গল্প : রাস্তার মেয়ে : রেজানুর রহমান

সিরাজুল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। যে যাই বলুক এই মেয়েকে সে বিয়ে করবে। তার আগে মেয়ের সম্মতি প্রয়োজন। পাত্র রাজি কিন্তু পাত্রী রাজি কি না সেটা জানা দরকার। পকেট থেকে পঞ্চাশ পয়সার একটি কয়েন বের করল সিরাজুল। এই কয়েন দিয়ে লটারি হবে। কয়েনের একদিকে যমুনা বহুমুখী সেতুর ছবি, অন্যদিকে জাতীয় ফুল শাপলার ছবি। শাপলাকেই বেছে নিল সিরাজুল। লটারিতে কয়েনের শাপলা পিঠ উঠলেই সিদ্ধান্ত ফাইনাল! অর্থাৎ এই মেয়েকেই বিবাহ করবে সে।

তার আগে মেয়েটির সম্মতি দরকার। সিরাজুলের একক ইচ্ছায় তো আর বিবাহ সম্ভব নয়। মেয়েটি কী রাজি হবে ? ডান হাতের অনামিকা ও বৃদ্ধাঙ্গুলির সাহায্যে কয়েনটাকে ওপরে ছুড়ে দিল সিরাজুল। কয়েনটা ঘুরতে ঘুরতে ধপ করে ঘরের মেঝেতে পড়ে গেল। চোখ বন্ধ করে আছে সিরাজুল। চোখ খুলতে সাহস হচ্ছে না। লটারিতে যদি হেরে যায় তাহলে ব্যাপারটা মেনে নিতে পারবে না। তার চেয়ে লটারিতে কী ঘটেছে সেটা না দেখাই ভালো। লটারি লটারির জায়গায় থাকুক। সিরাজুলের সিদ্ধান্তই ফাইনাল। এই মেয়েকেই সে বিবাহ করবে।

কিন্তু হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন তাকে প্রশ্ন করার জন্য মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আবছা একটা ছায়া।

কেমন আছ সিরাজুল ?

জ্বি, ভালো।

মেয়েটা কে ?

আমি তাকে চিনি না।

সিরাজুলের কথা শুনে ছায়াশরীর থেকে কৌতুক মিশ্রিত হাসির শব্দ ভেসে উঠল―

এসব কি বলতেছ মিয়া? মেয়েটাকে চেনো না অথচ বিবাহ করতে চাইতেছ। বিবাহ কী মুড়ি মোয়া নাহি ? তাছাড়া মেয়েটা যে তোমারে বিবাহ করবে তার গ্যারান্টি কী ? তোমাদের মধ্যে তো সে রহম কোনো কথাবার্তা হয়নাই। হইছে?

না। ছোট্ট উত্তর দিল সিরাজুল।

ছায়াশরীর এবার জিজ্ঞেস করলÑতাইলে কোন্ সাহসে তুমি বিবাহ করার ফাইনাল ডিসিশন নিয়া ফালাইছ ? মেয়েটাতো রাজি নাও হইতে পারে। আমার কথায় কী তুমি কোনও লজিক খুইজা পাইতেছ না ?

হ্যাঁ পাচ্ছি।

তোমার লটারির রিজাল্ট কী বলে মিয়া ? দেখো… হের পর ডিসিশন নাও…

মেঝেতে পরে থাকা কয়েনটির দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না সিরাজুল। তার কেন যেন মনে হচ্ছে রেজাল্ট নেগেটিভ। সিরাজুল মনে মনে বলল, রেজাল্ট নেগেটিভ হলেও সে এই মেয়েকেই বিয়ে করবে।

বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে দুই চোখ বন্ধ করল সিরাজুল। অথচ এখন তার চোখ খোলা থাকার কথা। চুক্তি অনুযায়ী মেয়েটি গোসল শেষে ভিজা চুলে নগ্ন শরীরে সিরাজুলের সামনে এসে দাঁড়াবে। সিরাজুল মেয়েটির নগ্ন শরীর দেখবে। সেও নগ্ন হবে। তারপর দু’জনে বিছানায় যাবে। মেয়েটি সিরাজুলের শরীর ঘেঁষে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তার শরীর থেকে সুগন্ধী সাবানের সুবাস ভেসে আসছে। মেয়েটির স্তনের স্পর্শ পাচ্ছে সিরাজুল। গোটা শরীরে পলকে পলকে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। নারীর নগ্ন শরীর দেখার বহু দিনের ইচ্ছে সিরাজুলের। বন্ধুরা ব্যাপারটা নিয়ে কতই না ঠাট্টা তামাশা করে। এই তো গত পরশু সুলাইমান তাকে কীভাবেই না অপদস্থ করল। পুরোনো পল্টনে একটা নতুন হোটেল হয়েছে। নাম ‘খেয়া’। সেখানেই কয়েকজন বন্ধু মিলে আড্ডা দিচ্ছিল। সেই আড্ডায় কথায় কথায় নারীর নগ্ন শরীরের প্রসঙ্গ ওঠে। কে প্রথম, কবে, কখন কোনও নারীর নগ্ন শরীর দেখেছে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। বিশ্ব প্রেমিক সাত্তার প্রথম গর্বের সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। তার ফুফাতো বোন বিলকিস নাকি স্বইচ্ছায় একদিন তার নগ্ন শরীর দেখিয়েছিল। সাত্তার তখন বয়সে বেশ ছোট। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বিলকিস আপা সাত্তারদের বাসায় কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে এসেছিল। একদিনের ঘটনা। মা পাশের বাসায় বেড়াতে গেছে। ভাই-বোনেরা কেউই বাসায় নেই। টিভি রুমে বসে টিভিতে একটা অনুষ্ঠান দেখছিল সাত্তার। হঠাৎ বাথরুম থেকে বিলকিস আপার চিৎকার শুনতে পায় সাত্তার। টিভি বন্ধ করে বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

আপা, কি বলবে বল…

বিলকিস আপা বাথরুমের দরজা খুলে মাথা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, বাবু সোনা আমার একটা কাজ করে দিতে পারবি ?

কি কাজ বলো ?

বিছানার ওপর আমার কাপড় পড়ে আছে। একটু এনে দিতে পারবি ?

সাত্তার দৌড়ে গিয়ে বিছানা থেকে বিলকিস আপার সালোয়ার কামিজ, ব্রা এনে বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়ায়Ñআপা দরজা খোলো… তোমার কাপড় এনেছি….

বিলকিস আপা বাথরুমের দরজা খুলে দেয়। তার শরীরে কোনও কাপড় নেই। লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারছিল না সাত্তার। বিলকিস আপা হঠাৎ তাকে টেনে নিয়ে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। জিজ্ঞেস করেÑকিরে লজ্জা পাচ্ছিস ?

সাত্তার হ্যাঁ না কিছুই বলে না। বিলকিস আপা এবার সাত্তারের ছোট্ট শরীর পেঁচিয়ে ধরে। সাত্তারের ছোট্ট দুই হাত কখনও নিজের দুই স্তনে, কখনও গোপনাঙ্গে টেনে নেয়। অস্ফুস্ট স্বরে বলতে থাকেÑসোনা আমার মানিক আমার। শোন, এই ঘটনা কাউকে বলবি না!

বিপুল উৎসাহে সাত্তারের কথা টেনে নেয় শহিদুল। সাত্তারকে থামিয়ে দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করে। শহিদুল তার দূর সম্পর্কের এক মামির নগ্ন শরীর দেখেছিল। কথাটা শুনেই সিরাজুল লজ্জায় মাথা নুয়ে ফেলে। সব কিছুর একটা সীমা আছে। শেষ পর্যন্ত মামির নগ্ন শরীর নিয়েও কৌতুক হবে ? মৃদু প্রতিবাদ করে সিরাজুলÑআমি একটা জরুরি কথা বলতে চাই!

সবাই সিরাজুলের দিকে মনযোগী হয়। শহিদুল কেবল তার মামির ঘটনাটা বলতে শুরু করেছিল। সিরাজুলের কথা শুনে একটু অবাক হয়। কথা থামিয়ে সিরাজুলের দিকে তাকায়। সিরাজুল ইতস্তত করে বলেÑআমাদের আলোচনায় কিছু সেন্সর আরোপ করা দরকার। মামি-চাচি-খালার শরীর নিয়ে এভাবে…

শহিদুল বিষধর সাপের মতো ফোঁস করে ওঠে। লম্বা হাত বাড়িয়ে প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বলেÑঅবজেকশন… অবজেকশন… বন্ধু তুমি মেয়েদের সম্পর্কে কতটুকু জানো ? বলো, বলো… মামি, চাচির কথা বলতেছ ? আমি প্রথম ধর্ষিত হই আমার ওই মামির দ্বারা। কী, তোমার বিশ্বাস হইতেছে না ?

শহিদুলের কথা শুনে সিরাজুল বাদে অন্য সবাই হো-হো করে হেসে ওঠে। পাশেই বসেছিল আবুল কালাম।

সে শহিদুলকে উদ্দেশ্য করে বলেÑভালো কথা বলেছ বন্ধু ? জোর করে সেক্স করলেই তো বলা হয় ধর্ষণ করেছে। সেই অর্থে পুরুষ মানুষও ধর্ষিত হয়। আমার জীবনেও এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমি তখন খুবই ছোট। আমার এক খালার সঙ্গে রাতে ঘুমাতাম। মাঝে মাঝে দেখতাম খালা তার নগ্ন শরীরে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগত না। কিন্তু খালা প্রায় প্রতিরাতেই জোর করে আমাকেও উলঙ্গ করত। চকলেটের টোপ দিত…

আবুল কালামকে থামিয়ে দিয়ে শহিদুল তার কথা বলতে শুরু করেÑএক অর্থে আমিও ধর্ষিত হয়েছি। আমার ওই মামির হাজবেন্ড মানে আমার মামা বিদেশে থাকত! বছরে একবার, দু’বার দেশে আসত। মামির তখন ভরা যৌবন। এক ছেলের মা। ওই ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতাম আমি। একদিন প্রাইভেট পড়াতে গেছি। দরজার কলিং বেল টিপলাম। দেখি কেউ খোলে না। দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। সাধারণত কি হয় ? আমি ওই বাসায় গেলেই আমার প্রাইভেট ছাত্র অর্থাৎ আমার মামাতো ভাই দৌড়ে আসে। আজ তাকেও দেখলাম না। একটা ছুটা কাজের বুয়া ওই বাসায় কাজ করে। সেও নেই কোথায় গেল সবাই ? হঠাৎ বাথরুম থেকে মামির কথা শুনলাম।

কে ? শহিদুল নাকি রে ?

জ্বি মামি।

দরজাটা বন্ধ করে দে।

জ্বি মামি…

দরজা বন্ধ করে দিয়ে কি করব ভাবছি। হঠাৎ ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম। মামি বাথরুম থেকে বের হয়েছেন। তার শরীরের নিচের অংশে পেটিকোট। ওপরের অংশে একটা ছোট্ট একটা তোয়ালে জড়িয়ে রেখেছেন। আমি লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে সাহস পাচ্ছিলাম না। মামি অবলীলায় আমার সামনে দিয়ে হেঁটে তার ঘরে চলে গেলেন। ভেবেছিলাম ঘরে গিয়ে তিনি দরজা বন্ধ করে দিবেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। ঘরের দরজা খোলাই থাকল! হঠাৎ শুনি কান্নার শব্দ।

আমি পড়ে গেলাম উভয় সংকটের মধ্যে। মামি হঠাৎ এভাবে কাঁদছেন কেন ? আমার কি তার কাছে যাওয়া উচিত ? সঙ্গে সঙ্গেই আমার মন আমাকে সতর্ক করে দিল। ‘শহিদুল তুমি একটা ঝামেলায় পড়তে যাইতেছ ? মারাত্মক ঝামেলা। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো’। আমি চলে যাবার কথা ভাবতেই মামির কান্নার শব্দ বেড়ে গেল! মনে হল মামি মারাত্মক কোনও বিপদে পড়েছেন। কারও মৃত্যু সংবাদ পেয়েছেন কী ? এবার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। দৌড়ে গেলাম মামির ঘরে…

এই পর্যন্ত বলে থামল শহিদুল। কি যেন ভাবল। তারপর মৃদু হেসে বলল, কান্নাটা যে তার অভিনয় ছিল সেটা বুঝলাম একটু পরেই। এর আগে লুকিয়ে লুকিয়ে নারীর নগ্ন শরীর দেখেছি। এই প্রথম সামনাসামনি একজন যৌবনবতী নারীর খোলা শরীর দেখলাম। আমি তো ভাই কবি সাহিত্যিক না! সে জন্য প্রকৃত বর্ণনা দিতে পারতেছি না। তবে এটা মানতেই হবে নারীর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে অদ্ভুত জাদু আছে…

কবি সাহিত্যিকের প্রসঙ্গ উঠতেই এবার সবাই সিরাজুলের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠল। কবিতা লেখে সিরাজুল। কয়েকদিন আগে দেশের একটি নামকরা পত্রিকায় তার একটি কবিতা প্রকাশ হয়েছে। ওই কবিতায় নারীর শরীরের বর্ণনা আছে। তার মানে নারীর শরীর সম্পর্কীয় ব্যাপারে অন্যের চেয়ে নিশ্চয়ই সিরাজুলের অভিজ্ঞতা বেশি।

কিন্তু সিরাজুল সবাইকে চরম হতাশ করল। সে নাকি যৌবনবতী কোনও নারীর নগ্ন শরীর ইহজনমে দেখে নাই। তার কথা শুনে বন্ধুরা সবাই হাসাহাসি শুরু করে দিল। শহিদুল বলল, সিরাজুল একদম মিথ্যা বলবি না ? তুমি ব্যাটা সাধু সাজতেছ না ? মাইয়া মানুষের ন্যাংটা শরীর ইহজনমে দেখো নাই ? এই কথা আমাদেরকে বিশ্বাস করতে বল ? ঠিক আছে তোমার একটা কবিতার কয়েকটা লাইন শোনাই, ‘আমার দুই হাত খামচে ধরল দুটি পর্বত।

কবিতার দুটি লাইন পড়ে সিরাজুলের দিকে তাকাল শহিদুল। জানতে চাইলÑএই কবিতা তোমার ?

হ্যা আমার! ছোট্ট উত্তর দিল সিরাজুল।

কোনও অভিজ্ঞতা ছাড়াই এ ধরনের একটা কবিতা লিখে ফেললি ? নারীর দুই স্তন যে দুটি পর্বতের মতো এটা বুঝলি কি করে ?

সিরাজুল বলল, এটা বুঝতে নারীর শরীর প্রাকটিক্যালি দেখা লাগে না। এটা হলো অনুভবের ব্যাপার…

এবার সিরাজুলকে থামিয়ে দেয় আবুল কাসেম। জানতে চায়Ñকবি তুমি সত্যি সত্যি কোনও মেয়ের নগ্ন শরীর দেখো নাই!

না! আবারও ছোট্ট উত্তর দিল সিরাজুল।

দেখার চেষ্টাও কর নাই ?

না।

তাহলে কবিতা লেখা বন্ধ কর।

এবার প্রতিবাদী হয়ে উঠলো সিরাজুলÑনারীর নগ্ন শরীর দেখার সঙ্গে কবিতা লেখার সম্পর্ক কী ? তোমার কথায় আমি কোনও যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না! তোমাদের এই উদ্ভট আলোচনা বন্ধ কর। বলেই আড্ডা ছেড়ে উঠে আসছিল সিরাজুল।

আবুল কাসেম তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, বন্ধু আমি তোমার সঙ্গে একমত। কবিতা লেখার জন্য নারীর নগ্ন শরীর দেখতেই হবে এমন কোনও ব্যাকরণ তৈরি হয়নি। তবে বন্ধু তোমাকে একটা পরামর্শ দিবÑনারীকে যত পার আবিষ্কার করো! তাহলেই দেখবে তোমার কবিতার খাতা খুলে যাচ্ছে…

পল্টন মোড়ের ‘খেয়া’ রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফেরার সময় সিরাজুলের মাথায় বার-বার সেই আড্ডার প্রসঙ্গই ঘুরপাক খাচ্ছিল। বন্ধুরা তো ঠিকই বলেছে। সিরাজুলের বয়স তো আর কম হলো না। সামনের নভেম্বরে ৩০ পার করবে। অথচ নারীর শরীরই দেখা হয়নি। তার মানে এই নয় ৩০ পার হওয়ার আগেই নারীর নগ্ন শরীর দেখতে পারাটা পুরুষের জন্য একটা বিশেষ যোগ্যতা। তবে সিরাজুলের জীবনেও যে এমন সুযোগ আসেনি তা কিন্তু নয়। ফুলু আপার কথাই ধরা যাক। দুর সম্পর্কের খালাতো বোন। বিয়ের ৬ মাসের মাথায় স্বামীর মৃত্যু হয়। বিধবা ফুলু আপা সিরাজুলদের গ্রামের বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। ফুলু আপার সঙ্গে সিরাজুলের বয়সের ব্যবধান প্রায় ৬ বছর। সে কারণে দু’জনের মেলামেলায় কেউ সন্দেহ করত না। ফুলু আপা কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। শেষ দিকে দু’জনের সম্পর্কটা এমন হয়ে উঠেছিল যে, সিরাজুল যা চাইত ফুলু আপা তাই করত। ৬ মাসের বিধবা এক নারী। যৌন ক্ষুধায় কাতর ছিল। সিরাজুল একটা টোকা দিলেই শুধু কী নগ্ন শরীর দেখা ? আরও কত কিছুই না ঘটে যেতে পারত। কিন্তু সিরাজুল কোনও দিনই এই কু-চিন্তা মাথায় আনেনি। অথচ বন্ধুরা তাকে এ নিয়েই খোটা দিল। না, ওদের সঙ্গে মেলামেশা করা ঠিক হবে না। সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ বলে একটা কথা আছে। অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে।

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গাড়ি চালিয়ে মগবাজারের দিকে আসছিল সিরাজুল। প্রেসক্লাবের সামনে হঠাৎ একটি মেয়ে তার গাড়ির সামনে এমন ভাবে এসে দাঁড়াল যে ঠিকমতো গাড়ির ব্রেক না কষলে একটা মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেত! গাড়ি থামিয়ে মেয়েটিকে ধমক দিল সিরাজুলÑএই যে ঘটনা কী ? মরতে চান নাকি ?

মেয়েটি মুখ ওড়না দিয়ে ঢাকা। তাই তার প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। তবে বোঝা গেল সে কোনও কারণে ভয় পেয়েছে। তাই সাহায্য চাচ্ছে।

আমাকে একটু হেল্প করবেন ?

মেয়েটির কথায় অবাক হলো সিরাজুল। এত রাতে একটি অপরিচিত মেয়ে সাহায্য চাচ্ছে। কোন ষড়যন্ত্রের অংশ নাতো? রাত বিরাতে প্রেসক্লাব, পল্টনের এদিকটায় দেহপসারিনীদের দৌরাত্ম্য দেখা দেয়। সে রকম কেউ নাতো? মেয়েটিকে গুরুত্ব না দিয়ে গাড়ি স্ট্রার্ট দেয় সিরাজুল। মেয়েটি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে এমন ভাব দেখিয়ে অনুমতির অপেক্ষা না করেই গাড়ির দরজা খুলে ঢুকে পড়ে। সিরাজুল মেয়েটিকে ধমক দিতে গিয়েও দেয় না। দুরে কয়েকজন লোককে দেখতে পায়। তারা কাউকে খুঁজছে বলে মনে হয়। মেয়েটি হাত জোড় করে বলে, আমি খুব বিপদে পড়েছি। গুন্ডারা আমার পিছু নিয়েছে। প্লিজ আমাকে একটু সামনে নামিয়ে দিন।

পিছনে লোকগুলোর গতিবিধি দেখে মেয়েটির কথা সত্য বলে ধরে নেয় সিরাজুল। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি ছুটতে থাকে।

কাকরাইল মসজিদের কাছাকাছি আসতেই মেয়েটির কান্না শুনতে পায় সিরাজুল। ঘটনা কী ? মেয়েটি কাঁদছে কেন ? গাড়ি থামায় সিরাজুল। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করেÑঅ্যাই আপনি কাঁদছেন কেন ? কি হয়েছে ?

মেয়েটি কিছুই বলে না। কাঁদতেই থাকে। সিরাজুল আরও উভয় সংকটে পড়ে যায়। মেয়েটির আচরণ রহস্যজনক মনে হচ্ছে। সে হঠাৎ কাঁদছে কেন ? মেয়েটিকে মৃদু ধমক দেয় সিরাজুলÑএই যে আপনি কাঁদছেন কেন ? কি হয়েছে বলবেন তো ? আপনি সামনে কোথাও নামবেন বলেছিলেন। কোথায় নামবেন ? এই যে… মেয়েটি এবার জোরে কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতেই বলে, আমি চরম বিপদে পড়েছি। যে লোকগুলো আমার পিছু নিয়েছিল তারা এখনও আছে। ঐ যে দেখেন পিছনে একটা বেবি ট্যাক্সি… ওরা আমাদেরকে ফলো করছে। আমি গাড়ি থেকে নেমে গেলেই ওরা আমাকে… বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে মেয়েটি।

সিরাজুল পিছনে তাকিয়ে দেখল দূরে একটা বেবি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। দু’জন লোক বেবি ট্যাক্সির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে তারা সিরাজুলের গাড়িকে ফলো করছে। মেয়েটিকে প্রশ্ন করল সিরাজুলÑআপনি এখন কি চান বলুন তো ?

মেয়েটি কোনও জবাব দিল না। সিরাজুল এবার ধমক দিলÑআমার কথা কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন ? কথা ছিল আপনি সামনে কোথাও নেমে যাবেন। প্লিজ এবার আমার গাড়ি থেকে নামুন। তা না হলে আমি আপনাকে নিয়ে থানায় যাব… আমার কথা কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন ?

থানার কথা শুনে মেয়েটি হঠাৎ কান্না থামিয়ে বলল, প্লিজ আমাকে থানায় নিবেন না। শুধু আজকের রাতটা আপনার বাসায় আশ্রয় দিন। সকাল হলেই আমি চলে যাব। প্লিজ…

মেয়েটির কথা শুনে ভূত দেখার মতো ভয় পেল সিরাজুল। অসম্ভব! গভীর রাতে অপরিচিত একটি মেয়েকে নিয়ে বাসায় নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। যদিও বাসায় কেউ নেই। পাঁচতলা বিল্ডিং এর ছাদে দুই রুমের একটি ছোট্ট বাসায় একা থাকে সিরাজুল। সকালে আফিসে যাবার আগে কাজের বুয়া বাসায় আসে। সকালের নাস্তা আর রাতের খাবার রান্না করে দিয়ে যায়। দুপুরে সাধারণত অফিসের ক্যান্টিনেই খেয়ে নেয় সিরাজুল। মেয়েটিকে বাসায় নিলে নানান ঝামেলায় পড়তে হবে। সব চেয়ে বড় ঝামেলা হবে বাড়ির দারোয়ান মোসাদ্দেককে ম্যানেজ করা। মোসাদ্দেক মারাত্মক সন্দেহবাজ টাইপের একটি চরিত্র। তিলকে তাল করতে ওস্তাদ। কি করা যায় ? কি করা যায় ? ভাবতে গিয়ে চমকে উঠল সিরাজুল। পাশের রাস্তা দিয়ে পুলিশের একটি টহল গাড়ি আসছে। মেয়েটিকে মৃদু ধমক দিল সিরাজুলÑএই যে কান্না থামান। পুলিশ কিছু জিজ্ঞেস করলে আপনি আগ বাড়িয়ে কিছু বলবেন না। যা বলার আমি বলব!

পাশের রাস্তায় পুলিশের টহল গাড়িটি থামল। একজন পুলিশ অফিসার গাড়ি থেকে নেমে সামনের দিকে এগিয়ে এলেন। তাকে অনুসরণ করলো দু’জন সিপাহি।

এরই মধ্যে সিরাজুল গাড়ি নষ্ট হয়েছে এটা বোঝানোর জন্য কয়েকবার গাড়ি স্ট্রার্ট দেওয়ার অভিনয় করল। পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে প্রথমে সিরাজুলের দিকে তাকালেন। তারপর গাড়ির ভিতর বসা মেয়েটিকে দেখলেন কয়েক সেকেন্ড। সিরাজুলকে প্রশ্ন করলেনÑসমস্যা কী ?

সিরাজুল বেশ ভয় পেয়েছে। তবে স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল, গাড়ি স্ট্রার্ট নিচ্ছে না!

আপনার পরিচয় ?

আমার নাম সিরাজুল ইসলাম। একটি ব্যাংকে কাজ করি।

পুলিশ অফিসার সন্দেহ ভরা চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলÑউনার পরিচয় ? মেয়েটি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে দিয়ে সিরাজুল বলল, আমার ওয়াইফ!

পুলিশ অফিসার এবার যেন আরও বেশি সন্দেহ ভরা চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সিরাজুলকে প্রশ্ন করলেনÑআপনার ওয়াইফ ?

জ্বি…

পুলিশ অফিসার মেয়েটিকে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পুলিশের গাড়ি থেকে একজন সিপাহি চেঁচিয়ে বলল, স্যার কাকরাইল মোডে একটা মারাত্মক ঝামেলা চলতেছে… কন্ট্রোল রুম থেকে এইমাত্র জানালো। একজন নাকি স্পট ডেথ…

খবর শুনে পুলিশ অফিসার হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সিরাজুলকে বললেন, রাত অনেক হয়েছে। তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যান। পুলিশ অফিসার দ্রুত পায়ে হেঁটে পুলিশ ভ্যানে উঠতেই সাইরেন বাজিয়ে পুলিশ ভ্যানটি সামনের দিকে ছুটে গেল। এত দ্রুত পুলিশের ঝামেলা দূর হয়ে যাবে এমনটা ভাবেনি সিরাজুল। মেয়েটিকে বলল, এবার গাড়ি থেকে নামুন।

মেয়েটি হঠাৎ যেন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, এত রাতে কোথায় যাব আমি ?

সিরাজুল অবাক হয়ে বলল, এত রাতে কোথায় যাবেন মানে…? আপনি কি বলতে চাচ্ছেন ? আপনি কোথায় যাবেন সেটা তো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি এক্ষুনি আমার গাড়ি থেকে নামবেন। না হলে আমি পুলিশকে খবর দেব!

মেয়েটির আগের মতোই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, পুলিশ ডাকলে আপনিই বিপদে পড়বেন। একটু আগে পুলিশের কাছে আমাকে আপনার স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এবার পুলিশকে কি বলবেন ?

মেয়েটির কথা শুনে সিরাজুল নিজেই নিজেকে বিশ্রী ভাষায় একটা গাল দিল। এরকম বোকামি কেউ করে ? পুর্লিশের কাছে সত্য ঘটনা প্রকাশ করলেই তো হতো। সিরাজুল কি মেয়েটির প্রতি কোনও কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে ? মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দরী। হোটেলের সেই আড্ডার কথা মনে পড়ল। কাজটা তো এই মেয়েকে দিয়েই সেরে ফেলে যায়। কিন্তু এই মেয়ে কি রাজী হবে ? তাছাড়া বাসায় মেয়েটিকে নিয়ে ঢুকবে কি করে ? দারোয়ান মোসাদ্দেক হয়তো নানা ধরনের প্রশ্ন করবে ? মেয়েটি কে ? তার পরিচয় কি ? এ ধরনের অনেক কথাই জানতে চাইবে। তখন কীভাবে সামাল দিবে সিরাজুল। হঠাৎ সিরাজুল বেশ সাহসী হয়ে উঠল। মেয়েটির ব্যাপারে পুলিশকে যে কথা বলেছে দারোয়ানকেও একই কথা বলবে। হুট করে বিয়ে করে ফেলেছে। মেয়েটি তার স্ত্রী। বিয়ের কথা বললে দারোয়ান হয়তো কথা বাড়াবে না। তার আগে মেয়েটির সঙ্গে কথা ফাইনাল করা দরকার।

কিন্তু সিরাজুলকে কিছু বলতে হলো না। মেয়েটিই তার সুর পাল্টাল। নিজের আসল পরিচয় তুলে ধরে সিরাজুলকে বলল, ‘ভাই আপনাকে সত্য কথাটাই বলি। আমি একজন রাস্তার মেয়ে। শরীর বিক্রি করে সংসার চালাই। প্রতি রাতে রাস্তায় দাঁড়াই। আপনার মতো কেউ না কেউ আমাকে কিনে নিয়ে যায়। আজও একই উদ্দেশে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ ৩/৪ জন সন্ত্রাসী চেহারার পুরুষ আমাকে একরাতের জন্য কিনতে চায়। ওরা একটি বাসায় নিয়ে আমাকে দলবদ্ধভাবে উপভোগ করতে চায়। অনেক টাকার প্রস্তাব। কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমার শরীর ভালো না। এক সঙ্গে এত মানুষের চাপ নিতে পারব না। তাই বাধ্য হয়ে আপনার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াই। একজনকে শরীর দিতে পারব। কিন্তু আজ একের অধিকজনকে পারব না। আপনাকে দেখে ভালো মানুষ মনে হচ্ছে। যদি সম্ভব হয় আজকের রাতটা আমাকে আপনার বাসায় আশ্রয় দিন। সকাল হলেই আমি চলে যাব।

মেয়েটির কথা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে সিরাজুল কিছুই বলল না। তবে দু’জনের মধ্যে একটা চুক্তি হলো। গাড়ি স্ট্রার্ট দিল সিরাজুল। গাড়ি ছুটে চলল রাস্তায়।

মেয়েটি তার নগ্ন শরীরে সিরাজুলের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। একটু আগে দুই হাত দিয়ে বুক ঢেকে রেখেছিল। এখন তার বুক খোলা। সিরাজুল একটি মেয়েকে নগ্ন চেহারায় দেখার জন্য যতটা উন্মুখ হয়ে উঠেছিল ততটাই বিব্রত বোধ করছে। তার শুধুই মনে হতে থাকলও কোনও কিছুই খোলামেলা ভালো নয়। একটু আগে সালোয়ার কামিজ পরা মেয়েটির জন্য যতটা আকর্ষণ অনুভব করেছিল এখন তার নগ্ন শরীর মোটেই ভালো লাগছে না। বিশ্রী লাগছে…

মেয়েটি সিরাজুলকে কাছে আসার জন্য আহবান জানাল। আসেন আমার খেলা শুরু করি।

সিরাজুল মেয়েটির কাছে যাবার ব্যাপারে মোটেই উৎসাহ দেখাল না। দুর থেকেই নির্দেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, আপনার শরীর ঢাকেন।

মেয়েটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলোÑশরীর ঢাকব মানে ? আপনিই তো এভাবে বলেছেন। চুক্তিটা তো এমনই ছিল।

সিরাজুল চুক্তির প্রসঙ্গ তুলল না। বরং বিরক্ত হয়ে বলল, আপনাকে শরীর ঢাকতে বলেছি, শরীর ঢাকেন। ন্যাংটা শরীরে আপনাকে বিশ্রী লাগছে।

মনে হলো সিরাজুলের কথা শুনে মেয়েটি অপমানিত হয়েছে। তাই উদ্ধত ভঙ্গিতে সিরাজুলের দিকে এগিয়ে এসে বলল, আপনার সাহস তো কম নয়। আমার শরীর নিয়ে কথা বলেন! জানেন এক্ষুনি আমি আপনার জীবনের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারি ?

মেয়েটির কথায় যারপর নাই অবাক হলো সিরাজুল। বারোটা বাজাবে মানে ? সে কী সিরাজুলের ক্ষতি করবে ? কিন্তু কীভাবে ?

মেয়েটি তার শরীর ঢাকল। অর্থাৎ সালোয়ার কামিজ পরল। তারপর শোবার ঘর থেকে পাশের ঘরে গেল। সেখান থেকেই উচ্চস্বরে বলল, আপনার বাসাটা খুব ছোট। তার মানে আপনি বেশি মালদার মানুষ না। তবে গাড়ি দেখে ভেবেছিলাম আপনি অনেক বড় লোক। মালদার পার্টি! বেশি না দুই লাখ দিলেই চলবে। দুই লাখ টাকা ছাড়েন। তা নাহলে আপনি অনেক বড় বিপদে পড়ে যাবেন। বলতে বলতে আবার শোবার ঘরে ঢুকল মেয়েটি। সিরাজুল নিজের কান ও চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এখন যা ঘটছে তা কি সত্যি সত্যি ঘটছে ? ডান হাতে চিমটি কেটে দেখল বাস্তবেই সব কিছু ঘটছে।

একটু আগের অসহায় মেয়েটি এখন দুর্দান্ত এক ভিলেন হয়ে উঠেছে। মুখে মৃদু হাসি ছড়িয়ে বলল, ছোট হলেও আপনার বাসাটা সুন্দর। আমার পছন্দ হয়েছে। এক কাজ করেন দুই লাখ টাকা বের করেন। বাইরে আমার লোকজন অপেক্ষা করছে। টাকাটা পেলেই আমি চলে যাব।

সিরাজুল এবার প্রতিবাদের সুরে বললÑদুই লাখ টাকা দিব মানে ? কেন দিব ? এই কে আপনি ?

মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, এখনও বুঝতে পারেননি আমি কে ? জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। নিচে রাস্তার দিকে দেখেন তাহলেই বুঝতে পারবেন আমি কে ?

সিরাজুলের শরীর কাঁপছে। মাথা গরম হয়ে গেছে। ধীর পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। নিচে রাস্তার ওপর ৪/৫ জন লোক দাঁড়িয়ে আছে। প্রেসক্লাবের সামনে এই লোকগুলোকেই দেখেছিল সিরাজুল। তার মানে সে কি একটা ট্র্যাপে পড়ে গেছে ?

মেয়েটি এগিয়ে এসে সিরাজুলকে বলল, ঘটনা বোধ করি এখন আপনার কাছে পরিষ্কার ? লোকগুলো আমারই লোক। টাকাটা দেন। আমি চলে যাই। অবশ্য দুই লাখ টাকা যদি ক্যাশ না থাকে তাহলে যা আছে তাই দেন। আর বাকিটা চেকে দিলেই চলবে! খবরদার চেক যেন বাউন্স না হয়।

সিরাজুল কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। হঠাৎ মেয়েটির কামিজের পকেটে থাকা মোবাইল ফোন বেজে উঠল। তার কাছে যে মোবাইল ফোন আছে এটা আগে টের পায়নি সিরাজুল। তাই সে অবাক হলো। মেয়েটি বেশ স্বাভাবিকভাবেই ফোনে কথা বলতে শুরু করল।

‘আরে ভাই তোমরা এত অস্থির হইতেছ ক্যান ? অভিনয় কি এতই সোজা ? এখন নাটকের ক্লাইমেক্স চলতেছে। আমার অভিনয়ে আমিই মুগ্ধ। রেজাল্টের অপেক্ষা করো। শোনো, আমারে আর ফোন দিও না। দরকার পরলে আমিই তোমাদেরকে ফোন দিব।’

ফোন কেটে দিয়ে সিরাজুলের দিকে তাকাল মেয়েটি। সিরাজুল একটা প্যাকেট ও একটি চেক বাড়িয়ে দিল মেয়েটির হাতে। মেয়েটি অভিভূত। সে ভাবতেই পারেনি এত দ্রুত সব কিছু ঘটে যাবে। হঠাৎ কেঁদে ফেলল মেয়েটি এবং চোখের পানি মুছতে মুছতে সিরাজুলকে বলল, আপনি কি আমাকে নিচে রাস্তা পর্যন্ত একটু এগিয়ে দিবেন ?

মেয়েটি এখন কাঁদছে। কিন্তু কেন ? এটাও কী তার অভিনয়। অভিনয়ের কান্না এত নিখুঁত হয় ? এত কিছু ভেবেও মন্ত্রমুগ্ধের মতো মেয়েটির কথায় রাজি হয়ে গেল সিরাজুল। বাড়ির সিঁড়ি ভেঙে মেয়েটিকে নিয়ে নীচতলায় এল। বাড়ির দারোয়ান মোসাদ্দেক এবার যারপর নাই অবাক। মুখ ফুটে সে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বাইরে অপেক্ষারত একটা গাড়িতে উঠে চলে গেল। সিরাজুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো গাড়িটার দিকে তাকিয়েই থাকল।

কয়েকদিন পরের ঘটনা। সিরাজুল শারীরিক ও মানিসকভাবে বেশ অসুস্থ। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। বন্ধুদের আড্ডায়ও যাচ্ছে না সে। সারাক্ষণ বাসায় থাকে। সেদিনের রাতের ঘটনা বাড়ির দারোয়ানের কল্যাণে জানাজানি হয়েছে। বাড়ির মালিক হায়দার আলি নিজেই সিরাজুলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। সব কিছু শুনে থানা পুলিশের সহায়তা নেবার কথা বলেছিলেন সিরাজুলকে। কিন্তু সিরাজুল ইচ্ছে করেই থানা পুলিশ পর্যন্ত যায়নি। মেয়েলি কোনও ঘটনা থানা পুলিশ পর্যন্ত গেলে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেয়ে যৌনতার দিকটাই গুরুত্ব পায় বেশি।

সেদিনের রাতের ঘটনায় এক অর্থে সিরাজুলই তো দায়ী। রাতের অন্ধকারে রাস্তার একটি মেয়েকে বাসায় তুলে এনেছিল। তার মানে সিরাজুলের মতলব ভালো ছিল না। পুলিশের কাছে অভিযোগ দিতে গেলে এই একটা বিষয়ে ধরা খাবে সিরাজুল। তার চেয়ে নীরব থাকাই ভালো। এক অর্থে সিরাজুলের শাস্তি হয়েছে। যে শাস্তি তার প্রাপ্য ছিল। বিবেকবোধ সম্পন্ন কোনও ভালো মানুষ কি এভাবে রাতের অন্ধকারে রাস্তার কোনও মেয়েকে নিজের বাসায় নিয়ে আসে ? উচিত শিক্ষা হয়েছে সিরাজুলের।

এত কিছু ভাবার পরও সেদিনের সেই মেয়েটিকে কোনও ভাবেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না সিরাজুল। সেই রাতে অল্প সময়ের মধ্যেই সিরাজুলের এই বাসাকে বদলে দিয়েছিল মেয়েটি। প্রথমে বদলে দেয় সিরাজুলের শোবার ঘর। বিছানার চাদর, বালিশের কাভার বদলে দেয়। অগোছালো লেখার টেবিল গুছিয়ে দেয়। বাথরুমে ঢুকে গোশলের আগে বাথরুম পরিষ্কার করে। মনে হচ্ছিল বাসার কর্ত্রী। মনে মনে এমন একটা মেয়েকেই জীবন সঙ্গী করতে চায় সিরাজুল। সৃৃষ্টিকর্তা বোধ করি তার আরজি শুনেছে। তাই মেয়েটি নিজে এসে হাজির হয়েছে। সিরাজুল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এই মেয়ে যদি রাজি হয় তাহলে তাকে বিয়ে করবে। কিন্তু কীভাবে যে কি হয়ে গেল! সিরাজুল মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় যত কঠিনই হোক মেয়েটাকে সে খুঁজে বের করবে। আজ রাতেই রাস্তায় নামবে সে। রাস্তার মেয়েকে নিশ্চয়ই রাস্তায়ই পাওয়া যাবে।

কলিং বেল বাজছে। এখন খাড়া দুপুর। অসময়ে কে এলে ? বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে দেয় সিরাজুল। দারোয়ানের পিছনে ডাক পিয়ন একটা চিঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। রেজিস্ট্রি চিঠি। সিরাজুলের সই লাগবে। কে চিঠি পাঠাল ? তাও আবার রেজিস্ট্রি চিঠি। কৌতূহল হচ্ছে। রেজিস্ট্রি স্লিপে সই দিল সিরাজুল। চিঠি প্রাপকের হাতে পৌঁছে গেছে। তার মানে ঘটনা শেষ। এখন তো ডাক পিয়নের চলে যাবার কথা। কিন্তু সে যাচ্ছে না। সিরাজুলকে বার-বার আড়চোখে দেখছে। দারোয়ান ঘটনাটা পরিষ্কার করে দিল। সিরাজুলকে বলল, স্যার পিয়ন আপনার চিঠি নিয়া পাঁচতলা পর্যন্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠেছে। দশ-বিশ টাকা যা পারেন বকশিস দেন!

সিরাজুলকে কথাটা বলার পর দারোয়ান উপযাচক হয়ে পিয়নকে বলল, ভাই চিন্তা করবেন না। স্যার খুব মাইডিয়ার মানুষ। দশ-বিশ টাকা তার কাছে কোনও বিষয় না।

টেবিলের ড্রয়ার থেকে ২টা ৫০ টাকার নোট বের করল সিরাজুল। একটা পিয়নের হাতে দিল। আরেকটা দারোয়ানের হাতে দিতেই দারোয়ান খুশি হয়ে ডাক পিয়নকে বলল, ভাই হাতে হাতে তো প্রমাণ পাইলেন আমাদের স্যার কেমন, স্যার দিল দরাজ মানুষ ? আশা করছিলাম ২০ টাকা। পাইলাম ৫০ টাকা। দু’জনই সিরাজুলকে লম্বা সালাম ঠুকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল!

চিঠিখানা বেশ ভারী। প্রেরকের জায়গায় একটি মেয়ের নাম লেখা। রোখশানা ইয়াসমিন, শান্তিনগর ঢাকা। একটি মোবাইল নম্বরও দেওয়া আছে। কে এই রোকশানা ? টেবিল থেকে মোবাইল ফোন তুলে নিয়ে চিঠির প্রেরকের ঘরে উল্লিখিত মোবাইল নম্বরে ফোন করল সিরাজুল। ফোন বন্ধ। কৌতূহল দমাতে দ্রুত চিঠিখানা খুলল সিরাজুল। ফুল স্কেপ সাইজ কাগজে চার ভাঁজ করা বেশ লম্বা চিঠি। চিঠির ভাঁজ খুলতেই টুপ করে একটা চেক মেঝের ওপর পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল সিরাজুল। এটা তো সেই চেক। সেদিন রাতে প্রায় জোর করে এই চেক লিখে নিয়েছিল মেয়েটি। ঘটনা কি ? এই চেক ফিরে এল কীভাবে ? মেয়েটিই কি ফেরত পাঠিয়েছে। প্রেরকের জায়গায় রোখশানা ইয়াসমিন লেখা। তার মানে ওই মেয়েটির নামই কি রোখশানা ? বিছানায় বসে চিঠি খানা পড়তে শুরু করল সিরাজুল।

সুন্দর, গোটা গোটা হাতের লেখা।

শ্রদ্ধাভাজনেষু, সালাম নিবেন। আমার পরিচয় বোধকরি এতক্ষণে জেনে ফেলেছেন। সেদিনের ঘটনার জন্য আমি সত্যি দুঃখিত। আপনার মতো ভালো মানুষের সঙ্গে আমার এরকম ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। তবে সমস্যা কি জানেন, খারাপ মানুষকে সহজেই চিনে ফেলা যায়। কিন্তু ভালো মানুষকে সহজেই চেনা যায় না। কারণ প্রত্যেকটা খারাপ মানুষ ভালো মানুষের মুখোশ পড়ে থাকে। সেজন্য প্রকৃত ভালো মানুষকেও আমরা সন্দেহ করি। যেমন শুরুতে আপনাকে আমার ভালো মানুষ মনে হয়নি।

ও হ্যা, এবার বোধকরি আমার আসল পরিচয়টা তুলে ধরা প্রয়োজন। নাম রোখশানা। আমাদের একটা গ্যাং আছে (বিশেষ অনুরোধ প্রচার মাধ্যমে আমাদের এই তথ্যগুলো জানাবেন না। তাহলে না খেয়ে মারা যাব।) আমাদের গ্যাং-এ পুরুষ-মহিলা সমান সমান। রাতে আমাদের কর্মকাণ্ড শুরু হয়। মেয়েদের কাজ হলো যে কোনও মূল্যে ধনবান কোনও পুরুষকে শিকার হিসেবে টার্গেট করা। এ সময় পুরুষ সদস্যরা নারী সদস্যদেরকে ফলো করবে। নারী সদস্যের কাজই হলো বিত্তবান কোনও পুরুষকে টার্গেট করা। চরম বিপদে পড়েছে বলে টার্গেটের কাছে সহযোগিতা চাইবে। অনেক সময় টার্গেট কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না। কাজেই টার্গেট খুঁজে পেতে বেশ কষ্ট। এজন্য অভিনয়ের আশ্রয় নিতে হয়। টার্গেটকে রাজি করানো সম্ভব হলে মহিলা সদস্য টার্গেটের গাড়িতে উঠে বসে। পুরুষ সদস্যরা তখন ওই গাড়িকে ফলো করে। টার্গেটের বাসা পর্যন্ত যায়। মহিলা সদস্য তার অভিনয়ের গুণে টার্গেটকে এতটাই দুর্বল করে ফেলে যে সে যা বলে টার্গেট তাই করে। এ ক্ষেত্রে আমরা কয়েকটা পদ্ধতি অবলম্বন করি। টার্গেটকে অতিরিক্ত চালাক মনে হলে শরীর বিনিময়ের সময় কৌশলে মোবাইল ফোনে আপত্তিকর দৃশ্য ধারণ করি। তারপর সুযোগ বুঝে কোমল হৃদয়ের নারী থেকে দস্যুরানির ভূমিকায় অবতীর্ণ হই। যার যা সামর্থ্য বুঝে অর্থ দাবি করি। অর্থ দিতে রাজি না হলে বাইরে অপেক্ষমাণ পুরষ সদস্যদেরকে ফোন করি। তারা তাদের অ্যাকশন শুরু করে দেয়। অ্যাকশন মানে টার্গেটকে বাইরে থেকে ভয় দেখানো। ‘আপনি তো মিয়া খুবই বাজে লোক। একটা রাস্তার মেয়েকে বাসায় নিয়ে এসেছেন। মেয়েটি যা বলে তাই করেন। তা না হলে আপনার কপালে দুঃখ আছে…’

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ধরনের হুমকিতে কাজ হয়। মান সম্মানের ভয়ে টার্গেট কোনও প্রকার উচ্চবাচ্য না করে টাকা দিয়ে দেয়। আবার অতি ধুরন্ধর যারা তারা কোনও প্রকার ভয়-ভীতির তোয়াক্কা করে না। দাপট দেখিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। আমার জীবনে একবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। এক রাত থানায় থাকতে হয়েছে। পরের দিনই আমাকে কোর্টে চালান করে দেওয়ার কথা। কিন্তু রাতে ওসি সাহেবের আবদার পূরণ করলাম। পরের দিন আর কোর্টে যেতে হলো না।

ও হ্যাঁ, ভালো কথা। এতক্ষণে আমার প্রতি আপনি বোধ করি চরম বিরক্ত হয়েছেন। হয়তো ভাবছেন আমি কেন এই অন্ধকার পথে পা বাড়ালাম ? শুনবেন আমি কেন এই অন্ধকার পথে পা বাড়িয়েছি ? শুনুন তাহলে। আমার বাবা আজিজুল ইসলাম ডাক বিভাগে চাকরি করতেন। আমরা ৫ ভাই-বোন। ৪ জনই বোন। একজন ভাই, সবার ছোট। আমি সবার বড়। বাবার সামান্য আয়ে আমাদের সংসার কোনওমতে চলে যেত। আমি তখন ঢাকার একটি নামকরা কলেজে পড়ি। অন্য ভাই-বোনেরা সবাই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী। কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি আমি টিউশনি করতাম। বলতে পারেন নিম্নবিত্ত একটা পরিবার সিনেমার কাহিনির মতো বড় লোক হবার স্বপ্ন দেখছে। হঠাৎ স্বপ্নটা ভেঙে গেল। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা মারা গেলেন। ভাবুন একবার, সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বেঁচে না থাকলে সংসারের অবস্থাটা কি হতে পাওে ? নিজের লেখাপড়ার পাশাপাশি ভাই-বোনদের লেখাপড়াও বন্ধ হবার মতো অবস্থা তৈরি হলো। ঠিকমতো সংসারই চলে না। সেখানে স্কুল কলেজের খরচ চালানো খুবই কঠিন হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম পরিবারের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কি-ই বা করতে পারি ? একজনকে ভালোবাসতাম। জীবনে আমরা কোনওদিন কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না এমন শপথ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার বিপদ দেখে ভালোবাসার সেই রাজপুত্র কৌশলে শটকে পড়ল। কাজেই বুঝতে পারছেন আমার মানিসক অবস্থার কথা! একদিন সাহস করে আমি যে বাসায় টিউশনি করাই অর্থাৎ আমার ছাত্রের বাবাকে সব খুলে বললাম। তিনি আমার সব কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। আমার ছাত্রের মা তার স্বামীর কাছে আমার হয়ে সুপারিশ করলেনÑদেখো না গো মেয়েটাকে হেল্প করতে পার কি না। তোমাদের অফিসে কোনও একটা পোস্টে চাকরি দিয়ে দাও না।

ভদ্রলোকের শিপিং ব্যবসা। পরের দিন আমাকে তার অফিসে যেতে বললেন। পরের দিন তার অফিসে গেলাম। আমাকে দেখে তিনি বেশ খুশি। ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বললেন। আমি তার সঙ্গে গাড়িতে উঠলাম। আমি একটু একটু ভয় পাচ্ছিলাম। ভদ্রলোক কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে ? সাহস করে জিজ্ঞেস করলামÑআঙ্কেল আমরা কোথায় যাচ্ছি ? আঙ্কেল মৃদু হেসে বললেন, আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হয়েছে। তার কাছে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। আশা করি তোমার একটা ভালো চাকরি হয়ে যাবে।

ভালো চাকরির আশায় কিছুই বললাম না। ঢাকার একটা নামকরা হোটেলে ঢুকলাম আমরা। আঙ্কেল হোটেলের রিসেপশনের সামনে যেতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন হোটেল কর্মচারী তার হাতে একটা চাবি তুলে দিল। এরপর সেদিন আমি ওই হোটেলে প্রথম আমার সতীর্থ হারালাম।

চিঠিখানা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই আপনি ধৈর্য হারাচ্ছেন। কাজেই ইতি টানা দরকার। ওই ঘটনার পর আমার আঙ্কেলরূপী বদমায়েশ পুরুষটি আরও কয়েকবার আমার শরীর উপভোগ করে। প্রতিবারই আমাকে একটা চাকরি লোভ দেখিয়েছে। কিন্তু আমার চাকরি হয়নি। সরল মনে ছাত্রের মায়ের কাছে নালিশ করেছিলাম। তাতে হিতে বিপরীত হলো। আমার টিউশনিটাও চলে গেল। আমাকে দুশ্চরিত্রা অপবাদ দিয়ে বলতে গেলে তাড়িয়ে দিলেন তথাকথিত ওই ভদ্রমহিলা। ওই মহিলাকে ‘তথাকথিত’ কেন বললাম জানেন ? চরিত্রগতভাবে তিনি তার স্বামীর থেকে এক ডিগ্রি ওপরে চলাফেরা করেন। তার একাধিক বয়ফ্রেন্ড আছে। স্বামীর কু-কীর্তি ফাঁস হওয়ায় মহিলা বেশ খুশি হন। কারণ এখন তার স্বামী কোনওভাবেই তার দিকে চোখ তুলে কথা বলতে পারবে না।

চিঠিখানা শেষ করি। সংসারের পুরো ভার আমার ওপর। একটা কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছি। ঘটনাচক্রে পরিচয় হয় এলাকার এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে। মন্দ লোক। বাধ্য হয়ে তার মন্দ ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। বাসার লোকজন জানে আমি একটি হোটেলে রাতে রিসিপশনিস্ট হিসেবে কাজ করি। কিন্তু তারা কতদিন আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারবে জানি না। কারণ সত্য কোনও দিন চাপা থাকে না।

এবার আসি আপনার কথায়। আপনি এত সরল সহজ কেন ? রাতের অন্ধকারে একটা মেয়ে দৌড়ে এসে আপনার কাছে সাহায্য চাইল আর আপনি তাকে বিশ্বাস করে ফেললেন ? জীবনে এ ধরনের বোকামি আর করবেন না। তবে আপনার সারল্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম বাসায় ঢোকা মাত্র আপনি হায়েনার মতো আমার শরীর খামচে ধরবেন। কিন্তু আপনি মোটেও তা করলেন না। বরং আমাকে সংসারের সব কিছু খুলে দিলেন। সত্যি কথা বলতে কি নিজেকে ওই বাসার কর্ত্রী মনে হচ্ছিল। স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম। বাসায় ফিরে নিজের সংসার গোছাচ্ছি। শোবার ঘরটা আমার। বাথরুমটা আমার। বাসার ছোট্ট লনটা আমার। বারান্দায় ছোট্ট টবে গোলাপ ফুটেছে। ওই গোলাপও আমার। সত্যি বলতে কী এমন একটা সংসারই চেয়েছিলাম আমি! কিন্তু ইহজনমে কোনও দিনই সংসার করা হবে না। আফসোস!

আপনি আমার কপালে একটা চুমো খেয়েছেন এজন্য অনেক কৃতজ্ঞতা। আপনি হয়তো জেনে অবাক হবেন, আমি প্রতিদিন আমার নষ্ট শরীর ধুয়ে ফেলি কিন্তু কপালটা ধুই না! পাছে না আপনার স্পর্শ মুছে যায়।

চিঠিতে অনেক কথা লিখলাম। কেন লিখলাম জানি না। ও হ্যাঁ, একটা জরুরি কথা বলি, সহজেই কাউকে বিশ্বাস করবেন না। জীবনের প্রয়োজনে দরদাম করাও লাগে। সেদিন রাতে আপনাকে ট্র্যাপে ফেলে ২ লাখ টাকা চাইলাম আর আপনি সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিলেন। আপনি এত বোকা কেন ? আপনি যদি বার্গেনিং করে আমাদেরকে ৫০ হাজার টাকাও দিতে চাইতেন আমরা তাতেও রাজি হয়ে যেতাম! আপনি কি কোনও কারণে আমার ওপর দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন ? খবরদার এ ধরনের ভুল আর করবেন না। আপনার কাছে থেকে নেওয়া ক্যাশ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। ওই টাকা আপনি আর পাবেন না। অনেক প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির মোকাবিলা করে এক লাখ ৪০ হাজার টাকার চেকটি ফেরৎ পাঠালাম। এজন্য আমাকে মহান ভাবার কোনও কারণ নেই।

শেষে একটি অনুরোধ করি। আশা করি অনুরোধটি রাখবেন। আমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখবেন। কবিতার শিরোনাম হবে ‘রাস্তার মেয়ে’। ভবিষ্যতে আপনাকে অনেক বড় কবি হিসেবে দেখতে চাই। অনেক বড় কবি…

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : আবু হাসান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares