গল্প : ধবলার ডাক : ওমর কায়সার

কোনও অঘটন ঘটেনি তো ? ধবলা এমন আকুল হয়ে কেন বার বার ডাকছে ? তখনও ভোর ফোটেনি। বাড়ির ভেতর, বাইরের সুপারি বন, তার পাশে বিস্তৃত ধানক্ষেতেও অন্ধকার ছড়িয়ে আছে। দূরে পুবের আকাশে কোথাও এখনও আলো লুকিয়ে রয়েছে। বিশ শতকের মধ্য আশির এই বিরাট পৃথিবীজুড়ে তার জন্য যে আকুল অপেক্ষা, সেটা যেন সূর্যের মনেও নেই । সকাল হবে। অতি পুরোনো আলোর গোলকটি এসে একটি নতুন দিনের ঘোষণা দেবে, তার জন্য কী অধির আগ্রহ চেমনের। রাত ফুরোতে কত বাকি ? কবে উঠোনের দক্ষিণের কোণ থেকে গলা উঁচিয়ে ভোর হলো বলে ডাক দেবে লালঝুটির বড় মোরগটি। বটতলার মসজিদ থেকে শীতল বাতাসে ভেসে আসবে মুয়াজ্জিনের আহ্বান―আস ছালাতু খায়রুম মিনান নাউম।

ধবলা আবার ডাকছে। এমন অবেলায় গাইটি এমন করে ডাকার কারণ কী ? চেমনার মনে উৎকণ্ঠা। মনে মনে ভাবে চেরাগটা জ্বালিয়ে একবার গোয়াল ঘরে ঘুরে আসবে কি না। কিন্তু সাহস হয় না। এত রাতে যদি কিছু হয়ে যায় ? ঘরের চৌহদ্দির বাইরে গোয়ালঘর পর্যন্ত পুরো এলাকা তাবিজ দিয়ে বন্ধ করা হয়নি। ওই অদৃশ্য সীতারেখার বাইরে পরিরা সারারাত ধরে নাচানাচি করে। এমনও হতে পারে, ওরা ধবলার বেশ ধরে ডাকছে। ভাবতেই তার বুকটা ধড়ফড় করে কাঁপে। কিন্তু ধবলা ডেকেই চলেছে। সেই ডাক তার বুকের কোথাও গিয়ে বার বার ঘাই মারছে। জিন-পরির ভয়কে ছাপিয়ে ধবলাকে দেখার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠছে। সারারাত নিজে অনিদ্রার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, এখন আবার বাইরে যাবার ইচ্ছের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ক্ষণ, দিন,  সপ্তাহ, মাস, বছর করে করে একটি জীবন এভাবেই কিছু না কিছুর সঙ্গে লড়াই করেই কেটে যাচ্ছে। বিছানা থেকে উঠে পড়ে সে। অন্ধকারে হাতড়িয়ে কুলঙ্গি থেকে চেরাগ আর দিয়েশলাইটা নিয়ে জ্বালাতেই চারপাশের সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে দাদির কথা কানে এল―ঘুম ন যচ ? কিরে তুই বাত্তি কিল্লাই জ্বালাইয়ুচ, (ঘুমাসনি ? বাতি কেন জ্বালিয়েছিস ?)।

সে যে ঘুমায়নি কথাটা এই মুহূর্তে দাদিকে বলা যাবে না। তাতে দাদি তার ঘুমাতে না পারার অন্তর্নিহিত কারণটি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে ওটাকে কোথা থেকে যে কোথায় নিয়ে যাবে সেটা চেমন আরা আঁচ করতে পারে। তাই ঘুমের প্রসঙ্গটা বাদ দিয়ে সে শুধু ধবলার প্রসঙ্গটাই উত্থাপন করে। শুনে দাদি রাতের নির্জনতাকে হাসির দমকে ভেঙে চুর চুর করে দিল। হাসতে হাসতে দাদির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, বুকের ভেতর জমানো কফগুলো ওপর দিকে বেরিয়ে আসতে চায়। কাশি ওঠে। কাশি আর হাসি একসঙ্গে চলে। সেই হাসি চেমন আরার মধ্যে সংক্রমিত হয়। দাদি কেন হাসছে সে বোঝেনি। আর না বুঝে সেও হাসছে। দোচালা টিনের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘরটির ভেতর মাত্র দুজন বাসিন্দা। দাদি কোনও রকমে তার হাসি ও কাশিকে সামলে নিয়ে বলে উঠল―তোর ধবলা বুঝিত পাইজ্জি, আজিয়া তোর মানুষ আইবু। তই মালিকুর মানুষ আইবু। তারার মিলন অইবু। ইতি কি বই তাইবু না ? ইতিরও বিরিষ লাইবু। পাল দঅন ফরিবু।  এতেল্লাই ডাহের। বাত্তি নিভাই ঘুম যা। ঘুম ন যাইলি শরীরুর ছুরত আঁজি যাইবু। (তোর ধবলা বুঝেছে, আজ তোর মানুষ আসবে। তো মালিকের মানুষ আসবে, তাদের মিলন হবে, তার হবে না ? সে কী বসে থাকবে ? তারও একটা ষাঁড় লাগবে। তাঁর প্রজননের ব্যবস্থা করতে হবে। এই জন্যই ধবলা ডাকছে। বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়। না ঘুমালে শরীরের সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে।)

ধবলার এমন ডাকার কারণ চেমনার আগেই বোঝা উচিত ছিল। না বুঝে দাদিকে এ কথাটি বলাতে সে নিজে নিজে আরক্ত হয়ে যায়। তার পুরো শরীরজুড়ে কেমন একটা শিরশির করা ভাব। কোথাও কোথাও মাংসপেশি কেমন শক্ত আর অচল হয়ে যায়। চোখ লাল হয়ে ওঠে, বুকের গহিন থেকে উঠে আসা নিঃশ্বাসের বাতাসে যেন আগুন ছোটে। মাথা আউলা হয়ে যায়। ইচ্ছে করে তাবিজের বন্ধন রেখা পেরিয়ে সমস্ত সীমানা ছাড়িয়ে অনবরত দৌড়ে দৌড়ে কোথাও, অন্য কোথাও চলে যায়। কিন্তু তার যাওয়া চলবে না। আজ তার অপেক্ষার দিন শেষ। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ফিরে আসতে চায়। বাতি নিভিয়ে দেয়, বিছানায় গা এলিয়ে দেয় একটু ঘুমের আশায়।  তখনই আবার দাদি বলে ওঠে―চেরাগ নিবাই কিল্লাই দিয়ুছ ? এহন লাতা ডাকিবু। আর ঘুম নঅ যাইচ। আজিয়া বউথ হাম। আর নাতিন জামাই আইবু সাত বছর পর। গুঁড়া ফিডা বানাইয়ুম। মজা গরি হাইবু। চেরাগ জ্বালা। উগগা কুরা জরান ফরিবু। আরেক্কান হথা, নজরুলুরে মাদ্রাসার হোস্টেলত্তুন লই আনিবি। যে বাপরে হনদিন নঅ দেহে, এই বাপ আইবু, ইতা ঘরত নঅ থাইলি বাপত্তে ভালা নঅ লাগিবু। (চেরাগ নেভালে কেন ? এখনই মোরগ ডাকবে। আর ঘুমাসনে। আজ অনেক কাজ। আমার নাতিন জামাই আসব সাত বছর পর, সেমাই পিঠা বানাব। মজা করে খাবে। চেরাগটা জ্বালা। একটা মুরগিও জবাই করতে হবে। আরেকটা কথা। নজরুলকে  মাদ্রাসার হোস্টেল থেকে নিয়ে আসবি। যে বাবাকে জীবনে দেখেনি, সেই বাবা আসবে। যদি সে ঘরে থাকে, বাপের ভালো লাগবে না।)

একটু আগে দাদি তাকে ঘুমোতে বলেছে। এখন বলছে না ঘুমাতে। আসলে দাদি নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না, কী করতে হবে। নজরুলকে নিয়ে কী করতে হবে সেটা নিয়েও দাদি এক এক সময় একেক কথা বলছে।  নজরুলের বয়স ৬ বছর। চেমনার একমাত্র ছেলে। ক’দিন আগে তার বাবা একটি চিঠি লিখে জানিয়েছে মার্চ মাসের ২৭ তারিখ আসবে। দুবাই শহর থেকে সাড়ে পাঁচ বছর পর লেখা সেই চিঠিতে স্বামীর একটা নির্দেশও দেওয়া আছে। তার ছেলেকে যেন  কোরআনে হাফেজ বানান হয়। স্বামীর আদেশ পেয়ে পাশের গ্রামের মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেয় মা। ওখানেই হোস্টেলে থাকে সে। এতে খুব একটা সন্তুষ্ট নয় দাদি। যে লোকটা নিজের সন্তানের কোনও খবর নেয়নি এতদিন। বাচ্চা হওয়ার পর একবার একটা চিঠি লিখে জানিয়েছিল ছেলের নাম যেন ইসলামি কায়দায় রাখা হয়।  নজরুল ইসলাম। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কোনও খবর নেয়নি । দাদি ভাবে, একটা নবজাতককে নিয়ে একজন মায়ের কীভাবে দিন কাটে, তারা কী খায়, কী পরে, কীভাবে  চালায় জীবন তার কোনও খবররাখবর সে রাখে নাই। আজ আসছে পুত্রকে কোরআনে হাফেজ বানানোর নির্দেশ। টাকা কোথা থেকে আসে শুনি ?  গাছ বিক্রি করতে করতে বাড়িটাকে মরুভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতে একটানা গিজগিজ করতে থাকে দাদি। নাতিন জামাইয়ের ওপর তার প্রচণ্ড ক্ষোভ। তারপরও একটা বড় শিরীষ গাছ বিক্রি করে প্রপৌত্রকে মাদ্রাসায় ভর্তির টাকা জোগাড় করেছে।

দাদি তাকে বলে, প্রত্যেক হপ্তাত যে তুই চিডি দস, এগিনুর খরচও তো আঁত্তে জোগন পড়ে। সেই হালারে চিডি কিল্লাই দঅন পড়েদ্দে ? ইতা তো তোরে নঅ লেহে। ইতার চৌদ্দ গোষ্ঠী বজ্জাত। নইলি তোরে কিল্লাই বাপর বাড়িত ফাডাই দিইয়ি ? (প্রতি সপ্তায় যে তুই চিঠি পাঠাস, সেই চিঠির খরচও তো আমার জোগাড় করতে হয়। কী দরকার, সেই শালারে নিয়মিত চিঠি দেওয়ার। সে কী তোরে কিছু লেখে ? তার চৌদ্দ গোষ্ঠী বজ্জাত। নইলে তোরে তারা বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিল কেন ?)

দাদির এসব প্রশ্নের কোনও উত্তর চেমনার জানা নেই। নজরুল যখন পেটে ছিল তখন একদিন ভোরবেলা তার শ্বশুর তাকে বাপের বাড়ি ফেলে দিয়ে গেছে। আর নেয়নি। কোনও খবরও নেয় না। এই অদ্ভুত আচরণের কারণ খুঁজতে গিয়ে চেমন আরা কোনও কূল কিনারা পায় না। দুনিয়াটা অদৃশ্য পরির জগতের মতো কেবলই রহস্যময় মনে হয়। সে দাদিকে বলে, দাদি আঁরে যদি ইতারা এডে ফেলাই ন যাইতু তুঁই হার লগে থাইকতা ? কেন গইরত ? (আমাকে যদি তারা এখানে ফেলে না যেত, তাহলে তুমি একা কী করে থাকতে। কি করতে ?)

এ কথায় দাদির আরও রাগ হয়। রেগে গিয়ে মাটিতে মাথা কুটতে থাকে। একনাগাড়ে বিলাপ করতে থাকে। এই যে দুনিয়ায় এত ভার তাকে সইতে হচ্ছে, কেন সইতে হচ্ছে তার জন্য উপরের দিকে হাত তুলে জিজ্ঞেস করতে থাকে আল্লাহকে। দাদির স্থির বিশ্বাস ছোটবেলায় মা হারান চেমন আরার বাবা শফি মারা গেছে নিজের মেয়ের দুঃখ সহ্য করতে না পেরে। দাদি বিলাপ করে বলে―স্বামী নাই, ছেলের বউ নাই, উগ্গা নাতিনুরে এতিম গরি, আঁর ফোয়া আঁরে দইজ্জার মাঝখানদি ভাসাই দিই গেইয়েগুই। (স্বামী নাই, ছেলের বউ নাই, আমার একটা নাতিনকে এতিম করে  ছেলেটি আমাকে সাগরের মাঝখানে ভাসিয়ে দিয়ে চলে গেল।)

চেমনা আবার চেরাগ জ্বালায়। তার মনের ভেতর একটা অলৌকিক চেরাগ বাস্তবের এই চেরাগটির মতো কেমন দপদপ করে উঠছে। দাদিকে সে জানায়। নজরুলকে সে আনতে যাবে না। তার বাপকে নিয়ে মাদ্রাসায় যাবে। তারপর ছেলেকে একটা চমক দেবে। হয়তো তখন দেখা যাবে, পবিত্র কোরআন বুকে নিয়ে তার ছেলে বাবাকে দেখবে। আর খুব শ্রদ্ধাভরে কোরআন শরিফটা রেখে বাবার কাছে দৌড়ে আসবে। ভাবতে ভাবতে চেমনার চোখের সামনে সামনের চেরাগসহ সবকিছু অস্পষ্ট হয়। চেমনার পরিকল্পনার কথা শুনে একটু আগে যে দাদির হাসিতে অন্ধকার ভেঙে যাচ্ছিল, সেই দাদি তার চেয়ে কয়েকগুণ জোরে কাঁদতে শুরু করেছে। আর নাতিন জামাইয়ের চৌদ্দ গোষ্ঠীর শেষ ঠিকানা নরক কামনা করে বিলাপ করতে শুরু করেছে।

এমন অভিশাপের বিলাপ শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে চেমনা। দাদির অনেক কথায় তার মনের কথা প্রতিধ্বনিত হয়। কিন্তু কখনও সে মুখ ফুটে কখনও বলেনি। দাদির মুখে যখন স্বামীর জন্য অভিশাপ শোনে তখন তার বুকটা ভয়ে কাঁপে। সে মনে মনে বলে, আল্লাহ যেন দাদির এই অভিশাপ কানে না শোনে। কষ্ট যখন অসহ্য হয়ে যায়, তখনই দাদি অভিশাপ দিতে থাকে। সে দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত যে দাদি সত্যি সত্যি মন থেকে এসব কথা বলে না। এই যে লোকটা আসবে বলে আজও সীমিত সাধ্যের মধ্যেও নানা আয়োজনের পরিকল্পনা করছে, তা কেন করছে ? নিশ্চয় দাদিও ভালোবাসে তাকে। চেমনা মনে মনে স্বামীর কল্যাণ কামনা করে। সুস্থতা কামনা করে। সে ভাবে যত দূরে থাক, রহস্যময় লোকটা ভালো থাকুক। যদি কোনও দিন দয়া হয়, যে মুখ সে ফিরিয়ে নিয়েছে, সেটি ঘোরাতেও পারে। সিজদায় পড়ে থাকে চেমনা―তার স্বামীর যাতে সুমতি হয়।

দাদির দৃষ্টি আকর্ষণ করে চেমনা বলে, তুই তো আবার শুরু গরি দিইয়ু।  উদা হাঁদিলি কি উইবু না ? এহন কেন গরি, কী গইজ্জুম হই দঅ। হাদন বন্ধ গর। (তুমি তো আবার শুরু করলে। শুধু কাঁদলে কী চলবে ? এখন কীভাবে, কী করব সেটি বল। কান্না বন্ধ কর।)

নাতনির কণ্ঠে দাদি সম্বিৎ ফিরে পায়। আজ তো অভিশাপ দেওয়ার দিন নয়। আজ তো বরণ করার পালা। তারপরও দাদির সন্দেহ হয়। অনেক বছর আগে ছেলের নাম প্রস্তাব করে যে চিঠি দিয়েছিল। সেখানেও বলেছিল মার্চ মাসে আসবে। আসেনি। বলেছিল ঘটা করে ছেলের আকিকা করবে। করেনি। তার মনে সন্দেহ হয়। কিন্তু মনের সন্দেহ মনে রাখে। নাতনিকে জানায় না। থামির ওপরের অংশের আঁচল দিয়ে চোখ মুছে। তারপর গায়ে জড়িয়ে মনে মনে আল্লাহু আকবর বলে উঠে পড়ে বিছানা থেকে।

রাত শেষ হওয়ার অনেক আগে থেকেই এই ঘরে ভোর শুরু হয়ে যায়। সিন্দুক থেকে, আলমারি থেকে, খাটের তলা থেকে, শিকেয় ঝোলানো বৈয়াম থেকে দাদির গচ্ছিত নানা তৈজসপত্র, খাবার দাবার বের হতে থাকে। চুলার আগুনে আলোকিত হতে থাকে দুটি নারীর মুখ। কত শত শত দিন পেরিয়ে এ রকম একটি সম্ভাবনার সকাল এল আজ চেমনার জীবনে। সাড়ে সাত বছর আগে বিয়ে হয়ে ছিল তার। সেই দিনের অনুভবগুলো আজ ফিরে ফিরে আসছে তার তপ্ত শরীরে। চেমনার শরীর পুড়ে পুড়ে যাচ্ছে। খাক খাক হয়ে যাচ্ছে ভেতরের কলিজা। বুকের ভেতরের প্রতিটি ধুকপুকে যেন কেউ অবিরাম ঢোল বাজিয়ে চলেছে। সেই ঢোলের আওয়াজে তার দুই কান বন্ধ হয়ে যায়। আকাশ ফর্সা হয়ে চারদিকের সমস্ত প্রাণ কেমন সরব হয়ে উঠেছে। আমগাছের ফাঁকফোকর থেকে কয়েকটি ভাতময়না কোলাহল করছে। ধবলা ডাকছে। চেমনার কানে এসব যাচ্ছে না। গুঁড়া পিঠার সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে পাড়ায়। প্রতিবেশীদের মুখে হাসি। তাদের মুখে ছন্দের খই ফোটে।

নাতিন জামাই আইস্যে

ফইরর ঘাটত বইস্যে

কী কী আইন্যে চঅগু

জিলাপি আর কুড়ার গু।

(নাতিন জামাই এসেছে

পুকুর ঘাটে বসেছে

এনেছে কী এনেছে কী

মুরগির গু আর জিলিপি)

এই শ্লেষ চেমনা বোঝে না। দাদি বোঝে। বহু দশকের পুরোনো কুচকানো চামড়াটা পুড়ে যায়। কিন্তু কিছুই বলে না। এসবের জবাব দাদি দিতে জানে। কিন্তু দেবে না। আগে নাতিনজামাই আসুক। তারপর সে কী কী এনেছে সবাইকে দেখিয়ে দেবে। ভাবতে ভাবতে নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে দুই প্রজন্মের দুই নারী।

কাজের ভেতর দিয়ে একটা প্রহর কখন চলে গেল তারা টেরই পেল না। চেমনার ধমনীর ভেতর রক্তের স্রোতে গতি বাড়ছে। নিজের অজান্তে সে কিছুক্ষণ পর পর উঠানের পশ্চিম পাশে যেখানে বাঁশের বেড়ার ফটক আছে, সেখানে চলে যায়। এখান থেকে গাছের ছায়ায় ঢাকা রাস্তাটাকে একটা সবুজ সুড়ঙ্গ বলে মনে হয়। সেই সুড়ঙ্গের ভেতর চোখ রাখে সে। বার বার দেখে। না, যা সে দেখতে চায় তা চোখে পড়ে না। ফিরে যায় ঘরে।

একসময় সমস্ত আয়োজন শেষ হয়ে গেলে অপেক্ষা ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে ওঠে। একটা প্রহর চলে গেল। ভাতময়নাগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কোনও একটা গাছের ডাল থেকে একটা ঘুঘু ডাকছে। চেমনা ওপরে চোখ রাখে। আমগাছগুলোতে এবার এত বেশি মুকুল এসেছে, পাতাগুলো দেখাই যাচ্ছে না। কত শত মধুপোকা ভিড় করেছে সেখানে। ঘুঘুটাকে দেখা যায় না। আবার উঠোন পেরিয়ে চোখ রাখে সবুজ সুড়ঙ্গে। নিস্তব্ধ দুপুর বেলা। সেখানে হাহাকার খেলা করছে।

দুপুর গড়িয়ে গেল। বিকেলে নজরুল মাদ্রাসার হোস্টেল থেকে ফিরে আসে। এসেই তার বড়মাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, সে আর মাদ্রাসায় যাবে না। ওখানে তার শুধু কান্না আসে। খালি সবাইকে দেখতে ইচ্ছে করে। দাদিকে সে কানে কানে বলে―ওখানে তার একদম ভালো লাগে না। মায়ের কাছে সে ভয়ে যায় না। মা তাকে কাছে টেনে নেয়। দরিয়ার ঢেউয়ের মতো তার বুকে কী যেন আছড়ে পড়ছে।

দাদি দেখে নাতনি আর তার পুত্রকে। মনে মনে নাতনির উদ্দেশে বলে―

মাস গেলগুই, বছর গেলগুই

সূরয অস্তগামী

মা হারাইলি, বাপ হারাইলি

হারাইলি তোর স্বামী।

বিকেল গড়িয়ে গেলে দিনের আলো নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কিন্তু দাদির তেজ বাড়ে। শুরু হয়েছে তার বিলাপে বিলাপে জগতের সকল মানুষকে অভিশাপ দেওয়ার পালা। ক্লান্তিহীন বিলাপের ভেতর সূর্য ডুবে গেলে গাছের পাতারা নীরব হয়ে যায়। দাদিও ক্ষান্ত হয়। অন্ধকার ঘরের ভেতরে ঢুকে কুলুঙ্গিতে রাখা চেরাগটা জ্বালিয়ে দেয়। এই আলো অসহ্য মনে হয় চেমনার। তার ইচ্ছে করছে দৌড়ে গিয়ে এক ফুঁ দিয়ে চেরাগটা নিভিয়ে দেয়। এ সময় গোয়ালঘর থেকে অবিরাম ডেকে যাচ্ছে ধবলা। সেই ডাক সবুজ সুড়ঙ্গ পেরিয়ে, বিল পেরিয়ে, কোথায় কোথায় যে গিয়ে আবার ফিরে ফিরে আসছে কিছুই বোঝার উপায় নেই।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares