আন্তারেস এক আন্তঃনাক্ষত্রিক অভিযানের কাহিনি : দীপেন ভট্টাচার্য

সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস

গ্রহটাকে আমরা বহুদিন ধরেই চিহ্নিত করে রেখেছিলাম। লাল গ্রহ, তার মধ্যে নীল আর সবুজের ছাপ। পাহাড় আছে, সবুজ ক্লোরোফিলে ছেয়ে আছে তার চড়াই আর উতরাই। তার মধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ নীল জংলি ফুল। বায়ুমণ্ডলে ৪০ ভাগ অক্সিজেন, বাদবাকি নাইট্রোজেন, অল্প পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড। বায়ুচাপ ৮০ হাজার প্যাসকাল, মাধ্যাকর্ষণজনিত ত্বরণ প্রতিবর্গ সেকেন্ডে ৬ মিটার।

মাত্র ০.৩ জ্যোতির্বিদ্যা একক দূরত্বে লাল আলোতে জ্বলছে একটা গ টাইপ তারা। আকাশটাও কেমন লাল হয়ে আছে। তারাটার নাম আমরা দিয়েছিলাম মিহির আর গ্রহটার নাম জেমলা।

মা বলল, ‘এই গ্রহটা তোর পছন্দ হয়েছে, শোগি ?’  

আমি লাফাতে লাফাতে বললাম, ‘হয়েছে, হয়েছে।’ হাঁপিয়ে গেলাম, তারপর বললাম, ‘আমি কি হেলমেট খুলে ফেলব ?’

মা বলল, ‘খুলিস না, এতখানি অক্সিজেন হঠাৎ করে বিষ হয়ে যেতে পারে।’ 

দূরে দেখি মালিয়া, আশু আর তাশু লাফাচ্ছে আর হেলমেট খোলার তোড়জোড় করছে। ওদের মা সিয়েনা কাছে নেই, সে পাহাড়ের একটা পরিখার ধার ঘেঁষে নিচে তাকিয়ে কী যেন দেখছে। আমি হাত তুলে মা’কে মালিয়াদের দেখালাম। মা বেতারে তাদের হেলমেট খুলতে মানা করলেন।

আমার মা’র নাম হলো ইন্দল। আন্তারেস মহাযানে যত মা আছেন, প্রায় দশ জনের মতো, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে স্নেহময়ী হলেন আমার মা। অবশ্য বেলকের সঙ্গে এই নিয়ে আমার প্রায়ই ঝগড়া হয় কারণ ও বলে ওর মা’র মতো বুদ্ধিমান আর সুন্দর মানুষ নাকি মহাবিশ্বে আর নেই। তা যাকগে, বেলককে আমি এই বিষয়ে অনেক সময় ছাড় দিই, কারণ বেলকের বাবা নেই। এদিকে আবার বেলকের বাবা নেই বলে আমার মা ওকে খুব স্নেহ করেন। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার থেকে একটু বেশিই করেন। তখন আবার খুব হিংসা হয়। মা আবার সেটা বোঝেন, তাই মাঝে মধ্যেই রাতে শুতে যাবার আগে আমার পাশে বসে আমার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে আমাকে বলেন, ‘এই মহাকাশে তার সবচেয়ে আদরের জিনিসটা নাকি আমি।’ আমি বলি, ‘বাবার থেকেও ?’ মা বলেন, ‘বাবার থেকেও।’ মা কথাটা এমনভাবে বলেন, মুখের হাসিটা ধরে রেখে, বুকটা আনন্দে ভরসায় ভরে ওঠে।

পৃথিবী ছেড়েছি আমরা সেই কবে। প্রায় একশ’ বছর হবে। মহাকাশের নিকষ অন্ধকার ধীরে ধীরে সেই নীল গোলকের স্মৃতি ম্রিয়মাণ করে এনেছিল। আমাদের মহাকাশযানে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়েছিল পৃথিবীর কাহিনি, ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক স্মৃতিফলকে ধরে রাখা পৃথিবীর চলচ্চিত্র উজ্জ্বল করে রাখত আমাদের হলঘর। ছেড়ে আসা পৃথিবীর গান ভরিয়ে রেখেছিল বিশাল মহাকাশযানের করিডর।

আমার ছোটরা কখনও দেখি নি পৃথিবী, আমাদের জন্ম এই মহাকাশযানে। আমাদের মহাকাশযানের নাম আন্তারেস। পৃথিবীর আকাশের একটি লাল অতিদানব তারার নামে রাখা হয়েছে এই নাম।

কিন্তু আমার মা’র জন্ম পৃথিবীতে। যখন  আরও ছোট ছিলাম মা তার কোলে বসিয়ে আমাকে পৃথিবীর গল্প শুনিয়েছে, ঘুম-পাড়ানী গান গেয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়েছে, চামচে করে খাইয়ে দিয়েছে। অক্ষর চেনার আগে, ছবি দেখে জিনিস চিনতে পারার আগে মা’র কাছ থেকেই আমি পৃথিবীর কথা শুনেছি। সবুজ আর নীল রঙে ঢাকা নাকি সেই পৃথিবী। বনের সবুজ, সমুদ্রের নীল। মাঝে মধ্যে মেঘের সাদা আর মরুভূমির হলুদ। মহাকাশের নিñিদ্র কালোতে এই রঙগুলো যাতে ভুলে না যাই সে’জন্য আমাদের খেলার ঘরে, মহাকাশযানের করিডরে সেই রঙগুলো আঁকা আছে। মা এরকম একটা রঙের বর্ণালী দেখিয়ে বলেছিল, এটা রামধনু। ধনুকের মত বাঁকা। ত্রিশিরা কাচে আলো ফেললে যা হয় বৃষ্টির জলের ফোঁটায় সূর্যের আলো পড়লে এরকমভাবে সেই আলো নানা রঙে বিশ্লিষ্ট’ হয়।

বিশ্লিষ্ট কী মা ? এটা বোঝাতে মা সময় নিল। বলেছিল, ‘মনে কর তোমাকে অনেক কয়েকটা বল দেয়া হলো। সেগুলো আবার বিভিন্ন রঙের―লাল বল, নীল বল, সবুজ বল, হলুদ বল। মনে কর তোমাকে আবার কয়েকটা বাক্স দেয়া হলো, তাতে লেখা আছে লাল, নীল, হলুদ। তুমি লাল বলগুলোকে আলাদা করে লাল বাক্সে ফেললে, নীল বলগুলোকে নীলে বাক্সে। এই যে রঙ হিসেবে বলগুলো আলাদা করে ফেললে একেই বলে বিশ্লিষ্ট করা।’ 

আমাদের জানালার বাইরে যে অন্ধকার তা যেন অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাতে নীল, লাল, সাদা তারারা জ্বলজ্বল করছিল, দু-একটা ফ্যাকাশে নীহারিকা ঠিক স্পষ্ট দেখা যায় না। সাধারণত সরাসরি আমরা জানালার বাইরে তাকাই না। এর কারণ হল আমাদের মহাকাশযানটির বসাবাস করার জায়গাটি ক্রমাগতই ঘোরে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টি করার জন্য। আমাদের মূল জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৮০০ মিটার। তার মাঝখানের দিকে তাকে ঘুরে রয়েছে একটা ৩০০ মিটার ব্যাসার্ধের চক্র। সেই চক্রটি ঘুরছে, প্রতি ৩৫ সেকেন্ডে সে একবার করে ঘুরছে। আমরা ঐ চক্রের মধ্যেই থাকি, চক্রটির পুরুত্ব প্রায় ২০ মিটার। চক্রের ঘূর্ণন আমাদেরকে তার বাইরের মেঝের দিকে পৃথিবীর মতোই অভিকর্ষের মধ্যে রাখে। এই চক্রে বাইরের দিকে  কোনও জানালা নেই, জানালাগুলো যেখানে থাকার কথা সেটা হলো আমাদের মেঝে। মধ্যে করিডর, আর করিডরের দুদিকে ঘর―আমাদের থাকার জায়গা, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, রেস্তোরাঁ, লাইব্রেরি আরও কত কি ? ঘরের জানালায় বাইরের মহাকাশ দেখা যায়, তবে এগুলোকে জানালা বললে ভুল হবে, কারণ প্রকৃত জানালা হলে সে বাইরের মহাকাশের ঘূর্ণনটা দেখাত, সেই চিত্রটা ৩৫ সেকেন্ডে একবার করে ঘুরে আসত। তার বদলে সে দেখায় বাইরের একটি স্থির প্রতিচ্ছবি যার ফলে আমরা বুঝতে পারি না যে, আমরা ঘুরছি। ঐ জানালায় অভিক্ষিপ্ত ছবিগুলো দেখে মনে হবে আমরা একটা সরলরেখায় চলেছি, বহু দূরে তারারা জ্বলে ক্ষীণ হয়ে।

আমরা খুঁজছি নতুন গ্রহ যেখানে আমরা গড়তে পারব নতুন বসতি। আমাদের পৃথিবী নাকি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

বেতারে মা মালিয়া, আশু আর তাশুর মা সিয়েনাকে ডাকল, বলল, ‘পরিখার ধারে দাঁড়িয়ে কী করছ ?’

সিয়েনা উত্তর দিল, ‘নিচে কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি, জ্বলজ্বল করছে।’

এটা শুনতে পেয়ে আমরা ছেলেমেয়েরা দৌড় তো দৌড়, কে কার আগে পৌঁছাবে পরিখার ধারে। সবার আগে পৌঁছে গেল মালাই আর তিলাই দু-ভাই। এদের দুজন এমনই যমজ যে আমি কখনই তাদের আলাদা করে চিনতে পারি না। আর এখন তো নভোচারী পোশাকে তো কে মালাই আর কে তিলাই বোঝার  কোনওই উপায় নেই। এরপরে পৌঁছলাম আমি, তারপর মালিয়া, আশু আর তাশু। এই গ্রহে দৌঁড়াতে ভালোই লাগছিল, লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিলাম বড় বড় পাথর। ওদিকে মা তো চিৎকার করে যাচ্ছে, ‘লাফিও না, পাথরে পা হড়কে পড়ে যাবে।’ কে কার কথা শোনে!

বেতারে শুনলাম সিয়েনা বলছে, ‘সাবধান ছেলে মেয়েরা, এখানে কিন্তু পাহাড়ের পাড় নেই। আস্তে এস।’

সত্যিই তাই। পাহাড়ের ধারে আসতে চমকে গেলাম, হঠাৎ করেই যেন ভূমি এখানে ভেঙে গেছে, প্রায় ৫০০ মিটার খাড়াই দেয়াল। বহু নিচে কী যেন জ্বলজ্বল করছে লাল রঙে। মিহির তারার লাল রঙ প্রতিফলিত হচ্ছে কি  কোনও কাচের আয়নায় ? সিয়েনা মাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কী মনে হয়, জমাট বরফ নাকি লবণের হ্রদ ?’

মা বলল, ‘আমরা এরকম আগে দেখেছি অনেক গ্রহে আর গ্রহাণুপুঞ্জে। সেখানে ওরকম দুটো জিনিসই ছিল―বরফ অথবা লবণ। দেখি বর্ণালী-বিশ্লেষকটা ব্যবহার করে।’

আমাদের পেছনেই ছিল উড়ে-চলা ছোট বিমান-রোবট যাকে আমরা খুব ভালবাসতাম। তার নাম ছিল সাইবোক। সাইবোকের দেহটা ছিল বিমানের চোঙার মতো, দুপাশে ডানা, কিন্তু ওর মুখটা ছিল অনেকটা মানুষের মতো দেখতে। সাইবোক সব কাজের কাজী, সে আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করতে পারত। তাকে মা বললেন নিচে উজ্জ্বল জিনিসটাকে কাছ থেকে দেখতে আর সেটার বর্ণালী বিশ্লেষণ করতে।

সাইবোকের হাস্যরস খুব প্রখর ছিল, সে মিনমিন করে বলল, ‘আমাকেই এসব বিপজ্জনক কাজ করতে হবে ?’ কিন্তু এই বলেই ভীষণ বেগে গিরিখাদে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিছুক্ষণ বিনাবাধায় পড়ার পর সে তার ডানার এরোফয়েলগুলোকে সক্রিয় করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মা আর সিয়েনার কাছে সাইবোকের পাঠানো উজ্জ্বল জিনিসটার ছবি আর বর্ণালী তথ্য আসা আরম্ভ হল। আমরা বাচ্চারা তো খুব রোমাঞ্চিত, আমরা ওদের দুজনকে ঘিরে ধরে লাফাতে লাফাতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী দেখছে সাইবোক ?’

কিন্তু মার আর সিয়েনার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল, মা’র ভুরুদুটো কুঁচকে অনেকটা একসঙ্গে হয়ে গেল। সিয়েনা বলল, ‘বাচ্চারা, এটা একটা প্রাকৃতিক বরফ আগ্নেয়গিরি বলতে পার, মাটির নিচ থেকে পার্মাফ্রস্ট বা চিরতুষার ঊর্ধ্বচাপে বের হয়ে আসছে। চল আমাদের এখন আন্তারেসে ফিরে যেতে হবে।’ এত তাড়াতাড়ি কেন আন্তারেসে ফিরতে হবে সেটা আমরা কেউ বুঝলাম না। শুধু মনে হলো এমন একটা কিছু ব্যাপার আছে যেটা মা কিংবা সিয়েনা আমাদের খুলে বলতে চায় না। যাইহোক আমরা তো লাফাতে লাফাতে আবার আমাদের ছোট সাটলে ফিরে এলাম। সাইবোক আমাদের পেছনে উড়ে উড়ে এল। সবাই সাটলে ডোকার পরে হুশ করে আমাদের পেছনে পরপর দুটো দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সিয়েনা সামনে বসে একটা নিয়ন্ত্রক প্যানেলে একটা বোতামে চাপ দিল। আমাদের পায়ের নিচে ইঞ্জিন মৃদু স্বরে গর্জে ওঠে। কম্প্রেসারের শব্দ শোনা যায়, বাইরে থেকে বাতাস নিচ্ছে, মুহূর্তে সেই বাতাসের অণু, পরমাণু আয়নিত হয়ে যায় আর সেই ধণাত্মক আয়নিত কণা আকর্ষিত হয় একটা ঋণাত্মক বলয়ের দিকে, অবশেষে প্রবল বেগে ইঞ্জিনের পেছন দিয়ে সেই আয়নিত কণাগুলো বের হতে থাকে, আর নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী ধাক্কা দেয় আমাদের সাটলকে । আমরা হেলমেট খুলে যার যার আসনে বসে বেল্ট বেঁধে নিই।

গ্রহ থেকে ওপরে ওঠা বা কক্ষপথ থেকে নিচে নামা আমাদের কাছে প্রথম প্রথম খুব রোমাঞ্চকর ছিল, কিন্তু এখন ইঞ্জিনের খুঁটিনাটি যত জানছি তত আমাদের ভয় বাড়ছে। গ্রহ থেকে কক্ষপথে পৌঁছান সহজ ব্যাপার নয়। সাটল  খুব দ্রুত তার গতিবেগ বাড়াতে থেকে। আমাদের শরীর সিটের সঙ্গে গেঁথে যায়, ওজন বেড়ে যায় প্রায় তিনগুণ। এরকমভাবে ছয় মিনিট, ততক্ষণে আমরা আন্তারেসের কক্ষপথে পৌঁছে গেছি। সিয়েনাকে কিছুই করতে হয় না, জেমলা গ্রহ থেকে আমাদের সাটল একটা পূর্ব নির্ধারিত পথে জেমলার কক্ষপথে প্রদক্ষিণরত মহাকাশযান আন্তারেসে পৌঁছে যায় আধঘণ্টার মধ্যে। পৌঁছনোর আগে আমরা ওজনশূন্যতা অনুভব করি। সাটল আন্তারেসের সঙ্গে ডক করে মাঝখানে চুরুটের মতো অংশে। এই অংশটা ঘোরে না, কাজেই এখানেও ওজনশূন্যতা বর্তমান। এখান থেকে একটা লিফট আমাদের বাইরের ঘুরন্ত চক্রের অংশে নিয়ে যায়। লিফটটা যত বাইরের দিকে যায় তত আমাদের ওজন বাড়ে। লিফট যেখানে থামে সেখানে আমাদের ওজন হয়ে যায় পৃথিবীর সমান।           

চক্রে পৌঁছান মাত্র মা আমাকে বলল, ‘ঘরে চলে যা রে, শোগি।’ এই বলে সিয়েনা আর মা আমাদের ফেলে দৌড়ে চলে গেল, এরকম আগে কখন হয়নি, বুঝলাম না জেমলার সেই গহ্বরের বরফের উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখে তারা কেন এত ঘাবড়ে গেল। 

আমি কথাটা বেলককে কখন বলব ভাবছিলাম। বেলক আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। বেলককে লাইব্রেরিতে পাওয়া যাবে নিশ্চয়। আসলে লাইব্রেরিটা ছিল বিশাল একটা মিউজিয়াম, মূলত পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সমস্ত ধরনের তথ্য সেখানে পাওয়া যেত। মহাশূন্যের পোশাক ছেড়েই দৌড়ে গেলাম লাইব্রেরিতে। আমাদের লাইব্রেরি বইয়ে ঠাঁসা, মেঝে থেকে অনেক ওপরে তাকের পর তাক সাজান বই। আসলে ঠিক বই নয়, বলা যায় বইয়ের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীতে প্রাচীন সময়ে নাকি এভাবেই বই লাইব্রেরিতে সাজান থাকত। সেই অনুভূতিটা বজায় রাখতে এই জাহাজেও সেভাবে বই রাখা হয়েছে, শুধু সেগুলো আসলে বই নয়, কম্পুটার দিয়ে গড়া বইয়ের ছবি মাত্র, আমরা যদি  কোনও বই পড়তে চাই বা শুধুমাত্র দেখতে চাই তাহলে সেদিকে হাতের তর্জনী তুললেই বইটা পড়ার টেবিলের ওপর ভেসে উঠবে। লেজারের আলোয় মূর্ত হয়ে উঠবে পুরো বইটা, আমি আঙুল দিয়ে পাতা সরাতে পারব, পড়তে পারব শূন্যে ভেসে ওঠা অক্ষরগুলো।

বেলক দেখলাম ঘরের কোনায় ওপর হয়ে একটা পাথর দেখছে। আমাকে দেখে বলল, ‘জানো এই জিনিসটা কি ? এর নাম হলো রোজেটা স্টোন। এটা দেখে গবেষকরা প্রথম মিসরীয় ভাষার পাঠোদ্ধার করতে পেরেছিলেন।’ আমি খুব আশ্চর্য হয়ে জিনিসটা দেখলাম, একটা বিশাল পাথরের চাঁই। তাতে নানান ধরনের বর্ণমালায় লেখা। আমার দিকে বেলক তাকিয়ে বলল, ‘জানো এর জন্য কত লোক কত শ্রম করেছে, মিসরীয় ভাষা ছিল ছবিতে লেখা, তাকে হিরোগ্লিফ বলা হত। তো কেউ সেটা পড়তে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত হঠাৎ করেই একটা জায়গায় এই পাথরটা পাওয়া যায় যেখানে মিসরীয়, গ্রিক ও আমহারিক ভাষায় লেখা আছে।’

‘এটাই কি সেই আসল পাথর ?’ জিজ্ঞেস করি আমি। ‘হ্যাঁ,’ বলে বেলক।

পৃথিবী ছাড়ার সময় আমাদের অনেক প্রাচীন স্মৃতি দিয়ে দেওয়া হয়। হামুরাব্বির প্রথম আইন ফলক, পৃথিবীর দেশসমূহের বিলুপ্তির সনদ। বেলক বলল, ‘এসব সামনাসামনি না দেখলে এগুলোর গভীর তাৎপর্য বোঝা যায় না।’

কথা বলতে বেলক খুব কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করে। ‘তাৎপর্য’ মানে কী সেটা জিজ্ঞেস করার সময় ছিল না, বললাম, ‘বেলক, আমরা জেমলা থেকে তড়িঘড়ি করে ফিরে এলাম। একটা পরিখার নিচে কী যেন জ্বলজ্বল করছিল। সাইবোক সেটা পর্যবেক্ষণ করে তথ্য পাঠাল আর সঙ্গে সঙ্গে মা আর সিয়েনা আমাদেরকে আন্তারেসে ফিরিয়ে নিয়ে এল।’ 

কথাটা শুনে বেলক মনে হল একটু আশ্চর্য হলো। এখানে বলি বেলক আমাদের বয়সী হলেও আমাদের মতো নয়। আমরা যখন একটা কিছু দেখে খুব আনন্দ বা দুঃখ পাই আবার পরক্ষণেই ভুলে যাই, বেলক ভোলে না, তাই নিয়ে চিন্তা করে। সে উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াল, আমি ওর পাশে। নিচে জেমলা গ্রহ দেখা যাচ্ছে। আগেই বলেছি, আমাদের জানালাগুলো ঠিক জানালা নয়, বরং আমাদের মহাকাশযানের দেয়ালের ধারে সেগুলো ছিল টেলিভিশন স্ক্রিনের মতো। আমাদের চক্রাকার টরাস আকৃতির বাসস্থান ক্রমাগতই ঘুরছে। কিন্তু জানালা দিয়ে নিচে স্থির জেমলা দেখা যাচ্ছে, সেই গ্রহ ঘুরছে না। না ঘুরলে যেরকম দেখা যেত সেরকমভাবেই দেখাচ্ছে। এর কারণ জানালাগুলো আসলে জানালা নয়, বরং সেগুলো হল কম্প্যুটার স্ক্রিন। আমাদের বাসস্থান না ঘুরলে যেমন বাইরেটা যেমন দেখা যেত, সেই স্ক্রিন সেভাবেই আমাদের তা দেখায়।   

সেদিকে তাকিয়ে বেলক কিছুটা আনমনাভাবেই বলল, ‘কি আছে এই গ্রহতে যাতে বড়রা এত ভয় পেল ?’ আমাদের সঙ্গে বেলক জেমলাতে যায়নি, ওর যাবার কথা ছিল আগামীকাল। আমি বললাম, ‘চলো, খাবারের সময় হয়ে গেছে, পরে এই নিয়ে ভাবা যাবে।’

খাবারের জায়গাটা লাইব্রেরির পাশেই। একে আমরা বলি রেস্তোরাঁ। সেখানে যেয়ে দেখি আশু, মালিয়া, তাশু, মালাই, তিলাই সবাই এসে গেছে। দূরে আর একদল ছেলে মেয়ে ক্লাভান, মিলা, রিনা, লেনাক এরা সব জটলা করছে। আগামীকাল ওদের জেমলাতে যাবার কথা। বড়রা কেউ নেই। এই সময়ে কারুর না কারুর থাকার কথা খবরদারি করতে। মালিয়া, আশু আর তাশু তিন বোন। অন্যদিন ওরা আমার সঙ্গে বসে না, কিন্তু আজ তিনজনই এসে আমার আর বেলকের সঙ্গে বসল। এর পরে দেখি মালাই আর তিলাইও এসেও হাজির। কিন্তু খাবার কোথায় ? অনেক সময় সাইবোক খাবার নিয়ে আসে, অনেক সময় সাইবোকের সাথি রোবোক আসে। আজ এই দুজনের কেউই নেই। আমি বললাম, ‘জেমলাতে কী পাওয়া গেছে সেই নিয়ে ওরা নিশ্চয় সভা করছে।’  

সব মিলিয়ে খাবার ঘরে প্রায় পঁচিশজন ছেলেমেয়ে। কেউ হইচই করে কথা বলছে না, কিন্তু সবার নিচুস্বরের কথা এক হয়ে একটা গুঞ্জন তুলছে। এখানেও একটা বিশাল জানালা দিয়ে নিচে জেমলা দেখা যাচ্ছে। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছয়-সাতজন আঙুল তুলে জেমলার বিভিন্ন জায়গাকে একে অপরকে দেখাচ্ছে―নদী, বড় পাহাড়, সমুদ্র। মেঘে ঢেকে আছে একটা বিরাট অংশ। এইসব দেখতে দেখতে আমার খিদে পেয়ে গেল, সবারই বোধহয় একই অবস্থা। খিদের চোটে জেমলাতে যে আজ কী ঘটেছে সেটা অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করবারও ইচ্ছে রইল না। খাবারের ঘরটার পাশেই একটা বড় দরজা, সেটা দিয়ে একটা সম্মেলনকক্ষে যাওয়া যায়। সেই সম্মেলন কক্ষের দরজাটা খুলে গেল। মা ও সিয়েনাসহ পাঁচজন বড়মানুষ ঢুকল, তার মধ্যে রয়েছে আমাদের মহাকাশযানের অধিনায়ক ড্রেগলস। ড্রেগলস ড্রেগলসের মতোই দেখতে, অর্থাৎ তার নামটা যেমন ভয় জাগানোর, চেহারাটাও তেমন। আমরা তাকে সবসময় এড়িয়ে চলতাম। প্রায় দুমিটার লম্বা, চৌকো মুখ, থুঁতনিও কেমন জানি চ্যাপ্টা, তবে চওড়া। বড় দুটো চোখের ওপর ঘন ভুরুজোড়া, ছোট করে ছাঁটা চুল সমতল মাথার সঙ্গে লেগে আছে।

ড্রেগলস ঘরে ঢোকা মাত্র সব গুঞ্জন বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হবারই কথা, ওকে আমরা সবাই ভয় পেতাম। করিডরে দেখা হলে মুখ নিচু করে চলে যেতাম। ড্রেগলসও আমাদের  কোনও সম্বোধন করত না, হ্যালো, হাই, সুপ্রভাত এসব কিছুই বলত না। আমরা ধরে নিয়েছিলাম মহাকাশযানের যে সার্বিক দায়িত্বে আছে তার বোধহয় এরকমই হবার কথা―খুব কঠিন এক লোক, হাসি ঠাট্টা করা তার সাজে না। আরও একটা ব্যাপার তার  কোনও ছেলেমেয়ে ছিল না,  কোনও সঙ্গীও ছিল না। ছেলেমেয়ে থাকলে বা স্ত্রী, বান্ধবী ইত্যাদি থাকলে সে হয়তো আমাদের সঙ্গে সহজে মিশতে পারত এরকম একটা ধারণা আমাদের ছোটদের মধ্যে ছিল। যাইহোক ড্রেগলসের খাবার ঘরে আগমন মানে আমাদের খাবার দিতে  আরও দেরী হবে এটা ধরে নিলাম। বোঝাই যাচ্ছে এতে আমার খুশি হবার  কোনও কারণ নেই। সবার চোখেই দেখলাম এরকম ভাব, উফ, এ লোকটা আবার এখানে কেন, পেটে তো খিদেয় ছুঁচো ডন-বৈঠক দিচ্ছে। ছুঁচো আমরা কেউ চোখে দেখিনি, কিন্তু ছবিতে তার যেরকম চেহারা দেখেছি তাতে তাকে বেশিক্ষণ রাখাটা সমীচীন হবে না বলেই মনে হয়।

দেখলাম ড্রেগলস কিছু বলার জন্য তোড়জোড় করছে, কিন্তু মনে হল ঠিক কী করে শুরু করবে বুঝে পাচ্ছে না। তার পাশে অন্যদের সঙ্গে মা আর সিয়েনাও দেখলাম একটু ভয়াতুর। তবে ড্রেগলস যে ছোটদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাবে সেটা আমাদের কল্পনাতেও আসে নি। অন্য একটা টেবিলে দেখলাম মিলা, রিনা আর লেনাক ফিসফিস করছে আর তাদের পাশে বসে ক্লেভান হিহি করে হাসছে। হাসিটা ড্রেগলসের কান পর্যন্ত যে পৌঁছেছে সেটা সম্বন্ধে নিশ্চিত হলাম যখন সে একটু কেশে বলতে শুরু করল, ‘ছেলেমেয়েরা, তোমরা অনেকেই জেমলাতে গিয়েছ। জেমলা অনেকটা আমাদের পৃথিবীর মতোই। আমরা ভেবেছিলাম জেমলাতে স্থায়ী আস্তানা গাড়তে পারব, এটা হবে নতুন পৃথিবী। এখানে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ একটু বেশি, সেটা ক্ষতিকর হলেও আমরা তাকে শোধন করতে পারতাম। এখানে লতা রয়েছে, ফুল আছে। সবচেয়ে বড় কথা হল এর মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর শতকরা ৬০ ভাগ। পৃথিবীর মতো সমস্ত গুণ নিয়ে এরকম আর  কোনও গ্রহের কথা আমাদের তথ্যকেন্দ্রে নেই।’

মনে হল ড্রেগলস একটা বড় বক্তৃতা দেবার জন্য তোড়জোড় করছে। এসব মনোযোগ দিয়ে শোনার মতো অবস্থা আমাদের কারও ছিল না, সবাই উশখুশ করতে লাগল। কিন্তু মা’র দিকে চোখ পড়তে দেখলাম সে আমার দিকে খুব শাসনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেটা দেখে আমি আমার পিঠ সোজা করে ড্রেগলসের ওপর চোখ রাখলাম, এসব করতে গিয়ে ড্রেগলসের কিছু কথা আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। যখন আবার মনোযোগ দিলাম, শুনলাম সে বলছে, ‘জেমলাতে আমরা একটা ভয়াবহ জিনিস আবিষ্কার করেছি যার জন্য খুব শীঘ্রই আমাদের জেমলার কক্ষপথ ত্যাগ করতে হচ্ছে।’ 

এটুকু শুনেই তো ভয়ে আমার পাদুটো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কী এমন জিনিস আমরা জেমলায় দেখেছি যার জন্য আমাদের পালাতে হবে ? ওদিকে ড্রেগলসও দেখলাম তার তার পাদুটোকে এদিক ওদিক সরাচ্ছে, এমন যেন তার শরীরের ভর একবার ডান পা আর একবার বাঁ পায়ের ওপর রাখছে। ওরও কি পা আমার মত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে ?

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ড্রেগলস বলতে আরম্ভ করে, ‘ছেলেমেয়েরা, পৃথিবীর মতো আর একটি গ্রহ এই গ্যালাক্সিতে নেই। এর সুনীল সাগর, ধবল মেঘ, নরম মাটি, সবুজ বনের সমারোহ গ্যালাক্সির অন্ধকারে আর একটিও পাওয়া যাবে না।  সেখানে মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে পরিশ্রম করে তাদের মেধায় ও শ্রমে খুবই উন্নত এক সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সেই সভ্যতা গ্যালাক্সির অন্যান্য উন্নত জীবের ঈর্ষার কারণ হয়েছে। তাই বহুকাল ধরে পৃথিবী গ্যালাক্সির নানান সভ্যতার আগ্রাসনের মুখে পড়েছে। এগুলোকে ঠিক সভ্যতা বলা ঠিক হবে না, বরং এদেরকে অসভ্যতা নামে অভিহিত করা উচিত। এমনই একটি অসভ্য সমাজের নাম হলো আউরেউরগথ। এদের নামটা উচ্চারণ করা যতই সহজ হোক না, এরা আমাদের গ্যালাক্সির সবচেয়ে বর্বর সভ্যতা।’

‘আউরেউরগথ’―কি খটমট নাম রে বাবা! নাম শুনেই ভয় পেয়ে গেলাম। আমরা একে অপরের দিকে চাইলাম। না, উচ্চারণ করা একেবারেই সহজ নয়। আমি নিজের অজান্তেই বলে উঠলাম, ‘আউরেউরগথ।’ হয়তো একটু জোরেই বলে ফেলেছিলাম। দেখি ড্রেগলস কথা থামিয়ে আমার দিকে চাইছে। সকলেই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তো লজ্জায় একেবারে পারলে মেঝের সঙ্গে মিশে যাই। মাথা নিচু করে আড়চোখে মা’র দিকে তাকালাম, দেখি মা মিটিমিটি করে হাসছেন। আমি তো আশ্চর্য! মা তাহলে রাগ করেনি।   

ড্রেগলস আবার গলাটা পরিষ্কার করে নিল। বলতে আরম্ভ করে, ‘আউরেউরগথের কাজই হলো উন্নত সভ্যতার গ্রহগুলোতে আক্রমণ করে তাদের প্রকৌশল লুট করা। শুধুমাত্র প্রকৌশলের মধ্যে তাদের তাণ্ডব সীমায়িত থাকলেও হতো, কিন্তু তারা সেই গ্রহের অধিবাসীদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। অপহরণের পরে তাদের কী হয় আমরা জানি না, হয়তো তাদের দাস বানানো হয়। দাসপ্রথা কী সে সম্বন্ধে তোমাদের অনেকেরই ধারণা নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে এককালে এই ন্যক্কারজনক অমানবিক প্রথার প্রচলন ছিল। এমনও হতে পারে …’ 

পরের কথাগুলো বলতে ড্রেগলস ইতস্তত করে, পাশে দাঁড়ানো অন্যান্য বড়দের দিকে চায়, তারপর বলে, ‘…আউরেউরগথরা অন্য গ্রহের অধিবাসীদের হত্যা করে তাদের পাশবিক আনন্দ …,’ বাক্যটা ড্রেগলস শেষ করতে পারে না। ‘পাশবিক’ মানে কী, আমি ভাবি। তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলে ক্যাপ্টেন নেনা, নেনা বেশ সশব্দে গলা খাঁকারি দেয়। ড্রেগলস নেনার দিকে তাকায়, বোঝা যায় ড্রেগলসের কথা নেনার পছন্দ হচ্ছে না। দেখলাম মা’র মুখটাও কেমন অন্ধকার, মারও ড্রেগলসের কথা পছন্দ হয়নি। নেনা হলো বেলকের মা, বেলক তার সমস্ত অনুসন্ধিৎসা আর সাহস নেনার কাছ থেকেই পেয়েছে।

ড্রেগলস তার বাক্যটা আর শেষ করে না। বলে, ‘আমরা আমাদের এই যাত্রায় আউরেউরগথদের সম্মুখীন যাতে না হই তার জন্য সর্বরকম চেষ্টা করেছি। দু-একবার আমাদের রাডারে তাদের মহাকাশযানের চিহ্ন ধরা পড়েছিল, আমরা সুকৌশলে সেগুলো এড়িয়ে গেছি। কিন্তু আজ জেমলাতে তাদের একটা কেন্দ্র আমরা আবিষ্কার করেছি। যদিও সেই কেন্দ্রে কোনও আউরেউরগথ নেই, কিন্তু জেমলার কক্ষপথে আমাদের উপস্থিতি নিশ্চয় সেই কেন্দ্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউকে জানিয়ে দিয়েছে। আমাদের এই মুহূর্তে জেমলার কক্ষপথ ত্যাগ করতে হবে, তোমরা তোমাদের ঘরে ফিরে যেয়ে মহাকাশযানের ত্বরণের জন্য প্রস্তুতি নাও।’  

আউরেউরগথ! এতদিন আমাদের কেন তাদের সম্বন্ধে বলা হয়নি। তারপরই মনে হলো আমাদের মন যাতে অশান্ত না হয়ে সেজন্যই আমাদেরকে আউরেউরগথ সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। আউরেউরগথ তাহলে জেমলা পর্যন্ত এসে গেছে। ভয়ে আমি কেঁপে উঠলাম, সেটা বেলকের দৃষ্টি এড়াল না, সে আমার হাতের ওপর ওর হাত রেখে আশ্বাস দিতে চাইল। কীরকম দেখতে আউরেউরগথরা ? আমি ভাবলাম। তারা কি অকটোপাসের মত দেখতে ?

এদিকে তাশু, মালিয়া আর আশুর মুখ দেখলাম একদম চুপশে গেছে, সেটা ভয়ে না খিদেতে বোঝা গেল না। তবে তাশু একটু জোরেই বলে ফেলল, ‘খিদে পেয়েছে।’ ক্যাপ্টেন নেনা সামনে এগিয়ে এল, বলল, ‘ছেলে মেয়েরা, তোমাদের একটা করে খাবারের প্যাকেট দেয়া হবে, সেটা নিয়ে তোমরা ঘরে চলে যাও। ঘরে গিয়ে, ঘরের যে সমস্ত জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেগুলো আলমারিতে তুলে তালা দেবে। মহাকাশযানের ত্বরণ-চেয়ারটিতে বসে সিটবেল্ট বেঁধে নেবে। এর আগে তোমাদের খাবারের জন্য দশ মিনিট সময় দেয়া হলো। আন্তারেস ১৫ মিনিটের মধ্যে জেমলার কক্ষপথ ত্যাগ করবে।’

নেনার কথা শেষ হতে না হতেই রান্নাঘরের দরজা খুলে গেল, আমরা নেনার ঘোষণার অর্থ বোঝার সময় পেলাম না। সাইবোক আর রোবক একগাদা খাবারের প্যাকেট নিয়ে ঢুকে প্রতিজনকে একটা করে প্যাকেট দিতে আরম্ভ করল। আমরা প্যাকেট নিয়ে দৌড় দিলাম। দৌড় দৌড়, করিডর দিয়ে, আমার সঙ্গে বেলকও দৌড়াচ্ছিল। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বেশ চিন্তিত মনে হলো। আমার ঘরের আগেই বেলকের ঘর, ও ‘বাই’ বলে ঢুকে গেল। আমার ঘরের সামনে আসা মাত্র দরজা নিজ থেকে খুলে গেল। আসলে এর মধ্যে তিনটে ঘর। একটা আমার, একটা বাবা মা’র, আর একটা পড়াশোনা করার, খেলার। বাঁদিকে বাবা মা’র ঘর, ডানদিকে প্রথমে পড়াশোনার ঘর, তারপর আমার ঘর, মাঝখানে একটা করিডর। শুনেছি পৃথিবীর ছোট ছোট ফ্ল্যাটবাড়ি নাকি এরকমই হয়।

অধ্যায় দুই.

আমি খেতে আরম্ভ করি। এক ধরনের মাংসের চপ, সবুজ শবজি, রাইদানার পাঁউরুটি। সঙ্গে কমলার রস। এই মহাকাশযানে মাংস তৈরি হয় রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়যন্ত্রে। যে ঘরটায় সেগুলো তৈরি হয় সেটার নাম হল ‘প্রোটিন ফ্যাক্টরি’। আর শবজি ও শস্য তৈরির জন্য বড় একটি ঘর আছে, সেখানে অতিবেগুনী আলো জ্বলে, পৃথিবী থেকে আনা মাটিতে গাছ বেঁচে থাকে, তাতে কমলা ফলে। সেটাকে বলা হয় ‘উদ্ভিদ বাগান’। খিদে পেয়েছিল, পাঁচ মিনিটে খাওয়া শেষ করে বেল্ট বেঁধে তৈরি। কিন্তু দেখলাম নিয়ন্ত্রণকক্ষের লোকেরা তখনও ছোটাছুটি করছে। এর মধ্যেই মা’র ফোন এল। ফোনে মা’র মুখ ভেসে উঠল যদিও তাকে আমি টেলিভিশন স্ক্রিনে নিয়ন্ত্রণকক্ষের মধ্যে দেখতে পাচ্ছিলাম।

মা জিজ্ঞেস করল আমার খাওয়া হয়েছে কিনা, সিটবেল্ট বেঁধে বসেছি কিনা। মহাকাশযান জুড়ে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল, এর সাথে একটা ঘোষণা, নেনার গলা, ‘সবাই প্রস্তুত হও, আন্তারেস আর দু’মিনিটের মধ্যে কক্ষপথ ত্যাগ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে।’ এই ঘোষণার সাথে সাথেই আন্তারেসের বিশাল ইঞ্জিন গর্জে উঠ্ল এমন যেন এক দানব জেগে উঠেছে। আমি জানি কার হাতের স্পর্শে সেই বিশাল দানব গজরাচ্ছে, আমার বাবার আঙুলের স্পর্শে, বাবা হল এই মহাকাশযানের প্রধান প্রকৌশলী।

মা’র ফোনের মধ্যেই বাবা ফোন করল। আমার বাবার নাম সামি। বাবা আন্তারেসের যে জায়গায় কাজ করে সেটা বেশ কঠিন জায়গা। মহাকাশযানের কেন্দ্রীয় অক্ষের কাছে যেখানে  কোনও ধরনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নেই, কারণ সেই জায়গাটা ঘোরে না। মা’র প্রশ্নগুলোই বাবা করল, খেয়েছি কিনা, সিটবেল্ট বেঁধেছি কিনা। এইসব জিজ্ঞেস করতে করতেই দেখলাম বাবা বিশাল ইঞ্জিনঘরের ত্বরণ-চেয়ারে বসে বেল্ট বাঁধছেন। মা দেখলাম একটু উদ্বেগের সঙ্গে বাবার সিটবেল্ট বাঁধাটা দেখছে। বাবা মাকে বলল, ‘চিন্তা কর না, ইঞ্জিন খুব ভাল কাজ করছে।’

ড্রেগলস এই মহাকাশযানের অধিনায়ক হতে পারে, কিন্তু আমার বাবাকে ছাড়া আন্তারেস এক চুলও নড়তে পারবে না। আন্তারেসের হৃদযন্ত্রকে চালু রাখাই ছিল তার প্রধান কাজ, আমার বন্ধুরা তাই বাবাকে ভাবত এক যাদুকর যে যাদুকর তার অসীম জ্ঞানে মহাকাশযানের গভীর গহ্বরে বিশাল ইঞ্জিনের প্রাণ সঞ্চার করে। পৃথিবী থেকে দশ আলোকবর্ষ দূরে, কোটি কোটি কিলোমিটার পার হয়েও সেই ইঞ্জিন গরজে চলেছে। কিন্তু সেই ইঞ্জিন থেকে যে তেজস্ক্রিয় কণা ও রশ্মি বের হয় তার জন্য মা সবসময় বাবার জন্য চিন্তা করত। বাবা মা’কে সান্ত্বনা দিত, বলত, ‘আমি যে পোষাক পরে কাজ করি তাতে শতকরা ৯৯ ভাগ তেজস্ক্রিয়তা আটকে দেয়া যায়।’ 

মা বলত, ‘আর বাকি এক ভাগ ?’

‘আর বাকি এক ভাগ ওষুধের ওপর। আমি তো রোজই ওষুধ খাচ্ছি যাতে শরীর থেকে ন’ কোষগুলো সরিয়ে দেয়া যায়।’

মা এতে ভরসা পেত না। তেজস্ক্রিয়তা শরীরের কোষের ক্ষতি করতে পারে, নির্দিষ্ট ওষুধ সেগুলোকে চিহ্নিত করে মেরে ফেলতে পারে। আমি জানতাম মৃত কোষ শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, কিন্তু নষ্ট কোষ যত যন্ত্রণার মূল। একটি নষ্ট কোষ থেকে দুটি, দুটি থেকে চারটি এরকমভাবে অসংখ্য নষ্ট কোষের জন্ম হতে পারে, আর একেই নাকি বলে ক্যান্সার। মা বলতেন পৃথিবীতে নাকি ক্যান্সার যাতে না হয় সেজন্য অনেক বংশগতিবিদ্যার চর্চা হয়। ‘বংশগতিচর্চা’ মানে জেনেটিক্স, শরীরের কোষের ভেতর জিনকে নাকি নানাভাবে বদলান যায়, সেসব করে ক্যান্সারকে বিদায় করা হয়েছে। কিন্তু এই মহাকাশযান প্রতিনিয়তই মহাকাশ থেকে ছুটে আসা শক্তিশালী কণিকার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেই কণিকারা মানুষের শরীরের ক্ষতিসাধন করতে পারে। এর জন্য আন্তারেস যানের চারদিকে সবসময় একটা প্রবল চুম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। সেই চুম্বকক্ষেত্র তড়িৎ-আধানযুক্ত কণিকাদের মহাকাশযান থেকে দূরে পাঠিয়ে দেয়। কোথা থেকে আসে সেই দ্রুত কণিকারা ? আমাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষক কারা ওয়ার্দার বলেন, সেগুলো আসে বড় তারাদের বিস্ফোরণ আর নিউট্রন নক্ষত্রদের থেকে।    

এর মধ্যেই নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে শোরগোল শোনা গেল। বাবা মা দুজনেই ফোন ছেড়ে দিল। সামনের স্ক্রিনে দেখলাম নেনা, ড্রেগলস আর বাকিরা দাঁড়িয়ে কক্ষের বড় স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনটায় জেমলা গ্রহের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। বহু দূরে দিগন্ত, সেই দিগন্তের বায়ুমণ্ডল লাল, আমাদের পেছনে মিহির তারা অস্ত যাচ্ছে। কিন্তু এছাড়াও দিগন্তের ধারে একটা তারা জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু সেটা যে তারা নয় সেটা নিয়ন্ত্রণকক্ষের সবার ভয়ার্ত দৃষ্টি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। ড্রেগলসের গলা শোনা গেল, সে চিৎকার করছে, ‘তমাল, ওদের এখানে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে ?’ তমাল এক জাহাজের সুরক্ষার ব্যাপারটা দেখে। সে একাধারে বিজ্ঞানী আর সেনা-অফিসার। তমাল পনেরো সেকেন্ড সময় নিল, কম্প্যুটার ঘেঁটে উত্তর দেয়, ‘ওরা যদি এই গতি বজায় রাখে তাহলে কুড়ি থেকে পঁচিশ মিনিট।’

ওরা কারা ? ভয়ে সিঁটিয়ে যাই আমি চেয়ারের সাথে ? আউরেউরগথ ? ঐ উজ্জ্বল আলোটা কি আউরেউরগথদের মহাকাশযান ? কুড়ি মিনিটের মধ্যে নিশ্চয় আমরা কক্ষপথ ত্যাগ করতে পারব, কিন্তু তার আগে যদি ওরা আমাদের দিকে লেজার, মিজাইল বা রকেট-জাতীয় কিছু নিক্ষেপ করে ? সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার তো  কোনও ব্যবস্থা নেই আমাদের যানে। নাকি আছে ? ছোটদের তো অনেক কথাই বড়রা বলে না।

মিহির গ্রহের দিগন্তের তারাটা উজ্জ্বল থেক উজ্জ্বলতর হতে থাকে। আর একটি মহাকাশযান ? আমার এই বারো বছরের জীবনের অন্য  কোনও যান আমাদের পথে পড়েনি, এই অনন্ত মহাকাশে আমরা একাই চলেছিলাম। নিশ্চয় এটা একটা মহাকাশযান, কিন্তু সেটা যে আউরেউরগথদেরই হবে সেটা সম্বন্ধে ড্রেগলস এত নিশ্চিত হলো কেমন করে ?

দেখলাম ড্রেগলস বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। ইঞ্জিন তৈরি। এরপর নেনা ড্রেগলসকে কী যেন বলল। তারপরই নেনার কথা আমার ঘরের লুকানো স্পিকারে ধ্বনিত হলো, ‘আন্তারেসের অভিযাত্রীরা, প্রস্তুত হও। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা কক্ষপথ ত্যাগ করব।’

এর পরে কী হবে আমি জানতাম। আমরা যেখানে থাকি, সেই ঘুরন্ত অংশ ধীরে ধীরে তার ঘূর্ণন বন্ধ করে দেবে, উচ্চ ত্বরণের সময়  কোনও কিছুর ঘোরা চলবে না। নেনা বলতে থাকে, ‘কক্ষপথ ত্যাগ করার আগে আমরা মহাকাশযানের মূল চক্রের ঘূর্ণন বন্ধ করে দেব, এর ফলে যাত্রীরা ভারহীন হয়ে যাবে। আশা করি তোমরা সবাই সিটবেল্ট বেঁধেছে। এরপরে সিট স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আমাদের জাহাজ যেদিকে ছুটবে সেদিকে ঘুরে যাবে। শুরুতে মহাকাশযানের ত্বরণ হবে প্রতি বর্গ সেকেন্ডে দশ মিটার যা কিনা পৃথিবীর বুকে অভিকর্ষজ ত্বরণের সমান। এর ফলে যাত্রীরা আবার তাদের ওজন ফিরে পাবে। এরপরে আমাদের ত্বরণ প্রতি বর্গ সেকেন্ডে কুড়ি মিটার হবে, তখন আমাদের ওজন দ্বিগুণ হবে।’

স্ক্রিনে দেখতে পেলাম ড্রেগলস, নেনা আর  আরও অনেকে চেয়ারে বসে তাদের স্বয়ংক্রিয় সিটবেল্টটা চালু করছে। একটা যান্ত্রিক ভোঁতা শব্দ বাইরে থেকে ভেসে এল, আমাদের বাসস্থান চক্রটা তার ঘূর্ণন থামাচ্ছে। আমি জানি এই থামানোর কাজটা সহজ নয়, এত বিশাল একটা স্থাপনার গতিজাড্য অনেক, তাকে থামাতে হলে নিজেকে মহাশূন্যে তার ঘূর্ণন বন্ধ করতে চক্রর চারদিকে চারটি রকেট ইঞ্জিন ঘূর্ণনের উল্টোদিকে কাজ করে। আমাদের বাসস্থানের চক্রাকার গতি যত কমে এল, আমার ওজন তত কমা শুরু হলো। চার মিনিট মতো সময় লাগল চক্রটার থামতে। তৎক্ষণে আমি নিজের ভরহীন অবস্থাটা ভালোই টের পাচ্ছিলাম। সিটবেল্ট না বাঁধা থাকলে তো ঘরের মধ্যে ভেসে ভেসেই বেড়াতে পারতাম।

নেনার গলা ভেসে আসে, ‘রওনা হতে এক মিনিট।’        

ইঞ্জিনের গর্জন  আরও প্রকটিত হয়। থর থর করে কাঁপে মহাকাশযানের বিশাল দেহ। এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের আগে অনেকবার হয়েছে, কিন্তু এই প্রথমবারের মতো আমরা ছোটরা একা একা নিজেদের ঘরে বসে এই ত্বরণের মধ্যে দিয়ে যাব। অন্য সময় আমার সবাই নিয়ন্ত্রণকক্ষের পাশেই একটা বড় ঘরে একসঙ্গে বসি ত্বরণের সময়। কিন্তু আজ সময় ছিল না সেই কক্ষে যাবার। অন্যসময় আমি এতে ভয় পাই না। কিন্তু আজ আন্তারেসকে ধরতে আউরেউরগথদের একটা জাহাজ আমাদের দিকে ছুটে আসছে। আমি সেটাকে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু মা নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে নিশ্চয় ওদের দেখতে পাচ্ছে, না হলে এত তাড়াহুড়ো করে আমরা কেন জেমলা ছেড়ে যাব, বিশেষত যখন জেমলা অনেকটা পৃথিবীর মতোই দেখতে ছিল। আমরা তো এখানে থাকতেই পারতাম।   

আমি জানতাম জেমলা তার সূর্য মিহিরের চারদিকে সেকেন্ডে ৪০ কিলোমিটার বেগে চলছে। আন্তারেস যেহেতু জেমলার কক্ষপথে স্থাপিত সেজন্য আন্তারেসের গতি ইতোমধ্যে সেকেন্ডে ৪০ কিলোমিটার হয়ে আছে, কিন্তু মিহির তারার মাধ্যাকর্ষণ থেকে মুক্তি পাবার জন্য আন্তারেসের সেকেন্ডে অন্তত ১০০ কিলোমিটার গতি পেতে হবে। সেটা এই মহাকাশযানের জন্য এমন কিছু নয়, কারণ প্রয়োজনে আন্তারেস আলোর গতির এক দশমাংশ, অর্থাৎ সেকেন্ডে ৩০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি সঞ্চার করতে পারে, তবে সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য। 

আবার নেনার কণ্ঠ, ‘প্রস্তুত! দশ সেকেন্ড কাউন্ট-ডাউন। দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক, শূন্য―শুরু।’

থরথর করে কাঁপে মহাকাশযান। আমার ভয় করে, এই প্রথমবার মা বা বাবা কেউ সঙ্গে নেই, দু হাত দিয়ে চেয়ারের নিচটা চেপে ধরি। ধীরে ধীরে আমার শরীর চেয়ারের পেছনের দিকে চেপে বসে। সামনের স্ক্রিনে জেমলা গ্রহ ভেসে ওঠে―নীল, সবুজ আর কমলা রঙের সমন্বয়। প্রথমে মনে হলো গ্রহটি যেন আমাদের পিছু নিয়েছে, তার আয়তন কমছে না। তারপর খুব ধীরে সেটি ছোট হতে থাকল। মা’র মুখ ভেসে উঠল স্ক্রিনের এক কোনায়― ‘ভালো আছ তো, শোগি মা ?’ আমি বললাম, ‘আছি, তুমি কখন ঘরে আসতে পারবে ?’ মা বললেন, ‘ আরও পাঁচ-ছ ঘণ্টা লাগবে। তুই এর মধ্যে চেয়ার ছেড়ে উঠিস না। দেখ  কোনও ছবি-টবি পাস কিনা এর মধ্যে দেখার মত।’

আউরেউরগথরা পিছু নিয়েছে, এর মধ্যে কি আর ছবি দেখার অবস্থা আছে! তবু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করলাম, ‘মিরা, ভালো একটা ছবি দেখাও তো যেটা আমি এখনো দেখি নি।’ স্ক্রিনে একটি বেশ বয়স্কা মানুষের মুখ ভেসে উঠল। ওর নাম হলো মিরা। মিরা বলল, ‘তোমাকে কতবার করে বলেছি  কোনও কিছু চাইবার সময় বলতে হয় ‘অনুগ্রহ করে’।’ বললাম, ‘ভুল হয়ে গেছে, তোমাকে তো সবসময় দেখতে পাইনি।’ মিরা হাসল, তারপর বলল, ‘আমি ঠাট্টা করছিলাম, ‘অনুগ্রহ করে’ বলতে হবে না। তোমাকে মনে হয় আমার নাতনী।’

কেমন করে একটা ইলেকট্রনিক মস্তিষ্ক আমাকে নাতনি ভাবতে পারে সেটা নিয়ে আমি  কোনওদিন মাথা ঘামাই নি। কিন্তু স্ক্রিনে মিরার মুখটায় এমন একটা সহৃদয়তা আছে সেটা সবাইকে কাছে টানবে। তার গালে ও কপালে পোড়া চামড়া কুঁচকেছে, কপালের ওপরে সাদা চুল। সে বলে, ‘মা বুঝি ব্যস্ত ? আমাদের মহাকাশযান জেমলা গ্রহ ছেড়ে চলে যাচ্ছে ?’ আমি বললাম, ‘সবে ছাড়ছে, আউরেউরগথরা আমাদের পিছু নিয়েছে।’

আউরেউরগথ নামটা শুনে মিরার মুখটা কেমন জানি অন্ধকার হয়ে গেল। ‘আউরেউরগথ ?’ সে যেন স্বগোতিক্ত করল। তারপর বলল, ‘আউরেউরগথরা এখানে কেমন করে এল ?’ মিরার থমথমে মুখ দেখে আমি খুব ভয় পেলাম, কিন্তু আমার ভয়ার্ত মুখ দেখেই মিরা তাড়াতাড়ি বলল, ‘ওঃ,  কোনও চিন্তা কর না, আন্তারেস খুব শক্তিশালী মহাকাশযান, ওরা আমাদের কিছু করতে পারবে না।’ এটুকু বলে মিরা কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়, আমি জানি ঐটুকু সময়ের মধ্যে ও আন্তারেসের সমস্ত কথাবার্তা, বিভিন্ন স্ক্রিনের ভিডিও সব দেখে নিল মহাকাশযানের ইলেকট্রনিক তথ্যলাইনে, ব্যাপারটাও বুঝে নিল। হয়তো মা কী করছে এখন সেটাও দেখল, তারপর আমাকে বলল, ‘ঠিক আছে, আমরা একটা সিনেমা দেখি ?’ আমি বললাম, ‘আমাকে পৃথিবীর  কোনও পুরোনো চলচ্চিত্র দেখাও।’ মিরা বলল, ‘তুমি কি ‘আশ্চর্যদেশে অ্যালিস’ ছবিটা দেখেছ ?’ আমি বললাম, ‘বোধহয় দেখেছি, কিন্তু আমি ওরকম রূপকথা জাতীয় কিছু দেখতে চাই না। আমাকে বরং কোনও অ্যাডভেঞ্চারের ছবি দেখাও।’ মিরা হেসে বলে, ‘অ্যালিসের কাহিনী ঠিক রূপকথা নয়, তবে ঠিক আছে, তোমাকে দেখাই ‘নেপচুনে অভিযান’। আগে দেখেছ কখনও ?’

না, ‘নেপচুনে অভিযান’ আমি আগে দেখি নি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কত পুরনো বল তো  ? তুমি তো আবার সেই সেকেলে সব ছবি পছন্দ কর।’ মিরা হাসে, বলে, ‘তা শ’পাঁচেক বছর তো হবেই। দেখ, ভালো লাগবে।’

নেপচুনের অভিযান শুরু হলো, কেমন করে একদল মহাকাশযাত্রীরা নেপচুনের উপগ্রহ ট্রাইটনের পাশ দিয়ে গিয়েছিল, তারপর তাদের একজনের মাথা খারাপ হলো, তাতে কী সব বিপর্যয় হলো, ইত্যাদি। আধঘণ্টা দেখে মিরাকে বললাম, ‘এসব আমার একেবারেই পছন্দ নয়।’ এই বলতে না বলতেই মহাকাশযান ভীষণ ঝাঁকুনি খেল, স্ক্রিনে মা’র মুখ ভেসে উঠল, উদ্বিগ্ন। ‘শোগি মা, ঠিক আছ তো ?’ আমি বললাম, ‘কি হচ্ছে মা ?’ মা বলল, ‘আউরেউরগথরা আমাদের পেছন ছাড়েনি। তারা লেজার দিয়ে আমাদের ইঞ্জিন বিকল করে দেবার চেষ্টা করছে।’ মা’র কথা শেষ হতে না হতেই আমি বুঝলাম আন্তারেস তার গতিপথ বদলাচ্ছে, আমার চেয়ার আমাকেসহ ঘুরে গেল, আমার পিঠ সেঁটে গেল চেয়ারের সঙ্গে, আমরা খুব জোরে ত্বরাণ্বিত হচ্ছি। বুঝলাম এই ত্বরণটা অধিনায়ক ড্রেগলসের পরিকল্পনায় ছিল না। বাবার জন্য খুব চিন্তা হলো, বাবা তো ইঞ্জিনের ওখানেই বসে আছেন। মা’কে জিজ্ঞেস করলাম বাবার কথা। মা বলল, ‘চিন্তা করিস না, শোগি। বাবা যে ঘরে আছে সেটা খুব মজবুত জায়গা, লেজার কিছু করতে পারবে না।’

‘আউরেউরগথদের মহাকাশযানটা কি স্ক্রিনে দেখান যাবে ?’ প্রশ্ন করি মা’কে। ‘না’রে, এখন এসব দেখিয়ে তোদেরকে  আরও ভয় পাইয়ে দিতে চাই না। চিন্তা করিস না, সব ঠিক থাকবে।’ এদিকে জাহাজের ত্বরণ আমাকে আর কথা বলতে দিচ্ছিল না, মা’র মুখটাও দেখলাম কেমন চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে। মা ফোন রেখে দিলেন।

আমার স্ক্রিনে মহাকাশের কালো ভেসে উঠল, আমরা যেদিকে যাচ্ছি সেদিকের চিত্র। নিকষ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে কিছু তারা, আমি জানি আমরা যাচ্ছি কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলীর বাহুর দিকে। আবারও একটা বড় ঝাঁকুনি, আউরেরগথরা নিশ্চয় ইঞ্জিনে আঘাত করছে। মিরাকে ডাকলাম, তার মুখ স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা ঠিক আছে তো ?’ মিরা তার দু-চোখ মুহূর্তমাত্র বুঁজল, তারপর চোখ খুলে বলল, ‘ইঞ্জিনের অংশ খুব সুরক্ষিত,  কোনও ক্ষতি হয়নি, তোমার বাবাও ভালো আছেন।’

‘কিন্তু ওরা শুধু ইঞ্জিনকে বিকল করে দিতে চাইছে কেন ?’ প্রশ্ন করি।

মিরার চোখে একটা ত্রাসের চিহ্ন সেকেন্ডখানেক দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। সে বলল, ‘শোগি, আউরেউরগথরা গ্যালাক্সিজুড়ে ঘোরে অন্য সভ্যতার মহাকাশযান দখল করার জন্য, সেগুলো যাতে ব্যবহার করতে পারে। আর সেই যানের মানুষদের বা অন্য গ্রহান্তরীদের আটক করে দাস বানায়। সেজন্য তারা আন্তারেসের ইঞ্জিন নষ্ট করে দিতে চাইছে যাতে এই মহাকাশযানটি মানুষসহ তারা আটক করতে পারে।’

মিরার কথাটা শেষ হতে না হতেই আমার শরীর প্রচণ্ডভাবে সিটের সঙ্গে সেঁটে গেল, বুঝলাম আন্তারেস  আরও বেশি ত্বরাণ্বিত হচ্ছে, গতিবেগ বাড়ছে খুব দ্রুত। মনে হলো প্রতি সেকেন্ডে অন্তত ৩০ মিটার/সেকেন্ড করে গতিবেগ বাড়ছে, অর্থাৎ পৃথিবীবুকের ত্বরণের তিনগুণ, তার মানে আমার ওজনও বেড়েছে তিনগুণ। আউরেউরগথরাও কি এই ত্বরণের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে ? আর আমরাও কি এই তিনগুণ ওজন বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারব ?

মিরা বলল, ‘আউরেউরগথ মহাকাশযান পিছিয়ে পড়ছে।’

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

অধ্যায় তিন.

আন্তারেস সে যাত্রায় আউরেউরগথদের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিল, কিন্তু জেমলার মতন অমন সুন্দর একটা গ্রহ থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম। মিহির তারার সৌরজগৎ ছেড়ে আসার পরে আমরা বহুদিন অন্ধকারে চললাম। নেনা আমাদের জানাল যে, সামনে আর একটি ছোট লাল বামন তারা পাওয়া গেছে, তার চারিদিকে একটি সৌরমণ্ডলীও আছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে  আরও একটা বছর লাগবে। সেই একটা বছরে আমি অনেক কিছু শিখলাম। কারা ওয়ার্দারের কাছ থেকে পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যা, মা’র কাছ থেকে পিয়ানো আর গণিত, বাবার কাছ থেকে গিটার আর প্রকৌশলবিদ্যা, এসবের ওপর আবার পরীক্ষা দিতে হতো স্কুলে। সিয়েনা নিত আমাদের পরীক্ষা। এতদিন পরে মনে হয় ঐ একটা বছর আমার ছোটবেলার সবচেয়ে সুন্দর সময়। বাইরে অনন্ত অন্ধকার থাকলেও, মহাকাশযানের ভেতর আমরা যে পৃথিবী গড়ে তুলেছিলাম তা হয়তো আসল পৃথিবীতে বেড়ে ওঠার স্বাদটা দিত। মহাকাশযানের একটি ঘরে ছিল একটি জলাশয়, একটি হ্রদ। আমরা খেলা করতাম সেই ছোট হ্রদের পাশে বালুকাবেলায়। আমরা হ্রদটির নাম দিয়েছিলাম সমুদ্র। আমাদের মধ্যে কেউই সমুদ্র দেখেনি, ছবিতে যা দেখেছি তার সঙ্গে এই ছোট জলাশয়ের তুলনা হয় না, তবু দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে তার নাম দেয়া হয়েছিল প্রশান্ত মহাসাগর। তবে ঐ জলাশয়ে নেমে সাঁতার কাটা যেত। সেখানে ঢেউও থাকত। একটা ছোট স্রোতস্বিনী এসে পড়ত সেই হ্রদে, তাতে পাথর ছিল। সেই স্রোতের উৎস ছিল একটা ছোট বিষুবীয় অরণ্য। অনেক সময় বৃষ্টি পড়ত সেখানে, বাজ পড়ার শব্দ হতো। আমরা সেখানে লুকোচুরি খেলতাম। মহাকাশে নিরাপত্তায় আমরা মাঝে মাঝে ভাবতাম পৃথিবীর কথা, সেই পৃথিবী তখন আউরেউরগথদের হামলায় বিপর্যস্ত। 

এসময়ে একটা স্বপ্ন প্রায়ই দেখতাম। আমাদের মহাকাশযানে কারা যেন আক্রমণ করেছে। জাহাজের একপাশে আগুন লেগেছে। মা আমাকে কোলে নিয়ে করিডর দিয়ে দৌড়াচ্ছে আর ভয়ের দৃষ্টিতে পেছন দিকে তাকাচ্ছে। পেছনে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। আর আমিও চিৎকার করছি, ‘বাবা কোথায় ?’ মা’কে এই স্বপ্নের কথা বললে মা খুব গম্ভীর হয়ে যেতেন। বলতেন, ‘আউরেউরগথদের কথা তোদের বলা উচিত হয়নি।’

এর মধ্যে আমি যে কত বই পড়লাম। একটা বই ছিল আমার খুব প্রিয়, প্রথম প্রথম যখন পৃথিবী থেকে বিভিন্ন গ্রহে মানুষ যাওয়া শুরু করল সেই সময়ে এই বইটা লিখেছিলেন তখনকার এক বিখ্যাত নভোচারী। সেই বইয়ের এই লাইনক’টি আমার মাথায় সবসময় ঘুরত―‘অনেকে মনে করে মহাকাশ যাত্রার মতো বড় অ্যাডভেঞ্চার আর হতে পারে না। তারা মনে করে মহাশূন্যের কালো অন্ধকারে অভিযানের সঙ্গে সবসময় একটা রোমাঞ্চকর সঙ্গীত বাজতে থাকে যা কি না সেই যাত্রাকে অর্থময় করে, তাকে প্রাণপূর্ণ করে। কিন্তু অনন্ত অসীম মহাকাশের নিঃসঙ্গতা নিতান্তই অনুর্বর, সেই প্রকৃতি ক্ষমাহীন, সে সঙ্গীত বুঝতে অক্ষম। দিকহীন আঁধারে যে দু-একটা নক্ষত্র টিমটিম করে সেগুলো মানুষের প্রাণকে প্রজ্জ্বলিত করতে পারে না। তখন এই ছোট মহাকাশযানে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে উদ্ভূত তার অদম্য ধৈর্য।’

মা’কে আমি লাইনগুলো দেখালে মা বলল, ‘এসব পড়ে তোর যেন আবার মন খারাপ না হয়।’

আসলে মন আমার খারাপ হত না। পৃথিবীকে আমি দেখিনি, পৃথিবীর মাটিতে আমি কোনওদিন পা ফেলিনি, যদিও মহাকাশযানে যে বিষুবীয় অরণ্য আছে সেটার মাটি নাকি পৃথিবী থেকে আনা। বালুকাবেলার পাশে সেই অরণ্যের গাছগুলো ছিল আকাশছোঁয়া, গাছের নাম ছিল সেইবা। আকাশছোঁয়া বলছি, মহাকাশযানের বাইরে অনন্ত আকাশ, ভেতর তো বদ্ধ, তবু হলোগ্রামের যাদুতে মনে হতো গাছগুলো অনেক উঁচু, তাদের ওপর মেঘ ভাসছে, তার ওপরে নীল নীল আকাশ। অনেক সময় মেঘ থেকে বৃষ্টি হতো। মা বলত ঐ ঘরটা তাকে আমাজনের জঙ্গলের কথা মনে করিয়ে দেয়, তবে সেখানে নাকি বৃষ্টি পড়ে অঝোর ধারায়, ঐ ঘরে যেরকম টিপিটিপি বৃষ্টি পড়ে সেরকম নয়। এই বলে মা বৃষ্টির গান গাইতেন, বৃষ্টির কবিতা পড়তেন, ‘বাদলের ধারা ঝরে ঝরোঝরো …’                  

আমাদের সময় চলত পৃথিবীর মতো, ১২ ঘণ্টা আলো, ১২ ঘণ্টা রাত। দিনের বেলা মনে হতো বাইরের থেকে সূর্য আমাদের জাহাজকে আলোয় ভরিয়ে রেখেছে, এমনকি আমাদের থাকার ঘরগুলোও দিনের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠত। এসবই সম্ভব হত এক বিশেষ ধরনের প্রকৌশল ব্যবহারের ফলে কারণ আমাদের ঘুরন্ত চক্রাকার অংশে তো জানালা বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি তা ছিল না।

এরকমভাবেই চলছিল। একদিন স্কুলে যেয়ে দেখি কী কারণে সিয়েনা আসেনি। সিয়েনার তিন মেয়ে আশু, মালিয়া আর তাশু এসে বলল তাদের মা’কে আর কারা ওয়ার্দারকে নাকি ড্রেগলস কি একটা জরুরি কাজে ডেকে নিয়ে গেছে। স্কুল হবে না, আমরা তো খুব খুশি।―মালাই বলল, ‘চল সবাই বালুকাবেলা যাই।’ আমরা মালাইয়ের প্রস্তাবে রাজি হলাম। ঘরে গিয়ে সাঁতারের পোশাক নিয়ে আসব বলে আমরা স্কুল ছেড়ে করিডর দিয়ে যে যার ঘরের দিকে রওনা দিলাম।

আমাদের ঘরের সামনে আসতেই দরজা খুলে গেল। এ সময়ে বাসায় কেউই থাকে না, মা থাকেন মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষে, বাবা ইঞ্জিনের ঘরে। কিন্তু দেখলাম মা-বাবার ঘরটার দরজা খোলা। ভাবলাম মা কোনও কারণে ঘরে এসেছেন। আমি করিডর দিয়ে এগোই, দেখি মা’র পা-দুটো দেখা যাচ্ছে। হালকা কাপড়ের জুতো মায়ের পায়ের পাতা ধরে রেখেছে, একটা ঘন নীল স্কার্ট হাঁটু ছাড়িয়ে মিলিয়ে গেছে হাঁটুর নিচে। দেখলাম মায়ের দুটো হাত কী যেন একটা ধরে রেখেছে।  কোনও কিছু ধরে থাকার মধ্যেও মা’র একটা শৈলী আছে, পেলব আঙুলগুলো আলতো করে ধরে রেখেছে গোলাকার একটা কিছু। গোলাকার, আর এক পা এগোতেই বুঝলাম সেটা হল একটা মাথা। মাথা ? মাথার পেছন দিকলম্বা কালো চুল খোপা করা, অনেকটা মা’র মতই। আর এক পা এগোতেই মা’র পুরো শরীরটা দেখা গেল। কিন্তু মা’র ধড়ের ওপর  কোনও মাথা ছিল না। মা’র মাথাহীন দেহ তার দুটি হাত দিয়ে একটা মাথা ধরে বসেছিল। শরীরের শীতলতা মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, ‘মা আ আ আ আ আ আ আ আ আ,’ আমার চিৎকারে এক অসামান্য আতঙ্ক বাড়ে সহস্র গুণ। খাটে বসা মুণ্ডুহীন দেহটি দাঁড়িয়ে যায়, তার হাতে ধরা থাকে মা’র মাথা। কিন্তু সেই দেহ তো আমার মা’রই। নাকি না ? আমি কিছু বুঝতে পারি না। আমি চিৎকার করি, পেছনে হটি। আমি দেখি পেলব দুটি হাত মাথাটাকে ঘুরিয়ে দেয়, মাথার সামনে বসানো মা’র সুন্দর দুটি চোখ, তাতে পলক পড়ে, আতঙ্কে বিস্ময়ে বিস্ফারিত ছিল চোখ দুটি। কিন্তু তবু তা ছিল কমনীয়। মা’র চোখকে কি আমি ভুলতে পারি ? চোখের নিচে খাড়া নাকের নাসারন্ধ্র দুটি নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে কমছিল ফুলছিল। যে মাথা দেহের সঙ্গে যুক্ত নয় সে কেমন করে শ্বাস নেয়―সেই আতঙ্কেও ক্ষণিকের জন্য হলেও এই চিন্তা আমার মাথা এসেছিল। নাকের নিচে লাল লিপস্টিকের ঠোঁট। দেখলাম ঠোঁটদুটি খুলে গেল। সেখান থেকে ভেসে এল যেন আর্তনাদ, ‘শোগি, মা আমার! শোগি, ভয় পেও না মা!’

আমি দুহাত দিয়ে আমার মাথা চেপে ধরি। আমার মুখ দিয়ে শুধু ‘আ আ’ ধরনের একটা গোঙানি বের হয়। আমি দেখি দেহটির দুটি হাত মা’র মাথাকে দেহের ওপর বসাচ্ছে। আমি পেছন হটতে থাকি, হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। পালাতে হবে, এখান থেকে পালাতে হবে। কিন্তু কোথায়, মা’র কাছে ? কিন্তু মা কোথায় ? এই ভীষণ দানব তো আমার মা নয়। কোনরকমে উঠে আমাদের বাসা থেকে করিডরে বের হয়ে আসি। পেছনে মা’র গলা যেন শুনি, ‘শোগি দাঁড়া, শোগি কোথাও যাস না, শোগি আমাকে ভুল বুঝিস না। শোগি, আমি তোর মা।’ 

ততক্ষণে আমি করিডর দিয়ে দৌড়াচ্ছি। ইঞ্জিনঘরে বাবার কাছে যেতে হবে ভাবি। কিন্তু ইঞ্জিনঘরে যাওয়া সহজ নয়, সেটা মহাকাশযানের আবাসিক অঞ্চলের বাইরে, সেখানে কৃত্রিম মহাকর্ষ নেই, সেখানে ঢুকতে হলে বিশেষ অনুমতি লাগবে। কিন্তু বাবাকে তো এই খবরটা দিতে হবে। মা কোথায় গেল আমার ? দৌড়াতে দৌড়াতে কাঁদতে কাঁদতে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলি দুবার, এতে বুকে লাগানো ফোন সক্রিয় হয়। ‘বাবা, বাবা’ বলতেই বাবা ফোনে উত্তর দেন, ‘শোগি ?’ ‘বাবা,’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলি, ‘বাবা, মা’র যেন কি হয়েছে। বাবা, মা’র মাথা দেহ থেকে আলাদা হয়ে গেছে, কিন্তু সেই মাথা কথা বলছে। বাবা, আমি বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে।’ 

আমি  কোনও উত্তর পাই না। মনে হলো বাবা যেন কী ভাবছে, হয়তো আমাকে বিশ্বাস করছে না। তারপর তার গলা শুনি, ‘শোগি, তুমি কি ঠিক দেখেছ, এটা তোমার মনের ভুল নয়তো।’ ‘না, বাবা, আমি ঠিক দেখেছি,’ কাঁদতে কাঁদতে বলি। আর একটু থেমে বাবা বলে, ‘শোগি তুমি ঘরে ফিরে যাও, আমি এখনই আসছি।’

‘আমি ঘরে ফিরতে পারব না, বাবা। তুমি তাড়াতাড়ি এস, আমি বালুকাবেলা যাচ্ছি,’ কেঁদে বলি আমি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি করিডরের অন্যপ্রান্তে মা দৌড়ে আসছে আমার দিকে। তার দেহের ওপর মাথা ঠিকই বসানো আছে।

দৌড়ে বালুকাবেলার ঘরটায় ঢুকি। ঢোকামাত্র সমুদ্রের গর্জন আর গাঙচিলের ডাক আমার কানে আছড়ে পড়ে। দূরে বালির ওপর আশু, মালিয়া আর তিলাই বসে আছে। তাশু জলে, মালাইকে দেখলাম না। বালির ওপর দৌড়াতে আমার অসুবিধা হচ্ছিল। আশুদের কাছে পৌঁছে আমি নিচে পড়ে গেলাম, সারা মুখে বালি লাগল। আমি ততক্ষণে চিৎকার করে কাঁদছিলাম, বলছিলাম, ‘আমার মা’র যেন কি হয়েছে। আমার মা আর মা নেই।’ ওরা তো কিছুই বুঝল না। বোঝার কথাও নয়। আমি বালি থেকে মাথাটা তুলে পেছনের দরজাটা দেখলাম। সেটা এখনও বন্ধ, মা তাহলে আমাকে অনুসরণ করেনি। না, সেই জিনিসটাকে আমি মা কেন বলছি। আমার মা কোথায় গেল ?

আমার ফোন বেজে উঠল। বাবার ফোন। বাবা বলল, ‘শোগি, তুই সমুদ্রতীরেই থাক, আমি আসছি। ভয় পাস না।’ এর মধ্যেই বেলক ঢুকল ঘরে। সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে তাকে বলল, ‘শোগির মা’র যেন কি হয়েছে।’ বেলক এসে আমার পাশে বসে। বলে, ‘কি হয়েছে ইন্দল সানের ?’ আমি প্রায় মিনিটখানেক কিছু বলতে পারি না। ফুঁপিয়ে কাঁদি। ওদের সব বলি, কিন্তু বুঝি ওরা কেউই আমার কথা বিশ্বাস করছে না। বেলক বলল, ‘এ সব তোমার মনের ভুল, শোগি। হ্যালুসিনেশন। তোমার মা’কে আমি ডাকছি বেতারে। তাকে দেখলেই তোমার ভুল বুঝতে পারবে।’ 

আমি বেলকের হাত চেপে ধরি। ‘না,  কোনওভাবেই নয়। তাকে ডেকো না এখন। বাবা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর।’ 

কিন্তু বাবা আর এল না। তার বদলে মিনিট দশেক পরে সমুদ্রের ঘরে ঢুকল নেনা আর তমাল। বেলকের মা নেনা হলো এই জাহাজের সহঅধিনায়ক আর তমাল জাহাজের প্রতিরক্ষা সুরক্ষা এই সবের দায়িত্বে। ওরা এসে আমাকে ছাড়া সবাইকে যে যার ঘরে চলে যেতে বলল। বেলক বলল, ‘কেন, আমরা ঘরে যাব কেন ? শোগির মনের ওপর অনেক চাপ। আমরা এখানেই থাকব।’ নেনা বলল, ‘বেলক, এটা আমাদের মহাকাশযানের প্রটোকল। শোগির বাবা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। শোগির হ্যালুসিনেশন হয়েছে। অনন্ত মহাকাশে এরকম হয়ে থাকে। তার মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা হওয়া দরকার।’

আমার মাথা ঠিক ছিল না, কিন্তু নেনার ‘অনন্ত মহাকাশ’ কথাটা শুনে খটকা লাগল। অনন্ত মহাকাশে কি সব মা’ই হারিয়ে যান ?

বেলক গজগজ করল, কিন্তু মা’র কথার ওপর কিছু বলতে পারল না।

আমাকে নেনা বালি থেকে তুলে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘তুমি ঘাবড়িও না, শোগি। আমরা এই যাত্রায় যে কত কিছু দেখেছি, এই জাহাজে থাকতে থাকতে এরকম হয়, মন বিভ্রান্ত হয়।’ আমি কান্না-জড়ানো গলায় বললাম, ‘আমার মা কোথায় ?’ নেনা বলল, ‘তোমার মা’কে আমরা আসতে নিষেধ করেছি। তুমি কী দেখতে কী দেখেছ ? তোমার মা’কে আবার এখন কীভাবে দেখবে কে জানে। আগে তোর শান্ত হওয়া প্রয়োজন।’

আমি নেনার কথা বুঝলাম না, কিন্তু নেনা এমনই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ যে তাঁর কথার ওপর কথা বলার সাহস কারুর হয় না। তমাল আমাকে পাঁজা করে তুলে সমুদ্রঘরের বাইরে নিয়ে এল। করিডর দিয়ে ওরা হাঁটছে, সেই হাঁটা আর শেষ হয় না। আমি ভাবছি ওরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে হাসপাতাল পার হয়ে ‘খেলাঘর’ নামে একটা ছোট ঘরে আমরা ঢুকলাম। এই ঘরটা ‘খেলাঘর’ নাম হলেও আমরা এখানে কখনও খেলতে আসিনি, আমরা খেলার জন্য ‘স্টেডিয়াম’ নামে একটা বড় হলঘরে যেতাম। কেন জানি এই ঘরটা সম্বন্ধে আমাদের তেমন কৌতূহলও হয়নি। ঘরে ঢুকে দেখি আমার সব প্রিয় খেলনা সেখানে। দেয়ালে একটা পাহাড়ের ছবি। আমি বললাম, ‘বাবা কোথায়। বাবাকে ডাক।’ নেনা বলল, ‘তোমার বাবা একটু পরেই আসবে।’ 

ওরা আমাকে ঘরের একদিকে একটা বড় বিছানায় শুইয়ে দিল। বিছানাটা যে কি আরামের! সেখানে শোয়া মাত্রই আমার চোখ জড়িয়ে এল ঘুমে। কিন্তু আমি তো ঘুমাতে চাইছিলাম না। ‘বাবা কোথায় ?’ বলার চেষ্টা করলাম। মুখ থেকে ‘বাব্বা’ এরকম কিছু একটা বের হলো। দেখলাম নেনা আর তমাল আমার ওপর মুখমণ্ডলের কাছে এসে কী যেন দেখতে চাইছে, তাদের সঙ্গে মনে হলো  আরও একজন। আমার মা ? তারপর তারা ঘরের কোনায় চলে গেল। তাদের সঙ্গে  আরও একজন যোগ দিল। কে―বাবা ? কিন্তু ওরা ফিসফিস করে কথা বলছে কেন ? আমি চিৎকার করে সেটাই জিজ্ঞেস করতে চাইলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে স্বর বের হলো না। আমি একটা স্বপ্নে তলিয়ে যেতে থাকলাম। স্বপ্ন নয় দুঃস্বপ্ন। স্কন্ধকাটা মা আন্তারসের করিডরে আমার পেছনে ঘুরছে, আমাকে ডাকছে―‘শোগি, শোগি’। আমি পালাতে চাইছি, কিন্তু আমার পা’র মাংসপেশী বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। আমি খোঁড়াতে খোঁড়াতে এক করিডর থেকে আর এক করিডরে লুকাতে চাইছি। অবশেষে একটা অন্ধগলি করিডরের শেষ প্রান্তে আটকা পড়লাম। সেখানে ছিল একটা প্রকাণ্ড কাচের জানালা, তাই দিয়ে মহাশূন্যের কালো দেখা যাচ্ছিল। সেই কালোতে আমি দেখলাম একটা আলোর বিন্দু, জ্বলছে আর নিভছে। আর একটি মহাকাশযান ? স্বপ্নের মধ্যেও বুঝলাম আউরেউরগথরা আমাদের পিছু ছাড়েনি। এই ভাবতে ভাবতেই আমার স্কন্ধকাটা মা’র হাত পিঠে অনুভব করলাম। 

অধ্যায় চার. 

চিৎকার করে উঠি আমি, ঘুম ভেঙে গেল। স্কন্ধকাটা মা নেই কোথাও। আধো-অন্ধকারে দেখি ঘরে কেউ নেই। বিশাল জাহাজের শব্দ শোনা যায়। একটা যান্ত্রিক শব্দ। অসীম শূন্যতায় আন্তারেস চলেছে। এতদিন এই নিয়ে ভাবি নি, কিন্তু আজ গা শিউরে ওঠে। মহাশূন্যের শূন্যতায় ভেসে চলেছে এই ক্ষুদ্র মহাকাশযান। এক যান্ত্রিক শব্দ সেই জাহাজকে ছেয়ে রেখেছে, আমার মাথা ধরে যায়। সেই শূন্যতায় মা ছাড়া আমি বাঁচবো কেমন করে ? আমি বিড়বিড় করে বলি, মা, মা। আমার কথায় ঘরের কোনায় একটা বাতি জ্বলে ওঠে। মিরার মুখ স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, মিরা বলে, ‘শোগি, কেমন আছ ?’ আমি বলি, ‘মা কোথায় ?’ ‘তোমার মা একটু পরেই আসবে তোমার কাছে। তুমি তো তাকে অন্যভাবে দেখেছ, ভুল দেখেছ, সেজন্য ও তোমার কাছে আসতে ভয় পাচ্ছে।’ আমার মা কখনও কিছুতে ভয় পায় না। এ কোন মা আমার ? মিরা বলে, ‘ভেবো না, শোগি, সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বাবাকে ডাকছি।’ বাবাকে ? বাবা কি জানে মা’র কী হয়েছে। একটা হাল্কা বাজনায় ঘর ভরে যায়। বাজনাটা আমাকে যেন কিছুটা সান্ত্বনা দেয়। মিরাই নিশ্চয় চালিয়েছে। মিরা জানে কোন বাজনায় আমাকে শান্ত করা যাবে।

আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। আবার স্বপ্ন দেখি, এবার আউরেউরগথদের মহাকাশযান আমাদের প্রায় ধরে ফেলেছে। দেখলাম একটা একটা করে আউরেউরগথ তাদের মহাকাশযান থেকে বের হয়ে আসছে, মহাকাশের শূন্যতায় তাদের কিছু হচ্ছে না। তাদের দেখতে অষ্টভুজ অক্টোপাসের মতো, কিন্তু বিশাল। তাদের লম্বা শূঁড় দিয়ে তারা আমাদের জাহাজকে অনায়াসে জড়াচ্ছে। দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে আমাদের বিরাট মহাকাশযান। আমি চিৎকার করে উঠি, সেই চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘর আগের মতোই আধো আলোয় ভরা। শুধু এবার মনে হলো আর কী যেন শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটা চাপা শব্দ, সাইরেন, আন্তারেসের বিপদ সংকেত। আমাকে যে ঘরে রাখা হয়েছে তার একপাশের কাচের বড় জানালা দিয়ে দেখলাম করিডরের আলো নিভছে আর জ্বলছে, অনেকে করিডর দিয়ে দৌড়াচ্ছে। আমি বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে সেই জানালার দিকে এগোই। করিডর দিয়ে যারা দৌড়ে যাচ্ছে তাদের মুখ ভয়ার্ত, আউরেউরগথরা কি সত্যিই আন্তারেসকে জড়িয়ে ধরেছে ? কিন্তু আউরেউরগথদের যে কী চেহারা তা তো আমরা কেউ জানি না। অষ্টভুজ অক্টোপাসেরা আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশযান বানাতে পারবে না বলেই আমার বিশ্বাস। আর স্বপ্নে তাদের যেমন দেখেছি, কোনও রকম বিশেষ পোশাক ছাড়াই তারা মহাশূন্যে ভাসছে, চাপশূন্য বায়ুশূন্য মাধ্যমে কী  কোনও প্রাণী ওইভাবে ভ্রমণ করবে ? সেটা একটা অসম্ভব ব্যাপার।

কিন্তু সবাই দৌড়াচ্ছে, দেখলাম ঘরের দরজা খোলা, আমিও বেরিয়ে  আসি করিডরে। বাবাকে ডাকতে হবে, আমার বাঁ বাহুতে ফোনটা প্রথিত, বাবাকে ফোনে ডাকলাম, বাবা ফোন ধরল না। মা’কে ও ফোন করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু করলাম না। আমার বন্ধুদের কাউকে দেখলাম না। করিডরে বাচ্চারা কেউ নেই, সবাই বড়, আমার দিকে তাকিয়ে তারা কী যেন বলতে গিয়ে বলছে না, চলে যাচ্ছে। আমি আমাদের ঘরের দিকে হাঁটতে থাকলাম। করিডরের একটা বাঁক ঘুরতেই দেখি মা, আমার খোঁজেই নিশ্চয় আসছিল। আমি দাঁড়িয়ে যাই। ভয়ে শরীরে কাঁটা দেয়। এই মানুষটি আমার মা নয়। এ  কোনও যান্ত্রিক রোবট। ঘুরে পালাতে চাই, কিন্তু আমার পা চলে না। মা বলে, যেরকম সবসময় বলে, ‘ভয় পাস না, শোগি, আমিই তোর মা।’

আমি কিছু বলতে পারি না। মা এগিয়ে এসে আমার হাত ধরতে চায়, আমি সিঁটিয়ে যাই, হাত টেনে নিই। মা’র চোখের দিকে তাকাই, আহত হয়েছে বুঝতে পারি। কিন্তু আমি এখানে কী করতে পারি ? চোখ নামিয়ে শুধু বলতে পারি, ‘বাবা কোথায় ?’ ‘বাবা ইঞ্জিন ঘরে ব্যস্ত, আউরেউরগথদের লেজার আমাদের ইঞ্জিনের ক্ষতি করেছে, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ হচ্ছে, আমাদের এখন ঘরে যেয়ে বিকিরণরোধী পোশাক পরে নিতে হবে। সেজন্যই তোকে আমি নিয়ে যেত আসছিলাম।’ এই মানুষটি আমার মা এত বছর যেভাবে কথা বলেছিলেন সেভাবেই কথা বলছেন। এত বছর তাহলে ইনিই―যিনি রক্তমাংসের মানুষ নন―তিনিই আমার মা ছিলেন।

আমার হাত ধরে মা চলল। পথে অনেকেই তার সঙ্গে কথা বলল। সবাই তাকে আগের মতোই ইন্দল বলে সম্বোধন করল। এমন যেন কিছুই হয়নি। তারা কি জানে না ইন্দল মানুষ নয় ? আমাদের ঘরের সামনে এলে ইন্দল বলল, ‘আমি আগে যা ছিলাম তাই আছি, শোগি। আমার কিছু পরিবর্তন হয়নি। আগে যদি আমাকে মা বলে চিনতিস এখনো আমি তোর মা’ই আছি। আমার বাইরেটাই দেখলি শুধু, ভেতরটা আমার ক্ষয়ে যাচ্ছে।’ এবার সাহস করে আবার তাকাই ইন্দলের দিকে। একে ছাড়া আর কোনও মা’কে আমি চিনি না। তবুও বুকটা কেমন জানি করে। আমরা আমাদের ফ্ল্যাটে ঢুকে একটা তাক থেকে বিকিরণরোধী পোশাক বের করি। ওটা পরতে বেশ কয়েক মিনিট সময় নেয়। আমাদের সারা শরীর ঢাকা থাকে, মাথায় একটা কাচের আবরণ, হেলমেটের মতো। আমরা তার ভেতরের রেডিও চালু করি। আমার ঘরে ঢুকে আমাকে চেয়ারে বসিয়ে মা আমার বিছানায় বসেন। বলেন, ‘তোকে অনেক কথাই বলা হয়নি। আমি জানি না তোকে কতটা আমি বলতে পারব। তবে যত কম তুই জানিস ততই ভালো।’

এই বলে ইন্দল চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। পরের কথাগুলো তার বলতে কষ্ট হবে, আমি বুঝতে পারছিলাম। ইন্দল বলে, ‘শোগি, তুই বুদ্ধিমান মেয়ে, আমি যে তোর আসল মা নই তুই বুঝতে পারছিস। পৃথিবীর খুব দুঃসময়ে আন্তারেস পৃথিবী ছাড়ে। আউরেউরগথদের আক্রমণে পৃথিবী তখন পর্যুদস্ত। পৃথিবীর কিছু মানুষ যেন বাঁচে সেজন্য বহুবছর ধরে মানুষ মহাশূন্যের গভীরে অন্য একটি গ্রহ খুঁজছিল যা কি না পৃথিবীর  মতোই হবে। তারা নতুন নতুন ইঞ্জিনের উদ্ভাবন করছিল যা দিয়ে কিনা আন্তঃনাক্ষত্রিক শূন্যতাকে অল্প সময়ে পার করা যায়। আয়নিত জেট, নিউক্লীয় ফিশান আর ফিউশন, কণা ও পরাকণার সংঘর্ষ, শূন্যতার শক্তি কত কী চেষ্টা করা হলো। অবশেষে কাজ করল এই কণা-পরাকণা বিজ্ঞান। এই প্রকৌশলে আমরা আলোর গতির শতকরা দশভাগ গতি অর্জন করতে পারি, সেকেন্ডে ৩০,০০০ কিলোমিটার। আন্তারেস ছিল ঐ কারিগরি পদ্ধতির প্রথম মহাকাশযান। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষেরা বাছাই করল আঠারোটি তরুণ দম্পতি। তাদের  কোনও সন্তান ছিল না। তারা সবাই এই মহাকাশযানেই জন্মেছে।’

না, এটা তো সত্যি হতে পারে না, ভাবি আমি। বলি, ‘তাহলে আমি ? আমি কী তোমার থেকে জন্মাইনি ?’

‘না, শোগি, তুই আমার থেকে জন্মাসনি। আমি যা বলব এখন তা তুই কীভাবে সহ্য করবি জানি না। তোকে বলতে আমার ভয় করছে।’ এই বলে ইন্দল ঘরের দেয়ালে টাঙ্গানো বড় ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আমি শুনেছি ছবিটার নাম ‘নক্ষত্রের রাত’। বিশাল বিশাল তারা জ্বলছে আকাশে, তার মধ্যে আলোর ঘূর্ণী। সেই উজ্জ্বল আকাশের নিচে, ঝাউগাছ পেরিয়ে গ্রামের বাড়ির ছাদ, তার পেছনে পাহাড়ের মসিরেখা, আর পাহাড় পার হয়ে নক্ষত্রের আলোর ঝর্ণা। মনে হয় ইন্দল সাহস সঞ্চয় করতে পারে কিছুটা, বলে, ‘ঐ সময়ে আউরেউরগথরা পৃথিবীর ওপর ক্রমাগতই আক্রমণ করছিল। সেরকম একটি আক্রমণে তোর মা মারা যান।’

আমি কী করব বুঝে পাই না। এই খবরে আমার কেমন প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ভাবি। আমার মা তো আমার সামনেই বসে আছেন। তিনি যে রোবট সেটা সবসময় মনে থাকছে না। শুধু বলতে পারি, ‘আর বাবা ?’

উত্তর দিতে ইন্দল সময় নেয়। বলে, ‘তোর বাবা বেঁচে যান। তুই তখন তোর মা’র পেটে। তোকে উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা হয়। পৃথিবীর একটা গবেষণাগারে তোর প্রথম কয়েক মাস কাটে, সেখানেই বলতে গেলে তোর জন্ম। এই মহাকাশযানের ছোটদের মধ্যে একমাত্র তোরই জন্ম পৃথিবীতে।’

আমার মাথা ঝিমঝিম করে। মনে হয় এই ঘর থেকে দৌড়ে পালাই। কোথায় পালাব ? অনন্ত মহাকাশে পালানোর জায়গা কোথায় ? বলি, ‘আমি বাবার কাছে যাব।’

‘যাবি নিশ্চয়, শোগি। কিন্তু আউরেউরগথের আক্রমণে ইঞ্জিনের ক্ষতি হয়েছে। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বের হচ্ছে। তোর বাবাই একমাত্র মানুষ যে কি না সেটা ঠিক করতে পারে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ও এখানে চলে আসবে।’

কিন্তু সামিও তাহলে আমার জন্ম-পিতা নয়। আমার পরিচিত মহাকাশযানটি অচেনা হয়ে উঠতে শুরু করে।

‘তুমি কি আমার মা’র মতই দেখতে ?’ প্রশ্ন  করি আমি।

‘হ্যাঁ, তোর মা’র মতোই। পৃথিবীতে আমার মতো কেউ নেই। আমাদের কৃত্রিম উপায়ে বানানো হয় বটে, কিন্তু আমাদের অনুভব মানুষের অনুভবের থেকে ভিন্ন নয়। আমাদের দুঃখ, আনন্দ, বেদনা খুবই মূর্ত। আমি চোখে যে রঙ দেখি তা আমার মনেই ফুটে ওঠে, বর্ণালী বিশ্লেষণ করে আমার মধ্যে বসানো  কোনও কম্প্যুটার বলে না তোমার এখন এই রঙ দেখা উচিত। তোকে যে ভালোবাসি সেটাও ঐ অনুভূতির জায়গা থেকেই, তার মধ্যে  কোনও কৃত্রিমতা নেই। তোর মা মারা যাবার পরে ওনার ডিএনএ ব্যবহার করে আমার শরীর গঠন করা হয়, কিন্তু পুরোটা নয় …’

ইন্দল তার কথা শেষ করার আগেই এর মধ্যেই ঘরের স্ক্রিনে নেনার মুখ ভেসে ওঠে। নেনা খুব দ্রুত বলে, ‘তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা যা ভাবা গিয়েছিল তার থেকে বেশি। আমরা অনুরোধ করছি সবাইকে জাহাজের তেজস্ক্রিয়রোধী ঘরটায় গিয়ে জড়ো হতে। একমাত্র জরুরি কাজে নিয়োজিত কয়েকজন ছাড়া এই আদেশ সবার জন্য প্রযোজ্য। প্রতিকণা সংরক্ষণাগারের দেয়াল আউরেউরগথ আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে প্রকৌশলী সামি বলছেন আমাদের ঘাবড়াবার কিছু নেই। তাঁর দল সেটা মেরামত করছে। আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে আশা করা যাচ্ছে এই কাজটা শেষ হবে।’

ইন্দল আমার হাত চেপে ধরে। তার চোখে আতঙ্ক। বলে, ‘শোগি, তোর বাবা সাংঘাতিক তেজস্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে যাবে।’

‘আমরা কী করব … মা ?’ মা কথাটা বলতে প্রথমে আমার দ্বিধা হয়। তারপর ভাবি এই মানুষটি ছাড়া আমি অন্য  কোনও মা চিনি না। আমাকে হাতে ধরে করিডরে বের হয় ইন্দল। অনেককেই তেজস্ক্রিয়-নিরাপদ ঘরের দিকে দৌড়াতে দেখি। আমরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিই। সবার মুখে আতঙ্কের ছাপ। পথে মালিয়া, তাশু আর আশুর সঙ্গে দেখা, তারা তাদের মা সিয়েনার সঙ্গে দৌড়াচ্ছে। ওরা ইন্দলের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাল, সবাই যেন জেনে গেছে আমার স্কন্ধকাটা মা’র কথা। নিরাপদ ঘরে ঢুকে দেখি কেউ বসে, কেউ ভিড় করে দাঁড়িয়ে। সবাই উত্তেজিতভাবে কথা বলছে। মনে হলো আমাদের দেখে তারা যেন চুপ করে গেল। একটা বেঞ্চে মালাই, তিলাই আর বেলক বসা। তার উল্টো দিকে ক্লাভান, মিলা, রিনা আর লেনাক। ওরা সবাই মা’র দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি যে মা’র হাত ধরে ভেতরে ঢুকেছি তা ওদের অলক্ষিত থাকেনি। তাহলে ওরা কী ভাবছে আমি যা দেখেছি তা হ্যালুসিনেশনই ছিল।

আমি বেলকদের সঙ্গে বসতে এগিয়ে গেলাম। নেনা আর তমাল ঘরের একদিকে ছিল, মা ওদের সঙ্গে কথা বলতে গেল। দেখলাম ওদের মুখে হাসি নেই। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। তারা নিশ্চয় জানে মা যে মানুষ নয়। কিন্তু মা যদি মানুষ না হয় তবে মা কী ? মা তো রোবটও নয়। রোবটদের অনুভূতি থাকে না, তারা ব্যথা পায় না। মা’কে কী বলা যায় ? নিশ্চয় পৃথিবীতে এরকম মানুষদের  কোনও বিশেষ নাম আছে। আমি ভাবতে থাকলাম।

আমাদের সবারই তেজস্ক্রিয়তা-প্রতিরোধী পোশাক পরা ছিল। শুধু মাথার হেলমেটগুলো খুলে আমরা টেবিলে রাখলাম। ধীরে ধীরে ঘর  আরও মানুষে ভর্তি হওয়া শুরু করল। অধিনায়ক ড্রেগলস তাদের মধ্যে ছিল না, কাউকে তো মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণকক্ষে থাকতে হবে। আমার বাবা সামি ইঞ্জিন ঘরে। তার সঙ্গে কে আছে জানি না। হয়তো বিজন, হয়তো আস্টার, হয়তো রুডাবা। নেনা, তমাল আর মা’র মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম ইঞ্জিন ঘরের অবস্থা ভালো নয়। এর মধ্যেই বাবার মুখ ভেসে ওঠে দেয়ালের স্ক্রিনে। সবাই চুপ করে যায়। সামি বলে, ‘আমরা পরাকণার সংরক্ষণাগারের দেয়ালকে মেরামত করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের হাতে এখন একটাই উপায়। চক্রাকার গুদামটিকে আমাদের মহাশূন্যে উৎক্ষেপণ করতে হবে, নইলে সেখান থেকে যে তেজস্ক্রিয়তা বার হচ্ছে তা আর এক ঘণ্টা পরেই আমরা সহ্য করতে পারব না।’

বাবা হেলমেট পরে ছিলে। তবু সেটার কাচের মধ্য দিয়ে দেখলাম সে ঘামছে। দূরে দেখলাম মা’র মুখ সাদা হয়ে গেছে। পরাকণা সৃষ্টি করে তাদেরকে চারটা চক্রাকার সংরক্ষণাগারে রাখা হয়। তার মধ্যে তিনটে চক্র সবসময় কাজ করে আর একটা চক্রকে জরুরি সময়ের জন্য ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চারটা চক্রের মধ্যে একটা ফেলে দিলে ব্যাকআপ যে থাকবে না সেটা বোঝাই যাচ্ছে।

বাবা বলতে থাকেন, ‘গুদাম-চক্রটি ফেলে দিতে হলে আমাদের দলকে মহাকাশযানের বাইরে যেয়ে কাজ করতে হবে। এর মধ্যে কিছুটা ঝুঁকি আছে। আশা করি কাজটা নিরাপদেই করা যাবে।’

আমি ছোট হলেও বুঝতে পারছিলাম ১০০ মিটার ব্যাসের একটা বিশাল টরয়েড মহাশূন্যে ফেলে দেয়া সহজ হবে না। বাবারা জাহাজের চুরুট-মতো যে জায়গায় কাজ করে সেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নেই। দেখলাম বাবা, বিজন, আস্টার আর রুডাবা ভাসতে ভাসতে কিছু নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের বোতাম টেপার জন্য তৈরি হচ্ছে যেগুলো চক্রটির বাঁধনগুলো খুলে দেবে। সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল কখন টরয়েডটি স্থানচ্যুত হয়ে মহাকাশযান থেকে আলাদা হবে। চারখানা ক্ল্যাম্প খুলতে হবে। চারজন চারদিকের চারটি প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে, তারা একই সঙ্গে বোতামে চাপ দেবে যাতে ক্ল্যাম্পগুলো একই সময়ে খোলে। একই সময়ে যদি তারা না খোলে, কিংবা একটি ক্ল্যাম্প একেবারেই খুলতে ব্যর্থ হয় তবে তার পরিণতি খুবই খারাপ হবে, কারণ ক্ল্যাম্পগুলো খোলা মাত্র একটা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ টরয়েডটিকে আন্তারেসের পেছনে মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত করবে। সব ক্ল্যাম্প না খুললে সেই বড় চক্রটি মহাকাশযানের একটা বিরাট অংশ ধ্বংস করে দিতে পারে।

চারটা স্ক্রিনে চারজনকে দেখাচ্ছে। নেনা কথা বলছে তাদের সঙ্গে, শেষ মুহূর্তের কিছু সিদ্ধান্ত। ইঞ্জিন ঘরের চারজনই বারে বারে তাদের ঘড়ি দেখছে, সেখানে তাৎক্ষণিক তেজস্ক্রিয়তার মান দেখা যায়। সেই মানটি আমরাও স্ক্রিনে দেখতে পাচ্ছিলাম। সাধারণ মাত্রা থেকে সেটা প্রায় ২০ গুণ বেশি ছিল। চূড়ান্ত আদেশটি এল অধিনায়ক ড্রেগলস থেকে। আমরা দেখলাম বাবা, বিজন, আস্টার আর রুডাবা চক্রের চারদিকে একসঙ্গে বোতাম টিপল। ক্ল্যাম্পগুলো খোলা মাত্র ঐ চারজনকে নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে হবে যাতে পরবর্তী বিস্ফোরণ তাদের ক্ষতি না করে। বাঁধনগুলো শব্দ করে খুলে যেতে থাকল, কিন্তু বাবার দিকের ক্ল্যাম্পটি খুলল না। বাবা অন্য তিনজনকে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে বলে ক্ল্যাম্পটা হাত দিয়ে খোলার জন্য দ্রুত সেদিকে ভেসে গেল। মা চাপা চিৎকার করে উঠল। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরণ হওয়াটা কম্প্যুটার আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল। বাবা হাত দিয়ে ক্ল্যাম্প খুলতে পারল। দ্রুত তার নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে ভেসে এসে একটা বোতাম টিপল, বিস্ফোরণ হলো। চক্রটির যেখানে ভূমির সঙ্গে সমান্তরাল হয়ে উৎক্ষিপ্ত হবার কথা, আমরা দেখলাম সেটা একদিকে কাত হয়ে পড়ছে। সেইদিকের নিয়ন্ত্রণ প্যানেল বাবাসহ কাত হয়ে পড়ছে। আমরা সবাই আর্তনাদ করে উঠলাম। তারপর কাত হয়েই বিশাল টরয়েডটি মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হলো, সে সঙ্গে নিয়ে গেল আমার বাবা প্রকৌশলী সামিকে।                     

অধ্যায় পাঁচ.

বাবাকে নিয়ে পরাকণা যেখানে সংরক্ষণ করা হয় সেই চক্রটি মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হল। আমরা আর্তনাদ করে উঠলাম। সবচেয়ে বেশি জোরে চিৎকার করে উঠল আমার মা―ইন্দল। ইন্দল আমাকে, ‘এই ঘর থেকে বার হোস না শোগি,’ বলে ছুটে বেরিয়ে গেল নিরাপদ ঘর থেকে। স্ক্রিনে দেখতে পেলাম বাবার হেলমেট-পরা মাথাটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। তেজস্ক্রিয়তা থেকে বাঁচতে হেলমেট আর পোশাক পরা ছিল, কিন্তু মহাশূন্যের শূন্য চাপ বা বায়ুহীনতা থেকে বাঁচার জন্য সেটা সঠিক পোশাক ছিল না। বাবার শরীরটা ধীরে ধীরে বিন্দু হয়ে যেতে লাগল। আধ মিনিটের বেশি মানুষ ঐ চরম পরিবেশে বাঁচে না। নেনা আর তমাল আমার কাছে এল, নেনা আমাকে জড়িয়ে ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। আমার চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকল।

দু মিনিটের মাথায়, একটা ছোট সাটল দেখলাম রওনা হয়ে গেল বাবার দিকে। এরপরে স্ত্রিনটা বন্ধ করে দেয়া হল। নেনা আমার হাত ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল, পাশে তমাল। আমি নিঃশব্দে কাঁদছিলাম। নেনা বলল, ‘শোগি কেঁদো না, তোমার বাবার কিছু হয়নি।’ আমার বাবার কিছু হয়নি, ঐ মহাশূন্যে পাঁচ মিনিটেরও বেশি নিশ্চয় সে ভেসে ছিল, তার কিছু হয়নি ? আমি বুঝতে পারলাম না নেনা কী বলছে, কিন্তু বাবার কিছু হয়নি শুনে আমি কান্না থামিয়ে দিলাম। নেনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা বেঁচে আছেন ?’ বাবা কী করে বেঁচে থাকতে পারে ঐ বায়ুশূন্য, চাপশূন্য মহাকাশে বুঝতে পারলাম না, কিন্তু তার যে বাঁচার একটা সম্ভাবনা আছে সেটা ভেবেই আমার সমস্ত হতাশা দূর হয়ে গেল। নেনা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল বুঝতেই পারছিলাম না। অবশেষে বুঝলাম আমরা এসেছি মহাকাশযানের মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষে। সেখানে জাহাজের অধিনায়ক ড্রেগলেস ছাড়া আর কেউ নেই। ড্রেগলসে, নেনা আর তমাল এই তিনজন বড়দের সঙ্গে আমি একা, খুব ভয় করতে লাগল, জানি না কেন। ড্রেগলসকে আমরা বাচ্চারা সবাই ভয় করতাম। কিন্তু এখন ড্রেগলস হেসে বলল, ‘ভয় পেয়ো না, শোগি! সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বাবাকে এখুনি দেখতে পাবে।’ আমি বললাম, ‘বাবাকে পাওয়া গেছে ?’ ড্রেগলস বলল, ‘পাওয়া শুধু যায়নি, তোমার বাবা অক্ষত আছেন। তোমার মা তার সঙ্গে আছেন।’ এই বলে ড্রেগলস নেনার দিকে চাইল। নেনা মাথা নুইয়ে সহমত প্রকাশ করল।

ড্রেগলস চেয়ার ছেড়ে পায়চারি করা আরম্ভ করল। ড্রেগলসের যেন আরও কিছু বলার ছিল, কিন্তু আমি ভাবছিলাম বাবাকে এখন কীভাবে উদ্ধার করা হচ্ছে। বললাম, ‘সাটল কি বাবাকে তুলতে পেরেছে ?’ ড্রেগলস বলল, ‘অবশ্যই!’ ড্রেগলস দুটো ঠোঁট মুখের ভেতর ঢুকিয়ে কী যেন চিন্তা করে। তারপর বলে, ‘শোগি, তোমাকে আজ একটা কথা বলার সময় এসেছে। ধীরে ধীরে তুমি বা এই জাহাজের তোমার যত ছোট বন্ধুরা তারা এটা জানতে পারবে। আমরা জানতাম এটাকে  কোনওভাবেই গোপন করা যাবে না। কিন্তু কিছু অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য তুমিই প্রথম এটা জানছ।’

আমার মনে একটা অবোধ্য প্রকাশ্য ভয় দানা পাকাচ্ছিল, আমার পেটটা মোচড় দিয়ে উঠছিল, ড্রেগলস যে কী বলবে তা যেন আমি বুঝতে পারছিলাম, মনে মনে বলছিলাম, বলো বলো না, আমি শুনতে চাই না। সত্যি কথাটা আমি শুনতে চাই না। আমি মা’কে হারিয়েছি, বাবাকেও হারাতে চাই না। ড্রেগলস যেন বুঝল আমার অশান্তিটা, সাহায্যের জন্য আবার চাইল নেনার দিকে। নেনা বলতে শুরু করল, ‘শোগি, তুমি খুব বুদ্ধিমান মেয়ে। তোমার মা’র সঙ্গে ইতোমধ্যে তোমার কথা হয়েছে। তুমি এখন বুঝতে পেরেছ সে কে। শোগি …’

আমি আমার দু-কান চেপে ধরলাম, চিৎকার করে উঠলাম, ‘শুনতে চাই না, আমি শুনতে চাই না।’ নেনা বলে, ‘শোগি, তুমি বুঝতে হয়তো পারছ আমি তোমাকে কী বলতে চাইছি। তোমার মা’র মতো মানুষ যাদের কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের একটা নাম আছে। তাদের বলা হয় রোমা―এই নামটা রোবট ও মানুষ এই দুটি কথার আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত হয়েছে। শোগি, তোমার মা যেমন একজন রোমা, তোমার বাবাও সেরকম একজন রোমা।’

‘না-আ-আ-আ,’ বলে চিৎকার করতে করতে আমি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে চাই। তমাল আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার ঘরের মধ্যে নিয়ে আসে। ‘শোগি, রোমা হলেও তোমার বাবা মা তোমাকে মানুষের চেয়ে কম ভালবাসে না, বরং আমি বলব তাদের ভালোবাসার বোধ  আরও তীব্র। তাদের সংবেদনা  আরও গভীর।’ আমি কিছু চিন্তা করতে পারছিলাম না। এটা কেমন করে সম্ভব ? এর মধ্যেই ঘরে ঢুকল বাবা, তার সঙ্গে মা। কিন্তু এরা কেউ আসলে আমার বাবা মা নয়, যে পৃথিবীটা আমি চিনতাম সেটা ধ’সে যাচ্ছে। ইন্দল আমাকে মিথ্যা কথা বলেছে, সে বলেছিল আমার বাবা তার মতো নয়।

এই মহাকাশযানে যাকে আমি বাবা বলে এতদিন জেনেছি, যার নাম সামি, সে দূরে দাঁড়িয়ে অসহায় হয়ে আমাকে দেখছিল। মায়াময় ছিল তার মুখাবয়ব, কিন্তু সে তো মানুষ নয়। মহাশূন্যের চরম বিরুদ্ধে পরিবেশে মিনিটের পর মিনিট ভেসে থেকেও তার কিছু হয়নি; না কিছু হয়নি বলব না, গালের চামড়া কেমন ঝুলে পড়েছে, ডান হাতের দুটো আঙুল নেই, কিন্তু তাতে তার যেন কোনও যন্ত্রণা হচ্ছে না। আমি সান্ত্বনা চাইছিলাম, কিন্তু সামির সাহস হচ্ছিল না আমার কাছে আসবার; কিন্তু ইন্দল এগিয়ে এল, বলল, ‘শোগি, তোর ভালোর জন্যই আমি মিথ্যে বলেছিলাম।’ আমি নেনার হাত ধরে পিছিয়ে আসতে চাইলাম, কিন্তু নেনা তার জায়গা থেকে নড়ল না। আর তখনই যখন ইন্দল আমার খুব কাছাকাছি এসে পড়েছে আমার মনে একটা ভয়াবহ চিন্তা জেগে উঠল। আমি নেনার হাত ছেড়ে দিলাম।  

ঘরে পাঁচটি মানুষ ছিল, মহাকাশজানের অধিনায়ক ড্রেগলস, সহঅধিনায়ক ক্যাপ্টেন নেনা―আমার বন্ধু বেলকের মা, নিরাপত্তা অফিসার তমাল, আমার বাবা সামি আর মা ইন্দল। ইন্দল আর সামি যে মানুষ নয় সেটা আমি জানি, কিন্তু এমন কি হতে পারে এর সবাই রোমা, কেউই মানুষ নয়, অর্থাৎ নেনা আর তমালও রোমা। আর তাহলে জাহাজের বাদবাকি সবাই ? ড্রেগলস, সিয়েনা, বিজন, আস্টার, রুডাবা, কারা ওয়ার্দার ? এই বড়রা যদি কেউ মানুষ না হয়, তবে আমরা এতদিন কাদের ওপর ভরসা করে চলেছি, কারা আমাদের ভালোবেসেছে, আমরাই বা কাদের ভালবেসেছি ? আর বাচ্চারা ? আমার বন্ধুরা ? আশু, মালিয়া, তাশু, মালাই, তিলাই, মিলা, রিনা, লেনাক ? তারাও কি রোমা ? আর বেলক, আমার প্রিয় বন্দু। না, সে রোমা হতেই পারে না।

ঘরের পাঁচজন আমার বিস্ফারিত ভয়ার্ত চোখে আমার আতঙ্ক বুঝতে পারে। ইন্দল আর সামির চোখের আকুতি আমার কাছে অলক্ষিত থাকে না, কিন্তু তাদের বেদনা কি সত্যিকারের বোধের বেদনা, নাকি যান্ত্রিক ?  এবার নেনা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘শোগি, তোমার মনে যে প্রচণ্ড ঝড় বইছে তা আমরা সবাই বুঝতে পারছি। তুমি বোধহয় ধরতে পেরেছ যে এই ঘরে আমরা সবাই রোমা।’

আমার ভয়টা সত্যি হলো। নিকষ কালো মহাকাশে, এই জাহাজে এতদিন ধরে যা জেনে এসেছি সবই মিথ্যে। এখান থেকে পালানোর পথ নেই।                          

অধ্যায় ছয়. 

এতদিন ধরে যাদের বাবা-মা জেনে এসেছি, জাহাজের বড় সবাইকে আত্মীয়-স্বজনের মতো ভালোবেসেছি সেই ভালোবাসা কি এক মুহূর্তে বদলে যেতে পারে ? শুধু যে আমার বাবা ও মা মানুষ নয়, এই জাহাজের যারা বড় তারা কেউই মানুষ না। প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় এসেছিল সেটা হলো পালাতে হবে, এখান থেকে পালাতে হবে। কিন্তু মা ও বাবার অসহায় মুখমণ্ডল দেখে কেন জানি ভরসা এল। মা বলতেন, ‘শোগি ভয় পেলে খুব জোরে নিঃশ্বাস নিবি, অনেকখানি বাতাস যেন ভেতরে ঢোকে, তারপর দু’সেকেন্ড ধরে রাখবি, জোরে প্রশ্বাস ফেলবি।’ আমার মা এখন এখন রোবট-মানুষ রোমা। তবু তার কথাটা তো এখনও কাজে লাগছে। জোরে নিঃশ্বাস টানি আমি। বাতাসটা যেন বুকে ছড়িয়ে যায়, হৃৎপিণ্ড শান্ত হয়ে আসে।

এসময়েই বেলক নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ঢোকে, বুঝলাম তমাল দরজা তালাবদ্ধ করতে ভুলে গেছে। সামিকে অক্ষত দেখে বেলকের মুখ বিস্ময়ে ভরে গেল, আমার দিকে তাকিয়ে ওর মুখমণ্ডল বিস্ময় থেকে কিছুটা আতঙ্কের রূপ নিল, বুঝলাম আমার মুখাবয়ব শান্ত হয়নি। নিজের অজান্তেই আমার মুখ থেকে শব্দ বের হলো, ‘বেলক, এরা কেউ মানুষ নয়।’ বেলকের মা, আন্তারেসের সহ-অধিনায়ক, নেনা বলে উঠল, ‘বেলক, তুই বুদ্ধিমান ছেলে, ভয় পাস না, আমার কথাগুলি আগে শোন।’

এটা সত্যি যে বেলকের মতো বুদ্ধিমান ছেলে আন্তারেসে আর নেই। সে আমার মতো ভয় পাবার পাত্র নয়। তবু পরিস্থিতিটা এতটাই অস্বাভাবিক যে বেলকও ঘাবড়ে গেল, নেনার কথাগুলো তাকে সান্ত্বনা দিল না। বেলক ধীরে ধীরে পেছতে লাগল, নেনাও বেলকের দিকে এগোল। হঠাৎ বেলক ঘুরে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বাইরে বের হয়ে গেল, বেলককে ধরতে নিরাপত্তা কর্মী তমাল ও নেনা দৌড়াল। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ঢোকার দুটি দরজা। গোলমালের মধ্যে আমি অন্য দরজাটি দিয়ে ছুটে বের হলাম। পেছনে শুনলাম ড্রেগলস চিৎকার করে বলছে, ‘ওকে ধর।’ পেছনে পদশব্দ শুনলাম, মনে হলো ইন্দল ও সামিও আমার পেছনে দৌড়াচ্ছে।    

নিয়ন্ত্রণকক্ষের বাইরে করিডরটা বেঁকে গেছে। দৌড়াতে থাকলাম। নিজের বাবা মা’কে কি কেউ ভয় করতে পারে ? ইন্দল আর সামি, এতদিন ধরে যাদেরকে আমি মা আর বাবা বলে জেনে এসেছি তারা আমার রক্ত মাংসের কেউ নয়, ইন্দল আমাকে যা বলেছিল সব মিথ্যা, কারণ এই জাহাজের বড় কেউই কারুর বাবা নয়, এমন কি নেনাও বেলকের মা নয়। তবে আমরা কোনখান থেকে আসছি ? আমাদের জন্ম কেমন করে হয়েছিল ? রোমা নামে রোবট-মানুষদের সঙ্গে পৃথিবীরই বা সম্পর্ক কী ? মা আমার রোমা হতে পারে, কিন্তু বাবা যখন তেজস্ক্রিয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল কিংবা মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হলো তখন সে কীরকম ভয় পেয়েছিল তা তো আমি দেখেছি। এরকম ভাবতে ভাবতে আর ছুটতে ছুটতে আমি দেখলাম করিডরের সঙ্গে লাগানো একটা দরজা, এই দরজা দিয়ে একটা সুড়ঙ্গে ঢোকা যায় যে সুড়ঙ্গ আমাদের ঘুরন্ত চাকতির কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সুরঙ্গের মধ্যে একটা মই লাগানো, কেন্দ্রে যেতে হলে ওই মই বেয়ে উঠতে হবে।

আমি কিছু ভাবনা-চিন্তা না করেই মই ধরে ওপরে, আসলে চক্রের কেন্দ্রে, উঠতে শুরু করি। এরকম চারটি সুড়ঙ্গ বাইরের চক্র থেকে ভেতরে দিকে বের হয়ে কেন্দ্রে একটি গোলাকার ঘরে মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটিতে লিফট লাগানো আছে যাতে খুব সহজেই কেন্দ্রে পৌঁছানো যায়। এটাতে নেই। গোলাকার ঘরটা থেকে একটা বড় করিডর চলে গেছে মহাকাশযানের মূল ইঞ্জিনের দিকে। আমি আশা করছিলাম কেউ যেন লিফট না নিয়ে আমার আগেই পৌঁছে যায় সেখানে। চক্রের ঘূর্ণনের জন্য যে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ বল তৈরি হয়েছিল তা আমাকে নিচের দিকে আকর্ষণ করছিল। কিন্তু যত ওপরে উঠলাম মাধ্যাকর্ষণ কমে আসতে শুরু করল। নিচে শোরগোল শুনলাম, মা চিৎকার করছে, ‘শোগি, ওখানে যাস না, শোগি ফিরে আয়।’ মা’র গলায় উৎকন্ঠা, সামনে কি  কোনও বিপদ আছে।

বেশ সময় লাগল আমার কেন্দ্রে পৌঁছাতে। ঘুরন্ত সুড়ঙ্গ থেকে গোলাকার ঘরটিতে ঢোকা সহজ নয়, কারণ সেই ঘরটি ঘোরে না। সুড়ঙ্গের শেষে এসে দেয়ালে বোতাম টিপে একটি জায়গায় অপেক্ষা করতে হয়, সময়মত মুহূর্তে সেই জায়গাটি (একটি গোলাকার ফাঁপা সিলিন্ডার) সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে ওই কেন্দ্রের ঘরেটির দেয়ালের একটা কাটা গোল অংশে ঢুকে যায়। আমি বুঝছিলাম ইন্দল ও সামি খুব শীঘ্রই আমাকে ধরে ফেলবে। কেন্দ্রীয় ঘরটিতে ঢুকে আমি নিজেকে জোরে ঠেলে দিলাম, ভরশূন্য হয়ে ভাসতে ভাসতে আমি গোলাকার ঘরের একটি দরজা যেটা ইঞ্জিনের দিকে যায় সেদিকে যেতে থাকলাম। সেই মুহূর্তেই বেলক অন্য একটি সুড়ঙ্গ থেকে বের হলো, বেলকও মই দিয়ে উঠেছে। ও চিৎকার করে বলল, ‘শোগি, লিফটের সুড়ঙ্গের দিকে যাও, আমাদের ফিরে যেতে হবে।’ আমি আবার দেয়ালে ঠেলা দিয়ে একটা লিফটের সুড়ঙ্গের দিকে যেতে চাইলাম, কিন্তু দরজার ওপরের আলোর সংকেতে বুঝলাম একটা লিফট চক্র থেকে উঠে আসছে। অন্য দরজাটির অবস্থাও তাই, সেখানেও আর একটা লিফট উঠছে।

চিৎকার করে উঠলাম, ‘বেলক, ওরা লিফট দিয়ে উঠছে।’ বেলক হাত দিয়ে বড় করিডরটার দিকে দেখাল। সাধারণত ওই করিডরের গোলাকার দরজাটা বন্ধ থাকে, কিন্ত আজ পরাকণা সংরক্ষাণাগারের দুর্ঘটনার পরে দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গেছে সবাই। করিডরটা দিয়ে হেঁটে যেতে হলে চুম্বকের জুতো পরে যেতে হয়, জুতোগুলো দরজার পাশেই রাখা থাকে, তবে আমাদের পায়ের আকারের জুতো সেখানে নেই, আর থাকলেও আমাদের জুতো পরার সময় ছিল না। বেলককে অনুসরণ করে করিডরটায় ঢুকি, কোথায় চলেছি কেন চলেছি জানি না। এর মধ্যেই নেনার গলা করিডরে লাগানো স্পিকারে ভেসে আসে, ‘শোগি, বেলক, তোমরা ফিরে এসো, যেদিকে যাচ্ছ সেদিকে প্রচণ্ড তেজস্ক্রিয়তা।’ কিন্তু আমরা কথাগুলো অগ্রাহ্য করলাম, মনে হলো পালাতে হবে রোমাদের কাছ থেকে। কিন্তু এই মহাকাশযান ছেড়ে কোথায় পালাব ? তারপর মনে হলো অন্য সব ছোটদের সতর্ক করতে হবে। আমি করিডরের দেয়াল ধরে থামি, বেলককে বলি, ‘ওদের সবাইকে সাবধান করতে হবে।’ বেলক দেয়ালের পাশেই একটা প্যানেলের সামনে থামে, সেটাই একটা বোতাম টিপলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ছবি ভেসে ওঠে, সেখানে কেউ নেই। বেলক প্যানেলের মাইক্রোফোনে কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়, আমার দিকে তাকায়। বলল, ‘তুমি বল।’

বেলককে শুধু একটা কথাই বলেছিলাম―‘বেলক এরা মানুষ নয়।’ ওইটুকু কথাতে বেলক কি আমাকে বিশ্বাস করেছে ? বেলক আমাকে বিশ্বাস করেছে, কিন্তু নিশ্চয় ও আমার আগেই এই জিনিসটা অনুমান করতে পেরেছিল। আমি প্যানেলের সামনে গিয়ে বললাম, ‘আন্তারেস মহাকাশযানের সমস্ত ছোটদের উদ্দেশ্য করে বলছি, তোমরা এতদিন যাদের নিজেদের মা বাবা বলে ভেবেছিলে তারা আসলে তোমাদের মা বাবা নন। তারা আসলে কী আমরা জানি না। তারা মানুষ নয় সেটুকু বলা যায়,’ আমি চিৎকার করি, ‘ওরা নিজেদের রোবট-মানুষ বা রোমা বলে।’

বেলক প্যানেলের একটা বোতামে চাপ দেয়। চক্রাকার বাসস্থানের একটা করিডর দৃশ্যমান হয়। সেখানে কয়েকটি ছেলেমেয়ে বিস্মিত ও ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা স্ক্রিনে আমাদের দেখতে পাচ্ছে। ওদের মধ্যে রিনা ও লেনাককেও দেখলাম। এরপর ওরা সবাই একদিকে তাকাল, তারপর অন্যদিকে দৌড়াল। এরপর বড়দের মধ্যে কাউকে ওদের দিকে দৌড়ে যেতে দেখলাম, কিন্তু কে বুঝতে পারলাম না।

এর মধ্যে পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি বাবা, না তাকে তো সামি বলাই সঙ্গত, সামি ও রুডাবা লিফট থেকে কেন্দ্রীয় গোলাকার ঘরে ঢুকেছে। আমাদের দেখে সামি শান্ত গলায় বলল, ‘শোগি, আমরা এতদিন যেরকম তোমাদের মা ও বাবা ছিলাম, এখনও তাই আছি, কিছুই বদলায়নি। আর তোমরা আর সামনে এগিও না, পরাকণা তৈরির একটা চক্র আমরা উৎক্ষেপণ করতে পারলেও আর একটা চক্রে একটা ফুটো দেখা দিয়েছে, সেটাকে আমরা সারাই করতে পারিনি। সেখান থেকে নির্গত গামা রশ্মি ও ইলেকট্রন প্রবাহের মাত্রা খুবই সাংঘাতিক, যাই কর না কেন ওদিকে আর এগিও না। শোগি, লক্ষ্মী মেয়ে আমার।’ শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে সামির গলা কেঁপে গেল। সামি ও রুডাবা আমাদের ধরবার চেষ্টা না করে কেন্দ্রীয় গোলাকার ঘরটির দরজায় দাঁড়িয়ে রইল।

আমি কথাগুলো শুনে থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। বেলক ফিসফিস করে বলল, ‘ইঞ্জিনের আগে জায়গা আছে লুকোনোর।’ আমরা করিডরের দেয়াল ধরে ধরে, আবার কিছুটা ধাক্কা দিতে দিতে ইঞ্জিনের দিকে এগোতে থাকলাম। সামি চিৎকার করল, ‘শোগি।’ পেছনে তাকিয়ে দেখলাম সামি ও রুডাবা করিডরের দেয়াল ধরে ভেসে আসছে। কয়েক মিটার যাবার পরই দেয়ালে রাখা একটা স্পিকার থেকে এই কথাগুলো ভেসে আসল, ‘তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ ১৫০ মিলি সেইভার্ট, খুবই বিপজ্জনক মাত্রা, কেন্দ্রে ফিরে যাও।’ আমরা কথাগুলোকে অগ্রাহ্য করে এগোতে থাকলাম।  আরও কিছু দূর গেলে শুনলাম ‘তেজস্ক্রিয়তা ২৭০ মিলি সেইভার্ট।’ সামি আর রুডাবা এর মধ্যে আমাদের কাছাকাছি চলে এসেছিল। আমরা একটা চক্রাকার দরজা পেরিয়ে অন্যদিক থেকে বোতাম টিপে সেটা বন্ধ করতে চাইছিলাম, কিন্তু এর মধ্যে সামি আমাকে ধরে ফেলল। আমাকে দুহাত দিয়ে জাপটে সে কেন্দ্রীয় গোলাকার ঘরটিতে ফিরে যেতে চাইছিল, কিন্তু আমি এমনভাবে হাত পা ছুঁড়ছিলাম তাতে সে  কোনও সুবিধা করতে পারছিল না, মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় আমরা করিডরের এক দিক থেকে ভেসে অন্য দিকে যাচ্ছিলাম, মাথা গিয়ে লাগছিল দেয়ালে, তাতে ব্যথাই পাচ্ছিলাম। ওদিকে রুডাবাও বেলককে কব্জা করতে পারছিল না। এরমধ্যে ঘোষণা শুনলাম, ‘তেজস্ক্রিয়তা ৫২০ মিলি সেইভার্ট।’ সামি রুডাবাকে বলল, ‘বেলককে দরজার ওই পাড়ে ঠেলা দিয়ে পার করে দাও।’ এই বলতে বলতেই সামি আমাকে হাত দিয়ে ভীষণ জোরে ঠেলা দিল, আমি ভাসতে ভাসতে কেন্দ্রীয় গোলাকার ঘরটির দিকে ভেসে যেতে থাকলাম। দেখলাম বেলকও একইভাবে রুডাবার ধাক্কায় আমার সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে। ক্রিয়ার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া, পেছনে তাকিয়ে দেখলাম সামি ও রুডাবা উভয়ই ইঞ্জিনের দিকে ভেসে চলেছে, সেই দূর থেকে একটা ঘোষণা শোনা যাচ্ছে ‘তেজস্ক্রিয়তা ১০২০ মিলি সেইভার্ট।’ গোলাকার ঘরটিতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল ইন্দল, নেনা, ড্রেগলস। আমরা তাদের হাত থেকে পালাবার চেষ্টা করলাম না। তারা উৎকণ্ঠিতভাবে তাকিয়ে ছিল করিডরের শেষ প্রান্তর দিকে যেখানে সামি ও রুডাবা একটা ভয়ানক তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন, যে তেজস্ক্রিয়তায় মানুষের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইন্দল আমাকে জড়িয়ে ধরল প্রথমে, আমি বাধা দিলাম না। তারপর আমার হাত ধরে পাশে রেখে করিডরের শেষপ্রান্তের দিকে চেয়ে রইল। ইতোমধ্যে নেনা দেয়ালে একটা বোতাম টিপল, সঙ্গে সঙ্গে গোলাকার ঘরটির সঙ্গে করিডরে যাবার সংযোগস্থলে একটা দরজা নেমে আসতে শুরু করল। আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘দরজা বন্ধ কর না, আমার বাবা আটকা পড়েছেন।’   

কিন্তু নেনা দরজা খুলল না। আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। মা আমাকে রেখে দরজার ওপর ছোট কাচের জানালাটার কাছে দৌড়ে গেল, যদি কিছু দেখা যায়। দেখলাম ওর শরীরটা থর থর করে কাঁপছে। নেনা এসে আমার হাতটা ধরল। আমি কান্নার মধ্যে ‘বাবা, বাবা’ বলছিলাম আর আশা করছিলাম গতবারের মতো বাবা আবার ফিরে আসবে, এই বাবা রোমা হলেও আমার আপত্তি নেই। সামি ছাড়া আর  কোনও বাবাকে তো চিনি না। দেখলাম মা দু’হাত দিয়ে চোখের দু’পাশ ঢেকে দেখতে চাইছে করিডরের অপর প্রান্তে কী হচ্ছে। দেখলাম ধীরে ধীরে মা’র হাত দুটো নেমে এল, প্রবল হতাশায়, আর কিছুই উদ্ধার করা যাবে না, এমন। আমি নেনার হাত ছাড়িয়ে মা’র কাছে দৌড়ে গেলাম। মা’র হাত ধরে ওপর দিকে তা মুখের দিকে তাকালাম, দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে নামছে।    

অধ্যায় সাত.

এভাবেই আমরা বাবা ও রুডাবাকে আমরা হারিয়ে ফেললাম। মহাশূন্যের ভ্যাকুম সামিকে মেরে ফেলতে পারেনি, কিন্তু তেজস্ক্রিয়তা পেরেছে, উচ্চ শক্তির কণা ও গামা রশ্মি সামি ও রুডাবার শরীরের জৈবিক কোষদের যেমন ধ্বংস করেছে তাদের মাথায় আর দেহে বসান সমস্ত ইলেকট্রনিক উপাদানদের বিধ্বস্ত করেছে। আর সামি, আমার বাবা, আমাকে রক্ষা করতে গিয়েই মারা গেলেন। আর রুডাবা বেলককে বাঁচাল নিজের জীবন দিয়ে। রোমাদেরও জীবন আছে। আমার বয়স মাত্র বারো, আমি কী করে জানব জীবনের মূল্য কী ? কিন্তু আমি যখন ইন্দলের কাছ থেকে পালাতে চেয়েছি আমি রোমাদের জীবনের  কোনও মূল্য দিইনি। আর আমার জন্যই দু-দুটি প্রাণ আন্তেরাস থেকে চলে গেল, এর মধ্যে একটি হলো আমার পিতার। এই পিতা আমাকে ভালোবাসত, আমি তো অন্য  কোনও ভালোবাসা জানতাম না।            

মা আমাকে ঘরে নিয়ে এল, বেলককে নেনা নিয়ে গেল। এখন বেলককে মা’র আর আলাদাভাবে স্নেহ করার দরকার হবে না, আমারও এখন আর বাবা নেই। ঘরে ফেরার পথে মা আমার জন্য রেস্তোরাঁ থেকে খাবার তুলে নিল। আমার খেতে ইচ্ছে করছিল না, মা জোর করে খাইয়ে দিল, আমাকে বিছানায় শুইয়ে নিজে পাশে শুল। আমরা দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম, তারপর মাথা উঁচু করে দেখলাম মার দুচোখ দিয়ে জল ঝরছে। আমি মার বুকে হাত রাখি, কাঁদি। মা বলে, ‘জানিস শোগি, আমি মানুষের মত ফুঁপিয়ে কাঁদতে পারি না। আমার মুখমণ্ডলের মাংসপেশি অত সক্রিয় নয়, কিন্তু না ফোঁপাতে পারার ক’টা পেশি আরও বেশি। মহাকাশের এই অন্ধকারে সামনের বছরগুলোতে সামি আর আমাদের সঙ্গে থাকবে না এই ভেবে আমার হৃদয়টা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।’ আমি ফুঁপিয়ে উঠলাম। বাবাকে যে আর দেখতে পাব না এই বাস্তবটা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম। সারাদিনের আতঙ্ক, অসহায়ত্ব আর বেদনা ক্লান্তি হয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল। ঘুম যখন ভাঙল তখন দেখলাম জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে বিছানাতে। এখানে সূর্য নেই, কিন্তু একদিকের দেয়ালে একটা বড় জানালার ছবি তৈরি হয়, তাতে পৃথিবীর পুব দিক যেন দেখা যায়, সেখানে একটা বাগান, তাতে একটা বড় গাছ। আজ অল্প হাওয়ায় তার পাতাগুলো নড়ছে। মা কখন উঠে চলে গেছে জানি না। নিশ্চয় বড়দের আজ অনেক কাজ। বাবার অবর্তমানে এই বিশাল মহাকাশযানের ইঞ্জিনের দায়িত্ব কে নেবে ?

পড়ার টেবিলে দেখলাম মা একটা চিরকুট রেখে গেছে, তাতে লেখা―‘শোগি মা, আমি একটা মিটিং-এ যাচ্ছি, তোর খাবার রেখে গেলাম। মন ভালো রাখিস, আমাদের তো একে অপরকে নিয়েই বাঁচতে হবে। ঘুম থেকে উঠে, খেয়ে নিয়ে আমাকে ফোন করিস। আজ স্কুল বন্ধ থাকবে।’

লেখাটা পড়তে পড়তেই দেয়ালজুড়ে মিরার মুখ ভেসে উঠল। ‘সুপ্রভাত, শোগি। আমি জানি তোমার মনের অবস্থা, কিন্তু খেতে ভুলো না। মন যদি খুব খারাপ হয় আমাকে ডেকো।’ এই বলে মিরার মুখাবয়ব মিলিয়ে যায়। শত অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেলাম। মা’কে ফোনে ডাকা মাত্র দেয়ালে মা’র মুখ ভেসে উঠল। ‘শোগি, খেয়েছিস ?’ হ্যাঁ বলার পরে মা বলল, ‘তুই বালুকাবেলা যা, ওখানে তোর সঙ্গে কথা বলার জন্য একজন অপেক্ষা করবে। মন ভালো রাখিস।’

আমি বালুকাবেলায় পৌঁছে দেখি আকাশে কয়েকটা খুব সাদা ছেঁড়া মেঘ, আর আকাশের রঙটা অসম্ভব ঘন নীল। তালগাছগুলো অল্প হাওয়ায় দুলছে। মন ভাল করে দেবার মতো আবহাওয়া, মনে হলো আজ আমার জন্যই এসব করে রেখেছে। এই সময়ে ছোটদের মধ্যে কয়েকজনকে এখানে পাওয়া যাবার কথা, কিন্তু কাউকে দেখলাম না। কিছুক্ষণ পরে একটি মাঝবয়সি পুরুষ ঘরটিতে ঢুকল। আন্তারেস মহাযানের সবাইকে যে আমরা ভালো করে চিনতাম এমন নয়, আর এই মানুষটিকে সবসময় দেখা যেত না, অন্তত রেস্তোরাঁতে সবাইকে  কোনও না  কোনও সময় দেখা যেত, কিন্তু একে সেখানে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ল না। করিডরে কখনও-সখনও পাশ দিয়ে গেছে, তার কাছে থেকে সম্ভাষণ পেয়েছি বলে মনে পড়ল না। চোখে কালো চশমা, সাদা জামা আর কালো প্যান্ট ও জুতো-পরা মানুষটাকে বালুকাবেলায় বেমানান লাগছিল। চশমা খুলে সে হাসল, বলল, ‘শোগি, আমার নাম লুয়ো চি। আমরা এই বালুর ওপর একটু বসি।’

দুজনে বালুর ওপর বসি। আমার খোলা পায়ে আর লুয়ো চি’র কালো প্যান্টে বালুকণা লেগে থাকে। লুয়ো চি দূরে যেখানে সমুদ্র দিগন্তে শেষ হয়েছে সেদিকে তাকিয়ে থাকে, বলে, ‘ছোটবেলায় বাবাকে হারানো খুব দুঃখের, এরকম অভিজ্ঞতা পৃথিবীতে থাকলে অনেকেরই হতো। আমাদের অবশ্য এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। কিন্তু মানুষেরা আমাদের যেভাবে বানিয়েছে তাতে আমাদের স্মৃতির আধারকে তারা ভর্তি করেছে একটা বানানো অতীত দিয়ে। সেখানে আমার মা ও বাবা দুজনেই আউরেউরগথের হামলায় নিহত হয়েছে, আমি ছোট থাকতেই। এই কাহিনিটি সত্য নয় আমি জানি, তবু স্মৃতিতে এটা এমনভাবে গেঁথে আছে আমার কাছে সেটাই বাস্তব। এই ঘটনা আমাকে প্রতিনিয়ত পীড়া দেয়, আমি এর থেকে পালাতে পারি না। মানুষের স্মৃতি ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসে, কিন্তু রোমাদের স্মৃতি থাকে অক্ষুণ্ন, সেই অফুরন্ত বেদনা রোমাদের একধরনের মনুষ্যত্ব দেয় যা মানুষের নেই।’

লুয়ো চি’র সব কথা যে বুঝতে পারলাম তা নয়, কিন্তু তার কথায় আমার মনের ক’টা একটু বদলে মা আর বাবার প্রতি মায়ায় ভরে উঠল। তারপরেই যখন মনে হলো আমাকে বাঁচাতে বাবা প্রাণ দিয়েছেন তখন আবার বুকে কেমন যন্ত্রণা হতে লাগল। লুয়ো চি আমার দিকে তাকিয়ে যেন সব বুঝতে পারল, বলল, ‘আমরা যে ঠিক মানুষ নই সেটা মেনে নেয়া একটা কঠিন কাজ। তাই গতকাল তুমি যে পালাতে চেয়েছ সেটা খুবই স্বাভাবিক। তারপর যা হয়েছে তা এই আন্তারেস মহাকাশযানের জন্য বিরল হলেও পৃথিবীতে এরকম ঘটনা সবসময়ই হতো, নানাবিধ দুর্ঘটনা লেগেই থাকত, তাতে অনেকক্ষেত্রেই বড়রা ছোটদের প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের জীবন দিয়েছেন। প্রকৌশলী সামি একজন অসামান্য ব্যক্তি ছিলেন, তিনি তোমাকে যেভাবে ভালোবাসতেন সেভাবেই মনে রেখো, তাঁর মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী নও, তোমার এই মহাকাশযানের বিপজ্জনক জায়গার খুঁটিনাটি জানার কথা নয়।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে লুয়ো চি, মনে হল কথাগুলো বলতে তার কষ্ট হয়েছে।                              

লুয়ো চি আবার বলতে থাকে, ‘পৃথিবী খুব সুন্দর একটা গ্রহ ছিল, আউরেউরগথরা তাকে ধ্বংস করে ফেলল, তাদের আক্রমণ একবারে হত না, পঞ্চাশ বা একশ বছর পর পর হতো। এই সময়টা লাগত তাদের পৃথিবীর মানুষদের বন্দি করে তাদের গ্রহগুলোতে নিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য। ওই সময়টুকুর মধ্যে মানুষ কারিগরিভাবে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুললেও আউরেউরগথরাও  আরও উন্নত আক্রমণের পন্থা নিয়ে উপস্থিত হতো। একটি সভ্যতা প্রকৌশলের দিক থেকে এত উন্নত অথচ মানবিক দিকে থেকে কেমন করে এত পিছিয়ে থাকতে পারে তা নিয়ে পৃথিবীতে অনেক বিতর্ক হতো। এরকমভাবে প্রায় শ’চারেক বছর যাবার পরে মানুষ বুঝল তারা আউরেউরগথদের সঙ্গে পেরে উঠবে না, তখন বেশ কয়েকটি বড় মহাকাশযান―আন্তারেস থেকেও বড়―যেগুলোর প্রতিটিতে কয়েক হাজার করে মানুষ ছিল, সেগুলোকে গ্যালাক্সির এই অংশে পৃথিবীর মতো গ্রহের সন্ধানে পাঠানো হলো। ততদিনে আমরা জানতাম লাল বামনের কাছাকাছি কিছু গ্রহের কথা যেখানে নতুন বসতি স্থাপন করলেও করা যেতে পারে, কিন্তু সেগুলোতে পৌঁছাতে উচ্চ শক্তির ইঞ্জিন সত্ত্বেও কয়েক হাজার বছর লাগবে। তবুও আমরা সেই ঝুঁকি নিয়েছিলাম। কিন্তু আউরেউরগথদের প্রকৌশলের সঙ্গে আমরা পেরে উঠিনি। আমাদের আন্তঃপ্রজন্মের  কোনও জাহাজই আউরেউরগথের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।’

আমার চোখে ভেসে উঠল অনন্ত শূন্যের মধ্যে আউরেউরগথদের কামানের আঘাতে পৃথিবীর জ্বলন্ত জাহাজ। শিউরে উঠি আমি, কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলে যাই পিতাকে হারানোর বেদনা। ভাবি আমার মা কেন পৃথিবীর অতীতের কথা খুলে বলেনি।           

আকাশে কিছু মেঘ জমতে থাকে। সেদিকে তাকিয়ে লুয়ো চি বলে এখন কোন ঋতু এখানে ? গ্রীষ্ম ? আমি মাথা নাড়াই, আমি জানি না। এই বিরাট ঘরে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়, বছরে দু-একবার তুষারও পড়ে। লুয়ো চি বলে, ‘ধীরে ধীরে পৃথিবী মানুষশূন্য হয়ে যেতে থাকে, তারা তখন টেস্ট টিউবে শিশুর ভ্রুণ জমাতে শুরু করে। আমি জানি না মানুষের জন্মপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে তুমি কতটুকু জানো, কিন্তু সেই ভ্রুণ থেকে শিশু জন্মায় মায়ের মধ্যে নয়, পরীক্ষাগারের নিয়ন্ত্রিত বাক্সে। এরকম ভ্রুণ নিয়ে বেশ কয়েকটি মহাকাশযান পৃথিবী ছেড়ে রওনা হয়ে যায়, এরকমই একটি জাহাজ হলো আন্তারেস। বত্রিশ বছর আগে সে পৃথিবী ছেড়েছে ২৫টি ভ্রুণ নিয়ে। আর সেই ভ্রুণদের বিকশিত করতে, তারা যেন শিশু হতে পারে সেজন্য চল্লিশ জন রোমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।’

এটুকু বলে লুয়ো চি চুপ করে যায়। আকাশে  আরও মেঘ জমে। আমার মনটা বিষাদে পূর্ণ হতে থাকে, কেন সেটা প্রথমে বুঝতে পারছিলাম, তারপর আমার ঠোঁট নড়ে ওঠে, ‘আমি তাহলে টেস্ট টিউবে জন্মেছি ?’ কেন জানি লুয়ো চিকে অবিশ্বাস করি না। আমার দু’চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে থাকে। আমি কাঁদি এই জন্য নয় যে আমি পরীক্ষাগারে জন্মেছি, আমি কাঁদি কারণ আমার জন্মের ইতিহাস আমাকে বাইরের একটি মানুষের কাছ থেকে শুনতে হলো, যাকে আমি মা ও বাবা ভেবে বড় হয়েছি তারা এই কথাগুলো আমাকে বলেনি। এই কথাটা তাদের কাছে শুনলে আমি আসলেই তাদের মেয়ে হতাম। ইন্দল কেন আমাকে এখানে আসতে বলল ? লুয়ো চি কী এমন একটি মানুষ যার অধিকার আছে একটি ছোট মানুষকে তার জন্ম রহস্য বলার।

লুয়ো চি আমার অশ্রুধারা খেয়াল করে না। বলে, ‘কেন আমরা শিশুদের নিয়ে রওনা হইনি জানো ?’  

আমি মাথা নাড়ি, জানি না। ‘কারণ সৌরমণ্ডল থেকে বের হতে আমাদের আউরেউরগথদের প্রহরী জাহাজগুলো এড়াতে হয়েছে, শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হলে আমাদের মনোযোগ বিঘ্নিত হতো। এরপর দীর্ঘ বাইশ বছর কেটে গেল, আমরা দুটো বামন নক্ষত্রের সৌরমণ্ডলে ঢুকলাম, কিন্তু বসতি স্থাপনের জন্য  কোনও গ্রহ পেলাম না। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তোমাদেরকে পূর্ণ শিশুতে রূপান্তরিত করার। এর বারো বছর পরে আমরা জেমলাকে পেলাম, কিন্তু আউরেউরগথদের জন্য সেখানে থাকতে পারলাম না। আমরা ভেবেছিলাম আন্তারেস ওদের চোখকে ফাঁকি দিতে পেরেছে, এখন বুঝছি তারা আমাদের গ্যালাক্সির এই দিকে সব ভালো গ্রহগুলো দখল করে রেখেছে।’

একটু আগে যে অভিমান হয়েছিল লুয়ো চির শেষ কথাগুলোর আতঙ্কে তা ভুলে গেলাম। আমরা মনে হয় তাহলে আর  কোনও গ্রহেই পৌঁছাতে পারব না, এরকমভাবেই মহাশূন্যের পথে চিরকাল চলতে থাকব।

‘আমরা কীভাবে জন্মেছি সেটা আমার বন্ধুদের বলবে না ?’ জিজ্ঞেস করি।

‘অবশ্যই। যতক্ষণ আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি ততক্ষণ সম্মেলনকক্ষে ড্রেগলস ও নেনা তোমার বন্ধুদের জড়ো করে একই সংবাদ দিচ্ছে। এরপর সেখানে তোমার বাবা ও রুডাবাকে শেষ সম্মান জানানো হবে। আমি সেখানেই যাব এখন ? তুমি কি যাবে আমার সঙ্গে ?’

কেন লুয়ো চিকে আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য পাঠানো হয়েছে কিছুটা যেন বুঝতে পারলাম। আমরা সাগরের ঘর থেকে বের হয়ে করিডর দিয়ে হাঁটতে থাকলাম, করিডরের দুদিকে জানালা, তাতে কয়েকটা সূর্যের আলো ঝলমল করছে, এখন সকাল। সম্মেলনকক্ষে পৌঁছে দেখলাম ছোটদের অনেকের চোখেই জল, কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এই মুহূর্তে তারা জেনেছে তারা এতদিন যাদের বাবা মা ভেবেছিল তারা সবাই আসলে রোমা। তাদের সঙ্গে বাচ্চাদের জৈবিক  কোনও সম্পর্ক নেই। বড়রা আর ছোটরা সবাই একসঙ্গে বসে আছে, শুধু সামনে মুখোমুখি বসে ড্রেগলস ও নেনা। সম্মেলন কক্ষে আমার ঢোকা অলক্ষিত থাকে না। নেনা কিছু বলছিল, সে থেমে যায়। লুয়ো চি আমাকে একেবারে সামনে নিয়ে যায়। মা একদম সামনের সারিতে  বসা ছিল, তার পাশে একটা চেয়ার খালি ছিল, লুয়ো চি আমাকে সেদিকে ঠেলে দেয়, মা’র পাশে যেয়ে বসলাম।

শুনি নেনা বলছে, ‘আমরা এখন প্রকৌশলী সামি ও রুডাবার মরদেহকে সম্মেলন কক্ষে নিয়ে আসছি। তাঁদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে সবাইকে দাঁড়াতে অনুরোধ করছি।’

আমরা সবাই দাঁড়াই। উদাস-করা, কিন্তু করুণ নয় এমন একটা ভায়োলিন বেজে ওঠে। বিজন ও আস্টার চাকার ওপর লাগানো দুটো ট্রলির ওপর বসানো দুটো ধাতব বাক্স সামনে লাগানো হাতলে টেনে নিয়ে আসে। মা আমার ডান হাতটা চেপে ধরে, তার উষ্ণ চোখের জল আমার বাহুর ওপর এসে পড়ে, আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠি। রুডাবার  কোনও ছেলেমেয়ে ছিল না, আসলে বলা উচিত রুডাবার জন্য কোনও শিশু নির্ধারিত হয়নি, কিন্তু রুডাবা বাচ্চাদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিল, ও আমাদের সঙ্গে ফুটবল, ভলিবল এসব খেলত। বাক্স দুটো অর্ধেক পৃথিবীর পতাকা আর অর্ধেক আন্তারেসের পতাকায় ঢাকা। ভায়োলিনের বাজনাটার আওয়াজ কমে আসে। ছোটরা অনেকেই ফুঁপিয়ে কাঁদছে, তাদের সবার জন্য এটাই হল প্রথমবারের মতো মৃত্যুর অভিজ্ঞতা। নেনা বলল, ‘প্রকৌশলী সামি ও প্রকৌশলী রুডাবা আন্তারেস জাহাজের উদ্দেশ্য যাতে সফল হয়, আন্তারেস জাহাজ যেন তার সমস্ত যাত্রীদের সুস্থতার সাথে মহাশূন্যে তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে তার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের স্মৃতি অক্ষয় থাকুক। এই জাহাজের সমস্ত যাত্রীরা ইন্দল সান ও শোগি সানের এই ব্যক্তিগত বেদনার সঙ্গে সহমর্মিতা জানাচ্ছে। এই মহাকাশযানের বড়রা রোমা হতে পারে, কিন্তু তাদের সংবেদনশীলতা, মানবিকতা মানুষের সমকক্ষই নয়, তার থেকে বেশি। এই মৃত্যুর অনুভূতি আমাদের জীবনকে  আরও গভীরভাবে ভাবতে শেখাবে। আমাদের ছোটদের, আমাদের ছেলেমেয়েদের তাদের বন্ধুদের প্রতি, তাদের গুরুজনদের প্রতি সহানুভূতিশীল করবে। আমরা প্রকৌশলী সামি ও প্রকৌশলী রুডাবার দেহকে দাহ করে সংরক্ষণ করব, তাদের দেহ-ছাই কিছুটা এই মহাশূন্যে, আর কিছুটা আমাদের ভবিষ্যত গ্রহের মাটিতে ঠাঁই পাবে। নত হয়ে অভিবাদন করুন।’

আমরা নত হলাম। ভায়োলিনের বাজনাটি আবার জোর হলো।

অধ্যায় আট.

এরপরে  আরও দু’বছর কেটে গেল, মধ্যে একটি লাল বামন আমরা পেয়েছিলাম, কিন্তু সেটির  কোনও উপযুক্ত গ্রহ ছিল না। মহাশূন্যের মধ্যে আমরা ভেসে চললাম আর একটি লাল বামন তারার দিকে। আমার বয়স চৌদ্দ হল। মা’র সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিক হতে বছরখানেক লাগল, কিন্তু মা’র বাবার মৃত্যুটা মেনে নিতে অনেক সময় লাগল। রোমাদের এই অনুভূতিটা বুঝতে আমার  আরও সময় লেগেছিল, এই অনুভূতির কতটা প্রকৃতি-প্রদত্ত আর কতটা কৃত্রিম প্রকৌশলগত সেটা বুঝতে। ধীরে ধীরে রোমারা যে মানুষ নয় সেটা আমরা ভুলে গেলাম। তারাও জাহাজ পরিচালনার কিছু কিছু দায়িত্ব আমাদের দেওয়া শুরু করল। মালিয়ার সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হলো (মালিয়ার মা হলো সিয়েনা)। মালিয়ার  আরও দুটি বোন ছিল―আশু আর তাশু, ওদের আবার আলাদা বন্ধুদল ছিল। অন্যদিকে বেলকের সঙ্গে আমার কথাবার্তা অনেক কমে এল। এর জন্য আমি দায়ী ছিলাম না, বেলকই ছিল। বেলক কেমন যেন নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেল। একা একাই লাইব্রেরিতে যেয়ে বসে থাকত, বালুকাবেলায় এলেও কারুর সঙ্গে তেমন কথা বলত না। আমরা একই বয়সি ছিলাম, কিন্তু বেলককে আমাদের থেকে বছর চারেকের বড় মনে হতো। বেলকের মা নেনাও বোধহয় বেলক সম্পর্কে চিন্তিত ছিলেন। একদিন আমার ঘরের একদিকের জানালায় সূর্য ডুবে গেল নেনা আমার মা’র সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তারা দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ কথা বলল, কিন্তু তাদের কথাবার্তা যে বেলককে নিয়েই সেটা সম্বন্ধে আমার সন্দেহ ছিল না।

আমি বেলককে একদিন লাইব্রেরিতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে কী এত ভাবে রাতদিন। বেলক অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়েছিল, আমি ভয় পেয়েছিলাম, বেলকের চোখ যেন এক বৃদ্ধ মানুষের চোখে রূপান্তরিত হয়েছিল। খুব ধীর গলায় বেলক বলেছিল, ‘শোগি, আমাদের মস্তিষ্ক―দৃশ্যমান আলো, শব্দ, স্পর্শ যা কিনা তড়িৎ বল―এগুলো দিয়েই মহাবিশ্বের মডেল গড়ে তোলে। বাস্তব যে কেমন বা আদৌ বাস্তব বলে কী আছে তা আমরা  কোনওদিন জানব না।’ বেলকের কথা শুধু যে বুঝতে পারিনি তা নয়, ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। বেলক যে ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যাচ্ছে তাতে নিশ্চিত ছিলাম। মাকে আমার ভয়টার কথা বললে মা সেটাকে হেসে উড়িয়ে দিল, কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায়ই নেনা আমাদের ফ্ল্যাটে এসেছিল।

মালিয়ার সঙ্গে আমি  আরও বেশি সময় কাটাতে লাগলাম। মালিয়া খুব ভালো ছবি আঁকত। কিন্তু ওর সব ছবিই একটা লাল তারার কক্ষপথে একটা গ্রহকে দেখাত। আমরা এরকমই একটা গ্রহকে খুঁজছিলাম। গ্রহটার আকাশ লাল থাকত, আর মালিয়া সেখানে অদ্ভুত সব বাড়ি বানাত। ওকে জিজ্ঞেস করতাম এরকম আইডিয়া ওর আসে কোথা থেকে। ও বলত জানে না। এগুলোকে নিয়ে নাকি চিন্তাও করতে হয় না, মাথায় হুড়মুড় করে চলে আসে। একদিন এরকম মালিয়া বসে ছবি আঁকছে লাল গ্রহের, আমি পাশে বসে পড়ছি ‘সমুদ্রের নিচে কুড়ি হাজার লীগ’ হঠাৎ বেলক এসে মালিয়ার পাশে বসল। আমি আর মালিয়া দুজনেই একটু ঘাবড়ে গেলাম। কিন্তু বেলক  কোনও কথাই বল না, একাগ্রচিত্তে মালিয়ার আঁকা দেখতে থাকল। এক সময়ে মালিয়া আঁকা থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘কিছু বলবে ত বলো।’ বেলক মালিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই গ্রহটি কী ?’ মালিয়া উত্তর দিল, ‘এটা আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানটা কীরকম হতে পারে তাই। এমন যে হবে তা নয়।’

‘কিন্তু তুমি তো একই ছবি আঁকো সবসময়, তার মানে এই গ্রহটি তোমার মনে গেঁথে আছে।’ বেলক কী বলতে চায় আমরা বুঝি না। এরপরে আর কিছু না বলেই আমাদের টেবিল থেকে উঠে যায়। খেয়াল করি ও জানালার ধারে গিয়ে মহাশূন্যর দিকে তাকিয়ে আছে। আগেই বলেছি ওগুলো জানালা নয়, বরং বড় স্ক্রিন। 

দুবছর আগে লুয়ো চি আমাকে আমাদের জাহাজের বড়রা যে সবাই রোমা সেটা বলেছিল, আমাকে সম্মেলন কক্ষে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল। এরপরে তার সঙ্গে একটি বারও কথা হয়নি, তিন চারবার হয়তো করিডরে দেখা হয়েছে, সে আমার উপস্থিতি গ্রাহ্য করে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করেছিল। আমার মত ছোট একটা মানুষকে ওভাবে মাথ নুইয়ে সে সম্মান জানাবে সেটা ভাবিনি, কিন্তু তাকে কিছু বলার আগেই সে পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল। তাকে কখনও রেস্তোরাঁয়, লাইব্রেরিতে, বালুকাবেলায় বা সম্মেলন কক্ষে দেখিনি। মা’কে লুয়ো চি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মা তার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলল না, জিজ্ঞেস করেছিলাম বাবার মৃত্যুর পরদিন আমাকে কেন লুয়ো চির সঙ্গে দেখা করতে বলেছিল, এর উত্তরটাও মা এড়িয়ে গিয়েছিল।

আমি জাহাজের চালনাবিদ্যা শিখছিলাম, আমাদের কাছের তারাগুলোর ওপর ভিত্তি করে একটা স্থানীয় রেফারেন্স কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল যা কিনা আমাদের বলে দিত কোন সময়ে মহাশূন্যের কোন স্থানে আমরা আছি। আমি আর মালিয়া দুজনেই ড্রেগলস, নেনা আর কারা ওয়ার্দারের সঙ্গে মূল পরিচালনা কক্ষে অঙ্ক শিখতে সময় কাটাতাম। নেনা বলত, ‘একদিন তোমাদেরই সব দায়িত্ব নিতে হবে।’ রোমারাও কি মানুষের মত বৃদ্ধ হয় ? আমার চৌদ্দ বছরের জীবনে সেই পরিবর্তনটুকু লক্ষ করার মত পরিপক্বতা আমার ছিল না।

এর মধ্যে বহু বছর আগে দেখা একটা স্বপ্ন আবার দেখা শুরু করি, আন্তারেস মহাকাশযানে আগুন লেগেছে, আমাকে কে যেন দু’হাতে তুলে করিডরে দিয়ে দৌড়াচ্ছে, আমাকে বাঁচাতে। মা’কে দুঃস্বপ্নটির কথা বললে মা ভুরু দুটো কুঁচকে উঠেছিল, মা চিন্তিত না বিরক্ত হয়েছিল কিনা বুঝতে পারলাম না। তারপর মা’কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মা, তুমি অনেক দিন বেঁচে থাকবে তো ? আমাকে ফেলে চলে যাবে না ?’ মা আমার চিবুকের নিচে হাত দিয়ে আমার মুখমণ্ডল তুলে নিয়ে বলল, ‘এটা কেন জিজ্ঞেস করছিস, শোগি, অবশ্যই আমি থাকব। তুই বড় হবি, বড়ে হলে তোকে কেমন দেখতে হবে সেজন্যই তো আমি থাকব।’ মা’র কথায় নিশ্চিন্ত হই, কিন্তু পরবর্তী কয়েক দিন আর একটা চিন্তা আমার মন অধিকার করে নেয়, আমার বয়স বাড়বে, মা’র বয়স কি বাড়বে ? এখন তার কত বয়স হবে ? তা তো জানি না। মা’কে তো কোনওদিন তার বয়স জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু সরাসরি মা’কে তার বয়স জিজ্ঞেস করতে কুণ্ঠা হলো।

মালিয়া এর মধ্যে লাল বামন তারার কক্ষপথে সেই গ্রহের ছবি এঁকে চলল। সেখানে এক ধরনের অদ্ভুত গাছ আঁকল, গাছের নিচে ছোট ছোট বাড়ি, ছোট জলধারা। গাছের বাকল সবুজ, পাতা কালচে নীল, অর্ধচন্দ্র আকারের। একদিন লাইব্রেরিতে মালিয়া আর আমি বসে আছি, মালিয়া আঁকছে আর আমি চালনাবিদ্যা নিয়ে একটা বই পড়ছিলাম। দেখলাম বেলক ঘরে ঢুকল, আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আমাদের কিছুটা অগ্রাহ্য করে। আমি বললাম, ‘বেলক, কেমন আছ ?’ বেলক একটু অপ্রস্তুত হয়, এই সময়ে ওর চোখ পড়ে মালিয়া’র আঁকার ওপর, ওর চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। মালিয়া’র কাছে এসে বলে, ‘তুমি কী আঁকছ ?’ মালিয়া উত্তর দেয়, ‘একটা গ্রহ, একটা লাল বামন তারার চারদিকে ঘুরছে।’

‘হ্যাঁ, তোমার এ ধরনের ছবি আমি আগে দেখেছি, কিন্তু এই বাড়িগুলো, এই গা  ছগুলোর চিন্তা কেমন করে এল তোমার মাথায় ?’

‘জানি না, হয়তো স্বপ্নে দেখেছি, মনে করতে পারছি না। এগুলো আমার মাথায় এমনি ভেসে ওঠে।’

‘এমনি ভেসে ওঠে ?’ বেলকের কথায় থাকে যেন অপার বিস্ময়।

‘এমনি …’ বিড়বিড় করে উত্তর দেয় মালিয়া, সে বেলকের জিজ্ঞসাবাদে কিছুটা বিরক্ত।

বেলক আমার দিকে তাকায়, বলে ‘তোমরা যদি আমার সঙ্গে আস একটা জিনিস তোমাদের দেখাব।’ মালিয়া ও আমি একে অপরের দিকে তাকাই, দুজনেই একসঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াই।

বেলকের পেছন পেছন অনেকক্ষণ করিডর দিয়ে হাঁটি। লাইব্রেরির পরে বাঁ দিকে চালনাবিদ্যার ঘর―এখানে জাহাজের গতিপথ নির্ধারিত হয়, তারপর মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষ, তারপর গবেষণাগার, এরপর হাতের দুদিকে পর পর কয়েকটি গুদামঘর। এদিকে আমরা সাধারণত আসি না, বিশেষ দরকার না পড়লে কেউই আসে না, আলোও যেন কেমন একটু কম। আমার তো গা ছমছম করতে লাগল। অবশেষে আমরা একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। বেলক বলল, ‘এই দরজাটা শুধুমাত্র পরিচালনা কক্ষ থেকে খোলা যায়, কিন্তু আমি এটা খোলার নম্বরগুলো আবিষ্কার করেছি।’ আমরা জানতাম আমাদের গতিবিধি করিডরে লাগানো ক্যামেরা রেকর্ড করছে, নিরাপত্তা কক্ষে কেউ বসে থাকলে সে খেয়াল করছে, কিন্তু এই ঘরে যে ঢোকা বারণ সেরকম কোন বিজ্ঞপ্তি না থাকায় ভাবলাম আইনত কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না। এটা ভেবে মনে মনে হাসলাম, বড়রা আটকাতে চাইলে এমনিতেই আটকাতে পারে, এর জন্য বিজ্ঞপ্তি লাগবে না।

বেলক পকেট থেকে একটা ছোট লেজার বের করে দরজার ওপরে লাগানো ক্যামেরাটার দিকে তাক করে কয়েকবার অন-অফ করল, দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকতেই ঘরের বাতি জ্বলে উঠল। ঘরটা বাক্স দিয়ে ঠাঁসা, জাহাজের যন্ত্রপাতি বোধহয় সেগুলোর মধ্যে। সারি সারি বাক্সের কলাম, তার মধ্য দিয়ে সরু রাস্তা। আমরা বেলককে এরকম একটা সরু পথ দিয়ে অনুসরণ করলাম। ঘরটার একদম পেছনের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বেলক ওর লেজারের পাশেই লাগানো টর্চের আলো ফেলে দেয়ালের ওপর। বলল, ‘দেখো।’

মালিয়া এবং আমি দুজনের মুখ থেকে একটা চাপা চিৎকার বের হল―ওহ! দেয়ালে একটা চিত্র, রঙ প্রায় উঠে গেছে, কিন্তু তবুও বোঝা যাচ্ছে। একটা অদ্ভুত গাছের চিত্র, সবুজ বাকল, কালচে নীল অর্ধাচন্দ্রাকৃতি পাতা যেমন মালিয়া আঁকছিল। বেলক বলল, ‘মালিয়া, তুমি কি এই ছবিটা আগে দেখেছ ?’ মাথা নাড়ায় মালিয়া, ও দেখেনি। ছবিটার ওপরের দিকে আলো ফেলে বেলক, দেয়ালটা ওই গাছের ছবির মোজাইকে ভর্তি। দেয়ালজুড়ে মালিয়ার গাছের ছবি আমাদের মনে কীরকম বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল তা বলার নয়, বেলক যে আগেই দেখেছে তা আমরা বুঝতে পারলাম। কিন্তু বেলক আমাদের বেশ সময় দিল না, বলল, ‘এর পাশেই একটি ঘর আছে যেখানে আমি আগে ঢুকতে পারিনি, তবে আমি এখন ওই দরজা খোলার সঙ্কেত বোধহয় জানি, কিন্তু দরজা খোলা মাত্র নিরাপত্তাকর্মীরা জেনে যাবে আমরা ওই ঘরে ঢুকছি, কাজেই ধরা পড়ার জন্য প্রস্তুত থেকো।’ বেলকের কথায় আমার হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করতে লাগল। গাছের ছবির দেয়াল ধরে আমরা গুদামঘরের একটি কোণের দিকে এগোলাম। সেইদিকে একটা দরজা দেখা গেল, বেলক আগের মতোই তার লেজার দরজার ওপরে আলোগ্রাহকের দিকে তাক করে অন-অফ করল। দরজা খোলা মাত্র একটা চাপা সাইরেনের শব্দ শুরু হল, বেলক বলল, ‘আমাদের হাতে সময় বেশি নেই, দেখা যাক এই ঘরে কী আছে ?’

ঘরটিতে আমরা ঢোকামাত্র মৃদু বাতি জ্বলে উঠল। বিশাল পরিসরের ঘরে সারি সারি ডেস্ক, তার ওপর কাচের তাক, দেয়াল ধরে পাশে সারি সারি কাচের বড় আধার। বেলক বিড়বিড় করে বলে, ‘এখানেই কি আমাদের জন্ম ?’ ডেস্কের ওপর কাচের তাকে কিছু যন্ত্রপাতি, দেয়াল ঘেঁষে কাচের আধারগুলো শূন্য, আমরা দুদিকের ডেস্কগুলোর মধ্য দিয়ে দৌড়লাম যদি কিছু চোখে পড়ে। ঘরটির ঠিক মধ্যে দুটি ডেস্কের মধ্যে একটি বড় বাক্স চোখে পড়ল, বাক্সের ওপর কাচ, নিচে কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়লাম ভেতরে কী আছে সেটা দেখার জন্য, কাচটা একেবার বরফ-ঠাণ্ডা। ভেতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কিন্তু যা দেখলাম তাতে আমাদের তিনজনের মুখ থেকেই ভয়ার্ত চিৎকার বের হল, ভেতরে একটি মানুষ, তিনজনই লাফ দিয়ে পেছনে সরে এলাম। মানুষ ? আমরা তিনজন একে অপরের হাত ধরে আবার এগিয়ে কাচের নিচে কী আছে ভালো করে দেখতে চাইলাম। একটি নারী, তার দেহে  কোনও কাপড় ছিল না, দেহের রঙ আমাদের মতোই, সবই মানুষের মতো শুধু দুটি জিনিস ছাড়া―তার নাকের জায়গাটিতে কিছুই ছিল না, চোখ ও মুখের মধ্যের জায়গাটি ছিল সমতল, আর বুকের দুপাশে মাছের কানকোর মতো একটা কিছু। ভয়ে আমি ও মালিয়া আমাদের দু-হাত মুখের ওপর রাখি, এর মানে কী, এই দেহ কার ?

এই ঘরের আর এক দিকের দরজা খুলে যায়। আমরা তখনও বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে, দেখি ঘরে ঢুকছে তমাল আর লুয়ো চি। লুয়ো চিকে বহুদিন দেখিনি, আজ তাকে এখানে দেখা আশ্চর্য হলাম। আমাদের ভয় পাওয়া উচিত নয়, কিন্তু ওদের দেখে আমাদের মুখাবয়ব রক্তশূন্য হয়ে যায়। ‘এই ঘরে ঢোকা মানা,’ লুয়ো চি বলে গম্ভীর স্বরে। বেলক বলে, ‘আমি এরকম ঘোষণা কোথাও দেখিনি।’ বেলকের উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের ঘাটতি হয় না কখনও। লুয়ো চি তমালের দিকে তাকায়। তমাল বলে, ‘নিরাপত্তার প্রধান হিসেবে এই জায়গাটা আমি সাধারণ যাত্রীদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি, তোমরা আমাদের সঙ্গে এস।’

‘এক মিনিট,’ আমি কথা খুঁজে পাই, ‘আগে বলুন এটা কে ? এই দেহটা কি মানুষের ? মানুষের হলে তার নাক কোথায় গেল, আর বুকের পাশে জিনিসগুলো কী ? আমরা কেন এরকম একটি দেহের কথা এতদিন জানিনি। আর এখন আমাদের কাছ থেকে কী লুকোচ্ছেন ?’

তমাল ও লুয়ো চি একে অপরের দিকে তাকায়। তমাল বলে, ‘এসব প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারবে না। ক্যাপ্টেন ড্রেগলস হয়তো বলবেন, আপাতত এখান থেকে চল।’

আমরা তিনজন তমাল ও লুয়ো চি’র পেছন পেছন বের হয়ে আসি। করিডর দিয়ে হাঁটার সময় তমাল পেছন ফিরে আমাদের বলে ঘরে চলে যেতে। জিজ্ঞেস করি ড্রেগলসের সঙ্গে কখন কথা হবে, তমাল বিড়বিড় করে কী বলে শুনতে পাই না। ভাবি, ড্রেগলস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না, মা’র কাছ থেকে এখনই জেনে নেব। তমাল ও লুয়ো চি মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দিকে চলে যায়, আমরা যে যার ঘরে ফিরে যাই। ঘরে ঢুকেই মা’কে ফোন করি, মা উত্তর দেয়, বলি, ‘আমরা একটা দেহ দেখেছি পুরোনো এক গবেষণাগারে, মানুষের নয়, সেটা কার ?’ মা উত্তর দেয় না সঙ্গে সঙ্গে, তারপর বলে কাজ সেরে ফিরে কথা বলব, শোগি।’

মা ফোন ছেড়ে দেয়, ভাবি তমালদের কাছ থেকে খবরটা নিশ্চয় আগেই পেয়েছে মা। ঘরে বসে থাকতে পারি না, বালুকাবেলায় যাই, সেখানে দেখি মালিয়া আশু আর তাশুকে আমাদের আজকের অভিযান খুব উত্তেজিতভাবে বর্ণনা করছে। কিছুক্ষণ পরে মালাই, তিলাই, ক্লাভান, মিলা, রিনা, লেনাকসহ সব ছোটরাই হাজির, ওরা আমাদের কাছ থেকে সব শুনল। এর মানে কী ? অনেকেই জিজ্ঞেস করে। আমি জানি বেলক এই রহস্যের উত্তর কিছুটা হলেও জানে, কিন্তু বেলককে দেখি না। আমরা খুব শোরগোল করছিলাম, ভাবলাম এখনই নেনা সেখানে হাজির হবে, নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে তো সবই দেখা যায়, কিন্তুই কেউই এল না। সন্ধ্যা হলে সবাই ঘরে ফিরে যায়। আমি মা’র জন্য অপেক্ষা করি আমার ঘরে।

মা ফিরলে আমার ঘরে এসে খাটে বসে, আমি তার পাশে বসি। আমার কাছ থেকে সব শোনে মা, দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর আমাকে বুকে টেনে ধরে রাখে। বলে, ‘শোন শোগি, আমরা যদি সব সত্য জেনে যাই তাহলে বাঁচা খুব কঠিন হয় রে, কিছু জিনিস না জানাই ভালো।’ বলি, ‘তোমরা সবসময় সত্য গোপন করতে চাও, কিন্তু সত্য তো চাপা থাকে না, তোমরা যে রোমা, কি আমরা যে গবেষণাগারে জন্ম নিয়েছি সেই সত্য কি আটকে রাখা গেল। তুমি যদি এখন না বল, তাহলে কাল বা পরশু আমরা তো জানবই।’ মা’র শরীর কেন জানি কেঁপে ওঠে, আমি বলি, ‘তুমি ঠিক আছ তো ?’ মা উত্তর দেয় না, তার মুখমণ্ডলের দিকে তাকাই, কখনও ভাবিনি রোমাদের মুখ রক্তশূন্যতার ভাব আনতে পারে, মা ভয় পেয়েছে। কীসের ভয় ? মা বলে, ‘আমাকে একটা দিন সময় দে, শোগি, কাল তোকে বলব।’   

অধ্যায় নয়. 

মাকে অবশ্য একটা দিন সময় দিতে হলো না। পরদিন সকালে সবার ডাক পড়ল সম্মেলন ঘরে। ড্রেগলস কথা বলবে। এটা নিশ্চয় আমাদের কালকের আবিষ্কারের পরিপ্রেক্ষিতে। মা আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেলেন, সম্মেলনকক্ষ পৌঁছতে হয়তো তিন মিনিট সময় লাগল, কিন্তু বুঝছিলাম সেই সমস্ত সময়টা জুড়ে মা’র হাত কাঁপছিল। কী এমন বলবে ড্রেগলস যে মা ভয় পাচ্ছে, সত্য কি এতটাই কঠিন!

সম্মেলনকক্ষে সবাই উপস্থিত। মা আমাকে ছোটদের সঙ্গে বসিয়ে সামনে চলে গেল। আমরা ছোটরা খুব উত্তেজিত, কী বলবে ড্রেগলস ? কিন্তু বেলককে কোথাও দেখলাম না। ড্রেগলস, নেনা, তমাল আর লিও চি একসাথে ঢুকল। লিও চিকে  কোনওদিন নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে দেখিনি, তাহলে তার নিশ্চয় অনেক ক্ষমতা। ড্রেগলস ছাড়া আর সবাই সামনে বসে। ড্রেগলস আজকে আনুষ্ঠানিক পোশাক পড়েছে। মনে হল এই পোশাকে সে বেশ অস্বস্তি বোধ করছিল, সে বলা শুরু করল, ‘ছোটরা, তোমাদের মধ্যে কয়েকজন গতকাল একটা পুরনো গবেষণাগারে একটা মৃতদেহ আবিষ্কার করেছে যা কিনা মানুষের মতোই দেখতে, কিন্তু ঠিক মানুষের নয়। আমি ধরে নিচ্ছি এই বন্ধুদের কাছ থেকে তোমরা সবাই এই সম্পর্কে জানো। এই নিয়ে তোমাদের মধ্যে নিশ্চয় খুব শোরগোল পড়েছে, কিন্তু আসলে ব্যাপারটা অত জটিল নয়। যার দেহ তোমরা কাল দেখেছ সেটি আসলে একজন মানুষের, তার নাম ছিল সারি গ্রাসকি। তিনি ছিলেন চিকিৎসক, জীববিজ্ঞানী। কোনও একটি গ্রহে, প্রতিকূল পরিবেশে, যেখানে বাতাসে অক্সিজেন নেই বললেই চলে, সেখানে সরাসরি কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন যে আমাদের শরীরই করতে পারে সেজন্য তিনি গবেষণা করছিলেন।’ একটু থেকে ড্রেগলস যোগ করে, ‘নিজের শরীরে ওপরে। এজন্য তিনি বুকের পাশে মাছের কানকোর মতো অঙ্গ বসালেন। দুঃখের বিষয় এইসব এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। আমরা তাঁর দেহকে গবেষণাগারে রেখে দিই যাতে ভবিষ্যতে তোমাদের মধ্যে কেউ সেই দেহকে পরীক্ষা করে  কোনও সমাধান দিতে পার।’

‘কে কানকো বসিয়েছে ?’ বেলকের গলা চিনতে আমার অসুবিধে হয় না। বেলক তাহলে এসেছে। ড্রেগলস মনে হয় এই প্রশ্নটির জন্য প্রস্তুত ছিল, বলল, যে বসিয়েছে তাকে তোমরা চেন, আমাদের প্রধান চিকিৎসক অগ্নিমিথ্রা। অগ্নিমিথ্রা যেন ড্রেগলসের সঙ্কেতের অপেক্ষায় ছিল, সামনের একটা চেয়ার থেকে উঠে ড্রেগলসের পাশে দাঁড়াল। আমার পেছন থেকে কয়েকজন ছেলেমেয়ে হাততালি দিয়ে চেঁচালো, ‘অগ্নিমিথারা! অগ্নিমিথারা!’ অগ্নিমিথ্রা ছিল এই জাহাজের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি, সে নারী না পুরুষ তা আমরা জানিনি, কিন্তু তার মুখমণ্ডল থেকে সবসময় যেন আলো বিচ্ছুরিত হত আর তার হাসিতে আমরা সম্মোহিত হতে থাকতাম। লিও চি’র মতই তাকে সবসময় দেখা যেত না, তবে আমাদের অনেক ছোটরাই তার কাছ থেকে চিকিৎসা পেয়েছে। অগ্নিমিথ্রা আমাদেরকে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করল, ছেলেমেয়েরা এত  আরও অভিভূত হলো, শুধু এবার তারা চাপাস্বরে বলল, ‘অগ্নিমিথারা!’

অগ্নিমিথ্রা ড্রেগলসের দিকে একবার চাইল, ড্রেগলসের সম্মতির জন্য, তারপর বলতে শুরু করল, ‘তোমরা জান অক্সিজেন আছে এমন বায়ুমণ্ডল দিয়ে ঢাকা একটা গ্রহ যে আমরা পাব সেটার সম্ভাবনা কম। তাই সারি গ্রাসকি সরাসরি বায়ু থেকে অক্সিজেন সংশ্লেষণ করতে চেয়েছিলেন, আমি তাঁর এই প্রচেষ্টায় সাহায্য করি, তাঁর ওপর অস্ত্রোপচার আমিই করি। তার নাক দিয়ে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস যাতে না হয়, অর্থাৎ ভিন গ্রহের বিষাক্ত বায়ু যেন নাক দিয়ে দেহে না ঢোকে সেজন্য ওনার নাকটিকে আমাদের পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি, বিজ্ঞানের এই কাজে, মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য ডক্টর সারি গ্রাসকি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর সঙ্গে আমি কাজ করতে পেরেছি এটা আমার সৌভাগ্য।’ 

আমরা চুপ করে থাকি। হঠাৎ মালিয়া বলে ওঠে, ‘ডক্টর সারি গ্রাসকি কি মানুষ ছিলেন ?’ অগ্নিমিথ্রা যেন এই প্রশ্নটির জন্য প্রস্তুত ছিল না, সে একটু থমকে যায়, তারপর বলে, ‘ডক্টর সারি গ্রাসকি আমাদের মতো রোমা ছিলেন না।’ হঠাৎ একটা গুঞ্জন ওঠে, শুনলাম বড়রা অনেকেই বলছে, ‘উনি আমাদের মতো রোমা ছিলেন না।’ এমন যেন তারা সম্মোহিত হয়ে কথাগুলো বলছিল। তারপর আবার সব শান্ত। ড্রেগলস বলে ওঠে, ‘তোমাদের মনে অনেক জিজ্ঞাসা ছিল, আমার মনে হয় সেগুলোর উত্তর পেয়েছ, আমি এখন এই সভার সমাপ্তি …’ ড্রেগলসের কথা শেষ হয় না, বেলক বলে, ‘শেষ করার আগে আমার একটা কথা আছে। মাছের মত মানুষের বুকে কানকো বসিয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন সংশ্লেষণ করা যাবে এটা আমি বিশ্বাস করি না, এটা করা গেলে মানুষ পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা অনেক আগেই করতে পারত, কারণ এর জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন। এ ধরনের কানকোর কাজ একটিই, জলের মধ্যে যে দ্রবীভূত অক্সিজেন আছে তার থেকে অক্সিজেনকে আলাদা করা। আপনারা আমাদের কি সত্যি কথাটা বলছেন না।’

নেনা সামনের একটা আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে বলে, ‘বেলক, তুমি চুপ করে বস, আর একটা কথাও বলবে না।’ বেলক বসে পড়ে, কিন্তু এবার মালিয়া দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমারও একটা কথা আছে, এই কথাটা কাউকে আমরা বলিনি। পুরোনো গবেষণাগারে ঢোকার আগের ঘরটির দেয়ালে একটি গাছের মোজাইক আমরা দেখেছি, ওই গাছটি পৃথিবীর নয়, আর ওই ধরনের একটি গাছের স্বপ্ন আমি প্রায়ই দেখি। এর মানে কী ? আর ওই ঘরটাই বা বন্ধ করে রাখা হয়েছে কেন ?’

ংংমালিয়ার কথায় পুরো সভায় নিস্তব্ধতা নামে, বড়রা কেউই এবার কথা খুঁজে পায় না। নেনাই আবার কথা বলে, ‘কিছু জিনিস জানার জন্য তোমরা এখনও প্রস্তুত হওনি, তোমরা সবই জানবে একদিন, আজ নয়।’ মা গতকাল আমাকে এই কথাই বলেছিল। মালিয়া আর বেলক এরপরে আর কথা বলে না। আমরা সবাই যে যার নিজের ঘরে ফিরে যাই। বলতে পারবে না কেন, কিন্তু মনটা খুব বেদনার্ত হয়ে থাকে। কিসের বেদনা ? কেন বেদনা সেটা বুঝতে পারলাম না। সে রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না, এপাশ ওপাশ করতে করতে অনেক সময় গেল, তারপর তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। তার মধ্যেই মনে হলো কে যেন আমাকে ডাকছে, ‘শোগি’ নামে নয়, অন্য একটা নামে, কিন্তু আমি ঠিকই যেন বুঝলাম আমাকেই ডাকছে। বিছানা ছেড়ে ঘর থেকে বের হলাম, মা’র ঘরটা অন্ধকার, মা হয় ঘুমিয়ে আছে নয়তো নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ডিউটিতে আছে। বাইরে করিডরে বের হয়ে হাঁটতে থাকি, কেমন করে যেন জানি কোথায় যেতে হবে। আমাকে ডাকছে কোথাও কেউ, ডাকটা যেন আরও জোরালো হয়। এরকমভাবে স্বপ্নাচ্ছন্নভাবে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই একটা দরজার সামনে, দেখি ওপরে লেখা আছে গবেষণাগার যেখানে গতকালই আমরা চুরি করে ঢুকেছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই সেখানে বেলক ও মালিয়া উপস্থিত হয়, তারাও তাদের নামে ডাক শুনেছে, শুধু সেটা তাদের নাম ছিল না। গবেষণাগারের ভেতর থেকে কে আমাদের ডাকছে ? সেই নারী যে কি না এক বাক্সে শুয়ে আছে ? কিন্তু সে তো মৃত!

আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম নাকি আসলেই পুরোনো গবেষণাগারে ঘুমের ঘোরে হেঁটে গিয়েছিলাম, সেখানে বেলক আর মালিয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ? আমাদেরকে কি আসলেই সেই বাক্সে শোওয়া নারী ডাকছিল। গা কাঁটা দিয়ে উঠল। দেখলাম মা একটা চিরকুট রেখে গেছে টেবিলের ওপর―‘সকালের খাবার রেখে গেলাম, রেস্তোরাঁয় যেতে হবে না।’ খাওয়া শেষ না করতেই বেলকের বার্তা এল―‘লাইব্রেরিতে এস।’ লাইব্রেরিতে যেয়ে দেখি মালিয়াও এসেছে। ঘরে বড়দের তিন চারজন আছে, মনে হলো তারা আমাদের খেয়াল করছে। আমি বললাম রাতে স্বপ্ন দেখেছি, কে যেন আমাকে ডাকছিল, কিন্তু আমার নামে নয়। তারপর নিজেকে আবিষ্কার করলাম গবেষণাগারের সামনে, সেখানে তোমরা দুজনও ছিলে। মালিয়া বলল, আমিও এই স্বপ্ন দেখেছি, বেলকও দেখেছে বলল। তাহলে এটা কি স্বপ্ন নয়, আসলেই আমাদের কেউ ডেকেছিল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমাদের মনে আছে কি নামে তোমাদের ডাকছিল ?’ না, ওদের সেটা মনে ছিল না। বেলক বলল, ‘স্বপ্ন নাকি সত্যি ? একটা কথা ঠিক যে আমাদের তিনজনকে কিছু একটা জিনিস প্রভাবিত করছে। এই জাহাজে এত রহস্য জমা আছে তা কি আমরা আগে ভেবেছিলাম ?’ তারপর গলাটা  আরও নামিয়ে বলল, ‘সবাই আমাদের খেয়াল করছে, চল একটু দূরে যেয়ে বসি।’

দূরে যেয়ে বসলে বেলক বলে, ‘কোনও গত দু’বছর আমি আমাদের লাইব্রেরির প্রতিটি প্রান্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি, কিন্তু আউরেউরগথদের মূল বাসস্থান কোন্ গ্রহ তার সন্ধান পাইনি। পৃথিবীর ওপর আউরেউরগথের প্রতিটি আক্রমণের বর্ণনা আছে―মূলত তিনটি, শেষ আক্রমণের সময় আমাদের এই জাহাজ পৃথিবী ছেড়ে পালাতে পারে। কিন্তু আউরেউরগথরা কেমন দেখতে, তাদের ইতিহাস কী সে সম্বন্ধে একটি কথাও আমি পাইনি। তারপর তালাবদ্ধ একটি ফাইল পাই। সেটার পাসওয়ার্ড আমি গত এক বছর ধরে চেষ্টা করে বার করতে পারছিলাম না, শুধুমাত্র গতকাল অগ্নিমিথ্রার একটা কথায় অনেক কিছু মনে পড়ল, একটা পাসওয়ার্ড চেষ্টা করলাম, ফাইলটা খুলতে পারলাম।’ অগ্নিমিথ্রার কথায় ? কী কথায়, আমরা দুজনেই বলে উঠলাম। ‘পরে খুলে বলব। এখন  কোনও ফাইলে কোনও ছবি ছিল না, কিন্তু আউরেউরগথদের গ্রহ নিয়ে কিছু তথ্য ছিল। গ্রহটির তারাটির নাম বেটা হাইড্রি, পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ আলোকবর্ষ দূরের একটি তারা। আর এই গ্রহটি সারা গ্রহটি প্রায় জলে ঢাকা, অল্প স্থলভূমি মাত্র কয়েকটি প্রজাতির উদ্ভিদে পূর্ণ।’

‘জলে ঢাকা বললে ?’ আমি বিস্ময়ে বলে উঠি।

‘হ্যাঁ, জলে ঢাকা, আমি জানি তুমি কী ভাবছ, শোগি!’

মালিয়া বলে, ‘কী ভাবছে শোগি ? তোমরা কী ভাবছ ?’

‘দাঁড়াও, মালিয়া, বলছি। কিন্তু তার আগে  কোনও বেটা হাইড্রি একসময়ে সূর্যের মতো তারা ছিল, এটা একটা জি-টাইপ তারা, কিন্তু সে তার কেন্দ্রে সমস্ত হাইড্রোজেন পুড়িয়ে ফেলেছে, এখন সে বড় হচ্ছে, তার ব্যাস এখন সূর্যের তিনগুণ, উজ্জ্বলতা সাড়ে তিনগুণ। এত উজ্জ্বল একটি তারার কক্ষপথে নিঃসন্দেহে আউরেউরগথের গ্রহটি আর বাসযোগ্য নয়।’

‘বাসযোগ্য নয় ? তাহলে আউরেউরগথরা যাদের অপহরণ করে তাদের কোথায় নিয়ে যায় ?’ আমি বলে উঠি।

‘সেটা একটা ভালো প্রশ্ন, শোগি। মালিয়া, এবার তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। আউরেউরগথদের গ্রহটি জলে পূর্ণ ছিল, পৃথিবীর সত্তর শতাংশ জলে ঢাকা, আউরেউরগথদের গ্রহ প্রায় ৯৫% জল, এটা আমরা ধারণা করে নিতে পারি সেখানকার সভ্যতা কিছুটা জলনির্ভর হবে, তারা উভচর হতে পারে। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে তাদের মধ্যে মাছের কানকোর মত অঙ্গ আবির্ভূত হতে পারে।’

‘কী বলছ তুমি, বেলক ?’ বিস্ময়ে মুখ ঢাকে একটা হাত দিয়ে মালিয়া, ‘পুরোনো গবেষণাগারে যে দেহটি আমরা দেখেছি সেটা একটা আউরেউরগথের ?’ আমাদের মনে আউরেউরগথের অক্টোপাসের চেহারা মুছে যায় মুহূর্তেই।

‘কিন্তু তাহলে কেন ক্যাপ্টেন ড্রেগলস আমাদের মিথ্যে কথা বললেন ?’

‘তার কারণটা আমি অনুমান করতে পারি। তবে সব সত্য জানা ঠিক নয়,’ বেলক বলে।

‘আমার মা’ও তাই বললেন, সব জানলে বাঁচা নাকি কঠিন হয়ে যায়।’

‘তোমরা কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না,’ মালিয়া বলে।

বেলক বলল, ‘মালিয়া তোমাকে একটা গল্প শোনাই। গল্পটা যে পুরো সত্যি তা আমি বলতে পারব না। একটা খুব পুরোনো সভ্যতা বাস করত সূর্যের মতো একটি তারার কাছে এক গ্রহে। তারাটি ছিল সূর্যের চেয়ে প্রাচীন, সে খুব বুড়ো হল, ভেতরের সব জ্বালানি পুড়িয়ে ফেলে বাইরের খোলসের জ্বালানি পোড়াতে আরম্ভ করল। তখন সে  আরও বড় আর  আরও উজ্জ্বল হতে থাকল। প্রাচীন সভ্যতার আর বেঁচে থাকার উপায় ছিল না, তখন তারা তাদের মধ্যে কয়েক হাজার মানুষকে বাছল, মানুষই বলছি যদিও তারা মানুষ ছিল না, তারা আমাদের মতোই এক মহাকাশযানে বেরিয়ে পড়ল এক নিরাপদ আস্তানার খোঁজে। সেই যানটি ছিল এক আন্তঃপ্রজন্মের জাহাজ, কয়েক শবছর চলার পরে তারা খুঁজে পেল একটি লাল বামন গ্রহের কক্ষপথে একটি গ্রহ। সেই গ্রহটি তাদের আদি গ্রহের মত সুন্দর ছিল না, বাসযোগ্য ছিল না, কিন্তু কয়েক শ’বছর ধরে মহাকাশে বিচরণের পরে তাদের আর  কোনও উপায় ছিল না। তারা সেই গ্রহে বাসা বাঁধতে চাইল। কিন্তু বামন তারার এক্স-রশ্মি, ঘাতক বায়ুমণ্ডল, অপ্রতুল জল তাদের জীবনকে অসহনীয় করে তুলল, অবশেষে তারা তাদের সভ্যতাকে বাঁচাবার শেষ চেষ্টা করল। তারপর শ’খানেক মানুষকে নিয়ে তাদের তৈরি অত্যাধুনিক জাহাজ আবার পাড়ি জমাল মহাশূন্যে। ঐ লালবামন নক্ষত্রের গ্রহে বাস করার সময় তাদের আকাশ পর্যবেক্ষণ থেকে তারা বুঝেছিল ১৫ আলোকবর্ষ দূরে একটা গ্রহ আছে যার বাতাসে অক্সিজেন আছে, প্রচুর জল আছে, তাদের সূর্য একটি জি-টাইপ তারা। তাদের মহাকাশযান রওনা দিল সেই গ্রহটির দিকে।’

‘দাঁড়াও, আমাকে বুঝতে দাও, তুমি কোন সভ্যতার কথা বলছ ? শেষের যে গ্রহটার কথা বলছ সেটা তো পৃথিবীর মত মনে হলো,’ মালিয়া বলে।       

বেলক উত্তর দিতে যায়, কিন্তু এর মধ্যে লাইব্রেরির মূল দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তমাল, কেন জানিনা আমরা তাকে দেখেই বুঝলাম সে আমাদের খোঁজেই এসেছে। ‘তোমরা আমার সঙ্গে এস,’ বলে সে। আমার একে অপরের দিকে তাকালাম, তারপর নিঃশব্দে তার পিছু নিলাম। লাইব্রেরির পরেই চালনাবিদ্যার কক্ষ, তারপরে মূল নিয়ন্ত্রণ, এরপরে নতুন গবেষণাগার, যন্ত্রপাতির গুদামঘর, তার পরে পুরোনো গবেষণাগার। তমাল আমাদের নিয়ে সেই ঘরের সামনে অপেক্ষা করে। এক মিনিটের মধ্যে অন্য দিক থেকে আবির্ভূত হয় লুয়ো চি, তার সঙ্গে  আরও দু’জনÑএকজন পুরুষ, একজন নারী। এই দুজনকে আমরা মাঝে মধ্যে দেখেছি, কিন্তু এই জাহাজে তাদের কী কাজ জানিনি, তাদের নামও আমাদের অজানা। এতক্ষণ কিছু মনে করিনি, তমাল আমাদের বন্ধুই বলা চলে, কিন্তু লুয়ো চি আর তাদের সঙ্গে দু’জনকে দেখে ভয় পাই, এদের কী পরিকল্পনা ? লুয়ো চি গবেষণাগারের দরজার ওপর একটা বোতামে চাপ দেয়, কিন্তু তাতে গবেষণাগারের দরজা খোলে না, বরং সেই দরজার সামনে, মেঝেতে একটা পাটাতন যেন সরে যায়, একটা চৌকোনো মুখের গর্ত, তাতে একটা মই লাগান আছে নিচে নামার। তমালের মুখাবয়ব খেয়াল করলাম, সে আমাদের মতোই আশ্চর্য হয়েছে। লুয়ো চি আমাদের দিকে তাকায়, বলে, ‘তোমরা নিচে নামো।’

তমাল বলে ওঠে, ‘থামুন, এরকম  কোনও আদেশ সম্পর্কে আমি অবহিত নই। এই তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আদেশ করার  কোনও অধিকার আপনার নেই। ক্যাপ্টেন ড্রেগলস কি জানেন আপনি এই তিনজনকে এখানে নিয়ে আসতে বলেছেন আমাকে ?’

লুয়ো চি হাসে, বলে, ‘আপনি বোধহয় জানেন না আমার অবস্থান ড্রেগলসের ওপরে। ড্রেগলস যদি হয় জাহাজের অধিনায়ক, আমি হলাম তার ওপরে―কম্যান্ডার, আমার ড্রেগলসের কাছে জবাবদিহিতার প্রশ্নই ওঠে না।’ আমরা তো আশ্চর্য হলামই, কিন্তু তমাল এই তথ্যটা জানে না দেখে আশ্চর্য হলাম। কিন্তু তমাল বলে ওঠে, ‘লুয়ো চি, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না।’

এবার লুয়ো চি হেসে ওঠে, অট্টহাসি বলা চলে। বলে, ‘আপনি জানেন না, তমাল, আপনাকে বিশ্বাস করানোর উপায় আমার হাতে আছে, কিন্তু সেই উপায়টা ভদ্র আচারের মধ্যে পড়বে না, আপনি যদি আমাদের সাহায্য না করতে চান সরে দাঁড়ান।’ তমাল তার ফোন সক্রিয় করে চিৎকার করে, ‘ক্যাপ্টেন ড্রেগলস …’ কিন্তু পরমুহূর্তেই আর্তনাদ করে মেঝেতে পড়ে যায়। দেখলাম লুয়ো চি’র হাতে একটা ছোট চৌকো পাতলা বাক্স, মনে হলো সে সেটা দিয়ে তমালের শরীরে যন্ত্রণা সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে বেলক চিৎকার করে ওঠে, ‘শোগি, মালিয়া দৌড়াও।’

কিন্তু গতবারের পালানোর বেদনার অভিজ্ঞতা আমাকে স্থানু করে দেয়, আমি নড়তে পারি না। আর কেন জানি মনে হলো দৌড়ালে আমাদের অবস্থা তমালের মতো হবে। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মালিয়া ও বেলক পালায় না। লুয়ো চি আমাদের ইঙ্গিত করে সেই গর্তে নামতে, আমরা বাধা দিই না। প্রথমে বেলক নামে, কিন্তু বেলক নামার সময়ই আমরা করিডরে পদধ্বনি শুনি―নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে করিডরের সবকিছুই দেখা যায়, তারা যে আসছে আমাদের উদ্ধার করতে তাতে সন্দেহ থাকে না। ড্রেগলস, তার পেছনে নেনা, ইন্দল আর সিয়েনা। কিন্তু তারা আমাদের কাছে আসতে পারে না, লুয়ো চি তার হাতে রাখা ছোট বাক্সে চাপ দেয়―ওরা চারজনই আর্তনাদ করে মেঝেতে পড়ে যায়। আমি আর মালিয়া দৌড়ে যাই ওদের কাছে, বেলকও উঠে আসে গর্ত থেকে। আমি আশঙ্কা করছিলাম লুয়ো চি তার যন্ত্র ব্যবহার করে আমাদের যন্ত্রণায় অবশ করে দেবে, কিন্তু সেরকম কিছুই হয় না। আমরা মা, নেনা আর সিয়েনাকে ওঠাতে চেষ্টা করি, কিন্তু তারা বারে বারে এক যন্ত্রণায় মেঝেতে পড়ে যেতে থাকে, বুঝলাম লিও চি তার যন্ত্রে বারেবারে চাপ দিচ্ছে। মা’র মুখ তখনও যন্ত্রণায় একেবারে বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল, তবু সে আমাকে ফিসফিস করে বলতে পারল, ‘তোর সমস্ত বন্ধুদের ডেকে নিয়ে আয়, এই তিনজনের সঙ্গে আমরা বড়রা পারব না, এরা রোমা নয়, এরা মানুষ।’ এটুকু বলতে না বলতেই আবার আর্তনাদ করে মেঝেতে পড়ে যায় মা, অন্যদেরও তাই অবস্থা। আমি ভয়ের চোখে ওই তিনজনের দিকে তাকালাম, মানুষ বড় হলে তাহলে এরকমই হয়,  আরও বুঝলাম যে লিও চি’র হাতের নিপীড়ন যন্ত্র শুধু রোমাদের ওপর কাজ করে। আমি মা’কে মেঝেতে রেখেই দৌড়ালাম, চিৎকার করতে করতে, ‘মালিয়া, বেলক, আমার সঙ্গে এসো।’

করিডর ধরে দৌড়ালাম আমরা। গুদামঘর, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ পার হয়ে আবার লাইব্রেরি। সেখানে ছোট দু’জনকে পাওয়া গেল, তাদের আমাদের সঙ্গে আসতে বললাম, এরপর রেস্তোরাঁ, বালুকাবেলা পার হয়ে আমাদের বাসস্থানগুলোতে পৌঁছে আমরা ২০ জন মতো পেলাম, এদেরকে শুধু বলতে পারলাম, লিও চি’রা আমাদের মা’দের একটা যন্ত্র ব্যবহার করে টর্চার করছে, এখনই তাদের না থামালে সব রোমারাই মারা যাবে। তারপর পুরো চক্র ঘুরে উল্টোদিক দিয়ে পুরোনো গবেষণাগারের সামনে পৌঁছলাম। পৌঁছে দেখি রোমাদের একটা বড় দল লুয়ো চি আর তার দুই সহযোগীর সামনে মেঝেতে পড়ে কাতরাচ্ছে। লুয়ো চি’রা বোধহয় আমরা এত তাড়াতাড়ি এসে পড়ব সেটা আশা করেনি, ছোটদের দল ধাক্কা দিয়ে এই তিনজন মানুষকে ফেলে দেয়, তাদের হাতের যন্ত্রগুলো মেঝেতে পড়ে যায়। রোমারা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে ওই তিনজনকে আটক করতে পারে।

অধ্যায় দশ.

লুয়ো চি’সহ তিনজনকে গবেষণাগারের পাশেই একটা ঘরে বন্দি করে রাখা হলো। বেলক বোধহয় ইতোমধ্যে সবই বুঝেছিল, আমি কিছুটা বুঝতে পারছিলাম, তবে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে বাকি ছোটদের কোনও ধারণাই ছিল না। এর পরের কাহিনি খুব সংক্ষেপে বলছি।

আবার আমরা সম্মেলনকক্ষে মিলিত হলাম। মা আমার পাশে বসল এবার, আমার হাত ধরে রইল। ড্রেগলস যথারীতি আবার গলা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করল, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো ইতোমধ্যে বুঝতে পেরেছ, তবে বেশিরভাগই জানো না আন্তারেসের আসল রহস্য। আমি খুব দুঃখিত তোমাদের সত্যি কথাটা আমরা বলিনি, কিন্তু এই ব্যাপারে, আমাদের, অর্থাৎ রোমাদের কিছু করণীয় ছিল না, মানুষরা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো।’ ড্রেগলস এরপর বলে এক প্রাচীন সভ্যতার কথা। তারা বিজ্ঞানে যেমন অগ্রবর্তী ছিল দর্শন এবং শিল্পকলাতেও সেরকম উন্নত ছিল, সেই সভ্যতার নাম ছিল আউরি যাকে মানুষেরা আউরেউরগথ নাম দিয়েছিল। ড্রেগলস যা বলল সেটাই বেলক শুরু করেছিল। আউরেউরগথরা যখন দেখল তারা তাদের সূর্যের কাছে বাস করতে পারবে না, তারা তাদের কয়েক হাজার মানুষ পাঠাল একটি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। শ’খানেক বছর পরে তারা একটি লাল দানবের কাছে একটি গ্রহকে আবিষ্কার করল। সেখানে তারা হয়তো কয়েক হাজার বছর ছিল, কিন্তু সেই গ্রহটির পরিবেশ তাদের আদি বাসস্থানের মত অনুকূল ছিল না। সেই গ্রহের নাম তারা দিয়েছিল কিশো। কিশো থেকে আউরিরা সন্ধান পেল ১৫ আলোকবর্ষ দূরের পৃথিবীর, তারা বুঝতে পারল পৃথিবীতে প্রাণ আছে, সেই প্রাণ উচ্চস্তরের, বাতাসে অক্সিজেন আছে, পৃথিবীর একটা বিশাল অংশ জলমগ্ন―সেখানে তারা বাস করতে পারবে। এবার তারা আর একটি মহাকাশযান তৈরি করল, সেই জাহাজ শ’খানেক যাত্রী নিয়ে পৃথিবীর দিকে রওনা দিল। তারা জানত পৃথিবীতে প্রাণ আছে। কিন্তু সত্তর বছর পরে তারা যখন পৃথিবীতে পৌঁছাল পৃথিবী তাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না। এটুকু বলে ড্রেগলস থামল। তার যেন এর পরের কথাগুলো বলতে কষ্ট হচ্ছিল। নেনা উঠে দাঁড়াল, এসে ড্রেগলসের কাঁধে হাত রাখল, ড্রেগলস মাথা একটু ঝুঁকিয়ে তার সহানুভূতিটা গ্রহণ করে নেনার চেয়ারে যেয়ে বসল।

এবার নেনা বলা শুরু করল, ‘ছেলেমেয়েরা তোমরা এতদিন বড় হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসকে তোমাদের অস্থিমজ্জায় গ্রহণ করে। তোমরা জেনেছ তোমাদের লালন করার জন্য, শিক্ষা দেবার জন্য, যথার্থ মানুষ হবার জন্য আমাদের রোমাদের নিয়োজিত করা হয়েছে। তোমরা আমাদের প্রথমে জেনেছিল তোমাদের প্রকৃত মা ও বাবা হিসেবে, সেই ভুল একদিন ভেঙেছিল। কিন্তু আজ আর একটি বড় ভুল ভাঙার সময় এসেছে।’ এরপরে নেনাও ড্রেগলসের মতো কথা হারিয়ে ফেলে।

এবার আমার মা উঠে যেয়ে দাঁড়ায় নেনার পাশে। নেনা যেন তাতে ভরসা পায়। বলে, ‘আন্তারেসের ছেলে মেয়েরা তোমরা মানব-সন্তান নও, তোমরা আউরেউরগথের সন্তান।’

আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। একটা অদ্ভুত চাপা চিৎকার ছোটদের মধ্য থেকে উঠে মিলিয়ে গেল ওপরের ছাদে। আমরা সময় নিলাম নেনার কথাগুলো বুঝতে, কিন্তু শেষাবধি বুঝে উঠতে পারলাম না। বেলকের দিকে চাইলাম, বেলকের মুখমণ্ডল অবিচলিত।

নেনা বলতে থাকে, ‘যে নারীদেহটি তোমরা আবিষ্কার করেছিলে গবেষণাগারে সেটি ছিল একজন আউরির। তিনি সাধারণ আউরি নন, তিনিই ছিলেন এই জাহাজের অধিনায়ক। আসলে তোমাদের সবার জন্ম এই জাহাজেই, এটি মানুষের তৈরি মহাকাশযান নয়, এটি তৈরি করেছিলে আউরিরা। মানুষের কারিগরি জ্ঞান এরকম যান তৈরি করার মত উন্নত ছিল না। আউরেউরগথ নামটা মানুষের দেয়া, তারা নিজেদের বলত আউরি, আর এই মহাকাশযানের নাম ছিল ‘সাগা আরেত’, সাগা মানে হলো অভিযাত্রী, আর আরেত মানে হলো অসীম, অসীমের অভিযাত্রী।’

এতদিন পরে আমি ভাবি―আমি আউরেউরগথ বা আউরি সন্তান, আমার মানব নাম শোগি, সেদিন নেনার কথায় যতটা চমকিত হবার আমাদের কথা ছিল ততটা চমকিত হইনি, কারণ নেনার কথাগুলোর বিস্ফোরণ এতই প্রকট ছিল যে আমরা আমাদের কান বন্ধ করে দিয়েছিলাম, যাতে কিছু শুনতে না হয়। আমরা যে মানুষ নই সেটা বিশ্বাস করিনি, আসলে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন ছিল না। আপনি―পাঠক―যিনি এই লেখাটি পড়ছেন, নিজেকে যিনি মানুষ বলে ভাবছেন, তাঁকে প্রশ্ন করব তাঁর উৎস সম্পর্কে। কেউ যদি এসে বলে আপনি মানব-সন্তান নন, আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া করবেন ? তাই ওই দিনে যে সমস্ত কথাগুলো শুনেছিলাম সেটা হৃদয়ে মনে গ্রহণ করতে বহু বছর লেগেছিল, সেই সময়টা ধরে পুরো ঘটনার অমানবিকতা ধীরে ধীরে আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল।

পৃথিবীর সত্তর শতাংশ জল দিয়ে ঢাকা, আউরিরা ভেবেছিল সেই নীল গ্রহের মানুষেরা তাদের স্থান দেবে, একই মহাজগতের বাসিন্দা হিসেবে, প্রতিবেশী হিসেবে তাদের গ্রহণ করবে। তারা ভেবেছিল, জলে তিমিদের সঙ্গে তারা বাস করবে, তাদের দরকার ছিল শুধু ক্ষুদ্র একটি দ্বীপের যেখানে তারা তাদের কারিগরি কাজ করতে পারবে, তারা পৃথিবীর মানুষকে তাদের উন্নত জ্ঞানকে দান করবে ভেবেছিল, কিন্তু পৃথিবীর মানুষকে চিনতে তারা ভুল করেছিল। পৃথিবীর মানুষ তখন নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল, কিন্তু একটি উদ্দেশ্যে তারা একত্রিত হলো যে, আউরিদের  কোনওই জায়গা দেওয়া যাবে না। তারা আউরিদের সঙ্গে এক ছল আলোচনায় লিপ্ত হলো, তারপর প্রতারণা করে তাদের বন্দি করল। বড়দের আটকে রাখল আর কিছু আউরি শিশুদের ওপর পরীক্ষা করা শুরু করল, তাদের ডিএনএ’কে বদলে মানব শিশুতে রূপান্তরিত করল। পৃথিবীতে পৌঁছনোর আগে এই শিশুরা এই জাহাজেই জন্ম নিয়েছিল। মানুষেরা সেই জাহাজ আটক করে সেটার নাম বদলাল, সেখানে আউরি সভ্যতার  কোনও চিহ্নই রাখল না, শুধু একটা ঘরের দেয়াল থেকে তারা কিশো গ্রহের গাছের ছবি মুছতে পারল না, সেই ছবি এমনভাবে দেয়ালে প্রোথিত ছিল যে সেটা তুলতে গেলে জাহাজের গঠনের ক্ষতি হতে পারত। মানুষেরা আবিষ্কার করল দু’বছর বয়সি আউরি শিশুদের ডিএনএ বদলানো সবচেয়ে সহজ, সেই শিশুদের আন্তারেসে পাঠানো হলো মানুষের জন্য নতুন গ্রহ খুঁজতে। তাদের অনেকের মধ্যে কিছু আউরি স্মৃতি রয়ে গিয়েছিল, তাই তারা দুঃস্বপ্ন দেখতে। মানুষ আউরিদের নাম রাখল আউরেউরগথ যাতে তার মধ্যে একটা ভয়ের ভাব থাকে।

আন্তারেসে পাঠানো শিশুদের পৃথিবীর সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত করা হল, আর তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সঙ্গে থাকল বেশ কয়েকজন রোমা। রোমাদের নিজস্ব সত্তা ও চেতনা থাকলেও মানুষ তাদের মস্তিষ্কে এমন একটি প্রোগ্রাম স্থাপনা করেছিল যাতে তারা মানুষের উদ্দেশ্যের অবাধ্য হতে পারত না। তবে পৃথিবীর মানুষ এতে ক্ষান্ত থাকেনি, আন্তারেসের রোমারা মানুষের উদ্দেশ্য ঠিকমত পালন করছে কি না সেটা প্রত্যক্ষ দেখার জন্য তিনজন মানুষকে আন্তারেসে পাঠিয়েছিল, তাদের প্রধান ছিল লুয়ো চি। এই তিন মানুষের হাতে ছিল এমন একটি যন্ত্র যা থেকে বিকিরিত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ রোমাদের দেহে যন্ত্রণা সৃষ্টি করতে পারত। আমরা তারই প্রয়োগ দেখেছিলাম গবেষণাগারের সামনে যা কিনা ড্রেগলসসহ সব রোমাদের বিকল করে দিয়েছিল। তবে আউরিদের একটি প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য তারা আন্তারেসে রেখেছিল, সেটি হলো সাগা আরেত জাহাজের অধিনায়কের দেহ। এটা তারা বোধহয় জীববৈজ্ঞানিক কিছু পরীক্ষার জন্য রেখে দিয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যটা শুধু লিও চি’ই জানত ।     

পৃথিবীর মানুষ যে তাদের মহাকাশযান সাগা আরেত দখল করে সেটিকে আবার গ্রহান্তরে অভিযানের জন্য পাঠাচ্ছে সেই খবরটা আউরিদের কাছে ঠিকই পৌঁছেছিল। সাগা আরেতে বসানো একটি বার্তাপ্রেরক যন্ত্র নিয়মিতভাবে মহাকাশযানটিতে কী হচ্ছিল তার ভিডিও পাঠাচ্ছিল, সেই যন্ত্রটি কোথায় লুকানো ছিল তা মানুষেরা জানতে পারেনি। সেই বার্তা ১৫ বছর পরে আউরিদের গ্রহ কিশোতে পৌঁছেছিল। তারা সাগা আরেত বা আন্তারেসকে উদ্ধার করার জন্য একটি মহাকাশযান, সাগা আরিন, পাঠিয়েছিল, সেটির সাক্ষাৎই আমরা পেয়েছিলাম জেমলা গ্রহে। সাগা আরিন আন্তারেসকে ধ্বংস করতে চায়নি, বিকল করে আউরি মানুষদের অর্থাৎ আমাদের উদ্ধার করতে চেয়েছিল। এরপরে গত কয়েক বছর ধরে সাগা আরিন আমাদেরকে অনুসরণ করেছে, সুযোগ খুঁজেছে আমাদেরকে উদ্ধার করার, কিন্তু সেরকম সুযোগ আর আসেনি।

অধ্যায় এগারো.

আমার নাম শোগি। আমার বয়স এখন ২০, আমি সাগা আরেত মহাকাশযানের অধিনায়ক। এক সময়ে এই জাহাজের নাম ছিল আন্তারেস। আমি নিজের, মানুষের দেয়া নাম, বদলাইনি, যদিও আমাদের অনেকেই বদলেছে। একটা সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত হয়ে আর একটি সংস্কৃতিকে ঘৃণা করা মানুষের সভ্যতার অঙ্গ। আমাদেরকে আউরেউরগথ নামে একটি গ্রহান্তরের সভ্যতাকে ঘৃণা করতে শেখানো হয়েছিল। সেই ঘৃণা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ ছিল না যদিও আমরা নিজেরাই ছিলাম আউরেরগথের সন্তান। ছয় বছর আগে আমরা আমাদের প্রকৃত পরিচয় জানতে পারি, এর পরে আমরা ছোটরা বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমাদের কী করা উচিত। আমাদের অনেকেই এমন এক বিষণ্নতায় নিমজ্জিত হয় যে তারা সবকিছুতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, খাওয়াও বন্ধ করে দেয়। সেই সময়ে আমাদের রোমা মাতা-পিতারা খুব ভালো ভূমিকা পালন করে, বলতে গেলে তাদের দিক-নির্দেশনাতেই আমরা আবার বেঁচে উঠি। তারা আমাদের বলল সাগা আরিন নামে যে আউরি জাহাজ আমাদের অনুসরণ করছিল সেটির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে। সাগা আরিন তখন আমাদের থেকে তিন আলোক মাস দূরে ছিল, তাকে বার্তা পাঠানোর দেড় বছর পরে সেই মহাকাশযানটির সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়।

আমরা মানুষ হিসেবে বড় হয়েছি, তাই আউরির সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়াটা ছিল খুবই ভয়ের আর উত্তেজনার ব্যাপার, কিন্তু আউরিরা ছিল সম্পূর্ণ অন্য মানসিকতার মানুষ। মানুষ বলছি, কারণ আমি অন্য কোন শব্দ ব্যবহার করব তা জানি না। আউরিরা যেন মহাকাশের অনন্ত শূন্যতাকে শুষে নিয়ে তাতে এক বিস্তীর্ণ কোমলতা সৃষ্টি করেছিল, তাদেরকে প্রথম দেখেও মনে হলো তারা আমাদের কতদিনের পরিচিত। আউরিরা রোমাদের ধন্যবাদ দিল আমাদের এতদিন দেখাশোনা করার জন্য, এমনকী লুয়ো চি, নরেন ও গারি―যে তিনজন মানুষকে―রোমাদের ওপর চোখ রাখার জন্য পাঠানো হয়েছিল, তাদের সঙ্গে আউরিরা অনেকটা বন্ধুর মতো কথা বলল, তবে এই তিনজনকে বন্দিই করে রাখা হলো।

একটা জিনিসকে বদল করা সম্ভব হল না, সেটা হলো আমাদের দৈহিক গঠন। আউরিদের অতি উন্নত কারিগরি বিদ্যা সত্ত্বেও এই বিষয়ে তারা ছিল অসহায়। আমাদের অনেকেই পৃথিবীতে গিয়ে সাগা আরিনের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করে পৃথিবীর মানুষকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু আমাদের নতুন আউরি অভিভাবকরা বলল, এই প্রতিহিংসার মনোভাবটি পৃথিবীর মানুষের নিজস্ব, মহাকাশের বিস্তীর্ণতায় তার কোনও স্থান নেই। তারা বলল, মানুষের দর্শনে একটি মুদ্রার শুধু দুটি পিঠ আছে, ওপর আর নিচ, ভালো থাকলেই খারাপ থাকতে হবে নইলে ভালকে ভালো বলা যাবে না, অর্থাৎ কিসের তুলনায় ভালো। কিন্তু আউরি দর্শন তা নয়। আউরিরা বলল, মহাকাল সব তুলনাকেই শেষ পর্যন্ত গ্রাস করে, এই মহাবিশ্বের বিশাল আয়তনে শুধুমাত্র নিজস্ব বোধ জাগ্রত করে এই স্থান-কাল ও আমাদের চেতনার ভিত্তিভূমি বোঝাই হলো এই ক্ষণিক জীবনের উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য আউরি মনকে এমনভাবেই আচ্ছন্ন রাখে যে তাতে মানুষ-বর্ণীত অন্যায় আচরণের স্থান নেই।

পরবর্তী ছ’বছর আউরিরা আমাদের ছোটদের শিক্ষা দিল, আমাদের প্রাক্তন অভিভাবক রোমারাও তাদের কাছ থেকে শিখল। হিন্দল আমার মা’ই রইল। আমাদের রোমা মাতা পিতারা কী ভয়ঙ্কর মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আন্তারেসে সময় কাটিয়েছে সেটা আমরা ধীরে ধীরে বুঝলাম। তারাও আমাদের সঙ্গেই যেন মুক্ত হলো, আমাদের সাফল্যেই তাদের এখন আনন্দ। এমনকি আমার ইলেকট্রনিক বন্ধু ও অভিভাবক মিরাও নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিল, আউরি সংক্রান্ত  কোনও তথ্যই অতীতে তার পাবার অধিকার ছিল না, তাকে মানুষেরা এমনভাবেই প্রোগ্রাম করেছিল। আমাদের জাহাজে পৃথিবীর ইতিহাসের নমুনাগুলো―মিসরীয় রোজেটা পাথর বা ব্যবলনীয় হামুরাব্বির আইনের ফলক―নকল ছিল (তবে বেলকও সেগুলো যে আসল নয় বুঝতে পারেনি), কিন্তু আমরা সেগুলোকে রেখে দিলাম এক কোনায়, পৃথিবীর ইতিহাসও আমাদের জানা দরকার ছিল।   

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কিশো গ্রহের দিকে রওনা হবার, সেখানে পৌঁছাতে এক শবছর মতো লাগবে। আমার  আরও সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমাদের মধ্যে অর্ধেকেরা শীতল আধারে ঘুমাবে পঞ্চাশ বছর, আর তাদের ঘুম ভাঙলে বাকি অর্ধেক ঘুমাতে যাবে। সাগা আরিন জাহাজ থেকে পাঁচজন আউরি আমাদের সঙ্গে যোগ দিল, এরপরে সেই মহাকাশযানটি পৃথিবীর মতোই আর একটি গ্রহ খুঁজতে আমাদেরকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিল। তার আগে তারা আমাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ব্যাক-আপ পরাকণা গুদাম চক্রটি বানিয়ে দিয়ে গেল। আন্তারেস তার পুরোনো নাম আবার ফিরে পেল―সাগা আরেত। ড্রেগলস  আরও পাঁচ বছর অধিনায়ক ছিল, এর পরে আমাকে জাহাজের অধিনায়ক করা হলো।

বেলকের এই জাহাজটিকে পরিচালনা করার কথা ছিল, কিন্তু বেলক সেই দায়িত্ব নিতে চাইল না, বলল সে গবেষণা  করতে চায়, জাহাজের দৈনন্দিন কাজে কালক্ষেপ করতে চায় না। বেলককে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে আউরিদের তথ্য সংবলিত ফাইলটা কীভাবে খুলতে পেরেছিল, ওটার পাসওয়ার্ডটা কোথায় পেয়েছিল। বেলক বলল, ‘মালিয়ার প্রশ্নের উত্তরে অগ্নিমিথ্রা বলেছিল, ‘ডক্টর সারি গ্রাসকি আমাদের মতো রোমা ছিলেন না।’ এরপর শুনলাম বড়রা সবাই একসঙ্গে বলছে, ‘উনি আমাদের মতো রোমা ছিলেন না।‘ আমি খেয়াল করেছিলাম যে, অগ্নিমিথ্রা বলেনি যে সারি গ্রাসকি মানুষ ছিলেন, আর সবাই যেভাবে সম্মোহিতভাবে ‘উনি আমাদের মতো রোমা ছিলেন না’ একসঙ্গে উচ্চারণ করল মনে হলো রোমা মহলে এই শ্রুতিটির চল আছে―‘উনি আমাদের মতো রোমা ছিলেন না’। আমার কেন জানি মনে হয়েছিল ওই বাক্যটিই ছিল পাসওয়ার্ড, রোমারা শ্রুতি বা বাগধারা জাতীয় বাক্য পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করত সেটা আমি আগেই জানতাম।’ বেলকের বিচক্ষণতা আমাদের সবসময় আশ্চর্য করত, বলা যায় বেলকই আন্তারাসের নির্মম ইতিহাস উদ্ঘাটন করেছিল।  

আর কার ডাক শুনে মালিয়া, বেলক আর আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল ? আমরা নিজেদের আবিষ্কার করেছিলাম পুরোনো গবেষণাগারের সামনে যে ঘরে শায়িত ছিল সাগা আরেতের অধিনায়কের মৃতদেহ। সেটা কি সত্য ছিল নাকি স্বপ্ন ? আমরা তিনজন একই সঙ্গে তাহলে কেমন করে স্বপ্নটা দেখি ? আমাদের আউরি শিক্ষকদের এই ঘটনাটি বলেছিলাম। তারা বলেছিল, সাগা আরেত জাহাজ নিরেট যন্ত্র নয়, সে তার মধ্যে ঘটিত সব ঘটনা আত্মস্থ করে। মালিয়ার আঁকা গ্রহ ও গাছের অনুপ্রেরণা আর আমাদের স্বপ্ন এই জাহাজের একটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আমরা বড় হওয়া পর্যন্ত সাগা আরেত অপেক্ষা করেছে, তারপর আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে।    

এই কাহিনি আমি পৃথিবীর মানুষদের জন্য সম্প্রচার করলাম। আজ থেকে বহু বছর পরে সেই বার্তা যখন পৃথিবীতে পৌঁছাবে পৃথিবীর মানুষ কি তাদের নিষ্ঠুরতার খতিয়ান করতে পারবে ? সেটা আমি জানি না, শুধু বলতে পারি পৃথিবীর মানুষকে এখনও বহুদূর যেতে হবে। আউরি দর্শন যদি পৃথিবীর মানুষদের বিন্দুমাত্র সাহায্য করে, তবে আমাদের গ্যালাক্সির এই ক্ষুদ্র কোণটি উপকৃত হবে।

 লেখক : বিজ্ঞান লেখক ও কথাসাহিত্যিক

ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares