গল্প : দ্বিতীয় যৌবন : বাদল সৈয়দ

সকালে ঘুম থেকে উঠেই মায়ের ডাক শুনে, মতি মিয়ার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বুড়ি সারাদিন খকখক কাশে আর তাকে রাজ্যের গালাগালি করে। ‘মতি হারামজাদা’ ছাড়া কথাই বলে না। বুড়া মানুষগুলোকে নিয়ে এ সমস্যা প্রায়ই হয়। তারা সময়ের বাতাস বোঝে না। আরে, গাছে ডালপালাও তো বাতাস যেদিকে সেদিকে দোলে। মানুষ তা করবে না ?

যখন বায়ু যেদিকে, মতি মিয়া সেদিকেই থাকে, এটা দোষের কী হলো ? বরং এটাই বুদ্ধিমানের কাজ। বুড়ি সেটা বোঝে না। এই যে এ আকালে দুটো ভাত পেটে যাচ্ছে তা তো মতি মিয়ার বাতাস চেনার কারণে। কই তার জন্য শোকর করবে, তা না সারাদিন গালাগালি। অতি বিরক্ত মুখে মতি মিয়া বারান্দা থেকে ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘কী কবার চাও, কও না মা। আমার কান ঠিক আছে তো। এখান থাইকাই তোমার কথা শুনি।’

‘হারামজাদা মতি, তুই কইলাম মইরা ডোবায় পইড়া থাকবি। তারপর ফেরেশতারা এক লাত্থিতে তোরে দোজখে নিয়া ফেলবেন। আমিও নিচ্চিত দোজখে যামু, আল্লাহপাক বলবেন, এর পুত্র মতি মিয়া ছিল অতি বদলোক, তার কারণে এরেও দোজখে পাঠাও।’

‘আমি কী দোষ করছি মা ?’

‘কী করছ নাই হারামজাদা ? মিলিটারিদের লগে উঠাবসা, এরে তার ধরাই দেওয়া, হিন্দু বাড়ি  লুট কী করস নাই হারামজাদা ?’

‘মা, এইডাই এখন বাতাস। মিলিটারিরাই এখন মা-বাপ। তুমি না, কবরে যে আব্বাজান শুইয়া আছেন, তিনিও না। এখন আমার আব্বা হইল মেজর সাব্বির, তাঁর স্ত্রী হইলো আম্মাজান, আফসোস তার সাথে দেখা হইল না।’

‘মর তুই, হারামজাদা, মর, মইরা ডোবায় পড়া থাক।’ ভেতর থেকে বুড়ির খুনখুন বিলাপ শোনা যাচ্ছে।

মতি মিয়া পাত্তা দিল না, তার তাড়া আছে। মেজর সাব্বিরের জন্য জরুরি খবর আছে, তা পৌঁছে দিতে হবে।

সে দ্রুত পায়ে হাঁটা দিল, পেছন থেকে তার স্ত্রী ডাক দিয়ে বলার চেষ্টা করল, কিছু খায়া যান।

মতি মিয়া বউয়ের দিকে না তাকিয়েই গালি দিল। ভয়াবহ অশ্লীল গালি। কারণ পেছন থেকে ডাকা মানে তার কাছে ‘কুডাক’। বেকুব মেয়ে মানুষ ‘কুডাক’ বোঝে না। সহজ ভাষায় তার গালির অর্থ হচ্ছে আরেকবার কুডাক দিলে তোকে মিলিটারির হাতে তুলে দিব,  আদর দেখাস, ফাজিল মেয়ে ছেলে কোথাকার। মিলিটারি আব্বাদের কাছে পড়লে বুঝবি আসল আদর কী জিনিস ?

তার বউ  হতভম্ব হয়ে তীব্র গ্লানি নিয়ে তাকিয়ে আছে। মতি এ ধরনের কথা বলবে সে কোনওদিন কল্পনাই করেনি। তার চোখে একদলা জল জমেছে, গড়িয়ে এসে তা তার চিবুক বেয়ে নিচে পড়ছে। ক্রন্দনরত প্রায় কিশোরি মেয়েটি ভাবছে, সময় মানুষটাকে কত দ্রুত বদলে দেয়। এই মানুষটাই ক’দিন আগেই তাকে কত আদর করত! রাতে তার হাতে ছাড়া শেষ পানটা খেত না, প্রায়ই হাট থেকে লাল-নীল চুড়ি কিনে আনত, অথচ মতি মিয়া খুবই দরিদ্র। ক্ষেতে কাজ করে, দিন আনে দিন খায়, তারপরও কত মায়া ছিল তার মনে। এখন কাঁচা টাকা আসছে আর মানুষটা বদলে যাচ্ছে। কত দ্রুতই না মানুষ বদলে যায়!

সময়টা ছিল আসলেই বদলে যাওয়ার। কেউ জননী মাতৃভূমির জন্য প্রাণ বাজি রেখেছিল, আর কেউ মায়ের শাড়ি খোলায় মন দিয়েছিল।

১৯৭১ ছিল এমনই সময়।

মেজর সাব্বির তখন মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন। কাল রাতে তাঁর ভালো ঘুম হয়নি। এ মরার দেশে আসার পর থেকে তাঁর শরীর তেমন ভালো যাচ্ছে না। আর্দ্র আবহাওয়া, যখন তখন বৃষ্টি নামে, পাঞ্জাবের রুক্ষ আবহাওয়ায় বড়ো হওয়া মেজর সাহেবের শরীর তা মেনে নিতে পারছে না। তার ওপর তাঁর ক্যাম্পের আশেপাশে প্রচুর সাপ। গত সপ্তাহে একজন সৈনিক সাপের কামড়ে মারা গেছে। তিনি সাপ ভয় পান। তবে তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রচুর কার্বোলিক অ্যাসিড ছড়ানো হয়েছে, কিন্তু তাঁর ভয় যাচ্ছে না। কোথায় যেন পড়েছিলেন কার্বোলিক অ্যাসিডে কাজ হয় না, কারণ সাপের ঘ্রাণেন্দ্রিয় নেই। কে জানে কথাটা সত্য কি না ? সত্য হলে বিপদ আছে। তবে তাঁর সবচে বেশি মেজাজ খারাপ কারণ তাঁর ক্যাম্পে এখনও কোনও মেয়ে নেই। মতি মিয়া বার বার আশ্বাস দিচ্ছে জোগাড় হবে, কিন্তু পারছে না। এ উল্লুকটা সব পারে, কিন্তু মেয়ে জোগাড় করতে পারেনি। অথচ আগের ক্যাম্পে প্রায় প্রতি রাতেই নতুন নতুন মেয়ে হাজির করা হতো, আর এখন তিনি রাতে অভিনেত্রী রানীর ছবি ব্যবহার করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যদি জানেন একজন মেজর তাঁর বান্ধবীর ছবি রাতে ব্যবহার করছে তবে তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠানো হবে। তীব্র বিরক্তি নিয়ে ক্যাম্পের বাইরে এসে দেখলেন, হনহন করে মতি মিয়া আসছে। দেখে তাঁর মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। কাকের মতো কালো এ শুয়োরের বাচ্চা তাঁর পায়ে নিয়মিত তেল মালিশ করে, হিন্দু পাড়ার খবর এনে দেয়, কোন বাড়ির ছেলেরা মুক্তিযোদ্ধা সে খবর এনে দেয়। তারপরও এ সিড়িঙে মার্কা লোকটিকে দেখলে তাঁর লাথি মারতে ইচ্ছে করে। কেন কে জানে ?

মতি মিয়া মেজর সাহেবের কাছে এসে বিনয়ে প্রায় বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বাঁকাতে বাঁকাতে তার শরীর মট করে ভেঙে যাবে।

মেজর সাহেব একদলা থুথু ফেলে প্রায় ধমক দিয়ে বললেন, কী বলবে বলো এবং সোজা হয়ে দাঁড়াও। সাপের মতো বাঁকা হচ্ছ কেন ?  তোমার কি ধনুষ্টংকার হয়েছে ? নাকি তা হওয়ার ব্যবস্থা করব ? 

মিলিটারি সাহেবের ধমক শুনে মতি মিয়া প্রায় নেতিয়ে পড়ে আর কি, এর মধ্যে মধ্যে সে বার বার বলতে লাগল, ‘হুজুর মেহেরবান, হুজুর মেহেরবান।’

মেজর সাহেব আবার কড়া ধমক দিলেন, কী বলবে ক্লিয়ার বলো অ্যান্ড অ্যাটেনশন, সোজা হয়ে দাঁড়াও।

মতি মিয়া সোজা হয়ে দাঁড়ানোর অনেক চেষ্টা করছে; কিন্তু মিলিটারি-আব্বার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ানো এত সহজ নয়। তারপরও কোনওভাবে সামলে নিয়ে সে হড়বড় করে কী যেন বলতে লাগল, কিছুই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে আসছে পচা গন্ধ। কতদিন হয়েছে দাঁত মেজেছে আল্লায় জানে।

মেজর সাব্বিরের মেজাজ চড়ছে। তিনি চড়া গলায় তাঁর বডি গার্ডকে বললেন, এ উল্লুক কী বলছে আমি কিছুই বুঝছি না। তুমি তো এ মুল্লুকে অনেকদিন আছ, এদের ভাষা ভালো বোঝ, ভালোভাবে জেনে নাও সে কী চায়, আমি তাঁবুতে যাচ্ছি, সেখানেই রিপোর্ট করো।

গার্ডের বাম পা কিছুটা উপরে উঠে খট করে নিচে নেমে এল, সঙ্গে শোনা গেল তাঁর কড়া গলা, ইয়েস স্যার।

বুটের শব্দে মতি মিয়া আরেকবার কেঁপে উঠল।

দুদিন আগের কথা।

মাত্র ভোরের আলো ফুটছে। এর মধ্যে পঠিয়া চা বাগানের ম্যানেজার হাসান চৌধুরীর একবার বাগান ঘোরা শেষ হয়েছে। এটাই নিয়ম। সুর্যের আলো ফোটার আগেই বাগানের ম্যানেজারকে তা ঘুরে দেখতে হয়, কুলি বাবুদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে হয়। তা সেরে হাসান সাহেব নিজের অফিসে আরাম করে চা নিয়ে বসেছেন। ভদ্রলোক বেশ সুদর্শন। পঞ্চাশের ওপরে হলেও এখনও সুঠাম শরীর, গায়ের রঙ পাকা গমের মতো। জানালা দিয়ে রোদের আলো তাঁর ডান গালে এসে পড়ছে। হাফ প্যান্ট আর সাদা পলো শার্টে তাঁকে মানিয়েছে খুব। খেয়াল করলে বোঝা যায় রিচার্ড বার্টনের সঙ্গে তাঁর চেহারার অদ্ভুত মিল আছে।

গরম চায়ের কাপ হাতে তিনি বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। সবুজ তাঁর খুব পছন্দ, তাই বাইরের সবুজের ঢেউ থেকে তিনি চোখ সরাতে পারছেন না। এমন সময় খুট করে পেছনে শব্দ হলো। তিনি পেছন ফিরে তাকিয়ে একটু অবাক হলেন। দরোজায় এক তরুণ দাঁড়িয়ে, বয়স বিশের মতো হবে। চেহারায় এক ধরনের নিষ্পাপ ভাব। তিনি বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, তুমি কে ? এখানে কীভাবে ঢুকলে ?

ছেলেটি জবাব না দিয়ে মিষ্টি হাসল, ‘স্যার একটু বসতে পারি ? আপনার সঙ্গে জরুরি কথা ছিল।

‘বসো।’

ছেলেটি খুব বিনীত ভঙ্গিতে সামনে বসল। হাসান সাহেবের বিস্ময় কমছে না। হাবেভাবে মনে হচ্ছে শিক্ষিত একটি ছেলে। কথা বলছে বিশুদ্ধ শুদ্ধ ভাষায়, যা এ অঞ্চলে বিরল। এখানে সবাই স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বলো কী বলবে ?

কোনো ভণিতা ছাড়াই ছেলেটি বলল, ‘আপনার বাংলোটি আমাদের ক’দিনের জন্য ধার দিতে হবে। আমাদের এক বন্ধু অসুস্থ, তার বিশ্রাম দরকার।’

হাসান সাহেবের মাথায় রক্ত উঠে এল, এ বেয়াদব বলে কী ? তাঁর বাংলো ধার দিতে হবে মানে ? এটা কি মুসাফিরখানা নাকি যে কেউ ইচ্ছে করল আর এসে উঠে পড়ল। তিনি কঠিন কণ্ঠে বললেন, ‘মানে ? কী বলতে চাইছ তুমি ? আমার বাংলো ধার দিতে হবে কেন ? হু আর ইউ ? এত বড়ো সাহস, আমার বাংলো ধার চাও! এটা কি তোমার মামার বাড়ি ?’

‘স্যার, আপনি অনেক প্রশ্ন এক সঙ্গে করেছেন। সবগুলোর জবাব দিচ্ছি, মনোযোগ দিয়ে শুনুন।’ হঠাৎ ছেলেটির বিনীত কণ্ঠ ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে গেছে।

‘আমি কে তা আপনি একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন এবং আপনি আমাদের পক্ষে না বিপক্ষে সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। শুধু একটা কথা বলি, আমার চাদরের নিচে একটি জিনিস আছে। তার নাম সংক্ষেপে এসএলআর। এ সময়ে এ জিনিসটার নাম কমবেশি সবাই শুনেছে। আপনিও নিশ্চয় শুনেছেন। আপনার বাগান রক্ষীদের চার পাঁচটি গাদা বন্দুক এর সামনে কোঁক করার সময়ও পাবে না। তাই তাদের না ডাকাই ভালো।’

অনেকক্ষণ কথা বলে ছেলেটি একটু দম নিল। তারপর বলল, ‘কাল একটি খণ্ডযুদ্ধে আমাদের একজন বন্ধু আহত হয়েছে। তারপর থেকে আমরা বাগানের সঙ্গে লাগোয়া জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছি। মোট পাঁচজন। কিন্তু সেখানে আমাদের বন্ধুর চিকিৎসা এবং বিশ্রাম সম্ভব নয়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ও কিছুটা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আপনার বাংলোয় থাকব। ওর চিকিৎসা আমরাই করব। আমাদের মধ্যে একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট আছে। আপনার কাজ হবে শুধু আমাদের আশ্রয় দেওয়া এবং তা আপনাকে দিতেই হবে। কারণ আমাদের অবস্থান জানার পর আমরা এমনিতেই আপনাকে ছেড়ে যেতে পারি না। আমি নিশ্চিত আমি এখান থেকে বের হলেই আপনি আর্মিকে খবর দেবেন। তাই আপনার দুটো পছন্দ, একটি হচ্ছে আমাদের আশ্রয় দেওয়া অথবা জঙ্গলে গিয়ে কিছুদিন আমাদের সঙ্গে থাকা। কথা দিচ্ছি আপনার কোনও সমস্যা করা হবে না। আমরা নিরাপদে সরে যেতে পারলেই আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।’

হাসান সাহেব হতভম্ব চেহারা নিয়ে তরুণটির দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে তিনি বললেন, ‘কিন্তু আমার বাড়িতে মালি, বাবুর্চি, দারোয়ান, আর্দালি সব মিলিয়ে প্রায় এগারোজন মানুষ কাজ করে। তারা ব্যাপারটি কীভাবে নেবে ? ওদের কেউ যদি তোমাদের কথা ফাঁস করে দেয় ?’

‘সবচে ভালো হয় তাদের ছুটি দিয়ে দিলে।’

হাসান সাহেব কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসছেন, তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘ফুলিশ’।

‘মানে ?’ ছেলেটি অবাক হয়ে বলল।

‘ইউ আর আ ফুলিশ। চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলো থেকে সব হাউজ স্টাফকে বিদায় দেওয়া হলে মুহূর্তে তা অসংখ্য গুজব তৈরি করবে। এ ধরনের ঘটনা দুনিয়ার কোনও বাগানে ঘটেনি এবং ঘটবেও না এবং সে গুজব অবশ্যই আর্মির কাছে পৌঁছাবে।’

‘তাহলে কী করা যায় ?’ এবার তরুণের কণ্ঠে দিশাহারা ভাব, এদিকটা তারা ভাবেনি।

হাসান সাহেব মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘সমস্যা নেই। বাগানের কুলিদের কাছে ম্যানেজার মানে দেবতা। ওদের মুখ খুলতে আমি নিষেধ করলে ওরা টুঁ শব্দও করবে না। আমি ওদের বলব আমার ভাগ্নে দলবল নিয়ে বাগানে বেড়াতে এসেছে। তবে তা যেন তারা বাইরে না বলে। কারণ এতগুলো ইয়াং ছেলে না বলে কয়ে আসায় আমি ভয় পাচ্ছি আর্মি অন্য কিছু মনে করে কি না ? ওদের জান যাবে, কিন্তু ম্যানেজারের ক্ষতি হবে এমন কিছু করবে না। পুরো বোবা হয়ে থাকবে। বি সিউর অব ইট।’

‘আপনি বলবেন তাঁদের ?’ তরুণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

হাসান সাহেব তরুণের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা সন্ধ্যার পর আসবে। আমি চাই না বেশি লোকজন তোমাদের দেখুক। আমি গেইটে বলে রাখব, কোনো সমস্যা হবে না অ্যান্ড বাই ফর নাও। সন্ধ্যায়  দেখা হবে।’

যুবকটি উঠছে না, ইতস্তত করছে।

হাসান সাহেব বললেন, ‘আমি আর্মিকে খবর দেব তা ভেব না। নিশ্চিন্তে যেতে পার। আই উইশ আই কুড জয়েন ইউ, সন। কিন্তু আমার বয়স পঞ্চান্ন এবং আমার স্ত্রী এবং দুটো মেয়ে আছে, তাই পারছি না। সংসারী লোক সব পারে না।’

তরুণটি পৌঢ়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝল তিনি মিথ্যা বলছেন না। কিছু কিছু মানুষের চোখের ভাষা সত্যটা প্রকাশ করে। এখানেও তাই প্রকাশ পাচ্ছে।

সে বিনীত ভঙ্গিতে উঠে বিদায় নিল। 

সেদিন রাত আটটার দিকে পাঁচজন যুবক ম্যানেজার সাহেবের বাংলোতে এসে পৌঁছাল। তাঁদের একজন বেশ অসুস্থ মনে হচ্ছে, অন্য দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছে। বাগানের দারোয়ানকে বলা হলো গাড়ি ছেড়ে অনেক দূর হেঁটে আসার সময় তার পা মচকেছে। অবশ্য না বললেও চলত। ম্যানেজার সাহেব তাঁর ভাগ্নের বন্ধুবান্ধবসহ আসার খবর আগেই দিয়ে রেখেছিলেন। বাগানে তাঁর হুকুম প্রায় ঈশ্বরের আদেশের মতো। দারোয়ান বিনাবাক্যে তাদের বাংলোয় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করল।

মেজর সাব্বির তাঁর তাবুতে ফেরার আধঘণ্টা পর হন্তদন্ত হয়ে তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ড ক্যাপ্টেন নিয়াজ সেখানে এসে পৌঁছালেন। তাঁর পেছন পেছন এসেছে মেজরের বডিগার্ড । সে-ই মতি মিয়ার সঙ্গে কথা বলেছিল।

কমান্ডার সাব্বির উৎসুক নয়নে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, অ্যানি নিউজ ইয়াং ম্যান ?

ক্যাপ্টেন খুব উত্তেজিত হয়ে বললেন, স্যার, ওই বান্দরটা বলছে পঠিয়া চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোয় কয়েকজন ‘মুক্তি’ আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে একজন সম্ভবত আহত।

‘হোয়াট ?’ মেজর সাহেব প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

‘ইয়েস স্যার, বান্দরটা সৈনিক আবদুল্লাকে এ খবর জানিয়েছে।’

‘আর ইউ সিউর ?’

মেজর প্রশ্ন করছেন বডিগার্ড আব্দুল্লাকে। ক্যাপ্টেনকে নয়।

আবদুল্লার পা প্রায় একফুট উঠে আবার খট করে নিচে নেমে এল, একই তালে ডান হাত কপাল ছুঁয়ে মুহূর্তে সোজা হলো, জি, স্যার, সে তাই বলছে।

‘সে জানলো কীভাবে ?’

‘তার সোর্স আছে স্যার’, এবার জবাব দিচ্ছেন ক্যাপ্টেন। এর জন্য আমরা তাকে টাকা দিই। এর আগেও তার খবরের ভিত্তিতে আমরা বেশ কিছু অভিযান চালিয়েছি স্যার। আপনি নতুন আসায় পুরোপুরি জানেন না। সে আগের সিও স্যারের খুব বিশ্বস্ত ছিল।’

কথাটা ঠিক। মেজর সাব্বির এ ক্যাম্পের দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র সপ্তাহখানেক। অনেক ব্রিফিং নেওয়া এখনও বাকি। এসেই তাঁকে একটা খণ্ডযুদ্ধ করতে হয়েছে, তাই পুরো অপারেশনাল ব্রিফিং এখনও হয়নি। আগের সিও ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে হেলিকপ্টারে চট্টগ্রামের সিএমএইচে চলে যাওয়ায় তিনিও কিছু বলে যেতে পারেননি।

তারপরও তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইজ হি ট্রাস্টেড ক্যাপ্টেন ? তার কথা কি বিশ্বাস করা যায় ? নাকি গিয়ে দেখব ধুধু মাঠ ?

‘বিশ্বাস করা যায় স্যার। সে এর আগে অনেকগুলো রেইডের পথ দেখিয়েছে, খোঁজ দিয়েছে। তাছাড়া মিথ্যা খবর দিলে সে নিজেই তো বিপদে পড়বে। আমরা তখন কী ব্যবস্থা নিতে পারি তার ধারণা ওকে দেওয়া হয়েছে। টাকাটাও একটা ফ্যাক্টর স্যার।’

‘কিন্তু কীভাবে নিশ্চিত হ’ল ওরা মুক্তি ?’

‘স্যার এদের মধ্যে একজন আছে আহত। সোর্স বলছে সে পায়ে গুলি খেয়েছে। তিন দিন আগে স্যার বোয়ালখালিতে মিলিটারি ব্রিজ আক্রান্ত হয়। আমাদের ফৌজ তা ঠেকিয়ে দেয়। দুজন মুক্তি মারা যায়। কয়েকজন পালিয়ে যায়। আমার ধারণা এরা সেই পলাতক দলের সদস্য। সাধারণ কোনও মানুষের পায়ে গুলি খাওয়ার কথা নয়।’

‘গুড লজিক। ওকে, গেট প্রিপায়ার্ড। ইট উইল বি আ হার্ড হিট। ভেরি হার্ড এবং তা হবে আজ রাতেই।’

পটিয়া চা বাগানের হাসান সাহেবের ধারণা সঠিক ছিল না। বাগানের সবাই তাঁকে দেবতা মানত না। অন্তত একজন এর ব্যতিক্রম ছিল। তিনি সেটা আজ রাতে বুঝতে পারবেন, কিন্তু লোকটিকে তা জানার জন্য হয়তো বেঁচে থাকবেন না।

ছেলেগুলো এসেছে দুদিন হলো। তারা একটি রুমে সবাই আশ্রয় নিয়েছে। হাসান সাহেব বলেছিলেন কয়েকটি রুমে ভাগ করে থাকতে, তারা রাজি হয়নি। অসুস্থ ছেলেটিকে তাদের দলের মেডিকেল ছাত্রটি চিকিৎসা করছে। তবে সম্ভবত তার অবস্থা বেশি ভালো না। হাসান সাহেবকে অবশ্য তাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তিনি কিছুক্ষণ পরপর গোঙানির শব্দ শুনছেন। 

রাত নটায় মেজর সাব্বির তাঁর জিপে উঠলেন। পেছনে দুটো পিকআপে  সৈনিকেরা। মোট তেইশজন। এর মধ্যে বাইশজন পাকিস্তানি, তারা এসেছে একটি জনগোষ্ঠীকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে।

তেইশ নাম্বার মানুষটি সঙ্গ দিচ্ছে নিজের জননী জন্মভূমির চামড়া ছাড়ানোর কাজে সাহায্য করার জন্য। একে আমরা চিনি।

তার নাম মতি মিয়া―সে-ই সম্ভবত দুনিয়ার একমাত্র হতভাগ্য মানুষ যার নিজের মা তার মৃত্যু কামনা করে কোরআন খতম দেন।

পটিয়া চা বাগানে সন্ধ্যার পরপরই ঘুমে ভরা রজনী শুরু হয়। কেরোসিন বেশি জ্বালাতে হবে বলে কুলি লাইনের লোকজন মোটামুটি সূর্য ডোবার পরপরই খাওয়া দাওয়া শেষে এক পেট দেশি মদ গিলে কিছুক্ষণ ফুর্তি করে তারপর রাত আটটা না বাজতেই গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায়। তাই পাকিস্তানি আর্মি যখন রাত দশটার দিকে বাগানে ঢুকল তখন সেখানে মাঝরাতের নির্জনতা। সে নিস্তব্ধতার মধ্যে গাড়িগুলো খুব কম গতিতে ম্যানেজারের বাংলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সব গাড়ির হেড লাইট নেভান। অপারেশনের এটাই স্টান্ডার্ড প্রসিডিওর, যাতে দূর থেকে গাড়িগুলোকে কেউ লক্ষ্যবস্তু বানাতে না পারে। ড্রাইভাররা পথ চিনছে পাশে মৃদু কনভয় আলোতে।

হাসান সাহেব তখন মাত্র ডিনার সেরেছেন। পুরো বাংলো অন্ধকার, শুধু ডাইনিং রুমে একটি হারিকেন জ্বলছে। অবশ্য বাগানে বিদ্যুৎ না থাকলেও এর কারখানায়, যেখানে শুকনো পাতা গুঁড়িয়ে চা বানানো হয় সেখানে একটি জেনারেটর আছে। তার সংযোগ দিয়ে ম্যানেজারের অফিস এবং বাংলোয় রাত দশটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেলের সংকটের কারণ সে সুবিধা আপাতত বন্ধ আছে।

হাসান সাহেব খাওয়া শেষে বেসিনে কুলকুচি করছেন, এমন সময় বাইরে ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ শুনে অবাক হলেন। এত রাতে তাঁর কাছে কে আসবে ? কৌতূহল নিয়ে তিনি বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন, প্রথমে কিছু বুঝতে পারলেন না। মনে হলো লাইট নেভান একটি গাড়ি এগিয়ে আসছে, তার পরপরই অমবস্যার অন্ধকার একটু সয়ে ওঠার পর তিনি দেখলেন একটি নয় কয়েকটি গাড়ি শামুক গতিতে এগুচ্ছে।

মুহূর্তের মধ্যে তাঁর অভিজ্ঞ চোখ বুঝে নিল কী ঘটতে চলেছে।

নিজের অজান্তেই তাঁর গলায় ধাক্কা দিল তিনটি শব্দ, ‘ও মাই গড’।

তারপর তিনি পড়িমরি করে ছুটলেন সেই রুমের দিকে যেখানে ছেলেগুলো আশ্রয় নিয়েছে।

রুমের দরোজায় ধাক্কা দিতে দিতে তিনি ফিসফিস করে বলতে লাগলেন, ‘আর্মি, আর্মি―’

পর মুহূর্তেই দরোজা খুলে গেল, ভেতর থেকে একটি হাত এক ঝটকায় তাঁকে ভেতরে টেনে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে নিজেও তার পাশে দড়াম করে শুয়ে পড়ল, তারপর ফিসফিস করে বলল, চুপ, একদম চুপ, শাট ইয়োর মাউথ।

তার চার মিনিটের মাথায় বাংলোটি পাকিস্তান আর্মি ঘিরে ফেলল।

প্রথম জিপ থেকে মাটিতে ঝাঁপ দিলেন মেজর সাব্বির। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অনুসরণ করল পেছনের গাড়ির সৈনিকেরা।

তারপর তারা ক্রল করে সামনে এগুতে লাগলেন।

ঠিক সে মুহূর্তে তাঁরা আক্রান্ত হলেন।

তবে বাংলো থেকে নয়। তাঁদের পেছনে বাংলো ঘেঁষা সারি সারি চা গাছের আড়াল থেকে। হঠাৎ চারিদিক দিনের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, সে আলোতে পাকিস্তানি সৈনিকদের আয়নায় নিজের প্রতিফলনের মতো পরিষ্কার  দেখা যাচ্ছে। বোঝাই যায় আকাশে কেউ ফ্লায়ার ছুড়েছে। তার সাদা আলোয় মেজর সাহেব দেখতে পেলেন প্রথম গুলিটি খেয়ে ছিটকে পড়েছে মতি মিয়া। তারপর একের পর এক ব্রাশ ফায়ার আর গ্রেনেডের আক্রমণে তাঁর সৈনিকেরা প্রায় উড়ে গিয়ে কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়ছে। কারও কারও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খণ্ড খণ্ড হয়ে আকাশে ভাসতে ভাসতে নিচে নেমে আসছে।

তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘রিট্রিট, রিট্রিট, ইটস আ ট্র্যাপ। এটা একটা ফাঁদ। গাড়ি স্টার্ট দাও, কুইক, সবাই গাড়িতে ওঠ, যার হাতে হাতিয়ার আছে সে কাভার দাও।’

বলতে বলতে তিনি প্রায় উড়ে গিয়ে একটি পিক আপের আড়ালে গিয়ে পড়লেন। তারপর লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে নিজেই স্টিয়ারিং ধরলেন। ড্রাইভার নিখোঁজ, তবে তার আগে সে সামরিক অপারেশনের নিয়ম ভোলেনি। তাহলো, যুদ্ধের নিয়ম হচ্ছে, গাড়ি থেকে সৈনিকেরা নেমে যাওয়ার পর তা ফিরতি পথে মুখ করে ঘুরিয়ে রাখতে হয়। যাতে বিপদ হলে সহজে পালান যায়, গাড়ি ঘোরান নিয়ে সমস্যায় পড়তে না হয়।

মেজর সাব্বির সে রাতে মাত্র পাঁচজন জীবিত সঙ্গীকে নিয়ে ক্যাম্পে ফিরতে পারলেন। এত বড়ো পরাজয় তাঁর আগে কখনও হয়নি।

আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে জীবিতদের মধ্যে মতি মিয়াও আছে। তবে তার পায়ে গুলি লেগেছে। রক্তে চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। একজন সৈনিক একটা ময়লা কাপড় দিয়ে তার পা চেপে ধরে আছে, যাতে অতি রক্তক্ষরণ না হয়; কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না।

তাঁরা ক্যাম্পে পৌঁছালেন রাত বারটায়। এর মধ্যে রিইনফোর্সমেন্ট এসে পৌঁছেছে, তারা আবার বাগান আক্রমণ করবে। কিন্তু কোনও লাভ হবে না।

মুক্তিযোদ্ধারা ইতোমধ্যে পালিয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় পালিয়েছেন ম্যানেজার হাসান সাহেব। অবশ্য না গিয়ে তাঁর উপায় ছিল না। যে ঘটনা ঘটেছে তারপর তাঁর বাগানে থাকা ছিল অসম্ভব। ছাত্রজীবনে তিনি রেডিওতে কাজ করতেন। পরে কলকাতায় গিয়ে তিনি এ অভিজ্ঞতা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কাজে লাগাবেন।

রিইনফোর্সমেন্ট নিয়ে আসা দুটো হেলিকপ্টারের একটি আহত সৈনিকদের চট্টগ্রাম সিএমএইচে নিয়ে গেল। এক্ষেত্রে তার প্রভুরা মতি মিয়াকেও কিছুটা দয়া দেখাল। অন্যদের সঙ্গে তাকেও চিকিৎসার জন্য উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হলো।

একমাস পর।

ভয়াবহ ব্যর্থ অভিযানের পর মেজর সাব্বিরকে ক্যাম্প থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তের জন্য ‘কোর্ট অব ইনকোয়ারি’ কাজ করছে। তাঁর জায়গায় নতুন কমান্ডিং অফিসার হিসেবে এসেছেন মেজর হামিদ। সুস্থ হয়ে কয়েকদিন আগে মতি মিয়াও আবার তার প্রভুদের সেবায় যোগ দিয়েছে। অবশ্য এখন তাকে কিছুটা খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। 

এখন সে দাঁড়িয়ে আছে মেজর হামিদের সামনে। বিনয়ে বার বার বাঁকা হয়ে যাচ্ছে, আর একটু পরপর বিনা প্রয়োজনে ‘হুজুর মেহেরবান, হুজুর মেহেরবান’ করছে। মেজর হামিদ কোনও সাড়া দিচ্ছেন না। তিনি গভীরভাবে কী যেন চিন্তা করছেন। অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন, মতি মিয়া, আমরা তোমার কাজে খুশি। পাকিস্তানের কওম রক্ষায় তোমার অবদানের জন্য জিওসি সাহেব তোমাকে ছোট্ট একটি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দুহাজার টাকা আর একটি সার্টিফিকেট।

মতি মিয়ার চোখ চকচক করে উঠল। এত্ত টাকা!  বাপের জন্মে হাজার টাকা একসঙ্গে দেখার সুযোগ তার হয়নি। কৃতজ্ঞতায় সে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে আর বারবার বলছে, হুজুর মেহেরবান, হুজুর মেহেরবান, লাখ লাখ শুকরিয়া।

মেজর হামিদের মনে হচ্ছে তাঁর সামনে একটি তেলাপোকা দুপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি পোকাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, তবে আমার একটি ব্যাপার জানার ছিল মতি মিয়া।

‘জি জনাব।’

‘বাগানের ঘটনার আগে তোমার সাহায্য নিয়ে আমাদের বাহিনী পাঁচটি অভিযান চালিয়েছে। তিনটি মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানায়। সেখানে আমরা কিছু গোলাবারুদ উদ্ধার করি, কিন্তু কেউ ধরা পড়েনি। এরপর তুমি দুটো হিন্দু বাড়ি দেখিয়ে দাও যারা আওয়ামী লীগকে টাকা দিত, সেখানে গিয়েও আমরা কাউকে পাইনি, তবে আমাদের সৈনিকদের ভাগ্যে অতি সামান্য কিছু সোনাদানা জুটেছে। পাঁচটি অভিযান একটি প্যাটার্ন তৈরি করেছে এবং সে প্যাটার্ন একটি প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। আমার মনে হচ্ছে তুমি এর উত্তর দিতে পারবে।’

‘হুজুর মেহেরবান’―মতি মিয়া আসলে বুঝতে পারছে না মেজর সাহেব কী বলতে চাইছেন ?

‘প্যাটার্ন বলতে তুমি কিছু বেদরকারি এবং ফালতু অভিযানে নিয়ে প্রথমে আমাদের আস্থা অর্জন করেছ, তারপর সেদিন রাতে চা বাগানে নিয়ে পুরো দলটিকে বাঘের মুখে ফেলে দিয়েছ। ইট ওয়াজ আ ট্রাপ এবং ফাঁদটি পেতেছ তুমি। ব্যাপারটি আমি নিশ্চিত। তোমার কারণে আমাদের আঠারজন সোলজার হারাতে হয়েছে, দুজন পঙ্গু হয়ে গেছে।’

মতি মিয়া চোখে অবিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘হুজুর আপনি এইটা কী বলেন ? সেইদিন তো আমিও গুলি খাইছি। আমার পাও তো নষ্ট হয়া গেছে।’

‘তোমার আহত হওয়ার ব্যাপারটি প্যাটার্নটিকে আরও পরিষ্কার করে মতি। বোঝাই যায় সেদিনের আক্রমণ যারা করেছিল তারা ছিল হাইলি ট্রেইন্ড এবং এটা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। তারা আমাদের যাকেই টার্গেট করেছে তাদের প্রায় সবাই মারা গেছে। অথচ তোমাকে গুলি করা হলো পায়ে, মাথায় বা বুকে নয়; কারণ যাতে তুমি মারা না যাও, কিন্তু আহত হয়ে আমাদের আরও আস্থা অর্জন করতে পার। অ্যাম আই রাইট ? আই আম সিউর, আই আম রাইট। আমার অ্যানালিসিস তাই বলছে। তোমার কি কিছু বলার আছে মতি মিয়া ?

‘স্যার, আপনি ভুল বলতেছেন। সেদিনের ঘটনায় আমার কোনো হাত নাই।’ তার কণ্ঠে তীব্র আতঙ্ক।

মেজর হামিদ হাসলেন। তাঁর হাসিটি সুন্দর। তিনি বললেন, আমার আগে যারা এখানে কমান্ডে ছিল তারা ছিল গর্দভ। কিন্তু আমি তা নই। এখানে যোগ দেওয়ার পরই আমি মনোযোগ দিই ভুলটা কোথায় ছিল তা বের করার কাজে। তখনই প্যাটার্নটি আবিষ্কার করি। তারপর তোমার ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার জন্য গোয়েন্দা লাগান হয়। আমি কি বলছি, তুমি কি বুঝতে পারছ ?

‘না, স্যার।’

‘গুড, বুঝিয়ে দিচ্ছি। তোমার বন্ধু আলম ধরা পড়েছে, যে পঠিয়া অভিযানে তোমাকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়েছে এবং সে যত গান জানে সব আমাদের শুনিয়েছে। আমাদের জানার কিছু বাকি নেই মতি। আমাদের গোয়েন্দাদের এত বোকা ভাবাটা তোমার ঠিক হয়নি। এবার কিছু বুঝেছ ?’

‘জি স্যার।’

মেজর হামিদ চেয়ার থেকে উঠে এসে মতির সামনে দাঁড়ালেন। হাতে থাকা কমান্ড ব্যাটন দিয়ে তিনি নিজের উরুতে চাপড় মারছেন, তাঁর ঠোঁটে এখনও হাসি ঝুলে আছে। তিনি বললেন, ‘তোমার কি কিছু বলার আছে ?’

‘জি, স্যার।’ এখন তার কণ্ঠ নির্লিপ্ত, ভয়ের লেশমাত্র নেই। কারণ ভীতুর ভান করার প্রয়োজন এখন ফুরিয়ে গেছে।

‘বলো।’ মেজর সাহেবের কণ্ঠ খুবই নম্র শোনাল।

‘আমার মা এবং স্ত্রীকে কি খবর দেওন যায় যে তারা আমারে যা ভাবতেছেন আসলে আমি তা না।’

‘না, যায় না। কারণ আমি চেষ্টা করব তোমার সর্বোচ্চ যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু নিশ্চিত করতে। শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণা। মা এবং স্ত্রীর ঘৃণা নিয়ে মারা যাওয়াটা তার অংশ।’

মতি মিয়া নির্লিপ্ত চোখে মেজরের দিকে তাকিয়ে আছে।

এখন তার শরীর বিনয়ে বেঁকে যাচ্ছে না।

মতিউর রহমান দাঁড়িয়ে আছেন টানটান সোজা হয়ে, পৌরাণিক গ্রিক বীরের সমস্ত সাহস ধারণ করে।

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares