মোহিত কামাল: সাফল্যের চন্দন রোশনি  : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

২০১৮ : বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাশিল্পীর সাহিত্যকর্ম

মোহিত কামাল

[কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের জন্ম  ১৯৬০ সালের ০২ জানুয়ারি  চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়।

তাঁর বাবার নাম আসাদুল হক এবং মায়ের নাম মাসুদা খাতুন। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম ও খালিশপুর, খুলনায়। বর্তমান নিবাস ধানমন্ডি, ঢাকা। স্ত্রী মাহফুজা আখতার মিলি, সন্তান মাহবুব ময়ূখ রিশাদ, পুত্রবধূ ইফফাত ইসলাম খান রুম্পা ও জিদনি ময়ূখ স্বচ্ছকে নিয়ে তাঁর সংসার। চার ভাই এক বোনের মধ্যে চতুর্থ সন্তান তিনি। তাঁর অ্যাফিডেভিট করা লেখক-নাম  মোহিত কামাল। তিনি সম্পাদনা করছেন শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ, সাহিত্য-সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকা শব্দঘর। তাঁর লেখালেখির মুখ্য বিষয় : উপন্যাস ও গল্প; শিশুসাহিত্য রচনার পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণাধর্মী রচনা। লেখকের উড়াল বালক কিশোর উপন্যাসটি স্কলাস্টিকা স্কুলের গ্রেড সেভেনের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে; ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি (ঝঊছঅঊচ)  কর্তৃকও নির্বাচিত হয়েছে।  এ পর্যন্ত প্রকাশিত কথাসাহিত্য ৩৭ (উপন্যাস ২৪, গল্পগ্রন্থ ১৩)। এ ছাড়া কিশোর উপন্যাস (১১টি) ও অন্যান্য গ্রন্থ মিলে বইয়ের সংখ্যা ৫৫।

জাতীয় পুরস্কার : কথাসাহিত্যে অবদান রাখার জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০১৮), অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার ১৪১৮ বঙ্গাব্দ (২০১২) অর্জন করেছেন।

তাঁর ঝুলিতে রয়েছে অন্যান্য পুরস্কারও; হ্যাঁ (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০২০) উপন্যাসটি পেয়েছে সমরেশ বসু সাহিত্য পুরস্কার (২০২০)। পথভ্রষ্ট ঘূর্ণির কৃষ্ণগহ্বর (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০১৪) উপন্যাসটি পেয়েছে সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার (২০১৪)। সুখপাখি আগুনডানা (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০০৮) উপন্যাসটি পেয়েছে এ-ওয়ান টেলিমিডিয়া স্বাধীনতা অ্যাওয়ার্ড ২০০৮ এবং বেগম রোকেয়া সম্মাননা পদক ২০০৮―সাপ্তাহিক দি নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস-প্রদত্ত। না (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০০৯) উপন্যাসটি পেয়েছে স্বাধীনতা সংসদ নববর্ষ পুরস্কার ১৪১৫। চেনা বন্ধু অচেনা পথ (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০১০) উপন্যাসটি পেয়েছে ময়মনসিংহ সংস্কৃতি পুরস্কার ১৪১৬।

কিশোর উপন্যাস উড়াল বালক (রোদেলা প্রকাশনী, ২০১২; অনিন্দ্য প্রকাশ, ২০১৬) গ্রন্থটি ২০১২ সালে পেয়েছে

এম নুরুল কাদের ফাউন্ডেশন শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১২)।]

 পেশায় মনোচিকিৎসক, অধ্যাপক- মনোশিক্ষাবিদ; সাবেক হেড অব সাইকোথেরাপি ও একাডেমিক কোর্স ডিরেক্টর, সাবেক পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা—তিনি মোহিত কামাল। চিকিৎসক হিসেবে গুরু দায়িত্ব পালন করলেও সেসব ছাপিয়ে বড় পরিচয়ের জায়গাটি তিনি নির্মাণ করেছেন কথাসাহিত্যিক হিসেবে। তাঁর জীবনী পাঠ করে জানা যায় যে, তিনি কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার পরিচালক রোকনুজ্জামান দাদাভাইয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই নিজের মনোভূমিতে লেখক হওয়ার স্বপ্নের চারা রোপণ করেন। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ নবাঙ্কুর কচি-কাঁচার মেলার সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপিত হয় শৈশব থেকেই। ক্রমে সেই স্বপ্নের চারাগাছটি এখন মহীরূহে রূপ লাভ করেছে। তবে জন্মস্থান সন্দ্বীপকে নিয়ে লেখা তাঁর প্রথম গল্প ‘চারপাশ যখন ভাঙতে থাকে’ লিখেছেন ১৯৮৬ সনে। প্রথম গল্পগ্রন্থ কাছের তুমি দূরের তুমি প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে সময় প্রকাশন থেকে। এরপর থেকেই তিনি সাহিত্যের নিরলস ও কঠোর পরিশ্রমী লেখক হিসেবে লিখে যাচ্ছেন বিরামহীনভাবে। তাঁর যাপিত জীবন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, নিষ্ঠাবান, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকেও একই পেন্ডুলামে বেঁধে নিয়েছেন, ফলে প্রধান পেশা অর্থাৎ চিকিৎসক হিসেবে যেমন সুনামের সঙ্গে কাজ করে সাফল্য অর্জন করেছেন ঠিক তেমনি শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাঁর সাফল্য কোথাও থেমে থাকেনি। তিনি সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন; প্রথম আলোর মাদকবিরোধী আন্দোলনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য; ‘প্রবাল কচি-কাঁচার মেলা’র সাবেক পরিচালক।

সাহিত্যচর্চায় নিরন্তর নিজেকে নিমগ্ন রেখে চলেছেন। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ধানমন্ডিতে তার বর্তমান স্থায়ী বসবাস। এফিডেফিট করা তাঁর লেখক-নাম মোহিত কামাল। কথাসাহিত্যের প্রতি নিরন্তর ভালোবাসা ও একাগ্রতার আকর্ষণে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শব্দঘর নামে একটি মাসিক সাহিত্যপত্রিকা, পালন করছেন সম্পাদনার মতো গুরু দায়িত্ব। কঠোর পরিশ্রমী, অধ্যবসায়ী, সদালাপী, নিরংহকারী, মিশুক ও হাসিখুশি মোহিত কামাল নিজ পেশার পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনেও দাপটের সঙ্গে দুহাতে সৃষ্টি করছেন জটিল রসায়নের গল্প ও উপন্যাস। তাঁর লেখার বেসিক ফাউন্ডেশন হলো চরিত্রের মধ্যে সাইকোলজিক্যাল কেমিস্ট্রি এবং ইন্টার‌্যাকশন। সাহিত্যে চরিত্র চিত্রিত হয় মূলত মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে। কাহিনির বয়ান এবং মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও উত্তরণের ভিত্তিতে কোনো সাহিত্যের মানও নির্ভর করে। মোহিত কামাল এক্ষেত্রে সাফল্যের সাক্ষর রেখে যাচ্ছেন তাঁর অসংখ্য লেখায়। তাঁর লেখার আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো টিনএজাদের জীবনাচারে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও পরিণতি। পরিশ্রমী এই কথাসাহিত্যিক সাহিত্যকর্মের জন্য অর্জনও করেছেন বাংলা একাডেমির পুরস্কারসহ ডজনখানেক মর্যাদাসম্পন্ন সাহিত্যপুরস্কার।

লেখালেখিকে প্রধান পেশা এবং রুটি-রুজির প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করে বর্তমান প্রতিযোগিতার পুঁজিবাদী বিশে^ বেঁচে থাকার সাহস খুব কম মানুষের রাজতিলক পরার সুযোগ হয়। অধিকাংশ লেখকেরই লেখালেখির জগৎ হয়ে থাকে পেশা নয়, নেশার আফিম। ব্যক্তি মোহিত কামালও পেশায় চিকিৎসক, কিন্তু লেখালেখি তার নেশার ঘোরলাগা জমিন। চিকিৎসকের পেশায় এমন অনেক খ্যাতিমান লেখক রয়েছেন যারা নিজ প্রতিভায় সাহিত্যাঙ্গনে দীপ্তি ছড়িয়েছেন ও ছড়াচ্ছেন এমন অনেক লেখকের নাম উল্লেখ করার মতো যেমনÑরুশ কথাসাহিত্যিক আন্তন চেখভ, উলিয়াম ক্যারলস উইলিয়ামস, জন কীটস, আর্থার কোনান ডোয়েল, মিখাইল বুলগাখভ, খালেদ হোসাইনি, ডব্লিউ সমারসেট মম, ফ্রেডরিখ শিলার, মাইকেল ক্রিচটন, নাওয়াল আস-সাদাবি, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)। বাংলাদেশেও কয়েকজন চিকিৎসক পেশা ছাপিয়ে লেখক হিসেবে অধিকতর পরিচিতি লাভ করেছেন তাঁরা হলেন : আনোয়ারা সৈয়দ হক, শাহাদুজ্জামান, জাকির তালুকদার, মামুন হুসাইন, তসলিমা নাসরিন ও মোহিত কামাল। তরুণ লেখক আশরাফ জুয়েলও চিকিৎসকের পেশা ছাপিয়ে ক্ষুরধার স্বীয় প্রতিভায় লেখক হিসেবে প্রধান পরিচয় লাভ করার চলন্ত সিঁড়িতে আছেন। মাহবুব ময়ূখ রিশাদসহ আরও বেশ তরুণ চিকিৎসক সাহিত্য জগতে এগিয়ে আসছেন। প্রসঙ্গটি এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করার কারণ হলো, অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতীয়মান হয়—মানুষের প্রধান পেশার প্রতি এক ধরনের পারসেপশন তৈরি হলে দ্বিতীয় পেশার কর্মের প্রতি উন্নাসিক ভাব প্রকাশ করে এবং মহৎ কর্মকেও তখন প্রিকনসেপশনের কারণে যথার্থ মূল্যায়ন করতে চায় না বা করলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এখানে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাঁদের মুখ্য পেশা গৌণ। তা কেবলই নেশার আড়ালে এমনভাবে ঢাকা পড়েছে যে কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য তাঁদের পরিচিতি, খ্যাতি, মর্যাদায় এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন যেখানে মুখ্য পেশা সম্পর্কে জানতে হলে তাঁদের জীবনী পাঠ করতে হয়।  

শুধু সাহিত্য নয়Ñযেকোনও শিল্পের সৃষ্টিই হয় সময়কে আশ্রয় করে। অন্য কথায় বলা যায় সময়ও কোনও কোনওভাবে শিল্পীর জন্ম দেয়। যুগে যুগে সংকটময় সময়ে কিংবা সুসময়ে মানুষের চেতনার পারিপাশির্^ক রূপকারই শিল্পী এবং তাঁদের তীক্ষè পর্যবেক্ষণ, মায়াবী অনুভূতি প্রকাশ করেই কালের ইতিহাসে সৃষ্টি করেন শিল্প। এই শিল্পের ফরমেট হতে পারে বিভিন্ন যেখানে সাহিত্য অবশ্যই একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কারণ লেখক উপলব্ধি করতে শেখেন তার চারপাশের জগতকে আশ্রয় করেই এবং জীবনের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতাই লেখার অন্যতম প্রধান উপাদান। লেখকের গভীর ও প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, তীক্ষè অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে দেখা সমাজ ও মানুষকে শিল্পের ঘষামাজার কাজ করেন কল্পনার রঙে। চারপাশের ইমেজ লেখক ধারণ করেন, তিনি জারিত হন নিজের এবং অন্যের আবেগ ও অনুভূতিতে যা শিল্পের প্রধান উপাদান হতে পারে। পৃথিবীর মহৎ সাহিত্যগুলোর গভীর অনুসন্ধান করলে লেখকের কমবেশি অভিজ্ঞতার ছাপ পাওয়া যায়—সন্দেহ নেই।

সাহিত্য স্বপ্নদ্রষ্টা মোহিত কামাল যে আপসহীনভাবে কোমর বেঁধেই এই প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছেন এর প্রমাণ মেলে লেখালেখি, সাংগঠনিক ও সম্পাদনার কাজের মাধ্যমে। তার চেয়ে একটি বড়ো গোপন সত্য হলো লেখক হওয়ার স্বপ্নে পারিবারিক নাম পরির্তন করে  আসল নামের পাশাপাশি সহজে মনে রাখার মতো, সহজে উচ্চারণ করার মতো এবং গতিশীল দুটি শব্দে ‘মোহিত কামাল’ নামটি এফিডেবিট করে ধারণ করে সাহিত্যাঙ্গনে বিচরণ করছেন। পারিবারিক নাম পরিবর্তন করে লেখক নামে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইতিহাস অনেক পুরোনো। মার্ক টোয়েন, ম্যাক্সিম গোর্কি, তলস্তয়, বনফুল এমনকি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দালিলিক নাম বাদ দিয়ে ‘মানিক’ নামেই লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নাম পরিবর্তনের ইতিহাসে বাংলাদেশে আরও অনেক রয়েছে যাঁদের সঙ্গে যুক্ত হলেন মোহিত কামাল, মামুন হুসাইনও। এতেই প্রমাণ করে তাঁরা সাহিত্যাঙ্গনে এসেছেন সৃষ্টির অদম্য নেশায় এবং সাহিত্যকে ঋদ্ধ করার প্রবল আত্মবিশ^াসও এতে প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে স্থানিক অর্থাৎ উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে স্থান বা অঞ্চল এবং সেই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনাচার, ভাষা ও সংস্কৃতি উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করে তোলে। দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, তারাশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা, হরিশংকর জলদাসের জলপুত্র, দহনকাল, আবুবকর সিদ্দিকের খরাদাহ, সেলিম আল দ্বীনের নাটক বনপাংশুল ও হাত হদাই ইত্যাদি সাহিত্যকর্মে কাহিনির দৃঢ়মূলে রয়েছে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের জীবনাচার ও সংস্কৃতির বিশদ বর্ণনা পাঠককে মুগ্ধ করে। মোহিত কামালের অধিকাংশ সাহিত্যকর্মের পাত্রপাত্রীর স্থান নগরকেন্দ্রিক, বিশেষ করে ঢাকা শহরের মানুষের জীবনাচার ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট বিধৃত হয়েছে। উপন্যাসের আঙ্গিক ও কাহিনি দুটি বিষয়ই উপন্যাসকে মহান সাহিত্যে রূপ দিতে পারে তা যেমন সত্য আবার আঙ্গিককে খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে কাহিনিও অনেক সময় উপন্যাস, মহৎ সাহিত্য হতে পারে। কোন সাহিত্যকর্ম কালের প্রবাহে মহান ও টিকে থাকার সংগ্রামে জয়ী হবে তা নির্ভর করে ঔপনাসিকের শিল্পচেতনা ও শিল্পনিপুণতার ওপর। কোনও কোনও কাহিনিও পাঠকের মনে দাগ কাটে এবং কালের প্রবাহে সেই চরিত্রগুলো মানুষের মনে স্থান করে নেয়। মোহিত কামালের অধিকাংশ কথাসাহিত্যে কাহিনি যতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্থান পেয়েছে আঞ্চলিকতা ততটা গুরুত্ব না পেলেও একেবারে গুরুত্বহীনও বলার সুযোগ নেই। মরুঝড় উপন্যাসে মধ্যপ্রাচ্যকে উপন্যাসের প্রেক্ষাপটের বর্ণনায় পাঠকের সে ভুল ভাঙবে যা নিঃসন্দেহ। অন্যদিকে চন্দন রোশনিতেও বিশেষ অঞ্চল অতিক্রম করে মহাজগতের সঙ্গে একটি নিপুণ যোগসূত্র স্থাপনে তিনি সফল হয়েছেন। তবে একটি কথা অনিবার্যভাবে সত্য যে, কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয় ‘মানুষ’। অনিবার্যভাবেই সত্য যে, মানুষ ছাড়া কথাসাহিত্যের মূল অনুষঙ্গ আর কিছু হতে পারে না। তবে তিনি মানুষের ভেতর ও বাইরের রূপ যেভাবে দেখেন ও উপলব্ধি করেন এবং মানুষের ভেতরের নিগূঢ় সত্যকে যেভাবে উপলব্ধি করে সাহিত্য রচনা করেন তা খুব কম লেখকের পক্ষেই সম্ভব। তাঁর কথাসাহিত্যে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিল বিষয়-আশয়কে বিপুল ঐশ^র্য হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। এর কারণ হতে পারে তার পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং অসংখ্য মানুষের সঙ্গে নিবিড় মিথস্ক্রিয়া। মানুষ ও অমানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তিনি সফলভাবে কাহিনি নির্মাণ করে পাঠকের মধ্যে বিস্তার করেন চুম্বকীয় আবেশ। তিনি হয়তো তার পাঠকের মনস্তত্ত্বও বুঝতে সক্ষম এবং যে কারণে বর্তমান সাহিত্য পাঠককুলের ভাষা, কাহিনির বিন্যাস, শব্দ চয়ন ও পরিণতি সেভাবে তৈরি করতে পারেন বিধায় লেখক হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন।

২.

মোহিত কামালের গ্রন্থ সংখ্যা অনেক (৫৫টি)। তিনি ফিকশন ও নন-ফিকশন লিখলেও ফিকশনেই তার খ্যাতির পরিধি অনেক বিস্তৃত। তাঁর সৃষ্টি বিপুল সাহিত্যসম্ভার নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করা দুঃসাধ্য কাজ হলেও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থের আলোচনা না করে অতৃপ্ত থাকা ও মানসিক যন্ত্রণার কারণ ভেবে কয়েকটি গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে প্রয়াসী হলাম। যেহেতু তিনি পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মন ও মনের বাড়ি মানুষ নিয়েই যাঁর খেলা, লেখা, মনন ও ধ্যানের আরাধ্য বিষয় তাই তাঁর মন উপন্যাস দিয়েই আজকের আলোচনার সূত্রপাত্র করতে চাই।     কথাশিল্পী মোহিত কামালের মন উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে বিদ্যাপ্রকাশ থেকে। এটি পাঠককে বিশেষভাবে মোহিত করে, সমাদৃত হয় অনেক লেখকের কাছেও। সুস্মিতার বাড়ি ফেরা, মরুঝড়, চন্দন রোশনি উপন্যাসগুলোর মতোই এটিও নাটকীয়ভাবে একটি অপ্রত্যাশিত রূঢ় দ্বান্দ্বিক পরিবেশে শুরু হয়। কখনও মনে হতে পারে তাঁর লেখার শুরুটা বুঝি বা ক্লাইমেক্স থেকে। তারপর কাহিনি গড়িয়ে পড়ে ক্লাইমেক্সের পিরামিডের শীর্ষবিন্দু থেকে সমতলের দিকে। এ-রকম দ্বান্দ্বিক পরিবেশ থেকে আখ্যান আরম্ভ করার কৌশল লেখকের নিজস্বতার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানোর অনুষঙ্গের প্রতীতি জন্মায়। লেখকের নিজ আবাসিক এলাকা ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় হওয়াতে মন, সুস্মিতার বাড়ি ফেরা, ও আত্মার বিলাপ তিনটি উপন্যাসেই ধানমন্ডি এলাকার অভিজাত ও ধনাঢ্য পরিবারের ঘটনার প্রেক্ষাপটে রচিত। মন উপন্যাসটি দুটি পর্বে বিস্তৃত হয়েছে সর্বমোট ১৮টি অধ্যায়ে। প্রথম পর্বে ১৩টি পর্ব এবং দ্বিতীয় পর্বে ৫টি অধ্যায়ে বিভাজন করা হয়েছে।

উপন্যাসের শুরুতেই পাঠককে আটকে ফেলেন অমোঘ আকর্ষণে :

‘আমার একার বলে কিছু নেই। যা আছে আমার, সব তোমার। বুঝেছ ?

কথা শেষ করে চট করে ঘুরে দাঁড়াল মীরান। জানালার পর্দা সরিয়ে আকাশ দেখার চেষ্টায় বাইরে তাকাল ও।

ঝিরঝির বৃষ্টি ঝরছে বাইরে, দুদিন ধরে টানা বৃষ্টি ঝরছেই। এ যেন শ্রাবণের কান্না। অথচ কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহ চলছে। প্রকৃতিতে হেমন্তের হিম থাকার কথা, শিশির ঝরার কথা। হিম নেই, শিশির নেই। তবে হিম হয়ে আছে মীরানের ঘরের পরিবেশ। ধোঁয়াটে হয়ে আছে চারপাশ।

চুপ হয়ে আছে কারিনা। ওর মুখে ফুটে আছে কঠিন ভাষা। মন ভরছে না স্বামীর কথায়। ক্ষুব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে শোবার ঘরের দেয়ালের দিকে। বুকের মধ্যে জমাট বেঁধেছে লঘুচাপ।’ 

এর পরের প্যারা থেকেই কাহিনির কেন্দ্রে চলে আসে মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মধ্যে।

‘নতুন অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছে ওরা। কথা ছিল দুজনের নামে রেজিস্ট্রেশন হবে। কথা রাখেনি মীরান। ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন করেছে নিজের নামেই। তাই ক্ষুব্ধ কারিনা।’

তারপরেই

‘চেয়ার থেকে উঠে বাথরুমের সামনে এসে দরজায় সজোরে লাথি মারে কারিনা। ভেজানো দরজা খুলে গেছে এক লাথিতে। পায়ে চোট লেগেছে। সেদিকে খেয়াল নেই। ক্রোধান্ধ গলায় বলল, বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসো। আয়নায় ক্রিমিনাল মুখটা না দেখে আমাকে দেখো। বলো, কথা রাখোনি কেন ?…’

বস্তুত, উপন্যাসের প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই হিপোক্র্যাট মীরান ও ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ কারিনার চরিত্র সম্পর্কে পাঠকের ধারণা পরিষ্কার হয়ে যায় এবং পাঠক পরবর্তী ঘটনা জানার জন্য উপন্যাসের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকে। 

মন উপন্যাসের কাহিনি মূলত ফ্ল্যাটকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে। দাম্পত্যজীবনের পূর্বের মধুময় যাপিত জীবনের অবসান ঘটে নতুন ফ্ল্যাট কেনার পর থেকে। স্বামী মীরানের সঙ্গে স্ত্রী কারিনার নিবিড় বন্ধনের জীবনের দূরত্ব কেবল বাড়তে থাকে যার মূলে রয়েছে ফ্ল্যাটটি মীরানের একার নামে রেজিস্ট্রেশন করার কারণে। কারিনার সঙ্গে মীরানের দাম্পত্যজীবনের শীতল ভূমি রচিত হতে শুরু করে যেখানে দুজন একই ছাদের নিচে বসবাস করলেও দুজন যেন যোজন যোজন মাইল দূরে সরে যেতে থাকে। মীরান কোনও এক কোম্পানির একজন সৎ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং কারিনা অপূর্ব সুন্দরী গৃহিণী। যেদিন তাদের পরিবারে চরম মনোমানিল্যের কারণে কারিনা বাসা থেকে বের হয়ে পাশের বাসায় চলে যায় তখনই গ্রাম থেকে চিকিৎসার জন্য আসা দূর সম্পর্কিত এক চাচা দেবদূতের মতো হাজির হন। যদিও শহরের বাসায় গ্রামের দূর সম্পর্কীয় কোনো আত্মীয় চিকিৎসার জন্য আসা মানেই বিড়ম্বনা ব্যতীত কিছু নয় তদুপরি মীরান চাচাজানের আগমনকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখে। সে ভাবে, চাচার কারণে কারিনার ফুঁসে ওঠা রাগ হয়তো নিভে যেতে পারে। যদিও সাময়িকভাবে কারিনা চক্ষুলজ্জার কারণে চাচার সামনে তার মনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি কিন্তু দুজনের ব্যবধান ঘোচেনি একটুও। তবে চাচাকে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে বাসায় রেখে কারিনা চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করে, মীরানও যতটুকু পারে সহায়তা করে যার ফলে চরিত্র দুটির উদারতা ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায়।

জীবনমুখী পারিবারিক উপন্যাস হিসেবে উপন্যাসের অন্যান্য অনুষঙ্গ বাস্তবসম্মতভাবে প্রতিটি চরিত্র চিত্রিত করা হয়েছে অত্যন্ত দরদ দিয়ে। এই ফ্ল্যাটকে কেন্দ্র করেই ঢাকা শহরের তথা বাংলাদেশের সামগ্রিক রূপও লেখক কৌশলে প্রকাশ করেছেন। কেউ ফ্ল্যাট কিনলেই যে, সহজে পার পেয়ে যাবে তা কী করে হয় ? স্থানীয় মাস্তানরা মীরানকে অনুসরণ করতে থাকে। অন্যান্য দিনের মতো মীরান এক ভোরে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে হাঁটতে যাওয়ার সময় মাস্তানরা তাকে অনুসরণ করে। এই দৃশ্যটি লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে উপস্থাপন করেছেন যা পাঠকের দৃষ্টিতে জীবন্ত মনে হয়। আরেকটি দৃশ্যও পাঠকের মনে জীবন্ত মনে হয়। প্রদোষের স্নিগ্ধ বাতাসে তাপহীন কোমল সূর্যালোকে লেকের পাশ ধরে হাঁটাহাঁটি করে জীবনের জরা-ক্লান্তি বিনাশ করে দেহ ও মনের প্রশান্তির খোঁজে হেঁটে বেড়ায় পৌঢ় বয়সের নর-নারীরা। সেখানে থাকে নানা রকমের মানুষও। এই দৃশ্য যেন পাঠককে মনে করিয়ে দেয় রবিন শর্মার দ্য মঙ্ক হু সোল্ড হিজ ফেরারি উপন্যাসে সন্নাসীরা মহাজাগতিক স্বপ্নে বিভোর হয়ে হিমালয়ের পাদদেশে ভোরের আলোয় অসংখ্য বৃক্ষরাজির মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে অফুরন্ত প্রাণশক্তির প্রয়াসে এবং অনুরূপ একটি দৃশ্য দেখা যায় এ প্রবন্ধ লেখকের জলের লিখন উপন্যাসের চন্দ্রিমা উদ্যানের প্রাণময় জীবনের সন্ধানে কাকডাকা ভোরে বাসা থেকে নেমে আসে অসংখ্য মানুষ। তারা জাগতিক জীবনের মোহে খুঁজে বেড়ায় প্রাণশক্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের দেশে এমন ঐশ^রিক ঐশ^র্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভয়ঙ্কর দুষ্ট মানুষ যারা শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে। মীরানকে কৌশলে ডেকে নিয়ে প্রথম দিন মোবাইল ফোনসেট ও ঘড়িটি রেখে দেয় মাস্তান দলপতি বড়োভাই এবং জানিয়ে দেয় পরবর্তী সময় তাদের খুশি না করলে ছেলেমেয়ে বউ গায়েব হয়ে যেতে পারে। শুরু হয় মীরানের জীবনের আরেক ভয়ঙ্কর অধ্যায়। অবশ্যই পরবর্তী সময় অল্প পরিমাণ টাকা দিয়ে তাদের কবল থেকে মুক্ত হয় মীরান।

মা-বাবার মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও আচরণ শিশুদের উপর নানাভাবে প্রভাব ফেলে তার একটি নমুনা এই উপন্যাসে দেখা যায় মীরান-কারিনা দম্পতির ছেলে রূপকের মধ্যে। যদিও মেয়ে রুনির মধ্যে তেমন কোনও প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। রূপক ছোটবেলা থেকেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে বাবার প্রতি। তার মধ্যে ধারণা জন্মে তার বাবাই খারাপ ও মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। বাসায় বসে যে ছেলে ভিডিও গেমসে আসক্ত ছিল সে একদিন ঘর থেকে বের হয়ে যায়, বাবার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে, বাসায় অশান্তি সৃষ্টি করে মা-বাবাকে ভাবিয়ে তোলে।

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল ফিকশন নির্মাণে টুইস্টিংয়ের একজন অনবদ্য কারিগর। এই উপন্যাসেও নানা জায়গায় টুইস্টিং রয়েছে। তবে একটি ঘটনা হতে পারে আনন্দদায়ক কিন্তু পরিণামে ভয়াবহ রূপ লাভ করে। রুনিকে স্কুলে দিয়ে লেকের পাশে মায়েরা জড়ো হয়, গল্পগুজব করে সময় কাটায়। কিন্তু কারিনার বান্ধবী ডলি বলল, আমরা স্বামীদের চরিত্র পরীক্ষা করব। তারা একজন অন্যজনের স্বামীর ফোন নাম্বার নিয়ে কথা বলবে এবং পরে এখানে এসে সবার উপস্থিতিতে বলবে। মানুষ জীবনকে কত রঙে সাজাতে চায়, কত ঢঙে প্রকাশ করতে চায় তা বলে কি শেষ করা যাবে ? ডলি যদিও এমন আনন্দ করার জন্য ধারণা প্রকাশ করে কিন্তু এই ফাঁদে ধরা পড়ে ডলির স্বামী নাঈম ও কারিনা। কারিনা ডলির কাছে সত্য প্রকাশ না করে বরং মীরানের দূরত্বকে নাঈমের মধ্য দিয়ে পূরণ করা শুরু করে এবং ডলির সঙ্গে নাঈমের দূরত্ব বেড়ে যাওয়াতে পারিবারিক কলহ চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।

মীরানকে ডলি ফোন করে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করলেও হালে পানি পায়নি। তবে মীরানও পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে যায় লাবণ্য নামের এক মেয়ের সঙ্গে। এই প্রেমের সঙ্গে লাবণ্যের এক বন্ধুকে চাকরি দেওয়ার সম্পর্ক ছিল এবং যদি পাঠক শেষ পর্যন্ত পরকীয়ার অশ্লীলতা দেখার জন্য অপেক্ষা করে কিন্তু মীরান কোনো শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়নি। তাদের কেবল ফোনালাপের মধ্যেই নীরিহ গোছের বেচারার প্রেমবন্দি ছিল।

মীরান-কারিনার ছেলে রূপক ক্রমে বেপরোয়া হয়ে পড়ে এবং ঘরে না থেকে এখন বাইরেই বেশি থাকে। লেখাপড়াতেও তার কোনও মনোযোগ নেই বা লেখাপড়া করার কোনও স্বপ্নও সে দেখে না। রূপকের এই আচরণের জন্য মা-বাবা দুজনই অসহায়, তাদের নৈতিক কোনও শক্তি নেই যে ছেলেকে পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। এ-রকম দাম্পত্যকলহের জেরে কিশোরদের প্রতিবাদী হয়ে ওঠার চরিত্র দেখা যায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মানব জমিন উপন্যাসে তৃষার ছেলে সজলের মধ্যে। সজলের ধারণা সে অবৈধ সন্তান যার সত্যতা অবশ্যই আছে। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কাছের মানুষ ইন্দ্রানীর মেয়ে তিথিও যখন বুঝতে পারে সে মায়ের অবৈধ সন্তান তখন প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। বুদ্ধদেব গুহের মাধুকরী উপন্যাসে পৃথুর ছেলেকে প্রতিবাদী হতে দেখা যায়।

এই উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বে রূপক বড় হয়। একদিন ঘটনাচক্রে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে বসে থাকার সময় চলমান গাড়িতে সে দেখতে পায় তার মায়ের কাঁধে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে এক লোক অর্থাৎ নাঈম। সেদিন থেকে রূপক হয়ে ওঠে আরও বেপরোয়া এবং হেরোইন আসক্ত হয়ে পড়ে। রূপককে অবশ্যই উদ্ধার করে তারই গার্লফ্রেন্ড। সব বুঝতে পেরে কারিনা নিজের সিমটি কমোডে ফেলে ফ্ল্যাশ করে দেয়। ওরা ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনে।

৩.          

সুস্মিতার বাড়ি ফেরা উপন্যাসটিও সমকালীন যাপিত জীবনের জীবনমুখী বাস্তবানুগ নাতিদীর্ঘ উপন্যাস। এই উপন্যাসে লেখক সাইবার ক্রাইমের মাধ্যমে একটি মেয়ের জীবন কতটা দুর্বিষহ হতে পারে তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রিত করেছেন। উপন্যাসের শুরুর দিকেই চরম সংকটের আবহ তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময় প্রতিটি পাতায়ই দেখা যায় এই সংকটকে পুঁজি করে সমাজের নানা স্তরের মানুষের রূপ উন্মোচিত হতে থাকে। এ-কথা অনস্বীকার্য যে, সংকটের সময় মানুষের দুই ধরনের চরিত্রই প্রকাশিত হয়—মানবতাবাদী ও স্বার্থান্বেষী। এই উপন্যাসেও সুস্মিতাকে কেন্দ্র করে যখন সংকট তৈরি হলো তখন কেউ তাকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে আবার কেউ তাকে হেয় করার জন্য নিষ্ঠুর কাজে প্রবৃত্ত হয়।

সুস্মিতার বাড়ি ফেরা কাহিনিটি নির্মিত হয়েছে সুস্মিতার কিছু ছবির সুপারইম্পোজ করে রাজিব নামের এক প্রতারক তরুণের প্রতারণাকে কেন্দ্র করে। ঘটনাটি আকস্মিক নয়; বরং বলা যায় লেখক পরিকল্পিতভাবে কাহিনি চরিত্র চিত্রিত করেছেন সহানুভূতি দিয়ে।

“মায়ের অনুমতি পাওয়া নয়, রাজিবের ‘মা’ ‘মা’ ডাক সুস্মিতার অন্তর কাঁপিয়ে দিল। অতর্কিত খুলে গেল বুকের জানালা-দরজা। দেহকোষের প্রতিটি অনুকোষের দ্বারও খুলে গেল। ফাঁকফোকর দিয়ে রাজিব ঢুকে গেল তার গহনে, বিশ্বাস আর ভাল লাগার শেকড় গেড়ে বসল বুকের কন্দরে। মনে হলো কত জন্মে এমন বর প্রত্যাশা করেছিল সে! আরো মনে হতে লাগল জনমভর যেন তাকে চেনে, জনমভর যেন এ-পরিবারেরই একজন হয়ে থাকবে রাজিব। রিং পরানো বাগদত্তা কন্যা মনে হলো না আর নিজেকে, ভাবনার ডানায় উড়তে উড়তে আবিষ্কার করল এ ডানা রাজিবের নয়, এ ডানা জন্ম থেকে নির্ধারিত স্বামী প্রবরেরই ডানা। উড়তে দোষ কি!”

বাগদত্তার সঙ্গে উড়তে দোষ ছিল না যদি সুস্মিতা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারত যে, রাজিব সত্যিকার অর্থে অর্থলোভী ঠক ও ভয়ানক প্রতারক। সুস্মিতাকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে গিয়ে কয়েকটি ছবি তোলে। তারপর ছবিগুলো সুপারইম্পোজ করে নগ্ন ছবি তৈরি করে সুস্মিতার কাছে দশ লাখ টাকা দাবি করে। হুমকি দেওয়া হয় যদি টাকা না দেওয়া হয় তাহলে নগ্ন ছবিগুলো ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে। সুস্মিতা ও তার পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই ছবিগুলো যে প্রকৃত নগ্ন ছবি নয় তা বুঝতে পারে সুস্মিতার ছোটো ভাই সম্ভাবনাময় তরুণ ক্রিকেটার। সে তীব্র প্রতিবাদ করে এবং সাহসের সঙ্গে ঘটনা মোকাবিলা করতে থাকে। সুস্মিতার অনেক বন্ধুও এগিয়ে আসে এই ভুয়া ছবির প্রতিবাদে। কিন্তু পাড়ার মাস্তানরা রাজিবের পরামর্শে সুস্মিতা ও তার বান্ধবীকে কলগার্ল হিসেবে আখ্যায়িত করে চাঁদাবাজি, অপমান, নির্যাতন করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি ভয়ানক রূপ লাভ করলে সুস্মিতার বাবার বন্ধু ও সোহানের প্রেমিকার বাবা এগিয়ে আসেন সাহসের সঙ্গে।

ঘটনার পরম্পরায় র‌্যাবের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে মামলা করা হলে র‌্যাব প্রকৃত প্রতারককে ধরতে সক্ষম হয়। কিন্তু তাতে কতটা রক্ষা হলো ? সুস্মিতার তরুণ ভাই ও পূর্নকথার বাবাকে সন্ত্রাসীরা হত্যা করে :

                “ঝুমকির হাত ঝাকি দিয়ে ছাড়িয়ে পূর্ণকথা দাঁড়াল প্রথম টেবিলের সামনে। উল্লসিত হয়ে বলল, ‘এই যে আমার আব্বু! পেয়েছি আব্বুকে! তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এখানে শুয়ে আছো কেন, আব্বু ? শোয়ার জন্য আর জায়গা পেলে না, তুমি ? তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা দিশেহারা হয়ে গেছি।’

                সুস্মিতা এগিয়ে গেল আরো সামনে। ওই যে, সোহান শুয়ে আছে আরেক টেবিলের ওপর। কাছে গিয়ে তার মুখে হাত বুলিয়ে আদর করে বলল, ‘ওঠো সোহান, চলো। বাড়ি চলো। শোনো, শয়তান রাজিবটা ধরা পড়েছে র‌্যাবের হাতে! নিশ্চয় তুমি খুশি হয়েছো! ওঠো। বাড়ি যাই, চলো।’

                সোহানের খোঁজ না পেয়ে আনটিকে ফোন করেছিল পূর্ণেন্দু। তার কাছ থেকে খবর পেয়ে ছুটতে ছুটতে এ সময় মর্গে ঢুকে পূর্ণেন্দু সুস্মিতার পিছনে দাঁড়িয়ে শুনল সোহানকে বলা আপুর কথা। প্রিয় বন্ধুকে এ অবস্থায় দেখে বেদনায় নীল হয়ে উঠল সে। টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে হাত রাখল বন্ধুর মাথায়। মনে মনে বলল, ‘সোহান তুমি কেবল আমার বন্ধুই নও, তুমিই আমার আইডলÑতুমি দেশের সম্ভাবনাময় সেরা ক্রিকেটার!’”

                নিষ্পাপ সুস্মিতা সম্মান ফিরে পায়, বাড়ি ফেরে কিন্তু বিনিময়ে দুটি প্রাণের বলি হয়। বর্তমানে সমাজবাস্তবতার এই চিত্র আমরা প্রায়ই পত্রপত্রিকায় দেখতে পাই যারা সুস্মিতার মতো শান্ত বিষাদের নদীতে ডুবে থাকে। সমকালীন সমাজ বাস্তবতা নিয়ে লেখক মোহিত কামালের এটিও একটি ভালো উপন্যাস হিসেবে পাঠকের মনে দাগ কেটেছে।

৪.

মরুঝড় ব্যতিক্রমধর্মী উপন্যাসের একটি উদাহরণ এবং তাঁর এই উপন্যাস কল্পকাহিনি হিসেবে উচ্চ মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। মরুঝড় উপন্যাসে পাওয়া যায় ফিকশন নির্মাণের মাধ্যমে লেখক সত্তার প্রকৃত পরিচয়। এই উপন্যাস সন্দেহাতীতভাবে তাঁর এক অনবদ্য সৃষ্টি।

মরুঝড় শুরু হয়েছে দ্বান্দ্বিক আমেজে, দুবাইয়ের দালালদের ওপর নির্মাণ শ্রমিকদের অমানুষিক নির্যাতন এবং অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দিয়ে সামন্ত প্রভুদের সম্পদ লুণ্ঠনের চিত্র যেন আমাদের পূর্ব পুরুষের দাসপ্রথারই পোর্টেট অঙ্কিত হয়েছে মরুভূমির বালিয়ারির ধূসর ক্যানভাসে। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বাংলাদেশের ‘রুস্তম আলী’ প্রথমে নির্মাণ শ্রমিক থাকলেও পরে প্রশিক্ষণ নিয়ে ইলেকট্রিক ম্যাকানিক্স হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে উপন্যাসের পাতায়। সত্যবাদী, প্রতিবাদী ও বুদ্ধিমান যুবক সদ্য বিবাহিত স্ত্রী নূরে জান্নাত কলিকে বাংলাদেশে রেখে যায় এবং ঊষর মরুভূমির প্রখর রৌদ্রতাপের দহনের সঙ্গে পত্নী-বিরহের নিভন্ত আগুনে ক্রমাগত দগ্ধ হতে থাকে। রুস্তম-কলির বিরহের নিভন্ত আগুনের শিখাকে আরও প্রজ্জ্বলিত করার জন্য ক্রমান্বয়ে বাতাস দিতে থাকে রুস্তমের মা। কলির সঙ্গে রুস্তমের বাসায় থাকা একমাত্র মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ দেয় না এমনকি মিথ্যে কথা বলেও প্রোষিতভর্তৃকা কলির অভিভাবক না হয়ে নিষ্ঠুর প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। কলির চাচাত দেবর দশম শ্রেণির কিশোর ‘শৌর্যের’ সঙ্গে পরকীয়া প্রেমের অপবাদের বাণও নিক্ষেপ করতে কুণ্ঠিত হয়নি। উপন্যাসটির নাটকীয়তা এবং গল্পের নানা রকম টুইস্টিং শুরু হয় দুবাইয়ের এক ধন্যঢ্য কিশোরীর নামও ‘কলি’ হওয়ার মধ্য দিয়ে। দুই কলির উপস্থাপনার মধ্যদিয়ে লেখক রুস্তমের চেতন-অবচেতনের বাধা তুলে দিয়ে যেন গাইলেন অধিবাস্তবতার গান। রুস্তমের মুখোমুখি দুজন ‘কলি’। একজন বাংলাদেশের এবং অন্যজন দুবাইয়ের ‘কলি’। দুবাইয়ের কলিও রুস্তমকে পছন্দ করে ফেলে নানা ঘটনার মধ্যদিয়ে। স্বীকার করা বাহুল্য যে মরুভূমির নারীদের ধনপ্রাচুর্যে পরিপূর্ণ সুরম্য প্রাসাদের অন্তরালে বন্দিত্ব ও অসহায়ত্বের কথা পৃথিবীর সব মানুষই জানে। সেই বন্দিত্বের চিত্র এখানে পরিস্ফুটিত হয়েছে। দুবাইয়ের কলি তার প্রেমকে প্রকাশ করার হয়তো সুযোগ নিতে চেয়েছিল… অথবা লেখক খুব কৌশলে সে জায়গাটি প্রচ্ছন্ন রেখে পাঠকের মনে অসংখ্য প্রশ্ন তৈরির তন্ত্র রেখে দিয়েছেন। কিন্তু নামের বিভ্রাটের কারণে প্রচণ্ড প্রতাপশালী কলির মা রুস্তমকে মরুভূমির এক অজানা স্থানে কারাগারে আবদ্ধ করে পারিবারিক সাজার বিধানে। রুস্তমের বুদ্ধিমত্তা ও কর্মকৌশলে কারাগারে তার বস ইন্দোনেশিয়ার নাগরিককে সে মুগ্ধ করে। রুস্তমের প্রিয় বন্ধু কলকাতার তন্ময় এবং সেখানকার ইঞ্জিনিয়ার আমির হামজা আল শামস, দুবাইয়ের কনসুলেটর, বাংলাদেশের উপজেলার কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত রুস্তম মর্যাদার সঙ্গে মুক্তি পায়। বীর রুস্তমও তার সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজনের কারাবাসীকে মুক্ত করে শির উচুঁ করে কলিদের প্রাসাদে বিশেষ অতিথির মর্যাদায় ফিরে আসে। উপন্যাসের শেষ দিকে পাঠকের মনে এমন ভাবনার উদ্রেক হয় যে, রুস্তম কি শেষ পর্যন্ত পাওলো কোহেলের ‘আল কেমিস্টের’ নায়ক স্যান্টাগো যেমন বাতাসে ভেসে ফাতিমার ঠোঁটে চুমু খেয়েছিল সে রকম কিছু করবে কি না! না, লেখক সে পথে হাঁটেননি। বরং উষ্ণক রুস্তমের সততা ও ন্যায়ের কারণে দুবাইয়ের কলি তাকে বিশাল স্বর্ণালঙ্কারের দোকানের ম্যানেজার বানায়, তাকে ফ্ল্যাট দেয় এবং বাংলাদেশের কলি অর্থাৎ নূরে জান্নাত কলিকে নিয়ে দুবাইয়ে থাকার সুব্যবস্থা করে দেয়। শেষ অধ্যায়ে পাঠকের মন দ্রবীভূত এক প্রকার বিষাদের দ্রবণে। দুবাইয়ের কলি আক্ষেপ করে বলেছিল, নাম বিভ্রাটের কারণে রুস্তমের সঙ্গে তার যে কেলেঙ্কারির ঘটনা রটেছে সেজন্য তার বিয়ের জন্য ভালো কোনও ছেলে বিয়ে করতে চায় না। বুড়ো বুড়ো পাত্র আসে যাকে কলি পছন্দ করে না। সে রুস্তমের দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়ার আরজি জানালে বাংলাদেশের কলি ঘোর আপত্তিতে খারিজ করে দেয়।

                মরুঝড় উপন্যাসের ভাষা সাবলীল, উন্নত এবং উপমার ব্যবহারও উল্লেখ করার মতো রসদ বিদ্যমান। উপন্যাসের শেষে এসে পাঠককে দাঁড়াতে হয় ক্ষণিকের জন্য, ভাবতে হয়… চমৎকার ফিকশনটির নির্মাণ কৌশলের জন্য অভিভূত হতে হয়।

৫.

চন্দন রোশনি উপন্যাসকে কয়েকটি বিচারে কথাশিল্পী মোহিত কামালের ভিন্ন মাত্রার উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এখানে বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার মিশেলে এক অপূর্ব যোগসূত্র স্থাপন করে কাহিনি নির্মাণ করতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। ঐহিক, পারত্রিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় ঈশ^রকণার মাধ্যমে তিনি আত্মার সন্ধান করার এক অভিনব ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। বলা বাহুল্য যে, অন্যান্য উপন্যাসে যেমন লেখক সমকালীন ঘটনার অনুপুঙ্খ অনুষঙ্গ উপন্যাসে স্থান দেন এই ব্যতিক্রমধর্মী উপন্যাসটিতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখানেও নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা, ঈশ^রকণার বৈজ্ঞানিক প্ল্যান্ট স্থাপন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পেট্রোল বোমার আগুনে ঝলসে যাওয়া মানুষের আর্তনাদকে দক্ষতার সঙ্গে কাহিনির সঙ্গে প্রতিস্থাপন করেছেন। এ-উপন্যাসের ভাষা, বৈজ্ঞানিক শব্দাবলি ও ব্যাখ্যাসহ বিজ্ঞান ও জগতের নানা বিষয়ের উপস্থাপনের জন্য এটি ভিন্নমাত্রার তাতে সন্দেহ নেই।

                উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অর্ণব ও উর্বশী যারা হানিমুন করার জন্য কক্সবাজারে বেড়াতে যায় এবং অর্ণব ঢেউয়ের স্রোতে হঠাৎ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তখন কোনো এক সময় উর্বশী লক্ষ করে তার পায়ে একটি লাল কাঁকড়া কামড় দিয়েছে এবং এই কামড়ের মধ্য দিয়ে অর্ণবের মহাজাগতিক আত্মার সঙ্গে তার যোগসূত্র স্থাপিত হয়। এই যোগসূত্রকে উর্বশী অনুভব করে এলইডি স্ক্রিনে, কখনও মানসজগতে, কখনও জাগতিক মোহ ও ঘোরের মধ্যে। লেখকের বর্ণনায় পাঠক অনুধাবন করতে পারে :   

‘ভাবনার আলোর ঝলক মস্তিষ্ক থেকে ছড়িয়ে গেল সাগরতলের উদ্ভিজ আর প্রাণিজ রাজ্যে। আচমকা লাল কাঁকড়াটির চোখ থেকে ছড়িয়ে যেতে লাগল শব্দঢেউও। এক সেকেন্ডের শতভাগেরও কম সময়ের মধ্যে সেই ঢেউয়ের সঙ্গে যোগ হয়ে গেল ফেলে আসা জগতের সংযোগ। স্পষ্ট অর্ণব দেখতে পাচ্ছে, এলইডি স্ক্রিনের থ্রিজি দৃশ্যপটÑএক তরুণী শুয়ে আছে বেডে। মেয়েটির পায়ের কাঁকড়ার কামড়স্থল থেকে বেরুচ্ছে বৈদ্যুতিক স্রোতের তরঙ্গকণা। শান্ত পুকুরের ঢিল ছুঁড়লে যেভাবে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে, বিদ্যুৎ-তরঙ্গের অ্যাকশন পটেনশিয়াল, ধনাত্মক আর ঋণাত্মক গতির নান্দনিক ঢেউও সেভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে শূন্যে। নিজের পায়ের দিক থেকে তাকিয়ে অর্ণব দেখল আকড়ে ধরা লাল কাঁকড়ার চোখ চেয়ে আছে ওর চোখের দিকে।’

                উর্বশী নববিবাহিতা হয়েও স্বামীকে হারানোর যে-রকম বেদনারসে সিক্ত হওয়ার কথা সে-রকম কিছু লেখক এখানে ঘটাননি। ঘটালে হয়তো উপন্যাসের মূল কাহিনিটি নির্মিত হতো না। তিনি দেখিয়েছেন অর্ণবের আত্মার সঙ্গে উর্বশীর আত্মার দুর্নিবার আকর্ষণ যার মাধ্যমে সে অনুভব করতে পারে না অর্ণব তার জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। যদিও উপন্যাসের শেষে এসে পাঠক থমকে দাঁড়ায় এবং বিষাদে হৃদয় বিগলিত হয়। উর্বশী সন্ধান করেÑ 

                ‘দেহের অর্ণব নয়, আলোর দেহকাঠামো জেগে উঠল, হাড়ের গড়নে যোগ হতে লাগল তুলতুলে আলোর দেহ। ধুপধুপ লাফানো হৃৎপিণ্ডের মধ্যে থেকে হুশ হুশ করে বেরুতে লাগল আলোর বুদবুদ।’

                মোহিত কামালেরর সর্বশেষ উপন্যাস আত্মার বিলাপেও এ-রকম আত্মার সন্ধান করতে দেখা যায় লেখককে।

                তিনি দক্ষ ফিকশন রাইটার হিসেবে উপন্যাসের কাহিনিকে উর্বশী ও অর্ণবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন মাত্রা যোগ করে বাঁক বদল করেন এবং কাহিনির বড়ো অংশ জুড়ে সেই চরিত্র চিত্রিত হয়। মহাজাগতিক আলোর কণা থেকে গল্পটি মর্তের পৃথিবীতে রচিত হয় উর্বশীর বান্ধবী চন্দনাকে চাকরি দেওয়ার জন্য শিল্পপতি হিকমত আবসারীর কূটকৌশলের ঘটনার মাধ্যমে। চাকরি প্রত্যাশী চন্দনাকে গাজিপুরের কোনও এক রিসোর্টে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করার প্রয়াসে ব্যর্থ হয়ে সেখানে তাকে খাদে ফেলে দিয়ে আসে। এই ঘটনার পর চন্দনাকে মিডিয়াতে পতিতা আখ্যা দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর চন্দনা ও তার মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। চন্দনার প্রতি উর্বশীর অবাধ বিশ^াস থাকার ফলে এই ঘটনাটিকে শক্তহাতে হাল ধরে এবং সুকঠিন আত্মপ্রত্যয়ী তেজস্বী নারী হিসেবে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করার জন্য বেপরোয়াভাবে কাজ শুরু করে। শুরু হয় সমাজের প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ। উর্বশীর দুর্দমনীয় সাহসিক কাজের জন্য অর্ণবের যেন রয়েছে অলৌকিক হাত এবং সে অর্ণবের অলৌকিক কণা তাকে সাহস যোগায়। সমাজের কিছু মানুষ চন্দনা ও উর্বশীর পক্ষ নেয় এবং কিছু মানুষ তাদের বিপক্ষে গিয়ে ঘটনাকে আরও জটিল করে তোলে। কিন্তু উর্বশী থামার পাত্রী নয়। একদিকে বান্ধবীর আত্মসম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার নিরন্তর সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে সত্য উদঘাটন করতে আবার অন্যদিকে তাকে ভালোবাসত এক সময়ে হিমাদ্রিও তার পিছু নেয় নষ্ট নারী হিসেবে আখ্যায়িত করে। সে কখনও কখনও ঘোরের মধ্যে থাকে, জীবন ও মহাজগতকে উপলব্ধি করতে নিজের মতো করেÑ     

                ‘আবিষ্কার করল উর্বশীকে প্রতিদিন খুঁজতে থাকা কক্ষপথের মূল কেন্দ্রে কি তবে রয়েছে অবস্থান হারিয়ে যায়নি সাগরতলে। গ্যালাক্সির কক্ষপথে আলোকণারূপে কি ঘুরে বেড়াচ্ছে ও। এই আলোর কণাই কি দেহত্যাগী আত্মা ? হাশরের ময়দানে কি তবে এই আত্মাই আবার প্রতিস্থাপিত হবে নিজ-দেহে ?’

আত্মজিজ্ঞাসায় আত্মা ও জীবনের এই প্রশ্নের কী মীমাংসা হয় ? হয় না। সমান্তরালভাবে জাগতিক ও পারত্রিক ঐন্দ্রজালিক রহস্যের ঘেরাটোপে উর্বশী কখনও প্রত্যাশার দীপ্ত শিখায় প্রজ্জ্বলিত হয়, কখনও জাদুকরী মায়ায় জড়িয়ে নিজেকে সমর্পণ করে বিশ^সৃষ্টির রহস্যের কাছে। তাতে প্রতিভাত হয় কল্পনার ছায়ায় বাস্তবতা। 

‘অর্ণবের রেটিনায় ইমেজ ঢেলে দেওয়া দৃশ্যটির উল্লাস সঞ্চারিত হয়ে গেল উর্বশীর দেহেও। জীবন্ত উর্বশীর দেহ থেকে সে-ঐশ^র্যকণা এখন ঢুকে যাচ্ছে চন্দনার মায়ের চোখে। নৈরাশ্য আর বিস্ময়ের ঘোরে জমতে থাকা বেদনার স্রোত তরল হতে লাগল। মা এখন মেয়ের কলঙ্ক দেখছেন না। উর্বশীরকেও দোষী ভাবছেন না, খারাপ ভাবনাগুলো ধুয়ে গেল নতুন কণার পরশে। চন্দনার মায়ের এ পরিবর্তনে পরোক্ষভাবে নিজের ভূমিকা আছে দেখে নবছন্দে মেতে উঠল অর্ণবের দেহতরঙ্গ কণা।’

উর্বশী সমস্ত অপশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়। আইনের আশ্রয়ের মাধ্যমে নিরলসভাবে সাহসের সঙ্গে সব চ্যালেঞ্জকে উড়িয়ে দিয়ে চন্দনার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় এবং হিকমতের চরিত্রও উদঘাটন করতে সমর্থ হয়। চন্দনা ও তার মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য পাঠক আনন্দিত হয় ঠিকই কিন্তু উর্বশী কীভাবে তার জীবনকে দেখে সেই প্রশ্ন পাঠকের মনে থেকেই যায়। তার মনোজগতে যে অর্ণব বসতি স্থাপন করে আছে তার সঙ্গে দুর্নিবার ভালোবাসার সেতুবন্ধন কীভাবে স্থাপিত হবে সেই প্রশ্ন পাঠকের মনে দেখা দেয় ও বিষাদগ্রস্ত হয়। লেখকও পাঠককে ঘোরলাগা জায়গায় বন্দি করে উপন্যাসটি শেষ করেছেন : 

                ‘কে ? কে বলছো কথা ? অর্ণব ? তুমি, তুমি বলছো এমন কথা ?’

                উত্তর খুঁজে পেল না উর্বশী। কেবল বুঝল চন্দন সৌরভ ছড়িয়ে চন্দন রোশনি চারপাশ উজ্জ্বল করে শূন্য করে দিচ্ছে অর্ণবের আদিসত্তা। আলোর সত্তায়ও বয়ে যাচ্ছে আঁধারের প্রবল ঘূর্ণি। তবু অর্ণব ছড়াচ্ছে চন্দন রোশনি! সেই রোশনিস্রোত বুকে টেনে নিয়ে উর্বশী তাকিয়ে রইল গ্যালাক্সির আলোময় জগতের দিকে।

৬.

আত্মার বিলাপ মোহিত কামালের সর্বশেষ উপন্যাস প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। আত্মার বিলাপ ও চন্দন রোশনি তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী  উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। তবে আত্মার বিলাপ-এ লেখক প্রচলিত ফরমেট ভেঙে নিজস্ব ধারায় একটি ফরমেট তৈরি করেছেন যেখানে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মৃত শহীদুল জহিরকে অর্থাৎ শহীদুল জহিরের আত্মাকে প্রধান চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তারপর শহীদুল জহিরকে কেন্দ্র করেই অন্যান্য চরিত্র আবর্তিত হয় এ মনস্তাত্ত্বিক, মনোসামাজিক, মনোদার্শনিক উপন্যাসের আখ্যান। আত্মার বিলাপ মনোবিষয়ক উপন্যাস হলেও এটি করোনাকালের ২০২০ সালের মহামারির ডায়রি বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ লেখক করোনাভাইরাসের আক্রমণের ফলে সারা পৃথিবী যখন তছনছ হয়ে যাচ্ছে, মৃত্যু ও হাহাকার, ক্রন্দন-রোদন লাশের মৌন মিছিল পৃথিবীর অলিতে-গলিতে তখন লেখক নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তুলে আনেন এক বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি। উপন্যাসের ক্যানভাসের বিস্তৃতিও বাংলাদেশ ছাপিয়ে আমেরিকা পর্যন্ত। বাংলাদেশে করোনা মহামারি নিয়ে অনেকেই গল্প লিখেছেন, কেউ কেউ সংকলন প্রকাশ করেছেন বা করার জন্য কাজ করছেন, উপন্যাসও লিখেছেন এমন বার্তা সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের হাতে এটিই মহামারির বাংলাদেশে প্রথম উপন্যাসের দাবিদার বলে মান্য করতে হবে। মহামারিকে ভিত্তি করে ধ্রুপদী সাহিত্য আলবেয়ার কাম্যুর দ্য প্লাগ সারা পৃথিবীর সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত। আত্মার বিলাপ ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা পাবে কিনা তা মহাকালই বলতে পারবে। তবে প্রথম উপন্যাস হিসেবে মহামারির এই দলিলের তাৎপর্য অনেক বেশি।

প্রথম পুরুষের কথনে এই উপন্যাসের প্রধান পাত্রের অর্থাৎ কেন্দ্রীয় চরিত্র শহীদুল জহিরের (বস্তুত কাল্পনিক চরিত্র) ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা থেকে শুরু। শহীদুল জহির অকৃতদার ছিলেন—এ উপন্যাসে লেখকও স্ত্রী-বিছিন্ন হয়ে গৃহকর্মী নাজমার সঙ্গে থাকেন। তবে পাশের বাসার শারমিনের সঙ্গে তার মনোজগতে সখ্য গড়ে ওঠে—ঠিক প্রেম নয় আবার অপ্রেমও নয় : অবচেতনের এমন একটি সম্পর্কের দোলাচল দেখা যায় চেতনমনের আচরণে। উপন্যাসে কয়েকটি চরিত্র শারমিনের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। পাঠক হয়তো বিভ্রান্ত হতে পারেন যে, শারমিন বিভিন্ন চরিত্রে কেন উপস্থাপিত হয়েছে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় লেখক এই আখ্যানে কেন্দ্রীয় চরিত্রের মধ্যে অবচেতন মনের বা সাবকনসাস মনের সঙ্গে চেতন বা কনসাস মনের একটি সেতুবন্ধন রচনা করেছেন। ফ্রয়েডের তত্ত্বানুযায়ী মানুষের সাবকনসাস মনের ক্রিয়া অনেক সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই গল্পের মূল চরিত্র অর্থাৎ শহীদুল জহিরের সাবকনসাস মনে শারমিনকে ধারণ করে আছেন এবং তিনি তরুণীদের দেখলে শারমিনের কথা মনে হয়। বিভিন্ন তরুণী হলেও লেখকের কাছে সবাই শারমিন রূপে আবির্ভূত হয়। এদের মনোরাসায়নিক কথা যেভাবেই বিধৃত হোক না কেন করোনা মহামারির উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি এই উপন্যাসের প্রাণ ভোমরা। কাহিনি বুননে করোনাভাইরাসও একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং করোনাভাইরাসকে গল্পের কথকের সঙ্গে বিভিন্ন সময় সংলাপে লিপ্ত হতে দেখা যায়। এসব সংলাপের মধ্য দিয়ে মূলত লেখক করোনারভাইরাসের গতি-প্রকৃতি, এর ভয়ানক ক্ষতিকর দিক, মানবসমাজের জন্য কতটা হুমকি ইত্যাদি বিষয়গুলো ব্লেন্ডিং করে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। আলবেয়ার কাম্যুর দ্য প্ল্যাগ উপন্যাসটি মহামারির যে ক্রমধারায় বর্ণিত হয়েছে এটিও ঠিক অনেকটা সেভাবে হলেও এখানে লেখক তাঁর নিজস্বতা বজায় রেখে নতুন ফরমেটে উপস্থাপন করেছেন। তিনি করোনাভাইরাসকে শজারু সম্রাট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন :

“হঠাৎ দেখতে পেলাম করোনার ‘এস’ প্রোটিন চোখের ভেতর নয় কেবল, গলার ভেতরও ঢুকে গেছে আমার কোষের গ্রাহকযন্ত্র, এসই-২-এর সঙ্গে লেগে যাচ্ছে। আর সঙ্গে সঙ্গে করোনার আরএনএ-এর ‘এন’ প্রোটিন আমার গলায় কোষের ভেতরে ঢুকে কী যেন ঘটিয়ে দিচ্ছে। আরএনএ’র সব ধরনের চরিত্র বেরিয়ে আসতে লাগল। হতবাক নয়, বিস্ময় নয় কেবল, খোলা চোখে দেখতে লাগলাম মুহূর্তে অজস্র নতুন ভাইরাস সৃষ্টি হওয়া শুরু হয়ে গেছে। মূল করোনার চরিত্রের সঙ্গে ওদের মিল নেই। ভিন্ন প্রকৃতির করোনা দাপটের সঙ্গে বংশবিস্তার করা শুরু করায় গলায় খুশখুশ কাশিও শুরু হয়ে গেছে। অল্প অল্প ব্যথাও। গায়ের ত্বক ফুঁড়ে বেরোতে লাগল গরম ভাপ।”

লেখক একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে দেশের ভয়াবহ কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জাতীয় কমিটির উপদেষ্টা সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। সে হিসেবে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা ও ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে যা জানেন তা অন্য সাধারণ একজন লেখক হিসেবে জানা সম্ভব নয়। এ-কারণেই উপন্যাসের পাতায় পাতায় সম্পূর্ণ পরিস্থিতিকে তিনি শিল্পিতভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। করোনাভাইরাস সম্পর্কে তথ্য ব্লেন্ডিংয়ের কৌশল লেখকের দক্ষতার সাক্ষী বহন করে :    

‘অন্ধত্বের মহামারিও শুরু হয়ে গেছে। ঠিক যেন হোসে সারামাগোর, মহামারি নিয়ে লেখা কালজয়ী উপন্যাস ব্লাইন্ডনেস বা অন্ধত্বর-র মতো অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষের মতো। করোনা কেবল গলায় আসন নেয় না, কেবল ফুসফুস বা রক্তনালিতে ক্ষত তৈরি করে রক্ত জমাট বাঁধায় না, কেবল মস্তিষ্কে আসন নিয়ে চিন্তা আর মেমোরিকে দখল করে না, চোখের জ্যোতিও কেড়ে নেয়। চোখ ইমেজ ধারণ করলেও সে ইমেজ থেকে প্রতিফলিত হয় কেবল আঁধার। মানুষ কেবলই যেন আঁধারে ডুবে যাচ্ছে।’

মহামারির সময় মানুষের কেবল মৃত্যু হয় এমন নয়। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, পরিবেশগত, শিক্ষার ওপর প্রভাব ফেলে। এই উপন্যাসে এসব বিষয়ও লেখক অনুল্লেখ রাখেননি। গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকা, ব্যাংক, শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার চিত্রও তিনি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। প্রথম যখন লকডাউন হয়েছিল তখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন ছিল তার চিত্রও উপন্যাসের ক্যানভাসে স্থান পায়।

মহামারি তো জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে আতঙ্কের মাঝে মানুষের বেঁচে থাকা। গ্রামীণ জীবনে করোনা মহামারির তেমন প্রভাব পড়েনি কিন্তু নগর জীবনে এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। ভয়াবহতার খণ্ড খণ্ড চিত্র বেশ কিছু গল্পে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হলেও এই উপন্যাসেই এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে তথ্যাদি উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রথম দুতিন মাসের মধ্যে মৃতদেহকে সৎকার করার মানুষ পর্যন্ত পাওয়া যেত না; ভয়ে পালাত সবাই। কিছু কিছু সাহসী মানুষ, কয়েকটি সাহসী প্রতিষ্ঠান মৃতের সৎকারের জন্য এগিয়ে আসে এবং তাদের জন্য আলাদা কবরস্থানেরও ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম দিকে এলাকার মানুষ অন্যান্য গণকবরে লাশ দাফন করার জন্য বাধা দিয়ে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে যদিও পরবর্তী সময় সেই ভয় মানুষের কেটে যায়। লেখকও এই বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন : 

‘ভাই! কেবল আপনিই আমাদের দুজনকে দেখতে পাচ্ছেন। আমরা মরে যাচ্ছি। ওরা আমাদের মাটি চাপা দিতে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই ধর্মীয় অনুশাসন মেনে দাফন হোক আমাদের, জানাজার পর দাফন চাই। কেবলই মাটিচাপা খেতে চাই না।’

এ যেন সত্যির আত্মার বিলাপ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় আর পাঠকের মনকে বিদীর্ণ করে দেয়।

এই উপন্যাসে করোনা মহামারির ঘটনার পরম্পরার বিন্যাস অত্যন্ত নিবিড়ভাবে গ্রন্থিত হয়েছে। অসংখ্য মৃত্যু, বিপর্যস্ত অর্থনীতি, অবরুদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা, গণমানুষের মানসিক ও সামাজিক অবস্থার বিবরণ যেমন উঠে এসেছে ঠিক তারই ধারবাহিকতায় মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়টিও স্থান পেয়েছে। লেখক জীবনকে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন নানা আঙ্গিক থেকে। কখনও বিজ্ঞানের আলোকে, কখনও বাস্তবতার আলোকে সন্ধান করেছেন জীবনের নিগূঢ় সত্যকে। ভাববাদ ও আধ্যাত্মবাদে জীবনকে যেভাবে দেখা হয় বাস্তবে কি তার জোরালো যুক্তি খাটে ? চীনা দর্শন থেকে বেশ কিছু ভাববাদের বিষয়কে উপস্থাপন করে লেখক বাস্তবতার সঙ্গে সংশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন জীবনের জন্য ভাববাদ সব সময় প্রযোজ্য নয়। মাসলোর থিওরি অনুযায়ী মানুষ যত দিন বাঁচে তত দিন ক্ষেত্র ও প্রেক্ষাপটের আঙ্গিকে চাহিদার পরিবর্তন হতে থাকে। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ বিভিন্ন চাহিদার মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করে যা কি না কার্ল মার্কসের বস্তবাদ দর্শনের আভাসও মিলে। মৃত্যু ভয়কে জয়ের আশা জাগানিয়া ভ্যাক্সিন কোথায় কীভাবে ট্রায়াল হয়েছে তার বিবরণ গল্পের কথকের মাধ্যমে পাঠক জানতে পারে। কিন্তু ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল হলেও মানুষ যে সম্পূর্ণ নিরাপদ এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমরা বর্তমান সময়ে এসে দেখছি করোনা স্ট্রেইন পরিবর্তন করে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে এবং অসংখ্য লাশের মিছিলে কেবল হাহাকার ও আর্তনাদ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে যা লেখকের তীক্ষè পর্যবেক্ষণ এড়িয়ে যেতে পারেনি। আত্মার বিলাপও শেষ হয়নি। লেখকও আত্মার বিলাপের প্রতিধ্বনি ঘটিয়েছেন উপন্যাসের শেষ প্যারায় :    

‘বিশ্বাসী মন নিয়ে তাকালাম প্রিন্স বেকারির দেয়ালে সাঁটানো এলইডি টিভির দিকে : চলমান স্ক্রলে দেখলাম বিশ্বে এ পর্যন্ত করোনাঘাতে মারা গেছেন পঁচিশ লক্ষ বায়ান্ন হাজার চারশ’ পাঁচ জন। নিহত মানবত্মার স্বর একযোগে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ওভেনের উত্তাপে বার্গাররূপী গলতে থাকা আমার আত্মার ভেতর। সে বিলাপ ছড়িয়ে যেতে লাগল ওয়েব পোর্টালে ভর করে বিশ্বজুড়ে; ঘরে আর ঘরে, আকাশে আর বাতাসে, জলে আর স্থলে, শ্মশানে, গহিন অরণ্য আর কবরেও।’        

৭.

ঈর্ষার ঘোরমগ্ন সময় গল্পগ্রন্থটি বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার ক্রোড়পত্র হিসেবে পাঠককের হাতে ধরা দেয়। আলোচ্য গল্পগ্রন্থটির ১৩২ পৃষ্ঠায় মোট ১৫টি গল্প মলাটবন্দি হয়েছে। পনেরোটি গল্পের ভাবার্থ ও নির্মিতি বিবেচনায় চার ধরনের বিভক্তি দেখা যায়। শেষের চারটি গল্প ব্যতীত অন্যান্য গল্পগুলো বর্তমান সময়ের অস্থির টিনএজের বাস্তবচিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে। শেষের গল্পগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ছায়া প্রতিফলিত হয়েছে।

                ‘দুঃখের ঢেউ ক্রোধের আগুন’, ‘তিনি ও তাঁর কয়েকটি শর্ত’, ‘গণিতের রটনাসূত্র’, ‘পেরেক’, ‘লুণ্ঠন’, ‘ফ্রেন্ড’ ও ‘খড়কুটো’ এই কয়েকটি গল্পে লেখক যেন বর্তমান সময়ে তরুণ-তরুণীদের জীবন ও বাস্তবতার ছবি এঁকেছেন নিখুঁতভাবে। গল্পের ভাষা বর্তমান তরুণ-তরুণীদের ভাষারই প্রতিধ্বনি। একজন লেখক তখনই চরিত্রের ভাষা ও সংলাপকে বাস্তবরূপ দিতে পারেন যখন লেখক চরিত্রগুলোকে অনুধাবন করতে পারেন, চরিত্রের মধ্যে এনগেজড হয়ে যেতে পারেন যা কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের লেখায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই সময়ে মোবাইল ফোনের ভাষাও লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন যা অনেক লেখকের পক্ষেই অসম্ভব। এদিক থেকে বিবেচনা করলে লেখক যদিও ষাট বছর অতিক্রম করেছেন তবু মনে হয় তিনি তারুণ্যের বৃত্তেই এখনও দীপ্তিমান এবং তরুণদের মনের ভাষা রপ্ত করে গল্প নির্মাণ করতে সিদ্ধহস্ত। গল্পগুলোতে প্রেমের সংকট, অর্থনৈতিক সংকট, পুরুষের চরিত্রের চিরাচরিত দুষ্টু রূপ এবং ভুল বোঝাবুঝির ঘটনাবলি অনুপুঙ্খভাবে বিধৃত হয়েছে।

এই গ্রন্থের দু-একটি গল্পে তিনি বিজ্ঞানের জটিল রসায়নের সঙ্গে সমাজবাস্তবতারও ছবি অঙ্কন করেছেন যেগুলো সায়েন্স ফিকশনের নামান্তর। আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার লাগামহীন জীবনযাপনের আখ্যান হলো ‘ফ্রেন্ড’ ও ‘খড়কুটো’ দুটি গল্প। ফ্রেন্ড গল্পে মেয়ে ইংরেজি শিক্ষায় এতটাই বেপরোয়া হয়ে গেছে যে, তার মা-বাবাও জানেন না বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল দেশে রক্ষণশীল পরিবারের একটি মেয়ের আচরণ কোন পর্যায়ে গিয়েছে! মেধা ঠিক তার আচরণের ক্লাইমেক্সে মাকে বোঝাতে সক্ষম হয়—একদিন মেধার বয়ফ্রেন্ডকে বাসায় দাওয়াত করে আনে এবং একসঙ্গে ঘণ্টা দু-এক বদ্ধ রুমে কাটানোর পর মায়ের সঙ্গে বন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দেয় তখন মা হতভম্ব হয়ে যান। এই গল্পটি বর্তমান উচ্চবিত্তের বেপরোয়া তরুণ-তরুণীদের অবাধ মেলামেশার একটি নমুনা বললে ভুল হবে না। ‘খড়কুটো’ গল্পেও উচ্চ মধ্যবিত্তের এক বাবার আদরের কন্যা ইংল্যান্ডে যায় উচ্চ শিক্ষার জন্য। বাবার আহ্লাদের কন্যা যেদিন বিস্তারিত জানাল যে, তার সিটিজেনশীপের জন্য দক্ষিণ আমেরিকার এক তরুণের সঙ্গে সুখময় লিভটুগেদার করছে সেদিন বাবার বুকের ভেতরে আক্ষেপের তুফান শুরু হয় আর আক্ষেপের সুর অনুরণিত হয়, ‘ফেরদৌস আহমেদের মনে হলো সৎ উপায়ে নিজ আয়ের রক্তধোয়া অর্থ দিয়ে খাল কেটেছেন তিনি। সে-খাল দিয়ে ভেসে যাচ্ছে মমতার নৌকা। পালতোলা নৌকা ছুটে যাচ্ছে নতুন স্রোতের টানে। ওই স্রোতে তিনি কেবলই ভাসমান খড়কুটো।’      

‘আগুন আংটি’ গল্পটি নোয়াখালীর সোনাগাজির সেই মাদ্রারাসার নুসরাত ও প্রিন্সিপাল সিরাজ-উদ-দৌল্লার আলোচিত ঘটনাটি গল্পের বয়ানে স্থান পেয়েছে। বর্তমান সময়ে হয়তো মানুষ এই গল্পটিকে বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারবেন এবং নুসরাতের ঝলসানো শরীরের প্রকাশিত ছবি তাদের চোখে ভেসে উঠতে পারে, ভেসে উঠতে পারে তার পরিবারের সদস্যদের মর্মন্তুদ আর্তনাদের ছবি। কিন্তু এই গল্পের মাধ্যমে ভবিষৎ প্রজন্মও জানতে পারবে এই দেশে নারীরা কত নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।  

শেষ গল্প ‘সমাধিসৌধের সামনে দাঁড়িয়ে’—পরাবাস্তবতার গল্পের নিদর্শন হিসেবে বিবেচ্য। লেখক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের সমাধির আর্কিটেকচারাল ভিউয়ের চমৎকার বর্ণনা উৎকীর্ণ করেছেন। এই গল্পটি পূর্ণাঙ্গতা পায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গল্পের নায়ক ময়ূখের সংলাপের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের কয়েকটি বিষয় আলোকপাত করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে গ্রন্থটিরও পাঠ শেষ হয়; এক অভাবিত মায়াবী উষ্ণতায় হৃদয় জারিত হয়—“কবর-ঘিরে থাকা রেলিংয়ে হাত রেখে স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে ময়ূখ শুনল গমগমে দৃপ্তস্বর-‘যাও ময়ূখ, ঢাকা যাও। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। যাও। আমার হাসুর ছায়াতলে থেকো। সংঘবদ্ধ থেকো।’

স্পষ্ট কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ময়ূখের মনে হলো বঙ্গবন্ধু এখানে ঘুমিয়ে নেই। জেগে আছেন। নিজের জোরালো গর্জন হাসুর কণ্ঠে আর তাঁর তর্জনীর দিক নির্দেশনা হাসুর তর্জনীতে ঢেলে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্তে শুয়ে আছেন মায়াময় ভূমিতে, তাঁর বাবা-মায়ের পাশে, শ্রেষ্ঠ কবরে।”

৮.

লেখক মোহিত কামাল তরুণী ও নারী চরিত্রগুলো অত্যন্ত দরদ ও সহানুভূতি দিয়ে নির্মাণ করেছেন। বাংলাদেশের নারী সমাজ শুধু পিছিয়ে পড়ে আছে তাই নয়; তারা বঞ্চিত, নিগৃহীত, নির্যাতিত, লাঞ্ছিত ও অবহেলিত… তিনি উপলব্ধি করেছেন অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে, বর্ণময় করেছেন কাহিনির বিন্যাস ও ভাষার অলঙ্করণে। হ্যাঁ ও না দুটি উপন্যাসেও কিশোরীদের নির্যাতনের চিত্র চিত্রিত হলেও এই দুটি গ্রন্থ তলিয়ে যাওয়া কিশোর-কিশোরী এবং দম্পতিদের আলোর পথ দেখানোর জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করার দাবি রাখে। তাঁর প্রায় প্রতিটি উপন্যাস ও গল্পই বর্তমানকে ধারণ করেছে। কালের সাক্ষী হিসেবে কিংবা বলা যায় সময়কে ধারণ করার সাহিত্য হিসেবে মোহিত কামালের সাহিত্য অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাঁর সাহিত্যে সময়কে বন্দি করেছেন খ্যাতিমান ব্যক্তিদের নাম, ঘটনা, সন-তারিখ বর্ণনা করে। লেখকের নিজস্বতা খুঁজতে গেলে মোহিত কামালকে বর্তমানকে ধারণ করার একজন দক্ষ কুশীলব হিসেবে নিঃসন্দেহে বিবেচনা করতে হবে। তাঁর জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে বলতেই হয় তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন সমাজমনষ্ক কথাসাহিত্যিক, সফল মানুষ যাঁর মধ্য থেকে চন্দন রোশনাই বিচ্ছুরিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।

লেখক : প্রবন্ধিক ও কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares