গল্প : সহোদর : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

মাসাধিককাল যাবৎ মেঘলা আকাশের মতো জমাট গুমোটে বাড়িটি থোম ধরে আছে। কোলাহলমুখর বাড়িটিকে হঠাৎ করে যেন নৈঃশব্দ্যের কোনও কালো দানব বিশাল থাবায় চেপে রেখেছে এবং সেই বাড়ির মানষগুলো থাবার নিচে অসাড় শরীর নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। এই বাড়িতে দুটি শিশু থাকলেও তাদের কলকাকলি ঝড়ে আক্রান্ত পাখির ছানাদের মতো বিধ্বস্ত―মূলত বেদনাকাতর বিষণ্নতার ছায়া বড়োদের চোখ-মুখে দেখে ওরা ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেছে। কখনও মনে হতে পারে ওরা নিঃসঙ্গ বাকহীন। ওদের ফুটফুটে সুন্দর চেহারায় পুরোনো তামার পাত্রের মতো মালিন্যের ছাপ পড়েছে, এলোমেলো উসকোখুসকো চুলের সঙ্গে চিরুনির বিচ্ছেদ ঘটেছে এবং সর্বোপরি নিয়মিত স্নানাহারের ব্যত্যয়ে হতদরিদ্র পথশিশুদের মতো মনে হতে পারে―যদিও এই গ্রামে এদের পরিবারকে দরিদ্র বলা যথার্থ নয়। এই পরিবারটি নয়; বরং বলা যায় যেসব সূচকে উচ্চমধ্যবিত্ত নির্ধারিত হয়ে থাকে সে-সব সূচক বিদ্যমান। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে খাদ্যাভাবের কারণে ওদেরকে হতদরিদ্রের মতো দেখাচ্ছে প্রকৃত ঘটনা তা নয়। এই বাড়ির বড়দের বিষাদে ভারাক্রান্ত মুখভাব দেখে দুটি শিশু যদিও মনমরা থাকে কিন্তু ওরা প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞাত নয় এবং বয়সের কারণে প্রকৃত ঘটনাটি ওদের কাছে দুর্জ্ঞেয়। কারণ বিষয়টি এমন স্পর্শকাতর ও নাজুক যে বড়রা ওদের কাছে খোলাখুলি প্রকাশও করতে পারে না; প্রকাশ করার মতো ঘটনাও নয় এবং প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করে না। আর যদি প্রকাশ করা হয়, ওদের মাধ্যমে ঘটনা কোনওভাবে গ্রামে চাউর হয়, তাহলে গোটা পরিবারের জন্য নেমে আসবে ভয়াবহ বিপদ, যা মোকাবিলা করা ওদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আগে যে অটুট বন্ধন ও পারস্পরিক ভালোবাসার নিবিড় সম্পর্ক ছিল তা হঠাৎ করে হাওয়া হয়ে যাওয়াতে, এখন প্রত্যেক সদস্যকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়, এবং তাদের মধ্যে পারিবারিক কোনও সম্পর্ক কোনও কালে ছিল কি না তাও সন্দেহ হতে পারে। ওরা যখন খেতে বসে তখন আগের মতো কেউ কথা বলে না, কেউ কাউকে ডেকে খাবার দেয় না। অথচ কিছু দিন আগেও সবাই মিলে একসঙ্গে খেত, মা খাবার বেড়ে দিত, তদারকি করত, কত হাসিতামশা, কত গল্প হতো। আর এখন কোনও বাড়িতে কোনও মানুষ মারা গেলে অন্য সদস্যরা যে-রকম শোক-বিহ্বল, মুহ্যমান থাকে ঠিক তেমন মনে হয়। এই বিষণ্নতার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে এই বাড়ির দুটি শিশু; ওরা এই কয়দিনে মনে হয় খেলাধুলাও ভুলে গেছে। নিরেট নিরানন্দে বিমর্ষ মানুষগুলোর দিকে তাকালে মনে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক যে, এ বাড়ির সবার মুখ থেকেই হাসি-খুশি উচ্ছলতা উধাও। দুই মাস পূর্বেও এ বাড়িতে খাবার তৈরি করা, নির্দিষ্ট সময়ে খাবার পরিবেশন করার যে চিরাচরিত নিয়ম পালিত হয়ে আসছিল এই নিয়মের সর্বত্রই ব্যত্যয় ঘটছে। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম-বিশ্রাম, স্নান ইত্যাদি নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আনন্দময় জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ থাকলেও এখন নিরানন্দের মালিন্যে শুধু মানুষের চোখ-মুখ নয়, বাড়িটিও ঢাকা পড়েছে। শুধু বেঁচে থাকার জন্য কিছু আবাছা চালের ভাত, আলু সিদ্ধ, ডাল ছাড়া প্রাণিজ আমিষ অথবা ঝামেলাপূর্ণ এমন কোনও কিছু রান্নাও হয় না। এরপরও একদিন রান্না হলো তো সেগুলো বাসি টকযুক্ত গন্ধ হয়ে গেলেও, দু-তিন দিনও খেতে হয়। রান্নায় কে সময় দেবে ? কীভাবে মনোযোগ দেবে ? সবার বুকের ওপরে পাথরচাপা কান্না, নিদারুণ কষ্টের হাহাকার। আগের নিয়ম পাল্টে যাওয়াতে যার যখন খিদে লাগে রান্নাঘর থেকে হাঁড়ি থেকে একা একা নিয়ে খেতে হয়। শুধু বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু রান্নাও করে বাড়ির বড়ো মেয়ে আমেনা, যাকে কি না প্রায়ই আঁচলে মুখ ঢেকে নীরবে কাঁদতে দেখা যায়। তার চোখ দুটিও ফোলা ফোলা। মনে হয় সবসময়ই কাঁদে। আগে আমেনার মা সংসার সামলালেও গত দুই মাস যাবৎ বড় ঘরের একটি কোটায় আটকে রাখা হয়েছে অথবা নিজের ইচ্ছেয় সেই কোটায় বন্দি হয়েছে―বের হতে দেখা যায় না। গভীর বিষণ্নতায় আক্রান্ত আমেনার বড় ভাই নুর হোসেনও যে কাজগুলো না করলেই নয়, সেগুলোই সম্পন্ন করে কোনও দিন বাড়ি থেকে দূরে একটি নির্জন পোড়ো বাগানে চুপচাপ বসে থাকে সারাদিন; আবার কোনও দিন নদীর পাড়ে বসে থেকে আকাশের দিকে নিশ্চল চোখে উদাস তাকিয়ে থাকে। আকাশে তখন হয়তো মেঘের নানা রং, মেঘের আকৃতি দেখে বিচলিত হয়, সূর্যাস্তের বিচিত্র রং দেখে অথবা সে কিছুই দেখে না এবং পরে সন্ধ্যা নামলে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে অবসাদগ্রস্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরে। সাংসারিক কাজের অভাব নেই, জমিতে লাঙল দেওয়া দরকার, পাটের বীজ এখন না বুনলে এবং আউশের ধান না বুনলে আগামী শ্রাবণে যে খাদ্য সংকটে পড়বে তা জেনে-বুঝেও কোনও কাজ করতে ইচ্ছে করে না; শুধু গরুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যতটুকু খড়ঘাসবিচালি দেওয়া দরকার ততটুকু দিয়েই, বাকিটা সময় এখানে-সেখানে নিঃসঙ্গ নিশ্চুপ বসে থেকে কাটায়। দীর্ঘশ^াস যেন ওর বুকে স্থায়ী বসতি গেড়েছে―মাঝে মাঝে দীর্ঘশ^াসে বাতাসে মৃদু তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। রাতের গভীরে আমেনার সঙ্গে ফিসফাস দু-একটা কথা বলে, যার অর্থ ওরা দুই ভাইবোন ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনও প্রাণী শুনতে পায় কি না সন্দেহ আছে। এ-বাড়িতে বড় বলতে আর কেউ নেই ? নুর হোসেনের বাবা ও চাচা দুই ভাইয়ের বাড়িটিতে এখন চাচাদের কেউ বাড়িতে থাকে না―ওরা থাকে শহরে। এক সময় এই বাড়ির জৌলুশ ছিল―ধনেসম্পদে, মান-সম্মানে―দশগ্রামে নুর হোসেনের বাবা আলতাফ হোসেনের মতো একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে সুনাম ছাড়া কোনও দুর্নাম ছিল না। তার মৃত্যুর পর ছোটো ভাই সবুর হোসেনকে পিতৃস্নেহে বড় করেছে, লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছে যে এখন শহরেই বাড়ি করে থাকে। দুই ঈদ ছাড়াও পৌষ ও ভাদ্র মাসে দুইবার এসে ভাগের ফসল বিক্রি করে আবার চলে যায়। এজন্য বাড়িটি অনেক বড় যা অন্য গ্রামের দশটি বাড়ির মতো নয়। বাড়িটি বড় হলেও মানুষজন কম থাকায় নিরিবিলি বলা চলে। নুর হোসেন, আমেনা আর তাদের ছোট ভাই আলি হোসেন ও ছোট বোন রাবেয়া। চার বছরের আলি হোসেন এই বাড়ির সবার ছোট, তার পিঠাপিঠি আমেনার বয়স পাঁচ বছর। গত তিন বছর আগে আলতাফ হোসেনের যক্ষা রোগ ধরা পড়ে এবং তখন থেকেই থাকত বাড়ির বৈঠকখানায় একা একা এবং সেই সময় থেকেই স্বামীসঙ্গহীনা হয়ে পড়ে, স্ত্রী নুরি বেগম যদিও মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত স্বামীর পাশে দায়সারা গোছের সেবাযত্ন করেছে, যা একজন রোগীর জন্য প্রাপ্যের তুলনায় নগণ্য ছিল। সে হিসেবে বড় মেয়ে কর্মিষ্ঠ আমেনার সেবাই মুখ্য ছিল, মায়ের সেবা গৌণ বিবেচ্য। একদিনের ঘটনায় পরিবারের মানুষসহ গ্রামের মানুষও বিচলিত হয়েছিল : আলতাফ হোসেনকে এক সকালে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না; ঘর খালি, বাসি টকগন্ধযুক্ত শয্যা, খালি, কোথায় গেল অসুস্থ অচল মানুষটি। বাড়ি ছাপিয়ে কথাটি পাড়ায় চাউর হলে অনেকেই খুঁজতে বের হয়ে যায় এখানে সেখানে; কেউ বলছে নদীতে গিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে, কেউ বলছে পরিরা উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাদের এমন বিশ^াসও আছে যে, অনেক সময় মানুষকে জিন-পরি উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং অনেক দিন পর আবার ফিরিয়ে দিয়ে যায়। তবে তাদের এসব অলৌকিক বয়ান বেশিক্ষণ টেকেনি, যখন পাড়ার হেদায়েত আলি জানাল যে, আলতাফ হোসেন পুকুরের বকচরে কাদাজলে ডুবে আছে। পাড়ার কয়েকজন তাকে উদ্ধার করে ওখানে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে, কঙ্কালসার অবসন্ন ও নিস্তেজ আলতাফ হোসেন অস্ফুট উচ্চারণে কী বলেছিল, তার মর্মার্থ কেউ উদ্ধার করতে পারেনি। তবে ঠোঁটের নাড়াচাড়া দেখে পাড়ার বৈদ্য দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিল যে, তার নিশি রোগ হয়েছে। এখন থেকে রাতে তাকে পাহারায় রাখতে হবে। না-হয় নিশি রাতে ঘর থেকে বের হয়ে চলে যাবে; তখন জিনপরিও তুলে নিয়ে যেতে পারে। সেই রাত থেকে আমেনা ও নুর হোসেন বাবার ঘরে পালাক্রমে পাহারা দিয়ে গেছে মৃত্যু অব্দি। কিন্তু ক্রমান্বয়ে মানুষটি এতটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল যে, সুঠাম দেহবল্লরি পৌরুষ্যে দীপ্তমান আলতাফ হোসেন মাত্র তিন মাস বেঁচেছিল। আলতাফ হোসেন যেমন ছিল সুঠাম দেহের পৌরুষদীপ্ত মানুষ ঠিক তেমনি তার স্ত্রী নুরি বেগমও ক্ষীণাঙ্গী অপূর্ব সুন্দরী নারী। দীর্ঘদিনের স্বামীর শুশ্রƒষা করে এবং বলতে গেলে অকালে স্বামীকে হারিয়ে কিছুটা মতিভ্রম হলেও হতে পারে কিংবা যৌবনদ্দীপ্তা অকাল বৈধব্যে কিছুটা অসংযত হলেও হতে পারে; কী কারণে নুরি বেগম মাঝে মাঝে নিশি রাতে ঘর থেকে বের হয়ে ঘুরে বেড়াত তা হলফ করে বলা মুশকিল। অসংযত আচরণ কোন্ পর্যায়ে ছিল, কিংবা এর গতিপ্রকৃতি কী রকম ছিল, সে সম্পর্কে বিশ বছর বয়সী নুর হোসেন কিংবা অষ্টাদশী আমেনা বেগমের কোনও ধারণা ছিল না। তারা কেবল বুঝতে পারে ওদের মা রাত জেগে উঠোনে বসে থাকে, কিংবা বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন নিস্তব্ধ রাতের মধ্যপ্রহর পর্যন্ত রান্নাঘরে খটরমটর এটাসেটা করে। কী করে তাও ওদের কারও জানা ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন ঘটনাটি ঘটাতে পারবে ওরা বিশ^াস করতে পারছে না। মানুষের ধৈর্যেরও সীমা আছে। মনমরা, প্রায় নিস্তেজ নুর হোসেন যখন নদীর তীরে বসে আকাশের দিকে নিশ্চল চোখে তাকিয়ে থাকে তখন মাঝে মাঝেই মাথায় খুন চেপে যায়। ওর মনে হয় মানুষ খুন করতে পারলে হয়তো জীবনে শান্তি পেত। কখনও এমনও ভাবে কাউকে খুন করে জেলে যাবে; তারপর ফাঁসিতে ঝুলবে। অশান্তির জীবনের চেয়ে ফাঁসিতে ঝুলতে পারলে শান্তি পাওয়া যেত। এমন চিন্তাচ্ছন্ন থাকার সময়, একদিন ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে, বাড়ির গোমস্তা দুদুর সঙ্গে দেখা হয়। সেও পাশাপাশি আরেক জনের ক্ষেতে কাজ করে; তখন নুর হোসেনের মনে হয় দুদুকে খুন করে জেলে যাবে। গতকাল সন্ধ্যার সময় নদীর পাড়ে বসে থাকার সময়ও দুদু গিয়ে নুর হোসেনের পাশে বসে বিড়ির প্যাকেট বের করে, একটি নিজে জ¦ালিয়ে আরেকটা নুর হোসেনকে দিলে সে বলল, বিড়ি খাইতে ভাল্লাগতেছে না। দুদু মিয়াও কয়েক দিন ধরে লক্ষ করছে নুর হোসেনের আচরণ স্বাভাবিক নয় এবং নিজ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করার মতো সাহস পায়নি বলে জিজ্ঞেস করতে পারেনি। আজকে বুকে সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল, কয়দিন ধইর‌্যা তোমার মন খারাপ দেখতাছি। কিছু অইছে? শইল খারাপ ?

                মাসাধিককাল অব্দি গ্রামের কোনও মানুষের সঙ্গে কথা বলে না নুর হোসেন, গুমোট যন্ত্রণার একটি আগ্নেয়গিরি বুকের ভেতরে জীবন্ত হয়ে ওঠার জন্য ফুঁসছে ক্রমাগত, মানুষ দেখলেই খুন করতে ইচ্ছে করে, বিশেষ করে দুদু মিয়াকে। পড়ন্ত বিকেলের শেষ রোদের রেশও বৃক্ষপল্লবের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছে, দূরের গ্রামগুলোকে ঝাপসা দেখা যায়, নীড়ে ফেরা পাখিরা আকাশে উড়ে যাচ্ছে, সেই সময় শ্লেষ ও বক্র দৃষ্টিতে দুদু মিয়াকে একবার দেখে উঠে চলে যায়―কোনও কথা বলেনি। তবে বাড়ি ফেরার পথে তার কেবল মনে হয়, এই দুদুই রাতবিরেতে নদীর পাড়ে বসে বাঁশি বাজায়, যে বাঁশির সুরে পাগল হয়ে হয়তো তার মা এখানে আসতে পারে, দুদুর সঙ্গে সম্পর্ক করতে পারে। কিন্তু এরই বা প্রমাণ কী ? হাতেনাতে ধরতে না পেরে শুধু সন্দেহের বশে একজন মানুষকে কতল করা কতটা যুক্তিসঙ্গত ? এ-রকম যুক্তি-অযুক্তিতে নিজের ক্রোধের প্রশমন করে, সন্ধ্যার পর বাড়িতে ঢুকে স্পঞ্জের স্যান্ডেল নিয়ে হাতমুখ ধুতে এসেও পুকুরপাড়ে নিস্তেজ বসে থাকে দীর্ঘক্ষণ। আবছা অন্ধকারে সন্ধ্যার স্নিগ্ধ বাতাসে শরীর জুড়িয়ে এলেও, মনের আগুন নিভে না। বাড়ির ভেতরে কুপি জ¦ালায় আমেনা। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর পা ধুয়ে বাড়িতে ঢুকে আমেনাকে বলল, ভাত দে।

                রান্নাঘরে ভাত দিয়ে ভয়-বিহ্বল আমেনা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে নির্বাক হয়ে। নুর হোসেন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, আর কয় দিন ?

                আমেনার কাছে কোনও উত্তর নেই। তবে দুই ভাইবোনের ধৈর্যের বাঁধ ক্রমাগত ভেঙে যাচ্ছে, অধৈর্য আমেনা বলল, জানি না।

                ‘হুম’, অস্ফুট উচ্চারণে নুর হোসেন খেদ নাকি শ্লেষ প্রকাশ করেছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারে না আমেনা। খাওয়া-দাওয়া নেই তবু ওরা খিদে অনুভব করে না; বিশেষ করে আমেনার ঘাড়েই যত বোঝার ভার। সে যেন এই বোঝা বইতে পারছে না। অকস্মাৎ মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলে নুর হোসেনের চোখও ঝাপসা হয়ে ওঠে। আর্দ্র কণ্ঠে আমেনা জিজ্ঞেস করে, শয়তানের কথা কি গেরামের মাইনসে টের পাইছে?

                অস্পষ্ট উচ্চারণে নুর হোসেন বলল, না।

                আমেনা নুর হোসেনের কথা স্পষ্ট শুনতে না পেলেও ঠোঁটের স্পন্দন থেকে অনুমান করে, এর মর্মার্থ উপলব্ধি করে। বিষণ্নতা দুশ্চিন্তায় ন্যুব্জ নুর হোসেন সারা দিন মাঠেঘাটে পড়ে থাকায় শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে আমেনার মন বিগলিত হয়ে ওঠে এবং কুপির মৃদু আলোয় ঝাপসা মুখচ্ছবি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাতে ওর যেন বুক ফেটে যায়। আমেনার দীর্ঘশ^াসে বাতাস ভারী হয়। পাতের অর্ধেক ভাত থাকতেই হাত ধুয়ে উঠে পড়ে নুর হোসেন―গলা দিয়ে খাবার নামাছে না। ওরা একটি দিনের অপেক্ষায় আছে এবং সেইদিনই যে কী করবে তাও তারা এখনও সিদ্ধান্ত পাকা করতে পারছে না। মা অনেকটা মৃত্যুশয্যায় শায়িনী বলা যায়। থাকার বড় ঘরের পশ্চিমপাশের কোনায় গাছগাছালি ঘেরা জঙ্গল লাগোয়া এক কোনায় কোটাঘরে ঝাঁপ বন্ধ করে রাখে আমেনা। লোকমুখের কলঙ্ক থেকে রেহাই পেতেই তাকে এভাবে কোটাবন্দি করা হয়েছে তা নুরি বেগমও বোঝে। নিজেরই বা কতটুকু নৈতিক সাহস আছে যে ঘর থেকে বের হবে। অবশ্যই নির্বিকার নুরি বেগমের বের হওয়ার ইচ্ছেও হয় না। শারীরিক গঠনের কারণে নিশক্তি অনুভব করে না; বরং বেশ সতেজই মনে হয়। পাড়ার দু-একজন মহিলা এসে মাঝে মাঝে খোঁজ করলে অতন্দ্র প্রহরীর মতো আমেনা ঘরের ভেতরে ঢোকার পথ আগলে রেখে জানায় তার মায়ের অসুখ, ঘুমাচ্ছে অথবা অন্য কোনও কথা বলে যাতে তারা ঘরে ঢুকে নুরি বেগমের সঙ্গে দেখা করতে না পারে। কয়েকজন ভিখারিনীর কাছে উদার মনের সেবা পরায়না নুরি বেগম দেবীতুল্য মানবী বলেই প্রায় প্রতিদিনই তাকে দেখার জন্য ব্যাকুলতা প্রকাশ করলেও আমেনা অসুস্থতার অজুহাতে ভিক্ষা দিয়েই বিদায় করে। দুই মাস আগেও নুরি বেগম প্রতিদিনই দু-একজন ভিখারিনীকে বারান্দায় বসিয়ে নিজ হাতে খাইয়েছে; এখন হঠাৎ করে এমন মানবতার মানবীর কী হলো যে ঘরের বাইরেই আসে না। কী অসুখ হয়েছে পাড়ার দু-একজন জানতে চাইলেও আমেনা বেগম জ¦র-কাশি ইত্যাদি বলে বিদায় করে। অনেকের প্রতীতি জন্মেছে যে, হয়তো আলতাফ হোসেনের মতো নুরি বেগমেরও যক্ষ্মা হয়েছে এবং এজন্য ঘরের ভেতর থেকে বাইরে আসে না। এ-রকম সন্দেহে কেউ কেউ এ-বাড়ি আসাও বন্ধ করে দিয়েছে। এতে আমেনার আত্মতুষ্টি বাড়ে, মনে মনে প্রার্থনা করে যে, মানুষ ভাবুক যেন মায়ের যক্ষ্মা হয়েছে।

                নুর হোসেন রাতে ঘুমায় চাচার ঘরে। ঘরে কুপি জ¦ালিয়ে একবার সারাটা ঘর দেখে, বিছানাটা এলোমেলো থাকা সত্ত্বেও ঠিক করতে ইচ্ছে করেনি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটি বিড়ি টেনে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়ে বাম হাতটা কপালে ঠেকিয়ে শুয়ে থাকে। রাতের প্রহর ধীরে ধীরে ক্ষয়ে আসছে। দুচোখে ঘুমের খরা। কৃষ্ণপক্ষের এক ফালি চাঁদ ঝুলে আছে। বেড়ার ফাঁক গলে জোছনার মৃদু অথচ স্নিগ্ধ আলো ঘরে এসেছে। ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসে একটি জলচৌকিতে বসে বিড়ি জ¦ালিয়ে অসাড় চোখ মেলে এক ফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং কান দুটি খাড়া করে রাখে নিজেদের ঘরের দিকে। কখন কী হয় বলা তো যায় না। যেকোনও সময়ই ঘটে যেতে পারে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। হায় খোদা! মুক্তি দাও। এই সমাজে মানুষের সামনে যেন মুখ দেখাতে পারি। এমন কাতর কত প্রার্থনাই করে মনে মনে। কখনও ভাবে ভয়ানক প্রলঙ্করী ঝড়ের তাণ্ডবে যদি সব ভেঙেচুরে একাকার করে দিত; যদি একটা বড়ো ভূমিকম্প হয়ে সব ধ্বংস করে মিশিয়ে দিত তাহলে জীবনের সকল লীলা সাঙ্গ করে সবাই একসঙ্গে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারত। দু-একবার ভেবেছে চাচার কাছে গিয়ে সমস্যার উত্তরণের কথা বলবে কি না ? হয়তো তাদের বাসায় যদি মাকে রাখা যেত তাহলে গ্রামের মানুষেরা জানতে পারত না। কিন্তু চাচা-চাচি কিংবা চাচাত ভাইবোনকে কী বলে বোঝাবে ? ওদের কাছে কীভাবে মুখ দেখাবে ? এই বয়সে, ছিঃ! তীব্র ঘৃণায় বুকের ভেতরটা ফেটে পড়ে এবং তখন অব্যক্ত যন্ত্রণায় নুর হোসেন বরফের মতো স্তব্ধ হয়ে যায়। নিশ্চল চোখে তাকিয়ে থাকে ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের ম্লান আলোর নিতল আকাশে। তখন আকাশে গ্রহ-তারার মিটমিটে ঠাণ্ডা নিভন্ত আলোয় দুর্জ্ঞেয় জাগতিক রহস্যের জাল বোনে, যে জালে সে আটকে আছে নিশ^াস বন্ধ করে এবং শত চেষ্টা করেও বের হতে পারছে না। দুর্ভেদ্য নিñিদ্র স্তব্ধতায় তলিয়ে থাকা পৃথিবী রহস্যময়‒জাগতিক- অজাগতিক―নুর হোসেনের কাছে সবকিছুই মনে হয় মায়াবী বন্ধনের গভীর যোগসূত্র যে যোগসূত্রের কোনও কূলকিনারা করতে পারে না। আকাশপানে তাকিয়ে থেকে তার দৃষ্টি ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে এবং তখন অনুভব করে একটি বেদনাসঞ্জাত করুণ সুরের অনুধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে বুকের গভীরের প্রাচীরে কম্পমান হয়। অজানা শঙ্কায় কেমন যেন ব্যথা অনুভব করে সে বুঝতে পারে না। ঈষৎ তন্দ্রাচ্ছন্ন নুর হোসেন রাত্রির নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে নিজেকেও একাকার করে আরও গভীরতায় তলিয়ে নিজের সত্তা ও অস্তিত্বের অনুসন্ধানে তন্নিষ্ঠ হয়। কোথায় পাবে সে সত্তা ও অস্তিত্বের পাঠ। আকাশজুড়ে একটি রহস্যময় ভূর্জপত্রের খসড়া; রহস্য থেকে কিছুই উদঘাটন করতে পারে না এবং তখনই বধির কান্নার স্রোত বয়ে যায় বুকের গভীরে। ঘরের পাশে নারকেলের পাতা মৃদু কাঁপে, নুর হোসেনের মনে হয় এই কম্পন যেন তার জীবনের প্রতিটি শিরায় প্রবাহিত হচ্ছে। কী গভীর শান্ত রাত, কী গভীর স্তদ্ধতা যেখানে নিজেকে বিলীন করে দিতে ইচ্ছে করে। যদি এমন হতো―এই শান্ত ও স্তব্ধ জায়গাটি পৃথিবীর কোনও গিরিপর্বতমালার রহস্যময় গুহা, যদি দীর্ঘকাল কেটে যেত এমন স্তব্ধতার মধ্য দিয়ে, যদি এমন হতো সূর্য উঠত দীর্ঘকাল পর―নুর হোসেনের কল্পনায় ডানা মেলে আর আরও গভীরে তলিয়ে যেতে থাকে। তখনই পাশের ঘর থেকে আলি হোসেনের কান্না ভেসে আসে। সচকিত নুর হোসেন এই কান্নার মর্মার্থ উদ্ধারে ব্যাপৃত হয়ে খরগোশের কানের মতো কান পেতে থাকে ঘরের দিকে। ক্ষণকাল পরেই আমেনা জেগে ওঠে; কোমল আদরের হাত আলি হোসেনের মাথায় রেখে জিজ্ঞেস করে, কান্দোস ক্যান?

                আলি হোসেনের কান্নায় এক প্রকার তরঙ্গ সৃষ্টি হয় এবং অনেকক্ষণ পর অস্ফুট উচ্চারণে বলে, আম্মা।

                দীর্ঘদিন মায়ের সান্নিধ্যবঞ্চিত বিষণ্ন আলি হোসেনের মাতৃস্নেহের জন্য হঠাৎ করেই ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করাতে শুধু আমেনাই বিব্রত হয়নি; পাশের ঘরে বিনিদ্র নুর হোসেন ও মা নুরি বেগমও বিব্রত হয়। কিন্তু অবোধ শিশুকে কী করে বোঝাবে তাদের সংসার-জীবনের এই জটিল সংকটের কথা। এ-সংকট কেবল একজন মানুষের নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে যাবে পরিবারের প্রতিটি মানুষের অন্তত তিন পুরুষ পর্যন্ত। পরিহাস, অবজ্ঞা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা আর ঘৃণার রহস্যময় কুহকে পরিণত হতে যাচ্ছে, যেখান থেকে এই সমাজে মাথা উঁচু করে কথা বলা যাবে না। হঠাৎ করে একটি ঘটনায় নুর হোসেনদের পৃথিবীটা বদলে যায়, নিকট অতীতের উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর বিস্তৃতির স্পন্দন তীব্রতর হতে থাকে; এমন সাজানো-গোছানো ঝলমলে সংসারটি ধূরততায় ছেয়ে গেছে―মানুষ হিসেবে কীভাবে মেনে নেবে ? মনে হয় আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এক অচেনা জগতে ওরা সবাই প্রবেশ করবে যেখানে সমাজের সব মানুষ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর দূর দূর করবে ওদের। মাথার ভেতরে কখনও চরম উত্তেজনার বলক ওঠে; কখনও দুর্ভাবনার বিষধর কীট যেন নুর হোসেনকে কামড়াতে থাকে। অন্ধকার ও প্রগাঢ় নৈঃশব্দের রাতের বিবরে হঠাৎ পেঁচার ভয়ঙ্কর তিনটি ডাক শুনতে পায় সে। আলতাফ হোসেন মারা যাওয়ার আগেও পেঁচার এমন কুৎসিত ডাক শুনে মা বলেছিল যে, এই ডাক বড় খারাপ। পেঁচারা সব বুঝতে পারে। যখন কোনও বাড়িতে কোনও মানুষ মারা যায় তখন পেঁচা মাটিতে নেমে তিনটি ভয়ঙ্কর ডাক দেয়। আজকের এই ডাকে নুর হোসেনের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। তাহলে কী মা মরে যাবে! যাক, এমন মা মরে গেলেও আপত্তি নেই। যদিও শেষ বাক্যটি বলার সময় তার বুকের ভেতরে যন্ত্রণা উত্তাপ ছড়িয়েছিল, তবু স্বতঃধারায় উৎসারিত বাক্যটিকে দমন করতে পারেনি। হয়তো কোনও অলৌকিক অন্তর্জ্ঞানের ইঙ্গিতেই বাক্যটি অনুচ্চারে উত্থিত হয়ে মনের ভেতরেই বিলুপ্ত হয়।

                আলি হোসেনের কান্নার শব্দে রাবেয়ার ঘুম ভেঙে গেলেও নিশ্চুপ থাকে সে―তারও কান্না পায় কিন্তু হয়তো মেয়েদের বুদ্ধিমত্তা বেশি থাকায়, পরিস্থিতি কিছুটা আঁচ করে কান্না সংবরণ করে বড় বোন কী করে, উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। আমেনা আলি হোসেনের মাথায় হাত বুলিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, আম্মার অসুখ। কিছুক্ষণ পর আলি হোসেনের সরব কান্না নীরবতায় ঢেকে যায়। নিদ্রাহারা আমেনা বারান্দায় গিয়ে বসে। চারপাশে এখন অকাট্য স্তব্ধতা ও ভয়াল জমাট অন্ধকার। চিন্তাচ্ছন্ন আমেনা একটি পিঁড়িতে নিঃশব্দে বসে থেকে নিগূঢ় জীবনের মায়া ও বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। কেন মায়ের জীবনে এমন অশনি দুর্নিবার ঘটনা ঘটে গেল ? মা কি পারত না নিজেকে সংবরণ করতে ? নাকি কিছুটা মতিভ্রম অথবা কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ হওয়াতে নিজের জীবন এবং সন্তানের জীবনের কথা ভাবতে পারেনি। নাকি সামান্য অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার ভান করে গভীর রাতে ঘর থেকে বের হতো নদীর পাড়ে দুদুর বাঁশির টানে। অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার লক্ষণই বা কী ? ছোটবেলা থেকেই মাকে এমন দেখে আসছে আমেনা। সবকিছুতে কেমন যেন নির্বিকার থাকে, গায়ে লাগায়নি কিছু, আবেগ কিংবা অনুভূতিহীন অনেকটা জড় পদার্থের মতো। কিন্তু তার মনোজগতের খবর কে-ই-বা রাখে। এমন আচরণ তো এখনও প্রকাশ পায়নি যে তাকে ডাক্তার কবিরাজ দেখানোর প্রয়োজন ছিল। সঙ্গহীন মানুষ কি জৈবিক রসায়ন ও আবেগের কাছে হেরে যায় ? তমসাচ্ছন্ন নিস্তব্ধ রাতের শেষ প্রহরে নিরুত্তাপ নিষ্প্রভ চোখে তাকায় আকাশের দিকে। হিমঠাণ্ডা অগণিত তারকারাজি মিটমিট করছে অন্তহীন আকাশে। সেদিকে তাকিয়ে থাকে আর তার মনে বার বার একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খায় এবং সরল কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারে না। তার প্রশ্ন একটিই যে, মা অপ্রকৃতিস্থ কি না। মায়ের দিকে তাকালে সে বুকের ভেতরে মায়ার আর্দ্রতা অনুভব করে। এমন সুন্দর চেহারা, সুন্দরী নারীর শরীরটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, মায়াবী মুখে মালিন্য এবং চোখের নিচে কালিমার দাগ। মা কি বাঁচবে ? অকস্মাৎ মনের ভেতরে একটি অশুভ শব্দ জেগে উঠলে তার অন্তরাত্মা হু হু করে ওঠে এবং শব্দহীন আর্তনাদে বুকের ভেতরটা যেন ভেঙেচুরে একাকার হয়ে যেতে থাকে। ভীষণ যন্ত্রণায় বিদ্ধ হলেও মায়ের প্রতি দুর্নিবার দরদও জাগে। অনেক দিন ধরেই মাকে নানাভাবে বিদ্রুপ, যন্ত্রণা, অকথ্য ভাষায় গালাগাল করাতেও সে এখন বেদনাকাতর হয় এবং মনে মনে ভাবে ভুল হোক কিংবা শরীর-মনের টানেই হোক কিংবা অসুস্থার কারণেই হোক মায়ের এই ঘটনার জন্য আর প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, আর কথায় যন্ত্রণা দেবে না; বরং তাকে পুনরুদ্ধার করে আবার মায়ের ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করবে। মানুষ তো মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে থাকে আজীবন―কে না চায় ভালোবাসা ? কিন্তু মা কি এমন সারাজীবনই জড় পদার্থের মতো ছিল ? গ্রামের অন্যান্য মায়ের মতো তেমন আদর মায়া আবেগ কি কখনও দেখেছে মায়ের মধ্যে ? মনের অতলান্তে অসংখ্য প্রশ্ন জাগ্রত হলেও মীমাংসাহীন নিগূঢ়তায় সেখানেই বিলীন হয়ে যায়। এমনকি এখন যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে সে ব্যাপারেও নির্বিকার। মনে হয় কিছুই হয়নি তার। শুধু আমেনা আর নুর হোসেনের রূঢ় কথার জন্য কোটাঘরে আটকে আছে। বাবার মৃত্যুর সময়ও তাকে কাঁদতে দেখা যায়নি। এখনও কোটাঘরে আমেনা যখন যা খাবার দিচ্ছে তাই খাচ্ছে, নিজের ইচ্ছেমতো কোনও খাবারও চায় না, গোসলের কথা বললে সেই কোটাঘরের পাশে এক বালতি পানি দিলে সেটুকু পানি দিয়েই গোসল করে, দুর্ভাবনাহীন ঘুমায়। আমেনার একটি ভাই পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল দশ বছর আগে, তখনও তাকে বিকারহীন মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল ওর পানিতে পড়ে মৃত্যুটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। এসব কীসের আলামত ভেবে কূলকিনারা করতে পারে না আমেনা। রাতের গাঢ় অন্ধকার ফিকে হয়ে আসে; গাছে গাছে অসংখ্য পাখির ডানা ঝাপটানি আর কিচিরমিচির শব্দ শুরু হয়। পাখিরা নীড় ছেড়ে নিচে নেমে আসে। গ্রামের মসজিদ থেকে ভোরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। আমেনার চোখে তখন তন্দ্রা ভর করে।

                জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ আমেনার বেঁচে থাকার সব স্বপ্ন দুই চোখ থেকে উধাও হয়ে গেছে এবং নিজের জন্য কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। রাবেয়া আর আলি হোসেন ছাড়া আর কারও প্রতি তার কোনও মায়া নেই, কোনও দরদ নেই―এক কথায় কোনও অনুভূতি নেই। নিজের পরিবার তো পরিবারই, এছাড়াও এই সমাজের সব মানুষকেই তার কাছে বিভীষিকাময় দানব মনে হয়। এমন মনে হওয়ার পিছনে নির্ভেজাল যুক্তিও রয়েছে এবং তা হলো তার বয়সী কোনও মেয়ের এই পাড়ায় বিয়ের বাকি নেই। তার বিয়ে হয় না বলে কখনও গোচরে কখনও অগোচরে নানা কথা শোনে: ‘আই বুড়িরে দিয়া ঘরের খুঁটি দিব নে। এই কালটনির বিয়া অইব ?’ আপন চাচিই গত ঈদে বেড়াতে এসে এসব কথা পাড়ার মানুষের সঙ্গে বলার সময় আমেনা নিজের কানে শুনেছে। এসব কথা বুকের ভেতরে শরের মতো বিদ্ধ হলে আমেনা প্রথমে খুব বিমর্ষ হতো; এখন আর গায়ে মাখায় না। ধরেই নিয়েছে তার বিয়ে-সাদী হবে না। নিজের মনকে প্রবোধ দিয়েছে, দুনিয়ার কত মানুষই তো বিয়ে না করে থাকে। হয়তো তার মনের সান্ত্বনার জন্য এমন প্রবোধ-ছলের চাদরে একটা আবরণ তৈরি করে রেখেছে। মাঝে মাঝে দু-একটা ঘর আসত কিন্তু আলতাফ হোসেন মারা যাবার পর আরও একটা বাড়তি ফোঁড়া যোগ হলো: বাপটা যক্ষ্মা রোগে মরছে। যক্ষ্মা রোগকে মানুষ ভয় পায় এবং সংক্রমণের ভয়ে এই জনপদে যক্ষ্মা রোগীর পরিবারের সঙ্গে জেনেশুনে কেউ আত্মীয়তা করতে চায় না। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আমেনা নিজের কথা কিছুক্ষণ ভেবে বারান্দা ছেড়ে রান্নাঘরে ঢুকে চুলো থেকে আঙুলে টিপে একটু নরম কয়লা নিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে পুকুর ঘাটে যায়, তার কাঁখে একটি মাটির কলস। রাবেয়া আর আলি হোসেন ভোরেই ঘুম থেকে উঠে খেতে চায়, ওদের খাবার দিতে হবে। পুবের আকাশে ভোরের নরম সোনালি রোদের আভায় পাতায় পাতায় আলোর নাচন শুরু হয়েছে, মৃদুমন্দ বাতাসে গাছের পাতা কাঁপছে, গাছে গাছে পাখিরা আনন্দে লাফালাফি করছে পুকুর পাড়ের কদম গাছের সবুজ পাতার দিকে নিরুত্তাপ চোখে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে থাকলেও আমেনার মনে হয় সে কিছুই দেখছে না। দাদার আমলের বিরাটাকার পুকুরের মাছেরা খেলছে, কোথাও কোথাও সামান্য তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। নিরাসক্তভাবে ঘাটে বসে থাকলেও ওর মনে একটি কথা তোলপাড় করছে যে, সত্যটা জানা দরকার। যদিও এই সত্য জেনে কোনও লাভ নেই, যদিও এ-কথা প্রকাশ করলে মায়ের ভাগ্যে জুটবে দুররাসহ নানা সামাজিক অবিচার, তবু সত্য জানা দরকার। একটি সত্য জানার জন্য চিন্তাচ্ছন্ন বিমূঢ় আমেনা পুকুরের কদমগাছের ওপর দিয়ে সীমাহীন ঝকঝকে নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে নির্ভার দৃষ্টিতে। হয়তো কিছু দেখছে অথবা কিছুই দেখছে না এমন মনে হয়। পরক্ষণেই তার মনে হয় দুতিন মাসে কে কদমগাছের তলায় সেদ্ধ ডিম, কলা, আতপ চালের ভাত, কবুতরের মাংস দিয়ে ভোগ দিয়েছিল ? কী উদ্দেশ্য ছিল ? আমেনা চিন্তাচ্ছন্ন অবস্থায় কতক্ষণ বসেছিল অনুমান করতে পারেনি; রাবেয়ার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে পেছনে তাকালে সে বলল, আলি হোসেন কানতাছে। আমেনা দ্রুত কুলকুচি করে কলসে পানি ভরে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিরুচ্চারে বলল, মরণজ¦ালা আমার। আমেনার পেছনে পেছনে রাবেয়াও বাড়ির ভেতরে ঢোকার সময় দেখতে পায় নুর হোসেন গোয়াল থেকে দুটি গরু বের করে উদাস দৃষ্টিতে মাঠের দিকে শ্লথ পদক্ষেপে হেঁটে যায়। নুর হোসেনকে বড়ো নিস্তেজ মনে হয় আমেনার কাছে, অজানা আশঙ্কায় বুকের ভেতর কেমন যেন করে ওঠে। পেটটা পিঠের সঙ্গে মিশে আছে যেন একটা সেউতি; মুখটা শুকনো আমচুরের মতো, চোখ দুটি গর্তে ঢুকে গেছে। একজন প্রাণোচ্ছল মানুষ কয়েক দিনে এমন গোড়া কাটা লাউডগার মতো ঝিমিয়ে পড়বে, অনাহারে অনিদ্রায় এতটা কাতর হয়ে পড়বে ভাবতেও অব্যক্ত কষ্টে বুক ভারী হয়ে যায় আমেনার; তখনই ভঙ্গুর মনে শক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে অনুচ্চারে বলল, যা অয় অইব ? এই আত্মপ্রত্যয় থেকে আমেনা আরও মনকে শক্ত করে এভাবে তৈরি হয় যাতে এই বাড়ির কেউ অন্তত খাওয়ার কষ্ট না পায়। সে উপলব্ধি করতে পারে, এই সংসারে এখন সুস্থ হয়ে টিকে থাকতে হলে আমেনাকেই হাল ধরতে হবে এবং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত সংসারে উচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে হলে তারই পূর্ববৎ কর্মীষ্ঠ হতে হবে। ধূলিঝাড়া মুরগির মতো মন ও শরীর থেকে সমস্ত বিষাদ ঝেড়ে ফেলে সে যেন ঋজু হয়ে দাঁড়ায়। রাবেয়াকে বলল, তুই হাঁস-মুরগি বাইর কইর‌্যা খাওন দেয়। হঠাৎ করেই বদলে যাওয়ার কণ্ঠস্বরে ভয়ার্ত রাবেয়া সচকিত হয়ে বোনের দিকে উৎফুল্ল মনে তাকালে আমেনা আবার একইভাবে বলল, যা। আমি ভাত রানতাছি। বাড়িতে ঢুকে আলি হোসেনকে বারান্দায় বসে কাঁদতে দেখে কাঁখের কলসটি রান্নাঘরে রেখে এসে আলি হোসেনকে কোলে নিয়ে পুনরায় রান্নাঘরে ঢুকে এক টুকরা কয়লা হাতে দিয়ে বলল, যা, মুখ ধুইয়া আয়। আইজ তর লাইগা আন্ডা রানমু। বোনের আদরের স্পর্শ এবং দরদমাখা কথা শুনে তার কান্নার গতি কিছুটা রোধ হয়, কয়লা হাতে নিয়ে পুকুরের দিকে এগিয়ে যায়। আজ কী রান্না হবে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে, এমনভাবে কাজ শুরু করে আমেনা যেন এই পরিবারে কিছুই ঘটেনি। মুখের মালিন্যের ছায়াও কেটে গেছে, শরীরের দুর্বলতাও ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এবং কোমরে আঁচলের গিঁট দিয়ে রান্না শুরু করে―মনে মনে বলল, আইজ ভাইরে আডো (হাটে) পাডান লাগব। পুষ্কুনি থাইক্যা মাছ ধরানি লাগব।    

                ঘরের মাচার নিচে ঢুকে রাবেয়া খাঁচা উঠালে কয়েকটি মুরগি পাখ ঝাড়তে ঝাড়তে বের হয়ে যায়। অন্য খাঁচাটি উঠালে তিনটি হাঁস প্যাঁক প্যাঁক করতে ঘর থেকে বের হয়ে পুকুরে গিয়ে নেমে খাদ্যান্বেষণে ডুব-সাঁতারে মত্ত হয়। মুরগিগুলো বাড়ির আঙিনা ছেড়ে পাশের ঝোপঝাড়ে পোকামাকড় খুঁটে খুঁটে খেতে শুরু করে।

                বিনিদ্র রাত কাটিয়ে, ক্লান্ত-শ্রান্ত নিস্তেজ শরীর নিয়ে, গরু দুটিকে ঘাসের চাতালে খুঁটিতে বেঁধে, ভোরের নির্মল আলোয় আলোকিত বৃক্ষপল্লবের দিকে অর্ধনিমীলিত চোখে তাকিয়ে নুর হোসেন ভোরের সমস্ত সতেজতার সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিতে না পারা দৈন্যপীড়া অনুভব করে দীর্ঘশ^াস ফেলে। এই সময় আদুল গায়ে সুঠাম দেশের কালোবর্ণের দুদু মিয়া পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সাদা ধবধবে দাঁত বের করে হাসিমুখে নুর হোসেনকে জিজ্ঞেস করল, তর শইল ভালা না রে ? নুর হোসেন কোনও উত্তর না দিয়ে বরঞ্চ মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, এই হারামজাদারে খুন করতে হবে। মনে মনে একটা পরিকল্পনাও করে ফেলে যে, রাতে ওর বাঁশি শোনার জন্য নদীর পাড়ে নিয়ে খুন করে নদীতে ভাসিয়ে দেবে। এর পর যা হবার তাই হবে। নুর হোসেন কোনও জবাব না দেওয়াতে সে অপমানিত বোধ করলেও, মনে মনে ধরে নেয় গরিব মানুষের এমন অপমান নিত্যদিনের পাওনা; ধীরে ধীরে হেঁটে মাঠের দিকে যায়। তবে কিছুক্ষণ পরেই তার মনোজগতে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং ভাবান্তরে পড়ে যে, নুর হোসেন কেন আগের মতো কথা বলে না কিংবা কোনও কথারই উত্তর দেয় না। নিশ্চয়ই কোনও ঘটনা ঘটেছে যার জন্য নুর হোসেন এমনভাবে বিমুখ হয়ে থাকে। কিন্তু কোনও জটিল চিন্তায় মাথা ঘামানোর মতো মানুষ সে নয় বলে পরক্ষণেই সে নিজের কাজে চলে যায়।

                বাড়ি ফিরে এসে আমেনাকে দেখে নুর হোসেন বুঝতে পারে ওর মুখের ওপর থেকে মনমরার ছায়াটি নেই। কিছুটা বিস্মিত হলেও ভালো লাগে এই জন্য যে, সংসারের সুখ-দুঃখের চাবিকাঠি এখন তার হাতেই। সে-ই সামলাতে পারে পরিবারের দুর্গতি। ভ্রাতৃস্নেহ ও দরদ নিয়ে রান্নাঘারে আমেনার পাশে এসে দাঁড়ালে, সে বলল, আলি হোসেন আর রাবেয়ার খুব কষ্ট অইতাছে। আইজ পুষ্কুনি থাইক্যা মাছ মারবা। বৈহালে আডো (হাটে) যাইবা।

                আমেনার কথায় নুর হোসেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। দুদু মিয়াকে সকালে দেখার পর মাথায় যে খুনের নেশাটা চেপে ছিল তা ধীরে ধীরে সরে যায়। উঠোনে আলি হোসেন ও রাবেয়াকে কিছু একটা খেতে দেখে স্বস্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে। মাসাধিককালের দুর্ভাবনার যে দানবটি মাথায় চেপে ছিল সেই চাপ মনে হয় কিছুটা শিথিল হয় এবং উত্তুঙ্গ মনের লাগাম টেনে ধরতে পারে। রান্নাঘর থেকে বাইরে এসে বিড়ি টানতে টানতে গোয়ালঘরে গিয়ে ঢুকে প্রথমে চারি পরিষ্কার করে, পরে গোয়ালের মেঝে ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে স্বস্তির নিশ^াস ফেলে।

                দুপুরে মাকে গোসল করিয়ে মাছের ঝোল দিয়ে খাবার দিয়ে আমেনা সাহসী হয়ে জিজ্ঞেস করল, কে করল এই সর্বনাশ ?

                নুরি বেগম নির্বিকার, ভাতের লোকমা মুখে দিয়ে স্বভাবসিদ্ধ উচ্চারণে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে এমনভাবে বলল যেন মনে হলো কোনও ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর কাছে বলল, তোর বিয়া অওনের তাবিজের কথা কইতে গেছিলাম তর বাপের দোস্তের কাছে। এরফর…।

                মা যদিও বাক্যটি শেষ করেনি তবু আমেনার বুঝতে বাকি রইল না যে, ঘটনাটি কীভাবে ঘটতে পারে। এখন কষ্টটা নিজের কপালের দিকেই টেনে আনে আমেনা। এই কপাল লইয়া জন্ম হলো ? বিয়ে হয় না, তাবিজ দিলে তাড়াতাড়ি বিয়ে হবে; অথবা কোনও মানুষ আমাকে তাবিজ করে রেখেছে এজন্য বিয়ে হচ্ছে না; যার জন্য তাবিজ আনতে গিয়ে মায়ের এমন সর্বনাশ করল বাপের ছোটবেলার দোস্ত। বাবার সঙ্গে তার কত খাতির মহবত ছিল, কত দাওয়াত খাওয়া হতো দুই পরিবারের মধ্যে। সেই ছোটবেলা বাবা আর জালাল উদ্দিন গ্রামের দুজনকে সাক্ষী রেখে তারা একটি পাটকাঠির দুদিকে মুখে নিয়ে কামড় দিয়ে একসঙ্গে বলেছিল, ‘আইজ থাইক্যা আমরা দুজন দোস্ত।’ এই জনপদে এ-রকমই রেওয়াজ। অবশ্য দোস্তিয়ালা করার সময় সাক্ষী রাখতে হয় এবং দোস্তিয়ালা হয়ে গেলে রেওয়াজ অনুযায়ী একজন আরেকজনের অংশ হয়ে যায় এবং একজনের সব সুখ-দুঃখের ভাগিদার অন্যজন হয়। সেই থেকে তাদের বন্ধুত্ব ছিল আলতাফ হোসেনের মৃত্যু অব্দি। আর সেই লোক… আমেনা ভাবতে পারে না। তার শিরার রক্ত হিম হয়ে আসে, মাথা স্তব্ধ হতে থাকে। তবু সে ঋজু থাকার জন্য সকালে যে সংকল্প করেছিল সেই সংকল্প ধরে থাকতে চায়। দীর্ঘশ^াস ফেলে বুকের ভেতরের উত্তপ্ত বাতাস বের করে সে স্বাভাবিক থাকতে চায়; সেরকমই প্রতিক্রিয়াহীন জড়তুল পাথরের মতো থাকে পরিবারের সবার মঙ্গলের কথা চিন্তা করে। ওদেরকে আর মনমরা দেখতে চায় না আমেনা। সবার জন্য অন্তত তিনবেলা ভালোভাবে খাওয়ান দরকার। 

                দিনগুলো দ্রুতই শেষ হয়ে আসে এবং এক জাগতিক বিপর্যয়ের জন্য সার্বিকভাবে তৈরি থাকে আমেনা ও নুর হোসেন। মনে হয় মহাপ্রলয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, যে প্রলয়কে সামাল দিতে নিজেদের বিসর্জন দিতে হবে। কীভাবে দেবে বিসর্জন অথবা প্রলয়কে কীভাবে মোকাবিলা করবে তারও পরিকল্পনা দুজনে করে রাখে। এই প্রলয়ের উৎস যদিও ওদের মা তবু তার কোনও কিছু বলার নেই; বরং রক্তমাংসের শরীরের একটি যান্ত্রিক রোবটের মতো, যার কোনও ভাষা নেই। নুরি বেগমও বুঝতে পারে চার চারটি সন্তানের জন্য এখন আমেনার কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করা ছাড়া উপায় নেই। এ-কারণেই আমেনা যা বলে তাই করে এবং ভবিষ্যতেও করতে হবে―তাও বুঝতে পারে।

                যে-বাড়িটি দীর্ঘদিন নিরানন্দ গুমোট স্তব্ধতায় নিমজ্জিত ছিল সেই বাড়িতে আজকে কিছুটা আনন্দের ছোঁয়া লেগেছে। মা কোটাবন্দি থাকলে রাবেয়া আর আলি হোসেনের মনোকষ্টের ভার কমেছে আমেনার জন্যই। রাতে মুরগির মাংস রান্না করা হয়েছে, পুকুরের রুই মাছের ভাজি, ডাল মিলিয়ে মাসাধিকাল পরে বাড়ির সবাই আত্মতৃপ্তিতে রাতের খাবার খায়। রাবেয়া আর আলি হোসেন মায়ের খোঁজ-খবর প্রকাশ্যে না নিতে পারলেও মায়ের উপস্থিতি এই বাড়িতে আছে বলে মায়ের শূন্যতায় হাহাকার করছে না। তারা ধরেই নিয়েছে যে মায়ের কোনও অসুখ হয়েছে এবং ভালো হলে আবার তারা আগের মতো হয়ে যাবে। নুর হোসেন চাচার ঘরে শুতে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আমেনা দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে নুর হোসেনকে ডেকে উঠিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। ঘরের ভেতরে কুপির মৃদু আলোর শিখা বাতাসে কাঁপছে। আমেনা ঘরের মাঝখানে দাঁড়ালে নুর হোসেন বোনের দিকে নিষ্পলক জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেয়। হয়তো কিছু বলতে এসেছে এবং মনের ভেতরে হু হু করে ওঠে এই ভেবে যে, আজ রাতেই কি তাহলে সেই অঘটন ঘটতে যাচ্ছে। আমেনার মনেও অনেক দ্বিধা, সংকোচ, লজ্জা―আপন ভাইকে কী করে বলবে, বলার ভাষা কী হবে। কিছুক্ষণ সময় কেটে যায় দ্বিধা কাটাতে এবং মনের ভাষা প্রকাশ করার জন্য লাগসই শব্দ খুঁজতে। নুর হোসেন আগের মতোই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত আমেনা মনের সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে বলল, জালাল চাচার কাজ। কথা শেষ করে আমেনা আর ঘরের ভেতরে থাকেনি। কিন্তু নুর হোসেনের কাছে মনে হয়ে এই ঘরটি যেন ক্রমাগত নিচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি তলহীন শূন্যতায় ভাসতে থাকে। নুর হোসেন ঘরের চালের দিকে তাকিয়ে দেখে ঘরটি সত্যিকার অর্থেই ঠিক জায়গায় আছে কি না। নাকি নিজেকেই পাখির পালকের মতো মনে হচ্ছে, যে পালকটি বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। মাথা ঘুরছে ধীরে ধীরে। নুর হোসেন বিছানার পাশে বসে একটি বিড়ি জ¦ালিয়ে ভাবতে থাকে যদি দুদু মিয়াকে খুন করে ফেলত তাহলে কত ভুলই না হতো। এই ভেবে সে কিছুটা স্থির হয় এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য বিছানার নিচে রাখা কিরিচটি বের করে এর তীক্ষèতা হাতের স্পর্শে পরখ করে। মনে যদিও উত্থিত হয় জালালকে সে খুন করবে কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় এই কাজ দুঃসাধ্য। অসম্ভব। বাবার বাল্যকালের দোস্ত যারা কি না পাটকাঠি কামড় দিয়ে দোস্তিয়ালা করেছিল, বাবার মৃত্যু পর্যন্ত বন্ধুত্ব অটুট রেখেছিল, গ্রামের মধ্যে সে একজন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মানুষ, তিন বছর আগে হজব্রত পালন করে হাজি সাব হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতেও সমস্যা ছিল না; কিন্তু তার দেহবল্লীর সামনে দাঁড়ানোর মতো শক্তি ও সাহস দুটির কোনওটিই নেই নুর হোসেনের। কিরিচের ধার ও তীক্ষèতা পরখ করে বিমর্ষ মনে আবার শিয়রের কাছে বিছানার নিচে রেখে দেয়। মাথার ভেতরটা জ্যাম হয়ে গেছে, বিড়ি জ¦ালিয়ে টেনে কিছুটা জ্যাম ছুটিয়ে কুপির আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। নিমীলিত চোখে ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে একবার মনে মনে বলল, একটা ভুল ধারণা নিয়ে যদি দুদুকে খুন করে ফেলত তাহলে এই পাপের কোনও ক্ষমা হতো না।      

                প্রতি রাতের মতো আজও আমেনার চোখে ঘুম নেই। ভীষণ অস্থিরতাকে দূর করার জন্য কোরআন শরিফের সুরা পড়ে মনে মনে যে সুরাটি দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য গ্রামের মক্তবের হুজুর শিখিয়েছিলেন ছোটবেলা; কিন্তু দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা দূর হয় না। বরঞ্চ আরও নতুন নতুন চিন্তায় আক্রান্ত হয় সে। কদমগাছের তলে তবে কি মায়েই ভোগ দিয়েছিল ? গভীর রাতে রান্নাঘরে মা যে খটরমটর করত তা ভোগ দেওয়ার জন্য ? সবকিছুই আমার বিয়ের জন্য ? আমেনার বুকের ভেতরে হু হু করতে থাকে এবং তখন তার মনে হয় যদি চিৎকার করে কাঁদতে পারত তাহলে হয়তো বুকের পাথরটা সরে যেত। এই কষ্টের ভার বহন করা যেন তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। চোখে-মুখে আঁচল চেপে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে কাঁদে আমেনা এবং শেষ রাতের দিকে নিজেকে বেশ হালকা মনে হয়।  

দুপুর থেকেই নুরি বেগমের শারীরিক অবস্থায় জানান দিয়েছে আজ যেকোনও সময়ই ঘটনা ঘটতে পারে। নুর হোসেনকে ডেকে আমেনা ফিসফিস করে কী যেন বলল। সন্ধ্যার পরেই রাবেয়া আর আলি হোসেনকে চাচার ঘরে শুইয়ে দিয়ে এসেছে আমেনা। তাদেরকে বুঝিয়েছে মায়ের খুব অসুখ তাই নুর হোসেনকে মায়ের কাছে থাকতে হবে। শিশুদের মাথায় মায়ের অসুস্থতা ছাড়া অন্য কোনও ধারণা জন্মেনি। ওরা চাচার ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে।

                চরম উৎকণ্ঠা ও দুর্ভাবনায় নিমজ্জিত নুর হোসেন বারান্দায় জলচৌকিতে বসে বিড়ি টানে; ধীরে-সুস্থে ধোঁয়া ছেড়ে ঘনকালো মেঘে আচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুদিন আগের যে একটি নিভন্ত আগ্নেয়গিরি বুকের ভেতরে মাঝে মাঝে ফুঁসে উঠত সেটি এখন শান্ত; মনও পাথরের মতো শান্ত এবং প্রকৃতির অমোঘ লীলা-বৈচিত্র্যের কথা ভাবে। যদিও বাস্তব জীবনের ক্ষেত্রে কোনও ম্যাজিকের কোনও প্রভাব নেই, তদুপরি প্রতিটি জীবনই যেন ম্যাজিকের মতো। প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের ম্যাজিকেল আকর্ষণ-বিকর্ষণ হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, কোথায় যেন একটি নির্দিষ্ট নিয়মেই সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। একটু আগেও বিস্তৃত আকাশে ঠাণ্ডা গ্রহনক্ষত্রের আলো আকাশে দৃশ্যমান ছিল, আর এখনই সব ঢেকে গেছে কালো মেঘে। নুর হোসেন কিংবা আমেনাও মনে মনে প্রার্থনা করে সন্ধ্যা থেকে, যদি আজ রাতে ভয়ানক ঝড়-বৃষ্টি হতো যে ঝড়ে ভাসিয়ে নিত ওদের ক্লেশ ক্লেদ যন্ত্রণা কষ্ট ও জমাট বিষাদের পাহাড়; লণ্ডভণ্ড হয়ে যেত এই জনপদ যেখান থেকে ওদের মুক্তি ঘটত। এখন প্রাকৃতিক একটা বিপর্যয় ওদেরকে রক্ষা করতে পারে―এই বিশ^াস ধারণ করেছে। যদি এমন প্রলয় হতো যাতে শোনা না যেত মানুষের আর্তনাদ, কান্না কিংবা যন্ত্রণার চিৎকার এবং প্রবল বর্ষণে ভাসিয়ে নিত মনের মলিনতা, দেহের আবর্জনা! চিন্তাক্লিষ্ট নুর হোসেন ধ্যানী যোগীর মতো অর্ধনিমীলিত চোখে রহস্যময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে; তখন মাঝে মাঝে তীক্ষè তরবারির মতো বিদ্যুতের ঝলক ঘনীভূত মেঘের প্রাচীর ভেঙে জমাট অন্ধকারের বুকচিরে নেমে আসে পৃথিবীতে এবং গুরু গুরু মেঘের নিনাদ ক্রমে গুরুগম্ভীর ও ভয়ঙ্কর রূপে ছড়িয়ে বরফের মতো নিñিদ্র নৈঃশব্দ্যে ফাটল ধরায়। এমন বজ্রনিনাদে বুকের ভেতরে কম্পন হওয়ার কথা থাকলেও নুর হোসেন নির্বিকার এবং মনে প্রাণে এই নিনাদ আরও ঘনীভূত হোক, আরও পুঞ্জীভূত―এমন কামনায় তার মন তুষ্ট হয়। ধীরে ধীরে রাত ঘনীভূত হয় এবং এই রাতকে আরও নিবিড় রহস্যময় ও নিগূঢ় ঐন্দ্রজালিক রূপ দিতে অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে গাঢ় অন্ধকার, ঘনকালো জমাট মেঘপুঞ্জ। আর কত অপেক্ষা ? কোটাঘরে কী হচ্ছে সে জানে না―অজ্ঞই থাকতে চায় সে―আসন্ন দুর্নিবার্য দুর্বিপাক সম্পর্কে জানা এবং সহ্য করা স্বাভাবিক মানুষ; বিশেষ করে, পুরুষের পক্ষে অনভিপ্রেত ও অস্বাভাবিক। মাতৃজঠরের কাক্সিক্ষত বা অনাক্সিক্ষত ঘটনা কোনও স্বাভাবিক ছেলেসন্তানের পক্ষে খোঁজ নেওয়া কি দুরূহ কাজ নয় ? নুর হোসেন কি এখনও স্বাভাবিক আছে? তার ভেতরের সত্তাটি কি বদলে যায়নি ? তার ভেতরের মনুষ্যত্বের যে আকড়গুলো ছিল সেগুলো বিদ্যমান যন্ত্রণায় এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি ? সে কি এই মেঘঘনঘটা নির্জন নিস্তব্ধ রাতে নিজেকে এক মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়া অনাগত মানবসন্তানকে খুনের সমস্ত প্রস্তুতি নেয়নি ? এই রাতেই সে হতে যাচ্ছে এক অর্বাচীন হন্তারক এবং আমৃত্যু লেগে থাকবে হন্তারকের তকমা। এ-রকম দুর্ভাবনা কিংবা অর্বাচীন মনে জট পাকালেও এগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে পাথরের মতো শান্ত থাকে। জালাল উদ্দিনের কথা মনে হয় নুর হোসেনের। এই গ্রামের সবচেয়ে প্রতিপত্তি ও দোর্দণ্ড প্রভাবশালী জালাল একটা নদীখেকো। নদীটি প্রায় খেয়ে ফেলেছে, গাছগাছালি লাগিয়ে দখল করেছে, সরকারের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও চরের বালি বিক্রি করে সম্পদের পাহাড় বানিয়েছে এবং তিন বছর আগে জালাল উদ্দিন নামের পূর্বে হাজি শব্দটিও বসিয়ে দিয়েছে। গ্রামের দোস্তি পাতা মানে পরিবারের নিকট আত্মীয় হয়ে যাওয়া, পরিবারের যেকোনও অনুষ্ঠান-পার্বনে দোস্তকে বাদ দিয়ে হতো না, গ্রামের রেওয়াজ অনুযায়ী হতে পারে না। কিন্তু এক সময় আলতাফ হোসেন জালাল উদ্দিনের কুকর্মের জন্য সম্পর্কটা নিজেই শিথিল করে দিয়েছিল। আজ সে-ই এমন বিশ^াসঘাতকতা করল। নুর হোসেনের চিন্তা থমকে যায়। থামতে তো হবেই। জালাল উদ্দিনের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার কাছে নুর হোসেন পর্বতের তুলনায় একটি ইঁদুর মাত্র। দুদুকে খুন করার জন্য যেমন সে উত্তুঙ্গ হয়ে উঠেছিল জালাল উদ্দিনের নাম শুনে ততই নুয়ে পড়েছিল। তখন সে ভাবতে থাকে অন্য কথা। মায়ের ইচ্ছে ছাড়া কি ঘটনা ঘটতে পারে ? এমন আমেনাও ভেবেছিল এবং আমেনার ক্রোধ স্তিমিত হয় এই ভেবে যে, মা হলেও সে মানুষ। বাবার মৃত্যুর পর জৈবিক ক্রিয়া কি বন্ধ হয়ে যাবে ? চল্লিশ বছরের জীবনে সামাজিকভাবে বিধবা হলেও শরীরের জৈবিক ক্রিয়া তো দমে যায়নি। আমেনার মনে এমন ভাবনা উত্থিত হতে পারে, সে তো অবোধ মেয়ে নয় এবং নিজেও বোঝে জৈবিক তাড়নার কথা। মানুষ তো বারবার জন্ম নেয় না। যৌবন ফিরে আসে না। এসব খেদোক্তি, মানসিক যন্ত্রণায় কাতর হলে সবকিছুই এক সময় দীর্ঘশ^াসে বিলীন হয়। মেঘপুঞ্জ আরও ঘনীভূত হলে বাতাস আর সে ভার বইতে পারে না, শুরু হয় প্রথমে ঝিরঝির এবং পরে শোঁ শোঁ বাতাস, টুপটাপ বৃষ্টি। বাতাসের বেগ বেড়ে যেতে পারে এবং ঘরের কুপি নিভে যেতে পারে ভেবে মাছ ধরার খালইয়ের ভেতর কুপিটি রেখে আবার বারান্দায় বসে উদাস দৃষ্টিতে মাতাল আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রতীক্ষার প্রহর গোনে নুর হোসেন।

                কী হচ্ছে কোটাঘরে ? নুর হোসেন সে দিকে কান পেতে আছে। হয়তো যেকোনও সময়ই অনাগত কোনও এক নবজাতকের কান্না শুনতে পাবে। আর মা ও ঝিয়ের মধ্যে বাকহীন অপেক্ষা। শুধু ব্যথায় নুরি বেগমের শরীর ও মুখ নীল হয়ে গেলেও কোনও আর্তনাদ নেই; পারে তো আমেনা মুখ চেপে ধরে। এতে মায়ের মরণ হতে পারে কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই আমেনার। বুকে কঠিন পাষাণ বেধে, চরম নিষ্ঠুরতায় নিজেকে তৈরি করে, মায়ের মুখ চেপে ধরে, যাতে কোটাঘর থেকে টু শব্দটি বের হয়ে বাইরের বাতাসের সঙ্গে মিশতে না পারে। এতক্ষণে মা হয়তো কিছুটা বুঝতে সক্ষম হয় এবং নিজেকে সংযত করে চেপে থেকে বেদনাসঞ্জাত আর্তনাদ নিয়ন্ত্রণ করে। গর্ভধারণ ও প্রসবে অভিজ্ঞ মা। কিন্তু আমেনার কি সে অভিজ্ঞতা আছে ? তবু সমাজের রক্তচক্ষুর ত্রাসন-শাসন থেকে বাঁচার জন্য, একটি নয়, চার চারটি সন্তানের অনাগত ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকার কূপ থেকে বাঁচার জন্য মা-মেয়ের অলঙ্ঘনীয় আপসকামিতা; আমেনার কাছে স্খলিত মায়ের নতি স্বীকারের ফলে লজ্জা-সম্ভ্রম জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেই আমেনাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেয়। আমেনা এই মুহূর্তে আর মেয়ে নয়, সে হয়ে গেছে কোনও এক অচেনা অভিজ্ঞ ধাত্রী, যার কাছে নুরি বেগম নিজের শরীরের সমস্ত গোপনীয়তাকে সমর্পণ করে এবং নিজেই বলে দেয় প্রসবের সময় কখন কী করতে হবে। আমেনাও ভুলে গেছে নুরি বেগম তার মা; সে একজন ধাত্রী এবং কিছুক্ষণ আগে শিখে নেওয়া বিদ্যা কাজে লাগানোর জন্য দ্বিধাহীন নির্ভীক কাজ করে। কোটাঘরেও মাছধরার খলুইয়ের মধ্যে কেরোসিনের কুপিটি নিবু নিবু করছে, বাতাসের ঝাপটায় শিখাটি মৃদু দুলছে। বাড়ির পশ্চিমপাশে বিশাল জঙ্গল থাকায় যদিও এই কোটাঘরটি ঝড়ো বাতাস থেকে রক্ষা পায়। তবে অনুমান করা যায় যে, বাইরে শোঁ শোঁ বাতাস বইছে, তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে এবং হয়তো শিলাবৃষ্টিও হচ্ছে যা কোটাঘর থেকে আমেনা অনুমান করতে পারে না, অনুমান করতে পারে না নুরি বেগমও। অবশ্যই বাইরের ঝড়ের চেয়ে এই কোটাঘরের ঝড় অনেক প্রবল, অনেক মাতাল।

                কোটাঘরের ঝড় থামে। বাইরের ঝড় থামেনি। মায়ের জরায়ু থেকে বের হয়ে আসে রক্তমাখা একটি ফুটফুটে শিশু। ক্রন্দনহীন, শব্দহীন। চোখ দুটি নিমীলিত। নুরি বেগমে কিছুক্ষণের জন্য অজ্ঞান অথবা অতিরিক্ত যন্ত্রণার কারণে বেদিশা থাকায় গর্ভজাত সন্তানকে দেখার সুযোগ পায়নি। আমেনা শিশুটিকে একটি কাপড়ে মুড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে নুর হোসেনের কোলে দিয়ে পাশে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে। নুর হোসেন ফাঁসির জল্লাদের মতো সবকিছু তৈরি করেই বারান্দায় অপেক্ষা করছিল। ঝড়ের তাণ্ডব থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য একটি পলিথিন দিয়ে নিজের সারা শরীর মুড়িয়ে নেয়, একটি কোদাল, এক টুকরো পলিথিনে এক পোয়া পরিমাণ লবণ ও একটি টর্চ নিয়ে যাত্রা শুরু করে, গভীর জঙ্গলের দিকে। আমেনা ফিসফিস করে বলল, মুহের মধ্যে সব নুন দিয়া দিবা। গাতাডা বেশি জের কইরো। নইলে হিয়ালে লাশ তুইল্যা ফেলবো। তারপর দীর্ঘশ^াস ফেলে মিনিট দু-এক প্রকৃতি রহস্যময় ঝড়ের তাণ্ডব দেখে কোটাঘরে গিয়ে গর্ভফুলটি নিয়ে ঘরের পাশে একটি গর্ত করে পুঁতে দিয়ে মায়ের শুশ্রƒষায় আত্মনিয়োগ করে।

                প্রবল বাতাস ও বৃষ্টি, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝিলিক, যে ঝিলিকের আলোয় গাঢ় অন্ধকারে গভীর জঙ্গলের সামান্য পথ দেখায়, জলকাদায় মাখামাখিতে ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে, আঁকা-বাঁকা পিচ্ছিল পথে পা টিপে টিপে দৃঢ় পদক্ষেপে, ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় নুর হোসেন। অন্ধকার আরও গাঢ় হয়। তার এক হাতে সদ্যোজাত কাদামাটির মতো নরম রক্তমাখা একটি শিশু। কোমরের কোচরে এক পোয়া লবণ, কাঁধে কোদাল এবং এক হাতে টর্চ। অনেক গভীর জঙ্গলটি অতিক্রম করে প্রায় নদীর কাছাকাছি এসে স্থির হয়ে দাঁড়ায় সে। তারপর আকাশের দিকে একবার নিমীলিত চোখে তাকিয়ে মনে মনে বলল, হে আল্লাহ, তুমি আমারে ক্ষেমা দিও। তারপর শিশুটিকে মাটিতে রেখে একটি গভীর গর্ত করে। গর্তটি জলকাদায় বারবার ভরে যায় এবং অশান্ত মনে অবিশ্রান্তভাবে গর্তটি করতে সফল হয়। আজকের অভিযানের শেষ পর্বের দিকে সে মগ্ন, কোমরের কোচর থেকে এক পোয়া লবণ বের করে শিশুটির মুখে ঢুকিয়ে দেবে যাতে তার সহজ মৃত্যু হয় এবং পরে গর্তে মাটি চাপা দেবে। রক্তমাখানো শিশুটির মুখে টর্চের আলো ফেলার পর শিশুটি মুদিত চোখ সামান্য বিস্ফারিত করে। আর তখনই নুর হোসেনের অন্তরাত্মা হু হু করে ওঠে, তার চোখ দুটি ভিজে যায় অজানা মায়ায়, অজানা আশঙ্কায়। শিশুটির দিকে সে তাকাতে না পেরে চোখ বুজে কিছুক্ষণ সময় কী যেন ভাবে এবং তার মনের ভেতরটা কেমন করে সে বুঝতে পারে না। তখন সে অনুভব করে―এই জগৎ বড় রহস্যময়। কী পাপ আর কী পুণ্য ? কে নির্ধারণ করে এই পাপ-পুণ্য ? নুর হোসেনের চিন্তাশক্তি ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় এবং মাটিতে হাঁটু গেড়ে আরও কিছুক্ষণ বসে থেকে এক সময় লবণের পুটলিটা দূরে ছুড়ে ফেলে দেয়। তারপর শিশুটিকে নিয়ে এগিয়ে যায় নদীর দিকে। বৃষ্টির কারণে নদীতে বেশ স্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। নদী পারাপারের জন্য স্থানীয়রা কয়েকটি মান্দাস ব্যবহার করে যেগুলো এখানে খুঁটি দিয়ে আটকানো, একটির খুঁটি ছাড়িয়ে শিশুটিকে মান্দাসের মাঝখানে শুইয়ে দেয়, নিজের গায়ের পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়ে ভাসিয়ে দেয়। ভাটির টানে মান্দাসটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে এবং এক সময় সেটি গভীর অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে যায়।

ঝড়বৃষ্টি থামে রাতের শেষ প্রহরে। ভোরে পুবের আকাশ সূর্যের নরোম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে চারপাশ। গাছে গাছে সবুজ সতেজ পাতা আলোয় ঝলমল করছে। নদীর পাশেই একটি বাজারের ঘাটে মান্দাসটি লেগে আছে। নদীর পাড়ে জনাবিশেক মানুষ বিস্মিত চোখে চেয়ে আছে ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত শিশুটির মুখের দিকে এবং তখন শিশুটির চোখ দুটি মিটমিট করে।  

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ              

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares