গল্প : ভাইরাস : সাঈদ আজাদ

নিপার আর্তনাদ মণ্ডল বাড়ির অন্ধকার উঠান কাঁপিয়ে, পৌঁছে যায় পাড়ার শেষ বাড়িটাতেও । 

রাত তেমন হয়নি। তবে, গ্রামের লোকজন ঘুমাতে শুরু করেছে। খাওয়ার পর, ঘুম ছাড়া এখন লোকের কাজ-ই-বা কী! বাড়ি থেকে বের হওয়া নিষেধ, বাজারে যাওয়া নিষেধ, চায়ের দোকানে বসা নিষেধ। শোনা যাচ্ছে মসজিদেও জামাত বন্ধ হবে।

বাড়িতে বাড়িতে এখন আতঙ্ক! সারা দেশের মতোই অদেখা শত্রুর ভয়ে ভীত গ্রামের লোকজনও। দিনের বেলায়ও তারা এখন বের হয় না তেমন। গ্রামে গ্রামে মাইকিং হচ্ছে, টিভিতে বলছে, ফেসবুকে জানাচ্ছে, অনেক লোক এক সঙ্গে হওয়া যাবে না, কাছাকাছি হওয়া যাবে না। করোনা নামে এক ভাইরাসে পৃথিবীর মানুষ মরছে। মরতে শুরু করেছে বাংলাদেশের মানুষও। অনেক মানুষ এক সঙ্গে হলেই, বিদেশ-ফেরত কারও সঙ্গে মিশলেই সে ভাইরাস শরীরে চলে আসে। ভাইরাস শরীরে ঢুকলে আর রক্ষা নেই। দশ পনেরো দিনের মধ্যেই মৃত্যু।

চিৎকার শুনে প্রতিবেশীদের ভয় বাড়ে।

নিপার স্বামী মোরশেদ থাকে ইটালিতে। দিন পনেরো আগে মোরশেদের ইতালি ফেরত এক বন্ধু বিস্তর জিনিসপত্র দিয়ে গেছে তমিজউদ্দীন মণ্ডলের বাড়িতে। খবরে শুনে শুনে গ্রামের ছোট বড় সবাই জানে, করোনা কী, কীভাবে তা ছড়ায়। কোনও দেশে করোনায় কত জন মারা গেছে।

নিপার শ^শুর-শাশুড়ি দুজনেই বুড়ো মানুষ। সঙ্গত কারণেই প্রতিবেশীরা ভাবে, নিপার শ^শুর বা শাশুড়ি কারও করোনা হয়েছিল নাকি ? সে কি মারা গেল ? হয়তো সেই বন্ধুই ভাইরাসটা দিয়ে গেছে তমিজের বাড়িতে। সে এসেছে ইতালি থেকে। ইতালিতেই তো ভাইরাসটা বেশি মানুষ মারছে।

ভয় পেলেও, একজন দুজন করে লোক বাড়ি থেকে বেরও হয়। কৌতূহলের কারণেই হয়তো ভয়টা তাদের মধ্যে তেমন কাজ করে না। সকলের মুখেই মুখোশ। তারা কেউ অবশ্য বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢোকে না। বাড়ির লোকদের কাছাকাছি হলে যদি তারাও করোনায় আক্রান্ত হয়, সে ভয়ে।

রাতটা অমাবস্যার। অনেক অনেক বছর আগে অমাতে পুরো গ্রাম অন্ধকারে ডুবে থাকত। তা চিত্র এখন বদলেছে। চাঁদহীনতায় এখন আর পুরো গ্রাম অন্ধকার হয় না। গভীর রাতেও বিদ্যুতের আলো এই বাড়ি অই বাড়ির উঠান আলোকিত করে রাখে। হয়তো মানুষের মনের অন্ধকার দূর হয়নি, কিন্তু বাড়ি-ঘরের অন্ধকার ঠিকই দূর হয়েছে।

তবে, মণ্ডলবাড়ির পুরোটাই অন্ধকার। খরচের ভয়ে কিপটা তমিজউদ্দীন মণ্ডল বিদ্যুৎ আনেনি বাড়িতে। কিছুদিন আগেও তার আর্থিক অবস্থা শোচনীয়ই ছিল বলা যায়। তিন মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে জমিজমা বেচে সে এক রকম ফতুর হয়ে গিয়েছিল। যদিও এখন তার একমাত্র ছেলে মোরশেদ ইতালি থেকে মাসের শুরুতেই বেশ মোটা অঙ্কের টাকা পাঠায়, কিন্তু স্বভাবের কারণেই তমিজ সব টাকা ব্যাংকে রেখে কৃচ্ছ্র জীবন যাপন করে। এসব জানে প্রতিবেশীরা ।       

নিপার চিৎকার শোনা যাচ্ছে তখনও। তবে চিৎকারে আগের জোরটা নেই। সীমানায় থেকেই টর্চ জে¦লে একজন জানতে চায়, ‘কী হয়েছে ?’

নিপার শাশুড়ি মাজেদা হারিকেন হাতে বাইরে এসে বলে, ‘আর কইয়্যো না। বউরে মনে হয় জিনে ধরছে।’     

তমিজউদ্দীনও এসে দাঁড়িয়েছে বউয়ের পাশে। যারা দেখতে এসেছিল, তারা বুঝে যে নিপার শ^শুর শাশুড়ি সুস্থই আছে।

‘সকালেই সন্দ হইছিল আমার’, মাজেদা বলে। ‘কাজ কাম বাদ দিয়া সকাল থাইক্যা উঠানে বইসা বিড়বিড় কইরা কী সব কইতাছিল।’

কেউ কেউ অবিশ্বাস করে মাজেদার কথা। তারা অল্প বয়সি। কেউ কেউ বিশ^াসও করে। তারা বয়সি।

          করোনার মাঝে জিন! বিপদের ওপর আপদ। সকালেই আসে কবিরাজ। মুখে মুখে মুখোশ পরে লোকরা দেখে, নিপার ওপর ভর করা জিনটা কবিরাজের কেরামতিতে মরিচ পোড়া ঝাঁঝে উড়ে গিয়ে নারিকেল গাছে বসে। খানিক পর নারিকেল গাছের মাথায় ঝড় তুলে জিনটা উড়েও যায় গ্রাম ছেড়ে।

ক্রমে সারা গ্রামের মানুষ জেনে যায়, নিপাকে জিনে ধরেছিল। সেই জিন ছেড়ে গেলেও, নিপার আচরণ কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। বাড়ির কাজ-কাম করে না ঠিকমতো। যেখানে বসে থাকে, বসেই থাকে। খায় না সময় মতো। গোসল করে না। চোখের নিচে কালি জমে তার। মুখ ভেঙে হনু ভেসে উঠে। কথাবার্তাও বলে কেমন অসংলগ্ন। তা জিনটা মনে হয় আশেপাশেই কোথাও ছিল। এক রাতে আবার নিপার চিৎকার শোনা যায়। আবার সবাই টর্চ, আর মোবাইল জ¦ালিয়ে এসে দাঁড়ায় তমিজের উঠানে। এবার আর তারা বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকতে ভয় পায় না। এই বাড়িতে তো আর করোনা নেই।

এসেছে মহিলারাও। আগতদের সবার মুখেই মুখোশ। মুখোশ পরতে পরতে সবার এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে, প্রতিবেশীদের বাড়ি এলেও, মুখোশ না পরার কথা ভাবতে পারে না তারা। মুখোশের ভেতর থেকেই তাদের একজন জিজ্ঞেস করে মাজেদাকে, ‘কিগো মাজেদা তোমার বউয়েরে যে জিনে ধরেছে, বাপের বাড়ির লোকজন জানে ?’

মাজেদার মুখেও মুখোশ। করোনা নাকি বুড়ো মানুষকেই বেশি ধরে। তাই সেও মুখোশ ছাড়া মানুষের সামনে আসে না। মাজেদা মুখোশের ভেতর থেকেই বলে, ‘জানব কইত্থে ? এখন মানুষ চলাফিরা করতে পারে ? ঘর থাইক্যা বাইর হইলেই নাকি মরার করনোয় ধরে। আর বাপের বাড়ি জানলেই কী ? বাপ মাতো আর নাই। আছে এক ভাই, সে বোনরে বিয়া দিয়া গ্রাম ছাইড়া কই গেছে কেউ জানে না। এখন সব যন্ত্রণা আমগ ঘাড়েই।’

ঘরের ভেতরে নিপা তখনও গুনগুন করে কাঁদছে। 

মেয়েটা রূপসী বলেই হয়তো জিনটা আবার এসেছে। একজন মতামত দেয়।

আস্তে আস্তে ভিড় কমে। লোকেরা সরে যায় তমিজের উঠান থেকে।

তারপর, রাতের দিকে মাঝে মাঝে নিপার চিৎকার শোনা যেতে থাকে। তবে সে চিৎকারে লোকেরা আর আগের মত তমিজের উঠানে ভিড় করে না। এক জিনিস বার বার দেখার মধ্যে মজা নাই।           

নিপা যেদিন মণ্ডলবাড়িতে বউ হয়ে এল, তাকে দেখে গ্রামের অনেকেই অবাক হয়েছিল। অমা তমিজউদ্দিনের কালো ছেলের এমন সুন্দর বউ! মণ্ডলের অন্ধকার বাড়ি আলো করে রাখবে গো বউটা।

বয়স কম নিপার। মাত্র আঠারো পার হয়েছে। তুলনায় মোরশেদের বয়স অনেক। চৌত্রিশ। বোনদের বিয়ে দিতে গিয়েই বয়সটা বেড়েছে তার। মোরশেদের সঙ্গে বিয়েতে রাজি ছিল না নিপা। তার বিয়ে ঠিক হলে, কান্নাকাটি করে খাওয়া বন্ধ করেছিল সে। কিন্তু ভাই তার চোখের জলের কোনও দামই দেয়নি। বোনকে সচ্ছল পরিবারে বিয়ে দিতে পারছে, এতেই খুশি ছিল ভাই। চোখের জল মুছে, নিপাও শেষে বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছিল। শ^শুরবাড়ি আসায় পর বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক শেষই হয়ে গেছে তার। সম্পর্ক থাকবে-ই-বা কার সঙ্গে। বাপ-মা নেই। একমাত্র ভাই নিরুদ্দেশ।

নিপার তুলনায় বয়স হয়তো বেশি মোরশেদের, দেখতেও সে বেশ কালোই। কিন্তু মানুষ সে ভালো। এখানেই নিপার সান্ত্বনা। বিয়ের পর মাসখানেক বাড়ি ছিল মোরশেদ। তখনই বুঝেছে নিপা। এক মাসে হয়তো একজন মানুষকে ঠিক চেনা যায় না। তবে, একটা মানুষের ধাত ধরা যায় ঠিকই। এক মাস, ত্রিশটা দিন। হিসেব করলে বড় কমও নয়। আহা, কত তাড়াতাড়ি চলে গেল দিনগুলো।

সাত মাস ধরে ইতালি আছে মোরশেদ। বিদেশে যাওয়ার আগে সে উপজেলা চেয়ারম্যানের মাছের প্রজেক্টে কাজ করত। বাড়ির লাগোয়া যেটুকু জমি ছিল, সেটা বিক্রি করেই গেছে বিদেশ। আসলে অই জমি বিক্রির টাকাতেও হয়নি। বেশ কিছু টাকা ধার করতে হয়েছে। ধার অবশ্য শোধ হয়েছে। সংসারও সচ্ছল হয়েছে। কিন্তু জমিজমা এখনও কেনা হয়নি।

মোরশেদ চলে যাওয়ার পর পর মন খারাপ লাগত নিপার। একা একা লাগত ভীষণ। এখন কষ্ট অনেকটা কমে এসেছে। তবে, কষ্ট মনের ছাড়াও হয় মানুষের। দেহের কষ্টও বড় কম নয়। মনের কষ্ট বলে হালকা হওয়া যায়, কিন্তু দেহের কষ্ট প্রকাশের সুযোগ নেই। সে কষ্টের কথা শুনলে মানুষ মন্দ বলে।

দিনমান কাজে-কামে সময় যায় নিপার। সমস্যা রাত নিয়ে। সন্ধ্যার পরই শ^শুর শাশুড়ি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ে। একা একা ঘুম আসতে চায় না তার। মোরশেদ বাড়ি থাকতে প্রায় সারা রাতই গুটগুট করে গল্প করত। প্রথম প্রথম গল্প শুরু করতে না করতেই ঘুমিয়ে পড়ত নিপা। বেচারা বোধহয় মন খারাপ করত। সপ্তাহ না যেতেই মোরশেদের বকবক কেমন ভালো লাগতে শুরু করে। রাত কাবার হয়ে যেত কথা শুনতে শুনতে। মোরশেদ যাওয়ার পর সহজে ঘুমটা আসতে চায় না। রাতগুলো বিছানায় এপাশ ওপাশ করেই সকাল হয়।

তেমনই এক নির্ঘুম রাতে নিপার মনে হয়, ছায়া ছায়া কী যেন একটা ঢুকেছে তার ঘরে। এক সময় বিছানায়ও এসে বসে সেটা। অন্ধকারে ঠিক মতন বোঝা যায় না অবয়বটা কিসের। ভূতের ভয় চিরকালই নিপার। কিন্তু সেটা ভূত না। অন্যকিছু। ছায়াটাকে চিনতে পেরে আতঙ্কে দম বন্ধ হয়ে মরার অবস্থা হয়েছিল তার। কোনও কিছুই না ভেবে সে প্রাণপণে চিৎকার করেছিল। চিৎকারে গ্রামের সব লোক জড়ো হয়েছিল এ বাড়িতে। মাজেদা তাকে জিনে ধরেছে বলে সকলকে বুঝ দিয়েছিল। লোকজন কী বুঝেছে কে জানে! তবে, তারপর আর আসেনি ছায়াটা। নিপাও স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলে ভেবেছে, হয়তো ভুল করেই তার ঘরে ঢুকেছিল ছায়াটা।

কিন্তু না, ছায়াটা তার ঘরে ঢোকে আবার এক রাতে। ঘুমাচ্ছিল তখন সে। কোমরের কাছটায় খসখসে হাতের স্পর্শে চিৎকারটা তার মুখ দিয়ে আপনাআপনিই বের হয়ে আসে। চিৎকার হয়তো শোনে প্রতিবেশীরাও। তবে, আগের মতো তারা আর ঘটনা জানার জন্য হাজির হয় না মণ্ডলবাড়িতে। এরপর থেকে মাঝে মাঝে ছায়াটা তার ঘরে ঢোকে। ঢুকেই অবশ্য বের হয়ে যায়। হয়তো নিপা ঘুটঘুটে আঁধারে বিছানায় বসে থাকে বলেই ছায়াটা  সাহসী হতে ভয় পায়।   

উঠানে বসে তাল গাছের চটার ওপর বালি ফেলে বটি ঘসে নিপা। বটিতে সে মাঝে মাঝেই ধার দেয়। কখন কাজে লাগে বটিটা বলা তো যায় না।

মাজেদাও উঠানে বসে আছে, তবে তার কাছ থেকে অনেকটাই দূরে। মাজেদার মুখে কালো মুখোশ। মুখোশটা সারাক্ষণই পরে থাকে সে। করোনার ভয়ে। বয়স হয়েছে, তাও মরতে ভয় বুড়ির।

মাছ কাটার বটিটা ধারালো করতে করতে খর চোখে শাশুড়ির দিকে তাকায় নিপা। কদিন আগেও এ বাড়িতে মাজেদাকেই তার আপন মনে হতো। আজ নিপার খুব ইচ্ছে করে, মাজেদার মুখোশটা খুলে বঁটি দিয়ে গলাটা কেটে ফেলতে।

মাজেদা বুঝি নিপার মনের কথা পড়তে পারে। চোখে চোখ পড়াতে দ্রুত উঠান থেকে ঘরে চলে যায় সে। নিপা হাসতে হাসতে বঁটিতে ধার দিতে থাকে। তবে, খানিক পরেই হাসি চলে যায় তার মুখ থেকে। বদলে বিষাদ বিস্তৃত হয় বদনে।

মানুষ যে এমন বিপদে পড়তে পারে, অন্য কেউ বললে নিপাই বিশ^াস করত না। জগতে এমনও হয়! মাজেদা প্রথম থেকেই জানে সব। না, নিপা তাকে কিছু বলেনি। বরং মাজেদাই আকারে ইঙ্গিতে তাকে বলেছে, ‘পুরুষ মানুষের দোষ ধরতে নাই। বাচ্চা তো আর হইতাছে না। একটু হাত টাত দিব। চুপ কইরে থাইক। এই বয়সে কোনও কোনও পুরুষের মাথায় মেয়ে মানুষের নেশা জাগে। অবশ্য বেশি দিন থাকে না সেই পাগলামি।’ 

নিপা স্থির চোখে মাজেদার দিকে তাকিয়ে ছিল শুধু। কিছু বলেনি। আসলে নিপার বাকরোধ হয়ে গিয়েছিল। মোরশেদের সঙ্গে মোবাইলে কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারেনি সে। ভেবেছিল, একটু আধটু চেঁচামেচি করলেই ঠিক হয়ে যাবে সব। কিন্তু হয়নি ঠিক। নিপা বুঝেছে, বটি ছাড়া ঠিক হবেও না।

তবে সাহসী হতে সময় লাগে নিপার। প্রকৃতির নিয়মে দিন যায়, রাত আসে। ফের দিন আসে। অমাবস্যা যায় পূর্ণিমার দিকে।

আজ আকাশে চাঁদ উঠেছে। আধখানা। অই আধখানা চাঁদেই পৃথিবীর অন্ধকার চলে গেছে কোথায়! মণ্ডলবাড়ির উঠানও আলোকিত। তবে, বন্ধ দরজা ভেদ করে সে আলো ঘরে পৌঁছে না। তাই বুঝি ঘরের মানুষগুলোর মনেও আঁধার।

রাত বাড়লে গ্রামের লোকেরা ঘুমায়। গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে যায় এক সময়। সহসা সেই নিস্তব্ধতাকে খান খান করে মণ্ডলবাড়িতে চিৎকার শোনা যায়। লোকজন ক’দিন ধরেই চিৎকার শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আজকের চিৎকারটা যেন ভিন্ন রকম। যেন, নিপা না―আজ চিৎকার করেছে অন্য কেউ। চিৎকারটা বোধহয় জিনেরই। কেমন পুরুষ পুরুষ গলা।

মণ্ডলবাড়ির উঠান আবার লোকের ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে।

রাত প্রায় শেষই বলা যায়। উঠান আলোকিত হলেও ঘরের ভেতরটা পূর্ববৎ অন্ধকারই। বারান্দায় হয়তো আলো পড়ত। কিন্তু উৎসুক লোকের ভিড়ে চাঁদের আলো বাধা পেয়েছে। তাই সেখানটায়ও অন্ধকারই।

কান্নার শব্দ আসছে ঘরের ভেতর থেকে। ঠিক কান্না না, শব্দটাকে বিলাপই বলা যায়।

বারান্দায় পা ছড়িয়ে নিপা বসে আছে। কেউ একজন টর্চের আলো ফেলে তার মুখে। নিপার মুখে আজ আতঙ্ক নেই। বদলে মুখময় রক্তের ছিটা। তার নির্বিকার দৃষ্টিতে বরং শূন্যতাই। কাছেই পড়ে আছে রক্তরঞ্জিত বঁটিটা। ঘটনার আকস্মিকাতায়ই বোধহয় টর্চ যে জ¦ালায়, সে হতভম্ব হয়ে পড়ে। টর্চ নিভিয়ে ফেলে দ্রুতই। বারান্দা আবার অন্ধকার হয়ে যায়।

ঘরের ভেতর বিলাপীর স্বরটা হঠাৎ জোরালো হয়। ‘আমার জামাইরে তোমরা ডাক্তারের কাছে নিয়া যাও। ডাক্তারের কাছে নিলে জানটা বাঁচব মানুষটার। হায় হায়রে, রাক্ষুসী আনছিলাম ঘরে।’      

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares