গল্প : বিমানে দেখা সুন্দরীর সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে : দিলওয়ার হাসান

আমার পঠিত এক ছোটগল্পের নায়ক প্যারি থেকে নিউইয়র্ক যাচ্ছিল। প্রবল তুষার ঝড়ের কারণে সময়মতো ছাড়তে পারেনি বিমান। সেই নায়ক বিমানবন্দরের প্রতীক্ষালয়ে দারুণ এক সুন্দরীর দেখা পেয়েছিল। স্মার্টও ছিল সুন্দরীটি। কোমল মোলায়েম ত্বকের অধিকারী। মাখনের মতো গায়ের রঙ। চোখ কাঁচা আখরোটের মতো সবুজ। কাঁচা আখরোট আমি দেখিনি। তবে কল্পনা করতে পারি তা আমার নিত্য দেখা কচি লেবুর মতো ছিল।

কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়েছে কালো এলোমেলো শিরোরুহ। কাব্য করে বললে কুন্তল বা কেশ। তাকে ঘিরে আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশের মতো মধ্যযুগীয় আবহ। অদ্ভুত একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

মেয়েটি পরেছে চামড়ার জ্যাকেট। গায়ের সিল্কের জামায় হালকা ফুলের নকশার ছাপ আর দুধ-সাদা ট্রাউজার। জুতোয় বোগেনভিলা ফুলের রঙের সরু ডোরা দাগ―নায়কের দেখা সেরা সুন্দরী। ভাগ্য প্রসন্ন ছিল তার। প্রিয় ওই সুন্দরীর পাশেই পড়েছিল তার আসনটি।

নিজের আসনে বসেই সেই সুন্দরী সবকিছু এমনভাবে গোছগাছ করে নিল যেন অনেকদিন থাকবে এখানে। বিমানবালা ওয়েলকাম ড্রিকংস্ পরিবেশন করতে এলে সে মানা করল। এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি হলেই তার চলবে। বিমানবালা পানি নিয়ে ফিরে এলে সে প্রথমে অবোধ্য ফরাসিতে ও পরে কিছুটা বোঝা যায় এমন ইংরেজিতে বলল, পুরো বিমানে ভ্রমণে তাকে যেন কোনও মতেই জাগিয়ে তোলা না হয়। এ কথা বলার পর সে তার বাক্স খুলে সোনালি দুটো বড়ি বের করে সযত্নে সেবন করল, ছোট্ট জানালার কাচ নামল, পর্দা টেনে দিল, কম্বলটা জড়িয়ে  নিল কোমর অবধি। চোখে লাগাল স্লিপিং মাস্ক। অতঃপর নায়কের দিকে পেছন ফিরে নিদ্রার ভেতরে চলে গেল। পা থেকে জুতো জোড়া পর্যন্ত খুলল না। বোঝা গেল এই সুন্দরী দারুণ এক উড়নপেকে ট্রাভেলার।

প্যারি থেকে নিউইয়র্ক পৌঁছুতে আট ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে একবারও সে পাশ ফিরে শোয়নি। তার শ্বাস প্রশ্বাস ছাড়বার শব্দটুকু পর্যন্ত শোনা যায়নি।

সফরটা নায়কের জন্যে উত্তেজনাপূর্ণই ছিল বলা যায়। তার বিশ্বাস―প্রকৃতিতে সুন্দরী নারীই সব চেয়ে সুন্দর। পাশে শুয়ে আঘোরে ঘুমাচ্ছে যে-মেয়েটি, তার কাছ থেকে মুহূর্তের জন্য নিজেকে সরিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। বিমান যাত্রার শেষ ক’টি মুহূর্তে সে মেয়েটিকে জাগ্রত অবস্থায় দেখবার বাসনা পোষণ করেছিল। রেগে আগুন হয়ে গেলে তাকে দেখতে কেমন লাগে তা-ও প্রত্যক্ষ করবার জন্যে প্রস্তুত  ছিল সে। বিমান অবতরণের সংকেত জ্বলে উঠতেই জেগে উঠেছিল মেয়েটি। তাকে এত সুন্দর আর সতেজ লাগছিল যে, মনে হচ্ছিল এতক্ষণ কোনও গোলাপ বাগিচায় পড়ে পড়ে নিদ্রা যাচ্ছিল। শুভ সকাল বলা দূরে থাক। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে চলে যাওয়ার সময় শুভবিদায় বা ধন্যবাদ পর্যন্ত জানাল না। স্প্যানিস টানে শুধু উচ্চারণ করল―মাফ করবেন। গল্পের নায়কের মনে হলো―মেয়েটা নিউইয়র্কের রৌদ্রস্নাত আমাজন জঙ্গলের ভেতর মিলিয়ে  গেল। …

ওই গল্পটা পড়ার পর যতবার আমি বিমানে ভ্রমণ করেছি ততবারই চেয়েছি ওই রকম এক সুন্দরীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটুক। তার আসন পড়ুক আমার ঠিক পাশে। তার শরীর থেকে নির্গমন করুক স্নিগ্ধ এক সুরভি যা আমাকে নিমজ্জিত করবে সমুদ্রের নীল জলে। তার সুন্দর দুটি চোখ মেলে ধরুক আমার দিকে। দীর্ঘযাত্রায় এক ফোঁটাও ঘুমাবে না সে―আমার সঙ্গে গল্প করবে হেসে হেসে। ওয়েলকাম ড্রিংক্স এলে গ্লাস বাড়িয়ে ঠোকাঠুকি করবে। চিয়ার্স ব’লে গ্লাসে ছোঁয়াবে দুটুকরো চিলতে ঠোঁট। আমি আরও কয়েক পেগ হুইস্কি কিংবা রাম (আমার সবচেয়ে প্রিয় মদ্যপানীয়) চেয়ে নেব। একটুখানি নেশা হবে আমার। সেই নেশা-ধরা চোখে তার দিকে তাকাব। পরখ করব কী রঙ তার চোখের, সবুজ নয়তো ? না, সবুজ রঙের চোখ প্রিয় নয় আমার। চোখের রঙ  হিসেবে আমার পছন্দ চিরকালের ভোম্রা-কালো।

বারোয়ারি কোনও ছাতার নিচে গিয়ে বসব না আমরা। ওগুলো পেরিয়ে অনেক  দূরে চলে যাব, যেখানে অন্য কেউ থাকবে না। তার পরনে থাকবে হালকা নীলের বুটিদার জামদানি। নানান বিষয়ে আলাপ হবে তার সঙ্গে। তবে ধর্ম ও রাজনীতি আসবে না সেখানে―দুটোই কন্ট্রোভার্সিয়াল, যে কোনও সময় তর্কাতর্কি লেগে  সময় খচে যেতে পারে। সাহিত্য-শিল্প, সঙ্গীত-নৃত্যকলা, ভ্রমণ, বইপত্র, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, সেক্স, জীবনানন্দ, বনলতা সেন― সিংহল সমুদ্র থেকে মলয় সাগরে কঙ্কাবতী, কঙ্কাবতী গো, নতুন ননীর মতো তণুতব আর্ট মাস্ট নট কনসেন্ট্রেটেড ইন ডেড শ্রইন্স কল্ড মিউজিয়াম―মায়াকোভস্কি। দিস পোয়েট কমিটেড স্যুইসাইড আফটার আ ডিসপুট উইথ পোলোনোস্কা, উইথ হুম শি ছ্যাড আ ব্রিফ বাট আনস্টেবল রোমান্স। চার্লস বুকোওয়াস্কি কিংবা জালালউদ্দিন রুমি নিয়েও আলাপ হতে পারে। কিংবা কনটেম্পোরারি সিনেমাস―দ্য সিক্রেট ইন দেয়ার আইজ, সোস্ট রাইটার, ফ্লাওয়ার্স অব ওয়ার, দ্য লিজেন্ড অব টোমিরিস, হোয়াইট মিডোস, মিসিং …

আমরা হয়তো হেঁটে হেঁটে অনেকটা দূরে চলে যাব। আমাদের মধ্যে গড়ে উঠবে নিবিড় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। একে অপরের খুব কাছে চলে যাব আমরা।

কক্সবাজারগামী বিমানে উঠে আজও এসব কথা মনে হচ্ছিল। বিমানে কক্সবাজার কাছের জায়গা। ঘণ্টাখানেকেরও কম সময় লাগে। উড্ডয়নের জন্যে বিমান প্রস্তুত। জানালার পাশের সিটে বাসে বাইরের ধূধূ সোনালি দুপুর দেখছিলাম। পাশের আসন তখনও শূন্য। এ রুটে কদাচ সিট খালি থাকে। হয়তো ট্রাফিক জ্যামে পড়ে ফ্লাইট মিস্ করতে যাচ্ছে কেউ। এখনই উড়াল দেওয়ার ঘোষণা ভেসে আসবে মাইক্রোফোনে। তখনই হাইহিল স্যান্ডেলের খট্খট্ শব্দ উড্ডয়ন-উন্মুখ বিমানটিকে বেশ খানিকটা হকচকিয়ে দিল। ততক্ষণে বেল্ট বাঁধার পরামর্শও ঘোষিত হয়ে গেছে।

একটা মেয়ে আমার পাশের খালি আসনটায় এসে বসল। একেবারে ধীরেসুস্থে। মনেই হলো না সে এই বিমানের শেষ আরোহণকারী। একটা মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল। ওর হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ গোছের কিছু নেই। সাদা সূতোয় কাজ করা একটা ফিনফিনে শার্ট গায়ে। মেয়েলি ধাঁচের শার্ট। পরেছে ফেড জিন্স। হাঁটুর কাছে ফেঁসে-যাওয়া―আকজাল এ রকমই পরে সবাই।

‘বেল্টটা একটু বেঁধে দেবেন ?

তাকাতে হলো। চোখে হালকা গোল রিমের চশমা। পুরোনো ডিজাইন নতুন হয়ে ফিরে এসেছে। ডিজাইন আসলে নতুন হয়  না। নতুনটা বাতিল হয়ে পুরনো হয়, সেটি-ই আবার নতুন হয়ে ফিরে আসে।

বেল্ট লাগাতে গিয়ে ওর মধ্যপ্রদেশে ছোঁয়া লেগে গেল একটুখানি। মেদ নেই। মসৃণ। যুবতীদের যেরকম  থাকে। তখন বাঁধভাঙা কল্পনার রাজ্যে ভাসতে লাগলাম। কিন্তু এর পরনে তো নীর জামদানি নেই ?

‘বেড়াতে যাচ্ছেন, না কাজে ?’ জিজ্ঞেস করলাম। ইংরেজরা যেমন ভ্রমণ সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করে―অধিক দূরে যাইবেন কি ? সেই রকম আরকি। এমনি যাচ্ছি, ‘বলল সে।’

খাবারের ক্যারিয়ার ঠেলে নিয়ে বিমানবালা এলেন। এদের পরিবেশিত এইসব খাদ্য সামগ্রী খুবই বিরক্তিকর লাগে আমার―সাধারণত এক পিস কেক, একটা শুকনো বার্গার, কাটা বিস্কিট আর দুটো টক লেবনচুষ। লজেন্স জিনিসটা ছোটোবেলায় প্রিয় ছিল আমার। হাফপ্যান্টের পকেটে সব সময় থাকত। নাবিস্কোরই বেশি হতো। একটা ছিল খুব পাতলা নারকেল দেওয়া।

সব সময় ফিরিয়ে দিই। আজ নিলাম। খানিকটা খিদে ছিল। মচমচে সেলোফিন পেপারে মোড়া কেকটা খুলছিলাম। মেয়েটা বলল, ‘আমাকে দিন খুলে দিই। হাসলাম। খুব যত্ন করে খাচ্ছিল। প্রায় নিঃশব্দে। আঙুলগুলো সরু। ফরসা। বড়  খোঁপা দেখে বোঝা যায় মাথায় অনেক চুল। আজকাল অবশ্য আর্টিফিশিয়ালও হয়। সে একা-একা সমুদ্দুরে যাচ্ছে তা-ও আবার এই চৈতি খরায়। আমি যাচ্ছি একটা অফিসিয়াল কানফারেন্সে। এ রকম খাবারের পর আমার চায়ের তেষ্টা পায়। এরা চা পরিবেশন করে না। জানি হোটেলে পৌঁছুতেÑপৌঁছুতে এই তেষ্টা আর থাকবে না। গোসল করে গুছিয়ে বসলেই ভাতের খিদে পাবে।

এর ভেতরেই অবতরণের ঘোষণা। জানালা দিয়ে তাকিয়ে কক্সবাজারের আশপাশের এলাকার অস্পষ্ট একটা আভাস পেলাম। সহযাত্রী আনমনে তাকিয়ে আছে জানালা দিয়ে। বাম হাত বাম গালে স্থাপিত। উদাসীন। একটু পরে নদনদী, নৌকা, গাছপালা, ঘরবাড়ি জমিন আর খুদে খুদে মানুষের ছবি ভেসে উঠল। ক্লান্ত ঈগলের মতো ধীরে ধীরে নেমে আসছে বিমানটা ডানায় ভর দিয়ে।

ল্যান্ডিংটা স্মুদ হলো না। ভূমি স্পর্শ করতেই কেঁপে উঠল। যাত্রীদের মধ্যে দ্রুত নেমে যাওয়ার ব্যাকুলতা―সমুদ্র ডাকছে তাদের। সংকেত-বাতি জ্বলে উঠতেই উঠে দাঁড়াল মেয়েটা। বলল, ‘আসি তাহলে।’ ভেবে রেখেছিলাম আমার একটা ভিজিটিং কার্ড ওকে দেব। ভুলে গেলাম। সে উঠে যাওয়ার পর ফাঁকা সিটটা থেকে হালকা গরম একটা হাওয়া বেরুল। একটা শূন্যতা কয়েক সেকেন্ড হাঁ করে থাকার পর আমি মাথার ওপরের লাগেজবক্স থেকে হাতব্যাগটা পেড়ে নিলাম।

লাগেজ নিতে গিয়ে দেখলাম মেয়েটা ধীর পায়ে চলে যাচ্ছে। খালি হাত। বাইরে এলাম। আমার জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল। মেয়েটা ততক্ষণে চলে গেছে।

পনেরো মিনিটের মধ্যে হোটেলে চেকইন করতে আমার চায়ের তেষ্টা ফিরে এল। ইন্টারকমে অর্ডার দিয়ে লাঞ্চের মেনুটাও বলে দিলাম―প্লেইন রাইস, চিড়িং ভর্তা, মাখা মাখা ঝোলের রূপচাঁদা আর ঘনডাল।

স্নান করে ভাত খেলাম। রান্না সুস্বাদু ছিল। একটা  সিগারেট ধরিয়ে জানালা খুলে দিলাম। সমুদ্র বেশ দূরে। সমুদ্র দূর থেকে দেখতে ভালোলাগে না আমার। দূর থেকে ভালোলাগে পাহাড়। সমুদ্রের কাছে গেলে তার অস্তিত্ব অনুভব করি। জুতো-স্যান্ডেল খুলে দু-পা ডুবিয়ে দিলে সমুদ্র আমার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কী শীতল জল! সেই শীতলতা মনের গভীর অতলান্তস্পর্শ  করে, সেখানে কোনও কারণে উথাল পাথাল থাকলে তা প্রশমিত হয়।

বাড়ির বাইরে কোথাও গেলে বিশ্রাম নিতে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়তে চাই আমি; কিন্তু সহজে ঘুম আসে না। তখন বইটাই পড়তে হয়। আমার ট্রাভেল-ব্যাগে একটা দুটো পেপারব্যাক থাকে। একটা বই পেলাম, সমুদ্র নিয়ে একটা গল্প আছে ওখানে। নামটা সমুদ্র হলেও সমুদ্দুর খুব একটা নেই ওখানে―অদ্ভুত একটা লোকের চরিত্রায়ণ। শেষাবধি করুণা জাগে তার জন্যে। সমুদ্রের মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে নিটোল ঘুমের ভেতর দিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে লোকটা। অথচ রাতে সে ঘুমাতে পারেনি। ঘুমাতে চায়ওনি সে। দু-তিনবার তার চোখের পাতা জড়িয়ে এসেছিল। জোর করে চোখ খুলে রেখেছিল। তাতে ফল হয়েছে। ঘুম আর আসেনি। জেগে থেকে রাত্রির ভয়ঙ্কর শব্দ শুনেছে, অন্ধকারের গর্জন। যেন অন্ধকারের চাদর মুড়ি দিয়ে একটা মেঘ দূরে কোথাও মাটির কাছে নেমে সারাক্ষণ গুরুগুরু করে ডাকছিল। …

আমার কিন্তু ঘুম এসে গিয়েছিল পড়তে-পড়তে। গভীর ঘুম। একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। বিমানে যে মেয়েটা আমার পাশে বসেছিল, তার সঙ্গে সবুজ একটা মাঠের ওপর খালি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি। মেয়েটা ছাইরঙের একটা জামদানি আর কালো ব্লাউজ পড়েছে। খালি পা। আমি তার হাত ধরতে গেলে সে হেসে দূরে চলে যাচ্ছিল। …

রিংটোন হিসেবে আমার মোবাইল ফোনে একটা ক্লাসিক্যাল ভায়োলিনের বাজনা দেওয়া আছে। সেই বাজনা ক্রমাগত বাজছে। কিন্তু ফোন ধরছি না আমি। মনে হচ্ছিল ফোন আসেনি―সঙ্গীত ধ্বনিত হচ্ছে কোথাও থেকে। সেই সঙ্গীত আমাকে  জাগিয়ে দিলে মনে হলো আমার ফোনই বাজছে। ধরলাম। একটা নারীকণ্ঠ বলছে―সন্ধ্যায় পালঙ্গীর বিচে চলে এসো। বিমানে দেখা মেয়েটার গলা―তুমি করে বলছে।

বললাম, ‘পালঙ্গীর বিচ তো আমি চিনিনে।’

‘তুমি যে-বিচ চেন সেই বিচে এসো। আমি তোমাকে খুঁজে নেব।’ লাইন কেটে দিল। ফোন নয় যেন সামনে বসে কথা বলছিল।

বিকেলের ছায়া ক্রমেই গভীর হয়ে আসছে―ছায়া ঘনাইছে বনে বনে, …

ওয়াশরুম থেকে ফিরে সাদা টিশার্ট, ঘননীল জিন্সের প্যান্ট আর কেড্স পরে বেরিয়ে পড়লাম। হেঁটে-হেঁটে বিচে পৌঁছে গেলাম। একটা টুকটুকে সিঁদুরে আম ঝুপ করে সমুদ্রে পড়ে গেল। অপরূপ এক সন্ধ্যা নেমেছে সৈকতে। কিন্তু বিপুল জনসমাগম আর কোলাহল সমস্ত সৌন্দর্য নসাৎ করে দিচ্ছে। বিক্ষুব্ধ সমুদ্র তার রাগী ঢেউগুলো পাঠাচ্ছে পাড়ে―ফেনিল তরঙ্গরাশি ধুয়ে দিচ্ছে বালি আর মাটির উপকূল।

‘এই আমি এখানে।’

তার পরনে ছাইরঙের জামদানি। কালো ব্লাউজ। স্বপ্নে যেরকম দেখেছিলাম। অবাক হলাম না স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তব মিলে গেল বলে। স্বাভাবিকই মনে হলো।

‘চলো আমরা ওদিকে যাই―যেখানে কোনও মানুষ থাকবে না। একশ বিশ কিলোমিটার অবধি যাওয়া যাবে।’ অনেকটা পথ হাঁটার পর আমরা এতটাই নির্জনতার ভেতর চলে এলাম যে সমুদ্র, বালুচর আর ক’টা ঝাউগাছ ছাড়া কিছুই নেই এখানে। একটা গাছকে পেছনে রেখে বসে পড়লাম। নির্জনতা আমাকে উদাস করে। ঘন হয়ে পাশাপাশি বসার পর দেখলাম ওর পায়ে হাইহিল জুতোর বদলে নীল রঙের কেড্স। যে রঙটা আমার জিন্সের রঙের সঙ্গে মিলে গেছে।

আমি তার বামদিকে বসেছিলাম। সে তার বাম হাত আমার কাঁধে তুলে দিয়ে বলল, ‘আরও কাছে এসে বসো। জানি তুমি এই প্রথম কোনও মেয়ের এত কাছাকাছি এসেছ। তোমার হাত দাও―ধরব। তোমার হাত কেউ  ধরেনি। তুমি কোনও নারীর শরীর বা মনের এত কাছাকাছি যাওনি।

‘তুমি কাউকে বলনি―ভালোবাসি, ফলে কেউ তোমাকে বলেনি ভালোবাসি। এই ব্যাপারটা একতরফা বা এক পাক্ষিক নয়, দ্বিপাক্ষিক। তোমার চুম্বনে কম্পিত হয়নি কোনও নারী। ফলে শুষ্ক তোমার ঠোঁট, যেখানে এরিন মোরের হালকা একটা সুবাস লেগে থাকে সব সময়―কোনও নারীর লিপিস্টিকস্নাত ঠোঁট স্পর্শ করেনি।

ছোঁয়াছুঁয়ির একটা সম্পর্ক তুমি কারও সঙ্গে গড়ে তুলতে পারনি। তোমার ব্যক্তিত্ব তোমাকে গড়তে দেয়নি। প্রত্যাখ্যাত হাওয়ার ভয়ে তুমি কাওকে ভালোবাসা জানাতে পারনি। অথচ তোমার ভেতর ভালোবাসার প্রবল তৃষ্ণা। ভালো চাকরি করছ, দামি গাড়িতে চড়ছ―দেশ-বিদেশে যাচ্ছ। একজন নারীকে কাছে না-পাওয়ার বেদনায় ভেঙেচুরে যাচ্ছ, তোমার শরীরে জেগে উঠছে কামনার আগুন―কোনওভাবেই নির্বাপিত হচ্ছে না।

‘এসো আমার আরও কাছে এসো। আমাকে জড়িয়ে ধরে তোমার শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে দাও। আমি তোমার ভেতর ডুবে যেতে চাই। তোমার হৃদয় মেলে ধর―খুলে  দাও। দাও আমার হাতে। হৃদয় না-খুললে তোমার হাত সরবে না, পা নড়বে না, ঠোঁট খুলবে না। তোমার মাথা কাজ করবে না।

‘এসো ঠোঁট দাও। আমি এরিনমোরের ঘ্রাণ নেব, আমার ঠোঁট দিয়ে শুষে নেব সেই ঘ্রাণ। তুমি নাও আমার ঠোঁট। ওখানে হালকা একটা ঘ্রাণ পাবে―স্বর্গের বাগানের অলৌকিক পুষ্পের সুঘ্রাণ। এসো তোমার গায়ের টিশার্টের দেয়াল খুলে দিই, তোমাকে পরিয়ে দিই সদ্যভূমিষ্ঠ আদমের পোশাক!’

তখনই আমি অনন্ত নিদ্রা থেকে জেগে উঠি। চোখ মেলে তাকাই পৃথিবীর দিকে। আহা পৃথিবী কত সুন্দর!

‘তোমার নাম কী ?’

‘নাম ? আমার কোনও নাম নেই। তুমি যা বলে ডাকবে তা-ই হবে আমার নাম!’

‘আচ্ছা তোমার নাম সাগরকান্তা। সাগরকান্তা মানে নদী। তুমি সমুদ্রের সঙ্গে মিলতে এখানে এসেছ। তাছাড়া তুমি সমুদ্রের মতো রহস্যময় আমার কাছে―এই যে এত বড় জলের আধার, কোথা থেকে এল কোথায় গেছে, কিছুই তো জানি না। যখনই তাকাই ওর দিকে বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। শূন্য হয়ে যায়।

‘আমার নামও তো তুমি জানো না ? কে আমি, কোথায়  বাড়ি, কোথায় ঘর, কী করি, বয়স কত ?’

সাগরকান্তা হাসল।

‘কী হবে এসব জেনে ?’

‘তুমি সমুদ্র। সমুদ্রের মতো কূলকিনারাহীন―গভীর, আমি থই পাইনে।’

তারপর আমার ওপরের অনন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ পরে কাব্য এল আমাদের মধ্যে :

আমি : একটি নেহাত যুবক এবং একটি কঁাঁচা মেয়ে ইচ্ছে-হাওয়ায় পাল খাটিয়ে নৌকাখানি বেয়ে মাটির বুকে পা ফেলে আজ এমন আত্মহারা ভয় ধরান ভীষণ কাছে বসল এসে তারা।

সাগরকান্তা: হা হা হাওয়ায় হঠাৎ কখন ঘনিয়ে এল রাত, অন্ধকারে নিবিড় সুখে ধরল তারা হাত, ডাইনে বাঁয়ে তীক্ষè তীর, বিঁধছে শীতের হাসি থরথরিয়ে কাঁপল তারা, বলল―ভালোবাসি।

আমি: আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দিল, বৃষ্টি ঢেলে জল, সেই ছবিটি মাটির পটে তেমনি অবিকল কৃষ্ণ-রাধার মতোন দোলে ইচ্ছে-হাওয়া পেয়ে একটি নেহাত যুবক এবং একটি কাঁচা মেয়ে সাগরকান্তা বলল আমি স্পেন দেশের একটা কবিতা জানি :

বৃষ্টির জলধারায় নিঃশ্বাস ফেলে তোমার চোখ আর সূর্য যখন ডুবে যায়, তোমার চিবুক বিকেলের মাধুর্যেও ভেজে না, তোমার কেশ প্রেম নিভিয়ে দেয় চাঁদের আলো। …

তখন প্রবল হাওয়া সমুদ্রে। সাগরকান্তার শাড়ি হাঁটুর ওপরে উঠে এল বাতাসের তোড়ে। নামিয়ে দিলাম। উদোম পা আগুন রাঙা। লোহা পোড়ালে যে-রঙ হয়।

তার মুখের দিকে তাকাই। গভীর হয়ে নেমে এসেছে রাত। সমুদ্রতট অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। আকাশ সরে গেছে অনেক দূরে। কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে দুরগুম দুরগুম দুরগুম দুরগুম―পেঁচা ডাকছে কাছের গাছ থেকে।

চাঁদ উঠল একটু পরে। ঝপঝপ ঝপঝপ তালে লক্ষ লক্ষ গাঙচিল উড়ে এল পাড়ে। তারপর আর তাদের কোনও সারাশব্দ পাওয়া গেল না। ঘুমিয়ে পড়েছে।

বললাম, ‘এবার তোমার কোলে মাথা রাখব। বিলি কেটে দেব তোমার রেশমি চুলে।’  এভাবেই গভীর হলো রাত।

সাগরকান্তা আমার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে আদর করছিল, চুমু খাচ্ছিল। বলছিল, ‘আমি অনেক দিন ধরে তোমাকে কাছে পেতে চেয়েছি, আদর করতে চেয়েছি। তোমার বুকটাকে মনে হচ্ছে জীবন্ত মরুভূমি। আমি তোমার বুকের বালির ওপর দিয়ে হাঁটছি―তোমার আদিগন্ত বালুর ওপর দিয়ে দৌড়ে যাব, তোমার বালুচরের দিকে, পার্কের দিকে, খাদের দিকে, নেচে নেচে ক্লান্ত হয়ে যাব। ঘুমিয়ে পড়ব, আর উঠব না। চিরনিদ্রায় ডুবে যাব।

সাগরকান্তা শুয়ে আছে সৌন্দর্যের গুহা খুলে। কমলা রঙের বাতাসে গন্ধকের ভারী ঝাঁঝাল ঘ্রাণ। আমি অচৈতন্যের ভেতর চলে গেলাম। তার শাড়ি খুলে ফালা ফালা করে ফেললাম। উড়িয়ে দিলাম বিত্রস্ত বাতাসে। সাগরকান্তাকে পাজাকোলা করে তুলে নিলাম। হাঁটতে লাগলাম কাছের ঝাউগাছটার দিকে। তখন দামাল বাতাসের দল ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর। সমুদ্রের গর্জন শুনতে পেলাম। সাগরকান্তাকে শুইয়ে দিলাম বালুর ওপর। এখানকার বালিগুলো তুলোর মতো নরম।

গাছটার মাথার ওপর চাঁদ ঝুলে আছে। সে, বলল, ‘আমার ঊষর বুকে এসো। ঠোঁটে ঠোঁট রাখো। আমি তোমার শরীর ঘেঁষে শুয়ে থাকতে চাই জীবনভর। ভালোবাসতে চাই―জীবনের সব সাধ আহ্লাদ শুধু তোমার সঙ্গে পূর্ণ করতে চাই।’…

তখন নিবিড় ঘুম থেকে উঠে পড়ে লক্ষ লক্ষ গাঙচিল। তারা পা টিপে টিপে এগিয়ে আসে। জ্যোৎস্নার সঙ্গে এদের রঙ মিলে গেছে বলে মনে হচ্ছে টুকরো টুকরো চাঁদ সমুদ্র সৈকতে ছড়িয়ে পড়েছে―ক্রায়া ক্রায়া ক্রায়া করে ডাকছে। এগুলোই কি সেই হাস্যরত গাঙচিল, আঙ্গুরিঠুটো, রিংবিল্ড গাল ? এটা কি ওদের ডিমপাড়ার মৌসুম ? কী সুন্দরই না লাগছে!

ওরা আমাদের দিকে আসছে কেন ? ধীরে ধীরে সাগরকান্তাকে ডাকি―এই সাগরকান্তা দেখ দেখ। আমার শরীরে তার কোনও স্পর্শ অনুভব করি না। সে নেই। কোথায় গেল ? আমি চিৎকার করে তাকে ডাকি। আমার চিৎকারে গাঙচিলগুলো থমকে দাঁড়ায়, আবার ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যায় সমুদ্রের ওপর সীমাহীন আকাশে।

অনেক খোঁজাখুজি করেও পাই না তাকে। আমি কোন্ দিক থেকে এখানে এসেছিলাম ঠাহর করতে পারি না। চাঁদের আলো বিভ্রম জাগাচ্ছে। দূরে একটা বহুতল হোটেলের মাথায় তার নাম একবার জ্বলছে একবার নিভছে।  সেটাকে লক্ষ্য করে এগোতে থাকি। 

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares