গল্প : ইহজীবন : সুব্রত বড়ুয়া

আকাশে আলোর বন্যা। চাঁদের আলো। ঘরের ভেতর ভ্যাপসা গরম। ফুল-স্পিডে ফ্যান চলছিল বটে, তবে তাতে গরমের হল্কা তেমন একটা কমেনি।

রত্নেশ্বর বিছানায় ছটফট করছিল। মাঝরাতে ঘুম ভাঙার পর উঠে একবার বাথরুমে গিয়েছিল। যখনই ঘুম ভাঙে রাতে, মনে হয় যেন তলপেটে চাপ বাড়ছে। একবার বাথরুমে যেতেই হয়। সূত্রধরের কাজকর্ম শেষ হবার পরে বেসিনের কল খুলে দিয়ে চোখেমুখে পানির ঝাপ্টা দিয়েছিল। ভেবেছিল, এতে গরমের ভাপটা নিশ্চয়ই একটু কমবে। তারপর বাথরুমের আলো নিভিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। বারান্দার গ্রিলের বাঁধন ছাড়িয়ে টবের গাছগুলোর যেসব পাতা আর চিকন ডাল বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল সেগুলো কাঁপছিল ঝিরিঝিরি বাতাসে। কিন্তু গ্রিলের ভেতরে বাতাসের কোনও সাড়া নেই। রত্নেশ্বর গ্রিলের ফাঁক দিয়ে একটা হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বাইরে। সেই হাতে হালকা বাতাসের ছোঁয়া লাগছিল। একটা মিষ্টি কোমল অনুভূতি ছুঁয়ে যাচ্ছিল তাকে। জীবনে কত ছোট সুখই না মুহূর্তের জন্য মানুষকে ভালোলাগার পরশ দিয়ে যায়। চারতলার এই একচিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের জগৎটাকে কতটুকুবা দেখা যায়। চারপাশের ছোটবড় সব নানান রকমের বাড়ি। কত মানুষের বাস সেখানে। বেশির ভাগ বাড়িই অন্ধকারে ডুবে আছে, যেন এই মুহূর্তে ভেতরের মানুষগুলোর মতো বাড়িগুলো গভীর ঘুমে কাতর। একটা-দুটো বাড়ির দুয়েকটা জানালায় মলিন আলো জ্বলছে। ওখানে কেউ জেগে আছে কি না কে জানে।

রাতের এই ঘুমিয়ে থাকা শহর দেখতে দেখতে রত্নেশ্বর কত কিছুই না ভাবে।  ভাবনার কোনও শেষ থাকে না। বেঁচে থাকা মানেই ভাবনা। সেই ভাবনার সুতো ক্রমেই বাড়তে থাকে। রত্নেশ্বর, রতন, রতইন্যা। মনে মনে হাসি আসে তার। মানুষের জীবন কতভাবেই না বদলে যায়। ফিরে তাকাও, দেখি একবার নিজের দিকে। রত্নেশ্বর মনে মনে নিজেকে দেখার চেষ্টা করে। জন্ম ও ছেলেবেলা কেটেছে গ্রামে। তারপর বড় হয়ে উঠতে উঠতে সেই গ্রামের জীবনটাকে পেছনে ফেলে এসেছে নিজের অজান্তেই। এখনকার ছেলেপিলেরা তাকে তেমন চেনে না। সেও চেনে না ওদের। কারও চেহারাই তেমন আলাদা করে মনে থাকে না। গ্রামে গেলে নতুন করে চেনা-জানা হয় অনেকের সাথে। কিন্তু দীর্ঘ অদর্শনে সেও আর মনে থাকে না। মনে পড়ে যায় একবার বাড়ি যাচ্ছিল। বাস থেকে নেমে রিকশা নিলেই হয়। সেদিন নেয়নি। দুপুরের প্রায় কাছাকাছি সময়। চৈত্র মাসের দারুণ রোদ। রাস্তার দুপাশে গাছপালা কিছু ছিল, কিন্তু তার ছায়ার বিস্তার ছিল না পুরো রাস্তাজুড়ে। রত্নেশ্বর ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল অল্প কিছুদূর হেঁটেই। বয়সের ভারটা কেবলই জানান দিয়ে যাচ্ছিল তাকে। তখন টের পাচ্ছিল―একটা রিকশা নিয়ে এলেই হতো। এখন মাঝপথে রিকশা পাবে বলে মনে হয় না। তিন পথের মোড় আম গাছটার ছায়ায় পৌঁছে একটু জিরোবে বলে ভাবছিল। দশ-এগারো বছর বয়সের একটি লিকলিকে কালো ছেলে সেখানে মাটির ওপর বসে দূরের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিল। রত্নেশ্বর গিয়ে তার কাছেই দাঁড়াল। একটু  বসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তেমন জায়গা রত্বেশ্বরের চোখে পড়ল না। দূর থেকে দৃষ্টির ঠিকানা গুটিয়ে এসে রত্নেশ্বরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ছেলেটি। রত্নেশ্বরও ওকে দেখছিল। এসময় ছেলেটি হঠাৎ ওকে জিজ্ঞেস করল―

 আপনি কাদের বাড়ি যাবেন ?

 ছেলেটির প্রশ্নে চমকে উঠেছিল রত্নেশ্বর। উত্তর দেবার কথা চিন্তা করতেই, মনে করতেই, মুখে চলে এসেছিল কথাটি―আমি আমাদের বাড়ি যাব।

সেটুকু বলেই ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়েছিল সকৌতুকে। মজাও পেয়েছিল মনে মনে। ‘আমি আমাদের  বাড়ি যাব’। ছেলেটির মুখে বিস্ময়। হয়তো এমন একটা উত্তরের রহস্য বুঝতে পারছিল না সে। আজ এতদিন পরে কথাটি মনে পড়ায় নিজেও একটু বুঝি অবাক হলো, রত্নেশ্বর। আসলে এমন কথার কী কোনও অর্থ হয় ? রত্নেশ্বর হাসল মনে মনে। আসলে অই কথাটা হঠাৎ কেন যে মুখে চলে এসেছিল সে নিজেও জানে না। কিছুক্ষণ সেই গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তারপর আবার বাড়ির পথ ধরেছিল, রত্নেশ্বর। একটু এগিয়ে গিয়ে একবার পেছন ফিরে ছেলেটির দিকে আবার তাকিয়েছিল সে। দেখেছিল, অপলকে ছেলেটি তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে খুব হেসেছিল রত্নেশ্বর।

তার কথায় কী ভেবেছিল ছেলেটি ? সে কথাটুকু অবশ্য আর জানার উপায় ছিল না। এখন এই দুই যুগ পরও ঘটনাটার কথা মনে হলে হাসি পায় রত্নেশ্বরের। মনে হয়, ‘আমাদের বাড়ি যাব’ বলে কোনও বাড়ি ঠিক নির্দেশ করা যায় না। তবু এই―‘আমাদের বাড়ি’ কথাটিই যেন চিরকালের জন্য মাথার মধ্যে, চিন্তার মধ্যে, ভাবনার মধ্যে একটি গুঞ্জনের মতো অনুরণিত হয়ে চলে।

রত্নেশ্বর একা একা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। চারদিকে কেবল অনড় স্তব্ধ হয়ে আছে। রত্নেশ্বর চারতলার বারান্দা থেকে নিচের রাস্তার দিকে তাকায়। সারাদিনের ব্যস্ততার কোনও রেশই নেই সেখানে। অনেকক্ষণ পর একটা রিকশা দেখতে পায় সে। খুব ধীরে সুস্থে রিকশাটি এগিয়ে যেতে থাকে। একটা রাস্তার কুকুর নিরীহভাবে দু’একবার ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করে ওঠে। রিকশার চলার শব্দ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়।

এই রাস্তায় বেওয়ারিশ কুকুরদের কয়েকটি ঠেক আছে। রত্নেশ্বর ভেবে দেখেছে, অন্তত চারটি ঠেক তো হবেই। রাতে মাঝে মাঝে ওদের গলাবাজি শোনা যায়। কোনও কোনও গাড়ি খুব দ্রুত চলে যেতে থাকলে অই কুকুরগুলোর মধ্যে কেউ কেউ খুব বিরক্ত হয়ে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। রত্নেশ্বরের মনে হয়―এটা এক ধরনের প্রতিবাদ, কিংবা হয়তো কিছুই না। হয়তো প্রকৃতির এক স্পন্দন মাত্র।

রত্নেশ্বর রাতের মানুষের চলাফেরা দেখে নিজের মধ্যে কত কিছুই না ভাবে। বেঁচে থাকার জন্য, জীবনধারণের জন্য, পরিবার পরিজনদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য কতভাবেই না নিজেকে নিয়োজিত করে রাখতে হয়। এরই নাম জীবনসংগ্রাম। নিজের জীবনের ফেলে-আসা দিনগুলোর কথা, টুকরো টুকরোভাবে মনে পড়ে যায়। তখন রত্নেশ্বর খুব অবাক হয়ে নিজেকে দেখে, নিজের জীবনকে। কখনও কখনও তার মনে হয়―মানুষের জীবনটা যেন নিয়তির অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা এক পুতুলের জীবন। সেখানে নড়াচড়ার স্বাধীনতা আছে,  কিন্তু তার সবটুকুই একটি ছকের মধ্যে ঠেসে ধরে রাখা। ইচ্ছে করলেও কিছুতেই সেই ছকের বাইরে যাওয়া চলে না, কিংবা সে-রকম বাইরে যাওয়ার ইচ্ছেটুকুও কখনও মনের মধ্যে জাগে না। হয়তো তার তুলনা হতে পারে এই গ্রিল-দিয়ে ঘেরা এক চিলতে বারান্দার স্বাধীনতার মতো। এখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে বাইরের জগৎটার কিছু কিছু দেখা যায়, হাত বাড়িয়ে বাতাসের স্পর্শ টের পাওয়া যায়, ঝলমলে রাতের আকাশের বাঁধভাঙা চাঁদের হাসির দিকে তাকিয়ে থাকা যায়; কিন্তু এখানকার এই বন্দিত্ব ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া যায় না।

এই ভাবনাটা মনে আসায় নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় রত্নেশ্বরের। মনে হয় তার ভাবনার জগৎটাও যেন সীমাবদ্ধ একটি জায়গা। ইচ্ছে করলেও সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া চলে না; কিংবা ইচ্ছেটাই হয়তো করে না। কোথায় যেন শুনেছিল―মানুষ তার অভিজ্ঞতার বাইরে চিন্তা করতে পারে না। কিন্তু এও তো ঠিক যে―এই অভিজ্ঞতাটা যে কী সেও-তো তার বোধের মধ্যে ঠিক পুরোপুরি মূর্ত হয়ে ওঠে না। রত্নেশ্বর নিচের দিকে তাকায়, কিংবা বলা যেতে পারে―নিজের দিকে তাকায়। এই কথাটা মনে আসায় একটু মজাও পায় সে। এইসব ভাবতে ভাবতে রত্নেশ্বর তার নিজের একাকিত্বের ভাবনাটাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে থাকে। এ-কথা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না যে―রত্নেশ্বর এই রকম একাকিত্বের কথা ভাবে। আসলে প্রতিটি মানুষেরই হয়তো একধরনের নিজস্ব একাকিত্ব থাকে। কেউ তার হদিশ পায়, কেউ পায় না। জীবন-তো এ ভাবেই এগিয়ে চলে।

জীবন! রত্নেশ্বর নিজের মনেই হেসে ওঠে। জীবন নিয়ে এত সব গভীর ভাবনা তার মাথায় আসার কথা নয়। তবু আসে! হয়তো জীবন নামক কথিত সময়কালটা ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে বলেই। রত্নেশ্বরের হঠাৎ  মনে হলো―সে যতই নিজেকে জীবনের কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছে ততই আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়েছে তার থেকে দূরে। একে একে সব বাঁধনই আলগা হয়ে গেছে। নিজেকে মনে হয় তার একাকী সেই গাছটির মতো যেটিকে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে নিরুপায় বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে দেখেছিল একবার।

ট্রেনের জানালা দিয়ে বিশাল মাঠের মাঝখানে একা সেই গাছটিকে দেখেছিল সে। খুব জোরে মুষলধারে নয়, বৃষ্টি পড়ছিল ঝিরিঝিরি, যেন আলগোছে গা ভিজিয়ে নিচ্ছে মাটির পৃথিবী। সেই বিশাল মাঠের এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরটা ধুয়ে নিচ্ছিল গাছটি। কাছে পিঠে কোনও বাড়িঘর নেই। গ্রামের ঘরবাড়ির আবছা ছায়াটুকু কেবল দেখা যাচ্ছিল। যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ গাছটার দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে সম্মোহিতের মতো বসে ছিল রত্নেশ্বর। বুকের মধ্যে কোথায় যেন হালকা বেদনার মতো একটা কিছু জড়িয়ে রেখেছিল তাকে। কেমন যেন নিজে নিজেই  উদাস হয়ে গিয়েছিল সে। একবার তার মনে হয়েছিল―নিজেই যেন অই খোলা মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির পানিতে ভিজছিল সে, অন্য কেউ নয়। তার কাছেপিঠে কেউ নেই। একেবারে একা সে।

কিন্তু অই একাকিত্বকে সে ভয় পাচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল―আকাশের বৃষ্টিকণা আর নিচের মাটির পৃথিবীর মধ্যে একটা সেতুবন্ধের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে। কোনও কিছুই করার নেই তার। ঘর নেই, সংসার নেই, স্ত্রী-সন্তান নেই―একাকী একটি মানুষ সে। পুরোপুরি একা।

রত্নেশ্বরের মনের মধ্যে কী একটা যেন খেলা করে। হঠাৎ ক’রে তার মনে হয়―বাইরের বাতাসটা যেন কোমল, আর্দ্র হয়ে উঠেছে। বৃষ্টিভেজা হালকা বাতাসের ছোঁয়া যেন তাকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। একটা করুণ বৃষ্টির ধারা যেন তার শরীরের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে নিচের পৃথিবীর দিকে।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares