গল্প : জোছনার মতো ভালোবাসা : বেগম জাহান আরা

দরজায় ঠকঠক করে দুটো শব্দ―কেউ আসবে ঘরে। বললাম, ভেতরে আসেন। সালোয়ার কামিজ আর মাথায় ওড়না দিয়ে এক মহিলা এসে দাঁড়াল।

সালামালেকুম। আমি কুবরা।

ও হ্যাঁ, সিস্টার বলেছিল আপনার কথা।

সকালেই সিস্টার বলেছিল, একজন পাকিস্তানি রোগী আছে আমাদের ক্লিনিকে। তুমি বাংলাদেশি শুনে সে দেখা করতে চায়। তুমি কি কথা বলবে ?

মনে মনে ভেবেছিল রাহেলা, এটা কেমন সংকোচ ? সে কি মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কথা মনে রেখেই এই সংকোচ বোধ করছে ? বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এখনও ভালো না। রক্তের দাগ মোছেনি এখনও। বয়সি মানুষদের বুকের ভেতর ঘা থকথক করে। এমন কোনও পরিবার ছিল না যাদের পিঠে মুক্তিযুদ্ধের আঁচ আর আঁচড় পড়েনি।

সিস্টারকে বলেছিল, দেখা করব ওর সঙ্গে। আজই বলে দিয়ো কথাটা।

এই তাহলে সেই পাকিস্তানি রোগী ?

সালামের উত্তর দিয়ে রাহেলা বলে, বসুন।

ঘরে দুটো চেয়ার। আমার বিছানার সঙ্গে লাগানো হাতলঅলা একটা চেয়ার। আর ব্যালকনির দরজার দিকে একটা। ওটায় হাতল নেই। চেয়ারটা বিছানার কাছে টেনে এনে বসল মহিলা। ও কথাই শুরু করল উর্দুতে। ওর ধারণা বাংলাদেশের সবাই উর্দু জানে। শুধু ও নয়, এখানকার কয়েকজন পাকিস্তানিকে দেখেছে রাহেলা। সবারই ধারণা, বাংলাদেশের সকল মানুষ উর্দু জানে। কি অর্বাচীন!

রাহেলা বলে, উর্দু আমি জানি না। ইংরেজিতে কথা বলি ?

আমি ইংরেজি জানি না। তাহলে জার্মান ভাষায় কথা বলি ?

ওটাও আমি খুব কম জানি। মানে, যতটুকু বুঝি, তার অর্ধেকও বলতে পারি না।

রাহেলা হিপ রিপ্লেসমেন্ট করে আট দিনের দিন এই রিহ্যাব ক্লিনিকে এসেছে। পুরো নাম, ‘হেলিয়স রেহা ক্লিনিক’। রেহা হল, রিহ্যাবিলিটেশন। এই অপারেশনের পর তিন থেকে চার সপ্তাহ ফিজিওথেরাপি নিতে হয়। বাল্টিক সাগরের একেবারে কোলে ‘ডাম’ শহর। এখানে গড়ে উঠেছে চমৎকার আধুনিক দরদালান। তার মধ্যে এই রেহা ক্লিনিকের দশ তলা ভবন একটা। উত্তর জার্মানির এই শহর পর্যটনের জন্য খ্যাত। প্রতিটা ঘরের সঙ্গে তিনকোণা ব্যালকনি। দাঁড়ালে সাগরের দিগন্ত-বিস্তারি থই থই জলরাশির উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তীরে ছোট ছোট নৌকা বুকের ওপর উদ্ধত মাস্তুল নিয়ে অপেক্ষা করে পর্যটকদের জন্য। মানুষ আসবে, পাল উড়িয়ে নৌকা নিয়ে ঢেউ ভেঙে ভেঙে নেচে বেড়াবে সেই আশায়। গম গম করা পর্যটক নেই, তবে কিছু মানুষের আনাগোনা সব সময় থাকে।

এদেশে তো মানুষের চেয়ে মানুষের জীবনের উপকরণ অনেক বেশি। তাই অলস প্রহর গোনে নৌকাগুলো। যদি কক্সেসবাজার হতো, তাহলে এতগুলো নৌকার একটাও বসে থাকত না। গিজগিজ করত প্রমোদে উন্মুখ মানুষ, কাড়াকাড়ি করত নৌকা নিয়ে। আর ব্যবস্থাপনারও ব্যাপার আছে। সেটা তো বলতেই হবে। বাড়াবাড়ি রকমের নিয়ম, যেন রুটিন-মেশিন। এদিক-ওদিক হওয়ার জো নেই।

দুই পা টান টান করে শুয়ে আছে রাহেলা। একটু একটু করে গল্প শুরু হল জার্মান আর উর্দু ভাষার মিশ্রণে। সে এক আজব কম্বিনেশন। তবু ভাবের আদান-প্রদানে খুব একটা অসুবিধে হলো না। মহিলার নাম কুবরা।

জানতে চাইল রাহেলা, মানে কি ?

জানি না।

পাকিস্তানের কোথায় ঘর ?

লাহোর। তবে লাহোর থেকে ছয় ঘণ্টা বাসে যেতে হয়। পথ খারাপ না।

দেশে কে কে আছে ?

বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই আছে।

ভাষার মিশ্রণের কারণেই হয়তো সম্বোধনের ‘আপনি’ নেমে এল ‘তুমি’তে। রাহেলা প্রশ্ন করে, তুমি জার্মানিতে এলে কি করে ?

আমার স্বামীর সঙ্গে এসেছি।

স্বামী কি করে ?

আগে কাজ করত। এখন করে না।

মানে ?

এখন শুধু মদ খায়। নির্বিকার ভাষ্য কুবরার।

সংসার চলে কী করে ?

আমি কিচেনে কাজ করি।

লক্ষ্য করল রাহেলা, কুবরা বেশ সুঠাম স্বাস্থ্যের মেয়ে। বাংলাদেশের অনেক অনেক ছেলে এদেশের কিচেনে কাজ করে। কিন্তু কোনও মেয়ের কথা জানে না রাহেলা। শক্ত কাজ।

তাতে সংসার চলে যায় ? তোমার স্বামীর মদের পয়সাও হয়ে যায় ?

না, ও সরকারি সাহায্য পায়।

ছেলে মেয়ে কয়টা ?

দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। দুই ছেলে লেখাপড়া করছে।

কতদিন আছো জার্মানিতে ?

ছাব্বিশ বছর।

জার্মান ভাষা বেশ ভালো শিখেছ তো!

হ্যাঁ, লেখাপড়া তো শিখিনি। এখানে এসে এই ভাষাটা শুনে শুনে শিখেছি।

দেশে লেখা পড়া করোনি কেন ? 

আমার বাবা গরিব ছিল। ভাইদের স্কুলে পাঠিয়েছিল। মেয়েদেরকে পারেনি।

একবিংশ শতাব্দীতে এমন কথা শুনতে খুব কষ্ট হয়। এই উপমহাদেশে এখনও নারী-পুরুষের এরকম বৈষম্য বেশ চালু আছে। নীরবে তা মেনে নেয় মেয়েরা। রাহেলা ভালো করে কুবরার মুখের দিকে তাকায়। কি কমনীয় আর মিষ্টি মুখখানা। এ চেহারার গুণেই হয়তো কোনও এক ভাগ্যান্বেষী যুবকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। বেঁচে গেছে না দহে পড়েছে, বলা যায় না। তবে কুবরাকে খুশিই মনে হয়।

কুবরা বলে, তোমার ডান পা বেশ ফুলে আছে।

এখন একটু কম মনে হয়। আরও ফুলেছিল।

আমি একটু দাবিয়ে দিই ?

সে কি কথা কুবরা ? হাঁ হাঁ করে ওঠে রাহেলা। বলে, আমার পা দাবিয়ে দেবে কেন তুমি ? কী করে তা হয়!

আমি তো তোমার মেয়ে হতে পারতাম মা জি।

এ কী শব্দ উচ্চারণ করল পাকিস্তানি মেয়ে কুবরা ? দুই চোখ ভাসিয়ে অশ্রু গড়াতে লাগল রাহেলার। কোথায় বাংলাদেশ, কোথায় পাকিস্তান আর কোথায় জার্মানি ? গল্প উপন্যাসে পড়েছে, মন দিয়ে মন ছুঁতে জানলে পৃথিবী তোলপাড় হয়ে যায়। মানচিত্রের সীমারেখা ভেঙে মানুষ অভিন্ন বাতাবরণে আসে। যেখানে শুধু হৃদয়গুলো ফুটে থাকে তাদের সমস্ত সুকুমার শোভা আর অনুপম গন্ধ নিয়ে।

মা জি, কাঁদছ কেন ? কষ্ট হচ্ছে ?

বড় ব্যথা কুবরা। খুব কষ্ট।

আমি তো দেখতেই পাচ্ছি। আমারও তো মেরুদণ্ডের হাড়ে অপারেশন হয়েছিল। আমি জানি কষ্ট কতটা হয়।

তুমি কেমন আছ এখন ?

অনেক ভালো।

কতদিন হলো এখানে আছ ?

চার সপ্তা। আগামী সপ্তায় ঘর যাব। আর কথা নয় মা জি। তোমার বডি মিল্ক কোথায় আছে বল ? এবার একটু কাজ করি। বাথরুমে―

রাহেলা ব্যথায় প্রাণান্ত। দৈনিক আটটা নোভালজিন খেয়েও তেমন একটা কমছে না ব্যথার তোড়। ডাক্তার বলেছেন, চাইলে আরও খেতে পারে রাহেলা। কিন্তু সে চায় না। এতেই পেটে ব্যথা শুরু হয়েছে। সে আর এক জ¦ালা। হয়তো ভালো লাগবে মালিশ করে দিলে। কিন্তু পায়ে মালিশ নেয়ার সংকোচটাও লজ্জা দিচ্ছে। এমন অলৌকিকভাবে এ সেবা নেমে আসবে তার ঘরে, তা সে ভাবতেই পারেনি। একটু আরামের লোভে আর বাধা দিল না। লোভের কাছে মানুষ কত সহজে হেরে যায়।

কুবরা বাথরুম থেকে ‘ডাভ’ ব্রান্ডের বডি লোশন আনল। চেয়ার টেনে বিছানার কাছে এল। তারপর চেয়ারে রাখা ছোট তোয়ালে বিছানার চাদরের ওপর বিছিয়ে তার ওপরে রাখল রাহেলার ডান পা। এবার সত্যি মায়ের মতো মমতায় নরম করে মালিশ করতে লাগল কুবরা। যেন কতকালের চেনা মানুষ। কত মায়ার সম্পর্ক তার সঙ্গে। কী আশ্চর্য ঘটনা! অথচ ওর সঙ্গে দেখা করার আগে ভেবেছিল, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিন্দা করবে। বলবে, পাকিস্তানিদের আমরা কোনও দিন আপন ভাবতে পারব না। তারা আমাদের জানের দুশমন হয়েই থাকবে। রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেমনই হোক, আমাদের জীবনে যে দুর্যোগ ওরা এনেছিল, আমরা তা ভুলব না। ওদের রচিত কবর থেকে ফিরে এসেছেন বঙ্গবন্ধু। রাজনৈতিক অর্থে উদারতা দেখালেও, ওরা তা বোঝেনি। এ দেশের সাধারণ মানুষ কোনও দিন বন্ধু হবে না পাকিস্তানের।

কুবরা পা মালিশ করছে। কী অসাধারণ আরাম লাগছে। সাজানো কথাগুলো আস্তে আস্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে রাহেলার। সত্যি তো, একাত্তরের যুদ্ধে যাই হোক, কুবরা তো তার অংশীদার নয়। হয়তো সে তখন একেবারেই শিশু। হয়তো সে জানেই না যুদ্ধের কথা। আবার চোখে নামে নীরব অশ্রুর বন্যা। এই মেয়ে পাকিস্তানি, কে বলবে ? তাকে ‘মা’ ডেকেছে। মেয়ের মতো সেবা করছে। কেমন করে ঘটছে অ্যাঁ! এই মেয়ে মদ্যপ স্বামী নিয়ে বেঁচে আছে এই পরদেশে। তিন ছেলেমেয়ে মানুষ করেছে। ভাষা শিখেছে নিজের চেষ্টায়। কাজ করে কিচেনে। ছেলেরাই যেখানে পরিশ্রান্ত হয়ে ওঠে। কুবরা বলেছে, বাচ্চারা ওর খুব ন্যাওটা। হবেই তো! এমন মায়াবতী মাকে ভালোবাসবেই তো বাচ্চারা।

আবার হারিয়ে গেল মানবিক ভালোমানুষ ‘এসএইচআই’। মনে হলো কুবরার হাত দিয়ে সারা পাকিস্তান বুঝি বাংলাদেশি রাহেলার পা ধরে মাফ চাইছে। এই মুহূর্তে কেউ তারা মানুষ নয়, মানচিত্র। দুটি স্বাধীন দেশের প্রতীক। একদিকে বাংলাদেশ আর অন্যদিকে পাকিস্তান। আবার ঘুরে দাঁড়াল মন। না না ওসব কিছুই না। এই মুহূর্তে দুটি মানুষের মধ্যে বিনিময় হচ্ছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার। এ আরেক রকম পৃথিবী। হঠাৎ করেই দেখা দেয় মানুষের জীবনে।

এবার রাখো কুবরা। খুব আরাম পেলাম।

বলেছিলাম না মা জি, দাবিয়ে দিলে ভালো লাগবে।

তোমাকে ধন্যবাদ দেব না কুবরা। ভালোবাসা দিব। আর কি বলি বলো তো ?

কিছু বলতে হবে না মা জি। হ্যাঁ, তোমার কোনও ছোট কাপড়―মানে আন্ডারওয়্যার, প্যান্টি―থাকলে কাল এসে ধুয়ে দেব।

না না কুবরা, আমার কোনও কিছু নেই ধোয়ার।

ঠিক আছে, আমি কাল আসব আবার।

বিস্ময়ের শেষ নেই রাহেলার।

কবি এমনি বলেননি, ‘সবচেয়ে দুর্গম যে মানুষ আপন অন্তরালে যার কোনও পরিমাপ নেই, বাহিরের দেশ-কালে সে অন্তরময়―অন্তর মেশালে তবে তার অন্তরের পরিচয়।’

রবীন্দ্রনাথ বহু দেশ ঘুরেছেন। বহু মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছেন। বহু মনকে তিনি ছুঁয়েছেন। বহু মন তাঁকে ছুঁয়েছে। তাই তো তিনি এমন করে বুঝেছিলেন যে, কারও মনের কাছাকাছি আসার জন্য দেশ-কালের মাপ কোনও হিসেব নয়। দুটি হৃদপদ্ম যখন পরস্পরকে দেখা মাত্র ফুটে ওঠে পরম আনন্দে, তখন সেই ওপরের মহাজনও অপার তৃপ্তিতে হাসেন। ভাবেন, তাঁর দাবা খেলায় আকস্মিক কিস্তি মাত না হলে মজা কোথায় ? 

পরদিনও এল কুবরা।

ছোট একটা বাটিতে আপেল, নাশপাতি আর আলু বোখারা কেটে নিয়ে এসেছে। বলল, তার ছেলে এসেছিল দেখতে। ‘কিল’ শহর থেকে ‘ডাম’ দুই ঘণ্টার পথ ট্রেনে। প্রতি সপ্তায় দুই ছেলেই পালা করে আসে। বড়ো ছেলে এনেছে ফলগুলো। তারই ভাগ রাহেলাকে দিতে চায় কুবরা। খুব সমাদর করে নেয় রাহেলা ফলগুলো। ওর সামনেই খায় দুই এক টুকরা ফল। খুশিতে ঝলমল করে ওঠে কুবরার চোখ-মুখ।

তোমার দেশেও তো খুব ফল হয়, তাই না বিটিয়া ? মুখ ফসকে বেরিয়ে এল শব্দটা।

অবাক হয় না কুবরা। যেন এই সম্বোধনেই আমি ওকে ডেকে থাকি। একটু হেসে বলল, হ্যাঁ, আমাদের নিজেদেরই ফলবাগান আছে।

আমাদের দেশে এই সব ফল হয় না।

তাই নাকি ? কেন ?

মাটি আর আবহাওয়ার ব্যাপার কুবরা। তবে আমি যখন জার্মানিতে আসি, তখন এসব ফল খুব খাই। ভালোবেসে খাই।

এখন যাই মা জি, আমি কাল আবার আনব।

না না, ওই তো দেখছ টেবিলের ওপর আপেল জমে গেছে।

খাওনি কেন ?

শরীরটা বড়ো খারাপ। এত ব্যথা যে খাওয়া দাওয়া ভালো লাগছে না। আমার জীবনে অনেক অপারেশন হয়েছে। কিন্তু হিপ রিপ্লেসমেন্টের মতো দারুণ ব্যথার অপারেশন আর হয়নি। খুব কষ্টে যাচ্ছে দিন।

দুই সপ্তা পর থেকে একটু একটু করে কমবে মা জি। নাও শুয়ে পড়ো পা লম্বা করে। একটু দাবিয়ে দিয়েই যাই―

স্বচ্ছন্দ সমর্পণে রাহেলা কুবরার কথা মতো পা মেলে শুয়ে পড়ে। কুবরার মমতার হাতের মালিশে আজও আরাম পেল রাহেলা। ইচ্ছে হলো, এই প্রবাসে নির্জনে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে।

ডাম শহরের রেহা ক্লিনিকে একজন পাকিস্তানি মেয়ের এমন নিখাঁদ ভালোবাসা অপেক্ষা করছিল তার জন্য, এ যেন স্বপ্নেরও অতীত। সবই ওই মহাজনের কারসাজি। কার জন্য কোথায় কি সাজিয়ে রাখেন তিনি, কেউ জানতে পারে না।

পরদিন সন্ধ্যায় কুবরা এল না।

কী অস্থিরতা রাহেলার! কী হতে পারে মেয়েটার ? কেমন একটা প্রতীক্ষা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মনে হয়, এই বুঝি এল। এই বুঝি এল।

খাঁ খাঁ করে উঠল এই সন্ধ্যা।

একসময় ঘর থেকে ফোনকল করল রাহেলা।

কুবরা জানাল, আজ তবিয়ত ভালো নেই মা জি। মেডিসিন উডিসিন নিয়ে শুয়ে পড়েছি। তবে আমার গলতি হয়েছে, তোমাকে জানানো উচিত ছিল যে, আজ আমি আসতে পারছি না।

কী যে বলো কুবরা, এতে গলতি কোথায় ? তোমার কথা ভাবছিলাম কি না, তাই ফোন দিয়েছি। ভালো থেকো। বিশ্রাম নাও।

তারপর দিন দুপুরের দিকে কুবরা আবার হাতে একটা বাটি নিয়ে এল। ছোট ছেলে এসেছে কিল থেকে। সেখানকার প্রতিবেশী ছেলের হাতে বাসমতি চালের মটরশুঁটি পোলাও পাঠিয়েছে কুবরার জন্য। সঙ্গে পুদিনা পাতার চাটনি। বলল, মা জি, তোমার জন্য সামান্য একটু পোলাও এনেছি। কুবরার হাত ধরে কাছে বসালো রাহেলা। বলল, এত দূর থেকে তোমার ছেলে খাবার এনেছে তোমার জন্যে। সেখান থেকে আমাকে কেন দিচ্ছো বিটিয়া ?

তোমাকে দেখেই মা বলে মেনেছি। সামান্য খাবারই তো। তোমাকে একটু না দিয়ে খাই কেমন করে! খেয়ে দেখো ভালো লাগবে।

তোমাকে তো আমি কিছু দিতে পারছি না। বিশেষ করে তোমার ছেলের  জন্য কিছু দিতে ইচ্ছে করছে।

আমার ছেলের জন্য কিছু দিতে হবে না। তবে তোমার যদি কিছু কিনতে হয়, তাহলে বলো আমাকে। নিচে দোকান আছে। টুকটাক জিনিস কেনা যায়।

আজ নয়। তবে ওই যে বিস্কুটের প্যাকেট আছে ওটা নিয়ে যাও তোমার ছেলের জন্য।

তুমি খাবে কি ?

অন্য ভাঙা প্যাকেটে আছে কিছু। তাছাড়া খেতেই তো পারি না কিছু।

বেশি সাধাসাধি নেই। লক্ষ্মী মেয়ের মতো প্যাকেটটা নিল কুবরা। রাহেলা জানতে চাইল, তোমার ছেলে কি চলে যাবে আজই ?

না। আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছি, ও আজ আমার সঙ্গে থাকবে।

হাসল একটু, বিছানা খুবই ছোট না ?

কুবরা হেসে বলে, আমার বাচ্চারা আমার সঙ্গে ঘুমাতে খুবই পছন্দ করে। মেয়ে বিয়ে হয়ে দুবাইতে চলে যাওয়ার পর থেকে এই ছেলে আমার কছে শোয়। হয়ে যাবে আমাদের। তুমি চাউলটা খেয়ে নিও। চাটনিটা তিখট, মানে ঝাল কিন্তু। আমি আসব সন্ধ্যাবেলায়।

আজ আর এসো না বিটিয়া। ছেলেকে সময় দাও।

হাসপাতালে রুটিন-মাফিক খাওয়া। সকাল আটটায় নাশতা, সাড়ে এগারোটায় লাঞ্চ, সাড়ে পাঁচটায় ডিনার। এদেশে সকাল আর সন্ধ্যায় ঠাণ্ডা খাবার। মানে, রুটি, মাখন, মার্মালেড, চিজ, দই, ফল এইসব। রান্না করা ঠাণ্ডা খাবার নয়, যথার্থ অর্থেই ঠাণ্ডা। দুপুরে লাঞ্চটা গরম। খাবার দিয়ে গেছে। উঠি উঠি করে শুয়েই ছিল রাহেলা। কারণ এরই মধ্যে জেনে গেছে সে, কী রকম খাবার দিতে পারে লাঞ্চে।

ক্রাচটা নিয়ে বাথরুমে গেল। দুঃসহ ব্যথা আর সারা শরীরে কেমন বিশ্রী কষ্ট। মাথা ঝিমঝিম করছে। বাথরুম থেকে এসে আবার শুয়ে পড়ল রাহেলা। সারাদিনে সাতাশ-আঠাশটা বড়ি খেতে হচ্ছে। সঙ্গে কিছু খাবার নাহলে তো চলবে না। সকালের খাবার একটু খেতে পারে সে। বাকি দুবার কিছুই খেতে পারে না বলতে গেলে। ফলে পেটে মোচড়ানো ব্যথা হচ্ছে ক’দিন থেকে। তেতো হয়ে থাকে মুখ। মনে জোর এনে উঠে পড়ল রাহেলা।

লাঞ্চে আছে সবজি সেদ্ধ, টমেটোর সসে ডোবানো বেবি টার্কির মাংস আর ম্যাশ পটেটো। খাবার ভালো। স্বাস্থ্যকর। লবণ খুবই কম। কোনও মশলা তো নেই-ই, লবণও নেই। রাহেলা চেয়ে নিয়েছে লবণ আর গোলমরিচের কুটি কুটি প্যাকেট। বাংলাদেশের মানুষ নাকি ভোজনরসিক। হয়তো হবে। কুবরার ‘চাউল’ দেখে মনে হল, পোলাও খেতে পারে এমন মানুষ কোনও দিন শুধু পুদিনার চাটনি দিয়ে তা খাবে না। সঙ্গে কমপক্ষে কাবাব চাই। কিছুতেই গিলতে পারল না সে খাবার। দুই তিন চামচ সবজি আর দুই টুকরো টার্কির মাংস নিয়ে অনেকক্ষণ চিবিয়ে গিলে ফেলল। ডেজার্ট হলে চলত। খেয়েছে গায়ের জোরে। তারপর ওষুধ। বিশ্রাম নিতে গিয়ে বমি চলে এল। উঠে বসে বিছানায়। সুইচ টিপে আলোর বিন্দুতে কিছুক্ষণ বসে থাকে মাথা উঁচু করে।

ঘড়ি তো চলে না―দুপুর থমকে থাকে নিষ্ঠুর প্রহরীর মতো।

কাচের খোলা জানালায় সাগরের প্রতিফলন দেখা যায়। কি নিশ্চিন্তে দুলছে, নাচছে, ছিটকে উঠছে। এক ঢেউ ভাঙার আগেই আরেক ঢেউ এসে উপচে পড়ছে। সাগরের জলের শব্দ কোনও দিন তার কাছে কান্না বা বেদনার শব্দের মতো লাগেনি। মনে হয়েছে জলের সঙ্গে জল-রমণের শীৎকার। কি আনন্দে নিরন্তর নিরবধি জল-রমণে মেতে আছে সাগর! আর পৃথিবীতে এত প্রাণের জন্ম হয়েছে এবং হচ্ছে। শত শত গাঙচিল সাদা-ধুসর পাখা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে। ডাকাডাকি তো আছেই। ভাঙা ভাঙা গলার স্বর। সাগর তো আরও দেখেছে রাহেলা। গাঙচিলের ডাক ভালো লাগেনি কোনও দিন। আজ এই নির্জন দুপুরে মনে হলো, বেশ লাগছে তো। ক্লিনিকের গা-ঘেঁষা গাছে গাছে ঘুঘু ডাকে। বেশ বড় ঘুঘুগুলো। দেশের কবুতরের চেয়েও বড়।

সেকেন্ড মিনিটের কাঁটা গুনতে গুনতে ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বাজল। আবার ঠাণ্ডা খাবার এল। গমের আটার পাউরুটির একটা টুকরো, মার্মালেড, এক স্লাইস চিজ, এক কিউব মাখন, এক কিউব মার্জারিন, আর সালাদ। অবশ্য রুটি তিন চার স্লাইস পাওয়া যায়। চাইলেই হল। কিন্তু রাহেলাই খেতে পারে না। ব্রাউন পাউরুটিও মনে হয় রবার। চিবালে নরম হতে চায় না।

ভাবল, আজ কুবরার ‘চাউলটা’ খাবে।

কেনোমতে একটু রুটি খেয়ে ডেজার্ট নিয়ে বসল রাহেলা। ভাবল, আগে পোলাও খেয়ে নেয়া যাক। পুদিনার চাটনি দিয়ে এক গ্রাস পোলাও মুখে দিল। ওরেব্বাবা! এ কি প্রাণঘাতী ঝাল ? বিষম উঠে গেল। অসম্ভব। এই পোলাও খাওয়া যাবে না। তাড়াতাড়ি ডেজার্ট খেতে শুরু করল। তাও কী জিভের জ¦লুনি থামে!

আবার প্রহর গোনা। সন্ধ্যাবেলায় কুবরা আসবে। ওকে কিছু উপহার দিতে মন চাইছে রাহেলার। কিন্তু কী দিতে পারে ? সঙ্গে শাড়ি আছে। এখনও পরতে পারেনি। শরীর একটু ভালো হলে পরবে। ওখান থেকে একটা সিল্কের শাড়ি দেওয়া যায়। শাড়ি তো সবাই ভালোবাসে। হয়তো কুবরাও বাসবে। নিশ্চয় বাসবে। একটা শাড়ি আলাদা করে রাখল কুবরাকে দেওয়ার জন্য। আজই সন্ধ্যাবেলায় দেবে।

সন্ধ্যা নেমে এল।

রাহেলার শরীর বেশ খারাপ লাগছে।

নার্স এসে ব্লাড প্রেসার দেখে বলল, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ডাক্তার এলেন। প্রেসার দেখলেন। চিন্তিত হয়ে পড়লেন খুব। এমন পেশেন্টকে রেহা-তে রাখা ঠিক হবে না। এই ক্লিনিকের সহযোগী ক্লিনিক আছে বিশ কিলোমিটার দূরে। সেটা বড় হাসপাতাল। ওদের ডাক্তার, যন্ত্রপাতি অনেক উন্নত।

আধা ঘণ্টার মধ্যে রাহেলাকে ঐ হাসপাতালে পাঠানোর সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। ডাক্তার এবং নার্সরা দেয়াল আলমারি খুলে একটা ব্যাগে কিছু জিনিসপত্র ভরে দিল। বাথরুম থেকে কসমেটিক, মানে বডি লোশন, পেস্ট ব্রাশ, মুখের ক্রিম এসব ভরে দিল কসমেটিক রাখার ব্যাগে। রাহেলাকে বললো, দুতিন দিন তুমি ওই হাসপাতালে থাকবে। ওরা তোমার প্রেসার কনট্রোল করে দেবে। কোন চিন্তা করো না। ম্যাজিকের মতো দুই যুবক এসে দাঁড়াল কালো পোশাক পরে। অনেকটা স্কাউটের মতো।

ডাক্তার বললেন, এরা আমাদের ছেলে, অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাবে তোমাকে।

সরু ট্রলি নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল ওরা। তারপর কোন পথে কীভাবে রাহেলা হাসপাতাল থেকে বের হলো এবং ওই হাসপাতালে পৌঁছাল, সেটা বলতে পারবে না। সবটাই নভোযানের স্পেসশিপের মতো মনে হয়েছিল।

কেটে গেল ওখানে নয় দিন। পাগলা ঘোড়ার মতো প্রেসার কন্ট্রোল করতে গিয়ে ওদেরকেও হিমশিম খেতে হল। পরীক্ষা নিরীক্ষার বাকি রাখেনি কিছু। তার মধ্যেও ভেবেছে রাহেলা, রেহা-তে গিয়ে কুবরাকে পাবে তো ? শাড়িটা ওকে না দিতে পারলে খুব খারাপ লাগবে তার।

অনুমান-আশঙ্কা ঠিক হল!

নয়দিন পরে রেহা-তে ফিরে জানা গেল, কুবরা চলে গেছে কিলে। শাড়িটা ঠিক সেখানেই রাখা আছে। হয়তো রেহা থেকে কুবরার ফোন নম্বর নেয়া যায়, হয়তো ডাক যোগাযোগের ঠিকানাও পাওয়া যাবে, কিন্তু কোনওটাই করতে ইচ্ছে হলো না তার। এমনি থাক সব। এই ক্ষণিকের পরিচয়, এই সেবা, এমন ‘মা জি’ ডাক, এই বুকের মধ্যে কেমন অতৃপ্তি ভাব, এটাই ভালো। জ্বলবে জোনাকির মতো টিপ টিপ করে।

কুবরা এসেছিল তার চরম অসুস্থতার মধ্যে।

যোগাযোগের সূত্র হলো, একসময় এক দেশের মানুষ ছিল তারা।

সেই পরিচয় তো রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে ছিঁড়ে গেছে প্রায় অর্ধ শতাব্দী হতে চলল। এখনও পাকিস্তান নাম শুনলে ভয়াবহ স্মৃতির আইকন ঝিলিক দিয়ে ওঠে মনের আয়নায়। সেই দেশের এক মেয়ে কোনও ঋণ শোধ করে গেল আমার কাছে। ওর পা দাবানো কি ক্ষমা প্রার্থনা ছিল? সমস্ত পাকিস্তানের পাপস্খলন করা ছিল ? কোন্ প্রাণের টানে এসেছিল রাহেলার কাছে কুবরা ? ভেবে কোনও প্রশ্নের উত্তর পেল না রাহেলা। আবার সেই কবির কথা, দেশ-কাল সব মিছে হয়ে যায় হৃদপদ্মের বাগানে।

কী অনায়াসে রাহেলার হৃদপদ্মের বাগানে ঢুকে পড়েছিল কুবরা ?

আহারে জীবন!

এক জীবনে কুবরার মতো মানুষ হয়তো একবারই পাওয়া যায়। কেউ হয়তো সেটাও পায় না। ওর কি মনে থাকবে রাহেলার কথা ? যাকে ‘মা জি’ বলে ডেকেছিল ? বুকের মধ্যে তোলপাড় করে। অসুস্থ রাহেলা ক্রাচ দুটো ক্লিপে আটকে রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। মনে মনে বলে, ভালো থেকো বিটিয়া। তুমি অনেক দিলে। ছোট হয়ে থেকে গেলাম আমি। সামান্য উপহারও দিতে পারলাম না।

নীরব অশ্রু টপটপ করে বালিশে পড়তে লাগল।

বাইরে ঘুঘু ডাকছে ঘুঘু ঘুগ―ঘুগ ঘুগউ।

গাঙচিল ডাকছে ওড়ার আনন্দে। সাগর নাচছে দিশাহীন, সীমাহীন আনন্দে।

শরতের বাতাসে গাছপালা শব্দ করে দুলছে।

পৃথিবীতে নন্দন-রসের আকাল নেই, তার প্রমাণ প্রকৃতি নিজেই―

অপাপবিদ্ধ ভালোবাসা বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে জোছনার মতো।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares