গল্প : দম্পতি : হোসেনউদ্দীন হোসেন

এই প্রথম নিজের জন্য মেয়ে দেখতে যাচ্ছে সে। সঙ্গে তিনজন, দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আরিফ, মারুফ আর ওর খালাতো ভাই হারুন। হারুন ওর বয়সের দিক থেকে চার কিংবা পাঁচ বছরের বড়। গন্তব্যস্থল কায়েতপাড়া। মধুপুর স্টেশন থেকে দূরত্ব তিন কিলোমিটার। যাতায়াতের ব্যবস্থা একেবারে খারাপ নয়। ট্রেন থেকে নামলেই রিকশা সর্বক্ষণ পাওয়া যায়। কেউ কেউ হাঁটা পথে পায়ে হেঁটে যায়।

সকালে এগারোটায় ওরা হরিদাসপুর থেকে ট্রেনে উঠেছিল। মধুপুর আসতে সময় লেগেছে আধা ঘণ্টা। নেমেই একটা অটো ভাড়া করে কায়েতপাড়ায় ওরা যখন নামল, তখন সময় গড়িয়ে দুপুর বারোটা। মাথার ওপরে দাঁড়িয়ে দিনের সূর্য তাপ ছড়াচ্ছে। ওরা বটতলায় এসে একজন পথচারীর নিকট ঠিকানা জানতে চাইল, আলফাজ মিয়ার বাড়ি কোনটা ?

তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, আপনারা কোথা থেকে আসছেন ?

আরিফ বলল, তালসোনাপুর থেকে।

তিনি ঘাড় নিচু করে বললেন, আমি তো আপনাদের জন্যেই এই বটতলায় অপেক্ষা করছি। আলফাজ মিয়া আমাকে পাঠিয়েছেন। আসুন, আমার সঙ্গেই আসুন। উনি আমার চাচাতো ভাই।

আমরা এবার প্রথম আসছি এই গ্রামে। মারুফ বিড়বিড় করে বলল। আসুন, আসুন। আমার সঙ্গেই আসুন। একটু হেঁটে গেলেই আমাদের বাড়ি। পৌঁছাতে বড়জোর চার মিনিট লাগে।

কায়েতপাড়ার আসল নাম হলো কায়স্থপাড়া। কায়স্থপাড়া এখন কায়েতপাড়া নামে পরিচিত। এককালে ছিল হিন্দু বর্ধিষ্ণু গ্রাম। দেশ ভাগের পর প্রায় সত্তরভাগ হিন্দু ওপারে চলে গেছে। যারা এখনও আছে, তারা বাপ দাদার ভিটেই কোনও রকম বাতি জ্বালাচ্ছে। মনটা উড়ু উড়ু। ওপারেই গিয়ে একদিন পা রাখবে। এইভাবে চলে গেছে অনেকেই।

হিন্দুপাড়ার মধ্য দিয়েই যেতে হয় মুসলমান পাড়ায়। একটা ইটের রাস্তা। হেরিংবোন করা। সেই রাস্তা দিয়ে আলফাজ মিয়ার চাচাতো ভাই রব্বানি মিয়া আগে আগে যাচ্ছে। কিছুদূর গিয়েই একটা মসজিদ। রব্বানি মিয়া দাঁড়ালেন।

এই হচ্ছে, আমাদের মসজিদ, পুরোনো আমলের মসজিদ। আমার দাদা হাবিব মিয়া ব্রিটিশ আমলে তৈরি করে ছিলেন। সে কি আজকালকের কথা। তা’প্রায় দেড়শ’ বছর হবে। চলুন ওই আমাদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। রব্বানি মিয়া গর্বের সঙ্গে বললেন।

হারুন বলল, আপনাদের বংশ তো নামি দামি বংশ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

হ্যা, এই অঞ্চলে সকলেই আমাদের মান্যগণ্য করে।

একটা পাঁচিল দেওয়া বাড়ির সদর দরোজার সামনে এসে দাঁড়াল রব্বানি মিয়া। এই হচ্ছে আমাদের বাড়ি।

কয়েকজন মুরব্বি এসে অভ্যর্থনা জানাল। আসুন, আসুন। ভেতরে আসুন। কোনও কষ্ট হয়নি তো ?

হারুন বলল, না। কোনও কষ্ট হয়নি। সহিসালামতে এসেছি।

পুরোনো আমলের বাড়ি। চুন সুরকি ইট দিয়ে গাঁথা। ঘরের দেয়াল প্রায় তিরিশ ইঞ্চি। পুরোনো আমলের আসবাবপত্র। নয় দশটি গদিওয়ালা কুরসি। ওপরে বিদ্যুতের ফ্যান। দরোজা জানালায় পর্দা টাঙানো। একটা সেকেলে আভিজাত্য মোচড় মেরে যেন উঠে এসেছে। এখনও পুরনো আমলের বংশধারা অব্যাহত রয়েছে।

বাড়িটার নামের মধ্যেও রয়েছে আভিজাত্য। মিয়াবাড়ি। এক সময় গ্রামের কায়স্থদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই পরিবারটি চলত। এখন সেই কায়স্থরা নেই। কোথায় চলে গিয়েছে। কিন্তু মিয়াবাড়ির ঠাটবাট এখনও বজায় রয়েছে।

অতিথি আপ্যায়নের জন্য যা কিছু করণীয় আলফাজ মিয়ার পরিবার তা সাধ্যমত করেছে। প্রথমে শরবত, তারপর ক্ষীর পায়েস, মিষ্টি মিঠাই, নানারকমের ফল, টেবিলে সাজানো।

আলফাজ মিয়া নতুন একটা ঝুলওয়ালা ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি গায়ে দিয়েছেন। পরনে সাদা চকচকে পাজামা। দাঁড়ি গোঁফে লাগিয়েছেন আতর। দেখা যাচ্ছে দিব্যি একজন সৌম্যকান্তি প্রৌঢ়। জৌলুস মুখমণ্ডল। একজন হাস্য প্রফুল্ল মানুষ। এই প্রথম মেয়ে বিয়ে দিচ্ছেন। ছেলে আবুল বরকাতের চেহারাও সুশ্রী। টকটকে ফর্সা। নওজোয়ান। স্বাস্থ্য সৌন্দর্যে হাজার যুবকের মধ্যে একজন।

তিনি অতিথিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, একটু নাস্তার ব্যবস্থা করেছি বাবারা, চলো, ওই ঘরে সাজানো রয়েছে। সকলেই উঠে ওরা ডাইনিং রুমে চেয়ারে গিয়ে বসল। আরও কয়েকজন মুরব্বি এসেছেন। কিছুক্ষণ আগেই পা দিয়েছেন এই বাড়িতে। আলফাজ মিয়া বললেন, এত দেরি হলো ক্যানো ? এদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করে দিচ্ছি। ইনি হচ্ছেন আমার বড় শ্যালক, কেফায়েত মাহমুদ, উনি হচ্ছেন আমার বড় ভাইরা নসরত গনি, তারপর একজনের ঘাড়ে ডান হাত রেখে বললেন, ইরফান জাভেদ, এরা সব সকলেই এখন শহরের বাসিন্দা। বহুকাল এই বাড়িতে আসেননি। আমার সৌভাগ্য এবার দয়া করে পা রেখেছেন।

হো হো করে সবাই হেসে উঠল।

আলফাজ মিয়া এবার পরিচয় করে দিলেন নতুন অতিথিদের সঙ্গে।

এর নাম বরকত, আবুল বরকত। এর সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে। পাশের দুজন ওর বন্ধু, আরিফ আর মারুফ। তারপরেরটা হলো ছেলের খালাতো ভাই হারুন।

বাহ, বেশ মিরাকল ব্যাপারই বুঝা যাচ্ছে। কেফায়েত মাহমুদ সকলকে শুভেচ্ছা জানালেন। আপনাদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে খুব ভালো লাগছে। চেয়ারে বসে টুকটাক কিছু খেয়ে ওরা রুমালে মুখ মুছতে মুছতে আবার ড্রইং রুমে এলেন। শুরু হলো এলোমেলো গল্প। দেশের কথা উঠল, ব্যবসা বাণিজ্যের কথা উঠল, রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠল। এক একজন এক এক রকম মন্তব্য করল। আরিফ আর মারুফ ওদের সঙ্গে মিশে এক হয়ে গেল। কথায় কথায় কথা বাড়ছে। একটা সুন্দর পরিবেশ হয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে সময়টা পার হয়ে যাচ্ছে। কীভাবে পার হচ্ছে ওরা কেউ বুঝতে পারে না।

আড়াইটা বাজতেই ভোজের জন্য আলফাজ মিয়া ডাইনিং রুমে যেতে আহ্বান জানালেন।

গোল হয়ে বসে ওরা দুপুরের ভোজপর্ব সারলেন। রাজসিক ব্যাপার। বিশ রকমের পদ। জমিদারি আমলের খাওয়াদাওয়া। যার যার পছন্দমত খাওয়া। খেয়েদেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে ঘরের বাইরে এসে খোলা হাওয়ায় বরকতরা চারজন দাঁড়াল। তিনজন সিগারেট ধরায়ে আয়েশ করে টানতে লাগল।

আরিফ বলল, ধরা বিয়ে হবে নাকি ?

হারুন মন্তব্য করল, সেই রকমই তো আয়োজন দেখছি।

মারুফ বলল, আমার তো ধারণা হচ্ছে তাই।

বরকত ঝিম মেরে তাকিয়ে প্রাচীন আমলের বাড়ি দেখতে লাগল। মনে মনে কী যেন সে ভাবছে। যদি ধরা বিয়ের প্রসঙ্গ হয়, তবে সে কী করবে ? যদি তাই হয় ? … তা হলে …

এ ব্যাপারে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে লাগল বরকত।

হারুন বলল, পাত্রী যদি সুন্দরী হয় তবে একটা সিদ্ধান্তে আসা যাবে।

আরিফ বলল, এখনও তো পাত্রী আমরা দেখিনি। এই বরকত, কী ভাবছিস তুই বল ?

বরকত মৃদু হাসল, তোরা যা বলবি, সেটাই করব।

ঠিক আছে, রাজনন্দিনীকে আগে দেখে নিই…

ঘড়ির কাটা টিক্টিক্ করে ঘুরছে। চারটে বাজব বাজব প্রায়। কেফায়েত মাহমুদ বাড়ির অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে এলেন।

আসুন। ভেতরে আসুন। এবার মেয়ে দেখার পালা।

আরিফ বলল, হ্যাঁ, এবার মেয়ে দেখার পালা।

সবাই একএক করে ড্রইং রুমে এসে বসল। কিছুক্ষণ পরেই মেয়ের খালা হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলেন। আর একজন মেয়ে থালায় করে মিষ্টি এনে রেখে গেল। এবার সুন্দরী দর্শনের পালা।

দরোজার পর্দা সরে গেল। একজন অপরূপ সুন্দরী আস্তেআস্তে হেঁটে এসে মাথা নিচু করে সালাম জানিয়ে টেবিলের সামনে রাখা কুরসিতে বসল।

সারা ঘরময় মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ। বাতাসে পাক খাচ্ছে।

বোবার মতো আবুল বরকত তাকাল মেয়েটার মুখের দিকে। হালকাপাতলা মেদহীন দেহ কাঠামো। পরনে সবুজ রঙের শাড়ি। অপূর্ব মুখশ্রী। পটোলচেরা চোখ। পাতলা ঠোঁট। চিকন নাক। বেশ সুন্দরী বলতে হবে।

সকলেই মেয়েটির দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কী আছে ?

আরিফ জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন আপনি ?

খুউব ভালো আছি। ঠোঁট নেড়ে জবার দিল মেয়েটি।

মারুফ বলল, একটু হাসেন তো দেখি।

হেসে উঠল মেয়েটা। রূপার মতো ঝকঝকে দাঁত। কোথায়ও কোনও এলোমেলো নেই। হাসিটা উজ্জ্বল হয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ল।

হারুন বলল, আপনার হাতের পাতা দুটো দেখি ?

মেয়েটা দুই হাতের দশ আঙ্গুল টেবিলের ওপরে রাখল। যেন চাঁপা ফুলের কলি। মেয়ের খালা বললেন,  আর কিছু কি জানার আছে আপনাদের ?

আরিফ বলল, না, আমরা আর কিছু জানতে চাইনে।

বরকতের দিকে তাকিয়ে খালা বললেন, আপনি কি কিছু জানতে চাইছেন ?

হ্যাঁ। আমার কিছু বলার আছে।

বলুন ?

আমি তাঁর হাতও দেখতে চাইনে―দাঁতও দেখতে চাইনে। চুলও দেখতে চাইনে। ওসবের প্রতি আমার একটুও আগ্রহ নেই।

খালা বললেন, বলুন, কী বলতে চান ?

আমি উনার কাছে জানতে চাই মানব প্রকৃতি সম্পর্কে। আমার সঙ্গে উনি কীভাবে আচরণ করবেন, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সবচেয়ে প্রয়োজন দিক হলো অ্যাডজাস্ট। উনি যে পারিবারিক পরিবেশে শিক্ষা অর্জন করেছেন, নিজের মানসিকতা গড়ে তুলেছেন, কিংবা লেখাপড়া করেছেন, আমার মধ্যে তার অভাব রয়েছে। আমার জন্ম কৃষি পরিবারে। এখনও সেই পরিবারে আছি। ভবিষ্যতে থাকব। উনি আমার পরিবারে বধূ হয়ে যদি যান তবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন কি না ? তারপরেও আর একটি বিষয় আছে, আমার চাকরি করার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আমি কৃষিবিজ্ঞানে মাস্টার্সে প্রথম স্থান অধিকার করি। কোথায়ও চাকরি করার ইচ্ছে নেই। আপনি এ ব্যাপারে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন কি না। এখন আমার জানা দরকার আপনার নিজস্ব কোনও স্বপ্ন ও পরিকল্পনা আছে কী ?

হ্যাঁ, আপনার পরিবারে থাকার ব্যাপারে আমার কোনও আপত্তি নেই। তবে আমার একটা স্বাধীন ইচ্ছে আছে, আমি শিক্ষক হতে চাই। এই স্বাধীনতা আমাকে দিতে হবে।

এই চাকরিও এখন দূর্লভ হয়ে উঠেছে। শিক্ষক হতে গেলে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। কেন শিক্ষক হতে চান আপনি ?

আমাদের দেশে নারীরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত। অশিক্ষা কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের মধ্যে তাদের জীবন কাটে। পরিবারের পুরুষেরা ভোগের জন্য তাদের ব্যবহার করে। সমাজেও তারা নিগৃহীত। ওদের চোখে আমি জ্ঞানের আলো দিতে চাই। এটাই হলো আমার উদ্দেশ্য।

জানেন, আজকাল ঘুষ ছাড়া চাকরি হয় না। ঘুষ দিয়ে চাকরিও পাওয়ার একটা নিয়ম হয়ে দেখা দিয়েছে। এই নীতি মানে দুর্নীতি।

ঘুষ দেবার পক্ষপাতি আমি নই। আমার যোগ্যতা দিয়েই আমি চাকরি নেব। তা’না হলে চাকরি করব না। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছি। যোগ্যতার ভিত্তি হলো জ্ঞান। চরিত্রহীনতা নয়। আমি বিসিএস পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছি। ঘুষের বিনিময়ে চাকরি করার পক্ষে আমি নয়। শিক্ষকতার প্রতি আমার বিশেষ ঝোঁক রয়েছে। কারণটাও আমি বলেছি। কেন শিক্ষক হতে চাই।

আবুল বরকত বলল, আপনার উদ্দেশ্য মহৎ। এই মহৎ উদ্দেশ্যের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। নিকটবর্তী কোনও বিদ্যালয়ে চাকরি করতে পারলে কোনও সমস্যা থাকে না। সমস্যা দেখা দেবে দূরের কোথাও গেলে। এতে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হয়। দূরত্ব বাড়ে। নৈকট্য ছিন্ন হয়ে যায়। সংসারেও দেখা দেয় সংকট। দেখা দেয় ভাঙন। স্বামী স্ত্রীর অবস্থান ঠুনকো হয়ে পড়ে।

হ্যাঁ, আপনার যুক্তি ফেলে দিচ্ছি না। আপনার তো একটা কিছু করতে হবে। অর্থনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করার ক্ষেত্র শক্তিশালী না হলে কোনও পরিকল্পনা টেকসই হয় না।  দারিদ্র্য একটা ফ্যাক্টর। মোকাবিলা করবেন কি করে ?

হ্যাঁ, এটা নিয়ে আমার বিষয়টা আগে বলেছি। কৃষিকর্মে যুক্ত হতে চাই। আমার বাবার বেশ কিছু ভূ-সম্পতি আছে। আধুনিক পদ্ধতিতে ফসল আবাদ করতে যা কিছু দরকার―যেমন ট্রাক্টর, ফসল বোনা, ফসল কাটা, ঝাড়াই বাছাই মাড়াই, গুদামজাত, বাজারজাত ইত্যাদি নিয়ে আমার পরিকল্পনা। দারিদ্র্য মানুষের তৈরি। আমি ভেঙে  ফেলতে চাই। এটা নিয়েই আমার অভিযান। তা না হলে কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষাটা অনর্থক হয়ে উঠবে। নিজের হাতেই নিজের কাজ করার শক্তি আমার রয়েছে। ভয় পাবার কোনও কারণ নেই। এই ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন। আপনি সঙ্গে থাকলে ভালো হয়। কর্মক্ষেত্রটা নারীপুরুষের জন্য এক হয়ে উঠবে। জেন্ডার সমস্যা দূর হয়ে যাবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি থাকে না। আমিও আপনাকে চিনব। আপনিও আমাকে চিনবেন।

ঠিক আছে। বাস্তবায়নই হলো মূল ব্যাপার।

অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে। কথা নয়―কাজ। আমি কাজ করতে চাই।

খালা বললেন, এটাই হচ্ছে সত্যিকার পুরুষের কথা।

আবুল বরকত অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সকলকে বললেন, আপনারা কিছু মনে করবেন না। আমি যা উনাকে বলেছি এটা নিয়ে কেউ যেন কাউকে ভুল না বোঝে। এতে পরস্পরের মধ্যে মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমরা যেন দুজনেই দুজনকে চিনতে পারি, তার জন্য একটা ভাব বিনিময়। এটা কোনও তর্ক নয়। উপদেশ নয় এবং আদেশ-নির্দেশ নয়। সিরিফ ভাব বিনিময়।

খালা বললেন, আমি তোমাদের দুজনের কথা শুনেছি। এভাবে বিয়ের আগে পাত্র ও পাত্রীর মধ্যে ভাববিনিময় হওয়া উচিত। কোনও সংকট থাকে না। আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা বিয়ে করতেন পোনের বিনিময়ে। মেয়েরা ছিল পণ্য। অর্থাৎ বাজারের মাল। দরদস্তর করে নগদ টাকা দিয়ে বিয়ে পড়ায়ে নিজেদের ঘরে নিয়ে যেতেন ছাগল গরুর মতো। মেয়েদের সম্মান দেয়া হতো না। ঘরের বাইরে বেরোনো ছিল হারাম। মাথার ঘোমটা এক হাতের বেশি লম্বা থাকত। কেউ যাতে শ্রীমতির চেহারা না দ্যাখে। এখনও সমাজের মধ্যে রয়েছে কিছুটা। যতই শিক্ষিত হোক না কেন, বিয়ের আগে পাত্র পাত্রী উভয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ ভেবে দেখেন না। যার কারণে দাম্পত্য জীবনটা গরুর জোয়ালটানার মতো হয়ে উঠেছে। কেউ কাউকে বুঝতে চায় না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজটাই হলো এ রকম। নারীরা অসহায়। পুরুষের সেবিকা।

কেফায়েত মাহমুদ বললেন, সব কিছু তো হলো, এখন জানতে চাই, মেয়ে দেখে আপনাদের পছন্দ হলো কি না-

আরিফ বলল, অবশ্যই।

তা হলে বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করা যাক। কেফায়েত মাহমুদ মন্তব্য করলেন। হারুন বলল, আমাদের কোনও আপত্তি নেই।

মারুফ বলল, এ ব্যাপারে পাত্রীর মন্তব্য জানতে চাই। তার পছন্দ হয়েছে কী না ?

পাত্রী বলল, বাপমার পছন্দ―আমার পছন্দ।

আলফাজ মিয়া বললেন, আমাদের মতে ছেলেটা উত্তম। কোনও আপত্তি নেই।

কেফায়েত মাহমুদ হাসলেন। মন খুলে হাসলেন।

আবার একটা নতুন আবহাওয়া সৃষ্টি হলো। অন্দরমহল থেকে আর একজন তরুণী এসে থালা ভরে মিষ্টি আনল। শুভ কাজে মিষ্টি বিতরণ করলেন কেফায়েত মাহমুদ।

তা হলে বিয়ের ব্যাপারটা পাকাপাকি হয়ে যাক। কবে, কখন, দিনক্ষণ, নিয়ে আলোচনা করা যাক।

হারুন বলল, আমাদের মুরব্বিরা শুনলে খুব খুশি হবেন।

তবে কি মুরব্বিদের ডাকবেন ?

আরিফ বলল, বরকতের বাপ হারুন ভাইকে মুরব্বি হিসেবে পাঠিয়েছেন। উনি যেটা বলবেন, সেটাই চূড়ান্ত।

মেয়ের খালু নসরত গনি কানাডায় থাকেন। তিনি বললেন, আমরা তো এখানে থাকিনে―কানাডায় আছি। বিশ বছর সেখানে আছি। তিন দিন পরে চলে যাব কানাডায়, যদি আজ কিংবা কালকের মধ্যে বিয়েটা হয়, তবে বিয়েটা দেখে যেতে পারব। তা না হলে―

কেফায়েত মাহমুদ বললেন, দুলাভাই যা বললেন, আমারও কথা তাই। আমি ব্যবসায়িক মানুষ। দুদিন কেন, একদিনও থাকতে পারব না। আপনাদের যদি কোনও সমস্যা না থাকে, তা’হলে আজকের রাতের মধ্যেই আমরা ব্যবস্থা করে ফেলি। কি বলেন আপনারা ?

হারুন বলল, আমরা তো সেভাবে তৈরি হয়ে আসিনি। গয়না, কাপড় চোপড় অর্থাৎ বিয়ের ব্যাপারে যা যা দরকার, কোনওটাই আমরা আনিনি। শুধু এসেছি মেয়ে দেখব বলে। এখন―

ইরফান জাভেদও থাকেন খুলনা শহরে। তিনি বললেন, আমারও থাকার সময় নেই। বিয়ে যদি হয়ে যায় যাক। আমি বলছি, আজকের মধ্যে শুভ কাজটা নিষ্পন্ন হোক। দিনটা ভালো। বরপক্ষের কোনও কিছু আজ দিতে হবে না। ওটা আমরাই দিয়ে দেব। গয়না, কাপড়চোপড় যা কিছু লাগে তা আমরা এখনই আনিয়ে নিচ্ছি। আপনারা আমাদের মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দেবেন।

হারুন বললো, তবুও―

এর মধ্যে কোনও তবু নেই। নসরত গনি জোরের সঙ্গে বললেন, আমরা তো কিছু নিয়ে এসেছি। কোনও হ্যাম্পার হবে না।

কেফায়েত মাহমুদ আলফাজ মিয়াকে ডেকে নিয়ে আন্দরমহলে চলে গেলেন। নসরত গনি আবারও বললেন, শুভ কাজ যত তাড়াতাড়ি হয়― ততই মঙ্গল। ওপরওয়ালার ওপরে ভরসা আছে-ইন্শাআল্লাহ, কোনও সমস্যা হবে না।

অন্দরমহলে আনন্দের লহর বয়ে যেতে লাগল। এক এক করে নসরত গনি ও ইরফান জাভেদ হাসতে হাসতে উঠে গেলেন অন্দরমহলের দিকে।

আপনারা বসেন। আমরা একটু পরেই আসছি। ইরফান জাভেদ যেতে যেতে বললেন। 

ড্রইং ঘরে হতবাক হয়ে বসে রইল ওরা চারজন।

আরিফ বলল, যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই।

মারুফও একই কথা বলল।

হারুন বলল, বরকতের বাপ তো বলেছিল, যদি কেউ সেধে মেয়ে দেয়, বিনা বাক্যে সেই মেয়ে নেয়া ভালো। মারুফ বলল, এ রকম মেয়ে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সচরাচর দেখা যায় না। আরিফ বলল, লাখে একটা। যেমন অভিজাত ঘর―তেমন অভিজাত সুন্দরী মেয়ে। এদের ব্যবহার খুব ভালো। বরকতের সঙ্গে সবদিক থেকে আশ্চর্য রকমের মিল আছে। প্রবাদ আছে, ভালো কাপড়ের ন্যাকড়াও ভালো। ইরফান জাভেদ হাসতে হাসতে অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে এলেন। খুব খুশিখুশি ভাব। ড্রইং রুমে একটা কুরসির ওপরে বসে ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং রেখে দোলাতে লাগলেন।

বললেন, বিয়ের আয়োজন চলছে। পাড়া পড়শিদের নেমন্তন্ন করতে মেয়ের চাচা রওনা হয়েছে। মসজিদের ইমাম সাহেব বিয়ে পড়াবেন। রাত বারোটার মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যাবে বিয়ের কাজ। সন্ধ্যার পর হবে গায়ে হলুদ। আমাদের আরও কয়েকজন জ্ঞাতিগোষ্ঠীর লোক এসে পড়বে রাত আটটার মধ্যে। সেলফোনে যোগাযোগ চলছে। বাড়ির ভেতরে চলছে ছোটখাটো একটা আয়োজন। সবারই মুখে মুখে একই কথা―বরকতের মতো ছেলে পাওয়া দুষ্কর। সবক্ষেত্রে ব্রিলিয়ান্ট। মেয়েও যেমন রুপসী―ছেলেও তেমন খুব সুন্দর। উপরিওয়ালার ইচ্ছা―

বুঝলেন জাভেদ সাহেব, শারমিনের মতো মেয়ে হয় না। হারুন মন্তব্য করল।

যাক, আমাদের উভয় পক্ষের ইচ্ছা খুদা পূরণ করে দিয়েছেন, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ, জাভেদ বললেন।

ওই দিন রাত বারোটার আগেই শুভ কাজ সম্পন্ন হয়ে গেল। মসজিদের ইমাম সাহেব বিয়ে পড়ালেন। দোয়া দরুদ পাঠ করলেন। একটা আনন্দঘন মুহূর্তে পরিণত হলো বিয়ের অনুষ্ঠান।

খালা এসে নববধূ ও বরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ঘরে নিয়ে গেলেন। পরিবেশটা আরও মধুময় হয়ে উঠল।

মুরব্বিরা এসে দুজনের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ জানালেন। তোমাদের মঙ্গল হোক, তোমাদের মঙ্গল হোক। যুগলে সুখে থাকো তোমরা।

পরের দিন দুপুর বেলা একটা মাইক্রো গাড়িতে করে তালসোনাপুর বউকে নিয়ে এল আবুল বরকত।

সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল খবরটা। বরকত বিয়ে করে এনেছে। গ্রামের মানুষেরা ছুটে এসে বউ দেখতে লাগল।

ওমা, এত দেখছি পরি, কোথা থেকে একটা পরি বিয়ে করে এনেছে। গ্রামের মেয়েরা ভিড় করে পরির রূপ বর্ণনা করতে লাগল।

পুরুষেরাও বউটাকে দেখে একই রকম মন্তব্য করতে লাগল, হ্যাঁ, একেবারে হুরি বলে মনে হচ্ছে। এ রকম মেয়ে এর আগে তাদের চোখে পড়েনি।

বরকতের বাবা মা সারা গ্রাম ধরে লোকজনকে গরু আর খাসি জবাই করে খাওয়াল। সাতদিন ধরে চলেছিল বিয়ের উৎসব। বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজনেরা যেখানে আছে, তাদেরকে ডেকে এনে খাওয়ায়ে ছিল বরকতের আব্বা আব্দুল ওহাব। একমাত্র ছেলে আবুল বরকত। তার বিয়ের ব্যাপারে তার বাবার কোনও কার্পণ্য ছিল না। কেউ যাতে না বলতে পারে, আব্দুল ওহাব কৃপণতা দেখায়েছে। জমিজমা অর্থবিত্ত কি তার কম আছে ?

গ্রামের মানীগুণী লোকের অভাব নেই। আব্দুল ওহাবকে তারা শ্রদ্ধাভক্তি করে। ভালো লেখাপড়া জানে আব্দুল ওহাব। সেই আমলেই সে বি. এ. পাস করেছিল। চাকরিবাকরি করেননি। ক্ষেত খামারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। নিজের ছেলেটাকেও নিজের মতো শিক্ষিত করে তুলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সে আমেরিকায় গিয়েছিল। সেখান থেকে আধুনিক বিজ্ঞান ভিত্তিক চাষাবাদের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসেছে ছ’মাস আগে। গ্রামের ছেলে শহরে গিয়ে আস্তানা করেনি। আস্তানা করেছে সে নিজের গ্রামে। তাকে নিয়ে গর্ব করে গ্রামের লোক। এই ছেলের বিয়েতে দুই হাত ভরে তিনি খরচ করবেন না তো অন্যকার জন্যে খরচ করবেন ?

যাকে দেখছেন, তাকেই তিনি জিগ্যেস করছেন, কেমন দেখলেন আমার বউমাকে ?

কী বলেন ওহাব ভাই, একেবারে পরির মতো মেয়ে।

কোন্ গ্রামের মেয়ে, ওহাব ভাই ?

কায়েতপাড়ার মিয়া বাড়ির মেয়ে।

মিয়া বাড়ির মেয়ে ?

হ্যাঁ, মিয়া বাড়ির মেজো কর্তা আলফাজ মিয়ার মেয়ে। আমার বেহায়ের কোনও পুত্র সন্তান নেই―একটা মাত্রই মেয়ে। খুব ভালো মানুষ আমার বেহাই।

খুব ভালো মেয়ে জোগাড় করে এনেছেন ওহাব ভাই। যেমন আপনার ছেলে, তেমনি আপনার বউ মা।

হ্যাঁ, খুব সুশিক্ষিতা মেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স এবং এম, এ। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। আল্লাহ মিলিয়ে দিয়েছেন। আমি চাই তোমাদের দোয়া। সকলের দোয়া। আমার ছেলে বউ যেন থাকে সুখে। প্রায় একমাস ধরে চলল পাড়ায় পাড়ায় পথে ঘাটে মাঠে বরকত আর তার বউ শারমিনকে নিয়ে গল্প। শারমিন ভদ্র এবং সুনাম অর্জন করেছে। গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ির বউ ঝিদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। মেয়েদের নিয়ে সে একটা কিছু করতে চায়। তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে চায় সে। এটা নিয়েও নানা রকম কাজ করার ইচ্ছা তার রয়েছে।

বরকত বলল, কেমন লাগছে শারমিন ?

খুব ভালো লাগছে বরকত।

আমি মাঠ নিয়ে থাকতে চাই―আর তুমি থাকো গ্রামের মেয়েদের নিয়ে।

আমিও তোমার মাঠের সঙ্গী হয়ে যাব কয়েক দিন পর।

হোহো করে দুজনেই হাসল।

এই ভাবেই তো গ্রামের মানুষদের সঙ্গে চিরকাল থাকতে চাই।

আমিও তোমার মতো ইচ্ছা পূরণ করতে চাই।

ঠিক তো ?

হ্যাঁ, ঠিক।

তুমি খুশি হয়েছ তো ?

হ্যাঁ, আমি খুশি।

কোনও ছন্দ পতন হচ্ছে না তো ?

কী ভাব যে তুমি, আমি বুঝতে পারিনে। আমি আর তুমি কি আলাদা ?

দেখো, তুমি সঙ্গে আছ বলে, আমাদের কাজটা তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে।

এই ভাবে আমি চিরকাল তোমার সঙ্গেই থাকব। বরকত, আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারিনে। আমি তোমার জীবন তুমি আমার জীবন। বরকত শারমিনের চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে রইল।

২.

প্রায় তিন মাস পার হয়ে গেল। হঠাৎ করে একটা উড়ো চিঠি এল বরকতের হাতে। চিঠিটা ডাকঘরের মাধ্যমে এসেছে। প্রেরকের নাম নেই। ঠিকানা নেই। চিঠি খুলে পড়ল বরকত। চিঠিতে খিস্তি খেউড় বাক্য ছাড়া আর কিছু নেই। পাঁচ লাইনের বাক্য―‘এই শালা, বিয়ে করেছিস, চাঁদা দিবিনে ? চাঁদা না দিলে খবর আছে। পনেরো দিন সময় দিলাম। ইতি―

‘তোর যম।’

চিঠি পড়ে অবাক হলো না বরকত। মনে হলো কোনও পরিচিত বন্ধু ইয়ার্কি ফাজলামি করে ওকে চিঠি দিয়েছে। এই হাতের লেখাটা কার হতে পারে, এটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল বরকত। কোনও গুরুত্ব দিল না সে। চিঠিটা ছিঁড়ে না ফেলে বিছানার গদির নিচেই চালান করে দিল বরকত। এমন কি শারমিনকেও এ সম্পর্কে কিছুই বলল না সে।

শারমিনের স্বভাব হচ্ছে যে কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে সে কখনও কৌতূহল প্রকাশ করে না। তার চরিত্রের মধ্যে এই নীতিবোধ প্রচণ্ড। বরকত এই কারণে তাকে খুব মূল্যায়ন এবং সমীহ করে।

পনেরো দিন পর আর একটা উড়ো চিঠি হাতে এল বরকতের। নাম আছে। ঠিকানা আছে। নাম আবু সায়েদ মুহাম্মদ বালু। লোকটার সঙ্গে তার কোনও দিন পরিচয় হয়নি এবং দেখাও হয়নি। সে চিঠিতে লিখেছে যে আপনি মিয়াবাড়ির মেজো কর্তা আলফাজ মিয়ার কন্যাকে বিয়ে করেছেন। কন্যাটির সঙ্গে আমার দৈহিক সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময় আমরা বিভিন্ন হোটেলে গিয়ে কামক্রীড়া করেছি। আপনি অচিরেই ওকে তালাক দিবেন। তা না হলে খবর আছে। বংশ নিপাত করে দিব। দুনিয়ায় যদি বেঁচে থাকতে চান, তবে আমার হুকুম মান্য করবেন। ইতি― আবু সায়েদ মুহাম্মদ বালু।

চিঠিটি পড়ে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইল বরকত। মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। বালুর সঙ্গে তার বউয়ের দৈহিক সম্পর্ক ছিল, এটা তার বিশ্বাসই হয়নি। এবং সে বিশ্বাসই করে না। শারমিন অভূতপূর্ব সুন্দরী কিন্তু চরিত্রহীন নয়। তার বিরুদ্ধে বানোয়াট একটা কলঙ্ক আরোপ করা হয়েছে, মিথ্যা বদনাম দিয়ে এই মেয়েটাকে ক্ষতি করা হচ্ছে। সবই একটা চক্রান্ত। কোনও রকম বিশ্বাস করল না বরকত। চিঠিটা আগের চিঠির মতো গদির তলায় চালান করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এসব চিঠির প্রসঙ্গ নিয়ে সে একবারও শারমিনের সঙ্গে আলাপ করল না। খুশি খুশি ভাব নিয়ে বরকত আর শারমিন একত্রে কাজ করতে লাগল। বরকতের মনে কোনও ফাটল নেই। এ সম্পর্কে কোনও প্রতিক্রিয়াও নেই। বউকে সে আরও গভীরভাবে ভালোবাসতে লাগল।

বরকত বলল, শারমিন, তুমি ছাড়া আমি শূন্য।

শারমিন হাসল, তবে আমিও শূন্য। দেখো, একা একা কেউ চলতে পারে না। শূন্য শূন্যই। ‘এক’ মানে একজন সৃষ্টিকর্তা। দুই মানে জোড়া। অর্থাৎ অস্তিত্ব। তুমি বিহনে আমিও যেমন নেই―তুমিও তেমন নেই।

তুমি দেখছি দর্শনও পাঠ করেছ ?

আমি যা বলছি, এটাই হলো জীবনদর্শন। একই নৌকা নয়―দুটো নৌকা। পাশাপাশি জলে ভেসে যাচ্ছি। একটা যদি ডুবে যায়, তবে আর একটি নৌকা উদ্ধার করতে … হবে। আমার জন্যে তুমি, এবং তোমার জন্য আমি। ব্যাস। হলো তো ?

তাই ?

হ্যাঁ, তাই।

হাসাহাসি করল ওরা। কখনও মুখ গোমড়া করে থাকে না। কোনও মান অভিমান নেই। কোনও রাগারাগি বা ভুল বুঝাবুঝি নেই। দুজনেই দুজনের প্রতি বিশ্বস্ত। মাঝেমাঝে বরকতের বাবা মা ওদের সঙ্গে যোগ দেন। পরিবারটির সদস্য সংখ্যা বেজোড় নয়। বাবা মা এবং বরকত ও শারমিন। সবার মধ্যে একটা নিবিড় সখ্য গড়ে উঠেছে। সারাদিন কাটে এক রকমে। সন্ধ্যেবেলা দেখা যায় আর এক রকম। ওদের বাড়ির উঠোনে মেয়ে এবং ছেলে ছোকড়াদের ভিড় জমে যায়। আঠাশ ইঞ্চি মাপের একটা টিভি আছে। উঠোনের এক কোণে শারমিন টিভিটা এনে চালু করে দেয়। ছেলে মেয়েরা তাই দেখে মুগ্ধ নয়নে।

এই ব্যবস্থা আগে ছিল না। শারমিন এসে চালু করেছে। সন্ধ্যেবেলাটা প্রতিদিন এদের নিয়েই মেতে থাকে শারমিন। বরকত এবং তার বাবা মা শারমিনের আচরণে খুশি। শারমিন এই পরিবারের শুধু নয়―পাড়াপড়শিদের কাছেও বিশেষ একটা ভাবমূর্তি তৈরি করে নিয়েছে।

বরকত বলল, যেখানেই যাচ্ছি, সেখানেই শুনছি তোমাকে নিয়ে গল্প।

ওমা, তাই নাকি ? শারমিন পাল্টা জিগ্যেস করল।

তাই না তো কী ?

কি কি গল্প শুনলে ?

গল্প তো মন্দ নয়। সবাই প্রশংসা করল।

আরে, বল না, কি রকম প্রশংসা।

খুউব ভালো, তুমি খুউব ভালো। আমাকে বলল, তোর বউয়ের মতো বউ এদিগরে নেই। কোথা থেকে এই বউ এনেছি ? আমি বলি, পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম, মেয়েটা কাছে এসে বলল, আমাকে নিয়ে চলো, তাই নিয়ে এসেছি।

হো হো করে প্রাণ খুলে হাসল বরকত।

ধ্যাৎ, তুমি শুধু কেবল আমাকে নাড়ো। আমি কি বুঝি না, তুমি এসব বানায়ে বল।

হ্যাঁ, আমার খেয়েতো কাজ নেই―বানিয়ে বলি।

শারমিন ওর পিঠে একটা কিল মারে। কিল খেয়ে কৃত্রিম একটা শব্দ করে। অবিকল কান্নার সুর।

শারমিন আরও কয়েকটা কিল মারে। বলে, দুষ্টু, দুষ্টুমি করা বার করে দেব।

শয়তান … শয়তান …

শয়তান না, আমি ভূত… আমি ভূত। তোমার ঘাড় মটকে দেব।

দুজনে হো হো করে কিছুক্ষণ হাসাহাসি করল। কয়েকদিন পর শারমিনের হাতে একটা চিঠি দিয়ে গেল ডাক বিভাগের পিয়ন। সরকারি চিঠি। চিঠির গায়ে গোল সিল মারা। শারমিন লেফাফা খুলে চিঠিটা বের করল। সরকারি দপ্তর থেকে জানান হয়েছে যে বি.সি.এস পরীক্ষায় শারমিন তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। চোখে পানি এসে গেল শারমিনের। সে আনন্দে ছুটে গিয়ে আব্দুল ওহাবকে দেখাল, বাবা, আমি বি.সি.এস পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেছি।

বাহ, বেশ সুখবর তো। এই, এই বরকতের মা, কোথায় আছ, তাড়াতাড়ি এস, আমার মা জননী বি.সি.এস পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছে।

হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল বরকতের মা, কি হয়েছে গো―

মা জননী বি.সি.এস পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছে। ঘর থেকে মিষ্টি এনে দাও।

পাড়ার লোকেরা সুখবর শুনে এখনি ছুটে আসবে। সবাই আমার মায়ের ভক্ত।

ঘটনাও ঠিক ঘটে গেল তাই। সারা গ্রামময় বাতাসে সুখবরটা এককান থেকে আর এক কানে পৌঁছে গেল। দু’একজন করে লোকও আসতে লাগল। তারপর সারা গ্রামের লোক এসে ভিড় করে উঠোনে দাঁড়াল। শারমিনের ওপরে মানুষের যে অভূতপূর্ব টান, তা এই ঘটনায় প্রমাণ করে দিল।

মাঠে ছিল বরকত, সেখানে থেকে সে দ্রুত মোটরসাইকেলে চলে এসেছে।

পাড়ার মেয়েরা সবচেয়ে বেশি উল্লাস করছে। শারমিন আপা, শারমিন আপা বলে চিৎকার করছে।

একজন বলল, শারমিন আপা ইবার সরকারি বড় অফিসার হবে। আমাদের গ্রামের বউ, কেউ আমাদের ওপর হাম্বিতাম্বি করার সাহস পাবে না। আমাদের নালিশ করার একটা জায়গা হয়েছে।

ছোট ছোট বাচ্চা ও কিশোর ছেলেরাও আনন্দে লাফালাফি করতে লাগল। বরকত যে ভাবে এসেছিল―ঠিক সেই ভাবেই চলল হাটে ময়রার দোকানে মিষ্টি আনতে। বউয়ের কৃতিত্বের জন্য বুকটা সাত হাত উঁচু হয়ে উঠেছে। হাটে গিয়েও শুনল লোক মুখে শারমিনের কৃতকার্যের কথা।

ও বরকত, তোমার বউয়ের সাফল্য মানে আমাদের সাফল্য। মিষ্টি আমরাই খাওয়াব তোমাকে। আমাদের গর্ব। আমাদের গ্রামের বউ। আমাদের একটা মানমর্যাদা আছে না ? ও ঘোষ দাদা, ওর কাছ থেকে টাকা নিবানা- টাকা দেব আমরা।

মতিলাল ময়রা বলল, যা যা লাগে আমি ঠোঙায় করে বেঁধে দিচ্ছি। টাকা আমি তোমার কাছ থেকে নেব না।

মিষ্টির একগাদা ঠোঙা বড় একটা প্যাকেটের মধ্যে পুরে দিল মতিলাল ময়রা। মোটরসাইকেলের পেছনে দড়ি দিয়ে আচ্ছা করে বেঁধে দিয়ে বলল, নিয়ে যাও, বাবা, খবরটা শুনে আমাদের বুক উঁচু হয়ে উঠেছে।

বাড়িতে এসে বরকত দেখল, সারাবাড়ির প্রাঙ্গণে লোকে লোকারণ্য।

আব্দুল ওহাব ঘোষণা দিয়েছেন, যত পার খাও। বউমার জন্যে নামাজ পড়ে দোয়া করো গে―

সন্ধ্যার পর পর বাড়িটা খালি হয়ে গেল। সারাটা দিন ছিল হৈ হৈ রব। কানটা ঝালাপালা হয়ে আছে। তবুও মনের মধ্যে আনন্দ। বারান্দায় চেয়ারে বসে হাফ ছাড়ল বরকত।

দেখেছ শারমিন তোমাকে নিয়ে কত হৈচৈ ?

হ্যাঁ, তাই তো দেখলাম।

বুঝলে, এরা সব কীভাবে তোমাকে ভালোবাসে। চার মাসের মধ্যেই এত কাণ্ড ? তোমার জন্যে সব ছুটে এসেছে।

হেসে উঠল শারমিন। এদের ভালোবাসার মধ্যে কৃত্রিমতা নেই। একটু ভালোবেসেছি, তাই এত কাণ্ড। মানুষকে ভালোবাসলে, মানুষই প্রতিদান দেয়। এরা যে খবরটা শুনে এইভাবে ছুটে আসবে, আমি ধারণা করতে পারিনি। ওদের এই ভালোবাসার তুলনা নেই।

আব্দুল ওহাব বললেন, যারা এসেছিল, এরা সব প্রায় দরিদ্র শ্রেণি। ওদের কারও চাওয়ার কিছু নেই এবং পাওয়ারও কিছু নেই। ওদের সঙ্গে মিশলে ওরা খুব খুশি হয়।

হ্যাঁ, বাবা, ওরা খুউব খুশি হয়। আজকে তো তাই মনে হলো। আমি একটু সময় পেলেই ওদের বাড়িতে গিয়ে ওদের মতো করে বসতাম। কথা বলতাম। হাসতাম। মাথায় হাত বুলাতাম। কখনও কারও হাতে ভিক্ষা দিইনি। ওরাও চায়নি। কারণ আমি জানতাম ওরা ভিক্ষুক নয়। ওরা স্নেহের কাঙাল। ভালোবাসার কাঙাল। দুটো টাকা দিলে ভিক্ষুকের মতো হাত পেতে নেবে কিন্তু ভালোবাসাতো দুটো টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায় না, শারমিন বলল।

আব্দুল ওহাব বললেন, মা, তোমার বিবেক আছে বলে বিবেচনা করে ওদের সঙ্গে মিশেছ, এই কারণেই ওরা তোমাকে আপন করে নিয়েছে। এটা ক’জনা পারে ? আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি মা―তুমি সুলক্ষণা মেয়ে। জগতে যেখানে যাও না কেন লোকের কাছ থেকে স্নেহ ও ভালোবাসা পাবে।

হ্যাঁ, বাবা, আপনার আশীর্বাদই হচ্ছে আমার জীবন পথের পাথেয়। মানুষই হচ্ছে মানুষের সহায়ক। ভালো মানুষ আছে, মন্দ মানুষ আছে। হিংসুটে মানুষ আছে। লোভী মানুষ আছে। স্বার্থহীন মানুষ আছে। সবাইকে মনের মানুষ করতে হলে পরশমনি হওয়ার সাধনা করতে হয়। আমি সেই কাজটিই করে থাকি বাবা। শারমিনের চোখ দুটো পানিতে ভরে গেল।

আব্দুল ওহাব ওর দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। বললেন, তুমি খুব দয়ালু মা। তুমি সব কিছু অন্তর দিয়ে উপলব্ধি কর। যা কিছু দেখ, অন্তর দিয়ে দেখ। শারমিনের মাথায় হাত রাখলেন আব্দুল ওহাব, তুমি তোমার ইচ্ছা পূরণ কর মা। আমি তোমার জন্যে এই দোয়া করি।

রাত্রে বিছানায় গিয়ে বরকতের কাছাকাছি বসল শারমিন। বরকত ওর চুলের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে আদর করতে লাগল। মাথা নিচু করে নিশ্চুপ বসে রইল শারমিন।

বরকত বলল, চিঠি তো পেয়েছ, আমিও খুশি হয়েছি। তোমার খুশি মানে আমার খুশি। আমি যে এত খুশি হয়েছি, ওজন করে তোমাকে দেখাতে পারব না। আমার অন্তকরণ জানে আমি তোমাকে কত ভালোবাসি। যা হোক। এখন সিদ্ধান্ত নাও কবে তোমাকে যেতে হবে। কত তারিখে প্রশিক্ষণ শুরু হবে ?

শারমিনের মাথা আরও নিচু হয়ে এল; আমি যেতে চাচ্ছি না বরকত। শুধুমাত্র পরীক্ষা দিয়েছিলাম আমার যোগ্যতা যাচাই করার জন্য। আমি যে যোগ্যতা অর্জন করেছি, এটাই আমার বড় রকমের বিজয়। আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় হয়েছে। আমি কথা দিয়েছিলাম তোমার সঙ্গে থাকব। আমি তোমাকে ছেড়ে কোথায়ও যেতে চাইনে।

এটা তোমার অভিমানের কথা শারমিন, তোমার সঙ্গে সম্পর্ক আমার আত্মার সম্পর্ক। তুমি বড় হওয়া মানে আমি বড় হওয়া। তোমার কৃতিত্ব মানে আমার কৃতিত্ব। তোমার এই কৃতিত্বে তোমাকেই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। বড় একটা কর্মের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। প্রশাসন বিভাগে তুমি গিয়ে যে অবদান রাখবে, সেই অবদান অন্য কারও পক্ষে রাখা সম্ভব নয়। নারীদের চোখে আলো দিতে চেয়েছিলে, সেই সুযোগটা গড়িমসি করে হারায়ো না। আমি তোমার স্বামী হয়ে তোমাকে যেতে বলছি। তুমি তৈরি হও। আমি নিজেই তোমাকে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক।

শারমিনের চোখ দুটো আরও ভিজে উঠল। দু’এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল।

তুমি কাঁদছ ? বরকত বুকের মধ্যে ওর মাথাটা চেপে ধরে রাখল। কিছুক্ষণ ঝিমমেরে থেকে বলল, তুমি কাঁদছ কেন, এটা তো আনন্দের ব্যাপার। তুমি সিভিল সার্ভিসে পরীক্ষা দিয়ে যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছ, এটা তো অসাধারণ ব্যাপার। সারা এলাকার লোক আনন্দ করছে। বাহবা জানাচ্ছে। এতে আমার মনপ্রাণ এত উদ্বেলিত হয়েছে যে, ইচ্ছা করছে তোমাকে মাথায় তুলে নিয়ে নাচি। 

আরও গভীরভাবে বুকের মধ্যে বরকত শারমিনকে চেপে ধরে রাখল। 

শারমিন বলল, আমি, আমি, এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারছি না। শুধু কান্না আসছে।

ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল বরকত, আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি, বরকত বলল।

তা আমি জানি বরকত। জানি বলেই কান্না আসছে। কি করে তোমাকে ছেড়ে যাব আমি। আমার মনে প্রাণে এখন তুমি ছাড়া আর কিছু নেই। শুধুমাত্র তুমি আর তুমি।

এটাও আমি জানি। তুমিও আমাকে দারুণ ভালোবাসো।

ওরা দুজনে বিছানায় শুয়ে পড়ল। জড়াজড়ি করে পরস্পরের বুকের ওপর বুক রেখে শুয়ে রইল। সারারাত একইভাবে আলিঙ্গন করে ঘুমিয়ে কাটাল দুজন।

পরের দিন আব্দুল ওহাব বললেন, মা, যাওয়ার ব্যাপারে কি কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছ ?

না বাবা, কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি, শারমিন বলল।

আমি তোমার যাওয়ার আগের দিন একটা অনুষ্ঠান করব। এই জন্যে দিনক্ষণ জানতে চাচ্ছি, আব্দুল ওহাব বললেন।

আপনার ছেলেকে ডাকুন। মাকেও ডাকুন। বিষয়টি নিয়ে আমি কথা বলতে চাই।

আব্দুল ওহাব বরকত এবং বরকতের মাকে ডাকলেন। বরকত বাইরের উঠোনে দাঁড়িয়ে ট্রাক্টর চালকদের সঙ্গে কথা বলছিল। মা রান্না ঘরে হাঁড়িপাতিল রাখার জায়গাটা ঠিকঠাক করছিলেন।

আব্দুল ওহাবের ডাকে উভয়ে এসে পড়ল। গোল হয়ে ওরা বসল টেবিলের চারপাশে ঘিরে।

আব্দুল ওহাব বললেন, বউমা কিছু বলতে চায়, শোনো।

কি মা, কিছু বলবা ? বরকতের মা বলল।

হ্যাঁ, মা, আমি কিছু বলতে চাই।

বল, কি বলতে চাও ? বরকত বলল।

শারমিন বলল, তার আগে আব্বা কিছু বলুন। কি জন্যে ডাকা হয়েছে। আব্দুল ওহাব বললেন, বউ মাকে তো ঢাকায় যেতে হবে। তাই আমি চাইছিলাম, গ্রামের লোকজন নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করব। দিনক্ষণ ঠিক হলে আয়োজনটা করতে পারি।

শারমিন বলল, বাবা, ঢাকায় যেতে আমার মনপ্রাণ সায় দিচ্ছে না। যেন কেমন লাগছে। আমি বলছি, চাকরি করার আমার আগ্রহ নেই। না গেলে হয় না ?

এ’তুমি কি কথা বলছ মা ?

হ্যাঁ বাবা, আমার মনের কথা বলছি।

তা হয় না মা। তুমি সিদ্ধান্ত বদলাও।

বরকতের মা বললেন, দেখো মা, আমি খুব বেশি লেখা পড়া শিখিনি। আই এ পাশ করেছিলাম। তারপরে সংসারে ঢুকেছি। আমিও চেয়েছিলাম বি.এ, এম.এ পাস করে চাকরি করব। সে আশা পূরণ হয়নি। আমি তোমাকে অজপাড়া গাঁয়ে আটকে রেখে হাঁড়িকুড়ি ঘাঁটাঘাঁটি করাতে চাই না। আমার ইচ্ছে ছিল সিভিল সার্ভিসে যাব। সেই আশাটা আমি তোমার দিয়ে পূরণ করতে চাই। আমার ব্যাটার বউ যে কৃতিত্ব অর্জন করেছে, এটা বিশাল ব্যাপার। এক লাখ ছেলে মেয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তুমি তাদের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছ। সারাদেশের মানুষ অবাক। এই রত্নটি আমার বাড়ির রত্ন। তুমি তৈরি হয়ে নাও মা, দেশের লোক জানুক। আমার বরকতের বউ চাকরির উচ্চ শিখরে অবস্থান করছে।

বরকত বলল, মা, তোমার সঙ্গে আমি একমত। আব্দুল ওহাব বললেন, এটা আমার গর্ব। তুমি সিদ্ধান্ত নাও, কবে যাবা ? আমি অনুষ্ঠানটা তাড়াতাড়ি করতে চাই। বলো মা, কবে যাবা ?

অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত যেতে রাজি হলো শারমিন। তবুও মনে দ্বিধা সংশয়। শারমিন বলল, এই মাসের পনেরো তারিখে গিয়ে যোগ দিতে হবে। আজ পাঁচ তারিখ। আপনি সাত অথবা আট তারিখে অনুষ্ঠান করুন। আমরা তেরো তারিখেই রওনা হব এখান থেকে। চৌদ্দ তারিখে ঢাকায় পৌঁছাব। কোনও সমস্যা হবে না।

বাড়ির সবাই খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল। শারমিন হাসল না। চুপ করে শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে রইল।

তবে একটা কাজ করি মা, আট তারিখেই আমি অনুষ্ঠানটি করি ? আব্দুল ওহাব বললেন।

ঠিক আছে, বাবা, তাই করেন। এ ব্যাপারে আমার কোনও আপত্তি নেই। বরকতের মা বললেন, হ্যাঁ, মা, ভালো করেই করব। গরিব মিসকিনদের মন ভরে খাওয়াব। ওদের দোয়া আল্লাহ কবুল করবেন।

বরকত বলল, কেউ যাতে না বলতে পারে, কৃপণতা করা হয়েছে।

আব্দুল ওহাব বললেন, বউমার উপলক্ষে গ্রামের গরিব মিসকিনসহ সকল লোককে আমি দাওয়াত করব। তোমার বন্ধু বান্ধবদের তুমি দাওয়াত করবা।

ঠিক আছে, বাবা। তাই করব।

আব্দুল ওহাব স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। মাথার মধ্যে কয়েকদিন থেকে একটা দুশ্চিন্তা ভর করেছিল, সেই দুশ্চিন্তাটা এখন দূর হয়ে গেল। তিনি খাতা কলম নিয়ে, বসলেন। কত লোক দাওয়াত করবেন, কটা খাসি জবাই করবেন, কত মণ চাল লাগবে, দুটো গরু লাগবে ইত্যাদি হিসাব করে মনটাকে আরও হাল্কা করে ফেললেন। সবকিছু মিলিয়ে নগদ কত টাকা খর্চা হবে, তাও হিসেবের খাতায় লিখলেন।

তারপর দিন গ্রামের মাথাওয়ালা লোকদের ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন। খানা তৈরি করার দায়িত্ব দিলেন কয়েকজনকে। মাথাওয়ালা লোকগুলো খুশি হয়ে অনুষ্ঠানটি সফল করার জন্য সার্বিক দায়িত্ব পেয়ে খুশি হয়ে উঠল। সবাই শারমিনের জন্য একটা কিছু করে দেখাতে চান। শারমিন তাদের মাথার মণি হয়ে উঠেছে।

আব্দুল ওহাব দাওয়াত করতে প্রত্যেকের বাড়িবাড়ি গেলেন। বুঝলে, আমার মা জননী বড় একটা চাকরি পেয়েছে। তার জন্যে এই আয়োজন। তোমরা সবাই যাবা। মন খুলে খাওয়াব। মা জননীর জন্য একটু দোয়া করে আসবা। মনে থাকবে তো ?

হ্যাঁ। আলবত যাব। আমাদের গ্রামের বউ। তার জন্যে দোয়া করে আসব। গ্রামের লোকেরা দোয়া করবে না তো― দোয়া করতে আসবে কারা ? বেশ একটা খুশ খবর। উৎফুল্ল হয়ে উঠল গ্রামের লোকেরা।

আব্দুল ওহাব মসজিদের ইমামের কাছে গেলেন। ইমাম সাহেবও খুশি।

ওহাব ভাই, আপনার দাওয়াত কবুল করলাম। একটা কাজ করলে হয়, কোরআন খতম করে নেন। আল্লাহ খুশি হবেন।

যেটা ভালো হয়―তাই করেন হুজুর। আপনার ওপরেই দায়িত্ব দিলাম।

ইন্শাআল্লাহ, কবুল করে নিলাম।

আব্দুল ওহাব হুজুরের হাতে হাত রেখে মুসাফা করে চলে এলেন। মনটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে আব্দুল ওহাবের।

বাড়িতে এসে চিন্তা করলেন, গ্রামের কোনও লোকের দাওয়াত করতে ভুল হয়েছে কি না। হিসেব করে দেখলেন সব ঠিক আছে। সন্ধ্যাবেলা মাগরিব নামাজের পর বেহাইয়ের কাছে মোবাইল করলেন। বেহাই আপনাকে বিষয়টা না জানিয়েই আকস্মিকভাবে বউমার উদ্দেশে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। আট তারিখে হলো আপনাকে দাওয়াত। অবশ্যই আসবেন।

খুব খুশি, খুব খুশি। দাওয়াতটা গ্রহণ করলাম। কিন্তু আসতে পারব না বেহাই। শারমিনকে নিয়ে আমরাও একটা আয়োজন করছি। যে বিদ্যালয় থেকে সে স্কুল ফাইনাল দিয়ে বোর্ডে তৃতীয় স্থান লাভ করেছিল, সেই স্কুলের পরিচালনা কমিটি ওই একই দিনে একটা সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাকে অবশ্যই যেতে হবে সেখানে। না গেলে তারা অসন্তুষ্ট হবে। অতএব, আমি আপনার বাড়ির অনুষ্ঠানে যেতে পারছি না। এর জন্যে মাফ চাচ্ছি। কিছু মনে করবেন না বেহাই। শারমিনের বাপ দুঃখ প্রকাশ করলেন।

ও আচ্ছা, এটাও তো একটা খুশ খবর। আমার শারমিন মা খুব খুশি হবেন। আব্দুল ওহাব হাসলেন।

শারমিন ঘরের মধ্যে ছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আব্দুল ওহাবের কাছে দাঁড়াল।

বাবা, আব্বা কি বললেন ?

উনি আসতে পারবেন না। ওখানে যে বিদ্যালয়ে তুমি পড়েছ, ওই বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি তোমাকে নিয়ে একটা মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান করবে, তার একটা প্রস্তুতি সভা হবে আট তারিখে। তাই আসতে পারবেন না।

বাবারাও তাহলে একটা অনুষ্ঠান করবেন ?

হ্যাঁ, তাই তো উনি বললেন।

যাক, বেশ  মজা হবে।

হ্যাঁ, মা, মজাতো হবেই। আমার মা জননীর জন্যেই এসব আয়োজন। সব জায়গা থেকে দেখছি বিপুল সাড়া। এটা আল্লাহর রহমত।

দুপুর বেলা খাওয়া-দাওয়া করে আব্দুল ওহাব ছাগল আর গরু কিনতে কয়েকজন লোক নিয়ে দুর্গাপাড়া হাটে রওনা দিলেন। হাটটি  গরু ছাগলের হাট। একেবারে নদীর ধারে অবস্থিত। ব্রিটিশ আমলের হাট। বিভিন্ন স্থান থেকে লোকে গরু ছাগল এনে হাটে তোলে। খরিদ্দারদের পায়ের শব্দে জমে ওঠে হাটখোলাটা। যে পরিমাণে আনা হয় গরু ছাগল, তার তিনগুণ লোক এসে জমায়েত হয় এই হাটে। খরিদ্দার যেমন, দালালের সংখ্যাও তেমন।

হাটে এসে দুটো ইয়া বড় আকারের গরু কিনলেন আব্দুল ওহাব। টাকা একটু বেশি খর্চা হলেও গরু দুটো মনের মতো হয়েছে। দশটি বড় বড় ছাগল কিনলেন। কোনও দামাদামি করেননি। গরুছাগলের মালিকরা বেশি টাকা চায়নি। আব্দুল ওহাবকে এদিগরের এমন কোনও লোক নেই যে চেনে না। তার বউমার জন্য মেজবানি দিচ্ছেন। এই কথাটা দালালরা হাটের মধ্যে ছাড়িয়ে দিয়েছিল। বউমা বড় রকমের একটা চাকরি পেয়েছেন। একথাটাও রটিয়ে দিয়েছে ওরা।

অনেকেই কৌতূহলী হয়ে জানতে চেয়েছিল, কী রকম চাকরি ?

দালালরা বলেছিল, জজ ম্যাজিস্ট্রেট।

ওমা, তাই নাকি ?

হ্যাঁ, তাই।

তাহলে জবর রকম একটা খানাপিনা হবে বৈকি।

খবরটা প্রচার হয়ে গেলে আব্দুল ওহাবের সম্মানটা আরও উচ্চে উঠল। গরু ছাগল কিনে বাড়ি আনার পর সম্মানটা আরও চারগুণ বেড়ে গেল।

কেউ কেউ জিগ্যেস করল, কত টাকা খরচা হয়েছে ?

দালাল বললেন, লাখের বেশি।

সারা গ্রামের লোক ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গরু আর ছাগল দেখতে।

আট তারিখে ঠিক বিহানবেলা মসজিদের ইমাম এসে পশুগুলো জবাই করে দিয়ে গেলেন।

সেই গরু আর ছাগলের গোশত খেয়ে গ্রামের তাবৎ লোক শারমিনের জন্য দোয়া করে গেল।

বড় একটা শামিয়ানা টাঙানো হয়েছিল উঠোনে। মসজিদের ইমাম সাহেব মাথায় পাগড়ি বেঁধে আল্লাহ রসুলের নাম করে বয়ান করলেন। দোয়া দরুদ পাঠ করলেন। শারমিনের উদ্দেশে আল্লাহর দরবারে হাত উঁচু করে তিনি বললেন, আল্লাহ, তুমি এই এই নেকবান্দাকে কামিয়াবি হাসেলের জন্য তওফিক দান কর। তার জিন্দেগী খুবসুরত করে দাও। তার বরকত সুগম করে দাও। আব্দুল ওহাব এবং তার পরিবারে রহমত দান কর। আবুল বরকত এবং শারমিনের দাম্পত্য জীবন মধুময় করে দাও। যে উদ্দেশে শারমিন যাত্রা করছে, ইয়া আল্লাহ তা’ সফল করে দাও। হুজুরের দোয়া শেষ হলে পর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো বাড়ির ভেতরে। ইমাম সাহেব শারমিনের বাজুতে একটা রূপার মাঁদুলি বেঁধে দিলেন। বিড় বিড় করে সুরা ইয়াসিন পাঠ করে গায়ে ফুঁ দিলেন।

যাও মা, আল্লাহ তোমার ভালো করবেন। কোনো বাঁধাবিঘ্ন থাকবে না।

আব্দুল ওহাব বললেন, আমার মার জন্যে এই অনুষ্ঠানটি করলাম ইমাম সাহেব।

খুউব ভালো হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে। ইমাম সাহেব প্রশংসা করলেন। মার মুখমণ্ডলেই রয়েছে মঙ্গলের চিহ্ন। এ রকম মেয়ে আমি চোখে দেখিনি।

ইমাম চলে গেলেন। সারা ঘরময় খুশবুর গন্ধ ভাসতে লাগল। আব্দুল ওহাবের মনের ভেতরে একটা ভাবাবেগ সমুদ্রের কল্লোলের মতো উপচে পড়ছে। লোকজনকে তিনি খুশিমত খাওয়াছেন। তারাও প্রাণ খুলে বউমার জন্যে হাত উঁচু করে দোয়া করেছেন। কোথাও কোনও সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। এমন একটা অনাবিল আনন্দ এর আগে কখনও তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি।

শারমিনকে বললেন, মা, কেমন মনে হচ্ছে তোমার ?

শারমিন মাথা নিচু করে শ্বশুরের পায়ে হাত দিয়ে কদমবুচি করে বলল, বাবা, আপনি যা করেছেন, এর কোনও তুলনা হয় না।

ঠিক বলছ তুমি মা ?

হ্যাঁ, বাবা, আমি ঠিক বলিছি। আপনার আশীর্বাদই হচ্ছে আমার বড় পাওনা। আমি যেন আপনাদের মুখ উজ্জ্বল করতে পারি। জগতের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যেই আমি যাচ্ছি। ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রতি আমার সামান্যতম লোভ নেই। আমি চাই মানুষের কল্যাণ। আজকে যে কাজটি আপনি করলেন, এর মধ্যে রয়েছে আপনার উদারতা এবং মহানুভবতা, শারমিন বলল।

শাশুড়ির কাছে গিয়েও পায়ে হাতে রেখে কদমবুুচি করল। মা ওর মাথায় হাত দিয়ে স্নেহ করলেন, দেখ মা, তুমিই হচ্ছ আমার গর্ব, তুমিই হচ্ছ আমার অহংকার। সারাদিন অনুষ্ঠানের মধ্যে ব্যস্ততম সময় কাটাতে হয়েছে আবুল বরকতের। দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। সেই সকাল থেকেই সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও ফুরসত ছিল না ওর। সন্ধ্যার পর ক্লান্তিতে শরীরটা ভেঙে পড়ছিল। সে ঘরে গিয়ে বালিশে মাথা রেখে ক্লান্তি ঝাড়ছিল।

শারমিন ওর মাথার শিয়রে গিয়ে বসল।

কষ্ট হয়েছে নাকি ?

না, না কোনও কষ্ট নেই।

তবে শোনো, কাল সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত যে ক’দিন বাড়িতে আছি তোমার সব রকমের কাজের সহায়তা করব আমি। দুজনেই একই সঙ্গে থাকব। খাব, কাজ করব। তারপর ঘরে এসে দুজনে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকব।

ধকল সইতে পারবা তো ?

অবশ্যই পারব।

আমি তো সারাদিন ট্রাক্টরের সঙ্গে থাকি।

আমিও ট্রাক্টরের সঙ্গে তোমাকে কাছে নিয়ে থাকব।

তার মানে তুমিও চাষা হতে চাও ?

দোষ কি ?

দুজনে হো হো করে হাসল।

ঘটনাটি সেই রকমই ঘটল। ভোর রাত্রে উঠেই বরকতের সঙ্গে শারমিন মাঠে চলে গেল। পরিধানে ছিল কালো একটা ট্রাউজার। খুউব মনোরম দেখাচ্ছিল শারমিনকে।

শারমিন বলল, আমার দিকে অমন করে বিড়ালের মতো তাকাচ্ছ কেন ?

খুউব ভালো লাগছে দেখতে।

তোমাকেও কিন্তু ভালো দেখাচ্ছে। খাকি প্যান্ট, খাকি শার্ট। একেবারে নতুন বরকত। তার মানে আমার বর।

দুজনেই হো হো করে হেসে উঠল।

গ্রামের লোকেরাও খবরটা শুনে মাঠে এসে ভিড় জমাচ্ছে। দারুণ একটা কৌতূহল। এটা নিয়ে চুটিয়ে অনেকেই পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গল্প করে শুনাচ্ছে। রূপকথার কাহিনির মতো হয়ে উঠেছে। শারমিনের বাবার কানেও গিয়েছে বিষয়টি। তিনিও বিষয়টি শুনে হো হো করে হাসলেন। সেলফোনে তিনি মেয়েকে উৎসাহিত করে বললেন, শারমিন, তুমিও মাঠে গিয়ে চাষ কাজে নেমেছ শুনে খুশি হলাম। বেশ ভালো ভাবে যুগলে থাক তোমরা। শোন, আর একটি সুখবর আছে। বারো তারিখে বিদ্যালয়ে তোমাকে নিয়ে অনুষ্ঠান হবে। প্রধান অতিথি হবেন জেলা প্রশাসক। বেশ বড় রকমের আয়োজন। তুমি এগারো তারিখে চলে এসো। সঙ্গে করে বরকতকে আনবে।

খবরটা খুশির খবর। বরকতও শুনল। বাড়ির সকলেই শুনল। বউমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বরকতের মা আদর করল।

রাতের বেলা কায়েতপাড়ায় যাওয়ার ব্যাপারে এক জায়গায় বসলো ওরা।

আব্দুল ওহাব বললেন, তুমি এক কাজ কর মা, তোমাকে তো আবার ঢাকায় যেতে হবে। এখান থেকে এগার তারিখে একেবারে গোছগাছ করে যাও। হাজার হোক তোমার বাবামার বাড়ি, সেখানেও একদিন থাকতে হবে। তারপর বরকতের সঙ্গে তেরো তারিখে চলে যাও ঢাকায়।

হ্যাঁ, বাবা, আমিও তাই ভাবছি। শারমিন বলল।

বরকত বলল, এক কাজ কর শারমিন, তুমি এগার তারিখে সকাল আটটার ট্রেনে চলে যাও। আমি যাব বার তারিখে। মাঠের কাজটা দুদিনের মধ্যে আমি যতটুকু পারি গুছিয়ে নেব। তাই এগার তারিখে আমি যেতে পারব না। তোমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর আমি নিয়ে যাব।

শারমিন বলল, হ্যাঁ, তাই করবা। কাজের গাফিলতি করা ঠিক হবে না। আমিও চাচ্ছি চাষাবাদের কাজটা যেন থেমে না যায়।

আব্দুল ওহাব হেসে উঠলেন, তোমার চিন্তাটা খুব ভালো মা।

আবুল বরকতও খুব খুশি হলো।

মা বললেন, দেখেছ, কী সুন্দর চিন্তা। আমরা হলে বেঁকে বসতাম। সংসার নিয়ে দুজনের একই রকম ভাবনা।

মা, আমাকে নিয়ে আমি কখনও ভাবি না―আমি সবার নিয়ে ভাবি। সংসার নিয়ে ভাবি। সংসারের কাজ নিয়ে ভাবি।  সব কাজই তো আমাদের কাজ। ওর নিয়েও আমার অহঙ্কার। এত বড় ডিগ্রি নিয়েও গ্রামে আছে, উদ্দেশ্য চাকরি নয়―গ্রামকেও নিয়ে সে ভাবে। আমি ওর সঙ্গী হয়েছিলাম ওর এই কাজের সহায়ক শক্তি হিসেবে থাকব বলে। দুর্ভাগ্য, তা আর হলো না, শারমিন বলল।

তুমি যে জন্য যাচ্ছ, এটাও কিন্তু একটা বড় কাজ। তুমি তোমার যোগ্যতার নিদর্শন রেখেছ। একদিন তুমি জেলা প্রশাসক হবে, ধাপে ধাপে সব সিঁড়ি অতিক্রম করে সচিবও হয়ে যাবে। আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি। এতে আমার গৌরব বাড়বে। আমার মার নাম চির অক্ষয় হয়ে থাকবে। শুধু তাই নয়, বরকতের কাজের গতি বাড়বে। মূল্যায়ন হবে। স্বামীর জগতে স্বামী থাকবে আর তোমার জগতে থাকবে তুমি। একটা আদর্শ কাজের মাধ্যমে দুজনেই রেখে যেতে পারবে তোমাদের কীর্তি।

শারমিন ঠোঁট টিপে হাসল, চেষ্টা করলে সব স্বপ্ন পূরণ হয় মা। দেখি, কাজ করার দিন তো সামনে রয়েছে, সেই দিনের অপেক্ষায় থাকুন।

আবুল বরকত বলল, বর্তমানের পরেই তো ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যৎ তৈরি করে দিচ্ছে বর্তমান। একটা স্রোত যাচ্ছে, সেই স্রোতের মধ্যে আমরা আছি। রাত বাড়ছিল। কথাও বাড়ছিল। আড়মোড়া ভেঙে সকলেই উঠে পড়ল। রাতটা ছিল শুভ রাত। বিছানায় গিয়ে শারমিন বরকতকে কোলের মধ্যে টেনে এনে কোল বালিশ বানিয়ে শুয়ে পড়ল।

মুখের কাছে মুখ রেখে শারমিন বলল, এই, আজ রাতটা কিন্তু অন্যভাবে কাটাব।

তাই ?

হ্যাঁ। তোমার মাথাটা আমার বুকের মধ্যে দাও। গলাটা জড়িয়ে ধরো।

গলা জড়িয়ে ধরল বরকত।

ঘনঘন শ্বাস টানতে লাগল শারমিন।

মনে হচ্ছে কী জানো ?

কী ?

মনে হচ্ছে, তোমাকে একেবারে বুকের অন্দরমহলে পুরে রাখি।

রাখ।

বুকটা চিরে দাও না।

চিরতে গেলে তো ছুরি কাঁচি লাগবে।

তুমিই তো ছুরি কাঁচি।

দারুণ একটা আনন্দ অনুভূতির মধ্যদিয়ে সারারাত কাটালো দুজন। শারমিন ফিসফিস করে বলল, আজকের রাতটা এবং আগামীকালের রাতটা নেশার মতো কাটাতে চাই। পরশু দিন এগারো তারিখ। চলে যাব আমি। বার তারিখে কেটে যাবে ব্যস্ততম সময়। তের তারিখে রাতে দুজনেই এক সঙ্গে যাব ঢাকায়। এই ভাবে এক সঙ্গে শুয়ে থাকার আনন্দ আবার যে কবে পাব―

আমারও মনটা এই কারণে বিষণ্নতায় ভরে আছে। আবার যে কবে পাব তোমাকে―

ইস, তোমাকেও দেখছি যে একই মনোরোগে ধরেছে।

ধরবেই তো―

বুকের মধ্যে অতৃপ্ত একটা যন্ত্রণা হিসহিস করে উঠে আসছে। অঙ্গে অঙ্গে মিলিয়েও যন্ত্রণা লাঘব হচ্ছে না। যেন দুটি শুকনো কাঠ আগুনে দগ্ধ হচ্ছে। ভোরের পাখিরা ডেকে উঠল। এই সময় প্রতিদিন ট্রাক্টর নিয়ে মাঠে বেরিয়ে যায় বরকত। আজ আর বেরোতে ইচ্ছে হলো না। শারমিনের হালকা ফিনফিনে দেহটা বুকের ওপরে তুলে নিল।

আজ আর মাঠে যাব না শারমিন।

কেন ?

তোমাকে বুকে নিয়ে আজ সারাদিন শুয়ে থাকব।

বরকতের বুকের মধ্যে মাথাটা ডুবিয়ে দিয়ে শারমিনও শুয়ে থাকল।

আস্তে আস্তে তন্দ্রায় চোখ দুটো বুজে গেল শারমিনের। তন্দ্রার গভীরে ডুবে যেতে যেতে শারমিন একটা স্বপ্ন দেখল, একটা ট্রেনে উঠে ওরা দুজনে কোথায় যেন চলেছে। দূরন্ত গতিতে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। একটার পর আর একটা স্টেশন। বড় একটা জংশনে থেমে গেল ট্রেনটা। ওরা উভয়েই ট্রেন থেকে নামল। চারদিকে হৈ হল্লা আর ভিড়। আগে আগে হেঁটে যাচ্ছে আবুল বরকত। ওর পেছনে পেছনে হাঁটছে শারমিন। কিছু দূর গিয়েই আবুল বরকত উধাও হয়ে গেল। কোথায় যে আবুল বরকত হারিয়ে গেল―চিৎকার করে ছোটাছুটি করে, বরকত বরকত বলে অবিরাম ডাকতে লাগল শারমিন।

ঘুমের ঘোরে চিৎকার শুনে আবুল বরকত উঠে বসল। শারমিন এখনও বরকত বরকত বলে চিৎকার করছে।

আবুল বরকত ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল, এই, এই, তুমি ডাকছ কেন ?

শারমিনের ঘুম ভেঙে গেল। তার চোখে মুখে তখনও তন্দ্রা। 

কেমন যেন একটা আতঙ্ক।

আবুল বরকতের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার বুকের মধ্যে দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরল শারমিন।

বরকত বলল, কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছ নাকি ?

শারমিন কাঁপতে লাগল।

শারমিনের বুক থরথর করে কাঁপছে।

ওর চুলের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে দিল বরকত।

শারমিন ওর মাথাটা বরকতের বুকের মধ্যে পুরে দিয়ে হাঁফাতে লাগল।

 কোনও ভয় নেই। এই তো আমি তোমার কাছে আছি। আছি। আছি।

হ্যাঁ, আমিও তোমার কাছে আছি। আছি। আছি। চিরকালের জন্যে আছি।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares