গল্প : মাছি অথবা নিছক কানামাছি : উৎপল দত্ত

বিশ্বাস করেন, আমার নাম মাছি।

মাছি কারও নাম হয়! সত্যি কথা বল্। চর-থাপ্পড় খাবি! হাত ওপরে তোলেন নিপাট ভদ্রলোক। তার মাথায় হেলমেট, রাজমুকুটের মতো। চোখ ভরা আক্রোশ, মুহূর্তকাল আগে সস্তা চায়ের দোকানে চা খেতে এসে তার একশ’ টাকা খোয়া গেছে। অদূরে তার মোটরবাইক। সদ্য জাপান থেকে এসেছে। বন্ধু রাসেল সাইফুল্লাহ’র শোরুম থেকে কেনা। মাঝরাতে সুখস্বপ্নের মতো ফোন করে জানিয়েছিল বন্ধু রাসেল, এসে গেছে। তার স্বপ্নের মোটরবাইক এখন ঢাকায়। জলের মতো টাকা বেরিয়ে গেছে, তবু স্বপ্ন ছাড়েনি। টাকা যায়, টাকা আসে। এখনও আসেনি টাকা পকেটে। তাই গলা ভেজাতে সস্তা চায়ের দোকানে পঙ্গু বেঞ্চিতে বহুকাল পর বসেছিলেন তিনি। চায়ের বিল মেটাতে পকেট হাতড়ান, পকেট কথা বলে না। বোবা পকেট জানিয়ে দেয়, নেই। খোয়া গেল একশ’ টাকার একটি মাত্র নোট।  এই সময়ে একশ’ টাকা কম কথা নয়। পাশেই ছিল হিলহিলে লোকটা। সন্দেহ-সাপ ফণা তোলে। তাই তার নাম জানতে চেয়েছিলেন, বাইকঅলা ভদ্রলোক। উত্তর আসে, মাছি। সাপ ভেতর থেকে লতিয়ে বেরিয়ে আসে, ‘মাছি! আমার নাম মাছি।’ ভেংচি কেটে ‘মাছি’ নামধারী লোকের উত্তর নকল করেন বাইক-ভদ্রলোক। কাল সারারাত দাপাদাপির রাত ছিল। ঘুম হয়নি। চোখ লাল। বন্ধু সাইফুল্লাহকে পুরো টাকা দেওয়া হয়নি। এখন তা সম্ভবও নয়। ব্যাংক লোনের ফিকির করে বেড়াচ্ছেন। উদার বন্ধুর কাছে কৃতজ্ঞ সে। এরকম বন্ধু হারানো, বাপ-মা হারানের মতো। বাকি টাকা শোধ করতে হবে। কেমন করে, তার কোনও হদিস নেই তার মাথায়। মাথায় রাজমুকুটের মতো হেলমেট আছে, মোটরবাইকের অ্যাক্সেসরিজ হিসেবে এক্সট্রা পাওনা। এর জুড়ি নেই। তবু তার মনে আছাড়ি-পিছাড়ি করে মেঘ।

 বেনুর মুখ শরতের আকাশ। গুচ্ছ কাশফুলের শুভ্রতা মুখে মেখে চা খাচ্ছিল।

সজোরে বেনুর চোয়ালে মোটাসোটা হাতের চড় এসে পড়ে। উড়ে যায় হাতের কাপ। গাল চেপে ধরে রাস্তায় বসে পড়ে বেনু। তার দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত ঝরছে। পর পর দু’টি পাঁচ আঙুলের থাবা তার চর্মসার চোয়ালে এসে পড়ে। বাঁ দিকের একটি দাঁত পোকায় খাওয়া। নড়বড়ে, দাঁতের শেকড় গভীরে। পড়েও না, সারেও না। ব্যথায় ভুগছিল সে। ব্যথা বাড়ে-কমে, গোড়া ফুলে যায়। থাবা পড়ল সেখানেই।

চোয়াল গড়িয়ে বেনুর ময়লা জামায় রক্তের ফোঁটা। হাতের তালু রক্তে মাখামাখি। ব্যথায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল বেনু। পাড়ার ডাক্তার বলেছিল, দাঁত এখনই তোলা যাবে না। কেস খুব খারাপ হবে, রক্তারক্তি হয়ে যাবে। অন্ধ হয়ে যাবি। খসখস করে কাগজে ওষুধ লিখে দিয়েছিল। দাম শুনে কেনেনি। ব্যথা বাড়লে গরম চা খায়, চিনি ছাড়া।

ফুটপাতে চায়ের দোকানের সামনে উবু হয়ে বসেছিল বেনু। কষ্টকে ঠেলে ভেতরে পাঠাচ্ছে। প্রতিবাদ ভুলে গেছে সে, গত জনমে। অথবা প্রতিবাদের ভাষা তার জানা নেই আর। এ শহরে সে নতুন। সদ্য সে সওদাগরি ডিঙা ভিড়িয়েছে। সওদাগর এখন ভূমিতে উবু হয়ে টলছে। ব্যথার তীব্রতায় খিঁচুনি শুরু হলো। 

একশ’ টাকা হাতিয়ে বলে মাছি, আমার নাম মাছি। চালাকি, আমার সঙ্গে চালাকি, ভদ্রলোকের সাপ এখনও গর্ত খুঁজে পায়নি। তাই আবার তার হিসহিস। এবার জুতা দিয়ে বেনুকে গুঁতিয়ে দেয় ভদ্রলোক। টাল সামলাতে না পেরে সেখানেই গড়িয়ে পড়ে বেনু।

চায়ের দোকানে চামচের শব্দ হঠাৎ থেমে গেছে। বেঞ্চির ওপর চায়ের অপেক্ষায় যারা. তাদের মধ্যে একজন ঊনিশ-কুড়ি। চায়ের দোকানের পাশে পর পর কয়েকটি ফলের দোকান। তারা দেখছিল, আর  দরকষাকষি করছিল। খদ্দেরের হাতে পলিথিনের ব্যাগে ফল তুলে দিচ্ছিল। ব্যস্ততা সহসা কমে গেল। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে যুবক উঠে আসে, স্যার ছেড়ে দেন। বোঝাই তো যায় গ্রাম থেকে―কথা শেষ করতে পারে না যুবক। তার আগেই কথা ফেরায় মারকুটে ভদ্রলোক,

আরে এই গ্রাম থেকে আসা লোকজনই তো পকেটমার।

কত টাকা হাতাইছে। যুবকের জিজ্ঞাসা।

একশ’। সেটা বড় কথা না, আবার কানামাছি খেলে। মাছি কারও নাম হয়! নকল নাম। পকেটমারের নকল নাম লাগে। বলেন, লাগে না!

যুবক তার যৌবন হারায়। এই মুহূর্তে দীর্ঘদেহের মারকুটে ভদ্রলোকের চ্যালেঞ্জে চুপ করে যায়। চুপসে যায়। চৌকস মানুষটার সকল কথাই এখন ধমক। তার কোমরের ওপরে টামি মোটা। মেদ আছে। পকেটেও মেদ আছে। অদূরে ঝলক দেওয়া মোটরবাইকটির মালিক তিনি, আন্দাজ করে যুবক শুরুতেই স্যার বলে সম্বোধন করেছিল।

লাগে না, বলেন লাগে না, একই কথা ধমকের সুরে আওড়ায় রাজমুকুটের মতো হেলমেট-পড়া ভদ্রলোক।

হ্যাঁ তা লাগে। যুবক আর ঝামেলায় জড়ায় না। সুড়সুড় করে পাশ কেটে নিজপথ ধরে। পেটের থলি, টাকার থলির সঙ্গে ক্ষমতাও থাকতে পারে। মাথার হেলমেট খোলেনি সে। পাশেই তার জাপানি বাইক। সাত জনম পার করেও সে অমন বাইক কিনতে পারবে না। যেতে যেতে বাইকের দিকে লোভনীয় দৃষ্টি ফেলে সে। চোখের লোভ আফশোস হলে একসময় প্রতিবাদহীন যুবক গায়েব হয়ে যায়।

বেনু ব্যথায় কাতরায়। কথা বলার শক্তি নেই। ভদ্রলোকের কথার উত্তর দিতে না পেরে নিজের মনের সঙ্গে কথা চালাচালি করে বেনু। অশ্রুত কথার মধ্যে প্রতিবাদ না হলেও আর্তনাদ ছিল, আমার নাম মাছি। আমি পকেটমার নই। আমি মাছির জাদু জানি। জাদুর ব্যবসা নিয়ে ঢাকায় এসেছি। একদিন আমিও ওই রকম গাড়ি কিনব। আমার দাঁতে ব্যথা, আমি সওদাগর, একশ’ টাকার চোর নই আমি―নিজের মনের সঙ্গে কথার খেলা কারও কানে যায়নি। কারণ তা ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়নি। আহত চোয়ালের ব্যথায় তা সম্ভব হয়নি।

দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত তখনও ঝরছে। ছটফটানিতে তার পরনের লুঙ্গি ওপরে উঠে গেছে। ঊরুর মাংসপেশি

হেলমেটঅলাকে কুপিত করে।

কানামাছি খেলাচ্ছি তোকে, দাঁত কিড়মিড় করে লোকটা। একপাটি ফরসা দাঁত। স্বাস্থ্যবান। বেনুর ঊরু নিশানা করে পা তোলে সে। আঘাতটি ভয়ানক হতে পারত! হয়নি, পা গুটিয়ে নেয় সে নাটকীয় দক্ষতায়।

একটি পুলিশ টহল-ভ্যান সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রিয়ার উইন্ডো খুলে মুখ বাড়ায় একজন।

চটপট সামনে এগিয়ে যায় লোকটি। তার চোখমুখের ধমক সবাইকে চমক দিয়ে মিলিয়ে যায়, স্যার হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেছে কী রক্তারক্তি ব্যাপার দেখুন স্যার,  মানে ব্লিডিং স্যার! এখনই হাসপাতালে নেওয়া দরকার। ‘একটু’ বোঝাতে দুই আঙুল যেমন অজান্তেই সংযুক্ত হয় তেমনি সংযুক্ত মুদ্রায় হাত বাড়ায় সে, স্যার একটু সাহায্য, মানে হেলপ স্যার, হাসপাতালে―

রিয়ার উইন্ডো তরতরিয়ে নেমে যায়। পুলিশ ভ্যান দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার সময় লোকটির বাইকে কষে ধাক্কা দেয়। আসলে ধাক্কা লেগে যায়। পথের মধ্যে ছিটকে পড়ে বিবাদী বাইক। লোকটি হাউমাউ করে ছোটে তার বাইকের দিকে। মাথার হেলমেট আগেই খুলে হাতে নিয়েছিল পুলিশ-ভ্যানের আবির্ভাবের পর। এখন তা হাত থেকে খসে যায়, পড়ে মাটিতে। আহাজারি করে ওঠে লোকটি, আহারে। কাল শোরুম থেকে চালিয়ে আনলাম। এখনও লাইসেন্স হয় নাই, পেপারস নাই। টাটকা গাড়ি, ফটকা লোকটা―সব খেদ, ক্ষোভ এখন মাছির ওপর।

পথে-পড়া পলিথিন ব্যাগ, পরিত্যক্ত জলের বোতল সংগ্রহ করে পেট চালায়―এরকম তিনজন কাছেই ছিল। ওদের বয়স পাঁচ থেকে বারো। দাঁড়িয়ে মারপ্যাঁচ দেখছিল ফলের দোকানের আড়াল থেকে। ছুটে এসে একজন হেলমেটটি কুড়িয়ে নিল।

লোকটি ফিরে এসেছে হাঁফাতে হাঁফাতে। আক্ষরিক অর্থেই তার চোখের কোণে জল। একবিন্দু নোনাজল। বেনু বা মাছির  নোনতা রক্তপাতের সমান নয়। লোকটির হাতে একটি লোহার রড। গাড়িটি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। রডটি সে গাড়ি বা বুকের পাঁজর থেকে খসিয়ে নিয়েছে। বেনুকে লক্ষ করে রড উঁচিয়ে ধরেছে সে।

আমার জাপানি গাড়ি মাছিতে খায়। আমি এখন কানামাছি খেলা দেখাই।

স্যার কানামাছি তো আপনি খেলতেছেন। চায়ের দোকানের ভেতর থেকে শব্দ আসে। আপাত বিনয়ী হলেও কণ্ঠস্বর বলিষ্ঠ ছিল, তাই লোহার রড অল্পকাল শূন্যে ঝুলে থাকে। চায়ের দোকান থেকে শব্দ উঠেছিল লোহার দণ্ড বেনুর ওপর নেমে আসার মুহূর্তে। থামিয়ে দেয় একটি ভেসে-আসা স্বর।

আরও স¦র যোগ হয়ে তা কোরাস হয়।

উঁচানো লোহার রড সিনেমার স্লো মোশানের মতো নেমে আসে।

কানামাছি। কানামাছি। হে হে কানামাছি। লোকটি চারপাশে গুঞ্জন শুনতে পায়।

বাইকটি রাস্তার মধ্যে বেনুর মতো শুয়েছিল। তারও রক্তপাত হচ্ছে। তেলের মতো কালো তরল গড়াচ্ছে। রিকশা-  মোটরকারের জট লেগেছে সরু পথে। তার চেয়েও নাদুসনুদুস একটি লোক, চোখে রোদ চশমা, নেমে এল তার গাড়ি থেকে। যানজটে তার নিজের ফোর হুইলার ফেঁসে গেছে। তামাটে-লাল রঙের ফোর হুইলার থেকে নেমে হুমকি দিল, এই বাইক রাস্তার মধ্যে কেন! কার বাইক ? হু ইজ দেয়ার!  হু  ইজ দ্য ওনার।

ভাই গাড়ি সরান।

কার গাড়ি! রাস্তার মধ্যে কার গাড়ি! খ্যাকখ্যাক থু―

পানিশমেন্ট দরকার। কড়া পানিশমেন্ট।

ইত্যাকার নৈমিত্তিক শব্দ লোকটির কানে কোরাসের মতো অন্যরকম শব্দ হয়ে বাজে―কানামাছি। কানামাছি। হে হে কানামাছি―কানামাছি। তার কানের মধ্যে সবাই কানামাছি ঠেলে-ঠুঁসে দিচ্ছে!

স্যার এই যে আপনার একশ’ টাকা। আপনি চা খাওয়ার পর ফেরত নেন নাই। আপনি গাড়ি দেখতেছিলেন। আর যার দাঁত ভাঙলেন সেও চা খাইতে আইছিল। কানামাছি আপনি খেলতেছেন।

বেঞ্চ থেকে আরেকজন উঠে আসে, ভাই লোহার রডটি ছাড়েন। মুঠো আলগা হয়ে এসেছিল আগেই, লোহার রড খসিয়ে নেওয়া সহজ হলো বেঞ্চ থেকে উঠে আসা লোকটির পক্ষে।

ফলের দোকানের পাশে পলিথিন-কুড়ানো ছেলেরা দেখছিল লোকটার সাপ-সাপ সখেদ সওয়ার। সরু রাস্তায় ভিড় আর শোরগোল উঠতেই পড়ে থাকা  রাজমুকুট―হেলমেট― বগলদাবা করেছিল ওদের একজন।

হেলমেট চালান করে ফিরে এসেছে সে।

কত দিল ? বাকি দু’জনের একজন জানতে চায়।

পাঁচশ। নতুন তো। ভালো দাম দিছে। হেকমত চাচার দোকানে বিরিয়ানি খামু।

চুপ কর। ওদের মধ্যে যে বয়সে প্রায় বারো, সে ধমকায়। তারপর বেনুর দিকে তাকিয়ে বলে, চল হাসপাতালে নিয়া যাই। হেঁচকি তুলছে। রক্ত দেখছস!

হ যাই, চল যাই, বাকি দু’জন বয়সে কম।

কোমরে গামছা কষে চায়ের দোকান থেকে উঠে আসে একজন। সে রিকশাÑভ্যান চালায়। রিকশা-ভ্যান পাশে ভিড়িয়ে সে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল।

বেনুকে ভ্যানে তোলা হলো। সজোরে ঘন্টি বাজিয়ে ভ্যানঅলা একটানে বেরিয়ে যায়।

কানামাছি শব্দে বিহ্বল লোকটি বেনুর রক্ত-জলে আছাড় খেল। বেনুকে নিয়ে যাওয়ার পরপরই চায়ের দোকানি মাছি তাড়াতে জল ঢেলে দিয়েছিল। সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়লো বাইকঅলা।

ভ্যানে তিনটি ছেলের দু’জন উঠেছিল বেনুর সঙ্গে। বড় ছেলেটি রয়ে গিয়েছিল এদিকটায় নজর রাখতে। লোহার রডটি হাতে তুলে নেয় সে। ভালো দাম পাওয়া যাবে। ওজন আছে, ভাবে সে। ওজন এবার তার প্রতিদিন মার-খাওয়া মনকে উসকে দেয়। ভালো দামের কথা ভুলে, ঘুরে দাঁড়ায় সে। পড়ে থাকা ভদ্রলোকের কোমর বরাবর লোহার রড দিয়ে কষে আঘাত করে। তারপর কানামাছি কানামাছি ধরনের একটা সুর ভাজতে ভাজতে হাসপাতালের পথে দৌড়ায় যেখানে বেনু আছে।

লোকটি কাদাজলে শুয়ে ক্যাক করে ওঠে। চায়ের দোকানি এবার তার হাতে একশ’ টাকার নোট গুঁজে দেয়, স্যার ভাংতি নাই। চায়ের দাম পাঁচ টাকা। ভাংতি নাই, একশ’ টাকাই রাখেন।

দুই.

বেনু তার নাম ভোলেনি। স্কুলের খাতায় তার নাম লেখা আছে। এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করে বই খাতা তাকে তুলে দিয়েছিল। প্রথমে বাবা মরল, গাছ থেকে পড়ে। মা বেঁচেছিল আরও কিছুকাল। পরীক্ষার আগের দিন সে ওপারে যায়।

দিনকয়েক পর, মায়ের শোক যায়নি তখনও, বেনু দেখল ঘরের কোণে মাছি। খালি ঘর, মা নেই বলেই খালি। ঘরের জিনিস নিজের মতো গুছিয়ে নিতে গিয়েছিল একলা বেনু, আর তখনই দৃশ্যটি দেখল সে। একটি আচারের কৌটা। তাকে চট করে চেনা যায় না। মাছিতে জড়িয়ে আছে। মৌচাকে যেমন মাছিরা গাদাগাদি করে থাকে, ঠিক তেমন। হাত বাড়াতেই, মাছি উড়তে শুরু করল। বেশুমার মাছির ওড়াউড়ি আর গুঞ্জন। বেনু নিজেও বেসামাল। লুঙ্গির গিঁট কষে নিজেকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, পারছে না। নজরে পড়ল আরও তিনটি কাচের কৌটা। একই রকম। এবার চিনতে অসুবিধা হলো না। দেখতে কালো, কদাকার কৌটা জুড়ে মাছির প্রলেপ। পাগলের মতো কৌটাগুলো গড়িয়ে দিল সে। ঘরময় মেঘের মতো মাছির দাপাদাপি। স্তম্ভিত বেনু দাঁড়িয়ে পড়ল। নিশ্চল। মিনিট দশেকের মধ্যেই সব মাছি বেনুর গায়ে। মেঝেতে বোতল গড়ায়। খালি ঘরে বেনু এখন মাছি-মানুষ। এক তিল জায়গাও নেই। চোখ আগেই বন্ধ করেছিল সে। প্রথমে গা কেমন করছিল। সয়ে যায় সময়ে। চোখ খুলে পিটপিট করে দেখল, তার সারাদেহে মাছি। একটি ছোট পুঁতিরও ঠাঁই হবে না সেখানে।

মাছি নিয়ে বাইরে বের হয় বেনু। পুরোনো বাড়ি। অপরিসর ভিটেয় অনেক গাছপালা। বাবা বুনেছিল। সূর্য আগেই উঠেছে। উঠোনে তার আলো এখনও পড়েনি। রোদ নেই, সাদা হাঁসের পালকের মতো ভোরের আলো ঝরছে।

বাবার হাতে লাগানো মিষ্টি আমগাছটার উচ্চতা পরিমাপ করছিল। বেঁচে দিলে ভালো দাম পাওয়া যাবে। কয়েক মাস পেট চালানো যাবে। পেটে দাহ, প্রদাহও আছে। বেনু কোনও কাজ জানে না। দু’দিন কিছুই খায়নি। আগামীকাল সে হয়তো মরে যাবে, তাই মনে হয় বেনুর। গাছ কেটে ফেলা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনও সদর্থক বুদ্ধি মাথায় আসে না তার।

মন খুঁতখুঁত করে। আম পাকলে বাবা গাছে উঠে যেত। এ ডাল থেকে সে ডাল, বাবার অবাক চলাচল, বেনু দেখত। আমের রঙ দেখে, বুড়ো আঙুলে টিপে বোঁটা থেকে চিমটি কেটে আম খসায় বাবা, এই নে ধর। এক টুকরো চট হাতে নিচে দাঁড়ান বেনু লুফে নিত আম। কারও নিশানায় ভুলচুক ছিলও না। একটু দুলিয়ে  টুক করে আম ছেড়ে দেওয়ার বিশেষ ভঙ্গি স্পষ্ট ভেসে ওঠে বেনুর মনে। তাকিয়ে ছিল বেনু, কতক্ষণ তা মনে পড়ে না। চোখ ভিজেছিল, তার কয়েক ফোঁটা গাল গড়িয়ে বুকে পড়ল। ওই গাছ থেকে পড়েই মরে গেছে বাবা হারাধন। পাড়ার লোকে বলত হারা। তার বাবা হারিয়ে গেল, মা গেল। বেনুর চোখ থেকে আমগাছটি ক্রমশ হারিয়ে যায়। কল্পনায় কাটা পড়ে আমগাছ।

মাছিরা পিলপিল করে। হাতের তালু দিয়ে মাছি সরাতে যায় সে। চমকে ওঠে বেনু। তার গায়ে  কোনও মাছি নেই। প্রায় লাফিয়ে ঘরে ঢোকে, দেখে মাটিতে কৌটার গড়াগড়ি। সব কৌটা মাছিতে ঢাকা।

দু’দিন সে ঘটনা পরখ করে। কৌটায় হাত দিলেই মাছিরা তার সারা দেহ দখল করে। গায়ে আলতো স্পর্শ পেলেই বোতল জুড়ে বসে।

গ্রামের হাটে চট আর চারটি বোতল নিয়ে যায় বেনু। বুক দুরুদুরু, সেই বুকে সে সাহস ডেকে আনে। হাটে ঢোকার মুখে পথের মোড় বেছে নেয় সে। চট বিছায়। চটের ওপর চারটি বোতল। মাছিতে আকীর্ণ। ভেতরের আচার পচে গেছে। বোতলের মুখ খোলার সাহস করেনি সে। ওই আচার মায়ের জাদু হতে পারে।

মাছি মাছি মাছি। একবার গলায় আটকাল। কেশে গলা পরিষ্কার করে সে তারস্বরে বলতে শুরু করল মাছি, মাছি মাছির খেলা দেখেন ভাইসকল। মাছির খেলা দেখেন। প্রথম দিনেই বাজিমাত। লোকজন ভিড় করে মাছির খেলা দেখল। আলো পড়ে যাবার আগেই সে তার মাছির উপকরণ গুছিয়ে নিচ্ছিল। চটে জমেছে চাঁদের মতো পয়সা। দুই টাকার কয়েন। পাঁচ টাকার কয়েন। কাগজের নোটও আছে। দলা পাকানো দশ টাকার নোটও দেখতে পেল সে। লোভী অথবা বেঁচে ওঠার চোখ তার টাকায় আটকে যায়। দুই হাতে টাকা-পয়সা জড়ো করছিল বেনু।

সুন্দর খেলা। বজ্জাতি নাই। তুমি হারুর পোলা না!

চোখ তুলল বেনু। বাঁ হাতে বাজারের থলে আর ডান হাতে লুঙ্গির খুঁট খামচে দাঁড়িয়েছিল বুড়োমতো মানুষটি। এক মুখ সাদা দাড়ি আর বড় চুলের জন্য বুড়ো লোকটিকে পাগলাটে দেখায়।

ঢাকায় যাও। রোজগার বাড়তে পারে। ঢাকায় এই জাদুর খেলার কদর বেশি।

ঢাকায় ঠিক তখনই আসেনি বেনু। ঢাকা বলে কথা। অনেক শিক্ষিত মানুষ আছে। তাদের মাছির জাদুতে ভোলান সহজ নয়। বেনু গ্রামের হাটেই প্রায় এক বছর তালিম নেয়। রাজধানী ঢাকায় মাছির জাদু প্রদর্শনীর উপযোগী ভাষা আর কৌশল রপ্ত করে। ততদিনে বেনু নামটি হারিয়ে যায়। লোকমুখে তার নাম প্রথমে মাছি-বেনু, পরে হয় শুধুই মাছি।

প্রায় একবছরের উপার্জনের টাকা পুঁজি করে ঢাকায় মাথা গুঁজেছিল বেনু। প্রথমদিন তার খেলা জমেনি। দ্বিতীয় দিন জায়গা পাল্টায় সে। ব্যবসা জমে উঠবে, তার আলামত পাওয়া যায়। এখন সময়ের অপেক্ষা শুধু। বেনুর ব্র্যান্ড নেম মাছি হয়ে গেছে।

সেদিন অবসরে মোড়ের দোকানে চা খেতে এসেছিল বেনু। প্রশ্নের উত্তরে পাশের ভদ্রলোককে আনন্দে জানিয়েছিল, তার নাম মাছি।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares