বিশ্বসাহিত্য : বিশ্বসাহিত্য : ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি’ : মোহীত উল আলম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের শেষ বছরে, ১৯৪১ সালের ২১ জানুয়ারির সকালে, শান্তিনিকেতনের উদয়ন ভবনে বসে একটি কবিতা লিখলেন, যেটির প্রথম পঙ্ক্তি ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।’ কবিতাটি বেশ দীর্ঘ, কিন্তু পুরো কবিতাজুড়ে ছড়িয়ে আছে একদিকে তাঁর দুর্মর ইচ্ছা পুরো পৃথিবীকে জানার, অন্যদিকে জানতে পারার সীমাবদ্ধতা―এবং এ দুইয়ের সংঘাতজাত অনুভূতিকে অনায়াসেই বিশ^সাহিত্যের সংজ্ঞা হিসেবে দাঁড় করানো যায়। একদিকে বিশ^সাহিত্য হচ্ছে বিশ^কে সৃজনশীলভাবে মেলানোর আবেগ, অন্যদিকে পৃথক সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষা, রাষ্ট্র, বর্ণ ইত্যাদি পরস্পর-বিরোধী উপাদানগুলোর সবল উপস্থিতি―যে সাংঘর্ষিকতা হচ্ছে বিশ^সাহিত্য শীর্ষক বিষয়টির প্রধানতম উপাদান। 

২০০৫ সালে আমি ছোট্ট একটা ভ্রমণে স্পেন যাই। বার্সিলোনা থেকে পাঁচশ কিলোমিটার দক্ষিণে এলচে নামক একটি শহরে যেতে ট্রেনে উঠে দেখি যাত্রীদের প্রায় সবার হাতেই একটি করে পড়ার বই। আমার পাশে এক বয়স্কা মহিলা বসেছিলেন। ধরেই নিলাম যে মহিলা একজন স্প্যানিশ। এবং তাঁর হাতের বইটি স্প্যানিশ ভাষায়, যেটার কাভারে চোখ দিয়ে আমি বুঝলাম তিনি পাওলো কোয়েলহোর উপন্যাস দ্য আলকেমিস্ট পড়ছেন। পরে, পুরো কামরায় চোখ বুলিয়ে দেখলাম, যাত্রীদের সবার হাতেই প্রায় পাওলো কোয়েলহোর কোনও না কোনও বই। তখন সম্ভবত পুরো ইউরোপজুড়ে কোয়েলহোর ক্রেজ চলছিল। কোয়েলহো পর্তুগিজ ভাষার লেখক। মহিলা সম্ভবত উপন্যাসটির স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ পড়ছিলেন। কিংবা আমার চোখে যেহেতু স্প্যানিশ ভাষা আর পর্তুগিজ ভাষার লৈখিক প্রকরণের মধ্যে তফাৎ ধরা পড়ে না, এমনও হতে পারে যে, মহিলা হয়তো মূল পর্তুগিজ ভাষায় বইটি পড়ছিলেন। ইউরোপে ভাষাচর্চার প্রাগ্রসর ব্যবস্থাদির আলোকে বলতে হয়, স্পেন আর পর্তুগাল পাশাপাশি দেশ হওয়ায়, দুই দেশের লোকজন পরষ্পরের ভাষা বলতে এবং পড়তে পারার কথা।

বিশ্বসাহিত্যের সার্বিক দিক আলোচনা করা বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য, এবং সে জন্য আমার পাশর্^বর্তিনীর ভাষাজ্ঞান আমার লেখার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য প্রাসঙ্গিক। আবার বলছি, ধরেই নিলাম যে মহিলা একজন স্প্যানিশ, এবং বইটি যদি তিনি অনূদিত ভাষায় পড়েন তাহলে তিনি অনুবাদে বিশ^সাহিত্য পড়ছেন। এবং বিশ^সাহিত্য পড়ার ব্যাপারে বর্তমান প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে। আবার যদি তিনি জাতিতে স্প্যানিশ হয়েও মূল পর্তুগিজ ভাষায় উপন্যাসটি পড়েন, তাহলে বিদেশের রপ্ত ভাষায় মূল সাহিত্য পড়লে আবেদনটা কিরূপ হয় তার আলোচনাও থাকবে বর্তমান প্রবন্ধে। উদাহরণস্বরূপ বলি, আমরা (বাংলাদেশিরা) ঐতিহাসিক  কারণে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে সড়গড়। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা হ্যামলেট নাটকটি পড়ে যে আনন্দ আস্বাদন করি, সেটি কি একজন ইংরেজি ভাষাভাষি লোকের আস্বাদিত আনন্দের অনুরূপ, নাকি কম, নাকি বেশি ? এই প্রশ্নটি অবান্তর হবে যদি আমরা ধরে নিই যে, একজন ইংরেজি ভাষাভাষি লোক তার মাতৃভাষা ইংরেজি হবার কারণেই যে হ্যামলেট একজন অ-ইংরেজি ভাষার লোকের চেয়ে বেশি আস্বাদন করতে পারবেন, তার কোনও যুক্তি নেই। কিন্তু প্রশ্নটির একটি যুক্তি থাকে যখন আমরা কল্পনা করি যে সমান মেধার দু’জন পড়ুয়ার মধ্যে একজন যদি ইংরেজ হন, এবং আরেকজন অ-ইংরেজ হন, তা হলে কার কাছে হ্যামলেট বেশি বোধগম্য হবে ? আরেকটু ঘুরিয়ে বললে প্রশ্নটার গুরুত্ব বোঝা যাবে। ধরুন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বইটির কথা : সংস অফারিংস গীতাঞ্জলি-র কথা। তার দু’জন পাঠক, একজন বুদ্ধেদেব বসু, আরেকজন টি এস এলিয়ট (ডব্লিউ বি ইয়েটসের কথা আনলাম না, কারণ তাঁর মাতৃভাষা ছিল আইরিশ, ইংরেজি নয়।)। তা হলে দু’জনের মধ্যে কার বেশি রবীন্দ্র-কাব্য উপভোগ করার কথা ? অবশ্যই বুদ্ধদেব বসুর। এবং আমরা জানি গীতাঞ্জলি বা সংস অফারিংস-এ অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলো নিয়ে বুদ্ধদেব সবিশেষ ক্ষুব্ধ ছিলেন, কেননা তিনি ধারণা করতে পেরেছিলেন, কবিগুরু যে কবিতাগুলো নিয়ে কাব্যগ্রন্থটি সাজিয়েছিলেন, সেগুলোর চেয়ে অনেক ভালো কবিতা বাছাইয়ের বাইরে পড়েছিল। সে যাই হোক, এই আলোচনাটিও বর্তমান প্রবন্ধে থাকবে―অনুবাদের আলোচনার অংশ হিসেবে আমরা কি ধরেই নেব যে বিদেশি ভাষায় সাহিত্য পড়তে গেলেই একজন বিদেশি পাঠক মূল ভাষার একজন পাঠকের সমকক্ষ হতে পারবে না! এ ক্ষেত্রে রবার্ট ফ্রস্টের উক্তিটিই কি মেনে নিতে হবে যে, অনুবাদের মধ্যে যেটি হারিয়ে যায় সেটিই কবিতা!

অনুবাদ প্রসঙ্গে আসার আগে, আমরা আরও কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করব। প্রথমে আলোচনা করব, বিশ^সাহিত্য কীভাবে একটি সাধারণ ধারণা থেকে আরও নির্দিষ্টকৃতভাবে পাঠযোগ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করল। এখানে বিস্তৃত করব এ কথাটি যে বিশ^সাহিত্য যখন একটি বিমূর্ত ধারণা থেকে বাস্তবায়িত ধারণায় প্রবর্তিত হতে থাকল, তখন একটি বিতর্ক ডালপালা মেলে বেড়ে গেল। সেটি হলো বিশ^সাহিত্য বলতে জার্মান মহাকবি জোহান উলফগ্যাং ফন গ্যেটে যখন ১৮২৭ সালে বিশ^সাহিত্য বা তাঁর জার্মান ভাষায় ‘ওয়েল্টলিটেরাটার’ ধারণার জন্ম দিলেন, তখন তিনি সেটি মানবতার বিশ^ভ্রাতৃত্বের মিলন প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ^সাহিত্য পাঠের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছিলেন বলেই ধারণাটি দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পরবর্তী প্রায় দু’শত বছরের মধ্যে বিশ^সাহিত্যের সংজ্ঞা বিশ^সাহিত্যের এই অনির্বচনীয় সাধারণ মানবসম্প্রীতি উজ্জীবনকারী নৈর্ব্যক্তিক বিষয় সংজ্ঞার মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি, এটি পুঁজিবাজার বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বাজারি পণ্য বা বিক্রয়যোগ্য বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়। তখন গ্যেটে কথিত উচ্চাঙ্গ সাহিত্যের বদলে বাজার মাত করার সাহিত্যপুস্তকগুলো বিশ^সাহিত্য হিসেবে কথিত হতে শুরু করে। তখন সমালোচকেরা এই ধরনের বাজার মাত করার সাহিত্যকে ‘বিশ^সাহিত্য’ অভিধা না দিয়ে ‘গ্লোবাল’ সাহিত্য হিসেবে অভিহিত করতে থাকেন। তাই আমাদের আলোচনায় ‘বিশ^সাহিত্য’ এবং ‘গ্লোব্যাল’ বিষয়ক দ্বান্দ্বিক আলোচনার পাশাপাশি কীভাবে বিশ^সাহিত্য পুঁজিবাদী তত্ত্বের আলোকে ক্রমশ ঔপনিবেশিক সাহিত্যের আধার হিসেবে পরিচয় পেতে শুরু করে তার আলোচনা থাকবে। এই প্রসঙ্গটি ব্যাখ্যা করার পর পর আমরা আলোচনায় আনব ‘বিশ^সাহিত্য’ একটি অধীত বিষয় হিসেবে কীভাবে শিক্ষায়তনে, বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে গ্র্যাজুয়েট এবং পোস্ট-গ্যাজুয়েট পর্যায়ে ‘সাহিত্যবিভাগ’ পরিচিতি নিয়ে আবির্ভূত হয়। এবং এ পর্যায়ে স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে আমরা আলোচনায় নিয়ে আসব তুলনামূলক সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের বিসংবাদ তৈরি হবার ব্যাপারটি―অর্থাৎ, দুটোরই কাজ কি একে অপরের পরিপূরক, নাকি বিকল্প লক্ষ্যসাধন ? এই দিক থেকে আমরা আরও একটি বিষয়ের অবতারণা করব যেটি হলো বিশ^সাহিত্য বলতে আহৃত বিদেশি ভাষায় সাহিত্য রচনাকারীদের সঙ্গে মূলভাষায় সাহিত্য রচনাকারীদের মধ্যে মৌলিক প্রভেদ নিয়ে আলোচনা করা। এ পর্যায়ে আমরা প্রবাসী লেখকদের ইংরেজিতে (কিংবা যে কোনও অগ্রগণ্য সাম্রাজ্যিক ভাষায়) রচিত সাহিত্যের আলোচনা করব―যেমন, অমিতাভ ঘোষ বা ঝুম্পা লাহিড়ীর উপন্যাস। তাদের সম্পর্কে আলোচনা শেষ করার পর যে বিষয়টির ওপর আলোকপাত করব, সেটি হলো বিশ^সাহিত্য বলতে কোন্ প্রকরণটি সবিশেষ গুরুত্ব ও প্রচার পেয়েছে―কাব্য, নাট্য না কথাসাহিত্য ? কথা সাহিত্যের ব্যাপকতার গুরুত্বই আমরা পেশ করব।

তা হলে মূল আলোচনায় যাবার আগে কী কী প্রসঙ্গ নিয়ে আমরা আলাপ করব তার একটি ধারণা ক, খ আকারে দেওয়া দরকার।

(ক) বিশ্বসাহিত্য―সাধারণ ধারণা থেকে নির্দিষ্টকৃত ধারণায় অবতরণ।

(খ) বিশ্বসাহিত্য―পুঁজিবাদী বাজার সংস্কৃতির কারণে ‘গ্লোবাল’ সাহিত্যে পরিণত হবার আশঙ্কায় উদ্বেগ।

(গ) বিশ্বসাহিত্য―সাম্রাজ্যবাদিতার প্রভাবে ঔপনিবেশিক সাহিত্যের বিকাশ ও চরিত্র।

(ঘ) বিশ্বসাহিত্য―অধ্যয়নিক প্রতিষ্ঠানে চর্চার স্বরূপ।

(ঙ) বিশ্বসাহিত্য―প্রবাসী লেখকদের রচনার অবস্থান নির্ধারণ।

(চ) বিশ্বসাহিত্য―কথাসাহিত্য প্রকরণের ব্যাপক বিকাশ।

(ছ) বিশ্বসাহিত্য―অনুবাদের ভূমিকা।

(ক) বিশ্বসাহিত্য―সাধারণ ধারণা থেকে নির্দিষ্টকৃত ধারণায় অবতরণ।

আমাদের ধারণায় ‘বিশ্বসাহিত্য’ ধারণাটি ইউরোপের অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইটেনমেন্ট যুগের বৈশি^ক ধারণা থেকে সৃষ্টি হলেও এর চর্চা সুদূর অতীত কাল থেকে চলছিল। বিশেষ করে আমরা ধারণা করতে চাই যে, প্রাচীন গ্রিক ও পরবর্তীকালে রোমান সাহিত্যের ধারার মধ্যে বিশ^সাহিত্যের চর্চা নিশ্চয় চলছিল। কেননা, মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই জাতিতে জাতিতে গোত্রে গোত্রে সাংস্কৃতিক লেনদেনের অভাব ছিল না। হোমারের মহাকাব্যগুলো গ্রিসের সীমানা ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতেও গ্রহণযোগ্য ছিল। পরবর্তী রোমান সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলে ইউরোপের প্রাচীন রাষ্ট্রগুলোতে সাহিত্য ও সংস্কৃতির আদানপ্রদান বেড়ে যায়। মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে প্রাচীন ইউরোপীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির যোগাযোগ স্থাপিত হয়, এবং এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ভাষাগুলো থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ভাষায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনুবাদও চলতে থাকে। এই পর্যায়ে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালে মেসোপোটেমিয়ায় আক্কাদি ভাষায় রচিত গিলগামেশকে বিশে^র প্রথম মহাকাব্য হিসেবে গণ্য করা হয়। আবার ইউরোপে রেনেসাঁ যুগের শুরু হলে বহুরাষ্ট্রিক ইউরোপের বহু ভাষা ও সাহিত্য গড়ে উঠতে থাকে নিজ নিজ দেশীয় ভাষায়, যার ফলে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের প্রভাবের মাঝেও স্বদেশি সাহিত্য বা ভার্নাকুলার লিটেরেচার গড়ে উঠতে থাকে। ফলে, রেনেসাঁ যুগেও ইউরোপ-কেন্দ্রিক বিশ^সাহিত্য চর্চার পরিবেশের অভ্যুদয় হয়। ঠিক একই কারণে আমরা বলতে চাই যে দূর-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সমন্বয়ে বিশ^সাহিত্যের একটি প্রাচ্যদেশীয় অস্তিত্ব―সাধারণ জ্ঞানে বলছে―টিকে থাকার কথা।

তবে ‘বিশ্বসাহিত্য’ ধারণাটি, যেটির আলোকে আমরা বর্তমান প্রবন্ধটি তৈরি করছি, সেটি প্রথমে উক্ত করেন―আগেই বলেছি―গ্যটে। এদিক থেকে গ্যেটেকে বিশ্বসাহিত্যের আধুনিক উদ্গাতা বলা যায়। ১৮২৭ সালে গ্যেটের পক্ষে সম্ভব হয় ফরাসি ভাষায়, কাব্যে অনূদিত, একটি চীনা উপন্যাস পড়ার। গ্যেটে বললেন, ‘চীনের লোকেরা চিন্তা করে, কাজ করে, এবং অনুভব করে ঠিক আমাদের মতো’১। তারপর বললেন, ‘জাতীয় সাহিত্য বলতে এখন আর কিছু থাকে না; এখন হাতের কাছে এসে গেছে বিশ্বসাহিত্য, এবং সকলের উচিত এই ক্ষণটিকে ত্বরান্বিত করা।’ এই হলো গ্যেটের বিখ্যাত ওয়েল্টলিটারাটারের ধারণা। গ্যেটে জানতেনই যে বিশ্বসাহিত্যের ভিত্তি হচ্ছে মিলের মধ্যে নয়, বরঞ্চ অমিলের মধ্যে, কিন্তু বিভিন্ন সাহিত্যের মধ্যে আদানপ্রদানকে গ্যেটে বিশ্বসাহিত্যের মূল কর্ম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। সে জন্যই তিনি জার্মানির সাহিত্য আর চীনা সাহিত্যের মধ্যে মানবিক ঐক্য খুঁজে পেতে বেগ পাননি। গ্যেটে সাহিত্যের সমন্বয়বাদী চিন্তার মধ্যে ‘নিজস্ব’ (সেলফ) এবং ‘পরস্ব’ (আদার) নিয়ে সম্প্রীতিমূলক ধ্যান-ধারণা দেন, এবং নিজের শেষের দিকের কাব্যে তিনি প্রমাণ করেন তিনি যতটা জার্মান ততটা মূলচ্যুত ও উত্তরিত। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের অধ্যাপক ডেভিড ড্যামরশ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হোয়াট ইজ ওয়ার্ল্ড লিটেরেচার (২০০৩)-এ বললেন যে : বিশ্বসাহিত্য বলতে শুধু যে নিয়মানুযায়ী কিছু চিরায়ত সাহিত্য পড়তে হবে তা নয়, বরঞ্চ বিশ্বসাহিত্য হচ্ছে সেরকম একটি পাঠাভ্যাস যাতে পাঠক নিজের ভাষা ও সাংস্কৃতিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে একটি আলাদাকৃত জগতে থাকবে। গ্যেটে এবং ড্যামরশের শুধু পাঠকভিত্তিক বিশ^সাহিত্যের সংজ্ঞা থেকে আলাদা করে প্রাবন্ধিক মার্টিন কার্ন বলছেন যে : বিশ্বসাহিত্য লেখাও যায়―‘ওয়ার্ল্ড লিটেরেচার ক্যান বি রিটেন’। (কার্ন, পৃ. ১১) সম্ভবত, কার্ন বলতে চান যে, বিশ^সাহিত্য বলতে শুধু পাঠক কিছু সাহিত্য পড়ার জন্য গ্রহণ করবে তা নয়, বিশ্বসাহিত্য লেখাও যায়। কীভাবে ? কার্ণের মতে যখন কোনও লেখক নিজের শিকড়ের মধ্যে না থেকে, অর্থাৎ নিজের ভাষা ও সাংস্কৃতিক গণ্ডির মধ্যে না থেকে সাহিত্য রচনা করেন, বা যা রচনা করেন তা নিজের সংস্কৃতি ও ভাষার চেয়ে অতিমাত্রায় ভিন্ন হয়, তখন বিশ্বসাহিত্য লেখা হয়েছে বলা যায়। একটু পরে আমরা যখন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আলাপ করব, তখন দেখব যে সংস অফারিংস-এর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ আসলে বিশ্বসাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন। সেটি এসেছে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বলৌকিক ধারণা থেকে, যেটির আলাপ শুরুতে আমরা রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথের বিশ^লৌকিক ধারণাটি কীভাবে উসকে উঠেছিল সেটি বুঝতে কথিত কবিতা থেকে আমরা আরও খানিকটা উদ্ধৃত করতে পারি :

বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।

দেশে দেশে কত-না নগর রাজধানী―

মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,

কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচিত তরু

রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন;

মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ।

সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণবৃত্তান্ত আছে যাহে

অক্ষয় উৎসাহে―

যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী

কুড়াইয়া আনি।

জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে              

পূরণ করিয়া লই যত পারি ভিক্ষালব্ধ ধনে।

আমি পৃথিবীর কবি, যেথা তার যত উঠে ধ্বনি

আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখনি,

এই স্বরসাধনায় পৌঁছিল না বহুতর ডাক―

রয়ে গেছে ফাঁক।

উদ্ধৃত অংশে শেষের দিকে রবীন্দ্রনাথের যে আক্ষেপ রয়ে গেছে, এবং বলছেন যে স্বরসাধনায় ‘রয়ে গেছে ফাঁক’―সেটি গ্যেটের সময়ের শুরু থেকে একুশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এসেও বিশ্বসাহিত্য প্রসঙ্গে যে বিতর্কটি চলে আসছে তার অনুরূপ, এবং অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তার আশু কোনও সমাধানও নেই। সেটি হচ্ছে বিশ্বসাহিত্যের বোধগম্যতা নির্ভর করছে মোটা দাগে অঙ্কিত শাশ্বত মানবিক গুণাবলির ওপর―যেমন, উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় হ্যামলেটের প্রতিহিংসার রূপায়ণ যে কোনও ভাষায় একটি বোধগম্য বিষয়। কিংবা ইডিপাসের অসংশোধনযোগ্য পাপ সব ভাষাভাষি লোকেরই বোধগম্য হবার কথা। অর্থাৎ, মহাবৈশি^ক বা ইউনির্ভাসেল বিষয়াদি বরাবরই বিশ^সাহিত্যের সংজ্ঞা পরিস্ফুটনে সহায়ক হয়েছে। কিন্তু বাধ সেধেছে ইউনিভার্সেল থিমগুলোর পাশাপাশি পারটিকুলার বা স্থানিক প্রেক্ষাপটটি নিয়ে। যেমন, আমরা যদি ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস পুতুল নাচের ইতিকথা-র কথা ধরি, তাহলে বলতে পারি যে, এটির মূল চরিত্র ডাক্তার শশীর মধ্যে জীবনের অস্তিত্ব নিয়ে যে বস্তুবাদী চিন্তার প্রকাশ হয়েছে সেটি অস্তিত্ববাদের বিষয় হিসেবে সর্বজনগ্রাহ্য হবে। আবার ১৯৪৭ সালে ফরাসী ভাষায় প্রকাশিত আলবেয়্যার কাম্যুর দ্য প্লেগ উপন্যাসটির মূল চরিত্র ডাক্তার রিউর মধ্যে যে চারিত্রিক অস্তিত্ববাদিতা প্রকাশ পায়, তার কারণে ডাক্তার শশীর চরিত্রের সঙ্গে ডাক্তার রিউর চরিত্রের মিল খুঁজে পাওয়া হচ্ছে বিশ্বসাহিত্যের জন্য প্রণোদনা। কিন্তু যে জায়গাটিতে বিশ^সাহিত্য দাঁড়াতে বেগ পায়, সেটি হচ্ছে স্থানিক পরিবেশ যখন স্থান-কাল-পাত্র-নির্ভর হয়ে মনোযোগ পায়। অর্থাৎ, পুতুল নাচের ইতিকথায় গ্রাম বাংলার লৌকিক আচার-আচরণ, এবং এক একটি সংস্কৃতির অতি-নিজস্ব অবয়ব, অনুভূতি এবং প্রকাশ অন্য সংস্কৃতি ও ভাষার কাছে অবোধ্য থাকারই কথা। অর্থাৎ এক একটি ভাষা ও সংস্কৃতির অতি-নিজস্বতা আসলে অনুবাদে যেমন―ফ্রস্টের কথা অনুসারে বলতে পারি―তুলে আনা সম্ভব নয়, তেমনি বিদেশি ভাষায় প্রশিক্ষিত একজন বিদেশির যদি ভালো বাংলা জানাও থাকে, তার পক্ষে মানিকের এই স্থানিক নিজস্বতা উপলব্ধি করা সম্ভব না-ও হতে পারে।

সে জন্য বিশ্বসাহিত্য বরাবর কখনও এই দ্বিধাটা উতরোতে পারে নি যে, ইউনিভার্সেল বিষয়গুলো বিশ্বসাহিত্যের পরিধিতে অনায়াসে জায়গা নিতে পারলেও স্থানিক বা পার্টিকুলার বিষয়গুলো কখনও বিশ্বসাহিত্যের ভিতর ঘরের বাসিন্দা হতে পারেনি। এই ফাঁকটুকু থাকার (রবীন্দ্রনাথের ‘রয়ে গেছে ফাঁক’) কারণে যে বিপদটুকু হয় সেটি হচ্ছে বিশ^সাহিত্য অনেক সময় দাবি করে যে উল্লিখিত টেক্সটটিকে একাধারে পরিপ্রেক্ষিতবিহীন বা ডিকনটেক্সটুয়ালাইজ এবং অনৈতিহাসিক বা ইতিহাসবিহীন বা ডিহিস্টোরিসাইজ করে  ফেলতে হবে।

এই বিপদটা নিয়ে দু’টো উদাহরণ দেব। হ্যামলেট নাটকটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সম্পদ হলেও এটি শুধু হয়েছে এর প্রতিহিংসাবিষয়ক দার্শনিক মহামানবিক মনস্তত্ত্বের সবিশেষ রূপায়নের জন্য, কিন্তু এই নাটকটির অনেক স্থানিক বিষয় আছে―যেমন বড়দের থিয়েটার ও ক্ষুদে অভিনতাদের থিয়েটারের মধ্যে জনপ্রিয়তার দ্বন্দ্ব নিয়ে যে উল্লেখযোগ্য দৃশ্যটি আছে, সেটি সচরাচর বিশ্বসাহিত্যের দরবারে উপেক্ষিত থাকে, কারণ এটার পার্টিকুলারিটি বা স্থানিকতা বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয়তা হারায়। এবং এ দৃশ্যটিকে যখন আমরা বাদ রাখব, তখন হ্যামলেটের একটি উপ-নাটকে প্রতিহিংসামূলক কয়েকটি বাক্য জুড়ে দেবার ব্যাপারটি বুঝতে পারলেও, বুঝতে পারব না কেন ঐ নাট্যদলটি রাজপ্রাসাদে অভিনয় করার জন্য আমন্ত্রিত হলো, এবং কেনই বা হ্যামলেট তাঁর বক্তব্যে ভালো অভিনয় কী করে করতে হয় সে সম্পর্কে আলোকপাত করবেন। অর্থাৎ, এভাবে হ্যামলেট নাটকটি বিশ্বজননীনতা পেল তার স্থানিক-পরিপ্রেক্ষিত হারিয়ে। অর্থাৎ, হ্যামলেট বিশ্বসাহিত্যের অংশ হলো খানিকটা শিকড়-উপড়ানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে গিয়ে বা খানিকটা ডিকন্টেক্সুচুয়ালাইজড হয়ে।

বিপদটির দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে ইয়েটসের রবীন্দ্র-মূল্যায়নের ব্যাপারটি আলোচনায় আনতে চাই। গীতাঞ্জলি-র (১৯১২) শুরুতে কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস ১৬ পৃষ্ঠার এক ভূমিকা লেখেন যেখানে দেখা যায় ইয়েটস রবীন্দ্রকাব্যের সে সকল বিষয় নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন, যেগুলোর সর্বকালীনতা আছে : যেমন ঈশ^র-বন্দনা, প্রকৃতি-বন্দনা, প্রেমের আকুতি ইত্যাদি। আবদার রশীদকৃত ইয়েটসের ভূমিকার অনুবাদ থেকে কিয়দংশ উদ্ধৃত করলে ইয়েটসের ভাবাবেগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে :

এই গানগুলোর মধ্যে,―আমার ভারতীয় বন্ধুদের মতে মূল রচনায় যেগুলো ছন্দের সূক্ষ্মতায়, অননুবাদ্য বর্ণাঢ্যতায় এবং মাত্রাগত মৌলিকতায় পরিপূর্ণ,―যে ভাবজগতের ছবি বিধৃত রয়েছে, আমি সারাজীবন তারই স্বপ্ন দেখেছি। অতি উৎকৃষ্ট সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সৃষ্টিকার্য হওয়া সত্ত্বেও মনে হয় এগুলো যেন অতি সাধারণ মৃত্তিকাজাত ঘাস বা ঝোপঝাড়। যেখানে কাব্য ও ধর্ম এক হয়ে আছে, তেমনি এক ঐতিহ্য, শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের কাছ থেকে অলঙ্কার ও আবেগ সঞ্চয় করে বহু শতাব্দী অতিক্রম করে এসেছে, তারপর পণ্ডিত ও মনীষীদের  সেই ধ্যানধারণা আবার ফিরে গেছে জনগণের কাছে।২

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের কবিতা পছন্দ করেছিলেন এ জন্য যে, তাঁর পশ্চিমা সভ্যতার বিপরীতে রবীন্দ্র-লিরিক ছিল এক পূর্বে-অনাস্বাদিত নতুন কাব্য-ঢেউ। পশ্চিমা কাব্যের মধ্যে, এমনকি ওয়ার্ডসওয়ার্থের চরম লিরিক্যাল কবিতাগুলোতেও আছে ভাবের আধিক্যের তলায় তলায় একটি যৌক্তিক বিষয়ভিত্তিক সংযত প্রত্যক্ষতা বা অবজেক্টিভিটি : ‘Ten thousand saw I at a glance.’ রবীন্দ্র-কাব্যে এই ধরনের সাংখ্যিক উচ্ছ্বাসের উপস্থিতি নয় বরং অনুপস্থিতি ইয়েটসকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছিল। বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলছেন, ‘ইঙ্গিতের মহান শিল্পী তিনি।’৩ এই ইঙ্গিতময়তা রবীন্দ্রকাব্যের মূল সুর হলেও, পুরো রবীন্দ্র কাব্যসত্তা তাতে প্রতিফলিত হয় না। সেজন্য ইয়েটসের রবীন্দ্র-প্রশস্তি আধুনিক বিচারে খানিকটা একপেশে মনে হবে, মনে হবে খানিকটা পশ্চাৎমুখী, কেননা তিনি রবীন্দ্রনাথকে বিশ^কবির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে অ-স্থানিক বা ডিকনটেক্সচুয়ালাইজড করে ফেলেছিলেন। বস্তুত ইয়েটসের উচ্ছ্বাসের ফলে রবীন্দ্রনাথ যেমন রাতারাতি পশ্চিমে আইডলে পরিণত হয়েছিলেন, তেমনি তার সমাপ্তি হতেও সময় লাগেনি। তার কারণ হচ্ছে ভাববাদী মিস্টিক কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কখনও বিবেচিত হতে পারেন না, যেহেতু তাঁর সাহিত্যে বরঞ্চ মাংসল, সজীব, সমাজবদ্ধ জীবনরীতির নিরেট বর্ণনা ঘন হয়ে আছে।

এবং বুদ্ধদেব বসুর অভিযোগটির পুনরাবৃত্তি করে বলতে হবে যে, এই ডিকনেটেক্সচুয়ালাইজড হবার সুযোগ রবীন্দ্রনাথই করে দিয়েছিলেন, তাঁর বেশ কিছু ভাব-প্রধান কিন্তু প্রথম সারির কাব্য নয়―সেগুলোকে গীতাঞ্জলি-তে স্থান দিয়ে। আবদার রশীদের ‘মুখবন্ধ’ থেকে জানতে পারছি, ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে বা সং অফারিংস-এ মোট গান ও কবিতার অনুবাদ ১০৩টি হলেও বাংলা গীতাঞ্জলি থেকে নেওয়া হয়েছে কেবল ৫৩টি, আর বাকি ৫০টি কবিতা ও গান নেওয়া হয়েছে গীতিমাল্য, খেয়া, নৈবেদ্য ইত্যাদি৪ কাব্যগ্রন্থ থেকে। তারপরও বুদ্ধদেব বসুর আক্ষেপ, আমাদেরও আক্ষেপ করে বলতে হয়, এই সং অফারিংস-এ রবীন্দ্রনাথ ‘সোনার তরী’র মতো উল্লেখযোগ্য কবিতা অন্তর্ভুক্ত করেননি, যেটি তিনি রচনা করেছিলেন ১৮৯৪ সালে, যার অর্থ কবিতাটি তিনি গীতাঞ্জলিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারতেন। (এই তর্কটা অহেতুক হবে, কেউ যদি বলেন যে সোনার তরী তো গীতিকাব্য নয়, তাই সং অফারিংস-এ অংশ নিতে পারে না।) বস্তুত, মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে বুঝতে পেরেছিলেন যে পশ্চিমের পাঠক যে জিনিসটা লুফে নেবে সেটি হলো প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতাবোধ এবং সৃষ্টিকর্তার মধ্যে ব্যক্তিমানুষের সম্পূর্ণ নিমজ্জনের গীতল বর্ণনা―‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’ ধরনের গান―যেটি সং অফারিংস-এর প্রথম গান। 

এ প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর, রবীন্দ্রনাথের অবস্থান বিচারেও, খানিকটা ভ্রান্তি আছে বলে বোধ হয়। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, তাঁর কাব্যের কোন্ ধারাটি বিশ্বমহল―যেটি তখন একান্তভাবে ইউরোপকেন্দ্রিক একটি ভাবধারা দিয়ে পরিচালিত ছিল―গ্রহণ করবে। অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথের মনে সং অফারিংস-এর জন্য কবিতা ও গান নির্বাচন করা, এবং সেটি কাদের জন্য করা এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট একটি সিদ্ধান্ত কাজ করেছিল, যেটিকে আমরা ঔপনিবেশিক শাসনামলের প্রজা কর্তৃক রাজার তুষ্টিসাধনের প্রক্রিয়ায় ফেলতে পারি। কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল অরাজনৈতিক, শুধু সাহিত্য-বাস্তবতাকেন্দ্রিক। অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথের সং অফারিংস কাব্যগ্রন্থখানির সূচি নির্ধারণের সময় শুধুমাত্র কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছিল―সেটা বলা যাবে না, বলতে হবে রবীন্দ্রনাথ যে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাস করছিলেন, সে প্রেক্ষাপটটি বুদ্ধদেব বসু অবলোকন করতে পারেননি তাঁর কলাকৈবল্যবাদী মনস্তত্ত্বের কারণে। যে অর্থে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে বিশ^সাহিত্যের প্রতিনিধি করে ফেললেন, সে অর্থটি বুদ্ধদেব বসু ধরতে পারেননি তাঁর একান্ত রাজনীতি-বিযুক্ত মানসিকতার জন্য, আর আমরা পারছি না আমাদের উত্তর ঔপনিবেশিক চিন্তাধারার জন্য। 

তবে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের আরও একটি দিক আছে, যেটি সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু বলছেন যে, এক দিক থেকে রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি বলা যায় না, আবার অন্য দিক থেকে বলা যায়। প্রথমটির ব্যাপারে বুদ্ধদেব বসু আমাদেরকে সজাগ করছেন যে রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বকবি’ অভিধাটির গুরুত্ব পশ্চিমা সাহিত্যমণ্ডলে অতি দ্রুত ফুরিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর কাব্যে বহুবার ‘বিশ্ব’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, এবং বুদ্ধদেব বলছেন যে, এ কারণে বাঙালিরা তাঁকে ‘বিশ্বকবি’ উপাধি দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথকে গ্যেটের বিশ্বসাহিত্য-স্বপ্নের আরাধ্য পুরুষ বর্ণনা করে বুদ্ধদেব লিখলেন :

যে-বিশ্ববোধ গ্যেটে আয়ত্ত করেছিলেন সচেতন ও সচেষ্টভাবে, তা ছিল রবীন্দ্রনাথে স্বজ্ঞাপ্রসূত; গ্যেটের পক্ষে যা বার্ধক্যের উপার্জন, তা রবীন্দ্রনাথে আযৌবন অবিচ্ছেদী। এ-দিক থেকে আমরা বলতে পারি যে গ্যেটের স্বপ্ন যে-মানুষের মধ্যে প্রথম সার্থক হলো তিনিই রবীন্দ্রনাথ, যে প্রকৃতির আশাতীত দানের মধ্যে গ্যেটের আদর্শ বাস্তব হয়ে উঠল। (পৃ. ৮)

বুদ্ধদেব ‘বিশ্বকবি’ অভিধাটির দু’টি ধরন বিশ্লেষণ করলেন। প্রথম অভিধায় তাঁরাই বিশ্বকবি যাঁদের লেখা চিরায়ত বা ক্লাসিক―‘সর্বদেশে ও সর্বকালে যাঁদের কোনও-না-কোনও রচনার কিছু-না-কিছু গুণগ্রাহী পাঠক থাকে।’ (পৃ. ৮-৯) রবীন্দ্রনাথ সে ধারার বিশ^কবি নন, বরঞ্চ, বুদ্ধদেবের কথামতো, রবীন্দ্রনাথ সেই ধারার বিশ^কবি :

যাঁর চিন্তায় জগতের সাহিত্য এক ও অভিন্ন―রূপকরণে অফুরানভাবে বিচিত্র হলেও নির্যাসে এক, যাঁর মনের মধ্যে সাহিত্য এক বিশাল ও বিরতিহীন উৎসবের মতো উপস্থিত, যেখানে সব যুগ, সব জাতি একত্র হয়েছে, আর তিনিও ক্ষণকালের জন্য আহ্বান পেয়েছেন।  …আর এই বিশ্ববোধই বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথের চরিত্রলক্ষণ।৫

অবশ্য রবীন্দ্রনাথের চর্চা বাংলার বাইরে কোথাও হচ্ছে না দেখে বুদ্ধদেব হতাশ হয়েছেন। আমরাও জানি, টি এস এলিয়ট ১৯২১ সালের দিকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে গিয়ে হতাশ হয়েছিলেন এ রকম একটি মন্তব্য তাঁর একটি প্রবন্ধে করেছিলেন।৬ আর ইয়েটসের বন্দনাও দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকে নি।

গ্যেটের ‘বিশ্বসাহিত্য’ নিয়ে ধারণাটি আলাপ করার সময় আমরা লক্ষ করেছি চিরায়ত বিষয়গুলোর প্রাধান্য থাকলেও, স্থানিক বিষয়গুলোর শিকড় না উপড়ালে বিশ্বসাহিত্যের অবয়ব ক্ষুন্ন হয়। সে জন্য আমরা রবীন্দ্রনাথকে আলোচনায় এনে দেখলাম, তিনি যেসব ভাববাদিতার জন্য ইউরোপের ব্যাপক পাঠক-মনোযোগ পেয়েছিলেন, সেটি নিতান্তই অ-স্থানিক এবং অনৈতিহাসিক। সে অর্থে বিশ্বসাহিত্যের যে কোন সংজ্ঞাই বোধ করি এ দ্বিবিধ খামতির মধ্যে থাকবে: স্থানিকতার সঙ্গে চিরায়তের দ্বন্দ্ব, এবং ইতিহাসের সুনির্দিষ্টতার অনুসরণ বিশ^সাহিত্যের বিচারের প্রেক্ষাপটে খুবই সহায়ক কিছুই নয়।

ইতিহাসের সুনির্দিষ্টতার চেয়েও জাতীয় সাহিত্যে, এবং এর সম্প্রসারিত রূপে বিশ^সাহিত্যে প্রকৃত অর্থে আদৃত হয় অনৈতিহাসিকতা বা ডিহিস্টোরিসাইজেশন। অনৈতিহাসিকতা বলতে হালকা কিছু ভাববার অবকাশ নেই। অনৈতিহাসিকতা বলতে পোয়েটিক লাইসেন্স বা লেখকের স্বাধীনতার কথা বলছি, যেটার ভিত্তি থাকে সাহিত্যের রসকে প্রাধান্য দিয়ে ইতিহাসকে সেভাবে রূপায়িত করা। অর্থাৎ, স্যার ফিলিপ সিডনি যে অর্থে সাহিত্যকে ইতিহাসের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন সে অর্থে। সাহিত্যের রস অক্ষুণ্ন রাখতে শেক্সপিয়ার তাঁর ঐতিহাসিক নাটকগুলোতে বার বার ইতিহাসের নির্দিষ্টতা থেকে সরে এসেছেন যাতে সাহিত্যের রস ক্ষুণ্ন্ন না হয়। যে কারণে আমরা দেখতে পাচ্ছি হেনরি ফোর্থ নাটকে প্রিন্স হাল শ্রুসবারি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন, কিন্তু প্রকৃত শ্রুসবারি যুদ্ধে তিনি বয়স-স্বল্পতার জন্য অংশগ্রহণ করেননি। শেক্সপিয়ার এই কাজটি করলেন কারণ নাটকের প্রয়োজনে তাঁকে প্রতিপক্ষ শিবিরের যোদ্ধা হটস্পারের সঙ্গে প্রিন্স হালকে সমকক্ষ হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন ছিল। চার্লস ডিকেন্সের বিখ্যাত উপন্যাস আ টেইল অব টু সিটিজ পড়ে পাঠক মাত্রই বন্ধুর প্রেম রক্ষার্থে বন্ধুর জীবনত্যাগের মর্মন্তুদ চিরায়ত ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হবেন, কিন্তু এ কথা আশা করা বৃথা হবে যে এই উপন্যাসটি পড়ে তিনি ফরাসি বিপ্লবের নাড়ি-নক্ষত্র সঠিকভাবে জানবেন। প্রচুর অনৈতিহাসিকতা আছে, কিন্তু তারপরও সাহিত্যরসমণ্ডিত কোনও একটি উপন্যাসের কথা বাংলা সাহিত্যে উল্লেখ করতে হলে সম্ভবত সর্বপ্রথম আসবে মীর মশাররফ হোসেন রচিত বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসটি। আহমদ ছফা তাঁর বাঙালী মুসলমানের মন গ্রন্থটিতে বিষাদ-সিন্ধুর ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন : উপন্যাসটি শুধু অনৈতিহাসিক নয়, অ-ভৌগোলিকও। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ পরিবার আজরের মরুভূমিতে বাস করার কল্পকাহিনি তিনি নিতান্তই অভৌগোলিক ও অনৈতিহাসিক হিসেবে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু আহমদ ছফার আপত্তির যৌক্তিকতা মেনে নিয়েও বলতে হয় বিষাদ-সিন্ধু তাঁর সাহিত্যগুণে বাংলা সাহিত্যে চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে। ওপরের উল্লিখিত সবগুলো টেক্সটই জাতীয় সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ^সাহিত্যের গণ্ডিতে প্রবেশ করেছে। বিষাদ-সিন্ধুর অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক ফকরুল আলম ওশেন অব সরো (২০১৬) নামে, যে কারণে এটি বিশ^সাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ করেছে বলা যায়।

তা হলে এখন আমরা বলতে পারি বিশ^সাহিত্যের সংজ্ঞায় পড়তে গেলে কিছুটা অস্থানিক, অনৈতিহাসিকতা, অভৌগোলিকতাসহ কিছুটা সাংস্কৃতিক নির্দিষ্টতাও হারাতে হয়। এ বিষয়ে জাপানি বিশ^ব্যাপী জনপ্রিয় লেখক হারাকু মুরাকামি একটি উদাহরণ হতে পারে। তাঁর জাপানি ভাষায় রচিত হিৎসুজি ও মেগেরু বোকেন (১৯৮২) ইংরেজিতে অনূদিত হয় আ ওয়াইল্ড শিপ চেইজ নামে। যদিও জাপানি মৌলিক ভাষায় উপন্যাসটির মূল বিষয় হলো ১৯৭০ সালের জাপানের রাজনৈতিক অস্থিরতা, কিন্তু অনুবাদে এগুলো তেমনি প্রতিফলিত হয়নি, বরঞ্চ একধরনের পরাবাস্তববাদ প্রাধান্য পেয়েছে, যার আন্তর্জাতিকতা আছে, কিন্তু জাপানের মূল ক্ষেত্রটা আর ধরা পড়েনি। এটিও ডিকনেটেক্সচুয়ালাইজেশন আর ডিহিস্টোরিসাইজের প্রমাণ। অস্ট্রিয়ান-হাঙ্গেরিয়ান লেখক ফ্রানৎস কাফকার কথাও উঠে আসে। তাঁর ভাষা জার্মান হলেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা দুনিয়াব্যাপী, এবং কেউ তাঁকে জার্মান লেখক বা হাঙ্গেরিয়ান লেখক হিসেবে ভাবেন না, ভাবেন : যেন তিনি বিশ^সাহিত্যের অংশ। কাফকা নিজের সৃষ্টিশীলতা নিয়ে এত বেশি উদ্বিগ্ন থাকতেন যে সমালোচক জুলিয়েট ক্রিস্টেভা তাঁকে তিনি নিজের কাছেই একজন আগন্তুক ছিলেন এভাবে কথিত করেছেন। (কান, পৃ. ১২) 

(খ) বিশ্বসাহিত্য―পুঁজিবাদী বাজার সংস্কৃতির কারণে ‘গ্লোবাল’ সাহিত্যে পরিণত হবার আশঙ্কায় উদ্বেগ

এবার আসব এই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় ধারাটি আলোচনা করতে। অর্থাৎ, কীভাবে পুঁজিবাজারের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যে ব্যবসায়ী মনোভাব ঢুকে গিয়ে গ্যেটে-আকাক্সিক্ষত ‘বিশ্বসাহিত্য’-র সংজ্ঞায় মানবতার যে সম্প্রীতিমূলক ধারণা ছিল, তার বদলে বেনিয়া মনোভাব ঢুকে গিয়ে পুরো ধারণাকে একটি বিব্রতকর পর্যায়ে নিয়ে এল। গ্যেটের ওয়েল্টলিটেরাটারের ধারণা ছিল বিভিন্ন সমসাময়িক সাহিত্যের মধ্যে অনুপ্রেরণামূলক বিনিময় হবে, কিন্তু তার পরিবর্তে ক্রমশ জায়গা নিয়ে নিল বৈশি^ক অর্থবাজারের প্রভাবে বইয়ের পণ্যতে রূপান্তর। দেখা গেল চিরায়ত সাহিত্যের বদলে চাহিদা বাড়ছে রগরগে যৌন-সাহিত্য, হেনরি মিলারের উপন্যাসসমগ্র (ট্রপিক অব ক্যান্সার ইত্যাদি), কিংবা রোমহর্ষক মাফিয়া উপন্যাস মারিয়া পুজোর গডফাদার ধরনের সাহিত্য। বিশিষ্ট তাত্ত্বিক ও সমালোচক ফ্র্যাংকো মরেট্টি তাই বললেন, আমরা দু’টো বিশ্বসাহিত্য দেখতে পাই। একটি হচ্ছে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত, আরেকটি হচ্ছে তৎপরবর্তী সময় থেকে। দ্বিতীয় ওয়েল্টলিটেরাটারকে তিনি গ্যেটের প্রদত্ত ধারণার বিপরীত বলে আখ্যা করলেন, এবং বললেন, এটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিশ^সাহিত্যে সমতা আনয়ন করা। যেখানে গ্যেটে ধারণা করেছিলেন যে প্রত্যেকটি সাহিত্য নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অটুট রেখে একটি সমন্বয় সাধন করবে, সেখানে বিশ্ব-বাজারি সাহিত্যের চেহারা হয়ে গেল যতটুকু সম্ভব একই সমতলে পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্যকে নিয়ে আসা, অর্থাৎ বাজারের জন্য কাস্টমাইজ করে ফেলা। সেজন্য প্রধান জোরটা পড়ল অনুবাদের ওপর। আর অনুবাদটা প্রধানত হলো ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে। কথাটা স্পষ্ট করলে এ রকম দাঁড়াবে যে রবীন্দ্রনাথ যখন সং অফারিংস প্রকাশ করেছিলেন, সবাই জানত যে তিনি একজন ভারতীয় অ-ইংরেজ কবি, তিনি বাংলায় লেখেন, কিন্তু যিনি উপস্থিত কারণে গন্তব্য-ভাষা বা টার্গেট ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে ইংরেজিকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু মরেট্টির মতানুসারে লেখক মার্টিন কার্ন বলছেন, গ্লোবাল সাহিত্যে এসে মূল ভাষাটার গুরুত্ব আর রইল না, ভাষান্তরিত ভাষাটাই―অর্থাৎ ইংরেজিই হয়ে গেল মূল ভাষার বিকল্প। অর্থাৎ অনুবাদের ভাষাই মূল ভাষার চেয়ে গুরুত্ব পেয়ে গেল বেশি―কারণ বিশ^বাজারে সমতাকরণের ভাষাটাই যে ইংরেজি। এ জন্য বিশ্বসাহিত্য নিয়ে অন্যতম চিন্তক ডেভিড ড্যামরশের কথার পুনরাবৃত্তি করে বলতে হয় বিশ্বসাহিত্য যেগুলো নিজের সাংস্কৃতিক গণ্ডির বাইরে পঠিত হচ্ছে, এবং পঠিত হচ্ছে সাধারণভাবে ইংরেজিতে। ব্যাখ্যাটি এরকম : ধরুন কোনও বাংলাদেশি লেখক, মধ্যম মানের, কিন্তু ইংরেজিতে ভাষান্তর করে তাঁর বইটি লন্ডন, নিউ ইয়র্কের বুক স্টোরে কোনওমতে ফেললেন, তখন ড্যামরশের সংজ্ঞানুযায়ী তিনি বিশ^সাহিত্যের গণ্ডির মধ্যে ঢুকে যাবেন, কিন্তু তাঁর চেয়ে অনেক গুণসম্পন্ন লেখক শুধুমাত্র অনূদিত হননি বলে হয়তো অজানা রয়ে গেল। আগের অধ্যায়ে আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ফরাসি লেখক আলবেয়ার কাম্যুর মধ্যে তুলনা টেনেছিলাম। এখন এ অনুবাদ প্রসঙ্গেও আরেকটি তুলনা আসে। অনেক সাহিত্য সমালোচকের মতে আলবেয়ার কাম্যুর অস্তিত্ববাদী জীবন-দর্শন ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন-দর্শন এত কাছাকাছি আঙ্গিনার যে মানিকের পুতুল নাচের ইতিকথা উপন্যাসটি যদি ইংরেজিতে অনূদিত থাকত এবং নোবেল কমিটির হাতে পড়ত, তা হলে একটা দেখার ব্যাপার ছিল। তেমনি জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির মূল ভাষার পরিচয় নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় বলে মনে হয় না, কারণ ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে তিনি এতটাই সুপরিচিত হয়ে গেছেন যে, অনেকে তাঁকে যতটা না জাপানি ভাবেন তার চেয়ে বেশি ভাবেন আমেরিকান হিসেবে। তিনি নিজেও ইংরেজিতে উপন্যাস লিখেছেন। অর্থাৎ, বিশ^-বাজারের অর্থনীতিতে মুরাকামি অনেক বেশি আদৃত লেখক, কেননা তাঁর ভাষা সহজ ও বোধগম্য। অনেকেই বলে থাকেন মুরাকামির সাফল্যের পেছনে তাঁর সুদক্ষ অনুবাদক জে রুবিনের ভূমিকা ব্যাপক।

অনুবাদের কথাটা উঠে এল যখন তখন ইংরেজি ভাষার প্রতিপত্তির কথা আগে বলতে হবে। আধুনিক বিশ্বের অন্যতম সফল অভিধান-রচয়িতা ডেভিড ক্রিস্টাল ১৯৯৭ সালে একটি ছোট্ট বই প্রকাশ করলেন : ইংলিশ অ্যাজ আ গ্লোব্যাল ল্যাংগুয়েজ। তাতে তিনি ইংরেজির দাপট স্বীকার করে বললেন, ‘যদি এরকম হয় যে আগামী [কার্নর মতে ৫০০ বছর]-তে শুধু ইংরেজিই হবে বিশ্বসাহিত্যের ভাষা, তা হলে এর চেয়ে জঘন্যতম আর কিছু হতে পারে না। পরিসংখানের দিক থেকে ইংরেজি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম ভাষা। এদিক থেকে এটি চীনা ভাষার চেয়ে বহু পিছিয়ে। চীনা ভাষায় ইংরেজির চারগুণ লোক বেশি কথা বলে। এরপর হলো স্প্যানিশ ভাষার অবস্থান। কিন্তু ইংরেজি ভাষা থেকে অন্যান্য ভাষায় অনুবাদে ইংরেজি চীনা ভাষার চেয়ে একশ’ ভাগ এগিয়ে আছে। আবার ইংরেজিতে অনুবাদে চীনা ভাষার চেয়ে ইংরেজি ভাষা তিনগুণ এগিয়ে আছে। অর্থাৎ, ভাষা হিসেবে এবং অনুবাদের ভাষা হিসেবে ইংরেজির কাছে আর সব সাম্রাজ্যবাদী ভাষা প্রান্তিক ভাষা মাত্র। 

অনুবাদের প্রসঙ্গ থেকে উঠে আসছে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদানের প্রসঙ্গ। ইংরেজির প্রতিপত্তির সঙ্গে নোবেল পুরস্কার পাওয়া না পাওয়ার একটি সম্পর্ক যে আছে সেটা আমরা আগেই বলেছি যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেটি হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন। যদিও তাঁর কাব্যপ্রতিভা অমিত ছিল, এবং তাঁর সাহিত্যখ্যাতির অবমূল্যায়নের কোনও সুযোগ নেই, এবং হয়তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের সময় রাজনৈতিক আপসকামিতার কৌশল হিসেবে তাঁকে তাঁর পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক উচ্চ অবস্থানের কারণে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হ’তই, কিন্তু তিনি যদি মূল কোনও সাম্রাজ্যবাদী ভাষায় অনুবাদের প্রচেষ্টা না নিতেন তা হলে নোবেল কমিটি তাঁর কাব্য বিবেচনা করার সুযোগ পেত না। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে নয়, কিন্তু অনুবাদের ভাষার সঙ্গে নোবেল কমিটির সম্পর্ক নিয়ে তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার বিয়ারক্রফটের মন্তব্যটি  প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, যে সাহিত্য ইংরেজিতে বা নোবেল কমিটি অন্য যে ভাষা পড়তে পারে, সে ভাষায় লেখা না হলে কোনও একজন লেখক নোবেল পাবেন না। (কার্ন ১৪)

বিয়ারক্রফট একটি হিসাবও তুলে ধরেছেন। ১৯০০ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে যে ১১০ জন সাহিত্যিককে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়, তার মধ্যে মাত্র আটজন ছিলেন অ-ইউরোপীয় অধিবাসী। তার মধ্যে তিন জন―চীনের মো ইয়ান এবং আর দু’জন জাপানি লেখক―ইউরোপের অধিবাসী ছিলেন, আর আরেকজন ইউরোপীয় শাসনের অধীনে বাস করতেন―রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে। তিনি ছিলেন ইউরোপের বাইরে প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল পাওয়া সাহিত্যিক। তাঁর আগে ১৯০৭ সালে, ভারতে জন্মগ্রহণকারী ইংরেজ সন্তান রুডিইয়ার্ড কিপলিং নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন সাহিত্যে। বিয়ারক্রফট আরও বলছেন, বিচারকেরা সে রচনাটুকুই মূল ভাষায় পড়েছেন যেটি তারা পড়তে পারেন, বা সে অনুবাদটুকুই পড়েছেন যেটা তাঁরা পড়তে পারেন, এবং অনুবাদের তারতম্য অনুসারে নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্তির মধ্যে হেরফের হবেই। আর আর্ন্তজাতিক বা বিশ^ রাজনীতির প্রভাবশালী কূটকৌশল কি নোবেল পুরস্কারের মধ্যে ছাপ ফেলে না ? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদিও যে কোনও বিচারে নোবেল পুরস্কার পাবার যোগ্য ছিলেন, তবুও এই পুরস্কার পাওয়ার কৌশলগত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি ইঙ্গিত আমরা করেছি। ঠিক সেরকম একটি উপসংহারে আসা যায় চীনা লেখক মো ইয়ানের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে। মো ইয়ানের প্রকৃত নাম গুয়ান মই, এবং তিনি চীনা রাজনীতির কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু ২০১২ সালে তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর সি সি পি বা সেন্ট্রাল কমিউনিস্ট পার্টি উৎসাহভরে ঘোষণা দিল যে, মো ইয়ানের পুরস্কারপ্রাপ্তিতে এটাই পরিষ্কার হলো যে, চীনা সাহিত্য বহুদূর এগিয়ে গেছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও বোঝা গেল যে, বিশ^ব্যাপী প্রতিটা ক্ষেত্রে চীনের প্রতাপ ও প্রভাব ক্রম-বর্ধমান। অথচ এর মাত্র ডজনখানিক বছর আগে যখন চীনা লেখক, প্যারিস-প্রবাসী গাও জিনজিয়াংকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়, তখন চীনের সরকার গাও জিনজিয়াংকে ফরাসি লেখক হিসেবে শুধু অভিহিত করল না, সুইডিশ একাডেমিকে ভর্ৎসনা করল রাজনৈতিক অভীপ্সা থেকে এই পুরস্কার দেওয়ার জন্য। মোট কথা হলো চীনা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নটাই করা হয়ে থাকে যে এটি শুধু সাহিত্য ছাড়া আর কোনও উদ্দেশ্য সাধিত করছে কি না! সহজ হিসাব, এর সাহিত্যের মূল্যায়ন হয় কতটুকু সেটি চীনের পোলিট ব্যুরোর নীতির সঙ্গে গেল বা গেল না।

(গ) বিশ্বসাহিত্য―সাম্রাজ্যবাদিতার প্রভাবে ঔপনিবেশিক সাহিত্যের বিকাশ ও চরিত্র। 

গ্যেটেকে ওয়েল্টলিটেরাটার বা বিশ্বসাহিত্যের ধারণার প্রবক্তা আমরা বলছি, কিন্তু ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো দিগবিদিক ছড়িয়ে পড়ে উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করেছিল। এবং উপনিবেশগুলোতে একটি সমান্তরাল পরস্পর-বিরোধী ধারার সৃষ্টি হয়। কোনও কোনও অধিকৃত রাজ্যে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবশালী ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যের বিরোধের সৃষ্টি হলো। এই বিরোধটি বেশিরভাগ হয়েছে এশিয়া এবং আফ্রিকায়, আর উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ আমেরিকায়ও বিরোধটি হয়েছে, কিন্তু সেটির স্বরূপ ছিল ভিন্ন। এ কথাটা অবশ্য পুরোপুরি প্রামাণিক নয়, যেটা বলতে যাচ্ছি। সেটি হচ্ছে, এ দু’টি মহাদেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের আগে নেটিভ কালচার বা আদি সংস্কৃতি বলতে প্রাচীন ইন্ডিয়ান বা অন্যান্য গোত্র যারা ছিল, তাদের সম্ভবত কোনও লিখিত সাহিত্য ছিল না, ফলে এ দুই মহাদেশে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ভাষাই সাহিত্য রচনা ও ভাষা চর্চায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। আদি জনগোষ্ঠীর কোনও লিখিত সাহিত্য এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা দিতে পারল না। উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে থাকল ইংরেজির প্রভাব, আর কানাডায় ব্যাপক ইংরেজির সঙ্গে কিছুটা ফরাসি ভাষার প্রভাব। আবার উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো থেকে শুরু করে মধ্য আমেরিকা হয়ে সুদূর আর্জেন্টিনা ও চিলি পর্যন্ত হয়ে গেল স্প্যানিশ ভাষার বলয়, মাঝখানে ব্রাজিলে প্রভাব বিস্তার করল পর্তুগিজ ভাষা। এশিয়া এবং আফ্রিকার উপনিবেশগুলোর সঙ্গে উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উপনিবেশগুলোর তফাৎ হলো, এবং যে কারণে অস্ট্রেলিয়া ও নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গেও তফাত রইল, সেটি হলো ভারত বা নাইজেরিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী ভাষা ইংরেজির সঙ্গে সেসব দেশের স্ব স্ব ভাষার সঙ্গে বিরোধ, কিন্তু আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ইংরেজি ভাষা একচ্ছত্র হয়ে রইল। আবার রাজনৈতিক অর্থে, সব উপনিবেশিত দেশে বিরোধটা হয়ে রইল ঔপনিবেশিক শাসন আর ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে বিরোধ। কিন্তু উপনিবেশিত অঞ্চল আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া আর নিউ জিল্যান্ডে ভাষাটা চাপিয়ে দিতে হয়নি, সাম্রাজ্যবাদী ভাষাটাই সেখানে বলবৎ রইল, কিন্তু ভারত বা নাইজেরিয়ায় ইংরেজি ভাষাটা চাপিয়ে দিতে হয়েছিল, বা আলজেরিয়ায় ফরাসি ভাষা, মোজাম্বিকে পর্তুগিজ ভাষা চেপে বসেছিল―ঐসব দেশের স্বদেশি ভাষা বা ভাষাগুলোর ওপর। ১৭৭৬ সালে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য যখন টমাস জেফারসনসহ অন্যরা শাসনতন্ত্র রচনা করছিলেন, তাঁরা সেটি তাঁদের মাতৃভাষা ইংরেজিতেই রচনা করেছিলেন, যে ভাষা আবার তাঁদের ঔপনিবেশিক শাসক গ্রেট ব্রিটেনের ভাষা ছিল। কিন্তু ভারত উপমহাদেশের রাজনৈতিক জীবনের একটি বিশেষ ক্ষণে যখন লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) পেশ হলো, সেটি রচিত হয়েছিল ইংরেজি ভাষায়, যেটি ব্রিটিশ শাসকবর্গের ভাষা ছিল, কিন্তু ভারতীয় কোনও নেতার মাতৃভাষা ছিল না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল পুরস্কার দেবার সময় সুইডিশ একাডেমি সংশা পত্রে লিখলেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরস্কারটি পেলেন প্রধানত, ‘… because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West.’ (পৃ. ১৩৮)৭ কথাটা কেমন ? ―‘in his own English words’ ? প্রাবন্ধিক বি. ভেঙ্কট মানি বলছেন যে, সুইডিশ একাডেমির কথায় বোঝা যাচ্ছে সাইদের ওরিয়েন্টালিজমের ধারণাটি কতটা পাকাপোক্ত। রবীন্দ্রনাথের লিখিত ‘নিজের ইংরেজি ভাষা’ ? রবীন্দ্রনাথের মাতৃভাষা ইংরেজি ? এই কথাটা বলার মওকা হলো, আগেই বলেছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  যেহেতু ছিলেন ব্রিটিশ প্রজা, তাই সুইডিশ একাডেমি দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের মাতৃভাষাকে অবলীলায় ইংরেজি বলে কথিত করলেন―বাংলার কোন উল্লেখ নেই। প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরস্কারগ্রহণ সম্পর্কিত একটি তারবার্তা পাঠালেন, যেটি সুইডেনস্থ ব্রিটিশ দূত রবার্ট ক্লাইভ একাডেমির কাছে পৌঁছে দিলেন। রবীন্দ্রনাথের জবাবটাতে তিনি যে ভারতীয় অধিবাসী সেটি সম্পর্কে কোনও উল্লেখ না করে বিশ^নাগরিকত্বের ভ্রাতৃত্ববোধ নিয়ে লিখলেন, ‘I beg to convey, to the Swedish Academy my grateful appreciation of the breadth of understanding which has brought the distant near, and has made a stranger a brother.’ (পৃ. ১৩৮)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর ভারতীয় সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদায় উঠেছিল এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কথা আমাদের বলতেই হবে। পশ্চিমের সঙ্গে পূর্বের যোগাযোগ দাঁড়িয়ে গেল। প্রাবন্ধিক মানির আরও দু’টো উল্লেখ এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের যোগাযোগটা সুনির্দিষ্ট করবে। ১৯১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পান ফরাসি ঔপন্যাসিক রমাঁ রল্যাঁ, এবং একটি কৌতূহলের ব্যাপার হলো তিনি মহাত্মা গান্ধির ওপর একটি জীবনীও লিখলেন, ১৯২৪ সালে, আবার সেটি বহুল প্রচারের জন্য ফরাসি থেকে জার্মান ভাষায় অনুবাদও করলেন। আবার জার্মান ঔপন্যাসিক হারমান হেস ১৯২২ সালে রচনা করলেন সিদ্ধার্থ নামক উপন্যাসটি, যার উৎস হতে পারে এই উল্লেখটি যে, হেসের পিতামহ কেরালায় ধর্মযাজক হিসেবে কাজ করেছিলেন, ফলে হেসের ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা ছিল। আর হেস সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হলেন ১৯৪৬ সালে।

১৯২৩ সালে রমাঁ রল্যাঁর মাথায় ‘বিশ্ব পাঠাগার’ গঠনের চিন্তা আসে। এটি তিনি হেসের সঙ্গে আলাপ করেন। ধারণাটি ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের তাবৎ চিরায়ত সাহিত্যের সংগ্রহ থাকবে সেখানে। বিশ্ব পাঠাগারটির নাম দিলেন, ‘হাউজ অব ফ্রেন্ডশিপ,’ এবং চিন্তা করলেন যে এটির অবস্থান হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক ১৯১৮ সালে স্থাপিত শান্তিনিকেতন বিদ্যায়তনে। অবশ্য ওয়েল্টবিবলিওথেক বা বিশ্ব পাঠাগার ধারণাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। যদিও বলতে পারি, বর্তমান সময়ে জার্মানির ফ্রাংফ্রুট শহরে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।

গ্যেটের দেশ জার্মানি সত্যি সত্যি ওয়েল্টলিটেরাটারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়ে। ১৮৫২ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে জার্মানির পুস্তক প্রকাশনের সংখ্যা তিন গুণ হয়ে পড়ে। ৮৮৫৭টি টাইটেল বা শিরোনাম থেকে এই সময়ে মোট মুদ্রিত বইয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪৭০২টি। ডেইড্রিগস ভার্লগ (Diedrichs Verlag) নামক একজন প্রকাশক বিশাল একটা পরিকল্পনা করলেন। তিনি ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ মহাসাগর অঞ্চলগুলো থেকে লোক-সংস্কৃতি ও রূপকথার পুস্তক প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন। ১৯১৫ সালে ভার্লগ ওয়েল্টলিটেরাটার নামক ১৬ পৃষ্ঠার একটি সাহিত্য পত্রিকা মিউনিখ নগরী থেকে ছাপানো শুরু করলেন, যেটিকে বলা যায় গ্যেটের বিশ^সাহিত্যের ধারণার মূর্ত প্রকাশ। প্রথম দিকে এক একটি সংখ্যায় এটি জার্মানির লেখকদের ওপর আলোচনা করত, যেমন ক্লিস্ট, ইকেনড্রফ, হফম্যান, গ্যেটে, হাইনে, শিলার প্রমুখের ওপর এক একটি সংখ্যা ছাপা হয়। ক্রমান্বয়ে বহিঃদেশের লেখকদের ওপর আলোচনা পত্রস্থ হতে থাকে। রাশিয়ার তুর্গেনিভ, দস্তোয়ভস্কি এবং আমেরিকার এডগার এলান পো-র ওপর সংখ্যা ছাপা হয়। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপের বড় লেখক বলতে কেউ বাদ পড়ল না : ভল্টেয়ার, বালজাক, গোগল, মপাঁসাঁ, এন্ডারসেন, ফ্লবেয়ার, শেখভ, গোর্কি, বর্নসন, পুশকিন, স্ট্রিন্ডবার্গ, মেরিমি, তলস্তয়, জোলা, জোকাই প্রমুখ। নোবেল বিজয়ীরাও কেউ বাদ পড়লেন না। টমাস মান, নুট হামসুন, সেলমা লেজারলফ, রুপইয়ার্ড কিপলিং বিভিন্ন সংখ্যায় জায়গা পেলেন, এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জায়গা পেলেন এর ১৯২০ সালে প্রকাশিত ৪৯ নম্বর সংখ্যায়। 

হারম্যান হেস একটি প্রভাবশালী প্রবন্ধ লিখলেন, ‘বিশ^সাহিত্যের পাঠাগার’ শীর্ষক, যাতে তিনি জার্মান শব্দ বিলডাং বা গড়ে ওঠা/ বেড়ে ওঠা এই অর্থ প্রয়োগ করে বললেন, ফার্সি, আরবি, চীনা, সংস্কৃত, তিব্বেতান ও পালি সাহিত্যের বইও এখানে সংগ্রহে থাকবে।

তবে গ্যেটের বিশ^সাহিত্যের স্বপ্ন, কিংবা রমাঁ রলাঁ আর হেসের বিশ^ পাঠাগারের চিন্তা ধূলিসাৎ হতে সময় লাগে না এবং সে সঙ্গে ভার্লগের ওয়েল্টলিটারাটার সাহিত্য পত্রিকাটিও হুমকির মুখে পড়ে যখন জার্মানিতে ১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় আসে হিটলারের দল ন্যাশনাল সোশালিস্ট পার্টি বা নাৎসি পার্টি। হিটলারের মন্ত্রিসভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত জোসেফ গোয়েবেলস একটি সাংস্কৃতিক দপ্তর গঠন করলেন যার দায়িত্ব হলো যাবতীয় প্রকাশনার দেখভাল করা, প্রকারান্তরে প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা। তারপরের ঘটনা বিশ^কাহিনি―ইহুদি নির্যাতন, আর্য রক্তের প্রাধান্য ও পরদেশ দখল ইত্যাদি। এর মধ্যে নাৎসি সরকার ওয়েল্টলিটারাটার নিজেদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশের দায়িত্ব নেয়। ফলে যা হবার তাই হলো, ওয়েল্টলিটারাটার নামে ইহুদি লেখক, রাশিয়ান লেখক, ইংরেজ (শুধু মাত্র শেক্সপিয়ার ছাড়া), আমেরিকান সব লেখকই বাদ পড়লেন শুধু নয়, নাৎসি সরকার একটি ভয়াবহ কাজও সম্পাদন করলেন। ল্যাংগেনবুখার নামক একজন ভুঁইফোর সম্পাদকের তত্ত্বাবধানে ১৯৩৪ সালের ১০ মে বার্লিন নগরীতে বই পোড়ানোর উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। গোয়েবেলস একটি উত্তেজনাসৃষ্টিকারী বক্তৃতায় বললেন, ‘নো টু ডিকাডেন্স এ্যান্ড মর‌্যাল করাপশন।’ (https://www.google.com/search? rlz) অর্থাৎ, অবক্ষয়ী আর অনৈতিক সাহিত্যকে না বলুন। হাইনরিশ হাইনে বললেন, যখন বই পোড়ানো হয়, তখন আসলে মানুষকেই পোড়ানো হয়। (মানি, পৃ. ১৭৭) এই মূঢ়তার চরম প্রকাশ ঘটল যখন লেফটেন্যান্ট সিগমান্ড গ্রাফ নামক একজন যুদ্ধরত সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ‘জার্মানচরিত্র এবং বিশ^সাহিত্য’ নামক একটি প্রবন্ধ রচনা করলেন, যাতে তিনি গ্যেটে এবং হিটলারের মধ্যে মিল বের করে বললেন যে প্রথমজনের বিশ্বসাহিত্য নিয়ে ধারণা আর হিটলারের জার্মানি নিয়ে ধারণা একই অনুপ্রেরণা থেকে উজ্জীবিত। বললেন, (আমার অনুবাদ) ‘এডলফ হিটলার একদা তাঁর একটি লেখায় একটি গাছের চিত্রকল্প দিয়ে বলেছিলেন, গাছটি সব দিকে শাখা আর ডাল মেললেও তার কাণ্ড থাকে মা মাটিতে প্রোথিত, ঠিক সেরকম আমরা  গ্যেটের ওয়েল্টলিটারাটারের ধারণাটি বুঝতে পারি।’ (মানি, পৃ. ১৬৬) তিনি আরেকটি আশ্চর্য মন্তব্য করলেন। বললেন, ‘ইংল্যান্ডের সঙ্গে যুদ্ধ সত্ত্বেও শেক্সপিয়ার জার্মানদের জন্য সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় লেখক হয়ে রইবেন। শেক্সপিয়ারের সাহিত্যকর্ম জার্মান আইডিয়া অব পারফেকশনেরই অংশ, কাজেই সেটাকে রক্ষা করতে হবে, যেভাবে কলোন শহরের ক্যাথিড্রালকে রক্ষা করতে হবে।’ (মানি, পৃ. ১৬৬) নাৎসি জার্মানির সরবরাহকৃত বিশ্বসাহিত্যের তালিকা থেকে পশ্চিমা বিশে^র বাঘা লেখকেরা সবাই পড়লেন, আর সঙ্গে সঙ্গে, বলাবাহুল্য, নিষিদ্ধ হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

যেহেতু ভারতীয় উপমহাদেশের অংশ হিসেবে আমরাও (বাংলাদেশিরা) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অধীনে ছিলাম, সেজন্য ঔপনিবেশিক আমলে (অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত) বিশ^সাহিত্য বলতে এ ভুভাগে আমরা ইংরেজি সাহিত্যকেই ধরে নিয়েছিলাম। বা ইংরেজি সাহিত্যের মাধ্যমে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যসহ আধুনিক যুগের প্রারম্ভিক পর্বের ইউরোপের অন্যান্য সাহিত্যের সঙ্গে হয়তো পরিচিত ছিলাম। যেমন বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিদেশি সাহিত্য বলতে ইংরেজি সাহিত্যের পাশাপাশি রুশ ঔপন্যাসিকদের নাম শুনতাম। বিশ্বসাহিত্য বলতে ঐটুকুই ছিল আমাদের ধারণা ষাটের দশকে বা সত্তরের দশকে।  ঔপনিবেশিক সাহিত্যের প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণ ও পাশাপাশি উপনিবেশিত সাহিত্যের বিকাশের পথে বাধাপূর্ণ সম্পর্কটা বিশ^সাহিত্য সংজ্ঞার প্রণয়নে আলাদা একটি ধারা নির্মাণ করেছে, যেটা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে আমাকে একটি কথা পরিষ্কার করতে হবে। ইংরেজিই যেহেতু আমাদের ঔপনিবেশিক ভাষা ছিল, সে জন্য ইংরেজি সাহিত্যের প্রসঙ্গ টেনে বিশ্বসাহিত্যের এদিকটার ব্যাখ্যা দেওয়া সহজ হবে।

প্রথমে রেনেসাঁ যুগের কথা দিয়ে শুরু করি। ইংল্যান্ড সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হবার আগে ভৌগোলিক অভিযাত্রার যুগের শুরু হয়। ইউরোপ থেকে অভিযাত্রিক নাবিকেরা, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, ভূগোলবিদ, প্রাণিবিশেষজ্ঞ ও প্রকৃতিবাদীরা সমুদ্রপথে চতুর্দিকে বেরিয়ে পড়েন। কলম্বাস ১৪৯২ সালে আমেরিকার উপকূলে বাহামাস দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেন, অর্থাৎ পৃথিবীর একটি দিকের উন্মোচন হয়। এর ঠিক ছয় বছর পর, ১৪৯৮ সালে ভাস্কো ডি গামা পৌঁছে যান ভারতের কালিকট বন্দরে। কিন্তু রেনেসাঁ ইউরোপের সময় ভৌগোলিক এই অভিযাত্রার আগেই মানসিক বা কল্পনার অভিযাত্রার শুরু হয়। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির সময় তাঁর প্রধান অমাত্য ছিলেন ছিলেন স্যার টমাস ক্রমওয়েল। তিনি ১৫৩৩ সালে কেন ইংল্যান্ড রোমান চার্চ থেকে আলাদা হয়ে যাবে সে ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন, ‘This realm of England is an empire.’ (ইংল্যান্ড নামক এই রাজ্যটি একটি সাম্রাজ্য)।৮ অষ্টম হেনরির দ্বিতীয় মেয়ে এলিজাবেথ টিউডর রানি হলে তাঁর দরবারের একজন বিখ্যাত অঙ্কশাস্ত্রবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্যাম্ব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের এম এ ড. জন ডী ১৫৭৭ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি বইয়ে রানিকে পরামর্শ দিলেন তিনি যেন জলদস্যুদের হাত থেকে ইংল্যান্ডে আমদানিকৃত পণ্য রক্ষার্থে শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করেন, এবং ইংল্যান্ড তার ফলে অচিরেই সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে (‘মেরিটাইম এম্পায়ার’) পরিণত হবে। ১৬০০ সালের শেষ দিনে এই রানি এলিজাবেথের কাছ থেকে লন্ডনের কিছু সওদাগর একটি সনদে সই করিয়ে নেন, যেটি ছিল তাদের গঠিত কোম্পানিকে যেন রানি দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে বাণিজ্য করার অনুমতি দেন। এই কোম্পানিটিই পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নাম নেয়, মূলত যেটির কার্যকলাপের ফলে ভারতবর্ষে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগের শুরু হয়।

তা হলে দেখা যায়, ইংল্যান্ড ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অর্থে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হবার আগেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাম্রাজ্য হবার স্বপ্ন লালন করতে থাকে। এবং রানি এলিজাবেথের সময় ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও প্রবন্ধকার প্রায় সবাই সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের মৌতাত নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন দেখতে পাই। ক্রিস্টোফার মার্লো সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র ড. ফাউস্টাস তাঁর প্রবল জ্ঞানস্পৃহা ও ভৌগোলিক জিগীষার জন্য বিখ্যাত। এ সময়কার প্রধান কবি ও নাট্যকার শেক্সপিয়ার একদিকে তাঁর নাটকগুলোতে ইংল্যান্ড থেকে বেরিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ (ডেনমার্ক, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, গ্রিস ইত্যাদি)  ও নগর  (ভেনিস, ভিয়েনা, রোম, মিলান, এথেন্স ইত্যাদি)-ভিত্তিক প্রেক্ষাপট তৈরি করলেন। অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা নাটকে প্রেমের ছলে সাম্রাজ্যচেতনার ইঙ্গিতটি স্পষ্ট। ক্লিওপেট্রা অ্যান্টনিকে জিজ্ঞেস করছে, সে তাকে কতটুকু ভালোবাসে। উত্তরে এ্যান্টনি বলে ক্লিওপেট্রার জন্য তার ভালোবাসার পরিমাণ বোঝাতে গেলে নতুন নতুন স্বর্গ, নতুন পৃথিবী যোগ করতে হবে:‘ Then must thou needs find out new heaven, new earth.’ (প্রথম অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য, পঙ্ক্তি ১৭) সাম্রাজ্যবাদী যুগের প্রারম্ভিক পর্বে এই ধরনের ভৌগোলিক উল্লেখ সেই বুদ্ধিজাত সাম্রাজ্যের ইঙ্গিত করে। অন্যদিকে বর্ণবাদের দিক থেকেও সীমানা অতিক্রম করে শেক্সপিয়ার সৃষ্টি করলেন ওথেলোর মতো চরিত্র। তাঁর শেষ  নাটক দ্য টেম্পেস্ট-কে নানাভাবে ঔপনিবেশিক সাহিত্যের সূচনাগ্রন্থ বলা যায়। কারণ নিজ রাজ্য থেকে বিতাড়িত ডিউক প্রসপেরো ক্যালিবানের দ্বীপ দখল করে নেয়। শেক্সপিয়ারের অন্যতম সমসাময়িক কবি জন ডান তাঁর ১৬৩৩ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত ‘দ্য সান রাইজিং’ শীর্ষক কবিতায় অনেকটা সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাকে আত্মস্থ করে তাঁর প্রেয়সীকে সগৌরবে বললেন, “She’s all the states, and all the princes, I, / Nothing else is” (প্রেয়সী আমার সমস্ত রাজ্য, আর আমি তার অধীশ^র / আর কিছুরই নেই গুরুত্ব।’ (আমার অনুবাদ)। 

কবির প্রেয়সী যেন রূপক অর্থে ভবিষ্যতে ইংল্যান্ড যে সব রাষ্ট্রকে দখল করবে তাদেরই প্রতিনিধি, আর কবি সে সব অধিকৃত রাজ্যের রাজা, অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসক ইংল্যান্ড। যদি দ্য টেম্পেস্ট ঔপনিবেশিক যুগের সূচনা পর্বের একটি উজ্জীবনী নাটক হয়ে থাকে, তা হলে ড্যানিয়েল ডিফোর উপন্যাস রবিনসন ক্রুসো (১৭১৯) হবে সেটিরই বর্ধিত এবং বাস্তবায়িত ঔপনিবেশিক সংস্করণ। প্রসপেরো চেয়েছিল ক্যালিবানকে ইউরোপীয় ভাষা শেখাতে, কিন্তু ক্যালিবান সেটা অগ্রাহ্য করে এবং রোষের মধ্যে বলে যে প্রসপেরোর ভাষা শিখে ক্যালিবানের এইটুকু লাভ হয়েছে যে সে তার শেখান ভাষাতেই প্রসপেরোকে গালি পাড়তে পারে৯। কিন্তু রবিনসন ক্রুসো-তে আমরা যখন আসছি, তখন নতুন মহাদেশ আমেরিকায় ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর প্রতিষ্ঠা প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে। রবিনসন ক্রুসো প্রথম দিকে ভেনিজুয়েলার আশেপাশে জাহাজ দুর্ঘটনায় একাকী কোনও নির্জন দ্বীপে পতিত হলেও ক্রমশ ঔপনিবেশিক সামর্থ্যরে পরিচয় দিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। হয়ে পড়েন প্রসপেরোর মতোই পুরো দ্বীপের ঔপনিবেশিক অধীশ্বর, এবং এক পর্যায়ে ঐ দ্বীপাঞ্চলগুলোর কৃষ্ণকায় অধিবাসীদের একজনকে তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ভৃত্যে পরিণত করেন। শুধু তাই নয়, ঔপনিবেশিকতার সংজ্ঞা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ শুধু জমির ওপর নয়, অধিবাসীদের শরীর ও মনের ওপরও থাকতে হবে, সেই মোতাবেক ঐ ভৃত্যকে ক্রিশ্চান ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন,  তাকে ইংরেজি শেখান আর ক্রিশ্চান ধর্ম অনুযায়ী তার নাম রাখেন ’ফ্রাইডে’। ফ্রাইডে এক পর্যায়ে রবিনসন ক্রুসোর পায়ের কাছে তার মাথা পেতে তাকে বাঁচানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানায়। এটিও চিত্রকল্প হিসেবে মাস্টার-স্লেইভের বা ঔপনিবেশিক শাসক ও উপনিবেশিত প্রজার প্রতীক হয়ে গেল।   

উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাইদের মতে সাম্রাজ্যবাদী বর্ণনার উৎকৃষ্ট মাধ্যম ছিল উপন্যাস। কারণ উপন্যাসের মাধ্যমে একটি বর্ণনা উপস্থিত হয় যেখানে ঔপনিবেশিক দেশগুলোর লেখকদের অবচেতন মনে যে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার প্রতি মৌন সমর্থন থাকে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ওরিয়েন্টালিজম-এ (১৯৭৮) তিনি সবিস্তারে বর্ণনা করলেন কীভাবে প্রতিচ্যের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর লেখকেরা তাঁদের কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে প্রাচ্য বা ওরিয়েন্টাল জগৎ নামক একটি বিশ^ তৈরি করলেন, যার সঙ্গে বাস্তব জগতের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা দ্বারা নির্ধারিত প্রাচ্যে দেশের কোনও সম্পর্ক ছিল না। তিনি ওরিয়েন্টালিজম-এর পরিপূরক আরেকটি গ্রন্থ লিখলেন, কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম (১৯৯৪) শীর্ষক ‘ভূমিকাতে’ সাইদ ব্যাখ্যা করছেন কেন ডিকেন্সের উপন্যাস গ্রেট এক্সপেকটেশানস (১৮৬১) এবং জোসেফ কনরাডের উপন্যাস নসট্রোমো (১৯০৪) এক অর্থে সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার প্রতিভূ।

ডিকেন্সের উপন্যাসের মূল নায়ক পিপ ছোটবেলায় এক দাগি আসামিকে ক্ষুধা নিবারণে সাহায্য করে। সে আসামি, এব ম্যাগউইচ, পরবর্তীকালে শাস্তিস্বরূপ অস্ট্রেলিয়ায় যাবজ্জীবনে চলে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেখানে সে ধনসম্পদের মালিক হয়ে গেলে তার এক সময়ের জীবনরক্ষাকারী পিপকে বেনামিতে একজন উকিলের মাধ্যমে জীবনপথে সফল হতে অর্থ সাহায্য পাঠাতে থাকে। পিপের সাফল্য দেখতে একসময় ম্যাগউইচ গোপনে ইংল্যান্ডে চলে আসে। এই ঘটনার ওপর সাইদ মন্তব্য করছেন যে ম্যাগউইচ আইনত নিষিদ্ধ ছিল, এবং সে ইংলান্ডে আসতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদীর প্রকরণ হলো এ রকম যে ইংল্যান্ড বা সাম্রাজ্যবাদের কেন্দ্র বা মেট্রোপোলিসএ ম্যাগউইচদের কোনও স্থান নেই। আবার পিপ যখন ম্যাগউইচকে তার বিকল্প পিতা হিসেবে মেনে নেয়, এবং এক পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ব্যবসা বাণিজ্যে সফল হয়, তখন সাইদ বলছেন, এটি হলো সাম্রাজ্যবাদের আরেকটি ফর্মুলা যে কেন্দ্র থেকে উপনিবেশে গিয়ে লোকজন ব্যবসাপাতি করে জীবনের উন্নয়ন ঘটাবে। কনরাডের ক্ষেত্রে, সাইদ বলছেন, সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকট কেন না, কনরাড বিশ্বাসই করতে পারতেন না যে উপনিবেশগুলোর কোনও নিজস্ব সত্তা থাকতে পারে। সাইদ লিখছেন, (আমার অনুবাদ) ‘কনরাড যেন বলতে চাইছেন, ‘আমরা পশ্চিমারা ঠিক করব, কে ভালো নেইটিভ এবং কে খারাপ নেইটিভ, কারণ এই নেইটিভগুলোর অস্তিত্ব নির্ভর করছে আমাদের স্বীকৃতির ওপর। আমরা তাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাদেরকে কথা বলতে শিখিয়েছি, চিন্তা করতে শিখিয়েছি, এবং তারা যখন বিদ্রোহ  করে সেটিও আমাদের প্রাক-ধারণার সঙ্গে মিলে যায় যে এরা শিশুর মতো, তাদের পশ্চিমা গুরুদের তালে তালে নাচছে।’ তারপরও সাইদ নস্ট্রোমো-তে কনরাডের তরফ থেকে একটি চরম কূটাভাস দেখতে পেলেন। সেটি হলো, এত যে নিয়ন্ত্রণ, সেটি টিকে থাকবে না। কারণ সাম্রাজ্যবাদের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে সেটার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, এবং এক সময় সাম্রাজ্যবাদের পরাজয় ঘটে। সাইদ রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের বিখ্যাত উপন্যাস কিম নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বললেন যে কিপলিংয়ের মতো এত সুদক্ষ বর্ণনাকারী হয়তো উপন্যাসের জগতে নেই, কিন্তু তাঁর উপন্যাসেও এই ইঙ্গিত আছে যে, সাম্রাজ্যবাদের এই নিরঙ্কুশ অধিকার টিকে থাকবে না; পরের জমি দখল করে শাসন বেশিদিন টিকে থাকবে না। আমরা ই এম ফর্স্টারের উপন্যাস আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া (১৯২৪) বা জর্জ অরওয়েলের প্রবন্ধ শুটিং অ্যান এলিফ্যান্ট (১৯৩৬)-এর আলোচনা যদি আনি, তা হলে সাইদের কথা মানতে হয় যে যদিও ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজি চিরায়ত সাহিত্যের প্রতিভূ হিসেবে উপন্যাসই আদৃত ছিল বেশি, এবং এগুলো বিষয়গতভাবে ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির জয়গান গাইলেও, এবং এ কারণে ভারতীয় উপমহাদেশসহ সব উপনিবেশে ব্যাপক মর্যাদার আসনে অদ্যাবধি প্রতিষ্ঠিত থাকলেও, উপন্যাসগুলোর বর্ণনার প্রকরণের মধ্যে ভাঁজ হয়ে আছে একটি বিষাদ, হতাশাময় হৃদয়ঙ্গমতা যে এই ঔপনিবেশিক শাসন টিকে থাকবে না। আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া-র মূল কথা হচ্ছে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো―সাইদের ‘ওরিয়েন্টাল’ ধারণার ব্যাখ্যা অনুযায়ী―প্রাচ্যদেশকে যেভাবে প্রাক-ধারণা করে মস্তিষ্কে জায়গা করে নিয়েছে সেটি কখনও প্রাচ্যদেশের বাস্তবতার প্রতিফলনে বদলাবে না। ভারতে বিবাহের উদ্দেশ্যে আসা ইংরেজ রমণী এডেলা কোয়েস্টেড ডাক্তার আজিজকে সম্ভাব্য ধর্ষণকারী মনে করেছে কারণ তার ধারণা হলো, ভারতীয় পুরুষ (বিশেষ করে মুসলমান পুরুষ) ইংরেজী নারীকে একা পেলেই ধর্ষণ করবে। এবং শুটিং অ্যান এলিফ্যান্ট প্রবন্ধের মূল বিষয়টা পুরো সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোটির অবস্থান যে কত ভঙ্গুর সেটি উন্মোচন করে যখন সাহেব দারোগা শুধুমাত্র নিজের ঔপনিবেশিক ভাবমূর্তি ‘সাহেব হচ্ছে হিরো, সাহেব সব পারে’―ধরে রাখার জন্য সেই উন্মাদ হস্তীটিকে―যে তখন কিন্তু নিরীহ, কারও ক্ষতিসাধনে প্রচেষ্টিত নয়―গুলি করে মেরে ফেলে। দু’টো উদাহরণই সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর অস্বচ্ছতাকে প্রমাণ করে, এবং দু’টাই হচ্ছে প্রাচ্য সম্পর্কে প্রতীচ্যের প্রাক-ধারণা নির্ভর।

আর আমাদের প্রবন্ধের আলোকে এটিও বলতে হয় যে যে উপন্যাসগুলোর আলোচনা করলাম: যেমন, রবিনসন ক্রুসো, গ্রেট এক্সপেকটেশানস, নস্ট্রোমো, আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া―সবগুলোই বিশ^সাহিত্যের ক্যানন বা পাঠ্যসূচিতে সচরাচর অন্তর্ভুক্ত হয়। তাই বলছি যে, ঔপনিবেশিক সাহিত্যের একটি বড় অংশ বিশ্বসাহিত্যেরও নির্ধারিত অংশ।   

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা ঔপনিবেশিক আমলটা শুধু যদি ভারত উপমহাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা করি, তা হলে দেখব যে ইংরেজ শাসনের বেলায় ইংরেজি সাহিত্য ব্যবহারের একটা প্রকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সামরিক শক্তি ছাড়াও ইংরেজরা ভারতকে দু’ভাবে বশীভূত করতে চায়। একটি হচ্ছে খ্রিস্টান ধর্ম দিয়ে বা বাইবেল দিয়ে, যেটি একেবারে ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম দিকে ক্রিশ্চান মিশনারিদের প্রচেষ্টা ছিল। সেটি সহসাই ব্যর্থ হয়। তখন তারা ইংরেজি সাহিত্যের নিহিত জোরালো উদার মানবতাকে বিশ্বমানবতা রূপে পরিগণিত করে ইংরেজি সাহিত্যের প্রচারে প্রবৃত্ত হয়। ১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকলের ভাষা নীতি (‘মিনিট অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন’) প্রবর্তনের পর ইংরেজি ভাষা রাজভাষায় পরিণত হয়, এবং ১৮৫৭ সালে যথাক্রমে কলিকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিটিতে ইংরেজি বিভাগ খোলা হয় এবং পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত থাকেন শেক্সপিয়ার, মিল্টন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রমুখ। সাইদ কথিত ’ওরিয়েন্টাল’ ধারণার চূড়ান্ত প্রতিমূর্তি হচ্ছে লর্ড ম্যাকলে, যখন তিনি সদম্ভে ঘোষণা করলেন, ‘a single shelf of a good European library was worth the whole native literature of India and Arabia’. (একটি ভালো ইউরোপিয়ান পাঠাগারের এক তাক পরিমাণ বইয়ের মর্যাদার সমান হবে না পুরো ভারতীয় এবং আরবি সাহিত্যের পরিমাণ।)

তবে ম্যাকলের অনুসরণে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধিষ্ঠান বিস্তৃতি পেলেও, সাইদের কথামতো দেখছি, এই উদার মানবতা বরঞ্চ উপনিবেশিতদের মনে প্রতিরোধপ্রবণতার সৃষ্টি করে। ইংরেজি সাহিত্যের প্রচার ও প্রচলন আসলে উভয়-প্রান্তে ধারাল ছুরির মতো প্রকাশিত হয়। এটি একদিকে যেমন উপনিবেশিতদেরকে ইংরেজদের মাহাত্ম্যের প্রতি অনুরক্ত করে তোলে, তেমনি অন্যদিকে এর শাঁস থেকে তারা নিজেদের বিদ্রোহের কণ্ঠস্বর খুঁজে পায়। যেমন, সাইদ বলছেন, ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো কখনও মনে করেনি যে ‘those ‘natives’ who appeared either subservient or sullenly uncooperative were ever going to be capable of making you give up India or Algeria. Or of saying anything that might perhaps contradict, challenge, or otherwise disrupt the prevailing discourse. `(xxiv)১০ আমার অনুবাদ: ‘সেই নেইটিভরা যাদেরকে সবসময় একান্ত বাধ্য কিংবা চাপা ফুঁসতে থাকা মানুষ মনে হতো, তারা একদিন সক্ষম হবে এবং বাধ্য করবে তোমাদেরকে ভারত বা আলজেরিয়া ত্যাগ করতে। অথবা, তোমাদের বিরোধিতা করা, তোমাদেরকে চ্যালেঞ্জ করা, কিংবা তোমাদের বর্ণনার বদলে নতুন বর্ণনা হাজির করা)।

কিন্তু ভারতে আসলে তাই হয়েছিল, যে ইংরেজরা মনে করেছিল উদার মানবতার শিক্ষা দিয়ে ভারতবাসীকে বশীভূত করে রাখবে, সে বশীকরণ নীতি সহসা উল্টো ফল দিতে শুরু করল। ক্যালিবান যেমন প্রসপেরোকে বলেছিল যে তোমার ভাষা শিখে সুবিধা হয়েছে তোমাকে তোমার ভাষায় গালি দিতে পারছি, তেমনি ভারতে শেক্সপিয়ারের সংবর্ধনা দু’ভাবে হতে দেখছি। দক্ষিণ ভারতের একটি কলেজে উইলিয়াম মিলার নামক একজন ইংরেজ প্রবাসী শিক্ষার্থীদের শেক্সপিয়ার পড়াতেন। তিনি শেক্সপিয়ারকে নৈতিকতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং সে অনুযায়ী শেক্সপিয়ারের ওপর খণ্ড খণ্ড কয়েকটি বই প্রকাশ করার পর ১৯০৫ সালে প্রকাশ করলেন Shakespeare’s Chart of Life, যেখানে তিনি শেক্সপিয়ারকে মানবচরিত্র নির্মাণের পুরোধা সাহিত্যিক হিসেবে কথিত করলেন। কিন্তু তলে তলে রয়ে গেল সে সাম্রাজ্যবাদী বারতা যে শেক্সপিয়ার হচ্ছেন সাম্রাজ্যবাদীর মোড়কে ব্যাখ্যায়িত উদার মানবতার কবি, যাকে উপনিবেশিতরা সভ্যতার চরম নিদর্শন হিসেবে কেবল দেখতে পারবে, দেখতে পারবে শুধু মান্য করার জন্য, সঙ্গী হিসেবে পাবার জন্য নয়। এর কিছু পরে স্মরজিৎ দত্ত শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ, ওথেলো এবং হ্যামলেট নাটকের ওপর তাঁর নিজস্ব মন্তব্যসহ সংস্করণ বের করলেন, ১৯২১ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে। প্রতিটি সংস্করণের নাম দিলেন অ্যান অরিয়েন্টাল স্টাডি। কিন্তু স্মরজিৎ দত্তের লক্ষ্য ছিল মিলারের চেয়ে সর্ম্পূণ আলাদা। তিনি শেক্সপিয়ারের নাটকগুলো থেকে পছন্দের পঙ্ক্তিগুলো বেছে বেছে তারপর সংস্কৃত কাব্য থেকে একই মেজাজের পঙ্ক্তি তুলনা করে দেখালেন যে সংস্কৃত কাব্যে শেক্সপিয়ারের কাব্যের সমপর্যায়ের পঙ্ক্তি কিংবা তার চেয়ে সরেস পঙ্ক্তি আছে। এবং বইটির এপিগ্রাফে লিখলেন, ‘Slavery enforced by brute force is degrading enough, Your Majesty! / But slavery of the mind is truly a hundred times more deplorable.’ (পৃ. ১৪)১১ (আমার অনুবাদ : ‘পশু শক্তি দিয়ে দাসত্ব নিশ্চিতকরণ এমনিতেই বড় অপমানজনক, রাজাধিরাজ মহাশয়! / কিন্তু মনের দাসত্ব এর চেয়ে আরও শতগুণ অনুশোচনামূলক।’)

এতো গেল ভারতবর্ষকে ইংরেজ শাসনের কৌশলগত দিক থেকে সাহিত্যকে প্রাধান্য দেয়ার কথা। কিন্তু ভারতবর্ষের সঙ্গে ঔপনিবেশিক ব্রিটেনের মানসিক সমঝোতা স্থাপন করার ক্ষেত্রে যাঁর নাম সবার্গ্রে আসে তিনি ইউরোপের অগ্রগামী প্রাচ্যবিদ স্যার উইলিয়াম জোনস (১৭৪৬-৯৪), যিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে ভারতবর্ষে আসেন। তিনি প্রাচীন ও আধুনিক বহু ভাষা জানতেন, এবং কলকাতায় বসবাস করার সময় তিনি সংস্কৃত ভাষাও শিখে নেন। তিনি ১৭৮৯ সালে সংস্কৃত থেকে কালিদাসের শকুন্তলা অনুবাদ করেন ইংরেজিতে। জোনস ১৭৭২ সালে ফার্সী ভাষার একটি কবিতা প্রকাশ করেন ইংরেজিতে। তাঁর আগের বছর প্রকাশ করেন ফার্সী ভাষার ব্যাকরণ, গ্রামার (১৭৭১)। এখানে থাকার দুই বছরের মধ্যে তিনি এরূপ সিদ্ধান্তে আসেন যে সংস্কৃত, ফার্সী এবং গ্রিক ও লাতিন ভাষা কোন একটি প্রাচীন ভাষা থেকেই উৎসকৃত এবং হিব্রৃু ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত না হলেও ঐ ভাষার মতোই পুরোনো। তাঁর এই ‘ইন্দো-ইউরোপিয় তত্ত’¡ বস্তুত ইউরোপিয় প্রথম সারির বিদ্বান ব্যক্তিদের প্রাচ্য তথা ভারতবর্ষকে বুঝতে পারার ব্যাপারে সহায়তা করে। আগের ধারণা যেমন ছিল যে হিব্রু ভাষার এককত্ব থেকে সমস্ত ভাষাগুলির প্রকরণ তৈরি হয়েছে, জোনসের ‘ইন্দো-ইউরোপিয়’ তত্ত্ব অনুযায়ী বরঞ্চ বিশ^ ইতিহাসের ভাষার ইতিহাসে এটিই প্রমানিত হয় যে প্রাচীন কাল থেকেই শিকড়-ভাষা বলতে কোন একক ভাষা ছিলো না, বরঞ্চ ভাষার বিবিধ শিকড় ও উৎপত্তির কথাই ভাষা-বিজ্ঞান স্বীকার করে।১২ 

উইলিয়াম জোনস এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের (১৮০০ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত) অধ্যক্ষ উইলিয়াম কেরী সহ প্রথম প্রজন্মের ইংরেজ প্রাচ্যবিদদের কাজের ফলশ্রুতিতে বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে নতুন দিগন্ত খুলে যায়। এ বিষয়ে ফরাসী পন্ডিত রেমন্ড শোয়াব দ্য অরিয়েন্টাল রেনেসাঁ শীর্ষক অতি অনুসন্ধানী একটি গ্রন্থ প্রকাশ করলেন ১৯৫০ সালে।১৩ অত্যন্ত সংবেদনশীল এই গ্রন্থে শোয়াবের বক্তব্যে গ্যেটে কথিত বিশ্বসাহিত্যের ধারণাই মূর্ত হয়। 

তা হলে দেখা যাচ্ছে, ঔপনিবেশিক যুগের শুরু থেকে শেক্সপিয়ার বা সমপর্যায়ের অন্যান্য লেখকদের পাঠ দেওয়া শুরু হয়, এবং তখন থেকেই বোঝা যাচ্ছে এই পঠনক্ষেত্রগুলো এক অর্থে মতবাদের যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত হবে। শেক্সপিয়ার শুধু নমস্য কোনও লেখক হয়ে রইলেন না, বরঞ্চ তাঁর থেকে আকর নিয়ে প্রতিরোধের ভাষাও রপ্ত করল উপনিবেশিত ভারতীয়রা। সাইদ এই জঙ্গমতাকে আখ্যা করেছেন নতুন এনার্জি হিসেবে। (পৃ. ২৩) এবং সময়টাকে এ যুগে অর্থাৎ উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে টেনে এনে বলছেন, এই নতুন ক্ষমতাপ্রাপ্ত কণ্ঠগুলো শোনার সময় এসেছে, এবং এগুলোকে উপেক্ষা করার অর্থ প্রাচ্য এবং প্রতীচ্যের মধ্যে কথোপকথনের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া।

ভারত ছেড়ে আমরা যদি আফ্রিকায় যাই, দেখি যে সেখানেও ঔপনিবেশিক পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে ভারতের মতোই―প্রশংসা এবং প্রতিরোধের সম্মিলন―কিন্তু ভারত থেকে খানিকটা তফাতে, কেননা, সেখানে, বিশেষ করে নাইজেরিয়াতে, সাহিত্যিকেরা তাঁদের স্বদেশি ভাষায় না লিখে সাম্রাজ্যবাদী ভাষা ইংরেজিতেই তাঁদের সৃজনশীল রচনাগুলো লিখলেন। এ ব্যাপারে চিনুয়া এচিবি যুক্তি দিলেন যে ইংরেজিতে লেখার কারণ বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য। তাঁর অত্যন্ত প্রভাবশালী উপন্যাস থিংস ফল এপার্ট-এ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগমনের ফলে স্থানীয় সংস্কৃতি বিনষ্ট হবার একটি অপূর্ব চিত্র অঙ্কন করলেন, এবং ভাষা ইংরেজিতে হলেও কোথাও এমন কোনও ছাপ রাখেননি যাতে মনে হতে পারে ভাষার কারণে তিনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপনয়ন করছেন। আরেকজন লেখক কেনিয়ার আনগুজি ওয়া থিওঙ্গো প্রথম কয়েকটি উপন্যাস ইংরেজিতে লিখলেও তারপর নিজ ভাষা কিকিউতে লিখতে শুরু করেন, এবং একটি বিখ্যাত উক্তি করেন যে ইংরেজি ভাষা হচ্ছে তাঁর কাছে বুলেটের মতো। তিনি বললেন, (আমি বাংলা করছি) ‘কেনিয়ার জীবনে একটি প্রধান বিষয় হলো যে-সব শক্তি ঔপনিবেশিক অথবা বিদেশি স্বার্থ সংরক্ষণ করছে, তাদের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে এমনতর শক্তির মধ্যে তীব্র লড়াই।’ (পৃ. ১৬৩)১৪

(ঘ) বিশ্বসাহিত্য―অধ্যয়নিক প্রতিষ্ঠানে চর্চার স্বরূপ।

সালমান রুশদি যখন তাঁর বিতর্কিত গ্রন্থ দ্য স্যাটানিক ভার্সেস-এর জন্য ইরান কর্তৃক নিষিদ্ধ হলো, এবং মুসলিম বিশ্বে তিনি প্রচণ্ড বিতর্কিত হয়ে উঠলেন, তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কোনও একটা বিশ্বসাহিত্যের কোর্সে তাঁর বিখ্যাত বই মিডনাইটস চিলড্রেন অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় আমরা বিভাগীয় অধ্যয়নিক পরিষদের সভায় সম্মিলিত সিদ্ধান্তে গ্রন্থটি পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দিয়েছিলাম। এই উদাহরণটি এ জন্য দিলাম যে ‘বিশ্বসাহিত্য’ যখন একাডেমিক কোর্স হিসেবে পড়ানো হয়, তখন কতগুলো বিবেচনা সামনে এসে যায়, যেগুলোর সঙ্গে বিশ^সাহিত্যের নিজস্ব বা নিহিত গুণাবলির কোনও সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, একজন বুদ্ধদেব বসু বা শিবনাথ শাস্ত্রী বা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজস্ব বাছাই থেকে বিশ্বসাহিত্য পড়তে পারেন, কিন্তু যখন বিশ^সাহিত্য অধ্যয়নিক বিষয় হিসেবে নির্ণিত হয়, তখন যে জরুরি বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া হয়, সেগুলো হচ্ছে নৈতিকতা, ধারাবাহিকতা, আর উপযোগিতা― রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে। নৈতিকতা বা আরও ভেঙে বললে রাজনৈতিক নৈতিকতা কী অর্থে সেটি ওপরে উল্লিখিত সালমান রুশদির প্রসঙ্গ থেকে বোঝা গেল। অর্থাৎ, অধ্যয়নিক পাঠ্যসূচিতে নৈতিকতার সঙ্গে মিশ্রিত থাকে রাজনীতির মাত্রাটি। কিংবা আরও বড় করে বলতে পারি, রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ সকল কিছু মিলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য বিভাগে বিশ^সাহিত্যের পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করা হয়।

দ্বিতীয় কথাটি হচ্ছে বিশ্বসাহিত্য বিষয় হিসেবে নির্দিষ্ট হবার বহু দশক আগে থেকেই ‘তুলনামূলক সাহিত্য’ বা ‘কম্পেয়ারেটিভ লিটেরেচার’ পড়ান হতো। আমাদের সামনের আলোচনায় ‘বিশ্বসাহিত্য’ ও ‘তুলনামূলক সাহিত্য’ একটি আরেকটির পরিপূরক নাকি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় তার ওপর আলোচনা থাকবে।

ধারাবাহিকতা বলতে আমি ক্যানন বা প্রতিষ্ঠিত পাঠ্যসূচিকে বোঝাচ্ছি। যে কোনও অধ্যয়নিক সূচিতে ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিষ্ঠিত লেখক বা লেখাকে কদর দেয়ার অলিখিত একটি নিয়ম আছে। সে মান্যতা কতটুকু অপরিহার্য, সেটা নিয়ে আলোকপাত থাকবে।

তৃতীয় দিকটি হচ্ছে উপযোগিতা। যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করি, তা হলে পাঠ্যসূচি একভাবে নির্ধারিত হবে, আর যদি আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিশ^সাহিত্য’ ও পাঠ্যসূচি নিয়ে কথা বলি, তা হলে আরেকভাবে কথা বলতে হবে।

আমেরিকার বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে বিশ্বসাহিত্য প্রবর্তন করার উদ্দেশ্যে বিচারক হার্বাট গুডরিচ ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত তাঁর এডুকেশন ফর ওয়ার্ল্ড আউটলুক প্রবন্ধে বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাহিত্য বিভাগগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে আমেরিকার শিক্ষার্থীদেরকে অনূদিত বিদেশি সাহিত্যের মাধ্যমে এই ধারণা দেওয়া যে জগতে আরও মনুষ্যজাতি আছে, যারা তাদের (শিক্ষার্থীদের) মতোই মানুষ। আলবার্সন নামক একজন ভাষাবিদ আরও শক্তভাবে বললেন যে (আমার অনুবাদ) ‘প্রাচ্যদেশ আমাদের জন্য ভালো সমস্যা তৈরি করেছে। এবং প্রাচ্যদেশের লোকজনকে একসময় আমাদের চিন্তা-চেতনার জগৎ থেকে আলাদা মনে হলেও, তাদের সাহিত্য পড়লে আমাদের চোখ থেকে এই ছানিটা সরে যাবে এবং আমাদের বুঝ বাড়বে।’ (স্মিথ, পৃ. ৫৮৮)১৫

আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা যাতে এক খণ্ড বইয়ের মধ্যে পুরো কোর্সটা পড়তে পারে সে জন্য প্রকাশকেরা সম্পাদিত মোটা মোটা সংকলন বের করলেন, যেমন দ্য বেডফোর্ড অ্যানথোলজি অব ওয়ার্ল্ড লিটেরেচার, দ্য লংম্যান অ্যানথোলজি অব ওয়ার্ল্ড লিটেরাচার বা অতি সাম্প্রতিক দ্য নর্টন অ্যানথোলজি অব ওয়ার্ল্ড লিটেরেচার। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত দুই ভল্যুমের দ্য নর্টন অ্যানথোলজি : ওয়ার্ল্ড মাস্টারপিসেস, যে সংকলনটি সম্পর্কে সমালোচক ওয়েইল হাসান বলছেন যে, ১৯৯০ সালে প্রকাশিত নর্টন অ্যানথোলোজি অব ওয়ার্ল্ড মাস্টারপিসেস হচ্ছে আগেরটারই পশ্চিমা-সাহিত্যভারী সংকলন। (স্মিথ ৫৯৫) তিনি আরও বললেন, বিশ্বসাহিত্য দ্বি-মুখী : এক দিকে আছে এটির প্রসারতা, আবার অন্যদিকে বিভিন্ন রকমের পোস্ট-কলোনিয়াল আর মাল্টি-কালচারিজমের সমালোচনার মুখে পড়া। মেরি লুইস প্র্যাট বললেন, বিশ্বসাহিত্য বলতে একটি মেল্টিং পট না বুঝে একটি অর্কেস্ট্রেশনের দিকে গেলে বরঞ্চ ভালো। আবার তাঁর বিপরীতে রজেনব্ল্যাট বললেন যে, অর্কেস্ট্রেশন না করে বিভিন্নমুখী সাহিত্যের (স্মিথ ৫৯৬) সন্নিবেশনই বিশ্বসাহিত্যকে পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি দেবে। তবে, উপরোক্ত ধরনের এক খণ্ডে সংকলিত গ্রন্থের পাঠ্যসূচি লক্ষ করে উত্তরাধুনিক যুগের অন্যতম তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর ডেথ অব আ ডিসিপ্লিন (২০০৩) প্রবন্ধে বললেন যে বিশ^সাহিত্যের নামে আসলে পশ্চিম ইউরোপের সাহিত্যই পড়ান হচ্ছে। এটাকে তিনি বললেন, অ্যাংলোফোন সাহিত্য। (স্মিথ, পৃ. ৫৯৩) কেউ কেউ বললেন, এ ধরনের সংকলনে ন্যাটো অন্তর্ভুক্ত ১৫টি সদস্য দেশের লেখকদের রচনাই প্রাধান্য পাচ্ছে। 

আর কম্পেয়্যারেটিভ লিটেরেচার বা তুলনামূলক সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের পার্থক্যটা সম্ভবত এ রূপে নির্ণিত হবে যে, তুলানামূলক সাহিত্যে অধ্যয়নিকভাবে জোরালো ও নির্দিষ্টভাবে এবং গবেষণার রীতিতে দ্বি-ভাষিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিতে হয় বা নেওয়া যায়, এবং সে জন্য তুলনামূলক- সাহিত্যসৃজিত বিচারবোধ হচ্ছে গভীরভাবে অধ্যয়নিক অনুসন্ধানী। অপরপক্ষে বিশ্বসাহিত্য ঠিক দ্বি-ভাষিক না হলেও চলে। যেমন আগের একটি অধ্যায়ে বলেছি যে অনুবাদের ক্ষেত্রে বিশ্বসাহিত্য প্রায় ইংরেজি-নির্ভর হয়ে পড়েছে। সেখানে মুরাকামি যে জাপানি ভাষার লেখক সেটি আর গুরুত্ব পাচ্ছে না, পাচ্ছে তার ইংরেজি ভাষায় অনূদিত সাহিত্য। আবার বিশ্বসাহিত্য অনেক বড় রেঞ্জের সাহিত্যকে আয়ত্তে আনতে পারে, যেহেতু এটা গভীরতার চেয়েও সারফেইস বা ওপরের রেঞ্জকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যেমন এক লাফে গিলগামেশ থেকে লাফ মেরে শেক্সপিয়ারে, তারপর শেক্সপিয়ার থেকে লাফ মেরে মুরাকামিতে চলে যাওয়া বিশ্বসাহিত্যের পাঠ্যসূচির বৈশিষ্ট্য। তারপরও একটা আলোচনা থেকে যায়, সেটি হলো বিশ্বসাহিত্য কি তুলনা ছাড়া পড়া যায় ? তুলনামূলক সাহিত্যবিচার কি শেষ পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্যের গণ্ডির অচ্ছেদ্য অংশ নয় ? 

আবার আমেরিকার গণ্ডির মধ্যেই আন্তর্জাতিকতার আবাস আছে। অভিবাসনকারীরা বিভিন্ন দেশ, জাতি, ভাষা ও বর্ণের হওয়াতে আমেরিকার অভ্যন্তরেই মেল্টিং পট বা বহুমাত্রিক সংস্কৃতির অস্তিত্ব থাকাতে সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বাভাবিক কারণে মাল্টি-কালচারিজম, সংখ্যালঘুদের সংস্কৃতি বা এথনোকালচারিজম বা বর্ণবাদী সংস্কৃতি কিংবা রেসিজম ও ব্ল্যাক বা কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতি সকল কিছু মিলে আমেরিকার প্রকাশকেরা বিশ্বসাহিত্যের নামে যে সকল একক খণ্ড বের করতে লাগলেন সেখানে যেমন মুলাটো লেখক (যার পিতামাতার মধ্যে একজন শে^তাঙ্গ, আরেকজন কৃষ্ণকায়) ফ্রেডারিক ডগলাসের আত্মজীবনী ন্যারাটিভ অব দ্য লাইফ অব ফ্রেডারিক ডগলাস : অ্যান এ্যামেরিকান স্লেইভ জায়গা পেল,  তেমনি পেল কৃষ্ণকায় আফ্রিকান―আমেরিকান লেখক রিচার্ড রাইটের প্রতিবাদী উপন্যাস নেইটিভ সান-এর বাছাইকৃত পরিচ্ছেদ। এ ধরনের সংকলনে তা হলে মাল্টিকালচারিজম বা বহুজাতিক সংস্কৃতির সম্মেলন ঘটল, কিন্তু এত বহুমুখীনতা সত্ত্বেও একটি এককতা মেনে নিতেই হলো, সেটি হলো ভাষার ক্ষেত্রে সেটি রয়ে গেল―মনোলিংগুয়াল বা এককভাষা-আশ্রয়ী, এবং এ ক্ষেত্রে ইংরেজি।

শেষ একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলে এই অধ্যায়ের আলোচনা শেষ করব। এই একক সংকলিত খণ্ডগুলোর এক একটির আকার দুই হাজার থেকে দুই হাজার পাঁচশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। তারপরও বিশ^সাহিত্যের বিপুল পরিমাণের এক কোণারও জায়গা হয়েছে বলা যায় না। তার অর্থ হচ্ছে, এই খণ্ডগুলোতে অতিরিক্ত বাছাইয়ের দিকে যেতে হয়েছে, ফলে গভীরতার চেয়েও বিস্তৃতির দিকে যেতে হয়েছে। উপায় নেই। এবং পাঠ্যসূচি পড়ানোর ক্ষেত্রে অধ্যাপকেরা সেমিস্টারের সময়ানুযায়ী খুবই-খুবই সংক্ষিপ্তকরণের দিকে গিয়ে থাকেন। উপায় নেই। লাফ দিয়ে দিয়ে তাঁদেরকে বিশ্বসাহিত্যের কোর্সগুলো পড়াতে হয়।

(ঙ) বিশ^সাহিত্য―অভিবাসী লেখকেদের রচনার অবস্থান নির্ধারণ

ডাইসপোরা বা অভিবাসী লেখকদের কথা বিবেচনায় আনলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভারতী চৌধুরী, অমিতাভ ঘোষ, ঝুম্পা লাহিড়ী বা জিয়া হায়দার রহমানের কথা যদি বলি, তা হলে এক  দিকে তাঁরা যেহেতু ইংরেজিতে লিখছেন, তাই তাঁরা এক দিক থেকে অ্যাংলোফোন সাহিত্যের বিকাশ ঘটাচ্ছেন, অন্য দিকে বিশ^সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে গভীর এক উদ্বেগেরও সঞ্চার করছেন। সেটি হলো, বিষয়গত দিক থেকে তাঁদের লেখায় অভিবাসী জীবনের প্রেক্ষাপটে ভারত বা বাংলাদেশ প্রতিফলিত হচ্ছে, এবং তাঁদের ভাষা ইংরেজিতে হওয়াতে তাঁদের দেখা ভারত বা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে প্রকৃত ভারত বা বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে। কিন্তু যে বাংলাদেশ বা ভারত একজন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা একজন হাসান আজিজুল হকের উপন্যাসে ফুটে উঠেছে সেটির সন্ধান তো আন্তর্জাতিক মহল জানছে না। যেমন অমিতাভ ঘোষের দ্য শ্যাডো লাইনস বা দ্য গ্লাস প্যালেস বা ঝুম্পা লাহিড়ীর দ্য নেইমসেইক কিংবা জিয়া হায়দার রহমানের ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো পড়ে বিদেশি পাঠক যে ভারত বা বাংলাদেশকে চিনবে, সেটি অনেকটা সাইদ কথিত প্রাক-ধারণাকৃত ‘প্রাচ্যবাদ’-এর সমতুল্য হবে। তবে এই সমস্যাটার প্রকৃতি আমরা আগেই আলাপ করে বলেছি যে বিশ^সাহিত্যের আঙিনায় স্থানিকতা বড় বিবেচ্য উপাদান নয়। আন্তর্জাতিকভাবে অমিতাভ ঘোষ যতটা পরিচিত থাকবেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ততটা কখনও হবেন না―যদিও দু’জনেই বাঙালি, একজন লেখেন ইংরেজিতে, আরেকজন বাংলায়, এবং এটা মেনে নিতে হবে। 

বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে আলোচনায় আনতে হবে আরেকটি ধারাকে যেখানে আছেন সেসব লেখকেরা যাঁরা নিজ নিজ দেশে আছেন কিন্তু সাহিত্য রচনা করছেন ইংরেজি ভাষায়, যেমন ভারতের অরুন্ধতী রায়, অরবিন্দ আদিগা, পাকিস্তানের মোহাম্মদ হানিফ, কিংবা বাংলাদেশের কায়সার হক ও তাহমিমা আনাম, সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম (তিনি দ্বিভাষিক), কাজী আনিস আহমেদ প্রমুখ।

(চ) বিশ্বসাহিত্য―কথাসাহিত্য, প্রকরণের ব্যাপক বিকাশ :

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিশ^সাহিত্য প্রসারণের ব্যাপারে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকরণ হচ্ছে গল্প-উপন্যাস বা কথাসাহিত্য। এই প্রসঙ্গে সাইদের একটি ধারণা আমরা আগেই আলাপ করেছি যে, উপন্যাস যে ন্যারাটিভ বা বর্ণনা দেয় তার একটি সর্বজনীনতা থাকে-বিধায় পাঠক মূল ভাষায় বা অনুবাদের মাধ্যমে সেটি গ্রহণ করতে পারে। অন্যান্য প্রকরণের ক্ষেত্রে, যেমন কবিতা বা নাটকে, বহু কিছু পাঠকের কল্পনাশক্তির ওপর ছেড়ে দিতে হয়। স্বাভাবিকভাবে একজন সাধারণ পাঠক নিজের কল্পনাশক্তিকে বা চিন্তাশক্তিকে অতটা খাটাতে উৎসুক থাকে না, ফলে কবিতা বা নাটক বোঝার ক্ষেত্রে ঐ অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে অনেক পাঠক বিমুখ থাকে। কিন্তু উপন্যাসের বর্ণনামূলক উৎসটাই জীবনের খুব কাছাকাছি থাকে বিধায়, এবং পাঠকের জন্য চিন্তা ও কল্পনা কথাসাহিত্যিক নিজেই করে দেন বিধায় অনেকটা তাঁর বর্ণনা পাঠকের জন্য পুনরুক্তিমূলক মনে হয়, এবং পাঠক সেটা পছন্দ করে। পাঠক নিজের জীবনের ছায়াটা যেন পঠিত উপন্যাসে দেখতে পায়। এই জন্য বিশ^সাহিত্যের আঙিনায় উপন্যাসের কদর বেশি।

আরেকটি কারণ হলো যে উপন্যাসে মানবসমাজ যেভাবেই অঙ্কিত হোক না কেন একটা সর্বজনীন মিল থাকে, এবং সেজন্য বিদেশি ভাষার পাঠক উপন্যাসের মধ্যে যতটা ঢুকতে পারে, অন্য প্রকরণের ক্ষেত্রে ততটা পারে না। আরেকটা কারণ হচ্ছে ঔপনিবেশিক সাহিত্য থেকে আধুনিক সাহিত্য কিংবা উত্তর-ঔপনিবেশিক কিংবা উত্তরাধুনিক সাহিত্যের মধ্যে সেতুটা প্রথমত উপন্যাসের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। যেমন ঊনবিংশ শতাব্দীর ভিক্টোরীয় যুগের ঔপন্যাসিক ডিকেন্স, হার্ডি, ই, এম, ফর্স্টার বা স্মলেটদের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ফরাসি এবং রুশভাষার উপন্যাসগুলোও বিশে^র দরবারে উপন্যাসের খুবই উচ্চ মানদণ্ড তৈরি করতে সমর্থ হয়। ফরাসি ঔপন্যাসিক ফ্লবেয়ার, রুশ ঔপন্যাসিক তলস্তয়, দস্তোয়ভস্কি, গোর্কি, আধুনিক জার্মানির হেসে, টমাস মান প্রমুখ, এবং আটলান্টিকের ওপার থেকে হর্থন, এলান পো, মার্ক টোয়েন প্রমুখের উপন্যাস, বলা যায়, বিশ^ব্যাপী বিশ^সাহিত্য বলতে উপন্যাসকেই জনপ্রিয় প্রকরণ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়।

এদিক থেকে বলতে হয় কথাসাহিত্যে আধুনিক বিশ^ জয় করেছে ল্যাটিন আমেরিকার উপন্যাস। কলম্বিয়ার গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ সম্ভবত এখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। তিনি ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড আমি ইংরেজিতে পড়েছি। ম্যাজিক রিয়ালিজমের অন্যতম প্রতিনিধি এই গ্রন্থটি পড়তে গিয়ে আমার বারবার অনুশোচনা হয়েছিল যে আমি কেন স্প্যানিশ ভাষা জানলাম না। মূল ভাষায় পড়লে আমার আনন্দ নিশ্চয় আরও ব্যাপক হতো। বাংলায় জি এইচ হাবিব এটার অনুবাদ করেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার আরও কয়েকজন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হচ্ছেন আর্জেন্টিনার জর্জ লুই বোরহেস, পেরুর মারিও ভার্গাস লোসা এবং চিলির ইসাবেল আলেন্দে। আবার মূল ভাষায় পড়তে না পারার একই রকম অনুশোচনা হয়েছিল মিসরের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত (১৯৮৮) ঔপন্যাসিক নগিব মাহফুজের প্রায় হাজার পৃষ্ঠার উপন্যাসত্রয়ী দ্য কায়রো ট্রিলোজি পড়ার সময়। যদিও অত্যন্ত দক্ষ অনুবাদ করা হয়েছে ইংরেজিতে, তারপরও আমার মনে হয়েছিল আরবি ভাষাটা যদি জানতাম তা হলে এই মহাকাব্যিক উপন্যাসের রস আরও বেশি আস্বাদন করতে পারতাম। আর যেহেতু ইসলামিক পুরুতান্ত্রিক পরিমণ্ডলের মধ্যে কাহিনির বয়ান সে জন্য আমাদের সমাজের সঙ্গে এত মিল যে ভেবেছি মূল ভাষায় পড়তে না পারার ক্ষোভটা যেন এখানে আরও উসকে উঠল। অন্যদিকে ইউরোপে চেক ভাষার লেখক মিলান কুন্দেরা খুবই আদৃত একজন ঔপন্যাসিক। তাঁর নামকরা উপন্যাস দ্য আনবেয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং স্বাদ গ্রহণে ভিন্নতর।    

তাই বিশ^সাহিত্য পাঠে ব্যক্তিগত পাঠ্যসূচি বা অধ্যয়নিক পাঠ্যসূচি যেটিই তেরি হোক না কেন দেখা যায় উপন্যাসেরই আধিক্য বেশি।

(ছ) বিশ্বসাহিত্য―অনুবাদের ভূমিকা

এই প্রবন্ধে প্রাসঙ্গিকভাবে অনুবাদের গুরুত্ব অনেক জায়গায় আলাপ করেছি। এই অধ্যায়ে আরেকটু খোলাসা করি। ডেভিড ড্যামরশ প্রকৃতই বলেছেন যে, অনুবাদ হলো ঊভয়ত সেতু এবং দেয়াল। আমরা ফ্রস্টের বিখ্যাত উক্তি ‘অনুবাদে যা হারিয়ে যাই তা-ই কবিতা’র যথার্থতার উল্লেখ করেও এ কথাটা স্বীকার করেছি যে বিশ^সাহিত্য বরাবরই একটি অনুবাদধর্মী প্রকরণ। অনুবাদে না থাকলে বিশ্বসাহিত্য বিশে^র দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না। তখন প্রশ্নটা উঠেছে, অনুবাদ কতটুকু মূলকে অনুবাদ করতে পারে বা পারে না। এই সব সংকটকে আমি নিম্নলিখিত উপায়ে আলোচনা করতে চাই।

রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে আবার শুরু করি। রবীন্দ্রনাথ নিজের ইংরেজি নিয়ে কখনও সন্তুষ্ট ছিলেন না। এডওয়ার্ড টম্পসনকে কোনও একটা চিঠিতে লিখেছিলেন যে, ইংরেজির আর্টিকেল এবং প্রিপজিশনের ব্যবহার নিয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তারপরও সং অফারিংস-এর অনূদিত কবিতাগুলো তাঁরই করা, এবং পড়তে বেশ ভালো লাগে, কারণ রবীন্দ্রনাথ নিজের ভাবকে ঠিকমতো অনূদিত ভাষায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন। তা হলে প্রশ্নটা আসবে, রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি জানলেও একেবারে উঁচু দরের ইংরেজি জানতেন না, এবং বুদ্ধদেব বসু এমন একটু আভাসও দিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথের দুর্বল ইংরেজির কারণে পশ্চিমে তাঁর জনপ্রিয়তাও দ্রুত লোপ পায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজের কবিতাকে যতটুকু উপলব্ধি করতে পারতেন সেটি একজন ইংরেজি জানা লোকের পক্ষে হয়তো সম্ভব হতো না। যদি বলি বুদ্ধদেব বসু (যিনি ইংরেজিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং এম এ-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন, এবং নিজেও ছিলেন সাধক কবি ও প্রাবন্ধিক) যদি রবীন্দ্রনাথের কবিতা অনুবাদ করতেন, তা হলে সেগুলো রবীন্দ্রনাথকৃত অনুবাদের মতো উতরোতো কি না! আচ্ছা, আবার যদি ধরি, ইয়েটস নিজেই রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো অনুবাদ করলেন, তা হলেও রবীন্দ্রনাথের অনুভূতি তিনি ঠিকমতো অনুবাদ করতে পারতেন কি না।

তা হলে আলোচনাটা নিশ্চিত একদিকে এসে যাচ্ছে যে অনুবাদের দায়িত্বটা কে নেবেন ?

রবীন্দ্রনাথের মতো ইংরেজি জানলে হয়তো কবি বা লেখক নিজেই অনুবাদের দায়িত্বটা কাঁধে নিতে পারেন। কিন্তু কবি বা লেখক যদি বিদেশি ভাষায় সড়গড় না হয় তা হলে কে অনুবাদ  করলে ভালো হবে ? বাংলা ভাষাভাষি লোক যিনি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাই ভালো জানেন, তিনি বাংলা ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করার দায়িত্ব নিলে কি ভালো হয়, নাকি একজন ইংরেজি ভাষাভাষী লোক যিনি ইংরেজি এবং বাংলা ভাষা উভয়ই ভালো জানেন, তিনি বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের দায়িত্ব নিলে ভালো হবে ? উদাহরণ দিয়ে বলি। অধ্যাপক ফকরুল আলম ও রাধা চক্রবর্তীর যৌথ সম্পাদনায় রবীন্দ্রনাথের রচনার বাছাই সমগ্র হার্ভার্ড ইউনিভাসির্টি প্রেস থেকে দ্য এসেনশিয়াল টেগোর নামক ৮১৯-পৃষ্ঠার একটি বৃহৎ সংকলন বের হয় ২০১১ সালে, যেখানে প্রায় রচনার অনুবাদকই বাংলা ভাষাভাষী। অন্য দিকে উইলিয়াম রাদিচে পেঙ্গুইন থেকে রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের অনুবাদ, সিলেকটেড শর্ট স্টোরিজ, প্রকাশ করেছেন পেঙ্গুইন ক্লাসিক্স থেকে ২০০৫ সালে। আমার প্রশ্নটার যুক্তি দুর্বল, কে বেশি অনুবাদক হিসেবে সফল হবেন, সেটি আসলে কোনও মাপকাঠি দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না। এটা আপেক্ষিক একটা প্রশ্ন, তবুও তোলা যুক্তিসংগত মনে করলাম। একটি প্রসঙ্গ মনে পড়ছে: ১৯৫৭ সালে সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায়ের স্ত্রী সাহিত্যিক লীলা রায় অনুবাদ করেন মাহ্বুব-উল আলম-এর উপন্যাস মোমেনের জবানবন্দি, সেখানে চট্টগ্রামের ভাষায় যেটাকে নারিকেলের মালা বা খোলা সেটি তাঁর অনুবাদে হয়ে গেল গলার মালা বা গারল্যান্ড। অনুবাদে এ ধরনের বিপর্যয় ঘটতেই পারে, দু’দিক থেকেই। এল ১ থেকে এল ২, বা মূল ভাষা থেকে অনূদিত ভাষায় অনুবাদ করলে মূল ভাষার অনুবাদকের যেমন ভুল হতে পারে, তেমনি এল ২ থেকে এল ১ ভাষায় অনুবাদের সময় বিদেশি ভাষার অনুবাদকেরও ভুল হতে পারে। তাই মূলত অনুবাদ বিষয়ক বিতর্কটা কেন্দ্রীভূত হয় ভালো অনুবাদ এবং দুর্বল অনুবাদের ওপর।

উপসংহারে বলতে হয় বিশ্বসাহিত্য বিষয়টি একটি নিশ্চিত গন্তব্য হিসেবে না ধরে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে ধরলেই ভালো। অর্থাৎ, এটার কোনও বিতর্কিত বিষয় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে ব্যাপারটা এমন নয়।

পরিশেষে বলি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে সম্প্রতি দশকগুলোতে প্রচুর আন্তর্জাতিক উৎসাহ লক্ষ করা গেছে। তাঁর কাব্য এবং উপন্যাসের অনুবাদও হয়েছে। সম্প্রতি মৃত সাংবাদিক পিটার কাস্টার্স, মার্কিন অধ্যাপক উইনস্টন ল্যাংলি ও র‌্যাচেল ফেল ম্যাকডারমট প্রমুখ নজরুল সম্পর্কে বইও লিখেছেন, গবেষণাও করছেন। বাংলাদেশে অধ্যাপক নিয়াজ জামান দীর্ঘদিন ধরে নজরুল গবেষণায় সম্পাদনাকর্ম ও অনুবাদকর্ম একনিষ্ঠভাবে করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তিনটি গ্রন্থ অধ্যাপক ফকরুল আলম ও আরও কতিপয় গবেষকের অনুবাদের ফলে তাঁর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তাঁকে একজন সুলেখক হিসেবেও আন্তর্জাতিক পরিসরে জানার সুযোগ তৈরি হলো।

তারপরও বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় স্বাস্থ্যকরভাবে প্রবেশ করাতে হলে অনুবাদকর্ম একটা যজ্ঞের মতো অবস্থায় আনতে হবে। 

 পাদটীকা

১.  মার্টিন কার, ‘এন্ডস এ্যান্ড বিগিনিংস অব ওয়ার্ল্ড লিটেরেচার,’ পোয়েটিকা, ২০১৭/২০১৮, ভল্যুম. ৪৯, নং ১/২, পৃ. ১-৩১।

২. আবদার রশীদ, সম্পাদনা: নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত গীতাঞ্জলি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩), পৃ. ২৬।

৩. বুদ্ধদেব বসু, প্রবন্ধ সংকলন (কলকাতা: ভারবি, ১৯৬৬), উদ্ধৃত প্রবন্ধ: ‘রবীন্দ্রনাথ: বিশ^কবি ও বাঙালি,’ পৃ. ১১।

৪. রশীদ, পৃ. উল্লেখবিহীন, তবে ১। রশীদ সমালোচকদের এই ’ইত্যাদি’ শব্দের ব্যবহার সমীচীন নয় বলে মন্তব্য করেছেন। অর্থাৎ, কবিতাগুলি যে সব কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে, সেগুলির সুনির্দিষ্ট উল্লেখ থাকা উচিত ছিল। 

৫. বুদ্ধদেব, পৃ. ৯।

৬. কোন্ প্রবন্ধে এলিয়ট এ মন্তব্যটি করেছিলেন সেটি মনে করতে পারছি না। আশা করি, ভবিষতে দিতে পারব।

৭. বি ভেঙ্কট মানি, ‘দ্য শ্যাডো অব এম্পটি শেলভস: টু ওয়ার্ল্ড ওয়ারস এ্যান্ড দ্য রাইজ এ্যান্ড ফল অব ওয়ার্ল্ড লিটেরেচার,’ রেকর্ডিং ওয়ার্ল্ড লিটেরেচার (লাইব্রেরিস, প্রিন্ট কালচার, অ্যান্ড জার্মানিস প্যাক্ট উইথ বুকস গ্রন্থটির অর্ন্তভুক্ত অধ্যায় (ফর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটি প্রেস)।

৮. আমার রচনা, ‘দ্য ইম্পেরিয়াল ডিজাইন অ্যান্ড শেক্সপিয়ার,’  দষ্টব্য। ক্রসিংস: আ জার্নাল অব ইংলিশ স্টাডিজ (ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ, ইউনিভার্সিটি অব লিবেরাল আর্টস, ঢাকা, সংখ্যা ২, ২০১১)।

৯. দ্য টেম্পেস্ট-এর কিছু কিছু সংস্করণে ক্যালিবানের সঙ্গে এই কথোপকথনটা মিরান্ডার সঙ্গে হয়েছে দেখানো হয়। 

১০. এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদ, কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম (লন্ডন: ভিনটিজ বুকস, ১৯৯৪)। 

১১. এই অনুচ্ছেদের আলোচনার জন্য আমি নিম্নোক্ত গ্রন্থটির সাহায্য নিয়েছি: হরিশ ত্রিবেদী, কলোনিয়াল ট্রানজেকশানস (ম্যানচে¯টার এ্যান্ড নিউ ইয়র্ক: ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৩)

১২. জোনসের ’ইন্দো-ইউরোপিয় তত্ত্ব’ সম্পর্কে জেনেছি নিম্নোক্ত প্রবন্ধ থেকে: সিরাজ আহমেদ, ‘নোটস ফ্রম ব্যাবেল: টুয়ার্ড আ কলোনিয়াল হিস্ট্রি অব কম্পেয়ারেটিভ লিটেরেচার,’ ক্রিটিক্যাল ইনকুয়্যারি, ভল্যুম ৩৯, নং – ২ (উইন্টার ২০১৩), পৃ. ২৯৬-৩২৬।  

১৩. জোনস সম্পর্কিত কিছু তথ্য উঠে আসছে ত্রিবেদীর বইটি থেকে। পৃষ্ঠা ৩, ২৫, ৮৩ ও ২০১ দ্রষ্টব্য।

১৪. চিদি আমুতা, ‘ফ্যানন, কাবরাল অ্যান্ড আনগুজি অন ন্যাশন্যাল লিবারেশন,’ দ্য পোস্ট-কলোনিয়াল স্টাডিজ রিডার, সম্পা: বিল ্এ্যাশক্রফট,  গ্যারেথ গ্রিফিথ এবং হেলেন টিফিন (লন্ডন অ্যান্ড নিউ ইয়র্ক: রাউটলেজ, ১৯৯৫)।

১৫. ক্যারেন আর. স্মিথ, ‘হোয়াট গুড ইজ ওয়ার্ল্ড লিটেরেচার ? ওয়ার্ল্ড লিটেরেচার পেডাগোজি অ্যান্ড দ্য রিটারিক অব মর‌্যাল ক্রাইসিস,’ কলেজ ইংলিশ, ভল্যুম ৭৩, নং ৬ (জুলাই ২০১১)।

লেখক : অনুবাদক ও কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares