গল্প : মরমে পরম : শেখ লুৎফর

ব্যক্তিজীবনে জীবাত্মার প্রভাব পড়লে ধনলিপ্সা তাকে অন্ধ করে ফেলে। টাকা-পাগল মানুষগুলা তখন মাংসাসী জন্তুর মতো আচরণ করে। সময় বিশেষ খুনি, তস্কর হতেও পিছপা হয় না। আজ পৃথিবীজুড়ে এদের রাজত্ব। এরা অ্যামিবার মতো বহুরূপী। খুব সহজেই এরা আমজনতার মন জয় করতে পারে। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীরে তারা শেকড়-বাকড় ছড়িয়ে নিজেদের মতো করে গুছিয়ে বসেছে।      

উদ্ভিদকে আঘাত করলে সে নীরবে কাঁদে; তার রক্তপাতও হয়। আমরা বলে থাকি গাছের কষ ঝরছে। মানুষকে আঘাত করলে কমবেশি সকলেই কাঁদে। আবার কেউ কেউ কাঁদে না। কষ্ট হজম করতে ভেতরে ভেতরে প্রাণপণ লড়াই করে। কষ্টের এই অনুভব থেকে অনেকে মানবিক হয়ে ওঠে। সংসারের সমস্ত সৃষ্টির মাঝে শান্তি ও কল্যাণ খোঁজে। দশজনের সুখকে নিজের সুখ মনে করে তৃপ্তি পায়। সম্ভবত একেই বাউলেরা মানবধর্ম বলে মানে। 

কনক বসা থেকে উঠে পড়ে। সেই দুপুর থেকে ট্রেনের জন্য প্লাটফর্মে অপেক্ষমাণ মানুষের দিকে তাকায়। মানুষের চোখমুখ দেখতে দেখতে তাদের মনের ভেতরটা সে তালাশ করতে চেষ্টা করে। সম্ভবত খোঁজাখুঁজির এই পথটাকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘গভীর নির্জন পথে।’

কনকের সঙ্গে একটু পরিচয় হওয়া দরকার। অই যে স্টেশনের দুই নম্বর প্লাটফর্মে একহারা গড়নের লম্বা একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। যার চোখে চশমা, মাথা ভরতি এলোমেলো চুল, গালে চার-পাঁচ দিনের না-কাটা দাড়ি, কাঁধে ক্যানভাস কাপড়ের একটা ব্যাগ, সে একটা এনজিওতে কাজ করে। নাম কনক। তার পরিচয় ও অতীত জীবন নানান জটিলতায় ঠাঁসা। তাই সে হতাশ হয়ে মরমি পন্থায় জগৎ-জীবনের তাৎপর্য সন্ধান করে। একটি গল্পের জন্য এইটুকু হলেই চলবে। কারণ ছোটগল্পের শুরু কিংবা শেষ বলতে কিচ্ছু নেই। গল্পের গঠন-কাঠামোও নির্ভর করে ভাব ও বিষয়ের ওপর। অর্থাৎ স্বভাবে সে স্থিতিস্থাপক। সময় মোতাবেক অ্যামিবার মতো চেহারা বদলায় বলে বহুবর্ণা আর ইঙ্গিতধর্মী। এই যে আপনি এই লেখাটা পড়ছেন এখন যদি আপনার পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে ? কিংবা পড়শি বাড়ির ষোড়শী মেয়েটি তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাবার সময় যদি আপনি দেখে ফেলেন ? চোখ বুজে একটু ভেবে দেখুন তো এই দুই-একটি শব্দের চারপাশে গল্পের কত সম্ভাব্য মুখ উঁকি মারছে! এই তো ছোটগল্প।

কনক চেয়ে চেয়ে মানুষের ভোগান্তি দেখে। ইংরেজ আমলে বানানো স্টেশানের ধারণ ক্ষমতার চাইতে চল্লিশগুণ মানুষ উপস্থিত আছে। বসা তো দূরে থাক দাঁড়ানোর মাটি নেই। সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের কারণে মানুষের ভোগান্তি, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তায় দিনে দিনে মানুষের মন বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কনকের মনে পড়ে সিলেটের সেই পাহাড় কাটা শ্রমিকদের কথা। ওদের সবকিছুতেই ‘এখন আছে তো তখন নাই’ এই রকম একটা ভাব। তাদের চোখে জীবন, সামনে থালার ভাতের মতো। তাই হয়তো তারা গলা ফাটিয়ে গাইতে পারে :

‘কফালর মা রে চুদি চলছে গাড়ি যাত্রাবাড়ী,

এই জীবনে যা যোয়াইলাম সব খোয়াইলাম খানকিবাড়ি।’

সুনামগঞ্জ থেকে বাউল মকদ্দস আলম উদাসীর সাক্ষাৎকার নিয়ে আসার পর থেকে কনক আরও শুকিয়েছে। জোরে বাতাস দিলে তার হ্যাংলা-পাতলা শরীরটা এখন উড়িয়ে নিতে পারবে। মাথার চুলগুলো বেশ লম্বা লম্বা। বিষণ্ন চেহারার মানুষটা এখন খুব নিঃশব্দে চলাচল করে। সব সময় উদাস চোখের দৃষ্টিতে ভাবনার ছায়া। একটা সিগারেট ধরিয়ে কনক আবার ভাবনায় মগ্ন হয় : মানুষ সব সময় নিজের চোখে নিজেকে দেখতে ভালোবাসে। তাই তার মনে শুধু ‘আমি’। দুনিয়ার সব আমার চাই। আমারচে বড় কে ? আমিত্বের এই অগভীর গর্তে দাঁড়িয়ে মানুষ তার পায়ের তলার মাটিকে করে  তোলে কর্দমাক্ত, চারপাশটা হয়ে ওঠে অসহ্য দুর্গন্ধময়। সে যদি অন্তত জীবনে একবার অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে পেত তবে নিজের ওপর ঘিন্নায় নিশ্চয়ই শিউরে উঠত। মানুষ নিজের অবচেতন মনেই হয়তো তার আমিত্বের দুষ্ট ক্ষত, দুর্গন্ধ লুকিয়ে রাখার জন্য নানান রকম পারফিউম ব্যবহার করে। মনের পচা-গলিজগুলো আড়াল করে রাখার জন্য মেলা টাকা খরচ করে দামি দামি ফুলের তোড়া কিনে। হাসি হাসি মুখে দশজনের সঙ্গে হাত মেলায়, বুকে বুক মেলায়, কুশল বিনিময় করে, আল্লা-খোদা-ভগবানের ভরসার কথা বলে। তাই পৃথিবীতে আজ বিলিয়ন বিলিয়ন কোটি ডলারের ফুলের বাজার। সম্ভবত বিধাতারও ধারণা ছিল না মানুষের বুদ্ধি আর নির্বুদ্ধিতার ব্যাপ্তি কতটুকু হতে পারে। তাই মানুষের মতো এই ধুরন্ধর প্রাণীটির প্রতি বিরক্ত হয়ে বিধাতা মাঝে মাঝে কূটনৈতিক চাল দেন। বোধ করি এই জন্যই বাউল মকদ্দস আলম উদাসীদের মতো মানুষেরা দুনিয়ার কাণ্ডকারখানাকে বলেন, ‘সব ভবলীলা। সব হে কৈরা যায়।’

কনকের এইসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ প্লাটফর্মের উত্তর দিক থেকে দীর্ঘদেহী, কালো আর উলঙ্গ এক তরুণ পাগল বুক চিতিয়ে এসে স্টেশনে ঢুকে পড়ে। মাথাভরতি ধুলাবালি ভরা ধূসর বাবরিটা তার হাঁটার তালে তালে নাচছে। প্লাটফর্মের শতশত নারী-পুরুষের সামনে দিয়ে উলঙ্গ উন্মাদ দুই হাত নাচিয়ে নাচিয়ে ঝড়ের বেগে হাঁটছে আর চিৎকার পারছে, মান্ৃহুঁশ! মান্…হুঁশ!

চুল-দাড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখটা নির্বিকার। শীল-নোড়ার মতো কালো আর পেটানো শরীর তার। মাথা উঁচু করে দূরে, সেই অসীমের দিকে তাকিয়ে লম্বা লম্বা কদমে এগিয়ে যাচ্ছে সে। তার চিৎকারে উপচেপড়া স্টেশনের মানুষগুলো প্রথমে ঢেউয়ের মতো একবার দুলে ওঠে। তারপর নিঃশব্দে দু’ভাগ হয়ে পাগলকে মহারাজের মতো পথ করে দেয়। কারও মুখে কোনও কথা নেই। সবাই হাঁ-করে পাগলকে দেখছে। হন হন হাঁটার গতিতে দুলছে তার গোপন অঙ্গ। পুরুষেরা বিস্ময় ভরা চোখে এক নজর দেখেই তার সঙ্গের নারীর দিকে তাকায়। শুধু একজন না। প্রত্যেকেই তার নিজের পাশে দাঁড়ানো কিংবা বসা মেয়ে কিংবা বউকে তীক্ষè চোখে এক পলক পরখ করে। স্টেশনের সব নারী ওড়না-আঁচল কিংবা বোরকার নেকাব দিয়ে চোখ ঢেকে নিয়েছে দেখে পুরুষেরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার পাগলের দিকে নজর দেয়ে। এই ফাঁকে অধিকাংশ নারীর চোখ-ই আবার ওড়না-আঁচল কিংবা বোরকার নেকাবের ফাঁক দিয়ে যা দেখার তা দেখতেই থাকে। পাগলের পেটটা পিঠের সঙ্গে লেগে আছে। কোমরটা চিকন আর থামের মতো বলশালী উরু দুইটাও দেখতে থাকে। দেখতে দেখতে পাগল আবার প্লাটর্মের দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে ফিরে আসে, মান্…হুঁশ! মান্…হুঁশ!

মান্…হুঁশ কথাটার মানে কি কেউ ভাবে না। যারা বেশি পেট আর চেট নিয়ে ভাবে তাদের মাথা মোটা হয়ে যায়। ভাবতে চাইলেই হাই ওঠে, ঘুমে চোখ ঢুলোঢুলো করে। তাই আমজনতার মাঝে কোনও কালেই নিজের পেট ছাড়া কোনও ভাবনা ছিল না। আজও নাই। তবু মানুষের সহজাত স্বভাবের গুণে তারা প্রথম ধাক্কার বিস্ময় কাটিয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। কিন্তু কেউ কথা বলে না। সবার নজর ও শতভাগ মনোযোগ পাগলের ওপর। এই যখন ভেদজ্ঞান ও বাহ্যধ্যান তখন সাহস করে এক তরুণ দশ টাকার একটা নোট পাগলটার সামনে মেলে ধরে। দেশের রাজনৈতিক মদদপুষ্ট সিন্ডিকেটবাজির কারণে গত দশ বছরে কৃষিতে বার বার মার খেয়ে তার পিতা এখন নিঃস্ব বুড়ো। কৃষক হয়েও সাত-আটজনের সংসারে আজ চিড়া-মুড়িটা পর্যন্ত চড়া দামে কিনে খেতে হয়। কৃষকের সব উৎপাদনের উৎস ও বাজার এখন দেশি তস্কর ও বেনিয়াদের হাতে। তাই এক কেজি মোটা চাল কিনতে লাগে পাঁচ্চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা। ধান বেচতে গেলে এক মণের দাম চারশ টাকা! পেটে ভাত থাকুক আর না থাকুক মাস শেষে বিদ্যুতের বিলটা দিতে হয়। ঘরে তিনটা মোবাইল। আজ শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস না হলেও চলে কিন্তু মোবাইলে মিনিট না ভরলে চলে না। তাই নাকের শ্লেষ্মা শুকাবার আগেই গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে তারা তিন ভাই-বোন গার্মেন্টেসের শ্রমিক হয়েছে। তাই সে এই উছিলায় বিধাতা সাহেবের একটু নেকনজর পাওয়ার জন্য পাগলটার দিকে দশ টাকার নোটটা মেলে ধরে ছিল। তার কপাল মন্দ, পাগল ফিরেও তাকাল না। এইবার পাগলের প্রতি স্টেশনের সবার মনের ভয়টা শ্রদ্ধা হয়ে ওঠে। মানুষের কত ধান্ধাবাজি, মনে কত রকম গোপন বিকার, কত কামনা-বাসনা! জন্মের পর থেকে দুনিয়াদারির চারণভূমিতে সে জ্ঞানার্জন, ধর্মার্জনের বাতাবরণে শুধু চোট্টামিই রপ্ত করেছে। তাই পদে পদে মানুষের কত ঝুঁকি। পকেট ভরতি কত টাকা। সুখ সুখ করে ছুটতে ছুটতে ভেতরে ভেতরে কত ক্ষয়! কত ক্লান্তি জমা হয়েছে! তাই কারও পকেট থেকে বেরিয়ে আসে একশ টাকার নোট। কেউ কেউ  বিনীত মিসকিনের অধম হয়ে পাঁচশ কিংবা হাজার টাকার নোট হাতে নিয়ে পাগলের দিকে বাড়িয়ে রাখে। পাগলের দুই চোখ দূরে, বহু দূরে।

সারাজীবন ধান্ধাবাজি আর লুচ্চামি করে কাটিয়েছে। তেমনি একজন সাহসী মানুষ হাজার টাকার একটা নোট সামনে মেলে ধরে পাগলের পথ আটকে দাঁড়ায়। পাগল নোটটা না নিয়ে ভুড়িওয়ালা সেই বেঁটে লোকটার মাথার ওপর মুখ নামিয়ে এমন জোরে মান্…হুঁশ! বলে হাক মারে যে সেই গর্জন সহ্য করতে না পেরে লোকটা কাঁপতে কাঁপতে প্যান্টেই পেশাব করে দেয়। এই নিয়ে সারা স্টেশনের শতশত মানুষের কি হাসি! কি আমোদ! পাগল কিন্তু উত্তর থেকে আর দক্ষিণে ফিরে না। এবং মিনিটখানেকের মাঝে মানুষ পাগলের কথা ভুলে গিয়ে পান-বিড়ি-সিগারেটে কিংবা আগের আলাপে মজে যায়। কোনও কোনও তরুণ সারা স্টেশনজুড়ে হাঁটে আর মেয়েদের এটা দেখে, সেটা দেখে। পরনে শর্টস, কানে ইয়ার ফোন, গায়ে ছাপ্পর মারা গেঞ্জি, গালে ছনবনা দাড়ি ঠিক যেন আমির খান! আমির খান! তাই মেয়েরাও যা যা দেখানো সম্ভব সব-ই দেখায়। আরও কত কিছু দেখাবার ছিল! কিন্তু চারপাশের এই সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগের জীবগুলোর জন্য দেখাতে না পেরে, কোনও কোনও মেয়ে রাগে চোখ লাল করে, পাশের বাপ-ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। চারিদিকে এত লুচ্চা-লম্পট, এত পরকীয়ার রসালো ঘটনা দেখতে দেখতে এই কিশোর-তরুণরাও এখন আল্লাহর নামে রিহার্সালে নেমে পড়েছে। 

কনক স্টেশনের দুই নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে সবকিছুই দেখছিল। শতশত নর-নারীর হাবভাব, পাগলের ভাবসাব। এখন আর কোনও কিছুতেই সে অবাক হয় না। এই ভবলীলার রঙ্গমঞ্চে কনক নিজেই এত বেশি নাটক করেছে ও দেখেছে যে এখন সে শুধু একজন অনুতপ্ত দর্শক। প্রকৃতি ও সময়ের নিরিখে স্্রষ্টা আর সৃষ্টির মাঝে যে সূক্ষè একটি ভেদরেখা আছে এখন তাই-ই সে সন্ধান করে।

                একটু পরেই শহরের দিক থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের একটা জঙ্গি মিছিল এসে প্লাটফর্মে ঢোকে। তাদের মোটাগাটা শরীর আর পরনের দামি পোশাকাশাকের সঙ্গে জবানের ভাষা মিলে না। মাত্র এই চল্লিশ-পঞ্চাশ জন মানুষের গলায় ডালকুত্তার গড় …গড় … আওয়াজ শুনে প্লাটফর্মের শতশত মানুষ ভয়ে তটস্থ হয়ে সুরুৎ সুরুৎ করে ইঁদুরের মতো চিপাচাপায় সেঁধিয়ে পড়ে। মানুষগুলো গর্জন করে বলছে, জুলমত হত্যার বিচার চাই, খুনি আব্বাসের ফাঁসি চাই।

জুলমত হলো এই শহরের একজন কুখ্যাত কমিশনার। তার নামে খুন-ধর্ষণ, ভূমি দখল ও চাঁদাবাজির কয়েক ডজন মামলা আছে থানায়। থানার রিপোর্ট মতে সে পলাতক। তাকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। আর আব্বাস হলো একই রাজনৈতিক দলের শহর সভাপতি এবং এই শহরের একচেটিয়া মাদক ব্যবসার প্রধান গুরু। জুলমত কমিশনার হয়ে তার পাতে ভাগ বসাতে চেয়েছিল। এই নিয়ে গত কয় মাস ধরে দুই গ্রুপের মাঝে বেশ আফাল-তাফাল গেছে। আজ সকালে জুলমতের লাশটা নতুন বাজারের ড্রেনে পড়ে থাকতে দেখে সবাই।

শকুন যখন মরা গরু খায় তখন একলা খায় না। তার একটু পেছনে অপেক্ষায় থাকে কুকুর। আরেকটু দূরে কাক। রাতে আসে শিয়াল, হায়েনারাও। সবাইকে ভাগ দিতে হয়। তা না হলে কারা জানবাজি রেখে চিৎকার দিবে, দেশদরদি জুলমত হত্যার বিচার চাই, খুনি আব্বাসের ফাঁসি চাই।

মিছিলটা দেখতে দেখতে রক্তপিপাসু হয়ে ভাঙচুর শুরু করে। কনক এক দৌড়ে গিয়ে চার নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়ান খালি একটা মালগাড়ির ওয়াগনে ঢুকে পড়ে। তিন নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল মোহনগঞ্জ কমিউটার। পেসেঞ্জার ভরতি সেই ট্রেনেও হামলা হয়। তাদের ছুঁড়ে মারা পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয় অনেক নিরীহ যাত্রী। ইঞ্জিনে আগুন দেওয়া হয়। সারাটা ট্রেনজুড়ে ভাঙচুর চলে। সব ফেলে যাত্রীরা প্রাণ হাতে পালিয়ে গেছিল। সেই সুবাদে একটা সফল লুটপাট চালানো হয়। দেশদরদি জুলমত ভাই’র হত্যাকারীর ফাঁসির দাবিতে যারা এই শহর তছনছ করছে, তারাই উত্তরের বিসকা স্টেশনে আটকে রেখেছে ঢাকাগামী দুইটা ট্রেন। আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আটক আছে জামালপুরগামী আরেকটা ট্রেন। নারী ও শিশুদের চিৎকার, ডাকাডাকির মাঝে চার-পাঁচটা ট্রেনের যাত্রীরাও হাওয়া!

ভাঙচুর শেষে ওরা মিছিল দিতে দিতে শহরের দিকে চলে যায়। লোভী, লম্পট আর দুঃখী, দুর্বল, পেটসর্বস্ব বিকলাঙ্গ প্রাণের শতশত সাধারণ মানুষেরা একটু পরেই আবার স্টেশনে ফিরে আসে। কেউ কেউ আসে না। তারা শহরের দিকে চলে গেছে। বাকিরা স্টেশনে ফিরে আলোচনায় মত্ত হয়। এই খুন, এই ভাঙচুরের ভিতরের নাড়িভুড়ি, কলকাঠি। গেটের ডান পাশে দুই কানা ভিক্ষুক বসেছিল তারা আলাপ করে, শহরকুতুব আইয়া আগেভাগে মান্…হুঁশ কৈয়া হুঁশিয়ার কৈরা গ্যাল পুঙ্গির পুতেরা কিচ্ছু বুঝল না।

অন্ধবুড়োর পাশের জন বলে, হ্যারা আছে ট্যাহাকামানি, মাগিবাজির তালে।

কনক আর দাঁড়ায় না। মাথাটা নিচু করে ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে। রিকশা, সিএনজি, ভিক্ষুক মুক্ত খালি ময়দান। একটা কুবাতাসে সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে। কনক মনে মনে হাসে, আল্লাহর আশরাফুল মাকলুকাতেরা চিরকাল শক্তের ভক্ত, নরমের যম। কনকের নজর পড়ে পাশের সাইনবোর্ডে, ‘আল্লাহর দান।’ সে পাশের হোটেলে ঢুকে পড়ে। মানুষে গমগম করছে। বিষয়, ঠেলাওয়ালার ছেলে থেকে জুলমত হয়ে ওঠা। তারপর জুলমত হায়দার কমিশনার। কোনার দিকে একটা চেয়ার খালি পেয়ে কনক বসে পড়ে। আলাপ চলছে। কনক আর শুনে না। ভিতরে ভিতরে কত কথা। এই চায়ের কাপ, চাপাতার গন্ধ, বনের একটা গাছের শরীরের কাঠ হয়ে ওঠা, চেয়ার-টেবিল হয়ে ওঠা। মানুষ মানুষকে কেন খুন করে ? বিধাতা চাইলেই তো সব মানুষের অন্তর স্নেহ, মায়ামমতায়, ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে পারে ? এই আমি কনক আবার যে কোনও দুর্বল মুহূর্তে লম্পটের জীবনে ফিরে যেতে পারি। এই যে পারাপারিটা, এইটাই কী আত্মা আর পরমাত্মার খেলা না ?

কনক বুক ভরে দম টানে। রুটি-ডাল-চায়ের গন্ধে তার পেটটা ক্ষিধায় কড়কড় ডাকে। পাশ দিয়ে একটা বয় যাচ্ছিল, সে হাত তুলে রুটি-ডালের ওয়ার্ডর দেয়। কনক মাথা উঁচু করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কাকে যেন খুঁজছে, এইরকম ভঙ্গিতে সবাইকে এক নজর দেখে নেয়।

‘মানুষ দেখি,

জুড়াই আঁখি।’

কার জানি গানটা ? কার…কার ? মনে করতে পারে না। তারপরেই কনকের মনে বিদ্যুতের চমকের মতো একটা লাইন খেলে যায় :

‘মানুষ হ’মন দুষ্ট পাখি,

নিজেরে আর দিস না ফাঁকি।

মানুষেতে বসত খোদা,

বিফল হবি ভাবলে যুদা।

মানুষ হ’মন দুষ্ট পাখি…’

কার গান ?

কনক নিশ্চিত, এটা লেখা হলে এই হবে তার প্রথম গান। হঠাৎ সে চমকে ওঠে, না না আমি লেখার কে ? বাউল উদাসী ভাই না বলেছে, হাতে পরমাত্মার প্রভাব পড়লেই গান লেখা হয়।

লেখক : গল্পকার

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares