নিবন্ধ : ইলিশ-স্মৃতি ইলিশ-প্রীতি : হামিদ কায়সার

এ-এক চিরন্তন বাঙালি-সমাজের গল্প, বাঙালির চিরচেনা রুচি। বাড়িতে নতুন জামাই এসেছেন। শশব্যস্ত শ্যালক মানিক দুলাভাইয়ের জন্য ডাব পাড়ছে আর মা তাকে তাগিদ দিচ্ছে হাটে যেতে, জামাইয়ের জন্য যে ভালোমন্দ রাধতে হবে! হাটে যাওয়ার আগে মানিক দুলাভাইকে ডাব কেটে পানি খাওয়াতে খাওয়াতে জানতে চাইছে, দুলাভাই কি মাছ খাইবেন ? দুলাভাই একটু ভেবে নিয়ে জানাল, ইলিশ! ইস! এই ইলিশটা বলার সময় তার যে মুখের অভিব্যক্তি! যেন নতুন নতুন শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে শুধু ও জিনিসটাই যায়, জীবনের সমস্ত স্বাদ উপচে ওঠে!

তো, জামাইকে রাতে খেতে দেওয়া হয়েছে বারান্দায়, শীতল পাটি বিছিয়ে। এও এক রীতি ছিল বটে, তখন চিরন্তন বাংলার। উঠোনে শীতল পাটি বিছিয়ে তার ওপর বসিয়ে জামাই কী আত্মীয়স্বজনকে খাবার দেওয়া হতো। গরমকালে তালপাতার পাংখার বাতাস।

যা হোক, জামাই বাবাজি তো খেতে শুরু করলেন, কিন্তু খাওয়া যেন তার জমে উঠছে না! মাথার ওপর যে বাল্বটা লাগান, তা তেমন জুতসই আলো দিতে পারছে কই! এক সময় থাকতে না পেরে, তিনি আর মনের বিরক্তি কিছুতেই লুকোতে পারলেন না, উহহু! কি বাত্তি লাগাইছে, কাটাকুটা কিচ্ছুই দেখি না। তখন শাশুড়ি আম্মা একটু বিব্রতই হলেন। চেঁচিয়ে মানিককে তাগাদা দেন, ও মানিক! বৈঠকখানার বাতিটা এইখানে লাগিয়ে দে।

মানিক ঝটপট বৈঠকখানার বাতি লাগিয়ে দিতেই জামাই খুশিতে আহ্লাদিত গলায় বলে উঠল, কী তামশা। একেবারে সব ফক্ফকা। তারপর সে জানতে চায়, মানিক কি বাত্তি লাগাইলি ? মানিক তখন জানাল যে, ফিলিপস। জামাইয়ের খাওয়া পুরো জমে উঠেছে। ইলিশ বলে কথা! তিনি উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠলেন, মাছের রাজা ইলিশ আর বাত্তির রাজা ফিলিপস।

আমি যে বিজ্ঞাপনটির বর্ণনা দিলাম, তা ফিলিপস বাল্বের। বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন-শিল্পে বহুজাতিক ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি ফিলিপস বাল্ব-এর এই বিজ্ঞাপন এক সময় খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এক সময় কী, আজও এখনও, বিজ্ঞাপন-সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন-শিল্পে ফিলিপস বাল্ব-এর এই বিজ্ঞাপন একটি টার্নিং পয়েন্ট। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনচিত্রে প্রথম সার্থকভাবে বাংলাদেশের লোক-সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবনাচারকে বিশ্বস্তভাবে তুলে ধরা হয়।

বিজ্ঞাপন-শিল্পের সঙ্গে যারা যুক্ত তারা জানেন, একটি পণ্যের বিজ্ঞাপন নির্মাণের পূর্বে বেশ ভালোভাবে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান তৈরি করা হয়। ফিলিপস বাল্বের বিজ্ঞাপন করার সময়ও স্ট্র্যাটেজি নেওয়া হয়েছিল, সদ্য গ্রামেগঞ্জে বিদ্যুতের আলো ছড়িয়ে পড়ার এই মহার্ঘ্যক্ষণে বাংলাদেশের গ্রামীণ এবং মফস্সল সমাজের কাছে যে জিনিস সবচেয়ে প্রিয় বা সবার কাছে যেটা সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য, সে-বিষয়টিকে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা। সে-পরিপ্রেক্ষিতে তারা দ্বিধাহীনভাবে বেছে নিয়েছিল ইলিশ মাছ। তাদের স্লোগানের আগে থেকেই অবশ্য, ইলিশ মাছ মাছের রাজা হিসেবে বাংলা এবং বাঙালির কাছে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল, অ্যাডে সে-ব্যাপারটি সার্থকভাবে আসায়, বিজ্ঞাপনটি দারুণ হিট করে যায়।

সত্যি, খাবার হিসেবে একমাত্র এই ইলিশ মাছই বুঝি বাঙালি ধনী-গরিব, বড়-ছোটো, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবার কাছেই অতি আদরণীয়, পরম প্রার্থিত। এই ইলিশ মাছ যে বাঙালি কতভাবে খেতে জানে, কত পদে, তার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। প্রথমে আমি নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়েই তুলে ধরার চেষ্টা করব। তা না হলে হয়তো বিষয়টার গভীরে প্রবেশ করা সম্ভবপর হবে না।

আমার শৈশবে, আমার জন্ম ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে, আমার বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝেছি ইলিশ মাছ কী এবং এর গুরুত্ব কতখানি! আমাদের গ্রামে হাট বসত প্রতি সোমবার। সেটা এমন সময়ের এক হাট, যখন বিদ্যুৎবাতি ছিল না, ঘরে তো ফ্রিজ রাখার কথা কল্পনাই করা যেত না, রাস্তাঘাটও ছিল না ভালো। ভালো কী, রাস্তাই ছিল না তেমন। মানুষকে সারা সপ্তাহের বাজার ওই একদিন সোমবারের হাট থেকেই সেরে রাখতে হতো। প্রতি সোমবারে দেখতাম দুপুরের পর থেকে শুরু হতো হাট থেকে ঘরে ফেরা মানুষের ঢল। তখন এমন ভাবনা মাথায় আসেনি। কিন্তু আজ ভেবে অবাক লাগে যে, হাটফেরতা প্রতিটি মানুষের হাতে-হাতে থাকত ইলিশ মাছ। মাছ-বিক্রেতা ইলিশের কানসার মধ্যে কী একটা গাছের শিকড় দিয়ে প্যাঁচ মেরে দিত। লোকজন তা হাতে ধরে ফিরে আসত ঘরে। তবে সে-মাছ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে আনার জন্য মাশুলও দিতে হতো! রাস্তায় যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, অনিবার্যভাবেই জানতে চাইছে, ইলিশটার দাম কত।

আচ্ছা, ইলিশ ছাড়া কি আর কোনও মাছ ওভাবে কানসার মধ্যে লতা প্যাঁচিয়ে হাতে-হাতে ঝুলিয়ে আনতে দেখেছি ? বোধ হয় না। ইলিশ ছাড়াও তো আরও সব বড় বড় মাছ ছিল, হাটে পাওয়াও যেত, রুই, আজকের এই চাষের রুই না। চাষের রুইয়ের কোনও অস্তিত্বই ছিল না তখন। চাষের মাছগুলো এল আরও অনেক পরে, এই যে আজকের দিনে যা দিয়ে চলছে খাওয়াদাওয়া―রুই, পাঙ্গাশ, পাবদা, তেলাপিয়া, ক্যাপ্টেন, কার্ফু, কই―এসব চাষের মাছের অস্তিত্ব তখন ছিল না। যা ছিল সবই অরিজিন্যাল গাঙের মাছ, নদীর মাছ, বিলের মাছ, পুকুরের মাছ অর্থাৎ যাকে বলে মিঠা পানির মাছ। বড় বড় রুইয়ের সঙ্গে জেলেদের মাছের সম্ভারে আরও দেখা যেত মৃগেল, গরমা, কাতলা, ভেটকি, চিতল, বোয়াল, আইড় মাছ। কিন্তু এসব কোনও মাছকেই কখনও কানসার মধ্যে লতায় বেঁধে ঝুলিয়ে আনতে দেখিনি। কারণটা কি, ওসব মাছের দাম বেশি ছিল বলে ? হ্যাঁ, এটা একটা কারণ হতে পারে, ইলিশের তুলনায় দেশীয় মিঠা পানির বড় মাছগুলোর দাম ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। ওসব মাছ কেনা ছিল একটা বড়লোকি ব্যাপার। উচ্চমূল্য দিয়ে কেনার সামর্থ্য তখনকার অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেরই ছিল না।

সেটা হতেই পারে, তাই বলে কেউ একজনও সেসব মাছ কিনত না, সেটা তো সম্ভব নয়। অবশ্যই কিনত। তবে কি না সে-মাছ বাড়িতে নিয়ে আসত কোনও একটা ব্যাগে ভরে। পাটের ব্যাগ, চটের ব্যাগ, তখন কত রকমের ব্যাগ ছিল সদাই আনার। সে ব্যাগ ভরে ভরেই পান সুপারি থেকে শুরু করে আটা-ময়দা-চাউল-ডাউল-পেঁয়াজ, রসুন, ঝাল মরিচ কাঁচা মরিচ, মাছ মাংশ যা যা লাগে সংসারে―ওই এক ব্যাগের ভেতরেই জায়গা পেত। মায় বেহাতি পর্যন্ত। হাটের দিনে বাড়ির সবার জন্য বেহাতি আনাটাও ছিল রেওয়াজ। বেহাতি মানে খাবারদাবার―কেউ আনত জিলাপি, চমচম, আমৃত্তি, রসগোল্লা, কেউবা আনত নিমকি অথবা পিয়াজু বা অন্য আরওসব যা যা আছে সেসব খাবার। তা যাই হোক, সেটারও জায়গা হতো ব্যাগের ভেতর। ইলিশই শুধু নিয়ে আসত হাতে ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে! এ-মর্যাদাটা আর কোনো পণ্যসামগ্রী পেত না বললেই চলে।

আর, সোমবারের সেই হাটবারে, বিকেল যখন পড়তি পথে বেরুলেই পাওয়া যেত ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ। প্রতিটি বাড়িতেই ভাজা হতো ইলিশ। আর সেই ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ত চারদিক। সে-ঘ্রাণেই অর্ধভোজন হয়ে যেত মানুষের। আজ গোলাপের যেমন ঘ্রাণ পাই না, পথে তো দূরের কথা, ঘরেও পাওয়া যায় না ভাজা ইলিশের সেই আস্বাদানীয় ঘ্রাণ। আমি আমাদের উঠোনের এক কোণের মাটির চুলাকে ঘিরে রান্নার জায়গাটায় দেখতাম, ইলিশ মাছটা কুটে চাক চাক করে ধুয়ে জাস্ট হলুদ মরিচ মিশিয়ে কড়াইয়ের তেলের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হতো! মুহূর্তেই চারদিকে ঘ্রাণ ছড়ায়ে ভাজা হয়ে যেত ইলিশ মাছ। ইলিশের পেটি ছিল সবার কাছেই প্রত্যাশিত। মুরগির রান যেমন ছিল প্রেস্টিজ ইস্যু, তেমনি একজনকে পেটি দিয়ে পাশের আরেকজনকে গাদা দিলে, তার ইগোতে বড্ড লাগত!

আমাদের বাড়িতেও প্রতি সোমবার রাতে ইলিশ মাছের ভাজা দিয়ে ভাত খাওয়াটা ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। কখনও কখনও সে-ভাজার সঙ্গে থাকত ইলিশের ডিমভাজাও, মাথার আশেপাশের কানসা এবং যোগ্য সহোদর হিসেবে পটোল ভাজার উপস্থিতিও লক্ষগোচর হতো। মা গাদা-পেটির জটিলতায় যেতে চাইতেন না। এমনভাবে টুকরো করে নিতেন মাছটা, গাদা-পেটি ভাই ভাই হিসেবে একসঙ্গে বিরাজমান থাকত।

হাটের দিনের পরদিন থেকে দেখা যেত একেকদিন একেকভাবে একেক তরকারির সঙ্গে রান্না হচ্ছে ইলিশ মাছ। কোনও দিন হয়তো স্রেফ আলু দিয়ে কোরমা। কোনও দিন আবার আলুও থাকত না। জাস্ট পেঁয়াজ প্রভাবিত কোরমা। পরের দিন হয়তো আলু দিয়ে করা হলো ঝাল তরকারি। এর পরের দিন হয়তো রান্না করা হলো পটোল দিয়ে, অন্য আরেক দিন হয়তো বেগুন দিয়ে। কচুমুখী দিয়েও ইলিশ রান্না করতে দেখেছি। কচুমুখী, কাঁচকলা। তবে সব তরকারিতে যে ইলিশ নায়িকার ভূমিকায় থেকেছে, তা না, কোনও কোনও পদে ওকে সাইড নায়িকার রোলও নিতে হয়েছে। যেমন মিষ্টি কুমড়ার সঙ্গে হয়তো ইলিশের মাথাটা ভেঙেচুরে দেওয়া হলো বা কুমড়ো অথবা লাউয়ের সঙ্গে বা পুঁইশাকের সঙ্গে, তাতে ওই প্রধান নায়িকার স্বাদ এবং গুণ দুটোই যেত বেড়ে। তাতে কি, নেপথ্যে যে ইলিশই রেখেছে সে-স্বাদ গড়তে মূল নিয়ামক ভূমিকা, তা তো আর যে-রাঁধিয়ে তার কাছে যেমন, যারা খাওয়াটার নাচগান উপভোগ করল―তাদের কাছেও অস্পষ্ট থাকত না, কাজেই নায়িকা মার খেয়ে যেত! জয় হতো আইটেম গার্ল ইলিশেরই!

আর, নোনা-ইলশার কথা কি বলব! আমাদের বাড়িতে তো আগে আগে মাসে দু’-তিনবার রান্না হতোই। বেশিও হতো। আলু দিয়ে নোনা-ইলিশের বিরন বেশি জমত। সামান্য একটু নোনা ইলিশ দিয়ে পুছে পুছে দুতিন প্লেট ভাত অনায়াসে সাবাড় করে দেওয়া যেত। এখন কেন যেন নোনা ইলশার গুণও সেই আগের মতো নেই।

বাড়িতে তো ইলিশ খাওয়ার বেশ মুখরোচক অভিজ্ঞতা আছেই, আমার নানাবাড়িসহ বিভিন্ন আত্মীয়বাড়িতেও ইলিশ দিয়ে ভাত খাওয়ার স্মৃতি এখনও টাটকা হয়ে আছে। একবার আমার নানা বাজার থেকে একটা নরম ইলিশ মাছ এনেছিলেন। নরম মানে বেশ নরম, প্রায় গন্ধ ছোটে আর কি, নানি খুব রাগ করেছিলেন, তাই বলে ফেলে দেননি মাছটি, বাড়িতে ছিল লেবুবাগান, সেই লেবুবাগান থেকে লেবুপাতা এনে ইলিশমাছটাকে ভেঙেচুরে যাকে বলে ঘাট্টা, সেই ঘাট্টা রেঁধেছিলেন, তার স্বাদ এমনই হয়েছিল, আমি আজ পর্যন্ত যত ইলিশ মাছ খেয়েছি যত পদের রান্নার, সেই ঘাট্টার স্বাদটাই সবচেয়ে বড় আমোদ হয়ে এখনও জিভ থুয়েটুয়ে আমার স্মৃতিকোষে স্থায়ী আসন নিয়ে রেখেছে। সেই স্বাদ আর জীবনে কখনও কোনও ইলিশ মাছ খেয়ে পেলাম না। কীভাবে পাব, বাজার থেকে তো আর কেউ শখ করে চেয়েচিন্তে নরম বা কাহিল ইলিশ মাছ আনে না, আনলে কানসা পেট দেখেশুনে টিপেটুপে বাজারের সবচেয়ে ভালো এবং টাটকাটিই নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। নানাও আর দ্বিতীয়বার কোনও দিন অমন নরমসরম ইলিশ মাছ আনেননি। স্বভাবতই নানিকেও আর লেবুপাতা খুঁজে এনে ইলিশ ভেঙেচুরে ঘাট্টা বানানোর প্রয়োজন হয়নি। আমি আমার মাকে বলে-কয়ে একবার লেবুপাতা জোগাড় করে ঘাট্টা রান্না করিয়ে ছেড়েয়েছিলাম। ইলিশ মাছের সঙ্গে লেবুপাতার মিশ্রণে আলাদা একটা স্বাদ পেয়েছি বটে, কিন্তু নানির সেই ঘাট্টার স্বাদ সামান্যও মিলল না। বোধ হয় ইলিশ মাছ যত নরম হবে, লেবুপাতার সঙ্গে ওর মিশ্রণ তত জটিল হয়ে অনাস্বাদিত স্বাদ তৈরি করে পুলক ছড়াবে!

নানাবাড়ি ছাড়াও অনেক আত্মীয়বাড়ি খেয়েছি কত উপলক্ষে, উপলক্ষ ছাড়াও খেতে হয়েছে, নাদানগিরিও করেছি কম না। একবার নানাবাড়ির গ্রামে মায়ের এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়বাড়িতে গিয়েছিলাম বেড়াতে, বিকেলবেলা। মা তো ছিলই, আমার তিন খালাম্মাও ছিল। আমাদেরকে চা-নাস্তা খেতে দিয়েছে। আমার বাচ্চা বয়স, সেসব খেতে ইচ্ছে করছে না। সে-বাড়ির গিন্নি তিনি আমার মায়ের সম্পর্কে কি লাগেন, এখন আর মনে পড়ছে না, হঠাৎ বলে উঠলেন, আঁই! ইলিশ মাছ আছে, ভাত খাবি ? ভাত দেই তরে ?

মনে আছে আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। বোধ হয় ইলিশ মাছের কথা শুনে। মা তেড়ে উঠেছিল, এখন ভাত খাবে কেন, বিকেলবেলা। কে শোনে কার কথা! আমাদের সেই আত্মীয়া কাচের একটা প্লেটে, তখন মেহমানদের সমাদর করে ঘরের আলমারিতে যত্ন করে সাজিয়ে রাখা, কাচের প্লেট বের করে আবারও যত্ন করে ভালোভাবে ধুয়েমুছে তাতেই দেওয়া হতো ভাত, আমার পাতে ইলিশের পেটিসহ ঝোল দিয়ে ভাত দিয়েছিলেন।

ইলিশ মাছটা পেটে দিয়েই আমার জিভ তো বটেই, মনপ্রাণ ভরে গিয়েছিল সমানে। সেটা ছিল সর্ষে ইলিশ। সর্ষে ইলিশ আমি আগেও খেয়েছি বাড়িতে, এমন মাখনের মতো নরম স্বাদের ইলিশও কম খাইনি, কিন্তু অসময়ে সেই বিকেলে, অন্য এক নারীর হাতের ভিন্ন স্বাদের রান্নার ইলিশ খেতে গিয়ে আমি যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। আমার সেই হারিয়ে যাওয়া দেখেই কি না, মনে আছে সেই আত্মীয়া মাকেও খাওয়াতে চেয়েছিল ইলিশ মাছ, অপুর মা। খাবে নাকি ভাত ? পদ্মার ইলিশ!

আহা! আজও যেন জিভে লেগে আছে সেই স্বাদ। সেই আমি প্রথম নাম শুনলাম পদ্মার ইলিশের। পরে দিনে-দিনে আরও কতবার যে জেনেছি, পদ্মার ইলিশের গুণের কথা, স্বাদের কথা, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। তবে এই ইলিশও যে কত প্রকারের হতে পারে, জানা ছিল না। আগে শুধু জানতাম, ইলিশ হয় পদ্মার আর ইলিশ হয় সাধারণ।

সবাই পদ্মার ইলিশেরই ভক্ত। পরে, পরে আরও কত কিছু জানলাম, চাঁদপুরের মেঘনা আর বরিশালের কীর্তনখোলায় যে যে ইলিশ পাওয়া যায় তাকেই বলা হয় পদ্মার ইলিশ। এর স্বাদ-গুণ, গড়ন-গাড়ন সবই অতি উচ্চস্তরের; একেবারে পদ্মিনী নারীর যেমন। এ-ইলিশ যে শুধু কীর্তনখোলা আর মেঘনায়ই জোটে, তা না; পদ্মা, বিষখালী, পায়রা, আড়িয়াল খাঁ নদীতেও নাকি পাওয়া যায়। জেলেরা ইলিশ ধরতে ধরতে পার্থক্য  বোঝেন, নিজেদের মতো আবার সেই পদ্মার ইলিশকে নানা পদ দেখে নানা নামে ডাকেন―ইলশাগাঙি, ইলশা মুখপ্রিয়া, ইলশা জলতাপী, ইলশা বারোয়ারি, ইলশা ফ্যানফ্যানা, ইলশা ঢ্যাপঢ্যাপা, ইলশা লটপটি।

সাদা চোখে সব ইলিশকে এক রকম মনে হলেও আসলে স্বাদ-গুণের ব্যবধানে, গায়ের রঙের তারতম্যে, নদীতে-সমুদ্রে অবস্থানের ভিন্নতার কারণে ইলিশ কিন্তু হয় ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির। সেই হিসেবে বাংলাদেশে রয়েছে ছয় জাতের ইলিশ। পদ্ম ইলিশ, চন্দনা ইলিশ, খয়রা ইলিশ, গুরতা ইলিশ, বড়ো চৌকা ইলিশ, চৌকা ইলিশ। কয়জনে বাজারে গিয়ে ইলিশের এই পার্থক্যটা ধরতে পারেন ? যারা পারেন, তারা সত্যিই ভাগ্যবান। কেননা, তারা হাত বাড়িয়ে পদ্মাকেই প্রথম বেছে নিতে পারেন। অন্য সব প্রজাতির তুলনায় এই ইলিশ যেমন বড় হয়, স্বাদেও সবচেয়ে সুস্বাদু, দেখতেও তুলনাহীন। চন্দনা ইলিশ স্বাদে বৈশিষ্ট্যে পদ্মের কাছাকাছি, তবে একটু খাটো। খয়রা বা বোরং ইলিশের দেহের ওপরের দিকে ধূসর-সবুজ ও পাশের দিকে রূপালি। গুরতা ইলিশের গায়ের ওপরের দিকটা নীলাভ সবুজ। মুখটা ওপরের দিকে তোলা থাকে। বড়ো চৌকা আর চৌকা ইলিশেরও আছে সুস্পষ্ট আলাদা বৈশিষ্ট্য।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন যদিও পোলাও মাংশ, বিরিয়ানির সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হতে চলেছে স্বাস্থ্যগত কারণে, কিন্তু শৈশব থেকে কিছুদিন আগেও সেসব খাবারের প্রতি আমার দুর্বলতা ছিল মারাত্মক রকমেরই সীমাহীন। সেই মাংসশাসিত পোলাও-বিরিয়ানির রাজত্বেও দেখেছি ইলিশের আধিপত্য এবং প্রভাব। বিয়েবাড়িতে তো বটেই, ঘরেও যখন পোলাও রান্না হতো, খাওয়াটার সূচনা হতো ভাজা ইলিশ সহযোগে। যেন ইলিশ স্কুলের অ্যাসেম্বলি ক্লাস, আন্তর্জাতিক খেলাধুলার জাতীয় সঙ্গীত। ভাতে যেমন ইলিশ জমিয়ে তোলে খাওয়া, পোলাওয়েও আনে অতুল্য তৃপ্তির ঢেঁকুর। শুধু যে ইলিশ ভাজা-পার্বণে পোলাওয়ের উদ্বোধনী ইনিংসের দুরন্ত সূচনা ঘটায় তা না, ইলিশ-পোলাওয়ে একেবারে রান্নাটার সর্বান্তকরণে মিশে থেকে ঘিয়ে-মশলায়-চালে-জলে একাত্ম হয় ক্ল্যাসিকেল মিউজিকের অভিজ্ঞান দেয়।

নিজের কথা তো অনেক হলো, এবার বউয়ের কথাও একটু বলতে হয়। ইলিশপ্রিয় বাঙালি যে একটু বউঘেঁষা হবে সেটা তো জানা কথা। বউ আমার মন জয় করে নিয়েছিল বাসররাতেই, তবে আমার বাবার মন জয় করে নিতে ওকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আমার বাবা, মায়ের রান্নার শক্ত ভক্ত। তার ওপর আবার, মা বিক্রমপুরের মেয়ে! বিক্রমপুরের মেয়েদের তো রান্নার হাতের যশ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। তো মায়ের সেই রান্নাকে অতিক্রম করে, একটা ভিন্ন হাতের রান্না আমার বাবার সহজেই ভালো লেগে যাবে―এতটা আশা করাও তো বোকামি। অথচ সেই বাবাকে, আমার বিয়ের প্রায় চার-পাঁচ বছর পর, হঠাৎই একদিন আমার বউয়ের রান্নার প্রশংসায় উচ্চকিত হতে দেখলাম, দেখলাম যে তিনি কী ব্যাপক বিহ্বল হয়েছেন! আমি আরও ততোধিক বিস্ময়াভিভূত হয়েছি এই দেখে যে, সেখানেও অঘটনঘটনপটিয়সীর ভূমিকায় পদ্ম না পদ্মিনী কোনও ইলিশ মাছ। সঙ্গত কারণেই সে-ঘটনার পর ইলিশ জাতটার প্রতি আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা-বোধ বেড়ে গিয়েছে। তারপর থেকেই মনে হয়, ইলিশ আমার শ্বশুরপক্ষের আত্মীয়।

এবার ঘটনার বিস্তারিত বিবরণীতে প্রবেশ করা যাক। সেবার হয়েছিল কী, আমার বউ চরম একটা রিস্ক নিয়ে ফেলেছিল। হ্যাঁ, রিস্কই তো! সেদিন কী একটা অনুষ্ঠান ছিল। কার যেন জন্মদিন নাকি কী, মনে নেই। বাসায় অনেক আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব আসবে। বাবা নিজে বাজার করে নিয়ে আসলেন, আগেরদিন। মাংসের সঙ্গে ইলিশ মাছও এনেছেন, বড়োসড়ো। মা ইলিশ ভাজার প্ল্যান করল। ভাগড়া দিল আমার বউ। মা, সব সময় তো ভাজা খাই-ই। এবার না হয় একটা নতুন আইটেম করব। কী সেই নতুন আইটেম ? ইলিশ ভাপা। মা কিছুতেই রাজি হন না। কেমন না কেমন স্বাদ হয়। তাছাড়া বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমার বউও হাল ছাড়তে রাজি নয়। পরে কী ভেবে যেন মা রাজি হয়ে গেলেন।  

আমার বউ নিল সেই চ্যালেঞ্জটা। এটা রান্নার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কষ্ট করে ইলিশটাকে কাটাকাটি করতে হবে না। আলসে টাইপের বউদের জন্য নিঃসন্দেহে এটা একটা বিরাট সুবিধা। শুধু আস্ত ইলিশটাকে ভালোভাবে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিতে হবে। তারপর সামান্য আদা-রসুন বাটা, কয়েকটা আস্ত পেঁয়াজ ছোট ছোট, আস্ত কাঁচামরিচ কয়েকটা, সামান্য ভিনেগার, অল্প লেবুর রস, সামান্য লাল মরিচের গুঁড়ো, অল্প চিনি, সামান্য সোয়াবিনের তেল―সব মিশিয়ে ভালোভাবে মাছটায় মাখিয়ে একটা বড় হাঁড়িতে বেশি পানি দিয়ে, হাঁড়ির মুখটা ঢেকে চুলায় বসিয়ে রাখতে হবে। বলগ ওঠার পর জাল কমিয়ে দিতে হবে (ঢাকনা কোনওমতেই খোলা যাবে না)। ঢিমা অর্থাৎ অল্প আঁচে কম পক্ষে ৮ ঘণ্টা চুলায় রাখতে হবে। এই ৮ ঘণ্টাতেই ইলিশ মাছ সিদ্ধ হয়ে যাবে। পানি কমে আসবে। পানি থেকে গেলে মাছটা নামিয়ে একটা প্লেটে রেখে পানিটা জোরে জ্বাল দিলে বেশ থকথকে ঘন একটা ঝোল তৈরি হবে। তারপর লবণ দেখে আস্ত মাছটার মধ্যে ওই ঘন ঝোল পুরোটাই ঢেলে দিতে হবে। মাছটার ওপরে সস আর টমেটো দিয়ে ডেকোরেশন করে এবার পরিবেশন করা যাবে। আমার বউ তাই করল, সারারাত ইলিশটাকে নিয়ে খাটাখাটুনি। পরদিন খাওয়ার টেবিলে রীতিমতো ঘটে গেল বিপ্লব। আমার বাবার ইলিশ নিয়ে মুহুর্মুহু প্রশংসা শুনে অন্য যারা আত্মীয়স্বজন এসেছিল, পড়ল তার ওপর হামলে, ফলাফল যা ঘটেছিল, আমি আর আমার বউ আর সেই ভাপা ইলিশের ভাগ পাইনি। তবু অপূর্ব স্বাদের এক আত্মতৃপ্তি আমাদের দুজনের মনেই জিইয়েছিল অনেক দিন।

আমার বউ ইলিশ নিয়ে এমন রিস্ক নিতে এখনও পছন্দ করে। ইলিশ নিয়ে নতুন নতুন পদ রান্না করতে চায়। কিন্তু কথা হলো, একজীবনে কারও পক্ষে সম্ভব রবীন্দ্রসাহিত্য পাঠ শেষ করা ? একজীবনে তেমনি কারও পক্ষে সম্ভব নয়, ইলিশ নিয়ে যত পদের রান্না আছে, তার সবটারই স্বাদ নেওয়ার। ইলিশ তো ইলিশ, ইলিশের ডিম নিয়েই তো কত রকমের কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলা যায়। ইলিশ মাছের ডিমের ঝুরা, ডিমের বড়া, সরিষা বাটা ঝাল, ডিমের ঝোল―এই ঝোল আবার হতে পারে নানা পদের―আলু সহযোগে, বেগুন সহযোগে বা শুধু পেঁয়াজ দিয়ে। ভাজা তো সে আরেক জাদু! আর ইলিশমাছ রান্নার তো আছে শ’শ’ কায়দা ও রেসিপি। আলোচনার সুবিধার্থে আমরা পদগুলোকে প্রধানত এভাবে ভাগ করে নিতে পারি।

১. কারিÑকোর্মাÑঝোলÑঝাল-স্টু: এ ধারার যে কত আইটেম হয়। বলে কি শেষ করা যাবে। ইলিশ কারি, কোর্মা, মাছের তেল-ঝোল, মাছের ঝোল, পাতলা ঝোল, সরিষা বাটা ঝোল, ইলিশ স্টু, পাঁচমিশেলি বেসন ঝোল, হলুদ ঝোল, ডাল ঝোল।

২. গ্রিলড-বেক্ড-রোস্টেড-স্মোকড : এই ক্যাটাগরিতেও পদের কোনও শেষ নেই। ইলিশ বেকড্, মাছ ঝলসান, মাছের রোস্ট, সরিষা পেস্টে ইলিশ, ধুঁয়াদার ইলিশ, স্মোকড হিলসা, ইলিশ কাবাব।

৩. দই ও নারকেল ইলিশ : এখানেও যে কত বিন্যাস, অভিনবত্ব। ইলিশ মাছের মালাইকারি, ইলিশ মৌলি, দই ইলিশ, নারকেল ইলিশ, নারকেল দুধে ইলিশ।

৪. ঘণ্টÑইলিশের মাথা ও লেজ সহযোগে : ষোলআনা বাঙালিয়ানা যাকে বলে! ইলিশ মাছের মাথা ও লেজের কষা, মাথা দিয়ে কচু শাকের ঘণ্ট, লাউশাক দিয়ে ইলিশ ঘণ্ট, মাথা দিয়ে কলমি শাকের ঘণ্ট, ইলিশ মাছের মুড়িঘণ্ট, চালকুমড়া দিয়ে ইলিশ মাছের মাথা।

৫. পোলাও-খিচুড়ি-বিরানিতে ইলিশ : বলা হয় যে ভারতবর্ষ জয় করতে এসে ইলিশ খেয়েই মারা গিয়েছিলেন তুঘলক আর আলেক্সান্ডার। এত ইলিশই তারা খেয়েছেন। শুধু কি খেয়েছেন, ইলিশকে শাহি চরিত্রও দান করেছেন। কত স্বাদে কত জুড়ি। ইলিশ পাতুড়িতে ঝাল খিচুড়ি, ইলিশ পোলাও, ইলিশ মাছের কমলা বিরিয়ানি, ইলিশ মাছের বিরিয়ানি, ভুনাখিচুড়ি, আখনি ইলিশ খিচুড়ি।

৬. ফল শাকসবজি দিয়ে ইলিশ : কতো পদের কথা বলব! তবুও কিছু তো বলতে হয়। আনারসি ইলিশ, আমের আচার দিয়ে ইলিশ, লাউপাতা দিয়ে ইলিশ ভর্তা, ইলিশের চালকুমড়া, ইলিশের কাঁচকলা, ইলিশের চৌ চৌ, কমলা ইলিশ, বেগুন ইলিশ, লেবুপাতায় করমচা ইলিশ, শসা দিয়ে ইলিশ, শিমের বিচি দিয়ে ইলিশ, কাঁকরোল দিয়ে ইলিশ, পটোল ও সরিষা দিয়ে ইলিশ, পটোল ও আলু দিয়ে ইলিশ, ডাঁটা ও আলু দিয়ে ইলিশ, আলু ও ঝিঙা দিয়ে ইলিশ, কচু দিয়ে ইলিশ, ফুলকপি ও আলু দিয়ে ইলিশ।

৭. ফ্রাই ও ভাজা ইলিশ : কে আবার জানে না ভাজা মাছটি উল্টিয়ে খেতে, তা আবার যদি হয় ইলিশ! ইলিশ মাছের তেলে ইলিশ মাছ ভাজা, ইলিশ ফ্রাই, ইলিশের দো-পেঁয়াজি।

৮. ভাপা ইলিশ : এই যে আমার গিন্নি, যে ভাপা ইলিশ রেঁধেছিল। তাও আছে কত প্রকারের। ভাপে সরিষা ইলিশ, ইলিশ ভাপে, ভাতের ভাপে ইলিশ পাতুড়ি, ভাত দিয়ে ভাপা ইলিশ, ভাপা ইলিশ, ভাপারি।

৯. নোনা ইলিশ : নোনা ইলিশ ভুনা, নোনা ইলিশের ডিম ভাজা, নোনা ইলিশের ভর্তা।

১০. আরও নানান পদ : কোনো ব্যাকরণ দিয়ে অকারণ ইলিশ রান্নার কত পদ তা বোঝান যায়, নাকি তা সম্ভব। হরেক রকম তার পদ। ইলিশ দমপোক্ত, ইলিশ মাখানি, ইলিশ পোড়া, ইলিশ মাছ মসলাদার, ইলিশ মাছের চাটনি, ইলিশ চুমরা, ইলিশ মাছের দোলন, ইলিশ মাছের মোলু, ইলিশের রসা, চানেলিশ, জিরা ইলিশ, টক ইলিশ, তেল ইলিশ, পোস্ত ইলিশ, ইলিশ মাছের পাতুড়ি, সরিষা ইলিশ, ইলিশ মাছের ঝুরি, কাসুন্দি ইলিশ!

শুধু এসব পদের কথা পড়লেই কি হবে ? এবার প্রতিটি আইটেম খাওয়ার প্রেমে পড়ে যান। ইলিশের উৎসবে উৎসবে জীবন দেখবেন কী এক দারুণ স্বাদে পার হয়ে যাবে!

ইলিশ যে সত্যিই মাছের রাজা, তা আমি শৈশব থেকেই বুঝেছি, তবে মাঝখানে ওর এই রাজকীয়তা নিয়ে আমার মধ্যে খানিকটা বিভ্রান্তিও উপস্থিত হয়েছিল। তার কারণটা হলো বিয়ে। না, আমার না, আমার বউয়েরও না। গ্রামের যত বিয়ে হতো, এমনকি শহরেও যত বিয়ে হতো, বিয়ের মধ্যে দেখতাম, আগের দিন জামাই বাড়ি থেকে কনের বাড়িতে যে ডালা পাঠানো হতো, তাতে থাকত একটা বিশাল সাইজের রুই মাছ। তাও আবার সে-রুইটাকে যে কতভাবে সাজিয়ে দেওয়া হতো, কত রঙে। তারপর জামাই, যখন প্রথমদিন শ্বশুরবাড়ি আসত, বিয়ের পর থাকার জন্য, তাকে বাজার করতে হতো। সে করত কি, বাজারে গেলে প্রথমেই বাজারে ওঠা সবচেয়ে বড় রুই মাছটিই কিনে নিত। কারণ দেশি সে-রুইয়ের যেমন দাম ছিল, স্বাদও ছিল সে-রকম মজাদার। ফলে ওই বড় রুই কিনলে জামাইয়ের মর্যাদা শ্বশুরবাড়িতে বেড়ে যেত।

দেশি রুইয়ের এমন মর্যাদার জায়গাটা কিছুটা হলেও পেয়েছিল দেশি বড় পাঙ্গাশ। নতুন জামাইয়ের কাছে পাঙ্গাশ তেমন আকর্ষণীয় না হলেও, যারা জায়গামতো ঘুষ দিয়ে কারও মনভজনের মাধ্যমে কার্য উদ্ধারের প্রচেষ্টা চালাত, তাদের প্রথম পছন্দ ছিল বিশাল বড় পাঙ্গাশ মাছ। বোধ হয় কাউকে তেল দেওয়ার জন্য এ মাছের কোনও বিকল্প নেই। দেশীয় পাঙ্গাশের ভেতর যে কী তেল ছিল, মাছ কাটলেই তেল থক থক করত। মাছের স্বাদও ছিল মনোহরণকারী। ঘুষ হিসেবে বড় দেশি রুইয়েরও একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল।

বিয়েতে কিংবা ঘুষের বাজারে রুইয়ের একচ্ছত্র এবং পাঙ্গাশের বিপুল চাহিদা দেখে আমি এক সময় ভাবতাম যে, ওরাই বুঝি মাছের রাজা-উজির হবে। কিন্তু বয়স যত বাড়তে লাগল, আমার দিন যত সমাগত হতে লাগল, দেখলাম যে, রুই-পাঙ্গাশের সেই মর্যাদার জায়গাটা ধীরে ধীরে কীভাবে ভূলুণ্ঠিত হলো। দেশে পুকুরের ব্যাপক চাষে-চাষে রুই আর পাঙ্গাশ ব্যবহৃত হতে হতে এখন সত্যি সত্যি ওরা দুটি প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান হয়ে উঠেছে। নদীতে তো দেশি রুই মেলে না বললেই চলে। যাওবা মেলে, তা নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। জামাইবাবাজির জন্য আর কে রেখে দেবে বাজারে। তাছাড়া বাজারে তো পুকুরের চাষাবাদের বড় বড় রুইগুলো আছেই, নিজের মাথা বেচে দেওয়ার জন্য হাজারে হাজারে, লাখে লাখ। এত যে এখন তা সস্তাতেও বিকোতে চায় না। সে রুই আর পাঙ্গাশ নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গেলে এখন উল্টো জামাইবাবাজির প্রেস্টিজ পাংচার হওয়ার জো। তাছাড়া এখন যে, জামাইয়ের সেই মাছ কেনার রেওয়াজটাই প্রায় উঠে গিয়েছে বলা যায়! আর যাকে ঘুষ দেওয়া হয়, তিনি পর্যন্ত সংকোচের মাথা খেয়ে বলে ওঠেন, নদীর রুই না হলে দরকার নেই। নদীর রুই বেচারা কোথায় পাবে ? রুইটা যদি ঘুষখোর ফিরিয়ে দেয়, তবু মঙ্গল, কিন্তু চাষের রুইটা যদি বাসায় নিয়ে যায়, ঘুষখোর সেটা খেতে খেতে ঘুষ প্রদানকারীর চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করবে গাল দিয়ে।

রুই-পাঙ্গাশের যখন এমন অবনমন, সেই উল্টো স্রোতে চোখের সামনে দেখলাম, ইলিশের মর্যাদা দিন দিন আরও উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছে। নতুন জামাইয়ের প্রথমদিন শ্বশুরবাড়ি এসে বাজার করার চলটা এখন বলতে গেলে নেই-ই, সেটা থাকলে যে এখন একটা বড় দেখে পদ্ম ইলিশ কিনতে দ্বিধা করবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। কেননা, ইলিশও তো এখন দামি হয়ে উঠেছে। আর ইলিশকে এমন দামি জায়গাটায় নিয়ে আসার অনন্য কারিগর হিসেবে নেপথ্যের আসল নটবরটি হলো বাংলা নববর্ষ। বাঙালির ঘরে ঘরে পহেলা বৈশাখের দিন ইলিশ খাওয়ার এমনই ধুম লেগে যায় যে, এক মাস আগে থেকেই এখন লাইন ধরে ধরে কিনে রাখতে হয় ইলিশ। তাও আবার প্রচুর দাম দিয়ে। ইলিশ আজ হয়ে উঠেছে বাঙালির বর্ণাঢ্য উৎসবের প্রতীকী মাত্রা। ইলিশ ছাড়া বাঙালির নতুন বছরের দ্বারোদ্ঘটন হয় না। হয় না নতুন যাত্রার সম্পন্ন আয়োজন।

লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares