গল্প : নির্ঘুম রাতের জাল : স্মৃতি ভদ্র

প্রিয় স্বাক্ষর,

কতদিন লেখা হয় না তোমাকে। গুছিয়ে রাখা কথাগুলো বলাও হয়নি অনেকদিন।

সময় আজকাল আঙুলের ফোকর গলিয়ে পালিয়ে যায়। সময় যেন বৈশাখে গাছের পাতায় এক পলক ঝিরিঝিরি হাওয়া।

আমলকী গাছটার কথা মনে পড়ে তোমার ? ঘরের জানালায় উঁকি দিলেই সবুজ পাতা নেড়ে কেমন সাড়া দিত, মনে পড়ছে তো ? জানালায় হাত বাড়িয়ে গাছটা যদি ছোঁয়া যেত! তোমার গলায় আক্ষেপ, আজও কানে বাজে।

সেই আমলকী গাছ কী আহ্লাদে জানালার শিকে লুটোপুটি খাচ্ছে!

হুটোপুটি-লুটোপুটি-তোমাকে মনে পড়ে তখন।

বেলা বাড়তেই রোদ এসে চুপচাপ বেড়ালের মতো গড়াগড়ি খায় আমলকীর পাতায়। সরতেই চায় না। ওই রোদও উসকে দেয় তোমার স্মৃতি।

লুকোছাপা করে তোমাকে এ ঘরে আবার রাখতে পারলে ভালো হতো। তুমি পাতার ওপর পড়ে থাকা অলস রোদ্দুর দেখে চঞ্চল হয়ে উঠতেÑচঞ্চল চোখ দেখার তৃষ্ণা নিয়ে আমি ঘুমাতে যাই।

রোদ্দুর কারও এত ভালো লাগতে পারে, তোমাকে আবিষ্কার না করলে জানাই হত না আমার।

দোকানের নাম ‘বিদ্যাবিতান’। বইয়ের দোকান। তোমার মনে থাকার কথা। বৈশাখের রোদে ঘেমে-নেয়ে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়ালে। বোকার মতো বুকের আঁচল বাড়িয়ে দিয়েছিলাম, ‘মুছে নাও’।

অস্বস্তি নিয়ে প্রায় লাফ দিয়ে দু’হাত পিছিয়ে গেলে তুমি, ‘এটা পাবলিক প্লেস’। এরপর পকেট থেকে টিস্যু বের করে নিজের ঘাম নিজেই মুছে নিলে। জরুরি কিছু বই হাতড়ে চলে যেতে ব্যস্ত তুমি। আঁচল ফিরিয়ে নিয়েছিলাম, কিন্তু বুক হু-হু করে উঠেছিল।

অনেক দিন পর চোরা-গুপ্তা সুযোগ করে তোমাকে পেয়েছি, সুযোগ হাত গলিয়ে পড়ে যাবে!

আমিও চালাকি করলাম। ‘তোমার বাড়ির কাছেই আমার একটা কাজ আছে’ বলে, তোমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলাম। সেদিন তাতানো রোদ্দুরে রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছিল। আমি ছাতা বের করতেই তুমি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলে। ছাতার তলায় ডাকতেই বললে, ‘আমার ছায়া ভালো লাগে না, রোদ্দুর আমার প্রিয় তুমি জানো না ?’

জানি কিন্তু ভুলে যাই। কতটুকু সময় আমরা এক সঙ্গে থাকি ?

আমার কিন্তু ছায়া ভালো লাগে, তোমার ছায়া।

ছাতার ছায়া এড়িয়ে আগে আগে হেঁটে তুমি যখন বাড়ির গলিতে ঢুকে গেলে, আমি গলির মাথায় দাঁড়িয়ে গেলাম। তোমার চলে যাওয়া দেখছিলাম। তোমার বাড়ির দেয়ালে তোমার ছায়া ছোট হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল।

মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়েছিলাম। ছায়ার মধ্যেই তোমাকে পাওয়া। এখন ছায়াও বিভ্রম আমার কাছে। ছায়া দেখলেই তা তোমার ছায়া ভেবে ভুল করি।

ছায়া ছিন্ন করে ছায়ার মানুষ যখন সামনে আসে, তখন চোখ ফিরিয়ে নেই। তার আগে নয়।

অচেনা মানুষের ছায়ায় তোমাকে খোঁজা আপত্তিকর। বিব্রতকরও। মানুষের কপালে ভাঁজ পড়েÑভাঁজের মধ্যে প্রশ্ন থাকে। তুমি পাশে থাকলে নির্ঘাত বলতে, ‘এজন্যই তোমার সঙ্গে ঘুরতে ভালো লাগে না, তুমি খুব বোকাÑকিসসু বোঝো না।’

হ্যাঁ, আমি বোকা। খুব বোকা। প্রতিদিন আরও বোকা হয়ে যাচ্ছি। স্রোতহীন মনে শ্যাওলা জমছে।

ঘরের ওপাশে শ্যাওলা-পড়া প্রাচীরের মতো। তার পাশেই তো আমলকী গাছটা। যতই রোদ মেখে ঝিলমিল করুক, তার ছায়ায় বিস্তর দীর্ঘশ্বাস লেগে থাকে। আর রাস্তার ওপাশে বৈদ্যুতিক তারে ঝুলে থাকা ভোকাট্টা ঘুড়িটা, বাতাস পেলেই ছটফট করে ওড়ার জন্য। পারে না। তেমন আমিও পারি না। ওই ঘুড়ির উড়তে না-পারার ইচ্ছা কী একদিন মরে যাবে! জানি না। কিন্তু আমি আমার ইচ্ছাকে নিরন্তর বাঁচিয়ে রাখতে চাইÑভোকাট্টা হতে চাই না।

‘ঘুড়িটা ওড়ার জন্য ছটফট করে’, আকুল হয়ে আমি বলেছিলাম।

‘কোথায় ছটফট করে! আসলে তুমি তোমার মনের ছটফটানি ঘুড়ির মধ্যে দেখতে পাও, ছটফটানি ছাড়লেই হয়’, তোমার নিরাসক্ত উত্তর।

আজন্ম কাঁটাতারে ঝুলে-থাকা ঘুড়ি আমি।

ছটফটানি দেখল সবাই। কাঁটাতার আড়ালে পড়ে থাকল।

ছোটবেলার ছটফটানি ছাড়তে পারিনি।

হ্যাঁ, সত্যিই আমি দাপিয়ে বেড়াতাম। ছটফট করতাম। ছোটবেলা থেকেই এমন আমি। পাড়ায় আমার পরিচিতি ছিল ‘ফুরফুরি’ মেয়েÑবাতাসের আগে যায়। এ বাড়ি ও বাড়ি ছুটে বেড়াতাম, কখনও বরই গাছ কখনও পেয়ারা গাছে আমাকে পাওয়া যেত। স্কুল পালিয়ে ক্ষেতের আলে বসে কাঁচা মটর তুলে খাওয়াÑকী-ই না করেছি। পাড়া-বেড়ানো মেয়ে বলে বকা খেয়েছি আব্বার কাছে!

মাঝেমধ্যেই তো আমার ঘরে শেকল পড়ত। ‘এই ঢ্যাঙা মাইয়্যা বাড়ির মান ডুবাইব!’

ভেতর থেকে আমার হাঁকপাঁক, শিকল খান নামাও আব্বা।

ঘরের শেকল নামত কিন্তু বাড়ির সম্মান বজায় রাখার অদৃশ্য শেকল আমার পায়ে পড়ানো ছিল। তা হলে স্কুল-কলেজ পার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কী করে এলাম! আমার নামের মধ্যেই উড্ডীন হওয়ার বীজমন্ত্র আছে। জানি না নিজের নাম ব্যক্তিমনে প্রভাব ফেলে কিনা। পাখির নামে নামÑপায়রা। পায়রা সুযোগ পেলেই ওড়ে।

তোমার দেখব, তাতেও নিয়ম ? তুমিও নিয়ম বেঁধে দাওÑ

আজ দেখা করা যাবে না, পরীক্ষার প্রিপারেশন। কাল আসতে পারব না, গিটারের ক্লাস আছে। আজ কীভাবে আসব, বাড়িতে ভর্তি মানুষ, বের হওয়া যাবে না।

সব অজুহাত তোমার।

কিন্তু আমি কেন কঠোর হতে পারি না ? কেন সত্যটুকু মেনে নিয়ে সবকিছু ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না ?

তুমিই বলো, আমি খুব আঁকড়ে ধরি।

অথচ নিজের সবকিছু ছাড়তে পারি শুধু তোমাকে ছাড়া।

ঘর ছাড়ার আগে কত বই আমি ফেলে এসেছি, যত্নে সংগ্রহ করা এ্যান্টিক শোপিস ফেলে এসেছি, তোমকে ফেলতে পারিনি। নিজের জন্য শুধু তোমাকে রেখেছি।

ভাবতাম, কিছুই চাই না আমি। তুমি সঙ্গে থাকবে, আমার কীসের অভাব ?

যতবার অজস্র কটুকথা আর অপমানে মুষড়ে পড়ে তোমার কাছে ছুটে গিয়েছি, ততবার তুমি বলেছ,

‘সম্পর্কটা থেকে বের হও, এভাবে বেঁচে থাকা যায় ?’ তুমি আক্ষেপ করে বলেছিলে।

সব সাহস জড়ো করে বলতাম, সম্পর্ক থেকে বের হলে তুমি থাকবে আমার সঙ্গে ?

মাথা নাড়িয়ে তোমার সামান্য ‘হ্যাঁ’ আমার গ্রীবায় এক থোক আত্মবিশ্বাস জড়ো করেছিল।

জানো, কখনও ভাবিনি তোমাকে পাবার পথ এতটা প্রতীক্ষার হবে।

তবে, প্রতীক্ষায় আমার আপত্তি ছিল না। যতই ছটফটানি থাকুক, একা থাকার সাহসটুকু আমার ছিল।

তাছাড়া সম্পর্কের শুরুতে কোন বিষদাঁত ছিল নাÑপরে বের হলো।

পালকে রঙ মেখে চন্দন এল। নিজেকে যদি পুকুর বলি, চন্দন তবে সতর্ক ও সহিষ্ণু মাছরাঙা।

চন্দনের একতরফা নিমগ্নতাই এই সম্পর্কের সূত্রপাত করেছিল।

আমি আজীবন বিবাগি। সবাই যে পথে যায় আমি সে পথে যাইনি। নিয়ম ভাঙার ঝোঁকও ছিল। পরিবারের আগ্রহ ছিল না। তবু বিশ^বিদ্যালয়ে গেছি। বিয়ে নিয়ে অতশত ভাবিনি। চন্দন দমকা হাওয়া মতো সব এলোমেলো করে দিল। চন্দন একেবারে আটঘাট বেঁধেই নেমেছেÑআমার একরোখা মনোভঙ্গিকে বাধ সাধার। নানা ছলে কতো কী বোঝাত। আর বলত সারাজীবন অপেক্ষা করবে। আমিও বিশ্বাস করে নিলাম, পৃথিবীতে একমাত্র চন্দনই পারে আমার জন্য অপেক্ষা করতে। বাউন্ডুলে আমি চন্দনের লাল-নীল সংসারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাই।

মা-ছাড়া ছোট সংসারে বেড়ে ওঠা আমার। বড় সংসারে খুশির ভেলায় দোল খেতে খেতেÑদিনগুলো কী রঙিন হয়ে উঠছিল। এ সংসারে সবাই আনন্দে মেতে থাকে। একসঙ্গে উৎসব। উপহার দেয়া-নেয়া। রেগে গেলে বাজে ভাষায় খিস্তি করা। আড়াল ছিল না, মানুষ পরিস্থিতিভেদে যা করে ঠিক তাই। এত তরঙ্গ, তার ওপর চন্দনের নিরাপদ মুখ। যত্নে ভাসিয়ে রাখত চন্দন। ভুলচুক হলে বলত, ‘মা খুব ভাল। মুখেই যা বকাঝকা করেন।’

সুখের ভেলায় খুব বেশিদিন ভাসা হলো না। একদিন ঘুমিয়ে পড়েছি ভেবে চন্দন পাশের ঘরে যায়। ভেবেছি ওয়াশরুমে গেছে। হঠাৎ শ^াশুড়ি আর চন্দনের ফিসফিসানি লাগামছাড়া হতেই উঠে দরজার পাশে দাঁড়াই।

‘তোমার বউ আমার মুখে মুখে তর্ক করে। মেয়ে মানুষের চাকরি করার দরকার কী ? হাতে টাকা আসলে মেয়ে মানুষ পোষ মানে না, পোষ মানাওÑনাহলে সংসার টিকবে না।’

চন্দনের প্রতিবাদী কণ্ঠের জন্য মুখিয়ে থাকি। পাল্টা সংলাপ শুনে আমার কোমর থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত অসাড় হয়ে যায়। ওই ঘরে চন্দনের কণ্ঠ, ‘আম্মা, ও আপনার মুখের ওপর কথা বলল আর আপনি চুপ করে থাকলেন। কষে দুই ঘা লাগাবেন না ? কান্নাকাটি করলে আমি ম্যানেজ করতাম। আপনি তো বোঝেন, সবাই একসঙ্গে শাসন শুরু করলে বেশি বিগড়ে যাবে।’

আর কথা কানে যায়নি, বধির হয়েছিলাম। বসে রইলাম কিছু সময়। চোখের সামনে চন্দনের মুখ পুরোটা মুখোশ হয়ে গেল। অপমানের যন্ত্রনায় থাকতে না পেরে মুখোমুখি হলাম। ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় অস্পষ্ট বললামÑ‘চন্দন তুমিÑ! ’

বুকের আঁচল নিত্য চোখ উঠত, নোনা জল শুষে নিতো।

মুখোশ বাড়তে লাগল দিনে দিনে। এক মানুষের কত মুখোশ থাকে! শ্বাশুড়ি সনাতন চেহারা সামনে এল। ভাসুড় ছাড়ালেন ভদ্রতার সীমা। একটা পথ তখনও খোলা ছিল। চাকরি।  তাও হাতছাড়া হল।

এবার উড়ুক্কু পায়রা বন্দি হলো অদ্ভুত সম্পর্কের জালে।

ছটফটানি করতে দেখে তুমি চোখের জল মুছে দিতে। সান্ত্বনা দিতে। আহ কী যে শান্তি ওই কোমল দুটি হাতে। শান্তি সাহস জোগাত। ইচ্ছে হতো তোমাকে নিয়ে উড়াল দেই।

অনেক হয়রান করেছে চন্দন।

‘ছেলেটারও মাথা খাচ্ছ ? এত কী গুজগুজ ওর সাঙ্গে!’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলত চন্দন।

তবু আমার মন খারাপ হতো না। সুযোগ পেলেই তোমার গা লেপ্টে বসে থাকার সুযোগ তখনও ছিল। কবিতা শোনাতে তুমি। আমি ভরে উঠতাম। ওরা যাই হোক, আমি তোমার কাছ থেকে সাহস ধার নিতাম।

সেই সাহস ছিনতাই করার মহড়া ছিলÑনোটিশ ছাড়াই বাড়ি ছাড়ার প্রসঙ্গ এল।

‘বাড়ি ছেড়ে যাবা ভালো কথা, খুব ভালো কথা, কিন্তু যেভাবে আসা হয়েছিল ঠিক সেভাবেই যেতে হবে।’

সেভাবেই যাব তোÑ কিছুই চাই নাÑসব ফেলে চলে যাব, প্রকাশ্যে নয়, নিজের মনকে বলি।

শাশুড়ি একটা বোঝাপড়ার চেষ্টা করেছিল, সে পথে যায়নি চন্দন।

‘ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে ?  ভুলেও ভেব না। ছেলে এই বাড়িতে আমার কাছে থাকবে’ বাড়ি দেখিয়ে, বুকে টোকা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল চন্দন।

শরীরের সব জোর জোয়ারে হারিয়ে গেল। সাহসের শেষ বিন্দু চন্দন ঘষে তুলে দিল। যেন এই মাত্র ঘর পুড়ে কাঠকয়লাÑআমি বিহ্বল হয়ে আগুন আর ছাই দেখছি।

তবু তোমার কোমল দুহাত আমাকে ছুঁয়ে দিল, ‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কেস হবে, আমি জানি তুমিই কেস এ জিতবে। আমি তোমাকে সাহায্য করব।’

তোমার কথা পুঁজি করে আমি বাড়ি ছাড়লাম। বেরিয়ে এলাম তেরো বছরের বিচ্ছিরি সম্পর্ক থেকে।

শুরু হলো আইনি লড়াই। সন্তানকে মায়ের কাছে পাওয়ার লড়াই।

পায়রার নীড় খোঁজার লড়াই।

চাকরি জুটল। ছোট একটা বাসা নেয়া যেত। নেয়া হয়নি। একটা ঘরের স্বপ্ন তো শুধু আমার নিজের নয় তা তোমাকে নিয়ে। বাসা ভাড়া না করে শ্যাওলা-ধরা দেয়ালের হোস্টেল রুম।

ছোট্ট বাসার স্বপ্ন তো আমাদের দু’জনের ছিল, একা তাতে কীভাবে রঙ মেশাব ?

আর এখন তো ছোট্ট বাসার স্বপ্ন অনেক দূরে, এতই দূরে যে, আমি হাতড়ে হাতড়ে বেহাল হই।

আর আরও বেহাল হয়েছি কোর্টের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে। সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসার পর কোর্ট-কাছারি প্রায় ভাতমাছ হয়ে গেল।

আর এর সঙ্গে যুক্ত হলো রিনার কেইসটাও।

সেদিন সন্ধ্যা রাতেই অফিস থেকে হোস্টেলের রুমে ফিরছিলাম। গরম কমে বাতাসে হালকা শীত শীত ভাব দেখেই মনে হলো, তোমার জন্য একটা সোয়েটার বানাব।

রাস্তার বাঁক ঘুরে উলের দোকানে চলে গেলাম। কয়েক রঙের উল কিনে যখন ফিরছি তখন বাজারে বহুকালের পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা। গল্পে গল্পে কখন রাত বেড়ে গেছে বুঝিনি।

এ শহরে এই রাত গভীর নয়Ñন’টা বা সাড়ে ন’টা।

আমি রিকশার ভাড়া বাঁচিয়ে হেঁটেই আসছিলাম। একটু পা চালিয়ে আমি তখন প্রায় হোস্টেলের কাছাকাছি। কাছেই জায়গাটা নিরিবিলি। লোকজন কম।

গলির মুখে ঢুকছি। দুই-একটা মোটর বাইক হুশ করিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল গা ঘেঁষে। বাকি সব নিশ্চুপ। একটু এগিয়ে যেতেই কানে এলো গোঙানির আওয়াজ।

আমার মন আবার উড়ুক্কুÑসুনসান জায়গা অথচ ভয় হল না। আমি আওয়াজ কানে তুলে এগোতে লাগলাম। অন্ধকার গলির সে কোণটা আরও বেশি ঘুটঘুটে সেদিকে এগিয়ে যাই। চোখে পড়ে একটা ভাঙা ঘর। কয়েকটা ছেলে সেখানে রিনাকে ঘিরে রেখেছে। এদের মধ্যে একজন রিনার মুখ চেপে ধরে রেখেছে যাতে ও শব্দ করতে না পারে। রিনার চিৎকার গোঙানি হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। রিনার হাত দু’টো ওরই ওড়না দিয়ে পেছনে বাঁধা। ছেলেগুলোর অশ্লীল শব্দ আর অঙ্গভঙ্গি রিনা দেখে ছটফট করছে।

আমি হঠাৎ চিৎকার করা শুরু করলাম। আচমকা চিৎকারে ছেলেগুলো ভড়কে গেল। ক্রমাগত আমার চিৎকারে আশেপাশের বাড়ি থেকে মানুষ বেরিয়ে এল। রিনা ছুটে আমার কাছে আসতেই, ছেলেগুলো ভাঙা দেয়াল টপকে সুরসুর করে কেটে পড়ল।

রিনাও খুব সাহসী মেয়ে। ও সেদিন রাতেই আমাকে নিয়ে থানায় গেল।

থানাগুলোর অবস্থা তো জানই। আমরা রাতে বাইরে ছিলাম কেন তা নিয়েই তাদের মাথাব্যথা বেশি। আর সবিস্তার বর্ণনা তো আছেই। কোথায় হাত দিয়েছে ? কত সময় হাত দিয়েছে? আপনি অত রাতে বাইরে কেন ?

শব্দ ছুড়েই  মলেস্টেশন। আমাদের তাই মনে হচ্ছিল। ওরাও ফকফক করে হাসছিল। রিনা সাহস হারায়নি। আমিও না।

আমি তখনও জানি না, এই ঘটনা আমার জীবন দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারে!

তখন শুধু আমি রিনার জন্য ন্যায়বিচার চেয়েছি।

রিনা আমার হোস্টেল-মেট। তবে খুব বেশি পরিচয় ছিল না। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় যতটুকু দেখা হত, তাতে ওই মুখ-চেনা পর্যন্তই পরিচয় ছিল।

ওই ঘটনার পর আমি রিনার পরম আত্মীয় হয়ে উঠলাম।

রিনাও মা-হারা। বাবা স্কুলের শিক্ষক খুব নিরীহ ভদ্রলোক। রিনার সব বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। সবার ছোট রিনা বাবার কাছে অনুনয় করে এখানে পড়তে এসেছে।

রিনার নিপাট ভদ্রলোক বাবা যেভাবে রিনার পাশে এসে দাঁড়াল, তাতে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। খুশিও হয়েছি।

পৃথিবীতে আসলে সাহসী মানুষ খুব কম নেই। ভরসা পেলাম।

রিনার বোনরা সম্পর্কে দাড়ি টানল। লোকজানাজানির ভয়ে তারা কাতর ও বিরক্ত। বোনরা গা ঢাকা দিল। রিনার বোন হয়ে উঠলাম আমি।

‘পায়রা আপা, তুমি সত্যিই যাবে কোর্টে সাক্ষী হয়ে ? ওরা তো ভালো না। তোমার ভয় লাগবে না ?’

অথবা, ‘পায়রা আপা, এই কেস মিটে গেলে আমি গ্রামে ফিরে যাব। তুমিও যাবে আমার সঙ্গে। কী করবে এই হোস্টেলে পড়ে থেকে।’ রিনা বলত।

রিনা তো জানত না, আমি তোমার অপেক্ষায় আছি। তুমি একেবারে চলে এলে এই হোস্টেল ছেড়ে আমরা ছেট বাসা নেব। সেখানে আমরা একসঙ্গে কবিতা পড়ব, তুমি গিটারে টুং টাং সুর তুলতেই আমি সুর মেলাব।

কত স্বপ্ন আমাদের!

কিন্তু রিনাকে সাহায্য করার এই সদিচ্ছা যে তোমাকে আমার কাছ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নেবে, আমি তখনও বুঝিনি।

তুমি সেদিন আমাকে অনেকবার সতর্ক করেছিলে। আর সেদিনই তো আমাদের শেষ দেখা হলো।

অনেক কষ্টে সুযোগ বের করে সেদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলে। আসলে দেখতে নয়, তুমি শেষ কথা বলতে এসেছিলে। আমিই বুঝিনি তখন। আমার বোঝার ব্যর্থতা তোমাকে বিরক্ত করেছিল,

‘দু’টো কেস জড়িয়ে যাবে। রিনার মলেস্টেশনের কেস এর জন্য তুমি তোমার কেস এ হারবে। আমাদের আর একসঙ্গে থাকা হবে না।’

আমি তোমার বিরক্তি বাড়িয়ে অবুঝের মতো সেদিন বারবার একই কথা বলেছি,

‘কীভাবে তা হয় ? দু’টো কেস সম্পূর্ণ ভিন্ন। রিনার কেস এ আমি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। আমি কোর্টে না গেলে মেয়েটার সঙ্গে অন্যায়ের বিচার হবে না। আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, ছোট একটা বাসা খুব তাড়াতাড়ি আমাদের হবে।’

প্রচন্ড বিরক্তিতে ‘হবে না’ বলে তুমি সেদিন চলে গেলে।

যদি জানতাম ওই দেখাই তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা, তাহলে এত তাড়াতাড়ি ছাড়ি তোমাকে ? জমানো কথারা বুকে হিম হয় আছেÑগলে বেরিয়ে পড়তে চাইছে।

আমার সাক্ষ্য রিনাকে ন্যায়বিচার পেতে সাহয্য করেছিল। ছেলেগুলোর শাস্তি হয়েছিল।

কিন্তু আমার মামলার মোড় মোচড় মেরে ঘুরে গেল!

আদালতে বলা হল, আমি রাত-বিরেতে ফিরি। অন্যায়ের প্রতিবাদ ভালো। কিন্তু সমস্যায় নিজেকে জড়ানো আমার স্বভাব। দৌড়-ঝাঁপ করে আমি বিপদ ডেকে আনি। নিজেই নিজেকে বিপন্ন করি। আমার জীবনও হুমকির মুখেÑআমার সাংসারিক দায়বোধ কম। তোমাকে আমার পাশে রাখা তাই ঝুঁকিপূর্ণ।

তোমার সঙ্গে থাকার উপযুক্ত নই আমি।

ঝুঁকিপূর্ণ।

রিস্ক ফ্যাক্টর।

অনিরাপদ।

আমি তোমার জন্য অনিরাপদÑঝুঁকিপূর্ণ! ঝুঁকিপূর্ণ কথাটা কেউটের মতো ছোবল মারে আমাকে। মাত্র একটা শব্দে এত বিষ! না, এখন আর আমি ছটফট করি না। নীড়ের স্বপ্ন বা স্বপ্নের নীড় ভেসে গেল। পায়রার নীড়!

প্রায় তিন মাস তোমার সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই। কেমন আছ জানি না। বিদেশে থাকা এক আত্মীয়ার কাছে তুমি চলে যাবে শুনছি। সব দায় শোধবোধ হয়ে গেছে। যেতেই পার নিরাপদ আশ্রয়ে।

তখন আমার কথা মনে পড়বে তোমার! আমলকী গাছÑরোদ-ছায়াÑভোকাট্টা ঘুড়িÑমনে পড়বে! নাকি সাগরের নোনা জলে হাত-পা ধুয়ে নতুন মানুষ হয়ে যাবে!

নতুন তুমি কী আমায় চিনতে পারবে ?

আমি চিনতে পারব তোমাকে তোমার ছায়াসুদ্ধ। তুমি যতই বদলে যাও আমি চিনতে পারব। তোমার চুলের ঘ্রাণ, কপালে বিরক্তির ভাঁজ, থুঁতনির দাগ আমি ঠিক পড়তে পারব।

যেহেতু ভোকাট্টা হতে চাইনি তাই দেখার তৃষ্ণা নিয়ে থাকব।

কিন্তু এই অপেক্ষার কাল কত দীর্ঘ হবে! কত বড় কালসাপ হবে এই অপেক্ষার প্রহর!

অপেক্ষায় তাই ভয় ধরে গেছে। অপেক্ষার বিষদাঁত এখন আমাকে তাড়ায়। তাই ভেতর থেকে অবিরত শুনি, দে ছুট, তোর নাম পায়রা, এবার উড়ে যা! স্মৃতি-ঘ্রাণ, রোদ-ছায়া সব নিবুনিবু।

এসব মনে রেখ না। এসব তোমার স্মৃতির খোঁড়ল থেকে ঝেটিয়ে ফেলে দিয়োÑ

নাহলে ভারবাহী হবেÑ

কে কবে সারাজীবন ছটফটানির বোঝা টেনেছে!

ইতি

পায়রা

পুনশ্চঃ

পনেরো বছরের স্বাক্ষর মায়ের এই সুইসাইড নোট পাওয়ার পর আর কখনও নির্ঘুম রাতের জাল কেটে বের হতে পারেনি।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares