গল্প : কবিজনম : সুফি বাংলার পান্থ

হিমালয় কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে এখন ব্ল্যাক ম্যাজিক সাধনাও শুরু করেছে। সন্ধ্যাবেলায় মেসের জানালা দরজা বন্ধ করে কবি ধ্যানে বসে।

কবিরা নতুন নতুন শব্দের জন্যে অশ্বত্থ ও পাকুর গাছের নিচে দিনের পর দিন সাধনা করবে। আলো বাতাস, গাছের পাকা ফল ও অল্প জল খেয়ে কবি বাঁচবে, কবিতা লিখবে―সমস্যা তো দেখি না! নতুন কবিতা তো আত্মিক মুক্তি। কিন্তু মহামান্য কবি হিমালয় ব্ল্যাক ম্যাজিক সাধনা করবে, তা কি মেনে নেওয়া যায় ?

সে কি জাদুর কবিতা লিখবে নাকি!

প্রতিদিন সন্ধ্যার পর তার রুমে এসে ধাক্কাধাক্কি করলেও কবি নির্বিকার। গভীর সাধনায় মগ্ন।

কবি হিমালয়ের মতো, সব কবি কী প্রতি সন্ধ্যায় দরজা-জানালার কপাট লাগিয়ে ধ্যান করে কবিতা নামায়।

কবিতা কি ওহি ?

এজন্য কি গর্তে ঢুকে বিচ্ছিন্ন হতে হয় ?

আগুনের পাখনাওয়ালা বিশেষ বার্তাবাহক প্রতি সন্ধ্যায় নতুন কবিতা এনে শুনিয়ে যাবে! কবি শুনে শুনে মনে রাখবে। পরদিন ভোর বেলা নতুন কবিতা নিয়ে পৃথিবীর পথে হাঁটতে বেরিয়ে পড়বে! ব্যাপারটা এমন হবার কথা নয়।

কবি হিমালয়ের জন্যে তো কোনভাবেই হবার নয়। হিমালয় জাত কবি সন্দেহ নেই। ভরা আড্ডায় যখন তখন সে গরম কবিতা বানাতে পারে।

সে মুহূর্তের কবি। প্রতি মুহূর্তে কবিতা তার কাছে এসে লুটোপুটি খায়।

ইদানীং হিমালয়ের লক্ষণ ভালো মনে হচ্ছে না। হঠাৎ হঠাৎ তার রুম থেকে ধূপের গন্ধ আসছে। আগরের গন্ধও হতে পারে। সে কি তবে প্ল্যানচেট করে বড় সব কবিদের ডেকে এনে এনে গল্প করছে। কবিতার ক্লাস করছে ?

তবে মহামান্য কবি সম্পর্কে বাজারে যে কথাগুলো ছড়িয়েছে তা হলো―কবি নাকি হিপ্নোটিজম ও মেসমেরিজম সাধনা করছে। বেশ অনেকদূর নাকি এগিয়েছে!

আশেপাশের লোকজন মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখ ফুটে কিছু তো বলছে না। সত্যি সত্যি কিছু যদি পেয়ে যায় তবে তাদের বিপদ আছে। কবি হিমালয় এক পাগলা কবি। ভালো করে বললে কবি সাহেব একজন পাগল মনের মানুষ। তার পক্ষে যেমন পুরো বারান্দা ব্যালকনি শিশু তামাক গাছে ভরিয়ে ফেলা সম্ভব, ঠিক তেমনি কঙ্কাল ও মানুষের হাড্ডিগুড্ডি এনে বিছানা ভরিয়ে ফেলাও অসম্ভব নয়! তার রুমের হিউম্যান স্ক্যালিটন প্রায় সকলেই দেখছে। লাল টকটকে লম্বা টাওয়েলে সবসময় তা ঢাকা থাকে। সন্ধ্যায় দরজা বন্ধ হলে ও ধূপ বাতি জ্বালানো হলে সে রহস্যময় লালটাওয়েল সরানো হয়। কবি কি শরীরের নার্ভ আর্টারি ও মাসেলের নাম মুখস্থের চেষ্টা চালাচ্ছে ?

নাকি ব্রাকিয়াল ফ্লেক্সাসের ডিসট্রিবিউশান বুঝার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ? মানুষের মাথায় সমস্যা হলে তার পক্ষে এমন একটা ঘটনা ঘটানো কোনও ব্যাপার না। খুব স্বাভাবিক।

সিনিয়র মেস মেম্বার―হরিপদ বাবু একবার কবির রুমে খাটের নিচে একটা প্লাস্টিকের জার দেখতে পায়। ফরমালিন দেওয়া স্কচ্টেপে আটকানো জার।

হরিপদ বাবু আগ্রহ নিয়ে জারের ভিতরে তাকাল। সত্যি সত্যি মানুষের বাচ্চার মতো এক শিশু। কি ভয়ংকর। কবির রুমে  ছয় মাসের মৃত শিশু থাকবে কেন ?

কবি সাহেবকে হরিপদবাবু ভয়ে ভয়ে বাচ্চাটার কথা বললেন। দাদা, শিশুটিকে কেমন জীবন্ত লাগছে। বলুন তো, দেখি বাচ্চাটি কি সত্যি সত্যি মানুষের বাচ্চা ?

কবি হিমালয় খুব শান্তভাবে জবাব দিলেন, মানুষের বাচ্চা হবে কি জন্যে ?

আমি মানুষের এত ছোট বাচ্চা কোথায় পাব ? এটা আর্টফিসিয়াল বেবি।

জিন ভূতের গল্প লেখার সময় বাচ্চাটাকে দেখি। বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য ভূতের গল্প লেখি। ভয় দেখানোর চেষ্টা করি। এখনকার বাচ্চাগুলো যেন কেমন, মানে একটুও ভয় ডর নেই।

ছোটদের জন্যে ভয়ের গল্প লেখি, ওরা পড়ে তো হেসে কুটি কুটি। মনে হচ্ছে কী হাসির কথা বলেছি তাদের! উল্টো ঘটনা ঘটে বড়দের সাথে। তারা সে একই গল্প পড়ে ভয়ে হিম হয়ে যায়! বিষয়টি আমি কিছুতে মেলাতে পারি না। বুঝলেন, হরিপদ বাবু। বড় সমস্যায় আছি। বড় পেরেশানিতে দিন পার করছি। ভাবছি গল্প লেখা ছেড়ে দিব।

হরিপদ বাবু মুখে কিছু বলছেন না। মেকি একটা হাসি দিয়ে কবি সাহেবের সঙ্গে একমত পোষণ করার ভাব করলেন। অভিনয় মনে হয় ঠিকমতো হল না। মহামান্য কবি পরম মমতা নিয়ে হরিপদ বাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, দাদা আপনার কি আজ শরীর খারাপ নাকি ?

হরিপদ বাবু কিছু জবাব দিলেন না। চোখ বড় বড় করে একদৃষ্টিতে ফরমালিনের জারের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আর্টিফিসিয়াল বেবি, কিন্তু কি জীবন্ত! তিনি হাসি হাসি মুখ করে রুম হতে বের হয়ে চলে গেলেন।

ঘটনা এখানে শেষ হতে পারত। কিন্তু  তা হলো না। বেশ জট পাকিয়ে গেল।

হরিপদ বাবু কবিতীর্থ থেকে বের হওয়ার পর জ্বরে পড়লেন। উথাল-পাতাল জ্বর। সে সব সময় ভয়ে অস্থির হয়ে থাকেন। প্রায় আমার শরীর কাঁপে। জ্বর আসে। তিনি ভয়ার্ত চোখে একদৃষ্টিতে ওপরে সিলিং দেখতে থাকেন।

তার জবান বন্ধ হয়ে গেল। তিনি সাগু আর ডাবের পানি ছাড়া কিছু খেতে পারছেন না। প্রায় দু’সপ্তাহ ভুগে তিনি সুস্থ হলেন। তার শরীর অর্ধেক হয়ে গেছে। চোখ কোঠরে ঢুকে গেছে। চোখের চারপাশে কালি পড়ে গেছে। তাকে দেখলে অনেকটা মৃত মানুষের মতো মনে হয়। তিনি বিছানা থেকে উঠে পুরো মেসে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছেন।

মহান কবি হিমালয়ের রুমে, নাকি ছয় মাসের এক বাচ্চা আছে। বাচ্চার নখ, চুল সব উঠেছে। দেখতে ধবধবে ফর্সা। চেহারা হাসি-খুশি। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, তিনি নিজে বাচ্চাটির চোখের পাতা নড়াতে দেখেছেন! শুধু তাই নয় কবি নাকি সাধনা করে বাচ্চাটিকে জীবিত করার চেষ্টা করছেন! প্রতিদিন নাকি কবি দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে শিশুটিকে বাঁচানোর চেষ্টা চালান। কি সব-ম্যাজিক সাধনা করেন।

পরে এসব শুনে মেস-মেম্বাররা একদিন হিমালয়ের রুম সব উলট পালট করে কোনও ফরমালিনে ডুবানো শিশু দেখতে পায়নি, শুধু একটা বার্বিডল পেয়েছে। যে পুতুলটি চাবি দিলে শব্দ করে হাতে তালি দেয়। প্রায় দেড় মিনিটের মতো হাততালি চলে। হরিপদকে বিষয়টি বললে তিনি সবাইকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করলেন! এত ভালো মানুষটি শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গেল!

সবার হরিপদর জন্যে খুব মায়া হয়। তাকে মনে হয় খুব দ্রুত রিহ্যাবে পাঠাতে হবে। চেম্বারের সিরিয়াল নিয়ে ডাক্তার দেখানোর সময় বেশ আগেই পার হয়ে গেছে।

মজার ব্যাপার হলেও হরিপদ বাবু মেসের মালিকসহ সকলকে গালাগালি করলেও মহান কবি সম্পর্কে কখনো কিছু বলেন না। গালাগালির প্রশ্নই ওঠে না। বিষয়টি বেশ রহস্যময়। এবার মহান কবির হিপ্নোটিজম ও মেসমেরিজম বিষয়ে আসি। কবি মানুষকে হিপ্নোটিজম ও মেসমেরিজম করার কলাকৌশল শেখার একাগ্র সাধনা করছে। তার চারপাশের মানুষদের সম্মোহিত করাই তার উদ্দেশ্য।

কবি মেসমেরিজমের প্রায় ১০টি বিষয় নিয়ে সাধনা করছে। কিছু বিষয় পাঠকদের অগ্রিম জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে। বিষয়গুলো অর্ডিয়েন্স কিংবা তার চারপাশের মানুষের জন্যে প্রযোজ্য হবে।

১. এরোপ্লেন চালাইবার দৃশ্য

২. নাপিতের সেলুনের দৃশ্য

৩. ঘোড়ায় চড়িবার দৃশ্য

৪. শরীরে পিন ফোটানো

৫. দেহকে শক্ত করানো

৬. নিজেদের নাকের ইলাসটিসিটি

৭. পরীর মিষ্টি খাওয়ানো

৮. দু’চোখ বন্ধ করানো

বাকি দুটো হলো অর্ডিয়েন্সকে হাসতে বাধ্য করা। কারণে অকারণে তারা হাসতে থাকবে। অন্যটি শেষের প্রক্রিয়া―

অর্থাৎ চারপাশের মানুষজন একসাথে গাইতে ও নাচতে শুরু করবে। মেসমেরিজমের কথাগুলো জাদুবিদ্যা বইয়ের ভাষায় জানালে ভালো হয়―

‘সম্মোহিত করবার দশ প্রকার ক্রিয়া দেখাইবার উপায় এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। আগ্রহীরা ইচ্ছা করিলে নিজেদের ইচ্ছামতো যে-কোনও দৃশ্যের অবতারণা করিতে পারিবেন। জাদুবিদ্যা বা সম্মোহন বিদ্যার প্রকৃত কথা হলো অর্ডিয়েন্সকে সম্মোহিত করার পর তাহাকে যে রূপ আদেশ দেওয়া হইবে, সে সেরূপ কর্ম সম্পাদন করিবে। তার এ অবস্থায় কোনও জ্ঞান থাকে না। ম্যাজিশিয়ান যেভাবে ইচ্ছা করেন, সেভাবে তিনি ম্যাজিক দেখাইতে পারেন।’

সত্যি! জীবন অনেক রহস্যময়। সব রহস্যের উত্তর যে জাদুকরদের কাছে আছে এমনটিও নয়। কবি গতকাল রাতে ঘুমাতে পারেনি। অনেকদিন পর আজ আবার ভোর হতে দেখল। সকাল হতে দেখাটা অবশ্যি বিশেষ কিছু।

হিমালয় কবি হওয়ার শুরুর দিনগুলোতে প্রায় প্রতিদিন সকাল হতে দেখেছে। সারা রাত কবিতা লিখে কবি ভোরের প্রথম আলোয় সে কবিতা আবৃত্তি করতেন। বারান্দা−ব্যালকনির গাছপালা, চড়ুই, শালিখ কিংবা, কাক এবং ভোরের হাওয়া কবির নতুন কবিতার প্রথম শ্রোতা। মহামান্য কবি হিমালয় সেদিনগুলোতে ভালভাবে বুঝতে পেরেছে কেন ধর্মগ্রন্থে মহান সৃষ্টিকর্তা ভোরের আলোর কসম দিয়ে মানুষের জন্যে মেসেজ থ্রো করেছেন।

কিন্তু কবি, আজকের ভোর―বেশ অস্থিরতা নিয়ে দেখছে। সারা রাতে কবিতা না লিখে তিনি শূন্য হাতে যে ভোর দেখছে, ব্যাপারটা এমনও নয়। সে একটা কবিতা লিখেছে। রাজনৈতিক কবিতা। তিনি তার সমস্ত কবিসত্তা দিয়ে দেশের মানুষের মুক্তির জন্যে কবিতা লিখছেন। কবিদের কবিতা লেখা সবচেয়ে বড় কথা। তাদের শেষ কথাও―কবিতা। কবিতা থেমে না গেলেই হয়।

আজ সকালে কবি তার জীবনের কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিলেন। সে নিজে নতুন এক রাজনৈতিক দল বানাবে। নির্যাতিত মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়াবে। প্রতিবাদি মানুষদের জন্য বানানো হবে আদর্শ প্ল্যাটফর্ম। কবি দিনের পর দিন প্রতিবাদি কবিতা লিখে যাবে। জাতীয় স্বাধীনতার পক্ষে অবিরাম চলবে তার এ কর্মযজ্ঞ। জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে তিনি ও তার দল সারা জীবন কাজ করে যাবে। সে অন্য সবাইকে দেখিয়ে দেবে শুধুমাত্র কবিতা লিখেও রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব। কবিতাকে সে ভীষণ বিশ্বাস করে। কবিতার শক্তি সম্পর্কেও তার জানা আছে। কবিরা রাজনীতি বুঝবে না, এ হতেই পারে না।

শুধু কবিতা লিখে রাজনৈতিক মুক্তি কখনও পসিবল ? কবিতার সাথে সাথে দল, আদর্শ ও একদল বিশ্বাসী মানুষের প্রয়োজন হবে। তিনি কবি মানুষ। তার এ কবিজনমে সে শুধু কবিতা নিয়েই ভেবেছে।

রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র, রাজনৈতিক কথাবার্তা তার জন্যে অবশ্যি নতুন চ্যাপ্টার। কবি হিমালয় এতে বিচলিত না। কবিদের মনের জোর থাকে সবচেয়ে বেশি। সমাজের  মানুষদের অনেক ঘাত প্রতিঘাত, প্রকৃতির বঞ্চনা সহ্য করে কবি হতে হয়। কবি হওয়া সাধনার বিষয়। একজন মানুষের কবিজনম যাপন করা সহজ কথা তো নয়। হিমালয় ‘রাজনৈতিক দলের জন্ম-মৃত্যু শিরোনামে কিংবদন্তি এক লেখকের লেখা নিয়ে ভাবছে। কবি অনেকদিন আগে সে ‘রাজনৈতিক দলের জন্ম-মৃত্যু’ লেখাটি পড়েছিল। বিশেষ লেখাটির কথা ভেবে এখনও সে শিহরিত হয়।

হিমালয়ের নিজের রাজনৈতিক দলের খসড়া তৈরিতে সে বিশেষ লেখাটির কথা বারবার মনে পড়েছে। কী সরল অথচ কী তীব্র লেখা!

মহান লেখকের পার্টি ভাবনার

আংশিক দলিল

একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম-মৃত্যুর গল্প পাঠকদের বলি। এক যুগ আগে বর্তমান চলমান রাজনীতিতে হতাশ হয়ে আমরা একটি রাজনৈতিক দল করেছিলাম। দলের নাম ঠিক হলো। লেটার প্রেসে কর্ণফুলী কাগজে প্যাড ছাপানো হলো। রাত জেগে গঠনতন্ত্র লেখা হলো। তিনটি স্তম্ভের ওপর দল। প্রথম স্তম্ভ সততা। দ্বিতীয় স্তম্ভ সততা। তৃতীয় স্তম্ভ সততা। অসৎ রাজনীতিবিদদেরও দলে আনার বিধান ছিল। তারা প্রথম যাবেন বায়তুল মোকাররমে। সেখানকার খতিব তাদের তওবা পড়াবেন। এরপর আসবেন শহিদ মিনারে।

সেখানে তাদের অসততার পরিমাণ অনুযায়ী কানে ধরে উঠবোস করবেন। তারপর সোনা-রূপার পানি দিয়ে তাদের গোসল করিয়ে নতুন জামা পরিয়ে দেওয়া হবে।

দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যদি কেউ অন্যায় করেন, সঙ্গে সঙ্গে জাহাজে করে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে নিঝুম দ্বীপে। দ্বীপে পাঠানোর আগে কপালে সিল দিয়ে দেওয়া হবে। সিলে বাংলা ও ইংরেজিতে রেখা থাকবে―

অসৎ উরংযড়হবংঃ.

সৎ মানুষের খোঁজে আমাদের লোকজন ঘুরে বেড়াবে, জীবনে কখনও কোনও অন্যায় করেননি এবং মিথ্যা কথা বলেননি এমন লোককে বানানো হবে প্রেসিডেন্ট। সাংসদদের সাইকেল চালনায় পারদর্শী হতে হবে। কারণ তাঁরা সাইকেলে করে অঞ্চল ঘুরে বেড়াবেন। সংসদ চলাকালীন তাঁরা শুধু ঢাকায় আসবেন, বাকি সময়টা থাকতে হবে অঞ্চলে।

মন্ত্রীরা মন্ত্রীপাড়ায় থাকবে না। তাঁদের জন্যে লম্বা টিনের চালা করে চৌকি পেতে দেওয়া হবে। হোস্টেলের মতো ব্যবস্থা। তারা সচিবালয়ে হেঁটে যাতায়াত করবেন।

আলাদা কিছু মন্ত্রণালয় খোলার পরিকল্পনা আমাদের ছিল, যেমন ভিক্ষুক মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয় শুধু যে দেশের ভিক্ষুকদের সমস্যা দেখবে তা না। বিদেশ থেকে ভিক্ষা আনার ব্যাপারটাও তারা দেখবে।

হাসি মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয় দেখবে দেশের মানুষ যেন হাসতে পারে। ইত্যাদি।

পার্টি গঠনের পর সপ্তাহে একদিন পার্টির বৈঠক বসতে লাগল। আমরা চাঁদাবাজি শুরু করলাম। পার্টির জন্যে চাঁদা তোলা হতে লাগল। মেম্বররা প্রতি সপ্তাহে যার যা মন চায় চাঁদা একটি কাঠের বাক্সে জমা করতে লাগলেন। মাসের শেষে দেখা গেল, নয়শ’টাকা হয়েছে। এই টাকায় পার্টির কাউন্সিল মেম্বাররা একটা করে নতুন জামা এবং চাদর কিনলেন। দলের টাকা ব্যক্তিগত জামা-চাদরের পেছনে খরচ করার কারণে কাউন্সিল মেম্বাররা আজীবনের জন্যে দলীয় রাজনীতি থেকে বহিষ্কৃত হলেন। সঙ্গে সঙ্গে দলও বাতিল হয়ে গেল।

বাংলাদেশের কিংবদন্তি লেখকের পলিটিক্যাল পার্টির জন্ম-মৃত্যুর গল্প এটি। কিংবদন্তি সে লেখকের পাশাপাশি বাংলাদেশের এক কবিও নির্বাচন করেছিল। তার মার্কা ছিল কুমির।

কুমির নির্বাচনে তাও গোটা ত্রিশের মতো ভোট পেল। তাদের আনন্দ ভ্রমণ শেষ হলো।

কবির ভাবনা গভীর হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র ও কর্মপদ্ধতি লিখিত আকারে বানাতে হবে। এছাড়া রাজনৈতিক দলের ফান্ডিং, কর্মী ও পার্টি অফিসের ব্যাপার স্যাপার আছে।

সবকিছু একসাথে চিন্তা করলে ভোঁতা এক ধরনের ব্যথা অনুভূত হয়। মাঝে মাঝে মাথা কাজ করে না। ব্ল্যাক আউট হয়ে যায়।

এত প্রতিকূলতার মাঝে একমাত্র স্বস্তির খবর হলো রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক মহামান্য কবি হিমালয় ঠিক করে ফেলেছে। দলের নাম ‘বাংলাদেশি আন্দোলন’। প্রতীক হবে ‘মানচিত্র’।

আজ মার্চ ১০। ২০২১ সাল। বুধবার। রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক লিখিত আকারে প্রকাশিত হলো। কবি হিমালয়ের মনে হল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আজ ঘটে গেল।

এখন শুধু স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা। নির্ঘুম ক্লান্তিহীন পথচলা। জীবনভর মুক্তির সাধনা করে যাওয়া। আদর্শ ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়া। বাংলাদেশে একদিন সাহিত্য বিপ্লব হবে। এ দেশে একদিন, কবিতা―রাজনৈতিক পথ দেখাবে। মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিবে। দেশের মানুষের জাতীয় মুক্তি আসবে।

হিমালয় ‘বাংলাদেশি আন্দোলন’ নিয়ে হানিমুন ট্যুরে আসেনি। সে হারবার মানুষ নয়। বাংলাদেশি মানুষের মুক্তির জন্য কবি এতটুকু ছাড় দিবে এটা ভাবা কোনওভাবেই ঠিক হবে না।

কবি আয়নার সামনে দাঁড়ানো। নিজের ফোলা লাল চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তার ভোকাল কর্ডের সর্বশক্তিতে সে সর্বোচ্চ আওয়াজ তুলে গর্জে উঠল―

বাংলাদেশি আন্দোলন দীর্ঘজীবী হোক।

মানচিত্র দীর্ঘজীবী হোক। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।

কবি হিমেল কিছুদিন হলো সন্ধ্যার পর নিয়ম করে পথ হাঁটতে বের হয়। ঢাকার ফুটপাত ধরে সে উদ্দেশ্যহীন হাঁটা হাঁটি করে।

মানুষ নিজে মাথার মধ্যে যে চিন্তা নিয়ে ঘোরে, সে চিন্তার প্রতিফলন তার হাঁটাহাঁটিতে অবশ্যি পরিলক্ষিত হয়। উদাস ভাবুক কবির হাঁটা আর মাওলানা সাহেবের হাঁটা এক হবার কথা না। আমি সদ্য নতুন দল বানিয়েছি। দলের গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করেছি। গঠনতন্ত্র সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কবি হিসেবে হিমালয়ের পুরোনো হাঁটাচলার পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না।

আমি আগে মুগ্ধ নয়নে রাস্তার দু’পাশের মানুষ যেভাবে দেখতাম, এখনও তা দেখি। এখনও আমি প্রতি মুহূর্তে কবিতা ভাবি। মাথায় বাজপাখির মতো রাজনৈতিক কবিতা এখন ঘোরাঘুরি করে।

দেশের মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা জরুরি। মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা আরও বেশি জরুরি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বা কেউ দু’হাতে গলা চেপে ধরলে তখন অবশ্যি বিপ্লব অপরিহার্য হয়ে ওঠে। জাতীয় ও রাজনৈতিক মুক্তি ছাড়া জীবনের মূল্য কী ?

হিমালয় অনেক আগে ঠিক করে রেখেছে এ জনমে পথ হেঁটে হেঁটে সে তার কবিজনম পার করে দিবে। পুরো জনম। আজও সে পথ হাঁটে অবিরাম। কবি কথা রেখেছিল। সে এখন কবিতা ও মানুষের জন্যে যুগল পথ হাঁটে। কবির চলার পথ শেষ হয় না।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares