আর কিছুই বলতে পারি না। এক সময় বুঝলাম আমি একটি খাটে শুয়ে আছি। দুইজন মানুষ আমার কপালে বিঁধে যাওয়া বুলেট বের করার চেষ্টা করছে। এরপর আবার জ্ঞান হারাই। যখন আবার জ্ঞান ফিরে পাই তখন আশেপাশে মানুষের কথা শুনি কিন্তু কাউকে দেখতে পাই না। আমার তেমন কষ্ট হলো না। মানুষ দেখে কি হয়। মানুষই তো মানুষ হত্যা করল। মায়ের ইজ্জত লুটল, বোনের স্বপ্ন ভেঙে দিল। ওই মানুষকে না দেখাই ভালো। সেই থেকে আমি গুরুর খোঁজে এ ঘাট থেকে সে ঘাট ঘুরে বেড়াই। নিশ্চয় গুরুর সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে। তিনিই তো বলেছিলেন, বিপ্লবী মরে না। দেখা হবে আমার দাদার সঙ্গে। দেখা হবে আমার বাবার সঙ্গে। সঠিক মানুষকে অন্ধ চোখেও দেখা যায় গো বাবু। এই পাহাড় এখন আমার আবাস। এইখানে আমার সবাই আছে।

হরিহর আপনি অনেক বড় মানুষ।

কি জানি বাবু, আমি এতসব বুঝি না।

হরিহর হাতে তুলে নেয় সেই যন্ত্রটি। টিং টিং টাং টাং বাজে। গুন গুন করে সুর সাধে। সেই সুর যেন ঘুড়ির সুতোয় টেনে নামিয়ে আনে ভোর। চতুর্দিকে ফ্যাকাশে আলো। বাইরে এসে নিতাই দীর্ঘ শ্বাস নেয়। তুলোর মতো মেঘেরা পাহাড়ে চুমু দিয়ে দিয়ে সরে যাচ্ছে। ভোরের শীতল বাতাসে নিজেকে জঞ্জাল মুক্ত মনে হয় নিতাই’র।

নয়.

প্রায় সব দোকানের শাটার অর্ধেক নামানো। মোগলটুলি বাজারের মুখে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে নিতাই। সবার চোখে-মুখে আতঙ্ক। দ্রুত পা চালিয়ে যে যার গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। কলেজে মিছিল হচ্ছে। নিতাই ভাবে একবার কলেজে গিয়ে দেখে আসা যায় ক্লাস হবে কি না। ফাইনাল পরীক্ষা মাত্র কয়েক মাস বাকি।  কলেজের কাছাকাছি যেতেই কানে আসে―নিতাইচাদের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে। হই হই রই রই, সন্ত্রাসীরা গেলি কই ? নিতাই কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। তাকে নিয়ে আবার মিছিল কেন! আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। হঠাৎ চোখে-মুখে অন্ধকার নেমে এল। একটা মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন নেমে চোখ কালো কাপড়ে ঢেকে দিয়ে তাকে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায়। এবার ভীষণ ভয় পেয়ে যায় নিতাই।

তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ? আমাকে কলেজে যেতে দাও।

তোমাকে ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।

কোন্ ভাই।

চলো দেখবা কোন্ ভাই।

আমি কোথাও যেতে চাই না। আমাকে ছেড়ে দাও।

তোমার ইচ্ছায় তো মাইক্রোতে উঠাই নাই। সব ওই ভাইয়ের ইচ্ছা। তিনি ছাড়লে ছাড়া পাইবা।

মাইক্রো ভাঙা রাস্তায় আছাড় খেতে খেতে ক্যাচ ক্যাচ শব্দে চলে। বুঝা যায় মাইক্রো নির্জন কোনও স্থানে এসে পড়েছে। আশপাশে কোন মানুষজনের শব্দ পাওয়া যায় না। আরও প্রায় আধঘণ্টা চলার পর মাইক্রো থামে। কয়েকজন নিতাইকে উঠিয়ে নিয়ে অতনিদূরে একটি চকির ওপর রাখে। 

গত দু’দিন তুমি কোথায় ছিলা ?

কর্কশ কণ্ঠে কেউ একজন জিজ্ঞেস করল। নিতাইয়ের চোখ বাঁধা। কে জিজ্ঞেস করল চিনতে পারল না।

আমি বান্দরবান গিয়েছিলাম বেড়াতে।

শোনো, ধরো ওই বান্দরবন থেইকা তোমারে সন্ত্রাসীরা উঠাইয়া নিয়া গেছে। আন্ধার ঘরে পিছমোড়া কইরা বাইন্ধা রাখছে। এই এখন যেভাবে বান্ধা।

নিতাই বুঝে যায়। কারা তাকে তুলে এনেছে। এ মুহূর্তে সে রাজনীতির বলি। দাঁত কিটমিট করে একে রাজনীতি ভাবতে তার বমি আসে। এখান থেকে বেরুবার কোনও উপায় মাথায় খেলে না। তাছাড়া কোথায় নিয়ে এসেছে তাও বুঝতে পারে না। শহর থেকে প্রায় এক ঘণ্টার পথ। অন্তত মাইল ত্রিশেক হবে।

আমার চোখ খুলে দাও।

তার কথা কেউ শোনে না। দলের কেউ একজন চিৎকার করে বলছে, ‘ভাই হান্নান নাই। ওরে গুলি করছে পুলিশ। ওর লাশও গায়েব। নিতাই চিনতে পারে। হান্নান কলেজের কোন ছাত্র না। পাশের একটি টং দোকানে চা বিক্রি করে। মিছিলে থাকে। সে যে কলেজের ছাত্র নয় কিংবা কোনওদিন স্কুলেও যায় নি―তা বোঝার কোনও উপায় ছিলও না। অথচ কলেজের রাজনীতির বড় একটি অংশ সে নিয়ন্ত্রণ করত। হান্নানের একটি দল আছে। সবাই তার মতো বকলম। এরা কি তাহলে তারাই!

ভাই আপনারা কি হান্নানের বন্ধু ?

হ ক্যান ?

না হান্নানের মৃত্যুর খবর শুনে কষ্ট পেলাম। কলেজের পাশেই তো চা দোকান তার। ব্যবসা করত, তাতে করে নিজেও ভালো থাকত সংসারও। কেন রাজনীতির সঙ্গে জড়াল।

তোমার বেশি বুঝতে হইব না। এখানে তোমাকে পনের দিন থাকতে হইব।

কেন, পনের দিন কেন ?

তুমি তো নাই, তোমারে অপহরণ করা হইছে। পনেরদিন পর তোমারে কোনও এক রাস্তায় আমরা ফালায়া আইমু। কথা যদি না শোনো তুমিও খালাস হইয়া যাইবা।

হান্নানের মৃত্যুসংবাদ আর নিতাই নিখোঁজ হওয়ার খবর পুরো দেশে বিস্তার হয়ে যায়। রাজপথে, কলেজে, পাড়ায়, মহল্লায় চলছে মিছিল। পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। প্রতিদিন খবরের কাগজে গোলাগুলি আর লাশের খবর আসছে। হান্নান হত্যার প্রতিশোধ আর নিতাইকে ফিরিয়ে না দিলে আন্দোলন চলবে।

নিতাই’র ভগ্নিপতি তালেব বেরিয়েছেন বাজারের উদ্দেশে। গেট ছাড়িয়ে টিপটপ ড্রাই ক্লিানার্স পেরুতেই শুনতে পান কয়েকজন নিতাইকে নিয়ে কি যেন আলোচনা করছে। তাদের কথা শুনে চোখ স্থির হয়ে গেল তার। হিতাহিত ভুলে দৌড়াতে থাকেন কলেজের দিকে। সরাসরি অধ্যক্ষ্যের কক্ষে গিয়ে হাফাতে হাফাতে বলেন―

স্যার কিছুক্ষণ আগে নিতাই বাসা থেকে বেরিয়েছে কলেজে আসার জন্য। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কখন তাকে অপহরণ করল!

অধ্যক্ষ জামাল উদ্দিন কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে বাতেনের দিকে তাকান।

আপনি কে ?

আমি নিতাইর ভগ্নিপতি। ও আমার বাসায় থাকে।

কখন বাসা থেকে বেরিয়েছে বললেন ?

এই তো দুই, তিন ঘণ্টা আগে।

আপনি কি বলছেন এসব ?

আমি ঠিকই বলছি।

আমার কাছে খবর হলো, নিতাই তিন দিন আগে বান্দরবান বেড়াতে গিয়েছিল, সেখান থেকে তাকে কারা যেন অপহরণ করেছে। এ নিয়ে থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ তাকে উদ্ধারে নেমেছে।

না স্যার ও তো গতকাল বান্দরবারন থেকে ফিরেছে।

আপনি ঠিক আছেন তো! তাহলে ও যে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিল তারা কি মিথ্যে বলছে ?

অধ্যক্ষ পিয়নকে দ্রুত নিতাই’র বন্ধু, যাদের সে সে বান্দরবান গিয়েছিল তাদের ডাকতে বললেন। কিছুক্ষণ পর পিয়ন ফয়সলকে নিয়ে অধ্যক্ষের কক্ষে ফেরত আসে। ফয়সল জানাল তারা চারজন বান্দরবান গিয়েছিল। নিতাই বান্দরবান মেঘলা পাড়ে টেম্পো থেকে নেমে যায়। যে হোটেলে তারা থাকার কথা সেখানে নিতাই ফেরত আসার কথা থাকলেও ফেরেনি। দুই দিনেও তার কোনও খোঁজ না পাওয়ায় সবাই ফেরত আসে। কলেজে এসে আজই খবরটি ছাত্র নেতাদের জানানো হয়। জানানোর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মিছিল, ভাঙচুর।

স্যার, আমি বলছি নিতাই সকালে বাসা থেকে বেরিয়েছে কলেজে আসার জন্য। আমাকে একটু সময় দিন, আমি খুঁজে দেখি।

দেখুন খুঁেজ, পুলিশ খুঁজছে তাকে। সম্ভাব্য যেসব জায়গায় এ ধরনের অপহরণকারীরা থাকে সেসব স্থানে পুলিশ কড়া দৃষ্টি রাখছে।

বাতেন অধ্যক্ষ্যের কক্ষ থেকে বেরিয়ে মিছিলের দিকে যায়। পুরো কলেজ চত্বর গমগম করছে। গেটে এক ব্যাটলিয়ান সশস্ত্র পুলিশ। তাদের অবস্থান এমন কেউ গেট থেকে বেরুলেই গুলি করে ঝাঁজরা করে দিবে। হঠাৎ বাদামতলী মোড়ের দিকে ককটলে ফোটার শব্দ শোনা গেল। কিছু পুলিশ সেদিকে দৌড়াতে শুরু করেছে। একটু পরে বন্ধুকের ফায়ার হলো কয়েক রাউন্ড। তারপর সুনসান নীরবতা। কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে আবার মিছিল, নিতাই চাঁদের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।‘ উদ্দাম মিছিলের সম্মুখে অনেকটা টলতে টলতে গিয়ে দাঁড়ায় বাতেন। পুরো মিছিল থমকে যায়। মিছিলের অগ্রভাগে থাকা একজন সজোরে ঘুষি মেরে বাতেনকে ফেলে দেয় মাটিতে। আরও কয়েকজন এসে কিল-ঘুসি দিতে দেরি করে না। পুলিশ গে’ট থেকে নীরব দর্শকের মতো সব দেখছে। যেন ভেতরে হাতাহাতির পাতানো কোনও খেলা চলছে। দূর থেকে একই দৃশ্য দেখছিল অধ্যক্ষের পিয়ন। ভোঁ দৌড়ে এসে বাতেনকে জড়িয়ে ধরে মিছিলকারীতে নিবৃত্ত করে। বলে, এ লোক নিতাইর ভগ্নিপতি। পরিচয় জানার পরও মিছিলকারীদের তেমন কোনও ভাবান্তর হয়েছে বলে মনে হয় না। ছাত্রনেতাদের একজন, বদরুল এসে দাঁড়ায় বাতেনের সম্মুখে।

আপনি এখানে কেন এসেছেন ?

আমি আপনাদের জানাতে এসেছি, নিতাই গতকাল বান্দরবান থেকে বাসায় ফিরেছে। সে আজ সকালে কলেজে আসার জন্য বাসা থেকে বেরিয়েছিল।

সবার চোখে-মুখে বিস্ময় আর কৌতুকের ছায়া। এই আগন্তুক বলে কি! নিতাই অপহরণ হয়েছে বান্দরবান থেকে আর বলছে ও কাল বাসায় ফিরেছিল।

আপনার কি মাথা ঠিক আছে মিয়া, আমরা নিতাইকে উদ্ধারের জন্য গলা ফাটাইতাছি, আর আপনি আইছেন বিভ্রান্তি ছড়াইতে। আপনাকে কে পাঠাইছে ?

ভাই আমাকে কেউ পাঠায়নি। আমি খবরটি শুনেই ছুটে এসেছি। ও যদি অপহরণের শিকার হয় তা আজ সকালে হয়েছে এখান থেকেই, বান্দরবান থেকে নয়।

সবার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি। সবাই ঘিরে ধরেছে বাতেনকে। এ মুহূর্তে বাতেন যেন তাদের খেলার সামগ্রী। একেক জন একেকভাবে তাকে আঘাত করছে। আন্দোলনে ফাটল ধরাতে এসেছে, এমন অজুহাত তুলে লিকলিকে এক কর্মী বাতেনের কোমরে দু’টো লাথি মারে। বাতেল কোঁৎ করে শব্দ তুলে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তখন আর পিয়নেরও কিছু করার থাকে না।

হুঁশ ফিরলে বাতেন নিজেকে অবিষ্কার করে তার বিছানায়। শুনতে পায় স্ত্রী ঝুনু চিৎকার করে কাঁদছে। ভাই হারানোর বেদনা তার চিৎকার ও কান্নার সঙ্গে চার দেয়াল টপকে জনলোকে লাফিয়ে পড়ছে। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে উৎসুক জনতা জানালা-দরজার ফাঁক গলে ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকে। কেউ কোনও প্রশ্ন করে না। এমনকি পাশের ফ্ল্যাটে থাকা চিরচেনা প্রতিবেশীরাও তাদের ঘরে এসে একবার জিজ্ঞেস করেনি কি হয়েছে! বাড়ির গেটে দু’টি পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখে একটি কুকুর মাঝে মাঝে ঘেউ ঘেউ করে উঠছে। পুলিশ দু’টোর এ মুহূর্তে কাজ হচ্ছে কুকুরকে নিবৃত্ত করা। ভিতর থেকে ভেসে আসা জোছনার কান্না তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারচেয়ে পাশের চা দোকান থেকে দু’টো শিঙাড়া, ধোঁয়া ওঠা দু’কাপ চা বিনা পয়সায় পেয়ে যাওয়াটা বড় সুখের। এতে করে তারা নিজেদের বেশ ক্ষমতাবানও মনে করে। ভয়ে দোকানি পয়সা নিল না! কুকুরের টানা ঘেউ ঘেউ শুনে বাতেন নিজেকে টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে কেঁচোর মতো গড়াতে গড়াতে বারান্দায় এসে রেলিং ধরে দাঁড়ায়। দেখে পুলিশ দু’টো চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরায়। দেখে বাতেন মেঝেতে বসে পড়ে। তাকে দেখল কি না এ চিন্তায় আবার অস্থির হয়ে ওঠে। চাপা গলায় ধমকে উঠলে ঝুনু কান্না গিলে ফেলে। কেবল চাপা বিলাপের মতো কুঁই কুঁই শব্দে ফানক শাপের মতো ফুঁস ফুঁস করে উঠছে। একটু পরে দরজায় টোকা পড়ে। কান খাড়া করে বাতেন বুঝতে চেষ্টা করে ভুল শুনছে কি না। না, দরজায় টোকার জোর ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে। ধীরে দরজার কাছে গিয়ে কান পেতে চেষ্টা করে আগন্তুকের কথা শোনার। না, বাইরে বুটের শব্দ আর দরজায় টোকার শব্দ ছাড়া কারও কোনও কথা শুনা যায় না। বাতেন সাহস করে দরজা খুলে দেয়। এতক্ষণ গেটে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ দু’টো হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে ঘরে।

শুনুন, আমরা গে’টে আছি। কোন ভয় নেই। তবে আমরা পুরো ঘরে একটু তল্লাশি চালাব। আচ্ছা নিতাই, মানে যাকে অপহরণ করা হয়েছে সে আপনার কি হয় ?

আমার শালা।

সে যে অস্ত্রগুলো ব্যবহার করত সেগুলো কোথায় জানেন নিশ্চয় ?

অস্ত্র! না, না ও কখনও ওসব হাতে নেয়নি।

আমাদের কাছে তথ্য আছে। এ মাত্র ওয়ারলেসে হেডকোয়ার্টার থেকে পুরো ঘর তল্লাশির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের কাজ করতে দিন।

ঝুনু পাশের ঘর থেকে গুমরে গুমরে কাঁদছেন। বিড় বিড় করে কাকে যেন অভিশাপ দিচ্ছেন। এরমধ্যে গ্রাম থেকে নিতাইর বাবা-মা, ভাই বোন এসে উপস্থিত হয়েছে। ঘরে পুলিশ দেখে অন্যরা কিছুটা ইতস্তত সরে গেলেও নিতাইর বাবা মিরচান এগিয়ে পুলিশের তল্লাশি প্রত্যক্ষ করে। পুলিশ তাঁকে দেখে একটু থমকে দাঁড়ায়।

আপনি কে ?

আমি নিতাই’র বাবা।

ছেলেকে রাজনীতির নামে সন্ত্রাস করতে লাগিয়ে দিয়েছেন কেন ?

কি বলছেন এসব। ও কোনও রাজনীতি করে না।

কি বলেন, পুরো দেশ এখন নিতাই চাঁদের উদ্ধারে উত্তাল, আর আপনি বলছেন রাজনীতি করে না।

আমি তো বললাম ও কোনও রাজনীতি করে না। তাকে কোনও একটি চক্র ফাঁসিয়েছে। আপনারা এখনও নিতাইর কোনও খোঁজ পেলেন না ?

আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে তাতে সরকার দল নিতাইকে অপহরণ করেনি। কারা এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তা বের করার চেষ্টা চলছে।

ওদিকে পাশের ঘর থেকে সম্মিলিত কান্নার রোল উঠেছে। নিতাইর মা বিলাপ জুড়ে কাঁদছেন। অপহরণকারীদের খোদার কহরে দিচ্ছেন। বলছেন যারা এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী যাতে ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের শরীরের মাংস খসে খসে পড়ুক। তারা কুকুর বিড়ালের খাবার হোক। বোনদের কেউ একজন হেছকি তুলে তুলে কাঁদছে আর বলছে, নিতাই কখনও সন্ত্রাসে যুক্ত ছিল না। কোনও রাজনীতির সঙ্গেও সে যুক্ত নয়। কেন তার সহজ সরল ভাইটিকে সন্ত্রাসীরা অপহরণ করল। বসার ঘর থেকে ভেসে আসছে টেলিভিশনে রাত আটটার খবর। নিতাই অপহরণ ঘিরে পুরো দেশে কোথায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে সেসব দেখানো হচ্ছে। সবাই দৌড়ে বসার ঘরে ঢুকে পড়ে। দুই পুলিশও বাদ যায় না। খবরের প্রায় অর্ধেকজুড়েই ছিল নিতাই অপহরণকে কেন্দ্র করে পুরো দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা। রাজধানী উত্তাল। দেশের বড় বড় শহরগুলো নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। গাড়ি-ঘোড়া চলছে না। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে গেল। শুধু বিটিভি নয়, বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, টাইমসসহ আন্তর্জাতিক প্রায় সব মিডিয়ায় গুরুত্ব পেল নিতাই অপহরণ এবং একে ঘিরে পুরো দেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ঘটনা। কোনও সংবাদমাধ্যমে নিতাইকে তুখোড় ছাত্রনেতা, কোথাও সাধারণ ছাত্র আর কোথাও কোথাও সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করে সংবাদ হয়েছে। ফলে নিতাই এখন শুধু দেশে নয়, বহির্বিশ্বেও একটি পরিচিত নাম।

অপহরণের প্রায় দশ দিন অতিক্রান্ত কিন্তু নিতাইর কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তার টিকিটিরও খোঁজ দিতে পারল না। পরিবারের সবাই এক রকম আশা ছেড়েই দিয়েছে।

নিতাইকে যে ঘরে রাখা হয়েছে তাতে বাইরের কোনও আলো প্রবেশ করার সুযোগ নেই। গুদাম ঘর, কোনও জানালা নেই। ভারী কাঠের দরজার ফাঁক গলে সূতানলি শাপের মতো এক ফালি আলোয় বুঝা যায় পুরো ঘরের চতুর্দিকে মাকড়সার জাল। নিতাই প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় সব খবর পেয়ে যাচ্ছে। খবরের সময় কেউ একজন দরজার ওপাশে রেডিও ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে। ভাঙা ভাঙা নেটওয়ার্কে প্রচারিত খবরের সবটুকু কান খাড়া করে শোনে নিতাই। সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়া সে সংবাদে অপহরণে সরকার দলের জড়িত না থাকার সহস্র অজুহাতে ভরা। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতাদের  বিবৃতিতে ভরপুর সংবাদ।  

কিন্তু আন্দোলনকারীরা দমার নয়। এটাই সুযোগ। সরকার হঠাও আন্দোলনের তুরুপের তাস নিতাই। এমন একটি হট ইস্যু পেয়ে জমে উঠেছে আন্দোলন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা ও কূটনীতিকদের সহায়তা চেয়েছে। সবাই খোঁজ খবর নিচ্ছে। বহির্বিশ্বের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও খোঁজ খবর লাগিয়েছে। তবে তারা অপহরণের ঘটনার চেয়েও নিতাই কে,  সে বিষয়ে জানতে আগ্রহী বেশি। যাকে নিয়ে কেবল বাংলাদেশে নয় পুরো বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যমগুলো ব্যস্ত, নিশ্চয় রাজনীতিতে তার সে প্রভাব রয়েছে। খবর পাওয়া গেল এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী সিআইএ। সারাদেশের প্রতিটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে উত্তাল। পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনে নিতাইর ছবি। দেয়ালে দেয়ালে চিকার সঙ্গেও ভেসে উঠছে ব্লকে মারা তার ছবি। এ মুহূর্তে পুরো দেশের রাজনীতি নিতাইময়। কখনও পুলিশ, কখনও নেতা আর কখনওবা অপরিচিত কিছু মানুষজন এসে বাতেনের ঘরে অতর্কিতে প্রবেশ করছে। বিস্তর প্রশ্নে বাতেন, জোছনা ও নিতাই’র বাবা-মা’কে জেরা করা হচ্ছে। একদিন দেখা গেল বাতেনের ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। অতিষ্ঠ হয়ে গভীর রাতে বাসা ছেড়ে তারা নিরুদ্দেশ। মিডিয়া, পুলিশ আর নেতারা নাছোড়। খোঁজ-খবর করে নিতাইদের হাজারি তালুক গ্রামের বাড়িতে গিয়ে হাজির। পুরো গ্রাম আতঙ্কে নড়েচড়ে ওঠে। নিতাইকে নিয়ে গ্রামের কেউ কেউ নানান খিস্তি খেউড় আউড়াতে ভুল করছে না। গ্রাম ছেড়ে শহরে পড়তে যাওয়ার এই দশা।

আজ চৌদ্দ দিন সন্ধ্যা। পনের দিন পর তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। সে হিসেবে আর একদিন বাকি। তাকে যে ঘরে রাখা হয়েছে তাতে দিন না রাত বোঝার উপায় নেই। দরজার ওপাশ থেকে কেউ একজন ভারী গলায় বললল―

নিতাই চৌদ্দ দিন হইয়া গেল। সন্ধ্যা নাইমা গেছে। রাত পোহালেই পনের দিন। ভাই একটু পর আইব। তোমার লগে কথা কইব। কাইল তোমারে মুক্ত কইরা দেয়া হইব।

নিতাই সেই ভাইয়ের অপেক্ষা করে। কে সে, কেন তাকে আটকে রাখল। পুরো দেশে এমনকি বহির্বিশ্বেও তোলপাড় তুলে দিল তাকে অপহরণ করে! হঠাৎ কব্জার ভারী শব্দে দরজা গেল খুলে। কোনও আলো নেই। অন্ধকারেই কেউ একজন প্রবেশ করেছে ঘরে, নিতাই টের পায়।

শোনো নিতাই। তুমি এখন হিরো। আমি তোমারে এই হিরো বানাইছি। তোমারে অপহরণ কইরা আন্দোলনের মাঠ গরম কইরা দিছি। দেশ-বিদেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন তোমারে নিয়া নিউজ বানাইতাছে। এখন আমি যা কইমু তুমি সে মত কাজ করবা।

আপনি কে ?

আমার পরিচয় জানবার চেষ্টা লইও না।

আমাকে কেন এখানে এনেছেন ?

তা তো কইলাম একটু আগে। ইস্যু, তোমারে দিয়া ইস্যু বানাইছি। মিয়া তুমি তো বিরাট নেতা হইয়া গেছ এখন। বড় বড় নেতাগো লগে রাজনীতি করবা। এর জন্য আমারে মনে রাখবা। আমি তোমারে বড় নেতা বানাইয়া দিছি।  পুরা বিশ্ব এখন তোমারে চিনে। আরে সিআইএ তোমার খবর লইতাছে মিয়া!

আমাকে ছেড়ে দিন।

শোনো মিয়া, তোমারে কাইল ছাইড়া দিমু। আমার লোকজন তোমারে জায়গামতো নামাইয়া দিয়া আইব। কিন্তু তার আগে খুব মন দিয়া আমার কথা শোনো। পরশু কলেজের শহিদ মিনারে তোমারে ফুলের মালা দিয়া বরণ করব নেতারা। কেন্দ্রীয় নেতারাও থাকব।

কেন ?

কারণ তোমারে আমরা তো অপহরণ করি নাই। আমরা তোমারে উদ্ধার করছি। টানা পনের দিনের আন্দোলন, সারাদেশ কাঁপাইয়া দিছি। ক্যান ? তোমারে উদ্ধার করনের লাইগা। বুঝছ মিয়া কি কইছি ?

নিতাই বুঝতে পারে না এই লোক কি বলতে চায়। এত দিন আটকে রাখল আর এখন বলছে অপহরণ করেনি!

আপনারা তো আমাকে অপহরণ করেছেন, উদ্ধার করলেন কই ?

ওই মিয়া বেশি কথা হুনতে চাই না। যা কইতাছি তা কইবা তা না অইলে ফটাশ। বুঝে আইল আমার কথা ?

নিতাই কিছুটা বুঝার ভান করে। ভেবে দেখে এখান থেকে মুক্ত হতে হলে তার আর কোনও উপায় নেই।

আমাকে কি করতে হবে ?

শহিদ মিনারে তোমারে ফুল দিয়া বরণ করার পর বক্তব্য দিবা। তাতে কইবা, ‘আজকে এইখানে যে নেতারা উপস্থিত আছেন সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। মাঠে যেসব নেতা-কর্মী আন্দোলন করেছে আমার মুক্তির লাইগা সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমি, আইজ এই শহিদ মিনার থাইকা সরকার পতন আন্দোলনের ডাক দিলাম। জেগে ওঠো সারাদেশ। আমারে যারা অপহরণ করছে তাগোর ক্ষমতায় থাকনের কোনও অধিকার নাই।’  কি পারবা না ? আমি যা কইছি তা তুমি তোমার মতো কইরা সাজাইয়া কইয়া দিবা। তোমার কপাল তো খুইলা গেছে মিয়া। এরে কয় রাজনীতি বুঝলা নিতাই মিয়া। তোমার ভবিষ্যৎ ফকফকা। আর হ্যাঁ মনে রাখবা, যা বলেছি তা বক্তব্যের আগে কাউরে কইবা না।  

নিতাই বুঝতে পারে, অপহরণ করে খেলা মাত্র শুরু করেছে তারা। তাকে নিয়ে আরও কত খেলার পরিকল্পনা করেছে তা হয়তো জানা যাবে পরে। কিছুক্ষণ পর আবারও কব্জায় ভারী আওয়াজ করে বন্ধ হয়ে যায় দরজা। সেই লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে।

সেই চিকন আলো ঘরের মেঝেতে সূতোর মতো গড়াগড়ি দিতে দেখে নিতাই বুঝতে পারে ভোর হয়েছে। কিছুক্ষণ পর একটি হাত দরজার আড়াল থেকে মাটির সানকিতে পান্তাভাত ঠেলে দেয়। প্রতিদিন সকালের খাবার ছিল এই পান্তাভাত। দুপুরে একটি তরকারি দিয়ে ভাত, রাতে রুটি ভাজি। এই খেয়ে পনেরোদিন পার করেছে নিতাই। এতে তার তেমন কষ্ট যে হয়েছে তা নয়। গ্রামে এমন খাবার খেয়েই তো কৈশোর পার করে এসেছে সে। দরজার ওই পার থেকে কেউ একজন কর্কশ গলায় বলে―

খাইয়া রেডি থাক, আমরা আইতাছি তোমারে লইয়া যাইতে। তোমার আইজ ঈদের দিন। মুক্তি পাইবা।

নিতাই খেয়ে অপেক্ষায় থাকে। তখনও সকাল গড়িয়ে দুপুরে পড়েনি। হুড়মুড় করে মুখে কাপড় বাঁধা তিনজন ঢুকে পড়ে ঘরে। ঝাপটে ধরে নিতাইয়ের হাত পিছমোড়া করে বাঁধে। চোখে আবার সেই কালো কাপড় বেঁধে দেয়। সে আর কিছুই দেখতে পায় না। পাঁজাকোলে করে তিনজন মিলে তাকে হেছকা টেনে যেন কোথায় ফেলে দেয়। একটু পরেই বুঝতে পারে মাইক্রো বা জিপ জাতীয় কোনও গাড়ি হবে। নিতাই সিটের মাঝখানের প্যাসেজে পড়ে আছে, গাড়িটি চলতে শুরু করেছে। পুরো গাড়িতে সিগারেটের বিদঘুটে গন্ধ। যেন ভিজে যাওয়া সিগারেট টানছে কেউ। নাকি গাঁজা বোঝা মুস্কিল। ভাঙাচোরা রাস্তায় হোচট খেয়ে খেয়ে চলে গাড়িটি। গাড়িতে বসা কারও কোনও সাড়াশব্দ নেই। কেবল পুলিশ দেখলেই বলে ওঠে―

এই ড্রাইভার পুলিশ আটকাইতে চাইলেও থামবা না। মাল আছে লগে প্রয়োজনে ফায়ার করমু।

এই কথায় ড্রাইভার গাড়ির গতি কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট গাড়ি চলার পর আশপাশে রিকশা, টেক্সি-টেম্পুর শব্দ শোনা যায়। আরও কিছু সময় পরে মানুষের কোলাহলও কানে আসে। আরও প্রায় পনের মিনিট চলার পর গাড়ি এসে থামে এক জায়গায়। বুঝা যায় শহরের কোনও ব্যস্ত এলাকা এটি। চোখ বাঁধা অবস্থায় গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে নিতাইকে ফেলে দেয় কেউ একজন। কিছুক্ষণ পরে চতুর্দিক  থেকে উৎসুক মানুষের ভিড় জমতে থাকে। কেউ তার চোখের বাঁধন খুলে দিতে রাজি হয় না। ভিড় দেখে বাঁশিতে দম দিতে দিতে এসে হাজির হয় পুলিশ।

এই কি হচ্ছে এখানে। সরুন, এখান থেকে সরে যান।

পিছমোড়া করে বাঁধা একটি মানুষ, চোখেও কালো কাপড়ে বাঁধা। দেখে পুলিশ ওয়ারলেসে হেডকোয়ার্টারে কি যেন বার্তা দেয়। আর, পুলিশের এক সদস্য খুলে দেয় চোখের বাঁধন। প্রচণ্ড আলোয় নিতাই ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখে নিউ মার্কেটের ফুটপাতে পড়ে আছে। চতুর্দিকে কয়েকশ মানুষ তাকে ঘিরে ধরেছে। পুলিশ ফুস-ফাস বাঁশি বাজিয়েও পাবলিক থামাতে পারছে না। এর মধ্যে পুলিশ সদস্যরা নিতাইকে চিনতে পেরে ত্বরিত ভ্যানে তুলে নেয়। থানায় নিয়ে ওসির কক্ষে বসিয়ে রাখে। নিতাইকে দেখে পুলিশ সদস্যরাও উৎসুক হয়ে পড়েছে। হওয়ারই কথা। এই সেই নিতাই! যার জন্য পুরো দেশ কাঁপছে। যাকে নিয়ে আলোচনা এখন বিশ্বজুড়ে। খবর পেয়ে পুলিশের বড় বড় কর্তারা এসে হাজির। সরকার দলীয় কয়েকজন নেতাও উপস্থিত হলেন। আন্দোলনকারীরাও থানার বাইরে এসে ভিড় জামাতে শুরু করেছে। মিছিল নিয়ে নগরের একজন নেতা থানায় ঢুকে পড়েছেন। নিতাই কে আসছে, কে যাচ্ছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। একজন পুলিশের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে মোবাইলে ফোন করে বাতেন কে। কোনও কথা না বলে কেবল জানিয়ে দিল নিজের অবস্থান। ফোন কেটে দেয়। পুলিশের এক বড় কর্তা এবার জেরা করতে শুরু করেছে―

আচ্ছা নিতাই আপনি কোথায় ছিলেন এতদিন ?

আমি জানি না।

মানে কোথায়, কোন্ স্থানে আপনাকে অপহরণকারীরা রেখেছিল কিছুই মনে করতে পারছেন না ?

কেন মনে করতে পারব না। আমাকে একটি বদ্ধ ঘরে রাখা হয়েছিল। সে ঘরে কোনও আলো বাতাস ছিল না।

সেটি কোথায় ?

তা তো বলতে পারব না। তবে খুব বেশি দূরে নয়, গাড়িতে এক ঘণ্টার পথ।

আপনাকে কারা আটকে রেখেছিল ?

তা তো জানি না।

তাদের কোনও কথা শোনেননি আপনি ?

হ্যাঁ শুনেছি।

আপনার আশপাশে থাকা লোকজন কি নিয়ে কথা বলত ?

সেসব কথার কোনও আগামাথা আমি বুঝতে পারতাম না।

হুম। আপনার পরিবারের কাউকে খবর দিয়েছেন ?

হ্যাঁ দিয়েছি। আসবেন।

আপনার কি মনে আছে কোথা থেকে আপনাকে অপহরণ করা হয়েছিল ?

মোগলটুলি বাজারের মোড় থেকে।

বান্দরবান থেকে নয় ?

না, আমি বাসা থেকে কলেজে যাওয়ার পথে একটি মাইক্রো আমাকে তুলে নিয়ে যায়।

আপনি প্রতিবাদ করেননি কেন ?

সে সময় পাইনি। ওরা আমার চোখ বেঁধেই গাড়িতে তুলে দ্রুত টান দেয়।

আচ্ছা আপনার কি মনে হয়, কেন ওরা আপনাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ?

দেখুন চতুর্দিকে কত কিছুই তো হচ্ছে। সব কিছুর কি কার্যকারণ আছে ?

আপনি কিন্তু প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছেন।

আপনি প্রশ্ন করলেন কই, আপনি তো জেরা করছেন, আমি তো আগেই বলেছি কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল জানি না। কেন নিয়েছিল তা আপনাদের তদন্তে উঠে আস উচিত।

দেখুন আপনার বিষয়টি এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। আমরা এটিও বুঝতে পারছি না কেন আপনার বিষয়ে সবার এত আগ্রহ।

যাদের আগ্রহ তাদের জিজ্ঞেস করুন।

পুলিশ কর্মকর্তা ঝোলানো থুঁতনিতে দীর্ঘ ছায়া নিয়ে বসা থেকে উঠে পড়ে। নিতাইকে প্রশ্ন করতে গিয়ে নিজেও কিছুটা বিভ্রান্ত। তাকে জোর করে কিছু বলাও যাচ্ছে না। চতুর্দিকে সিআইএ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার আনাগোনা। নিতাইকে ঘিরে কি হচ্ছে তা মুহূর্তে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন সংবাদে।

নিতাইকে ওসির কক্ষেই বসিয়ে রাখা হয়েছে। উৎসুক মানুষের আনোগোনোর কমতি নেই। প্রায় দুই ঘণ্টা পরে থানায় এসে পৌঁছায় বাতেন ও মিরচান। নিতাইকে জড়িয়ে ধরে মিরচান চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ে। কিন্তু নিতাইর কোনও ভাবলেশ নেই। সে আগের মতোই বসে আছে এবং অস্ফুটে বলে―

বাবা কান্না কেন করছ।

একটু পরে ওসি প্রবেশ করেন। বাতেন আর মিরচানের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিজের চেয়ারে বসে পড়েন। ইতোমধ্যে  বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে সাংবাদিকরা বাইরে জমায়েত হতে শুরু করেছে। আছে কিছু বিদেশি সংবাদ মাধ্যমও।

আপনাদের পরিচয় ?

আমি ওর বাবা। আর ও বাতেন আমার মেয়ের জামাই।

নিতাই অপহরণ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য কি ?

আমাদের কোন বক্তব্য নেই। ও ফিরে এসেছে তাতেই আমরা স্বস্তি ফিরে পেয়েছি।

বাতেন কথাগুলো ঊর্ধ্বশ্বাসে বলে শ্বশুরের দিকে তাকায়।

নিতাই বলছিলেন যে, তাকে মোগলটুলি মোড় থেকে অপহরণ করা হয়েছিল―

জি ঠিক বলেছে। সে কথাই আমি কলেজে অধ্যক্ষ আর আন্দোলনকারীদের বলেছিলাম। উল্টো ওরা আমাকে বেধড়ক পেটাল।

দেখুন বাতেন সাহেব পরিস্থিতি তখন বেসামাল।

হ্যাঁ আমাকে যখন মারা হচ্ছে তখন গেট থেকে পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে।

হ্যাঁ বুঝতে পারছি আপনার কথা। শুনুন এখন আপনারা কি কোনও মামলা করতে চান ?

না না কোনও ঝামেলায় আর যেতে চাই না।

মিরচান বলে ওঠেন।

তাহলে এক কাজ করুন এই কাগজটিতে সই করে দিন। তাহলে আমরা নিতাইকে আপনাদের হাতে তুলে দিতে পারব।

মিরচান দ্রুত সই করে বাতেনসহ নিতাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। থানার বাইরে আসতেই তাদের ঘিরে ধরে সংবাদকর্মীরা। ঘাবড়ে যান বাতেন ও মিরচান। নিতাই থাকে স্বাভাবিক। এক পলক সবার দিকে তাকিয়ে বলে―

কাল শহিদ মিনারে আসুন সেখানে সব বলব।

নেতা মঞ্চে যাওয়ার আহ্বান জানালে নিতাই এগিয়ে যায়। কারও দিকে দৃষ্টি না ফেলে সোজা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে শহিদ মিনারে। সাংবাদিক, ক্যামেরা সবাই তৈরি। বিদেশি বেশ কয়েকটি মিডিয়াও উপস্থিত। নিতাই কথা কিংবা বক্তৃতার মাঝামাঝি পর্যায়ের অনুচ্চ শব্দে কোনও ভূমিকা ছাড়াই কথা শুরু করে―

কারা আমাকে অপহরণ করেছিল সে গল্প করতে চাই না। আমি একজন সাধারণ মানুষ মাত্র। পুরো দেশই তো অপহরণকারীদের কাছে জিম্মি। অতএব অপহরণ নাটক শুনিয়ে আপনাদের রস্বাদন করাতে পারছি না বলে ক্ষমা করবেন।

মিডিয়াগুলো নড়ে চড়ে ওঠে। নেতারা একে অপরের দিকে চোখ ঠেরাঠেরি করে। সেদিকে নিতাই’র ভ্রুক্ষেপ নেই। বলে চলে―

পঁচাত্তর পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে সে অর্থে কোন রাজনীতি ছিল না। যা ছিল তা একেকটি দলের তৈরি ক্ষমতায় যাওয়ার নীতি। গণতন্ত্র সম্পর্কে কোনও দলের ধারণা নেই। আমাদের দেশে  গণতন্ত্র হচ্ছে প্লেটোর  সেই শিপ অব স্টেট, যেখানে জাহাজের মালিক নিজেকে সকল যাত্রী থেকে বেশি ক্ষমতাবান মনে করে। যারা সমাজতন্ত্র বলে গলা পর্যন্ত আকন্ঠ ডুবে থাকে তারা পুঁজির কাছে অসহসায় বেশ্যা বনে যায়। ধর্মের নামে যারা রাজনীতি করে তারা একাত্তরেই নিজের পরিচয় দিয়েছে, সে পরিচয় এখন আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

আমরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে বসবাস করি, কিন্তু কোনও মানুষ স্বাধীন নন। এখন কোনও রাজনীতি হয় না, হয় দুর্বৃত্তায়ন। ডাকাতদের হাতে আমাদের দায়িত্ব। তাতে করে কি হবে, হয় আমরা ডাকাত হব, না হয় ডাকাতদের হাতে মারা পড়ব। এখন সময় হলো সঠিক চিন্তায় উপনীতি হওয়া। আমরা কি করব ? কোন্ নীতিতে বিশ্বাস করব ? চলমান রাজনীতি আপনাকে এসব প্রশ্নের কোনও সমাধান দেবে না। কারণ সে তো নিজেই অন্ধ, আপনাকে পথ দেখাবে কি করে ?

দলের কিছু পাতি গোছের কর্মী হাতে লাঠি তুলে নেয়, আবার ফেলে দেয়, নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে তারা। নেতাদেরও সম্ভবত ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে যাচ্ছে। তারাও কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা রোগীর মতো চোখ-মুখ খিচিয়ে মোছড়া-মুছড়ি করে। এই টুকুতেই আপাতত ক্ষোভ বিসর্জন দিতে হচ্ছে তাদের। এর বেশি কিছু করার উপায় নেই। কলেজের শিক্ষকগণ এবং সাধারণ ছাত্ররা নিতাইর বক্তব্য সহবতের সঙ্গে শুনছে। এক একজনের চোখে বিস্ময়, কি বলতে চায় নিতাই ? নিতাই বলেই চলে―

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চারটি মূলনীতি আমাদের জন্য রেখে গেছেন। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ। এসবের কিছুই আমাদের কর্মে প্রতিফলিত নয়। শুধু এই আদর্শসমূহের নাম ভাঙিয়ে আমরা কেউ যাচ্ছি ক্ষমতায় আর কেউ ক্ষমতার বাইরে থেকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ড্রেনে ঠেলে দিচ্ছি। বিশ্বাস করুন আমাকে অপহরণ করার পর এতটুকু অবাক হইনি। আমাকে মোগলটুলি মোড় থেকে তুলে নেওয়া হল। কারা তুলে নিলো তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ সব শিয়ালের তো একই রা। কেউ জাত শিয়াল আর কেউ খেক শিয়াল এই যা।

এ পর্যন্ত কথা বলে নিতাই চারদিকে দেখে এ পলক। পুরো মাঠ ভর্তি মানুষ। বহিরাগত মানুষ কলেজের দেয়াল টপকে প্রবেশ করছে মাঠে। মিডিয়ার ক্যামেরা এবং সাংবাদিকরা ছেদহীন মনোযোগে শুনছেন। আবার কথা বলতে শুরু করে―

আমরা একটু ইতিহাস সচেতন হই। তাহলে কেন আমরা ভারত ভাগ করলাম, কেন পাকিস্তান থেকে নিজেদের আলাদা করলাম ? কেন স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে প্রাণ দিলাম! 

আমরা সেসব ভুলে গেছি। এখন বাংলাদেশে কোনও রাজনীতি হয় না। যে রাজনীতিতে অস্ত্র কথা বলে তা আর রাজনীতি থাকে না। যে রাজনীতিতে শিল্প-সংস্কৃতি ও দর্শন চর্চা হয় না তা জনমঙ্গলের রাজনীতি নয়। আমি একজন বংশীবাদকের মধ্যে চিন্তার যে গভীরতা দেখেছি, একজন অন্ধ গায়ককে দেখেছি যেভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন দেশের জন্য, যে সরল কৃষককে আমি দেখেছি নিমগ্ন ফসল উৎপাদনে, সে একনিষ্ঠতা, সে চিন্তার উলম্ফন আমি আজকের কোনও রাজনীতিকের মধ্যে দেখি না। কারণ এখন আর রাজনীতি চর্চা হয় না। তাদের চর্চা ঘূর্ণায়মান খুন, অপহরণ আর ক্ষমতার লালসা।

নিতাই কথা শেষ করতে যাবে এমন সময় দূরে কলেজের বারান্দায় দেখা যায় কলি একা একা দাঁড়িয়ে নিতাইর দিকে তাকিয়ে আছে বিষণ্ন চোখে। নিতাই কথা শেষ করে―

দশ.

সন্ধ্যে হলেই মনে হয় রাত গভীর। নিতাইকে ঘিরে যে ভীতি পথে-প্রান্তরে, পাড়া-মহল্লায় ছোপ ছোপ পড়ে ছিল তা এখনো বিরাজমান। মাঝে মাঝে মহল্লার পাহারাদারের কর্কশ বাঁশি সব নীরবতা ভেঙে কিছু সময় কানে লেগে থাকে। কুঁই কুঁই করে কুকুরের টানা চিৎকার টেনে টেনে আরও অন্ধকার নামায়। রাতের খাওয়া সেরে সবাই শুয়ে পড়েছে। কেবল জেগে থাকে নিতাই। জানালার ফাঁক গলে দেখা যায়, বাজারের গলির মুখে পুলিশের ভ্যান এসে দাঁড়িয়েছে। কিছুক্ষণ পর দু’টো খেটে খাওয়া প্রকৃতির মানুষকে পাছায় লাথি মেরে, মাদারচুত রাস্তায় … চোদইবার আইছ বলে তুলে নিয়ে চলে যায়। মানুষ দু’টো লাথি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে ভ্যানের ভেতর। নিতাই মৃদু হাসে। অন্ধকারে বুঝতে পারে না এ হাসির রঙ কেমন! ভাবে দেশ কি মানুষের, না পুলিশ কিংবা রাজনীতিকদের! সব চলছে পুলিশ আর রাজনীতিকদের ঈশারায়। এমন দেশ কে চেয়েছিলেন ? আজীবন যারা সংগ্রামী ছিলেন, নিশ্চয় তারা এমন কোনও দেশ চাননি। তাহলে, কেন এই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে আমাদের যেতে হচ্ছে! কোথায় ভুল ছিলো ? হঠাৎ বাইরে থেকে সরু একটা আলোর কাঠি যেন লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। নিতাই যা ভাবছিল তার উত্তর যেন সেই সরু আলোয় জেগে আছে! সেই আলোর কাঠিতে ভর করে বহু দূর থেকে একটি বাঁশির কান্না ধেয়ে আসছে। সে কান্না ধীরে ধীরে শিসের মতো চিকন হয়ে মিলিয়ে যায় মগজের ভেতর। শহরের ইট পাথরে যন্ত্রের বাদ্য শোনা যায়, কিন্তু বাঁশি! এই ভর রাতে বাঁশি গ্রাম আর শহরের দূরত্ব যেন ঘুচিয়ে দেয়।  কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে একটি মেয়ে কণ্ঠ ফিন ফিনে বাতাসের সঙ্গে কানে এসে লাগে। নিতাই কান খাড়া করে সতর্কভাবে সে কণ্ঠ শোনার ও চেনার চেষ্টা করে। তাকেই ডাকছে! কে সে ? জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়, কারও উপস্থিতি বোঝা যায় না। তবে সেই ডাক ভেসে এসে তার কানে ধাক্কা দিয়ে যায়। বাইরে না গেলে কে সে বোঝা মুস্কিল। অন্ধকারে তার ভালোও লাগছিল না। বাইরে হেঁটে আসতে পারলে মন্দ হয় না। যদি পুলিশ পাছায় লাথি দিয়ে মাগির দালাল বলে সম্বোধন করে করুক। ঘুষ কিংবা নেতাদের মতো চাঁদাবাজি-অপহরণ তো করিনি। তার চেয়ে মাগির দালাল হওয়ার মধ্যে সততা আছে। এসব কথা মাথা থেকে মুখে এনে আওড়াতে আওড়াতে আলতো টানে দরজা খুলে সিঁড়ি টপকে নেমে পড়ে রাস্তায়। বাইরে দাঁড়িয়ে এদিক-সেদিক তাকায়, কোথাও আর সেই মেয়েলি কণ্ঠ শোনা যায় না। সে মোগলটুলি মোড় থেকে ডানে কদমতলীর দিকে হাঁটতে থাকে। মাঝে মাঝে দু’একটি রিকশা তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। কাটা বটগাছ এলাকা পার হওয়ার সময় কে যেনো তাকে শিস দিয়ে ডাকে। সেদিকে তেমন ভ্রুক্ষেপ না করে সমানতালে হেঁটে কদমতলীর মোড়ে এসে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়। বাতাসের গন্ধে যেন কেমিক্যাল মেশানো। চতুর্দিকে ময়লা-অবর্জনায় ঠাসা। নালা উপচে ময়লা পানি রাস্তা ভেসে যাচ্ছে। কয়েকটি কুকুর সে জলে ভেসে আসা কিছু একটা নিয়ে টানাটানি করছে। ঠাহর করে দেখে ছোট্ট মাংসপিণ্ডের মতো দলা পাকিয়ে আছে একটি মৃত শিশু! দুই হাত নেই। হয়তো কুকরগুলো ছিড়ে খেয়েছে। সে সময় একটি পুলিশের ভ্যান পাশ দিয়ে পাঠানটুলি মুখি যাচ্ছিল। নিতাই থামিয়ে পুলিশকে জানাল বিষয়টি। দু’টো পুলিশ নেমে কোনও কথা না বলে একটি প্লাস্টিকের বস্তায় মাংসপিণ্ডটি পুরে ভ্যানে উঠে চলে যায়। পুলিশ কোনও কথা বলে না তার সাথে। তাদের ভাব ছিল এমন যেন এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এ নগর মৃত শিশুদের শহর! এই যে শিশু, একে বলা হয় জারজ শিশু! কি অদ্ভুত নিয়ম। একটি শিশু জন্ম নিল মাথায় জারজ শিশুর অপবাদ নিয়ে। নিতাই হাঁটতে হাঁটতে টাইগারপাস হয়ে সিআরবি বিল্ডিং এর কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

অদূরে একটি খুঁটির মাথায় টিমটিমে বাতি জ্বলছে। তাতে সবকিছু আলো আঁধারির মতো কেঁপে কেঁপে ওঠে। একবার মনে হলো, কেন সে এ মধ্যরাতে পাহাড়ের কাছে এসেছে! সে কি এখানেই আসতে চেয়েছিল! না, একটু রাতের বাতাসে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিতেই বাসা থেকে বেরিয়েছিল। তাহলে এখানে কেন ? প্রচণ্ড বাতাসের তোড়ে মনে হয় বয়েসি বৃক্ষগুলো মাটিতে শুয়ে পড়তে চায়। নিতাই দিনের বেলায়ও যে এদিকে খুব একটা আসে তা কিন্তু নয়। রাস্তা তাকে কীভাবে এখানে টেনে নিয়ে এল তা ভাবতে গিয়েও ঠাঁই দেয় না বেশি। এসেছে তো এসেছেই। মধ্য রাতে বাতাসের সর সর গোঙানি খুব যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে তা নয়। তবে সেই শব্দকে মাঝে মাঝে কারও ফিস ফিস করে কথা বলার মতো মনে হতে থাকে। কিংবা হঠাৎ মনে হতে থাকে মাটিতে পা টেনে টেনে কে যেন হেঁটে যাচ্ছে পাশ ঘেঁষে! একটু এগিয়ে বড় বটগাছটায় হেলান দিয়ে নিতাই চতুর্দিকে দেখে নেয়। বোঝার চেষ্টা করে মধ্যরাতের পাহাড়ের ধ্যান। এ পর্যন্ত এসে বুঝতে পারে তার চোখে মুখে ঝুলে আছে ক্লান্তি।   

চোখ টেনে টেনে দেখে সিআরবি বিল্ডিং এর সম্মুখে গোল হয়ে বসে আছে কিছু মানুষ। এত রাতে এরা কারা!  নিতাই পা টিপে টিপে কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। সেই রাজনীতি, সেই আন্দোলন, আদর্শ, নীতি, দর্শন, দাবি আদায়, এসব শব্দ সকল কানে এসে লাগে তার। প্রথমে ভাবে রেলওয়ের শ্রমিকরা হয়তো সভায় বসেছে। পরক্ষণেই ভুল ভাঙে। দেখে লম্বা কলারের সাদা জামা গায়ে ধুতি পরা একজন কথা বলছেন। চোখা নাক, খাটো চুল। চোখে মুখে দিপ্তির ছটা। এত সূর্যসেন! নিতাই বসে পড়ে মাটিতে। তার দিকে কেউ ফিরেও চায় না। সবার মুখে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট। নিতাই একে একে অন্যদের দিকে তাকায়। সবাইকে চেনা যায়। প্রীতিলতা, আর কল্পনা দত্ত জড়াজড়ি করে বসেছেন। তারপর পাশাপাশি বসে আছেন যাত্রামোহন সেন ও পুত্র যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। পাশেই বসে আছেন বিশালদেহী লোকমান খান শেরওয়ানী, মুখভর্তি চাপ দাড়ি আর মাথায় কালো গোল টুপি পড়ে বসে আছেন কাজেম আলি মাস্টার, কালো ফ্রেমের চশমা ও সুভাস বোস এর টুপি পড়ে বিষন্ন চোখে বসে আছেন লোকনাথ বল। চট্টল হিতসাধিনী সভার যামিনি সেনের সঙ্গে মাথায় পাগড়ী ও মুখে সৌম্য দাড়িশোভিত মৌলানা ইসলামাবাদী বসে আছেন বুক টান টান করে। বাম পাশে আরও অনেকে বসে আছেন। মৃদু আলো ও গাছের ছায়ায় ঢেকে গেছে তাদের মুখ। তবে সেখান থেকে কেউ একজন বলে ওঠেন, ‘আপনারা আমাদের যে উত্তরাধিকার দিয়ে গিয়েছিলেন, তার সঠিক মূল্যায়ন ও চর্চায় আমরা ব্রতি ছিলাম। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। সবাই সমস্বরে বলে ওঠেন, তাহলে কোথায় ভুল ছিল, কোথায় ভুল ছিল! ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন-দেশভাগ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা নাকি স্বাধীন বাংলাদেশ! কোথায় ভুল ছিলো ? প্রীতিলতা বলে ওঠেন, আমরা তো ব্রিটিশ তাড়াতে চেয়েছিলাম, দেশ ভাগ তো চাইনি। মৌলানা ইসলামাবাদী চিৎকার করে বলে ওঠেন, কেউ দেশ ভাগের বিরুদ্ধে কথা বলেনি একমাত্র মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ছাড়া। ছায়ায় ঢাকা ওপাশ থেকে কয়েকজন বলে উঠল বাংলা মুলুক দেশ ভাগ চায়নি। ভোটাভুটিতে আমাদের এ অঞ্চল দেশ ভাগ না হওয়ার পক্ষেই ভোট দিয়েছিল। তাহলে কেন ভাগ হলো, সূর্যসেনের প্রশ্ন। আরেকজন আড়াল থেকে ক্রোধাগ্নিতে বলে উঠলেন, ধর্ম, ধর্ম, এই ধর্মই আমাদের এক থাকতে দিল না। ১৯৪৬ এ কলকাতা ভেসে গেল মানুষের রক্তে। অথচ রাস্তা, ড্রেনে যখন সব রক্ত মিশে গেল, কেউ আলাদা করতে পারল না কোনও রক্ত হিন্দুর আর কোনও রক্ত মুসলিমের। লোকমান খান শেরওয়ানী বলে উঠলেন, ধর্ম ভারত বর্ষের জন্য একটি বিষাক্ত টোপ। সেই টোপ ক্রমান্বয়ে আমাদের উত্তরাধিকারীদের বিভক্ত করে চলেছে। সবার মাঝখান থেকে নিতাই দরাজ গলায় বলে ওঠে, তাহলে সমাধান কিছুই আপনারা দিতে পারেননি, আজও পারছেন না। সবাই নড়েচড়ে বসেন, অসম সাহসী সূর্যসেন মাথা নিচু করে থাকেন, কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতার নুয়ে থাকা মাথা তুলে ধরার চেস্টা করছেন। টলতে টলতে কাজেম আলি মাস্টার বললেন,

আমাদের আন্দোলন তো বৃথা যায়নি। আমরা তো ব্রিটিশদের হাত থেকে তোমাদের স্বাধীন করে দিয়েছিলাম। দেখো আজ সেদিনের বীরেরা কেমন অসহায়। ভাবছে তাদের সেদিনের যে অসম সাহস, ব্রিটিশদের তাড়াতে যে জীবন বাজি রেখেছিল, তার সবই কি ফেলনা ছিল!

নিতাই ধীরে ধীরে সূর্যসেনের পায়ের কাছে বসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে চাপা কান্নায় আর্তনাদ করে ওঠে। প্রীতিলতাকে জড়িয়ে মা মা করে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কল্পনা দত্তের স্নেহছায়ার হাতে যে মায়া রাখল নিতাইয়ের চোয়ালে, তেমন আগে কখনও হয়নি তার! নিতাই চিৎকার করে ওঠে―

তোমরা ছাড়া আমাদের কে বাঁচাবে!

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত বুক টান টান করে দাঁড়ান।

তোমার প্রশ্নের উত্তর এই বীর চট্টলা। আমরা সংগ্রামী। আমাদের এই পরিচয়ের সূচনা নব্য প্রস্তর যুগ থেকে। ভুলে যেও না সেই প্রস্তরযুগে সীতাকুণ্ড ও রাঙামাটিতে যে অস্মীভূত অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল, তা থেকেই আমাদের সংগ্রামী পরিচয়ের সূচনা। সেই সংগ্রামী চেতনা প্রজন্মান্তরে যেভাবে আমাদের হাতে এসেছিল, তা তোমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম আমরা। তোমাদের কাজ হচ্ছে তা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া।

নিতাই এক সময়ের সাহসী সংগ্রামীদের দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড মুষড়ে পড়ে।

তাহলে কি তোমরা আর আমাদের মাঝে আসবে না ? আমরা আজ ঘোর অমাবস্যাকাল অতিক্রম করছি। আলো চাই আলো, তীক্ষ্ম তরবারির মতো ঝক ঝকে ধারালো আলো। কে দেবে আমাদের সেই আলো। তোমরা ফিরে আসো। এসে বলে যাও কীভাবে তোমরা এত সাহসী ছিলে। কীভাবে জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলে এর চেয়ে মহৎ কোন জীবন নেই!

প্রীতিলতা মৃদু আলোয় লতিয়ে ওঠা ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে বলে ওঠেন―

আমরা অবশ্যই ফিরে আসব। তোমার মতো হাজারো নিতাই’র মাঝে আমরা ফিরে আসব। প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে আমরা ফিরে আসব। এই বাংলার মুখের বুলিতে আমরা জেগে রইব। তুমি দেখবে, খুব খেয়াল করে দেখবে আমরা সবখানে আছি। তুমি যেখানে থাকবে আমরাও সেখানে থাকব। তুমি এই ঘোর অন্ধকালে মানুষকে বেঁচে থাকার মন্ত্র দাও। তুমি তরুণ, তুমিই পারবে এক সময় আমরা যা পেরেছিলাম। 

গোল হয়ে বসে থাকা মানুষগুলোর মুখ থেকে আর কোন কথা সরে না। নিতাই নিজেও আর কোনও কথা বলার বাক্য খুঁজে পায় না। এক সময় খেয়াল করল সবাই উঠে দাঁড়িয়ে একে একে যে যার পথে ছায়ার মতো মিলিয়ে গেল। নিতাই তখনও সিআরবি ভবনের সম্মুখে দাঁড়ানো গাছটির গোড়ালিতে হেলান দিয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে, আর গোঁৎ গোঁৎ করে কি যেন বলছে। এক পাতাকুড়নির ডাকে তার ঘুম ভাঙে। ধড়মড় করে উঠে বসে। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার কি যেন খোঁজে। হালকা মেঘের ছাউনির মতো চাদরে ঢেকে আছে পাহাড়। লাল ইটের বয়েসি সিআরবি দালানের গা থেকে যেন প্রকাশ হচ্ছে রোয়াবি গাঁথা। প্রতিটি ইটের গায়ে ভেসে উঠছে সময়ের ইতিহাস। তারা নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে যে হাসি হাসছে তা কি তাচ্ছিল্যের না সম্বোধনের বুঝা যায় না।  পিছন ফিরে, দু’চোখে ঝরতে থাকা জল নিয়ে সেখান থেকে টলতে টলতে নিতাইও মিলিয়ে যায় নাগরিক ভোরের হাঁক ডাকে। বাসার দিকে যেতে যেতে চেনা পরিচিত রাস্তা, মানুষ আর পরিপার্শ্বকে তার কেন যেন আজ অন্য রকম মনে হয়। আজকের ভোরটাই ঝকঝকে তকতকে ধোয়ামোছা। মাথা থেকে কোনও একটা জট যেন খুলে গেছে। নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গ মনে হয়। ভেতর থেকে ডানা ঝাপটে একটা পাখি উড়তে উড়তে শূন্যে মিলিয়ে যায়। নতুন কোনও আলো নিয়ে নিতাই ঢুকে পড়ে মোগলটুলি রাস্তায়।

এগারো.

পরীক্ষার রেজাল্ট মন্দ হয়নি। ভর্তি হওয়া গেল কলেজে। নিতাই ঢাকা আসার পর থেকে প্রায় আড়ালেই সময় কাটিয়েছে। কারণ চট্টগ্রামের ঘটনার পর তাকে দেখলেই মানুষ কৌতূহলী হয়ে ওঠে। এখন উপায় নেই। কলেজে ভর্তি হয়েছে। তাকে বের হতেই হবে। ক্লাসে যেতে হবে। অন্যদিকে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিক, গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন মানুষ তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা থেকে বিরত থাকেনি। ফলে শাহজাহানপুরের বাসাটি এখন অনেকেই চেনে। ঢাকা আসার পর কিছু বিদেশি কূটনীতিকও তার খোঁজ খবর করেছে। 

লাগাতার হরতালে অতিষ্ঠ দেশ। সরকারবিরোধী দল নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। নিয়মিত ক্লাস হয় না। কেবল রাজধানীতে নয় পুরো দেশেই একেই পরিস্থিতি বিরাজমান। নিতাই একদিন খুঁজে খুঁজে গেল সেই ঠিকানায়। যে ঠিকানাটি বাসদের সম্মেলন শেষে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে ট্রেনে অপরিচিত এক ব্যক্তি দিয়েছিলেন। যে ব্যক্তি বলেছিলেন সোভিয়েত ভাগের গল্প। ঠিকানা ৫৩ পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০। একটি দোকানের পাশ দিয়ে চিকন গলি। তার শেষ মাথায় ওপরের দিকে উঠে গেছে একটি লোহার সিঁড়ি। দোতলায় উঠে একেবারে শেষ মাথায় একটি পুরোনো কাঠের দরজার ওপরে চক দিয়ে লেখা ‘৫৩’। হালকা ধাক্কা দিতে ক্যাচ ক্যাচ শব্দে খুলে গেল দরজা। পুরোনো একটি টেবিলে বসে আছেন মাঝ বয়েসি এক লোক। চুল ঝুটি করে বাঁধা। চোখ জোড়া টকটকে লাল হয়ে আছে। দেখে মনে হয় রাতে ভালো ঘুম হয়নি। টেবিলের ওপরে কিছু কাগজপত্র ছড়ানো। একটি অ্যাশট্রে ি সিগারেটের উচ্ছিষ্ট দয়ে পূর্ণ। গুমোট ঘরে সিগারেটের ধোঁয়া যেন আটকে আছে। নিতাইকে দেখে কিছুটা ভ্রু কুঁচকে চোখ বড় বড় করে তাকায়। ভিজিটিং কার্ডটি এগিয়ে দিতেই লোকটি মুখ খোলে―

হুম, উনি তো এ মুহূর্তে ঢাকায় নেই। এখানে আসেন মাঝে মধ্যে। এখন উত্তরবঙ্গে আছেন প্রচারণার কাজে।

কিসের প্রচারণা ?

আপনার প্রশ্নের জবাব উনি দিতে পারবেন। আপনি এক সপ্তাহ পরে আসেন, হয়তো পেয়ে যাবেন। তবে নিশ্চিত করে বলা যাবে না। অনেক সময় তিনি হাওয়া হয়ে যান। তবে উনি বলেছিলেন, আপনি আসবেন।

নিতাই কিছুটা বিস্মিত হয়!

আমি আসব তেমন কিছু তো ওনাকে বলিনি। প্রায় এক বছর  আগে ওনার সঙ্গে আমার দেখা ট্রেনে। আর তো দেখাও হয়নি, কথা হবে কীভাবে!

তা তো বলতে পারব না। আপনাকে নিয়ে মিডিয়াগুলো সরব হয়ে ওঠার পরই বলেছিলেন, আপনি আসবেন।

নিতাইর বুঝতে বাকি থাকে না যে এই লোকটি তার সব ঘটনাই জানেন।

এই অফিসটা কি কোনও পার্টি অফিস ?

এটা কোনও পার্টি অফিস না। বলতে পারেন অধ্যয়ন কেন্দ্র।

 কি অধ্যয়ন করা হয় এই ছোট্ট কক্ষে ?

দেখুন অধ্যয়নের জন্য কেবল একটি কেন্দ্রবিন্দু দরকার। এর জন্য কোনও কক্ষ থাকাটাও জরুরি নয়। প্রয়োজন একটি বিন্দু।

কি রকম ?

এই যেমন ধরুন আপনি আসবেন। এ খবর আমরা আগেই পেয়েছি। আপনি কোথায় এসেছেন ? এই কক্ষে।  মনে করুন এটি একটি কেন্দ্র। আপনি সেই কেন্দ্রেই তো এসেছেন।

হ্যাঁ তা এসেছি কিন্তু এর সঙ্গে অধ্যয়নের সম্পর্ক কি ?

আপনি তো সোভিয়েত ভাগের বিষয়টি জেনেছেন এখান থেকেই। আপনার জানার কেন্দ্র হচ্ছে এ কক্ষ। যদিও আপনি এখানে নয়, ট্রেনে বসে তা জেনেছেন।

আপনি কীভাবে জানেন যে আমি সোভিয়েত ভাগের ইতিহাস জেনেছি ?

দেখুন এই যে ‘বিন্দু’ এর কোনও কিছুই আজানা থাকে না বা এখান থেকে কোনও নির্দেশনা ছাড়া কিছু হয় না।

মানে কি ? বলতে চাচ্ছেন আপনাদের এখান থেকে কোনও গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে ?

আপনি গোপনের কি দেখলেন। আপনি একটু খেয়াল করবেন আমি কি বলতে চাচ্ছি। সবই তো গোপন। আপনি যে এখানে এসেছেন কাউকে বলে এসেছেন ?

না।

কেনও আপনার এমন কেউ নেই যে যাকে বা যাদের বলে আসতে পারতেন না ?

ঢাকায় আমার কোনও বন্ধু নেই।

আমি বন্ধুর কথা বলছি না। বলছি যারা আপনাকে চোখে চোখে রাখছে তাদের কথা।

কারা আমাকে চোখে চোখে রাখে আমি তো জানি না।

জানেন কিন্তু বলতে পারেন না।

বলতে পারবো না কেন, অবশ্যই পারব, কারা আমাকে পাহারা দেয় বলুন ?

আমি কি করে বলব। আপনি জানেন না অথচ আমি জানব, এটা কি সম্ভব!

আরে ভাই আপনিই তো বললেন, আমাকে কারা যেন চোখে চোখে রাখে।

তা তো বলবই। কারণ তাদের বদৌলতেই আমরা আপনার সম্পর্কে খবরা খবর পাই।

আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

এই যে এখানেও একটি ‘বিন্দু’ কাজ করে। আপনার সব খবর এই বিন্দুতে যায়, সেখান থেকেই তা চলে যায় জনান্তিকে। এভাবেই আপনি সোভিয়েত কাণ্ড জেনেছিলেন।

নিতাই নিজের দাঁড়িয়ে থাকা জায়গাটি বা কক্ষটি ঠিক কি না সে বিষয়ে কিছুটা সন্দিহান হয়ে পড়ে। এমন মানুষের সঙ্গে তার আগে কখনও দেখা হয়নি। আলো-অন্ধকারে লাল চোখগুলো চিক চিক করে ওঠে। একটা সিগারেট হাতে নিয়ে ফিল্টারওয়ালা পোঁদের অংশ দিয়ে বারবার টেবিলে টোকা মারে। একটি দেশলাই দিয়ে ফস করে ধরিয়ে টানতে থাকে। সিগারেটের ধোঁয়া ছোট্ট ঘরটিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সরু তুলোর মতো আধবোজা জানালার ফাঁক গলে বাইরে চলে যাচ্ছে।

চা খাবেন ?

আপনার এখানে চা আছে নাকি ?

থাকেবে না কেন ? মানিক, এই মানিক, আমাদের দু’টো চা দাও।

এর পর কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটু পরেই প্রায় ভাঙা একটি দরজা ঠেলে পেছন থেকে দুই কাপ চা নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে রোগা উস্ক-খুস্ক এক তরুণ। নিতাই নব অগন্তুককে ভালো করে দেখার এবং বোঝার চেষ্টা করে। এতক্ষণ সে বুঝতেই পারেনি যে পিছনে আর কোনও ঘর থাকতে পারে। ভেবেছিল পেছনের ভাঙা দরজাটি পেরেক দিয়ে আটকানো। ছেলেটি চা টেবিলে রেখে, প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ধরাল। নিতাই মনে মনে ভাবল, একটা নাম অন্তত জানা গেল, মানিক।

আচ্ছা মানিক, আপনি কি এখানে থাকেন ?

তরুণের কোনও কথা নেই।

এই যে ভাই মানিক আপনাকে বলছি। আপনি কথা বলছেন না কেন ?

তরুণ এবার অনেকটা বাঁকা এবং ঝুলে থাকা চোখে নিতাইর দিকে তাকায়।

আমাকে বলছেন ?

হ্যাঁ আপনাকে।

না ভাবছিলাম আপনি মানিককে ডাকছেন।

আপনিই তো মানিক তাই না ?

না না আমি কেন মানিক হতে যাব।

আপনি কে ?

আমি এখানে আসি।

না মানে আপনার নাম কি ?

এখানে নাম কোনও গুরুত্ব বহন করে না। কাজ, এবং আপনার জনমুখী চিন্তা ও দর্শন যদি থাকে সেখানে নাম প্রয়োজন হয় না।

আপনারা আসলে কি বলতে চান বলুন তো ?

আমরা এখান থেকে বলি এবং করি।

নিতাই এবার কিছুটা বিরক্ত হয়। ভাবে কেন এখানে এসেছে! মানুষগুলো রহস্যময়!

আচ্ছা, বলুন তো উনি কখন আসবেন ?

উনি তো এখানেই আছেন।

না ওনার কথা বলছি না, আমি যার কাছে এসেছি।

শুনুন কেউ কারও কাছে আসতে পারে না। দু’জনই কাছাকাছি হয় প্রয়োজনে। এই দেখা হওয়া যেমন প্রাকৃতিক তেমনি দর্শনতাত্ত্বিক যোগও আছে।

কেমন ?

আপনি এখানে কেন এসেছেন ?

ওনার সঙ্গে দেখা করতে।

কেন দেখা করতে চান ?

কারণ ট্রেনে দেখা হওয়ার পর থেকে আমার মনে হয়েছে তিনি শিক্ষিত মানুষ। তার কাছে শেখা যাবে।

হুম, ‘শেখা’ এর চেয়ে একজন মানুষের কাছে লোভনীয় কিছু হতে পারে না। আপনি সেই মোহে এখানে এসেছেন। এটাও একটা মানবিক এবং মনোদর্শন। আপনাকে স্বাগতম।

আমি তো এসেছি অনেক্ষণ। এখন স্বাগত জানানোর কি আছে!

না আপনি এখানে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছেন তাই স্বাগত জানালাম।

বুঝতে পারলাম না। দ্বিতীয় ধাপ কই, আমি তো এক জায়গাতেই দাঁড়ানো আছি।

এক স্থানে দাঁড়িয়েও বহু স্থানে যাওয়া যায় ভাই।

নিতাই খেয়াল করে চেয়ারে বসা লোকটি টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন। নাক ডাকছেন। দেখে মায়া হলো। মনে হচ্ছে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে প্রশান্তির ঘুমে ডুবে গেছেন তিনি।

আচ্ছা উনি তো ঘুমিয়ে গেলেন। আমি যার কাছে এসেছি ওনার নাম তো জানা হলো না। উনি যে কার্ড দিয়েছিলেন তাতে কোনও নাম ছিল না। শুধু এই ঠিকানা ছিল।

আপনি আবার নাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। একটা কাজ করুন আপনি নিজে আজ থেকে নিজের নাম ভুলে যান। যদি সম্ভব হয় নিজের অতীতে কোনও ক্লান্তিকর স্পট থাকে তা মুছে ফেলুন। দেখবেন আপনার চিন্তা এবং কাজের সুবিধা হবে।

একটু পরে ঘুম থেকে হাই দিয়ে জেগে উঠলেন চেয়ারে বসা লোকটি। বললেন―

আমি কিন্তু একবারও আপনার নাম জানতে চাইনি।

নিতাই বুঝতে পারে লোকটি ঘুমায়নি। তবে যে নাক ডেকেছিল! তাও কি তার শুনার ভুল ছিল! এ লোক দু’টি কোনও কিছু উদ্দেশ্যমূলকভাবে করবে তাও বিশ্বাস হয় না। তাদের চিন্তা যে একেবারে ভোজালির মতো ধারালো তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

তাহলে যদি কখনও ওনার সঙ্গে দেখা হয় কি নামে ডাকব।

কেন ‘তান্ত্রিক’ বলে সম্বোধন করবেন।

আপনাকেও কি এ নামে ডাকব ?

এটা আপনার ইচ্ছা। যদি আপনার মনে হয় আমার সে সময় এবং ধী রয়েছে তাহলে কারও আপত্তি থাকবে না।

কিন্তু কথা হচ্ছে আপনার সবাই যখন একস্থানে থাকবেন তখন ডাকার নিয়মটি কি হবে। ভিন্ন ভিন্ন নাম না থাকলে সবাই তো মনে করবে তাঁকে ডাকা হচ্ছে।

না, মনে হবে না। দেখুন এখানেই মনের প্রকৃত সংযোগ ঘটে। নাম এক কিন্তু ডাকার সময় স্পষ্টতই বোঝা যাবে আপনি আমাকে ডাকছেন না অন্যজনকে। আপনার আমার আত্মার সম্মিলন কতটুকু স্থাপিত হলো তার ওপর বর্তে যাবে এই সম্বোধন।

নিতাই কিছুটা দ্বন্দ্বে আটকে যায়। দুই ব্যক্তিকে সে বুঝে উঠতে সময় লাগছে। আবার সে ঠিক জায়গায় বা মনুষ্য পরিমণ্ডলে রয়েছে কি না তাও অনুধাবন করার চেষ্টা করে।

আচ্ছা মানিক ভাই, আপনারা ঠিক কি বলতে চাইছেন একটু খোলতাই করবেন ?

আপনি আবার ভুল করছেন, আমাকে কোনও একটি নামে চিহ্নিত করতে চাইছেন। ‘মানিক’ শব্দের অর্থ কি হতে পারে, ভাগ্যবান, উপযুক্ত, সক্রিয় কিংবা আনন্দদায়ক। আমি এর কিছুই নই। আমি মানিক হতে যাব কেন!

তাহলে আমার নাম নিতাই কেন ?

সেটা আপনার ভুল। আপনার নাম কেন নিতাই হতে যাবে! আপনার নাম এখনও হয়নি। নাম তো অর্জন করতে হয়।

কীভাবে ?

মানুষ হচ্ছে হুজুগে। তা বাঙালি বলুন আর অবাঙালি বলুন। এই ব্রহ্মাণ্ডে যে মনুষ্যকুল নিজের থাবা বিস্তার করে চলেছে তারা এক একটি নাম ধারণ করে নিজেকে চেনানোর চেষ্টা করে। এটি একটি অযৌক্তিক এবং একপেশে সেই সঙ্গে দস্যুবৎ আচরণও বলা যায়।

তাহলে মানুষ কীভাবে পরিচিত হবে ?

আপনি অন্যপ্রান্তে চলে যাচ্ছেন। যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন। আপনার কথাই ধরুন। যখন আপনার অপহরণের সংবাদ প্রচারিত হলো নানান মাধ্যমে, তখন জানা গেল ‘নিতাই চান’। তখন থেকে আপনার পরিচিতজনেরাও আপনার নতুন পরিচয় পেল। আপনার পরিচয় বিশ্বে ছড়িয়ে গেল। এটাকে আপনি হুজুগও বলতে পারেন। আবার যদি মানুষের কাছে যে নিতাই পৌঁছে গেছে তাকে যদি সত্যি লালন করেন তাহলে তার রূপ হবে চিরস্থায়ী। দেখুন নাম কিন্তু আপনি আগেই ধারণ করে আছেন, কিন্তু আগে পরের ‘নিতাই’র মধ্যে বিপুল ব্যবধান রয়েছে। তাই বলছি নাম আছে কি নেই তা নিয়ে ভাববার প্রয়োজন নেই। নাম নিজেতেই এসে উপস্থিত হবে। 

আমার কি করা উচিত এখন ?

আপনি কাজ করে যান। এখানে মাঝে মধ্যে আসতে পারেন। আগামী সপ্তাহের প্রায় সাত দিনই এখানে ‘তান্ত্রিক সম্মিলন’ আয়োজন করা হবে। আপনি আমন্ত্রিত।

ট্রেনে যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তিনি কি থাকবেন ?

তা তো জানি না। এখানে কাউকে বলে আনা হয় না। আপনি নতুন তাই আমন্ত্রণ জানালাম। তান্ত্রিকগণ নিজে থেকেই উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করতেও পারেন আবার নাও পারেন। এতে চর্চায় কোনও ব্যঘাত ঘটার সুযোগ নেই।

টেবিল থেকে উঠে প্রথম ব্যক্তি জানালার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছেন। জানালার ফাঁক গলে কিঞ্চিৎ আলো লতিয়ে পড়েছে তার মুখে। একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান দেন।

আপনার পরিচয় তো এখন বিশ্বজোড়া। নিজেকে কি একবার প্রশ্ন করে দেখেছেন যে আপনি কে ?

না, না তো। হ্যাঁ আবার মনে হচ্ছে দেখেছি।

এ বিষয়ে কোনও দ্বিচারী মন কাজ করবে না। হ্যাঁ অথবা না। আপনি নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারছেন না। অতএর আপনার যে পরিচয়, তা এখনও আপনার হয়নি। যা হয়েছে তা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের হয়েছে। দেখুন এই পুঁজি বাজারে কে কখন কাকে পণ্য হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে তা বলা মুশকিল।

আপনি বলছেন আমার পরিচিতি বিশ্বজোড়া কিন্তু আমার তেমন মনে হয় না। আমার মাঝেও আমার পরিচয় রয়েছে কি না তাও নিশ্চিত হতে পারিনি। বিশ্ব পরিচয় কখন হলো, কীভাবে হলো আমি জানি না।

নিতাইয়ের কথায় এবার ঘরের দুই ব্যক্তি কিছুটা বিস্ময়ে তাকায় নিতাইর দিকে। তাদের চোখগুলো জ্বল জ্বল করে ওঠে। নিতাই বলে চলে―

এক অপহরণের ঘটনা যদি মানুষকে বিশ্ব পরিচয় দিতে পারে, তাহলে এত আয়োজন কেন। কেন এত দীক্ষা, এত পুড়ে যাওয়া। আমি তো নিজেকে খুঁজে ফিরছি। কখন পাব তার সন্ধানে ছুটছি। কোথাও আলোর দিপ্তি নেই। সবকিছু ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু আমিতো তাতে নিরাশ হতে রাজি নই। চাই কড়া এবং খাড়া যুক্তি ও মুক্তির আন্দোলন।

ততক্ষণে ঘরে কিছুটা আলো জেগে উঠেছে। পেছনের কক্ষ থেকে কে যেন আলো জ্বেলেছে। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাতের পেটে প্রবেশ করছে। আজকের সন্ধ্যেটা ভিন্নতর আবহ নিয়ে আবর্তিত। নতুন কোনও সুগন্ধে নিতাই মাতোয়ারা হয়ে ওঠে।

ওরা, যারা আমাকে অপহরণ করেছিল। পুরো দেশ উত্তপ্ত করার জন্য। আমি তাদের সে সুযোগ শেষ পর্যন্ত বাতিল করে দিয়েছি। সেখান থেকে আমি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছি। যদিও জানি না গন্তব্যের শেষ কোথায়।

দ্বিতীয় ব্যক্তি নিতাইর ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলেন―

গন্তব্য কতদূর তা জানার জন্যই তো আমাদের এই আয়োজন। আপনি যখন জানতে পারবেন আপনার শেষ গন্তব্য তখন জানবেন লক্ষ্যে পৌঁছুতে প্রয়োজন সময়ের ফুৎকার।

এসময় ঝন ঝন করে লোহার সিঁড়ি টপকে উপরে উঠে আসে কোনও আগন্তুক। একটু পর আর কোনও আলাপ পাওয়া যায় না। ঘরের দুই ব্যক্তি (নিতাই বুঝতে পারে না তাদের ‘তান্ত্রিক’ বলে সম্বোধন করা যায় কি না) কান খাড়া করে কি যেন শুনতে চায়। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে দিয়ে পেছনের পুরোনো দরজা ঠেলে লণ্ঠন হাতে ভেতরে প্রবেশ করে সেই তরুণী। যে কি না চট্টগ্রামে তার বাসায় গভীর রাতে ঢুকে পড়েছিল। যে নিতাইদের গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছিল বলে পরিচয় দিয়েছিল। চোখাচোখি হতেই নিতাই বিস্মিত হলেও স্বাভাবিক থাকল মেয়েটি।

আপনি এখানে কি করে এলেন। ঢাকা এসেছেন কবে ?

আমার আসতে হয়, যেতে হয় বহু জায়গায়। তার তো কোনও হিসেব রাখি না। বলতে পারেন এখন এলাম, কিংবা বলতে পারেন আমি এখানেই থাকি!

ঘরের বাকি দুই ব্যক্তি কোনও কথা বলেন না। ঘরের ক্ষয়িষ্ণু আলোয় বিড়ালের মতো দু’টো চোখ বার করে তাকিয়ে আছে দু’জন। লণ্ঠনের আলোয় দুলে ওঠে তাদের ছায়া। যেনো গলে গলে মেঝেতে পরে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে টিকে থাকার যুদ্ধে মগ্ন কোনও সৈনিক।

আপনার হাতে লণ্ঠন কেন ?

আমি লণ্ঠন হাতেই রাখি। সারাদিন লণ্ঠন হাতেই নগর-বন্দর, গ্রাম-মহল্লা ছুটে বেড়াই।

দিনের বেলায় লণ্ঠন!

হুম, দেখছেন না চতুর্দিকে অন্ধকার। কোথাও আলো নেই। মানুষ খুঁজতে এই লণ্ঠন হাতে ঘুরি। মানুষ কই। খোঁয়াজ খিজিরের মতো সব পশুর বিচরণ দেখি। মানুষ দেখলেই আমি তার চরণে লুটে পড়ি। হায় মানুষ, মানুষ কই!

আপনি কি বলছেন! তাহলে আমার সঙ্গে যে কথা বলছেন, আমি কি মানুষ নই ?

এভাবে তো মানুষ দেখা যায় না। আপনি কিংবা আমি কোথা থেকে এলাম আগন্তুক, আর বলছেন, বলুন তো আমি কে ? তা কি বলা সম্ভব!

তাহলে কি সম্ভব ?

সম্ভব হচ্ছে মানুষ হয়ে ওঠা। অথচ এই সম্ভাবনাই ঢেকে গেছে অসম্ভবের কৃষ্ণকায় অনিশ্চয়তায়।

তাহলে সম্ভব কি করে হলো ?

কারণ আপনি নিজেই মানুষ হতে চান না। সেটাই তো অসম্ভবের পক্ষে যথেষ্ট।

আমি আপনার কোনও কথা বুঝতে পারছি না। সেদিন চট্টগ্রামের বাসায় আপনাকে দেখলাম এক আর আজ অন্য।

আপনিই বলুন সেদিন আপনি যা ছিলেন, আজ কি তা আছেন ? অবশ্যই নেই। এই পরিবর্তনটাই স্বাভাবিক। কথা হচ্ছে আপনার পরিবর্তনটা চিন্তার কোন্ স্তরে দাঁড়িয়েছে, তা বিবেচনা করা। সবাই তো আর মনুষ্য চিন্তাবিশ্বে প্রবেশ করতে পারে না। যারা পারে তাদের মুখই আমার এই লণ্ঠনের আলোয় দেখা যায়। দৃশ্যত এই লণ্ঠনে কোনও আলো নেই। যা দেখছেন তা বিভ্রম। যখন কোনও মানুষ দেখা যায় তখন সেই মানুষের আলোয় আমার এই লণ্ঠন জ্বলে ওঠে।

মানুষের আলোয় লণ্ঠন জ্বলে উঠবে কীভাবে ?

ওঠে। আমি জ্বলে উঠতে দেখি বলেই এই লণ্ঠন হাত থেকে সরে যায় না।

দিনের বেলায় লণ্ঠন নিয়ে হাঁটা কেমন বেমানান ঠেকে না!

কেন বেমানান ঠেকবে। এ লণ্ঠন তো আর জ্বলে না। জ্বলে তো মানুষ। যদি সেই মানুষের দেখা  মেলে।

পেয়েছেন ?

এই ধরা তো মানুষের। মানুষ পাব না কেন। যদি বলি পাই না, তাহলে এই ভূগোলের অস্তিত্ব ভুল। আপনি আমি যেসব কথা বলছি তা ভুল। আপনি আমি এই যে দাঁড়িয়ে কথা বলছি তাও ভুল। আমরা তো ভুল নই। ভুল হচ্ছে আমাদের চিন্তা, আদর্শ এবং দর্শন।

আপনি কি বলতে চাইছেন একটু সহজ করে বলবেন ?

আমি তো সহজ করেই বলছি। এই ব্রহ্মাণ্ডে মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান প্রাণী আর নেই। ক্ষমতা অমঙ্গল এবং সৃষ্টির বিপক্ষে দাঁড়ালেই সেই মানুষ পরিচয়হীন হয়ে পড়ে। তাকে আর লণ্ঠনে দেখা যায় না। এই পরিচয় সংকটে পতিত না-মানুষের সংখ্যাই বেশি।

আপনি কেবল মানুষ খোঁজার কথাই বলছেন শুরু থেকে। আমরা যে সময় অতিক্রম করছি এসময়ে আরও অনেক বিষয় তো রয়েছে দেখার।

তা রয়েছে। আপনাকে প্রথমে ভেবে দেখতে হবে, আরও যেসব বিষয় রয়েছে তা মনুষ্য সমাজের বাইরে কি না। তাহলে দেখা যেতে পারে। আর যদি তা মনুষ্য সমাজে বিরাজমান হয় তাহলে আপনাকে অন্য বিষয়ের দিকে তাকানোর আগে মানুষ খুঁজতে হবে।

নিতাইর চোখ জোড়া ধাঁধার উত্তর খোঁজার মতো পিট পিট করে। হঠাৎ বুঝতে পারল ওই লোক দু’টি রুমের মধ্যে নেই। এখন পুরো ঘরে কিছুটা আলোও বেড়েছে। আগের মতো গুমোট মনে হচ্ছে না। রুমটি কিছুটা প্রসারিত মনে হচ্ছে এখন। এতক্ষণ পর রাস্তায় গাড়ি চলাচলের ব্যস্ততাও কানে বাজছে।

আপনার তো এখন ব্যাপক পরিচিতি। এই পরিচয় দিয়ে কি করবেন ভেবেছেন ?

আপনার মতো করে আমি কিছু ভাবিনি!

দেখুন রাজনীতিকরা টাকা খরচ করে পরিচিতি কিনে নেয়। আপনার তো সেসব কিছু করতে হয়নি।

কিনে না নিলে কি রাজনীতিক হওয়া যায় ?

ক্ষেত্র বিশেষ হওয়া যায়। তবে তেমন রাজনীতিক সংখ্যায় খুব কম। মেধা থাকলে, অর্থ বা পরিচিতি থাকে না। মেধাহীন ভাগাড় থেকে উঠে আসা অসম্ভব কদর্য প্রকৃতির যারা তাদের অর্থ হয়, সেই অর্থে তাদের পরিচিতিও হয়।

তাহলে সমাজ, রাষ্ট্র আর রাজনীতি সবই তো উল্টো চলছে। মঙ্গলের বার্তা কে দেবে ?

কেন আপনি! আপনি তো পরিচয় কিনে নেন নি। পরিচয় আপনাকে খুঁজে নিয়েছে।

আচ্ছা আপনি এত জাগতিক কথা বলছেন কেন। একটু প্রাকৃতিক হলে ক্ষতি কি। রাজনীতি অত্যন্ত ক্লিশে এবং কৃত্রিম একটি অপকৌশল এখন। এ বিষয়ে বাক্য বিনিময় না করে বরং বলুন আপনার সঙ্গে আমার বারবার দেখা কেন হচ্ছে!

আপনি চান নিশ্চয়।

আমি! আমি কখন, কীভাবে চাইলাম।

দেখুন মানুষ এমনই, কখন কি চায় সে নিজেও জানে না। যারা জানে তারা অত্যন্ত কেতাবি। যত যাই কিছু হোক তাদের দিয়ে অন্তত সহজ সময় যোগ হয় না।

আপনি অত্যন্ত সুশ্রী তাতে আমার আকর্ষণ রয়েছে। তবে চট্টগ্রামে আপনি নিজের যে বয়স বলেছিলেন, তাতে করে আপনার সঙ্গে আমার যায় কি করে!

নিতাই বয়স একটা জটিল ফাঁদ। এই ফাঁদে জগতের সকল মানুষ পা দিয়ে আছে, তা থেকে মুক্তির কোনও উপায় নেই। আমি সেই ফাঁদে নেই। তাই আপনি আমাকে এখনো সুন্দরী বলে কাছে পেতে চাইছেন।

কাছে পেতে চাই কি!

হ্যাঁ চান তো। আপনার চোখ তো তাই বলে। মন হয়তো লাইজু কিংবা কলির কথা বলছে। নিজেকে প্রশ্ন করুন হয়তো আমার মধ্যে তাদের পেতে চাইছেন। তাতেও আমি অতৃপ্ত হব না।

আপনি কিসে অতৃপ্ত হবেন ?

আমি যে মানুষ খুঁজি সে মানুষ না পাওয়াই আমার অতৃপ্তি।

আমাকে কি সেই মানুষ মনে হয় ?

নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন না। কিংবা আমার এই লণ্ঠনের দিকে তাকাতে পারেন। কিছু কি বুঝতে পারছেন ?

লণ্ঠন তো আপনার মতোই রহস্যময়। বয়সের মতো আলো লুকিয়ে ফেলছে, নাকি আলো বিকিরণ করছে তা বোঝা মুস্কিল।

দেখুন আপনাকে অনুসরণ করেই লণ্ঠন এতদূর পথ আপনার সঙ্গে হেঁটে চলে এসেছে।

আমি কোথায় হাঁটলাম। আপনিই তো এলেন এখানে।

নিতাই আপনি এত পথ হেঁটে এলেন, আমাকে একটু ছুঁয়েও দেখলেন না। কীভাবে বুঝব আমার সৌন্দর্যে মগ্ন হয়ে আছেন।

কেন আপনিই তো বললেন, আমার চোখ কি বলে।

তা বলেছি, কিন্তু এত দূর এসে মনে হচ্ছে আপনাকে আরও কিছু বোঝার আছে।

এসময় পাশ থেকে এক দোকানি বলে ওঠে―

ভাই আপনের সব কাপড় ইস্তিরি কইরা রাখছি, লইয়া যাইবেন না ? 

থমকে দাঁড়ায় নিতাই। বুঝতে পারে সে তার বাসার শিল্পী হোটেলের গলির জুম্মন ড্রাই ক্লিনার্সের সম্মুখে দাঁড়িয়ে। চোখ বড় বড় করে চারপাশ একাবার দেখে নেয় কোথাও সেই মেয়ে, সেই লণ্ঠন নেই।

হ্যাঁ দেন ভাই, নিয়ে যাই।      

বারো.

প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। শীতের ভেজা বাতাস হাড়ে গিয়ে ঠোক্কর খাচ্ছে। তাপমাত্রা মাইনাস তিন!  কাল রাতে এয়ারপোর্ট থেকে ইউনিভার্সিটির গাড়িতে হোস্টেলে এসেছে। গাড়িতে হিটার থাকায় তেমন শীত অনুভূত হয়নি। এখন সকালে ঘরের বাইরে পা রাখতেই নড়ে ওঠে নিতাই। ঠক ঠক করে লেগে যাচ্ছে দাঁতের কপাটি। বঙ্গবাজার থেকে কেনা মোটা জ্যাকেট গায়ে দিয়েও উষ্ণ হতে পারছে না। হোস্টেলের সম্মুখে উন্মুক্ত হান্টারডেল পার্ক। উন্মুক্ত প্রান্তর মাড়িয়ে প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসা বাতাসের সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ফোটা বিঁধে যাচ্ছে মজ্জায়! তারপরও ইউনিভার্সিটির পাশেই এত বড় পার্ক দেখে চোখে আরাম পায় নিতাই। দেশে ব্যস্ত এলাকায় এমন পার্ক দেখা যায় না।

নিতাই পাউরুটি আর এক কাপ চা চালান করে দিয়ে তৈরি হয়ে বেরিয়ে যায় ইউনিভার্সিটির প্রশাসনিক ভবনের দিকে। তার উপস্থিতির কথা জানান দিতে হবে। নিতে হবে কোর্সের যাবতীয় দলিলপত্র। ইউনিভার্সিটি ভবনটি এক ঐতিহাসিক স্থাপত্য। প্রথমে ইউনিভার্সিটি নাকি রাজ প্রাসাদ বুঝতে সময় লাগে তার। কারুকার্যময় ভবনের শরীরে যেন ইতিহাস মূর্ত হয়ে আছে। হঠাৎ একটি মেয়েলি কণ্ঠ চমকে দেয় তাকে! তাকে স্বাগত জানাল তরুণী। চোখা নাক, প্রচণ্ড আলোকদীপ্ত চোখ আর পুরু ঠোঁটের ফাক গলে যে হাসি উতরে গড়িয়ে পড়ছে তা দেখে নিতাই বিস্ময়ে কেঁপে ওঠে। তরুণী জানাল প্রফেসর মার্টিন কিটিং তাকে দায়িত্ব দিয়েছে নিতাইর ইউনিভার্সিটির বাকি প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করে দিতে।

নিতাই কিছু সময় নির্বোধের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবে কোথাকার আজপাড়া গাঁ থেকে উঠে আসা এক তরুণ বিলেতের মাটিতে এসে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে সম্ভব হলো। কারা সম্ভব করল। কেন করল! প্রশ্নগুলোর সঙ্গে তার বুকে যেন হু হু করে জমে উঠল কাজের পাহাড়। কাজ না দায়িত্ব তা নিয়েও দ্বদ্বে থাকে কিছু সময়। মেয়েটি আবার ডাক দিতেই তাকে অনুসরণ করে। কাগজপত্র সব জমা দিয়ে ভর্তির চূড়ান্ত কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর মেয়েটি তাকে নিয়ে যায় ইউনিভার্সিটি ক্যাফেটেরিয়ায়। বেশ পরিপাটি। পুরো ভবনের বাইরের কারুকার্যের মতো ভেতরটাও স্থাপত্য শিল্পের রুচি ধারণ করে আছে। তরুণী কফি আর দু’টো মাফিন হাতে এসে বসল টেবিলে। নিতাই তখনও ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছে। মেয়েটি এবার আলাপ শুরু করে―

স্যরি শুরুতেই আমার নাম বলা উচিত ছিল। তোমাকে দেখার পর আমার সেই ফরমাল বিষয়টি কেন যেন মাথায় আসেনি। আমি লরা, লরা স্টিভেন।

বলেই নিতাই’র দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। নিতাই অনভ্যস্ত হাত বাড়িয়ে ছোঁয় লরার তুলতুলে নরম হাত। তার হাতের আঙ্গুলগুলো যেন মুহূর্তেই অক্টোপাসের মতো প্যাঁচিয়ে ফেলে নিতাইর হাত। অবস নিতাই কিছু সময়ের জন্য হাতে টেনে আনার জোর পায় না।

ও তাই। লরা, আমি নিতাই।

তোমার নাম আমি জানি। মার্টিন আমাকে বলেছেন। আমিও তোমার সঙ্গে একই ক্লাসে। ভালো হলো তোমাকে পেয়ে।

তাহলে তো ভালোই হলো। তোমার কাছ থেকে পড়াশোনায় সাহায্য পাব।

সাহায্য বলছ কেন, বলো দু’জনে মিলে পড়ার কাজটি সম্পন্ন করব।

তুমি কি কোনও টপিক টিক করেছ যেটি নিয়ে কাজ করতে চাও ?

তুমি এবং আমি একই টপিক। টপিক আমি ঠিক করিনি। বলতে পার মার্টিন চায় তুমি এবং আমি এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করি।

কি বিষয় ?

দেখো রাউটলেস এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিল্ম থিউরিতে গৎ বাঁধা একটা কথা আছে। চলচ্চিত্রের বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তার বিকাশ একটা একাডেমিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যার মধ্য দিয়ে বুঝতে হবে শিল্প এবং বাস্তবতার সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক কোথায়। জানি না তুমি এর সাথে কতটুকু একমত। আমি কিন্তু একেবারেই একমত নই। আর আমার এই একমত না হওয়ার বিষয়টিই মার্টিন পছন্দ করেছে। তিনি আমাকে বলেছেন, এ কাজটি তোমার চিন্তার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তাই যেন তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমি কাজটি করি।

তা না হয় করলাম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তুমি থিউরির বাইরে কেন যেতে চাও ? আর বাইরে যদি যেতেই হয় তাহলে তোমাকে তো নতুন থিউরিতে যেতে হবে। সেই জায়গাটি কভিাবে চিহ্নিত করবে ?

এ জায়গায় এসে তোমার আমার বিতর্কের সুযোগ আছে। এ সুযোগকে প্রশ্রয় দিলেই দেখবে আমরা পেয়ে যাব চল ভাঙার নতুন দিগন্ত।

আরেকটু খোলাসা করলে বিষয়টিতে প্রবেশ করা যেতে পারে।

ধরো বিশেষ করে রাজনীতি-নির্ভর যেসব চলচ্চিত্র এ যাবত হয়েছে তাদের প্রধান অবলম্বন হচ্ছে মিথ। এই মিথ থেকেই উস্কে দেওয়া হচ্ছে রাজনীতি। আর্গো, লিংকন, জিরো ডার্ক থার্টির মতো চলচ্চিত্রগুলো দেখলে এ বিষয়ে বুঝতে সহজ হবে। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যে রাজনীতিক বিরোধ কিংবা কোনও একটি দেশের গোপন রাজনৈতিক কৌশল কীভাবে বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে সেদিকে আমাদের দৃষ্টি থাকবে। তবে আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই না বলেই নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে চাই।

তোমার নতুন ধারণা কি ?

বিশ্বে অনেক উচ্চমার্গের চলচ্চিত্র রয়েছে যেগুলো তথ্য-প্রযুক্তিকে নতুন নতুন পথ দেখিয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে তেমন হয়নি। প্রচলিত রাজনীতিকে ভেঙে তার ভেতরেই ঘুরছে চলচ্চিত্র। ঠিক মিসকারেজ হয়ে যাওয়া ভ্রুণের মতো! আমরা চল ভেঙে সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকব না। অন্য একটি পথ দেখাব।

নিতাই এতক্ষণে বুঝতে পারে তাকে মার্টিন কেন লন্ডনে নিয়ে এসেছে। লরার সঙ্গে অল্প সময়েই সে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যে নিতাই কোনও কফিতে অভ্যস্ত ছিল না, সে কি না এক কাপ সাবার করে আরও এক কাপ নিতে চায়। লরা বুঝতে পেরে আরও দুই কাপ নিয়ে এসে বসে পড়ে পাশে। লরা মিস্টি একটা পারফিউম মেখে এসেছে। সে সুগন্ধ নিতাইকে চুম্বকের মতো টানছে। ইচ্ছে করে লরার শরীরে শরীর ঠেকিয়ে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এত কম সময়ে ভিনদেশি এক তরুণীকে এত ভালো লেগে যাবার কোনও মাজেজা খুঁজে পায় না নিতাই। দেশ ছেড়ে পাশের দেশ ভারতে পর্যন্ত যাওয়ার অভিজ্ঞতা তার আছে। হাজার মাইল দূরে আসা এই প্রথম। আশপাশে পরিবার পরিজন না থাকায় লরাকে আরও বেশি আপন মনে হয়।

রাজনীতিতে ভিন্ন স্বরের কথাই তো আমরা বলছিলাম।

পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি কোনও পরিকল্পনা নেই। প্রায় প্রতিটি দেশই এখন একটি কাল্পনিক ভবিষ্যৎ স্বপ্ন দেখে। এটা বিশ্ব রাজনীতিতে চরম বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে।

আমরা যে রাজনৈতিক দর্শনের কথা বলছি।

এদেশের কথাই যদি ধরো, মার্গারেট থেসারের সরকার ছিল বেশ আলোচিত। অথচ সে সরকারই মনে করেছিল অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি দিয়েই কৃচ্ছ্রতা সাধন করতে হবে। চিন্তাটি কি ঠিক ?

ঠিক নয় কীভাবে বলি ?

বলতে পারি। এখানেই আমরা নতুন ধারণা ইনজেক্ট করতে চাই। আমরা কি বলতে চাইছি, আমরা বলছি অর্থনীতি একটি মঙ্গল রাষ্ট্রের জন্য প্রধান হতে পারে না। তথ্য প্রযুক্তি তো নয়ই। এই জায়গাগুলোতেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে তুমি অর্থনীতি বা প্রযুক্তি দিয়ে কি করবে ? এই জায়গা থেকে আমরা চলচ্চিত্রের গল্প শুরু করতে পারি।

আমার কিন্তু অন্য জায়গায় একটু খটকা আছে। ‘আধুনিক’ কাকে বলছি আমরা এখন ?  দ্রুত পরিবর্তনকে আমরা এমন অভিধায় দাঁড় করাচ্ছি। আসলেই কি তাই। দ্রুত বদলে দেওয়ার নাম তো অপরিপক্বতা হতে পারে।

তুমি ঠিকই ধরেছ। আমরা যে ‘আধুনিক রাষ্ট্র’র কথা বলছি, আসলেই কতটুকু আধুনিক তা নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে। নব্য-উদার গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদকে বলা হচ্ছে আধুনিক রাষ্ট্রের সফলতা, এটাই হচ্ছে হাস্যকর এবং আমাদের ভাবনার জায়গা।

কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে লরা মুখে স্থায়ী হাসি ঝুলিয়ে রাখে। নিতাইকে নিয়ে প্রসাশনিক ভবনে প্রবেশ করে। ভর্তির যাবতীয় সব কাজ শেষ করে বেরিয়ে আসে। হাঁটতে হাঁটতে দু’জনে হান্টারডেল পার্কে এসে দাঁড়ায়। দিনের মধ্যভাগ প্রায়। কিন্তু ঘড়ির দিকে না তাকালে বোঝার উপায় নেই। দেশে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিনের শরীর যেভাবে রঙ বদলায়, ঠাণ্ডা থেকে উষ্ণতায় জেগে ওঠে, এখানকার দিন তেমন নয়। দিনের মধ্যভাগ হলেও সকালে যে কনকনে ঠাণ্ডা ছিল এখনও তাই। তারপরও লরার সঙ্গে পার্কে হাঁটতে মন্দ লাগছে না নিতাইর।

আচ্ছা মার্টিনের সঙ্গে কি দেখা করা যাবে ?

মার্টিন তো এখন নেই। কোনও দেশে গিয়েছে ঠিক জানি না।

তোমাকে কিছুই বলে যায়নি!

আমি মার্টিনের খুব প্রিয় ছাত্রী। অনেক কিছুই আমার সঙ্গে শেয়ার করে, কিন্তু এ বিষয়ে একেবারেই সে নিজের ভেতর নিজে মাথা গুঁজে থাকে। এই ধরো  বাংলাদেশ যাওয়ার আগে আমাকে কিছুই বলেনি। ফিরে এসে তুমি আসছ সে খবর আমাকে দিতে গিয়েই জানাল সে বাংলাদেশে ছিল। অথচ, আমি কতবার বলেছি বাংলাদেশের রাজনীতি আমার আগ্রহের জায়গা। সে ফিরে আসার পর এ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। দেখে আসা বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ-অর্থনীতিসহ বহুবিধ বিষয়ে আমাদের কথা হয়েছে।

তুমি যে বলছিলে, বাংলাদেশ তোমার আগ্রহের জায়গা। কেন ?

তোমাদের দেশ ভাগ, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ এসব মূর্ত হয়ে আছে তোমাদের রাজনীতিতে। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন সব সময় মনে জাগে। এই যে এত আন্দোলন তোমরা করেছ, এত অর্জন তোমাদের, কিন্তু সেসবের বহিঃপ্রকাশ কোথায়!

এই প্রশ্নই বা তোমার মনে এল।

কারণ এসব অর্জনের পেছনে যে রাজনৈতিক চিন্তা-দর্শন কাজ করেছিল তা কিন্তু তোমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রে কার্যকর নয়।

তুমি যে কার্যকরের কথা বলছ তা কোথায় আছে ?

না আমি বিশেষ করে সরকার এবং জনগণের কথাই বলতে চাইছি। তোমাদের দেশে শিক্ষা সংস্কার বলতে পার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি করতে পারলে বিরাজমান সংকটের বড় একটি অংশ ঠিক করা সম্ভব হবে।

নিতাই বুঝতে পারে বাংলাদেশ সম্পর্কে লরা বিশদ খবরা-খবর রাখে। এতে লরার প্রতি তার ঝুঁকে পড়ার ইচ্ছে আরও প্রবল হয়ে ওঠে। লন্ডনে এসেই এমন পয়োমন্ত একটি তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হবে চিন্তাও করে নি। কনকনে ঠাণ্ডা শরীরের চামড়া ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছে তারপরও লরার সঙ্গে আরও কিছু সময় থাকতে চায়।

লরা তুমি তো বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক খবর রাখো। এ দেশের গণতন্ত্র সম্পর্কে তোমার মন্তব্য কি ?

এ প্রশ্নের উত্তর জানার আগে তুমি নিশ্চয় জানো যে বিশ্বের কোনও রাজনৈতিক চিন্তাই পোক্ত নয়। যারা সরকারে আসছে তারা নিজেদের মতো একটি পলিসি সেট করে নিচ্ছে। একে বলতে পার স্বনীতি। গণতন্ত্র তো তোমাকে তা করতে বলেনি। যুক্তরাজ্যও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এদেশে যে ওয়েলফেয়ার সিস্টেম রয়েছে তা মানুষের মঙ্গলে কাজ করছে। যদিও গণতন্ত্র নিয়ে তুমি প্রশ্ন করতেই পার।

এবার একটু ভিন্ন বিষয়ে কথা বলি তোমার সঙ্গে। রাজনীতি নিয়ে প্রচুর কথা হলো। তুমি কোথায় থাকো লরা ?

ওই যে পার্কের ওই পাড়ে একটি দোতলা হোস্টেল দেখতে পাচ্ছ সেখানে। রুম নাম্বার ১২। আমি একা থাকি। যেকোনও সময় আসতে পার।

তোমার বাবা মা কোথায় থাকেন ?

উনারা পিমরোজ হিলে নিজের বাড়িতে থাকেন। আমি মাঝে মধ্যে গিয়ে দেখে আসি।

ও সেটাই তাহলে তোমাদের বাড়ি।

আমার নয়, আমার বাবা মা’র। আমার কোনও বাড়ি নেই। প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আমি সামারে অন্য কোনও দেশে ঘুরতে চলে যাই। এসে আবার এই হোস্টেলে। ফলে আমার নিজের কোনও বাড়ির প্রয়োজন হয় না।

নিতাই এবার কিছুটা দ্বন্দ্বে পড়ে। বাবা-মা’র বাড়িকে নিজের বাড়ি মনে করে  না লরা। তবে বাবা-মা’র প্রতি তার যথেষ্ট ভালোবাসা প্রকাশ হয়েছে কথায়। যস্মিন দেশে যদাচার―একেই বলে। লরা হাঁটতে হাঁটতে নিতাই এর হোস্টেলের সম্মুখে এসে দাঁড়ায়।

আজ তাহলে আসি। কাল দেখা হবে।

কেন বিকালে তুমি কোথাও বের হও না ?

তা হই প্রতি দিনই। আজ এখনও ঠিক করিনি কোথায় যাব। তুমি চলে আসো বিকালে তোমাকে নিয়েই বেরুব। তবে সাবধানে আসবে।

সাবধানে কেন ?

তোমার অপহরণের ঘটনা কি ভুলে গেলে ?

এবার চূড়ান্ত ধাক্কা এসে তার বুকে লাগে। অপহরণের ঘটনাও জানে লরা!

তুমি কে ? মানে বলছিলাম তুমি কি করে জানো।

নিতাই বিকালে দেখা হবে। সাবধানে থাকবে।

লরা খোলা পার্কের সবুজ ঘাসের গালিচা মাড়িয়ে কোনাকোনি হাঁটতে থাকে। নিতাই দাঁড়িয়ে থাকে। লরা হাঁটছে আর মনে হয় সবুজ ঘাসের ওপর নাচতে নাচতে উড়ে চলেছে একটি প্রজাপতি।

দিনের সাড়ে তিনটা। অথচ সন্ধ্যা নেমে পড়েছে! তাহলে বিকাল কখন! নিতাই তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে পা চালায় লরার হোস্টেলের দিকে। গে’টে পৌঁছোতেই লরা বেরিয়ে আসে। বোঝা যায় নিতাই আসার অপেক্ষায় বসে ছিল।

নিতাই আজ তোমার পছন্দের কোথাও যাব।

আমি মাত্র এলাম। লন্ডনের কিছু চিনি না। তবে হ্যাঁ একটা ঠিকানা আছে তোমাকে দিতে পারি। সম্ভব হলে সেখানে যেতে পারি আমরা।

বলেই পকেট থেকে সেই ভিজিটিং কার্ডটি বের করে দেয়। লরা কার্ডটি হাতে পেয়ে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

তুমি কোথায় পেলে এ কার্ড ?

আসার সময় বিমানে এক লোক দিলেন।

হুম, বুঝতে পেরেছি। চলো আমরা এ ঠিকানাতেই যাই। বেশি দূর নয়।

গুডস স্ট্রিট টিউব স্টেশন থেকে ট্রেন চেপে দু’জনে এসে বের হয় কভেন্ড গার্ডেন স্টেশনে। স্টেশন থেকে পাঁচ মিনিট পায়ে হাঁটার পথ শেষে উপস্থিত হয় ২৬ ইবঃঃবৎঃড়হ ঝঃ, ডবংঃ ঊহফ, খড়হফড়হ ডঈ২ঐ ৯ইঢ । একটি কপি শপের পাশ ঘেঁষে ভিতরে চলে গেছে একটি চিকন সরু গলি। তার শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট অফিস। ঠিকানায় পৌঁছে নিতাইর মনে পড়ে যায় পল্টনের অফিসের কথা। দুটো অফিসের আবহে অনেক মিল। লরা এবং নিতাই ছোট্ট ঘরটিতে প্রবেশ করা মাত্রই চুলে ঝুটি করা সপ্রতিভ চেহারার এক লোক জানতে চায় কার কাছে এসেছে। নিতাই কার্ড টি বের করে দেয়। কার্ড হাতে নিয়ে লোকটি লরার দিকে তাকায়।

লরা, ইনি কি তোমার সঙ্গে এসেছে ?

হুম আমার সঙ্গে। 

নিতাই এবার বুঝতে পারে লরার এখানে আসা যাওয়া আছে। কিন্তু লরা এখানে আসার আগে তাকে বলল না।

তাহলে আমাদের তো দীর্ঘ কথা বলার প্রয়োজন নেই। স্যরি আপনার নাম জানা হয়নি।

আমি নিতাই।

আপনার দেশ ?

বাংলাদেশ।

দেশের নাম শুনে লোকটি আবারও ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়। তাহলে তো ভালোই হলো।

কি ভালো হলো ?

শুনুন ভালো-মন্দ সময়ের কাছে জানা যাবে। আমরা হচ্ছি নিমিত্ত  মাত্র। এসেছেন লন্ডন ঘুরে দেখুন। বাকিটা লরা আপনাকে বলতে পারবে।

না মানে, আপনার কথাটা আমাকে জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংক্ষেপে বললেও আমি অতৃপ্ত হবো না।

লোকটি একবার লরার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের ফাক গলে হাসি বিনিময় করে।

দেখুন একটা কমন প্র্যাকটিস বহু পুরোনো। কোনও বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধাতে পৌঁছোনোর আগে প্রয়োজন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। উন্নত বিশ্বের এই পরীক্ষাগার হচ্ছে বাংলাদেশসহ এশিয়ার উন্নয়শীল দেশগুলো। এ বিষয়গুলো অত্যন্ত রাজনৈতিক। বাংলাদেশ এর মাজেজা বোঝে কি না সন্দেহ। আমরা তেমন কোনও প্রমাণ পাইনি।

যেমন ?

কেবল একবার ব্রিটিশ কলোনিগুলোর দিকে তাকান উত্তর পেয়ে যাবেন। উপসাগরে আমেরিকার যুদ্ধ কৌশলের দিকে তাকানোর পর আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।

উপসাগরীয় দেশগুলো তো আর আমাদের মতো দরিদ্র নয়।  আমরা এই জায়গাগুলোর কথাই বলছি। বলতে চাইছি নীতি এক, বিশ্ব এক। একটাই ভূখণ্ড। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমারেখা নিয়ে আমাদের কোনও কথা নেই। কিন্তু যে রাজনীতি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে সে নীতি নিয়েই আমাদের প্রশ্ন। আমাদের কাজ।

আপনার আর সময় নেব না। আমি বুঝতে পারছি আপনি কি বলতে চাইছেন। দেখা হবে। কথা বলতেই তো এসেছি।

কথাগুলো বলার পর, নিতাইর চোখ থেকে বিষণ্নতায় ছোঁয়া একটি আলোর গতি যেন ঠিকরে বেরিয়ে গেল। লরাকে অনুসরণ করে চিকন গলিটি পেরিয়ে এসে দু’জনে প্রবেশ করে একটি কফি শপে। প্রথম কোনও বিলেতি কফি শপে প্রবেশ করল নিতাই। মনে মনে ঠিক করে সুযোগ পেলে একটা ডান্স ক্লাব কিংবা পাবে ঢুঁ মারবে। এবার নিতাই আর কফি পান করতে চাইল না। একটা অরেঞ্জ জুস আর ক্রইসান্ট নিল। লরা একটি ডিক্যাফ হাতে নিয়ে এসে বসল নিতাইর মুখোমুখি। ক্যাফেটি বেশ ভালো লাগল নিতাইর। চার দেয়ালে কাঠের কারুকাজ। সিলিং থেকে ঝুলে ঝুলে নেমে এসেছে সিলভার কালারের অজস্র বল। বাতির আলোয় পুরো ক্যাফের সাজ বড় মোহ জাগাল তার মনে। আলোর একটি রেখা লরার চোয়াল গড়িয়ে থেমেছে একেবারে বুকের মধ্যভাগে। লরাকে সে আলোয় নতুন করে দেখে। ভাবে কেন মেয়েটি তার সঙ্গে এত সময় ব্যয় করছে। আশেপাশের কোনও টেবিলে এশিয়ান গায়ের রঙে কাউকে দেখা গেল না। সবাই নিজের বন্ধু এবং বন্ধুনিকে নিয়ে গরম কফিতে চুমুক দিচ্ছে। কেবল লরা কোথা থেকে উঠে আসা এক চাষাভুষা তরুণের সঙ্গে লেপ্টে থাকতে চাইছে। এ সম্পর্কের নাম কি দেওয়া যায় ?

লরা তোমার কোনও বন্ধু নেই ?

অবশ্যই আছে। আমার অনেক বন্ধু।

না অনেক বন্ধুর কথা ঠিক বলছি না।

বুঝতে পেরেছি। মাত্র এলে লন্ডনে। একসঙ্গে থাকো কিছুদিন তারপর দেখতে পাবে কে আমার কেমন বন্ধু।

আমি এখানকার থিয়েটার দেখতে চাই। নতুন কোনও একটি কাজ যদি দেখতে চাই কি করতে হবে ?

কিছুই করতে হবে না। আগামী শনিবার আমরা গ্লোব থিয়েটারে যাব। দি টেম্পেস্টের প্রদর্শনী আছে।

বাহ তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

তোমাদের দেশের থিয়েটার সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিতে পার আমাকে।

বাংলাদেশের থিয়েটারে প্রচুর ভালো কাজ হয়। পশ্চিমা নাটকের অনুবাদ কিংবা ছায়া অবলম্বনে অনেক কাজ হয়। মৌলিক নাটকের দিক থেকেও একটি বৈশ্বিক মানদণ্ডে রয়েছে বাংলাদেশের থিয়েটার আন্দোলন।

খুব ভালো। কিন্তু নাট্য আন্দোলন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পালাবদলে কোনও ভূমিকা রাখতে পারে কি না ?

অবশ্যই পারে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় গান এবং নাট্যন্দোলনের ভূমিকা ইতিহাসে জারি আছে।

যাক এসব বিষয়ে কথা হতে পারে পরে। চলো এই এলাকাটা ঘুরে দেখতে পার। বিলেতের এই এলাকা মানে কভেন্ট গার্ডেন, পিকেডেলি সার্কাস, লেসটার স্কোয়ার এবং সোহো হচ্ছে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র।

তাই নাকি। তুমি অল্প সময়ে আমার মেজাজ ধরলে কি করে ?

শোনো পরিবর্তনের পক্ষে যে সব মানুষ দৃষ্টি প্রসারিত রাখে তারা সব সময় নতুন কিছু দেখতে চায়। এই দেখতে চাওয়াই হচ্ছে তার সংস্কৃতি। যা তার ভেতর এ চাহিদা তৈরি করে।

কথা বলতে বলতে হঠাৎ রাস্তার পাশে একটি বিল্ডিং এর গায়ে আঁকা একটা ছবিতে চোখ আটকে যায় নিতাই’র। সাদা দেয়ালে পেন্সিল আর্ট। একটি শিশু কন্যা হাত বাড়িয়ে আছে, উড়ে যাচ্ছে একটি হার্টস শেপের লাল বেলুন। শিশুটির চুলের আকৃতি বলে দিচ্ছে ছবির গতি।

ও এই ছবি। দেখো ছবিটি মানুষ কতটুকু বুঝে কে জানে। এই যে দেখতে পাচ্ছ ভালোবাসার প্রতীকী বেলুনটি ধরে রাখতে পারেনি শিশু কন্যাটি। বেলুন হারানোর বেদনা স্পষ্টতই দৃশ্যমান তার চেহারায়। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। পৃথিবী ক্রমশ মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এভাবে এখানে ছবিটি এঁকেছে কে ?

ব্যাঙ্কসি। পুরো লন্ডন শহরে দেয়ালে দেয়ালে তার অসংখ্য ছবি দেখতে পাবে। 

ব্যাঙ্কসি কে ?

ব্যাঙ্কসি কে, এ প্রশ্ন সবার। সে কি একা কোনও ব্যক্তি না একটি দল, এ নিয়ে এখনও নিশ্চত হওয়া যায়নি। কেউ কেউ বলে থাকে ব্যাঙ্কসি একজন স্বর্ণকেশী তরুণীর নেতৃত্বে আর্টিস্টদের একটি দল। ব্যাঙ্কসি স্ট্রিট আর্টিস্ট।

তোমার কথায় মনে হচ্ছে বিখ্যাত কোনও শিল্পী ব্যাঙ্কসি।

তা তো বটেই।

তাহলে সে পরিচয় দেয় না কেন ?

ব্যাঙ্কসি একটি আন্দোলন। তাঁর যে কাজ, প্রায় প্রত্যেকটি সংস্কার কিংবা প্রতীকী ব্যঞ্জনা রয়েছে। তার আঁকা ছবি ‘এক্সিট থ্রো দি গিফট শপ’ অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। কিন্তু ব্যাঙ্কসি তা গ্রহণ করেনি!

কি বলো কেন ?

সে কেন’র পরিষ্কার কোনও উত্তর নেই। তার আঁকা এই ছবিটি সাউথ বে নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিলামে তুলেছিল। ছবিটির বিক্রি হয়েছিল ১.০৪ মিলিয়ন পাউন্ডে! যদিও এ অর্থ ব্যাঙ্কসি পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না সন্দেহ রয়েছে।

তাহলে ব্যাঙ্কসি কেন এসব ছবি আঁকে।

তোমাকে আগেও বলেছি, এটি একটি আন্দোলনের নাম। তার যত ছবি রয়েছে সব ক’টিতে দ্রোহ বিদ্যমান। আমরা তার আর্ট কাজে লাগাতে পারি। ইনফেক্ট আমরা কাজে লাগিয়েছিও। কিং রব্বো আশির দশকের বিতর্কিত গ্রাফিতি আর্টিস্ট ছিলেন। ব্যাঙ্কসি এবং তার কাজ নিয়ে চ্যানেল ফোরে ‘গ্রাফিতি ওয়ার’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছিল। এরকম আরও বহুবিধ বিষয় আছে যেগুলো আমাদের চিন্তা এবং দর্শনের সঙ্গে মিলে যায়। তোমাকে আরেকদিন দিনের বেলায় দেখাব ব্যাঙ্কসির কাজ।

নিতাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার মনে হয় ব্যাঙ্কসির কাজ বাংলাদেশেও রয়েছে। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না’ ঢাকা শহরের দেয়ালে দেয়ালে এই যে গ্রাফিতি কে এঁকেছে। কাউকে তো শনাক্ত করা যায়নি। তাহলে কি ব্যাঙ্কসি বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত! এ মুহূর্তে আরও অনেক আর্টের কথা মনে পড়ছে নিতাই’র। ‘ইধহধহধ রং ধ হড়হ-ঢ়ড়ষরঃরপধষ ভৎঁরঃ’,  কিংবা ‘নির্বোধ তুই পালিয়ে যা, পাঠকরা খুঁজতেছে’ এমন অনেক কাজ ঢাকায় রয়েছে। যে আর্টের মধ্যে বার্তা আছে, আছে দ্রোহ ও সংস্কারের প্রবল ইঙ্গিত।

তুমি মনে হয় ব্যাঙ্কসি নিয়ে একটু বেশি ভাবছ। তা মন্দ নয়। আর্ট সব সময় আন্দোলন জাগিয়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। ব্যাঙ্কসির ‘এ ভিজ্যুয়াল প্রোটেস্ট’ এর কথা একবার ভাব তো! ‘নো বল গেম’ এর দিকে তাকিয়ে দুই কিশোর বল ধরার চেষ্টা করছে। যদিও সেখানে নেই কোনও বল। আছে সাবধান বাণী! কিশোর বয়সে প্রথা না মানার নিদর্শন। আর যদি ভাব ‘এপ্লোস‘ এর কথা! রণতরী থেকে উড়াল দিচ্ছে যুদ্ধ বিমান, আর একজন আর্মি হাতে ‘এপ্লোস‘ লেখা প্লেকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! এই হচ্ছে যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে ব্যাঙ্কসির অবস্থান। ‘ফ্লাওয়ার বোম্বার’ তার আরেকটি ঐতিহাসিক কাজ। জেরুজালেমে এই চিত্রকর্মটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফিলিস্তিনের অধিকার আদায়ের জন্য ব্যাঙ্কসি অনেকগুলো ছবি আঁকে, তার মধ্যে ‘ফøাওয়ার বোম্বার’ অন্যতম।  

নিতাই চুপচাপ কথা শুনে যায়। যত সময় যাচ্ছে ততই লরার প্রতি আরও বেশি ঝুঁকে পড়ছে।

আচ্ছা ব্যাঙ্কসি কোথায় থাকে, তা নিশ্চয় তুমি জানো।

কথিত আছে ব্যাঙ্কসির জন্ম শহর ব্রিস্টল। সেখানে এখন থাকেন কি না জানা নেই। কেন তার ঠিকানা দিয়ে কি করবে ?

তা হয়েতো সম্ভব হবে না। আমি মনে করি দেখা করতে হবে তেমন কোনও প্রয়োজন নেই। আমরা কাজের ভেতর দিয়েই তো তাকে পেয়ে যাই। তবে ইস্টএন্ডে তার অনুসারীদের একটা আখড়া আছে। একদিন যাওয়া যেতে পারে।

শুনেছি ইস্টএন্ডের দিকেই নাকি বাংলাদেশের মানুষ বেশি থাকে।

হ্যাঁ, ব্রিকলেন তো বিপুলসংখ্যক বাঙালি রয়েছে। বাংলা টাউন সেটি। তবে তোমাকে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে। অন্যদের মতো তুমি যখন যেখানে ইচ্ছে যেতে পারবে না। তুমি যে এখন আমার সঙ্গে আছো, তার তথ্য তালাশ করতেও কিন্তু সিআইএ ব্যস্ত।     

লন্ডন আসার পর একে একে কিছু দরজা খুলে যাচ্ছে। নিতাই বুঝতে পারছে দেশে দেশে একটি নতুন চিন্তা, নব আন্দোলন জেগে উঠছে। পাশাপাশি একটি শিল্প বিপ্লব অনেকদূর এগিয়েছে। তার এ ধারণা তৈরি করেছে ব্যাঙ্কসি। প্রথা-বিরোধী এবং দ্রোহের এ শিল্পকর্ম এখন পুরো বিশ্ব বিস্তার লাভ করেছে। হতে পারে ব্যাঙ্কসি একজন ব্যক্তি কিংবা সংগঠন, অথবা ধরা যাক একটি আন্দোলন দর্শনের নাম। তবে ব্যাঙ্কসির চিত্রকর্ম চড়া দামে নিলামে বিক্রি হওয়ার খবর নিতাইর মনে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এক দেড় মিলিয়ন পাউন্ড দামে ছবি কিনবে যে সে তো পুঁজিপতি। পুঁজিপতি কেন এই ছবি চড়া দাম দিয়ে কিনছে বা কিনতে চায়! প্রায় সব ছবিই তো রাজনীতি-বিরোধী। যে পুঁজিপতি কিনছে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে ব্যাঙ্কসির কাজ। পুঁজিপতিদের এও এক কৌশল। এ কৌশলে নিজেকে আড়াল করে  শিল্পের মোড়কে। বহু বুর্জোয়া রাজনীতিক রয়েছে তারা যা করে মূলত তা তাদের নিজস্ব কিছু নয়। কেবল রাজনীতিতে নয়, সমাজ, ধর্ম সবক্ষেত্রেই এই খেলা বিরাজমান।

পিকেডিলি ছাড়িয়ে লেসটার স্কোয়ারের দিকে আসতে পথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গিটার হাতে এক যুবক গান গাইছে। বিচ্ছন্নভাবে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ তার গান শুনছে। কেউ কেউ সামনে রাখা গিটারের ব্যাগে কয়েন ফেলে চলে যাচ্ছে। গান থামিয়ে যুবকটি সবার দিকে একবার তাকায়।

আমি সেলেব। সঙ্গে যাদের দেখছেন, ডবি আমার গার্ল ফ্রেন্ড। আর এই যে রাল্ফ (একটি কুকুর) ও হচ্ছে আমার পথের দিশারি। আমি ওর সঙ্গেই ঘর ছেড়েছিলাম। সাসেক্স থেকে ব্যস্ত লন্ডনে এসেছিলাম। কারণ আমার কাছে বর্তমানের অনিশ্চিত সময়ের চেয়ে ভবিষ্যৎ বেশি অনিশ্চিত মনে হয়নি। তাই রাল্ফের সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম। সময় ও মানুষের কাছে দাঁড়িয়ে বুঝতে আমরা কোথায় আছি। যাচ্ছি কোথায়। কার কাছে যেতে চাই।  এই ভ্রমণে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডবি। নারী এই প্রকৃতির সবচেয়ে মায়ারি একটি সৃজন। আমাদের সঙ্গে ও যোগ দেওয়ার পরে বুঝতে পারলাম তাকে আমার কতটুকু প্রয়োজন ছিল। সে না হলে আমাদের ভ্রমণ পূর্ণ হতো না। রাল্ফ আমাকে আরেকটি বিষয় শিখিয়েছে, যে রাস্তায় না নামলে নিজেকে চেনা যায় না। মানুষের ভিড়ে দাঁড়ালেই নিজেকে চেনা যায়।

নিতাই বিস্ময়ে কথাগুলো শুনে। আর বাংলাদেশের বাউল দর্শনের সঙ্গে কথাগুলোর সাযুজ্যতা কতটুকু তা মেপে দেখে। সেলেব যে কথাগুলো বলছে সবই তো লালনের কথা! নিতাই ঠিক দেখতে পায় শ্বেত চামড়ার মানুষটির পাশে দাঁড়িয়ে লালন গাইছে ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো/শুন বলিরে পাগল মন/মানুষের ভিতরে মানুষ/করিতেছে বিরাজন/মানুষ ধরো…’। তাদের গায়ে যে পোশাক তারও কত মিল! এখানে এসে একটু থমকে যায় নিতাই।  মিল কই ? সেলেবের মাথায় বাদামি নিউজবয় ক্যাপ, একটি বাদামি জ্যাকেটের ওপরে পরেছে ছেঁড়া গেঞ্জি। তাতে অসংখ্য তালি দেওয়া। জলপাই রঙের প্যান্টের সঙ্গে পায়ে দিয়েছে একজোড়া বাদামী বুট। নিতাই বুঝতে পারে পোশাকের একটি ভৌগোলিক সংস্কৃতি আছে, আছে স্থানিক লিগেসি, কিন্তু বিশেষ এই পোশাকগুলোর অন্তর্গত একটা সুর যেন একসূত্রে গাঁথা। নিতাই ভাবে পোশাক এখানে গুরুত্ব পাচ্ছে কেন! হয়তো নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করার একটি প্রক্রিয়া। লরার কথায় নিতাই নিজের কাছে ফেরত আসে।

লরা, একটা বিষয় আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। সেলেব যে পোশাক পরেছে তা কিন্তু তুমি এখন কার গায়ে দেখবে না। কি ভিন্নতা তাই না ?

বিশ শতকের প্রথম দিকে লন্ডনে বেশ কিছু স্ট্রিট সিঙ্গারের আগমন ঘটেছিল। তাদের মধ্যে একজন শিল্পী বেশ আলোচিত। তাঁর নাম ছিল কিথ। তার গায়কীর সঙ্গে ছিলো পোশাকী ঢং। দু’টো মিলে যে দ্যোতনা তৈরি করত, তাই ছিল দেখার মতো। আমি তার গল্প শুনেছি আমার দাদার কাছে। সেলের যে পোশাক পরেছে তা সেই কিথ স্টাইল। এখন যত স্ট্রিট সিঙ্গার দেখবেন তাদের অধিকাংশের পোশাকের ঢং একই। আমি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে একবার বাংলাদেশের বাউল বিষয়ে একটি প্রদর্শনী দেখেছিলাম। আমার মনে হয়েছে, এই যে এখানকার স্ট্রিট সিঙ্গার আর তোমাদের বাউলদের মধ্যে একটি মিল রয়েছে।

লরা, তুমিও কি তাই মনে করো ? আমি সেকথাই ভাবছিলাম। সেলেবকে দেখে আমার মনে হলো লালন এখানে দাঁড়িয়ে গান করছে।

বাহ্ তুমি মনে করিয়ে দিলে। আমি লালনের কথাই বলতে চাইছিলাম তোমাকে। ব্রিটিশ লাইব্রেরির প্রদর্শনীতে লালনকে জেনেছি। দেখো সেই আঠারো উনিশ শতকের লিগেসি যেমন তোমাদের বাউলরা বহন করছে, ঠিক তেমনি এই সেলেবদের মাঝেও সেই ইতিহাস দৃশ্যমান।

আমার কি মনে হয় জানো, এই যে বাউল এবং স্ট্রিট সিঙ্গারদের সহজিয়া দর্শন তা একটি সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। তুমি একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করবে কার জন্য ? মানুষের জন্য। তাহলে তো মানুষই সব। তুমি সেই রাষ্ট্রকে যদি মানুষের বসবাসের অনুপযোগী করে তোল তাহলে তো সে রাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই।

তুমি ঠিকই ধরেছ। আমরা সে কথাই বলতে চাইছি। বাউল বলো, স্ট্রিট সিঙ্গার বলো আর ব্যাঙ্কসি বলো সবার বক্তব্য কিন্তু এক। সবাই ভিন্ন ভিন্ন ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে একই মঞ্চে কথা বলছে।

নিতাই লন্ডনের একটি ব্যস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে দেশ থেকে নিজের অবস্থানের দূরত্ব আর টের পায় না। যখন চিন্তা এক হয়ে যায়। যখন ভৌগোলিক সীমারেখা উপড়ে ফেলে সব একাকার হয়ে যায়। সেখানে আর কোনও বিচ্ছিন্নতা থাকে না। নিতাই এ মুহূর্তে নিজেকে এই পৃথিবীর একজন মানুষ মনে করছে। একটি দেশ হচ্ছে নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতির সৌধ। সব সৌধের, সব স্রোতের এক মোহনায় জেগে ওঠার নামই হচ্ছে আন্দোলন। এই আন্দোলনের দিকেই এগুচ্ছে একটি মানব গোষ্ঠী। পুরো পৃথিবী জুড়ে এর সূচনা হাজার বছরের। কিন্তু তারা একটি নির্দিষ্ট সড়কে উঠে দাঁড়াতে পারেনি। নিতাই ঠিক দেখতে পাচ্ছে সবাই এখন একে একে উঠে দাঁড়াচ্ছে। কারণ এখন তো আর কোনও বিচ্ছিন্নতা নেই। পল্টন থেকে কভেন্ট গার্ডেন একটি সড়কের নাম।

লরা বাসায় ফেরার তাগাদা দেয়। যদিও নিতাইর ইচ্ছে করছিল আরও কিছু সময় থাকতে। কিন্তু কোথায় যেন একটা সুতো আলগোছে টান দিয়ে বলছে, ‘লরা ছাড়া কোনও কিছুই উপভোগ্য নয়’। সেলেব যেমন ডবিকে ছাড়া নিজেকে অপূর্ণ মনে করে। লরার সঙ্গে আবার কভেন্ট গার্ডেন স্টেশন হয়ে বাসার পথে রওনা হয় নিতাই।    

তের.

লন্ডন প্রিয় শহর হয়ে উঠছে। যত দেখছে তত মুগ্ধ হচ্ছে নিতাই। প্রাচীন একটা শহর। নিজের অঙ্গসজ্জা ঐতিহ্যের মোড়কে মোড়া। কোনও কিছুই বদলের নয়। যত দিন যাচ্ছে ততই এই শহরের মজ্জায় নিজেকে স্থাপন করছে। পুরো শহরে জৌলুসের কমতি নেই। পৃথিবীর ব্যস্ততম এবং ব্যয়বহুল এই শহরের মানুষগুলো কিন্তু বদলে অভ্যস্ত। নিজেকে বদল করে নেওয়ার প্রবণতা দুর্লক্ষ্য নয়। তবে সে বদল মানসিক না মানবিক ? এই প্রশ্ন এখন প্রধান। একজন মানুষ নিজেকে খুনি বানাচ্ছে। একজন মানুষ নিজেকে পতিতা কিংবা পতিত বানাচ্ছে। একজন মানুষ চোর হয়ে উঠছে। একজন মানুষ ছিনতাইকারী হয়ে উঠছে। একজন মানুষ চোরাকারবারী হয়ে উঠছে। একজন মানুষ পোশাকে নিজেকে পরিবর্তন করছে। নতুন মডেলের গাড়ি কিনছে। ফি বছর বাসার সব ফার্নিচার বদল করছে। আবার সব হারিয়ে রাস্তায় কম্বল মুড়িয়ে ঘুমাচ্ছে কেউ কেউ। সরকার তাদের ধরে ধরে জেলে পুরছে। এতসব পরিবর্তনের মধ্যে চিন্তারও পরিবর্তন হচ্ছে। এত সব মানুষ যে পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকছে, তাদের একটি অংশ মানবিক পরিবর্তনের দিকে ধাবিতে হচ্ছে। নিতাই এতদিনে সেই মানুষগুলোর খোঁজ পেয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে প্রতিদিন আড্ডা হচ্ছে। কোন দেশ থেকে কীভাবে এই পরিবর্তনের সূচনা করা হবে সেই পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থান চিন্তায় রেখে। লরা এবং নিতাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একে অন্যের ওপর আরও বেশি নির্ভর হয়ে ওঠে। লরাকে এই পৃথিবীর অতুলনীয় একটি মানুষ মনে হয় তার। সর্বাঙ্গে সুন্দরী একটি মেয়ে বিয়ে করে সুখেই জীবন যাপন করতে পারত। কিংবা একটা ধনী বয়ফ্রেন্ড থাকতে পারত। পোশাকি বদলে নিজেকে সামিল করতে পারত। কিন্তু ওসবে সে গেল না। গ্রহণ করল নিতাইর মতো অজ পাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা এক অনভিজ্ঞ যুবককে। প্রতিদিন সে নিতাইকে ভরিয়ে তুলছে ভালোবাসায়। এসব ভেবে ভেবে লরার বুকে মুখ গুঁজে বহুবার নিতাই কেঁদেছে। লরা বুঝতে পারে না নিতাই কেন কাঁদে। ভাবে দেশের জন্য মান কাঁদে। তবে লরা নিতাইকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে মাঝে মধ্যে অদ্ভুত আচরণ করে। নিতাইকে দেশে আর যেতে দেবে না বলে পায়ে শক্ত খুট দিয়ে দাঁড়ায়। আবার পরের দিন কভেন্ট গার্ডেন সে খুট ছাড়িয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় কার কোথায় যেতে হবে, কেন যেতে হবে। তাদের আন্দোলনের নীতি-আদর্শ-দর্শন সবকিছু পরিষ্কার হয়ে উঠছে। তৈরি হচ্ছে এর অবকাঠামো। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, মৌলবাদ এসবের কিছুই নয়। তৈরি হচ্ছে নতুন তন্ত্র। বিশ্বের রাজনীতিকরা বুঝতে পারেনি তাদের অলক্ষ্যে এমন একটি মানসিক পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে। লন্ডনে একে একে দেখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মারিও, স্পেনের ভেনেসা, ইটালির অলিভিয়া, ফ্রান্সের ভেরনিকা ও মরিস, অস্ট্রেলিয়ার টম-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কমরেডদের সঙ্গে। সবার অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক পর্যালোচনা থেকে একটি বিষয় একেবারেই পরিষ্কার মানুষ নতুন চিন্তা, নতুন রাজনীতি চায়। চলমান কোনও নীতির ওপর মানুষ আর নির্ভর করতে চায় না। মানুষের এ চাওয়া ঘিরে নতুন যে মেরুকরণের প্রস্তুতি চলছে তা রাষ্ট্রীয় নীতিকাররা অবগত। স্থানীয় পুলিশ স্টেশন থেকে প্রায় নিতাইকে তলব করা হয়। নেওয়া হয় নানান খবরাখবর। কবে তার কোর্স শেষ হবে। কেন সে এখানে কোর্স করতে এসেছে। অবসরে কি করে। কাদের সঙ্গে তার পরিচয়। ইত্যকার প্রশ্নের কোনও শেষ নেই। লরা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। পুলিশের অচরণে বুঝা যায় নিতাই সম্পর্কে তারা সব খবরা খবর জানে। সে কি করে কোথায় যায় সব খবর তাদের জানা। অতএব সতর্কতার কোনও বিকল্প নেই। কেবল নিতাই নয় কভেন্ট গার্ডেনের ওই আখড়ায় যারা যায় তাদের সবার প্রতি পুলিশের বিশেষ দৃষ্টি। মাঝে মাঝে গোয়েন্দারা এসে ঘুরে যায়। সবই বুঝতে পারে তারা। মাত্র তো শুরু। এখনি এসবে গা করতে চায় না কেউ।              

আজ ব্যাঙ্কসির সতীর্থদের আখড়ায় যাওয়ার উদ্দেশে বেরিয়েছে লরা ও নিতাই। তবে ইস্টএন্ডের আখড়ায় নয় বাটারসির আখড়ায়। ইস্ট এন্ডের আখড়াটি নাকি পুলিশ নিষিদ্ধ করেছে। সেখান থেকে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুড়েছে জেলে। বাটারসির আখড়ায়ও পুলিশ হানা দিয়েছে, তবে বন্ধ করে দেয়নি।

এই যে গোয়েন্দা তৎপরতা। এই যে জেলে পুড়ে দেয়া। এসব কি কখনও কোনও আন্দোলন বন্ধ করতে পেরেছে ? পারেনি।

নিতাই কথা ক’টি বলে উত্তরের অপেক্ষা করে। দু’জন তখন গুডস স্ট্রিট স্টেশনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে। লরা দূরে কি যেন দেখছে। নিতাই কিছুই দেখতে পায় না।

শোন এসব হলেই ভালো। আন্দোলন জমে উঠবে। এসব গ্রেফতার-নির্যাতনের মধ্য দিয়েই মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে আসল বার্তা। আমাদের আন্দোলন যদি মানুষের কল্যাণের জন্য হয় তাহলে সমর্থন পাবোই।  শোন তোমাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটা তথ্য দিই। স্টেশনে প্রবেশের আগে দেখলাম দু’টো মানুষ আমাদের খুব করে ফলো করছে। আমার চোখাচোখি হতেই মানুষের ভিড়ে মিলিয়ে গেল। কথা হচ্ছে, আমি বুঝতে পারিনি তারা কারা। পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা হলে বুঝতে পারতাম। এদের আগে কখনও দেখিনি।

কথাগুলো বলতে বলতে দু’জনে ট্রেনে চেপে বসে। গন্তব্য কভেন্ট গার্ডেন।

আমাদের এত ফলো করার কি হলো বুঝতে পারছি না।

নিতাই, আমরা যে কাজটি করতে চাই তা কোনও রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যায় না। তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়াল ? সব রাজনৈতিক শক্তি আমাদের প্রতিপক্ষ। এমনকি সব রাষ্ট্রও। আমরা যে কথা বলতে চাই। যে তন্ত্র আমরা রাষ্ট্র কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোকে দিতে চাই তা সহজে তারা নেবে না। কারণ তারা যে তন্ত্র-বাদ বিস্তার করেছে বাণিজ্য ফেঁদেছে তা থেকে সরে যাবে না।

আমরা কি করতে চাই তার নির্দেশনা কবে পাওয়া যাবে।

নির্দেশনা ইতোমধ্যে তো পেয়েছই। তারপরও চূড়ান্ত ঘোষণা পাওয়া যাবে শীঘ্রই। অপেক্ষা করো।

বাটারসি স্টেশনে নেমে দ্রুত পা বাড়ায় দু’জনে। লরা খেয়াল করে গুডস স্ট্রিট স্টেশনের সামনে থেকে ভিড়ে মিলিয়ে যাওয়া মানুষ দু’টি আবারও তাদের পিছু নিয়েছে। বুঝাই যাচ্ছে তারা একই ট্রেনে এসেছে। অতএব দৃষ্টির আড়াল হলেও ওই দুই ব্যক্তি তাদের লক্ষ্য করছিল। লরা হঠাৎ টান দিয়ে নিতাইকে নিয়ে ঢুকে পড়ে একটি সরাই খানায়। মাথাগুঁজে বসে পড়ে একটি টেবিলে। একটু পর উঠে দু’গ্লাস পানীয় এনে টেবিলে রাখে নিতাই। কেন এমন করল জিজ্ঞেস করে।

ওই দুই ব্যক্তির হাতে অস্ত্র। তুমি তো দেখি কিছুই খেয়াল করছ না নিতাই। ওরা ওয়াকি টকিতে কথা বলছিল। চোখ কান খোলা রাখতে হবে। তবে আমার প্রশ্ন হলো ওরা কারা। এভাবে অস্ত্র তাক করার মানে কি ? পুলিশের লোক হলে এমন করার কথা না। তাছাড়া গোয়েন্দার কাজও এমন হতে পারে না।

তাহলে এরা কারা ?

বিষয়টি কেন্দ্রে জানাতে হবে। এখান থেকে কীভাবে বের হব তা ভাবছি। ফায়ার এক্সিট দিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। তার আগে ওই দুই ব্যক্তির অবস্থান নিশ্চিত হতে হবে।

লরা সরাই খানার সিসিটিভি স্ক্রিনে চোখ রাখে। স্পষ্টই দেখা যায় দুই লোক দাঁড়িয়ে আছে দরজার অদূরে একটি টেলিফোন বুথের পাশে। পাশের যে রাস্তা সেটি ওইখান থেকে দেখা যাওয়ার কথা নয়। অতএব ফায়ার এক্সিট দিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারলে নিরাপদ। নিতাইকে আবারও টান মেরে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এদিক সেদিক তাকিয়ে পাশের রাস্তা ধরে বাটারসি পার্কের দিকে দ্রুত পা চালায়। পার্কের কাছাকাছি রেলওয়ে আর্চের একটি কক্ষে ঢুকে পড়ে। ভেতরে প্রচণ্ড হই হুল্লোড়। ঘরের পুরো দেয়ালে ব্যাঙ্কসির আর্ট। নিতাই দেখতে পেল বিমানে দেখা হওয়া সেই লোকটি যে কি না তাকে কভেন্ট গার্ডেনের ঠিকানাসহ একটি কার্ড দিয়েছিল সে লোকটি একপাশে একা বসে আছে। ঘাড় ফেরাতে দেখল সেই তরুণী, যে মেয়েটি নিতাইদের বাড়িতে থাকে বলে দাবি করে, সে দাঁড়িয়ে পাশে। লরাকে কোথাও দেখা গেল না। নতুন জায়গা, কারও সঙ্গে পরিচয় নেই। কি করবে বুঝতে পারে না নিতাই। মেয়েটি ওই লোকটির পাশে গিয়ে বসে। ঈশারায় নিতাইকে ডাকে। সেও গিয়ে বসে পড়ে তাদের সঙ্গে। লোকটি হর্স ক্যাপ খুলে টেবিলে রাখে। তামাটে চোখে তাকায়।

নিতাই আপনার কোর্স তো প্রায় শেষ। যে জন্য এসেছিলেন তাও প্রায় শেষ। যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিন। আগামী সপ্তাহে শেষ বৈঠকে সব জানানো হবে। বৈঠকে লরা আপনাকে নিয়ে যাবে। বৈঠকের ঠিক এক ঘণ্টা আগে জানানো হবে স্থান।

নিতাই, দেশে সাবধানে পা রাখতে হবে। পুলিশ প্রসাশন থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এবং রাজনৈতিক দলগুলো তোমার খোঁজখবর করছে।

মেয়েটি কথাগুলো বলে গম্ভীর হয়ে বসে থাকে। কথাগুলো শুনে নিতাই বুক টান টান করে বসে। যেন নিজের ভেতর নিজেকে নতুন করে প্রতিস্থাপন করে। সেই দীপ্তির রেখা ভেসে আছে তার চোখে মুখে। বহুদিন যে চিন্তা লালন করছিল তা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন রাজনীতি, নতুন দর্শন, যা হবে একটি মঙ্গল বিশ্বের রূপরেখা। এর সূচনা করতে পারবে শীঘ্রই তা ভেবে উচ্ছল হয়ে ওঠে নিতাই।

তোমার বাড়ি সম্মুখে পুলিশ পাহারা চলছে। মোগলটুলির বাসায় কড়া নিরাপত্তা। দেশে গেলে তুমি কোথায় থাকবে তাও ঠিক করা উচিত।

তাহলে তো আমাকে এয়ারপোর্ট থেকেই পুলিশ আটক করবে কিংবা পাহারা দিবে।

তা হতে পারে।

আমি এতে ভীত নই। আচ্ছা আপনাকে কভেন্ট গার্ডেনে পাওয়া গেল না কেন ?

লোকটিকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে নিতাই।

আমি সব সময় ওখানে যাই না।

তাহলে যে বলেছিলেন সেখানে আপনার সঙ্গে দেখা করতে ?

সেখানে যাওয়া মানেই তো আমাদের দেখা হওয়া। আপনি এটাকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ নেই। এই যে লরা তার সঙ্গে আপনি আছেন মানে সবার সঙ্গে আছেন।

নিতাই পাশ ফিরে দেখে লরা হাসছে। অথচ এখানেই একটু আগে বসা ছিল সেই তরুণী। এদিক সেদিক তাকিয়ে কোথাও তাকে দেখা গেল না।

কয়েকদিন পর লরা হোস্টেলে এসে দ্রুত তৈরি হওয়ার তাগিদ দিল নিতাইকে। এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছতে হবে ওয়ারটারলু। সেখানেই বৈঠক। কোন কথা না বলে দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল দু’জন। গুডস স্ট্রিট স্টেশন হয়ে ওয়াটারলু বেরিয়ে সাউথ ব্যাংকের কাছেই একটি সরাই খানায় ঢুকে পড়ে দু’জন। সোজা বেইসমেন্টে প্রবেশ করে একটা পর্দায় আড়াল করা কক্ষে ঢুকে পড়ে। আলো অন্ধকার। গোল টেবিলের চতুর্দিকে যে মানুষগুলো বসা তাদের কারও মুখ স্পষ্ট দেখা যায় না। অদূরে বসা কভেন্ট গার্ডেনের কক্ষে প্রথম দিন দেখা হওয়া সেই ব্যক্তি। বাকিদের চেহারা অস্পষ্ট। হঠাৎ তার কেন যেন মনে হয় অপর প্রান্তে ধবধবে সাদা থানকাপড় বসে বসে আছেন লালন! তার পাশে বসে আছে বান্দরবানের সেই হরিহর, তার পরে বসে বংশীবাদক ভাসানী, তারপর কৃষক আবুল। চোক কচলে ভালো করে বুঝার চেষ্টা করছে। এখানে ওরা কীভাবে আসবে তা ভেবে কিছুটা বিস্ময় জাগে তার মনে। তার বিস্ময় ছাপিয়ে অপর প্রান্ত থেকে কথা বলে ওঠেন ভারী কণ্ঠের কেউ।

আমরা আগামী এ সপ্তাহের মধ্যে ফিরে যাব নিজ নিজ দেশে। সময় হয়েছে কাজ শুরু করার। আপনি দেশে গিয়ে কাজ শুরু করবেন তৃণমূল থেকে। আমরা যে পরিবর্তনের কথা বলছি, তা খুব সহজ নয়। এর জন্য একেবারে তৃণমূল থেকে সংস্কার শুরু করতে হবে। মনে রাখবেন সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সচেতন করার মধ্য দিয়েই একটি দেশের আন্দোলন দাঁড় করাতে হয়। আমরা সেই পন্থাই অবলম্বন করব।

আমরা কি পরিবর্তন করতে চাই ?

অন্য একজনের প্রশ্ন।

আমরা প্রথমত পুঁজিপতি চাই না। পুঁজি থাকবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। সমাজে ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে এ কাজটি প্রথমেই করতে হবে। আবার রাষ্ট্র পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করলেও তা মানুষের মধ্যে সমবণ্টন হচ্ছে কি না সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ সূত্রেই আমরা গণতন্ত্রে পুরোপুরি বিশ্বাস রাখি না। গণতন্ত্র যে মানুষের মঙ্গলের জন্য নয় তা কিন্তু বলছি না। এটিকে এক এক দেশের সরকার নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছে। কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই গণতন্ত্রের প্রয়োগ নেই। এটিকে আমরা জনতন্ত্রে রূপ দিতে চাই। সরকার পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করবে ঠিকই কিন্তু এর বণ্টনে জনগণের মতামত প্রাধান্য পাবে। প্রতিনিয়ত জনগণের কাছে পুঁজি বণ্টনের হিসেব দিতে হবে। দেশের প্রতিটি মানুষ তার মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রর সহায়তা পেতে হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ‘জনতন্ত্র’। জনগণের মতামত ছাড়া সংবিধানসহ রাষ্ট্রের কোনও বিধিবিধান এমনকি আইনের কোনও সংশোধন করা যাবে না। জনপ্রতিনিধি সরকারের সঙ্গে জনগণের এ সম্পর্ক তৈরি করে দেবে। জনগণের হয়ে নিজের মতো জানানোর কোনও সুযোগ থাকবে না। জনগণ সে অনুমতি দিতে হবে একজন প্রতিনিধিকে। সহজ করে যদি বলা হয়, তাহলে বলতে হবে, একজন জনপ্রতিনিধি সরাসরি স্থানীয় জনগণের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করবে। সেই সূত্রে সরকারও জনগণের কথা আমলে নিয়ে কাজ করবে। সমাজতন্ত্র এসবের কিছুই করতে পারেনি। অতএব সমাজতন্ত্র বাতিল। আপনারা নিজ নিজ এলাকা থেকে ‘জনতন্ত্র’ বাস্তবায়নে কাজ শুরু করুন। যদিও এ কাজ খুব সহজ নয়। আমাদের অসৎ রাজনীতিকরা আমাদের নতুন দর্শন মেনে নেবে না। আপনাদের আন্দোলনের বেসিক বিষয় কি হবে তা কেবল জানালাম। পর্যায়ক্রমে সব জানতে পারবেন।

বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে পুঁজিপতিরা। তাদের আছে অস্ত্র ও পেশিশক্তি।

আমরা তাতে বিশ্বাস করি না। যুক্তি-বুদ্ধির কাছে এগুলো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। বিশ্ব রাজনীতিতে এর চর্চা নেই। আমাদের কাজ হচ্ছে এর সূচনা করা।

তাহলে তো হাজার বছর লেগে যাবে।

আপনি এত সহজে পরিবর্তন আশা করেন কীভাবে।

না তা করছি না। তবে জনতন্ত্র কবে নাগাদ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে তার একটি রোডম্যাপ থাকা উচিত।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা মারিও এ প্রশ্নগুলো করে।

আমরা মাত্র আন্দোলনের সূচনা করতে যাচ্ছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বলা যাবে আমরা কতদূর এগুচ্ছি। এখনি কোনও সময় বেঁধে দেওয়া যাবে না। কয়েক প্রজন্ম পরে বলা যাবে আমরা কোথায় দাঁড়াতে পেরেছি।

অস্ত্র আজকের বিশ্বকে অশান্ত করে রেখেছে।

তা ঠিক বলেছেন। অথচ এ অস্ত্র অবিষ্কার হয়েছিল শন্তির জন্য। তা না হয়ে এর ব্যবহার বিপরীতমুখি।  আমরা এই বার্তাটিই পৌঁছে দেব মানুষের কাছে। মনে রাখবেন প্রতিটি মানুষ কিন্তু শান্তি চায়, বাঁচতে চায়। যখন দেখে তার আর্থিক নিরাপত্তা নেই, নেই সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা, তখন সে হিংস্র হয়ে ওঠে। সেজন্য আমাদের রাজনীতিই হচ্ছে মানুষের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমরা এখন থেকে আর আড়ালে থাকব না। প্রতিটি এলাকায় সভা সেমিনার আয়োজন করুন। মানুষকে জনতন্ত্র বিষয়ে সচেতন করতে হবে। তাহলে এই জনগণই হবে আপনার অস্ত্র। একটি একটি মানুষ যখন যুক্তিবাদী হয়ে উঠবে দেখবেন আমাদের আন্দোলন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

একে একে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সকলেই নানা প্রশ্ন উত্থাপন করে। নিতাই নিজের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবহিত করে। প্রতিটি দেশের চলমান সংকটের বিষয়ে আলোকপাত করে আন্দোলনের সূচনার কর্মপন্থা নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। টানা প্রায় চার ঘণ্টার বৈঠক শেষে অন্যদের মতো নিতাইকেও দেশে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেয়া হয়। বৈঠকে দেখা  গেল নিতাইর অতীতের সব ঘটনাই তাদের জানা। সেসব বিষয় টেনেও তাকে নানাবিধ কৌশল অবলম্বনের পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এখন দেশে ফিরে যাওয়ার পালা। নিতাই বৈঠকে বসেই ঠিক করে দেশে গিয়ে সরাসরি গ্রামে ফিরে যাবে। সেখান থেকেই সূচনা করবে নতুন দিগন্তের।

চৌদ্দ.

ছয় মাসের ডিপ্লোমা শেষ। যদিও লন্ডনে এক বছর থাকার অনুমতি আছে নিতাইর। বাকি ছয় মাস থাকা হবে না। বড়জোর আর এক সপ্তাহ থাকা সম্ভব। লন্ডনের আবহাওয়া বহুরূপী। এখন বৃষ্টি আবার কিছুক্ষণ পর খটখটে রোদ। এখন তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস আবার মিনিট কয় পর অনুভূত তাপমাত্রা উঠে দাঁড়ায় ছয় এ। তবে আজকের দিনটি মনে হয় ব্যতিক্রম হবে। সকাল থেকেই টানা রোদ। এখন বেলা দশটা। আকাশ একেবারে ধোয়ামোছা। কোথাও মেঘের অস্তিত্ব নেই। তাপমাত্রাও সাত। লন্ডন এসেছে পর্যন্ত এমন আবহাওয়া খুব কমই পেয়েছে নিতাই। ছয় মাস সময় বাতাসের মতো উড়ে গেল। লরার সঙ্গে এই কম সময়ে যে সম্পর্ক হয়েছে তার পরিমাপ করা কি করে সম্ভব। নিতাইর দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ জারি হওয়ার পর থেকে লরা কি যেন বলতে চাইছে। কি বলতে চায় ? সে কি সঙ্গে যেতে চায়। না তা মনে হয় না। যাওয়ার তো সুযোগ নেই। স্টেশন ছেড়ে কারও কোথাও যাওয়ার আপাতত নিয়ম নেই। এমন সময় হোস্টেলের গেট থেকে লরার কণ্ঠ শোনা যায়। নেমে আসে নিতাই। আজ অন্যরকম সেজেছে লরা। পরেছে সালোয়ার কামিজ। বেণী করা চুল। ঠোঁটে ম্যাজেন্টা রঙের লিপস্টিক, কপালে ডাউস টিপ। নিতাই কিছুক্ষণ বিস্ময়ে নির্বাক থাকে। বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি, পোশাক-খাবার নিয়ে বহুবার কথা হয়েছে তাদের। তাতে করে লরা বুঝতে পেরেছে দেশের মেয়েদের পোশাকের প্রতি তার দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু লরা কোথা থেকে এ পোশাক সংগ্রহ করেছে।

বাহ, তোমাকে আমাদের দেশি পোশাক ঠিক মানিয়ে গেছে। জানো তোমার দিকে কেবল চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। তোমার মধ্যে আজ যে সৌন্দর্য দেখছি তা অন্য কোনও সময় দেখিনি। তুমি এত সুন্দরী কেন লরা ?

কথাগুলো একটানা বলে নিজেকে সামলে নিতে চায় নিতাই। ভাবে কথাগুলো কি অপ্রাসঙ্গিক হলো ? লরা তার দিকে তাকিয়ে ভীষণ হাসছে। পোশাকের সঙ্গে মানুষের হাসিরও যে বদল হয় তা জানা ছিল না নিতাইর। আজ লরাকে দেখে তাই মনে হলো।

তোমার জন্যই পরেছি। তোমার যাওয়ার সময় হয়ে আসছে। আর যে ক’দিন আছো ততদিন আমার সব আয়োজন হবে তোমায় ঘিরে। চলো আজ এমন রোদেলা দিনে কোথাও থেকে ঘুরে আসা যাক।

কোথায় নেবে ?

হুম … চলো কাছাকাছি কোনও সমুদ্রে যাই। আমরা সাউদএন্ডে যেতে পারি।

তুমি যেখানে নেবে সেখানেই যাব আমি।

দু’জনেই বেরিয়ে পড়ল। খটখটে রোদ হলেও তাপমাত্রা হিমাঙ্কে। লরা এমন তাপমাত্রায় অভ্যস্ত। নিতাই এই ছয় মাসেও কনকনে ঠাণ্ডার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে পারেনি। আজ রোদের মধ্যেও বাতাসের ঝাপটায় দাঁতের কপাটি লেগে যাচ্ছে। লরা কামিজের ওপর পাতলা একটা কার্ডিগান চাপিয়ে দিব্যি হেঁটে চলেছে। নিতাই ঘেঁষাঘেঁষি করে হেঁটে কিছুটা তাপ পেতে চায় লরার কাছ থেকে। বুঝতে পেরে লরা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে চায় না তাকে। এমন সুভাসিত পারফিউমের ঘ্রাণ আগে কখনও পায়নি নিতাই। সব মিলিয়ে নিতাই আজ একটু বেশি ঝুঁকে পড়েছে। দেশে ফিরে যাবে এমন মনে হতেই তার বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। ভাবে কীভাবে লরাকে ছেড়ে যাবে। লন্ডনে এসে এমন মায়ায় জড়িয়ে যাওয়া কি ঠিক হলো!

নিতাই, আমরা গুডস স্ট্রিট থেকে যাব ব্যাংক স্টেশনে, সেখান থেকে একটু হেঁটে ফ্রেন্সাইস স্ট্রিট থেকে সিটুসি ট্রেনে সাউদএন্ড।

আমি তোমাকে অনুসরণ করছি। কোনও সমস্যা নেই। যেভাবে নাও, যেখানে নাও আমি আছি।

লরা খেয়াল করে, নিতাই আগের চেয়ে নিজেকে ছাড়ছে একটু একটু করে। দেশে ফিরে যাওয়ার হুমুক জারি হওয়ার পর থেকে তাকে একটু ভিন্ন মানুষ মনে হচ্ছে। কথা আগের চেয়ে বেশি বলছে। প্রায়ই আবেগ তাড়িত থাকছে। আন্দোলনের চেয়ে নিজের মনোভাবের প্রাধান্য দিচ্ছে। লরা এসব উপভোগ করছে। সম্পর্ক ছিল আন্দোলনের সূত্র পর্যন্তই। কীভাবে সে সম্পর্ক ব্যক্তিগত হয়ে উঠল তা অজান্তেই তৈরি হয়ে গেল। নিতাইকে খুব কাছে থেকে দেখেছে লরা। অসম্ভব দৃঢ়চেতা এবং সৎ মানসিকতার মানুষ সে। রয়েছে পৌরুষদীপ্ত ব্যক্তিত্ব। এসব লরাকে খুব টেনেছে। সবচেয়ে যে বিষয়টি টেনেছে তা হলো নিতাইর শিশুসুলভ সারল্য। তার চরিত্রে কোনও বাহুল্য পরিলক্ষিত নয়। সরল পথের অসামান্য যাত্রী নিতাই। এমনই মনে হয়েছে লরার।  

পাতাল রেলে করে দু’জনে বের হলো ব্যাংক স্টেশনে। সেখান থেকে হেঁটে ফ্রেন্সাইস স্টেশন থেকে সিটুসি চেপে আদা ঘণ্টায় পৌঁছে গেল সাউথএন্ড। এ সমুদ্র তীরের গল্প নিতাইকে আগে বলেছিল লরা। ইংলিশ চ্যানেলের উপকূল সাউথএন্ড। হাজার হাজার পর্যটক এই কনকনে শীতের মধ্যেও ভিড় করেছে। শোনা গল্পের চেয়েও বেশি সুন্দর লাগেছে। লরা যেদিক দিয়ে যায় সেদিক যেন রঙিন হয়ে উঠছে। যে বেঞ্চিতে বসছে সেটিও যেন হেসে উঠছে। সমুদ্রের জোয়ারের সাঁই সাঁই শব্দ ছাপিয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে লরার প্রতিটি কথা। এই যে এক একটি মিনিট করে সময় চলে যাচ্ছে, তাতে করে বিয়োগের সময় দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে। একথা মনে হলেই নিতাই নিজের ভেতর নিজে সেঁধিয়ে যায়। কুঁকড়ে ওঠে। ভাবে মানুষের মাঝে এত মায়া কেন! কি করে সে লরাকে রেখে চলে যাবে বাংলাদেশে!

লরা কিছুদূর হেঁটে এসে নিতাইর পাশে বেঞ্চিতে বসে। টের পায় তার মানসিক অবস্থা। কনকনে ঠাণ্ডায় লরার উষ্ণ শরীরে ওম নিয়ে আরামবোধ করে নিতাই।

নিতাই তুমি দেশে যাবে একেবারে নতুন একজন মানুষ হয়ে। তুমি এখন আর তোমার নেই। আমিও আমার নেই। তোমার আমার মিশে যাওয়ার বাইরেও আমাদের আরেকটি সত্তা হলো ‘নব জাগরণ’। এটাই এখন আমাদের প্রধান কাজ। আমরা এখন থেকে অনিরাপদ পথের যাত্রী। যদি বেঁচে যাই আবার কোনও একদিন দেখা হবে। আর যদি বেঁচে না থাকি তারপরও পাশাপাশি থাকব।

লরার কথা শুনে চোখ তপ্ত হয়ে ওঠে নিতাইর। জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে ভাবেনি। এমন জীবন কি সে চেয়েছিল ? চেয়েছিলই তো। তা যদি না হবে আজ এখানে কেন ?  অন্য দশজনের মতো ভালো ডিগ্রি, ভালো চাকরি, প্রেম থেকে বিয়ে ও সন্তান উৎপাদন আর গৎ বাঁধা সংসার জীবন তো সে চায়নি। তবে ‘প্রেম’ সব সময় চেয়েছিল। নারীকে যেভাবে ভালোবাসা যায় সেভাবেই ভালোবেসেছে পরিবর্তনের মানসিকতা। লাইজু, কলি তারাও এ জীবন ভালোবাসে। তাদের সঙ্গে খুব যে কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে তেমন নয়। তারপরও কতটুকু তারা এ জীবনে থেকে গেছে তার টের পায় নিতাই। শেষে এসে লরা একেবারে লেপ্টে গেল তার জীবনে। একে অপরের প্রতি যে ঝুঁকে পড়া, তা থেকে আরও প্রবল হয়ে উঠছে বাঁক বদলের তৃষ্ণা। এমন প্রেমও কি হয়! না পাওয়ার মধ্যেই সকল প্রাপ্তির আত্মসমর্পণ! হে প্রেম, হে দ্রোহের মনোলোভা কাল, তোমার মাঝেই বুঝি জেগে আছে সকল সম্ভাবনা। আমরা আলোর সন্ধানে একটি গুহায় জেগে আছি, আমরা যে মানুষের অপেক্ষায় অমনুষ্য ভাগাড়ে টিকে আছি, তার সন্ধান একদিন পাব। আমরা সব সময় বিরাজমান। যুগান্তরেও যদি তার দেখা মেলে তার, তাতে আমরা জেগে থাকব। আমাদের ঠিকই দেখতে পাবে কালের সারথী। সেইদিন তাদের বাড়ির সেই তরুণী এসে বলবে, ‘দেখো আমি এখনও সেই একই বয়সে দাঁড়িয়ে’! ওর কখনও বয়স বাড়ে না। প্রতিটি সময় তার প্রেমে পড়ে। সে নিশ্চয় আমাকে মনে রাখবে।

নিতাই, কাল তোমার টিকেট কনফার্ম করা হবে। কবে যেতে চাও ?

যেতে যেহেতু হবেই, যত দ্রুত যেতে পারি মঙ্গল।

এভাবে বলছ কেন! তোমাকে কি আমি অমঙ্গলে রেখেছি ?

না তা বলছি না। মায়া বড় কঠিন। ও বলে মায়া, কিন্তু ভেতরে এত রক্ত খরন করে, তার নাম মায়া হয় কি করে! আমি এই কঠিন থেকে মুক্তি চাই।

সমুদ্র হঠাৎ যেন গর্জে উঠেছে। প্রচণ্ড ধমকা হাওয়া এসে আঁচড়ে পড়ে লরার চোয়ালে। চোখে চিকচিক করে ওঠা জল সে বাতাসের তোড়ে নামল না অন্য কোন কারণে বোঝা গেল না। তাকে বেশ দৃঢ়ই মনে হলো।

তুমি বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখতে পার।

কীভাবে ?

এই যে তুমি ফিরে যাচ্ছ দেশে, কেন ? একটা এজেন্ডা নিয়ে ফিরে যাচ্ছ। আমরা এখন আমাদের নিয়ে ভাবছি না। কেবল দেশও নয়, ভাবছি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বের কথা। এর চেয়ে বড় মায়া কি হতে পারে ?

আমি তো তাই বলতে চেয়েছি। তুমি আমি থেকে আমরা অনেক হয়ে যাচ্ছি। আমরা জেগে উঠব অনেকের ভেতর। আমাদের কোনও নিজস্বতা নেই। এটাই হচ্ছে মায়া। এটাই হচ্ছে নিজেকে মায়া না করা!

লরা বুঝতে পারে তাকে ছেড়ে যাওয়ার ভাঙচুর অস্থির করে তুলেছে নিতাইকে। সে নিজেও কি খুব স্থির আছে! ‘বিপ্লব’ বড় মায়াময়! এমন মনে হতেই পিক করে হেসে, নিজেকে সামলে নেয়। বিপ্লব যদি মায়াই না হবে তাহলে সব ছেড়ে তার দিকে কেন যাত্রা! এর মূলেই কি নিহিত সব প্রেম, সব সফলতা!  নিশ্চয় তাই। আগে তো একটি নিশ্চিত নিষ্কলুষ ভূমি চাই। তা না হলে কোনও কিছুই নিরাপদ নয়। তাই বিপ্লব আগে।

লরা, তোমাকে প্রতিদিন দেখতে ইচ্ছে করবে। অথচ দেখো তার কোনও উপায় নেই। আমি চলে যাব অজপাড়াগাঁয়ে। তুমি এই ব্যস্ত শহরে। হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব।

দূরত্ব আপাত দৃষ্টিতেই ঠাঁই পাক। তোমার আমার কোন দূরত্ব নেই। আর আন্দোলনের জন্য স্থান গুরুত্বপূর্ণ। তুমি যেভাবে তোমার জায়গা থেকে আন্দোলনের সূচনা করবে, আমিও আমার জায়গা থেকে। মনে রাখবে আমাদের প্রতিপক্ষ কিন্তু সবখানে। তারা আমাকে যেভাবে নজরে রাখবে, ঠিক তুমিও এর বাইরে নয়।

লরার কণ্ঠ কিছুটা কেঁপে ওঠে। দু’জনেই টানা কথা বলছে না। কিছুক্ষণ পর থেমে যাচ্ছে। চোখাচোখিও হচ্ছে না। পাশাপাশি বসে কিছুটা আড়াল রেখে কথা বলছে। তবে  এ কেবল চোখের আড়াল। মনের আগল ভেঙে দু’জন সেই কবেই সেঁধিয়ে গেছে একে অন্যের ভেতর। এ সম্পর্ক অনুভবের, দেখার নয়। যোজন যোজন দূরত্বে থেকেও তারা কাছাকাছি থাকবে। চোখের দেখায় তা সম্ভব নয়। মনের দেখায় তারা কাছাকাছি রইবে। শ্বেত শুভ্র এক তরুণী এভাবে ভালোবাসতে পারে, এমন ভাবনা কখনও নিতাইর মনে আসেনি। প্রথম দিন থেকেই লরার ঝুঁকে যাওয়ার প্রবণতায় বিস্ময় লেগেছিল তার। তাও না হয় গেল। কিন্তু এভাবে নিজেকে একজন অর্বাচীন যুবকের হাতে সমর্পণ করবে সে ভাবনা কখনও ভুল করেও জাগেনি তার।

জানো নিতাই, এ মুহূর্তে আমার দাদির মুখে শোনা একটি লোকগল্প খুব মনে পড়ছে।

কি গল্প বলো শুনি।

গল্পটি আঠারো শতকের। ইংল্যান্ডের অর্কনি এলাকার। শোনো তাহলে বলছি।

‘বনে বাস করত একটি মেয়ে, খুব সাহসী। নাম তার আরসিলা। সে নিজ এলাকার কোনও ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি ছিল না। তারপরও এক সময় উত্তরাধিকার সূত্রে যখন বাবার সম্পত্তির অধিকারী হয় তখন, এক তরুণকে বিয়ে করে। এমন সঙ্গীরই অনুরাগী ছিল সে। যদিও তরুণ ছিল নিম্ন বর্ণের কৃষক। তবে কিছুদিনের মধ্যেই স্বামীকে নিয়ে আরসিলার মধ্যে দেখা দিল অসন্তোষ। কারণ তাদের কোনও সন্তান হলো না।

একদিন মনের দুঃখে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্র পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায় আরসিলা। সাতটি অশ্রুবিন্দু বিসর্জন দেয় জোয়ারের জলে। অমনি দেখতে পেল একটি সিল মাছ বিশাল পুরুষ দেহে এসে তার সম্মুখে দাঁড়ায়, আর তাকে নিবেদন করে ভালোবাসা। এরপর বসন্তে সে পূর্ণাঙ্গ মানুষে রূপ নেয়। তারা বিয়ে করে। তারপর আরসিলার সংসার ভরে ওঠে সন্তান-সন্ততিতে। প্রত্যেকটি সন্তানের হাতে-পায়ে শক্ত মোজার মতো কি যেন জন্মসূত্রেই গজিয়ে ওঠে। তবে ধাত্রী সেগুলো কেটে দেয় যাতে আরসিলার গোপনীয়তা সম্পর্কে কেউ জানতে না পারে।’

আবার যাবার বেলায় তুমি এ গল্প কেন বললে! তুমি ঠিক কি বলতে চাইছ বলো তো ?

নিতাই হয়তো তোমার আমার দেখা হবে না আর। ঠিকই অসংখ্য অনুসারী আমাদের স্বপ্নে জেগে উঠবে। চাইবে নতুন পৃথিবী। ওরাই আমাদের সন্তান। ওদের ভিন্ন ভিন্ন কোনও পরিচয় থাকবে না। পরিচয় একটাই ওরা ‘বিপ্লবী’। ওরা এই পৃথিবীর সন্তান।

লরার কথায় কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে নিতাই। ভাবে সব সম্পর্কই যে একই পরিণতির মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেতে হবে তা নয়। সম্পর্ক আরও বেশি পূর্ণতা পায়, না পাওয়ার মধ্য দিয়ে। লরাকে এ মুহূর্তে পৃথিবীর সেরা প্রেমিকা মনে হয় তার। একটু পাশ ঘেষে লরাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে নিতাই। প্রচণ্ড চিৎকার বুকে আটকে গিয়ে কান্না হয়ে বেরিয়ে গড়িয়ে পড়ে চোয়ালে।

তুমি কেবল আমার বন্ধু নও লরা, তুমি আমার নেতা। তুমি আমার গুরু। আমি তোমাতেই নিজেকে সমর্পণ করেছি। তোমাতেই আমি জেগে রইব অনন্ত সময়।

লরা ঠোঁটের কোনায় হাসি টেনে চোখে জমা জল লুকানোর চেষ্টা করে। কোথায় যেন শূন্যতার মাঝে পূর্ণতায় ভরে উঠছে মন। কেবলই মনে হয় কে যেন বলছে, অসম্পূর্ণতার মাঝেই পূর্ণতা। অপ্রাপ্তিতে আক্ষেপ কেন ? তুমি তখনই নিজেকে পূর্ণ মনে করবে যখন কিছু না চেয়ে নিজেকে দিয়েছ বিসর্জন।

সূর্য হেলে পড়েছে সমুদ্র জলে। কমে এসেছে কোলাহল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় এত সময় বসে থাকতে এতকুটু বিরক্ত হয় নি দু’জন। বরং গত ছয়মাসে এই সময়টুকু তাদের জন্য একটি পথ তৈরি করেছে। যে পথ কখনও ভিন্ন পথে বাঁক নেবে না। যে পথ অনুভবের, তার শক্তি দৃশ্যমান যে কোনও পথের চেয়ে বেশি।

বাড়ি ফেরার জন্য উঠে পড়ে দু’জন। কারও মুখে কোন কথা না থাকলেও যেন একে অপরের সঙ্গে কত কথা বলছে। মনে মনেও যে কথা হয় তারই অনুরণন দু’জনের দেহ-মনে।

পনের.

আজ নিতাই দেশে ফিরছে। ক্যাম্পাসে এসেছে বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিতে। কোথাও লরাকে দেখা গেল না। দেখা গেল মাঠের উত্তর দিক থেকে উঁচু পাহাড়ের মতো একটা মানুষ হেঁটে আসছে। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারল মার্টিন আসছে! এই ছয়মাসে প্রথম তার সঙ্গে দেখা হলো নিতাইর। তাও যাওয়ার আগে। মার্টিনকে দেখে নিতাই কিছুটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও মার্টিন একেবারে স্বাভাবিক।

নিতাই তুমি আজ দেশে ফিরে যাচ্ছ শুনে আসলাম। আমি কাল রাতে ফিরেছি।

হ্যাঁ, কি আশ্চর্য আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন, অথচ ছয় মাসে দেখাই হলো না!

নিতাই, দেখা হওয়াটা জরুরি নয়। কাজ হলো কি না তা জরুরি। তোমাকে যে জন্য আনা হয়েছে, তা অনেকটাই কার্যকর হয়েছে। শোন মানুষের মধ্যে তথ্য যদি দিতে চাও তাহলে চলচ্চিত্রই হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকরী। আশা করি বুঝতে পারছ আমি কি বলছি।

আপনি আমার অনেক উপকার করেছেন। কৃতজ্ঞতা জানাই।

তুমি এভাবে বলার কোনও দরকার নেই। আমরা নতুন কিছুই তো চাই। নিজেদের চাওয়া এক থাকলে তা পাওয়া হবেই। তবে সব সময় চোখ-কান খোলা রাখবে। কারা তোমার আশেপাশে খেয়াল রাখা জরুরি। তুমি নিজের দেশে গুরুত্বপূর্ণ একটা দায়িত্ব নিয়ে যাচ্ছ। যাদের তুমি আগে দেখেছ তারাও থাকবে তোমার সঙ্গে। তবে আন্দোলনকে একটি পোক্ত অবস্থানে না নেওয়া পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতা থাকবে। যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।

মার্টিন দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করে। কাছে এসে দাঁড়ায় ক্লাসের কয়েক বন্ধু। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লরার হোস্টেলের দিকে হাঁটতে থাকে নিতাই। গেইটে গিয়ে কলিংবেল টিপে কোন সাড়া পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিতাই নিজের হোস্টেলে দিকে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতি ঘেরা কলেজ ক্যাম্পসের চতুর্দিকে তাকায়। যেনো প্রতিটি বৃক্ষ, দেয়াল আর মাঠের ঘাসে নিজেরে গায়ের ঘ্রাণ লেগে আছে। সবকিছু এত আপন হয়ে উঠেছে যে, থেকে থেকে মনে হয় কে যেন ডাকে! থমকে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে গাছের পাতাদের সর সর শব্দ মানুষের কথার মতো শোনা যায়। হোস্টেলে ফিরে গোছানো লাগেজ আরও একবার দেখে নেয়। সব ঠিক আছে। পাসপোর্ট, টিকিট সকালেই দিয়ে গিয়েছিল এজেন্সি থেকে। হঠাৎ নিতাই বিষণ্ন হয়ে ওঠে। যাওয়ার সময় প্রায় আসন্ন, অথচ লরা নেই কোথাও! শেষ দেখা কি হবে না! টেক্সি এসে গেছে। লাগেজ উঠিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক দেখে। কোথাও লরার দেখা নেই। নিতাই বুঝতে পারে না এর মানে কি ? গাড়ি টান দিয়ে আবার হোস্টেলের কলিংবেল টিপে দেখে নেয় সে আছে কি না। না কোনও উত্তর আসে না। গাড়ি দ্রুত চলতে থাকে হিথরো এয়ারপোর্টের দিকে। সবকিছু শূন্য মনে হয়। লরার এভাবে অদৃশ্য হওয়ার কোনও মাজেজা খুঁজে পায় না। হ্যাঙ্গার লেন পার হওয়ার পর দু’জন সাদা পোশাকধারী নিতাই’র  ট্রেক্সি থামায়। নিজেদের আইডি কার্ড দেখায়। পুলিশ অফিসার। নামতে বলে গাড়ি থেকে। কতদিন লন্ডনে ছিলো। কোথায় ছিল। কি পড়াশোনা করেছে। কাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ। ইত্যাকার প্রশ্নে জর্জরিত নিতাই। তার ফ্লাইটের বেশি সময় নেই, বলাতে ছেড়ে দিল। তবে বলে দিল, যেখানেই থাকুক তার সঙ্গে এমআইসিক্স যোগাযোগ করবে। নিতাই তাদের কথা তেমন আমলে না নিয়ে ড্রাইভারকে বলে দ্রুত এয়ারপোর্টের দিকে যেতে। এবার লরার প্রতি ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। যাওয়ার আগে এভাবে দেখা না করার কোনও মানে বুঝতে পারে না। হিথরো এয়ারপোর্টের তিন নাম্বার টার্মিনালে ট্রলি ঠেলে প্রবেশ করতেই দেখে লরা দাঁড়িয়ে আছে একপাশে! লরা স্বাভাবিক, কিন্তু নিতাই তার বিস্ময় প্রকাশের ধরন কেমন হবে তা বুঝে ওঠার আগেই ঈশারায় স্বভাবিক থাকার ইঙ্গিত করে। পাশে কোস্টা থেকে দু’কাপ কফি নিয়ে একটু আড়ালের সোফায় গিয়ে বসে দু’জন।

তোমাকে পথে কি কেউ আটকে ছিল ?

হুম পুলিশের দুই লোক।

কি বলেছ ?

বলেছি পড়া শেষ, চলে যাচ্ছি।

তারা আমাকে সন্দেহ করে। আবার যোগাযোগ করবে বলেও জানিয়েছে।

আমার সঙ্গে তোমার যোগাযোগ আছে কি না জানতে চেয়েছে ?

হ্যাঁ চেয়েছে। বলেছি তুমি আমার ভালো বন্ধু। তুমি কি এজন্যেই সকাল থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করোনি ?

বলতে পার তাই। তবে অন্য কারণও আছে। আমার বাবা-মা’র বাসায় গিয়েছিলাম। আমার দাদা’র একটা হাতঘড়ি আনতে।

একটা পুরোনো প্যাকেট থেকে ঘড়িটি বের করে নিতাইর হাতে দেয়। গোল সোনালি ফ্রেমের মধ্যখানে স্বর্ণের দু’টি কাঁটা বসানো। ঘণ্টার ঘরগুলোও স্বর্ণের মনে হলো। একপাশে দিক নির্দেশের ছোট্ট একটি কাঁটা। বুঝাই যায় অনেক পুরোনো ঘড়ি। ব্র্যান্ডের নামটিও প্রথম দেখল নিতাই ‘ভেনডম’।  

বাবা বলেছেন, আমার দাদা বলে গেছেন এই ঘড়িটি যেন আমার হাজব্যান্ডকে দেওয়া হয়। এটি রাখো তোমার জন্য নিয়ে এসেছি।

আমাকে কেন তুমি নিশ্চয় বিয়ে করবে, তখন তোমার হাজবেন্ডকে দিও।

এ জীবনে তার আর দরকার হবে না।  তুমিই এই ঘড়ির দাবিদার এখন।

নিতাই কিছুই বুঝতে পারে না। তাকে কেন এই ঘড়িটি দিতে চায় লরা। তাছাড়া এই ঘড়িটির জন্যই কি সে সারাদিন তার সঙ্গে দেখা করেনি।

আমার দাদা জাহাজের নাবিক ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়া থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আসছিলেন লিভারপুল পোর্টে। কিন্তু পথেই বোমার আঘাতে নষ্ট হয়ে যায় তাদের দিক নির্দেশক কম্পাস। দাদার এই ঘড়ি সেদিন তাদের নিক নির্দেশ করে নিয়ে এসেছিল। দেখো ঘড়িটি পুরোপুরি সচল। দাদা নাকি বলেছিলেন, ঘড়িটিতে কেবল চাবি ঘুরিয়ে একটু দম দিতে হবে। আরও একশ বছরেও ঘড়িটি নষ্ট হবে না। তোমার জন্য এই ঘড়িটি অনেক কাজে দিবে। যেখানেই যাও সঙ্গে রাখবে। পথ হারাবে না!

নিতাই, লরার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ভাবে মানুষ এত ভালোবাসতে পারে কি করে! দু’জনের চোখে গড়িয়ে পড়ে জল। কেউ আর জল লুকানোর অভিনয় করে না। কফি দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেয় লরা। চুমুক দিয়ে উঠে পড়ে নিতাই। সিকিউরিটি গেটের কাছে গিয়ে নিতাইকে জড়িয়ে ধরে লরা অস্ফুট স্বরে বলে ‘বিদায়’। নিতাই পাঁজর ভেঙে কি যেনো যেন বলতে চায়। কিছুই বলতে পারে না। লরার হাত ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ে ভিতরে। পেছন ফিরে আর তাকাতে চায়নি নিতাই। লরা দৌড়ে বেরিয়ে যায় টার্মিনাল থেকে। এদিক সেদিক তাকিয়ে কারও অবস্থান বুঝার চেষ্টা করে। ঝাপসা চোখে একা একা হাঁটতে থাকে।

ষোল.

নিতাই আকাশে বসে ভেবেছিল ঢাকা এয়ারপোর্টেও হয়তো ঝামেলা হতে পারে। না, তেমন কিছু হয়নি। বরং একজন ইমিগ্রেশন অফিসার স্বাগতই জানালেন। ‘ও! ফিরে এসেছেন’―বলে সিল দিয়ে দিলেন পাসপোর্টে। তবে এতে একটু খটকা লেগেছে তার। ইমিগ্রেশন অফিসারের বলার ভঙি এমন ছিল যে তিনি জানতেন নিতাই ফেরত আসবে। ইমিগ্রেশনের ডেস্ক পেরিয়ে, বেল্ট থেকে লাগেজ নিয়ে বাইরে এসে সরাসরি বেরিয়ে গেল না নিতাই। এক কোণে যাত্রী চেয়ারে বসে থাকে। প্রায় আধ ঘণ্টা পর বেরিয়ে একটি কালো টেক্সিতে উঠে পড়ে। গাড়ি দ্রুত চলতে থাকে রাজারবাগের দিকে। পথে রামপুরা এলাকায় কিছুটা জ্যাম থাকলেও বাকি রাস্তা জটহীন ছিল। অল্প সময়েই এসে নামে রাজারবাগ গ্রিন লাইন বাস স্টপে। বাস থেকে নামা মাত্রই দেখা মেলে পল্টনের সেই লোকটির। যার নাম এখনও জানে না নিতাই। লাগেজগুলো বাসের হেল্পার ভিতরে নিয়ে গেল। লোকটি নিতাইকে ঈশারায় এক পাশে নিয়ে যায়।

ফিরে এসেছেন ভালো কথা, কিন্তু সাবধানে থাকবেন। আপনি আমি এখানে যে আছি তা কিন্তু তাদের নজর এড়ায় নি। দেখুন দূরে দু’টো লোক দাঁড়িয়ে আছে। ওরা আমাদের গতি বিধি লক্ষ্য করছে।

হুম দেখছি। কোন চিন্তা করবেন না। আমি ঠিকই বাড়ি পৌঁছে যাব। মাকে দেখতে মন চাইছে খুব। আচ্ছা আমার আরেকটি কথার জবাব দিতে পারবেন ? আমাকে কেন সেই গ্রাম থেকে কাজ শুরু করতে হবে ?

শুনুুন, তৃণমূলের মানুষের মনে যদি আমাদের চিন্তা-দর্শন পৌঁছে দিতে পারি তাহলে সেখান থেকে জনমত প্রতিষ্ঠা পাবে। সব সময় মনে রাখবেন আম জনতা যদি পক্ষে থাকে তাহলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমরা কেউ আপাতত শহরে থাকব না। আমিও আজ যশোরে ফিরে যাব। এভাবে সবাই নিজ নিজ এলাকায় ফেরত যাবে।

গোয়েন্দা এত তাড়াতাড়ি আমাদের পিছু নিল কেন বুঝতে পারলাম না।

আমাদের বিষয়ে অনেক বেশি অপপ্রচার হয়েছে প্রসাশনে। বলা হচ্ছে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী। এটা আমাদের আক্রমণের অপকৌশল। আমরা যে বিচ্ছিন্নতাবাদী নই তা প্রমাণ করতে হবে জনগণের সাথে থেকে।

বাস হেল্পারের ডাকে তাদের কথায় ছেদ পড়ে। লোকটি জানিয়ে দেয় এই হেল্পার তাদের মানুষ। নিতাই কিছুটা ভরসা পায়। উঠে পড়ে বাসে। বাস চলতে শুরু করে সীতাকুণ্ডমুখী। মাঝে চৌদ্দগ্রামে বিরতিকালে হেল্পার চায় নি, নিতাই নামুক। প্রচণ্ড খিদা পাওয়ায় নিতাই তার কথা শোনেনি। হোটেল গেটওয়ে ইন এ একটি টেবিলে বসে খাবার আর্ডার করে। খেতে খেতে বুঝতে পারে তার পাশে যে লোকটি বসে আছে সে অন্যভাবে তাকে ফলো করছে। মাঝে মাঝে কিছু একটা নোট করছে। সে আর দেরি না করে খাবার অর্ধেক শেষ করেই উঠে পড়ে গাড়িতে। 

বেলাবেলি এসে নামে সীতাকুণ্ড বাজারে। তাকে দেখে পরিচিতজন আন্তরিক স্বাগত জানাল। সবাই তার বিদেশে পড়তে যাওয়ার খবরে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করল। নিতাই বাড়ি পৌঁছে দেখে মা-বাবা খুব গম্ভীর হয়ে বসে আছে। তার ফিরে আসায় তারা আনন্দিত নন।

মা আমি ফিরে এসেছি খুশি হওনি ?

অফুত তুই আঁর কাছে ফেরত আইসসছ এয়ারতুন খুশির কি আছে আর।

তাহলে তোমাদের মন খারাপ কেন ?

আঁরার ঘুম হারাম গরি দিয়ে পুলিশ। হইত্তদিন এক দুইবার গরি আইবো আর তোর খবর লইবো। পুলিশ হেইল্লে গরের কিল্লাইরে অফুত!

মা আমি তো বলতে পারছি না। তবে চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে।

এবার বাবা মুখ খোলেন।

তুই লন্ডন গেইয়স হড়ালেখা করতি। আর পুলিশ কর তুই বলে জঙ্গি ট্রেনিং লইতি গেইয়স।

এসব বাজে কথা বাবা। আমি কেনো জঙ্গি ট্রেনিং নেব। তোমরা একদম চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে।

বাবা-মা’র সঙ্গে কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা নেমে আসে। খাওয়া দাওয়া সেরে নিজের ঘরে একা হলেই পাঁজরে একটা মোচড় অনুভব করে। উপস্থিত হয় লরা। দীর্ঘ পথে নিতাই এই চিন্তায় থিতু হয়নি। কিন্তু ভর রাতে একা নিতাই আর তাকে এড়িয়ে চলতে পারে না। লরার দেয়া ঘড়িটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে। লরার সঙ্গে তোলা কিছু ছবি সম্মুখে রাখে। কিন্তু দীর্ঘ পথের যাত্রার ধকল আর সামলানো সম্ভব হলো না। ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালে ঘুম থেকে জেগেই শুনতে পায় বাবা’র চিৎকার। হুড়মুড় করে উঠে বসে। বাইরের ঘরে গিয়ে দেখে বাবা একটি পত্রিকা হাতে মাকে কি যেনো দেখাচ্ছে।

কি হয়েছে বাবা ?

কি অ-ন। তুই গেলি লন্ডন হড়ালেখা করতি। আর পত্রিকা কি কর চা।

নিতাই পত্রিকাটি হাতে নিয়ে দেখে ডাউশ শিরোনাম, ‘দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উত্থানে শঙ্কিত সরকার’। পুরো নিউজের সারমর্ম হলো এই, দেশে নাশকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের পিছনে রয়েছে বিদেশি মদদ। গতকাল নিতাই নামের এ দলের এক সদস্য লন্ডন থেকে  দেশে ফিরেছে। ফলে সতর্ক অবস্থানে প্রশাসন। তার গতিবিধি লক্ষ্য করা হচ্ছে’। সংবাদে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে পশ্চিমা কিছু পত্রিকার। সে পত্রিকাগুলোও এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য এবং আমেরিকাতে এ গোষ্ঠীর উত্থান হচ্ছে এমন আরও বহু কল্পকাহিনি। নিতাই হেসে উড়িয়ে দেয় পুরো নিউজটি।

বাবা, এই নিউজে যা বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুল। আমি বা আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী নই। আমরা কোনও ধরনের নাশকতায় বিশ্বাস করি না। আমরা মানুষের সঙ্গে আছি। আমরা যুক্তি-বুদ্ধির কথা বলছি। আমরা তো কোনও সমর চাই না। চাই যুক্তি-তর্ক। তোমরা এসব নিয়ে একেবারে চিন্তা করবে না।

বাবা-মা’র দিকে তাকিয়ে মনে হলো না তারা নিশ্চিন্ত হয়েছেন। দু’জনের চোখে মুখে শঙ্কা। নিতাই নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়ে। ঘুরবে এলাকায়। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলবে। রেল লাইনের কাছাকাছি আসতেই গ্রামের দুই সমবয়সী যুবক খলিল ও জমির তার দিকে ছুট আসে।

কি নিতাই, কবে এলে ? তোমাকে নিয়ে তো আবার আলোচান শুরু হয়ে গেল।

কি আলোচনা ?

তুমি নাকি বিচ্ছিন্নতাবাদী দলের সদস্য! তোমার এসবের দরকার কি। তোমার যে পরিচিতি, তা দিয়ে যে কোনও দলে ভিড়ে যেতে পার।

ভিড়ে যাওয়াই তো শেষ কথা নয়। তাতে আমার হয়তো লাভ হবে কিন্তু তোমাদের কি লাভ ?

আরে রাজনীতিকরা কি এখন আর অন্যের কথা চিন্তা করে নাকি।

ঠিক ধরেছ করে না। আমরা করি। তাহলে কে বিচ্ছিন্নতাবাদী, আমরা না তারা ?

তুমি যেভাবে বলছ সেভাবে ভেবে দেখিনি। তবে পত্র-পত্রিকা তো তোমাকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী বলছে।

এটা হচ্ছে অপচেষ্টা। নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর মতোই ঘটনা। এসব কিছু না। সব ঠিক হয়ে যাবে। কেবল তোমাদের সঙ্গে চাই।

আমরা বাবা ওসবে নেই।

তোমরা কি চাও না তোমাদের কথা সরকার শুনুক! 

নিতাই তুমি কয়েক মাস লন্ডনে থেকে দেখি নিজের দেশ সম্পর্কে সব ভুলে গেছ।

কিছুই ভুলিনি। ভুলিনি বলেই ঘুরে দাঁড়াতে চাই।

আমরা কি করতে পারি বলো।

কাল রাত দশটায় পুলের ধারে চলে এসো। সেখানে বিস্তারিত কথা হবে।  

এদিকে পুলিশের টহল বেড়েছে নিতাইর গ্রামে। তাতে পাড়ার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। সবাই আঙুল তাক করে আছে তার দিকে। ওসবে গা করার সময় কই। জমির আর খলিলকে আপাতত দলে ভিড়াতে চায়। তবে তার মনেও যে আতঙ্ক চাউর হয়ে ওঠে না তা কিন্তু নয়। মাঝে মাঝে অসম্ভবকে সম্ভব করার পথে যে যাত্রা শুরু করেছে তার শেষ কোথায় ? এমন প্রশ্নে  হোছট খায়। তারপরও তো যেতে হবে। পৃথিবীর কোনও আন্দোলনই তো নির্দিষ্ট সময় বেঁধে হয়নি। আধুনিক বিশ্বের পরিচালনাও হবে আধুনিক, এই তো তাদের চাওয়া। তবে কি এখন রাষ্ট্র পরিচালনা আধুনিক নয়। বাহ্যিক রূপ আধুনিক কিন্তু অভ্যন্তরের রূপ অনেকটাই মধ্য যুগীয়। বিচার মানি তালগাছ আমার। এটাই হচ্ছে বর্বরতা। এটাই হচ্ছে অনাধুনিকতা। জনগণ পরিচালনা করবে রাষ্ট্র। সংসদ, জনগণের কথা শুনবে। জনপ্রতিনিধিরা যথাযথ সম্মান পাবে কিন্তু ক্ষমতার উৎস থাকবে জনগণের হাতে। কোন একক পুঁজি থাকবে না। পুঁজির সমবণ্টন হবে জনগণের মাঝে। সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং উৎপাদনে জনগণের মতামত প্রাধান্য পাবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদে জনগণের অগ্রাধিকার থাকবে। এসব মৌলিক দাবি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে রেল লাইন পার হয়ে টং পুকুরের পাড়ে লাইজুর কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় নিতাই। কবরের উপরে সেই খেজুর ডোগা ঠিকই আছে কিন্তু শুকনো খটখটে। সবুজ ঘাসে ঢেকে গেছে কবর। সন্ধ্যার দমকা হাওয়ায় দুলে ওঠে কবরের ঘাস। যেন লাইজু কথা বলছে। কান পাতে নিতাই।

তোমার কি লরাকে খুব মনে পড়ছে ?

প্রশ্ন শুনে ভীষণ ধাক্কা লাগে মনে। লাইজু কি করে জানে লরার কথা!

লাইজু সব জানে। ঠিক আমি যেমন জানি।

দেখে পাশে দাঁড়িয়ে সেই তরুণী। প্রশ্ন তার।

ও তুমি!

লরাকে ভুলে যাওয়া না যাওয়ার প্রসঙ্গ আসছে কেন ? সে আমার জীবনে বিভিন্নভাবে স্থায়ী হয়ে আছে। সেখানে কেবল সেঁটে থাকার নিয়ম আছে। বিযুক্ত হওয়ার কোনও নিয়ম নেই।

লাইজু এখানে চিরনিদ্রায়। লরা বিলেতে। পেয়েও দূরে থাকা। এই যে তোমার জীবন, এটাই একজন সংগ্রামীর আলেখ্য।

জানো এখন বুঝতে পারি যে, আমি নিজেকে সারা জীবন একজন সংগ্রামী হিশেবে দেখতে চেয়েছি। লাইজু, কলি এবং লরা ওরা আমাকে এভাবে দেখতে চায়। তোমার কথাও বাদ যাবে কেন ? তুমিই আমাকে প্রথম প্লেটো বুঝিয়েছিলে। তুমিও আমার শিক্ষক।

নিতাই সংগ্রামীদের আরও শক্ত হতে হয়। আমি জানি তুমি দাবি আদায়ে ঠিকই অনঢ়। তবে নিত্য জীবন যাপনেও তোমাকে আরও বেশি সোজা সাফটা হতে হবে।

কেন ?

তুমি দলে কাউকে টানার বিষয়ে আরও সতর্ক হবে। কারও সাথে কথা বলার সময় বুঝতে হবে এর পরবর্তী পরিস্থিতি। ভুলে গেলে চলবে না তোমার গতিবিধি প্রতিনিয়ত রেকর্ড হচ্ছে।

আমি কি কোন অপরাধ করছি ? আমি তো মানুষের বাসযোগ্য একটি পৃথিবী চাইছি।

সবাই নিজের নীতিকে সঠিক মনে করে। হিটলার কি জাতীয় সমাজতন্ত্র মানে নাৎসিবাদ, জার্মানের অমঙ্গল চিন্তা করেই করেছিলো ? না। কিন্তু এর মধ্যে অন্তর্নিহিত ছিলো বৈজ্ঞানিক মৌলবাদ এবং ইহুদিবিদ্বেষ। অথচ ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের আগ পর্যন্ত নাৎসিবাদ ছিলো জার্মানের রাষ্ট্রীয় নীতি। এখনো নাৎসিদের বিচার হচ্ছে। কিন্তু এর উল্টো হতে পারত। যদি নাৎসিবাদ প্রতিষ্ঠা পেত তাহলে যারা এ মতবাদের বিরোধী ছিল তাদের বিচার হতো। ঠিক যেমন আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উঠেছে। যদি পাকিস্তান যুদ্ধে জিতে যেত তাহলে আজ যারা মুক্তিযোদ্ধা তাদের বিচার হতো। রাজনীতির বিচার  এতটাই নির্মোহ। অতএব যে যুদ্ধ শুরু করেছো তাতে জিততে হবে। এক যুগে না হোক কয়েক যুগ পরে হলেও যাতে তোমাদের মতবাদ জেগে থাকে। তুমি থাকবে না সেদিন, তোমার মতবাদ থাকবে। আর এর প্রবক্তা হিসেবে তোমারও নাম বেঁচে রইবে।

তোমার কথা প্রসঙ্গে আমার প্রশ্ন হলো, আমরা নতুন মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি কেন ? মার্কস, লেনিন, মাও সেতুং, আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের মতবাদ কেন শুদ্ধ রাজনীতি চর্চার বিষয় হয়ে উঠল না।

তুমি আজ যে ‘জনতন্ত্র’র কথা বলছ তা তো প্রায় গণতন্ত্রের কাছাকাছি অন্যরূপ। সেখানে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র সবই আছে। তুমি ভালো করেই জানো সক্রেটিস এবং প্লেটোর দর্শন তোমাদের এই তন্ত্রে রয়েছে।

আমরা এখানে বাউল এবং ফকিরি দর্শন নিয়ে এসেছি। লন্ডনে গিয়ে বুঝতে পারলাম এখানে রয়েছে সেই দেশেরই বাউল যাদের বলা হয় স্ট্রিট সিঙ্গার, তাদের চিন্তাও এখানে রয়েছে। পুরো পশ্চিমা বিশ্বে তাদের চিন্তার বিপুল প্রভাব রয়েছে। যদিও তা প্রতিষ্ঠা পায় নি পুঁজিবাদের করাল থাবায়।

তাই তো। আমি মনে করি তোমাদের নব রাজনৈতিক দর্শন নতুন পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করবে। একটি মানবিক এবং সকলের বাসযোগ্য মঙ্গল পৃথিবী।

শুধু তাই নয়। এই যে আমাদের কৃষক, ফসল উৎপাদনে যে সারা জীবন উৎসর্গ করল। তার চিন্তা, তার যে উৎপাদনের সৃজনশীলতা, তা কিন্তু রাষ্ট্র কখনও জানতে চায় না। তাহলে কীভাবে তুমি খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ হবে! তুমি তো জানলেই না একজন কৃষক কি ভাবছে। ভাসানীর মতো একজন ধ্যানী বংশীবাদক, হরিহরের মতো বাউল এই সমাজকে মেডিটেশন করাতে পারে। তার যে সাধনা, তার যে ধৈর্য তা আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।

কে যেন আসছে এদিকে। আমি চললাম। দেখা হবে।

নিতাই পাশে ফিরে দেখে কোথাও কেউ নেই। তবে দূর থেকে হঠাৎ টর্চের আলো এসে পড়ে তার চোখে। কিছুক্ষণ চোখে অন্ধকার দেখা গেল।  পরক্ষণেই পিঠে একটি হাতের স্পর্শ টের পেল। পেছনে ফিরতেই দেখে পুলিশের গাড়ি। কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক পুলিশ।

নিতাই সাহেব, আপনাকে খুঁজতে বাড়িতে গিয়েছিলাম। জানলাম আপনি এখানে।

কে বলল ?

তাই তো কে বলল! ও, হে রাস্তায় দাঁড়ান একটি মেয়ে বলল, আপনি এখানে।

ও আচ্ছা। বলুন কি করতে পারি ?

কিছুই করতে হবে না। আপনার সঙ্গে কেবল দেখা করতে এসেছি। আপনি কি করছেন কোথায় আছেন, কাদের সঙ্গে আছেন এ খবর  ওপরে দিতে হয়।

ওপরে!

হ্যাঁ, ওপরের তলার বসদের দিতে হয়। আপনি তো এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি। বিদেশি পত্র-পত্রিকাতেও আপনাকে নিয়ে লেখাজোখা হয়।

আপনারা কি এসব বলতে এসেছেন ?

বলতে পারেন তাই। চলুন আপনাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যাই।

না আমি যেতে পারব।

না না আপনাকে এখানে একা রেখে যাওয়া যাবে না। আপনি বাড়িতে থাকুন তাহলে অন্তত আমাদের কাজ সহজ হবে।

কি কাজ  ?

এই যে আপনাকে এখন খুঁজে বের করে জানাতে হলো আপনি কোথায় আছেন। বাড়িতে থাকলে আর খুঁজতে হলো না। বলতে পারব কোথায় আছেন।

বাহ আমি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলাম কেন  ?

নিতাই সাহেব, ডিউটির বাইরে কিছু কথা বলি। সাবধানে থাকবেন। প্রশাসন এখন প্রচণ্ড চাপে আছে। আপনার এবং আপনাদের দলের মানুষ কোথায় কি করছে তার খবরাখবর বিভিন্নভাবে রাখা হচ্ছে। বিদেশি চাপ আছে।

আমি সব জানি। ব্রিটিশ-মার্কিন গুপ্তচর পিছু নিয়েছে। বলুন তো বদলে এত ভয় কেন ?

আমরা আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনও কথা বলতে চাই না। আমার দায়িত্ব হচ্ছে আপনার গতিবিধি লক্ষ্য করা। বলে দিলাম। অন্য কেউ হয়তো বলবে না। আমার মনে হয়েছে আপনার রাজনৈতিক চিন্তা ভিন্ন এবং মঙ্গলজনক হবে। তবে আপনাকে এও মনে রাখতে হবে আমি সরকারের চাকর। এখন আপনার সঙ্গে সখ্য তৈরি করে কথা বলছি কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখবেন আপনাকে লাঠিপেটা করছি। এই হচ্ছে আমাদের দায়িত্ব।

আপনারা বরং চলে যান। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ি ফিরব।

পুলিশের গাড়ি হিঙ্গরি পুকুরের দক্ষিণ পাড় ধরে মিলিয়ে গেল। নিতাই অন্ধকারের পেটে হজম হয়ে আরও কিছু সময় বসে থাকে। ভাবে, কত কঠিন হবে ভবিষ্যৎ।

সতের.

আজ রাত দশটায় পুলের ধারে খলিল এবং জমিরকে আসতে বলেছিল নিতাই। ঢাকা থেকে আরও দু’জন দলের নেতা আসবেন। তবে তারা কে, কি তাদের নাম কিছুই জানে না। হঠাৎ করে দুপুরে অপরিচিত এক লোক এসে একটি চিরিকুট দিয়ে গেল। তাতে লেখা, রাতের বৈঠকের স্থান পরিবর্তন করতে হবে। খলিল এবং জমিরের কাছে সে খবর পাঠানো হলো। একটু করে ভাসানীকেও জানিয়েছে নিতাই। জানিয়েছে কৃষক আবুলকেও। রাতে সভার স্থান পরিবর্তন করে নেওয়া হলো আন্ধারমানিক টিলায়। দু’টি বোম্বা বাতি নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিলেন আবুল। জঙ্গল কেটে সাফ করে বসার জন্য দু’টি রাম দা নেওয়ার দায়িত্ব নিলেন ভাসানী। খলিল ও জমির নিয়ে আসবে কাগজ-কলম।

নিতাই পুরো দিন বাড়ি থেকে কোথাও বের হয়নি। পত্র-পত্রিকা পড়ে এবং টেলিভিশন দেখে সময় পার করেছে। মা’র সঙ্গে বিলেতের গল্প করেছে। গল্প করতে গিয়ে এক সময় লরার কথা বলেছে। মা কি বুঝতে পেরেছে লরার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক ? মনে হয় বুঝতে পেরেছে। তা না হলে কেন জানতে চাইল, লরা কবে বাংলাদেশে আসবে। আসার আগে যেন মাকে বলি। মা তার জন্য কিছু গিফট কিনবে। লরা আসতে পারবে না, এ কথা বলতেই মা খুব বিরক্তি প্রকাশ করে। বলে তোরা কি সব আন্দোলন ফান্দোলন করছিস কে জানে। আমরাও তো কত আন্দোলন দেখলাম। এক দেশ থেকে আরেক দেশে মানুষ আসতে পারবে না, তেমন কখনও শুনিনি। ইত্যকার বচসায় মা’র মুখে খই ফুটল। নিতাই কোনও রা করে না। চুপ করে মা’র কথা শোনে। বিকালের চা পান শেষে নিতাই একটু একটু করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। লরার দেওয়া ঘড়িটি হাতে দিয়ে নেয়। রাতে পাহাড়ে দিক বুঝতে সুবিধা হবে। রাতের খাবার শেষে সবাই নিজ নিজ ঘরে ঘুমের আয়োজন করে। নিতাই ঘরের আলো নিভিয়ে তৈরি হয়ে নেয়। ঠিক সাড়ে ন’টায় ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। রেল লাইনের ধারেই অপেক্ষা করছিল খলিল আর জমির। তিন জন অন্ধকার ভেঙে এক সঙ্গে পাহাড়মুখি হাঁটতে থাকে। টং পুকুরের পাড়ে দেখা হয় ভাসানী আর আবুলের সঙ্গে। সবাই জমির আল ধরে উঠে পড়ে আন্ধারমানিক টিলায়। ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা ডাক অন্ধকার আরও ভারী করে তোলে। যদিও জোনাকীর আলো সেই অন্ধকার কেটে কিছুটা প্রবোধ দিচ্ছে। সেই আলোয় স্পষ্ট দেখা যায় কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন উঁচুতে তেঁতুল গাছের নিচে। সেখান থেকে একটা সংকেত পেয়ে নিতাই বুঝতে পারে ঢাকা থেকে এসেছেন তারা। তবে দু’জন আসার কথা থাকলেও দেখা মিলল চার জনের। ভাসানী বোম্বা বাতি জ্বলিয়ে দেয়। আবুল দা হাতে জঙ্গল কেটে কিছুটা জায়গা বসার উপযোগী করে নেয়।  কলাপাতা কেটে তার ওপরে ছনের বিছানা মতো করে জায়গাটি বসার উপযোগী করে। সবাই বসে পড়ে। কথা শুরু করেন ঢাকা থেকে আসা একজন। নাম জিজ্ঞেস করা যাবে না, এটাই নিয়ম।

নিতাই, আমরা আপনার কাছ থেকে শুনতে এসেছি, কীভাবে কাজ শুরু করছেন।

আমার সঙ্গে দেখতেই পাচ্ছেন কারা আছেন। দু’জন আমার সমবয়সী বন্ধু, একজন বাঁশি বাদক এবং অন্যজন কৃষক। আমি লন্ডন থেকেও এখানকার আন্দোলন সংগঠনের কিছু কাজ করেছিলাম। সেগুলো অনেক কাজ দিয়েছে। আমি যেহেতেু এখান থেকেই কর্মসূচি শুরু করছি, সেহেতু এখানে আমার সহপাঠী উনারা।

বেশ, ভালোই হলো জেনে যে দেশে ফেরার আগেই আপনি কিছু কাজ করেছেন।

মাঝে খলিল কথা বলে ওঠে―

আমার জানার হলো, যে আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে তা কি সশস্ত্র নাকি অন্য কোন পন্থা ?

ঢাকা থেকে আসা অন্য একজন উত্তর দেন।

না আমরা সশস্ত্র কোনও আন্দোলনের কথা ভাবছি না। আমরা বলছি যুক্তি-বুদ্ধির কথা। এ কাজটি সঠিকভাবে করতে পারলে অস্ত্র এর কাছে টিকবে না। কারণ যারা অস্ত্র ব্যবহার করে বা অস্ত্রের শক্তি দেখায় তাদের কাছে আমাদের কথা পৌঁছে দিতে পারলেই হলো। সে তো আর  অস্ত্রে বিশ্বাস রাখবে না। তখন আর কোনও অস্ত্রশক্তি থাকবে না। থাকবে যুক্তি-বুদ্ধির শক্তি। রাজনীতি এখন যেভাবে পেশিশক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে তাকে রাজনীতি বলে না। এটি হলো লাঠিয়ালনীতি। আপনি দেশ চালাবেন, আপনাকে পড়াশোনা করতে হবে, অর্জন করতে হবে অভিজ্ঞতা। তা না হলে একটি রাষ্ট্রের যে কলকব্জাগুলো রয়েছে তার সম্পর্কে আপনি ধারণা পাবেন কীভাবে ? কীভাবে চালাবেন সেসব কলকব্জা ?

নিতাই দেখতে পায় আরও কয়েকজন মানুষ যোগ দিয়েছে তাদের বৈঠকে। এই মানুষগুলোকে একরাতে শহরের সিআরবি বিল্ডিং এর সম্মুখে দেখেছিল। তাদের দেখে বিস্মিত নয় বরং তার মনে একটা দোলা লাগে। সে দোলা শিমুল ফুলের মতো রঙ ছড়ায়। সবাই হাতের ঈশারায় তাকে অভিবাদন জানায়। আবুলের কথায় আবার ফিরে তাকায় নিতাই।

আমরা কৃষক। ফসল উৎপাদন করি, কিন্তু রাষ্ট্রের কোথাও আমাদের অবস্থান নেই। নেই কোনও স্বীকৃতি। আপনাদের সঙ্গে কৃষকদের আন্দোলন হবে দাবি আদায়ের।

আমরা ঢাকায় এ নিয়ে কাজ করছি। এখানে নিতাই আপনাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেবে।

আমি বিষয়গুলো নিয়ে উনাদের সঙ্গে কথা বলেছি। এতদিন আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। কাল থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক কাজ।

নিতাই কথা বলে, জমিরের দিকে তাকায়। জমির কি যেন বলতে চায়।

জমির, তুমি সম্ভবত তরুণদের কিভাবে সংগঠিত করা যায় সে বিষয়ে জানতে চেয়েছিলে।

হুম, আন্দোলনে তরুণদের যুক্ত করার কোনও বিকল্প নেই। আমি সে কাজটি করতে চাই। এ বিষয়ে কিছু দিক নির্দেশনা চাই।

ঠিক আছে আমি তোমাকে সময়মতো বলব।

নিতাই সবার দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দুলে ওঠা বোম্বা বাতির আলোয় নেচে ওঠে তার মুখ।

আমরা এখন পুরো বিশ্বে সংগঠিত। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য তথা ইউরোপ, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। লন্ডনে আমার সব দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এখন আমাদের মাঠে নামার পালা। তবে সাবধানে এগুতে হবে। ব্রিটিশ-মার্কিনি গুপ্তচরেরা আমাদের খোঁজে সর্বদা সক্রিয়। অতএব এদের তল্পিবাহকরা আমাদের বিপরীতে অবস্থান নেবে। এদের দৃষ্টিসীমা থেকে যতটুকু দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল।

এসময় অন্ধার ভেঙে কারও দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসার আভাস পাওয়া গেল। নিতাই সবাইকে ঈশারায় চুপ থাকতে বলেন। নিভিয়ে দেয় বোম্বা বাতি। কিছুক্ষণ আর কোনও শব্দ পাওয়া যায় না। কেউ একজন কানের কাছে এসে ফিস ফিস করে বলে―

এখান থেকে সরে যাও। পালাও!

কে বলল কথাগুলো চেনা গেল না। সে কথাই নিতাই সবার কানে কানে গিয়ে বলল। হঠাৎ টর্চের আলোয় ভেসে উঠল সবার মুখ। দ্রুত পায়ে তাদের দিকে তেড়ে আসছে বিশাল বহর। নিতাইসহ সবাই দৌড়ে নেমে পড়ে পাশের কান্নালে। হঠাৎ একটি গাছের গুঁড়ির সঙ্গে হোঁচট খেয়ে গড়াতে গড়াতে চরার পানিতে গিয়ে পড়ে নিতাই। কিছুক্ষণ চুপ করে পানিতেই শুয়ে থাকে। কারও কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। হঠাৎ অন্ধকার চুরমার করে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ  শোনা গেল। কিন্তু কোনও মানুষের নড়াচড়া টের পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ পর নিতাই বুঝতে পারে তার হাত পা ছিঁড়ে রক্ত গড়াচ্ছে। উঠে পাশে একটি গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে। সেখানেই অনেক্ষণ বসে থাকার পর কোনও দিকে যাবে বুঝতে পারে না। কোথাও কারও শব্দও শুনা যাচ্ছে না। কে কোথায় আছে জানা যায় কি করে! বুঝতে পারে না কোনও দিকে যাবে। ততক্ষণে রাত ভেঙে মৃদু ভোরের আলো নামতে শুরু করেছে। হঠাৎ চোখ যায় লরার দেওয়া ঘড়ির দিকে। সেই গড়িতেই দিক নির্দেশের কাঁটা আছে। ঘড়িটি সোজা করে ধরে নিতাই দক্ষিণ দিকে হাটতে শুরু করে। ভাবে পশ্চিমে অর্থাৎ বাড়ির দিকে যাওয়া যাবে না। তাহলে ধরা পড়ে যাবে। একের পর এক টিলা বেয়ে সে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে থাকে। হাঁটে আর ভাবে লরা কি জানত সে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। আজ তার দেওয়া ঘড়িটি না থাকলে পাহাড়েই ঘুরতে হতো তাকে। এখন অন্তত কোথাও না কোথাও জনপদের সন্ধান পাওয়া যাবে। অন্তত দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করলে এক সময় শহরের কাছাকাছি যাওয়া যাবে। 

পরদিন বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হলো-পুলিশের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংঘর্ষ : নিহত দুই। নিহত ভাসানী আর আবুলের ছবি ছাপা হলো। পুরো এলাকা থমথমে হলেও গ্রামবাসী ফুঁসে উঠল। দাবি তুলল, ভাসানী আর আবুল বিচ্ছন্নতাবাদী নয়। তারা এই গ্রামেরই মানুষ। তাদের কেন হত্যা করা হলো, তার জবাব তারা চায়। এই দাবি পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ল। এই দাবানলে নিজেদের দল ভারী করার কাজে যোগ দিল পুরো দেশে দায়িত্বে থাকা জনতন্ত্রবাদীরা। খলিল, জমির ও ঢাকা থেকে আসা দলের সদস্যদের কোনও হদিস পাওয়া গেল না। তাদের কথা সংবাদের কোথাও নেই। গ্রামের মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছে ভাসানী ও আবুলের হত্যার বিচারের দাবিতে। সেই সঙ্গে গ্রামের একটি অংশ নিতাই’র দিকে সন্দেহের আঙুল তোলে। বলে এর মূল হোতা নিতাই। তাকে খুঁজে বের করতে হবে। এদিকে নিতাই’র বাড়ি যেন জনশূন্য। ভেতর থেকে কোনও সাড়া শব্দ নেই। পুলিশ, গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন বাহিনীর মানুষ ঘেরাও করে রেখেছে তাদের বাড়ি। বাবা-মাকে দফায় দফায় জিজ্ঞেসাবাদ করা হচ্ছে। তারা কিছুই বলতে পারছেন না। তাদের নানানভাবে শাসানো হচ্ছে। খবর দিতে না পারলে তাদের গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে, চালান দেওয়া হবে জেলে, ইত্যাকার বহুবিদ ভয় প্রদর্শন চলতে থাকে ক্রমান্বয়ে। গ্রামে খলিল ও জমিরের অনুপস্থিতি নিয়েও কানাঘুষা চলতে থাকে। ইতোমধ্যে পুলিশের লোকজন তাদের বাড়িতেও গিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পুরো দেশ। দিনের পর দিন আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলনের কোনও নেতা নেই। সাধারণ মানুষ নিজে থেকেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। জনতন্ত্রবাদীরা এর সঙ্গে আছে, কিন্তু দৃশ্যমান নয়। তবে নিতাই’র কোনও খবর পাওয়া গেলও না। একদিন খবরের কাগজে সংবাদ প্রকাশিত হলো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নেতা নিতাই নিখোঁজ। সংবাদে ইনিয়ে বিনিয়ে বলা হলো কে এই নিতাই ? বিভিন্ন দল নিতাইকে নানান নেতিবাচক অভিধায় উপস্থান করছে মানুষের কাছে। নিজ গ্রামেও তাকে নিয়ে সমালোচনার অন্ত নেই। তারপরও আন্দোলন থেমে নেই। পুরো দেশে অনেক আন্দোলনকারী গ্রেফতার হয়েছে। এই আন্দোলনের খবর বিদেশি টেলিভিশন, পত্র পত্রিকায়ও প্রচারিত হচ্ছে। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকরা এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকান দূতাবাস থেকে এ বিষয়ে প্রতিদিন বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে। সেসব বিবৃতির মূল কথা হচ্ছে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা পুরো বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আঠারো.

কয়েক মাস হয়ে গেল নিতাই নিখোঁজ। ভাসানী আর আবুলের নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জমে ওঠা আন্দোলন এখনও ক্ষীণ জেগে আছে। কোথাও কোথাও মিছিল মিটিং হচ্ছে। নিতাইর বাবা-মা সন্তানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। এ কয়েক মাসে বহুবার থানায় যেতে হয়েছে। বাড়িতে আসা সাংবাদিক, কূটনীতিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সহস্র প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে এখনও জেগে থাকা আন্দোলনের মাধ্যমে একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে জনতন্ত্রবাদী ধারণা। মানুষ এর সমর্থনে এখন খোলামেলা কথা বলতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে একদিন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা গেল, নিতাইকে চট্টগ্রাম শহরের টাইগারপাস এলাকায় দেখা গেছে। এ সংবাদ প্রচারের পর থেকে নাকি টাইগারপাস, কদমতলী, সিআরবি থেকে শুরু করে পুরো এলাকায় তল্লাশি জোরদার করেছে পুলিশ। পরের দিন আবার খবর প্রকাশ হলো পাহাড়তলিতে দেখা মিলেছে বিচ্ছন্নতাবাদীদের দুই কর্মী খলিল ও জমিরের। ঢাকা থেকে যারা এসেছিলেন তাদের আর কোনও খোঁজ মেলেনি। তারা নিশ্চয় ঢাকা ফিরে গিয়েছিল। তা না হলে ঢাকা থেকে তাদের নিখোঁজের খবর প্রকাশ হতো। পুরানা পল্টনে এখন প্রায় প্রতিদিন নিতাইর সন্ধান দাবি এবং ভাসানী ও আবুলের হত্যার বিচার চেয়ে সভা হচ্ছে। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশের জনতন্ত্রবাদীরা নিতাইর সন্ধান দাবি করেছে। কয়েকটি পত্রিকা লরার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, জনতন্ত্রবাদীরা অবিলম্বে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ গড়ে তুলবে যদি নিতাইর সন্ধান দেওয়া না হয়। এসবের আবার পাল্টা বিবৃতি আসছে মার্কিন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারের মুখপাত্রের কাছ থেকে। পুরো বিশ্বে আবারও আলোচনায় নিতাই। এবার পত্রিকায় নয় বিচ্ছিন্নভাবে মানুষের মুখে শোনা যায় নিতাইকে দেখা যাওয়ার কথা। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহরে গড়ে উঠছে জনতন্ত্রবাদী সংগঠন। এমন খবর প্রায় প্রতিদিন প্রকাশ হচ্ছে পত্র পত্রিকায়। তবে কেউ প্রামাণ্য কোনও দলিল হাজির করতে পারে না। এভাবে গেল আরও কয়েক মাস। এ সময়ের মধ্যে পুরো দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ জনতন্ত্রে মুক্তি খোঁজে। পশ্চিমা বিশ্বে তাদের অবস্থান জানান দেয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম। কোথাও কোথাও উন্মুক্ত বিতর্ক অনুষ্ঠান হচ্ছে। যাতে প্রাধান্য পাচ্ছে জনতন্ত্র। এতে করে আরও কঠোর অবস্থানে দাঁড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সরাসরি ঘোষণা আসে, যেন বিচ্ছন্নতাবাদীরা মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এর মধ্যে ভীষণ ধাক্কা দেয় নিতাইর একটি অডিও রেকর্ড। যাতে সে সাধারণ মানুষের কাছে জনতন্ত্রের পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিয়েছে। নগর থেকে গ্রামে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এই রেকর্ড। পুলিশ খুঁজে খুঁজে সেসব রেকর্ড জব্দ করছে। আইন জারি করা হলো কারও কাছে সেই রেকর্ড পাওয়া গেলে গ্রেফতার করা হবে। তাতেও থামানো যায়নি। পাড়ায় মহল্লায় গোপনে সেই রেকর্ড বাজতে থাকে। নিতাই আড়ালে থেকেও চালিয়ে যায় কাজ।

কিন্তু একদিন সব ভেঙেচুরে গেল পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত এক খবরে। ‘আততায়ীর হাতে নিহত নিতাই’। সংবাদের ভাষ্য মতে, টাইগারপাসের কাছে পাহাড়ে আততায়ীরা নিতাইকে হত্যা করেছে। গুম করে দিয়েছে মৃতদেহ! সেই সঙ্গে আরও একটি সংবাদ, ‘একযোগে লন্ডন ও নিউ ইয়র্কে আরও দুই বিচ্ছন্নতাবাদী নেতা আততায়ীর হাতে নিহত’। নিউ ইয়র্কের টাইম স্কোয়ারের কাছে নিহত হয়েছে মারিও আর লন্ডনে কভেন্ট গার্ডেনে নিহত লরা!

এ ঘটনায় বিবৃতি দিয়েছে বিভিন্ন দূতাবাস। এবার বিস্ময়করভাবে কোনও রকম বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে মার্কিন দূতাবাস। তাদের বক্তব্য নিতে  বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে দেখে বন্ধ! অথচ আজ সোমবার। দূতাবাস বন্ধ থাকার কথা নয়।

এই মৃত্যুর সংবাদে পুরো দেশে চলছে আলোচনা সমালোচনা। নিতাইর বাবা-মা অর্ধমৃতের মতো বেঁচে আছেন। গ্রামের মানুষজন চা দোকানে বসে বহু বক্র সমালোচনায় সময় গুজরান করছে। একদিন স্কুল মাঠে জড়ো হয়ে বসা কিছু মানুষ পুরো ঘটনা নিয়ে কথা বলছে। তাদের একজন ভীষণ রেগে বলতে থাকে―

নিতাই ছোটবেলা থেকেই এমন। কেবল বাবা মা নয়, পুরো গ্রাম জ্বালিয়েছে। মরেও আমাদের গ্রামকে আতঙ্কে ফেলে গেছে। সে কি রাজনীতি করবে  ? নিজেরই ঠিক নাই।

কথা শুনে এক কিশোর সটান বৈঠক থেকে উঠে স্থির হয়ে বলে―

নিতাই যা করেছেন সেটাই ঠিক। তিনি তো আন্দোলনের সূচনা করে গেলেন। এ আন্দোলন চলবে।

বলেই, কিশোর দ্রুত পা চালায়। 

লেখক : কথাশিল্পী

 সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares