গল্প : তোমার ছায়া : শামীম আল আমিন

নিশাত মেয়েটা কেমন করে যেন চুলটা বাঁধে, দেখতে অদ্ভুত লাগে। অদ্ভুত মানে, অদ্ভুত ভালো লাগায় মনটা ভরে যায়। বাঁধার সময়ের দৃশ্যটা কেমন, দেখতে খুব মনে চায় সুমনের। আসলে কি, মেয়েটা যেন কেমন! এত এত ভালো লাগে! যা করে তাই ভালো লাগে। রেগে আলুর দম হয়ে থাকলেও। গালে কেমন টোল পড়ে। আহা, মনে পড়লে হৃদয়টা নেচে ওঠে। চোখে আবেগের পানি এসে যায়। তার সামনে গিয়ে আমতা আমতা করে কথা বলাটার মধ্যেও সুখ। বন্ধুরা বলে, ‘এত ডুবে যেও না, শেষে পস্তাবে। কষ্টের সাগর পাবে। সে সাগরে হাবুডুবু খাবে। যে কঠিন মেয়ে, তোমাকে ভুগিয়ে ছাড়বে!’ এত্তসব উপদেশ বাণী সুমনকে স্পর্শ করে না। সে কেবল নিশাতকে এক পলক দেখার জন্যে অপেক্ষা করে। ঐ তো চলে এসেছে। রিকশায়। আজ গাড়ি আনেনি। কলাভবনের ঠিক এখানটাতেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার কথা সুমনের। ঠিক জায়গামতোই সে ঘণ্টাখানেক ধরে অপেক্ষায়। নিশাতকে দেখামাত্রই বুকের ভেতরে তবলা বাজার মতো শব্দ শুরু করল। সেকি শব্দ; যেন ঝড় উঠেছে। আজ ততটা গরম নয়; এরপরও মনে হচ্ছে ঘামছে। রিকশাটা ঠিক সুমনের কাছে এসে দাঁড়াল। তার দিকে ঠিকমতো তাকাচ্ছেও না নিশাত। মনে হলো যেন দেখতেই পায়নি। চোখে সানগ্লাস। তাই নিশাতের মনোভাব ঠিক বুঝতে পারছে না সে। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়াল মেয়েটি। চোখ থেকে কখন সানগ্লাসটা সরিয়ে নেওয়া হবে সেই অপেক্ষায় সুমন। সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিশাত বলল, ‘তা গামা ভাই, কেমন আছেন’ ?  মেয়েটির কথায় কিছুটা ঘাবড়ে গেল সে। আজ যে কি আছে কপালে! গামা ভাই আবার কী ? একেক দিন একেক নামে ডাকে এই মেয়ে। ‘ভালো, ভালো। তুমি’ ?

‘খুব ভালো আছি গামা ভাই। আপনার কথা শোনার জন্যে মনটা অস্থির হয়ে আছে। রাতে তো ঘুমাতেই পারিনি’। কিছুটা টিপ্পনি কাটার ভঙ্গিতে বলল নিশাত। ‘বলুন, বলুন, কী বলবেন’ ?

‘এখানেই, এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলব! মানে কোথাও বসলে হয় না ?’ কোনও রকমে যেন কথাটা শেষ করল সুমন। আরও কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।

‘আচ্ছা আচ্ছা, তো এই ছিল মনে। প্রেম প্রেম ভাব দেখছি। এই জন্যেই তো আপনি একটা গামা। জানতে চাইলেন না যে, গামা মানে কী’ ? সুমনের জানতে চাওয়ার জন্যে অপেক্ষা না করেই নিশাত বলে ফেলল, ‘গামা মানে, গাধা মানব। আপনি একটা গাধা মানব’।

এই প্রথম কিছুটা কষ্ট পেল সুমন। তাকে গাধা মানব বলেছে, এই জন্যে নয়। এক ধরনের আশঙ্কায় পেয়ে বসেছে তাকে। এই মেয়েকে ভালোবাসার কথা বলে কোনও লাভ নেই। বরং বললে, নির্ঘাত খবর আছে! জান্ ত্যানা ত্যানা করে ছাড়বে। এখন মনে হচ্ছে, ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’।

‘তা গামা ভাই, কোথায় বসতে চান, কোনও পার্কের গাছের আড়ালে ? গায়ের এখানে সেখানে হাত দিতে পারবেন। ভেবে দেখুন, এটাই ভালো আইডিয়া। খুব ভালো লাগবে। কী বলেন’ ?

‘কী বলে এই মেয়ে’ ? ভীষণ আহত হলো সুমন। গায়ের এখানে সেখানে হাত দেওয়া মানে! কোনও উত্তর দিতে পারে না সে। কোন্ উত্তরের কী মানে দাঁড়াবে, এই শঙ্কায়। তার চেয়ে অপেক্ষা করাই ভালো। চুপ থাকার কিছু সুবিধাও আছে।

‘কি বললেন না যে। আপনার কি ধারণা, আমি অনন্তকাল সময় নিয়ে এখানে এসেছি ? পার্কে যাবেন, নাকি কোনও চায়নিজ ফায়নিজে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ? ঝেড়ে কাশেন’। কিছুটা ধমকে ওঠে নিশাত। উত্তরে কেবল বার দুয়েক খুক খুক করে কাশল সুমন। তার বলার কিছু নেই। সে এখান থেকে এখন পালিয়ে বাঁচতে চায়। ‘একটা কাজ করেন, আমি চায়না কিচেন রেস্টুরেন্টে যাচ্ছি। আপনি অন্য একটি রিকশা নিয়ে পেছনে পেছনে আসুন। নাকি একই রিকশায় যাবেন, কোমরে হাত দিয়ে বসতে পারবেন’ ? বলে ফিক করে হেসে উঠল নিশাত। মেয়েটিকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। মায়াবী সেই মুখ। লাবণ্যে ভরা। কাঠিন্যের মাঝেও কি এক উদারতা। বলে আর থামল না। একটা রিকশা ডেকে তাতে উঠে বসল নিশাত। রিকশাওয়ালাকে বলল, ‘চাচা চলেন, হাতিরপুলের চায়না কিচেনে যাব’। রিকশা চলতে শুরু করল। মেয়েটি একবারের জন্যেও পেছন ফিরে তাকাল না। কিছুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে, আরেকটি রিকশা ডেকে তাতে চেপে বসল সুমন। আপাতত তারও গন্তব্য চায়না কিচেন।

মুখোমুখি বসে নিশাত আর সুমন। তবে সুমন সরাসরি নিশাতের দিকে তাকাতে পারছে না। বেশিরভাগ সময়ই তার দৃষ্টি এদিক সেদিক ঘুরছে। নিশাত কঠিন চোখে সেই দৃশ্য দেখছে। খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেকক্ষণের নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে নিশাত বলল, ‘বলুন, কি বলতে চান’! উত্তরে সুমনের সেই অস্বস্তির কাশি। বিরক্তি বাড়ে নিশাতের। ‘প্রেম-ট্রেম নিবেদন করবেন নাকি ? দ্যাখেন গামা ভাইয়া সেই রাস্তায় হাঁটবেন না। আমি কিন্তু খুবই কঠিন মানুষ। স্যুপ দিয়েছে, এটা খান। তারপর সুবোধ ছেলের মতো বাড়ি ফিরে যান’।

অনেকক্ষণ পর এবার সাহস সঞ্চয় করে কিছু কথা বলতে চাইল সুমন। ‘তোমার রাগই বেশ লাগে। আমি কিছু মনে করি না’।

‘এ জন্যেই তো আপনাকে গামা বলি। গাধা মানব। পার্সোনালিটি বলতে তো কিছুই নেই। সব ক’টা স্ক্রু খুলে পড়ে গেছে। আবার প্রেমও করতে চায়। চান না বলেন! আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, এই টাইপের কথা বলার জন্যেই তো ডেকেছেন, নাকি’ ?

আপাতত প্রেম করার ইচ্ছা পালিয়ে গেল সুমনের। ‘তোমায় ভালোবাসি’ বলার চেয়ে। আপাতত মনটা বলছে, ‘চল ওঠা যাক। এবার পালিয়ে যা বাছাধন’। কিন্তু টেবিলে স্যুপ। খাবার আসছে। রূপবতী মেয়েটি সামনে বসা। সুন্দর করে আজ সেজেছে। চোখের ওপর থেকে সানগ্লাস সরিয়ে নেওয়ার ফলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আজ সে কাজলও পরেছে। সরাসরি তাকাতে পারছে না সুমন। কিন্তু আড়চোখে কখনও মেয়েটিকে দেখার ইচ্ছা সামাল দেওয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে নিশাতের কথা শুনে কেমন যেন বুকের বাম দিকটায় ব্যথা উঠে যাচ্ছে। খুব কষ্টের অনুভূতি হচ্ছে। তাকে পাওয়ার আশা কেমন মিলিয়ে যাচ্ছে। বাটিতে স্যুপ উঠিয়ে দিচ্ছে নিশাত। ‘নিন, স্যুপ খান। খাবার খান। এরপর বিদায় হোন। কোনও দিন ফালতু ইমোশনের কথা আমাকে বলতে আসবেন না। মনে যেন থাকে’।

সুমন স্যুপের বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিল। মাথা নিচু করে আছে। কোনও কিছু খাওয়ার মন নেই তার। ‘জীবনটা এমন কেন! এত যন্ত্রণার! এত কষ্টের! ভালো লাগে না’। ভাবতে ভাবতে কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। ভয়ে একটু একটু করে স্যুপ মুখে দিচ্ছে সে। কখন যে অনেকটা সময় গড়িয়ে গেল। এত চমৎকার একটি পরিবেশ। দারুণ সুযোগ। অথচ মেয়েটাকে কিছুই বলা হয়ে উঠল না। এখনি হয়তো সে বলবে, ‘আজ তবে উঠি’। হয়তো এমনও বলতে পারে, ‘আর কখনও আমার পিছু নেবেন না’। সত্যি তাই। নিশাত উঠে দাঁড়াল। কিছুটা কোমল গলায় বলল, ‘উঠি। ভালো থাকুন’। বলে চলে যেতে শুরু করল। সুমনকে আর কিছু বলার সুযোগই দিল না। ‘কি কঠিন মেয়েরে বাবা। এতটা নিষ্ঠুর মানুষ হয়’! ভেবে কান্না পাচ্ছে সুমনের। সে নিশাতের পিছু নিল না। জানে লাভ নেই। বরং উল্টো হবে। একবার উঠে দাঁড়িয়ে আবারও সেই চেয়ারে বসে পড়ল।

কিছুটা সময় পেরিয়ে গেল। উঠতে ইচ্ছা করছে না। এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। হঠাৎ টেবিলের একপাশে, যেখানে নিশাত বসেছিল, সেখানে একটা কাগজ চোখে পড়ল। পানির গ্লাস দিয়ে চাপা দেওয়া। উঠে গিয়ে কাগজটা তুলে নিল। খুলে দেখে রীতিমতো চমকে উঠল সুমন। প্রচণ্ড ধাক্কার মতো খেল। নিশাতের হাতের লেখা। সে লিখেছে, ‘গামা ভাইয়া, চেহারায় কিছুটা গাধা গাধা ভাব আপনার আছে, এটা ঠিক। এটাও ঠিক, আপনার সাহস কম। বলদ টাইপ। কিন্তু এটা টের পেয়েছি, আপনি ভালো মানুষ। ফলে আপনাকে বিশ্বাস করা যায়। তাই ভালো বেসেছি অনেক আগেই’। নিচে নিশাতের নাম লেখা। এটা কি! আনন্দে ঝলমল করে উঠল সুমনের হৃদয়।

নিজের চোখকেও সে বিশ্বাস করতে পারছে না। নিশাত কখন লিখল এটা, কখন রাখল! নিজের কাছে প্রশ্ন। কিন্তু উত্তরের প্রয়োজন নেই। রেস্টুরেন্টের বিল মিটিয়ে দিয়ে সোজা চলে গেল বাইরে। তার বিশ্বাস নিশাত যায়নি। বাইরে অপেক্ষা করছে। ঠিক তাই। সামনের গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের দিকটায় তাকিয়ে আছে নিশাত। পড়ন্ত রোদে লম্বা ছায়া পড়েছে মেয়েটার। সুমন একবার ভাবল পাশে দাঁড়িয়ে তার হাতটা ধরবে। কিন্তু পরক্ষণেই সেই ইচ্ছা বাদ দিল। যা রাগী মেয়ে, আবার কি বলে ফেলে! আজ কিছুতেই তাকে রাগাতে চায় না সুমন। তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। নিশাতের ছায়া পড়েছে সুমনের গায়। সুমন সাহস করে বলেই ফেলল, ‘আমার গায়ে তোমার ছায়া’। হেসে ফেলল নিশাত। অদ্ভুত সুন্দর সেই হাসি।  

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares