গল্প : মৃতের পাসপোর্ট : মাজহারুল ইসলাম

রু ই মাছের মাথাটা আমার প্লেটে তুলে দিলেন আম্মা। আমি একবার তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মাছের মাথাটা নাড়াচাড়া করছি। আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, তোর আব্বাকে আজ কী খেতে দিয়েছে ? আমি মাছের মাথাটার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললাম, আব্বাকে জাউ ভাত দিয়েছে।

আম্মা বললেন, আর কী ?

ফলের রস।

আম্মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাত কতটা খেয়েছে ?

আমি বললাম, আমি তো সামনে ছিলাম না। কাজেই কতটা খেয়েছে বলতে পারব না।

মাছের মাথাটা আম্মার প্লেটে তুলে দিতে চাইলে তিনি বললেন, আমি তো মাথা খাই না আব্বা। তুই পছন্দ করিস। তুই খাচ্ছিস না কেন ?

আমি দুই-তিন লোকমা ভাত মুখে দিয়ে বললাম, খিদে নাই। হাসপাতালে এটা সেটা খেয়েছি। খেতে ইচ্ছা করছে না।

আমরা যে হোটেলে থাকি তার কাছেই বাঙালি হোটেল কস্তুরি। বিকেলে হাসপাতালে যাওয়ার সময় রুমে খাবার পাঠাতে বলেছিলাম। অনেকদিন ধরে ওই হোটেল থেকে খাবার আনায় পরিচিত হয়ে গেছে। একটা বাচ্চা ছেলে রুমে খাবার দিয়ে যায়। ভাইজান রাতে হাসপাতালে থাকে। আমি সকালে গেলে সে কিছু সময়ের জন্য হোটেলে আসে বিশ্রাম নিতে। আবার দুপুরের পরই হাসপাতালে চলে আসে। ভাইজান মানে আমার মেজভাই। ছোটরা ওকে ভাইজান বলে ডাকি। আমি একদিন রাতে হাসপাতালে থাকতে চাইলে ভাইজান বলল, তুই পারবি না। তোর কষ্ট হবে। আমি ডাক্তার। আমার রাত জাগার অভ্যাস আছে।

আমি খাওয়া শেষ না করেই উঠে পড়লাম। আম্মাও খুব একটা খেলেন না। অনেক কষ্টে চোখের পানি আটকে রেখে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ কাঁদলাম। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে হোটেলের নিচে গিয়ে পিসিও থেকে আবার ঢাকায় ফোনে কথা বললাম। সকালের ফ্লাইটে আমার অরেক ভাই খোকন টাকা নিয়ে কলকাতা আসার কথা। খোকন আর আমি পিঠাপিঠি। খোকন সকালের ফ্লাইটে টাকা নিয়ে না এলে মহাবিপদে পড়তে হবে। হাসপাতালের বিল পরিশোধ না করলে আব্বাকে ছাড়বে না। বিমানের ফ্লাইটে কোনও সিট খালি নাই। আমার সাংবাদিক বন্ধুরা অনেক চেষ্টা করে খোকনের আসার ব্যবস্থা করেছে। ঢাকা-কলকাতা বাংলাদেশ বিমান ও এয়ার ইন্ডিয়া ছাড়া আর কোনো ফ্লাইট নেই। বিমানের ফ্লাইট সকালে আর এয়ার ইন্ডিয়া সন্ধ্যায়।

বিড়লা হার্ট সেন্টারে তিন দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর আজ আব্বা আমাদের ছেড়ে আকাশের তারা হয়ে গেলেন। খবরটা আম্মা এখনও জানেন না। আম্মার ইচ্ছায় আজ মাগরেবের নামাজ শেষে হাসপাতালের কাছে এক মসজিদে আব্বার সুস্থতার জন্য দোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মসজিদের ইমাম সাহেব দোয়া শেষে মোনাজাতের জন্য হাত তুলবেন, এরমধ্যে আমার মোবাইলে হাসপাতাল থেকে ফোন এল―এক্ষুনি ডাক্তার দেবি শেঠির সঙ্গে দেখা করতে হবে। আমরা দুই ভাই মোনাজাত না করেই দৌড়ে গেলাম হাসপাতালে ডাক্তার শেঠির রুমে। তিনি আমাদের বসতে বলে দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কথাগুলো খুব সহজে বললেন, তাদের আর কিছুই করার নাই। আমরা সম্মতি দিলে লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলবেন। আমি মেজভাইকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। ভাইয়ের চোখেও অশ্রু টলমল করছে। ডাক্তার শেঠি চেয়ার থেকে উঠে এসে আমার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিলেন। এই সময় যে পৃথিবীর কোনো সান্ত্বনাই কাজ করে না সেটা তিনিও জানেন।

আমরা কিছুটা শান্ত হওয়ার পর তিনি বললেন, আপনারা সবকিছু খুলে ফেলার আগে শেষবারের মতো দেখে আসতে পারেন। যদি ধর্মীয় কিছু করতে চান সেটাও করতে পারেন। এরপর আরও কিছু কথা বললেন।

ডাক্তার শেঠির রুম থেকে বের হয়ে আসার পর পরিচিত কয়েকজন বাংলাদেশের মানুষের পরামর্শে মসজিদের ইমাম সাহেবকে ডেকে আনা হলো। তাঁকে নিয়ে আমরা দুই ভাই সিসিইউতে গেলাম। আব্বাকে তওবা পড়ানো হবে। সেই সময় যে যা বলছে তা-ই করছি। চারদিকে সবুজ রঙের পর্দা দিয়ে ঘেরা আব্বার বেড। ভেতরে ঢুকে মাথাটা ঘুরে উঠল। ডাক্তার শেঠি অনুরোধ করেছেন সিসিইউতে অনেক রোগী আছে কাজেই আমরা যেন শব্দ করে কান্নাকাটি না করি। আমার ভাইও ডাক্তার। সেও আমাকে নিষেধ করেছে। অনেক কষ্টে বুকের মধ্যে পাথর চাপা দিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছি। আব্বার মুখের মধ্যে মোটা পাইপ ঢোকানো, শরীরের নানা জায়গায় যন্ত্রপাতি লাগানো। লাইফ সাপোর্ট মেরিন চলছে বলে বুকটা সামান্য ওঠানামা করছে। চোখ বন্ধ করে আব্বা ঘুমিয়ে আছেন। মনে হলো, আহা! কত দিন আরাম করে ঘুমাননি। দুজন নার্স বেডের পাশে দাঁড়ানো। আব্বার মুখের কাছে গিয়ে হুজুর তওবা পড়ালেন একা একাই। আমার দুই চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরছে। আব্বার ডান হাতটা স্পর্শ করলাম। বরফের মতো ঠাণ্ডা। নার্স দুইজন মনে হয় অপেক্ষা করছেন, আমরা বের হয়ে এলেই যন্ত্রপাতি সব খুলে ফেলবেন। ঘুমিয়ে থাকা মানুষটা হয়ে যাবে…।

সিসিইউ থেকে বের হয়ে আমি নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। ভাইজানকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। আম্মাকে কীভাবে এই খবর জানাব ? বিদেশ বিভুঁইয়ে কে তাকে সান্ত্বনা দেবে ? আমরা দুই ভাই, ভাবি ও তাদের ছয় মাসের শিশুকন্যাকে নিয়ে আম্মাকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব ? ভাইজান সিদ্ধান্ত দিলেন, আমি প্রতিদিনের মতো হোটেলে ফিরে যাব। রাতে আম্মাকে কিছুই জানাব না। ভাইজান রাতে হাসপাতালেই থাকবে। প্রতিদিন যেভাবে থাকে। ফজরের আজানের সময় হোটেলে ফিরে আসবে। আম্মা নামাজ পড়তে উঠবেন। সেইসময় দুই ভাই একসঙ্গে আম্মাকে এই কঠিন দুঃসংবাদটি জানাব।

আম্মার রুম থেকে বের হয়ে হোটেলের নিচে গেলাম ঢাকায় ভাইবোনদের সঙ্গে কথা বলতে। পে ফোন থেকে কথা বলে আমার রুমে ফিরে এলাম। ভাবিকে বলেছি আজ রাতে আম্মার সঙ্গে থাকতে। আমি আমার রুমে সারারাত জাগা। নিজেকে খানিকটা অপরাধী মনে হচ্ছে। এবার আব্বা কোনওভাবেই কলকাতা আসতে চাননি। আমি জোর করে নিয়ে আসি। বেশ কিছুদিন তিনি পাসপোর্ট লুকিয়ে রেখেছিলেন। ডিসেম্বরে আব্বাকে কলকাতা নিয়ে এসেছিলাম চিকিৎসার জন্য। ডা. শুভ দত্ত নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, এঞ্জিওগ্রাম করতে হবে। যদি ব্লক থাকে তাহলে এনজিপ্লাস্টি করে রিং লাগাতে হবে। এঞ্জিওগ্রাম করার আগেই এই সিদ্ধান্ত দিতে হবে। তাহলে একবারেই স্টেন্টিং করে দেবে।

আমরা সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলাম। ডা. দেবি শেঠি খুব নামকরা কার্ডিয়াক সার্জন। বাইপাস সার্জারিতে খুব খ্যাতি তাঁর। আমরা আব্বার বিষয়ে ডা. শেঠির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ডা. শুভ দত্ত বললেন এই বয়সে সার্জারি করা ঠিক হবে না। তা ছাড়া তিনি নাকি আব্বার রিপোর্ট তাঁকে দেখিয়েছেন। তিনিও স্টেন্টিং-এর কথাই বলেছেন। আব্বা কোনোকিছুই করতে রাজি না। তিনি ওষুধ খেয়ে যতদিন ভালো থাকা যায় সেটার পক্ষে। আমরা আব্বাকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করালাম। ডা. শুভ দত্ত এঞ্জিওগ্রাম করে বললেন মেজর আর্টারিতে ৯৫% ব্লক। স্টেন্টিং করে দিলেন। সাত দিন পর মহানন্দে আব্বাকে নিয়ে দেশে ফিরে এলাম।

একমাস পর থেকেই আবার মাঝে মাঝে বুকে ব্যথা শুরু হলো। ডা. শুভ দত্তকে ফোন করলে তিনি বললেন, অ্যাডজাস্ট হতে খানিকটা সময় লাগবে।

এভাবে আরও কিছুদিন চলল। বুকের ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হলো আব্বাকে। কার্ডিওলজিস্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন এঞ্জিওগ্রাম করে দেখতে হবে স্টেন্টের কী অবস্থা। তিনি সন্দেহ করলেন আদৌ স্টেন্টিং করা হয়েছে কি না ? যোগাযোগ করলাম শুভ দত্তের সঙ্গে। তিনি আবার নিয়ে যেতে বললেন। এবার আব্বা কোনওভাবেই কলকাতা যাবেন না। পাসপোর্ট লুকিয়ে রাখলেন। ভাইবোনরা সবাই বুঝিয়ে জোর করে আব্বাকে কলকাতা নিয়ে গেলাম। ডা. দত্ত আবার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর বললেন, এঞ্জিওগ্রাম করে দেখতে হবে কী অবস্থা। যদি কোনো সমস্যা থাকে তিনি ঠিক করে দেবেন।

তার রুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় বললেন বিষয়টি হাসপাতালের কারও সঙ্গে যেন আমরা আলোচনা না করি। আমাদের শুধু এঞ্জিওগ্রামের টাকা জমা দিতে বললেন।

নির্ধারিত তারিখে এঞ্জিওগ্রামের জন্য আব্বাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। বিকেলে এঞ্জিওগ্রাম করবেন ডা. দত্ত। আমরা অপেক্ষা করছি। এরমধ্যে আমার মোবাইলে ফোন এল এখনই যেন আমরা ডা. শেঠির সঙ্গে যোগাযোগ করি। ছুটে গেলাম ডা. শেঠির রুমে। তাঁর সহকারী আমাদের নিয়ে গেলেন ওটির সামনে। কিছুক্ষণের মধ্যে ডা. শেঠি সার্জারির পোশাক পরা অবস্থায় বের হয়ে এলেন। বললেন, এঞ্জিওগ্রাম করার সময় আব্বার হার্ট ফেইল করে। এখনই ইমার্জেন্সি সার্জারি করতে হবে। সব ব্যবস্থা করা হয়েছে, শুধু আমাদের সম্মতির অপেক্ষায় আছেন। আমি পাথরের মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছি। ডাক্তার কী বলছেন এসব ? আমার ভাই বললেন, সার্জারিতে সফলতার সম্ভাবনা কতটা ?

ডা. দেবি শেঠি বললেন, চান্স ফিফটি ফিফটি। সার্জারি না করলে জিরো পার্সেন্ট।

আমার ভাই বললেন, ডু ফর দ্যা বেস্ট ডক্টর।

ডা. শেঠি দ্রুত ভেতরে চলে গেলেন। একজন নার্স এসে কাগজে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর নিয়ে গেল। অপারেশন থিয়েটারের সামনে আমরা অপেক্ষা করছি। প্রায় আড়াই ঘণ্টা চলল সার্জারি। ডা. শেঠি বেরিয়ে এসে বললেন, সার্জারি ঠিকমতো হয়েছে। এখন রিকোভারি কতটা হয় সেটা দেখার বিষয়। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো। পরদিন সকাল দশটায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলে চলে গেলেন।

রাত প্রায় এগারোটায় ভাইজানকে হাসপাতালে রেখে আমি হোটেলে ফিরে আসি। আম্মাকে বললাম আব্বার সার্জারির কথা। আম্মা অনেক কান্নাকাটি করলেন। বললাম, আব্বা ভালো আছেন। ডাক্তার বলেছেন সব ঠিক হয়ে যাবে।

পরদিন ডাক্তার শেঠির সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি বিস্তারিত জানালেন। ডাক্তার শুভ দত্তের এঞ্জিওগ্রাম করার সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। ওইদিন সকাল থেকেই তাঁর বুকে ব্যথা ছিল। এই অবস্থায় এঞ্জিওগ্রাম করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও করতে হলে সার্জনের সঙ্গে কথা বলে ওটি তৈরি রাখতে হয় যেন কোনও সমস্যা হলে দ্রুত সার্জারি করা যায়। কিন্তু ডা. দত্ত এসব কিছুই করেননি। হার্ট ফেইল করার পর তিনি ডা. শেঠির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এরমধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা সময় চলে যায়। তারপর বললেন, রোগীর অবস্থা খুব ভালো না। অপেক্ষা করা ছাড়া তাদের কিছু করার নাই।

হোটেলের রুমে বসে এসব কথা মনে পড়ছিল। তাহলে কি ডাক্তার শুভ দত্ত প্রথমবার কোনও রিং লাগাননি ? ঢাকার ডাক্তারের তো সেটাই সন্দেহ ছিল। এজন্যই কি তিনি হাসপাতালে কারও সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছিলেন ?

এরমধ্যে কখন ভোর হয়েছে জানি না। ঠিক ফজরের আজানের সময় ভাইজান আমার রুমে এল। তারপর দুই ভাই গিয়ে উপস্থিত হলাম আম্মার রুমে। কেন জানি না রুমের দরজা খোলাই ছিল। আম্মা নামাজ পড়ছেন। আমরা নিঃশব্দে তাঁর পেছনে বিছানায় পাশাপাশি বসলাম। কীভাবে আম্মাকে জীবনের সবচেয়ে কঠিন দুঃসংবাদটি জানাব ? আম্মা মোনাজাত শেষ করে পেছনে তাকিয়ে আমাদের দু’জনকে একসঙ্গে দেখেই বললেন, তোদের আব্বা নাই, না ?

আমরা দুই ভাই মাথা নিচু করে আছি। আম্মা আমাদের জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলেন।

আব্বার মৃত্যুসংবাদ আমাদের মুখে বলতে হলো না। আব্বাকে হাসপাতালে রেখে আমরা দুই ভাই একসঙ্গে কখনও হোটেলে ফিরে আসি না। তাই হয়ত আমাদের দেখেই আম্মার বুঝতে অসুবিধা হয়নি আব্বা আর নেই। অথবা তাঁর অবচেতন মন তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিল বিষয়টা।

আম্মাকে বুঝালাম, এটা হোটেল। এখানে এত কান্নাকাটি করা যাবে না। অন্যান্য রুমের লোকজন বিরক্ত হতে পারে। আম্মা খানিকটা শান্ত হলেন।

সকাল দশটায় খোকন হোটেলে পৌঁছালে আরেক দফা কান্নাকাটি করলেন আম্মা। ভাবির পক্ষে ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে আম্মাকে ম্যানেজ করা সম্ভব হবে না বলে ভাইজানকে হোটেলে রেখে আমি আর খোকন ছুটলাম হাসপাতালে। প্রথমেই বিল পরিশোধ করলাম। তারপর শুরু হলো আব্বাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া। সাইফুল নামে বাংলাদেশের একজন হৃদয়বান মানুষ এগিয়ে এলেন আমাদের সহযোগিতা করতে। তাঁর আব্বা একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। প্রায় একমাস ধরে তিনি হাসপাতালে আছেন আব্বাকে নিয়ে। এই সময়ে আরও কয়েকজন মানুষকে কফিনবন্দি করে দেশে পাঠানোর কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে তিনি অভিজ্ঞ হয়ে গেছেন।

হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে লোকাল থানায় জিডি এন্ট্রি, বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে পাসপোর্ট বাতিল, এয়ারলাইনসে বুকিং, বিমানের নির্ধারিত ফিউনারেল হোমে মৃতদেহ নিয়ে কফিনবন্দি করে ফ্লাইটের কমপক্ষে চার ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্ট কার্গোতে কফিন পৌঁছানো পর্যন্ত সাইফুল ভাই আমাদের সহযোগিতা করলেন। একজন মানুষ যখন ট্রাভেল করে তখন তার পাসপোর্ট প্রয়োজন হয়। মৃত্যুর পর সেই মানুষ হয়ে যায় বস্তু। তখন আর তার পাসপোর্ট লাগে না। মালপত্র বাক্সপেটরার সঙ্গে তার জায়গা হয়। সেকারণে প্রথমেই দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট বাতিল করতে হলো। আমার সামনে দূতাবাসের লোকজন আব্বার পাসপোর্টে বাতিল সিল মেরে একটা কোনা কেচি দিয়ে কেটে ফেলল। আমার ভেতরটা তখন আরেক দফা দুমড়ে মুচড়ে গেল। মনে হলো, আমার হৃৎপিণ্ডে কেউ কাঁচি চালাল।

বাংলাদেশ উপহাইকমিশন ও সাইফুল ভাইয়ের সহযোগিতা ছাড়া ওইদিন আমরা আব্বাকে নিয়ে ঢাকা ফিরতে পারতাম না। পরদিন রোববার হওয়ায় সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। আব্বাকে নিয়ে ফিউনারেল হোমে পৌঁছাতে প্রায় তিনটা বেজে গেল। এয়ারপোর্টে পাঁচটায় পৌঁছাতে হবে। রাত নয়টায় ফ্লাইট। হাতে একদম সময় নাই। ফিউনারেল হোমের লোকদের অনুরোধ করলাম যতটা সম্ভব দ্রুত তাদের কাজ শেষ করতে। একপর্যায়ে আমি নিজেও ওদের সঙ্গে কফিনের ঢাকনায় তারকাটা মারতে শুরু করলাম। খোকন আগেই হোটেলে চলে গেছে। আম্মাসহ অন্যদের নিয়ে এয়ারপোর্ট যাবে। আমি আর সাইফুল ভাই আব্বার কফিন নিয়ে ছুটলাম এয়ারপোর্ট। কফিনবাহী গাড়ির সামনে লাল কাপড় বাঁধা থাকায় ট্রাফিক সুবিধা পাওয়া যায়। নির্ধারিত সময়ে এয়ারপোর্ট কার্গোতে না পৌঁছালে কফিন যাবে না৷ পাঁচটা বেজে গেছে। বিমানের এয়ারপোর্ট ম্যানেজার দুইবার ফোন করে আমাদের অবস্থান জানলেন। চালককে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আরও তিরিশ মিনিট লাগবে। টেনশনে ঘামতে শুরু করলাম আমি।

ঠিক পাঁচটা ত্রিশ মিনিটে আমরা কার্গোতে পৌঁছালাম। বিমানের লোকজন থাকায় খুব একটা সমস্যা হলো না। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে এয়ারপোর্ট টার্মিনালে পৌঁছলাম। চেক-ইন শেষ করে ইমিগ্রেশনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। সবগুলো পাসপোর্ট আমার কাছে। একসঙ্গে সেগুলো ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে দিলাম। আব্বার বাতিল সিল মারা পাসপোর্ট দেখে তিনি বললেন, ডেডবডি কি একই ফ্লাইটে যাচ্ছে ? আমি বললাম, জি। ইমিগ্রেশন অফিসার আব্বার পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে বললেন, মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট লাগে না। আমার চোখ দিয়ে আবারও কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। বুকের বাঁ দিকটায় চিকন ব্যথা অনুভব করলাম। কাউকে কোনও কিছু বুঝতে না দিয়ে ইমিগ্রেশন শেষ করে ভেতরে গিয়ে ডিপার্চার গেটের কাছে বসলাম। আম্মার চোখ ভেজা। একসময় বিমানে ওঠার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। হঠাৎ আমার চোখে পড়ল বিমানের নিচে লাগেজের পাশে আব্বার কফিন রাখা। লাগেজ বিমানে ওঠানো হচ্ছে। একটু পর আব্বার অবস্থান হবে ওইসব লাগেজের সঙ্গে। আমি দ্রুত এমনভাবে আম্মার পাশে দাঁড়ালাম যেন আব্বার কফিন আম্মার চোখে না পড়ে।

বিমানের সিটে আমি আম্মার পাশে বসলাম। বিমান রানওয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, তোর আব্বাকে কোথায় রাখছে ? অস্ফুটে বললাম, আছে।

এই কলকাতায় আব্বা-আম্মার একসঙ্গে পথচলা শুরু হয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে এখানেই থেমে গেল তাঁদের যৌথজীবনের পথচলা।

আড়চোখে একবার আম্মার মুখের দিকে তাকালাম। নিঃশব্দ তিনি, কিন্তু তাঁর দুচোখে ঝরছে অশ্রুধারা। চকিতে আমি দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করলাম। মাথায় শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে―আমরা সিটে বসা আর আব্বার জায়গা হয়েছে বাক্সপেটরার সঙ্গে। হায়রে জীবন!

লেখক : প্রকাশক ও কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares