মেগালো : দীপু মাহমুদ

সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস

বিজ্ঞান একাডেমিতে প্রকল্প উপস্থাপন

বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালকের নাম মিল্করাইচ। বয়স একাত্তর বছর। রাশভারী মানুষ। মাথাভর্তি সাদা চুল। ঠোঁটের ওপর একজোড়া সাদা গোঁফ। নাকের ডগায় চশমা। বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি চশমার ওপর দিয়ে তাকান। বিরক্তিতে তার ভুরু কুঁচকে আছে।

কুক নামে ছাব্বিশ বছরের এক ছেলে প্রকল্প উপস্থাপন করছে। বিজ্ঞান একাডেমিতে অল্পদিনেই এই ছেলের বেশ নামডাক হয়েছে। অভিনব চিন্তায় তার ধারেকাছে কেউ আসতে পারে না। তার বেশিরভাগ সৃষ্টি ভয়ংকর আর অদ্ভুত। তাকে অনেকে বিশ্বকর্মা বলে ডাকে। একবার সে ফসিল থেকে নতুন প্রাণের সম্ভাবনার প্রকল্প বিজ্ঞান একাডেমি থেকে পাশ করিয়ে প্রমাণের কাছাকাছি চলে গেছে। সেটা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

মিল্করাইচ কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে বললেন, নিজেকে বুঝতে পারা খুব দরকার। আমি নিজেকে বুঝে গেছি।

বিজ্ঞান একাডেমির কয়েকজন পরিচালক, গবেষক, বিজ্ঞানী সভায় উপস্থিত হয়েছেন। এটা বিশেষ জরুরি সভা। প্রাথমিক কয়েক ধাপ পার করে প্রকল্প অনুমোদন সভার আয়োজন করা হয়।

সকলে ঘাড় ঘুরিয়ে মিল্করাইচের দিকে তাকালেন। তিনি চশমার ওপর দিয়ে ভুরু আর কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। মিল্করাইচ কুকের দিকে তাকিয়ে বললেন, প্রকল্প প্রস্তাবনা পড়ে যতটুকু বুঝেছিলাম উপস্থাপনের পর তাও গুলিয়ে গেল। এখন কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি বুঝে গেছি আমার বয়স বাড়ছে। আমাকে দিয়ে আর কিস্সু হবে না। আমার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে।

মিস্টার ডার্কব্রাউন গম্ভীর গলায় বললেন, অ্যাই কুক, তুমি কি দয়া করে তোমার প্রকল্পধারণাটি আরেকবার উপস্থাপন করবে?

মিস্টার ডার্কব্রাউন বিজ্ঞান একাডেমির ডেপুটি প্রধান। তার মুখ থাকে সবসময় থমথমে। কেউ কোনওদিন তাকে হাসতে দেখেনি। তিনি অতি ভালো মানুষ। ভীষণ আন্তরিক। প্রচণ্ড ভয় পেলেও তাকে সকলে শ্রদ্ধা করে এবং বিশেষ পছন্দ করে।

কুক চটপটে ছেলে। সে সবরকম পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকে। তবু মিল্করাইচ যখন বলেছেন তিনি কিছু বুঝতে পারেননি তখন কুক ঘাবড়ে গেছে। হিমশীতল ঘরে সে তিরতির করে ঘামতে শুরু করেছে। হাতের কাছে পানি ভরতি গ্লাস তুলে নিয়ে ঢকঢক করে গ্লাসের পুরো পানিটুকু খেয়ে ফেলল। ঢোক গিলে বলল, নিশ্চয়! আমি পুনরায় আমার ধারণা উপস্থাপন করছি।

সকলে আবার কুকের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। মিল্করাইচ খানিকটা সামনে ঝুঁকে চশমার ওপর দিয়ে কুকের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মিস্টার ডার্কব্রাউনের হাতে কফির মগ। তিনি কফিতে চুমুক দিলেন।

কুক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সে ধীর গলায় বলল, পশ্চিমে আছে বিশাল বন। সেই বনের পাশে আছে এক গ্রাম। গ্রামের নাম চাইতু। গ্রামে বেশ কয়েকঘর মানুষ বসবাস করে। বনের ভেতর আছে আদিম এক আদিবাসী গোষ্ঠীর বাস। বনের একপাশ ঘিরে রেখেছে কিভু হ্রদ।

এ পর্যন্ত বলে থামল কুক। সবার মুখের ওপর দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে এলো। সকলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সবাই মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে। খুব অল্প সময়ের জন্য থেমেছিল কুক। খানিকটা দম নেওয়ার মতো করে বলতে শুরু করল, বনের দক্ষিণে কিভু হ্রদের পাড়ে আমরা নতুন এক শহর বানাব। শহরের নাম মেগালো। গ্রিকশব্দ মেগালোসরাস থেকে মেগালো। যার অর্থ বিশাল গিরগিটি। সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে মেগালোসরাস নামে পৃথিবীতে ডাইনোসরের বসবাস ছিল।

কুক আবার থামল। এবার থেমেছে একটু বেশি সময় নিয়ে। সে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তারা তার কথায় কেমন সাড়া দিচ্ছে সেটা বোঝার চেষ্টা করছে।

মিল্করাইচ বললেন, সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মেগালোসরাস ডাইনোসর ফিরিয়ে আনা হবে মেগালো নামের শহরে, তাই তো?

কুক বলল, সেটা চূড়ান্ত পর্যায়ে। মানুষ ও ডাইনোসরের সহ-অবস্থান হবে।

মিস্টার ডার্কব্রাউন বললেন, প্রাথমিক পর্যায়ে তাহলে কী হবে ?

কুক বলল, মেগালো শহরে আমরা মানুষের বসতি গড়ে তুলব। সেই মানুষ হবে আমাদের বানানো। বলতে পারেন রক্তমাংসের রোবট-মানব। অ্যান্ড্রোয়েড। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স দিয়ে তারা পরিচালিত হবে। আমরা এখান থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ করব। তাদের চিন্তাভাবনা, চলাচল, সিদ্ধান্তগ্রহণÑসব। বেশ কয়েকটি গোত্রে তারা বিভক্ত থাকবে। এখান থেকে চালনা করা হবে তাদের।

কুক আবার কথা থামিয়ে চুপ করে আছে। বিজ্ঞান একাডেমির একজন পরিচালক কিছু বলবেন বলে অনুমতি চেয়েছেন। পরিচালকের নাম ড্রিম ফারমার। তাকে বলার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেন, এটা আধুনিক ভিডিও গেম ছাড়া আমার কাছে অতিরিক্ত কিছু মনে হচ্ছে না।

ড্রিম ফারমারের কথা শুনে কেউ কিছু বলল না। সবাই মিল্করাইচের দিকে তাকিয়ে আছে। মিল্করাইচ কী ভাবছেন বোঝা যাচ্ছে না। তিনি গম্ভীর মুখে চুপ করে আছেন। সভাকক্ষে থমথমে অবস্থা।

মিস্টার ডার্কব্রাউন বললেন, আমার মনে হয় এক কাজ করা যেতে পারে।

সকলে ঘাড় ঘুরিয়ে ডার্কব্রাউনের দিকে তাকাল। তিনি বললেন, রোবট-মানবদের ভেতরে মানবিক গুণাবলি দিয়ে দেওয়া হোক। আর তাদের দেওয়া হোক সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা। তাদের মানবিকতা, সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টার মধ্য দিয়ে তৃতীয় কিছু সৃষ্টি হবে। আমরা দেখতে পারব সেই তৃতীয় ব্যাপারটি কী!

কুকের পক্ষ থেকে প্রকল্প প্রস্তাবনা উপস্থাপন শেষ হয়নি। মাঝপথে প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কুক তাতে বাধা না দিয়ে চুপ করে থাকল।

মিল্করাইচ বললেন, কুক তার প্রকল্প প্রস্তাবনা উপস্থাপন শেষ করলে সেটা নিয়ে আমরা আলোচনা করব।

মিস্টার ডার্কব্রাউন বললেন, অবশ্যই। আমি কেবল কুকের ভাবনাকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে চেয়েছি মাত্র।

মিস্টার ডার্কব্রাউনের কথা শুনে কুক নিজেকে খানিকটা গুছিয়ে নিলো। সে তার ভাবনার সঙ্গে দ্রুত নতুন কিছু যোগ করে ফেলেছে। কুক  আবার তার প্রকল্প প্রস্তাবনা উপস্থাপনায় ফিরে গেল। সে বলল, প্রত্যেক রোবট-মানবকে স্বাধীন করে দেওয়া হবে। তাদের প্রোগ্রামিংটা এমনভাবে করা হবে যেখানে কোনো একটা কাজের কয়েকটা ফলাফল বা পরিণতি থাকবে। তার সামনে থাকবে প্রচুর সম্ভাবনা আর সংকট। সে কোন্ সময়ে কোন্ সুযোগটা গ্রহণ করে তার ওপর নির্ভর করবে তার পরিণতি।

মিল্করাইচ এবার নিজেই উপস্থাপনার মাঝখানে কথা বলে উঠলেন। তিনি জিগ্যেস করলেন, আমরা এখানে বসে কী করব ?

কুক বলল, আমরা ওই রোবট-মানবদের সামনে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ ছড়িয়ে দেব। সেই সমস্ত সুযোগের কতগুলোর পরিণতি হবে ভালো আর কতগুলোর পরিণতি হবে ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক। সে নিজে সিদ্ধান্ত নেবে।

ড্রিম ফারমার এবার আর কথা বলার জন্য অনুমতির নেওয়ার অপেক্ষা করলেন না। তিনি বললেন, এখানে নতুন কিছু দেখা যাচ্ছে না। ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি ভয়ংকর হবে সেটাই স্বাভাবিক।

 কুক শান্ত ও শীতল গলায় বলল, সে যে সিদ্ধান্ত নেবে আমরা তাকে তার বিপরীত পথে পরিচালনা করব। বিভিন্ন গোত্রের ভেতর মারামারি বাধিয়ে দেব। তারা মারামারি, কাটাকাটি করে টিকে থাকবে। আমরা দেখব ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রোবট-মানব কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

মিস্টার ডার্কব্রাউন বললেন, প্রকল্প যদি এমন নিষ্ঠুরতা হয় তাহলে তা আমাদের এখনই বন্ধ করা উচিত।

মিল্করাইচ বললেন, আশা করি আপনি প্রকল্প উপস্থাপনের শেষ পর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। কয়েক ধাপ বিচারবিশ্লেষণ করে আমাদের এখানে এই প্রকল্প উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়েছে। আমি তাদের ওপর বিশ^াস রাখতে চাই, তারা কোনও মায়া বা নেশায় আচ্ছন্ন অবস্থায় এখানে প্রকল্প উপস্থানের জন্য পাঠায়নি।

মিল্করাইচের এই কথা শুনে সকলে চুপ করে গেল। সভাকক্ষে নেমে এলো হিমশীতল নীরবতা। কুক বলল, এক সময় মেগালো শহরে আমরা ডাইনোসর নিয়ে আসব। সেই ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকবে মানুষ। ঠিক মানুষ না, রোবট-মানব। আমরা তাদের কাছ থেকে শিখব ডাইনোসরের সঙ্গে টিকে থাকার কৌশল।

ড্রিম ফারমার তাকিয়েছেন মিল্করাইচের দিকে। মিল্করাইচ ওপর নিচ মাথা ঝাঁকালেন। ড্রিম ফারমার বলল, আমি জানতে চাইছিলাম ডাইনোসরের সঙ্গে মানুষের বসবাসের ব্যাপার আসছে কেন ?

কুক স্থির গলায় বলল, ডিক হ্যাচারিতে ডাইনোসরের জন্ম দেওয়া হয়েছে। তারা ডাইনোসরের ফসিল থেকে ডিএনএ নিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা আমাদের সকলের জানা আছে।

প্রকল্প প্রস্তাবনা উপস্থাপন শেষ হয়েছে। এখন প্রশ্ন-উত্তর পর্ব।

ড্রিম ফারমার উঠে দাঁড়িয়েছেন। বোঝা যাচ্ছে তিনি কিছু বলবেন। সকলে তার দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়েছে। কিছু বলার জন্য এভাবে আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ার কিছু নেই। যা বলার তা বসেই বলা যায়।

ড্রিম ফারমার বললেন, আমরা এই প্রকল্প পাশ করব কি করব না সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি সবাইকে চারটা ঘটনার ভিডিয়ো ক্লিপস দেখাতে চাই। সকলের অনুমতি প্রার্থনা করছি।

তাকে অনুমতি দেওয়া হলো। তিনি বললেন, আমরা অনেক বেশি প্রযুুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছি। আমাদের সমস্ত নির্ভরতা এখন রোবটের ওপর। যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স দিয়ে চালিত অ্যান্ড্রোয়েড। মানুষের নিজের ব্রেইন কাজ করছে না, নিস্তেজ হয়ে গেছে। আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠছে অথর্ব হয়ে। আমরা কি আমাদের ধ্বংস নিশ্চিত করতে রোবট-মানব বানিয়ে এমন এক বীভৎস খেলায় মেতে উঠব। শুধুমাত্র আমাদের মেধাশক্তির বিশালতা দেখার জন্য!

সভাকক্ষে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ড্রিম ফারমারের শুরুর দিকের কথাগুলো বক্তৃতার মতো শোনালেও শেষের কথা তিনি বলেছেন যথেষ্ট আবেগ দিয়ে।

সভাকক্ষের বিশাল মনিটরে ভেসে উঠেছে কোনও এক বাসার একটি ঘর। দশ বছর বয়সের একজন ছেলে বসে আছে কম্পিউটারের সামনে। কম্পিউটার স্ক্রিনে লেখা দেখা যাচ্ছে, উত্তর দাও, ইউনিট নাও। ধাপ শূন্য। সতেজীকরণ প্রশ্ন। এটাতে কোনও পয়েন্ট নেই।

প্রশ্ন: তেল এবং পানি উভয়ই তরল। কোনও পাত্রে রেখে দিলে পানি বাষ্প হয়ে যায়, তেল বাষ্প হয় না কেন ? যেমন ধরা যাক জলপাই বা সূর্যমুখীর তেল!

ছেলেটির কপালের ডানপাশে একটি সবুজ বাতি জ¦লে উঠল। সে কম্পিউটারে উত্তর লিখল, তেলের অণুগুলো নিজেদের ভেতর খুব শক্তভাবে আটকে থাকে। এরা সহজে নিজেদের মধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে না। পানির অণুগুলোর মধ্যে বন্ধন অনেকটা শিথিল। তাই পানির অনুগুলো বাতাসের সাধারণ তাপমাত্রায় ধীরে ধীরে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। তেলের বেলায় সেটা হয় না। তবে নারকেল তেল ৩৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে বাষ্পীভূত হয়।

বিজ্ঞান একাডেমির পরিচালক ডানকান এটুকু দেখে বলে উঠলেন, উত্তর সঠিক হয়েছে। বুঝতে পারছি না ড্রিম ফারমার এই ছবি দেখিয়ে আমাদের কী বোঝাতে চাইছেন।

ড্রিম ফারমার বললেন, আবার দেখুন।

সভাকক্ষের বিশাল মনিটরে পুনরায় একই ছবি দেখা গেল। ছেলেটিকে সেই একই প্রশ্ন করা হয়েছে। সে কিছু লিখছে না। ফ্যালফ্যাল করে কম্পিউটার মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে।

ড্রিম ফারমার বললেন, আপনারা খেয়াল করে দেখুন আগের ছবিতে ছেলেটির কপালের ডানপাশে সবুজ বাতি জ¦লছিল। অর্থাৎ তার ব্রেইনে যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স চিপস লাগানো আছে সেটা কাজ করছিল। পরের বার সেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স চিপসের সার্কিট বন্ধ রাখা হয়েছে। ছেলেটি নিজের ব্রেইন খাটিয়ে এই সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।

সভাকক্ষে আবার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। পরিচালকরা নিজেদের ভেতর কথা বলছে। ড্রিম ফারমার বললেন, আমরা পরপর তিন প্রজন্মকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স চিপসের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছি। তারা আর নিজ ব্রেইন কাজে লাগাতে পারছে না।

কুক কিছুটা বিচলিত হয়ে বলল, এটা সবার জন্য নয়। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স চিপস অত্যন্ত ব্যয়বহুল ব্যাপার। যাদের সামর্থ আছে শুধু তারাই নিজ সন্তানদের জন্য ব্যবহার করছে।

ড্রিম ফারমার বললেন, জ্ঞানের ব্যাপারে আমরা বিশাল বৈষম্য তৈরি করছি। তবে তুমি একথা স্বীকার করে নিয়েছ যে যদি কখনো আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স কাজ করা বন্ধ করে দেয় তাহলে যাদের আর্থিক সামর্থ আছে তাদের সন্তানরা আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। আমাদের রক্ষা করবে সেইসব সন্তানেরা যাদের বাবা-মা কিংবা অভিভাবকের আর্থিক সামর্থ নেই। যারা নিজ ব্রেইন খাটিয়ে কাজ করে।

সভাকক্ষে অকস্মাৎ আবার হিমশীতল নীরবতা নেমে এল। কেউ কোনও কথা না বলে চুপ করে থাকল। ড্রিম ফারমার বললেন, এখন পরপর তিনটি ভিডিয়ো ক্লিপস দেখাচ্ছি। আশা করি এতে আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।

ড্রিম ফারমার ভিডিয়ো চালিয়ে দিলেন। প্রথমে দেখা গেল একটা বাড়িতে বাবা-মা, ছেলেমেয়ে তারা নানাধরনের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস নিয়ে নিজের মতো ব্যস্ত। রোবট তাদের জন্য খাবার বানাচ্ছে। ঘর পরিষ্কার করছে। কাপড় ধুয়ে, শুকিয়ে আনছে।

তারপর আবার সেই একই বাসায় দেখা গেল রোবটগুলো অকেজো হয়ে আছে। ছেলেমেয়ে খাবারের জন্য চিৎকার চেঁচামেচি করছে। তারা কেউ খাবার বানাতে পারছে না, তাদের জন্য কেউ খাবার বানায়নি। তাদের ক্ষুধা লেগেছে।

ঘরদোর অপরিষ্কার হয়ে আছে, কাপড়চোপড় নোংরা। বাবা-মা নিজেদের ভেতর এই ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া করছে। একে অপরকে দোষারোপ করছে। কেউ কিছু করতে পারছে না।

এরপরের ভিডিয়োতে দেখা গেল একজন ডাক্তার পামটপ দিয়ে রোগির হার্ট অপারেশন করছেন। সেই ডাক্তারকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সি ছাড়া সাধারণ অপারেশন করতে দেওয়া হলো। তিনি করতে পারলেন না।

মনিটরে একজন রাজনৈতিক নেতাকে দেখা যাচ্ছে। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ বেশ ডাকসাইটে নেতা। যেকোনও সংকটে দেশ অপেক্ষা করে তার কাছ থেকে সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য।

সংকট এলে তিনি তা আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্ট ডিভাইসে বিশ্লেষণ করে সমাধানের জন্য বলেন। আজ তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, শিশুর শারীরিক ও মেধা বিকাশে খেলাধুলা ও চিন্তার যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। সরকারের অর্থায়নে বি ব্লকের দুটো মাঠে ইতোমধ্যে পরিবেশবান্ধব শিশুপার্ক বানানোর আয়োজন শুরু হয়েছে। আপনি কি মনে করেন শিশুদের শারীরিক ও মেধার বিকাশে পরিবেশবান্ধব এই শিশুপার্ক কোনো ভূমিকা রাখবে ? 

তিনি বোকার মতো চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছেন। তার কাছ থেকে আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্ট ডিভাইস সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে পারছেন না।

 ড্রিম ফারমার বললেন, আমার যা বলার ছিল বলা হয়েছে। এখন আপনারা সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা কি আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সকে আরও বেশি উৎসাহিত করব ?

 কেউ কোনও কথা বলেনি। সকলে ভেবেছে ড্রিম ফারমারের এই আলোচনার পর কুকের মেগালো শহর বানানোর প্রস্তাব নাকচ হয়ে যাবে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মিল্করাইচ বললেন, এই প্রকল্প প্রস্তাব আমি গ্রহণ করছি ছোট্ট সংশোধনীসহ।

সকলে এবার মিল্করাইচের দিকে তাকিয়েছে। তিনি বিজ্ঞান একাডেমির ডেপুটি প্রধান মিস্টার ডার্কব্রাউনের মতের সঙ্গে মত মিলিয়ে বললেন,  মেগালো শহরের বাসিন্দাদের নিয়ন্ত্রণ করার দরকার নেই। রোবট-মানব হবে রক্তমাংসের তৈরি। তাদের ভেতর মানবিকতা থাকবে। তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তাদের প্রোগ্রামিং করা হবে এমনভাবে যেন নিজ সিদ্ধান্ত এবং কাজের ফলাফল সে ভোগ করে। তবে তাকে মাঝপথে কোনওভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে না। তাহলে সে তার ভাবনার উন্নতি ঘটাতে পারবে। তাদের মাঝেমধ্যে মেগালো শহরের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। তারা বনজঙ্গল দেখবে। পশুপাখি দেখবে। এমনকি তাদের কখনও চাইতু গ্রামে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। চাইতু গ্রামের মানুষ যে ভাষায় কথা বলে মেগালো শহরের মানুষের ভাষা হবে একই। এমনকি তারা যেকোনও ভাষা বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারবে এবং বলতে পারবে। চাইতু গ্রামে গিয়ে তারা সেখানকার মানুষের সঙ্গে মিশে নতুন কোনও ধারণা নিজের ভেতর ধারণ করতে পারবে। তবে পুরো ব্যাপারটার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞান একাডেমির হাতে থাকবে। কখনও যদি মনে হয় কোনও গোত্রকে ধ্বংস করে দিতে হবে কিংবা কোনো গোত্রের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া দরকার তা যেন করা যায়।

হলে নীরবতা নেমে এসেছে। সকলে মিল্করাইচ যা বললেন সেটা নিয়ে ভাবছেন। খানিকটা সময় পার হয়ে গেল। নীরবতা ভাঙলেন মিস্টার ডার্কব্রাউন। তিনি বললেন, আমাদের কাছে কোনও নিয়ন্ত্রণ রাখার দরকার নেই। মেগালো শহরে একদল রক্ষী রোবট থাকবে পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। তাদেরকে সেভাবে প্রোগ্রামিং করা হবে। আমরা যা চাইছি ঠিক সেভাবে। প্রয়োজনে তাদের আলাদা চেহারা দেওয়া যেতে পারে। যেমন তাদের মাথায় চুল থাকবে না এবং তাদের কান আর নাক থাকবে না। শোনা এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য কান আর নাকের জায়গায় থাকবে সামান্য ফুটো।

ড্রিম ফারমার কোনও কথা বলছেন না। পুরো ব্যাপারটার সঙ্গে তিনি কোনওভাবেই একমত হতে পারছেন না। অথচ মনে হচ্ছে সকলে চাইছে এই প্রকল্প প্রস্তাব পাশ হয়ে যাক। তিনি চুপ করে আছেন।

বিজ্ঞান একাডেমির আরেকজন পরিচালক ওথ বললেন, বিশেষ করে রোবট-মানবরা যখন মেগালো শহরের বাইরে যাবে তখন তাদের ওপর আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তখন তারা হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, এটা আমার প্রস্তাব।

ওথ যা বলেছেন তার পক্ষে-বিপক্ষে কিছুক্ষণ কথা হলো। পরে মেনে নেওয়া হয়েছে যে রোবট-মানবদের বিজ্ঞান একাডেমি থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে যখন তারা তাদের বানানো শহর মেগালোর ভেতরে থাকবে। শহরের বাইরে রোবট-মানব হবে সম্পূর্ণ মুক্ত।

কুক বলল, শহরের বাইরে অন্তত রক্ষী রোবটদের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ রাখার অনুমতি দেওয়া হোক।

সেই অনুমতি দেওয়া হলো। প্রস্তাবে কিছু সংশোধনী জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এরভেতর সবচেয়ে বড়ো সংশোধনী হচ্ছে মেগালো শহরের সদর দরজার নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞান একাডেমির আওতায় থাকবে না, থাকবে শহরের রক্ষীদলের কাছে।

ড্রিম ফারমারের আপত্তিসহ বিজ্ঞান একাডেমি কুক প্রস্তাবিত মেগালো নামের শহর বানানোর প্রকল্পের অনুমোদন দিয়ে দিল।

২.

আদিবাসী গ্রাম

পশ্চিমে যে বিশাল বন সেই বনের মাঝে আছে আদিবাসীদের গ্রাম। গ্রামের নাম বাবুতি। আর এই আদিবাসীদের বলা হয় বামবুতি।

বাবুতি ছোট্ট গ্রাম। সেখানে খুব বেশিজন বামবুতি বাস করে না। তাই তাদের খোঁজ কেউ জানে না। শুধু জানে বিশাল ওই বনের ভেতর হ্রদে ঘেরা ছোটো একটা গ্রাম আছে। সেই গ্রামে কয়েকজন আদিবাসী থাকে। হ্রদের নাম কিভু।

বিশাল বনের মাঝে হ্রদের ভেতর পিঠ ভাসিয়ে থাকা তিমির মতো দ্বীপ বাবুতি। দ্বীপের যেদিকে চাইতু গ্রাম সেদিকটা ঘন বন। আর অন্যদিকে কিভু হ্রদের পানি। দ্বীপের প্রায় পুরোটা ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়ে গেছে। সেখানে জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় বামবুতিদের।

গাছের ডাল লতাপাতা দিয়ে ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে বামবুতিরা থাকে। পশু শিকারের জন্য তারা তির-ধনুক ব্যবহার করে। খুব ছোটবেলা থেকে লড়াই করে টিকে থাকার কৌশল শেখান হয় বামবুতি ছেলেমেয়েদের। আর এই কৌশল শেখার ভেতর লুকিয়ে থাকে আগামীতে বাবুতি গ্রামের নেতা হওয়ার সম্ভাবনা।

গ্রাম প্রধানরা প্রায় সকলেই বৃদ্ধ। গ্রাম পরিচালনার জন্য তারা একজন নেতা নির্বাচন করেন। এখন বাবুতি গ্রামের যিনি নেতা তার নাম জিউ। বয়স সত্তর বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু তাকে দেখলে মনে হয় পঞ্চান্ন বছরের বেশি বয়স হয়নি তার।

গ্রাম প্রধানদের আলাপ-আলোচনা করার জন্য গ্রামের একপাশে আলাদা জায়গা নির্ধারণ করা আছে। বাবুতিরা তার নাম দিয়েছে বাহুট আবাস। বামবুতি ভাষায় বাহুট মানে হচ্ছে শান্তি। সেখানে তরুণ বামবুতিরা যায় গ্রাম প্রধানদের কাছে বুদ্ধি পরামর্শ নিতে। গ্রাম প্রধানদের অনুমতি ছাড়া বাবুতি গ্রামের কেউ কিছু করতে পারে না।

জিউ দাঁড়িয়ে আছেন পশ্চিম দিকে মুখ করে। পেছনে সকালের সূর্য। সামনে বালির ওপর তার আবক্র ঋজু ছায়া পড়েছে। ছায়ার দুপাশে বালিতে মুখ গুঁজে দুহাত জোড় করে জিউয়ের সামনে সটান শুয়ে আছে দুজন। তাদের একজন কন্যা আর আরেকজন বালক। কন্যার বয়স সাত বছর আর বালকের বয়স দশ বছর।

কন্যার নাম গিমি। সাত বছর বয়স পূর্ণ হলে বামবুতিদের দীক্ষা নিতে হয়। সেদিন থেকে শুরু হয় তার লড়াই করে টিকে থাকার শিক্ষা।

জিউ বললেন, উঠে বসো।

গিমির পাশে আছে হুয়া। তারা দুজন উঠে বসল। তারা বসে আছে টানটান হয়ে। দুইহাতের করতল দুই হাঁটুর ওপর রেখে দিয়েছে। 

জিউ বললেন, আমার দিকে তাকাও।

গিমি আর হুয়া মাথা তুলে জিউয়ের চোখের দিকে তাকাল। সূর্যের আলো এসে পড়ছে তাদের মুখে। তরতাজা উজ্জ্বল প্রাণবন্ত মুখ। সকালের রোদ্দুরের আভা তাদের মুখকে আরও দ্যুতিময় করে তুলেছে। তারা তাকিয়ে আছে জিউয়ের চোখে। জিউয়ের দৃষ্টি স্থির। পলকহীন শান্ত তার চোখ।

ওদেরকে ঘিরে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছে বাবুতি গ্রামের মানুষ। গিমির দাদি, মা আর বাবা মিশে গেছেন বামবুতিদের সাথে।

গিমির দিকে তাকালেন জিউ। গিমির চোখের ওপর নিষ্পলক চোখ রাখলেন। অতিপ্রাকৃত ভরাট গলায় বললেন, কখনও কারও ক্ষতি করবে না। অন্যকে শ্রদ্ধা করবে। অন্যায় হত্যার জন্য আমাদের লড়াই নয়, বেঁচে থাকার জন্য আমাদের লড়াই। তোমার থেকে কখনও যেন কারও অমর্যাদা না হয়। আহার, বাসস্থান, সম্মান আর নিজের এবং বামবুতিদের মর্যাদা রক্ষা করার জন্য লড়াই করবে। কখনও কাউকে অপমান করবে না। সবকিছুর ওপরে স্থান দেবে ভালোবাসাকে। জেনে রাখবে তোমার জন্ম হয়েছে মানবপ্রেমের জন্য। তোমার মঙ্গল হোক। জয়ী হও তুমি।

গিমি আর হুয়া হাঁটুর ওপর থেকে দুহাত তুলে ফেলল। মুষ্টিবদ্ধ দুহাত আড়াআড়িভাবে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরল। সেটাই নিয়ম।

জিউ বললেন, গিমি, মনে রাখবে তুমি মারগুর দৌহিত্রী। তোমার দাদাঠাকুর ছিলেন আমাদের নেতা। তুমি আমার আশীর্বাদ গ্রহণ করো। গ্রহণ করো তোমার প্রয়াত পিতামহর আশিস।

গিমি দুইহাতের করতল জোড়বেঁধে বুকে ঠেকাল। জিউ বললেন, ওঠো। শুরু করো।

প্রথম পর্বে দুজনের মল্লযুদ্ধ। গিমিকে লড়তে হবে হুয়ার সঙ্গে। অল্প বয়সিদের ভেতর হুয়া সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী আর কৌশলী। গিমির সাথে লড়াইয়ের জন্য তাকে নির্বাচন করেছেন জিউ।

বালির ওপর চক্রাকারে গিমি আর হুয়া ঘুরছে। তাদের যে কেউ আরেকজনকে ধরে বালির ওপর শুইয়ে দেবে। গিমিকে পরে ধীরে ধীরে মল্লযুদ্ধে পারদর্শী করে তোলা হবে। কীভাবে লড়াই করে কাবু করতে হয় ভয়ংকর পশুকে। তবে ইতোমধ্যে সে তার বাবার কাছে মল্লযুদ্ধ শিখেছে। বাবার সঙ্গে লড়েছে বেশ কয়েকবার।

হুয়া সামনে ঝুঁকে গিমির দিকে ছুটে এসে সরে গেল। গিমির দাদি এগিয়ে এসেছেন। গিমির মা হাত ধরে তাকে আটকালেন। দাদি ভেজা গলায় বললেন, দুধের মেয়েটার শরীর এমনিতেই পলকা। বেকায়দায় যদি লাগে তাহলে হাড় ভেঙে যাবে।

মা বললেন, আপনি শান্ত হোন। আপনার নাতনি ঠিকই সামলে নেবে। সে জানে কেমন করে লড়তে হয়। দাদার রক্ত তার শরীরে।

আচমকা হইচই চিৎকার শুরু হয়েছে। আনন্দে সকলে হইহই করছে। গিমি ছুটে এসে অদ্ভুতভাবে জাপটে ধরে বালির ওপর শুইয়ে দিয়েছে হুয়াকে। ঘটনা এত দ্রুত ঘটেছে যে হুয়া কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। সে হতভম্ব হয়ে গেছে।

জিউ বললেন, এসো এবার আমার সঙ্গে।

গিমি জোড় হাতে প্রণাম করে তাঁর সামনে দাঁড়াল। এক হাত বাড়িয়ে দিলো জিউয়ের দিকে। জিউ তার হাত ধরে জোরে ঘোরালেন। পাক খেয়ে বালির ওপর পড়ে গেল গিমি।

জিউ শান্ত ও শীতল গলায় বললেন, ব্যাঘ্রশাবক আনার ব্যবস্থা করো। আয়োজন করো তক্রতটের। বামবুতি ভাষায় তক্রতট মানে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।

দশফুট লম্বা কালো কুচকুচে গাছের গুড়ি পোঁতা আছে মাটিতে। তাতে গাছের ছাল দিয়ে বাঁধা হয়েছে গিমিকে। গিমির চেহারায় নির্লিপ্তভাব। তাকে দেখাচ্ছে নিরুদ্বিগ্ন ও নিস্পৃহ।

গাছের ডাল দিয়ে বানানো খাঁচায় আছে বাঘের বেশ বড়োসড়ো একটা বাচ্চা। তক্রতটের জন্য সবসময় যে বাঘের বাচ্চা আনা হয় তা নয়। কখনও সিংহের বাচ্চা, নেকড়ে বা শেয়ালের বাচ্চাও আনা হয়। যখন যেটা পাওয়া যায়।

বিশেষ কায়দায় খাঁচার ভেতর আটকানো বাঘের বাচ্চাকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছে। খাঁচার ভেতর সে পায়চারি করছে আর গরগর করছে।

আচমকা খাঁচার মুখ খুলে দেওয়া হলো। ছুটে বের হয়ে এসেছে বাঘের বাচ্চা। সকলে দৌড়ে ছড়িয়েছিটিয়ে পড়েছে আশপাশে।

খাঁচা থেকে বের হয়ে বাঘ লাফিয়ে পড়ল গিমির পিঠে।

‘ও মা গো’ বলে গিমির মা দৌড় শুরু করলেন। গিমির মাকে আটকে দিয়েছেন গিমির দাদি আর বাবা।

দাদি বললেন, শান্ত হও বৌমা। গিমির দাদা একসঙ্গে তিন-তিনটা বাঘের সঙ্গে লড়াই করেছিল।

কাঁধে থাবা বসিয়ে নখ দিয়ে আঁচড়ে বাঘের বাচ্চা গিমির পিঠ চিরে ফালাফালা করে ফেলেছে।

গিমি চিৎকার করেনি, কাঁদেনি, ব্যথায় উফ জাতীয় কোনও শব্দ করেনি। মুখ শক্ত করে স্থির হয়ে থেকেছে। তাকে একেবারেই অস্থির দেখায়নি। সে ছিল শান্ত।

জিউ বললেন, বাঘকে খাঁচায় আটকাও। বনের গভীরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসো তাকে।

গাছের গুড়িতে মাথা ঠেকিয়ে আছে গিমি। বাবুতি গ্রামের মানুষজন এগিয়ে এসে আবার বৃত্ত রচনা করেছে। বাঘের বাচ্চা খাঁচায় আটকে ফেলা হয়েছে।

ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন জিউ। গিমির মাথায় হাত রাখলেন। শান্ত এবং দৃঢ় গলায় বললেন, রক্ষা করবে তুমি বামবুতিদের।

৩.

চাইতু গ্রামের মেয়ে শাওনি

গ্রামের নাম চাইতু। বিশাল বনের পাশে চাইতু গ্রাম। এই গ্রামের মেয়ে শাওনি। বয়স ১০ বছর। এখানে তার সমবয়সি আর কেউ নেই। অন্যরা হয় তার চেয়ে বয়সে বড়ো না হয় ছোটো। তাছাড়া শাওনি একা থাকতে চায়। সবসময় কী যেন ভাবে। গাছ আর পশুপাখির সঙ্গে কথা বলে। তাদের সঙ্গে থাকতে সে পছন্দ করে।

শাওনি পশুপাখি ভালোবাসে। তার চারটা বিড়াল আছে। আর আছে বেশকিছু পোষা পাখি। কিছু পাখি তার বাড়িতে থাকে আর কিছু পাখি থাকে বনে। যারা বনে থাকে তারা প্রতিদিন সকালে একবার আসে চাইতু গ্রামে শাওনির সঙ্গে দেখা করতে। শাওনি তাদের খেতে দেয়। পাখিগুলো কিচিরমিচির করে খাবার খেয়ে আবার বনের ভেতর চলে যায়।

আর আছে বানর। অনেক বড়ো বড়ো বানর। সেগুলো হনুমান কিংবা শিম্পাঞ্জী নয়, বানর। তবে বেশ বড়ো। শাওনির তখন ৫ বছর বয়স। সে বাড়ির বাইরে খেলা করছিল। একা ছিল শাওনি। তার পাখি এসেছে বনের ভেতর থেকে। পাখিরা তাকে ঘিরে রেখেছে। শাওনি লাফাচ্ছে। পাখিগুলো উড়ে গিয়ে আবার কাছে এসে কিচকিচ করছে।

হঠাৎ পাখিগুলো কিচিরমিচির করতে করতে একসঙ্গে উড়ে চলে গেল। শাওনি তাকিয়ে দেখে একটা বানর তার দিকে হেঁটে আসছে। সে আসছে শান্ত ভঙ্গিতে। ছোট্ট শাওনি একটুও ভয় পায়নি।

শাওনি বলল, এই বানর, তোমার লেজ মাটিতে পড়ে আছে। ময়লা লেগে যাবে।

বানর বলল, হিচিক।

শাওনি বলল, তোমার মা তোমাকে প্যান্ট পরায়নি ? গায়ে তো জামাও দাওনি!

বানর বলল, কিচিক।

শাওনি বলল, আমার সাথে খেলবে ?

বানর তার হাত বাড়িয়ে দিলো। শাওনি বানরের হাত ধরল। তারা হেঁটে হেঁটে বনের ভেতর চলে গেল।

খানিকবাদে শাওনির খোঁজ শুরু হলো। খুঁজে খুঁজে তাকে কোথাও পাওয়া গেল না। বন থেকে শাওনির যে পাখিগুলো এসেছিল তারা বনে ফিরে গেছে।

চাইতু গ্রাম খুব বেশি বড়ো না। একজনের কাছ থেকে আরেকজন, তার কাছ থেকে আরেকজন এভাবে মুখেমুখে সকলে জেনে গেল শাওনিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন তারা ঠিক করল বনের ভেতর খুঁজতে যাবে।

অনেক গভীর বন। সেই বনের ভেতর কী কী জন্তু আছে তারা জানে না। তবে বনে হাতি আছে তারা জানে। মাঝে মধ্যে হাতিরপাল বন থেকে বের হয়ে গ্রামে আসে। বাঘ, সিংহ আছে কিনা সে ব্যাপারে তাদের ধারণা নেই। তারা বনে মৌচাক থেকে মধু আনতে গেছে, কাঠ কাটতে গেছে। কোনওদিন বাঘ বা সিংহ দেখেনি। তবে কেউ কেউ বাঘ-সিংহের পায়ের ছাপ দেখেছে। তারা হয়তো থাকে আরও গভীর বনে। তবে শেয়াল আর নেকড়ে দেখেছে। তারাও কম ভয়ের না।

গ্রামের মানুষজন লাঠির মাথায় আগুন জ্বেলে, লাঠিসোটা হাতে নিয়ে হইহই করে ঢুকে পড়ল বনের ভেতর। দিনের আলো থাকতে থাকতে তারা শাওনিকে খুঁজে বের করতে চায়।

কোজো গ্রামের প্রধান। সে আছে। তার সঙ্গে গ্রামের অন্যান্যরা আছে। মাহতা বলল, নেকড়ে আর শেয়ালের গর্তগুলো দেখে যাব নাকি ? তারা ছোটো ছেলেমেয়েদের টেনে নিয়ে যায়।

কোজো ব্যাপারটা মানতে চাইছিল না। তবুও সে শেয়াল আর নেকড়ের গর্তের আশপাশে কোনও টানাহেঁচড়ার দাগ আছে কি না খোঁজ করে যেতে থাকল। তেমন কিছু দেখা গেল না।

বিপত্তি বাধল বাবুতি গ্রামের কাছাকাছি গিয়ে। লাঠির মাথায় আগুন আর লাঠিসোটা নিয়ে গ্রামবাসীদের আসতে দেখে বামবুতিরা মনে করল কেউ তাদের আক্রমণ করতে এসেছে। তারা নানারকমের আওয়াজ করতে করতে তির-ধনুক নিয়ে এগিয়ে এল।

তখন দেখা গেল শাওনি সেখানে বামবুতি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলা করছে।

কোজো এগিয়ে গেল। তারা একে অন্যের ভাষা বুঝতে পারল না। মাহতা অল্প অল্প বামবুতি ভাষা জানে। সে কিছু বলল আর শাওনিকে দেখিয়ে কোজো তাদের ঘটনা বোঝানোর চেষ্টা করল। বামবুতিদের নেতা জিউ ঘটনা বুঝতে পেরে হেসে ফেললেন। তিনি সবাইকে ঘটনা বুঝিয়ে বললেন। সকলে তির-ধনুক নামিয়ে নিলো।

নিজ গ্রামের মানুষজন দেখে শাওনি এগিয়ে এল। সে বামবুতি ছেলেমেয়েদের তারসঙ্গে আসতে বলল। তারা এল না।

কোজো এগিয়ে গিয়ে ইঙ্গিতে হাত নেড়ে জিউকে জিগ্যেস করল, তোমরা শাওনিকে কোথায় পেলে?

জিউ হাত নেড়ে বোঝালেন তারা জানে না শাওনি এখানে কীভাবে এসেছে। তবে তাকে তারা তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলতে দেখেছে। তাকে ফল খেতে দেওয়া হয়েছিল। সে ফল খেয়েছে। অল্প কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছে এখানে।

শাওনিকে ডেকে কোজো জানতে চাইল, তুমি এখানে কীভাবে এলে ?

শাওনি বলল, বানরের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে বনের ভেতর চলে এলাম। তারপর একটা ঘোড়ার পিঠে চড়ে এখানে এসেছি। এরা আমার বন্ধু। এদের সঙ্গে খেলা করছিলাম।

কোজোর মনে হলো শাওনি হয়তো গাধার পিঠে চড়ে এসেছে। এখানে বুনো ঘোড়া দেখা যায় না। তবে কিছু গাধার সন্ধান পাওয়া গেছে।

বাবুতি গ্রামের মানুষদের ধন্যবাদ জানিয়ে চাইতু গ্রামের মানুষরা শাওনিকে নিয়ে ফিরে এল। তখন সূর্য ডুবি ডুবি করছে।

চাইতু গ্রামে আনন্দের ঢেউ উঠেছে। কিছুদিন পরে তাদের কুমহরি উৎসব। সে এক বিশাল ব্যাপার। উৎসবের দিন কোনও বাড়িতে রান্না হয় না। গ্রামের চাতালে রান্না হয়। রান্নার আয়োজনে থাকে গ্রামের সবাই। যাকে যেমন দরকার। যারা রান্না করতে চায় আর ভালোবাসে।

সেদিন অনেকরকম আনন্দ হয়। অদ্ভুত খেলায় মেতে ওঠে গ্রামের নারী-পুরুষ, শিশু, কিশোর-কিশোরী এমন কি বয়স্ক মানুষজনও। উৎসবের দিন সবাই চাতালে বসে একসঙ্গে খায়। সে তাদের বড়ো আনন্দের দিন।

এখন চলছে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি। চাতাল ঠিক করা। বাড়ি বাড়ি থেকে চাল, তেল, মশলা জোগাড় করা। সেসব গুছিয়ে রাখা। কত কাজ, কাজের কী শেষ আছে নাকি! গ্রামের সকলেই ব্যস্ত।

বন থেকে একপাল হাতি বেরিয়ে এসেছে। মাঝে মধ্যে আসে। গ্রামের পাশে নদী আছে। নদীর নাম চৈতি। হাতিরপাল এসে চৈতি নদীতে পানি খায়। শুঁড় দিয়ে পানি ছিটায়। কেউ কেউ পানিতে নেমে শরীর ভিজিয়ে নেয়। তারা আবার বনে ফিরে যায়।

মাঝেমধ্যে হাতিরপাল গ্রামে ঢুকে বড্ড অনিষ্ট করে। মাঠে ফসল থাকলে সেগুলো নষ্ট করে ফেলে। কোনও কারণে মেজাজ খারাপ থাকলে দু-একটা বাড়িঘর ভেঙে রেখে যায়।

আজ হাতির পালের মন ভালো। তারা চৈতি নদীতে গিয়ে পানি খেয়ে, শুঁড় দিয়ে পানি ছিটিয়ে বনে ফিরে যাচ্ছে। বনের পাশে বাড়ির সামনে ফাঁকা মাঠে দাঁড়িয়ে আছে শাওনি। তার হাতে গাছের লম্বা লতা। এই লতা দিয়ে তারা ঘর বাঁধে। রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হয় না। শাওনি সেই লতা হাতের ভেতর পেঁচিয়ে খেলা করছে।

হাতির পালের দলনেতা হাতি এসে শাওনির সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার পেছনে সবগুলো হাতি দাঁড়িয়ে গেল।

অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শাওনি হাতির দিকে। দলনেতা হাতি শাওনির সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে। অন্য হাতিরাও তার দেখাদেখি হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল।

দলনেতা হাতি শাওনির দিকে শুঁড় এগিয়ে দিলো। শাওনি উঠে পড়ল হাতির শুঁড়ে। হাঁতি তাকে পিঠে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর হাঁটতে থাকল।

শাওনির ভালো লাগছে। সে হাতে পেঁচানো লম্বা লতা হাতির গলায় মালার মতো করে পরিয়ে দিলো। শক্ত করে বাঁধন দিয়ে দিল। পেঁচানো লতা হাতির গলায় মালা হয়ে থাকল।

এই ঘটনা দেখে গ্রামের মানুষজন হইহই করে উঠল। তাদের হইচই শুনে বাড়ির ভেতর থেকে শাওনির মা আর বাবা বের হয়ে এল। শাওনিকে হাতির পিঠে দেখে মা কাঁদতে শুরু করেছে। শাওনি তখন হাতির পিঠে বসে হাসছে।

হাতির কী মনে হলো কে জানে। হাতি আবার হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। সবগুলো হাতি আবার আগের মতো হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে। শাওনির মা চিৎকার করে কাঁদছে। অন্যরা হাতির কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে। শাওনির মা শাওনিকে ডাকছে। শাওনি হাতির পিঠ থেকে হাসতে হাসতে নেমে এল।

শাওনির বাবা দৌড়ে গিয়ে শাওনিকে কোলে তুলে নিয়ে ছুটে বাড়ির ভেতর চলে গেল। শাওনির মা বলল, আর কোনওদিন তোকে বাড়ির বাইরে আসতে দেব না। তুই বাড়ির ভেতর থাকবি।

হাতির পাল একসঙ্গে জোরে ডেকে উঠল। তারপর মাটি থেকে হাঁটু তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল। আরেকবার সবাই মিলে একসঙ্গে ডেকে উঠে হেঁটে হেঁটে বনের ভেতর চলে গেল।

৪.

বিজ্ঞান একাডেমির প্রকল্প বাস্তবায়ন

বনের দক্ষিণে মেগালো নামের নতুন শহর বানানো হয়েছে। সেই শহরে পাঠানো হয়েছে নারী, পুরুষ, কিশোর, কিশোরী, শিশু, বৃদ্ধÑনানা বয়সের রোবট-মানব। তাদের একেকজনের চেহারা একেকরকম। শারীরিক শক্তিও সকলের একরকম নয়। কেউ শারীরিকভাবে দুর্বল, কেউ শক্তিশালী। প্রোগ্রামিং করে তাদের ভেতর মানবিক সত্তা বা দোষ-গুণ দেওয়া হয়েছে। কেউ হয়েছে নিষ্ঠুর, কেউ হয়েছে নরম মনের। কাউকে বানানো হয়েছে চিন্তাশীল আবার কেউ উদাস, ভাবুক প্রকৃতির।

তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোবট-মানবদের নিয়ন্ত্রণ এখনও বিজ্ঞান একাডেমি নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে। তারা দূর থেকে রোবট-মানবের চিন্তা ও কাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এটা এখনও তাদের কাছে একধরনের খেলার পর্যায়ে আছে।

বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কুকের সঙ্গে আরও কয়েকজন বিজ্ঞানী, গবেষক আর টেকনিশিয়ান আছে। তারা রোবট-মানবদের নিয়ন্ত্রণ করছে। এরা সকলেই বয়সে তরুণ। তাদের ভেতর উত্তেজনা আছে। মেগালো শহরে রোবট-মানবদের নিয়ে তারা কী করবে সে ব্যাপারে নির্দিষ্টভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই তাদের উত্তেজনা আরও বেশি। তারাই নির্ধারণ করবে রোবট মানবদের নিয়ে কী করা যেতে পারে।

হিচকক বলল, ওদের ভেতর মারামারি বাঁধিয়ে দিই। দেখি তারা কেমন করে নিজেদের রক্ষা করে।

পিলাউ বলল, ওদের তো মারামারির কৌশল আমরা শিখাইনি।

রেড বলল, তাদের প্রোগ্রামিংয়ে মারামারির ব্যাপারটা দেওয়া আছে। যা তাদের আত্মরক্ষার জন্য ইন্সটল করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে। ঘটনা ঘটলে সে আত্মরক্ষা করবে নাকি মার খেয়ে রাস্তার ওপর পড়ে থাকবে সেটা তার সিদ্ধান্ত।

কুক বলল, এটা বিজ্ঞান একাডেমি মেনে নেবে না। মিস্টার ডার্কব্রাউন বলেছেন তাদের কোনোরকম সহিংস অবস্থার ভেতর নিয়ে যাওয়া যাবে না। তা ছাড়া মিল্করাইচ ব্যাপারটা ভালোভাবে দেখবেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি শুরুতেই প্রকল্প বাতিল করে দিতে পারেন।

পিলাউ বলল, তাহলে এই রোবট-মানব আগামীতে ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াই করে কীভাবে টিকে থাকবে ?

ওরা নিজেদের ভেতর এরকম কথাবার্তা বলে যেতে থাকল। কী করবে সে বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। তাদের ভেতর যতটা উত্তেজনা বাড়ছে তারচেয়ে বেশি বাড়ছে অস্থিরতা। এখুনি কিছু করতে না পারলে শান্তি পাচ্ছে না।

কুক বলল, ব্যাপারটা পরীক্ষা করে বিজ্ঞান একাডেমিকে দেখাতে হবে।

কেউ কোনো কথা বলল না। কুক সকলের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, প্রাথমিক অবস্থায় আমরা ওদের নিজের তৈরি সমস্যার সমাধান করার ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করে দেখতে পারি।

রেড বলল, সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে কেউ যদি কাউকে হত্যা করে? আমার হাতে যখন নিয়ন্ত্রণ আছে, তুমি যখন কোনও রোবট-মানবকে নিয়ে সমস্যার অন্য কোনও সমাধানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছ তখন আমি সমাধান বের করব হত্যা। আমি তোমার রোবট-মানবকে হত্যা করব। তাতে নতুন সমস্যা তৈরি হবে। এভাবে আমরা সমস্যা তৈরি এবং সমাধানের ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। ঠিক আছে, শুরু করো।

পিলাউ বলল, তার মানে আমরা আগে থেকে আলোচনা করে কিছু নির্ধারণ করব না। যেকোনও একটা সমস্যা তৈরি করব। তারপর আমরাই নিজেদের মতো করে রোবট-মানবদের দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করাব। নিয়ন্ত্রণ যখন আমাদের হাতে!

রেড বলল, ঠিক তাই!

পিলাউ বলল, এতে হত্যার সংখ্যা বেড়ে যাবে। বিজ্ঞান একাডেমি যখন জানবে মেগালো শহরে রোবট-মানবের সংখ্যা কমে গেছে তখন তারা বিরক্ত হবে।

কুক বলল, সেটা হবে না। যারা মারা যাবে তাদের আবার বাঁচিয়ে তোলা হবে। মেগালো শহরের রোবট-মানবদের সংখ্যা কখনও কমবেশি হবে না। আর তাদের বয়স বাড়বে না। শিশু কখনও কিশোর হবে না। কিশোর কখনও তরুণ কিংবা বৃদ্ধ হবে না।

হিচকক বলল, আমরা এখনই জটিল কিছু না ভেবে সহজ কোনও সমস্যার ভেতর তাদের নিয়ে যাই। যেমন ধরো রাস্তা দিয়ে মানুষজন যাচ্ছে কলা খেতে খেতে। কলা খেয়ে তারা খোসা রাস্তায় ছুড়ে ফেলছে। দেখি তারপর তারা কোনও সিদ্ধান্ত নেয় কি না! আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করব না। তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেবে।

পিলাউ বলল, আইডিয়া পছন্দ হয়েছে। চলো আমরা তাই করি।

পরীক্ষামূলকভাবে একটা ঘটনা ঘটানোর আয়োজন করা হলো। কিশোর-কিশোরীরা একসঙ্গে ফুটবল খেলছে। তারা খেলছে আনন্দ নিয়ে। খেলায় তুমুল উত্তেজনা।

আচমকা সেখানে কয়েকজন তরুণ ঢুকে পড়েছে। সামনে যে আছে তার চেহারায় রাগী ভাব। তারা এসে বলল, খেলা বন্ধ।

খেলা কেন বন্ধ হবে কিশোর-কিশোরীরা বুঝতে পারল না। তারা অবাক হয়ে গেল। একজন কিশোর জিগ্যেস করল, খেলা বন্ধ কেন ?

নিয়ন্ত্রণকক্ষে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তারা বেশ আনন্দ পাচ্ছে।

টেবিলে চাপড় দিয়ে রেড বলল, ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। এবার গলাটা ধরে ধাক্কা দিলেই হয়।

পিলাউ বলল, একটা ঘুষি। তারপর ঘটনা গড়াতে থাকবে। গড়াতে গড়াতে কোথায় যায় সেটাই দেখার ব্যাপার।

কুক মুখের ভাব সরল করে বলল, মারামারি বেঁধে যেতে পারে। তরুণরা বেশি বাড়াবাড়ি করলে কিশোরদল তাদের আক্রমণ করে বসবে। তারপর নিজেদের পাড়া থেকে আরও ছেলেমেয়েদের ডেকে আনবে। তারা চড়াও হবে তরুণদের ওপর। তরুণরা পাড়া থেকে বন্ধুদের ডাকবে। তাদের বন্ধুরা আসবে। তুমুল মারামারি শুরু হয়ে যাবে। ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না।

রেড বলল, তাদের আমরা নিয়ন্ত্রণ করছি না। তারা নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এখানে ঘটনার দায় কোনওভাবেই আমাদের ওপর আসতে পারে না।

মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। তরুণদের ভেতর থেকে একজন এগিয়ে এসে বলল, আমরা খেলব।

কিশোরদলের একজন মেয়ে তখন বলল, সে তো খুব ভালো কথা। এসো আমরা একসঙ্গে খেলি। তোমরা হবে একদল। আমরা একদল। আগামীকাল আবার মিলেমিশে দল বানাব।

চমকে উঠেছে রেড। তরুণদলের সামনে রাগী চেহারার যে ছিল সে বলল, উত্তম প্রস্তাব। এসো আমরা একসঙ্গে খেলা করি।

পিলাউ ফস করে মুখ দিয়ে বাতাস ছেড়ে দিল। মনে হলো সে এতক্ষণ দম আটকে রেখেছিল। পিলাউ বলল, হয়ে গেল! এখন তারা মিলেমিশে একসঙ্গে খেলবে। এই হলো তাদের সিদ্ধান্ত।

কিশোরদল আর তরুণরা খেলা শুরু করেছে। খেলার শুরুতেই কিশোররা এক গোল দিয়েছে তরুণদের। এখন কিশোররা আছে চাপের ভেতর। তরুণরা তাদের এরিয়ার ভেতর বল আটকে রেখেছে। তারা বল নিয়ে তরুণদের গোলপোস্টের দিকে যেতেই পারছে না।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে হতাশা নেমে এসেছে। তাদের ভেতর অদ্ভুত ঝিমুনি ভাব। এখন কী করা যায় ভেবে বের করতে পারেনি।    

হিচকক বলল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। চলো আমরা তাদের আদিবাসী গ্রামে নিয়ে যাই। আদিবাসীরা এই রোবট-মানবদের দেখে ক্ষেপে যাবে। তখন তারা তাদের আক্রমণ করে বসবে। আমরা দেখি আদিবাসীদের আক্রমণ কীভাবে রোবট-মানবরা মোকাবিলা করে।

রেড বলল, মেগালো শহরের বাইরে রোবট-মানবেদের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। লড়াইটা হবে রোবট-মানবদের সঙ্গে আদিবাসী গোষ্ঠীর। রোবট-মানবদের পাহারায় থাকবে আমাদের চুলহীন, নাক-কান ছাড়া রক্ষী রোবট। তাদেরকে অবশ্য আমরা সেখানে কাজে লাগাতে পারি।

পিলাউ বলল, শহরের বাইরেও রক্ষী রোবটদের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। প্রয়োজনে আমরা তাদের কাজে লাগাব।

রেডের প্রস্তাব সকলের পছন্দ হলো। রোবট-মানবদের আদিবাসী গ্রাম পরিদর্শনের অনুমতি বিজ্ঞান একাডেমি থেকে নেওয়া আছে।

অসুবিধা দেখা দিল মেগালো শহর আর আদিবাসী গ্রামের মাঝখানে কিভু হ্রদ। এই হ্রদ পার করে কীভাবে রোবট-মানবদের আদিবাসী গ্রামে নিয়ে যাওয়া যাবে ?

হিচকক বলল, নৌকা ভাসিয়ে দেওয়া হোক হ্রদে। অনেকগুলো নৌকায় করে নিয়ে যাওয়া হবে রোবট-মানবদের।

পিলাউ বলল, বৃহৎ জাহাজ বানাব। তাতে একবারে সবাইকে নিয়ে যাওয়া যাবে।

কুক বলল, আমরা তাড়াহুড়ো না করি। আদিবাসীদের গ্রামের সঙ্গে মেগালো শহরের একটা সংযোগ থাকা দরকার। মিল্করাইচের কথা মনে করো তোমরা। তিনি বলেছিলেন এই রোবট-মানবদের মাঝেমধ্যে গ্রামে নিয়ে যেতে হবে। তিনি তাদের চাইতু গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে বলেছেন। যেন তারা পরিবেশ এবং সমাজ থেকে অনেককিছু শিখতে পারে। সেজন্য আমাদের স্থায়ী চিন্তা করা দরকার।

হিচকক বলল, তুমি কি হ্রদের ওপর ব্রিজ বানানোর কথা বলছ ?

কুক বলল, ঠিক তাই।

রেড বলল, সেটা বানাতে সময় লাগবে।

কুক বলল, কিচ্ছু সময় লাগবে না। আমরা অ্যারোব্রিজ বানাব। অ্যারোটিউব ফাইবারে আটকে।

জটিল সমস্যার সহজ সমাধানে হঠাৎ সকলে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। তাদের চোখমুখে খুশির উজ্জ্বলতা জুড়ে বসল।

৫.

রোবট-মানবরা এল বাবুতি গ্রামে

মেগালো শহর থেকে রোবট-মানবরা বের হয়ে এল। হাতে সয়ংক্রিয় অস্ত্র। তাদের মেমোরি সার্কিটে ক্রুদ্ধতা আর নিমর্মতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রোবট-মানবদের পেছনে আছে একদল সুসজ্জিত রক্ষী রোবট। সামনে এগিয়ে যাওয়া দল যদি কোনও কারণে আদিবাসীদের কাছে পরাস্ত হয় কিংবা বেকায়দায় পড়ে যায় তখন রক্ষী রোবট তাদেরকে সহায়তা করবে।

সামনে কিভু হ্রদ। তার ওপরে অ্যারোব্রিজ। ফাইবারে অ্যারোটিউব আটকে বানানো হয়েছে। ব্রিজ শুরু হয়েছে মেগালো শহরের পাড় থেকে। শেষ হয়েছে বনের ধারে। বনের গভীরে অদিবাসী গ্রাম বাবুতি।

বামবুতিরা গতকাল ঘটনা জানতে পেরেছে। গ্রাম প্রধানরা বাহুট আবাসে বসে আলোচনা করছিলেন। বাবুতি গ্রামে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। যেখান থেকে বামবুতিরা খাবার পানি সংগ্রহ করে সেখানে পানি কমে গেছে। পানিতে খুব ছোট ছোট সাদা রঙের কিছু দেখা যাচ্ছে। খাবার পানির জলাশয়ের পানি কেন কমে গেল আর পানিতে এমন ধরনের জিনিস কোথা থেকে এল তা বামবুতিরা বুঝতে পারছে না। তারা খাবার পানির জন্য নতুন জলাশয় তৈরির ব্যাপারে আলোচনা করছে।

গ্রাম প্রধান কায়কুয়ার ভেতর আচমকা অস্থিরতা দেখা দিল। তিনি সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখমুখে আতঙ্ক আর হতভম্ব ভাব মিশে আছে।

কায়কুয়াকে খেয়াল করে অন্য গ্রাম প্রধানরা সামনের দিকে তাকালেন। একদল তরুণ আসছে। তাদের সামনে আবিওলা। তরুণরা যে দলবেঁধে আজই প্রথম আসছে এমন নয়। প্রয়োজন হলে তারা এখানে আসে। কোনও কাজে তাদের পরামর্শ কিংবা অনুমতির দরকার হয়।

আজ তাদের আসার গতি অন্যরকম। ভঙ্গি অন্যরকম। যেন বড়ো রকমের কোনো ঘটনা ঘটেছে কোথাও। তরুণরা হাঁটছে দ্রুতগতিতে। তারা নিজেদের ভেতর কথা বলছে। কথা বলার ভঙ্গি উত্তেজিত। হাত, মাথা, কাঁধ নাড়িয়ে তারা দ্রুত হাঁটার তালে কথা বলে যাচ্ছে।

এমন কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে যা তরুণদের উত্তেজিত করে দিয়েছে তা গ্রাম প্রধানরা অনুমান করতে পারলেন না।

আবিওলা এসে মাটিতে দু’হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার পাশে ও পেছনে অন্য তরুণরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে একইভাবে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। প্রত্যেকের মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত বুকের সঙ্গে লাগানো। গ্রাম প্রধানদের সঙ্গে দেখা করার এই প্রথা বংশ পরম্পরায় বামবুতিরা মেনে আসছে।

জিউ ওপর-নিচ মাথা দোলালেন। তরুণরা উঠে দাঁড়াল। আবিওলা বলল, হ্রদের ওপর আশ্চর্য কিছু দেখা যাচ্ছে। গতরাতে কিছু ছিল না। আজ ভোরেও দেখা যায়নি কিছু। অকস্মাৎ উদয় হয়েছে এক পথ নতুন শহর থেকে। এসে মিশেছে আমাদের বনের আঙিনায়।

আবিওলার দিকে তাকালেন জিউ। ২৬ বছর বয়সের তুখোড় তরুণ। পেটানো শক্তপোক্ত পাকানো শরীর। বামবুতিরা তাকে পছন্দ করে। ভালোবাসে। তার ওপর ভরসা রাখে।

জিউ তাকিয়ে আছেন আবিওলার চোখের দিকে। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আবিওলার। চোখের দৃষ্টি তীক্ষè। সে যেন ভেতরটা পর্যন্ত দেখতে পায়।

অস্থির হয় না আবিওলা কখনও। তার ভেতর বৃক্ষের ভাব আছে। প্রাণবন্ত কিন্তু স্থির। নিজে লড়ে ঝড় সামাল দেয়, রক্ষা করে অন্যদের।

গ্রাম প্রধানদের ভেতর চঞ্চলতা দেখা দিয়েছে। তারা উঠতে চাইছেন। ঘটনা কী ঘটেছে দেখা দরকার। জিউ কিছু না বলা পর্যন্ত তারা উঠতে পারছেন না।

জিউ স্থির চোখে তাকিয়ে আছেন। তার দৃষ্টি দূরে। তবে তা বিপন্ন কিংবা অনিশ্চিত নয়। তিনি তাকিয়ে আছেন নিশ্চিত শান্তভাবে।

কিভু হ্রদের পাড়ে যখন নতুন শহর গড়ে ওঠে তখনই তারা বুঝতে পেরেছিল আকাশে মেঘ জমছে। ঝড় শুরু হবে শিগরি। তবে তা প্রকৃতি থেকে ধেয়ে আসা কোনও ঝড় নয়। মানুষ একদিন ধেয়ে আসবে এই বনভূমিতে। দখল করতে চাইবে তাদের পিতৃপুরুষের আবাস।

সেবার এসেছিল একদল নারী। তাদের সঙ্গে ছিল বানমি আর তামালা। এসে বলল, হ্রদের পাড়ে শহর গড়ে মানুষ।

অসহিষ্ণু গলায় কায়কুয়া বললেন, হ্রদের শীতল বাতাস টেনে নিয়ে আসছে মানুষজনকে। নতুন নতুন শহর বানাচ্ছে তারা। ফাঁকা জায়গা বলে একসময় কোথাও আর কিছু রাখবে না তারা।

তামালা বলল, এরপর তারা দখল নিতে চাইবে আমাদের বনের।

বানমি বলল, মায়ের দখল আমরা ছাড়ি কেমন করে ? মা আমাদের খাওয়ায়, মা আমাদের পরায়, ঘুমাতে দেয়, বাতাস করে। এই বন আমাদের মা।

শীতল গলায় জিউ বললেন, মা সন্তানের জন্ম দেয়। বনে জন্মেছি আমরা। বনে আমাদের বাস। মাকে কেড়ে নিতে চাইতে পারে কেউ। মায়ের দখল নিতে পারে না। আমাদের মাকে ছাড়ব না আমরা।

চুপ করে আছে সবাই। কেউ কিছু বলছে না। এতদিন এমন ভাবনা তাদের মাথায় আসেনি। হ্রদের পাড়ে নতুন শহর গড়ে ওঠা থেকে এমন অলক্ষুণে চিন্তায় কাতর হতে হয়েছে।

জিউ বললেন, শান্ত থাকো সকলে। মা রক্ষা করবেন তার সন্তান। বনকে যখন আমরা মা বলে জানি, বন থেকেই রক্ষা হবে আমাদের।

ভরসা আর দুশ্চিন্তার দোলাচল নিয়ে ফিরে গিয়েছিল নারীরা নিজ গ্রামে। তবে এত দ্রুত তাদের এমন কোনো ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে তারা ভাবেনি।

উঠে পড়েছেন জিউ। তার সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছেন গ্রাম প্রধানরা। তারা হেঁটে যাচ্ছেন বনের ধারে। তরুণরা অনুসরণ করে যাচ্ছে তাদের।

অ্যারোব্রিজ পার হয়ে এগিয়ে এলো রোবট-মানবরা। বামবুতিরা রোবট-মানবদের দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। তারা আগে কখনও এদের দেখেনি। কিংবা এমন অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত দল দেখেনি তারা। তাদের ভয়ংকর দেখাচ্ছে। তাদের হাতের অস্ত্রগুলো বামবুতিদের কাছে অপরিচিত।

জিউ বিপদ বুঝতে পেরেছেন। তিনি সবাইকে তৈরি হয়ে নিতে বললেন। ঢাকে বাড়ি পড়েছে। জোরে জোরে আওয়াজ হচ্ছে। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলছে সবাইকে।

ঢাকের আওয়াজের জোর বাড়ছে। বামবুতি কিশোর-কিশোরী তরুণ-তরুণীরা এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে গিয়ে ভয়ংকর বিপদের খবর দিতে থাকল।

বামবুতি ছেলে, মেয়ে, নারী, পুরুষ সকলে তির-ধনুক নিয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। কেউ সামনে থাকল, কেউ গাছে উঠে পড়েছে। অনেকে তির-ধনুক নিয়ে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়েছে।

আদিবাসীদের প্রস্তুতি আর ছোটাছুটি দেখে বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে যারা বসে আছে তারা মজা পেয়েছে। আনন্দে এক হাত দিয়ে আরেক হাতে বাড়ি দিচ্ছে।

রেড বলল, ঘটনা এখনই ঘটবে। ঘটনা কী হয় আমরা দেখব।

কুকের কাছে রক্ষী রোবটের নিয়ন্ত্রণ। কুক চুপ করে আছে। সে কিছু বলছে না বা করছে না। 

দিশেহারা হয়ে পড়েছে বামবুতিরা। তারা এমন অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিল না। চারদিক থেকে রোবট-মানবরা তাদের ঘিরে ফেলেছে। তারা হাতের অস্ত্র দিয়ে তাদের দিকে আগুন ছুড়ে দিচ্ছে।

কয়েকটা আগুনের গোলা গিয়ে পড়েছে বামবুতিদের ঘরে। সেইসব ঘর আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। দ্রুত আগুন নেভানো দরকার। তা না হলে পুরো বন আগুনে পুড়ে যেতে পারে। এখানে অনেক পশুপাখি আছে। বনে আগুন লাগলে পশুপাখিরা পুড়ে মারা যাবে।

বামবুতিরা অবস্থা বেগতিক দেখে চোরাগোপ্তা হামলা শুরু করল। রোবট-মানবদের দিকে তারা আড়াল থেকে তির ছুড়ে দিচ্ছে। তির লেগে কোনো একজন রোবট-মানব পড়ে গেলে ওরা মনে করছে সে মারা গেছে। নতুন করে আরেকজনকে মারার উদ্যোগ নিচ্ছে। তখন বামবুতিরা দেখল মরা মানুষ আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে। উঠে দাঁড়িয়ে সে আবার আগুন ছুড়ে দিচ্ছে তাদের দিকে।

ঘটনা দেখে ভয় পেয়ে গেল বামবুতিরা। তাদের মনে হলো এরা মানুষ না, অন্যকিছু। সেই অন্যকিছু কী তারা জানে না। শুধু মনে হচ্ছে এরা আকাশের মেঘের ওপার থেকে এসেছে।

গ্রাম জ্বলছে দাউদাউ করে। এখুনি আগুন ছড়িয়ে পড়বে বনে। জিউ দুহাত ওপরের দিকে উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন। তারমানে তিনি কিছু বলবেন। আবিওলা এগিয়ে গেল সামনে। তারসঙ্গে আরও কয়েকজন।

জিউ বললেন, আগুন ছড়িয়ে পড়ছে বনে। বন পুড়ে যাবে। পাখি মারা যাবে। পশু মারা যাবে। আমরা আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে পারব না। যুদ্ধ বন্ধ করো।

অবাক গলায় আবে বলল, যুদ্ধ বন্ধ করব!

আবিওলা বলল, হ্যাঁ যুদ্ধ বন্ধ হবে।

জিউ বললেন, আগে ঘরবাড়ির আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করো। আগে বন বাঁচাও। রক্ষা করো শিশুদের।

আবিওলা আর আবে ছুটে গেল। তাদের সঙ্গে ছুটতে থাকল বাবুতি গ্রামের মানুষজন। এখন তাদের বড়ো দায়িত্ব হচ্ছে আগুন থেকে বন রক্ষা করা।

বামবুতিরা সকলে গাছে উঠে পড়েছে। তারা গাছের পাতার ভেতর নিজের শরীর লুকিয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে গ্রামের দিকে চলে গেল।

বিজ্ঞান একাডেমির কন্ট্রোলরুমে উল্লাস শুরু হয়েছে। তারা সফলভাবে পরীক্ষা চালাতে পেরেছে। বনের ভেতর কয়েকজন আদিবাসী মানুষের লাশ পড়ে আছে। কয়েকজন রোবট-মানব এগিয়ে গেল লাশের কাছে। তারা উবু হয়ে লাশের দিয়ে তাকিয়ে আছে।

কয়েকজন রোবট-মানব হাঁটু মুড়ে বসল আদিবাসীদের লাশের পাশে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে তারা লাশের দিকে। এক কিশোরী চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তার কোনও সাড়া নেই। নিস্তব্ধ, নিথর হয়ে আছে। সে মারা গেছে।

টপ টপ করে রোবট-মানবের চোখ থেকে পানি পড়ল মৃত কিশোরীর মুখের ওপর। রোবট-মানব কাঁদছে। তারা তাকে মেরে ফেলেছে। তারা মানুষ হত্যা করেছে। কেন তারা মানুষ হত্যা করল বুঝতে পারছে না।

এক রোবট-মানব ঝুঁকে কিশোরীর লাশ কোলে তুলে নিলো। তার দেখাদেখি আরও কয়েকজন রোবট-মানব মৃত আদিবাসীর লাশ কোলে তুলে নিয়েছে। তারা লাশ নিয়ে যাচ্ছে আদিবাসী গ্রামের দিকে।

সচকিত হয়ে উঠেছে কুক। ওখানে রোবট-মানবদের ওপর তাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। মেগালো শহরের বাইরে রোবট-মানবরা স্বাধীন। তাদের মেমোরি সার্কিটে ক্রুদ্ধতা আর নিমর্মতা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। তবু তাদের কান্না বন্ধ হলো না। রোবট-মানবরা অতি দুঃখে কাঁদতে থাকল। মানুষ হত্যা করে রোবট-মানবরা কাঁদছে এই দৃশ্য কুককে বিচলিত করে তুলল।

কুক তখুনি রক্ষী রোবট পাঠিয়ে দিল। রক্ষী রোবটরা অতিদ্রুত এগিয়ে গেল। তারা রোবট-মানবদের হাত থেকে আদিবাসীদের লাশ ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলল মাটিতে।

প্রচণ্ড ঘৃণা আর ক্ষোভ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে রোবট-মানবরা। তাদের কাছ থেকে কেন লাশগুলো কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কেন লাশ মাটিতে ছুড়ে ফেলা হয়েছে এ নিয়ে তারা চিৎকার করছে।

খেপে গেছে রক্ষী রোবট। তারা কোনো কথা শুনতে চাইছে না। বেঁধে ফেলার চেষ্টা করছে রোবট-মানবদের। তাদেরর ভেতর ধ্বস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল।

 বেঁচে আছে যে বামবুতিরা, তারা চলে গেছে আড়ালে। তারা গ্রামের আগুন নিভিয়ে ফেলেছে। তারপর কেউ ঢুকে গেছে মাটির গুহায়। কেউ উঠেছে গাছে। পাতার আড়ালে শরীর লুকিয়ে রেখেছে। কোনও মায়ের কোলে সন্তান। কারও হাতে তির-ধনুক। জিউ পরবর্তী কী নির্দেশনা দেবেন সেই অপেক্ষায় আছে তারা।

বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অদ্ভুত অনিশ্চয়তার ভাব নেমে এসেছে। রোবট-মানবদের আচরণ তাদের হতবাক করে দিয়েছে। তারা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করছে। মানুষ হত্যা করে নিজেদের অপরাধী ভাবছে।

কুক তাকাল পিলাউয়ের দিকে। পিলাউ, হিচকক, রেড সবাই মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা যে ঘটনা দেখেছে তা বিশ^াস করতে পারছে না।

আচমকা সবকিছু শান্ত হয়ে এল। রোবট-মানবদের বেঁধে ফেলল রক্ষী রোবটরা। তাদের নিয়ে ফিরে গেল মেগালো শহরে।

তারা শহরে ঢুকতেই শহরের মূল ফটক বন্ধ হয়ে গেল।

বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে আচমকা উল্লাস ছড়িয়ে পড়ল। যেন তারা জিতে গেছে দুঃসাহসিক কোনও খেলায়। এমন খেলা তারা আবারও খেলতে চায়।

৬.

হাতির পিঠে চড়ে শাওনি গেল বনে

চাইতু গ্রামে হইচই পড়ে গেছে। হাতির পাল গ্রামে ঢুকে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। আধাপাকা ফসল নষ্ট করে ফেলেছে। কলাবাগান দুমড়ে মুচড়ে মাটিয়ে শুইয়ে ফেলেছে। আজ কেন হাতির পাল এমন খেপে গেছে তা চাইতু গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল না। এর আগে হাতির পাল কখনও এমন করেনি। ফসলের ক্ষতি করেছে, কলাগাছ মুচড়ে ভেঙেছে। তবে এমন তাণ্ডব তারা কখনও চালায়নি।

গ্রামের মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না তারা কী করবে! এর আগে হাতি নিজের ইচ্ছেমতো এসেছে, ইচ্ছেমতো চলে গেছে। আসা-যাওয়ার পথে কিছু নষ্ট করতে ইচ্ছে হলে করেছে। হাতির পালকে কখনও তাড়াতে হয়নি। তাই চাইতু গ্রামের মানুষ জানে না উন্মত্ত হাতিকে কীভাবে তাড়াতে হয় বা বশে আনা যেতে পারে।

কুমহরি উৎসব নিয়ে তখন ব্যস্ত চাইতু গ্রামের মানুষ। তারা বন থেকে বাঁশ কেটে এনে এক জায়গায় জড়ো করেছিল। কলাগাছ দিয়ে চারপাশ সাজাবে বলে গর্ত খুঁড়েছিল। কয়েকটা গর্তে কলাগাছ লাগানো হয়েছে দেখার জন্য। হাতির পাল সেসব উলটেপালটে ফেলেছে।

 ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে গ্রামের মানুষের মধ্যে। তারা কোন্দিকে যাবে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কয়েকজন মিলে বনের ধারে গিয়ে একসঙ্গে হাতির মতো করে ডাকতে লাগল। তারা ভেবেছিল এতে হাতিরা বনে ফিরে আসবে।

তাতে ফল হলো উলটো। হাতির পাল আরও বেশি খেপে গেল। তারা সবকিছু মাড়িয়ে দল ধরে ছুটে যেতে থাকল।

হাতির পাল চাইতু গ্রামের ফসলের মাঠ মাড়িয়ে, কলাবাগান মাটিতে শুইয়ে দিয়ে চৈতি নদীর দিকে ছুটে গেল।

নদীর পাড়ে গিয়ে হাতির পালের নেতা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাকে এখন শান্ত দেখাচ্ছে। তার পেছনে দাঁড়িয়ে পড়েছে দলের অন্য হাতিরা। হাতির পালের নেতা শুঁড় উঁচু করে মুখে অদ্ভুত আওয়াজ করল। তখন নদীতে শাওনি গোসল করছে।

দলনেতার পেছনে হাতির পাল দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে তাদের ভেতর যে উন্মত্ত ভাব ছিল, এখন তা নেই। তারা শান্ত হয়ে এসেছে।

শাওনি হাতির পালের নেতার দিকে অবাক চোখে তাকাল। সে তাকিয়েই থাকল। হাতির গলায় তার দেওয়া সেই লতার মালা। আজও সেরকমই আছে।

হাতির পালের নেতা এগিয়ে এসে পানিতে শুড় ছোঁয়াল। হাতির পালের অন্যরা তখন নদীতে নেমে এল।

গ্রামের মানুষজন হাতির পালকে ধাওয়া করে নদীর পাড় পর্যন্ত আসার সাহস পায়নি। তারা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দূর থেকে হাতিগুলোকে দেখছে। হাতির পাল ফিরে যাওয়ার সময় আবার কী তাণ্ডব ঘটিয়ে যাবে তারা তা জানে না।

গ্রামের প্রবীণরা বললেন, তোমরা পথ পরিষ্কার করো। হাতি ফিরে যাবে। হাতির ফিরে যাওয়া পথের ওপর থেকে দুমড়ানো কলাগাছ সরিয়ে ফেলো। ছড়ানো ছিটানো বাঁশগুলোকে একপাশে নিয়ে রাখো।

গ্রামের মানুষেরা বুঝতে পারল না হাতি কোন্ পথে ফিরে যাবে। তারা যে পথে এসেছে সেই পথে ফিরে যাওয়ার কথা। সবসময় তাই যায়। আজ তাদের মতিগতি ভালো বোধ হচ্ছে না।

কেউ কেউ মুচড়ানো কলাগাছ, ছড়ানো বাঁশ আর গাছের ভাঙা ডাল পথের ওপর থেকে সরানোর চেষ্টা করল। কেউ গাছে উঠে পড়ল হাতির পাল কী করে দেখার জন্য। কেউ ছুটে গেল বাড়ির দিকে। উঠোনে ছেলেমেয়েরা খেলা করছে। বেশিরভাগ মানুষ চলে গেল মোটা মোটা সব গাছের আড়ালে।

নদীর ধারে যারা ছিল তারা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে নদীতে শাওনিকে দেখতে পেল। শাওনির সঙ্গে নদীতে আরও কয়েকজন গোসল করছে। তারা হাতির পাল দেখে ভয় পেয়েছে। তাদের কয়েকজন সাঁতরে দ্রুত দূরে চলে যাচ্ছে। হাতি পানিতে নামলেও সাঁতরে মাঝনদীতে যাবে না। কেউ খানিকটা পিছিয়ে গলা পানিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। কেউ আবার সাঁতরে খানিকদূর গিয়ে নদী থেকে উঠে পড়ল। হাতি দেখে তাদের ভয় পাওয়ার কথা না, তবু কেন জানি আজ ভয় লাগছে। হাতিদের ভাবভঙ্গিতে আজ এমন আলাদা কিছু আছে যাতে তারা ভয় পেয়েছে।

শাওনি যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকল। তার ভয় লাগছে না বরং ভালো লাগছে। হাতি শুঁড় দিয়ে তার গায়ে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। তাই দেখে শুঁড় দিয়ে এক হাতি আরেক হাতির গায়ে পানি ছিটিয়ে দিতে লাগল।

শাওনি শান্ত পায়ে নদী থেকে উঠে এল। নদীর পাশে গাছের ডাল আর লতা দিয়ে ঘেরা ঘর। শাওনি সেখানে গিয়ে পরনের ভেজা কাপড় বদলে শুকনো কাপড় পরে নিলো।

হাতির পাল নদী থেকে উঠে এসেছে। তারা দলবেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। নড়াচড়া করছে না। শুঁড় দোলাচ্ছে, মাথা ঝাঁকাচ্ছে। সামনে এগুচ্ছে না।

চাইতু গ্রামের মানুষজন উৎকণ্ঠা নিয়ে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। হাতির পাল এরপর কী করবে তাদের জানা নেই।

আচমকা একজন শিশুর কান্না শোনা গেল। সে হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে। সবাই ভেবেছে হাতি দেখে ভয় পেয়েছে। হাতি দেখে তাদের ভয় পাওয়ার কথা না। তারা মাঝেমধ্যেই হাতি দেখে। কিন্তু আজকের অবস্থা অন্যরকম।

কেউ একজন এসে জানাল সে কাঁদছে হাতির পিঠে চড়বে বলে। সকলের মুখ শুকিয়ে গেল। শিশুর কান্না শুনে হাতির পাল আরও খেপে যেতে পারে। কয়েকজন মিলে তার কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগল। তাতে তার কান্নার বেগ আর চিৎকার বেড়ে গেল। সে ছুটে হাতির পালের কাছে চলে যেতে চাচ্ছে। দুজন ছুটে গেল তার পেছনে। একজন তাকে ছোঁ মেরে কোলে তুলে নিয়ে দৌড়ে গ্রামের দিকে চলে গেল। হাতির পিঠে চড়বে বলে তখনো সে হাত-পা ছুড়ে কেঁদে যেতে থাকল।

শাওনি শুকনো কাপড় পরে ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে। ভেজা কাপড় মেলে দিয়েছে ঘরের বেড়ার সাথে। সে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে আসছে।

গ্রামের মানুষ হকচকিয়ে গেছে। একজন চিৎকার করে বলল, শাওনি সামনে যাস না। হাতির পাল খেপে আছে। আজ লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে সব।

আরেকজন চেঁচাচ্ছে, দৌড় দে শাওনি। বাড়ির দিকে যা। তোকে পায়ের নিচে ফেলে পিষে ফেলতে পারে হাতির পাল।

শাওনি জানে না আজ হাতির পাল গ্রামে ঢুকে কী করেছে। তার চেহারায় ভয় নেই। হাসিহাসি মুখ। সে হাঁটছে স্বাভাবিকভাবে। যেন হাতি তার বন্ধু। তারা এসেছে খেলা করতে। শাওনি এখন হাতির সাথে খেলা করবে।

হাতির পালের নেতা শুঁড় উঁচিয়ে দু’পা সামনে এগিয়ে গেল। তার ভঙ্গি বিনয়ী ও আন্তরিক। হাতির পালের নেতা গিয়ে দাঁড়াল শাওনির সামনে। সামনের দুই হাঁটু মুড়ে ফেলল। তারপর বসে পড়ল মাটিতে। হাতির পালকে দেখে মনে হচ্ছে সবকিছু যেন আগে থেকে ঠিক করা ছিল।

হাতির পালের নেতা শুঁড় এগিয়ে দিয়েছে। শাওনি হাতির শুঁড় বেয়ে পিঠে উঠে পড়ল। অন্য হাতিরা এসে তাদের ঘিরে দাঁড়াল।

চমকে উঠেছে চাইতু গ্রামের মানুষ। উন্মত্ত হাতির পাল শাওনির সামনে এসে শান্ত হয়ে গেছে। পালের নেতা শাওনির সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেছে। শুঁড় এগিয়ে দিয়ে শাওনিকে আদর করে তুলে নিয়েছে পিঠে। শাওনির মুখে হাসি। সে যেন মজা পাচ্ছে। শাওনিকে নিয়ে হাতির দল বনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা যে পথে এসেছিল সেই পথে ফিরছে। সেই পথ কিছুক্ষণ আগে পরিষ্কার করা হয়েছে।

চাইতু গ্রামের মানুষজন বিস্ময় ভরা চোখে দেখল হাতির পিঠে চড়ে শাওনি গভীর বনের ভেতর চলে গেল। 

৭.

নেকড়ের মুখে গিমি

বাবুতি গ্রামে সন্ধ্যা পার হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। এসময়ে বামবুতিরা ঘর থেকে বের হয় না। মাটির গর্ত থেকে পাহাড়ের খাঁজ থেকে বের হয়ে আসে নেকড়ে, শেয়াল আরও সব বন্য জন্তু। তাদের ডাকে জেগে ওঠে বন।

চাঁদের বয়স আজ ১৪ দিন। জোছনা হয়েছে উথালপাতাল। গিমির বাবা গিমিকে নিয়ে এসেছে পাহাড়ের ঢালে। যেখানে খাবার পানির নতুন জলাশয় বানানো হয়েছে।

গিমির বাবার নাম হিমবা। সে নিজেও তার বাবার মতো পালোয়ান, লড়াকু একজন। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নেমে এলেই গিমি তৈরি হয়ে নেয়। সে জানে বাবা তাকে নিয়ে বের হবে। প্রতিরাতে লড়াইয়ের নানান কুশলতা শেখায় তাকে। দক্ষ করে তোলে।

শুরুর প্রথমদিকে একদিন গিমি জানতে চেয়েছিল, বাবা, আমরা রাতে কেন বের হই, দিনের বেলা শিখি না কেন ?

হিমবা বলল, নিশুতি রাতে মনোসংযোগ সহজ হয়। দিনের আলোতে মনোযোগ হয়ে যায় বিক্ষিপ্ত। যখন তুমি রপ্ত করবে লড়াইয়ের সমস্ত কৌশল তখন দিনে লড়বে। চারপাশে আলোড়ন তখন তোমাকে নিপুণ মনোযোগ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।

এমনিতে জোছনায় যে আলো হয় এখানে চাঁদের আলো তার চেয়ে বেশি। জলাশয়ে চাঁদের আলো পড়ে ফিনকি দিয়ে উঠছে। গিমি বলে ফিনিক দেওয়া জোছনা।

হিমবা মেয়েকে এখানে নিয়ে এসেছে লড়াইয়ে আরও কুশলী করে তুলবে বলে। পাহাড়ের নিচে খাবার পানির নতুন জলাশয় বানানো হয়েছে। পাহাড় থেকে ঝরনা বেয়ে পানি নেমে আসে জলাশয়ে। জলাশয় ঘেরা আছে বেড়া দিয়ে। যাতে জন্তু জানোয়ার পানি খেতে জলাশয়ে নামতে না পারে।

তবু জন্তু জানোয়াররা এদিকে আসে। ঘোরাফেরা করে। তারা যে পানির সন্ধানে আসে তা নয়। তারা আসে পানিতে ফিনিক দেওয়া জোছনার আকর্ষণে।

হিমবা চারটা মশাল নিয়ে এসেছে। মাটিতে চার কোনায় পুঁতে রেখেছে সেই মশাল। জন্তু জানোয়ার এলে মশাল জ¦ালাবে। তাতে তারা ভয় পেয়ে সরে যাবে।

একসাথে অনেকগুলো শেয়াল ডাকছে। শেয়ালের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে বুনো কুকুরের ডাক শোনা গেল। কিছুক্ষণ শেয়াল আর কুকুর একসঙ্গে ডাকাডাকি করল। তারপর সব সুনসান। হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেল চারপাশ। কেবল বনের ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার মিহি শব্দ শোনা যেতে থাকল। তখন নেকড়ের গলার আওয়াজ পাওয়া গেছে। একটানা ডেকে যাচ্ছে রক্ত হিম করা ডাকে।

জলাশয় বানানোর জন্য মাটি তোলা হয়েছিল। সেই মাটি রাখা হয়েছে জলাশয়ের ধারে। নরম মাটিতে লড়াইয়ের কৌশল রপ্ত করাতে হিমবা প্রতিরাতে গিমিকে নিয়ে আসে এখানে।

হিমবা বলল, তোমার দাদাঠাকুরের নাম স্মরণ করো।

গিমি মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বুকে ঠেকাল। স্পষ্ট গলায় বলল, দাদাঠাকুর মারগু আপনাকে স্মরণ করছি। মঙ্গল কামনা করুন আমার। আমি যেন সফল হতে পারি লক্ষ্যভেদে।

হিমবা বলল, তোমার দাদাঠাকুর আমাকে নিয়ে যেতেন গহিন বনে। ঝিনঝিরার ওপাশে। পাহাড়ের ঢালে। দিনের বেলা সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হারিয়ে যেতাম। তখন আমি অনেক ছোটো। ভয় পেয়ে বাবা-বাবা বলে চিৎকার করতাম। বাবার দেখা পেতাম না। আচমকা তোমার দাদাঠাকুর আমার সামনে এসে দাঁড়াতেন। দুই কাঁধ চেপে ধরে ফেলে দিতেন মাটিতে। আমার যে কী ভয়াবহ কষ্ট হতো!

গিমি উঠে দাড়িয়েছে। ঠাণ্ডা গলায় বলল, বাবা আমি প্রস্তুত।

বাবাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। জলাশয়ে চাঁদ ঢেউ খেলছে। তিরতির করে কাঁপছে জলাশয়ের পানি। সেই ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে প্রবল জোছনা।

হিমবাকে হতচকিত করে দিয়ে ঝটিতে ঘুরে গেছে গিমি। দুই হাত বাড়িয়ে চেপে ধরেছে বাবার দুই হাত। এরপর কী করতে হবে সে জানে। কেমন করে পেঁচিয়ে ফেলে দিতে হবে মাটিতে।

মেয়েকে নিয়ে হিমবার গর্ব এখানেই। বয়স মাত্র সাত বছর। লড়াইয়ে এখুনি সে কী অসম্ভব কুশলী।

বৃহৎ এক গাছের ছায়ায় নিজেকে আড়াল করে ভীষণ চুপিসারে গিমির পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। যেমন দাঁড়াতেন বাবা। সে কখনও বুঝতে পারত না। মেয়ে পেরেছে। হিমবার মনে কৌতূহল, তবে কি জলাশয়ে তার চলাচলের ছায়া খেয়াল করেছে গিমি!

মেয়ে তার দুই হাত আঁকড়ে চেপে ধরে আছে। এরপর শরীর পেঁচিয়ে তাকে মাটিতে শুইয়ে দেবে। কিন্তু গিমি তা পারেনি। তার আগেই হিমবা তাকে ফেলে দিয়েছে অদ্ভুত কুশলতায়।

গিমি তখনও মাটিতে শুয়ে। তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল হিমবা। বলল, বড্ড দেরি করে ফেলেছ সিদ্ধান্ত নিতে। তুমি ভাবছিলে আমাকে ডানে ফেলবে নাকি বামে। সময় খুব মূল্যবান এখানে।

গিমি বাবার হাত ধরল না। শরীর থেকে মাটি ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে এলো সামনে। হিমবা তাকে দুহাত দিয়ে তুলে আঁচড়ে ফেলল মাটিতে।

প্রতিরাতে এমন হয়। প্রতিরাতে বাবার কাছে হেরে যায় গিমি। তাতে রেগে যায় বাবা। চড় দেয়, কিল দেয়, গাছের সঙ্গে বেঁধে পেঁচানো লতা দিয়ে পেটায়।

খুব সকালে ঘুম ভেঙে মা দেখে গিমির সারা গায়ে দাগ। কেটে রক্ত বেরিয়ে শুকিয়ে গেছে এখানে ওখানে। আতঙ্কিত গলায় মা বলে, এতটুকুন মেয়ে! তাকে এমন করে শাস্তি দেন কেন ? বড়ো হলে সে নিজে থেকে শিখে নেবে সব।

হিমবা বলে, যা শেখার তা ছোটোবেলায় শিখতে হয়। না শিখলে শেখার আগ্রহ মরে যায়।

কাতর গলায় মা বলে, তাই বলে মেয়েকে এমন করে আঘাত করবেন আপনি ?

শীতল গলায় হিমবা বলে, আঘাতে শক্ত হয় মন, শক্ত হয় শরীর। লড়াইয়ে জেতার জন্য শক্ত শরীর আর মনের প্রয়োজন বড়ো বেশি।

গিমি যে প্রতিবার বাবার কাছে লড়াইয়ে হারে তা নয়। বহুবার জিতে যায় সে। তবু বাবা বলে, বহুবার জিতলে হবে না। প্রতিবার জিততে হবে তোমাকে।

বাবাকে আবার হারিয়ে ফেলেছে গিমি। বাবা কোথায় লুকিয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। কখনও গিয়ে লুকিয়ে পড়ে গাছের আড়ালে, কখনও পাহাড়ের ওদিকে। অন্ধকারে অনুমান করে বাবাকে খুঁজে আক্রমণ করতে হয়।

পাহাড়ের খাঁজে দুটো চোখ জ¦লজ¦ল করে জ¦লছে। এমন চোখ গিমি চেনে। কোনও জন্তুর চোখ দুটো। গিমি খানিকটা ডাইনে সরে দুপা সামনে এগিয়ে গেল।

তখুনি বাবার গলা শোনা গেছে। গভীর বনের ভেতর থেকে বাবা চিৎকার করে বলল, সামনে এগুস না গিমি। ও নেকড়ে।

চাঁদের আলোয় তখন নেকড়েটাকে দেখতে পেয়েছে গিমি। রাগি চেহারা। মুখ হা করে আছে। নেকড়েও মনে হয় দেখতে পেয়েছে গিমিকে। নেকড়ে হাঁটার গতি হঠাৎ বাড়িয়ে দিয়েছে।

হিমবা আবার চিৎকার করে বলল, আমি আসছি। মশাল জ¦ালাতে হবে।

ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। নেকড়ে দৌড় শুরু করেছে। পাহাড়ের খাঁজ থেকে বের হয়ে দৌড়ে আসছে সামনে।

স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গিমি। হাতে লম্বা লাঠি। লাঠির মাথা সূঁচালো। গভীর বনে লড়াইয়ের সময় এমন লাঠি সঙ্গে রাখতে হয়। গিমির চোখ স্থির নেকড়ের চোখে।

বনের ভেতর থেকে দুপদাপ শব্দ আসছে। হিমবা ছুটে আসছে মেয়ের কাছে। নেকড়ে মেয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে তাকে পৌঁছাতে হবে।

বনের ভেতর থেকে বাবার ছুটে আসার আওয়াজ শুনতে পেয়েছে গিমি। সামনে মাটির ছোটো ঢিবি। নেকড়ে দাঁড়িয়ে আছে তার ওপর। চাঁদের আলোয় তাকে ভয়ংকর দেখাচ্ছে। লাফিয়ে পড়বে এখুনি। হয়তো গিমিকে ছিঁড়েফেঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।

গিমি মাটির ওপর দুপা শক্ত করে এঁটে দাঁড়িয়েছে। হাতের মুঠোয় ধরা ফলার মতো লাঠি কাঁধ বরাবর উঁচু করে ধরেছে।

হিমবা এসে পৌঁছাতে পারেনি। তখনো খানিকটা দূর বাকি। দাঁত বের করে মাটির ঢিবির ওপর থেকে লাফিয়ে এলো নেকড়ে।

হিমবা আর্তনাদের মতো অসহায় গলায় চিৎকার করে উঠল, গিমি!

নেকড়ে তখনো শূন্যে। গিমির মুখোমুখি। চোখদুটো আরও বেশি জ¦লছে। খেপাটে মুখের ভাব। সবগুলো দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। ঝাঁপিয়ে পড়বে গিমির ওপর। থাবা বসাবে গিমির মুখে।

আচমকা হাতের লাঠি ছুড়ে দিল গিমি। ফলার মতো লাঠি গিয়ে গেঁথে গেল নেকড়ের হা করা মুখে। শূন্য থেকে কাত হয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল।

একই সময় হিমবা এসে লুটিয়ে পড়ল নরম মাটির ওপর।

গিমি এগিয়ে গিয়ে এক টানে নেকড়ের মুখ থেকে ফলার মতো লাঠিটা বের করে আনল।

হিমবা তাল সামলে উঠে দাঁড়িয়েছে কেবল।

গিমি লাঠির সূঁচালো ফলা সরাসরি ঢুকিয়ে দিলো নেকড়ের বুকে। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে গেল নেকড়ে সেই জোছনা ভাঙা রাতে।

উঠে এসেছে হিমবা। বুকের ভেতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার ছোট্ট মেয়ে গিমিকে। গিমি স্থির হয়ে আছে। তাকে বেশ শান্ত মনে হচ্ছে। শান্ত গলায় গিমি বলল, দাদাঠাকুর মহান মারগু পথ দেখিয়েছেন আমাকে।

বুকভরে লম্বা শ^াস টেনে নিয়ে হিমবা বলল, বাবার কাছে হেরে গেছি সারাজীবন। আজ তুই আমাকে জিতিয়ে দিলি, মা।

হিমবার চোখে পানি। চাঁদের আলোতে চোখের সেই পানি চিকমিক করছে। হিমবার চোখ থেকে ঝিকমিকে পানি গড়িয়ে পড়ল তার গালে।

৮.

বামবুতি তরুণরা এলো বাহুট আবাসে

আবহাওয়ার ভাব খারাপ। এসময়ে বৃষ্টি হয়। এবার বৃষ্টি হচ্ছে এলোমেলো। থেমে থেমে। হয় আবার হয় না। ভাপসা গরমে অতিষ্ঠ অবস্থা। কখনও আকাশের পুব-দক্ষিণ কোনায় কালো মেঘ জমে। সেই মেঘ ভেসে চলে যায়। বৃষ্টি হয় না।

বাবুতি গ্রামের তরুণরা এসেছে বাহুট আবাসে। তারা সারিবদ্ধভাবে বসে আছে মাটির ওপর। তাদের মুখ আকাশের মেঘের চেয়েও ঘন কালো, থমথমে।

গ্রাম প্রধানরা বসে আছেন সামনে সারবেঁধে। তাদের চোখের কোনায় চিন্তার ভাঁজ।

আবিওলা বলল, আবার আসবে তারা। এই বন-মাটি সব চায় তাদের। তারা যত পায় তারচেয়ে আরও বেশি চায়!

আদে বলল, তাদের হাত থেকে রক্ষার উপায় কী ?

কায়কুরার কপাল কুঁচকে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি কোনোকিছুর গন্ধ শুঁকছেন। তিনি কোনও গন্ধ শুঁকছেন না। গভীর চিন্তায় তার চেহারা এমন হয়ে যায়।

কায়কুরা বললেন, তারা মানুষ না। অন্যকিছু। কোথা থেকে এসেছে এমন জীব জানি না আমরা। তাদের হাত থেকে আগুন বের হয়।

হিমবা কৌতূহলী গলায় বলল, তাদের কাঁদতে দেখেছি। বুদের লাশের পাশে বসে কাঁদছিল।

কায়কুরা কপাল কুঁচকে বললেন, খেয়াল করেছ তোমরা তাদের কান পাখির কানের মতো ? নাক জনোয়ারের নাকের মতো কেবল দুটো ফুটো! তবে তারা কি মানুষ ? নাকি জানোয়ার!

সকলে প্রতীক্ষা করছে জিউ কী বলেন তা শোনার জন্য। জিউ এখনও কিছু বলেননি। তাকে শান্ত দেখাচ্ছে। তিনি চুপচাপ বসে আছেন।

তামালা বলল, তারা মানুষ নাকি জানোয়ার সে বিচার হবে পরে। তাদের থেকে আমাদের সন্তানদের রক্ষা করার উপায় বের করতে হবে আগে। তারও আগে বন্ধ করতে হবে গ্রাম।

বানমি বেশ জোর গলায় বলল, বাঁচাতে হবে আমাদের বন, জঙ্গল, পাহাড়, মাটি। হাজার পাখি, পশু সকলের জীবন।

হিমবা বলল, কী চায় তারা ?

আদে বলল, এখনও জিজ্ঞেস করো সেই কথা ? আবিওলা বলেছে এই বন মাটি সব চায় তারা। নিজের করে নিতে চায় দুনিয়ার যেখানে যা কিছু আছে সব।

কায়কুয়া আবারও জোর গলায় বললেন, মানুষ হলে তার সঙ্গে লড়াই করা যায়। এরা মানুষ নয়।

অরুবা বলল, এরা জানোয়ারও নয়। শক্তি দিয়ে এদের হারাতে পারব না আমরা বুদ্ধি দিয়ে হারাতে হবে তাদের।

যারা এসেছিল তাদের কাউকে কাউকে দেখে মনে হয়েছে মানুষ। কারও কারও চেহারা মানুষের মতো নয়, তবে এরা কারা ? এই চিন্তা কাহিল করে ফেলেছে বামবুতিদের। তারা এসেছে আচমকা। আগাম কোনো ঘোষণা ছাড়া। তারা এসেছে হ্রদের ওপাশে বানানো নতুন শহর থেকে। বামবুতিরা জানে না সেই শহরে কারা থাকে।

গভীর চিন্তায় প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়ল সকলে। সমাধানের পথ কেউ খুঁজে বের করতে পারল না। তারা বুঝতেই পারছে না কাদের সঙ্গে লড়তে হবে তাদের। সমাধানের পথ কেমন করে পাবে!

জিউ থমথমে গলায় বললেন, লড়াই করে বাঁচতে হবে আমাদের। বুদ্ধি দিয়ে আর শক্তি দিয়ে। লড়াই করে বাঁচাতে হবে এ মাটি বন জঙ্গল আর আমাদের সন্তান।

আমি যেতে চাই সেই লড়াইয়ে।

সকলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। গিমি দাঁড়িয়ে আছে হাতে সূঁচালো ফলার মতো লাঠি নিয়ে। সে এসে সকলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ কেউ খেয়াল করেনি তাকে। সে বলেছে এই কথা।

আদে বলল, দশ বছর বয়স পূর্ণ না হলে লড়াইয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই, সেকথা তুমি জানো!

গিমি নিশ্চিত গলায় বলল, আর যদি আমি দশ বছর বয়সের কারও চেয়ে লড়াইয়ে অধিক পারদর্শী হয়ে থাকি ?

কেউ ভাবেনি, কেউ বোঝেনি জিউ বলতে পারে এমন কথা। এর আগে দশ বছর বয়সের নিচে কাউকে লড়াই তো দূরের কথা পশু শিকারে নিয়ে যাওয়া হয়নি।

জিউ যেন মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন। কিন্তু জিউয়ের কণ্ঠে স্থির প্রতিজ্ঞা। তিনি বললেন, যদি বনে গিয়ে ধূর্ত শেয়াল একটা শিকার করে আনতে পারো তবে অনুমতি দেব তোমাকে লড়াইয়ে যাওয়ার।

হিমবা বলল, শিশুমনের কৌতূহল অনেক। তারচেয়ে বেশি থাকে কিছু একটা করার আগ্রহ। তাকে ক্ষমা করবেন।

গিমির প্রসঙ্গ সেখানেই চাপা পড়ে গেল। আবিওলা বলল, এদের সাথে বুদ্ধি দিয়ে লড়াই করা হবে জয়লাভের একমাত্র উপায়।

শীতল চোখে জিউ বললেন, কোনও বুদ্ধি আছে তোমার কাছে। থাকলে খোলামেলা বলো। আমরা আলোচনা করি।

আবিওলা বলল, গ্রাম থেকে হ্রদ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ বানাব আমরা। গ্রামের ভেতর সুড়ঙ্গের মুখ থাকবে গাছ থেকে পড়া পাতা দিয়ে ঢাকা।   সুড়ঙ্গের ভেতরে কিছু দূরে দূরে থাকবে দুটো কপাট। পাটাতনের মতো। তারা যখন আসবে তাদের কৌশলে নিয়ে যেতে হবে সুড়ঙ্গের মুখে। পাতায় ঢাকা সুড়ঙ্গে যখন পড়বে তারা তখন খুলে দিতে হবে প্রথম কপাট। সবাই যখন সেখানে গিয়ে পড়বে তখন প্রথম কপাট আটকে দেব আমরা। খুলে দেব দ্বিতীয় কপাট। যার তলদেশে গভীর হ্রদ। পানিতে ভেসে যাবে তারা। প্রথম কপাট আটকানো থাকবে বলে তারা যেমন আর ফিরে আসতে পারবে না, তেমনি সুড়ঙ্গ থেকে পানি উঠে আসবে না আমাদের গ্রামে।

চুপচাপ বসে আছে সবাই। কেউ কোনো কথা বলছে না। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। আবিওলা যা বলেছে তাই নিয়ে ভাবনায় ডুবে আছে।

কেমন করে তৈরি হবে সুড়ঙ্গ, কোথা থেকে শুরু হবে, কতদিন লাগবে হ্রদ পর্যন্ত সেই সুড়ঙ্গ বানাতে, তার আগে যদি আবার ওরা আসে- আক্রমণ করে তাহলে সেই আক্রমণ ঠেকাবে কীভাবে ?

নীরবতা ভেঙে প্রথম কথা বললেন জিউ, কী মনে করো তোমরা ?

বুদ্ধি ছাড়া শুধু শক্তি দিয়ে তাদের সাথে লড়াই করে জেতা যাবে না।

সন্তান মরবে সামনে, আমরা নিরূপায়, অসহায়!

কোথা থেকে শুরু হবে সেই সুড়ঙ্গ, কতদিন লাগবে শেষ হতে? তার আগে যদি তারা আবার আক্রমণ করে আমাদের ?

কায়কুয়ার কপালে ভাঁজ দেখা যাচ্ছে না। সমতল কপালে প্রশান্ত চোখে তাকিয়ে কায়কুয়া বললেন, কাজ শুরু না করলে শেষ হবে না। বুদ্ধি অত্যধিক মাত্রায় পছন্দ হয়েছে আমার। আমি চাই আজ থেকে কাজে লেগে যাই আমরা সবাই। দলে ভাগ হয়ে রাতদিন কাজ করব। তাতে সময় লাগবে কম।

আদে বলল, বিকল্প কিছু ভেবে রাখা দরকার। যদি তার আগে তারা এসে পড়ে কোনওভাবে ?

বানমি বলল, বনে ঢোকার মুখে শক্ত বেড়া দিতে হবে। যাতে তারা আসতে না পারে।

হিমবা বলল, তারা মানুষ নয়। পাখির মতো যাদের কান, ডানা ছাড়া উড়ে আসতে পারে বেড়া ডিঙিয়ে। বিশ^াস নেই তাদের। কখন কী করে বসে। ভরসা পাই কম।

তামালা বলল, দলে দলে ভাগ হয়ে সুড়ঙ্গ কাটা হবে। তখন সবার কাছে রাখতে হবে তির-ধনুক, ফালা, বর্শা, সড়কি, ঢাল। তা ছাড়া একদল সবসময় তির-ধনুক নিয়ে প্রস্তুত থাকবে তাদের ঠেকাতে। একদল থাকবে তাদের খোঁজে। দেখা পেলেই আওয়াজ দেবে। আওয়াজ শুনলে প্রথমে এগিয়ে যাবে তির-ধনুক নিয়ে প্রস্তুত থাকবে যারা। তারপর সুড়ঙ্গ কাটা বাদ রেখে আর সকলে এগিয়ে যাবে সেখানে। প্রত্যেক বাড়িতে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে লড়াইয়ের জন্য, আগুন নেভানোর ব্যবস্থা রাখব আমরা যে যার ঘরে।

জিউ গম্ভীর গলায় বললেন, তবে সুড়ঙ্গ বানানোর কাজ শুরু হবে আজ দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত হলে। সেই সঙ্গে শুরু করো সুড়ঙ্গের ভেতরের কপাটের কাজ। নিজেদের তৈরি রাখো সকলে যেকোনও সময় লড়াই মোকাবিলায়।

কথা শেষ করে আচমকা থমকে গেলেন জিউ। সকলের মাথার ওপর দিয়ে তিনি তাকিয়ে আছেন সামনে। তার দৃষ্টিতে বিস্ময় ও গর্ব। যেন হঠাৎ কিছু দেখে ঝিলিক দিয়ে উঠেছে জিউয়ের চোখ।

যারা বসে ছিল তারা সকলে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। অত্যন্ত আশ্চর্য ঘটনা! গিমি আসছে। তার হাতে রক্তাক্ত সূঁচালো ফলার মতো লাঠি। কাঁধের ওপর বেশ বড়োসড়ো এক মৃত শেয়াল। শেয়ালের কণ্ঠনালির কাছ থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে।

হুয়ার কী মনে হলো কে জানে। সে উঠে গিমির নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ছুটে গেল গিমির কাছে।

ধীর অথচ দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এল গিমি। কাঁধের ওপর থেকে মৃত শেয়ালের দেহ নামিয়ে মাটির ওপর রাখল জিউয়ের সামনে। হাতে ধরা লাঠি মাটিতে আড়াআড়ি শুইয়ে রাখল। হাঁটু মুড়ে বসে মুষ্টিবদ্ধ দুহাত বুকে ঠেকিয়ে বলল, দাদাঠাকুর মহান মারগুর দিব্যি, আমি পেরেছি যা আপনি চেয়েছিলেন। আপনি নিশ্চয় আমাকে লড়াইয়ে যাওয়ার অনুমতি দেবেন। মহান জিউ, আমি আপনার কাছে লড়াইয়ের যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করছি। আমি জানি আপনি কখনও কথার বরখেলাপ করেন না।

হিমবার ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে। জিউয়ের সামনে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরা যাচ্ছে না। গিমির মায়ের চোখে পানি। সে আনন্দে কাঁদছে।

উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন জিউ। সকলে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিস্মিত চোখে তারা তাকিয়ে আছে গিমির দিকে।

জিউ হাত বাড়ালেন সামনে। ভরাট গলায় বললেন, তোমার মঙ্গল হোক। দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছে তোমাকে বাবুতি গ্রামের সকলে। তুমিই প্রথম সেইজন বামবুতিদের ভেতর যে দশ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে যাবে লড়াই করতে। তুমি তোমার যোগ্যতা দিয়ে তা অর্জন করেছ। বামবুতিদের পক্ষ থেকে তোমাকে আমি অনুমতি দিলাম লড়াইয়ে যাওয়ার। জয় হোক তোমার, জয় হোক বামবুতি সকলের।      

৯.

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে হট্টগোল

কুক, ডেভিড, মর্গান, নিতা, জেমি, মালাইসহ আরও কয়েকজন বসে আছে বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। এখান থেকে মেগালো শহরের রোবট-মানবদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে যারা বসে আছে তাদের প্রচণ্ড উত্তেজিত দেখাচ্ছে। তারা নিজেদের ভেতর কথা কাটাকাটি করছে, তর্ক করছে।

ডেভিড বলল, রোবট-মানবদের শুরুতেই আদিবাসী গ্রামে পাঠানো ঠিক হয়নি। সেখানে রোবট-মানবদের ওপর আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। শুরুতে শহরের ভেতরে তাদের সংকটে ফেলে দেওয়া দরকার ছিল। আমরা দেখতাম কীভাবে তারা সংকট মোকাবিলা করে।

মর্গান বলল, সেটা কীরকম, তুমি কি একটু বুঝিয়ে বলবে ?

ডেভিড বলল, যেমন ধরো, একজন হেঁটে এসে ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশে গাছের নিচে বসে পড়ল। অপর পাশ থেকে আরেকজন গাড়ি নিয়ে আসবে। সে রাস্তার পাশ দিয়ে যেতে চাইবে। গাড়ির হর্ন দেবে। রাস্তার পাশে বসে থাকা লোকটা উঠবে না। তার বেহুঁশ অবস্থা। গাড়ি থেকে নেমে এসে ওই রোবট-মানব তাকে ঘুসি মারবে।

মালাই বলল, ঘুষি মারবে কেন ?

ডেভিড বলল, এমনি ঘুসি মারবে। রাগ দেখাবে, ক্ষমতা দেখাবে। তখন যে ঘুসি খেয়েছে সেও পাল্টা ঘুষি মারবে। তাদের ভেতর শুরু হবে ঘোসাঘুষি। তাদের দুজনের পক্ষে কয়েকজন জুটে যাবে। কে ভুল করল, কে ঠিক করল তাই নিয়ে তারা নিজেদের ভেতর তর্কাতর্কি করবে। তর্কাতর্কি  করতে করতে মারামারি শুরু করবে। মারপিট করতে করতে তারা রাস্তায় নেমে আসবে। দুপাশ থেকে আসা গাড়ি আটকে যাবে রাস্তার মাঝখানে। গাড়ির যাত্রীরা রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলবে। তখন রাস্তায় যারা মারামারি করছিল তারা গাড়ি ভাঙতে থাকবে। রক্ষী রোবট এসে একপাশ থেকে পেটাবে। রক্ষী রোবটের সঙ্গে মারামারি শুরু হবে। প্রথমে ইটপাটকেল তারপর গুলি ছোড়াছুড়ি। রক্ষী রোবটের গুলিতে তিনজন মারা যাবে। পুরো শহরে মারামারি ছড়িয়ে পড়বে। এই হচ্ছে আমাদের এখনকার প্ল্যান।

একটানা কথা বলে ডেভিড হাঁপাচ্ছে। উত্তেজনায় সে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। কথা বলা শেষ হওয়ার পরও তার উত্তেজনা কমেনি।

জেমি বলল, ঘুসি খেয়ে সে বলতে পারে, ভাই আপনি ভুল জায়গায় ঘুষি মেরেছেন। আপনি বোধহয় গাছে ঘুসি মারতে চেয়েছিলেন। ভুলে ঘুষি আমার গালে লেগেছে। সে ঠোঁট কেটে বের হওয়া রক্ত মুছে চলে যাবে, তখন ?

মর্গান বলল, তাহলে এরা কোনও দিন ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে পারবে না। সেবার পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল এবার বিলুপ্ত হবে মানুষ।

নিতা বলল, একজনের ক্লান্ত হয়ে হেঁটে এসে রাস্তার পাশে গাছের নিচে বসা আর অপর পাশ থেকে আরেকজনের গাড়ি নিয়ে এসে হর্ন দিয়ে রেগেমেগে নেমে ঘুসি মারা পর্যন্ত আমরা নিয়ন্ত্রণ করি। তারপর দেখি তারা নিজ থেকে কী সিদ্ধান্ত নেয়।

জেমি বলল, ভালো আইডিয়া। আমরা সেটা করতে পারি।

মালাই বলল, একজন রাস্তার পাশে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে গেছে। তখন সেই পথে অনেকে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত আমরা করি। তারপর দেখি তারা নিজেরা কী করে।

জেমি কিছুক্ষণ আগে একটা কথা বলেছে। তার আগে আলাপ আলোচনার শুরু থেকে চুপ করে ছিল। কোনও কথা বলেনি। সে বলল, আমি কি আর একটা কথা বলতে পারি ?

বাকি প্রায় সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, হ্যাঁ অবশ্যই বলতে পার। বলো কী বলতে চাও।

জেমি বলল, রোবট-মানবদের ওপর আমরা কোনও নিয়ন্ত্রণ রাখব না।

হঠাৎ ঘরের ভেতর গুঞ্জন শুরু হলো। জেমিকে সমর্থন করে নিতা বলল, ডায়নোসরের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হবে তাদের। নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে। তাই যদি হয় তাহলে আমরা দেখি সংকট মোকাবিলায় তাদের আচরণ কেমন হতে পারে।

জেমি আর নিতার কথা কেউ মানছে, কেউ মানছে না। ডেভিড বলল, রোবট-মানবদের ওপর আমাদের যদি কোনও নিয়ন্ত্রণ না রাখি তাহলে খেলায় কোনও মজা থাকবে না।

গম্ভীর গলায় জেমি বলল, সঠিকভাবে চিন্তা করো, ডেভিড। আমরা কোনো খেলা খেলছি না। আমরা ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রকল্পের সম্ভাবনা যাচাই করছি।

ডেভিড বুঝতে পেরেছে সে কিছু ভুল বলে ফেলেছে। ডেভিড আর কিছু বলল না। চুপ করে থাকল।

মালাই বলল, আচ্ছা বেশ, তোমরা আমার কথা শোনো। আমরা যেটা করব তা হচ্ছে একজনকে রাস্তা পার করাব। হঠাৎ সে রাস্তার মাঝখানে বসে পড়বে। তারপর দেখব কী হয়।

রোবট-মানব আর রক্ষীদলের নিয়ন্ত্রণ কুক নিয়েছে। কুক তার কাজ শুরু করে দিলো। মনিটরে দেখা যাচ্ছে মেগালো শহরে তখন দুপুর। একজন রোবট-মানব রাস্তার পাশ দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে হেঁটে যাচ্ছে। হেঁটে যেতে যেতে সে আচমকা থমকে দাঁড়াল। তারপর বামে ঘুরে দক্ষিণ দিকে হাঁটা শুরু করল রাস্তার মাঝখান দিয়ে।

পশ্চিম দিক থেকে কালো রঙের একটা গাড়ি আসছে। রোবট-মানব সেটা খেয়াল করল না। সে বসে পড়ল রাস্তার মাঝখানে। কালো গাড়ি এসে ব্রেক করল ঠিক তার পাশে। ঠিক সময়ে ব্রেক করতে না পারলে গায়ের ওপর দিয়ে চলে যেত গাড়ি।

দরজা খুলে ঘরে ঢুকেছে রেড। সে ঘটনা কিছু জানে না। শুধু দেখল একজন রোবট-মানব রাস্তার মাঝখানে বসে আছে। ছুটে আসা একটা কালো গাড়ি জোরে ব্রেক করেছে তার পাশে। কালো গাড়ির পেছনে আরও কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে। কালো গাড়ি থেকে সানগ্লাস পরা বলিষ্ঠ চেহারার একজন তরুণ নেমে আসছে।

রেড বলল, ঘটনা এবারই ঘটবে। পেছনের গাড়ির ভেতরে যারা আছে তাদের অস্থির করে দাও। আর এই যুবককে দিয়ে আচ্ছা মতো পেটাও রাস্তার মাঝখানে বসে পড়া ওই লোকটাকে।

নিতা বলল, আমরা রোবট-মানবদের এখন আর নিয়ন্ত্রণ করছি না।

রেড চুপসে গেল। মুখ দিয়ে অনেকখানি বাতাস বের করে দিয়ে বলল, ভুউস! তাহলে আর কী হলো!

কালো গাড়ি থেকে তরুণ নেমে এসে রাস্তার মাঝখানে বসে থাকা রোবট-মানবের কাছে এগিয়ে গেল। তার দেখাদেখি পেছনের কয়েকটা গাড়ি থেকে আরও কয়েকজন নেমে এলো।

তরুণ গিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে বসল সেই রোবট-মানবের পাশে। আলতো করে হাত ধরে বলল, আপনি হঠাৎ এভাবে এখান দিয়ে রাস্তা পার হতে গেলেন কেন ?

অসহায় চোখে তাকিয়ে রাস্তার মাঝখানে বসে থাকা রোবট-মানব বলল, আমি কিছু জানি না। বুঝতে পারছি না কেন এমন হলো!

তরুণ বলল, শরীর খারাপ লাগছে ? আসুন আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিই। কোথাও যাচ্ছিলেন ?

রোবট-মানব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সে কিছু বুঝতে পারছে না কীভাবে ঘটনা ঘটেছে। বেশ কয়েকজন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় সারবেঁধে আছে গাড়ি।

তরুণ বলল, কোথায় যাবেন ? শরীর বেশি খারাপ লাগলে হাসপাতালে চলুন।

জেমি বলল, আমাদের এখনকার মানুষের চেয়ে রোবট-মানবরা অনেক বেশি সংবেদনশীল। আমরা কেবল মারামারি করতে জানি। তারা জানে কীভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হয়, শ্রদ্ধা করতে হয়।

রোবট-মানবের হাত ধরে তরুণ এগিয়ে যাচ্ছে। কুক তখন সেখানে রক্ষী রোবট পাঠিয়ে দিল। রক্ষী রোবটকে সে নিয়ন্ত্রণ করছে।

কয়েকজন রক্ষী রোবট গিয়ে তরুণকে জাপটে ধরল। ঘটনার আকস্মিকতায় তরুণ হকচকিয়ে গিয়েছে। একজন রক্ষী রোবট বলল, আমাদের সাথে চলো।

বিস্মিত গলায় তরুণ জানতে চাইল, আপনাদের সঙ্গে যেতে হবে কেন?

রক্ষী রোবট বলল, গাড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরে তুমি একজনকে হত্যা করার চেষ্টা করেছ।

রোবট-মানব বলল, সে কিছু করেনি। হঠাৎ আমার যেন কী হয়েছিল। শরীর খারাপ লাগছে।

রক্ষী রোবট খেকিয়ে উঠে বলল, জীবন বেঁচে গেছে তো তাই মুখ দিয়ে কথার ফুলঝুরি ছুটছে। মুখ বন্ধ রাখবে। কোন কথা বলবে না।

আশপাশে যে রোবট-মানবরা দাঁড়িয়ে ছিল তারা রক্ষী রোবটদের বলল, আপনারা ভুল করছেন। সে কিছু করেনি। আমরা দেখেছি।

রক্ষী রোবট বলল, আমরা কখনও ভুল করি না। রাস্তা পরিষ্কার করতে হবে আমাদের। সবাই গাড়িতে উঠে যে যার কাজে যান।

কেউ গাড়িতে উঠল না। তারা তরুণকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বারবার বলতে থাকল। তখন রক্ষী রোবটরা কারও কোনও কথা না শুনে লাঠি দিয়ে রোবট-মানবদের বেধড়ক পেটাতে শুরু করল।

রেড ম্যাগাজিনে একটা আর্টিকেল পড়ছিল। হইচই শুনে মাথা ঘুরিয়ে মনিটরের দিকে তাকাল। দেখল মেগালো শহরে রক্ষী রোবটরা লাঠি দিয়ে রোবট-মানবদের পেটাচ্ছে।

লাফিয়ে উঠে রেড প্রায় চিৎকার করে বলল, বলেছিলাম ঘটনা ঘটবে। ঘটনা ঘটেছে। কুক ফায়ার ওপেন করো। দুজনকে নিকেশ করে দাও। তারপর দেখা যাক তারা কী করে।

জেমি বলল, তোমরা থামবে ? এমন নৃশংস অবস্থা তৈরি করতে তোমাদের খারাপ লাগছে না ?

মর্গান বলল, লতাপাতা খেতে খেতে মানুষ একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে, যেমন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ডাইনোসর।

ডেভিড বলল, তাদের আমরা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। মানুষ নৃশংস না হলে তারা ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে পারবে না।

নিতা বলল, রক্ষী রোবটদের থামাও। তাদের ফিরিয়ে নিয়ে এসো। তরুণকে ছেড়ে দাও। অবস্থা স্বাভাবিক করো। যথেষ্ট হয়েছে।

কুক কিছু একটা ভেবে নিতার কথা মেনে নিল। মনিটরে দেখা গেল রক্ষীদল শান্ত ভঙ্গিতে ফিরে আসছে। রোবট-মানব হেঁটে রাস্তার মাঝখান থেকে আবার রাস্তার পাশে চলে এল। সে পুর্ব দিকে থেকে পশ্চিমে হাঁটতে থাকল। তরুণ উঠে পড়ল তার কালো গাড়িতে। আর যে যার গাড়িতে উঠে চলতে থাকল।

কুক বলল, শহরের ভেতর হাঙ্গামা বাঁধানোর দরকার নেই। গত দিন আদিবাসী গ্রামে হামলা করে রোবট-মানব জিতে এসেছে। আজ আবার আদিবাসী গ্রামে তাদের পাঠাব হামলা করতে। আদিবাসীরা এখন সতর্ক থাকবে। দেখি রোবট-মানবরা নিজেদের কীভাবে রক্ষা করে। আমরা শুধু আমাদের রক্ষী রোবট নিয়ন্ত্রণ করব। রোবট-মানবদের ওপরে সেখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। আর আদিবাসীদের ওপর তো আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। এই ঘটনা হবে আরও বেশি উত্তেজনাপূর্ণ। এখানে নিজেকে বাঁচাতে হলে তুখোড় বুদ্ধির দরকার হবে।

মালাই বলল, সেটা হবে রোবট-মানব আর আদিবাসী গ্রামের মানুষদের লড়াই।

কুক বলল, ঠিক তাই। তাহলে আমরা এখন শহর থেকে রোবট-মানব পাঠাচ্ছি আদিবাসী গ্রামে।

নিতা বলল, এখনই নয়। আমার প্রস্তাব হচ্ছে আমরা দশদিন সময় নিই। আগামী দশদিন আমরা মেগালো শহরে কিচ্ছু করব না। রোবট-মানবরা তাদের নিজের মতো থাকুক। নিজেরা কিছু করুক। তারা নিজে থেকে কী করে সেটা আগে দেখি। তারপর আমরা আমাদের পরিকল্পনা মতো কাজ করব।

মর্গান বলল, কুক তুমি কি মনে করছ তাতে আমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে?

কুক বলল, আমি মনে করছি হবে। আমাদের উচিত হবে কিছুদিন তাদের স্বাধীনভাবে বসবাস করতে দেওয়া। তাদের আচরণ লক্ষ করা। দরকার হলে সেই আচরণের ওপর ভিত্তি করে আমরা তাদের নিয়ে নতুন কিছু আয়োজন করব।

রেড বলল, তাহলে আজ রোবট-মানবরা আদিবাসী গ্রামে যাচ্ছে না ?

কুক বলল, তারা যাবে দশ দিন পর।

ডেভিড অনেকটা ভেংচি কাটা সুরে বলল, যাও দশ দিন তোমাদের ছুটি।  

তার কথার উত্তরে কেউ কিছু বলল না। জেমি বলল, আগামী দশ দিন আমাদের মেগালো শহরের বাসিন্দাদের ওপর নজর রাখতে হবে তারা নিজেরা কীভাবে নিজেদের পরিচালনা করে সেটা দেখার জন্য।

সবাই জেমির কথা মেনে নিল। মনিটর অন রেখে কুক উঠে পড়ল। অন্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসল ঘরের বিভিন্ন জায়গায়। কেউ আবার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বাইরে চলে গেল।

ওদিকে বামবুতিরা সতর্ক পাহারায় থাকল। তারা জানে যেকোনও সময় শহর থেকে চলে আসতে পারে অদ্ভুত সেই মানুষের মতো কিছু। না- জানোয়ার, না-মানুষ।

দশদিনে শহর থেকে কেউ এলো না। দশ দিনে বাবুতি গ্রাম থেকে হ্রদ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ বানানো হয়ে গেল। এই দশদিনে নিজেদের রক্ষা করার আরও কিছু কৌশল ঠিক করে ফেলল বামবুতিরা।

১০.

শাওনি গেল মেগালো শহরে

দশদিন পর।

মেগালো শহরের সদর দরজা খুলে গেল। অস্ত্রহাতে সারবেঁধে রোবট-মানবরা বের হয়ে আসছে। তাদের পেছনে একদল রক্ষী রোবট। তারা আসছে অ্যারোব্রিজ পার হয়ে বাবুতি গ্রামে।

বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মেগালো শহরের সবাইকে আদিবাসী গ্রামে পাঠানো হয়নি। পাঠানো হয়েছে বেছে বেছে চৌকস কয়েকজন লড়াকু তরুণকে। আর অল্প কয়েকটা রক্ষী রোবট…

আদিবাসী গ্রামের মানুষ খবর পেয়ে গেছে নতুন বানানো শহর থেকে বের হয়ে আসছে আজব মানুষ। তাদের হাতে আগুন ছোড়া অস্ত্র।

খবর শুনে জিউ সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করলেন। তিনি বললেন, আজ আর আমরা কেউ গাছের ওপরে বা গাছের আড়াল থেকে তির ছুড়ব না। সিদ্ধান্ত যেভাবে নিয়েছি আমরা আজ তাই করব। ঢুকে পড়ব গর্তে। গর্তের ভেতর থেকে তির ছুঁড়ব। যদি তারা গর্তের মুখে আগুনের গোলা ফেলে তাহলে গর্তের আরেক পাশ দিয়ে বের হয়ে আসতে হবে। বুদ্ধি দিয়ে তাদের নিয়ে যেতে হবে সুড়ঙ্গের কাছে।

গত কয়েকদিন ধরে বাবুতি গ্রামের মানুষ যুদ্ধের এই কৌশল বের করেছে। তারা তাদের গ্রামের ভেতর মাটির ঢিবিতে কয়েকটা মুখওয়ালা টানেলের মতো গর্ত করে রেখেছে। গর্তের ভেতর প্রচুর পরিমাণে তির আর ধনুক রেখে দিয়েছে।

নতুন বানানো শহর থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে দেখেই জিউয়ের কথামতো বামবুতিরা সবাই গর্তে ঢুকে পড়ল।

শাওনি সেদিন হাতির পিঠে চড়ে ফিরে গিয়েছিল নিজ গ্রামে। শাওনি ফিরে যাওয়ার সাত দিন পর চাইতু গ্রামে কুমহরি উৎসব হয়েছে। সেই সাত দিন শাওনিকে চোখে চোখে রেখেছে সবাই। বাড়ি থেকে দূরে যেতে দেয়নি।

তারপর আরও তিন দিন পার হয়েছে। উৎসবের আনন্দে গ্রামের মানুষ আগের কথা আর মনে রাখেনি। শাওনি তখন নিজের মতো খেলার সুযোগ পেয়েছে। সে খেলতে খেলতে চলে এসেছে বনের ধারে।

সেখানে এসে দেখে হাতির পাল দাঁড়িয়ে আছে। তার সেই চেনা হাতি। যার গলায় মালা পরিয়ে দিয়েছিল শাওনি।

হাতি আগের মতো সামনের দুপা ভাঁজ করে মাটিতে বসে পড়ল। শাওনি হাতির জন্য আজ আরেকটা মালা বানিয়ে আনল সেই লতা দিয়ে। হাতির গলায় পরিয়ে দিল।

হাতি শুঁড় এগিয়ে দিয়েছে শাওনির দিকে। শাওনি হাতির শুঁড় বেয়ে উঠে পড়ল পিঠে। হাতির পাল শাওনিকে নিয়ে চলে গেল গভীর বনের ভেতর।

হাতির পাল এসে ঢুকেছে বাবুতি গ্রামের ধারে। হাতির পালের নেতা বিপদ বুঝতে পেরেছে। সে সামনে না এগিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল।    

শাওনি পুরো ঘটনা দেখল হাতির পিঠে চড়ে। মেগালো শহর থেকে রোবট-মানবরা বের হয়ে অ্যারোব্রিজ পেরিয়ে ঢুকে গেল আদিবাসী গ্রামে। হ্রদের পাড় তখন ফাঁকা। হাতির পাল এগিয়ে গেল হ্রদের পাড়ে। তারা অ্যারোব্রিজ পার হয়ে মেগালো শহরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হাতির পালের নেতার পিঠে বসে আছে শাওনি।

হাতি গিয়ে দাঁড়িয়েছে মেগালো শহরের সদর দরজার কাছে এক ঝাঁকড়া গাছের নিচে। সেখানে হাতি দেখা যাচ্ছে। হাতির পিঠে শাওনিকে দেখা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ঘটনা দেখেছে সবাই। অ্যারোব্রিজ পার হয়ে হাতির পালকে মেগালো শহরের দিকে আসতে দেখেছে। সামনে যে হাতি তার পিঠে বসে আছে এক কিশোরী।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তারা হাতির পাল কিংবা কিশোরীকে নিয়ে মাথা ঘামাল না। তাদের নজর তখন রোবট-মানবদের দিকে।

রোবট-মানবরা আদিবাসী গ্রামে ঢুকে কাউকে দেখতে পেল না। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে যারা বসে আছে তারাও বিস্মিত হয়েছে। ডেভিড অস্থির হয়ে বলল, ফায়ার!

মালাই বলল, তারা হয়তো ঘরে ঘুমাচ্ছে। ঘুমন্ত মানুষের ওপর গোলা ছোড়া ঠিক হবে না।

ডেভিড বলল, আমরা বারবার বলছি, মানুষকে একদিন ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হবে। তখন এমন অনেক নিষ্ঠুর কাজ তাদের করতে হতে পারে।

মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সবাই। একজন রোবট-মানবের হাতে ধরা অস্ত্র গর্জে উঠল। সেখান থেকে গোলা ছোড়া হয়েছে। আগুনের গোলা। গিয়ে পড়েছে আদিবাসী গ্রামবাসীদের ঘরের চালে। চালে আগুন ধরে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠার কথা। ঘরের চালে আগুন ধরেনি। ধোঁয়া উঠছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সবাই নিজেদের ভেতর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকল। তারা ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছে।

বাবুতি গ্রামের সবগুলো ঘরের চালে গাছের বাকল বিছিয়ে রাখা হয়েছে। বামবুতিরা সেই বাকল খানিক আগে বিশেষ এক গাছের রস দিয়ে ভিজিয়েছে। তাই তাতে আগুন ধরেনি।

 রোবট-মানবরা কাউকে না দেখে গ্রামের ভেতর অনেকখানি ঢুকে গেল। তখন আচমকা চারদিক থেকে তির এসে তাদের গায়ে বিঁধতে শুরু করল। তির কোথা থেকে আসছে তারা বুঝতে পারল না। তিরের সঙ্গে বিষ জাতীয় কিছু লাগানো আছে। শরীর ভীষণভাবে চুলকাচ্ছে আর ফুলে যাচ্ছে।

রোবট-মানুষরা দিশেহারা হয়ে গেছে। তারা হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে দুহাত দিয়ে শরীর চুলকাতে লেগে গেল। শরীর চুলকাতে চুলকাতে ফুলে লাল হয়ে যাচ্ছে তবু যন্ত্রণা কমছে না।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে যারা আছে তারা খুঁজে পেয়েছে আদিবাসীরা কোথা থেকে তির ছুঁড়ছে। তারা রক্ষী রোবটদের এগিয়ে দিল মাটির ঢিবির গর্তের মুখের দিকে।

রক্ষী রোবটরা সেদিকে তাক করে গোলা ছোড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গোলা ছোড়ার আগেই তাদের গায়ে তির এসে বিঁধে গেল। তারাও লাফালাফি শুরু করে দিল। তাদের পুরো শরীর চুলকাচ্ছে আর মনে হচ্ছে শরীরের ভেতরে আগুন ধরে গেছে। বীভৎস যন্ত্রণা হচ্ছে।

অস্থির হয়ে পড়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সকলে। তারা আদিবাসী গ্রামে কোনো মানুষকে খুঁজে পাচ্ছে না।

কুক প্রথম কাউকে খুঁজে পেয়েছে। অল্প উঁচু মাটির ঢিবির ওপাশের গর্তে লুকিয়ে আছে এক কিশোরী। কুক এক রক্ষী রোবটকে পাঠিয়ে দিলো মাটির ঢিবির ওপর। তাকে দেখিয়ে দিয়েছে কিশোরীর অবস্থান।

গিমি মাথা তুলে দেখল মাটির ঢিবির ওপর জানোয়ারের মতো দেখতে এক মানুষ। তার দিকে অস্ত্র তাক করে আছে। শুধু গিমি একা দেখল না, জিউ দেখল। আর দেখল বাবুতি গ্রামের অনেকে।

রক্ষী রোবট অস্ত্র তাক করে ধরেছে গিমির দিকে। গিমির হাতে ধরা সূঁচালো ফলার মতো লাঠি। সে গর্ত থেকে বের হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে রক্ষী রোবটের মুখোমুখি। তার মনে পড়ে গেল সেই জোছনা রাতের কথা। মনে হলো নেকড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে এখুনি তার ওপর। ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে তার দেহ।

গিমি মনে মনে বলল, হে দাদাঠাকুর, মহান মারগু আমাকে আশীর্বাদ করুন।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ওরা দেখল, জিউ দেখল, গ্রাম প্রধান আর অনেক বামবুতি একসঙ্গে দেখল মাটির ওপর দুপা শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে গিমি। হাতের মুঠোয় ধরা ফলার মতো লাঠি কাঁধ বরাবর উঁচু করে ধরা।

গিমির মনে হচ্ছে তার সামনে কোনও আজব জানোয়ার মানুষ না, দাঁড়িয়ে আছে খেপা নেকড়ে।

হাতের লাঠি ছুড়ে দিল গিমি। ফলার মতো লাঠি গিয়ে গেঁথে গেল আজব মানুষ কিংবা মানুষের মতো দেখতে জানোয়ারের বুকে। মাটির ঢিবির ওপর থেকে ধপাস করে পড়ে গেল রক্ষী রোবট।

কুক আর্তনাদের মতো করে বলল, সিস্টেমে আঘাত করেছে। অকার্যকর করে দিয়েছে রক্ষী রোবটের সার্কিট।

রক্ষী রোবটকে ওভাবে পড়ে যেতে দেখে বামবুতিরা বুঝতে পেরেছে এদের মারা সম্ভব। তারা আবার নতুন উদ্যোমে তির ছুড়তে থাকল।

রোবট-মানবরা তিরের আঘাত সহ্য করতে পারল না। তারা দিশেহারা হয়ে গেল। দিগি¦দিক শূন্য হয়ে তারা এদিক ওদিক ছুটতে থাকল। কেউ কেউ ছুটে গেল সামনে। তাদের পেছন পেছন ছুটতে থাকল কয়েকটা রক্ষী রোবট।

তারা গিয়ে পড়ল সুড়ঙ্গের মুখে। তাল সামলাতে না পেরে রোবট-মানব আর রক্ষী রোবটরা ঝপাঝপ পড়তে থাকল সুড়ঙ্গের ভেতর।

সুড়ঙ্গের প্রথম কপাট খুলে দিল বামবুতিরা।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে আর রক্ষী রোবটদেরও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অবস্থা বেগতিক হয়ে গেছে। সবাই পালাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সবাই হিমশীতল ঘরে বসে ঘামছে। কপালের ঘাম মুছে তারা মনিটরে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।

কয়েকজন রোবট-মানব ছুটে অ্যারোব্রিজের কাছে পালিয়ে এসেছে। তাদের সঙ্গে এসেছে সামান্য কয়েকটা রক্ষী রোবট।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ওরা দেখল যারা গর্তে পড়েছে তারা আর বের হয়ে আসছে না।

বামবুতিরা সুড়ঙ্গের দ্বিতীয় কপাট খুলে দিয়ে প্রথম কপাট আটকে দিলো।

মর্গান বলল, কী হচ্ছে এসব ? অর্ডার কাজ করছে না!

মালাই বলল, তারা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাদের বিচার-বিবেচনা করার মতো স্বাধীন সত্তা দেওয়া হয়েছে।

ডেভিড বলল, এতে উত্তেজনা আরও বাড়ানো হলো নাকি আমাদের পরাজয় নিশ্চিত করা হলো, বুঝতে পারছি না।

কুক বলল, বিজ্ঞান একাডেমি এমনটাই চেয়েছে। আর সেভাবেই প্রকল্প অনুমোদন করেছে।

নিতা বলল, সবকিছু ঠিক আছে। এসো নতুনভাবে কিছু করি। 

রক্ষী রোবটদের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বিজ্ঞান একাডেমির কাছে। তারা রক্ষী রোবটদের দিয়ে অ্যারোব্রিজের কাছ থেকে রোবট-মানবদের আদিবাসী গ্রামে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। রোবট-মানবরা যুদ্ধে ফিরল না।

যুদ্ধে ফেরার জন্য তাদের ওপর অতিরিক্ত অত্যাচার করা হলো। ঘটনা ঘটল বিপরীত। রোবট-মানব যাদের হাতে অস্ত্র ছিল তারা সেই অস্ত্র থেকে রক্ষী রোবটদের ওপর গোলা ছুড়তে থাকল। তাতে রক্ষী রোবটরা ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। বেশিরভাগ রক্ষী রোবটের সার্কিট পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেল।

 রোবট-মানব যারা ফিরেছিল তারা সবাই ছুটে শহরে ঢুকে পড়ল। তাদের পেছন পেছন ছুটছে মাত্র কয়েকটা রক্ষী রোবট। যাদের সার্কিট পুরোপুরি অকার্যকর হয়নি। কিছুটা হলেও কাজ করছে।

সকলের ভেতর অস্থিরতা। পেছন ফিরে দেখার মতো অবস্থা কারও নেই। সকলে ছুটছে প্রাণপণে। তারা অ্যারোব্রিজ থেকে হ্রদে ঝাঁপ দিতে চাইছে। মনে হচ্ছে পানিতে ডুবতে পারলে শরীরের যন্ত্রণা কমতে পারে। তারা পানিতে ঝাঁপ দিল না। অ্যারোব্রিজ পার হয়ে শহরের দিকে দৌড়াতে থাকল।

শাওনি হাতির পিঠ থেকে নেমে এসেছে। সে অবাক হয়ে বনের ভেতর থেকে কতগুলো মানুষকে ছুটে আসতে দেখল।

তারা ছুটে এসে শহরের ভেতর ঢুকে গেল। শাওনিও তাদের সঙ্গে ঢুকে পড়ল শহরে। কেউ শাওনিকে খেয়াল করল না।

বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে তারা মনিটরে দেখল হ্রদের পানিতে ভাসছে রোবট-মানব আর রক্ষী রোবটের দেহ। যারা আদিবাসী গ্রামে লড়াই করতে গিয়ে গর্তে পড়েছিল তাদের দেহ ভেসে উঠেছে হ্রদের পানিতে।

অকস্মাৎ বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে চরম হতাশা নেমে এল। তারা আদিবাসী গ্রামের মানুষের কাছে হেরে গেছে। আধুনিক অস্ত্র হাতে রোবট-মানব আর রক্ষী রোবটরা লড়াই ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। আর আদিবাসী মানুষ বুদ্ধি দিয়ে নিজেদের জিতিয়ে নিয়েছে। 

রোবট-মানব আর রক্ষী রোবটরা সবাই ঢুকে পড়ার পর মেগালো শহরের সদর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শাওনি তখন মেগালো শহরের ভেতরে থেকে গেছে।

ওদিকে শাওনিকে হারিয়ে বাবা-মা ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছে। তারা খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। হাতির পিঠে উঠে শাওনি এর আগেও বনে ঢুকেছে। আবার গ্রামে ফিরেছে হাতির পিঠে চড়ে। এবার ফেরেনি। দিন পার হয়ে গেছে শাওনির কোনো খোঁজ তারা পায়নি। শাওনিকে হারিয়ে বাবা-মা সারাদিন কিছু মুখে দেয়নি। তারা আছে অভুক্ত অবস্থায়। ভেবেছিল রাতে শাওনি ফিরে আসবে। সারারাতেও শাওনি ফিরে এল না।

সকালে গ্রামের মানুষজন বসল আলোচনা করার জন্য। তারা আলোচনা করছে কীভাবে শাওনিকে উদ্ধার করা যেতে পারে। কয়েকজন বলল, আমরা বনে যাব। সেখানে শাওনির খোঁজ করব।

একজন বলল, এত বড়ো গভীর বন! কোথায় খুঁজব শাওনিকে ?

যারা বনে যেতে চেয়েছে তাদের একজন বলল, হাতির পায়ের ছাপ দেখে-দেখে যাব। আমি হাতির পায়ের ছাপ চিনি।

শাওনিকে খুঁজতে যারা বনে যেতে চেয়েছে তারা প্রায় সকলেই বন থেকে মৌমাছির মধু সংগ্রহ করে, না হয় কাঠ কাটে কিংবা পাতা নিয়ে আসে। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যেতে চাইল। শাওনির বাবা-মাও জেদ করল সঙ্গে যাবে। কয়েকজন তাদের যেতে নিষেধ করল। তারা তাদের নিষেধ শুনল না।

শাওনির বাবা বলল, বনের ভেতরে যে আদিবাসী গ্রাম আছে। বাবুতি গ্রাম। বামবুতিরা থাকে সেখানে। এর আগে একবার শাওনি সেখানে গিয়েছিল। চলো বাবুতি গ্রাামে যাই। বামবুতিদের সঙ্গে কথা বলি। শাওনি হয়তো সেখানে আছে।

কোজো বলল, তবে তাই করি। বাবুতি গ্রামে যাই। দরকার হলে শাওনির বাবা-মা সেখানে থাকতে পারবে। আমরা তখন বনের ভেতর শাওনিকে খুঁজব।

বয়স্ক ও অসুস্থ আর শিশু ছাড়া শাওনির বাবা-মাসহ চাইতু গ্রামের সব মানুষ শাওনিকে খুঁজতে গভীর বনে রওনা হয়ে গেল।

১১.

রোবট-মানবদের মারামারি

বিজ্ঞান একাডেমির বানানো মেগালো শহরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে আরও বেশ কয়েকজন নতুন মানুষ এসেছে। তাদের ভেতর আছে রয়েল, পাঞ্জু আর খামি। প্রায় প্রতিদিন বিজ্ঞান একাডেমির এই মেগালো শহর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে নতুন কোনও গবেষক, বিজ্ঞানী বা শিক্ষানবীশ এসে কিছুক্ষণ বসে। তারা দূর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে মেগালো শহরের বাসিন্দাদের দিয়ে কোনও ঘটনা ঘটায়। 

কুক, ডেভিড, মর্গানসহ অন্য যারা আগেরদিন ছিল তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে রোবট-মানবদের আর কখনও আদিবাসী গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে না। ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার কৌশল আবিষ্কার করতে তারা মেগালো শহরেই রোবট-মানবদের মধ্যে মারামারি বাধিয়ে দেবে।

মারামারি কীভাবে বাধবে তার ছক করা হচ্ছে। মর্গান বলল, শিশুরা খেলছে।

নিতা বলল, হ্যাঁ খেলছে। তারা আনন্দ করছে।

মর্গান বলল, মেগালো শহরের সকলে বেশ হাসিখুশি আজ। তারা কাজে বের হয়েছে। কেউ ঘরের কাজ করছে। কোথাও উৎসবের আয়োজন করা হবে। তারা সেখানে যাবে।

মালাই বলল, রোদ ঝলমলে শান্ত-স্নিগ্ধ আনন্দময় মেগালো শহরের সময়।

মর্গান বলল, এখান থেকে শুরু হবে তাদের টিকে থাকার লড়াই। আমরা কেউ আগে থেকে সিদ্ধান্ত নেব না কী হবে। ঘটনার প্রেক্ষিতে ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করব। দেখি ঘটনা গিয়ে কোথায় দাঁড়ায়!

নিতা বলল, তাতে আমরা একেকজন যদি বিপরীতমুখী উদ্ভট কোনও ঘটনা ঘটাতে থাকি ?

মর্গান বলল, যেমন ?

নিতা বলল, ধরা যাক একজনের নাম আলিম। তুমি চাইলে উৎসবে আলিম অন্য একজনের জিনিস না বলে নিয়ে দৌড় দেবে। তাকে ধরতে দৌড়াবে আরও কয়েকজন। তখন আমি চাইলাম আলিম তার সন্তানের জন্য খুব সুন্দর একটা খেলনা কিনবে। মেলায় ধরো সেই খেলনাটা একটাই আছে। ঠিক আলিমের সন্তানের সমবয়সী একজন শিশু সেই খেলনাটি নিতে চাইছে। সে কাতর চোখে খেলনার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ ভরা পানি। তখন আলিম কী করবে ?

ডেভিড বলল, হোক। আমরা সেটাই দেখব সেই উদ্ভট অবাস্তব অসম্ভব পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায় বা সামাল দেওয়া যেতে পারে।

মর্গান বলল, জেমিকে দেখছি না যে আজ। সে কী ওয়াক-আউট করল? আজ সুনসান মনে হচ্ছে ঘর। 

মর্গানের কথার কেউ কোনও জবাব দিলো না। বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে মেগালো শহরের কন্ট্রোল প্যানেল উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো।

মেগালো শহরের এক পাড়ার নাম ছত্র। ছত্রপাড়ায় ছেলেমেয়েরা খেলা করছে। এখানে ছত্রপাড়ার ছেলেমেয়েরা আছে আর আছে পাশের মিকাওপাড়ার ছেলেমেয়ে। তারা ফার্ম হাউজ বানিয়েছে। সেখানে বেশ কিছু মোটাতাজা গরু আর ভেড়া আছে। তারা নিজেদের ভেতর গরু আর ভেড়া বিনিময় করছে। একটা গরু দিলে চারটা ভেড়া পাওয়া যায়।

গণ্ডগোল বেধে গেল এই গরু আর ভেড়া নিয়ে। একজন চারটা গরু দিয়েছে। সে পাবে ষোলোটা ভেড়া। পেয়েছে পনেরোটা। যে দিয়েছে সে দাবি করছে ষোলোটা ভেড়া দেওয়া হয়েছে। তার দাবির পক্ষে সে নানারকমের প্রমাণ দেখাচ্ছে। যে নিয়েছে সে যে একটা ভেড়া কম পেয়েছে সে ব্যাপারে একের পর এক যুক্তি তুলে ধরছে।

প্রমাণ আর যুক্তি একসময় চিৎকার চেঁচামেচিতে রূপ নিলো। তারপর মারামারিতে। ফার্ম হাউজে যে ছেলেমেয়েরা খেলা করছিল তারা সবাই মারামারিতে জড়িয়ে পড়ল। তাতে একজনের মাথা ফেটে গেল। সেখান থেকে গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে।

নিতা উঠে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

মেগালো শহরে তখন কয়েকজন মিলে সেই রক্তাক্ত রোবট-শিশুকে নিয়ে ছুটে গেল ছত্রপাড়ায় তার বাড়িতে। ঘটনা যা ঘটেছে তারা সে কথা বলল আর তারসঙ্গে মিলিয়ে আরওকিছু বলে ভয়াবহ করে তুলল ঘটনা।

বড়োরা দেখল রক্তারক্তি ব্যাপার। যার মাথা ফেটে গেছে তার বাড়ি ছত্রপাড়ায় আর যে মাথা ফাটিয়েছে তার বাড়ি মিকাওপাড়ায়। ছত্রপাড়ার বড়োরা গিয়ে ছোটোদের বকাবকি করতে থাকল। তখন মিকাওপাড়ার বড়োরা এগিয়ে এল। 

যে মাথা ফাটিয়েছে তার বাবা-মায়ের কাছে ছত্রপাড়ার মানুষরা প্রতিবাদ জানালো। বাবা-মা ঘটনার পালটা যুক্তি দিয়ে সংকট আরও ভয়াবহ করে তুলল। তখন তারা পরস্পর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ল।

এই ঘটনায় ছত্রপাড়ার মানুষজন সংগঠিত হয়ে গেল। তাদের ঠেকাতে মিকাওপাড়ার মানুষজন জোর প্রস্তুতি নিয়ে নিল। ছত্রপাড়া আর মিকাওপাড়ার ভেতর শুরু হলো প্রথমে গালাগালি, তারপর লাঠালাঠি, পিটাপিটি। সেখান থেকে গোলাগুলি। ছত্রপাড়া আর মিকাওপাড়ার মারামারি ছড়িয়ে পড়ল পুরো মেগালো শহরে।

মারামারি, রক্তারক্তি, গোলাগুলি, হত্যা ছাড়া কি মানুষ বাঁচতে পারে না?

সবাই একসাথে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছে। মিস্টার ডার্কব্রাউন দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কখন এসেছেন কেউ খেয়াল করেনি। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে নিতা আর জেমি।

মিস্টার ডার্কব্রাউন গম্ভীর গলায় বললেন, তোমাদের বানানো এই রোবট-মানবদের তোমরা কেন বুদ্ধি দিয়ে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করাচ্ছ না ? কেন তোমরা তাদের বারবার হানাহানির ভেতর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছ? না কি পৃথিবীর মানুষের চিন্তায় টিকে থাকার কৌশল হিসেবে সংঘাত, হত্যা, দখল এমনভাবে পোক্ত হয়ে গেছে যা থেকে তোমরা বেরুতে পারছ না।

মেগালো শহরের কন্ট্রোল প্যানেল ছেড়ে সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে।

ডেভিড বিড়বিড় করে বলল, ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হলে…!

কথা শেষ করতে পারেনি ডেভিড। সে কথা অসমাপ্ত রেখে থেমে গেল।

মিস্টার ডার্কব্রাউন বললেন, বুদ্ধি ছাড়া শুধু অস্ত্র আর শক্তি দিয়ে মানুষ কখনো পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে না। তারা নিজেদের ভেতর মারামারি করে নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যাবে।

ডেভিড আবার কিছু বলতে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, পৃথিবী এখন সেখানেই পৌঁছে গেছে।

আর কেউ কিছু বলছে না। সকলের কাছে মনে হচ্ছে কোথাও ভুল হয়েছে। তারা নিজেদের আনন্দকে বড়ো করে দেখেছে। আগামী দিনে মানুষ কীভাবে টিকে থাকতে পারে সেটা ভাবেনি।

মিস্টার ডার্কব্রাউন সবার দিকে তাকালেন। কুক ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু বলছে না।

মিস্টার ডার্কব্রাউন বললেন, তোমার পরিকল্পনা যদি এরকমই হয়ে থাকে কুক তাহলে আমি বিজ্ঞান একাডেমিকে বলব প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে তারা যেন নতুন সিদ্ধান্তগ্রহণের জন্য উদ্যোগ নেয়।

কুক বিনীত গলায় বলল, এ ব্যাপারে আপনার কি মত জানতে পারি ?

মিস্টার ডার্কব্রাউন বললেন, আমি বিশ^াস করি পৃথিবী টিকে থাকবে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায়। আশা করি আমি আমার কথা বোঝাতে পেরেছি।

মিস্টার ডার্কব্রাউন বেরিয়ে গেলেন। তার সঙ্গে জেমি আর নিতাও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বের হয়ে গেল।

মর্গান বলল, তাহলে আর ডাইনোসর ছেড়ে দিলে মেগালো শহরের কেউ বাঁচবে না।

তারপর উপহাস করার মতো করে বলল, মানুষ ডাইনোসরের গলা ধরে ঝুলে থাকবে, যেমন থাকে গরুর গলা ধরে, আর ডাইনোসর তাদের আদর করবে।

ডেভিড বলল, ভালোবাসা দিয়ে কি সবকিছু বাঁচানো যায় ?

খামি বলল, নিশ্চয় যায়। তুমি যা কিছু ভালোবেসেছ, সব একদিন হারিয়ে যাবে সত্য। কিন্তু ভালোবাসা ঠিক ফিরে আসবে অন্য কোনোভাবে, অন্য কোনও চেহারায়। 

মেগালো শহরে তখনও তুমুল হট্টগোল চলছে। মেগালো শহরের কন্ট্রোল প্যানেল সবাই উঠে দাঁড়ালেও সিস্টেম অফ করেনি। যে ঘটনা তারা চালু করে দিয়েছে তা বারবার ঘটছে। একই রকমভাবে ঘটে যাচ্ছে। পুরো মেগালো শহরে মারামারি হচ্ছে। রোবট-মানবদের কাছে বিভিন্ন ধরনের মারণাস্ত্র। একজন আরেকজনকে মারছে। একজনকে ধরে কয়েকজন পেটাচ্ছে। একে অন্যকে হত্যা করছে। হত্যার পর তারা বীভৎসভাবে উল্লসিত হয়ে উঠছে। 

১২.

সবুজ পতাকা

শাওনি অবাক হয়ে দেখল এ শহরের মানুষজন মারামারি করছে। কোনও কারণ ছাড়া এরা মারামারি করছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে কোনও কাজ নেই। তারা যেন নিজের ইচ্ছেতে কিছু করছে না। তাদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চোখমুখে নিষ্প্রাণভাব। কোনও কিছুতে তাদের উৎসাহ নেই। তবু তারা যন্ত্রের মতো সব করে যাচ্ছে।

যার মাথা ফেটে গিয়েছিল তার মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়েছে। এখন আর রক্ত পড়ছে না। সে ভালো বোধ করছে।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে মালাই বলল, এখন বিরতি। মারামারি থামাও। দেখা যাক তারা নিজেরা কী করে।

খামি বলল, ভালো প্রস্তাব। নিজেদের সিদ্ধান্ত তারা কেমন করে কাজে লাগায় দেখা দরকার।

মারামারি থেমে আছে। তবে উত্তেজনা কমেনি। ছত্রপাড়া আর মিকাওপাড়ায় মানুষজন আলোচনা করছে কখন কীভাবে পরবর্তী আক্রমণ করবে।

ছেলেমেয়েরা আবার খেলা শুরু করেছে। তাদের ফার্ম হাউজের খেলা জমে উঠেছে। কারও গরুর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। কারও আবার ভেড়ার সংখ্যা হয়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে মালাইয়ের কথামতো সকলে মেগালো শহরের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ উঠে আড়মোড়া ভাঙছে। কেউ গেছে কফি আনতে। এখন নাকি স্ট্রং ব্ল্যাক কফি লাগবে।

পাঞ্জু মেগালো শহরের নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি। সে দেখল খেলার মাঠ থেকে তিনজন কিশোর ফিরে যাচ্ছে। তারা বন্ধু। তাদের দুজনের বাড়ি ছত্রপাড়ায়। একজন থাকে মিকাওপাড়ায়। সে আগে ছত্রপাড়ায় থাকত।

পাঞ্জুর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চলে এসেছে। সে ওদের ভেতর ঝামেলা বাধানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।

ছত্রপাড়ার প্রবীণ যে মানুষ তার নাম সুরাত। সকলে তাকে মান্য করে। তার কথা শোনে। তাকে ঘিরে বসে আছে মানুষজন। সুরাত দেখল বছর দশেকের একজন মেয়ে তারদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মেয়েকে সে চিনতে পারল না। তবে তাকে খুব আপন মনে হচ্ছে।

শাওনি মানুষজনের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে সুরাতের পাশে দাঁড়াল। নরম গলায় বলল, আপনারা মারামারি করছেন কেন ?

সামনে বসে থাকা একজন বলল, ওরা আমাদের একজনের মাথা ফাটিয়ে রক্ত বের করে দিয়েছে।

আরেকজন বলল, তারা আমাদের গালাগালি করেছে।

কেউ বলল, ওরা আমাদের ওপর গুলি ছুঁড়েছে।

শাওনি বলল, মিকাওপাড়ার মানুষের সঙ্গে আপনাদের কোনও শত্রুতা আছে ?

পাড়াপ্রধান সুরাত বলল, কারও সঙ্গে আমাদের কোনও শত্রুতা নেই।

শাওনি জিজ্ঞেস করল, তাহলে হঠাৎ মিকাওপাড়ার মানুষদের সঙ্গে মারামারি করতে গেলেন কেন ?

শাওনির কথা শুনে সুরাত কেমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। সে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারছে না যাদের সঙ্গে কোনও দিন কখনও কোনও শত্রুতা হয়নি, তাদের সঙ্গে আচমকা তারা এমন রক্তারক্তি মারামারিতে জড়িয়ে পড়ল কেন ? সে কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বলল, ওরা আমাদের একজনকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিলো যে!

শাওনি তখন খানিকটা বোঝানার সুরে বলল, আপনাদের ছেলেমেয়েরা খেলতে খেলতে ভুল করেছে। একজন আরেকজনকে আঘাত করেছে। আচমকা বেকায়দায় আঘাত লেগে মাথা ফেটে গেছে। তারা তো আবার মিলেমিশে খেলছে। আপনারা বড়োরা কেন ভুল করছেন ? কেন নিজেদের শত্রু বানাচ্ছেন ?

সামনে বসে থাকা মানুষজন একে অন্যের দিকে তাকাল। তারা নিজেদের ভেতর গুনগুন করে কথা বলছে। এভাবে কেন আগে ভাবেনি! এই ছোট্ট মেয়েটি সঠিক কথা বলেছে।

শাওনি তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, সবাই চলেন আমার সঙ্গে। আপনারা নিজে দেখে আসবেন।

সবাই একসাথে উঠতে গিয়ে থমকে গেল। কেউ উঠে দাঁড়াল। কেউ কেউ আবার বসে পড়ল। নিদান আর ভকু এক ছেলেকে ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। যাকে টানতে টানতে নিয়ে আসছে তার নাকমুখে রক্ত। মনে হচ্ছে তাকে কিল ঘুসি মারা হয়েছে।

নিদান আর ভকু ছত্রপাড়ার ছেলে। তারা যাকে ধরে নিয়ে আসছে তাকে কয়েকজন চিনতে পারল। সে মিকাওপাড়ায় থাকে। আগে ছত্রপাড়ায় থাকত। ওদের বন্ধু। তার নাম অ্যাপালো।

 সামনের মানুষদের চোখের ভাবভঙ্গি দেখে শাওনি পেছন ফিরে তাকাল।

সুরাত বলল, ঘটনা কী ? তার এই অবস্থা কেন হয়েছে ?

ভকু বলল, ঘটনা খারাপ। মিকাওপাড়ার লোকজন পরামর্শ করছে কীভাবে আমাদের ওপর চড়াও হবে। অ্যাপালোকে বললাম তোদের পরিকল্পনা বল। অ্যাপালো বলল সে কিছু জানে না।

শাওনি বেশ কঠিন গলায় বলল, তাকে ছেড়ে দাও। সে কিছু জানে না।

নিদান অবাক হয়ে শাওনির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কে ? তোমাকে আগে কখনও দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না।

যারা বসে ছিল তারা উঠে এসে এদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে। শাওনি শুকনো গলায় জানতে চাইল, তোমরা তাকে কোথায় পেয়েছ ?

শাওনির অমন কাটাকাটা কথা শুনে ভকু ঘাবড়ে গেছে। সে আমতা আমতা করে বলল, খেলার মাঠের ওদিক থেকে আমরা একসঙ্গে ফিরছিলাম।

শাওনি শীতর গলায় বলল, সে ছিল তোমাদের সঙ্গে। মিকাওপাড়ার মানুষেরা যে পরামর্শ করছে কীভাবে ছত্রপাড়ায় অ্যাটাক দেবে সেটা সে জানবে কীভাবে ?

ভকু আর নিদানকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। তাদের মনে হচ্ছে যুক্তি ঠিক আছে। তারা অ্যাপালোকে ছেড়ে দিলো। অ্যাপালো হাত দিয়ে মুখ মুছল। হাতে রক্ত লেগে গেছে।

নিদান ভুল মেনে নিয়ে ভাঙা গলায় বলল, কিছু বুঝতে পারিনি। ভকু যখন অ্যাপালোকে জিগ্যেস করল মিকাওপাড়ার লোকজন ছত্রপাড়া আক্রমণের কী প্ল্যান করছে, তখন অ্যাপালো বলল সে কিছু জানে না। আমার মাথার ভেতর কে যেন বলে উঠল, পেটাও ওকে। মারো, মেরে মাটিতে শুইয়ে দাও। আমি অ্যাপালোকে মারতে শুরু করলাম।

ভকু ভেজা গলায় বলল, নিদান মারছে দেখে আমারও মারতে ইচ্ছে হলো। আমিও মারলাম।

শাওনি এবার নরম গলায় বলল, এখন অ্যাপালোর হাতমুখ ধোয়ার ব্যবস্থা করো। আর তাকে সরি বলো। তোমরা ভুল কাজ করেছ। মারামারি করা খারাপ।

ভকু ছুটে বাড়ির দিকে চলে গেল। নিদান বলল, কিছু মনে করিস না। হঠাৎ আমার সব কেমন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। আমি কেন এরকম করলাম জানি না। সরি। তুই আমাদের ক্ষমা করে দে ফ্রেন্ড।

অ্যাপালো প্রথমে শাওনির দিকে তাকাল। তারপর নিদানের দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে হাসল।

ভকু পানি আর তোয়ালে নিয়ে এসেছে। অ্যাপালো মুখ হাত ধুয়ে ফেলল ভালো করে। শাওনি সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, চলেন যাই, মাঠে গিয়ে দেখি ছত্রপাড়া আর মিকাওপাড়ার ছেলেমেয়েরা কী করছে।

শাওনির সঙ্গে ছত্রপাড়ার বড়োরা রওনা হলো। ঘটনা দেখে তারা অবাক হয়ে গেছে। ছত্রপাড়া আর মিকাওপাড়ার ছেলেমেয়েরা আগের মতো একসঙ্গে মিলেমিশে খেলা করছে। আনন্দ করছে। হাসাহাসি করছে। নিজেদের বানানো ফার্ম হাউজে গরু আর ভেড়া বিনিময় করছে। ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। তারা আনন্দ করছে। তাদের ভেতর কোনও শত্রুতা নেই।

ছত্রপাড়ার প্রধান সুরাত বলল, আমরা মারামারি করতে চাইনি অথচ মারামারি করছি। এটা অত্যন্ত লজ্জার। আমরা নিজেরা নিজেদের শত্রু বানিয়ে ফেলেছি। এটা অন্যায়। অতি খারাপ কাজ। আপনারা অনুমতি দিলে আমরা সবুজ পতাকা তুলে দিতে পারি।

সবুজ পতাকা মানে মারামারি বন্ধ করে আলোচনার প্রস্তাব।

ছত্রপাড়ার সকলে রাজি হয়ে গেল।

মিকাওপাড়ার মানুষ দেখতে পেয়েছে ছত্রপাড়ার মাথায় বিশাল সবুজ পতাকা উড়ছে পতপত করে।

১৩.

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে আবার উত্তেজনা

বিজ্ঞান একাডেমির মেগালো শহর নিয়ন্ত্রণকক্ষে আবার উত্তেজনা শুরু হয়েছে। তারা কিছুতেই মেগালো শহরের ছত্রপাড়ার মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ছত্রপাড়ার মানুষরা নিজে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। মারামারির মাঝপথে ছত্রপাড়ায় সবুজ পতাকা তোলার সিদ্ধান্ত বিজ্ঞান একাডেমির মেগালো শহর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের না। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছত্রপাড়ার মানুষ। তারা নিজেদের বিচার-বিবেচনা কাজে লাগাচ্ছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

ডেভিড বলল, এই মেয়ে কে ? সে কি আমাদের বানানো মেগালো শহরের কেউ ?

কুক বলল, তাকে আমি চিনি না। সে মেগালো শহরের কেউ না।

জেমি বলল, আমি তাকে চিনি। তার সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি। সে চাইতু গ্রামের শাওনি।

মর্গান রেগেমেগে বলল, এখানে ঢুকল কীভাবে ? আমাদের রক্ষী রোবটরা তাকে আটকাতে পারেনি কেন ? আর কতজন ঢুকেছে কে জানে! খোঁজ নাও। সিস্টেমে ভাইরাস অ্যাটাক করেছে কিনা চেক করা দরকার।

কুক বলল, সবকিছু ঠিক আছে।

মালাই বলল, আদিবাসীদের তিরের আঘাত সহ্য করতে না পেরে রোবট-মানবরা যখন ছুটে হারিয়ে পালিয়ে আসছিল তখন রোবট-মানবের সঙ্গে মেগালো শহরে ঢুকে পড়েছে শাওনি।

কুক বলল, এই কথা তুমি কেমন করে জানো ?

মালাই বলল, তাকে ঢুকতে দেখেছি কিন্তু বুঝতে পারিনি। তখন হেরে ফিরে আসার উত্তেজনার ভেতর ছিলাম।

কুক বলল, সময় মতো বুঝতে না পারার কত খেসারত এখন দিতে হবে কে জানে। ওই কন্যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। রক্ষী রোবটকে দিয়ে তাকে ধরা যাবে কি না বুঝতে পারছি না। সে ছত্রপাড়ার মানুষদের কী বুঝিয়েছে জানি না। যদি রক্ষী রোবট পাঠিয়ে তাকে ধরতে গেলে ছত্রপাড়ার সবাই এক হয়ে রক্ষী রোবটদের সিস্টেমে গণ্ডগোল করে দেয়!

ডেভিড অনেকক্ষণ ধরে দুই হাত মোচড়াচ্ছে। সে অস্থির গলায় বলল, বিরাট টেনশন হচ্ছে আমার। এরা যদি পুরোপুরো নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে আমরা আর কখনওই তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না।

নিয়ন্ত্রণকক্ষে সকলের ভেতর উত্তেজনা আর অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তারা এখান থেকে রোবট-মানবদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। কিন্তু ছোট্ট এক মেয়ে তাদের সবকিছু ভণ্ডুল করে দিচ্ছে। মেগালো শহরের মানুষ এখন নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

মর্গান বলল, রক্ষী রোবট দিয়ে শাওনিকে শহরের বাইরে বের করে দাও।

মালাই বলল, সে থাক। শাওনি কীভাবে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে সেটা দেখা দরকার।

ডেভিড বলল, তুমি সেই এক্সপেরিমেন্ট করতে চাইছ যেখান থেকে বোঝা যাবে আগামী পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করবে কারা, মানুষ নাকি অ্যান্ড্রোয়েড।

মালাই বলল, হ্যাঁ আমি সেটা দেখতে চাইছি। মানুষের প্রোগ্রামিং করা বুদ্ধি আর মানুষের নিজ বুদ্ধির ভেতর তফাত কতখানি, যে কি না বয়সে একজন অতি ছোটো মানুষ। যার অভিজ্ঞতা খুবই সামান্য।

পাঞ্জু আর রয়েল কোনও কথা বলছে না। ব্যাপার বোঝার চেষ্টা করছে। তারা কিছু বলার জন্য উসখুস করছে।

খামির মুখে ঠোঁটের কোনায় অদ্ভুত হাসি। সে কেন এমন অদ্ভুতভাবে হাসছে অন্যরা তা বুঝতে পারল না। খামি বলল, এখন মেগালো শহরের রোবট-মানবরা একা চিন্তা করছে। শাওনি তাদের সংগঠিত করতে পারে। আর তারা একবার সংগঠিত হয়ে যদি নিজেরা মিলে ভাবনাচিন্তা করা শুরু করে তাহলে আর তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

মর্গান আবার জোর দিয়ে বলল, রক্ষী রোবট পাঠিয়ে শাওনিকে বের করে দাও।

মালাই কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। সকলে মনিটরের দিকে ঝুঁকে আছে। হিমঠাণ্ডা ঘরে কুকের কপালে বিনবিনে ঘাম।

ছত্রপাড়ার প্রধান সুরাত দেখল একদল রক্ষী আসছে তাদের কাছে। সে বুঝতে পারল তারা শাওনিকে ধরতে আসছে। শাওনি এখানে নতুন। তার কাছ থেকে বুদ্ধি পেয়ে তারা মারামারি থামিয়ে আলোচনার জন্য সবুজ পতাকা তুলেছে। এটা নিশ্চয় রক্ষীদের পছন্দ হয়নি।

সুরাত তাড়াতাড়ি ঘটনা বুঝিয়ে বলল সবাইকে, আমাদের ওপর বিপদ নেমে আসছে। রক্ষীদল আসছে শাওনিকে ধরার জন্য। আমরা মারামারি থামিয়ে দিয়েছি এটা তাদের পছন্দ হয়নি।

সকলে দেখল রাস্তা দিয়ে অস্ত্রে সজ্জিত রক্ষীদল আসছে তাদের পাড়ায়। তরুণ একজন বলল, শাওনিকে আমরা লুকিয়ে ফেলব। রক্ষীদল তাকে খুঁজে পাবে না।

সুরাত বলল, রক্ষীদল তাকে না পেয়ে আমাদের ওপর নির্মমভাবে নির্যাতন চালাতে পারে।

সামনে থেকে আরেকজন বলল, আমরা নির্যাতন সহ্য করব তবু বলব না শাওনি কোথায় আছে।

অন্য একজন বলল, রক্ষীদল যখন যা ইচ্ছে তাই করে। সবসময় আমাদের ওপর অত্যাচার করে। আমরা তাদের অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করি। আমরা অত্যাচার সহ্য করি বলেই তারা আরও বেশি অত্যাচার করে। তাদের অত্যাচার আমরা আর সহ্য করব না।

সবাই একসঙ্গে বলল, শাওনি কোথায় আছে আমরা তাদের জানতে দেব না। তারা অত্যাচার করলে তাদের অত্যাচার আমরা মেনে নেব না।

শাওনিকে নিয়ে নিদান, ভকু আর অ্যাপালো চলে গেল। তারা কোথাও গেল অন্যরা জানল না।

রক্ষীদল ছত্রপাড়ার মানুষজনের সামনে এসে দাঁড়াল। প্রধান রক্ষী এগিয়ে এসে বলল, তোমাদের এখানে একজন ছোটো মেয়েকে দেখা গেছে। সে কোথায়?

ছত্রপাড়ার বড়োরা কেউ কিছু বলল না। ছোটো ছেলেমেয়ে যারা মাঠে খেলছিল তারা দলধরে রক্ষী রোবটদের আসতে দেখে খেলা ছেড়ে রাস্তায় চলে এসেছে। তাদের ভেতর থেকে দশ বছরের একজন মেয়ে এগিয়ে এল। তার নাম অবরা। সে বলল, তোমরা কি আমাদের খুঁজতে এসেছ? আমরা তো মাঠে খেলছি।

প্রধান রক্ষী বলল, তোমাদের খুঁজছি না। অন্য একজন ছোটো মেয়েকে খুঁজছি।

অবরা বলল, আমরা ছাড়া এখানে আর কোনও ছোটো মেয়ে নেই।

রক্ষীদল ছোটো ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে বেকুব হয়ে গেল। তাদের ভেতর সত্যি সেই মেয়েটি নেই যাকে তারা খুঁজতে এসেছে।

রক্ষীদল ছত্রপাড়ায় ঢুকে পড়ল শাওনিকে খুঁজতে। তাদের সঙ্গে ছত্রপাড়ার বড়োরা আর ছত্রপাড়া ও মিকাওপাড়ার ছোটো ছেলেমেয়েরা গেল।

ছত্রপাড়ায় এসে রক্ষীদল শাওনিকে কোথাও খুঁজে পেল না। তারা ছত্রপাড়ার সব বাড়ি খুঁজে দেখল। খড়েরগাদা, গোয়ালঘর সব দেখল। শাওনি কোথাও নেই।

রক্ষীদল ছত্রপাড়া থেকে কয়েকজনকে আটক করল। তাদের ধরে নিয়ে যাবে। প্রধান রক্ষী বলল, শুধু সেই মেয়েকে পেলেই আমরা এদের ছাড়ব। আর যদি তোমরা সেই মেয়েকে খুঁজে আমাদের কাছে হাজির না করো তাহলে যাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছি তাদের মেরে পাউডার বানিয়ে ফেলব।

রক্ষীদল ভেবেছিল প্রধান রক্ষীর কথা শুনে ছত্রপাড়ার মানুষ ভয় পেয়ে যাবে। তখন তারা সেই ছোটো মেয়ে কোথায় আছে বলে দেবে। যাকে তারা খুঁজছে।

প্রধান রক্ষীর ধমকের ফল হলো বিপরীত। ছত্রপাড়ার সবাই একসঙ্গে রুখে দাঁড়াল। রক্ষীরা কাউকে ধরে নিয়ে যেতে পারল না। যাদের ধরেছিল তাদের ছেড়ে দিতে হলো। কাউকে পাকড়াও করে নিয়ে যাওয়া ছাড়াই রক্ষীদলতে ফিরে যেতে হলো।

বিজ্ঞান একাডেমির মেগালো শহর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে তখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ হতাশ হয়ে গা-ছাড়া দিয়ে বসে পড়েছে। কেউ উৎসাহিত হয়ে উঠেছে মেগালো শহরের রোবট-মানবদের নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে দেখে।

খামি বেশ আনন্দিত আর সাহসী গলায় বলল, নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে কখনও টিকে থাকা যায় না। নিয়ন্ত্রিত জীবন নিতান্তই সাজানো জীবন। যেকোনও সময় তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

১৪.

চাইতু গ্রামবাসী এসেছে বাবুতি গ্রামে

বেলা বাড়ছে। বছরের এ সময়টা হুহু করে বেলা বাড়তে থাকে। ধাপ ধাপ করে সূর্য মাথার ওপর উঠে যায়।

সূর্য এখনো পুরোপুরি খাড়া মাথার ওপরে উঠে যায়নি। তবে রোদের ঝকঝকে আলোতে চারদিক আলোকিত হয়ে আছে। সেই তীব্র আলো মাড়িয়ে গিমি আর হুয়া চলে এসেছে ছায়া ঢাকা বনের ভেতর। এখানে ঘন বন। গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়েও সূর্যের আলো এসে পৌঁছায় না।

খুব সকালে হুয়া গেছে গিমির বাড়িতে। গিমি তখন লম্বা আর সরু একটা গাছ বেয়ে তরতর করে একবার ওপরে উঠছে আবার নামছে।

ঘটনা দেখে হুয়া হকচকিয়ে গেল। বনের যে পশু, যেমন বানর সেও এমন নিপুণভাবে খাড়া গাছে এত দ্রুত উঠে যেতে পারে কি না সে জানে না।

গাছ বেয়ে সরসর করে নেমে আসার সময় গিমি দেখল হুয়াকে। সামনে এসে বলল, কী ব্যাপার হুয়া, এত সকালে!

হুয়া স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, অসাধারণ!

গিমি বলল, কী ?

হুয়া বিস্মিত গলায় বলল, তোমার গাছে চড়া!

হেসে ফেলেছে গিমি। হাসিমুখে বলল, সে আমি রোজ উঠি তাই।

হুয়া বলল, ঝিনঝিরার ওপাশে যেতে চাই। যাবে ?

গিমি মনে পড়ল তার দাদাঠাকুরের কথা। বাবাকে নিয়ে তিনি যেতেন ঝিনঝিরার ওপাশে পাহাড়ের ঢালে। গিমি অবাক গলায় বলল, ঝিনঝিরার ওপাশে গহিন বন। তার ওপাশে পাহাড়।

হুয়া বলল, সেখানে বাঘ আছে।

গিমি মাথা দুলিয়ে বলল, নেকড়ে বাঘ।

হুয়া প্রবল উৎসাহ নিয়ে বলল, একটা নেকড়ে বাঘ মারতে চাই।

গিমি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, কেন নেকড়ে বাঘ মারতে চাও ?

হুয়া চোখ উজ্জ¦ল করে বলল, নেকড়ে বাঘের চামড়া দিয়ে পোশাক বানাব।

গিমি দৌড়ে বাড়ির ভেতর গিয়ে তার বর্শার মতো সূঁচালো লাঠি নিয়ে এলো। দৌড়ানোর ভঙ্গিতে বলল, চলো যাই।

ঝিনঝিরার বন পেরিয়ে গিমি আর হুয়া নেকড়ে বাঘের খোঁজে পাহাড়ের ওপরে উঠতে শুরু করল। তখুনি হুয়া দেখল একদল মানুষ আসছে তাদের গ্রামের দিকে। তাদের দেখে ভীত ও শঙ্কিত মনে হচ্ছে। কিন্তু তারা কেন তাদের গ্রামের দিকে আসছে বোঝা যাচ্ছে না।

হুয়া ডেকে দেখাল গিমিকে। লোকজন দেখে গিমি বলল, গ্রামে ফিরে চলো। সবাইকে জানানো দরকার।

চাইতু গ্রামের মানুষজন বাবুতি গ্রামে পৌঁছানোর আগে গিমি আর হুয়া গ্রামে পৌঁছে গেল। তারা সরাসরি চলে গেল বাহুট আবাসে। সেখানে গ্রাম প্রধানরা আছেন।

বাহুট আবাস থেকে গ্রাম প্রধানরা বের হয়ে দেখতে পেলেন আবিওলা একদল মানুষ সাথে করে আসছে।

আবিওলা বলল, তারা আসছে চাইতু গ্রাম থেকে। তাদের মেয়ে শাওনিকে খুঁজে পাচ্ছে না। তারা শাওনিকে খুঁজতে এসেছে।

জিউ চিনতে পেরেছেন কোজোকে। এর আগেও দেখা হয়েছিল। সেবারও তারা এসেছিল শাওনিকে খুঁজতে। সেবার শাওনি এসে ছেলেমেয়েদের সাথে খেলা করছিল। এবার তারা শাওনিকে দেখেনি।

আবিওলা চলে গেল চাইতু গ্রাম থেকে যারা এসেছে তাদের আপ্যায়েনের ব্যবস্থা করতে। তার সঙ্গে গিমি আর হুয়াও গেল। প্রথমে গাছ থেকে ডাব পাড়তে হবে। তারপর অন্য ব্যবস্থা।

জিউ বললেন, কন্যাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে ব্যথিত হয়েছি। তবে তাকে আমরা এখানে আসতে দেখিনি। আমরা খুব খারাপ সময় পার করছি। হ্রদের পাশে নতুন যে শহর হয়েছে সেখান থেকে না-মানুষ, না-জানোয়ার অদ্ভুত কিসিমের কারা এসে আক্রমণ করেছে আমাদের। তাদের সাথে লড়াই করতে হয়েছে। হ্রদের ওপর তারা রাস্তা বানিয়েছে।

শাওনির বাবা আতঙ্কিত গলায় জানতে চাইল, কবে এসেছিল তারা ?

চাইতু গ্রামের মানুষ যে কথা বলছে সে কথা মাহতা বামবুতিদের বুঝিয়ে দিচ্ছে। আবার বামবুতিরা যা বলতে তা চাইতুদের বোঝাচ্ছে।

কায়কুয়া বললেন, ক্ষত এখনও শুকায়নি। গ্রামের ভেতরে গেলেই দেখা যাবে এখানে ওখানে আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষত। আগুনের গোলা ছুড়ে পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল আমাদের গ্রাম। বন জঙ্গল সব।

আদে বলল, কী তাদের চাওয়া আর কেন তারা এমন করছে কিছুই জানি না।

শাওনির বাবা অস্থির গলায় বলল, তারা তাকে ধরে নিয়ে যায়নি তো!

জিউ স্থির চোখে দূরে তাকিয়ে আছেন। তিনি কিছু ভাবছেন। মাথা ঘুরিয়ে জানতে চাইলেন, শাওনি কী হেঁটে এসেছে বনে ?

কোজো বলল, হাতির পিঠে চড়ে এসেছে। তার প্রিয় হাতি। মাঝেমাঝেই তাকে নিয়ে বনে ঘুরতে আসে। আবার ফিরে যায়। এবারও ভেবেছিলাম ফিরে যাবে। সে ফিরল না।

চাইতু গ্রামের মানুষদের চমকে দিয়ে জিউ গম্ভীর গলায় বললেন, নতুন শহরের পাশে আমরা একটা হাতি দেখেছি। পোষা হাতি মনে হয়েছে। তার গলায় গাছের লতা দিয়ে বানানো মালা ছিল।

জিউ যা বললেন মাহতা সবাইকে সেটা বুঝিয়ে দিল। সকলে একসঙ্গে হাহাকার করে উঠল। সকলের গলা ছাপিয়ে শাওনির মায়ের গলা শোনা গেল। সে জড়ানো গলায় বলল, শাওনি সেই হাতির পিঠে চড়ে বনে এসেছে।

জিউয়ের দিকে তাকিয়ে মাহতা জিগ্যেস করল, সেই হাতি কি আর দেখা গেছে ?

জিউ বললেন, আমরা সেই হাতি বনের ভেতর চলে যেতে দেখেছি। তার পিঠে শাওনি ছিল না।

চাইতু গ্রামের মানুষজনের ভেতর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তারা কথা বলছে―তাহলে শাওনি কোথায় গেল ? তাকে কোথায় খোঁজা যেতে পারে!

আবিওলা ফিরে এসেছে। তার সাথে গ্রামের আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণী আর ছোটো ছেলেমেয়ে। তারা ডাব আর ঝুড়িভর্তি ফল নিয়ে এসেছে।

আবিওলা বলল, গ্রামে রান্নার আয়োজন করা হয়েছে। আজ কোনও বাড়িতে রান্না হবে না। চাইতু গ্রাম থেকে যারা এসেছেন তাদের নিয়ে আমরা বাবুতি গ্রামের সবাই একসঙ্গে খাব।

জিউ খুশি হয়েছেন। তার চোখে হাসির আভাস দেখা গেল। তিনি আবিওলার ওপর ভরসা রাখেন।

তামালা বলল, খেতে একটু দেরি হবে। রান্না চড়ানো হয়েছে।

বানমি বলল, বেশি দেরি হবে না। যারা ঘরে রান্না করেছিল তারা তাদের রান্না নিয়ে আসবে। ততক্ষণ আমরা মুখ হাত ধুয়ে ফল আর রুটি দিয়ে পাখির মাংস খাই।

খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে চাইতু গ্রামের কারও তেমন আগ্রহ দেখা গেল না। তারা ডাবের পানি খেয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকল।

উঠে দাঁড়িয়েছেন জিউ। সকলে উঠে দাঁড়াল। চাইতু গ্রামের মানুষদের দিকে হাত ইশারা করে জিউ বললেন, আপনারা বসুন। বিশ্রাম করুন। আমাদের একটু সময় দিন। কী করা যায় ভেবে দেখি।

জিউ হাঁটছেন। জিউয়ের সঙ্গে আবিওলা, আদে, কায়কুয়া, তামালা ওরাও হাঁটছে। বানমি আর কয়েকজন থেকে গেছে চাইতু গ্রামের মানুষের সঙ্গে। তাদের সেখানে থাকতে বলা হয়েছে। যেন অতিথিদের আপ্যায়নে কোনও ত্রুটি না হয়।

বামবুতিদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে লম্বা পথ হেঁটে গেলেন জিউ। আবার কথা বলতে বলতে ফিরে এলেন।

চাইতু গ্রামের মানুষদের ভেতর তখন হতাশ ভাব চলে এসেছে। শাওনিকে যদি শহরের ওরা ধরে নিয়ে যায় তাহলে কেমন করে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে ভেবে তার উপায় বের করতে পারেনি। সে শহর কেমন তাও তারা জানে না।

জিউ স্থির গলায় বললেন, বামবুতিরা তৈরি হয়ে আসছে। হ্রদ পার হয়ে আমার যাব শহরে। সেখানে গিয়ে শাওনিকে খুঁজব। তার হাতি শহরের ফটকে দাঁড়ানো ছিল। ফিরেছে একা, শাওনিকে ছাড়া। তার মানে শাওনি আছে ওই শহরের ভেতরে।

চাইতু গ্রামবাসীর ভেতর উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তারা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল। শাওনিকে খোঁজার এমন সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে তারা ভাবেনি।

কোজো বলল, আমরা ভীষণ কৃতজ্ঞ বামবুতিদের কাছে। তারা আমাদের অতি আপনজন।

জিউ বললেন, আমরা এখুনি রওনা হতে চাই। ফিরে এসে খাওয়ার ব্যবস্থা।

বামবুতি তরুণরা সড়কি, বর্শা হাতে তৈরি হয়ে চলে এল। এর আগে হ্রদের ওপারের শহর থেকে কিম্ভুত না-মানুষ, না-জানোয়ার কিসিমের ওরা বেরিয়ে এসে তাদের গ্রাম লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। আজ তারা যাচ্ছে সেই শহরে শাওনিকে খুঁজতে। এবার তাদের না-মানুষ, না-জানোয়ার কিসিমের ওদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে নাকি আপোষে শাওনিকে ফিরে পাওয়া যাবে তা তারা জানে না।

বামবুতিদের সঙ্গে নিয়ে চাইতু গ্রামের মানুষ কিভু হ্রদের ওপর অ্যারোব্রিজ পার হলো। তারা এসে দাঁড়াল শহরের ফটকের সামনে। যেখানে হাতি দাঁড়িয়ে ছিল।

শহরের প্রাচীর দেখে হতভম্ব হয়ে গেল সকলে। বামবুতিরা এত কাছ থেকে এর আগে এই শহর দেখেনি। বিশাল উঁচু প্রাচীর। চারদিক দিয়ে ঘেরা। বৃহৎ ফটক। বাইরে থেকে শহরে ঢোকার কোনও পথ নেই।

তারা শহরের ভেতরে ঢুকতে পারল না। চারপাশে শাওনিকে খুঁজল। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। তখন সবাই ফিরে এলো গ্রামে।

চাইতু গ্রামের মানুষ নিশ্চিত হলো শাওনি শহরের ভেতর ঢুকে গেছে। সে সেখান থেকে বের হয়ে আসবে সেই আশা নিয়ে তারা বাবুতি গ্রামে থেকে গেল।

১৫.

সাদা পতাকা

শাওনি বলল, আমি মিকাওপাড়ায় যেতে চাই।

নিদান বলল, তুমি কেন মিকাওপাড়ায় যেতে চাইছ ?

রক্ষীদলকে আসতে দেখে শাওনিকে নিয়ে নিদান, ভকু আর অ্যাপালো ছত্রপাড়ার দিকে দৌড় শুরু করেছে। তাদের ইচ্ছে শাওনিকে নিয়ে তারা নদীর ওপারে চলে যাবে।

ভকু বলল, অতদূরে যাওয়ার আগে রক্ষীদল আমাদের পেয়ে যাবে। চল আমরা গাছে উঠে পড়ি।

শাওনির দিকে তাকিয়ে অ্যাপালো বলল, তুমি গাছে উঠতে পার ?

তখন শাওনি বলল, আমি গাছে উঠতে পারি। কিন্তু এখন গাছে উঠতে চাচ্ছি না। আমি মিকাওপাড়ায় যেতে চাই।

নিদান তার কথার উত্তরে জানতে চেয়েছে সে কেন মিকাওপাড়ায় যেতে চাইছে।

শাওনি বলল, রক্ষীদল আমাকে ছত্রপাড়ায় খুঁজবে, মিকাওপাড়ায় খুঁজবে না। তারা জানে তোমরা আমাকে লুকিয়ে রেখেছ। তোমরা আমাকে মিকাওপাড়ায় যেতে দেবে এমন ভাবনা তাদের মাথাতেই আসবে না।

শাওনির বুদ্ধি ওদের পছন্দ হলো। তারা শাওনিকে নিয়ে মিকাওপাড়ার দিকে রওনা হয়ে গেল।

মিকাওপাড়ার প্রধানের নাম সান। সে ছত্রপাড়ার সবুজ পতাকা দেখেছে। মিকাওপাড়ার সবাইকে ডেকেছে আলোচনা করার জন্য। তারা মারামারি বন্ধ রেখেছে। ছত্রপাড়ার সঙ্গে কী আলোচনা হতে পারে তাই নিয়ে সবাই কথা বলছে।

শাওনি এসেছে মিকাওপাড়ায়। অ্যাপালো এসেছে শাওনির সঙ্গে। নিদান আর ভকু তাদের মিকাওপাড়ার কাছে রেখে ফিরে গেছে।

শাওনিকে দেখে সান অবাক হলো। তাকে আগে কখনও এ শহরে দেখেনি। তার ভাবভঙ্গি, দাঁড়ানো, পোশাকও যেন খানিকটা তাদের থেকে আলাদা। সান বলল, তোমার নাম কী ?

সকলে শাওনিকে দেখল। তারাও কেউ তাকে চিনতে পারল না।

শাওনি নিজের নাম বলল।

সান জিগ্যেস করল, তোমার বাড়ি কি ছত্রপাড়ায় ?

শাওনি বলল, আমার বাড়ি চাইতু গ্রামে। এ শহরের বাইরে যে বন আছে সেই বনেরও বাইরে।

সান বেশ অবাক হয়েছে। এই মেয়ে এ শহরের না, তবু সে তাদের ভাষায় কথা বলছে। সান বলল, তুমি এখানে কেমন করে এলে ?

তোমরা যখন শহরের বাইরে গিয়ে মারামারি করে ফিরে আসছিলে তখন আমি তোমাদের সঙ্গে চলে এসেছি।

এখানে কেন এসেছ ?

তোমরা খুব বোকা। সেই কথাটা বলার জন্য এসেছি।

চমকে উঠেছে সান। তরুণ বয়সের কয়েকজন উঠে দাঁড়িয়েছে। তাদের চোখমুখে রাগ। তারা শাওনির দিকে এগিয়ে এল। সান হাতের ইশারা করে তাদের বসতে বলল। শাওনির কথাতে সে বেশ মজা পেয়েছে। সান বলল, কিসে তোমার মনে হলো আমরা বোকা ?

শাওনি বলল, তোমরা অতি বোকা। বোকার মতো ছত্রপাড়ার মানুষদের সঙ্গে মারামারি করছ। কেন মারামারি করছ ?

একজন তরুণ উঠে দাঁড়িয়ে জোর গলায় বলল, তারা আমাদের দিকে তেড়ে এসেছে, ইটপাটকেল মেরেছে।

শাওনি বলল, তোমরাও তাদের মেরেছ। খেলতে গিয়ে অসাবধানে তাদের গ্রামের একজনের মাথা ফেটে গেছে। তারা কি তোমাদের কোনও ক্ষতি করেছে ? জোর করে তোমাদের ফসল নিয়ে গেছে ?

যে তরুণ উঠে দাঁড়িয়েছিল সে বসে পড়ল। সান বিড়বিড় করে বলল, তারা আমাদের কোনো ক্ষতি করেনি।

শাওনি বলল, তাহলে তোমরা মারামারি করছ কেন ?

সান বলল, জানি না।

শাওনি বলল, তোমরা কেন মারামারি করছ তা জানো না। যাদের নিয়ে মারামারি শুরু হয়েছে তারা আবার খেলছে। মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে নিজেরা খেলা করছে। এদিকে তোমরা মারামারি করে মরছ।

সান বলল, তাহলে আমরা মারামারি করছি কিসের জন্য ?

শাওনি বলল, তোমাদের হুট করে যা মনে হয় তোমরা তাই করে ফেলো। চিন্তাভাবনা করো না। মাথার ভেতর কেউ হয়তো বলল মারামারি করো, তোমরা মারামারি শুরু করে দাও। কেন মারামারি করবে, এতে কী ক্ষতি হবে কিচ্ছু ভাবনাচিন্তা করো না।

উপস্থিত সকলে কথা বলছে। তারা আলোচনা করছে শাওনি ঠিক বলেছে। কোনো কিছু করার আগে নিজেদের চিন্তাভাবনা করা দরকার। আলাপ-আলোচনা করা দরকার। হুট করে কিছু করা ঠিক না।

সান বলল, একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি, যখন আমরা শহরের বাইরে যাই তখন নিজেদের মতো করে ভাবতে পারি। শহরের ভেতরে থাকলে পারি না।

শাওনি বলল, তাহলে শহরের বাইরে চলে যাও। এ শহরে থাকার দরকার নেই।

শহরের সদর দরজা সব সময় বন্ধ থাকে।

সদর দরজা খোলার ব্যবস্থা করতে হবে।

রক্ষীরা আমাদের যেতে দেবে না।

এ শহরের তোমরা যারা আছ সবাই একত্রিত হবে। মিকাওপাড়া, ছত্রপাড়া আর যত পাড়া আছে সব পাড়ার মানুষদের ডেকে বলো তোমরা এ শহর ছেড়ে বাইরে যেতে চাও। যেখানে গেলে তোমরা নিজের মতো করে ভাবতে পারো। তার আগে তোমাদের মারামারি বন্ধ করতে হবে।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে হট্টগোল শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছে শাওনি যা করতে চাইছে তাই করুন। তারা শুধু দেখে যাবে ঘটনা কী ঘটে।

কেউ বলছে এখুনই এসব থামানো উচিত। মিকাওপাড়ার মানুষদের ব্রেইনে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে তাদের মন ঘুরিয়ে ফেলতে হবে। তারা যেন নিজে থেকে মেগালো শহরের বাইরে যেতে না চায়।

আর কয়েকজন বলছে, শাওনি তাদের নিয়ে কী করতে চাইতে করুন। আমরাও আমাদের মতো চেষ্টা করে দেখি তাদের চিন্তাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারি কি না।

সান বলল, আমরা মারামারি চাই না। ছত্রপাড়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। সাদা পতাকা ওড়ানো হবে। কারও কিছু বলার আছে ?

তরুণ বয়সের একজন রাগভরতি চোখ নিয়ে এগিয়ে এল। তার নাম বকালি। সে দুহাত নাড়িয়ে বলল, অ্যাপালোকে ছত্রপাড়ার ছেলেরা আটকে রেখে মেরেছে। আমরা এর প্রতিশোধ নিতে চাই। ছত্রপাড়ার দুজনকে ধরে এনে পানিতে চুবিয়ে পেটাব।

সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। এই ঘটনা তারা জানে না। অ্যাপালো এখানে আছে। সে কিছু বলেনি। বকালি কোথা থেকে এই ঘটনা জেনেছে তারা বুঝতে পারছে না।

সান বলল, অ্যাপালো এ ব্যাপারে কিছু বলেনি।

বকালি বলল, অ্যাপালোকে জিগ্যেস করা হোক ঘটনা সত্য কি না।

অ্যাপালো বলল, ঘটনা সত্য। তবে এটা নিতান্তই ভুল বোঝাবুঝি ছিল। তারা আমার বন্ধু।

জিগসা নামে একজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে সকলের কথা শুনছিল। এমনিতে সে ভীষণ শান্ত মানুষ। আচমকা রেগেমেগে অস্থির হয়ে গেল। লাফাতে লাফাতে বলল, অ্যাপালো আমাদের ভুল বোঝাচ্ছে। সে আগে ছত্রপাড়ায় ছিল। এখনও ছত্রপাড়ার হয়ে কাজ করছে। সে একটা আস্ত গুপ্তচর। আমাদের কথা গিয়ে ছত্রপাড়ায় জানিয়ে দেবে। তাকে গাছের সাথে বেঁধে পেটানো হোক।

গরুর গায়ে মশা কামড়ালে গরু যেমন পা ছুড়ে লাফাতে থাকে  জিগসাকে সেরকম দেখাচ্ছে।

শাওনি বলল, তোমরা আবার ভুল করছ। তোমাদের ভেতর অবিশ^াস তৈরি হয়েছে। তোমরা আগে কখনও কাউকে অবিশ^াস করোনি। এখন কেন করছ ?

বকালির মাথা থেকে চাপ চলে গেছে। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। বকালি সরল মুখে বলল, কেন তাকে অবিশ^াস করছি জানি না। তবে মনে হলো।

জিগসা আবার শান্ত হয়ে আগের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে কিছুক্ষণ আগে অদ্ভুতভাবে লাফাচ্ছিল।

শাওনি বলল, এখনও কি তোমার অ্যাপালোকে অবিশ^াস হচ্ছে ?

বকালি টেনে টেনে বলল, এখন আর তাকে আমার অবিশ^াস হচ্ছে না।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে টেবিলের ওপর কিল দিয়ে রয়েল বলল, ব্রেইন থেকে প্রেশার তুলে নিতে কে বলল ?

পাঞ্জু বলল, তাদের ব্রেইনের ওপর অধিক প্রেশার দিয়েও এখন আর কোনও কাজ হচ্ছে না। তাদের ব্রেইন সার্কিট নিজে থেকে কাজ করতে শুরু করেছে। আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারাচ্ছি।

একসাথে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কয়েকজনের দীর্ঘশ^াস ফেলার শব্দ পাওয়া গেল। যারা হতাশ হয়ে দীর্ঘশ^াস ফেলেছে কুক তাদের ভেতর একজন।

সান বলল, তাহলে আমরা সাদা পতাকা তুলতে পারি ? 

রাজি হলো মিকাওপাড়ার সকলে। তারা তাদের পাড়ায় বিশাল আকারের সাদা পতাকা উড়িয়ে দিল।

বিজ্ঞান একাডেমির বানানো শহর মেগালোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বিজ্ঞানী, গবেষক, টেকনিশিয়ানরা অবাক হয়ে দেখল তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে মিকাওপাড়ায় সাদা পতাকা উড়ছে। সাদা পতাকার অর্থ হচ্ছে তারা মারামারি চায় না। তারা বন্ধুত্ব চায়।

১৬.

রোবট-মানবদের সংগঠিত হওয়া

মেগালো শহরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ঝিমুনি ভাব দেখা দিয়েছে। তারা সবাই ঝিমুচ্ছে। বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালক মিল্করাইচ সকালে মেগালো শহর প্রজেক্টের সঙ্গে যারা কাজ করছে তাদের সকলের কাছে মেসেজ পাঠিয়েছেন।

তিনি লিখেছেন, যদি হানাহানি প্রকল্পের লক্ষ্য হয় তাহলে প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হবে।

এই মেসেজ আসার পরপরই মিস্টার ডার্কব্রাউন এসে মেগালো শহরের রোবট-মানবদের ওপর থেকে সবধরনের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

কেউ কেউ সেটা মানতে রাজি হয়নি। গোপনে মেগালো শহরের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছে। অনেকে আবার তার বিরোধিতা করেছে। তারা বলেছে এটা করা ঠিক হবে না।

ডেভিড বলল, এ পৃথিবী থেকে মানুষ একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তারা নিশ্চিহ্ন হবে তাদের বোকামির জন্য। পৃথিবী শাসন করবে কীটপতঙ্গ।

কুক বলল, আমরা কি আবার ভেবে দেখব কোথাও ভুল হচ্ছে কি না ? প্রয়োজনে মিস্টার ডার্কব্রাউনের সঙ্গে কথা বলব। তিনি মিল্করাইচকে জানাবেন আমরা কী ভাবছি।

নিতা বলল, বিজ্ঞান একাডেমির সিদ্ধান্ত আমাদের মেনে নেওয়া উচিত।

খামি বলল, প্রয়োজনে আমরা মেগালো শহর নিয়ে নতুন কোনও পরিকল্পনা করতে পারি। সেটা বিজ্ঞান একাডেমির সামনে উপস্থাপন করব তাদের মতামতের জন্য।

ঘরের ভেতর কেমন গুমোট ভাব। কেউ কোনও কথা বলছে না। মেগালো শহরের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। তাই মেগালো শহরের ব্যাপারে কারও কোনও আগ্রহ নেই। তারা কেউ মনিটরের দিকে তাকাচ্ছে না। দেখছে না মেগালো শহরে কী হচ্ছে এখন।

মর্গান আর রেড একসঙ্গে বলে উঠল, এটা অসম্ভব। এটা হতে পারে না।

মর্গান বলল, কিছু একটা করা দরকার।

কুক বলল, চলো আমরা মিস্টার ডার্কব্রাউনকে বুঝিয়ে বলি।

 মর্গান, রেড, ডেভিড, পাঞ্জু, রয়েল, পিলাও, মালাই সকলেই রাজি হলো। তারা গেল মিস্টার ডার্কব্রাউনের কাছে।

মিস্টার ডার্কব্রাউনকে দেখে মনে হলো তিনি আছেন অশেষ প্রশান্তির ভেতর। তার চোখমুখে প্রশান্ত ভাব। তিনি অলস ভঙ্গিতে আধশোয়া হয়ে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। নীল ঝকঝকে আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে। তাতে রোদ্দুর পড়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে সাদা মেঘের বাগান ভেসে যাচ্ছে।

দলবল নিয়ে কুক ঘরে ঢুকে তাদের দাবি জানাল। মিস্টার ডার্কব্রাউন সব শুনলেন। তাতে তার প্রশান্ত ভাবের একটুও ব্যাঘাত ঘটল না। তাকে আগের মতোই প্রশান্ত দেখাচ্ছে। তিনি কিসে এতটা শান্তি বোধ করছেন তা বোঝা গেল না।

মিস্টার ডার্কব্রাউন তখুনি মিল্করাইচের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। মিল্করাইচ কথা বললেন বিজ্ঞান একাডেমির কয়েকজন পরিচালক, বিজ্ঞানী আর গবেষকের সঙ্গে।

মেগালো শহরের ব্যাপারে বিজ্ঞান একাডেমির সিদ্ধান্ত জানা গেছে। হানাহানির চিন্তা বাদ দিতে হবে। মেগালো শহরের রোবটদের স্বার্থ রক্ষা হয় এমন কিছুতে বিজ্ঞান একাডেমি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

এই সিদ্ধান্তে কুকরা খুশি মনে হলো। কোনও রকম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, সেখান থেকে অন্তত কিছু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে সেটা ভালো।

তারা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ফিরে এসে মনিটরের দিকে তাকাল। 

বিজ্ঞান একাডেমির মেগালো শহর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সবাই ঘটনা দেখে হতভম্ব হয়ে গেছে। তাদের ভেতর অস্থির ভাব চলে এসেছে। তারা আবারও রোবট-মানবদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল। নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। মেগালো শহরে রোবট-মানবরা নিজের মতো আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছে।

সাদা পতাকা দেখে উল্লাস করতে করতে রাস্তায় বের হয়ে এসেছে ছত্রপাড়ার রোবট-মানব। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মিকাওপাড়ার সকলে। তারা শাওনিকে নিয়ে আনন্দ করছে। তাদের সঙ্গে এসেছে শহরের অন্যান্য পাড়ার রোবট-মানবরা।

পিলাউ বলল, এখনই রক্ষী রোবট পাঠিয়ে তাদের শায়েস্তা করা দরকার।

নিতা বলল, হানাহানি করা যাবে না।

পিলাউ বলল, তারা যেভাবে উল্লাস করছে তাতে যেকোনও সময় বড়ো রকমের কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাই তাদের স্বার্থে শান্তি রক্ষার প্রয়োজনে আমি রক্ষী রোবট প্রেরণের কথা বলেছি।

ডেভিড বলল, অতি আনন্দ উচ্ছ্বাস বিপদ ডেকে আনতে পারে। অবশ্যই তাদের দমন করা উচিত।

মালাই বলল, এখুনি কিছু করা ঠিক হবে না। তারা কী করতে চাইছে সেটা আমাদের দেখা দরকার।

মর্গান বলল, সমস্ত প্ল্যান ভেস্তে যাবে। আমাদের এক্সপেরিমেন্ট মার খাবে।

জেমি বলল, নতুন কোনও একটা ফলাফল দাঁড়াবে। সেই ফলাফল গবেষণার অংশ হয়ে থাকবে।

রেড বলল, আমরা বড়ো বেশি ঝুঁকি নিচ্ছি।

কুক বলল, ঝুঁকি না নিলে নতুন কিছু পাওয়া যায় না।

সবাই চুপ করে গেল। আর কেউ কোনও কথা বলল না। কুকের মাথায় নতুন চিন্তা এসেছে। সে সংকটময় মুহূর্তে রোবট-মানবদের চিন্তাভাবনার গতিপ্রকৃতি বুঝতে চাইছে। নিজেরা চিন্তাভাবনা করে কীভাবে সংকট মোকাবিলা করে সেটা তার জানা দরকার বলে মনে হচ্ছে। এখন তাদের বাধা না দিলে তারা নিজের মতো করে ভাবতে পারবে।    

সুরাত আর সান শহরের সব পাড়ার মানুষদের একজায়গায় ডেকেছে। সান বলল, মাঝেমধ্যে আমরা নিজেদের ভেতর মারামারি করি। কেন করি জানি না। কেউ কারও ক্ষতি করে না তবু মারামারি করি। মারামারি করার পর আমাদের ক্ষতি হয়ে যায়।

সুরাত বলল, কোনো খারাপ ঘটনা ঘটলে আমরা নিজেদের ভেতর আলাপ আলোচনা করে সেটা মেটানোর চেষ্টা না করে প্রথমেই অন্যকে আঘাত করে বসি। এটা তো ভালো না। আমার সবাই একসঙ্গে আনন্দ উৎসব করি না, খেলাধুলা করি না। নিজেদের মতো করে ভাবতেই পারি না।

সান বলল, অথচ অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এ শহর থেকে যখন আমরা বাইরে যাই তখন সবাই নিজের মতো করে ভাবতে পারি। যখন শহরে থাকি তখন মনে হয় আমি যেন অন্য কেউ। অন্য কারও দেহ বয়ে বেড়াচ্ছি আমি, অন্য কারও ভাবনা ভাবছি।

সকলে একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছে। তাদের সকলের এরকম ঘটনা ঘটে। তারা সানের কথা মেনে নিয়েছে।

সুরাত তখন শাওনির সঙ্গে ওদের পরিচয় করিয়ে দিল। শাওনি বলল, তোমাদের একত্রিত হতে হবে। সবাই মিলে খুঁজে বের করতে হবে কেমন করে এ শহর থেকে বের হওয়া যায়। এ বনের বাইরে, চাইতু গ্রামের পাশে তোমরা নতুন গ্রাম বানিয়ে নেবে।

মেগালো গ্রামের সবাই শাওনির সঙ্গে একমত হলো। তবে শহর থেকে বেরুনো সহজ হলো না। রক্ষীদল এসে তাদের ঘিরে ফেলল। কয়েকজনকে ধরে নির্মমভাবে নির্যাতন করল।

 মেগালো শহরে রক্ষীদল দিয়ে রোবট-মানবদের নির্যাতন করার কথা মিস্টার ডার্কব্রাউন জেনে গেলেন। তিনি বিজ্ঞান একাডেমি থেকে রক্ষী রোবটদের ওপর হালকা নিয়ন্ত্রণ রেখে মেগালো শহরের রোবট-মানবদের নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা পুরোপুরি অকেজো করে দিলেন।

বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ মেগালো শহরের রোবট-মানবদের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল। তারা আর কিছুতেই রোবট-মানবদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। রোবট-মানবরা সকলে একত্রিত হয়ে গেছে। তারা নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করছে। তারা আর এ শহরে থাকতে চাইছে না।

বিজ্ঞান একাডেমির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে রেড, মর্গান, রয়েল, পাঞ্জু, খামি সবাই মিলে রক্ষীদল দিয়ে রোবট-মানবদের দমন করতে চাইল। তাতে অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে গেল। রোবট-মানবরা খেপে গেল। তারা রক্ষীদলের এক একজনকে ধরে অকেজো করে দিতে থাকল।

পাঞ্জু বলল, শহরের প্রধান ফটক বন্ধ করে দাও। যেন শহর থেকে কেউ বেরুতে না পারে।

মর্গান মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, তুমি ভুলে গেছ, মেগালো শহরের প্রধান ফটক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বিজ্ঞান একাডেমি আমাদের দেয়নি। সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে রক্ষী রোবটদের।

পাঞ্জু হুস করে দম ছেড়ে গা এলিয়ে দিয়ে বসে পড়ল।

মালাই বলল, কেউ যখন স্বাধীনভাবে চিন্তা করে তখন তাকে দমিয়ে রাখা যায় না।

ডেভিড বলল, তাহলে কি আমরা হেরে যাচ্ছি ?

জেমি বলল, আমরা হেরে যাচ্ছি না, আমরা শিখছি। মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ আর মর্যাদা।

একদল রোবট-মানব রক্ষীদলের কয়েকজনকে নিয়ে গিয়ে শহরের সদর দরজা খুলে ফেলল। রক্ষী রোবটদেরও এখন আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অতিরিক্ত চাপে তাদের সার্কিট দুর্বল হয়ে গেছে। কিছু সার্কিট পুড়ে গেছে। তারা আর কোনও কাজ করছে না।

১৭.

মুক্ত রোবট-মানব

মেগালো শহরের চারপাশ থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে। আওয়াজ এসে পৌঁছেছে বাবুতি গ্রামে। বামবুতিরা আর চাইতু গ্রাম থেকে যারা এসেছে তারা ছুটে এসে হ্রদের পাড়ে বনের ভেতর থমকে দাঁড়াল।

বামবুতিদের ভেতর অদ্ভুত বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। তারা ভেবেছিল শহর থেকে হইহই করে মানুষ বের হয়ে আসছে বাবুতি গ্রামে আক্রমণ করার জন্য। আগে যেমন এসেছে।

তারা অবাক হয়ে দেখল শহরের সদর দরজা খুলে গেছে। সদর দরজা দিয়ে শহরের মানুষ বেরিয়ে আসছে। তারা আনন্দ করছে। হাসাহাসি করছে, নাচানাচি করছে।

শাওনির বাবা-মা, চাইতু আর বাবুতি গ্রামের মানুষ শাওনির ফিরে আসার প্রতীক্ষায় থাকল। তাদের মনে হচ্ছে শাওনি ফিরবে।

সকলে দেখল শহরের সদর দরজা দিয়ে শাওনি বের হয়ে আসছে। তার মুখ হাসিহাসি। শহরের মানুষজন তাকে মাথায় করে নিয়ে আসছে।

গিমি ছুটে গেল অ্যারোব্রিজের ওপর দিয়ে। তার পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে হুয়া। তারা যাচ্ছে শাওনির কাছে। আবিওলা আছে তাদের সাথে।

শাওনিকে সাথে নিয়ে গিমি আর হুয়া আর আবিওলা ফিরে এল।

অ্যারোব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আছে শাওনির বাবা আর মা। তাদের সাথে বামবুতিরা। 

শাওনি ছুটে এসে বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরল। গ্রামের মানুষজন শাওনিকে কাছে পেয়ে অনেক আদর করল। বামবুতিরা আদর করল।

হাতির ডাক শোনা যাচ্ছে। শাওনি তাকিয়ে দেখল শহরের দেয়ালের পাশে হাতি দাঁড়িয়ে আছে। হাতির গলায় পেঁচানো লম্বা লতার মালা। শাওনি তার হাতিকে চিনতে পেরেছে। এই মালা সে হাতির গলায় পরিয়ে দিয়েছিল। শাওনি ছুটে হাতির কাছে চলে গেল।

হাতি শুঁড় উঁচু করে দুই হাঁটু মুড়ে শাওনির সামনে বসে পড়ল। শাওনি শুঁড় বেয়ে হাতির পিঠে চড়ে বসল। শাওনিকে পিঠে নিয়ে হাতি অ্যারোব্রিজ পেরিয়ে রওনা হলো বাবুতি গ্রামের দিকে। তাদের পেছনে সারবেধে এল মেগালো শহরের রোবট-মানবরা।

বামবুতিরা মানুষজন বাজনা বাজাচ্ছে। আনন্দের বাজনা। তাদের কাছে যে বাজনা বাজানোর কত রকমের যন্ত্র আছে তা অনেকেরই এতদিন অজানা ছিল। তারা বাজনার সব যন্ত্র বের করে এনেছে। বাজনার আওয়াজে পুরো বন উল্লসিত হয়ে উঠেছে। গাছে গাছে পাখি, বানর, উল্লুক- তারাও আনন্দে মেতেছে।

বাহুট আবাসে বসে আছেন জিউ। তার সামনে কোজো, মাহতা, সুরাত, সান, আদে, কায়কুয়া, আবিওলা, হিমবা, বানমি, তামালা, আরও অনেকে গোল হয়ে বসে আছে।

রোবট মানবরা খেয়াল করল বামবুতিদের ভাষা তাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। আবার চাইতু গ্রামের মানুষের কথাও তারা বুঝতে পারছে। দুরকম ভাষাতে তারা কথাও বলতে পারছে। শুধু মাহতাকে দরকার হচ্ছে বামবুতিদের ভাষা চাইতু গ্রামের মানুষদের বুঝিয়ে দিতে।

সান বলল, আমরা জানি না কেন তোমাদের সঙ্গে মারামারি করেছি। আমরা নিজেরা কেন মারামারি করতাম তাও জানি না। আমরা মারামারি করতে চাইনি। তবু কেন জানি করতাম। মনে হতো আমরা মারামারি করছি না। আমাদের দিয়ে কেউ মারামারি করিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু কে আমাদের দিয়ে মারামারি করিয়ে নিচ্ছে, কেন আমাদের ভেতর মারামারি বাধিয়ে রাখছে সেটা বুঝতে পারিনি।

সুরাত বলল, শাওনি গিয়ে আমাদের সেই কথাটা বোঝালো। ছোট্ট মেয়ে কিন্তু তার অনেক বুদ্ধি। আমরা তখন বুঝলাম বৃথা মারামারি করছি।

জিউ বললেন, কেউ যখন অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তখন সে যাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তাদের ভেতর গণ্ডগোল বাধিয়ে রাখে। তাতে তারা একজোট হতে পারে না। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।

সান বলল, কে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ?

জিউ বললেন, আমি কখনও আপনাদের শহরে যাইনি। আপনারাও আর সেখানে ফিরে যাবেন না বলছেন। তাহলে সে ব্যাপার নিয়ে না ভাবলেও চলবে।

সুরাত বলল, আমরা আপনাদের কাছাকাছি কোথাও থেকে যেতে চাই।

কোজো বলল, আমাদের সঙ্গে যাবে। শাওনি তাদের নিয়ে যেতে চায়।

সিদ্ধান্ত হলো তারা কোনওদিন নিজেদের ভেতর মারামারি করবে না। সকলে মিলেমিশে আনন্দে থাকবে।

হাতির পিঠে চড়ে শাওনি যাচ্ছে চাইতু গ্রামে। সঙ্গে যাচ্ছে চাইতু গ্রামের মানুষ আর রোবট-মানবরা। বাবুতি গ্রামের মানুষরা যাচ্ছে বাদ্যবাজনা বাজিয়ে তাদের এগিয়ে দিতে।

১৮.

গ্রামের নাম বানতু

চাইতু গ্রামের পাশে রোবট-মানবরা নতুন এক গ্রাম বানিয়েছে। তারা সেই গ্রামের নাম দিয়েছে বানতু। ওদের ভাষায় বানতু অর্থ হচ্ছে সুন্দর চোখ।

কিভু হ্রদ থেকে অনেকখানি উত্তরের দিকে গেলে এখনও দেখা যায় বনের পাশে চৈতি নদীর ধারে চাইতু আর বানতু পাশাপাশি দুটো গ্রাম।

বিজ্ঞান একাডেমির বানানো শহর মেগালো খাঁ খাঁ করছে। সেখানে কেউ নেই। কিসের যেন ভয়ে সেই শহরে কোনও মানুষ ঢোকে না।

কিভু হ্রদের ওপর কঙ্কালের মতো অ্যারোব্রিজ ভেসে আছে। অ্যারোব্রিজ পার হয়ে কেউ মেগালো শহরের দিকে যায় না। যাওয়া যায় না। ব্রিজের এখানে ওখানে নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ মেরামত করেনি।

 মেগালো শহর এখন অভিশপ্ত নগরী হিসেবে পরিচিত হয়েছে। কিসের অভিশাপে এই শহর এমন খাঁ খাঁ করছে, এতদিন পর তা আর কেউ বলতে পারে না।

মেগালো শহর প্রজেক্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যে নোট লিখে মেগালো শহর প্রজেক্ট বন্ধ করা হয় সেখানে বিজ্ঞান একাডেমি তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালক মিল্করাইচের স্বাক্ষর করা নোটে লেখা আছে, কেউ যখন নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে তখন প্রথমে সে চায় স্বাধীনতা। মুক্ত পরিবেশে নিজের মতো করে বাঁচতে চায়। আগামী দিনের পৃথিবীর মানুষ কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। মানুষ বাঁচবে সম্মান আর মর্যাদা নিয়ে। 

লেখক : বিজ্ঞান লেখক 

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares