গল্প : দৌড় : গার্গী রায়চৌধুরী

গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠে ঊর্মি দেখল, রাস্তায় ট্রাফিক কম। আশ্বস্ত হলো, যাক, সময়মতো পৌঁছে যাবে অফিসে, যদিও অন্যদিন এই সময়ে বেরোলে দেরিই হতো, পৌঁছতে। আজ অদ্ভুতভাবে রাস্তা ফাঁকা। তাই আশার আলো দেখছে ঊর্মি। সামনের ব্যস্ত সিগনালটাও খালি পেল। ভেবেও মনে করতে পারল না-শেষ কবে না, আটকে এই সিগন্যাল পার করেছে। দীর্ঘদিন সেলফ ড্রাইভিং এর অভিজ্ঞতায় বুঝেছে, একটা সিগন্যাল ফাঁকা পেলে পরেরগুলোয় সাধারণত আটকায় না গাড়ি। তাই যেন হয়, ঈশ্বরকে ডাকে ও। একটা মিটিংয়ে আজ প্রেজেন্টেশন আছেম তার আগে সামান্য এডিটিং দরকার। আগে পৌঁছলে সেটা করা যাবে শান্তিতে।

দুটো ব্যস্ত সিগন্যাল নির্বিঘ্নে পার করার পর, আটকে গেল ঊর্মি। সামনে কোথা থেকে একটা ভ্যান এসে দাঁড়িয়ে গেল। চলতি কথায় টেম্পো বলে যেগুলোকে। চেষ্টা করেছিল তবু কাটিয়ে বেরোতে পারল না, এমন বেয়াড়াভাবে দাঁড়িয়ে গাড়িটা। ঊর্মি খুব বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখল ভ্যানটার দুপ্রান্তের দুই রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে একজন পুরুষ ও একজন নারী। পুরুষটি ছোকরা গোছের। বয়েস সম্ভবত পঁচিশের কাছেপিঠে। মেয়েটি সেই তুলনায় পূর্ণাঙ্গ নারী। পোশাকআশাকে বোঝা যায় ওরা দুজনেই শ্রমিক। কয়েকটা ঝুড়ি কোদাল রাখা আছে ওদের পাশে। হয়তো কোথাও যাচ্ছে রাস্তা তৈরি বা মাটি কাটার কাজে।

এই মে মাসের গরমে দুজনেই এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে যেন মনে হচ্ছে ওদের চারপাশে বইছে বসন্তের হাওয়া। মাঝখানে রয়েছে কোনও ফুলের বাগান বা একটা তিরতির করে বয়ে চলা নদী। ভাবখানা এমন যেন দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল মাঠের প্রান্তে লাগান গোল পোস্টের গায়ে হেলান দিয়ে, মুখোমুখি দু’জনে দু’দিকে। পরস্পরের চোখে চোখে দারুণ গল্প জমে সেখানে।

সিগন্যাল ছেড়ে দেওয়ার পর ওদের পেরিয়ে চলে যেতে পারল না ঊর্মি। গাড়ির স্পিড কমিয়ে চলল টেম্পোর পিছন পিছন। মেয়েটার একমাথা খোঁপার ফাঁক দিয়ে বাতাস আঙুল গলিয়ে মুক্ত করেছে চুল। সেগুলো উড়ছে আকাশে যেন যৌবনের জয় পতাকা। দোহারা চেহারা, নদীর বাঁকের মতো বয়ে গেছে ভ্যানের রেলিং ধরে। ভঙ্গি বলছে, এই মেয়ে লতানে গাছের মতো দুর্বল নয়, বরং শক্তিময়ী, যেন ধারণ করার ক্ষমতা রাখে ইতিহাস, বর্তমান, ভবিষ্যৎ।

তুলনায়, ছেলেটি আনমনা এক রাখালের মতো, একচোখ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছে এক আদিম নারীর দিকে। এই পুরুষের চোখের চাওয়ায় লোভ নেই, আছে তীব্র এক মায়া। যে মায়া টেনে রেখেছে ওই তুমুল শক্তির উৎস মেয়েটিকে। ঊর্মি গাড়ি চালায় আর মুগ্ধ হয়ে দেখে ছেলেটির এক মাথা রুক্ষ ঝাঁকড়া চুল। হাওয়ার আদরে এলোমেলো, পথের ধুলো মাখা। গালে কচি ঘাসের মতো কোমল না-কামানো দাড়ি। ছেলেটির চোখের চাওয়ায় মেয়েটির মুখের ভাব বদলাচ্ছে ঘন ঘন। বিভঙ্গ পাল্টে পাল্টে আরও বেশি মোহময়ী হয়ে উঠতে চাইছে সে। বুকের আঁচল সরে গেছে অনেকটাই। ঊর্মি নিশ্চিত, ওই পুরুষ্ট বুকের গভীর বিভাজিকা স্বেচ্ছায় উন্মুক্ত করতে চেয়েছে সে ওই পুরুষটির জন্য। ছেলেটির যেন নজর নেই সেদিকে। তার মুখে অদৃশ্য মোহন বাঁশি। পেটানো মেদহীন শরীর নিয়ে সে, ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে ভ্যানের রেলিং ধরে।  মুখে আলগা হাসি লেগে আছে।

ঘড়ির কাঁটায় আর চোখ নেই ঊর্মির, মনে নেই সময়ের কথা যা কিনা নির্ধারণ করে থাকে ওর জীবন। ভ্যানের পিছনে যেতে যেতে ও ভাবছিল ওরা হয়তো স্বামী স্ত্রী নয়, হয়তো প্রেমিক প্রেমিকাও নয়। হয়তো আজই দেখা হয়েছে ওদের। ঠিকাদার, দু’জনকেই নিয়ে যাচ্ছে মাটি কাটতে কোথাও ? ঊর্মির মনে হলো, ওরা এখনও বন্ধনহীন। 

হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে গেল ভ্যানটা। অন্যমনস্ক ঊর্মি সামলাতে পারল না। গাড়ি সজোরে গিয়ে ধাক্কা মারল ভ্যানটার পিছনে। স্টিয়ারিং জোরে এসে লাগল ঊর্মির বুকে, মাথায়। মাথাটা ফেটে গেল কি ? কি যেন পড়ছে কপাল বেয়ে। ভ্যানের ড্রাইভার ছুটে এসেছে। কি হলো ম্যাডাম সিগন্যাল খেয়াল করেননি ? আমি তো দাঁড়ালাম, আপনি মেরে দিলেন ? ঊর্মি কোনওমতে গাড়ির দরজা খুলল। দেখল ওই শ্রমিক ছেলেটি-মেয়েটি ভীষণ উদ্বেগে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সেই মুহূর্তে ঊর্মির মনে হলো ওদের সুন্দর সময়টা ওর জন্য নষ্ট হয়ে গেল। দুটি গাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত। শরীরে অসহ্য ব্যথা, ও হাত বাড়িয়ে দিল ড্রাইভারের দিকে। ‘আমাকে বার করুন। হসপিটালে যেতে হবে …’ ।

পুলিশের সাহায্যে হাসপাতালে ভর্তির অনেক পর সন্ধ্যের দিকে একটু ধাতস্থ হলো ঊর্মি। দেখল অফিস কলিগরা ঘিরে আছে ওকে। চোখ যাকে খুঁজছিল তাকে আশেপাশে কোথাও দেখতে পেল না ও। উদ্বিগ্ন বন্ধুরা পাশে থাকার আশ্বাস জানিয়ে একে একে চলে যায় ঊর্মি শুয়ে ছিল চোখ বন্ধ করে। নড়াচড়া করতে পারছে না। স্যালাইনের সূচ বিঁধে আছে হাতে। পাশ ফেরার চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝল অসম্ভব। তাবে কি হাড় ভেঙেছে ? এখানে এসেই এক্স-রে হয়েছে। রাতে ডাক্তার বাবু এলে বলতে পারবেন ফ্রাকচার হয়েছে কিনা।

এত যন্ত্রণার মধ্যেও বন্ধ চোখের আড়ালে ওই লেবার ছেলে মেয়েদুটোকে আরেকবার দেখতে চাইল ঊর্মি। কি বোকা ও, ভ্যানটার পিছু নিতে গিয়ে কি কাণ্ড বাধাল। অফিসের কাজ ছেড়ে পাগলের মতো কেন ওদের দেখছিল ঊর্মি ? নিজের কাছে এখন উত্তর দেওয়ার সময়। কিন্তু কথা ছিঁড়ে গেল অনিন্দ্য এসে পড়াতে।

মিটিং সেরে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল, ঊর্মি।

কিন্তু এখন তো ভিসিটিং আওয়ার্স শেষ হয়ে গেছে, ঢুকতে দিল তোমাকে ? ঊর্মি জিজ্ঞেস করল।

আমার জন্য স্পেশাল পার্মিশান আছে। হসপিটালের মালিক তোমার বরের ক্লায়েন্ট, ঊর্মি। আমাকে কেউ আটকাবে না। অনিন্দ্যর গলায় অহং।

ঊর্মি আলতো করে হাসল। সত্যি, এমন সফল স্বামী যার, তার আর চিন্তা কি ?

তুমি  অ্যাক্সিডেন্টটা বাঁধালে কি করে, বল ত। অন্যমনস্ক হয়েছিলে নিশ্চয়ই, কি এত ভাব ? কতদিন বলেছি ড্রাইভার রাখো, তা না। অনিন্দ্যর গলার স্বরে বিরক্তি। তুমি তো জানো আমার শিডিউল, কাজ ফেলে আমার পক্ষে কি রোজ রোজ হসপিটালে আসা সম্ভব ?

ঊর্মি গলা স্বাভাবিক রেখে বলল, তোমাকে আসতে হবে না। আমার বন্ধুরা তো আসবে।

―হ্যাঁ, ঊর্মি, আমার কিন্তু রোজ আসার উপায় নেই। আমি ডাক্তারদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে নেব। চিকিৎসার কোনও ত্রুটি হবে না। বাট ফিজিক্যালি ইটস নট পসিবল ফর মি টু কাম অ্যান্ড সি ইউ এভরিডে।

ঊর্মি শান্ত গলায় বলল,―সেটা আমি জানি অনিন্দ্য। এখন ভিসিটিং আওয়ার্স শেষ, ফিমেল ওয়ার্ড তুমি এসো। ফোনে কথা হবে।

অনিন্দ্য চলে গেলে ঊর্মি দেখল, বহুদিন পর ওর চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে নামছে নিচের দিকে। হাত তুলে চোখ মোছার সাধ্য নেই। ঊর্মি হেসে ফেলল। কতদিন পর কান্না এল। সেই কবে থেকেই তো ও আর অনিন্দ্য ওদের নিজেদের জগৎ নিয়ে থাকে। দিনের পর দিন দু-একটা কাজের কথা ছাড়া আর কোনও কথাই হয় না দু’জনের। একই ফ্ল্যাটে আলাদা ঘর, আলাদা আলমারি, আলাদা বিছানা, আলাদা ফুড হ্যাবিট, আলাদা মন নিয়ে বছরের পর বছর ওরা আছে একসঙ্গে, লেজিটিমেট স্বামী-স্ত্রী হয়ে। বিদেশে পড়তে যাওয়া সন্তানের লেজিটিমেট মা বাবা হয়ে।

অনিন্দ্য একটা কথা প্রায়ই বলে, ইউ হ্যাভ টু চেজ ইওর ড্রিম। ঊর্মিও তো আজ চোখ ফেরাতে পারছিল না, এক জোড়া মানুষ, নাকি একটা স্বপ্ন ? কীসের পিছনে ছুটতে গিয়ে এমন ক্ষতবিক্ষত হয়ে ও শুয়ে আছে হাসপাতালে ?

ঊর্মি চোখ বুজে ফেলল। বন্ধ চোখের একান্ত ঘন অন্ধকার জগৎ ওকে আবার দেখাতে পারে সেই ঝাঁকড়া চুল, মায়াময় চোখ আর এক চিরকালীন প্রেয়সীকে। মন ভরে দেখতে লাগল ঊর্মি সেই দৃশ্য যা তাকে পৌঁছে দিয়েছে এই হাসপাতালের বিছানায়। অনিন্দ্য ঠিকই বলে, ‘ওয়াট এভার দ্য সিটুয়েশান মে বি ইউ হ্যাভ টু চেজ ইওর ড্রিম’। ঊর্মিও এই স্বপ্নটা বুকে বাঁচিয়ে রাখবে। হয়তো অন্য কোনও দিন আবার এক মায়াবী চোখ ধরা দেবে ওর কাছে।  

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares