গল্প : আশ্রয় : সুব্রত মন্ডল

আগস্টের মাঝামাঝি। গত পরশু লোকদেখানও স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়েছে। সারাদুপুর ব্যস্ত শীলভদ্র ঘেমে-নেয়ে একাকার। যদিও তিনি ইতিহাসের শিক্ষক, তবুও স্কুলের শিক্ষামূলক ভ্রমণের দায়িত্বের পুরোভাগেই তিনি রয়েছেন। ছাত্র ও শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা তোলা, আইডি কার্ড বানানো, বড় বাস ঠিক করা, রাঁধুনির সঙ্গে কথা বলা, মেনু অনুযায়ী তিনদিনের বাজার করা―সমস্ত কিছুই। ভূগোলের শিক্ষক মৃণালের সঙ্গে আলোচনা করে উনি একাই দায়িত্ব নিয়ে সামলেছেন। অভিভাবকদের কাছ থেকে মাঙ্গলিক টা-টা আদান প্রদান করে বাস ‘শ্রী দুর্গা’ বনগাঁ স্টেডিয়াম মোড় থেকে ছাড়লো ঠিক বিকাল চারটায়। পূর্বনির্ধারিত সিটে বসে ছাত্র-শিক্ষকেরা অজানা আনন্দে পুলকিত। এবারের গন্তব্য রাজগীর, নালন্দা, গয়া, বুদ্ধ গয়া।

বাস পৌঁছাল রাজগীর শহরে ঠিক ভোর পাঁচটা নাগাদ। কেউ কেউ ঘুমিয়ে। বেশিরভাগই চোখ খুলে চারদিকে পাহাড় দেখে অবাক। ছাত্ররা ‘ওই দেখ পাহাড়, ওই আর একটা’ এ-সব বলে বাসের মধ্যেই হুল্লোড় বাধিয়ে দিল। শীলভদ্র বসেছিল কেবিনে। সবচেয়ে ভালো আর বেশি করে দেখতে পাচ্ছিল সে-ই। বাসের সামনে বসে শীলভদ্রের মনের মধ্যে গেঁথে থাকা ইতিহাসের স্মৃতির ইটগুলো এক এক করে খসতে থাকল। হঠাৎ সম্বিত ফিরল ড্রাইভারের উচ্চকিত ডাকে, ‘দাদা, ওই যে হোটেল রাজলক্ষী।’ ব্যস্তসমস্ত হয়ে শীলভদ্র বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ এই তো। এই মৃণাল, সবাইকে নামার জন্য তৈরি হতে বলো। আর মিন্টুকে আমার সঙ্গে হোটেলে আসতে বলো। রুম অনুযায়ী ছাত্র ও শিক্ষককে অ্যালার্ট করতে হবে।’ মৃণাল আর মিন্টু শীলভদ্রের খুব কাছের বন্ধু, সহকর্মী, সহশিক্ষক―সব কর্মকাণ্ডের সাথী। ‘আমি এদিকটা দেখছি। মিন্টুকে পাঠাচ্ছি। তুমি হোটেল আর টিফিনের ব্যাপারটা দেখো।’ বলে মৃণাল ব্যস্ত হলো।

এক এক করে সবাই নামল বাস থেকে। রাঁধুনি সমীর দা’কে লুচি আর ছোলার ডাল টিফিনে দিতে বলে শীলভদ্র এক এক রুমে চারজন করে নির্দিষ্ট করে দিয়ে সবাইকে বলে দিল, ‘আজ লোকাল সাইট সিন। কাল নালন্দা, পাওয়াপুরি। ঝটপট তৈরি হয়ে নাও। ঠিক সাড়ে সাতটায় বের হতে হবে।’ 

স্নান, টিফিন করে বেরোতে বেরোতে আটটা বাজল। সবাই হোটেলের সামনে আস্তে আস্তে জড়ো হচ্ছে। খেয়াল হলো টাঙ্গা গাড়ির চালকরাও মধুলোভী মৌমাছির মতো হাজির। ঠিক বোঝেও ওরা। শীলভদ্র’র সঙ্গে দরাদরি করে টাঙ্গা ওয়ালারা দশজন রেডি হলো। সবার প্রথমে থাকল শীলভদ্র, মৃণাল, মিন্টু, রাজীব ও উত্তম। এরপর আরও ন’টা গাড়ি। কথায় কথায় শীলভদ্র আলাপ জমালো গাড়োয়ানের সঙ্গে। সে মাঝে মাঝেই বলছে, ‘ভাগ তেজ ভাগ। আউর জোরসে।’ রোদ বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে রোদের সঙ্গে শীলভদ্রের উত্তেজনার পারদও চড়ছে। প্রাচীন কঙ্কালসার ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে। রক্তের ধারায় লাগছে অজানা আনন্দের দোলা। টাঙ্গায় গাড়োয়ানের পাশেই বসে ছিল শীলভদ্র। আলাপ জমানোর অছিলার সুরে শীলভদ্র বলল, ‘আচ্ছা দাদা আপনার নাম কী ? জানা থাকলে ডাকতে বা কথা বলতে সুবিধা হয়। সারাদিন তো প্রায় আপনার গাড়িতেই কাটবে।’ কথা শেষ হতে না হতেই জবাব এল, ‘মিঞা, মেরা নাম হযরত মিঞা।’ তার মুখের কথা প্রায় কেড়ে নিয়ে শীলভদ্র বলে উঠল―

 ‘তা মিঞা ভাই, কত বছর এই গাড়ি চালাচ্ছ ?’

 ‘তা পঁচ্চিশ সাল তো বোটেই।’ বাঙালি পর্যটকদের সঙ্গে মিশতে মিশতে বাংলা শিখে ফেলেছে মিঞা। কিন্তু হিন্দি’র টান তো আছেই। শুনতে খুব একটা খারাপ লাগে না।

‘বাব্বা পঁচিশ বছর!’ বিস্মিত হলো শীল।

 ‘হ্যাঁ, এ তো আমাদের বাপ কাকাদের ব্যাওসা।’

‘তোমার ঘোড়াটা কিন্তু দারুণ। যে রকম কালো কুচকুচে রং, সেরকম তাগড়াই চেহারা। আর ছুটছে দেখো কী রাজসিক ভঙ্গিমা!’ মুগ্ধ হলো শীল।

 ‘হ্যাঁ, ইটা আমার পয়া ঘোড়া আছে বাবু। সার্ভিসও দিচ্ছে দারুণ।’

ঘোড়া নিয়ে অহংকারও একটু আছে। বছর পঞ্চাশের মিঞা ভাইয়ের ছোট করে ছাঁটা চুলে এবং কিছুটা লেনিন মার্কা দাড়িতে পাক ধরেছে ফিফটি ফিফটি। না থেমে আরও বলতে লাগল, ‘ই ঘোড়া কিনেছিলাম ষাট হাজার টাকা দিয়ে। তাও পাঁচ সাল হোয়ে গেল। দেখতে ইরকম এমনি এমনি নয় বাবু। ইয়ার পিছনে বহুৎ খরোচ আছে।’

‘কী রকম কী রকম ?’ শীলভদ্রের কৌতূহল বাড়তে থাকে।

‘তা বাবু, আমরা খাই না খাই উকে ছোলা, লঙ্কা, ছাতু খাওয়াতেই হোবে। গায়ে তেলভি মালিশ করি। আর বিমার হোলে তো কোথাই নেই। খরোচের পর খরোচ। তাও তো আপনারা দোরদাম কোরবেন। একটু ধরে দিবেন।  কিছু না হোক আমার তেজের জন্য একটু দিয়েন।’ বলেই হাতের লাগাম জোরে ওপর থেকে নিচের দিকে ঝাঁকুনি দিয়ে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, ‘এই হ্যাট হ্যাট। চোলরে তেজ, আউর জোরসে চোল।’

‘তোমার ঘোড়ার নাম বুঝি তেজ ?’ শীলের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি।

‘হ্যাঁ বাবু, ইয়ার নাম রাখছি তেজ।’

‘বাহ বেশ, একেবারে ঠিক নাম হয়েছে মিঞা ভাই।’

চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়। রাজগীর শহরকে ঘিরে রেখেছে পাঁচ-পাঁচটা পাহাড়। ইতিহাসের পাতা জানান দিচ্ছে, প্রাচীন মগধ রাজ্যের রাজধানী ছিল এই রাজগীর। চারদিকে পাহাড় থাকায় বহিঃশত্রুর হঠাৎ আক্রমণের সম্ভাবনা কম। প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন এই জায়গা রাজা অশোক, বিম্বিসার, জরাসন্ধ, মহাবীর প্রমুখ ইতিহাস বিখ্যাত ব্যক্তিদের রাজধানী ছিল। ইতিহাসের ছাত্র এবং শিক্ষক শীলভদ্রের অসম্ভব এক ভালোলাগার পারদ ধীরে ধীরে ওঠা রোদের মত চড়ছিল।

এক একটা স্পটে নামা। সেটা দেখার পর আবার টাঙ্গায় ওঠা। আবার নামা। আবার ওঠা। মিঞা ভাই মূল গাইড। প্রথমে নিয়ে গেল মনিয়ার মাঠ। তারপর সোনা ভাণ্ডার। বেনুবন। বাঁশ গাছের কৃত্রিম বন। পার্কের মতো তৈরি করা। এখানে নাকি ভগবান গৌতম বুদ্ধের কিছুদিনের আবাস ছিল। সংলগ্ন পুকুরটি বড় চমৎকার! কী বড় বড় মাছ! এখানে গৌতম বুদ্ধ স্নান করতেন। এরপর রোপ ওয়ে করে গৃধকূট পাহাড়ের উপর ওঠা। ওপরে বিশ্বশান্তি সাঁচি স্তূপ। গৌতম বুদ্ধের ধ্যানের স্থান। শীলভদ্র কেবলই ভাবে, সেসময় রোপ ওয়ে ছিল না। বুদ্ধ পায়ে হেঁটে নিশ্চয়ই এই এত উঁচু পাহাড়ের মাথায় উঠে ছিলেন। কৃচ্ছ্রসাধন আর কাকে বলে!

টাঙ্গা গাড়িতে ওঠা নামা, নামা ওঠা। বেশ ভালোই লাগছিল। টাঙ্গার সামনের দিকে ডান পাশে গাড়োয়ানের গা ঘেঁষেই বারবার বসছিল শীলভদ্র। আজকে প্রাণভরে দেখছিল। কী তেজ! কী বিক্রম! কী দারুণ রাজকীয় ভঙ্গিমা! যখন একটু জোরে ছুটছিল তখনই আরও ভালো লাগছিল। এতদিন সিনেমা বা অ্যানিম্যাল প্লানেটে দেখেছিল ঘোড়ার দৌড়। কিন্তু বাস্তবে একেবারে দু’হাত দূর থেকেই এই রাজকীয় ভঙ্গিমা চোখের আরাম আর মনের আনন্দ জোগাচ্ছে অফুরান। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কালো রং যে এত আড়ম্বরপূর্ণ হতে পারে তাই-ই শীলভদ্র ভাবছে। ছোটার তালে তালে কেশর দুলছিল। কী অনুপম দৃশ্য! সত্যিই পুরুষালি চেহারা।

এবার উষ্ণ প্রস্রবণ। ছাত্ররা শৃংখলাবদ্ধ ভাবেই প্রত্যেকটা স্পট ঘুরছিল। যাদের এই বছর প্রথম স্কুল ট্যুর তারা আনন্দে আত্মহারা। আবেগে বিহ্বল। এখানে কাউকে স্নান করতে দেওয়া হলো না। কেউ গোড়ালি ডোবাল, কেউবা একটু ছুঁয়ে দেখল। আবার সবাই যে যার নির্ধারিত টাঙ্গায় ফিরছে। হঠাৎ শীলভদ্রের নজর আটকে গেল তেজের কপালে। সাদা রং করা যেন একটা চোখের আকারের তিলক আঁকা।      

রাজগীর শহর থেকে একটু উত্তর দিকে বেরিয়ে এসে হোটেল রাজলক্ষী। শহরটার সব ভালো। শুধু রাস্তার ওপর ছড়িয়ে থাকা ঘোড়ার বিষ্ঠা শীলভদ্রর ভালো লাগল না। যাইহোক হযরত মিঞার ফোন নম্বর নিল শীলভদ্র, যদি ভবিষ্যতে কাজে লাগে। মিঞাকে ছাড়বার আগে পঞ্চাশ টাকা ব্যক্তিগত বকশিস দিল। আরও ভালো করে লক্ষ্য করল তেজের ডানকানটা অল্প একটু ভি আকৃতির চেরা। কোনও কারণে কেটে গিয়েছিল হয়তো। পরের দিন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, পাওয়াপুরি এবং তার পরের দিন গয়া, বুদ্ধ গয়া করে রাতে খাওয়া দাওয়ার পর বাস ছেড়ে সকাল এগারটার মধ্যে বনগাঁ পৌঁছাল শীলভদ্ররা।

এরপর প্রায় ছয় বছর কেটে গেছে। প্রতিবছর এই শিক্ষামূলক ভ্রমণ হয়। তারপর দারিংবারি, ভাইজাক, পুরী, পুরুলিয়া নানা জায়গায় ভ্রমণ হয়েছে। এইবার শীলভদ্ররা চারজন কলিগ সপরিবারে চলেছে রাজগীর। ছাব্বিশে ডিসেম্বর থেকে ঊনত্রিশে ডিসেম্বর।  এবারের শীত উদ্যাপন করবে রাজগীরে। দুটো টাটা সুমোতে চারটি পরিবার। বেরোবার একদিন আগে পাড়ার কানকাটা কাকুর ঘটনায় শীলভদ্র মনে মনে বেশ অস্বস্তিবোধ করে। মনটা ভারী হয়ে আছে।

কানকাটা কাকু হলেন বিজন সরকার।

দুটো মেয়ের বিয়ে হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারে। আর ছেলেদুটোর উপার্জন তথৈবচ। বড় জন গেঞ্জির কারখানায় কাজ করে। আর ছোটজন ফুচকা বেচে। দুজনেরই একটা করে ছেলে আর মেয়ে। অভাব, টানাটানি, হাতে এখন পয়সা নেই―এগুলো সংসারের অলংকার। কাকিমা মারা গিয়েছেন বছর দশেক হলো। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর বিজন কাকুর পরিশ্রমী চেহারায় ভাঙন ধরল। ওপার বাংলা থেকে রাতের অন্ধকারে তারকাঁটা পেরিয়ে আসতে গিয়ে গুলিতে কান ছুঁয়ে যায়। কোনও ক্রমে বেঁচে এপারে এসে ভাগ্যের অনুসন্ধানে নামেন। ভাগ্য নাকি পরিশ্রমীর সঙ্গে থাকে, সেই সূত্রে বিজন বাবুর ঠাঁই হলো সুভাষ কলোনির একেবারে প্রান্তে। একটা চাঁচের ঘর। মেলায় মেলায় ‘হরেক মাল পাঁচ সিকে’র অস্থায়ী দোকান দেওয়া। বিয়ে। দুই মেয়ে দুই ছেলে। কোনও রকমে মানুষ করা। ছেলেরা কতটা মানুষ হয়েছে কে জানে। কিছুদিন বিজন বাবু ফুটবলের মতো একবার বড় ছেলে একবার ছোট ছেলের কাছে লাথি খেয়ে বেড়িয়েছেন। মাত্র দুজনের বাপ গঙ্গা না পাওয়ার অবস্থা। গত পরশুদিন বিজন কাকু এসেছিলেন শীলভদ্রের কাছে। ভাঙা গলায় বললেন, ‘বাবা, দুটো ছেলের কেউই তো আর রাখতে চাইছে না। দেখো না তুমি যদি আমাদের এই বৃদ্ধাশ্রমে একটা ব্যবস্থা করে দিতে পার।’ 

‘সে কী কাকু! ওরা কেন আপনাকে রাখবে না ? এটা তো ওদের কর্তব্য। দুজনে বছরের অর্ধেক সময় ভাগাভাগি করে রাখুক।’

 ‘আর কর্তব্য! আমারই দোষ। আমি তো ওদের মানুষ করতে পারিনি। আগে তবু টুকটাক কাজ করতে পারতাম। এখন তো আর কিছুই করতে পারি না। তাই ছেলে বৌমারা আর রাখতে চাইল না। বুড়ো ঘোড়ার কোনও মূল্যই নেই বাবা এ সংসারে।’

‘না না কাকু, এরকম বলবেন না। আমি দেখছি কী করা যায়।’

সঙ্গে সঙ্গে পৌর পিতার সঙ্গে যোগাযোগ করা। বৃদ্ধাশ্রমে বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা। পরশুদিন প্রায় এই করে কেটে গিয়েছিল।

ছয় বছর পর আবার রাজগীরে। তখন গিয়েছিল বাসে, এখন টাটা সুমোতে। চেঞ্জ তেমন কিছু হয়নি। কেবল রাস্তা গুলো আরও বেশি ঝাঁ-চকচকে মনে হচ্ছে। সেই হোটেল রাজলক্ষ্মী। কিছুটা নস্টালজিক হয়ে পড়ছিল। এ শহরে একটা জিনিস পরিবর্তন হয়নি, রাস্তাঘাটে যত্রতত্র অশ্ব বিষ্ঠা’র ছড়িয়ে থাকা। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল তেজের কথা। হযরত মিঞার কথা। বিকালে সবাই যখন হোটেলের ঘরে আড্ডায় ব্যস্ত, তখন শীলভদ্র মৃণালকে সঙ্গে নিয়ে বেরল হযরত আর তেজের  খোঁজে। অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করেও হযরতের কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না। তাহলে তেজের দেখা পাওয়া যাবে কী করে ? দুজনে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যেতে থাকল মূল রাজগীর শহরের দিকে। দুপাশে হোটেলের সারি। পিছনে বাজার। মৃণাল বলছিল, ‘এখানকার কাঁচের চুড়ি বিখ্যাত। দেখবে নাকি বৌদিদের জন্য ?’

কিছুটা এগিয়ে আসার পর একটা তিন রাস্তার মিলন স্থল। একটা গেছে উত্তরদিকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, আর একটা দক্ষিণ দিকে মূল শহর, আর একটা হোটেলের রাস্তা যেটা দিয়ে ওরা দুজনে আসছিল। চারপাশে ফাঁকা উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো ঘাসে ঢাকা জমি। পড়ন্ত বিকেলে এক অনুপম দৃশ্যপট রচনা করেছে। পাহাড়ের পিছনে এখনই সূর্যটা যেন টুক করে লুকিয়ে পড়বে। চারিদিকে মাঠে ইতঃস্তত ঘোড়া ছড়িয়ে রয়েছে। কেউ বা দাঁড়িয়ে কেউ বা শুয়ে।               

চারিদিক আবছা হয়ে আসছে। কুয়াশা নামছে। রাস্তার বাঁদিকের ঢাল বেয়ে নিচে একটা ঘোড়ার দিকে শীলভদ্রের চোখ আটকে গেল। ছুটে গেল দুজনে। ঘোড়াটা ধুঁকছে। বয়সের ভারে অথবা অসুখের কারণে হবে হয়তো। কিন্তু হঠাৎ শীলভদ্রের সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। একি দেখছে সে! সত্যিই কি এটা সেই ঘোড়া! ছয় বছর আগের বিক্রম কোথায় গেল ? কপালের তিলক আজও অমলিন। এর মালিক কোথায় ? হযরত এইভাবে এখানে ফেলে রেখেছে কেন ? এর কোনও আশ্রয় নেই ? এই শীতে বাইরে বাঁচবে কী করে ? বর্ষাতেই বা ছিল কী করে ? এদের তো আর কোন উপার্জনক্ষম ছেলে নেই, যেখানে বুড়ো বয়সে আশ্রয় নেবে! নিদেনপক্ষে বৃদ্ধাশ্রম এর মতো এদের জন্য কোনও বৃদ্ধ আস্তাবল নেই, যেখানে মিলবে একটুখানি খাদ্য আর বাসস্থানের নিশ্চিত আশ্বাস।

চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। উত্তম ফোন করছে, ‘তোমরা কোথায় ?’ ‘এই তো আসছি’ বলে শীলভদ্র ফোন কেটে দিল চিন্তামগ্ন শ্লথ আঙ্গুলের টাচে। এরপর মোবাইলের টর্চ জ্বালালো। সন্দেহ হলো সাদা তিলক তো অনেক কালো ঘোড়ার থাকতেই পারে। কিন্তু ঝুঁকে পড়ে শীলভদ্র লক্ষ্য করল পাঁজরের হাড় প্রায় বেরিয়ে পড়েছে। ঘাড়ের কেশর নেতিয়ে পড়া ম্লান। চোখ থেকে অশ্রু ধারা গড়িয়ে পড়তে পড়তে যে পথের সৃষ্টি করেছে, তাও শুকনো। কানের দিকে নজর যেতেই শীলভদ্রর বুকটা ধড়াস করে উঠল। ডান কানটা কাটা। রাস্তার বাতি স্তম্ভের আলো আরওঝ যেন আবছা হয়ে উঠল শীলভদ্রের কাছে। হঠাৎ শীতের অন্ধকারের বুকচিরে হিমেল ছুরি চালিয়ে  ছ’বছর আগেকার চেনা আওয়াজ শীলভদ্রের কান গরম করে তুলল, ‘এই হ্যাট হ্যাট, চোল চোল।’

লেখক : গল্পকার

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares