গল্প : সাদা বাড়ি, কালো মেঘ : তাজিয়া ইরফান

হালকা আলোয় বিকেলে বারান্দায় বসে আছে নিমা। পাশে ছোট টেবিলের ওপর রাখা বড় ভাইয়ের চিঠি। চিঠি পড়ার পর ঝিম ধরে আছে ও। আজকাল আর বিরক্ত হয় না, রাগও করে না। আগে প্রচণ্ড অভিমান হতো, এখন তাও হয় না।

গত সপ্তাহে নিমার ওপর অনেক চেঁচামেচি করেছেন বড়ভাই। নিমা চুপ করে ছিল, এই চিঠি তার জের ধরে লেখা। বড়ভাই আজ কী বলেছে, কাল কী কী বলেছিল মনে রাখতে চায় না নিমা।

বেণুর মা আরেক কাপ রং চা দিয়ে গেছে। নিমার বিকেলটা এমন যেন চায়ের রঙের সঙ্গে বিকেলের রঙটা আস্তে আস্তে মিশে যায়। বারান্দায় বসে কয়েক কাপ রং চা খাওয়া হয়ে গেছে। এই বারান্দায় বসতে নিমার ভীষণ ভালো লাগে। বাবা এই বারান্দাতেই থাকতেন বেশিটা সময়। ফেব্রুয়ারির এই সময়টা নিমার বিশেষ প্রিয়, শীত যাই যাই করছে। শীতের ফুলেরাও তাই ম্রিয়মাণ। হাসিমুখে ফাগুনের রোদের তাপ সইছে সারাদিন। অল্পদিনের মধ্যে নিজেদের বিদায় জেনেও হাসছে, উড়ু উড়ু হাওয়া, হাওয়ায় হাল্কা শীত আছে কি নেই, বিকেল থেকেই পাখিদের কিচিরমিচির শুরু হয়। দিনের আলোটা বিকেল ধরে দীর্ঘক্ষণ থাকে, সামনের পুকুরের ওপর ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামতে থাকে, কৃষ্ণচূড়ার ডালপালা আবছা হয়ে আসে। দূরে দূরে পলাশ শিমুলের গাছ, মাঝে মাঝে সুপারি গাছের জটলা, দিনের আলোর সঙ্গে সঙ্গে এরাও একে একে মিলিয়ে যায়। আলোটা ক্ষীণ হতেই মাগরিবের নামাজের জন্যে উঠে যায় নিমা।

বাইশ বছর বয়েস থেকে এই বাড়িতেই নিমা, তার বাবা-মার সঙ্গে কাটিয়েছে আঠারো বছর। নিমা অবশ্য বাবা-মার সঙ্গেই ছিল আজীবন, বাবা-মা মারা যাবার পরও প্রায় দশ বছর কাটল নিমার এই বাড়িতে, নিমার বিয়ে হয়নি, তাই নিমার আর কোনো ঠিকানা নেই। বাবার বাড়িটাই নিমার একমাত্র ঠিকানা।

নিমা তখন সবে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংলিশে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হবে। খুব ভালো রেজাল্ট হওয়ায় বাবা-মা খুব খুশি হয়েছিলেন। আর সেই সময়েই পৃথিবীটা তছনছ হয়ে গেল। বাবার স্ট্রোক করলেন। শরীরের বাঁ দিকটা অবশ, কথা বলেন জড়িয়ে জড়িয়ে। বাবার কদর আর কর্তৃত্ব দুটোই দ্রুতগতিতে কমতে লাগল বড় ছেলের কাছে। বরাবরে মৃদুভাষি অমায়িক মানুষটার কি প্রচণ্ড রাগ আর কষ্ট। জেদ ধরে চলে এলেন পূর্বপুরুষের ভিটায়। ঢেমসার জমিদার বাড়ি, সাত বছর এখানে কাটালেন, এখানেই চোখ বুজলেন। শুয়ে আছেন পিতৃপুরুষের পাশে, দাদাদাদির মাঝখানে। এক জারুল গাছের ছায়ায়, পরম শান্তিতে। মা যোগ দিয়েছেন তারও এগারো বছর পর, মার কবর হয়েছে দাদির পাশে।

বাবা মারা যাবার পর ঢাকা ফেরা যেত, কিন্তু হলো না, ফেরার জায়গা নেই। মা বললেন ফেরা খুউব সহজ নয়। ধানমন্ডির বাড়িটা বিক্রি করে দিলেন বড় ভাই, সবারই টাকার খুব প্রয়োজন। ছেলেদের ওপর বাবার অনেক অভিমান ছিল, মায়ের অভিমান দীর্ঘায়িত হলো। বিশেষ করে, বড়ভাইয়ের ওপর অনেক অভিমান করে ছিলেন তিনি। ওরা মা-মেয়েতে দুই ভাগ পেয়েছে, মা নিজের ভাগের টাকাটা নিমার বিয়ের জন্যে তুলে রেখেছিলেন। বেঁচে থাকতে নিমার নামে করে রেখেছিলেন।

নিমারা এক বোন তিন ভাই, ছোটবেলায় ভীষণ মিল ছিল ভাই বোনেতে। ক্রমে সেই মিলটা কি করে বা কেন যে ফিকে হয়ে গেল কেউ জানে না। আসলে জানার কোনও আগ্রহও বোধ হয় ওদের ছিল না। নিমা দেখতে খুব সাধারণ, শ্যামলা না বলে কালো বললেই চলে। বিয়ের প্রস্তাবগুলো তেমন কিছু ছিল না বলে বাবা-মাই নাকচ করে দিতেন। বাবা যখন অসুস্থ হলেন বাবার দেখাশোনা, বাবার ভিটায় স্থানান্তর, বাবার মারা যাওয়া, সব মিলিয়ে নিমার বয়স গড়িয়ে গেল। মা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন কিন্তু হয়নি। মেজভাই কানাডায় এক ব্রাজিলিয়ান কেরেঞ্জাকে বিয়ে করেছে, ছোটভাইয়ের বিয়ের আগে মা খুব আপত্তি করেছিলেন, ঘরে আইবুড়ো বোন রেখে বিয়ে না করার জন্যে খুব বলেছিলেন ছোটভাইকে, আগে বোনের বিয়ে হউক। ছোটভাইয়ের পছন্দ ছিল তাই মায়ের অনুরোধ-আপত্তি কোনওটাই কাজ করেনি, সময়েই উপযুক্ত ঘর আসেনি, অসময়ে কি আর আসে ? মা তাও মন্দের ভালোতে রাজি ছিলেন, বড়ভাই রাজি ছিলেন না। বাবার অসুস্থতা দিয়ে শুরু, বড়ভাই মতামত দেয়ার ব্যাপারেই কেবল সংসারের কাণ্ডারি হলেন।

দুই মাস অন্তর অন্তর ক্ষেতের চাল, পুকুরের মাছ, কিছু সবজি, এটা ওটা নিয়ে ইদ্রিস চাচা ঢাকায় বড়ভাইকে দিয়ে আসে। আর দুই ভাই দেশে নেই, চাল বিক্রির টাকা তাদের ভাগেরটা নিমা জমা করে রাখে, ওরা দেশে এলে সেটা খরচ করে।

ঢেমশা গ্রামের জমিদারবাড়িতে সকালটা বেশ অলসভাবে কাটে। সকালগুলো ঘুম থেকে জেগেও যেন জাগতে চায় না, নিমার অবশ্য ঘুম থেকে ওঠার তাড়া নেই, দশটার দিকে আস্তে আস্তে প্রাইমারি ইস্কুলে যায়, টিফিনের পরে ইংলিশ ক্লাস নেয় বাচ্চাদের, ঘণ্টা দুই থাকে, তারপর বাড়ি ফেরে। মায়ের নামে একটা ছোট বুটিক আছে, ছয়জন মেয়ে কাজ করে , সুই সুতার কাজ, বেতের কাজ, ঢাকায় কয়েকটা বুটিকে সাপ্লাই দেয়। বেণুর মা স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে বেণু আর কুদ্দুসকে নিয়ে এই বাড়িতে কাজ করছে, বাবা মারা জাওয়ার পরও সুলতানের মা ছিল, বয়স হয়ে গেছে সুলতানের মায়ের, মা আর নিমা দুজনের কাজ ও ঠিকভাবে করতে পারত না, সেই সুবাদে বাধা কাজের লোক হিসেবে বেণুর মা এল, নিমা বাচ্চা নিয়ে আপত্তি করেছিল, মা বললেন বাচ্চার মায়েদেরও যখন কাজ করতে হয়ই, কি করবে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ? ওপরে আসতে মানা করে দিব, বাইরে বাইরে থাকবে, রান্নাঘর কলতলা ওই দিকটায় থাকবে, তাই বেণুর মায়ের কাজের সুবাদে বেণু আর কুদ্দুস এই বাড়িতে এল, অল্পদিনের মধ্যে দুজন ওপরে নিমার সঙ্গে, ক্যারম, লুডু খেলছে, নিমার জন্যে নীল শালুক নিয়ে আসছে, কখন জুঁই, কখন শেফালি, দুজনকেই ছোটবেলা থেকে নিমা পড়িয়েছে। বেণু খুব মনোযোগী, নিমার সুবাদে ইংলিশে খুব ভালো, এখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পলিটিক্যাল সায়েন্সে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। কুদ্দুস বেশি পড়তে পারেনি, ওর মাথায় পড়া থাকে না, ঢাকা এয়ারপোর্টে একটা চাকরি পেয়েছে, তাতেই চলে যায়।

বড়ভাই বাবার শ্যামলীর জায়গাটায় বাড়ি করে নিয়েছে, কিছু চতুরতা তিনি তখনই করেছেন, বাড়িটা জমির ঠিক মাঝখানে মাত্র দুই তলার ফাউন্ডেশন। বাড়ি না ভেঙে অন্য কিছু করার উপায় রাখেননি, অন্য ভাইরা অসন্তুষ্ট হলেও বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধে কে ? তা ছাড়া ওরা দেশে থাকে না সময় নিয়ে বড়ভাইয়ের সঙ্গে লড়ার করার ফুরসত কই ?

ঢাকা থেকে কত বছর দূরে, বন্ধু বা ক্লাস মেইট কারও সঙ্গেই যোগাযোগ ছিল না। কেউ দেশের বাইরে, কেউ দেশেই উচ্চ পদস্থ, কেউ একেবারেই সাধারণ জীবন যাপন করছে । তবে নিমার জীবনটা একেবারে লবা ডঙ্কা, কারুর  মতোই নয়। আস্তে আস্তে ফেসবুকের বদৌলতে সবার সঙ্গে যোগাযোগ হলো, আসলে বেণুকে দিয়েই শুরু। বেণুকে ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তির জন্যে যখন নিয়ে গিয়েছিল তখনই তিথির সঙ্গে দেখা। তিথি পাস করে ডিপার্টমেন্টে যোগদান করেছিল, তারপর বিলেত থেকে পিএইচডি, এখন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে আছে, এই জায়গা টা নিমারও হতে পারত, হয়নি।

সেই থেকে একে একে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ, একদিন নিমাদের ইয়ারের সবাই নিমাকে দেখতে আসার প্ল্যান করল। ফ্যামিলিসহ প্রায় চৌত্রিশ জন এসেছিল, সে কি আনন্দ হয়েছিল। নিমার একটাই শখ, এই বাড়িটা ধবধবে সাদা রং করে রাখা, বছর ঘোরার আগেই বাড়িটা রং করায় নিমা, তখন বড়ভাই রাগ করেন, রংমিস্ত্রিকে কেন এত টাকা দিলে, সারাদিন তো বসে থাক, দেখাশোনা করে একটু কম খরচ করলেই পার, কিন্তু অই সময় সাদা ধবধবে বাড়িতে নিমার মন খুব প্রফুল্ল থাকে, মনে হয় বাবা হাসছেন, নিমা তাড়াহুড়া করে বাড়ি রং করাল, পূর্ণিমার পরের দিন ওরা সব এল, এই বাড়িটা এমন আনন্দে নিমার জানামতে আগে জাগে নি কখনও। ওরা দলবেধে দূরে একটা হাওর দেখতে গেল, সবাই একরাত ছিল, স্কুলঘর, কাচারি সব মিলিয়ে কোনওভাবে সবার জায়গা করা হয়েছে । সবাই খুব পছন্দ করল, বলল তুই স্বর্গে আছিস তনি, নিমার নাম তনিমা চৌধুরী। তনিমা এমন একটা নাম যাকে দু’ভাগেই ভাগ করে ছোট করে ডাকা যায়, বাড়ির সবার কাছে নিমা আর স্কুল থেকে সবার কাছে তনি। এর মাঝে মৌসুমি বাংলাদেশ টেলিভিশনে আছে, ওই বারবার করে বলল এত সুন্দর একটা বনেদি বাড়ি, বার্মিজ কাঠের আসবাব, চারপাশ এমন সুন্দর, চাঁদনি রাতে এই ধবল বাড়িটা, আমরা আমাদের নাটক সিরিয়ালের শুটিঙের জন্যে চাই, তোরা রাজি হলে মোটামুটি ভালোই একটা রিটার্ন পাবি। তবে ঢাকা থেকে অনেক দূর বলে শুটিং ক্র, থাকার যন্ত্রপাতি সেইফ্লি রাখার ব্যবস্থা করতে হবে, ভেবে আমাকে জানাস।

নিমা বলল, আমার তো ভালোই লাগছে, একটা রোজগারের পথ হয়, হাতে কিছু টাকা এলে আরও গ্রামে কিছু ছোটখাটো কাজ আমি করতে পারি, বাবা সারা জীবন চাকরি করেছেন, নিজের গ্রামের জন্যে কিছু করার সময় পাননি বোলে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন, একটা এতিমখানা করার ইচ্ছে আছে, তার আগে একটা কম্পুটার লার্নিং স্কুল করব, যাতে ছেলেমেয়েরা বেসিক কম্পুটার স্কিলটা ছোটবেলা থেকে শেখে। তবে বড়ভাইয়ের ইজাজত ছাড়া হ্যাঁ বলতে পারছি না। উনার সঙ্গে কথা বলি তার আগে তুই ঢাকা গিয়ে আমাকে জানা কেমন রেন্ট পাওয়া যাবে। ওরা সবাই হইচই করতে করতে আবার আসব বলে ঢাকা ফিরে গেল ।

কিন্তু সুলতান, ইদ্রিস চাচা, বেণু, বেণুর মা সবার সীমাহীন উল্লাস, তাদের এই বাড়িটা টিভির পর্দায় দেখা যাবে বলে। ওদের উৎসাহে নিমা বড়ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলল, যদিও একটু কমিয়ে বলেছে, তাও টাকার অঙ্কটা ভালো, নিমা কমিয়ে বলল কারণ অরা যদি কোনও কারণে টাকা কম দেয়, তখন মৌসুমির সঙ্গে ঝামেলা করে সম্পর্ক নষ্ট করার ইচ্ছে নেই। বড়ভাই রাজি হলেন এক শর্তে, নিচের ঘর, দহলিজ, কাচারি, পুকুরপাড়, সব জায়গায় শুটিং হবে কিন্তু অন্দরমহলে কোনও শুটিং হবে না ।

সবি ঠিক শর্ত মেনে দুই মাইক্রবাস আর তিনটা গাড়িতে শুটিং এর টিম এল ঢাকা থেকে। অতনু হালদারের টিম, নাটকের নাম অহর্নিশ।

ওরা থাকবে পাঁচ থেকে ছয়দিন, ইশকুল ঘরে সবার থাকার ব্যবস্থা হলো, শুটিং এর যন্ত্রপাতি নিচের ঘরে থাকবে, মেয়ে রা নিচেই থাকবে, কাচারিতে থাকবেন অতনু হালদার আরও কয়েকজন। এই অজপাড়াগায়ে হোটেল নেই, তাই শুটিং টিম আগে থেকে এই ব্যবস্থা এগ্রিমেন্টে লিখে নিয়েছেন। সারা গ্রামে ছেলেমেয়েদের মধ্যে এক উৎসব বয়ে যাচ্ছে, গ্রামে এমন ঘটনা আগে ঘটে নি, তাদের গ্রাম দেখা যাবে টিভির পর্দায়। সবাই সুন্দর জামা কাপড় পরে ঘুরছে যদি কোনও একটা সিনে ক্ষণিকের জন্য হলেও দেখা যায়। ছেলেরা বিনা পারিশ্রমিকে জিনিসপত্র টানছে।

নিচের একটা ঘরকে শোবার ঘর দেখালেও, রান্নাঘর দেখাতে গিয়ে ঝামেলা হচ্ছে, গল্পটা একটা বনেদি বাড়ির লোকজন নিয়ে। প্রথমদিন পুকুরঘাটে দেখা হলো অতনু হালদারের সঙ্গে, কুশল বিনিময়ের পর নিমা জানাল সুলতান অলরেডি নিমাকে শুটিং এর অসুবিধার কথা জানিয়েছে। অতনু বলল এটা আপনি এগ্রিমেন্টে রেখেছেন, ভাববেন না, ঝামেলা নিয়ে আমি অভ্যস্ত।

টুকটাক কথা-বার্তা।

অতনু বললেন, মৌসুমি আপার কাছে শুনেছি এক সময়ের মেধাবী ছাত্রী আপনি, বাবা মা চলে যাবার পর ও এই বাড়ি আগলে আছেন, আগলে থাকার মতো বাড়ি বটে, চারপাশটায় কেবল শান্তি ছড়িয়ে আছে। পূর্ণিমার আলোতে সাদা বাড়িটা ফকফক করে হাসছে।

নিমা বলল কারও-কারও জীবন কেমন করে যেন ধীরে ধীরে এই হিজল গাছ, এই জারুলের তলা, সুপারি গাছের ঝোপ, পুরোনো দিনের শান বাঁধানো ছাল উঠে যাওয়া ঘাট, পুরোনো বাড়ির বার্মিজ কাঠের চৌকাঠের কাছেই বন্ধক পড়ে যায়।

মনে মনে বলে অতনু হালদার আমার কোথাও যাবার জায়গা নেই।

নিমা নিজে থেকে নিমার সঙ্গে অতনু আর নায়ককে মেয়েদের সঙ্গে রোজ দুপুর আর রাতের খাওয়া খেতে বলল, অন্য ক্রুরা কাছারিতে খাবে। নায়িকা বেশ অমায়িক একটা মেয়ে, ঢাকায় তিন বছরের মেয়েকে স্বামী আর শাশুড়ির কাছে রেখে এসেছে। খানা শেষ করেই বাচ্চার সঙ্গে কথা বলতে ছুটে, মনে হয় এই পৃথিবীতে ওর বাচ্চার চেয়ে জরুরি, প্রিয় আর কিছু হতে পারে না। নায়কের মনে হয় নতুন প্রেম, সেও ব্যস্ত। অন্যরাও খাওয়া শেষ করে বিশ্রাম নিতে চলে যায়, বৈশাখ মাসের প্রচণ্ড গরম, সবাই সহজে ক্লান্ত। কেউ কেউ পুকুরের দিকে হাঁটতে চলে যায়। রাতের খাবার শেষে অল্প অল্প গল্প হয় অতনুর সঙ্গে, অতনুর বাবা মারা যায় যখন ওর বয়েস পাঁচ, ভাইদের সংসারে মানুষ, তেমন ভালোবাসার ছায়া কোথাও ছিল না, পড়ালেখায়ও তেমন মেধাবী ছিল না, লেখালেখিতে হাত ভালো, এভাবে আস্তে আস্তে নাটকে জড়িয়ে গেছে, বোঝা যায় হাজার ঠোকর খাওয়া মানুষ, বৈষয়িক নন, ঠকে ঠকে মধ্যজীবন শেষের দিকে।

অতনুর সঙ্গে কথা বলতে নিমার ভালোই লাগে। যদিও কেউ কাউকে নিজেদের একাকীত্ব আর দুখের কথা বলেনি। তবু এই জগতের নিয়ম এক দুখী আরেক দুখীকে চিনতে পারে। সুখ মানুষকে তেমন করে বাঁধতে পারে না কিন্তু দুঃখ মানুষকে সহজে আপন করে দেয়।

অতনু যাবার দিন নিমার খুব মন খারাপ হলো, শুটিং টিম চলে গেলে বাড়িটা আবার ঝিম মেরে যাবে।

যাওয়ার সময় অতনু বলল আমার আরেকটা ফোন নাম্বার আছে, সেইভ করে রাখুন, আপনার কাছে যেটা আছে ওটা কাজের ফোন, অনেক সময় পাওনাদার থেকে বাঁচার জন্যে বন্ধ করে রাখি।

নিমা তার নকিয়া ফোনটা বার করল ফোন নাম্বার সেইভ করার জন্যে। হঠাৎ অতনুর স্মার্ট ফোনের পাশে খুব বেমানান মনে হলো, তা বুঝে অতনু হাসল, আমার দুটো স্মার্ট ফোন ছাড়া আর কিছু নেই। নিমা ও হাসল বলল, মেজভাই পাঠিয়েছিল, খুব মজবুত, এখন কাজ দিচ্ছে, আর আমার একটা ল্যাপটপ আছে, স্মার্ট ফোন ছাড়া কাজ চলে যায়। নিমা নিজ থেকে বলল মাঝে মাঝে ফোন করবেন।

ঢাকার কাছাকাছি পৌঁছে অতনু জানাল ওরা ঢাকার কাছাকাছি, রাত হয়ে গেছে নিমাকে পরে ফোন করবে।

অহর্নিশ টিভিতে দেখিয়েছে, সারা গ্রামজুড়ে শুধু অহর্নিশের কথা। গ্রামের সবাই প্রাউড, কিন্তু বাজ পড়ল অন্য জায়গায়। বড়ভাইয়ের কথা অমান্য করা হয়েছে, অন্দরমহল দেখান হয়েছে। অনেক দিন থেকে নিমা যে ঝড়ের আশঙ্কা করছিল সে ঝড়ই উঠল। এই অজুহাতে বড়ভাই গ্রামের ভিটে জমি-জমা বিক্রি করে দিবেন। মেজভাই, ছোটভাই কেউই এতে বাধা দিচ্ছে না। সবার তো টাকার প্রয়োজন। নিমা এতদিন পর বড়ভাইয়ের সঙ্গে জোর গলায় কথা বলল, নিমা জমি ভিটা কিছুই বিক্রি করতে দিবে না, বিক্রি করতে হয় তো শ্যামলীর জমি আগে বিক্রি করতে চায়। নিমা যখন মানবেই না তখন বড়ভাই কেইস করলেন।

এবার নিমা ছাড়বে না, কোর্টে বড়ভাইয়ের সঙ্গে নিমা লড়বে, ভাইদের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে এসব মনোমালিন্য কখনও নিমা চায়নি বলেই এতদিন নিশ্চুপ ছিল। কিন্তু এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। একই বাবা-মার আদর্শ আর ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়ে কি করে এতটা আলাদা হয়! কীভাবে বাবার ভিটা কবর বিক্রির চিন্তা করে, কীভাবে এতটা স্বার্থপর হতে পারে। বাবামাকে দেখাশোনার দায়িত্ব তো সব ছেলেমেয়েরই সমান বরঞ্চ ছেলেদেরই বেশি। ভাইরা তাদের দায়িত্ব তো পালন করেইনি, বাবা না গেলে বড়ভাই একবার মাকে বা নিমাকে বলতে পারতেন ঢাকায় উনার বাসায় থাকার জন্যে, নিমাকে মাস্টার্সটা শেষ করার জন্যে, অবজ্ঞা আর অবহেলার ভারে নুয়ে পড়া বাবা-মায়ের শেষ সময়েও সময় হয়নি তাদের। অভিমান আর কষ্ট নিয়েই পৃথীবি ছেড়ে গেছেন তারা। যাবার সময় নিমার জন্য ভীষণ স্থির ছিলেন দুজনেই বিশেষ করে মা। হয়তো মা পরে গেছেন বলে অস্থিরতাও ছিল বেশি। উনি বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধে নিমা একেবারেই একা। দায়িত্ব করার বেলায় ভাইদের সময় বা আগ্রহ কোনওটাই ছিল না। কিন্তু জমিজমার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ বা সময় কোনওটারই কোনও অভাব নেই। কালো হতে পারে কিন্তু ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়া মেধাবী ছাত্রী বলে দু-চারজন যে আগ্রহী ছিল না তা তো নয়।

বাবা-মায়ের কথা ভেবে নিমাই বরঞ্চ কখনও কারওর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায়নি। আর পরে তো বাবা-মা দুজনের দায়িত্ব নিমার একাকেই সামলাতে হয়েছে, তখন মনে হয়েছিল ভালোই হলো সম্পর্ক হয়নি কোনও। হলে হয়তো বাবা-মাকে এভাবে দেখাশোনা করতে পারত না। বাবা-মায়ের দায়িত্ব যখন ও একাই করেছে তখন জমিজমাতেও তো ওরই অধিকার সবচাইতে বেশি থাকা উচিত। নিমা ঠিক করেছে এতদিনের জমে থাকা সব ক্ষোভ, অভিমান, অবিচার সবকিছুর ন্যায্যবিচার চাইবে সে বিচারকের কাছে। অবশ্য বিচারক যদি পুরুষ হয় তবে উনি কি করতে পারবেন সঠিক বিচার ? দিতে পারবেন ন্যায্য রায়। হঠাৎ নিমার মনে হলো তার জীবনটা একটা কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে। আসলে বরাবরই দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু লড়াই করতে করতে সে ভাবনার অবসর হয়নি কখনও। নারী স্বাধীনতার, সমতার কত কথাই তো আজকাল শোনা যায় আসলে কতটা স্বাধীন নারী ? ক্ষেত্র বিশেষে সব চেয়ে বন্দি নারী তার আপন জনদের কাছে, সবচেয়ে অবহেলিত অপমানিত তার প্রিয় জনের কাছে।

বিচারকের সামনে তনিমা আহমেদ, ও নিজের কেইস নিজেই লড়বে ঠিক করেছে, একজন উকিল সে নিয়েছে কিন্তু নিমার ধারণা নিমার কেইসের হারজিত তার জবানবন্দিতে… যে বিচারক নিমার সামনে আজ তিনি একজন বাবা, তিনি একজন পুত্র, তিনি একজন স্বামী, তিনি একজন ভাই, তিনি কি পারবেন নিমার এক টুকরা স্বপ্নকে জীবনরূপ দেওয়ার রায় দিতে ?

নিমা বলছে… মাননীয় বিচারক… আমি যেসব ছোটখাটো প্রকল্প করেছি তার কাগজ আমার পরীক্ষার রেজাল্টের সার্টিফিকেট সব আমি জমা দিয়েছি, আমার অনার্স পরীক্ষার পর বাবা স্ট্রোক করে এবং আমি বাবা-মায়ের সঙ্গে আমার বাইশ বছর বয়েসে আমাদের গ্রামের বাড়ি ঢেমসা চলে যাই এবং আজ প্রায় আঠাশ বছর আমি সেখানেই বাড়িটা আঁকড়ে আছি ।

আমার বাবার স্বপ্ন ছিল উনার নিজ গ্রামের মানুষের জন্যে কিছু করার, বাবা-মাকে হারিয়ে মানসিকভাবে আমার প্রস্তুত হতে সময় লেগেছে, আমি সবে কাজগুলো করতে শুরু করেছি, চেষ্টা করছি আমাদের বাড়িটা থেকে সাহায্যের হাত প্রসারিত হবে দুঃখী, বঞ্চিত, অবেহেলিত, অসহায় মানুষগুলোর জন্যে, হয়তো খুবই ক্ষুদ্র এই প্রচেষ্টা।

বাবা অসুস্থ হবার পর থেকে কোনওদিন আগ্রহ নিয়ে আমার বড়ভাই মাস্টার্সটা শেষ করবার কথা বলেনি, শুনেছি কানাডায়, অস্ট্রেলিয়ায় ইমিগ্রেশন চেষ্টা করলে হয়, না-হউক ইমিগ্রেশন তাও যদি আমার ভাইরা মুখ ফুটে একবার বলত, আমার বড় ভাই মা মারা যাবার পরও একবার বলে নি ঢাকায় তার সঙ্গে গিয়ে থাকতে, আমি একা। আমি কারওর ওপর বোঝা না-হয়ে আমি আমার বাকি জীবনটা ঢেমসা আমার বাবার বাড়িতে কাটাতে চাই, যে সন্তান তার বাবা-মায়ের দেখাশোনা করে তাদের অন্তিম দিন পর্যন্ত, সে ছেলে হউক আর মেয়েই হউক তার বাবা-মার সম্পত্তিতে মতামতে অগ্রাধিকার জরুরি, মাননীয় আদালাত। নয়তো আমার মতো নিমারা বার বার হেরে যাবে আপন রক্তের কাছে।

ইদ্রিস চাচা, সালেহ মাস্টার, ফরিদ মাস্টার, সুলতান সব কোর্টের কোনায় দাঁড়িয়ে নিমার বয়ান শুনছে, অনেক কিছুর নীরব সাক্ষী ইদ্রিস চাচা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন, মাননীয় জজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, রায় এখনই হতে পারত কিন্তু উনি আদালত মুলতবি ঘোষণা করলেন…।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares