ইমতিয়ার শামীম : হিমের ভেতর, ধবল জ্যোৎস্নার ভেতর : সাগুফতা শারমীন তানিয়া

২০২০ : বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাশিল্পীর সাহিত্যকর্ম

ইমতিয়ার শামীম

জন্ম : ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ ; গ্রাম : রামগাঁতী, ডাকঘর ও ইউনিয়ন : সলপ, উপজেলা : উল্লাপাড়া, জেলা : সিরাজগঞ্জ।

মা : হামিদা সুলতানা। বাবা : চৌধুরী ওসমান।

পেশা : সাংবাদিকতা। বর্তমানে দৈনিক সমকালের সহকারী সম্পাদক।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : এমএসএস [সমাজ বিজ্ঞান]; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাথমিক শিক্ষাপর্ব রামগাঁতী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে; মাধ্যমিক শিক্ষাপর্ব সলপ উচ্চ বিদ্যালয়ে ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপর্ব সিরাজগঞ্জ সরকারি মহাবিদ্যালয়ে।

প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ : ডানাকাটা হিমের ভেতর (উপন্যাস, ১৯৯৬)।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ :  শীতঘুমে একজীবন, গ্রামায়নের ইতিকথা, আত্মহত্যার সপক্ষে, কয়েকটি মৃত মুনিয়া, মাৎস্যন্যায়ের বাকপ্রতিমা, শ্যামলতার মৃত্যুশিথান, পাখিরা নাচবে না আর, শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে, কাল অকাল, মৃত্যুনদী স্বপ্নসমুদ্র।

প্রকাশিত উপন্যাসগ্রন্থ :  ডানাকাটা হিমের ভেতর, আমরা হেঁটেছি যারা, চরসংবেগ, অন্ধ মেয়েটি জ্যোৎস্না দেখার পর, মোল্লাপ্রজাতন্ত্রী পবনকুটির, তা হলে বৃষ্টিদিন তা হলে ১৪ জুলাই, আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক, মৃত্যুগন্ধী বিকেলে সুশীল সঙ্গীতানুষ্ঠান, নীল কৃষ্ণচূড়ার জš§দিনে, শাদা আগুনের চিতা, অন্তর্গত কুয়াশায়, যারা স্বপ্ন দেখেছিল।

প্রকাশিত প্রবন্ধ-ব্যক্তিগত গদ্য :  যুদ্ধে উপেক্ষিত নীল নীল অপরাজিতা, মূলত মানুষ মূলত মানস, শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সন্ত্রাস, কখনও বৃষ্টিশেষে, মার্কেস : সঙ্গে নিঃসঙ্গে, মৃদগত কাল মৃদভেদী স্রোত।

প্রকাশিত ইতিহাস-গবেষণাগ্রন্থ : রক্তে জেগে ওঠেÑমুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস : সিরাজগঞ্জ।

শিশু-কিশোরপোযোগী গ্রন্থ :  আমাদের ব্যোমকেট ডাক্তার, ঋতুদের অভয়ারণ্যে, নদী-স্বপ্নে কয়েকদিন, তাজউদ্দীন নিঃসঙ্গ এক মুক্তিনায়ক, পাতার বাঁশি বাজে, নদীডাকাতের খুটখাট জলদৈত্যের এক ঘা, ভূতের বাড়ি ভয়ের হাড়ি, সুখেদুখে বৃষ্টিনদী।

সম্পাদনা : মহাবিদ্যালয়ে লিটল ম্যাগ ‘এইদিন সেইদিন’, ‘সুন্দর’, ‘অবলোকন’ ও ‘গল্প পত্রিকা’র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মিছিলের মুখ’, ‘বৈশম্পায়ন’, ‘পাঠচক্র’ ও ‘উৎস’ লিটল ম্যাগের সম্পাদনা পরিষদে যুক্ত ছিলেন।

স্বীকৃতি : ‘মৃত্যুগন্ধী বিকেলে সুশীল সংগীতানুষ্ঠান’ গ্রন্থের জন্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কথাসাহিত্য পুরস্কার [২০১২], লোক সাহিত্য পুরস্কার [২০১৩], জীবনানন্দ সাহিত্য পুরস্কার [২০১৪], ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গ্রন্থের জন্যে প্রথম আলো বর্ষসেরা সৃজনশীল গ্রন্থ পুরস্কার [১৪২১], কিশোর উপন্যাস ‘পাতার বাঁশি বাজে’র জন্যে শিশু একাডেমি পুরস্কার [১৪২১]।

অন্যান্য : ১৯৮৯-৯০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রছাত্রী সংসদের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে, স্থাপত্য অনুষদে ঢুকবার পর প্রথম যে কাজটা আমরা করতে আদিষ্ট হয়েছিলাম, তার নাম বিন্দু-পর্যবেক্ষণ, কম্পোজিশন উইথ ডটস। অসংখ্য বিন্দু ছড়িয়ে থাকবে একটি পৃষ্ঠায়, কিন্তু তারা একত্রে কোনও চেনা জিনিসের আকার গ্রহণ করবে না : না মেঘ না বলাকা না মানুষের মুখের রেখা। অথচ একটি সমষ্টি হিসেবে তারা কম্পোজিশন হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে, এমনভাবে, যেন একটি বিন্দুকে ছাড়া অপরটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ দেখায়। প্রথম বিভীষিকা। ফ্যাকাল্টির বড় ভাইয়েরা কেলিয়ে বলে উঠেছিল, তারা নাকি একখানা শাদা কাগজে বালি ছড়িয়ে, সারা রাত ধরে সে বালিবিন্দু একটা একটা করে এঁকেছে। সত্যমিথ্যা কে বা জানে। আমি এখনও মনে করলে শিউরে উঠি, চোখে বিঁধবার আর দাঁতে পড়বার মতো কটকটে বালির বিন্দুগুলো এক এক করে এঁকে নিতে হচ্ছে শাদা পাতায়। অনেকদিন পর, আমার সেই বালুকাবিন্দু আঁকবার কথা মনে পড়ে গেল, ইমতিয়ার শামীমের লেখা পড়তে গিয়ে। ওঁর লেখা ঐরকম অসংখ্য বালুকণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের সেই প্রথম প্রজেক্টের মতন, পয়েন্টি লিস্টের ক্যানভাসের অগণিত রঙের বিন্দুর মতো, একটি বিন্দুও অপসারণযোগ্য নয়, প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়।

এমনিতে আমি ওঁর লেখা পড়েছি পত্রিকার সাহিত্যপাতায় ইতিউতি, গল্প পড়েছি অথচ শেষমেশ উপন্যাসের  মতন গাঢ় রঙ গায়ে মেখে উঠে এসেছি। এবার পড়েছি জ্বর আসবার মতো, ঝেঁপে। গদ্য অত্যন্ত সুপাঠ্য, বুদ্ধিদীপ্ত এবং সংক্রমণশীল। দেখেছি ওঁর চিন্তার সংহতি আর বিবিক্তি ওঁকে বেদনার সমুদ্রে ঠেলে ফেলে দেবার পরেও এই লেখাগুলোর ভেতরের ধমনীগুলো সচল থাকে, নীল হয় কিন্তু তবুও জীবনের উত্তাপ-নিবিড় থাকে। নির্লিপ্ত থাকে না, অথচ প্রপাগান্ডা হয়ে ওঠে না। অসংখ্য অপ্রতিস্থাপনীয় বিন্দুর সমষ্টি হয়েই থাকে, যেখানে প্রতিটি বিন্দু গুরুত্বপূর্ণ। দেয়ালার মতো, স্বগতোক্তির মতো ভাষণ তাঁর, ইতিহাসনিষ্ঠ, বেদনাবিদ্ধ ঘটনাগুলোও সেখানে গভীরভাবে শিল্পিত, এ কেবল শব্দকুশল লেখকের পক্ষেই রচনা করা সম্ভব। যেমন―‘আমরা হেঁটেছি যারা’ থেকে সামান্য উদ্ধৃতি দিই :

‘ওদের বলা সেই হারামজাদা মানে আমার বাবার খবর আমরাও জানি না কতদিন হয়ে গেল। কিন্তু বারবার বলার পরেও বিশ্বাস করানো যায়নি ওদের এই সত্য। এখন আর কিছু বলি না আমরা কেউই, শুধু না বলা কথাগুলো নীরবে আমাদের ঠোঁটের ওপর কম্পন তুলতে থাকে। নীরবে আমরা দেখি ওদের খানা-তল্লাশি, দেখি ভেঙে ফেলল মাচার ওপর রাখা হাঁড়ি-কোলা, ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়ল আসন্ন খন্দের জন্যে গরুদের খড় ভিজিয়ে খাওয়ানোর নান্দা, একটা ষাঁড় খুলে নিয়ে যায় অনেকদিন পরে ভালোমন্দ খাবে বলে। রক্ষীদের অনেকদিন মানেই প্রতিদিন তা এতদিনে হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছি আমি। প্রতিদিনই ওরা হানা দেয় কারও না কারও ঘরে, গরু-ছাগল না হলে মোরগ-মুরগি ধরে নিয়ে যায়। আর বিকৃত দেঁতো হাসি ছুঁড়ে প্রতিবারই বলে, অনেকদিন ভালোমন্দ খাওয়া-দাওয়া হয় না, কিছু মনে কইরবেন না।’

অত্যন্ত চেনাজানা সমাজের অতি-অনভিপ্রেত প্রায়-ডিস্টোপিয়ান এই বিবরণ লিখবার সময় লেখক কি নির্লিপ্ত ছিলেন, নাকি রেগে ছিলেন, নাকি বেদনা-সংক্ষুব্ধ ছিলেন ? যে ঈশ্বর একটি বাড়িতে মৃত্যু আর তার পাশের বাড়িতে নতুন শিশুর আগমন ঘটান, আর তারই পাশের বাড়িতে কারও না কারও প্রার্থনা মঞ্জুর করেন, তিনি কি নির্লিপ্ত, তিনি কি সংবেদনশীল ? ইমতিয়ার শামীম জানেন! তাই তিনি লেখেন :

‘আমি বা আমরা কিছু মনে করি না। কেননা খুব সহজেই এ ক’দিনে আমি বড় হয়ে গেছি। মানুষের বড় হওয়া নিয়ে অজস্র ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু সব ব্যাখ্যাই এখন মিথ্যা আর হাস্যকর মনে হয় আমার কাছে।’

(‘আমরা হেঁটেছি যারা’)

নয়তো লেখেন―

‘ছেলেটাকে গণবাহিনীর রোগে ধরেছিল। এই বয়সের ছেলেপেলেদের এই এক আজব ফ্যাশান, দেশ উদ্ধার করবে, ধনীগরিব সবাইকে সমান করে ছাড়বে! বুঝতেই চায় না, হাতের পাঁচ আঙুল কোনওদিন সমান হয় না, খোদার দুনিয়ায় একজন ধনী হবে আরেকজন গরিব হবে, একজনের হয়তো দু’পা-ই নুলো হবে, আরেকজনের আবার পা ভালো থাকলেও সেই পা বাড়াবে মাগিপাড়ার দিকে।’

(আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক)

সমাজ পর্যবেক্ষণ করেন তিনি, উদ্বেগ আছে হয়তো, কিন্তু সেখানে ঠিক বিপ্লবীর সংরাগ নেই। ব্যক্তি ও সমাজের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই চোখে শ্লেষ-কৌতুক-রাগ-নিরপেক্ষতা যতই থাক, একটা মিষ্টি বাঁকা রোদের মতো ব্যাপার আছে, উত্তাপ হয়ে জমে উঠলেও যা সৌন্দর্য হারায় না। যেমন ডানাকাটা হিমের ভেতর-এ আছে এমন সময়ের কথা, যখন গ্রামে ইলেকট্রিসিটি এসেছে, রাস্তাগুলো পাকা হচ্ছে। তিনি লিখছেন :

‘একপুরুষ আগে শিক্ষিত হওয়া যেসব মানুষ তাদের সুদর্শন গাবুসগুবুস মার্কা ছেলেমেয়েরা গরম, প্যাঁচপেঁচে কাদা কিংবা অন্ধকারে চলাফেরা করার ঝক্কি সইতে পারে না বলে গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় চুকিয়ে দিয়েছিল, সেসব মানুষ আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে। তা ছাড়া বর্ষা হয় না বলে ওদের আর পানিতে ডুবে মরারও আশঙ্কা নেই।’

ন্যারেটিভে দার্শনিক স্থান পরিষ্কার। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জীবন বদলে গেছে, তাই তাকিয়ে দেখছেন সকৌতুকে, একটু জ্বালাও আছে বোধ করি। জ্বালা সেই মনমানসকে নিয়ে যা আদরণীয়কে যে কোনও ছুতোয় অনাদর করে; যে মনে উত্তরাধিকারের স্থানসংকুলান হয় না সেই মনকে নিয়ে।

আমাদের চিঠি যুগ কুউউ ঝিকঝিক উপন্যাসের নাম হিসেবে কী ভীষণ লিরিক্যাল, চলচ্চিত্রের নাম ‘ইটারনাল সানসাইন অব দ্য স্পটলেস মাইন্ড’ হবার মতো, সুরেলা, দ্যোতনাময়। যেখানে ট্রেন আসবার পর রেলস্টেশন জীবন্ত হয়ে উঠবার ছবি এঁকেছেন তিনি―বুদ্ধদেব গুহর অতিপঠিত উপন্যাস মাধুকরীতে সবজিমন্ডীর বেশ্যাপাড়ায় সকাল হবার একটা অতুলনীয় বিবরণ আছে, সেই বিবরণের পর ইমতিয়ার শামীমের এই বিবরণ আমার অত্যন্ত প্রিয় :

‘প্লাটফরমের ওপর হাঁটাহাঁটি করতে থাকা যাত্রীরা সচকিত হয়ে ওঠে, বেঞ্চ কিংবা চায়ের দোকানে বসে থাকা যাত্রীরা তড়াক করে উঠে বসে আর ওয়েটিং রুমের মধ্যে থেকে বোচকাবাচকি নিয়ে তরতরিয়ে বের হয়ে আসে লোকজন। চানাচুর-মুড়ি কিংবা সিগারেটওয়ালাদের হাঁক শোনা যায় …। দেখি গার্ড সবুজ পতাকা দোলাচ্ছে, সার্চলাইটের বিচ্ছুরিত আলো নাচানাচি করছে বাহিরগোলা পুলের ওপর। কাজেম দাদার দোকানে আলু কাটা হচ্ছে, পানি দিয়ে আটা মাখানো হচ্ছে; ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শিঙাড়া ভাজা হবে।’

ভোরের ট্রেন আসে যেন পাঠকের রক্তসংবহন নালি দিয়ে একঝলক লাল রক্তের ফোয়ারা হয়ে, সেও দ্যাখে প্রথম ট্রেনেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোক এসে নামে শহরে, সবচেয়ে বেশি চলে যায় রাত নয়টার ট্রেনে। স্টেশনের মিটমিটিয়ে চলা লাইটগুলোর মতোন সেও নীরব দর্শক হয়ে যায়। গুহর ম্যাক্সিমালিস্ট বিবরণপ্রণালি নয়, ইমতিয়ার শামীমের বিবরণের ধারা ওঁর নিজেরই, সন্ধ্যার পরে গা ছমছম মাছিমপুরের সেই বিবরণ―

‘যদিও কাছেই বাজার স্টেশন, কিন্তু তারপরই খালপাড়ে গজিয়ে ওঠা জঙ্গলের দাপটের পাশে দুর্দান্ত সাহস নিয়ে কেবল একটি আইসক্রিম ফ্যাক্টরির টিমটিমে আলো জ্বলে ভোর অবধি আর অজস্র পোকামাকড় উড়ে বেড়ায় এক কবিরাজ সাহেবের বিরাট আস্তানা থেকে ছুটে আসা বিভিন্ন দাওয়াই প্রস্তুতকালীন দুর্গন্ধের বৃত্তাকার চক্রে। এরকম জায়গায় মানুষ কেন, আমাদের রণেশের ধারণা, কোনও বাঘ-শুয়োরও বাস করে না, যদিও অজস্র সুন্দর কালো, সবুজ, হলুদ, নীল বিভিন্ন রকমের সুন্দর সব প্রজাপতি জন্মায় এবং আমাদের সেই প্রজাপতি ধরতে যেতে অমন এক গা শিরশিরানো জঙ্গলে যেতে প্রলুব্ধ করে …’

বিবরণে শুধু চিত্র-নির্মাণ নেই, আছে ব্যাজস্তুতি, আছে শ্লেষ আর সমাজবীক্ষণ। সংসারের বড় ছেলেটিকে আর্মি ধরে নিয়ে যাবার কয়েকদিন পরে আর্মি আবার এসে দোয়াতবাড়ির আদিলভাইকে ধরে নিয়ে যায় :

‘বাবা তার ডিসিবন্ধুকে ধরার জন্যে রাজশাহী চলে যায়, বেশ ক’দিন রাজশাহী-বগুড়া-সিরাজগঞ্জ দৌড়াদৌড়ি করে। কিন্তু আর্মির লোকজন ভারী অবাক কণ্ঠে বলে তাকে, কী বলছেন ? আমরা তো কাউকেই ধরে আনিনি। দাঁড়ান-দাঁড়ান―ব্যাপারটা খোঁজ নিতে হয় তো …

অতএব আমরা ঘটনাগুলোকে মৃত্যুর মতো স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার চেষ্টা চালাই। মা আবারও রান্নাঘরে রান্না করতে করতে পড়াশোনার টেবিলে বসা অন্তরাকে ডেকে পাঠায়, পিঁয়াজ কাটতে বলে। কিছুক্ষণ পর গলা উঁচিয়ে বলে, ওরকমভাবে না, পোলাওয়ের জন্যে পিঁয়াজ ওরকমভাবে কাটে না।’

পড়তে পড়তে প্রটাগনিস্টের সঙ্গে পাঠকও অন্যমনস্ক হয়, পড়ার জগৎ থেকে অদূরে সরে আসে, হঠাৎ কড়াইয়ে তেল ছাড়ার শব্দ শুনতে পায়, শুনতে পায় সন্তানহারা মা আবার জীবনের বিচিত্র আয়োজনে ফিরে এসে বলছে―‘হ্যাঁ, এইভাবে … এবার আঁচটা কমিয়ে দে …’

শহীদুল জহিরের মতো ক্রমাগত ক্রিয়াপদে নিত্য বর্তমান কালের ব্যবহার তো ওঁর আছেই, বিবরণে খানিকটা ইলিয়াস কিংবা রশীদ করীমের ছায়া পড়ে কিন্তু ছায়ামূর্তি সরে যায়। দাদিমার সাদা হয়ে আসা চুলে ‘বিগত শরতের কাশতৃণের ছায়া’ যা ‘মানুষের নিত্যনতুন উদ্ঘাটিত জ্ঞানকে উপেক্ষা করে’, তা একেবারে ইমতিয়ার শামীমের নিজস্ব। বিবাহিত-বিবাহিতার বিবরণে ‘মানুষখেকো বাঘ যেমন মাংসস্বাদে অভিভূত এবং অক্ষম মাংস বর্জনে’ পড়লে লেখকের নাম না থাকলেও চেনা যাবে। যার তোলা নাম ‘স্টাইল’, সাহিত্যে যার নিজের স্টাইল থাকে না, তার শুভনাম বা পদবি স্থায়ী হয় না।

যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, ওঁর লেখার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি কী, আমি বলব, একটি ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকা সময়ের চিহ্ন। যখন কালবৈশাখীর মরশুমে ঘরে আগুন লাগবার ভয়ে উঠানের খোলা চুলায় রান্না হতো। আমাশয় রোগীদের খিটমিটে চেহারা দেখলেই চেনা যেত, আর মকররাশির লোকে রেগে গেলে আটজনের সমান ডালভাত সাবাড় করে ফেলত। যেসব সময়ে ছোঁয়াচে রোগ হবার ভয়ে আম্মা তার পিঁড়িতে বুয়াদের বসতে দিত না, আমাদের সহপাঠিনীরা আলগোছে বোতলের জল খেত, বলত―‘মুখ না লাগিয়ে খেও।’ ওয়েলশ লেখক সুজান ফ্লেচারের ‘ইভ গ্রীন’ অনুবাদ করার সময় আমি দেখেছি আস্তিনে রুমাল গুঁজে রাখার স্বভাবওয়ালা নানিকে, আমি নিজেও দেখেছি পেটের কাছে শাড়ির কুঁচির ভাঁজের ঠিক পাশটায় পাট করে ভাঁজ করা শাদা রুমাল রাখা আম্মা খালা হাসপাতালের সিস্টার কিংবা স্কুলটিচারদের। ঐ মেয়েলী রুমালগুলো যে দৃশ্যের অবতারণা করে, সেগুলো শুধু অভ্যস্ততার গল্প নয়, সেগুলো একেকটি কালের গল্প, হারিয়ে যাওয়া সময়ের হদিশ। কুউউ ঝিকঝিক করে সরে যাওয়া গুডজ ট্রেন তারা। যদি জিজ্ঞেস করেন সেই মালগাড়িতে কী কী বোঝাই, আমি হারানো মুহূর্তের আর দৃশ্যের মালমসলার বিশাল লিস্ট এনে হাজির করতে পারি। খলিফাপট্টি থেকে কিনে আনা তার্পিনতেলের বোতল, স্টিমারজেটি, ধবল কুয়াশায় ভিজতে থাকা স্থানীয় রেলস্টেশন, ‘এখানে যমুনা নদীর পানির দামে ফ্রিজ কিনতে পাওয়া যায়’, ঈদগাহ মাঠের খয়া কিনারা, চিত্রালীর পাতাজুড়ে কাতরভাবে ‘ও রানা ও রানা’ করে যাওয়া অলিভিয়া, গ্রেটা গার্বোর ছবিওয়ালা ডাকটিকিট, সিনেমা হলের সুশীতল পারিবারিক পরিবেশ, কস্তুরি নাভির উপকারিতা বয়ান করতে থাকা ক্যানভাসার … আরও কত বলব বলুন। মাত্র এক-দুই-তিন দশকে নির্দয়ভাবে অফেরতযোগ্যভাবে এত ছবি হারিয়ে যায় এতকিছু হারানো বিজ্ঞপ্তিতে যোগ হয় এইসব শহরে :

‘ইরি ধান দখল করেছে পাটের জমি। আর মিটসেফ দখল করেছে পাট দিয়ে বানানো শিকার ভূমিকা। অনীক উঠে দাঁড়াতে গেলে শৈশবের মতো অপাঙক্তেয় শিকাটা মাথায় লেগে নড়ে ওঠে। অনবরত দোল খায় এপাশ-ওপাশ।’

(ডানাকাটা হিমের ভেতর)

গভীর বেদনা আমাদের প্লাবিত করে, চেকভের গল্পের বেদনাতুর মূলসুরের মতো করে সেই বেদনারও ব্যাখ্যা চলে না। অতএব বউ জিজ্ঞেস করে পুরুষটিকে, ‘আচ্ছা, তুমি আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাও না কেন ?’, সে চুপ করে থেকে অবশেষে উত্তর দেয় যেদিন স্ত্রী আর ঋতুমতী থাকবে না, সেদিন তার কোনও হিংসা থাকবে না, প্রতিহিংসা থাকবে না, শুনতে কষ্ট হবে না; সেদিন সে স্ত্রীকে ন্যাপথলিনের গন্ধে ভরা এক রাজ্যে নিয়ে গিয়ে গোটা রাজ্য তার হাতে তুলে দেবে। উত্তর হিসেবে বিচিত্র, সন্দেহ নেই। রক্তমাংসের সংরক্ত অধিকার নিয়ে কি সেই ভঙ্গুর রাজ্যে পা দেওয়া যায় না ? প্রাপ্তির তৃষ্ণা একেবারে শমিত না হলে সে বেদনাকে বোধ করা যায় না ?

বদ্ধ জলাশয়ে ব্যাঙের লাফ কেবলি একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য হতে পারত, কিন্তু হাইকুতে সেই প্রাণীজাগতিক লাফ যে অনুরণন তৈরি করে তা দৃশ্যের বাইরেরও অনেক কিছু আমাদের দেয়, দেয় ছবি ভেঙে যাবার উর্মিল গল্প, দেয় ছবি ভেঙে গল্প তৈরি হবার দৃশ্য, দেয় অব্যক্ত এক দর্শনের ইঙ্গিত। ইমতিয়ার শামীম যেভাবে পালংশাকের অবিন্যস্ত কুঁড়ির বিস্তারের মতো করে একটি ছেলে শিশুর যৌবনের সিংহদরজায় সসংকোচে প্রবেশের দৃশ্যাবলি বিনির্মাণ করেছেন, যে আবহ পয়েন্টিলিস্টের মতো বিন্দু বিন্দু করে সৃষ্টি করেছেন, যেখানে পুরুষালী শরীরী আকাক্সক্ষার পাশ দিয়েই শিঙের পাশের নরম রোমের মতো করে গজিয়েছে নারীকে ভালোবাসবার অভীপ্সা, বাংলা সাহিত্যে এমন সংবেদনশীলতা এমন সুমিতির যুগপৎ অস্তিত্ব বিরল যেখানে শিঙ আর রোম দুইই সমান্তরাল সত্য। আমি দেখিনি (বুদ্ধদেব বসু কৈশোরের বিবর্তন নিয়ে লিখেছিলেন বটে, সেখানেও এত ভারসাম্য ছিল না। বসু গভীরভাবে কাব্যিক, ইমতিয়ার কাব্যিক অথচ সমাজচেতনামুখর)। চিত্রকলায় দেখেছি নরওয়েজিয়ান শিল্পী এডভার্ড মুঙ্খ-এর ‘পিউবার্টি’তে।

আগেই বলেছি, ইমতিয়ার শামীমের লেখার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সেখানে সময়ের চিহ্ন। যখন শেখের ব্যাটা সপরিবারে মরে যাওয়ার পরে আর্মি এসেছে দেশে, টুপটাপ তুলে নিচ্ছে ছেলেদের, খালকাটা সামরিক জান্তা অক্লান্ত কোদালে খাল কেটে কুমির আনছে, সেসময় সামরিক শাসনের ছায়ায় যারা কচি পালংশাকের কুঁড়ি ফুঁড়ে বের হয়েছে গোছা গোছা সবুজ হবে বলে, তাদের শৈশব-কৈশোর অমনই। আমিই তো দেখেছি, আমরাই দেখেছি। বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে, অক্ষমতায় অস্পষ্টতায় ছেয়ে গেছে সব, প্রশ্নহীন সময়ে সাঁতার কেটেছে আমাদের সপ্রশ্ন মাথা। চিনতে পেরেছি। আমাদের সেই প্রজন্মগুলো দীর্ঘ কুয়াশায় নষ্ট হয়ে যাওয়া গোছা গোছা সবুজ বলেই। আমরাই যেন ওঁর নায়কের মতো মফস্সলের রাস্তায় মাউথ অর্গানে সুর ভেজেছি ‘আমি যে আঁধারে বন্দিনী’। নদী কুয়াশায় আধডোবা স্টিমারের মতো ঘাটে বন্দি হয়ে দেখেছি, পৃথিবীর সব ভালো ভালো মেয়েদেরই আর্মির সঙ্গে বিয়েশাদী হয়ে যেতে। আমরাই ক্ষেপে উঠেছি ছাইওয়ালীর ‘ছাই লাগব ছাই’ ডাক শুনে, অকারণ ক্ষেপে উঠেছি ভাঙা কাচকুড়ুনির প্রতি, ছাই আর ভাঙা কাচের মতো অকিঞ্চিৎকর হয়ে উঠছি বলে। আমরাই হয়ে উঠতে পেরেছি সময়ের ‘র‌্যান্ডম স্যাম্পল’, একেকটা ‘ম্যানা শয়তান’।

কিন্তু সর্বত্র তিনি মাউথ অর্গানের সরু সুর হয়ে নেপথ্য প্রশ্ন হয়ে মিলিয়ে যান না। কখনও কোনও সোনালি সুস্পষ্ট মুহূর্তে তিনি লিখে ফেলেন কেমন করে পৃথিবীর প্রতিবাদহীন সকল মানুষকে তিনি গালিগালাজ করেন :

‘মনে মনে বলি আমি, তোমাদের ইতিহাসে সেনাবাহিনী এদেশের গৌরব। কিন্তু আমার ইতিহাসে সে চিরকালের ঘৃণা। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন এই সেনাবাহিনীকে ঘৃণা করে যাব। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন এই সামরিক জান্তাকে ঘৃণা করে যাব। প্রতি বছর তোমরা সশস্ত্র দিবস উদযাপন করবে আর বলবে মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর গৌরবময় ভূমিকার কথা। প্রতি বছর আমি আমার বড়ভাইয়ের মৃত্যুতে খুব নীরবে বড়ভাইয়ের কবরের কাছে দাঁড়িয়ে মনে করব ক্ষমতাপ্রেমিক সেনাবাহিনীর রক্তপাতময় হত্যাযজ্ঞের কথা। প্রতি বছর তোমরা গোয়েবল্‌সের মতো বলবে, এই সামরিক জান্তার ডাকেই মানুষ আপ্লুত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে; কিন্তু একদিন নয়, প্রতিদিন এই শহরের পথ দিয়ে যেতে যেতে আমি অনুভব করব, কী করে একজন উর্দিপরা সামরিক জান্তা মসনদে চড়ে আবারও ফিরিয়ে এনেছে অন্ধকার সামরিকতার যুগ এবং খুব গোপনে শ শ মানুষকে ধরে নিয়ে ফাঁসি দিয়েছে সেনানিবাসের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নামকাওয়াস্তে বিচার করে।’

আমার জন্য এই পাঠকাল ছিল ভারী একাত্মতাবোধ করবার সময়। ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’-এ আশ্বিনের কুয়াশায় ডুবে ডুবে বুবু গায় ‘আমি আঁধার বিছায়ে আছি রাতের আকাশে, তোমারই আশ্বাসে’, তারস্বরে এই লাইন কত গেয়েছি রান্নাঘরের নিভৃতিতে, কত দিকভ্রান্তির বিভঞ্জন চেয়ে। ব্যক্তির একটি আন্তর-অভিযানকে তিনি পরিণত করেন সমাজ ও সমষ্টির অভিযাত্রায়। কিন্তু সেই যাত্রায় সাজ-সাজ রব নেই, কোথাও যেন ইসলামিয়াত বইয়ে পড়া সেই ‘বাতেনি-জিহাদ’-এর মতন করে আন্তরিক বিপ্লব ঘটে যায়, কারা যেন এসে কাদের উৎখাত করে দখল নেয়, কাদের সংলাপকে যেন মনে হয় প্রলাপ। লেখক উদাসীন নন কিন্তু ভয়ানকভাবে ইনভল্ভডও নন, অথচ একটা আন্তরিক সমবেদনায় একটা মানস সৌন্দর্যের ভূমি স্থায়ী হয়ে আছে লেখাগুলোতে। পড়তে পড়তে একেকবার আমার মনে হয়েছে, ইমতিয়ার শামীম ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে পারেন এই জন্যে যে, এ চরাচরে পুরুষ সাহিত্যিক হিসেবে তিনি জন্মেছিলেন। নইলে ‘সব লেখায় একই ঘোর’, ‘বিবরণই তো দিলেন, ভাষা ভাল, গল্প কই’ ইত্যাদি বেফুজুল কথা হয়তো শুনতে হতো। সেটা লেখকের খামতির কারণে নয় নিশ্চয়ই, অপরিণত পাঠকের অসহিষ্ণুতার কারণে; কিন্তু সেসব কথা হয়তো স্থায়ী হতে পেত। বাংলাদেশে এখনও ভাষার বিবরণে গল্প বলার এই দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি সমাদৃত নয়, ভবিষ্যতে হবে আশা করি। গ্রিক মিথলজিতে নিয়তির তিন বোনের একজন সুতোকাটুনি, তাঁকে সব্বাই চেনে, কিন্তু মধ্যম ভগ্নি গ্রন্থি নির্মাণ করেন, তিনি অত সর্বজনবিদিত নন। ইমতিয়ার শামীমের গদ্য আমাকে সেই গ্রন্থি-নির্মাতা বোনটিকে মনে করিয়ে দিয়েছে।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares