গল্প : দূর্বা ও মৌটুসি : শিহাব সরকার

জামাল ভোরে এখানে এসেই দেখলেন, ছেলেটা নদীর পাড়ে বসে আছে। দু’চোখ নদীর অপর পাশে ইন্ডিয়ান বর্ডারে সবুজ পাহাড়গুলোর দিকে। ঠিক নদী বলা যায় না, চারদিকে পড়ে থাকা ছোট-বড় পাথর এড়িয়ে পর্যটক নারী-পুরুষ ওটার অনেক ভেতরের দিকে চলে যায়। তবু একে ঝোরা বললেই মানানসই হয়। কেউ কেউ হাঁটতে হাঁটতে ওপারেও চলে যায়। পাড়ে ওঠার আগেই বিএসএফ জোরে জোরে হাত নেড়ে ফিরে যেতে বলে। অনেকে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রাণভরে অরণ্যঢাকা পাহাড়ের দৃশ্য দেখে। ভারতের সীমান্তপ্রহরীরাও নড়ে না। এক সময় ফিরে আসে সবাই। স্থানীয় লোকেরা ঝোরাটাকে নদী বলেই ডাকে।

ছেলেটা ভারতীয় এলাকা থেকে অনেক ভেতরে, বাংলাদেশের সীমানায়। ও বসে আছে যোগীদের মতো। মনে হয় কোনও বিশেষ যোগাসনে বসে চোখ মুদে আছে। গত তিন মাস ধরে ঝোরাটায় রোজ আসেন জামাল হায়দার চৌধুরী। আগে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে পাড়ে বসতেন। কিছুদিন হলো ঝোরার ঠিক মাঝখানে এই পাথরখণ্ডটা আবিষ্কার করেছেন। এখানে বসলে তিনি আর সাতাত্তর বছর বয়সি বৃদ্ধ থাকেন না। মনে হয় ফিরে গেছেন দশ বছর পেছনে। কী নিরিবিলি জায়গাটা! একে নিঝুম বললেই সঠিক শোনায়। নিরন্তর বয়ে চলা ঝোরার স্রোতের ছলোচ্ছলো শব্দ, পাড়ের গাছগাছালি আর ঝোপে পাখিদের কলরোল, হঠাৎ সমস্বরে নারীকণ্ঠের হাসি আর ডাকাডাকি। সব মিলিয়ে এক মায়ালু আবহ। এরা আদিবাসী মেয়ে। জামাল যেখানে বসে আছেন, তার থেকে অনেক বাঁয়ে ওরা জলকেলিতে নামে। অনেক সময় নিয়ে গোসল করে। কেউ কেউ পাথরখণ্ডে কাপড় ধোয়। কলসিতে ঝোরার পানি ভরে। এক সময় সারি বেঁধে দূরে ওদের গ্রামের পথ ধরে।

এখন জায়গাটা সুনসান। তরুণীরা চলে গেছে অনেকক্ষণ। ছেলেটাকে দেখা যাচ্ছে না। ভালোভাবে আলো ফুটলেই ও চলে যায়। কোথায় যায় জামাল জানেন না। ওর সঙ্গে এখনও তাঁর কথা হয়নি। ও চারদিক ভালো করে তাকিয়ে দেখেও না।

বাবা!

একটা অতি চেনা গলা। অজান্তে ভীষণ চমকে উঠলেন জামাল। ডানদিকে তাকিয়ে দেখলেন আরেকটা পাথরের ওপর বসে আছে একটা মেয়ে, অবিকল দূর্বা। তারটার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে। ওর পাঁজর ছিঁড়ে চলে-যাওয়া কন্যা। প্রায় এক ঘণ্টা তিনি বসে আছেন। যখন এখানে আসেন, তখন অনেকদিন অন্ধকার ভালো করে কাটে না। যেমন আজ। কিন্তু তিনি নিশ্চিত, আজ কেউ ছিল না ওই পাথরটার ওপর। বোধ হয় ছেলেটাকেও দেখেননি।

বাবা!

কিছু না বলে হতভম্বের মতো মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকেন জামাল।

আমি দূর্বা। দু’মাস আগেও তুমি আমার কবরে গিয়েছিলে। দু’মাস ধরে যাও না। অনেক খুঁজে আমি তোমাকে বের করেছি।

মা রে, কোথায় ছিলি তুই ? কোথায় ছিলি এতদিন ?

আমি তোমার আশেপাশেই থাকি বাবা। তোমাকে ছেড়ে দূরে গিয়ে আমি থাকতে পারি না। আমি তোমার টানে চলে আসি। আমাদের ওখানকার অনেকেই আসতে চায়, পারে না।

কেন পারে না ?

ওদের চেনা জগৎ যে তোমার মতো করে আমাকে মনে করে না। তুমি কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অন্ধ হয়ে গেছ। কেঁদো না বাবা। আমি সারাক্ষণ তোমার সঙ্গে সঙ্গে আছি। আমি জানি, তুমি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে একা-মানুষ। তোমার কেউ নাই।

একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন জামাল।

তোমার জন্য আমি আছি, বাবা। তোমারও আমাদের এখানে আসার সময় হয়ে এল। এখন তোমার সাতাত্তর। আমি তোমাদের ছেড়ে এসছিলাম, যখন তুমি সাতষট্টি।

তুই আমাকে নিয়ে যা মা। আমার আর এই পৃথিবী ভালো লাগে না। এত একা, আমি এত একা! কথা বলার লোক নাই। বন্ধু নাই। কাছের মানুষ নাই। গলা ভিজে আসে জামাল হায়দার চৌধুরীর।

বাবা, আমার কোনও ক্ষমতা নাই। সব একজনের ইচ্ছাতে হয়। তিনি যদি মনে করেন তোমার যাওয়া দরকার, তবেই তুমি আমার জগতে আসতে পারবে।

আমি কতদিন এভাবে থাকব! তোর মায়ের বুদ্ধিতে এই বাংলোটা কিনেছিলাম, তাই একটা স্থায়ী ঠাঁই আছে। তা-ও তো এটা ভেঙে পড়ল বলে। ছাদের টালিগুলো নড়ে গেছে, দেয়ালের সিমেন্ট খসে গিয়ে ইট বেরিয়ে পড়েছে।

বাবা, আমি সব জানি। তিন বছর পর তুমি আশিতে পড়বে। তুমি বলতে না, তুমি আশি বছরের অভিজ্ঞতাটা পার করে মরতে চাও ? দেখে যেতে চাও, আশিতে পৌঁছে তুমি লজিক্যালি চিন্তা করতে পারো কি না ? লিখতে পারো কি না ? তোমার গান ভালো লাগে কি না ?

তা বলতাম রে, মা। তখন যে তুই বেঁচে ছিলি। আমি ভাবতাম, আমার দু’তিনটা আদুরে নাতি-নাতনি থাকবে। ওদের নিয়ে, তোকে নিয়ে আমার দিন কেটে যাবে। সব কেমন ওলট-পালট হয়ে গেল।

দূর্বার দিকে তাকালেন জামাল। ঘড়ি দেখলেন। আটটা পেরিয়ে গেছে। এসময় চারদিক রৌদ্রে ঝলমল করে। দূর্বা মাথা নিচু করে আছে, থুঁতনিটা এক হাতে ভর দেয়া। সূর্য মেঘে ঢাকা। চারদিক ছায়া-ছায়া। চৈত্র মাস যাচ্ছে। কিন্তু বাতাসে মৃদু ঠাণ্ডার আমেজ। এক সপ্তাহ আগে একদিন ঠিক এসময় কালবোশেখি ছুটেছিল। আজও তাই হবে নাকি।

না, বাবা। আজ ঝড় হবে না। দূর্বা তাকিয়ে আছে জামালের দিকে। ওর দু’চোখের কোনায় অশ্রু জমাট বেঁধে আছে।

অনেক্ষণ ওরা নিশ্চুপ বসে থাকে।

জামাল অনেকক্ষণ একটানা তাকিয়ে থাকেন মেয়ের দিকে। ২০১৯-এ ওকে যেরকম দেখেছিলেন, ঠিক যেন ঐ চেহারাটা। উনি বেশ বদলেছেন। তার মাথার সামনের দিকের চুল পড়ে গেছে। তবে দু’পাশে আর পেছনে এখনও চুল আছে। কলপ করা বাদ দিয়েছেন অনেকদিন আগে। প্রায় সব চুল শাদা। মাঝে মাঝে অবশ্য এখনও ব্রাশের হালকা পোচ লাগান। নইলে আয়নায় নিজেকে খুব বিধ্বস্ত দেখায়। মানুষ এখন আর কিছু বলে না।

কী দেখছ বাবা ?

এই কামিজটা তোকে এক বার্থডেতে গিফট্ করেছিলাম।

দু’হাজার সতেরোতে। আমি সে বছর ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। ভর্তি হয়েছি জাহাঙ্গিরনগরে। পানিতে আধ-ডোবা ওর পায়ের পাতা দুটো নড়ছে। মৃদু শব্দ হচ্ছে। জামালের মনে হয় দূর্বার পা দুটো খালি।

স্যান্ডেল পরিসনি ?

দু’দিকে মাথা নাড়ল দূর্বা। আমি তো হাঁটি না বাবা।

তবে ?

আমি এবং আমার মতো অন্য মেয়েরা ইচ্ছে করলেই যেখানে-সেখানে পৌঁছে যেতে পারি। কীভাবে যাই জানি না।

কোথায় যাস ?

যেখানে যেতে মন চায়, সেখানেই যাই। তোমার ওখানে একবার যাবই। রাতে তোমার ঘুম আসে না। আমি তোমার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিই। আমি জানি ওতে তোমার ঘুম আসে।

তাই তো বলি, আগে প্রায় সারা রাত জেগে থাকতাম। এখন হঠাৎ ঘুম চলে আসে। প্রথমে ছোট ছোট ঢেউ। তারপর হঠাৎ বড় একটা ঘুমের ঢেউ এসে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এক ঘুমে রাত পার।

তুই রাতে কখন ঘুমাতে যাস মা ?

বাবা, আমাদের তো রাত-দিন নাই। টাইম নাই। ঘুম নাই।

বলিস কি ? কষ্ট হয় না ?

না বাবা। প্রথম প্রথম হতো। এখন হয় না।

খালি গায়ে একদল বালক হৈ চৈ করতে করতে ঝোরার কিনার দিয়ে যাচ্ছে। সামনে একজনের হাতে একটা ফুটবল। বোধ হয় ওরা কোনও ম্যাচে জিতে এসেছে। ছেলেটাকে টিমের ক্যাপ্টেন মনে হয়। দু’একজন তরুণ বয়সি ছেলেও আছে। ওরা ড্যাবড্যাব করে দূর্বার দিকে তাকিয়ে আছে। দূর্বা ওদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। নিঃশব্দে হাসল। তরুণ ক’টা বোকার মতো মুখ করে এদিকে তাকিয়ে থাকে। দৃশ্যটা জামালও লক্ষ্য করেছেন।

গ্রামের ছেলে তো! তোর কাপড়-চোপড় দেখে ভড়কে গেছে। তার ওপর আমাকে জানে এই এলাকার এক কালের জমিদার হিসেবে।

বাহ্, খুব মজা তো ? বাবা-মেয়ে ফুটবল টিমটার চলে যাওয়া দেখে।

বাবা ?

কী মা ?

তুমি লেখা ছেড়ে দিলে ? সিনেমার স্ক্রিপ্টে হাত দিয়েছিলে। দুটো ছবি তো খুব নাম করল। বলেছিলে নিজে ডিরেকশানে নামবে। প্রথম ছবিতে আমাকে একটা ক্যারেক্টার দেবে।

বলেছিলাম। সবই ঠিকঠাক চলছিল। এর মধ্যে তুই চলে গেলি। আমার সব ওলট-পালট হয়ে গেল।

এখন শুরু করো। তুমি এখনও ফিট। তোমাকে দেখে মনে হয় না তুমি সেভেন্টি সেভেন। দাড়ি- গোঁফে রং দাও। নইলে কেটে ফেল। মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে।

না রে মা। ওসব করে কী হবে ? আমার ভেতরটা ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। খালি হাহাকার। কোনও রকমে টিকে আছি। প্রাণের কথাগুলো বলব, তেমন কাউকেও পাই না। অনেকে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। বন্ধুদের কারও কারও ধারণা, তোর মা আর ভাইয়ের সঙ্গে আমি কানাডা চলে গেছি। সবাই একদিন আমাকে ভুলে যাবে। ভুলে যাক। আমার সময় হয়ে এসেছে।

বাবা, আমাদের জীবনটা কেন এরকম হয়ে গেল ? একটা হ্যাপি ফ্যামিলি ছিলাম আমরা। চেনা লোকেরা আমাদের হিংসা করত। বেশির ভাগ আমাদের খুব লাইক করত। যেমন এষার বাবা-মা। এষাকে মনে আছে না ? খুব ভালো গান করত। ফটোগ্রাফি করত। একবার বলেছিল, বাসায় সারাদিন থেকে তোমার ছবি তুলে দেবে। তুমি টাইম দিতে পারলে না।

হ্যাঁ, হ্যাঁ। মনে থাকবে না কেন ? আমাদের বাসায় এসে যেতেই চাইত না। তোর রুমে তোর সঙ্গে ঘুমাত। আমাকে দেখলে খুব লজ্জা পেত।

এষার খবর জানো ?

না রে, তুই চলে যাওয়ার পর মাঝে মাঝে বাসায় আসত। তোর অন্য বন্ধুদের নিয়ে আসত। তারপর হঠাৎ খবর নাই।

ওর জীবনে একটা বড় ট্র্যাজেডি হয়ে গেছে। বাসার সবাই প্রায় জোর করে ওর বিয়ে দিয়ে দিল। খুব ভালো ছেলে, ব্রিলিয়ান্ট। নাসায় চাকরি করে। ও স্বামীর সঙ্গে চলে গেল আমেরিকা।

বলিস কি ?

হ্যাঁ, বাবা। দু’বছর পর ওদের ফুটফুটে একটা মেয়ে হলো। ব্যাড লোক ছাড়া কী বলব। মেয়েটা হওয়ার ছয়-সাত মাস পর হাজব্যান্ডের ম্যাসিভ স্ট্রোক। নিচের অংশ পুরো প্যারালাইসিস। কথা বলতে পারে না ভালো করে, মুখ বেঁকে যায়। হুইল চেয়ারে বাড়ির ভেতর চলাফেরা। অফিস যাওয়া বন্ধ।

ওহ্ হো! কী দুর্ভাগ্য!

কিছুক্ষণ কথা বললেন না জামাল। অনেকক্ষণ পর, ‘তারপর ?’

নাসা ওদের নামে মাসে মাসে কিছু টাকা দিচ্ছিল। ওতে ওদের চলে যাচ্ছিল একরকম। এষার হাজব্যান্ডের ব্রেন ড্যামেজ হয়নি। স্ট্রোকের পরেও উনি ওদের রিসার্চে হেলপ করতেন। সেই সঙ্গে অফিসের খরচে চিকিৎসাও চলছিল। আমি স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল দূর্বা।

কী বলছিলি মা ?

বাবা, আমার মন বলছিল উনার আরেকটা স্ট্রোক হবে। এটা হবে ফাইনাল। তাই হলো শেষ পর্যন্ত। হি ডাইড।

এষার কী হলো। ওর ছোট্ট মেয়েটার ফিউচার ?

বাবা, এ নিয়ে সমস্যা হয়নি। এষার হাজবেন্ড নাসার সায়েন্টিস্ট হিসেবে খুব নাম করেছিলেন। তিনি ইউএস সিটিজেন। তার সংসারের দেখভাল করার দায়িত্ব নিয়ে নিল গভর্নমেন্ট।

এষা দেশে চলে এলেই পারত। এখনও পারে।

বাবা, এষাকে আমি স্কুল থেকে চিনি। ও খুব ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্বভাবের। দেশে এসে কারও বার্ডেন হয়ে থাকার মেয়ে নয় ও।

ওর মেয়ের জন্যই ওর ফিরে আসা উচিত।

না, বাবা। ওসব দেশে বহু সিঙ্গেল মাদার আছে। ওরা যার যার মতো করে চলে। তাছাড়া এষার কেসটা স্পেশাল। নাসা ওকে একটা ফটোগ্রাফির চাকরি দিয়েছে। ও ভালো আছে।

চুপ করে থাকেন জামাল। দূর্বার ভাগ্যটাও কি এষার মতো হতে পারত না ? ওরও না হয় জামাই মরে যেত, বা ডিভোর্স হয়ে যেত। কিন্তু ও-তো বেঁচে থাকত। রোজ মেয়ের সঙ্গে, নাতি-নাতনির সঙ্গে তিনি ফোনে কথা বলতে পারতেন। স্ক্রিনে দেখতেন ওদের ভিডিও ছবি। দূর্বার চেহারায় যে-মেয়েটা ওর পাশে বসে আছে, ও তো আসল দূর্বা নয়। ও অন্য ভুবন থেকে এসেছে। ও অশরীরী। কিছুক্ষণ পরই হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন জামাল। গলগল করে দুচোখ দিয়ে পানি বেরোচ্ছে। উনি মুখ ঢাকলেন।

কেঁদো না বাবা। সবাই এক রকম ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না। আমার আর এষার মন্দভাগ্য। দু’জনের দু’রকমভাবে।

কিন্তু তুই তো বেঁচে থাকতি মা। আমার বাসার আলো হয়ে থাকতি। আমাদের জীবনটা এরকম ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত না। কী পাপ করেছিলাম আমি ? একটা মশা বা পিঁপড়া পর্যন্ত আমি মারতে চাই না।

থাক বাবা, প্রসঙ্গটা বাদ দাও। সবই একটা মহাপরিকল্পনার অংশ। আমাদের বোধের বাইরে কোন মহাশক্তির ইচ্ছায় সব চলছে। বিশেষ করে জন্ম আর মৃত্যু।

মলিন হাসলেন জামাল।

তুই এতকিছু বুঝিস এখন ? আগেও বুঝতাম বাবা। তখন বুঝিনি যে আমাকে এত দ্রুত অন্য ভুবনে চলে আসতে হবে। অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা শুরু হবে মাত্র এক উইক পর। দিনরাত পড়ছি। টিচার, আমার ক্লাসফ্রেন্ডরা―সবার ধারণা আমি ফার্স্ট হব। আমারও আত্মবিশ্বাস ছিল ওরকম। হঠাৎ ওলট-পালট হয়ে গেল।

মাত্র দু’দিনের মধ্যে। এক শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেল। আমি সেদিন হলে থাকিনি। বাসায় আমার রুমে আমি। মনে হলো হালকা পেটব্যথা হচ্ছে। ভাবলাম সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে পিৎজা খেয়েছি। ওটাতে হয়তো ঝামেলা ছিল। তাই সামান্য পেটব্যথা। কিন্তু পেইনটা বাড়তেই লাগল। একপর্যায়ে থাকতে না পেরে আম্মুকে ডাকলাম। আম্মুর তো মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। হৈ চৈ করে তোমাকে, ভাইয়াকে ডেকে তুলল।

মা গো, আমি তো হৈচৈ করতে পারি না। কিন্তু আমার ভেতরে তখন তুফান হচ্ছিল। কাউকে বুঝতে দিইনি। আসলে আমি তো কাউকে কখনও কিছু বুঝতে দিই না। তোর মা বলে, আমার নাকি ফিলিংস নাই।

আম্মু তোমার অনেক কিছু বুঝতে পারেনি। তুমি ভীষণ চাপা স্বভাবের। তোমার কষ্টের কথা, দুঃখের কথা কাউকে বুঝতে দাও না।

আম্মুর মতো তুমি কথায় কথায় কেঁদে উঠতে পার না। অথচ আমি জানি, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সারাদিন কেবিনে রেখে আমাকে যখন রাত দশটার দিকে ওরা আইসিইউতে নিয়ে গেল…

আমার মাথার ওপর তখন পুরো আকাশটা ভেঙে পড়েছিল।

তোমার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। তুমি সবার থেকে বারবার আলাদা হয়ে যাচ্ছিলে। লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের পানি মুছছিলে। পুরো করিডোরে আত্মীয়স্বজন, আমার ক্লাসমেটরা। ওরা সবাই দল বেঁধে কয়েকটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে জাহাঙ্গিরনগর থেকে চলে এসেছিল।

দূর্বা আবার চুপ হয়ে গেল। জামাল আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন মেয়ের চোখ ছলছল করছে।

বাবা ?

বল মা।

আমি কিন্তু তখনও কল্পনা করতে পারিনি, আমি তোমাদের ছেড়ে চলে যাব। জানো, আমার কোন ভয় হচ্ছিল না। তখন ব্যথাটা কমে এসেছে। ভেবেছিলাম, কিছু টুকটাক টেস্ট করে আবার আমাকে কেবিনে নিয়ে যাবে। ওরা আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় বলেছিল, রাতটা রেখে পরদিন দুপুরে ছেড়ে দেবে।

আমি সেটা বিশ্বাস করেছিলাম, মা। কিন্তু তোকে যখন আইসিইউতে নিয়ে গেল, তারপর দু’বার সিটিস্ক্যান করল, আমি ঘাবড়ে গেলাম। সামান্য পেটব্যথার জন্য তো এসবের প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া তুই বরাবর সুস্থ। তোর এনার্জি দেখে আমি অবাক হতাম। তখন তুই হলে সিট পাসনি। রেগুলার ইউনিভার্সিটির বাস মিস করিস বলে লোকাল বাসে করে জাহাঙ্গিরনগরে যেতি। আমিনবাজার ক্রস করার পর প্রায় পনেরো-বিশ মিনিট বাসটা যেত বালুর ভেতর দিয়ে। চারদিক অন্ধকার করে আসা বালু। ড্রেজার দিয়ে তোলা তুরাগের বালু। সেই বালুর অত্যাচার তুই দিনের পর দিন চোখ বুজে সয়ে গেছিস।

বাবা, আমার কিন্তু খুব অসুবিধা হতো না। মুখে মাসক পরে ওড়নায় পুরো শরীর ঢেকে বসতাম।

না, মা। আমি যেদিন পুরো ব্যাপারটা শুনলাম, মনে হলো পরদিনই তোকে ওই ইউনিভার্সিটি থেকে নাম কাটিয়ে নিয়ে আসি। মনে হয়েছিল এই বালুই একদিন তোর কাল হবে।

বাবা, আমি কিন্তু ওটাকে খুব বেশি পাত্তা দিইনি। কারণ ইউনিভার্সিটির আরও অনেক মেয়ে ঐ বালুর ভেতর দিয়ে রোজ যাওয়া-আসা করে।

কিন্তু বাইরে থেকে তোকে স্ট্রং দেখালেও তুই অনেক উইক হয়ে পড়েছিলি। স্কিন ঠিক রাখার জন্য ডাক্তার তোকে একটা ওষুধ দিয়েছিল না ? সেটা তুই খেয়েছিলি মাসের পর মাস।

হ্যাঁ, বাবা। ওই ওষুধটা আমার সব এনার্জি খেয়ে ফেলেছিল। শেষদিকে আমার খুব উইক লাগত।

তারপর হসপিটালে একের পর এক টেস্ট, আইসিইউ, লিউকোমিয়া, প্যাংক্রিয়াটাইটিস। অল বোগাস। ভুল ডায়াগনোসিস। ভুল চিকিৎসা। আপন মনে বললেন জামাল।

আইউসিইউতে তোর অসহায় চোখ দুটো দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠেছিল। তোর মা তখন বাইরে একটা চেয়ারে বসে জোরে জোরে কাঁদছে। আমি ওখানে থাকতে পারলাম না। সবার চোখ এড়িয়ে এক ফাঁকে চলে এলাম রাস্তায়। তারপর অন্ধকারে একটা গাছের নিচে মাটিতে বসে রইলাম হতভম্বের মতো। আমি কি আমার মা-মণিকে শেষবারের মতো দেখে এলাম ? কান্নার তোড় ঠেকাতে পারলাম না। হাউমাউ করে কাঁদলাম অনেকক্ষণ। আমার তখন হিতাহিত জ্ঞান ছিল না। কথাগুলো কার উদ্দেশে বললেন, জামাল বুঝলেন না।

আমার তখন খালি ঘুম পাচ্ছিল। আশপাশের মুখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিল।

নিশ্চয় ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে তোর খুব পানি-পিপাসা লেগেছিল। হয়তো নার্সদের বলার চেষ্টাও করেছিলি। কিন্তু পারিসনি। দৃশ্যটা ভেবে আমি এখনও কাঁদি। কী ভীষণ কষ্ট।

না, বাবা। আমার তেষ্টা পায়নি। কারণ কী জানি না।

এক ঝাঁক অচেনা পাখি কলরব করতে করতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। মাথা পেছনে এলিয়ে খুব মন দিয়ে পাখিগুলোকে দেখল দূর্বা। এগুলো কী পাখি বাবা ?

বুঝতে পারছি না, মা। পাখিগুলোকে মনোযোগ দিয়ে দেখে জামাল বললেন, এখন তো দেশে দেশে পুরো গরম। হয়তো কোনও দেশে এখনও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা।

তা হতে পারে। নেচার উল্টা-পাল্টা হয়ে যাচ্ছে। মাইগ্রেটরি পাখিদের মুভমেন্টও পাল্টে যাচ্ছে।

আচ্ছা বাবা, ভোরবেলা তুমি এখনও টুনটুনির মতো দেখতে পাখিটার ডাক শুনতে পাও ? আমাদের আজিমপুরের বাসার পাশে নিমগাছের ডালে বসে খুব ভোরে ডাকত। কী মধুর ডাক। আমি রোজ শুনতাম।

না রে মা, আমার এখনকার বাসার জানালার পাশে একটা আমগাছ আছে, বেশ পুরোনো। ওখানে ভোরবেলা প্রচুর চড়ুই পাখি আসে। ডাকে অনেকক্ষণ। কিন্তু ওরকম মিষ্টি গলার কোনও পাখি ডাকে না।

কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গেল দূর্বা। দৃষ্টি নদীর ওপারে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা-ছাওয়া ভারতীয় পাহাড়গুলোর দিকে।

কী দেখছিস ?

কিছু না বাবা। ভাবছিলাম, আমাদের ঐ পাখিটার মতো পাখি ইন্ডিয়ান পাহাড়ে থাকতে পারে।

কিন্তু আমরা তো দেখেছি ঢাকা শহরে।

বাবা, পাখির বর্ডার নেই। মৌলভিবাজারেও থাকতে পারে। হয়তো ওপার থেকে উড়ে আসে।

হতে পারে।

বাবা, হয়তো ওরকম একটা পাখির ডাক তুমি শুনতে পাবে একদিন না একদিন। কিন্তু আমি ?

মাথা নিচু করে থাকেন জামাল। কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়তে থাকে।

বাবা ?

বল, মা।

তোমার অনেক কষ্ট। ছোটবেলা থেকে তুমি কষ্ট পেয়ে আসছ। আমি সেসব জানি। তুমিই আমাকে আবেগের বশে একদিন সব বলেছ।

ওসব কিছুই না। তুই যতদিন ছিলি আমার জীবনে, আমি সব ভুলে ছিলাম। আমার একেক সময় মনে হতো, আমার মতো সুখী মানুষ পৃথিবীতে নাই। কী থেকে কী হয়ে গেল! মাত্র দুদিনে আমার সব ছারখার হয়ে গেল। আমি খুব অভাগা রে। আম্মা চলে গেল যখন আমার বয়স ছয় কি সাত। সেই কবেকার কথা। তুই যখন বড় হতে লাগলি, তোর চেহারায় আম্মার আদল ফুটে উঠতে লাগল। তোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার ঘোর এসে যেত। আমার মা বোধ হয় ছোটবেলায় দেখতে এরকম ছিলেন। আসলেই তাই। তুই পৃথিবীতে এলি আমার মায়ের আদল নিয়ে।

বাবা, তুমি বলেছিলে আমাকে দাদির সব গল্প শোনাবে। অনেক শুনিয়েছ। কিন্তু আমি আরও শুনতে চেয়েছিলাম।

সব শোনাতাম, মা। কিন্তু সময় পেলাম কই ? তুই দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেলি। ভর্তি হলি ইউনিভার্সিটিতে। তোকে তোর দাদির গল্প বলতে চেয়েছিলাম। শোনাবার সময় করতে পারিনি। ভেবেছিলাম অফিস থেকে দিন পনেরো ছুটি নিয়ে দার্জিলিং যাব। বহুদিন আমরা পুরো ফ্যামিলি এসসঙ্গে ঢাকার বাইরে যাইনি।

ভাইয়া তো আমাদের সঙ্গে গিয়েছে মাত্র একবার। তখন স্কুলে পড়ে।

এবার সে-ও থাকত। দু’হাজার উনিশেই যাওয়ার প্রোগ্রাম করেছিলাম। তোর ফাইনাল পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই যেতাম। তখন ঢাকা-দার্জিলিং বাস সার্ভিসটা মাত্র শুরু হয়েছে। তুই কলকাতা যেতে চেয়েছিলি। তোর মা এবং ভাই কখনও কলকাতা যায়নি। কলকাতা থেকে ঢাকা ফিরতাম প্লেনে।

বাবা, তুমি কিন্তু এসব আমাকে বলোনি। বলতাম মা। সবই বলতাম। তোর সামনে টিকিটগুলো রেখে সাপ্রাইজ দিয়ে বলতাম।

একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল দূর্বা।

বাবা, একদিন গভীর রাতে তোমার বাংলোতে যাব। তুমি ভয় পাবে না তো ?

কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকলেন জামাল।

সত্যি বলছিস ? তুই আসতে পারবি ?

দ্যাখই না।

সামান্য দূরে একটা ডিঙি নৌকা ঝোরার দুটো পাথরখণ্ডের মাঝখানে আটকে গেছে। যে দুজন নৌকায় ছিল, ওরা ওটা ছাড়াবার জন্য খুব চেষ্টা করছে। এ দৃশ্য জামালের চেনা। প্রায়ই এরকম হয়। অনেক সময় জোরে ধাক্কা লাগলে নৌকা ভেঙে যায়। তখন হয় বিপদ। মহিলা বা শিশু থাকলে দুর্ভোগের সীমা থাকে না।

অনেকক্ষণ ধরে দূর্বা কথা বলছে না। ডানদিকে তাকালেন জামাল হায়দার চৌধুরী। পাথরটা খালি। মেয়ে নাই ওখানে। নিশ্চয় পানিতে পড়ে গেছে। হুড়মুড় করে নিজের জায়গা থেকে নেমে এলেন জামাল। এখানে কোমর পানি। ‘দূর্বা, দূর্বা’ চীৎকার করে খালি পাথরখণ্ডটার কাছে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকালেন। তারপর ডুব দিয়ে পানির ভেতর উল্টো-পাল্টা হাতড়াতে লাগলেন। পানির নিচেও অনেক ছোটবড় পাথর। ডুব-সাঁতার দেওয়া যায় না। পাথরে তার মাথা ঠুকে গেল কয়েকবার। সেদিকে জামালের ভ্রƒক্ষেপ নেই। হয়তো মাথা ফেটে গিয়ে রক্তও বেরোচ্ছে।  এক দমে বেশ কিছুদূর সাঁতরে মাথা তুললেন। নদীতে বা নদীর পাড়ে কেউ নেই। মেঘ কেটে গিয়ে চড়া রোদ উঠেছে। জামাল টের পেলেন তাঁর কপাল, ঘাড় বেয়ে রক্তের ধারা নেমে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ তিনি পানিতে দাঁড়িয়ে রইলেন। কোথাও নেই দূর্বা। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

দুই.

কিছু না বলে নিঃশব্দে চলে গেছে দূর্বা। জামালের বিশ্বাস, মেয়ে আবার আসবে। হয়তো তাঁর এই বাংলোতেই হাওয়া ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে গভীর রাতে তাঁকে চম্কে দেবে। বেশ ক’দিন কেটে  গেছে। বাসাটাকে সাফসুতরো করেছেন জামাল। লেখার টেবিল এবং বইয়ের শেলফটা গুছিয়েছেন। বারান্দার টবগুলোতে কিছু ফুলগাছ অযত্নে, অবহেলায় মরে ছিল। একদিন জামাল খেয়াল করলেন, বেশ সতেজ হয়ে জেগে উঠেছে গাছগুলো। একটায় আবার ফুল ফুটেছে। এক ভোরে, তখনও অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি, শুনলেন তার বেডরুমের জানালা-লাগোয়া আম গাছটায় হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট পাখিটা ডাকছে। সেই সুরেলা ডাক। যেন পাখিটা থেমে থেমে শিস দিয়ে যাচ্ছে। তিনি নাম দিয়েছিলেন মৌটুসি। হয়তো অন্য কোনও নামের পাখি। কিন্তু বাবা-মেয়ে দুজনের কাছেই পাখিটা ছিল মৌটুসি।

রোজ ভোরে অনেকক্ষণ ধরে ডাকে পাখিটা। তারপর আলো ফোটার পর চুপ হয়ে যায়। জামাল ধারণা করেন, পাখিটা তখন আর গাছে নেই। উড়ে গেছে। ঢাকার বাসায়ও এরকম হতো। গভীর রাতে মেয়ের অপেক্ষায় জামাল নিষ্ফল জেগে থাকেন। দূর্বা আসে না। জেগে থাকতে থাকতে এক সময় ঘুমে ঢলে পড়েন। তারপর জাগেন পাখিটার ডাকে। আবার শুয়ে পড়েন। ঘুমান বেলা দশটা-এগারোটা পর্যন্ত।

একদিন ঘুমঘুম চোখেই জামাল চলে এলেন ঝোরাটার পাড়ে। তখন সকাল। রোদের আঁচ বাড়ছে। দূর থেকে দেখলেন গোলাকার, মসৃণ পাথরটাকে―তাঁর প্রিয় জায়গা। ঝোরার মাঝখানে এই বাদামি রঙের পাথরটাতেই গিয়ে বসেন তিনি। তাঁর প্যান্ট ভিজে যায়। হাঁটু পানি, কোমরপানি ভেঙে ওখানে যেতে হয়। এভাবেই পাথরখণ্ডটার কাছে গিয়ে পৌঁছান তিনি। পানি ভেঙে যেতে তাঁর ভালো লাগে। রোদ থাকলে গরমে প্যান্ট দ্রুত শুকিয়ে যায়। নইলে আধ-ভেজা কাপড়েই বসে থাকেন। আজ পুরো নদী সুনসান। নির্জন পাড়। হয়তো একটু পর পাহাড়ি তরুণীরা নাইতে আসবে। পানি ছিটাবে একে অপরের গায়ে। হাসি আর কোলাহলে ওদের প্রিয় ঘাটটা মাতিয়ে তুলবে। সেদিন দূর্বা তাঁর পাশে থাকা যে-পাথরটায় এসে বসেছিল, সেটা খালি। নদীতে নেমে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন জামাল। এপার থেকেই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে প্যান্ট-শার্ট পরা দুই বিদেশি তরুণ ইন্ডিয়ান বর্ডারের কাছে হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনের কাঁধের পেছনে ক্যানভাসের ট্রাভেলব্যাগ। চোখে সানগ্লাস। জামাল বুঝতে পারলেন, তরুণ দুজন বিএসএফ-এর জওয়ানদের ওপারে ওঠার  অনুমতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছে। ওরা আঙুল দিয়ে পাহাড় দেখাচ্ছে। ইউনিফর্ম পরা, কাঁধে রাইফেল, এক জওয়ান হাত তুলে ওদের চলে যেতে বলছে, তরুণ দু’জন নড়ে না। অযথাই ওরা দাঁড়িয়ে আছে। এপারের স্থানীয়দেরই ওখানে যেতে দেয় না। আর ওরা সাদা চামড়ার বিদেশি।

নিজের জায়গার দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন জামাল। মাথা নিচু করে তিনি ছোট-বড় পাথর বাঁচিয়ে হাঁটছিলেন। প্যান্টের নিচের অংশ ধীরে ধীরে ভিজে যাচ্ছে। আজ কেন জানি স্রোতের তোড়ে টাল সামলাতে পারছেন না জামাল। রাতে একেবারেই ঘুম হয়নি। সেজন্য হতে পারে। শরীর দুর্বল লাগছে। হঠাৎ জামালের চোখ পড়ল সেই পাথরটার ওপর। এ কি! অবিকল সেদিনের ভঙ্গিতে দূর্বা পাথরটা থেকে নিচের দিকে পা ঝুলিয়ে দিয়ে বসে আছে। মুখ নদীর পাড়ের দিকে ফেরান। পানির ভেতর দিয়ে আছড়ে-পিছড়ে সেদিকে ছুটলেন জামাল। রোদ তেতে উঠছে। পানি ভেঙে তিনি হাঁটছেন, অথচ ঘামে শার্ট ভিজে গেছে। পানির নিচে একটা পাথরে জোরে পা লেগে যাওয়ার ফলে টাল সামলাতে না পেরে কাৎ হয়ে পড়ে গেলেন জামাল। পুরো শরীর ডুবে গেল। অনেক কষ্টে মাথা তুললেন, তারপর দাঁড়ালেন।

পাথরটার ওপর দূর্বা নেই। মেয়ের নাম ধরে জামাল চিৎকার করে ডাকলেন। নিঃশব্দ চারদিক। ছুটে-চলা ঝোরার পানি কলকল বয়ে চলেছে। আর কোনও শব্দ নেই। বসার জায়গাটার কাছে জামাল পৌঁছালেন অনেক কষ্টে। পা চলছিল না। একটা অচেনা সৌরভে জায়গাটা ম-ম করছে। পাথরটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন জামাল। টপটপ করে তাঁর অশ্রু ঝরছে। দুহাতে মুখ ঢেকে শিশুর মতো তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন।

 লেখক : কবি ও কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ                            

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares