গল্প : সফেদ জোছনা : রাজকুমার শেখ

অজয়ের চর ধরেই নিশাদ হাঁটছিল। আর মনে মনে জমিলার কথাটা ভাবছিল। জমিলা আসাদের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারেনি। খবরটা যখন পেল নিশাদ তখনও ঠিক জমিলার কথাই ভাবছিল। এর আগে বেশ কয়েক বার জমিলার সঙ্গে নিশাদের কথা হয়েছে ফোনে। আসাদ তখন বিছানায়। জমিলা নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। ওর কান্না শুনে নিশাদ ওকে বুঝিয়েছে।

তুমি বুঝবে না নিশাদদা, এ আমার অহংকারের ফল। আমি যে আসাদকে নিয়ে বড়ই অহংকার করেছিলাম।

এ কী বলছ জমিলা ? এখন এসব বলে কী হবে ?

নিশাদ বলে কথাটা।

না―এটাই যে সত্যি নিশাদদা। তোমার মতো একজন গুণী মানুষকে আমি বড়ই অবহেলা করেছিলাম। চিনেও চিনিনি। দূরে সরে এসেছিলাম।

থাক ও কথা। তোমার এখন অনেক দায়িত্ব। নতুন করে তোমাকে হাল ধরতে হবে সংসারের। তুমি পারবে জমিলা।

তুমি একবার আসবে না নিশাদদা ? আসাদের মৃত্যুর দিন কে, কখন এসেছিল তা আমার মনে নেই। এখনও বাড়িতে যেন আসাদ আছে। ওর গায়ের গন্ধ আমি পাই।

কথাগুলো অজয়ের চরে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল। জমিলা এখন কি করছে ? ওর আসবার খবরটা আগে থেকেই ও জানে।

ও যখন নতুন হাটে নামল তখন বেশ বেলা হয়েছে। অজয়ে হাঁটুসমান জল ভেঙে পার হলো। আবার লাল বালুচর ভেঙে ওকে হেঁটে যেতে হবে বেশ কিছুটা। তারপর কুলের বাস। এ বাসগুলো সোজা চলে যাবে বোলপুর। বাসাপাড়া থেকে কুলে খুব বেশি দূর পথ নয়। কুলেতে নেমে বেশ কিছুটা হাঁটা পথ। তারপর জমিলার বাড়ি। নিশাদের এই নিয়ে দু’বার এখানে আসা। যেদিন আসাদ চলে গেল সেদিন। আর আজ। আসাদের চলে যাওয়াটা নিশাদও মেনে নিতে পারেনি। ওর মনটা সত্যিই খুব খারাপ হয়েছিল। জমিলার কোনো সন্তান হয়নি। বিয়েটা খুব বেশি দিনের নয়। বছর দুয়েক হবে। হঠাৎ কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে। ওতেই ওকে চলে যেতে হলো। আসাদের জন্য ওর বড় মায়া লাগে। জমিলাদের বাড়ি এলেই নিশাদকে ও দেখা করত।

বলত, নিশাদ ভাই, আপনার কথা জমু বলে। আমাদের বাড়ি যাবেন। আপনাকে বোলপুর বেড়াতে নিয়ে যাব। আমাদের ওখানে শুধুই ধান জমি। খোলা মাঠ। দেখবেন আপনার ভালো লাগবে।

কথাটা মনে পড়তেই ওর মনটা খারাপ হয়ে গেল। মানুষ চলে গেছে কিন্তু কথা থেকে গেল। নিশাদ যতদিন বাঁচবে ততদিন হয়তো কথা ঘুরেফিরে ওর মনে আসবে। আসাই স্বাভাবিক। মানুষ ভুলে গেলেও মন ঠিক ধরে রাখে তার মনের মানুষকে। ভুলতে চাইলেও তা ভোলা যায় না। ঠিক ঘুরেফিরে আসবে। মন পুড়বে। সে আগুন চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসবে। মনের কোনো ঠিকানা নেই। কে কখন মনে বসে যায়, তা কেউই বলতে পারে না।

আজ অনেক দিন পর আসাদকে ওর মনে পড়ে গেল। জমিলার নতুন বিয়ে হওয়ার পর ওদের বাড়িতে আসাদকে নিয়ে এসেছিল। সেই থেকে আলাপ। আসাদ খুব ভালো ছেলে ছিল। সে জমিলাকে খুব ভালো বাসত। কিন্তু সে সুখ তার কপালে জুটল না। হঠাৎই চলে গেল। নিশাদ থেমে গেল। অজয়ের চরে রোদ পড়ে লাল বালি চকচক করছে। বালিতে ওর পা ডুবে  যাচ্ছে। হাঁটতে ওর বেশ কষ্ট হচ্ছে। এর আগে ও কোনো দিন বালির চর ধরে হাঁটেনি। বাস লেগে আছে গাছতলাতে। সওয়ারির জন্য অপেক্ষা করছে। নদীর চর বেশ অনেকটা। হাঁটতে থাকে ও। অজয়ের জলজ গন্ধ বাতাসে মিশে ভেসে আসছে। নিশাদ বুক ভরে বাতাস নেয়। মুক্ত বাতাস। ওর মাথার ওপর দিয়ে একটা চিল উড়ে গেল। ওর ডাকে কেমন যেন ও কেঁপে ওঠে। বহুদিন পর ও চিলের ডাক শুনল। ও একাই হেঁটে আসছে। নতুনহাট থেকে কিছু বাস চলে যায় কাটোয়া, বহরমপুর, সালার। নিশাদ এসেছে দেবগ্রাম হয়ে কাটোয়া ঘাট পেরিয়ে। কাটোয়াতে বাস ধরে সোজা নতুনহাট। তেমনটিই ফোনে বলেছিল জমিলা। আসাদ যেদিন মারা গেল, সেদিন ও বহরমপুর থেকে বাস ধরে ফুঁটি সাঁকো হয়ে এসেছিল। একটা বেলা শেষ হয়ে যায় জমিলার বাড়ি আসতে। নিশাদ এখন কিসের টানে এল ? জমিলা এখন পর-ঘরি। জমিলা ওকে আসতে বলতেই ও রাজি হয়ে গেল। আসলে এ সময় ওর পাশে থাকা দরকার। ও বড় একা হয়ে গেছে। সময় লাগবে ঠিক হতে। আসাদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে ওর মনে। অত সহজে আসাদকে ও ভুলতে পারবে না। সময়ই মলম লাগিয়ে দেয় ক্ষততে। সত্যিকারের কি ভোলা যায় ভালোবাসার জনকে ? যে তেমন করে ভালো বেসেছে একমাত্র সেই-ই জানে।

নিশাদ খুব কষ্ট করে হাঁটছে। বালুচরে জোরে হাঁটা যায় না। অজয়ের কথা বার বার শুনেছে নিশাদ জমিলার মুখে। ভরা আষাঢ়এ অজয়ের দুকূল ছাপিয়ে যায়। তখন অজয়কে চেনা যায় না। ওর ঢেউয়ে নৌকা দুলে ওঠে। যেন তলিয়ে যাবে নিমিষে। অজয় বড়ই অচেনা।

নিশাদ গাছতলাতে একটু বসে। ও বেশ হাঁপিয়ে গেছে। বাসটা ছাড়তে এখনও দেরি আছে। কয়েকজন বাসের ভেতরে বসে আছে। তার মধ্যে দু’-একজন আদিবাসী। ওরা জন খাটতে যাবে। এখানে মেয়েরা ধান পোঁতা কাজ করে। ধান জমিতে নিরান দেয়। বীরভূমের সব জায়গায় এদের দেখা যায়। খুব কষ্ট ওদের। ওদের মরদেরা তেমন কাজ করে না। মেয়েদের আয়ে ওদের সংসার চলে। জানালার কাছে একটি আদিবাসী মেয়ে বসে আছে। নিশাদ গাছতলাতে বসে ওকে দেখছিল। খুব বেশি বয়স হবে না। তামাটে গায়ের রং। খোঁপায় পলাশ ফুল গোঁজা। কটাসে চুল। মুখের আদলটা ঝুমকো ফুলের মতো। বেশ মানিয়েছে। নিশাদ তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। এমন সময় আরও কিছু যাত্রী এল। বাস ছাড়ার নাম নেই। আজ নাকি রুটে বাস কম আছে। কোথায় নাকি রাজনৈতিক দলের মিটিং আছে। নিশাদ বেশ বিরক্ত। ও যত তাড়াতাড়ি করছে তত বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে।  জমিলা ওর পথ চেয়ে বসে থাকবে।

দুপুর গড়িয়ে গেছে কখন। ওর খিদেও পেয়েছে। এখানে কোনো দোকানপসার নেই। শুধুই বালুচর। বেশ কিছুটা দূরে শুরু হয়েছে ধানখেত। সবুজ হয়ে আছে মাঠ। আর ক’দিন পরেই পুজো। ওর শরৎকালটা বেশ ভালোই লাগে। অজয়ের চরে কিছু কিছু জায়গায় কাশ ফুল দেখা যাচ্ছে। বাতাসে দুলছে। নিশাদ সেদিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। ওর মনেও আজ দোলা লেগেছে। অনেকদিন পর আজ ওর ভালোই লাগছে। বহুদিন ওর কোথাও যাওয়া হয় না। জমিলা তেমন করে না ডাকলে হয়তো আসা হতো না। আর কেনই বা সে আসবে এখানে ? তবু তাকে আসতেই হলো। তার মনে এখনও কোথাও জমিলার জন্য কিছু কি থেকে গেছে ? নিশাদ তো কবেই ওর কাছ থেকে সরে এসেছিল। নিশাদ তার জগৎ নিয়ে বেশ ছিল।

এমন সময় বাসটা ছাড়ে। নিশাদ বাসে উঠে পড়ে। বেশ শব্দ করে বাস ছুটে চলে। রাস্তার দুধারে ধান জমি। বাতাসে কেমন একটা সবুজ সবুজ গন্ধ ভেসে আসছে। নিশাদ বুক ভরে বাতাস নেয়। ধান ফুলের গন্ধ। আদিবাসী মেয়ের গায়ের গন্ধ। লালমাটির গন্ধ। পলাশের গন্ধ। নিশাদকে বিভোর করে দিচ্ছে। ওর কেমন নেশা লেগে যাচ্ছে। বাসের জানালা দিয়ে দূরে তাকিয়ে আছে। বাবলা গাছের ঝোপ কোথাও কোথাও। একটা ঠান্ডা বাতাস জানালা দিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরেছে। বেশ আরাম লাগছে। বোলপুরের দিকে বাসটা ছুটছে। এমন সময় বাসাপাড়া এসে বাসটা থেমে গেল। ও একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, এখানে দশ মিনিট থামবে। নিশাদ বেশ বিরক্ত হয়। কুলেতে যেতে কতক্ষণ লাগবে পাশের জনকে জিজ্ঞেস করে।

বাসটা আবার ছেড়ে দিল। বেশ কিছুটা আসার পর ওকে কুলে জোড় তালতলাতে নামিয়ে দিল। জমিলার বাড়ি জোড় তালতলা থেকে বেশ কিছুটা হাঁটা পথ। মেঠো রাস্তা। এখানে জমিলা কেমন করে মানিয়ে নিল ? এ জায়গাটা নাকি ওর খুব পছন্দ। ওর বাড়ির লোকজন কি দেখেই বিয়ে দিয়েছিল ? নিশাদের মনে নানা চিন্তার বাসা বাঁধছে। এর আগে এসেও ওর এই চিন্তাই হয়েছিল। তখন তো কাউকে ও জিজ্ঞেস করতে পারেনি। আসাদেরা পুরোনো বনেদি। এই সব দেখেই মনে হয় জমিলার বিয়ে দিয়েছিল। আসাদকে নিয়ে ও একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করত। নিশাদকে দেখাতে কি ? জমিলা যে সুখ চেয়েছিল তা ওর ভাগ্যে জুটল না। জমিলার জীবনের সবটাই বাকি। ওর সাধ আহ্লাদ সবই পড়ে আছে। ওর জগৎটা কেমন যেন হয়ে গেল। নিশাদকে কি ও কোনো দিনই ভালোবাসেনি ? এখন এসব ভেবে আর কি লাভ ?

নিশাদ হাঁটতে থাকে। বেলা অনেক হয়ে গেছে। ওর খুব খিদে পেয়েছে। সেই কোন সকালে বের হয়েছে।

ও যখন এসে পৌঁছাল তখন বেলা দুটো বেজে গেছে। জমিলা ওকে দেখতে পেয়েই বলে, নিশাদদা, এত দেরি করলে কেন ? আমি সেই কখন থেকে বসে আছি। তোমার ফোন লাগছিল না। এতটা পথ তো ঘুরে আসতে হলো। নতুনহাটে ঠিকমতো বাস পাওয়া যায় না। নিশাদ বলল কথাটা।

জমিলা ওকে ওপরের ঘরটাতে নিয়ে যায়। অনেক পুরোনো বনেদি বাড়ি। জমিলা কি একাই থাকে?  এত বড় বাড়িতে ও কি করে থাকে ?  নিশাদ তো কাউকেই দেখতে পেল না। কেমন এক বিষণ্নতার ছায়া খেলা করছে। সুবিশাল বাড়িটার পেছনে একটা জলা। ঝোপঝাড় আছে। নারকেল গাছ কয়েকটা আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। যে ঘরটা ওকে দেখিয়ে দিয়ে গেল জমিলা, সে ঘরটাতে অনেক পুরোনো আসবাব। কেমন একটা বোটকা গন্ধে ভরে আছে ঘরটা। আসলে অনেক দিন মনে হয় বন্ধ হয়ে পড়ে আছে বলেই হয়তো এমন গন্ধ। সব ঘরই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। ওপরে তেমন কেউ আসে না মনে হয়। জমিলা সব গুছিয়ে দিয়ে গেল। নিশাদ জমিলাকে দেখছিল। ওর সেই সুন্দর মুখটাতে কেমন একটা কালো ছায়া যেন লেপটে আছে। যে জমিলাকে সে চিনত, সেই  জমিলার সঙ্গে যেন কোনো মিল নেই। নিশাদ বেশ কষ্ট পেল। একটা ঝড় মানুষকে কীভাবে ভেতর ভেতর ভেঙে দিয়ে যায়। জমিলা কি আবার সেভাবে বাঁচতে পারবে ? আসাদ ওর মনজুড়ে আছে। সে স্মৃতি ও কোনো দিনই ভুলতে পারবে না।

জমিলা ওকে খেতে দেয়। বেশ অনেক কটা পদ। এসব কি জমিলা নিজ হাতে করেছে ? নিশাদ খেতে থাকে। জমিলা ওর সামনে বসে খাওয়ায়। এটা ওটা ওর পাতে তুলে দেয়। নিশাদ খেতে খেতে জমিলাকে জিজ্ঞেস করে, জমু, তুমি একা থাকো এ বাড়িতে ?

হুম। তবে একটা কাজের মেয়ে আছে। ও সকালে আসে। কাজ করে দিয়ে আবার চলে যায়।

তুমি একা এখানে থাকতে পারবে ?

খাওয়া থামিয়ে নিশাদ বলে কথাটা।

আসাদের একটি বোন আছে। ও কখনও সখনও আসে। থাকে। আমি বেশ আছি নিশাদদা। তুমি এলে তাই আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলাম তুমি আসবে না। আমি জানতাম তুমি আসবে। আমি খুব খুশি নিশাদদা। কটা দিন তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারব। নিশাদদা, তুমি লিখছ না ? তোমার লেখা কতদিন পড়িনি।

নিশাদ বেশ অবাক হলো এ কথা শুনে। জমিলা ওর লেখার ঘরে ঢুকে নিশাদের লেখার ডায়েরি খুলে বের করে পড়ত। তারপর বলত, এই গল্পের নায়িকা বুঝি আমি?

বলেই হাসতে হাসতে ওর ঘর ছেড়ে পালাত। নিশাদ হাঁ করে ওর ছুটে চলে যাওয়া দেখত। সেই জমিলার সঙ্গে এ জমিলার কোনো মিল নেই। ও এখন কত ধীর শান্ত। কত গুছিয়ে কথা বলছে। নিশাদ ওকে দেখছে। আজ ওর অনেক কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে।

ও এক সময় খাওয়া শেষ করে এসে শুয়ে পড়ে। দূরে কোথায় বাঁশ বনে একটা ঘুঘু ডেকে উঠল। নিশাদ ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুঘুটা বনে ডাকতে থাকে।

দুই.

পুবের জানালা দিয়ে ভোরের হিম বাতাস ঢুকছিল। নিশাদ ঘুম জড়ানো চোখে মোবাইল ফোনে সময়টা দেখল। ভোর চারটে বাজে। আর একটু পরেই সকাল হয়ে যাবে। গত রাতে ওর ভালো ঘুম হয়নি। কেমন একটা মনের ভেতর কথা হচ্ছিল জমিলার জন্য। গোটা রাস্তা ও কেমন এক ঘোরের মধ্যে ছিল। জমিলা তার প্রথম ভালো লাগা। ও ডাকতেই নিশাদ আর থাকতে পারেনি।

জমিলা এত বড় বাড়িতে একা কেমন করে থাকবে ? নিশাদ ভেবে পায় না।

হিম হিম ভাবটা ওর বুকে চেপে বসে। আর ঘুম আসছে না। ও চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। এমন সময় কে যেন পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকল। নিশাদ চোখ খুলে তাকাল না। এমন সময় ওর গায়ে কে যেন একটা চাদর দিয়ে দিল। এবার বেশ আরাম লাগছে। পুবের জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে গেল। নিশাদ আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

ও যখন উঠল তখন পুবে অনেকটা সূর্য উঠে গেছে। জমিলা ওকে ডাকেনি। বাঁশ বনে একটা টিয়া ডাকছিল। এখন টিয়ার ডাক তেমন শোনা যায় না। এখানে বেশ পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। নিশাদ পাখির ডাক শুনে মুগ্ধ। ভোরেও অনেক পাখি ডাকছিল। তারপর শিশিরের ফোঁটা টুপটাপ শব্দ করে ঝরে পড়ছিল মাটিতে। নিশাদ কান পেতে শুনছিল। ওর দালান বাড়ির ওপর থেকে দূরের মাঠ, ধানখেত, মেঠো পথ দেখা যায়। এখানে তেমন বসতি ঘন নয়। শুধুই জমি। ধান আর ধান। এখানকার প্রধান ফসলই হলো ধান। রবি ফসল তেমন হয় না। বছরে একবারই ধান চাষ হয়। কিছু কিছু জায়গায় রবি ফসলের চাষ হয়, যেখানে জল সেচের ব্যবস্থা আছে। সেখানে বছরে দুবার ধানও চাষ হচ্ছে।

এমন সময় জমিলা এল ঘরে। ওর গা থেকে জলজ গন্ধ বের হচ্ছে। সকাল সকাল ও গোসল করে নিয়েছে। মাথার এলান চুল দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ও কত বদলে গেছে। ওর এই সকালের রোদের মতোই রূপ। টানা টানা বুদ্ধি দীপ্ত দুটো চোখ। আজ ওর দিকে তাকালেই নিশাদের মায়া লাগে। ও এখন নিশাদের কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে। নিশাদ এখনও জানে না কেন তাকে ও ডেকেছে ?

নিশাদদা, ওঠো এবার। তোমার চা দেব এখানে ?

না―। আমি যাচ্ছি।

তোমার ভালো ঘুম হয়েছিল তো ?

তুমি ভোরে এসেছিলে ?

চাদরটা তখনও গায়ে দিয়ে আছে নিশাদ। সকালের হিম যেন এখনও চাদরে লেপ্টে আছে। ছাড়তে ইচ্ছে করছিল না। ও ওম নিচ্ছে। নিশাদের মনে হচ্ছিল ওকে কাছে টেনে নিয়ে ওর সমস্ত দুঃখ নিজের বুকে নিতে। কিন্তু সমাজ তা মেনে নেবে না। যে সামাজিক স্বীকৃতি তা কি ও দিতে পারবে ? না, জমিলা আর আসাদের আসনে কাউকেই বসাতে পারবে না ?

নিশাদ কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। জমিলা কী বলছে তা ওর কানে ঢুকছে না।

নিশাদদা, অত কী ভাবছ গো ? এখানে তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি ?

আরে―না―না। তেমন কিছু না। চলো চা খাই। তোমার বাড়িটা খুব সুন্দর। একটা বনেদি ছাপ আছে। আমাকে এখানে থাকতে দেবে ?

তোমার যতদিন ইচ্ছে থাকো।

তোমার পাড়ার লোক চাইবে কি ?

তাতে কি আসে যায়। আমার আত্মীয় এসে থাকবে তাতে লোকের কী ?

নিশাদ বেশ অবাক হলো ওর কথা শুনে। ও আর এগোয় না। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। জমিলাকে ও কথাই পারবে না। ওর পিছন পিছন নিশাদ সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামে।

বেলা হয়ে গেছে। জমিলা রান্নাঘরে ব্যস্ত। কাজের মেয়েটিকে কি সব বোঝাচ্ছে। নিশাদ চুপ করে বসে থাকে বারান্দায়। কোথায় একটা ঘুঘু ডেকে উঠল। ওর বুকেও ঘুঘু ডাকছে। ডেকেই চলেছে। সে যেন থামবে না কোনোদিন। জমিলা কি চায় ওর সঙ্গে ?  এত তাড়া কেন ? ও কি নিশাদের কাছে কিছু চায়? ও ভেবে পায় না। ঘুঘুটা আবার ডেকে উঠল। হয়তো ওর বুকেই।

তিন.

দুপুর গড়িয়ে গেছে। ওর ঘরে জলজ গন্ধ ভেসে আসে বাতাসে। জমিলা ওকে আজ অনেক পদ নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছে। নিশাদ দুপুরে খেয়ে একটু বিছানায় গা ড়িয়ে দিয়েছে। ওর আজ খুব ঘুম পাচ্ছে। গত রাতে ওর তেমন ভালো ঘুম হয়নি। জমিলার সঙ্গে অনেক রাত অবধি গল্প করেছে। জমিলাও রাত করে ঘুমোতে গেছে। জমিলাকে  নিয়ে ওর বিশাল চিন্তা। নিশাদ ওকে বলেছে, আসাদের সমস্ত স্মৃতি  জড়িয়ে আছে এই বাড়িতে। তুমি আবার কোথায় যাবে ? এখানেই তোমাকে থাকতে হবে। জমু, ভাগ্য মেনে নিতে হবে। তোমার কপালে যা আছে তাই হবে।

নিশাদদা, আমার পাশে যদি একজন থাকত!  তাহলে আমি চিন্তা করতাম না। বড় একা হয়ে গেলাম।

জমিলার গলা ধরে আসে। ও আর কথা বলতে পারে না। রাতের আকাশের তারাগুলো ওদের ড্যাব ড্যাব করে দেখছিল।

ওরা খোলা ছাদে বসে ছিল। দূরে কোথায় একটা পেঁচা ডেকে পালাল। রাত গভীর হচ্ছে একটু একটু করে।

নিশাদ কিছু বলতে পারে না। আধো অন্ধকারে ওর মুখটা খুঁজছিল। ওর মনে হচ্ছিল যে ওর হাত দিয়ে ওকে একবার ছুঁয়ে দেখতে। কিন্তু কোথায় যেন একটা অদৃশ্য গণ্ডি কাটা। নিশাদ তা কোনোদিনই পেরিয়ে ওকে ছুঁতে পারবে না। রাত বয়ে চলে। ওরা কতক্ষণ বসে ছিল কে জানে।

হঠাৎ কার হাতের স্পর্শে ওর ঘুম ভেঙে গেল। নিশাদ চোখ মেলে দেখছে জমিলা ওর কাছে দাঁড়িয়ে। মিষ্টি করে হাসল জমিলা।

নিশাদদা, চা কখন খাবে ? সন্ধে যে গড়িয়ে গেল।

নিশাদ জমিলার দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। যেন কোনো পরি নেমে এসেছে। ওর গা থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে। নিশাদ বুক ভরে বাতাস নেয়।  বহুদিন পর সে এত শান্তি পাচ্ছে। ওর মন ভরে এখন শুধুই জমিলা। এত দিন পর মন যেন কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু সব কিছু কি ওকে বলা যাবে ?

নিশাদদা, উঠে পড়। তোমার চা ঠান্ডা হয়ে গেল।

নিশাদ চাইছে জমিলা আর একটু কাছে থাকুক। ও চলে যাবার আগে আর একটু ভালো করে দেখতে চায়। জমিলার কাছে কেন যে আবার ও ফিরে এল?  বেশ ছিল ওর নিজের জগৎ নিয়ে। নিশাদ ওর কথা ফেলতে পারেনি। ওর ফোন পাবার পর থেকেই ও কেমন এক নেশার মধ্যে ছিল। জমিলা যত কাছাকাছি এসেছে ও ততই যেন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কেন এমন হচ্ছে ও বুঝতে পারছে না। ও কি কোনো মায়াজালে আটকে যাচ্ছে ?

নিশাদদা, চলো চা খাবে।

জমিলা পিছন ফিরতেই নিশাদ ওর হাতটা চেপে ধরল। ওর শীতল হাতের স্পর্শে নিশাদ কেমন এক ভালো লাগায় কেঁপে উঠল। দূরে কোথায় একটা তিতির ডেকে উঠল। জমিলা হাত ছাড়িয়ে নেয় না। নিশাদ ওর গভীর ঝিল চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকে। মুখে কিছু বলতে পারে না। সময় বয়ে যায়। জমিলা আরও ঘন হয়ে আসে ওর কাছে। তারপর ও বলে, নিশাদদা, তুমি পারবে আমাকে একটি সন্তান উপহার দিতে ? আমি যা নিয়ে বাঁচব। চিরকাল তোমার কাছে ঋণী থাকব। আসাদের কদিন হলো চলে যাওয়া। আমি বাঁচতে চাই নিশাদদা।

জমিলার গলা ধরে আসে।

নিশাদ এমন সুন্দর একটি সন্ধে নষ্ট করতে চায় না। জমিলার শীতল হাতটা ছেড়ে দেয়। তিতিরটা ডাকছে আবার। নিশাদ উঠে পড়ে। তারপর  সিঁড়ি ভেঙে হাঁটতে থাকে। এমন একটি ভালো সন্ধেকে ও কান্না দিয়ে  ভেজাতে চায় না।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares