গল্প : মানুষের জন্ম : হামিম কামাল

বনের পাশ ধরে তিতিল দ্রুত পা ফেলে হাঁটছে, যেন তার কোথাও যাওয়ার খুব তাড়া। পশ্চিমা সূর্যের আলো ছড়ানো কালো চুলগুলো হাঁটার ছন্দে অল্প অল্প দুলছে। ময়নাকাঁটার ঝোপ পেরোনোর সময় একটা হলুদ ফুল ছিঁড়ে ফিরতে গিয়ে বাহুতে কাঁটার আঁচড় লেগেছিল। সেখানে বিন্দু বিন্দু রক্ত ফুটে আছে।

পরনের নীল তারাস ভালুকের ছালটা পুরোনো, অক্ষত। কোমরে বুনো লতার বন্ধনী। পায়ে গয়ালের চামড়ার খয়েরি জুতো। শরীরে মিয়া ফুলের আরকের ঘ্রাণ। গোলাপি আমারুল গাছের সবুজ চিরল পাতা মালার মতো করে গলায় পরে আছে। কানে ময়নাফুল। অড়ইয়ের ডালপালাভেদী সোনালি আলোর বিকেল তাকে জড়িয়ে রেখেছে।

ত্রিশ হাজার বছর আগের কথা ওটা, তিতিল যখন বনের পথ ধরে যাচ্ছিল। সেদিনের মতো এখন আর কিশোরী নেই। তরুণী কিংবা বৃদ্ধাও নয়। মানুষের শরীরে সে নিজেকে আর ধারণ করছে না।

মৃত্যুর পর তিতিল সতেরটা শক্তিতে বিভক্ত হয়ে পৃথিবীময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বসন্তে যখন বাতাস ভরে ওঠে ফুলের রেণুতে, তখন শক্তিরা তাদের দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। শরীরের স্মৃতি তখনই শুধু মনে পড়ে। শক্তিবিন্দু থেকে বিকিরিত হয় উজ্জ্বল বেগুনি, উজ্জ্বল লাল রঙ। 

তিতিল-শক্তি এখন তার প্রিয় একটি স্মৃতি উদ্ধার করছে, রোমন্থনে ব্যস্ত।

ত্রিশ হাজার বছর আগের কিশোরী তিতিল বনের পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে। ময়নাকাঁটা গাছের ডালে লেগে ছড়ে গেছে বাহু। সোনালি আলো বিন্দু বিন্দু রক্তে প্রতিফলিত।

দ্রুত পা চালাচ্ছে তিতিল। গাছপালা পশুপাখি বনের আঁকবাঁক পরিচিত নয়। দৃষ্টি অস্থির। কখনও মাটিতে, কখনও ডানে বামে আমারুল, আর শূন্যলতায় ভরা অড়ই গাছে হঠাৎ ডেকে ওঠা চিবিদ পাখির দিকে, কখনও সরোবরের বেতসলতায়। থেকে পেছনেও তাকাচ্ছে তিতিল, কেউ আসছে কি না।

এক জায়গায় কিছু লটফল গাছের জটলা। লট নামে এই ফলটার সঙ্গে পরিচয় নতুন। টক-টক স্বাদটা তার মনে ধরেছে। সেই থেকে গাছ মনে রেখেছে। 

তিতিলদের ছোট একটা দলÑসরাল, তিতিল, লীলা, রজা, মালা, ওড় আর কিরাত, সতেরদিন হলো পারিজাত পাহাড় থেকে উত্তরে চারপাশ খানিকটা পরিষ্কার করে থাকতে শুরু করেছে। সবার বয়েস ষোল থেকে একুশের ভেতর। এর আগে ছিল পারিজাতের নিচে, পূর্বদিকের বনে ওরা দিন কয় কাটিয়েছিল।

এই লাল সূর্যের দেশে পারিজাত পাহাড়ের ওপর তাদের আবির্ভাব। চূড়ায় একটা পারিজাত গাছ ছিল, কাণ্ডের বেড় ছিল কম হলেও বিশ হাত। ভেতরে ফাঁপা খোল নিয়ে অন্তত হাজার বছর হলো সে দাঁড়িয়ে আছে। তার সম্মানে পাহাড়ের ওই নাম রেখেছিল সরাল। সেখানে জেদ ধরে এখনও রয়ে গেছে রুরু ও তার ছয় বছরের মেয়ে তা।

পাহাড়ের ওপরটা ছিল বিরান। মাটিতে এমন সব প্রাণীর জীবাশ্ম মিলত যাদের মাটির ওপর থাকার কথা নয়। একদিন পাঁচ পাওয়ালা ছোট্ট এক প্রাণীর জীবাশ্ম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সরাল বলল, ‘এ পাহাড় কি সাগরের তলে ছিল নাকি, কী কাণ্ড!’ ‘কী দেখে বুঝলে ?’ তিতিল এগিয়ে এল।

প্রাণীর ফসিলটা তিতিলের দিকে এগিয়ে দিয়ে সরাল বলল, ‘দেখো, এমন প্রাণী আমাদের ওখানে সাগরের নিচে দেখেছি। তাই না ?’

‘এখানে স্থলেরও তো হতে পারে। পারে না, হয়তো ভিন্ন জাত ?’

‘কিন্তু পায়ের পাতাগুলো দেখো ? আর পেটটাও। জলচরেরই তো একমাত্র এমন চ্যাপ্টা হতে পারে, কী বলো।’

‘ওপরে এল কী করে ?’

‘আমারও প্রশ্ন তাই।’

তিতিল বলল, ‘সে রকম কোনও বিস্ফোরণ হতে পারে ? আমাদেরটা যেমন ?’

প্রাণীর শুকনো ছোট্ট মৃতদেহটা রেখে সরাল একটা লাজুকলতার বেগুনি ফুল ছিঁড়ে নিয়েছিল। হাতের তালুতে ঘূর্ণি পাকিয়ে ফুলটা উড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘হতে পারে, নাও হতে পারে।’

‘তা পারে।’

‘হয়তো কোনও শিকারি পাখির কাজ, কী বলো।’

পাহাড়ে বুকভরে শ^াস নেওয়া যেত না। ধীরে ধীরে দু’চোখের গোড়া অবধি অসহ্য ব্যথার দখলে চলে যেত। তখন দৃষ্টিভ্রম ঘটত।

হয়তো সরাল কারও দিকে হাত বাড়িয়েছে, কিন্তু সে দেখত সরাল নয়, গলিত দেহের কোনও দানব তার ঘিনঘিনে হাত বাড়িয়ে আত্মা টেনে নিতে চায়। হয়তো একটা কাক উড়ে যাচ্ছে, কেউ দেখত কাকটা উল্টো হয়ে উড়ছে, যেন চিৎসাঁতার দিচ্ছে হাওয়ায়। কোনও নিচু জায়গার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হতো সবেগে জায়গাটা ওপরে উঠে আসছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বসে পড়ত কেউ কেউ। মনে করত ঢাল আচমকা বেড়ে যাবে। আরেক পা বাড়লেই মৃত্যু।

খানিক বিশ্রাম নিলে ধীরে ধীরে সব আবার আগের মতো হয়ে উঠত। কিন্তু বুক ভরে নিঃশ^াস নিতে পারত না বলে সারাক্ষণ দুর্বল বোধ করত ওরা। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারত না, দৌড়াতেও নয়। শুধু ঘুম পেত।   

প্রতিদিন একটু করে ওদের নেমে আসছিল। নামতে নামতে মাথা, আর চোখের সমস্যা দূর হয়ে গেল। কিন্তু ক্ষুধার সমস্যা জেগে থাকল।

নিচে গাছপালা ক্রমশ ঘন। পূর্বদিকে ঢালের নিচে একটা রুপালি নদী উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে গেছে, সরাল তার নাম রেখেছে নিহার। 

পারিজাত পাহাড়ে না ছিল যথেষ্ট শিকার, না ছিল খাওয়ার মতো শাকলতা জাতীয় কিছু। রুক্ষ সজারুকাঁটা গাছের লাল এক ধরনের ফল ছিল। সেটা খেতে আসত ধূসর চারপেয়ে একধরনের ইঁদুর জাতীয় প্রাণী। তাদের ছোট্ট শরীরে অল্প কিছু হাড়মাংস ছিল। ফাঁদ পেতে ধরে আধপেটা খাওয়া চলত তিতিলদের। অথবা উপাস করত। প্রথমবার আরও নিচে ওই বনের কাছাকাছি যাওয়ার কথা বলল সরাল।

‘শোনো সবাই। এখানে আমরা শিকারি প্রাণীর আক্রমণ থেকে নিরাপদ। কারণ এখানে খাবার নেই, কেউ আসে না।’

‘এত ভালোই,’ বলল রুরু।

‘প্রথমে ভালো, পরে খারাপ,’ সরাল বলল। ‘ভালোভাবে যদি বাঁচতে চাও নিচে চলো। যদিও সেখানে আমাদের আক্রমণ করার মতো অনেক প্রাণী থাকবে। কিন্তু খেয়ে বাঁচার মতো অনেক বেশি কিছু পাওয়াও যাবে, কী বলো। আর বুক ভরে শ^াসও নিতে পারব আমরা।’

এক রুরু ছাড়া কেউ কথা বলল না। ‘তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও। আমাদের বাপ-মেয়েতে এই ইঁদুর খেয়ে দিব্বি চলে যাবে।’

‘শ^াসকষ্টটা ?’ বলল তিতিল। ‘ধীরে ধীরে পাগল করে দেবে।’

‘আমাদের শ^াসকষ্ট হয় না। কিরে মা, হয় ?’

বেণি দুলিয়ে তা দুপাশে মাথা নাড়ল।

সরাল বলল, ‘তুমি এরই মাঝে পাগল হয়ে গেছ রুরু। মেয়ের মুখে দিকে তাকিয়ে চলো। সাদা সূর্যের দেশে যা করতে, এখানেও তা করো না।’

‘পাগলামি করছি না। নিচে আমার মেয়েকে নেকড়ে টান দিলে তুমি বাঁচাবে ?’

‘প্রকৃতি মা না করুক!’ সরাল বাকিদের দিকে ফিরে তাকাল। ‘আমরা সবাই আছি। আছি না ?’

তিতিল বলল, ‘একটা অনুরোধ করব রুরু ?’

‘তোমার ইচ্ছা।’

‘তা কে আমার সঙ্গে দাও। আমি ওকে মায়ের মতো আগলে রাখব। আমি তো মায়ের মতোই।’

‘কিরে মা, যাবি ?’

তা বেণি দুলিয়ে মাথা নাড়ল দুপাশে। ওর লাল গাল দুটো হাসিতে টুব টুব। খুব মজা পাচ্ছিল। সরাল বলল, ‘যদি কোনওদিন ফিরে আসার কথা ভাব, নিহার নদীর উজানের দিকে এগোবে।’

তিতিলদের দলটা পাহাড়ের নিচে নেমে পুবদিকের একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। কাছেই একটা খাদ। পাতাপচা গন্ধে জায়গাটা ভার হয়ে থাকত। ওখানে বিপদ ছিল চার ধরনের। একটা ঈগল এসে ছোঁ মেরে ওদের শিকার করা ছোট শুকর, কাঠবিড়ালি কেড়ে নিয়ে যেত। ওদের ফাঁদ পেতে ধরা মায়াহরিণ পাহারা দিয়ে রাখত নেকড়ের দল, নিয়ে আসতে দিতো না। পরে দলবেঁধে ওরাই খেত। বুনো গয়াল এসে ওদের কুঁড়ে ভেঙে দিয়ে যেত অযথাই। হয়তো তার চলার পথে প্রতিবন্ধক বলে ভাবত ওদের। একটা হনুমান ছিল, তার উপদ্রব সবচেয়ে সহনীয়। ওদের পেড়ে আনা আম, কাঁঠাল, বুনো পেঁপে চুরি করে নিয়ে যেত হনুমানবাবা। তাড়া করলে পাল্টা মাটি বা পাথরের ঢিল ছুড়ত। কাছাকাছি হলে মুঠো করে ধুলা ছুড়ত চোখে।

ওদের সঙ্গে লিঁয়াজো করার বুদ্ধিটা সরালের। একটা কাঠবিড়ালি রাখা হতো ঈগলের জন্য। হরিণের দুটো পা দেওয়া হতো নেকড়েদের। গয়ালের জন্য কী উৎকোচ রাখা হবে, খুঁজে পেতে উত্তম জিনিসই পাওয়া গেল পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালে। নুনের পাথর। আর হনুমানের জন্যে একটা বড় পেঁপে বা দুটো চালতা যখন যা পাওয়া যেত। নিয়ে চলে যেতে যেতে পিছু ফিরে তাকাত হনুমান।

নতুন জায়গায় এসব উপদ্রব ছিল না। যদিও নেকড়ের আস্তানা থেকে জায়গাটা খুব বেশি দূরে নয়। কাছেই নিহার নদী জলের উৎস। এই প্রাপ্তির কারণে নদীর কুটিল দানবটাকে উপেক্ষা করা চলত। এক মিঠাপানির দশ হাত কুমির। তবে সচরাচর তার আসা যাওয়া ছিল না।  

পথে দাঁড়িয়ে পড়ল তিতিল। একটা কিছু সরসর করে চলে যাচ্ছে পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলোর তল দিয়ে। পাতাগুলো তার জায়গা থেকে সরছে না। আরেকটু হলেই সাপটাকে মাড়িয়ে দিয়েছিল।

‘ক্ষমাপ্রার্থী!’

হাতজোড় করে শ্রদ্ধা জানাল তিতিল। সাপটা চলে যেতে বাম কোমরবন্ধনী থেকে পাথরের ছোরা খুলে নিয়ে অড়ই গাছের নরম বাকলে একটা এবড়োখেবড়ো ত্রিভুজ আঁকল।

অচেনা পথে চিহ্ন রেখে রেখে হেঁটে যাওয়ার এই অভ্যেসটাকে সরাল খুব উৎসাহ দেয়। একদিন শুধু রজা বলছিল, ‘তিতিল যেখানে সেখানে চলে যায় যখন তখন। ও আমাদের বিপদে ফেলবে।’

সরাল বলেছিল, ‘বরং উল্টোটা হতে পারে। ওর ওই পথ চিনে আসা আমাদের বাঁচাবে একদিন, কী বলো।’

‘সবকিছুতেই তোমার একটা উল্টা কথা আছে।’

সাদা সূর্যের দেশেও দুপুরে খাওয়ার পর সবাই ঘুমোলে তিতিল বেরিয়ে পড়ত, শিকারে গেলে দলছুট হয়ে যেত, কোনও আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গেলে দেখা দিয়েই উধাও। যখন তার মামা, ফুপু, দাদি ভুরু তুলে, নাক কুঁচকে, গলার স্বর উঁচু করে তিতিলের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বলতে থাকত, মা কুঁকড়ে যেত শোকে, তখন তার বাবা ঠেকাত তাদের। ‘খবরদার! আমার মেয়ে কারও মতো হয় নাই। সে তার নিজের মতো।’

‘নিজের মতো পাগল।’

‘পাগল না। ওর কৌতূহল। কৌতূহল থাকে বুদ্ধিমানের, বুদ্ধিমতীর। মানুষের শত্রু বন্ধু দুটোই এই কৌতূহল। কেউ তাকে শত্রু করে, কেউ তাকে বন্ধু ডাকে। তিতিল বন্ধু ডেকেছে করেছে।’

‘তা এর বুঝি কোনও সময় অসময় জ্ঞান নাই ? ’

‘সেই জ্ঞান ওর ভেতর নিজ থেকে আসতে দাও। তার আগ পর্যন্ত সহ্য করতে হবে।’

‘ধানাই পানাই রেখে সময়মতো শাসাও মেয়েকে,’ বলেছিল তিতিলের দাদি । ‘নয়তো হারাবে, বলে দিচ্ছি।’

বাবা বলেছিল, ‘তিতিল কখনও হারাবে না। তাই না তিতিল ? ওর সঙ্গে পবিত্র আত্মা আছে।’

রজার সঙ্গে তাকে নিয়ে তর্কে জড়ানোর পর সরালকে ডেকে একটা পিউ গাছের শাখা হাতে দিয়ে তিতলি বলেছিল, ‘তোমাকে উপহার দিলাম।’

পিউ গাছের শাথা কয়েকটা শাখা বিজড়িত হয়ে একেক পথে যেন। একেকটা শাখাকে তাই জটার মতো দেখা। যে শাখাটা তিতিল আলাদা করে এনেছিল সেটা ছিল হাত দেড়েক দীর্ঘ। আর আধ হাত দৈর্ঘ্যরে জায়গায় দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া। সরাল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল, ‘একটা কথা বলতে পারি ?’

‘দুটা বলো।’

‘না, একটাই। কোনওদিন যদি আমাদের পরিবার বড় হয়, তাহলে এই পিউ গাছের বেণি হবে সেই পরিবারের প্রতীক, কী বলো!’

পিউ গাছ ছিল না সাদা সূর্যের দেশে। তবে পরিবারের প্রতীক ছিল। যেমন তিতিলদের পরিবারের প্রতীক ছিল মিজু ফুল। মিঠা শীতল পানিতে ফুটত, টুকটুকে লাল।

সাদা সূর্যের দেশে তিতিল সাত বছর বয়েসে বনের ভেতর হারিয়ে গিয়েছিল। সেখানে গাছেরা পর্যন্ত বনে পথ হারায়। শীলাফল, পিনা, জিউ, লাক্ষা, চিকারা, আমারুল এরা সরসর শব্দে হেঁটে বেড়ায় বনময়। চাঁদের এক পক্ষ সময়ের ভেতর আবার অঙ্কুরোদগমের জায়গায় ফিরে আসে। এর মাঝে বনর রূপ বদলায় ক্ষণে ক্ষণে। 

তিতিলের সঙ্গে ওর বাবার বলা সেই পবিত্র আত্মা থাকার কারণে পথ চিনে ও ফিরে আসতে পেরেছিল। এরপরই নাম ছড়িয়ে যায়।

তিতিল সেই পবিত্র আত্মাকে দেখেনি, কিন্তু বাতাসে পাতার বাঁশির মতো শব্দ তুলে তুলে তিনি যখন এগিয়ে গেছেন, তিতিল শব্দ মেনে তাকে অনুসরণ করেছে। যে সমস্ত বাঁকে থ্যাবড়াকাণ্ড শীলাফল গাছের আনাগোনা বেশি, সেখানে শব্দ কোন্্দিক থেকে আসছে বুঝতে তিতিল ভুল করত। অদৃশ্য পবিত্র আত্মা তিতিলের কড়ে আঙুল স্পর্শ করত। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার অনুভূতি হতো তখন। তারপর কাছে কাছে থেকে শিস বাজিয়ে, পাশের সরোবর বা নদী থাকলে মাটি বা পাথরের গায়ে জল ছিটিয়ে পথ দেখিয়ে তিতিলকে তিনি এগিয়ে নিতেন। কখনও ঝিরিপথে পা হড়কে গেলে বাহু আঁকড়ে ধরতেন। প্রতিবার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিতিল চিৎকার করে উঠত। তবে যন্ত্রণাটা অসহ্য ছিল না। 

পারিজাত পাহাড়ে এসে জ¦রে পড়েছিল তিতিল। খাবার নেই, আশ্রয় নেই। তার ভেতর জ¦রে তার স্মৃতিবিভ্রাট ঘটতে শুরু করল। একইসঙ্গে একই জ¦রে পড়ল রুরুর ছোট্ট মেয়ে তা। সরাল তখন নিজের ভাগের খাবার তিতিলকে খাইয়েছে। রুরু শিয়রে শিয়রে জেগে থেকেছে সারারাত। মেয়ে তা কে সুখপাখির গল্প বলত রুরু। এক সুখপাখিরই কম করে হলেও পঞ্চাশটা গল্প জানা ছিল রুরুর, শুনতে শুনতে তা ঘুমিয়ে পড়ত, কিন্তু তিতিলের ঘুম যেত ছুটে। তা ঘুমালে সুখপাখির দুঃখের গল্পগুলো বেরিয়ে আসত। তা-কে ওসব বলত না রুরু।

‘সুখপাখির সুখের পাখি হওয়ার পেছনে রয়েছে চোখ ভেজানো দুঃখের ইতিহাস।’

দীর্ঘশ^াস ফেলত তিতিল। 

রুরু বলে যেত, ‘সে ঘরছাড়া, দেশছাড়া, আহারে!’

‘আহারে!’

‘আপনজনেরা তাকে ঠুকরে রক্তাক্ত করে ঝোপের আড়ালে নেকড়ের খাবার করে রেখে পালিয়ে গিয়েছিল।’

সরাল বলত, ‘এই গল্প মেয়েকে বলো না তুমি। যতটা অবিবেচক তোমাকে ভাবি, ততটা তুমি না আসলে। কী বলো তিতিল।’

‘যেদিন আমি বিছানা নেব, তা তোমাদের মতো বড় হবে, সেদিন বলব।’ 

জ¦র থেকে সেরে উঠতে তিতিলের প্রলাপ বকা তেরোটা রাত গেছে। ওই সময়ে একটা স্বপ্ন তিতিল বেশ ক’বার দেখেছে।

দেখেছে ওর পা দুটো নরম মাটির ভেতর দেবে গিয়ে একটা গাছের মতো আটক হয়ে গেছে। নিজেকে একটা লতানো গাছ হয়ে যেতে দেখত তিতিল। স্বপ্ন ততক্ষণে শিথিল হয়ে আসত। চট করে চোখ মেলে উঠে বসত তিতিল। তবু বহুক্ষণ সেই স্বপ্নের শিহরণ থেকে তার মুক্তি ছিল না। 

আরও খানিকটা চলতেই সামনে কিছু টিলার আভাস পাওয়া গেল। গাছের ভিড় এখানে হালকা হয়ে এসেছে। হঠাৎ পাখির সমাবেশ। সিংহভাগ টিয়া। বাকিরা ফিঙে।

টিলা পাশ কাটিয়ে আরো ত্রিশগজ পশ্চিমে এগোলে টিলার দ্বিতীয় সারি পড়ে। খাড়া দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে গেছে সেই সারি। তাদের গায়ে ছোট ছোট গর্ত। তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে পাকুড় গাছের শেকড় বাকড়। গোটা দশেক গর্ত শূন্য, ভেতরে ভেজা অন্ধকার।

টিলার ওপরে ওঠার মতো সহনীয় ঢাল আছে কোনও কোনও জায়গায়। তিতিল ডানে বামে তাকিয়ে ঢালের ওপর উপুড় হয়ে পড়ল। কম ঢালের জায়গাগুলো গর্তের সংখ্যাও কম। সেখানে আঁকড়ে ধরার মতো বলতে কিছু পান-নাতা লতা ছড়িয়ে আছে, আর কিছু দুর্বল শূন্যলতা মাঝের শূন্যস্থান অধিকার করে আছে। দূরে দূরে গোল সবুজ পাতার অচেনা গুল্ম।

তিতিল নরম বুক বাঁচিয়ে ঢাল ধরে উঠতে শুরু করল। হাতের তালুর গরম আঁশের সুড়সুড়ি। থেকে থেকেই পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে পড়ছে। গর্তের ভেতর থেকে ছোট কোনও প্রাণীর তীক্ষè কিচিরকিচ। একবার হিসিয়ে উঠে থেমে গেল কোনও সরীসৃপ, তিতিল তার ডান কোমরবন্ধনীর ছুরিটার ওপর বাঁ হাত রাখল। হৃদয়ের ধুকপুক শুনতে পাচ্ছে। অবশেষে শরীরময় মাটি মেখে টিলার ওপর উঠে এল তিতিল। মুখের ওপর সূর্য এসে পড়েছে।

চারদিকে টিলা রেখে মাঝখানে শুয়ে আছে একটা সরোবর। যেন ফিরোজা রঙের বিরাট কোনও আয়নার এক টুকরো। তাতে কিছুর ছায়া পড়েনি। শুধু নিরেট ফিরোজা আকাশের দিকে মুখ করে আছে। সরোবরে ঢেউ নেই। টিলাগুলোর গোড়া থকে সরোবর অবধি কোমরসমান শেয়াললেজা ঘাস, আর সবুজ গোল গোল পাতার সেই অচেনা গুল্ম।

টিলার ঢাল ধরে ওপারে নামতে শুরু করল তিতিল। তার চোখে অশ্রু জমছে।

 (ক্লুপ, ক্লুপ!

সর সর!

উশ, উশ!

ক্লুপ, ক্লুপ!)

তিতিল-শক্তি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। সাগরের উথলে ওঠা ঢেউয়ের মতো তিতিলের চুল। বিনয়ের মতো কোমল ত্বক। হাত জোড় করে আগে জলের দেবতার কাছে তার মনের কথা জানাচ্ছে তিতিল। ‘এত সুন্দর তুমি! আমার প্রতি দয়াপরবশ হও।’

‘মাঝে মাঝে সরালের জন্যে হলেও জীবনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, ’ তিতিল শক্তি বলল। মহানিয়ম আঙুল থেকে কালীর চুলের গিঁট খুলছিল। বলল, ‘সরালকে তুমি পাবে তিতিল। আর একটু।’

 ‘থাক, ও থেকে যাক। আমার তাড়া নেই।’

‘ও চিরদিন থাকবে না।’

‘এভাবে বলবেন না দয়া করে।’

দশ দিকে ধবধবে সাদার পটে লালচে কমলা, হলদে সবুজ, হলদে কমলা, নীলচে বেগুনি, নীলচে সবুজ, আর রক্তবেগুনি আগুনের কয়েক লক্ষ বিন্দু ছোটাছুটি করছে। মহানিয়ম  বলল,  ‘দেখো বৃক্ষের আত্মারা খেলছে। ওরা দেহহীন। ওদিকে বৃক্ষের মৃত্যু নেই। কেন বলব, এখানেই আছে তার উত্তর।’

‘সরাল বলত, সমস্ত বিপরীত মিলে জগৎ বাঁচিয়ে রাখে।’

‘জগৎ আরও অনেক পথে বেঁচে থাকে। যেমন সরাল আমার স্বপ্নে বেঁচে আছে। জীবনের এপারের এ জগতে শক্তি যাকে স্বপ্ন দেখে, ওপারে পৃথিবীতে তার মৃত্যু হয় না।’

ছোট ছোট নুড়ি তিতিলের অনাবৃত হাঁটুর নিচ থেকে গড়িয়ে সরে যেতে চাচ্ছে। বিকেলের রোদে সরোবরের পানিতে মুখের অস্পষ্ট বিম্ব পড়েছে। পানিতে হাত ডোবাল তিতিল। একপরত ফিরোজা জলের নিচে হাতের সাদা তালুটা দেখল কয়েক মুহূর্ত। বাহু থেকে ঘাড় পর্যন্ত রোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ঠাণ্ডায়। 

ভেজা হাতটা মাথার তালুতে, ঘাড়ে ছুঁইয়ে তিতিল চোখ বন্ধ করে থাকল। ঝিঁঝিঁ ডাকছে। কাঠঠোকরা ঠোঁট ঠুকছে কোথাও।

সরোবরের ওপারে কিছু গোলাপি পাথর। দেখে চোখ সরু করে তাকাল তিতিল। সময় কেমন আছে ? পশ্চিমে টিলার চূড়া ছুঁতে সূর্যের আরও এক বিঘত বাকি। ঠাণ্ডা বাতাস আসছে, জলছোঁয়া বাতাস।

হঠাৎ একটা গম্ভীর শব্দে চারপাশ গমগমিয়ে উঠল।

‘ও-ম!’

বুকে রক্ত ছলকে উঠল। একা থাকলে হাঁটুতে কাঁপন ধরে এমন ডাকে। ছোরা ধরা হাত কাঁপতে শুরু করে, দাঁত ঠকাঠক করতে থাকে। গোলাপির পাথরের ওপাশ থেকে আসছে শব্দটা। ‘ও-ম!’

আবার! হুবহু এক স্বর, কিন্তু শব্দটা এবার এল পুরো উল্টোদিক থেকে। তিতিলের পেছনের, উত্তরের টিলার দিক। দ্রুত পিছু ফিরল তিতিল। ডানে বামে দ্রুত কয়েকবার দৃষ্টি বদল করল। শেয়াললেজা আর টিয়েসবুজ গুল্মগুলো আগের মতোই স্থির প্রায়। শুধু বাতাসে পাতারা তিরিতিরি সাড়া দিচ্ছে।

‘ও-ম!’

শব্দের উৎস এবার পশ্চিম দিকের টিলা। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে তিতিল কোমরের দু’পাশের দুই ছোরায় হাত রাখল। শ^াস বন্ধ করে রেখেছে। বুক ঘামছে। দরদরিয়ে পিঠ। পুবের টিলা উতরাতে হবে। সূর্য পশ্চিম টিলার আড়ালে অদৃশ্য হওয়ার আগে আরো আধ মাইল হাঁটা সম্ভব, দৌড়ালে দেড় মাইল।

তিতিল হাতের দশ আঙুল একে একে তুলে নামানোর সমান সময় অপেক্ষা করল। ডাকটা একবার পুব দিকে আসে কি না, জানার অপেক্ষা। এল না। দু হাতে পাথরের দুটো ছোরা বের হয়ে এসেছে। বিড়বিড় করে প্রকৃতি মাকে ডাকতে ডাকতে যথাসম্ভব শান্ত পায়ে হাঁটতে থাকল। পৌঁছে গেল পুবদিকের টিলার গোড়ায়। যেদিক থেকে নেমে এসেছিল, সে জায়গাটা এ টিলার আরেকটু উত্তরে। কিন্তু সেদিকে কিছুর তেমন আড়াল নেই। এখানে শেয়াললেজাগুলো বেশ দীর্ঘ। ভালো আড়াল। 

টিলার ঢাল এখানে ওপারের তুলনায় খাড়া। যথারীতি পাননাতার দুর্বল অবলম্বন মুঠো করে ধরতেই উপড়ে এল, তবে মাটি এখানে শক্ত। কিছু গর্তও আছে, সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। দৃষ্টির সীমায় এমন তিনটা পাওয়া গেল। ভেতরে অন্ধকার। মাথার ওপর শিশু শেয়াললেজায় ঢাকা একটা কালো গর্ত চোখে পড়ল। ওখানে হাত রাখতেই মাটির কিনার পড়ল ভেঙে। নিচে পাও হড়কে গেল।

হঠাৎ শক্ত কাণ্ডের কোনও বিরুৎ হাতে আটকাল। কাঁটা বিঁধল হাতের তালুতে। লাল লাল বুনো বেগুনের ঝাড়! পাননাতা আর শেয়াললেজার আড়ালে এগুলো চোখে পড়েনি, আছেও একটা দুটো। পায়ের কাছে একটা বেরিয়ে থাকা একটা কালো পাথরের কোণ অবলম্বন হিসেবে পেল তিতিল। পা রাখল। চেপে রাখা শ^াসটা ছাড়ার পর শরীরময় একটা শিথিল অনুভূতি ছেয়ে গেল।

বুনো বেগুনের পেছনেই চোখে পড়ল সেই গাছটা, অচেনা। গোল সবুজ পাতার গুল্ম। সরোবরের চারধারে শেয়াললেজা ঘাসের আড়ালে আড়ালে এ গুল্ম তার সবুজ পাতা আর নীল ফুলের শোভা ছড়াচ্ছিল। ফুলগুলোকে যদিও কাছ থেকে দেখার অবকাশ হয়নি, এবারের আগে। গাছটার গোড়ার কাছে কাণ্ডটাকে যেন কেউ মুচড়ে দিয়েছে, এমনভাবে পাক খাওয়া। সাধারণত লতা কাণ্ডরূপে থিতু হলে এমন হয়। টিয়েপাখির পালকের মতোই মলমলে সবুজ পাতার ওপর সোনালি আলো পড়ছে। কালো ডালপালা, তবে ডালের কচি অংশটুকু সবুজ। আর কচি ডালের শেষপ্রান্তে একটা মোহন নীল রঙের ফুল ফুটে আছে।

ফুলটা অবিকল যোনি!

তিতিল চোখের পাতা ফেলল কয়েকবার। আরও স্পষ্ট করে দেখতে চাইল। তাতে ধারণা বদলাল না।

হঠাৎ ঠাণ্ডা জলছোঁয়া বাতাস, নিচে যেমন পেয়েছিল। তাকিয়ে দেখে পশ্চিমে কালো মেঘ জড়ো হচ্ছে। কী ব্যাপার ? এর তো কোনও আভাস ছিল না! আবারও ঠাণ্ডা হাওয়ার ধাক্কা লাগল। টিলার খাঁজে খাঁজে বাতাসের শিসের শব্দ বাজছে। 

মেঘগুলো বেশ নিচু। টুকরোগুলো উড়ে চলে এল তিতিলের মাথার ওপর, তাকে পেরিয়ে গেল। সরু ধারার বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল উত্তর দিকে হেলে থাকা সরলরেখায়। সূর্য তখনও আলো দিয়ে যাচ্ছে।

দেখতে দেখতে পাহাড়টা পিচ্ছিল হয়ে এল। বুনো বেগুনের গোড়া আলগা হতে শুরু করেছে। পায়ের তলার কালো পাথরের ওপর গলে এসে জমছে পিচ্ছিল ধূসর মাটি। চামড়ার জুতোর ভেতর পানি ঢুকে ভেতরটা কাদাটে হয়ে যাচ্ছে।

টিলার ওপর থেকে গড়াতে থাকা জল তিতিলকে ভিজিয়ে দিতে থাকল। হঠাৎ চুলকোতে শুরু করল চোখের পাতা, আঙুলের ডগা। লাল উঠল হাতের পাতা দুটো। একেক হাতের তালু জুড়ে বরফের সূঁচ ফুঁড়ে দিচ্ছে কেউ। হাত যে কেবল চুলকোচ্ছে, ফুঁড়ছে তাই না, শক্তও হয়ে আসছে। এমন হলে মুঠোই করতে পারবে না আর।

তিতিল একবার টিলার নিচে তাকাল। পেছনে সরোবরের ওপর বৃষ্টি জল ধরছে। আয়নার নিরেট ভাবটা নেই। তার মাথার ওপর টিলা আরও অন্তত কুড়ি হাত। টিলার ওপর মেঘের ছাউনির মতো শিরিষ গাছের ডাল আর ছোট ছোট ফুলের মতো পাতা। টিলার চূড়ায় গলে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে থাকা পাকুড় গাছের মাথাও চোখে পড়ছে। সাদাটে ধূসর কাণ্ডের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টিতে কাঁপছে গাঢ় সবুজ পাতা। এর ভেতর ভেজা সূর্যের সোনালি আলোও এসে পড়েছে পাতার বুকের ওপর।  

সরোবরের পশ্চিম পাশ থেকে একসময় মেঘের বুকে ভয় ধরানো কণ্ঠে আবার ডেকে উঠল পশুটা।

‘ও-ম!’

তিনিও বৃষ্টিতে ভিজছেন! নামার প্রশ্নই আসে না। টিলার চূড়াতেই উঠবে তিতিল যাই হোক না কেন। বাম হাতে বুনো বেগুনের ঝাড়টা ধরা, ডান হাতে পাঁচ ছ’টা পান-নাতার গোড়া এক করে যখনই ধরতে গেল, বেগুনের ঝাড় গোড়াসুদ্ধ উপড়ে এল তার শরীরের ভরে। পাননাতাও অবধারিতভাবে টাল রাখতে পারল না। পড়তে থাকল তিতিল। বুক আর উরু ছড়ে যাচ্ছে। আঁকড়ে ধরার মতো পাওয়া গেল না কিছুই। ঠেকে যাওয়ার মতো কোনও পাথর পায়ে বাধল না।

হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা পাথরের কোণ লেগে তলপেটটা চিরে গেল। পড়তে পড়তে নখ উপড়ে আসার উপক্রম। ডান হাতে তলপেটটা চেপে ধরল তিতিল। জায়গাটা দ্রুত গরম হয়ে উঠছে।

নিচে বেশ খানিকটা অংশে পাথরের আরও কয়েকটা কোণ বেরিয়ে আছে। শরীরটা শূন্যে ঠেলে দিয়ে ঢাল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন  করে ফেলল তিতিল। বাতাস কেটে পড়তে থাকল নিচে। তবে বেশি পথ আর বাকি ছিল না। ছ’ফুট নিচের শেয়াললেজা ঘাসের ঘন আস্তরের ওপর আছড়ে পড়ল তার দেহ। হাঁটুর দুই হাড় টকাটক ঠুকে গেল। দু’হাত পেটে চেপে রেখেছে। লাল হয়ে উঠছে আঙুলের ফাঁক।

তিতিলশক্তি রং বদল করছে, লাল থেকে আকাশি, আকাশি থেকে সবুজ, সবুজ থেকে লাল।

মৃত্যুভয় কাকে বলে তিতিল দ্বিতীয়বার বুঝেছিল সেদিন। প্রথমবার বুঝেছিল সাদা সূর্যের দেশে রুক পাহাড়ের চূড়ায় সেই শীতল আগ্নেয় বিস্ফোরণের সময়।

‘স্থানকালের যোনীপথ দেখেছিলে। শিশু জন্মের সময় মা একাই কি কেবল তীব্র কষ্টের ভেতর দিয়ে যায় ? ’ 

গড়িয়ে আরো কিছুদূর নামল দেহটা। নখের গোড়া আলগা হয়ে রক্তের রেখা ফুটেছে। বাম কোমরের ছোরাটা ডান হাতে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে মুঠো মুঠো দূর্বা কাটছে তিতিল।

‘ক্ষমাপ্রার্থী, ক্ষমাপ্রার্থী!’

চোখ লাল হয়ে উঠেছে। কোণ বেয়ে অশ্রু নামছে। কিছু ঘাস জড়ো করল। টিলার এপাশেও গোড়ার খানিকটা করে অধিকার করে ছিল শূন্যলতা। 

‘ক্ষমাপ্রার্থী!’

শূন্যলতা মুঠো করে ধরে সবলে টানতে থাকল তিতিল। একটা, দুটো, তিনটা। সব মিলে হাত বিশেকের মতো লতা জড়ো হলো। এবার টান দিয়ে পাতা ছাড়াতে থাকল। একটা ঘাসকাটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কান খাড়া করেছে, পেছন থেকে কোনও শব্দ আসে কি না। থেকে থেকে পেছনও ফিরছে। ঠিকরে বেরোনো রক্তাভ চোখ, ঘামের ভেজা মুখের ওপর এসে পড়ছে আবার পশ্চিমের সূর্যের আলো। দ্বিতীয় ছোরাটা বের করে তিতিল পাশে রাখল। পাতা ছাড়ানো হয়ে গেছে। এবার লতাগুলোর মাথায় মাথায় গিঁট বেঁধে জুড়ে দিল। তলপেটের ক্ষতে রক্তের একটা থিকথিকে লম্বাটে পর্দা জমে আছে আধভেজা। জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া শরীর নিজেই শুরু করেছে।

দূর্বা আর শূন্যপাতার চিবোনো অংশ ক্ষতে লাগিয়ে তলপেটটা লতায় শক্ত করে ঘিরে দিতে থাকল তিতিল। এক, দুই তিন, এভাবে ন’বার প্যাঁচ কষতে পারল তলপেটে। লতার নিচে প্যাঁচের নিচে চাপ বাড়তে থাকল লালায় ভেজা শূন্যপাতা আর দূর্বার চাপ চাপ মিশ্রণের ওপর। কষে গিঁট বেঁধে আর দেরি নয়। তিতিল উঠে দাঁড়াল। সূর্য তখন পশ্চিমের টিলার চূড়া ছুঁয়েছে।  

আগের ঢালের অংশ পেরিয়ে আরও দক্ষিণে এল তিতিল। বৃষ্টিতে ধূসর মাটি কালচে হয়ে উঠেছে, এবং পিচ্ছিল। সবুজ ঘাস আরও সবুজ। মাটি ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে পাকুড়ের শেকড় এখানে। পিচ্ছিল ঢাল দেখে হাত কামড়ে কাঁদতে থাকল তিতিল। চোখ বন্ধ করে দুই হাত জড়ো করল, ‘পবিত্র বন্ধু!’

চোখ বন্ধ থাকলে বুকের ধড়ফড় আরও বেড়ে যাচ্ছে। চোখ খুলে বলল, পবিত্র সাথী, আমাকে দেখুন!’  

‘ও-ম!’

ভীষণ কাছ থেকে এল ডাকটা! হঠাৎ একটা ডোরাকাটা সাদা মেঘ এসে পড়ল তিতিলের সামনে। পশমি গন্ধও সঙ্গে উড়ে এল।

একটা ষাঁড়। অথবা বাঘ। মাথাটা ষাঁড়ের। বাঁকানো ছোরার মতো দুটো শিং দুদিকে ঢেউ খেলে জেগে আছে। শিংগুলো প্রস্থে তিতিলের পাথরের ছোরার মতোই। ফোঁস শব্দে নিঃশ^াস ছাড়ল প্রাণীটা। শান্ত চোখে কালো আগুন। কান দুটো নাড়ছে সামনে পেছনে। বাঘের মাংসল থাবা বাড়িয়ে এক পা এগোল। সাদার ওপর কালো ডোরাকাটা তার সারা শরীরে। যুদ্ধের কোনও আঁচড় নেই কোথাও, পেশির সর্পিলতাও নেই হাতে, কাঁধে, পায়ে। সরোবরের অভিভাবক হয়ে দীর্ঘ নিরুপদ্রব জীবন কাটানোর সাক্ষী যেন প্রাণীটার শরীর। স্রেফ কে এই নবাগতা, তাই দেখতে এল।

তিতিল আকাশ মাটি এক করে চিৎকার করল। দু’হাতে ছোরা বেরিয়ে এসেছে। তার চিৎকারে কয়েক মুহূর্ত হতবুদ্ধি হয়ে থাকল প্রাণীটা। তারপর এগিয়ে দেওয়া পা ফিরিয়ে নিল। মাথা উঁচিয়ে পরখ করতে চেষ্টা করছে তিতিলের মেজাজ। তিতিল ছোরা দুটো তখনও বাগিয়ে রেখেছে। চোখ লাল, ভ্রুকুটি কুটিল, কপালের সরু ঘাম ভুরু ডিঙিয়ে চোখে এসে জ¦ালা ধরিয়ে দিচ্ছে। ওঠানামা করছে ভেজা বুক।

প্রতিবার শ^াস ফেলার সঙ্গে সে একটু একটু সোজা হতে শুরু করল তিতিল। একসময় ছোরা দুটো কোমরের দুই খাপে রেখে দিয়ে নিজেও এক পা পেছাল।

‘আমি আমার পথেই এগোব।’

বড় একটা শ^াস ফেলে তিতিল হাত জোড় করে দাঁড়াল।

‘ক্ষমাপ্রার্থী, সরোবরের অভিভাবক! আমাকে যেতে দিন।’

বৃষ্টিতে ভেজা ডানা নিয়ে চিৎকার করতে করতে উড়ে গেল একঝাঁক টিয়ে। পিছু পিছু ঢেউয়ের মতো উড়ে গেল তিনটি ফিঙে পাখির একটা দল। বৃষ্টি শেষ হয়েছে। বাতাসের তোড় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে মেঘ। টিলার খাঁজে খাঁজে হাওয়ার সুর খেলছে। তিতিল আর আধ-ষাঁড় আধ-বাঘ প্রাণীটা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেন পরীক্ষা করে যাচ্ছে পরস্পরের স্নায়ুর জোর। 

প্রাণীটা ঘুরে দাঁড়াল। শরীরের সমান লম্বা সর্পিল ডোরাকাটা লেজটা এতক্ষণ আড়ালে ছিল, এবার বেরিয়ে এসেছে। লেজ বাঘের, কিন্তু শেষপ্রান্তে ষাঁড়ের ফোলা পুচ্ছ। প্রাণীটা হেলেদুলে এগোতে থাকল দক্ষিণ পুবের টিলার দিকে। কিছুদূর এগিয়ে পেছন ফিরে তাকাল। তিতিল আগের জায়গাতেই হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। তার বড় বড় হয়ে ওঠা চোখ যাত্রাপথ অনুসরণ করছে প্রাণীটার।

দক্ষিণ-পুবের মোড়ে হারিয়ে গেল বাঘটা, বা ষাঁড়টা। ধীরে পাঁচ আঙুল তোলার সময় পর্যন্ত কোনও সাড়া নেই। এরপর গম্ভীর ও-ম! তিতিল একপা দু পা করে এগোল। উঁচু নিচু পথ। ডান হাতটা তলপেটে ঠেকিয়ে রেখেছে।

‘পবিত্র আত্মা, তুমি আমাকে দেখো। সেই সাদা সূর্যের দেশÑথেকে এ পর্যন্ত- তুমি কখনওÑ,’ হাঁপাচ্ছে তিতিল, ‘আমাকে ছেড়ে যাওনি। আজও যেও না।’

মোড়ের কাছে এসে উপত্যকাটা দেখতে পেল, একটা ফাঁকা শূন্য চলে গেছ পুবদিকে। এটা দেখতে পেলে টিলা বাওয়ার প্রয়োজন হতো না। অদ্ভুত প্রাণীটাকে আর দেখা গেল না কোথাও।

‘কৃতজ্ঞতা, কৃতজ্ঞতা!’

জলছোঁয়া ঠাণ্ডা বাতাসটা আছে এখনও। আলোর সোনা রং পুরোপুরি হারিয়ে ধূসর হয়ে ওঠার মুহূর্তে তিতিল সেই নাম না-দেওয়া নদীর কাছে পৌঁছে গেল। নদীটা নিহারের শাখা। হাতের দক্ষিণ পাশে বন রেখে চলল পূর্বদিকে। শুকনো ডাল এড়িয়ে চলতে চাইলেই তো আর পারা যায় না। বারকয়েক মড়াৎমড় শব্দ ঠেকানো গেল না। পথে কোনও প্রাণীকে সচকিত করে তুলতে চায় না তিতিল।

এক সময় অড়ই গাছের গায়ে ত্রিভুজ চিহ্ন দেখতে শুরু করল তিতিল। ঠিক পথেই ফিরছে। সেই সমস্ত চিহ্নে হাত রেখে রেখে গাছগুলোর কাছে হাতজোড় করে শেষবারের মতো ক্ষমা চেয়ে, আর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিতিল এগোতে থাকল। 

তিতিল শক্তি গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখছে, বুকের ভেতর কথার পাহাড় সার ধরে সাজিয়ে তার ডেরার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তিতিল। অধীর হয়ে প্রহর গুনছে কখন সরালকে সব খুলে বলতে পারবে এ অভিযানের কথা। তারপর বাকিদের বলার আগে, কেবল সরালকে দেখিয়ে আনবে সেই ফিরোজা সরোবর। আর দেখাবে সমান বিস্ময় সেই যোনীর মতো ফুল।

বৃষ্টিশেষের হাওয়ায় দূরের টিলায়, সরোবরের পাশে ফুলগুলো থেকে থেকে দুলছে।

তিতিল শক্তির হাসি ধরা পড়ল খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর পাড়ে দুটো পাথরের জলঠোকাঠুকিতে।

গোলাকার টক কিছু ফল আছে, গাছের কাণ্ডময় আঁচিলের মতো ছেয়ে থাকে। ফলগুলোর নাম তিতিল দিয়েছে লট। লট ফল টুকে নিল কিছু। এ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় আগেই চোখে পড়েছিল। তখন ঝলমলে আলো ছিল, এখন আলো মরে গেছে। তখন গাছের নিচটা খুব প্রাণময় মনে হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে কেমন মৃত্যুময়।

বনের হালকা অংশে আছে তিতিল। এখানে এখনও নদীর ধারের পায়েচলা পথটা চোখে পড়ার মতো আলো। দক্ষিণে বনের অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হয়েছে। শুরু হয়ে গেছে ঝিঁঝিঁপোকা, উচ্চিংড়ের সংগীত সন্ধ্যা। জ¦লে উঠছে জোনাকি। নীলচে সবুজ আলো জ¦লছে নিভছে দূরের অন্ধকারে। তিতিল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল।

ঝোপেঝাড়ে নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে। আকাশে মেঘ করেছিল বলে পরিবেশে রাতের আবহটা স্বাভাবিকের চলে এসেছিল আগেই। নিশাচররা হয়ত দ্রুত সাড়া দিতে শুরু করবে আজ।

লটফল গাছের ডাল, পাতা অনেকটাই ফাঁকা ফাঁকা বলে এখানে পাখির বাসা নেই। একটা উদ্বিগ্ন চিঙ্গোলা পাখি মাথা একপাশে ফিরিয়ে তাকে লক্ষ করছে। তিতিল হাতজোড় করল, ‘ক্ষমা কোরো লট গাছ। তোমার বিশ্রামের আর দেরি  নেই, আমি এমন সময়ে ফল ছিঁড়ছি। আমার যদি বিশেষ দরকার না হতো, এমন করতাম না।’

চোখ বুজে কিছু লটফলের ওপর তিতিল হাত রাখল। তারপর টুকটুক ছিঁড়ে নিল গোটা বিশেক। একটা অড়াই গাছের পাতা নিয়ে সেখানে লটগুলো জড়ো করল। বুনো বেলী গুল্মের ওপর পড়ে ছিল স্বর্ণলতা। তুলে নিয়ে ফলগুলো বেঁধে সরে সরে পড়ল তিতিল। 

পায়ে পায়ে যখন ডেরায় ফিরল তাকে দেখে এগিয়ে এল লীলা, কৃশকায় মেয়ে। সরু উরু দুটো পরাহ ফুল ঘষে নীল করে তুলছে। লীলা ভাঙা কণ্ঠে বলল, ‘বৃষ্টিতে পেয়েছিল তোকে ?’

‘হ্যাঁ,’ লটফলগুলো তাকে দেখাল তিতিল। ‘এর বেশিকিছু আনতে পারলাম না!’

‘তাতে কী, যথেষ্ট পেয়েছি আমরা। আরে, কী হয়েছে পেটে!’

‘যথেষ্ট বলতে ?’

‘দুদিন হয়ে যাবে সবার, যদি কিরাত চুরি না করে। বাদ দে, পেটে কী হয়েছে তোর ?’

‘একটু কেটে গেছে।’

‘চল, কী পেয়েছি দেখবি। কীভাবে হলো ?’

‘ঢাল দিয়ে নামছিলাম, একটা পাথর বেরিয়ে ছিল। সরাল কোথায় ?’

‘ওই অতিচালাক ফেরেনি এখনও।’

‘এখনও না!’

‘চলে আসবে, আয়। তুই গিয়ছিলি কোথায় ? ’

‘তোদের নিয়ে যাব শিগগির,’ বলল তিতিল, ‘তবে তার আগে যাওয়া আসার পথটা আরও ঠিকঠাক করা দরকার।’

‘পথের জন্যে কিরাতকে নিস,’ বলল লীলা। ‘ও ভালো পথ কাটে। ওর বাবা তো ওকে ছোটবেলায় জঙ্গলে ফেলে আসত।’

কিরাতকে তার বাবা হেরাত চোখে আবিল গাছের আঠা মাখিয়ে বনে নিয়ে যেত। এ আঠা সূর্যের আলো পেলে শক্ত হয়ে ওঠে, আর অন্ধকারে গলে যায়। বনের অন্ধকারে আঠা গলে গিয়ে হেরাত যখন চোখ মেলত, তার সঙ্গে কেউ নেই। কিরাত বলল, আমার বাপ বুড়া হইলে আমিও তারে চোখে আবিলের আঠা মাইখা কমু, ভালো হইসে, এইবার পথ চিনা চইলা আসো বাবা মাখন!’

পেছনে শিস বাজাল কেউ। লীলার চোখ বড় হয়ে উঠল, ‘সরাল!’

ঘুরে তাকাল তিতিল। সরালের কপালে লেপ্টে আছে ভেজা চুল। পিঠের আড়াল থেকে বেরিয়ে আছে ছ হাতি ধনুকটা। হাত খালি। মেয়ে দুটোকে হাতের দিকে তাকাতে দেখে ভেঙচি কেটে পিঠের আড়াল থেকে দেড়হাতি মায়াহরিণটা বের করে আনল সরাল। আনন্দে চিৎকার করে উঠল তিতিল আর লীলা।

সরাল শূন্যলতার গিঁট দেখিয়ে বলল, ‘এ কী তিতিল! কে মেরেছে ?’

রাতে তিতিল গেল সরালের কাছে। সরালের হাতে তখন একটা ইঁদুরের কংকাল। গভীর মনোযোগে হাড়ের জোড়গুলো দেখছে। পাশে জড়ো হয়ে আছে শুকনো আম পাতার আসন, আগুনের আলোয় আধা সোনালি, যেন কারও এসে বসার আগাম ব্যবস্থা। তিতিল সেখানে বসে পড়তেই সরাল তার মুখ চেয়ে হাসল। পেটের ক্ষতটার দিকে তাকাল একবার।

‘সবাইকে হাতভরে সময় দিয়ে পর সবার শেষে আমার কাছে এলি।’

তিতিল তার কাছ ঘেঁষে এল। কাঁধ স্পর্শ করল কাঁধ। তারপর টুকটুকিয়ে সব বলে গেল আজ যা ঘটেছে।

তাদের মাথার ওপর ধীর ডানায় আকাশ পাড়ি দিল সন্ধ্যাতারা।  

‘মধু, মধু!’ বলল তিতিল শক্তি। ‘আমার স্মৃতিরা গান গাইছে। গুন গুন গুন! গুন গুন গুন! রেণুরা পড়ছে গর্ভাশয়ের ওপর।’

দ্বিতীয় খণ্ড

পরদিন ভোরে সবাইকে ঘুমে রেখে শুকনো ডাল আর ঝরা পাতা মাড়িয়ে, সবুজ, হলুদ পাতার কাঁটাল ঝোপঝাড় পেরিয়ে, তিতিলের পাওয়া নদীর দক্ষিণ পাড় ধরে, বনের পাশ ঘেঁষে ওরা সেই সরোবরের পথে চলল। নদীতে হাত ডুবিয়ে সরাল বলল, ‘দক্ষিণে জলের আরও বড় উৎস আছে।’

‘উত্তরে না, দক্ষিণে! কী করে বুঝলি ?’

‘মনে হলো। এ নদীর কোনও নাম রাখলি ?’

‘সরোবরছোঁয়া।’

‘হা হা হা হা।’

‘হাস্যকর হলো ?’

‘না, এইমাত্র রাখলি তাই।’

‘কী করে বুঝলি ?’

‘মনে হলো।’

পূর্বদিক থেকে আসা সূর্যের আলো নদীর ওপারের গাছপালার ফাঁক গলে এপারের সব কাণ্ড, ছোটবড় পাতার ঝাড় আলো করে তুলেছে। অল্প ঘেমে উঠেছে তিতিল। শরীর থেকে আসছে মিয়া ফুলের আরকের ঘ্রাণ।

বেলা আরও বাড়িয়ে হাতে পায়ে নরম মাটির মাখামাখি নিয়ে যখন ওরা পাচিলের মতো টিলার চূড়ায় দাঁড়াল, সামনে সরোবরের দিকে তাকিয়ে সরালের মুখ থেকে বিস্ময়ের অস্ফুট এক শব্দ বেরিয়ে এল।

জলের কাছে কাঁটাঝোপের মতো একঝাড় গাছের চূড়া রঙিন করে আছে নীল রঙের ফুল। সরোবরের বিস্ময় তখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি সরাল, জলের পর  তিতিল যতবার ফুলের দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল, ফুল থেকে চোখ সরিয়ে সরাল ততবার সে জলের দিকে তাকাাচ্ছিল।

তিতিল বলল, ‘ওপারে দেখ্, সেই গোলাপি পাথর। চল না, এক জায়গায় আর কত!’

সামনে হাঁটুসমান উঁচু ঘাস, তার ফাঁকে ফাঁকে মাথা বের করে আছে গোলাপি মুখের মতো সব পাথর। কোথাও কোথাও কয়লার মতো মাটিও চোখে পড়ছে। বাতাস বইছে। আজ মাটিছোঁয়া ঠাণ্ডা বাতাস। একটা চাপা বৃষ্টিসোঁদা গন্ধ টের পাওয়া যায়। বুকের ভেতর ভরাট প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে।

‘যাব। তার আগে বোঝা দরকার।’

‘কী বুঝবি।’

‘ওদিকে টিলার ওপারে বন ঘন। তোর ওই ওম-বাবার ডেরা থাকতে পারে কি না ভাবনার বিষয়, কী বলিস।’

পুবে পশ্চিমে, উত্তরে দক্ষিণে সবুজ টিলার অবরোধ, মাঝখানে ঈশ^রের চোখের মতো সরোবর। টিলা বেয়ে নেমে আসা উষ্ণ বাতাসের বিচ্ছিন্ন কিছু ডানা ওদের জড়িয়ে ধরল। সরাল ফিসফিসিয়ে বলল, ‘সরোবরের পবিত্র আত্মা! আপনার ঘরে এসেছি। খানিক বেড়িয়ে দেখতে চাই।’

তিতিল বলল, ‘কে জানে ওরাই কাল বাঁচিয়েছিলেন কি না!’

গোলাপি পাথরের কাছে পৌঁছুল ওরা। খানিক দূরে অনেকটা জায়গা নিয়ে জড়ো হয়ে আছে তিতিলের নীল ফুল। সারির পর সারি ধরে উঁচুনিচু পেরিয়ে পৌঁছে গেছে টিলার কাছে কাছে। সেদিকে দুটো তরুণ পাকুড় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে বাড়ছে। পেছনে ঘাড় কাত করে দাঁড়িয়ে আছে আবারও, যোনীর মতোন দেখতে সেই নীল ফুলধারী গুল্মের বড় এক ঝাড়। তার পেছনে শেয়াললেজার দেয়াল। স্তর ডিঙিয়ে পান-নাতা, ভৃঙ্গরাজ, পাহাড়ি ভাঁটে ছাওয়া দক্ষিণ ঢাল দক্ষিণ আকাশের দিকে উঠে গেছে। গতকালের গুণে কিছু বনবেগুনের কাঁটাল ঝাড়ও চোখে পড়ল, বাতাসে দুলছে।

ঘাসগুলো আলো ফিরিয়ে ঝলমলে। আকাশ পরিষ্কার। সরোবরের জল আলোকিত ফিরোজা। আজকের ফিরোজা খানিক রুপালি আলোও ফেরাচ্ছে। 

ফুলের সারিগুলোর ওপর সেই উষ্ণ হাওয়া গড়িয়ে গড়িয়ে চলল। একটা পাতাটে সুঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে বাতাসে। দক্ষিণের টিলার দিকে এগিয়ে গেল তিতিল আর সরাল। রোদের নিচে সরালের ঝিকমিকে পেশল শরীরে মসৃণ আলো ফিরতে থাকল। তিতিলের অনাবৃত পিঠ, ঊরুর ওপর উষ্ণ ঘামের স্বচ্ছ আবরণ রোদে ঝিকিয়ে উঠছে। চলতে চলতে পরস্পরকে দেখছে আর হাসছে দুজন। 

একটা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁটু মুড়ে বসে, বৃন্ত থেকে না ছিঁড়েই সরাল হাতে তুলে নিল সেই ফুল। হাতের পাতার মতো বড় একেকটা ফুল!

‘ওরে! দূর থেকে এত বড় মনেই হয় না!’

‘হুঁ!’

‘আসলেই, একদম যোনীর মতন। কী করে সম্ভব ?’

‘সেটাই ভাবছি কালকে থেকে।’

‘আমার বোঝা উচিত ছিল, যেনতেন কিছুতে মুগ্ধ হওয়ার মানুষ না তুই, কী বলিস!’

 সাবধানী হাতে ফুলের পাপড়ি আঙুলে স্পর্শ করে চোখ দুটো বন্ধ করল সরাল, যেন ফুলের গান শুনছে। ওর আঙুল আগপিছ করতে থাকল ফিনফিনে রেশমি পাপড়ির ওপর। ‘ওর নাম দিলাম অপরাজিতা।’

হঠাৎ নাক তুলে হরিণের মতো ঘ্রাণ নিতে থাকল সরাল বাতাসে। উঠে দাঁড়িয়ে তিতিলের দিকে ফিরে তাকাল।

‘কী সরাল ?’

তিতিলও গন্ধটা পেল।

‘কয়টার ঘ্রাণ পাচ্ছিস তিতিল ?’

‘একটারই।’

‘আমি কয়েকটার।’

হঠাৎ ঘ্রাণটা গেল হারিয়ে। সরাল তড়াক ঘুরে তাকাল তিতিলের দিকে।

‘গন্ধ গেল কোথায় ?’

‘শিকারি জায়গা বদল করেছে!’

দুজন পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে অল্প কুঁজো হয়ে সামনে ঝুঁকে আছে। সরোবরের জলের ওপর দিয়ে খেলছে বাতাস। পায়ের পাতা দুটো সমকোণে। হাতে যার যার অস্ত্র। স্নায়ু টানটান। তিতিলের অস্ত্র দু হাতের ছোরা। ও স্বল্প দূরত্বের শিকারি। বড় দূরত্বের শিকারি সরাল। ওর কোমরে জামলতার কুড়ি হাত লম্বা বেণি। শেষপ্রান্তে ফাঁস। তুণিরে শালকাঠের ফালি চোখা করে বানানো তীর। তীরের পেছনপ্রান্তে নোরা হাঁসের সবুজাভ পালক গোঁজা। পিঠে আড়াআড়ি বাঁধা থাকে বাঁশের যে ছ’হাত লম্বা ধনুক, তা এখন একজোড়া তীরসহ সরালের হাতে। তাক করা। ডান দিকে হেলে আছে অল্প।

কলাগাছের কাটা কাণ্ডের মতো ভিজে উঠল ওরা, কিন্তু চোখের মণি মৃতের মতো স্থির। ওরা অপেক্ষা করে যেতে থাকল। উষ্ণ রক্তের টানে ছয়টা লোয়া মাছি বোঁ বোঁ শব্দে উড়ে এসে ওদের খোলা পায়ে বসল। সরালের পায়ে দুটো, তিতিলের চারটা। নড়ার উপায় নেই।  

বাতাস শুঁকে হঠাৎ সরালের নড়াচড়ার লক্ষণ দেখা গেল।

‘কী বুঝলি।’

‘রক্ত। এগোবি ?’

‘হুঁ।’ 

দক্ষিণ পশ্চিমের টিলার কোণ ধরে এগোল দুজন। জায়গায় বনের সবুজ অন্ধকারে যতটুকু চোখ যায়, কালো পাতার নিশিত গাছের আধিক্য। বয়েসী এক নিশিতের নিচে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে বুড়ো এক মেছোবাঘ। আধবোজা চোখের পাতার আড়ালে মণি নিভে গেছে। বনের তরল অন্ধকারটা খানিক ফিকে। পাতার ফাঁক গলে আসা আলোয় সাদা হয়ে আছে মুখের কাছের ফেনার বুদবুদ। পেটটা চেরা। অন্ত্র বেরিয়ে এসেছে। তার রক্তের ওপর শক্ত হয়ে আছে আকারে খানিক ছোট আরেক মেছোবাঘের ছাপ।

‘আহারে!’

‘লাল সূর্যের দেশে সব অনেক বেশি রঙিন, কিন্তু দুর্বল। যা দেখলাম।’

‘চল্ জায়গাটা ছাড়ি। কী বলিস!’

‘ওর কোনও ব্যবস্থা করবি না ?’

‘মড়াখেকোর দল যে কোনও মুহূর্তে চলে আসবে যে! নয়তো করতাম নিশ্চিত।’

নিশিত বনের সীমার বাইরে চলে এল ওরা। ঝুঁকি এড়াতে দক্ষিণের টিলার ওপর উঠে। বাতাস দিগবদল করছে। মড়ার গন্ধ পৌঁছে গেছে মড়াখেকোদের কাছে। টিলার ওপর থেকে বুড়ো নিশিত গাছের তলটা দেখা যায়। একপাল সরীসৃপ মড়াখেকো এসেছে। ঠোঁট দুটো ধনেশ পাখির মতো, আর দেহটা কালো অজগরের। বুড়োর শরীরে কামড় বসিয়ে নরম শাঁসের মতো মাংস কেটে আনতে থাকল।

‘এদের নাম দিলাম কালো নদী।’

কালো নদীর পেছন পেছন এল উচ্ছিষ্টভোজী। এরা হাড়জিরজিরে হলদে চামড়ার কুকুরজাতীয় পশু। সারাক্ষণ মাথা নামিয়ে চোখ উঁচিয়ে যেন ‘জি আচ্ছা জি আচ্ছা বলে যাচ্ছে।’

কালোনদীরা চলে গেলে জে আচ্ছার দল এবার বুড়ো বাঘটার অবশিষ্ট হাড়গোড় আর লেগে থাকা বেয়াড়া মাংস নিয়ে আনাড়ি কামড়াকামড়ি শুরু করে দিল। এদের কণ্ঠ এমন, যেন বিকট শব্দে কেউ কাঠ ফাড়ছে।

‘এদের নাম দিলাম কাড়াকর।’

এই কাড়াকরেরা কাড়াকাড়িতে যতটা শক্তিক্ষয় করল, ততোটা শক্তি মরদেহ থেকে সংগ্রহ না করেই নিজেরা মারপিট করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে শেষে ফিরে গেল।

রিনিন, রিনিন!

ছলাৎ, ছলাৎ!

‘তোমার প্রশ্নের পাথর ছুড়ে নীরবতার সরোবরে পরমের বিম্ব চূর্ণ করে দিও না। তোমার মৃত্যুতে শোকে যে নীরবতা তৈরি হয়েছিল তা ভেঙো ন তিতিল শক্তিা’, বলল মহানিয়ম।

যথারীতি দশ দিকে ধবধবে সাদার পটে লালচে কমলা, হলদে সবুজ, হলদে কমলা, নীলচে বেগুনি, নীলচে সবুজ আর রক্তবেগুনি অগ্নিবিন্দু ছুটোছুটি করছে।

‘ভাঙব না,’ তিতিল শক্তি বলল। দূরে সরে গেল, হাসছে।

পরাগের রেণুগুলো ওপরনিচ উড়ে উড়ে পৌঁছে গেল ফুলের গর্ভাশয়ে। গর্ভাশয় পরিণত হলো ফলে। চারপাশে আলো বাড়ল, কমল, বাড়ল। বাতাস দক্ষিণ থেকে উত্তরে বয়ে গেল, পশ্চিম থেকে পুবদিকে বয়ে গেল। পরে আলো হয়ে উঠল কালো, বাতাস হয়ে উঠল শীতল। বাজের কড়কড় শোনা গেল আকাশে। বৃষ্টি নামল রিনি রিনি রিনি। গাছের পাতা ভিজে গেল, শেকড় ভিজে গেল, একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে এ তাকে, সে ওকে দোলা দিতে থাকল। 

তিতিলশক্তি স্থান পেরোতে লাগল, পথটা সবুজ। কাল পেরোতে থাকল, পথটা লাল। বৃষ্টির মাটি থেকে বেরোলো তিতিল শক্তি। বেরিয়ে কোমল বাতাসের ঋতুতে এল। কোমল বাতাসের ঋতু হয়ে, তিতিল শক্তি রুক্ষ শীতের সময়ে পৌঁছুল।  শোঁ শোঁ শোঁ! চলে এসেছে শীতের ভূখণ্ডে। যত জল পেয়েছিল পৃথিবী বৃষ্টির দিনে, তার কিছু বাষ্প হয়ে আকাশের দিকে উঠছে এখন। খানিক উঠেই মাটির টানে আটকা পড়ল।

কুয়াশার অর্ধস্বচ্ছ স্তরের ভেতর ভাগ ভাগ হয়ে ভেসে থাকল তিতিল শক্তি।

মহানিয়ম বাতাসের তুলি চালাচ্ছে। শূন্য আকাশের খাতায় আলো আর ধূলিকণা মেশানো কালিমেঘ দিয়ে অনেক কথাই লেখা হচ্ছে। সাগরের জল তা পড়ে নিচ্ছে সব। আর সাগরের সঙ্গে সখ্য সরালের। জলের কাছ থেকে তুনে তুনে সে সবটুকু জেনে নিল।

অনেকদিন হলো সে সমুদ্রে ভেসে ভেসে এই পাঠ সরাল আয়ত্ত করেছে। ছ’শ বছর আগে এক জোছনা রাতে সাগরে নৌকা ভাসিয়েছিল সরাল। ঢেউ তাকে বারবার তীরে আছড়ে ফেলছিল। জোয়ারের সময় পেরিয়ে ভাটা এল। তার নৌকা তরতর করে মাছের মতো সাঁতরে চলে গিয়েছিল গভীর সাগরে। ওই ছিল তার শিক্ষাসফর। 

এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে, চাঁদের অরা দেখে, নক্ষত্রের নকশা দেখে, নৌকা থেকে সরাল ঝাঁপিয়ে পড়ল ভাঙা আয়নার মতো জলে। নৌকাটাকে ঘিরে কিছুক্ষণ সাঁতরাল। তাকে দূরে ঠেলে নিয়ে চলল। নৌকায় কোনও বৈঠা নেই।

পশ্চিমে চাঁদ উঠেছে। আকাশে লিখেই যাচ্ছে মহানিয়ম। বাতাসের তুলিতে, আলোর কালিতে। সাগর তা পড়ছে তরতর। নৌকা ঠেলে নিতে নিতে জলে পা ছুড়ছে সরাল। দেখছে, শুনছে, জানছে।

একটা দ্বীপের কূলের কাছাকাছি তার নৌকা পৌঁছে গেল। এখানে জলের থৈ থৈ সরালকে সাবধান করে দিয়েছিল আগেই, তবু প্রবালের কাঁটায় ওর পা গেল ছড়ে। নোনা পানি লেগে জ¦ালা করতে থাকলে। উফ!

নৌকার তলা বাঁচিয়ে অনুমানে পা রেখে রেখে সরাল এগোতে থাকল তীরের দিকে। ক্রমশ পায়ের নতুন নতুন জায়গা রক্তাক্ত হয়ে উঠছে।

বালিয়াড়িতে পৌঁছে নৌকা টেনে ওপরে তুলে তার পাশে মাটিতে শুয়ে পড়ল সরাল। সাগরিক বাতাস! দ্বীপের কেয়া আর নারকেলের বনে যেন বিরাট কোনও তিলাইবাজ ডানা নাড়ছে।

সরাল উঠে বসল। নৌকা ঠেলে নিতে থাকল দ্বীপের উঁচু দিকে। একটা কেয়াঝোপের আড়ালে তাকে রেখে আরও খানিকটা পিছিয়ে এল। একটা কোমল ঢালে যেই না আবার পিঠ রাখতে গেছে, ঢালটা সরে গেল। এক কচ্ছপের পুরু খোল থেকে বালি খসে পড়ছে। সরে যাচ্ছে আলুথালু এক কচ্ছপ। চাঁদের আলোর নিচে বালুতে দাগ রেখে সাগরের চলল।

সাগরটা যেন ঘুমন্ত দানবদেও ঢেকে রাখা চাদর। দানবগুলো ঘুমের ঘোরে হাত পা নাড়ছে, পাশ ফিরছে। দেখতে দেখতে সরালের তন্দ্রা মতোন পেল। 

স্বপ্নে এল মহানিয়ম। তার সঙ্গী গাছের রঙিন আত্মারা। সরালের শিয়রে দাঁড়িয়ে বললÑ

‘ভূখণ্ড থেকে ভূখণ্ডে, পাখি ও পতঙ্গের সাথে উড়ে উড়ে পৃথিবীময় গাছেদের ছড়িয়ে দিয়েছে তিতিল-শক্তি। তিতিল তোমার জন্যে বিচরণের ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। তুমি তাতে ভ্রমণ করছ। আমি ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করছি না। কেবল ঘটনার প্রভাবকদের নিয়ন্ত্রণ করছি। আর এভাবেই আমি ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করছি, তাকে নিয়ন্ত্রিত না করে।’

‘ও আচ্ছা।’

‘আমিই সেই রহস্যময় ফুল তিতিলের দৃষ্টিগোচর করেছি। তোমাকে দেখিয়েছি তার মনের বাসনাকে। আমি তোমাদের বৃক্ষধর্ম দান করেছি। আমি তিতিল আর সেই ফুলকে পরস্পরের সংলগ্ন ও অনুগামী করে দিলাম। রোদ ছুটে যাচ্ছে ভীষণ উজ্জ্বল, জল ছলছল। বাতাস শনশনিয়ে উঠছে নামছে পাহাড়ের ঢাল ধরে। ওদের ব্যস্ততার রেখা মেনে তিতিল শক্তি ভারী মন নিয়ে কেবলই জায়গা বদল করছে, কেবলই স্থান আর কাল বদল করছে…’

নিঃশ^াসের সঙ্গে বালু এসে ঢুকেছে সরালের মুখের ভেতর। আকাশে ভারত মহাসাগরের পূর্ণ চাঁদ। সরাল উঠে দাঁড়াতেই পায়ের পাতা দুটো দেবে গেল বালুতে। আলোয় বালুগুলো ঝিকমিক করছে।

কেয়াগাছের আড়াল থেকে নৌকার কোণ বেরিয়ে আছে। পাটাতনে নাইলনের নীল মাছধরা জাল। সরিয়ে ডালাটা উঠিয়ে সুরক্ষিত কুঠুরি থেকে সরাল একটা প্লাস্টিকের বোতল বের করে আনল। নীল মোড়কের একপাশে ইংরেজিতে, অপরপাশে বাংলায় ‘মাম’ লেখা বোতলটার। ভেতরে টলটল করছে রুপালি পানি। তা দিয়ে কুলকুচো করল সরাল, মুখহাত ধুলো, খেলোও কিছুটা।

বাতাসে নিরন্তর মাথা নাড়ছে কেয়ার বন। তারও কিছু দূরে ঝাউ, নারকেল আর অচেনা বৃক্ষ, আলো আঁধারিতে চিনে ওঠা যায় না। তাদের নিচে অন্ধকার মাটির ওপর চাঁদের আলোর আঁকা বিচিত্র কিছু ছবি। বাতাস তাদের জ্যান্ত প্রাণির মতো নাড়ছে।

বেলাভূমি থেকে দূরে কেয়া গাছের কাছে কাছে মাটি খানিক শক্ত, সেখানে হাঁটতে সুখ। সেই সুখ নিতে নিতে, যেতে যেতে দ্বীপের অপরপ্রান্তে পৌঁছল লোকটা। দূর সাগরে, সোজা বহুদূর উঠে গেছে একটা কালো বাতিঘর। বৃদ্ধ, মৃত একটা বাতিঘর। সরাল আর সেই বাতিঘর দীর্ঘক্ষণ দৃষ্টি বিনিময় করল।

ওখানে ছিল সরাল, তিন দিন। অন্ধকার ঘরে এক সবুজপালকের মানুষÑতাকে সঙ্গ দিয়েছিল, না নারী, না পুরুষ। তার ঠোঁটের এক কোণ ছোঁয়া হাসি মনে আছে। সরালকে সে সঙ্গমে আহ্বান করেছিল। সরাল বলেছিল, ‘কখনও যদি সত্যিকার ভালোবেসে থাকো কাউকে, তোমাকে আমার দ্বিতীয়বার কিছু বলার নেই। কী বলো!’

পরের রাতে ভাটা এলে পাটাতনবোঝাই করে ডাব, কেয়াফল, বুনো ডেউয়া, নারকেলে ছোবড়ার ভেতর একুশটি নানা আকার আর রঙের ডিমÑকোনোটা চিঙ্গোলা পাখির, নোরা হাসের, কোনোটা কচ্ছপেরÑএই নিয়ে ক্রমশ গভীর সমুদ্রের দিকে এগোতে থাকল সরাল। তীর ছাড়িয়ে, প্রবাল পাথরের সীমা পেরিয়ে আরো পৌনে এক মাইল দক্ষিণে এলে নৌকার কাছা ছেড়ে দিয়ে সরাল পাটাতনে উঠে পড়ল। ভিজে গেল চাম্বল কাঠের পাটাতন।

সারা রাত মহানিয়ম আকাশে লিখল যা, সাগরে তার পড়ল ছায়া। সাগর সেই নিঃসঙ্গ যাত্রীটিকে তা পড়ে শোনাল রাতভর।

শ্রোতাটির তন্দ্রারোগ আছে। তন্দ্রা এলে ত্রিশ হাজার বছর আগের এক স্মৃতি স্বপ্ন হয়ে দেখা দিল মস্তিষ্কের ভেতর।

মিয়া ফুলের আরক খেয়ে একে একে সবাই ঢলে পড়েছে আগুনের পাশে। জেগে আছে কেবল সে আর তিতিল। তিতিল হামা দিয়ে এসে তার ঠোঁটে চুমু খেল। সরালও চুমু খেল তিতিলের ঠোঁটে। তার নরম বুকে মুখ রাখল।

আগুনে কাঠ পুড়ে যাচ্ছে। একাকী আকাশ পাড়ি দিচ্ছে সেই সন্ধ্যাতারাটা। 

চাঁদের নীল রূপালি আলোয় ডুবে আছে চারপাশ। সেদিন আগুনের পাশে মালার ছটফট দেখে তিতিল ঢোক গিলে বলল, ‘অশরীরীরা চলে এসেছে।’

মালা ক্লান্ত কোমল কণ্ঠে বলল, ‘আজ সত্যিই সেই রাত।’

রুরুর মেয়ে তা, মালার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে। তার বাবা একটা বাঁশের ধনুক নিয়ে বকর বকর করে যাচ্ছে ওড়ের সঙ্গে। চাঁদের আলোয় মাটিতে তাদেও ছোট ছায়া।

আজ সকালে নিহার নদীর পার ধেরে হেঁটে উপস্থিত হয়েছে বাপ মেয়ে। ছোট্ট তা-র বুকের হাড় গোনা যাচ্ছে। রুরুর কণ্ঠা বেরিয়ে গেছে, চোয়াল গেছে চুপসে। এসে বলে, ‘যতই শক্তিশালী হোক, মানুষ কি আর দল ছাড়া থাকতে পারে ? হে হে হে!’

দূর থেকে পুবের বাতাসে ভেসে আসছে নেকড়ের ডাক। বনের যেখানে শেষ, সেখানে বিরুৎ অধ্যুষিত রাজত্বের ছোট ছোট টিলায় নেকড়েদের বাড়ি।

উঠান থেকে তিতিলকে নিয়ে বেরিয়ে এলো সরাল। দুজন সরোবরছোঁয়া নদীর দিকে হাঁটতে থাকল। ধীরে ধীরে উঠানের কথার পিঠে কথা, হাসির শব্দ আবছা হয়ে এল।

সরাল তাকিয়ে আছে পথে। তিতিল চাঁদের দিকে।

‘এ দেশে চাঁদটা অনেক বড়, তাই না ?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু একটাই।’

‘তা ঠিক। একটাই চাঁদ।’

মাটিতে ছায়াপায়রারা উড়ে গেল তখন। একটা দুটো তিনটা, তারপর এক ঝাঁক। ঝট করে মুখ তুলল সরাল। ওপরে কিছু নেই। মাটিতে তখনও ছায়ারা সরে যাচ্ছে।

‘সেদিন এই ছায়াপায়রার শরীর দেখতে গিয়ে কী হয়েছিল বলেছি ?’ বলল তিতিল।

‘কই, না!’

‘তাহলে কাকে বললাম!’

‘কাকে না কাকে বলেছিস! অভাব আছে ?’

ছায়াপায়রার শরীর দেখবে বলে অড়ই গাছের বনে থেমেছিল তিতিল। তাদের কুঁড়ে থেকে আরও উত্তর পশ্চিমে অড়ই গাছের বন। অড়ই গাছ সোজাসাপ্টা ধরনের। ছ’ সাতটির মতো পুরুষ্টু শাখা। পাতা কম, প্রতি শাখায় ছ সাতটা মাত্র, কিন্তু আকারে বেশ বড় একেকটা। বড় হলেও গাছের গড়নের কারণে অড়ই বন কখনও অন্ধকার থাকে না। চাঁদের আলোয় পাতার ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে ছায়াপায়রার ঝাঁক সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। রাতে এক ধরনের মিষ্টি ঝাঁঝাঁল ঘ্রাণ ছাড়ে অড়ই পাতা। ছায়াপায়রারা তখন ঘন হয়ে পাতার ছায়ার নিচে নিচে জড়ো হয়ে মাথা তুলে নেই গন্ধ পান করে। সেদিনও তাই চলছিল। একটা গাছের আড়ালে আত্মগোপন করে ওদের দেখছিল তিতিল।

সরাল বলল, ‘মনে পড়েছে। শুক্লপক্ষের তৃতীয় রাত। ফিরতে ফিরতে চাঁদ ডোবালি।’

‘কিসের ভেতর কী!’

‘আচ্ছা বল্, তারপর ?’

‘তারপর যা হলো তা তোকে বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না।’

‘ঠিক হবে না। আর কাউকে বলা ঠিক হবে।’

‘তারপর হঠাৎ আমার দু’পায়ের মাঝে ভিজে উঠল।’

‘মানে!’

‘কুসুম শুরু হয়ে গেল। উরু থেকে গোড়ালি রক্তে ভিজে গেল।’

‘তারপর ?’

‘অড়ই বন ছেড়ে পেছাতে থাকলাম। পেছনে শামা ঘাসের মাঠ। হঠাৎ দেখি, শামা ঘাসের বনে তুই দাঁড়িয়ে আছিস। ডাকছিস।’

‘অসম্ভব। আমি তখন জামলতার বেণি কাটছি।’

‘তো কী হয়েছে ? একটা মানুষ কি এক সময়ে দুই জায়গায় থাকতে পারে না ?’

‘পারে নাকি! কী বলিস!’

তিতিলের চুলের গোছা চোখের সামনে থেকে কানের একপাশে সরিয়ে দিল সরাল। ‘তারপর কী করলি ?’

‘তার কাছে গেলাম। তোর কাছ থেকে যা আশাই করা যায় না, সেই যত্ন সে করল আমাকে।’

‘এভাবে ?’

সরাল আলতো কামড় বসাল তিতিলের কানে।

‘হ্যাঁ, এই করল।’

‘কী! তুই কী করলি ?’

‘তখন এমনিতে যন্ত্রণায় বাঁচি না, দিলাম এক ধাক্কা!’

ছোট একটা ধাক্কা খেয়ে সরাল চিবিদ গাছে ঠেস দিয়ে পড়ল।

‘তারপর ?’

‘চলেই যাচ্ছিলাম। তখন পেছন থেকে আমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলি তুই।’

‘সর্বনাশ!’

‘কিছু বললাম না আমি। একটা উঁচু জায়গায় আমাকে শুইয়ে দিলি। তোর কাছে ওলট পাতার গুঁড়া ছিল। রক্ত শুষে নিলি।’

‘তারপর ?’

‘প্রথম স্রোতটা একটু কমল। ওলটপাতার গুঁড়াগুলোও জমাট বেঁধে গেছিল। তুই ওগুলো একটা একটা গর্তে ফেলে ঘাসচাপা দিয়ে, আবার আমার কাছে এলি।’

‘এসে ?’ 

তিতিল এক পা এগিয়ে এল। সরালও তাই। দক্ষিণ দিক থেকে বাতাসের বহর ছুটে এসে তিতিলের সমস্ত চুল বাঁ কাঁধে নিয়ে ফেলল। খোলা ডান কাঁধ জোছনা ফেরাচ্ছে। ‘এসে বললি, তোকে এতো সুন্দর কখনও লাগেনি রে! আমি বললাম, আমার শরীর খুব খারাপ লাগছে সরাল। আমাকে কুঁড়েতে দিয়ে আসবি ?’

‘তুই কাঁদছিস কেন ?’ হেসে ফেলল সরাল।

‘তুই বললি, অবশ্যই দিয়ে আসব, আমি পাহারা দিয়ে রাখব তোকে। তুই তো আমার উমা, আমার কত যত্নের তুই! একদম চিন্তা করিস না।’

‘তাই বললাম ?’

‘হ্যাঁ। আর বললি, তোকে দেখে গলা ভার হয়ে আসছে। বুকে আদর জাগছে। আমি বললাম, আর কটা দিন। তুই বললি, ক’দিন, ক’দিন ? আমি আবার বললাম, আর ক’টা দিন।’ চারপাশের বাতাস মিয়া ফুলের আরকের ঘ্রাণের ভরে উঠেছে। তিতিল ফিসফিস করে বলল, ‘কাল শেষ হয়েছে।’

সরাল সন্তর্পণে তিতিলের ওপরের ঠোঁটটা তুলে নিলো দুই ঠোঁটের মাঝে। ছোট ছোট শ^াস নিচ্ছে তিতিল, ফেলছে। সরাল তার শ^াসের ঘ্রাণ নিতে থাকল। মিয়া ফুলের আরকের ঘ্রাণ। তিতিল ঠোঁট না সরিয়েই তর্জনি আর বুড়ো আঙুল দিয়ে সরালের ঘাড়ে রামচিমটি কাটল। সরাল শব্দ করে হেসে কোমর ধরল জড়িয়ে ওর। আরো ঘনিষ্ঠ করে তুলল। চুমুর পাললির স্তর জমে জমে আদর বড় হলো তার নিজস্ব গৌরবে।

তলপেটের কাটা দাগটার ওপর হাত রাখল সরাল। তিতিল চোখ বন্ধ করে রেখেছে। ভিজে উঠেছে চোখের পাতা।

‘তিতিল!’ 

চোখ খুলল তিতিল। চাঁদের আলোয় জলের নিঃসঙ্গ ধারা মসৃণ গালে।

‘তুই কাঁদছিস কেন ?’

দূরে ফিরোজা সরোবরের পাশে নক্ষত্রের আলোয় শিহরিত হচ্ছে নীল যোনি ফুল। ধীরে ভিজে উঠছে পাপড়ি।

‘তিতিল!’ 

নিজ কণ্ঠের ডাকে তন্দ্রা ভেঙে, নৌকার পাটাতনের ওপর উঠে বসল সরাল। ঢেউয়ের তালে নৌকা উঠছে, নামছে। অন্ধকারে ঝিকমিক করছে সমুদ্রজোনাকি।

আকাশ থেকে তারারা সব উধাও। ঝড় আসতে পারে।

ফিরোজা সরোবরের পাশে নিঃসঙ্গ হাত পা নাড়ছে এক মানবশিশু। দীর্ঘ লেজ দিয়ে তাকে আগলে রেখে শরীরের উষ্ণতা দিচ্ছে অর্ধেক বাঘ অর্ধেক ষাঁড় এক প্রাণী।

বনের পাশ ধরে তিতিল নামে এক কিশোরীর কায়াহীন ছায়া দ্রুত হাঁটছিল, যেন তার কোথাও যাওয়ার খুব তাড়া ছিল, যেন কেউ তাকে আসবে বলে কথা দিয়েছে।

ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল সেই ছায়া।

সচিত্রকরণ : হামিম কামাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares