গল্প : প্রভাতফেরিতে মুজিব : সেলিনা হোসেন

একুশের প্রভাতফেরিতে যাওয়ার জন্য বের হয়েছেন মুজিব। সূর্যের হালকা আলো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। লেকের ওপরে আবছা কুয়াশা। এক মুহূর্ত লেকের সামনে দাঁড়ান। বুকের ভেতরে শহিদদের চেহারা প্রতিবাদী চেতনায় ফুটে থাকে। যে কয়জন শহিদ হয়েছেন তাঁদের স্মরণে তাঁর হাতে সে কয়টা লাল গোলাপ। রাস্তার মাথার দিকে তাকিয়ে দেখেন ফুল নিয়ে পথযাত্রায় নেমেছে মানুষ। তাঁর রাজনীতির কর্মীরা অনেকে তাঁর সঙ্গে পথে শামিল হবে। অনেকে শহিদ মিনারের সামনে তাঁর জন্য অপেক্ষা করবে। হাতের গোলাপ নাকে ধরে নিজেকে বলেন, তোমাদের স্মরণে বুকের ভেতর রক্তগোলাপ ফোটে সোনার ছেলেরা। তোমরা মাতৃভাষার জন্য আমাদের ইতিহাস সৃষ্টি করেছ। তোমরা অমর, তোমরা অমর।

রাস্তার মাথায় এলে দেখতে পান কবি সুফিয়া কামাল দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি একুশের ভোরে শহিদ মিনারে গিয়ে ফুল দেন। মুজিব তাঁর কাছে গেলে সুফিয়া কামাল বলেন, তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছি ভাই। তোমার সঙ্গে পায়ে হেঁটে যেতে পারলে গর্ব হয়।

আহারে, আমার আপাটা এরকম করে হেঁটে যাবে ? আপনি হেঁটে যাবেন না। আপনি রিকশায় যান। আমরা হেঁটে যাই।

না ভাই, আমি হেঁটে যেতে পারব। তোমাদের সঙ্গে হাঁটলে আমার কষ্ট হয় না। তুমি থাকলে তো আমি রিকশায় উঠবই না। চলো যাই। তোমার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম।

মুজিব হাসতে হাসতে বলে, ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’ আপা আপনি কবি। আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন। দেশের জন্য আপনার চিন্তা অনেক গভীর। আপনার কবিতা পড়ে আমি মুগ্ধ হই।

চলো, চলো।

আমরা রোদ ওঠার আগেই পৌঁছে যাব শহিদ মিনারে।

মিছিলের আরও অনেকেই একসঙ্গে বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিকই। আমাদের ফুলের তোড়ার গায়ে রোদ লাগবে না। ফুল শুকিয়ে যাবে না।

সুফিয়া কামাল জোরে জোরে বলেন, আমরা কখনও শুকনো ফুল শহিদ মিনারে দেব না। আমরা কখনও দেইনি। আমাদের তরতাজা ফুলের সৌরভ শহিদের রক্তে মিশে যাবে।

তখন ভেসে আসে গান―আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি―আমি কি ভুলিতে পারি―

গানের বাণী-সুরে ভরে যায় প্রভাতফেরী। সূর্যের আলো বাড়ছে, এখনও তেমন রোদ ছড়ায়নি। মুজিব সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গাইতে থাকেন। ততক্ষণে সবাই নীলক্ষেতে চলে এসেছে। পায়ে হেঁটে গেলে আর বেশি দূর নয়। একজন ছেলে কাছে এসে বলে, মুজিব ভাই মওলানা ভাসানী যাচ্ছেন। আপনি এগিয়ে গেলে ওনার সঙ্গে দেখা হবে।

না, আমার আপাকে ছেড়ে আমি তাড়াতাড়ি হাঁটব না। আপা পিছিয়ে পড়তে পারেন।

সুফিয়া কামাল মুখ ঘুরিয়ে বলেন, একুশের প্রভাতফেরী আমার প্রাণের টান। আমরা দুইজনে ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর রাস্তা থেকে রওনা করি। আমাদের ঠিকানা যেমন কাছাকাছি, তেমন চিন্তা-চেতনার দিকও একই রকম।

ঠিক বলেছেন আপা। আপনি কবি-রাজনীতিবিদ। আর আমি রাজনীতিবিদ-কবি।

পাশের দু’একজন হাসতে হাসতে বলে, এখন থেকে আমরা আপনাকে মুজিব ভাই না ডেকে, কবি ভাই ডাকব।

তা হবে না, আমার রাজনীতি আগে। আর সুফিয়া কামাল আপার কবিতা আগে। যেখানে রাজনীতির সংগ্রাম সেখানে তিনি সামনে গিয়ে দাঁড়ান। ঠিক বলেছি আপা ?

একদম ঠিক। মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আমি পিছিয়ে থাকতে চাই না। রাজপথে মিছিলে-মিটিংয়ে অংশ নিয়ে প্রতিবাদ করতে চাই।

আপনারা আমাদের আলোর পথের মানুষ। আপনাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করব কবি আপা। চলেন এগোই।

হাঁটতে শুরু করে সবাই। বিশ^বিদ্যালয় এলাকা পার হওয়ার আগেই বাবুপুরা বস্তির একটি দশ বছরের ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে মুজিবের পা জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে ডাকে, মুজিব ভাই, মুজিব ভাই।

কি রে সোনারা কি হয়েছে ?

আমরা আপনার সঙ্গে শহিদ মিনারে যাব।

চল, চল, আয় আমার সঙ্গে।

আমার হাতে ফুল নেই। শহিদ মিনারে তো আজকে ফুল ছাড়া যাওয়া যাবে না।

মুজিব একটি গোলাপ দিয়ে বলে, নে এটা নে।

একটা নেব না, সব দ্যান।

তখন পেছন থেকে আরও কয়েকজন এসে জড়ো হয়। চেঁচিয়ে বলে, আমাদেরকেও ফুল দেন।

তোরা সবাই গাছের ফুল নিয়ে আসিসনি কেন ?

আপনি তো আমাদের কাছে বটগাছ। আমরা বটগাছ থেকে ফুল নেব।

আশেপাশে হেঁটে যাওয়া দলের কর্মীরা তালি দেয়। বলে, সাবাস, সাবাস। মুজিব ভাই ওদেরকে একটি করে গোলাপ দিয়ে দেন। আপনাকে আমাদের আনা বড় ফুলের তোড়া দিচ্ছি।

মুজিব শিশুদের হাতে একটি করে গোলাপ দিলে ওরা দৌড়াতে শুরু করে। বলতে থাকে, আমাদের শহিদরা, আমাদের শহিদরা। ফুলের মালা গলায় পর।

সুফিয়া কামাল অবাক হয়ে বলে, এই শিশুরাও এত কিছু জানে।

মাতৃভাষার জন্য জীবন দানকারী শহিদদের কথা তো ওদের জানতে হবে কবি আপা।

এসব কিছু তোমার অবদান মুজিব। মুজিব দেশবাসীকে নিজেদের ইতিহাস জানিয়ে তৈরি করছ। তোমার রাজনীতি ভিন্ন মাত্রার। তোমার মতো দেশপ্রেমিক হয় না। আমিও তোমার কথায় অনুপ্রাণিত হই। আজকে শিশুদের কাছে এসব শুনে মনে হলো ওরাও তৈরি হচ্ছে। তুমি ওদের প্রাণের মুজিব ভাই।

মুজিব হাসিমুখে মাথা নাড়ে। আর কোনও কথা হয় না। মিছিল বিশ^বিদ্যালয় এলাকা ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যায়। মুজিব ভাবে, সুফিয়া কামালের কারণে আজকের প্রভাতফেরী অন্যরকম হলো। সুফিয়া কামাল ভাবে, রাজনীতিতে মুজিবের কোনও তুলনা হয় না। তার ত্যাগের কোনও সীমা নেই। তার নিষ্ঠার কোনও পরিসীমা নেই। মানুষের জন্য মমতা আর আত্মার একটা টান আছে। তার মতো একজন মানুষ সারা বিশে^ আমি দেখতে পাচ্ছি না। তার পলায়নী মনোবৃত্তি নেই। যেখানে সংকট, যেখানে সংগ্রাম, যেখানে সংঘাত দেখেছে, সে এসে আগে দাঁড়িয়েছে। মরণকে ভয় করেনি। এসব ভেবে সুফিয়া কামাল ঠিক করে বাড়ি ফিরে এই কথাগুলো লিখে রাখতে হবে। ‘আমার দেখা মুজিব’ নামে আমি একটি লেখা লিখব। আমার এই চিন্তা হারিয়ে যেতে দেব না। যে ছোটরা দৌড়ে এসে ওর পা জড়িয়ে ধরে ওরা এই লেখা পড়লে গভীরভাবে চিনবে মুজিবকে। সামনে আরও সুদিন আছে আমাদের। মুজিবের হাত ধরে সেইসব দিন আমাদের সামনে নতুন দিনের সূচনা করবে।

সবাই শহিদ মিনারের কাছাকাছি এসে যায়। শুনতে পায় একুশের সঙ্গীত―আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি―আমি কি ভুলিতে পারি―

সুফিয়া কামাল নিজেও গুনগুন করে গাইতে থাকে।

আপা আসেন একসঙ্গে গান গাই। এই তোমরা সবাই আমাদের সঙ্গে গাও। শুরু হয় একুশের গান। গান শেষে ফুলের বড় তোড়া সামনে নিয়ে মুজিব বলে, আপা ধরেন। আমি আর আপনি একসঙ্গে ফুল দেব।

দুজনে ফুল নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে শহিদ মিনারের সামনে রাখে। দলের কর্মীরা স্লোগান দিতে থাকে― একুশের স্মৃতি অমর হোক―

একুশের শহিদদের লাল সালাম।

দুজনে নেমে আসে শহিদ মিনারের ওপর থেকে।

আপা, আপনাকে একটা রিকশায় তুলে দেই।

হ্যাঁ, দাও। আমি চলে যাই। তুমি তো থাকবে।

হ্যাঁ, আমি থাকব।

আমি একা একা এই শহরে হাঁটব না। মিছিল হলে আমার সাহস বাড়ে। শহিদ মিনারে আমি সবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একজন সাহসী মানুষ হয়ে যাই।

এজন্যই তো আপনি কবি আপাগো। আজকে বিকালে আপনি আমার বাড়িতে আসবেন। রেণু আপনার কথা খুব বলে।

আমি জানি রেণু আমাকে খুব ভালোবাসে। ওর মতো মেয়ে হয় না। এত শান্ত, ধীর, স্থির।

আমাদের জন্য দোয়া করবেন আপা।

তুমি বিকালে আমার বাসায় এসো। পিঠা খাওয়াব।

আশেপাশের ছেলেমেয়েরা হাসতে হাসতে বলে, মুজিব হাত তুলে ওদের কথা থামায়। রিকশাওয়ালাকে বলে, অ্যাই যাও, এগোও। ঠিকঠাক মতো আপাকে বাড়ি পৌঁছে দিও।

তুমি আসবে না বিকালে ?

এখন কিছু বলতে পারছি না। সামনে অনেক কাজ। কখন বাড়ি ফিরব জানি না।

আচ্ছা, যাই। সময় পেলে এসো। না আসলে বুঝব সময় পাওনি।

রিকশা চলে যায়।

মুজিব শহিদ মিনারের সামনে এসে দাঁড়ায়। নিজের পার্টির তরফ থেকে ফুল দেওয়া হয়। ছোট ছোট ছেলেরা দৌড় দিয়ে উঠে যায় ওপরে। ফুল দিয়ে নেমে আসে। ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে।

মুজিবের হাত ধরে বলে, আজকে আমাদের বাড়িতে যেতে হবে।

এই ভাগ তোরা।

দলের ছেলেরা ওদের তাড়া দেয়।

না, আমরা ভাগব না। আমরা মুজিব ভাইকে নিয়ে যাব।

মুজিব ভাই তোদের বস্তিতে যাবে না।

তাহলে আমরা কোথায় থাকব ? আমাদেরকে কে দালানে রাখবে ?

মুজিব দলের ছেলেদের ধমক দিয়ে বলে, এই তোরা থাম। বস্তিতে ছেয়ে আছে ঢাকা শহর। ওদের জন্য কি তোরা দালান বানাতে পারবি ? শুধু শুধু ওদের মন খারাপ করে দিচ্ছিস কেন ? এই তোরা ওই পাশে গিয়ে দাঁড়া। আমি যাব তোদের সঙ্গে।

হুররে। মুজিব ভাই, মুজিব ভাই।

ছেলেরা দৌড়ে শহিদ মিনারের একপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ফুলের বিতান থেকে একটা একটা ফুল ছিঁড়ে হাতে নেয়।

মুজিব মওলানা ভাসানীর সঙ্গে কথা বলেন। রাজনীতির নানা দিক বিভিন্ন সূত্রে কথায় আসে। একপর্যায়ে ভাসানী বলেন, তোমার নেতৃত্ব বাঙালির সামনে ফুটে উঠেছে মুজিব। যেখানেই যাই অনেকেই তোমার কথা বলে। সাধারণ মানুষের মাঝে তোমার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি।

মুজিব বলে, আমি ঠিক করেছি আমি স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলব। আমাদের পূর্ববঙ্গকে শোষণ করা ওদের চলবে না। বাঙালির সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের পাট বিক্রি করে পুরো অর্থ ওরা নিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে লাগাচ্ছে। যথেষ্ট করেছে। আর মানব না।

ভালোই বলেছ। শহিদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে শপথ নেওয়া হলো। আজকে যাই। আবার দেখা হবে তোমার সঙ্গে।

হ্যাঁ হবে, অবশ্যই হবে।

হাসিমুখে চলে যান মওলানা ভাসানী। শহিদ মিনার থেকে লোকজন চলে যাচ্ছে। ফুল দেওয়ার পর্ব শেষ। বেলা বেড়েছে। চারদিকে রোদ ঝকঝক করছে। মুজিব শিশুদের দিকে এগিয়ে যান। ওরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। হাতের ফুলগুলো তাঁর দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে, আমাদের তো ফুল কিনার টাকা নাই। এই ফুল কয়টা আপনার জন্য রেখেছি। আপনি বসেন আমরা আপনাকে ফুল দেব।

বসতে হবে না আমার হাতে দে।

সিরাজ বলে, না বসতে হবে। বসলে আমরা মাথায় দিব। ফুল দিয়ে মাথা ভরে দেব।

বাব্বা তোরা এতকিছু ভেবেছিস।

বসেন, বসেন মুজিব ভাই। রব হাততালি দিতে থাকে। চারপাশের নেতা-কর্মীরা হাসতে থাকে।

ঠিক আছে তোদের অনুরোধ রাখছি।

মুজিব বসেন। ছেলেরা চারদিকে দাঁড়িয়ে মাথায় ফুল রেখে দেয়।

আমি দাঁড়ালে তো ফুলগুলো পড়ে যাবে। তখন কি করবি তোরা ?

আমরা সব ফুল তুলে নেব। বাড়ি নিয়ে যাব। আমাদের মায়েদেরকে ফুল দিয়ে বলব আপনাকে ফুল দিতে। মায়েদের তো ফুল কিনার টাকা নাই।

এদের তো অনেক বুদ্ধি।

মুজিব হাসতে হাসতে উঠে পড়েন। জসীম বলে, আমরা একদিন বস্তির ঘর ফুল দিয়ে সাজাব। মাকে বলব, খিচুড়ি আর চিংড়ি মাছ রান্না করতে। আপনি খাবেন তো মুজিব ভাই ?

আমি তোদেরকে খাইয়ে দেব। তোদের পেট পুরো ঢোল হয়ে যাবে।

ঠিক, ঠিক। আমরা সবাই ঢোল হব। মুজিব ভাইয়ের মিটিংয়ে আমরা সবাই ঢোল বাজাব।

মুজিব হাসতে হাসতে বলেন, ছেলেগুলো খুব উচ্ছল।

মুজিব ভাই চলেন বাবুপুরা বস্তিতে।

আমি কিন্তু একটু দাঁড়িয়ে থেকে চলে আসব। আমাকে বসতে বলবি না তোরা।

আমাদের ঘরে তো চেয়ার নাই। আমরা তো বসতে দিতে পারব না।

আমি বসব না, আমার সময় নাই। তাড়াতাড়ি চল।

সিরাজ ফুলগুলো নান্টুকে দিয়ে বলে, তুই ফুলগুলো নিয়ে দৌড় দিয়ে চলে যা। মায়েদের বলবি ফুল হাতে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। মুজিব ভাইয়ের দুই হাত ভরে মায়েরা ফুল দেবে।

মুজিব হাঁটতে শুরু করলে দলের কর্মীরাও পিছু নেয়। ওরা বলে, আমরা ভেতরে ঢুকব না। রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকব। মুজিব ভাইকে নিয়ে ফিরব।

ছুটে আসছে ট্রেন। কর্মীরা পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে। মুজিব ছোটদের সঙ্গে বস্তিতে ঢোকেন। ছেলেরা তাঁকে ঘিরে নৃত্যের ভঙ্গিতে এগোচ্ছে। মুজিব দূর থেকে দেখতে পান কয়েকজন নারী ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে এগিয়ে গেলে নারীরা ফুলগুলো তাঁর হাতে না দিয়ে পায়ের কাছে রাখেন। তারপর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেন।

মুজিব মাথার ওপর হাত রেখে বলেন, ওঠেন মায়েরা। ছোটরা ফুলগুলো হাতে তুলে নেয়। বলে, এগুলো শহিদ মিনারের ফুল।

ঠিক বলেছিস সোনারা। তোদেরকে দোয়া করি। তোরা ভালো থাকিস।

একজন মা বলে, আপনার জন্য এই মোড়াটা রেখেছি। এখানে একটু বসেন।

না, আমি আর বসব না। আমি যাই।

আপনার জন্য কয়েকটা পিঠা রেখেছি। খাবেন না ?

আজকে আমাকে সুফিয়া কামাল আপা পিঠা খাওয়াবেন। এই পিঠাগুলো আপনারা খান। ছেলেদেরকে খেতে দেন।

চারপাশে নারী-পুরুষের ভিড় জমে গেছে। সবাই মিলে স্লোগান দিচ্ছে―মুজিব ভাই, মুজিব ভাই। জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।

বাবুপুরা বস্তির মানুষেরা চারদিক থেকে ছুটে আসে। স্লোগান থেমে যায়। বয়সি মানুষেরা বলে, মুজিব ভাই আপনি আমাদের জন্য বক্তৃতা করেন। আপনার বক্তৃতা শুনলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।

আপনারা জানেন আজকে একুশে ফেব্রুয়ারি।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা জানি আজকে শহিদ দিবস।

তাহলে চলেন সবাই মিলে স্লোগান দেই। মুজিব হাত তুলে বলেন, শহিদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না―শহিদ দিবস অমর হোক।

বস্তিজুড়ে স্লোগানের ঢেউ বয়ে যায়। নারী-পুরুষ-শিশুদের কণ্ঠে স্লোগানের শব্দ বাবুপরা বস্তি ছাড়িয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের এলাকার দিকে ছড়িয়ে যায়। মুজিব হাত নেড়ে হাঁটতে শুরু করলে সবাই স্লোগান দিতে দিতে পেছনে আসে।

নীলক্ষেতের কাছে এলে বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্ররা ওদের সঙ্গে যুক্ত হয়। ওদের স্লোগান থামলে বলে, এবার আপনারা এই স্লোগান দেন।

বলেন, বলেন। নতুন স্লোগান বলেন।

ছেলেরা সমবেত কণ্ঠে স্লোগান দেয়, শেখ মুজিব এসেছে―বাঙালি জেগেছে।

সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হয় স্লোগান―শেখ মুজিব এসেছে―বাঙালি জেগেছে।

মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। চারদিক থেকে বেরিয়ে আসে অনেক মানুষ। সবাই মিলে স্লোগান দিতে থাকে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares