গল্প : ধুলোউড়ির মাঠ : গৌতম বিশ্বাস

আজকাল চোখ বুজে হাজার চেষ্টা করলেও ঘুম আসতে চায় না অনিমার। শুয়ে পড়লেই রাজ্যের ভাবনারা এসে ঘিরে ধরে। সামনে বড়ই কঠিন দিন। কী করে যে মেয়েটাকে বাঁচাবে। কতটুকুই বা বয়স ওর। এই সবে চার পেরিয়ে পাঁচে পড়ল। খিদেটা সারাদিন ওর পেটে কেবল খাই খাই করে। অনিমা কতই না বুঝিয়েছে ওকে, ‘অত খাতি চাসনে রে মা। এত খাবার আমি কোন থে দেব ক’দিনি ?’

   মায়ের অবস্থা বোঝে না মেয়ে। সে কেবল খেতে চায়। তবে একটাই যা ভালো―বাসি, পানতা যাই হোক কিছুতেই মেয়ের অরুচি নেই। এক চিমটে নুন দিয়ে মেখে দিলেই  হলো। গপ গপ করে গিলে নেয় সব। বুড়ি ক্ষান্তমনি বলে, ‘দেহিছো ক্যামন নক্কি মেইয়ে। আমার পরান নক্কি জম্ম দেছে।’

   হ্যাঁ, লক্ষ্মীই বটে। কেমন যে লক্ষ্মী সে তো অনিমাই ভালো বোঝে। জন্মের বছর খানেক পেরোতে পারল না বাপটা মরে গেল। আগে যা হোক কিছু না কিছু একটা করে সংসারে দু’টো পয়সা আসত। দু’বেলা উনুন জ্বলত বাড়িতে। গরম ভাতের গন্ধে বেশ একটা ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ত সারা বাড়ি। আর এখন―নিত্যদিন আধপেট খেয়ে কেবল বেঁচে থাকা। একে সত্যিই কী বেঁচে থাকা বলে ?

এখন যত দায় কেবল একা অনিমার। যাওয়ার সময় নারান তো তার হাতখানি ধরেই বলে গিয়েছিল, ‘সোংসারডা দেহে রাখ্যো। ওগের আমি তুমার উপর ছেড়্যে গেলাম।’

বলতে বলতে একবার মায়ের দিকে, একবার মেয়ের দিকে তাকিয়েছিল নারান। বুড়ি ক্ষান্তমনি তখন ছেলের ভাব সাব দেখে আছাড়ি পাছাড়ি কান্না শুরু করে দিয়েছে। মেয়ে তো কিছুই বোঝে না। মায়ের কোলে বসে সে ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল চেয়ে আছে বাপের দিকে। অনিমার চোখভরা জল। মুখে বাক্যি সরে না। ক’দিনের মাত্র সংসার। গা থেকে বিয়ের গন্ধটুকুও বোধ করি যায়নি। দাঁতে ঠোঁট চেপে নিশ্চুপ তাকিয়ে ছিল নারানের মুখখানির দিকে। এই মানুষটাকে নিয়ে কতই না স্বপ্ন ছিল তার। ভেবেছিল দু’জনে মিলে আয় উন্নতি করে সংসারের হাল ফেরাবে। টালির ছাউনি দেওয়া ঘরখানি পাল্টে নতুন ঘর দেবে। টিনের বেড়া। টিনের চাল। ঘরের সামনে থাকবে ফালি উঠোন। উঠোনের কোণে তুলসির গাছ। সন্ধ্যেবেলায় প্রদীপ জ্বালবে যার গোড়ায়। ঘরের পেছনে নিতাই সাহার যে ফালি জায়গাটুকু পতিত পড়ে আছে টাকা জমিয়ে ওটুকু কিনে নেবে। নিজেদের একফালি জমি হবে। বেগুন, লঙ্কা, ডাটা, উচ্ছের গাছ লাগাবে তাতে। সারাবছর সবজি ফলাবে সেখানে। সেই সবজি নিয়ে বেচে আসবে নিশ্চিন্দিপুরের হাটে। সদ্যই তখন জন্মেছে মেয়েটা। সেই মেয়ের মুখখানির দিকে তাকিয়েও কত স্বপ্ন। মেয়ে বড় হবে। ভালো ঘর, ভালো বর দেখে তার বিয়ে দেবে। যেখানে গোয়ালভরা গরু। খেত ভরা ফসল।

না, স্বপ্নটা বেশিদিন দেখতে পারেনি অনিমা। ভরা বর্ষার এক সন্ধ্যায় তিন দিনের জ্বরে ভোগে স্বামীটা তার―

ভাবতে গেলেই ডুকরে কান্না আসে। চোখের জলে মুখ গড়িয়ে বুক ভেসে যায়। ছোট্ট মেয়েটা অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ও মা, কান্দো ক্যান ? কী হইচে তুমার ?’

চোখের জল মুছে মেয়েকে বুকে আঁকড়ে ধরে অনিমা, ‘কিছু হয় নাই রে মা।’

মেয়ে ফের জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলি কান্দো ক্যান ?’

‘কই কান্দি ? কেডা কইছে কান্দি ?’

‘কান্দো না ?’

‘না।’

‘তাহলি তুমার চোক্ষে জল ক্যান ?’

‘চোক্ষে কী য্যান এট্টা ময়লা পড়ছে মা।’

‘তুমার চোক্ষে খালি ময়লা পড়ে, না মা ?’

‘হ রে মা। খালি ময়লা পড়ে। সারাদিন কাম করি তো। কহন কী ময়লা যায়।’

‘আচ্ছা মা―’

‘কী মা ?’

 ‘বাবায় কবে আসপে ?’

মেয়েকে বুঝিয়ে রেখেছে অনিমা তার বাপে কাজ করতে বিদেশ গেছে। বহুদূরের পথ। তাই আসতে পারে না। তবে আসবে। আসার সময় কত কিছু নিয়ে আসবে মেয়ের জন্য। মায়ের কথা বিশ্বাস করে মেয়ে পথের দিকে তাকায়। অপেক্ষা করে বাপ আসার। কিন্তু বাপ আসে না। তার অপেক্ষা বেড়ে চলে। থেকে থেকে তাই এমন করেই মায়ের কাছে জানতে চায় তার বাবার আসার কথা।

মেয়ের কথায় আকাশ দ্যাখে অনিমা। আকাশে ভেসে যাওয়া খণ্ড মেঘ দ্যাখে। মেঘের নিচে ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখি দ্যাখে। আর দ্যাখে হা করে গিলতে আসা খাঁ খাঁ শূন্যতাকে। দেখতে দেখতে হারিয়ে যায় মুখের কথারা। হারিয়ে যায় বুঝি অনিমাও। তার মনে পড়ে সেই সব দিনগুলো। নতুন যখন বৌ হয়ে এই সংসারে এল সে। কি এক ভালোলাগা এসে সারাক্ষণ ঘিরে রাখত তাকে। ছোট হোক, তবু নিজের একটা বাড়ি। নিজের ঘর। নিজের একজন মানুষ। কতই না ভালোবাসত মানুষটা তাকে। সারাদিন মাঠে মাঠে কাজ করে, সন্ধ্যেবেলায় ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে, ঘরের দাওয়ায় বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে গুনগুনিয়ে গান ধরত যখন, এক অন্য রকমের ভালোলাগায় বিভোর হয়ে যেত অনিমা। তালপাতার চাটাইটা পাশে টেনে নিয়ে বসে সে বলত, ‘অমন গুনগুনায়ে গাও ক্যান ? ভালো কইরে গাও।’

গান থামিয়ে ঘুরে তাকাত নারান, ‘তুমি শুনবা ?’

‘হঃ, শোনব।’

‘তাহলি শোনো।’

বলে অনিমার দিকে ফিরে গলা ছেড়ে গান ধরত নারান, ‘আমার সাধের এ ঘর সাধের সোংসার/সাধের বসত ভিটে―’

সন্ধ্যেবেলার অন্ধকারটা ততক্ষণে গাঢ় হয়ে ঘিরে নিয়েছে চারপাশ। আকাশের গায়ে ফুটে উঠেছে লক্ষ তারার ঝাঁক। একফালি চাঁদও উঠে এসেছে এক কোণে। গুচ্ছের জোনাকি আলো জ্বালতে বেরিয়ে পড়েছে ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে। ঝিঁঝিঁর ডাকে চারপাশে এক অন্য রকমের পরিবেশ।

 বিভোর হয়ে গান শুনতে শুনতে অনিমা ভুলে যেত উনুন ধরানোর কথা। এক সময় গান থামিয়ে নারান বলত, ‘রান্নার কথা দেহি ভুল্যেই গেছ। অহন আর গান না শুন্যে যাও, চাড্ডি গরম গরম রান্না করো। প্যাটে সমায় মতন দু’ডো না দিলি শরীর সবে ক্যান ?’

উঠে গিয়ে উনুনে হাঁড়ি চড়াত অনিমা। এক সময় গরম ভাতের গন্ধে ভরে যেত সারাটা বাড়ি। সেই গন্ধ বুক ভরে নেওয়ার জন্য এক একদিন চাঁদ এসে ঝুলে থাকত নিতাই সাহার বাঁশঝাড়ের মাথায়। তারপর পেট ভরে খাওয়া। মন ভরে কত আদর সোহাগ।

ভাবতে গেলেই কান্নারা এসে জড়ো হয় অনিমার দু’চোখে। তারপর তা নেমে আসে মুখ বেয়ে বুকে। চোখের জলে বুক ভেসে যায়। যা দেখে হাজারো প্রশ্ন মেয়ের।

আজকাল তাই দিনের বেলা অতীতটাকে জোর করে চাপা দিয়ে রাখে অনিমা। কিন্তু যখন দিন ফুরিয়ে রাত নামে, রাতের আঁধারে ঘিরে নেয় চারপাশ, নিঃঝুম হয়ে আসে সারা বাড়ি, তখন বেরিয়ে আসে অতীত। বেরিয়ে আসে সে সব দিন যাপনের স্মৃতি। নারানের মুখ। ঘুম আসে না অনিমার। সে কেবল কেঁদে চলে। তার সে নীরব কান্নায় ক্রমশ ভারী হয়ে আসতে থাকে রাতের আঁধার।

আজও ঠিক তেমনি করেই কাঁদছে অনিমা। কেবল অতীত নয়, আগামীর কথা ভেবেও সে কাঁদছে। সামনে আরও কঠিন দিন। ধানকাটা মরশুম প্রায় শেষ হয়ে এল।এখনও তবু এর ওর বাড়িতে এটা ওটা কাজ পড়ে আছে। যা করে দিয়ে যা হোক কিছু আসছে। তা দিয়ে দু’সের চাল, খানিক নুন, তেল, হলুদ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জমছে না কিছুই। এদিকে সামনেই বর্ষার মরশুম। একবার নামা শুরু হলে তা থামতে থামতে আর শরতের মাঝামাঝি। তখন তো মাঠ, ঘাট, নদী, নালা ভর্তি কেবলই জল। কাজ কোথা ? কীভাবে দু’টো পয়সা আসবে হাতে ? কীভাবে চলবে সংসার ? কীভাবে ছোট্ট মেয়েটার মুখে দু’টো ভাত তুলে দেবে ? তার ওপর ওই বুড়ি শাশুড়ি। সেও তো অনিমার মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকে দু’বেলা।

এ গাঁয়ে এমন অবস্থা যে একা অনিমার―তা নয়। তার মতই আরও জনাকয়েক আছে। কিন্তু তারা যা হোক কিছু একটা করে সংসারটা ঠিক চালিয়ে নিচ্ছে। আড়ালে আবডালে কত কিছুই না করে তারা। কেউ কিছু বলতেও সাহস পায় না তাদের। বলতে গেলে সেই একই কথা, ‘তুমার খাই না পরি যে কথা শুনাতি এয়েছ ? ‘তারা পারলেও অনিমা অবিশ্যি তেমন করে পারে না। কোথায় যেন একটা বাঁধে। নারানের মুখখানি এসে সামনে দাঁড়ায়। বলে, ‘তুমি এমনডা কইরো না গো।’

না, করে না অনিমা। দীর্ঘশ্বাস টাকে বুকের ভেতরে চাপা দিয়ে রেখে মেয়ের মুখখানির দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার নতুন কোনও উপায় খোঁজে।

কিন্তু ক’দিন ধরেই একটা ভাবনা ভেতর থেকে কেবলই ভাবাচ্ছে তাকে।

ভাবনাটা মাথার মধ্যে এমনি থেকে আসেনি। ওটা মাথায় দিয়েছে ও বাড়ির বুড়ি শ্যামাদাসী। সেদিন অনিমার দাওয়ায় বসে কথা বলতে বলতে বলেছিল, ‘বুঝলি বৌ, সে হলো গে ধানের রাজত্বি। সারা মাঠ জুড়্যে পালা দেওয়া আঁটি বান্ধা ধান। আমরা তো দিনির বেলা যাই। জমির থে ছড়ায়ে ছিটায়ে থাওয়া ধান কুড়োয়ে আনি। সগগলে কী আর তাই করে ? কত জন রেতের বেলা যায়। তাগের কুড়োবার ঝক্কি নাই। ওই সপ পালার থে বার কইরে নেয় যে যার মতন।’

চোখ জোড়া কপালে তুলে অনিমা বলেছিল, ‘কও কী খুড়ি ? কেউ দ্যাহে না?’

‘কী যে কস বৌ। রেতের আন্ধারে দ্যাকপে কেডা ? আর অত বড় মাঠ। পালা কী আর এট্টা দু’ডো ? খালি চোখ কান খোলা রাকতি হয়। তাহলি আর কুনো ভয় নাই।’

‘তুমি গেছো নেকি কুনো দিন ?’

‘না রে মা, না। রেতের বেলায় আমি ভালো চোক্ষে দেহিনে। তার ওপর সনঝে লাগলিই আমার আবার ঘোম পায়। তাই দিনির বেলা যা পাই কুড়োয়ে আনি।’

‘অনেক ধান ?’

‘হ রে মা, অনেক ধান।’

সেদিন থেকেই ভাবনাটা গেড়ে বসতে শুরু করেছিল মনে। চোখের সামনে ভেসে উঠতে শুরু করেছিল দিগন্ত বিস্তৃত এক আঁধারঘেরা মাঠ। সারি সারি ধানের গাদা। পাকা ধানের গন্ধ। অখণ্ড নির্জনতা।

কাঁদতে কাঁদতে আজও ফের একবার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ধুলোউড়ির মাঠ। ধানের গাদা। জন মানবহীন অরক্ষিত প্রান্তর।

আর সিদ্ধান্তটা নিয়েও নিল তক্ষুনি। চোখের জল মুছে দরজার ঝাপটাকে আস্তে করে একপাশে সরিয়ে রেখে সন্তর্পণে ঘর থেকে বেরিয়ে এল অনিমা। দাওয়ার এক কোণে রাখা বাঁশের চটায় বোনা ঝুড়ি আর বস্তাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। মুহূর্তে একরাশ আঁধার আর সীমাহীন নির্জনতা এসে ঘিরে নিল তাকে। একবার সামনের দিকে তাকাল সে। একবার আকাশের দিকে। কত রাত হলো কে জানে। নিশ্চয়ই অনেক রাত। সন্ধ্যেবেলায় যে তারাগুলোকে দেখেছিল পূবের আকাশে উঠে আসতে এখন সেগুলো এসে দাঁড়িয়েছে খাড়াখাড়ি মাথার ওপর। একফালি সরু কাস্তের মতো যে চাঁদটা পশ্চিম আকাশে ছিল সে কখন ডুবে গেছে। আকাশ জোড়া আঁধারের মাঝে কেবল কতগুলো তারার নিঃঝুম উপস্থিতি। চারপাশে ঝোপঝাড়ের গায়ে তাই কেবলই আঠাল আঁধার। উড়ন্ত জোনাকির ডানায় ক্লান্তির জড়তা। ঝিঁঝিঁর ডাকও বুঝি থেমে গেছে।

 অনিমাদের বাড়ি থেকে ধুলোউড়ির মাঠ খুব বেশি দূরে নয়। আবার খুব বেশি কাছেও নয় মোটেই। যেতে যেতে রাতটা তাই আরও গভীর হয়ে এল। মনে হলো চারদিক যেন এক হিংস্র নির্জনতায় ঢাকা পড়ে গেছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই। একটু ভালো করে কান পাতলেই বুঝি শোনা যাবে পৃথিবীর স্পন্দন। আচ্ছা, পৃথিবীর কী প্রাণ আছে ? প্রশ্নটা একবার উঁকি দিয়ে যেতেই হাসি পেল অনিমার। ধুর, পৃথিবীর আবার প্রাণ থাকে নাকি ? এ তো কেবল একদলা মাটি। ভাবতে ভাবতে একবার আকাশের দিকে তাকাল সে। জ্বলজ্বলে তারাগুলো যেন অনেকটা নিচে নেমে এসে ঝুলে আছে আকাশের গায়ে। এমনটাই মনে হলো অনিমার।

হাঁটছে অনিমা। হাঁটতে হাঁটতে গাঁয়ের সীমানা পেরিয়ে অনেকখানি দূরে চলে এসেছে সে। তার চারপাশে এখন কেবল আঁধারঘেরা শূন্যতা। পায়ের নিচে অসমান মাটি। কেটে নেওয়া ধানের গোড়া। আর চতুর্দিকে ছড়ানো আলপথ। আঁধারের ভেতরেও কেমন একটা আলো আলো ভাব। বেশ কিছুটা দূর পর্যন্ত অল্প স্বল্প দেখা যায়। সেই আলোয় পথ দেখে চলতে লাগল অনিমা। এই সেই ধুলোউড়ির মাঠ। যে মাঠে কত দিন কাজ করতে এসেছে নারান। তার মুখেই নামটা শুনেছে সে। একটা সময় নাকি চাষবাস কিছুই হতো না মাঠে। তার বুকজুড়ে তখন কেবল শুকনো বালির ছড়াছড়ি। চোত-বোশেখের কালবৈশাখীর হাওয়ায় সে বালি এমন করে উড়তে শুরু করত যে মনে হতো আকাশের মেঘ যেন নেমে এসেছে পুরো মাঠটার ওপর। আর শুধু কালবৈশাখীই বা কেন। একটু হাওয়া দিলেই ধুলো উড়ত। ধুলো মানে শুকনো বালি। খড়কুটোর অবশেষ। আগাছার শুকনো পাতা। তাই তো মানুষের মুখে মুখে মাঠটার নাম হয়ে গেল ধুলোউড়ির মাঠ। চারপাশের গ্রামগুলোর কাছে এ যেন এক বাড়তি পরিচিতি। কতদিন অনিমা আসতে চেয়েছে এই মাঠে। নারান কেবলই বলেছে, ‘সমায় কইরে নে, যাবানে একদিন।’

অনিমা বলতো, ‘কবে তুমার সমায় হবেনে কও তো ?’

‘হবেনে, হবেনে। অত উতলা হও ক্যান ?’

‘হব না ? কতদিন হইয়ে গেল বে হইয়ে আইছি। নে গেছ একদিন ? সারাদিন বাড়িৎ থাকতি ভালো লাগে কারুর ? না, আমারে তুমি তাড়াতাড়ি নে চলো। সগগলের মুখি খালি মাঠডার নামই শুনি। অথচ গেলাম না আজও। না, আর না। আমি ধুলোউড়ির মাঠ দেকতি যাব।’

‘ঠিক আছে, নে যাবানে।’

‘খালি তুমি আর আমি যাব কিন্তুক।’

‘আচ্ছা।’

নারান কথা দিয়েছিল অনিমা যেদিন আসবে সেদিন নারানও থাকবে তার সঙ্গে। অথচ আজ যখন অনিমা এল তখন নারান নেই। তার দেওয়া কথাগুলোও পালিয়ে গেছে এমনই রাতের আঁধারে।

নারানের কথাটা মনে পড়তে আচমকাই একটা শিহরণ খেলে গেল শরীরে। আঁধারঘেরা রাত্রির নির্জন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে স্পষ্টই যেন নারানের গায়ের গন্ধ পেল সে। আর কেমন যেন কাছেপিঠে কোথাও একটা কারও শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। থমকে দাঁড়িয়ে গেল পা দুটো। দাঁড়িয়ে পড়ল অনিমা। নিঃশ্বাসটা কেমন ভারী হয়ে এল তার। কেমন এলোমেলো হয়ে আসতে লাগল ভাবনারা। কী করবে বুঝে ওঠার আগেই চোখে পড়ল সামনেই বেশ বড়সড়ো একটা ধানের গাদা। তার পাশে আর একটা। তার পাশে আরও এক। দারুণ একটা ভালোলাগা এসে মনটা ছুঁয়ে যেতেই এগিয়ে গেল সে। তারপর ভালো করে চারপাশে আরও একবার দেখে নিয়ে ঝুড়ি, বস্তা কাঁখ থেকে নামিয়ে রেখে ধান ঝরানোয় মন দিল অনিমা।

নির্জনতা যত নিখাদ হয়ে আসতে লাগল, তারাদের চোখে নামতে লাগল ঘুমের ভার, রাতের প্রহর বাড়তে লাগল আপন গতিতে, সঙ্গে আনা বস্তাটা ততই ভরে উঠতে লাগল অনিমার। আর ততই চোখে ভেসে উঠতে লাগল আগামী দিনের টুকরো টুকরো কিছু সুখের ছবি। কাঠের আগুন। গরম ভাত।

দৃশ্যগুলো যখন আরও বেশি করে চেপে বসতে শুরু করেছে চোখে তখনই নিচের দিকে ‘হিসস্’ করে শব্দ আর পায়ে তীব্র একটা সূচ ফোটার যন্ত্রণা। চমকে উঠল অনিমা। সেই সঙ্গে তীব্র যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে এল মুখখানি। বিস্ফারিত চোখে নিচের দিকে তাকাল। স্পষ্টই চলে যেতে দেখল সরিসৃপটাকে।

পড়ে রইল ঝুড়ি। পড়ে রইল ধান। প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল অনিমা। গ্রামটাকে যেন বড় বেশি দূর মনে হচ্ছে তার। আরও একটু গতি বাড়াল পায়ে। অমনি আলপথে বেঁধে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল সে। প্রাণপণে ওঠার চেষ্টা করল। পারল না। সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে বিষ। অসাড় হয়ে আসছে দেহ। চেতনায় কীসের একটা ঘোর। বড়ো বেশি ঘুম পাচ্ছে তার। তার মধ্যেও স্পষ্ট ভেসে উঠছে তাদের ছোট্ট বাড়িটা। টালির ছাউনি দেওয়া কুঁড়েঘর। ফালি উঠোন। তুলসির গাছ। গনগনে আগুনে ভর্তি হাঁ মুখো উনুন। গরম ভাতে ভর্তি হাঁড়ি। আর সবকিছু ছাড়িয়ে মেয়েটার মুখ।

চিৎকার করে মেয়ের নাম ধরে ডাকতে গেল অনিমা। কেবল ফ্যাঁসফেঁসে কিছুটা আওয়াজ বেরোল। সঙ্গে একটু বাতাস। দু’হাতে খামচে ধরতে গেল মাটি। পারল না। দু’ফোটা জল গড়িয়ে নামল দু’চোখে।

ধুলোউড়ির মাঠ তখন আরও একটা জীবন নিতে পারার আনন্দে বিভোর।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares