গল্প : পাথর বৃত্তান্ত : মাহবুব আজীজ

আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরুবো, মেজ আপার বাসায় আবার ঘূর্ণিঝড়―দুলাভাই নতুন ঝামেলায় জড়িয়েছেন। আমাকে যেতে হবে সেখানে কিন্তু যা হয় আর কী―যেদিন দ্রুত বেরোনোর চেষ্টা করব, সে দিনই শেষ মুহূর্তে নানা কাজ এসে জড়ো হবে। আজও তাই হল―ইরফান ভাই একতাড়া কাগজ সামনে দিয়ে বললেন, ক্লায়েন্ট পাঠিয়েছে। দশ মিনিটের মধ্যে একটা রাইটআপ রেডি করে আমাকে মেইল করো!

করোনা ভাইরাস নিয়ে সচেতনতার ক্যাম্পেইন!

বাজারে মাস্ক ছাড়বে একটা ওষুধ কোম্পানি, তার জন্য বিজ্ঞাপনী ভাষা তৈরি করতে হবে―আমাদের এজেন্সির ভাষায় যাকে বলে রাইটআপ।

হায় ঈশ্বর! চীনে শুরু হয়েছে মহামারি, বাঙালি আগুপিছু না-ভেবে এ দেশে মাস্ক বানিয়ে পাঁচগুণ দামে বিক্রি শুরু করেছে! আমাকে বসে বসে এখন মাস্কের উপকারিতা লিখতে হবে!

অথচ, আমি আজ বেরোতে চেয়েছিলাম সন্ধ্যার আগে। মেজ দুলাভাইয়ের মাথায় গিজগিজ করে ব্যবসাবুদ্ধি―মুশকিল হচ্ছে, কোনওটাই ঠিক বৈধ পথের নয়, আবার তিনি এমনভাবে কাজগুলো করেন নানা কায়দায় আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসেন!

আমার বাবা ছিলেন ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী ইশকুলের ইংরেজির শিক্ষক; চার সন্তানের মধ্যে দ্ইু মেয়ে, দুই ছেলে―আমি ভাইবোনদের মধ্যে তিন নম্বর, মেজ আপা মানে টুনি আপা―ছেলেবেলায় বেশ ডাকাবুকা ছিলেন―ময়মনসিংহ মুমিনুন্নিসা কলেজে পড়ার সময় নিজের পছন্দে বিয়ে করেন আকরাম ভাইকে―তিনিই আমার মেজ দুলাভাই। মেজ দুলাভাই নানা ব্যবসা করে এখন ‘মহাকাল প্রোপার্টিজ’ নামের এক হাউজিং ব্যবসা খুলেছেন, অভিসার সিনেমা হলের পেছনে গোপীবাগে বউ-বাচ্চা নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন; আপা সকাল থেকে মুর্হুমুহু ফোন করে আমাকে তার বাসায় যেতে বলছেন, সর্বনাশ হইছে! তোর দুলাভাইকে পুলিশ বেঁধে নিয়ে যাবে। তুই তাড়াতাড়ি আয়।

‘আবার কি হলো! কি করেছেন দুলাভাই ? পুলিশ আসছে!’

‘মহা সর্বনাশ! তোর দুলাভাই গা ঢাকা দিয়েছে। বাসায় আমি আর বিল্টু-শান্তা। এরমধ্যে বাবাও আছেন। বাবা এসব দেখতেছেন, তার অজ্ঞান হবার দশা! তুই আয় ভাই!’

আমাদের পরিবারকে মোটামুটি শিক্ষিত মধ্যবিত্তই বলা যায়। বড় ভাই মাসুদ―তার বয়স পঞ্চাশের কাছকাছি, একটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্টার। তিনি এসব ঝামেলায় কোনোদিন টু শব্দও করেন না। তার ভ্রু-কুঞ্চিত এক কথা―ফ্যামিলির ‘ব্ল্যাকশিপ’। তাকে ছেড়ে টুনি কেন চলে আসে না!’ বড় বোন রুনি―আমার রুনি আপা স্বামী-সন্তান নিয়ে আছেন ইতালি; দুই-পাঁচ বছর পর পর হাজার খানেক কাপড় ভর্তি স্যুটকেস নিয়ে দেশে ঈদ করতে আসেন! ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী স্কুলের উল্টোদিকে আমাদের ছোট দোতলা বাড়ি, নিচের তলাটা ভাড়া দিয়ে বাবা ওপরে থাকেন; মা মারা গেছেন―তাও প্রায় পাঁচ বছর। এখন বাবা পুরো অবসরে, আগে দুই-পাঁচজন ছাত্রকে ইংরেজি পড়াতেন বাসায়, এখন তাও না। আমার বয়স আঠাশ। আমাদের বস ইরফান ভাইয়ের মতো আমি কনফার্মড ব্যাচেলর নই, বছর তিনেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সোসিওলজিতে মাস্টার্স করে বেরিয়েছি, তেজকুনিপাড়ায় একটা ছয় তলা বাড়ির চিলেকোঠায় ভাড়া থাকি―প্রায়ই ভাবি, নিজেকে গুছিয়ে নিই, একটা শান্তমতো সুন্দর দেখতে মেয়েকে বিয়ে করে সংসারী হব। বাবাকে একেবারে আমার কাছে নিয়ে আসব; অবশ্য বাবার এখনই আমার তেজকুনিপাড়ার চিলেকোঠায় আসার খুব শখ; আমার নিজেরই চালচুলোর ঠিক নেই! টুনি আপার গোপীবাগের বাসাতেই যেন তিনি থাকেন, আমি নানা কায়দায় তাকে যুক্তি দেই। বড় ভাই বরাবরই আসা-যাওয়া বা পারিবারিক বন্ধন নিয়ে উদাসীন।

তেজগাঁয় বিশাল এক নাক-কান-গলার সরকারি হাসপাতাল। তার কাছাকাছি জে এন্ড এম গ্রুপের অফিস মাঝারি গোছের বিজ্ঞাপনী সংস্থা। ইরফান ভাই ওই সংস্থার ক্রিয়েটিভ হেড; সকাল নয়টার মধ্যে অফিসে পৌঁছান, কখন বাসায় ফেরেন তিনিই জানেন! অবশ্য তিনি―যাকে বলে কনফার্মড ব্যাচেলর―অফিস থেকে ফিরে যাবেন কোথায় ? সেও এক প্রশ্ন―তাই তার অফিস-টাইম সুনির্দিষ্ট না থাকলেও অন্যান্যদের মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। যেমন, আমরা যারা কপি রাইটিং টিমে আছি, তারা বেশিরভাগ দিনই সকাল নয়টায় ঢুকে রাত আটটার মধ্যে বেরোতে পারি। মাঝে মাঝে কাজ না থাকলে বা কাজ আগে গুছিয়ে সন্ধ্যার আগেও বের হওয়া সম্ভব, আমাদের অফিস কারাগার-আইনের মতো কঠোর নয়!

আজ বিকালের মধ্যে বেরিয়ে গোপীবাগ যাব ভেবে নিজের কাজ গুছিয়ে নিয়েছিলাম। বেরিয়ে যাব―ঠাস করে মুখের উপর একগাদা কাগজ মেলে দিলেন ইরফান ভাই। লেখো―করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার উপায়!

ইরফান ভাইয়ের বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে, পেল্লায় শরীর যাকে বলে; মাঝে মাঝে আমরা মজা করে তাকে বলি, যেভাবে তিনি শরীরে বাড়ছেন―আমাদের অফিস ঘরের দরজা ভেঙ্গে ডাবল করতে হতে না হয়! পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার ইরফান ভাইয়ের ওজন কমপক্ষে দেড়শ কেজি হবে―এ কথা একদিন অফিস-বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতে বলে ফেলেছিলাম। অফিসের ভেতর আমরা সিগারেট খেতে পারি না; প্রায়ই দলেবলে বারান্দাতেই এ কাজে ব্রতী হই আমরা―ইরফান ভাইয়ের ওজন দেড়শ কেজি হবে―শুনেই তিনি রীতিমতো রেগে ধমকে বলেন, ‘ফাজলামো করো মিয়া! দেড়শ কেজি বোঝ! তোমাদের তিনটার সমান! আরে, আমি কি রটেন মাল নাকি!’

ইরফান ভাইয়ের রাগের মধ্যেও মজা লুকিয়ে থাকে। আমরা মানে সজল ভাই, তাসনিমা আর আমি―কপি রাইটিং টিমের তিনজন―সুযোগ পেলেই তাকে রাগিয়ে দেই।

‘লাড়াও ক্যান! লাড়াইবা না আমারে কইলাম!’ ইরফান ভাই আমাদের দিকে গরম চোখে বলেন।

‘ইরফান ভাই। আপনি ভাষা দূষণ কেসে পড়ে যাবেন―ল্যাংগুয়েজ প্লিজ!’, তাসনিমা গম্ভীর মুখে বলে।

‘রাখো, তোমার ভাষা দূষণ। আমার মতো একটা ফিট মানুষকে তোমরা লাড়াও!’

অফিসের পরিবেশ বন্ধুত্বপূর্ণ। অবশ্য কাজের সময় ইরফান ভাইয়ের চোখমুখ বদলে যায়, তখন তার সাথে ঠাট্টা বা মজা করা খুব ঝুঁকিপুণ―কখন যে রেগে কী বলে বসবেন, নিজেই জানেন না। কাজের সময় আমরা বিষয়টি মনে রাখি। সজল ভাই আর তাসনিমা গুলশানে এক টেলিফোন অপারেটর কো¤পানিতে গেছে ব্রিফ নিতে। অফিসে কপিরাইটার একা আমি, করোনা ভাইরাসের বিপদ ও প্রতিকার নিয়ে নিবন্ধ লিখতে হবে!

আমি কাতর চোখে করোনা ভাইরাসের তথ্যবহুল কাগজপত্রের দিকে তাকিয়ে থাকি। ইরফান ভাই দূর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে কী বোঝেন তিনিই জানেন! কাছে এসে বলেন, ‘কোথাও যাইবার চাইছিলা মনে হয়! কেউ খাড়ায়া রইছিনি রাস্তার মোড়ে! কেঠা ?’

চমকে উঠি, ‘জ্বি, মানে। একটু―!’

‘বুঝছি। বুঝছি। ভালাই তো। এতদিনে কেউ খাড়াইলো তোমার জন্য। যাও যাও। আমি করোনা ভাইরাস লিখতিছি―যাও!’

অফিস থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে শুরু করি। সাত-রাস্তা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠে সোজা অভিসার সিনেমা হলের সামনে নেমে যাব। সেখান থেকে হাঁটা পথে গোপীবাগ থার্ড লাইনে মেজ আপার বাসা। ঢাকার বাসে চলাচল করতে আজকাল শারীরিক ফিটনেসের প্রয়োজন হয়। উবার বা পাঠাও বেশ চলছে বটে কিন্তু আমি মোটর সাইকেলে বসে নিজেকে ঠিক তালে রাখতে পারি না। চালকের ঘাড়ে-পিঠে হাত দিয়ে বসি। দু’চারবার চেষ্টা করেছি, হয়ে ওঠে না। সাত-রাস্তা থেকে অভিসার যেতে ভাড়া নেবে ছয়শ টাকা! যে বেতন পাই, এই টাকায় উবার ভাড়া দিলে আগামী কোরবানি ঈদে আমাকে গাবতলীতে তুলতে হবে! সেক্ষেত্রে আমার বাস-ই ভালো। থেমে থেমে চলবে, এটা ঠিক, বাসে তিল ধারণ দূরে থাক, সুঁই ধারণের জায়গাও থাকবে না। তারপরও বিশ টাকায় পৌঁছে যাব―এ কম কথা নয়। ভাগ্য ভালো থাকলে দুই-তিন স্টপেজ পরে বসবার সিটও মিলে যেতে পারে।

কিন্তু আজ দেখি বাস-ই নাই! জমতে জমতে বাসস্ট্যান্ডে আমরা প্রায় শ’খানেক যাত্রী জমে গেছি। প্রত্যেকে উদগ্রীব চোখে তাকাই যার যার গন্তব্যমুখী রাস্তার দিকে―যদি বাস আসে! না, শুধু যাত্রীই বাড়ে, এমন সাধারণত হয় না, দুর্ঘটনা ঘটল কোথাও! দেখি, রিকশা থেকে লাল জ্যাকেট পড়ে নামছেন সজল ভাই, তাসনিমা বোধ হয় গুলশান থেকে চলে গেছে বনানীতে নিজের বাসার দিকে, হাসিমুখে সজল ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে তার ‘পাথর মুখ’ দেখে বুঝতে পারি, এই লোক সজল ভাই নয়। আমার কাছে বিস্ময়, মানুষে মানুষে পরিচয়ের দূরত্ব―কত ব্যবধানে দাঁড়ান! এই একটুখানি―এই লোকটির সাথে আমার পরিচয় থাকলেই আমরা পর¯পর হাসিতে উদ্ভাসিত হতাম, অথচ দু’জন পাথর-মুখ করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। এই লোকও সম্ভবত মতিঝিলের দিকে যাবেন, তিনিও ব্যগ্র চোখে তাকিয়ে―যদি একখানা বাস এসে থামে!

একটি বাস এসে থামে, আমি দৌঁড়ে উঠি, আমার কপাল নির্ঘাত ভালো বলতে হবে―রীতিমতো জানালার পাশে বসবার জন্য একখানা সিট পেয়ে যাই। লাল জ্যাকেটকেও দেখি আমার পাশের সিটে বসে পড়েন, বাস পল্টন পল্টন বলে সামনের দিকে এগোয়। পরিচয় আর অপরিচয়ের একটুখানি দূরত্ব নিয়ে ভাবতে থাকি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে সোসিওলজিতে পড়েছি আমি। ইশকুলে―ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে বা কলেজে―ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে পড়বার সময় কখনও ভাবিনি, সোসিওলজি হবে আমার পড়ার সাবজেক্ট! এমনকি এই বিষয়ে পড়ে ভবিষ্যতে কী করব―পড়ার সময়ও কোনোদিন ঠিক ভেবে উঠিনি। বাবা বলতেন, বিসিএস দাও, ভাইবোনেরাও বলেছেন। শুধু তাই না, যে বাবা জীবনে কোনোদিন আমি বিশ^বিদ্যালয়ে ঠিকমতো পরীক্ষা দিয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করেননি, তিনি আমার অনার্স পরীক্ষার পর রীতিমতো মানি অর্ডার করে আটশ টাকা পাঠালেন―যাতে আমি বিসিএস পরীক্ষায় ফরম পূরণ করি। আমার লেখাপড়ার দেখভালের দায়িত্ব বাবা দিয়েছিলেন মেজ আপাকে, তার কাছেই থোক টাকা দিয়ে রাখতেন তিনি, মাসে মাসে গিয়ে মেজ আপার কাছ থেকে আমি টাকা নিয়ে আসতাম। সে বারই প্রথম বাবা সরাসরি আমাকে টাকা পাঠালেন। আমার বোঝা উচিত ছিল, বিসিএস পরীক্ষাও আমার দেয়া উচিত―কিছুই করিনি। ফরম পূরণ করেছিলাম, কিন্তু পরীক্ষার দিন শুক্রবার এমন ঘুম পেল―! ঘুম থেকে উঠে আমার আর প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য হলে যেতে ইচ্ছা করেনি। পরীক্ষা দিলেই হয়ে যেত, এমনও নয়―আমি সবকিছুতেই মাঝারি, তবে প্রিলিমিনারিতে পাশ করলে আট-দশটা পরীক্ষা দিতে হয়, ভাবতেই ক্লান্ত লাগে। আমি তাই আর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিতেই যাইনি। তখন হল থেকে মাঝে মাঝে গোপীবাগে মেজ আপার বাসায় যাই। মেজ দুলাভাই তখনই এক বিরাট মামদোবাজ; ছিলেন সোনালী ব্যাংকের মাঝারি মাপের কর্মকর্তা। হলমার্ক কেলেংকারির সাথে কিভাবে যেন জড়িয়ে যান। তার ভাষায়―‘বুঝলে শালাবাবু, ছোট মাছের বুদ্ধিও ছোট। মিনিমাম একশ কোটি টাকা এখান থেকে আমার পাওয়ার কথা। তা না―বড়রা সব নিয়ে আমাকে কিছু ল্যান্ড ধরাই দিছে। এইগুলা হলমার্কের ল্যান্ড। এখন আমার জেলে যেতে না হয়!’

পরে বুঝতে পারি, বড় ধরনের চক্রে নিতান্ত ছোট মাছ হিসেবে মেজ দুলাভাই জড়িয়ে গেছেন। বড় মাছগুলো নানাভাবে লাভবান হয়েছে, বিপদেও পড়েছে, দুলাভাই তার কোনোটার মধ্যেই পড়েননি। তবে চাকরিটা তার গেছে আর কেরানিগঞ্জের দিকে কিছু জমি তিনি কিভাবে যেন নিজের নামে লিখিয়ে নেন। এর পর চার-পাঁচ বছর ধরে, আক্ষরিক অর্থেই দুলাভাইয়ের নির্দিষ্ট কোন চাকরি, কাজ বা ব্যবসা নেই। তবে তার সাথে দেখা হলে এসব কিছুই টের পাওয়া যায় না। তিনি হাসিমুখে তার জীবনের প্রবল সম্ভাবনার কথা আমাকে বলেন, ‘বুঝলে শালাবাবু। এই হলমার্ক আমার চোখ খুলে দিয়েছে! আমি যদি তখন খালি একশ কোটির চিন্তা না করে হাজার কোটির চিন্তা করতাম, এতোক্ষণে টরেন্টোতে গাড়ি নিয়া ঘুরতাম! শালার চক্ষু ছিল আন্ধা।’

আমি আকরাম দুলাভাইকে বোঝাবার চেষ্টা করি, ‘এভাবে অনিশ্চিত জুয়া খেলায় নিজের জীবনটা জড়াচ্ছেন! ছেলেমেয়ে দুটো বড় হচ্ছে। ওরা কি ভাববে আপনাকে!’

আমার কথাবার্তাকে তিনি নিতান্ত ছেলেমানুষী বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা যখন না-চাইতেই সব হাতের মুঠোয় পাবে, তখন কোনওকিছু নিয়ে তারা আর প্রশ্ন করবে না!’

মেজ দুলাভাইয়ের সবকিছুই চূড়ান্ত ধরনের জুয়া―হলমার্কের কেলেঙ্কারিতে ক্রীড়নক হয়ে হাতে নগদ টাকাও পান, তখন তিনি গোপীবাগে দুটো ফ্ল্যাট কেনেন। একটিতে থাকবেন, আরেকটি ভাড়া দেবেন! আচমকা কী হলো, শেয়ার বাজারে নাম লিখিয়ে দু’হাতে টাকা কামাতে শুরু করেন আর বছরখানেকের মধ্যে শুনি তিনি রাস্তায় মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। প্রচুর মানুষের কাছে তার ঋণ হয়ে যায়। তখন গোপীবাগের একটা ফ্ল্যাট তাকে বিক্রি করতে হয় মানুষের কাছ থেকে নেয়া ঋণ শোধ করার জন্য। কিছু টাকা বাঁচিয়ে দু’খানা গাড়ি সেকেন্ড হ্যান্ডে কিনে উবার ব্যবসা শুরু করেন। সেই গাড়ি দুটিও বছরখানেকের মধ্যে বিক্রি করে হাউজিং ব্যবসায় লগ্নি করেন। মাঝে যতবার দেখা হয়েছে, আমার অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে মাথা দুলিয়ে হেসেছেন আকরাম দুলাভাই, ‘শালাবাবু! হাউজিং ব্যবসা মানে শুন্যের উপরে ব্যবসা। জমি থাকলে তো ভালোই, পানি দেখায়া টাকা নেয়া যায়। আমি তো জমি দেখাইতেছি। টাকা আসতেছে বানের জলের মত!

আমি তাকে আরও ভেবেচিন্তে অগ্রসর হতে বলি, ‘দুলাভাই আপনার বয়স হয়েছে। এভাবে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন ? জমি দিবেন কীভাবে ? এক জমিই কি সবার কাছে বিক্রি করতেছেন ?’ 

আবার মাথা দুলিয়ে হাসেন তিনি, ‘পত্রিকার বিজ্ঞাপন হইল এর প্রধান মুলধন। তিন-চারটা বড় বাংলা আর ইংরেজি কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দিছি, এখন শুরু হইছে ফেসবুক―ফেসবুকে ভিডিও ছেড়ে দিছি।

জাতীয় সংসদ ভবন থেকে মাত্র এগারো কিলোমিটার, ব্যস হুরমুর করে লোক এসে যাচ্ছে!’

লাল জ্যাকেট পড়া ভদ্রলোক বাসের ঝাঁকুনি খেয়ে আমার দিকে একটু কাত হয়ে পড়ে, তার মুখভঙ্গি বিব্রতকর। লোকটা মধ্যবয়স্ক, পাতলা ধাচের মাথায় চুল কম―আমাদের অফিসের সজল ভাইয়ের সাথে কোথায় যেন তার মিল আছে!  ফোনে কথা বলে ওপাশে কাউকে জানায়, সে পুরান ঢাকায় আড়তে যাচ্ছে। আরও জানায়, প্রায় ফিসফিস স্বরে, না আরও দুই-চারদিন মাল গুদামে স্টক রাখতে হবে দাম আরও বাড়বে দুই দিনে তিনশ ছুঁয়ে যাবে।

কোন মাল তিনশ ছোঁবে ? পেঁয়াজ ? এই লোক কি স্টক করে? দেখে তো পেঁয়াজের কারবারি মনে হয় না, সরকারি অফিসের কেরানি বলে মনে হয়।

আমি তার দিকে তাকিয়ে নিজের পরিচয় দিই, ‘ভাই আমার নাম মাহবুব। আমি একটা এজেন্সির কপি রাইটার। আপনি ? আপনি কি ব্যবসা করেন ?’

থতমত খেয়ে যায় লোকটি। চোখেমুখে কালো ছায়া নিয়ে বলে, ‘আমার নাম মুরাদ। আমি কাওরানবাজারে কাগজ-কলমের ব্যবসা করি।’

বলব না, বলব না করেও বলে বসি, ‘ভাই যে স্টক করতে বললেন, কাগজও আজকাল স্টক করেন আপনারা ?’

লোকটি কথা না বলে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমি বলি, ‘পিয়াজের ব্যবসায় নামছেন! আজকাল আপেলের দামে পিয়াজ বিক্রি করতেছেন, না!’

‘আপনে পুলিশের লোক! অতো কথার দরকার কি!’ লোকটি মুখ বিকৃত করে আমার দিকে তাকায়।

‘না না। আমি পুলিশের লোক না। পিয়াজের দাম এখন কত? আড়াইশো টাকা হয়ে গেছে! কারা কেনে এই পিঁয়াজ!’ হেসে আমি অভয় জানাই তাকে।

লোকটি আমাকে আর কোন কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে দুম করে উঠে দরজার দিকে চলে যায়। আসলেই চেনা আর অচেনার মধ্যে সুতা পরিমাণ দূরত্ব, আমি মোটেও তার গুদামজাত পণ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা করি না; কি করবে লোকে! এই লোককেও তো বাড়িভাড়া দিতে হয়, ছেলেপুলে ইশকুলে দিতে হয়! সেও নিশ্চয়ই আরেক গুদামজাতের খপ্পরে পড়ে আছে!

‘ধর। ধর! ধর!’ ভূমিক¤েপর মতো কেঁপে ওঠে চারপাশ।

আমাদের বাস তখন পল্টনের একাত্তর হোটেল পেরিয়ে মোড়ে এসে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ান।

কি হলো ? কি হলো ? কোন দুর্ঘটনা ?

চারপাশে বেদম হুটোপুটি, তখনও সন্ধ্যা হয়নি, আলো আছে। বাসের জানালা দিয়ে আবছা আলোয় দেখি বিশ-বাইশবছরের একটি যুবককে পাঁচ-সাত জন রিকশাঅলা হাত-পা ছুড়ে যে যেভাবে খুশি ইচ্ছেমতো পেটাতে শুরু করেছে; মুহূর্তে লোক বাড়তে থাকে―চোখের পলকে একশ-দুশ লোক জমে যায়; আমরা বুঝে উঠি, যুবকটি একটা মোবাইল ছিনতাই করেছিল; যেমন হয়, এইসব মোড়ে―থেমে থাকা বাসের জানালায় আগে থেকে ওত পেতে থাকা তরুণ টুপ করে মোবাইলটি নিয়ে ভোঁ দৌড়―এই বেচারাও তাই করেছিল। কিন্তু দুই-তিন জন রিকশাঅলা একসাথে তাকে ধরে ফেলে!

আর যায় কোথায়!

মার, মার, মার!

আমি জানালা দিয়ে দেখতে থাকি―আমার মতো আর সকলেও তাই।

সিগন্যালে থেমে থাকা প্রাইভেট কার, বাস, রিকশা, ঠেলাগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স! এর মধ্যে ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা পড়া এক যুবক! তাকে মারছে, নির্মমভাবে মারছে―চারপাশে জমা হওয়া দুই-একশ মানুষ!

কি হবে ? কি হবে ?

ছেলেটিকে কি পিষে মেরে ফেলবে!

আমিসহ আমার মতো শত শত মানুষ চারপাশ থেকে পাথর চোখে অপেক্ষায়―কি হবে এরপর! মানুষগুলো কি শুধুই একজন ছিনতাইকারীকে মারছিল! না তা নয়; এ হচ্ছে অবদমন―অসংখ্য অবদমন একজোট হয়ে নাকি আরও কিছু―

জানি না।

আমি জানি না।

গণপিটুনির শিকার হওয়া যুবকটির অর্ধনগ্ন রক্তাক্ত শরীর থেকে চোখ সরিয়ে নেই।

পুলিশ কোথায় ? রাস্তাঘাটে পুলিশ থাকে না আজকাল! যুবকটিকে পিষে মেরে ফেলবে নাকি!

আচমকা, হইহই শব্দে চমকে দেখি যুবকটি থেতলে যাওয়া মুখচোখ নিয়ে দৌড় দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে। ইতিমধ্যে তার কাপড়-চোপড়ের অধিকাংশ মারের চোটে এখন শরীরে নামমাত্র অবশিষ্ট। প্রায় বিবস্ত্র যুবকটি থেতলে যাওয়া রক্তাক্ত চোখ-মুখ-হাত-পা নিয়ে প্রাণপণে এই বাস, ওই গাড়ির ফাঁক-ফোকড় দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে দৌঁড়ে একপর্যায়ে পালিয়ে যায়!

‘গেল! গেল! গেলরে গেল―!’

মনের সুখে পেটাতে থাকা লোকগুলো মহা আনন্দে চিৎকার করে, যেন সার্কাসের এক ক্লাউন তারা পায় হাতে―মনের আনন্দে পিটিয়ে তক্তা বানায়!

কেউ কেউ সখেদে বলে, ‘হালার শইল না, জ্বীন হালায়! এত পিটাইলাম, মুখের চামড়া ভি নাই হয়া গেল, চোখ ভি একটা কানা হয়া গেল―হালায় পড়ল না মাটিত―উইঠা সোজা দৌড় দিল। মাইরে বাপ!’

ততক্ষণে ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়ে,

গণপিটুনিতে অংশগ্রহণকারী ও আমরা যারা উৎসাহী দর্শক ছিলাম, যে যার পথ ধরি।

লেখক : কবি ও কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares