গল্প : চক্রব্যূহ : অঞ্জন আচার্য

র মিজউদ্দিনের রাম দা কি না কেটেছে ? কলাগাছ থেকে মানুষের মাথা এক কোপে ফেলে দেওয়া কোনও ব্যাপারই ছিল না। নবীনপুরের মানুষ যত না রমিজকে ভয় পায়, তার চেয়ে বেশি সমীহ করে তার রাম দাটাকে। ইদানীং সেটিতে গাঢ় বাদামি রঙ ধরেছে। হাতলটি কালচে হয়ে গেছে। বহুদিন পর আজ কী মনে করে এই ভরদুপুরে সেটি নিয়ে পড়েছে রমিজ। ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে দায়ের ধারটা পরখ করতে করতে ভাবে, সময়টা কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে অজগর সাপের মতো। রমিজের রক্তও কেমন ঠাণ্ডা মেরে গেছে কালে কালে। বয়স তো আর কম হ’ল না। তিন কুড়ি হয়েছে গত বৈশাখে।

উঠানের একপাশে ভাদ্র মাসের কড়া রোদ পড়েছে। পিঠ দিয়ে সেই রোদ ঠেকিয়ে বসে রমিজ। মোটা একটা মাছি অনেকক্ষণ ধরে ভনভন করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। তার পায়ের ওপর বসছে, আর উড়ে উড়ে যাচ্ছে। হাত দিয়ে সেটিকে মারার চেষ্টা করে। পারে না। বাম পায়ের গোড়ালির নিচ থেকে সবুজাভ রস বের হচ্ছে। দিন সাতেক আগে একটা পেরেক বিঁধেছিল। সেখানটায় ঘা হয়ে গেছে। ঘায়ের পেট ফুঁড়ে রস বের হচ্ছে। রসের গন্ধে বমি আসতে চায়। কোত্থেকে যে মাছিটা উড়ে এল, কে জানে ? যেন কাঁঠাল ভাঙা হয়েছে। রস চেটে খেতে খেতে মাছিটি উড়তে থাকে। নিজের মনে কী যেন বলে রমিজ ? ঠিক শোনা যায় না। দূরে একটা মাইকের শব্দে কান খাড়া করে সে। রাস্তাটির দিকে চোখ যায়। মাইকের আওয়াজটি ক্রমশ কাছে আসতে থাকে―‘ভোট, ভোট, ভোট, কাজী মেম্বার ভালো লোক, জয়ের মালা তারই হোক। কাজী মেম্বার চায় কি, জনগণের শান্তি।’  হাটের দিনে বাজারের পাশের ফুটবল মাঠে বসবে নির্বাচনী সভা। লক্ষ্মণ দাস সার্কাস থেকে সজনীমোহন যাত্রাদল―সবই এই মাঠে এসে ঠাঁই নেয়। বাজারের এক পাশ দিয়ে কালসাপের মতো কিলবিলিয়ে বয়ে গেছে বংশী নদী। একসময় নাকি এই নদী দিয়ে বজরা যেত। এখন হেঁটেই এপার ওপার হওয়া যায়। সময় সব গিলে খায়। নদীটাও রক্ষা পেল না।

রমিজের চোখগুলো আজকাল গাঁজা খাওয়ার মতো মনে হয়। হয়তো ব্যথায়, নয়তো ক্ষোভে। হঠাৎ ভোটের কথা শুনে চোখ দুটো যেন আরও বেরিয়ে আসতে চায়। একটা লাল পিঁপড়া বেয়ে ওঠে রমিজের ঘাড় বেয়ে। ঘামে জবজবে চুলের পাশে এসে আবার নামতে চায় পিঁপড়াটি। খপ করে সেটিকে ধরে ফেলে রমিজ। ডান হাতের চেটো দিয়ে চেপে ধরে। হাতের তালুতে তুলে ধরে আধমরা পিঁপড়াটাকে। তর্জনি আর বুড়ো আঙুলের ফাঁকে সেটি ফেলে দলে দলে পিষে মারে। পিঁপড়াটাকে মারতে রমিজের খুব ভালো লাগে। চোখ দুটো রোদে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। ঠোঁটের এক কোণে হাসির মতো কিছু একটা ফুটে ওঠে। লাল রঙ রমিজের বড়ো প্রিয়। 

রক্ত নিয়ে কারবার ছিল রমিজের। জমি দখলের সময় ডাক পড়ত তার। বায়না এলেই কে যেন তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিত। রক্ত তখন আর রক্ত থাকত না, পেট্রোল হয়ে যেত। মনে হতো মস্ত বড় একটা কড়াইয়ে তার শরীরটাকে রক্তের মধ্যে ডুবিয়ে কেউ ভাজছে, কালু ময়রার রসগোল্লার মতো।

সে কি আজকের কথা! এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামাতে শহরে তখন খুব গণ্ডগোল চলছে। রেডিওতে সারাদিন দেশের গান বাজে। নবীনপুর বাজারে কাজী মেম্বারের ঘরে ইত্তেফাক পত্রিকা আসে দুপুরবেলা। বিকালে গোল হয়ে সবাই সেখানে গিয়ে বসে। আলাল মিয়া, হারাধন মিস্ত্রি, জামিল উদ্দিন, সুকুমার পালের সঙ্গে রমিজও চা খেতে খেতে শহরের খবর শোনে। মনে যেন এক সঙ্গে পুরো নবীনপুরের মানুষ আঁৎকে ওঠে পত্রিকার খবরে।

পড়ন্ত বিকেলের সূর্যটা ডুব দেয় নদীর ওপারের গোলপাতার জঙ্গলের পেছনে। কে যেন জানতে চাইল মেম্বারের কাছে―তাইলে কি পল্লীবন্ধু থাকব না ? আমাগো কী হইব মেম্বার সাব ?

রমিজের চোখে কোনও ভাবান্তর নেই। একটা লোম পর্যন্ত নড়ে ওঠে না। মন না দিয়েও সব শোনে। কোনও কথাতেই সঙ্গ দেয় না। কে কবে ওর কথা শুনেছে বলি ? কিছুই বললেই কেবল নাক দিয়ে শব্দ করে―হুম, নয়তো মাথা নাড়ে। সারাদিন বরফ কলের যন্ত্র হয়ে ভেতরে ভেতরে বুদ হয়ে থাকে। বাঁশের বেঞ্চের এক পাশে বসে চায়ে চুমুক দেয় ছুপ ছুপ শব্দ ক’রে। মেম্বারের ডাকে রমিজের ঘোর কাটে। বরাবরের মতো নিরীহ চোখে তাকায় মেম্বারের দিকে। গম্ভীর গলায় কাজী মেম্বার বলেন―‘কমলগঞ্জে চর জাগছে রমিজ।’

এই একটিই বাক্য। এই একটি কথায় সব কথা বলা হয়ে যায়। দখলের দিনক্ষণ ঠিক করা এখন রমিজের ওপর। দলের সবাইকে এক জোট করতে হবে। এক মনে সবার মুখ ভাসাতে চেষ্টা করে। হারিচ্চা, কাল্লু, পাশা, হারু, লম্বু, বিচি …

ঘাড়ের কাছে দাঁড়ানো নিতাইকে ইশারা করে মেম্বার বলেন, ‘সকালেই শহরে যাবি। দারোগার কাছে ব্যাগ দিয়ে আসবি।’

নিতাই ঘাড়টা ডান দিকে কাৎ করে সম্মতি জানায়। রমিজের দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকায়।

জুম্মার দিন দুপুরে যার যার মতো গিয়ে উপস্থিত হয় কমলগঞ্জে। রাম দা, বর্শা, টেঁটা, বল্লমগুলো কেউ রিকশা ভ্যানে, কেউ রিকশায় করে, কেউ-বা পিঠে-পেটে গুঁজে নিয়ে আসে। এ জায়গা খুব সুবিধার জায়গা না। সেখানকার ন্যাংটা ন্যাংটা ছেলেগুলোও জন্মানোর পর থেকেই রক্ত দেখে দেখে বড় হয়। দূরে নতুন জেগে ওঠা চরের দিকে চোখ যায় রমিজের। চরের নাভির ওপর কে যেন আগে থেকেই একটা লম্বা বাঁশ পুঁতে গেছে। মাথায় লাল ঝান্ডা।

গঞ্জের ভেতর আজ গুমোট ভাব। মনে হয় যেন, কিছুক্ষণ এখানে বড় সড় ডাকাতি হয়ে গেছে। দোকানপাট সব কপাট দেওয়া। দুপুরের দিকে এদিকে কেউ আসে না। বিকাল থেকেই আবার সব জমে ওঠে। রাত দশটা পর্যন্ত চলে। তারপর এক এক করে নিভতে থাকে সব। রাত এগারো বাজার আগেই পূর্ণিমা রাতে কমলগঞ্জ বাজারে অমবস্যা নেমে আসে। তবে আজকের কথা আলাদা। দুপুরটাকেই নিশুতি রাত মনে হচ্ছে। এর ভেতর দিয়েই ফাঁকে ফাঁকে দূরত্ব রেখে একে একে রমিজেরা এগিয়ে চলে। রাস্তা পেরিয়ে ঢাল পেরিয়ে নদীর দিকে নেমে যায়। ঘাটে গিয়ে দেখে কোনও নৌকা নেই। চরে যাওয়ার পথ এই নৌকা। তাহলে কি আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল কমলগঞ্জের সবাই ? ওই পারে যাওয়ার উপায় খুঁজতে থাকে রমিজ। অপেক্ষা করতে থাকে। হঠাৎ একটা বর্শা সাঁই করে কাল্লুর পিঠে এসে বিঁধে। কাটা নারকেল গাছের মতো এক কাঁতে ধপ করে পড়ে সে। খরগোশের সতর্কে ঘুরে দাঁড়ায় রমিজেরা। ঢালের ওপরের দিকে উঠতে যায়। তিন-চার জনের একটা দল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যায় ওপরের দিকে। তার মানে আজ দাঙ্গাটা এখানেই বাঁধাতে হবে। মুখে বাঘের গর্জন তুলে একটা গালি দেয় রমিজ। তেড়ে যায় ওই চার জনের দিকে। কিছু বোঝার আগেই আশপাশ থেকে হই হই ওঠে। ডানে-বামে পঙ্গপালের মতো কিলবিলিয়ে আসতে থাকে ছেলে-বুড়ো থেকে ঘরের বউ। আজ আর রক্ষা নেই রমিজদের। রমিজও পালিয়ে যাওয়ার লোক নয়। রাম দাটাকে চড়কির মতো বাতাসে ঘোরাতে থাকে। দুই-তিনজন সেই দায়ের কোপে মাটিতে পড়ে যায়। চক্রব্যূহ ভেদ করার সূত্র তো জানা নেই কারও। ভীমের শক্তিতে লড়তে থাকে রমিজ। প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যায় সঙ্গীদের বাঁচাতে। পেছন থেকে বাঁশের একটা আঘাত এসে মাথায় পড়ে। কলকল করে জুলফি বেয়ে গরম কিছু নেমে আসে। জ্ঞান হারাতে হারাতে আবার জেগে ওঠে রমিজ। তবে রক্ত তাকে জাগিয়ে তোলে। একসময় অবস্থা বেগতিক দেখে দৌড়ে পালায়। সঙ্গের দশ-বারো জনের খবর তখন কেউ জানে না।

শেষ বিকালের আলোয় রমিজ এসে দাঁড়ায় পিচের বড় রাস্তায়। দূরে একটা ভ্যান যেতে দেখে হাত ইশারায় থামায়। রমিজের রক্তাক্ত মুখ দেখে ভ্যানে বসা দুই যাত্রী গা সিটিয়ে বসে। পথে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে নেমে যায় রমিজ।

পুরোটাই যে মেম্বারের সাজানো ছিল, সেটি বুঝতে আঁটচল্লিশ ঘণ্টা সময় লাগল রমিজের। পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল বাড়ি থেকে। খুনের মামলায় আদালতে পাঠানো হলো পরের দিন। যাবজ্জীবন সাজা হলো। জেলখানায় বসে অনেকবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে রমিজ। ঠিক পালানো বলা যায় না। মেম্বারকে এক কোপে ফেলে দিয়ে আবার ফিরে আসা যাকে বলে। তা আর হলো কই ?

আজ এই ভরদুপুরে বসে রমিজ সেই কথা ভাবতে ভাবতে ভোটের খবর শোনে। ভাবছে সমাবেশ দেখতে যাবে। কিন্তু পায়ের ঘা-টা কিছুতেই সায় দিচ্ছে না। দুই মণ পাথর যেন বেঁধে রাখা হয়েছে পায়ের সঙ্গে। গত রাতেরই তো ঘটনা। ঘর থেকে বের হয়ে যেই ঝোপের আড়ালে গিয়ে বসবে সেই সময়টুকুই মেলেনি। লুঙ্গির মধ্যেই সবটা সেরে ফেলেছে। এতটা বিকল হয়ে গেল কবে ? ভাবে আর জ¦লে ওঠে।

ঘরের চালার নিচে লম্বা একটা রাম দা রাখা ছিল। সেটি বের করে আজ বসেছে কী মনে ক’রে ? ইটের একটা টুকরো দিয়ে বাদামি রঙ ঘঁষে ঘঁষে উঠাতে গিয়ে দেখে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। মেম্বারকে এক কোপে ফেলার আগে ধারটা একবার পরখ করা দরকার। যেই ভাবা, সেই কাজ। মুঠোর মধ্যে হাতলটা আঁকড়ে ধরে। আস্তে আস্তে সেটি তুলে ধরে ওপরের দিকে। কানে বেজে ওঠে একদল ঢাকের শব্দ, কাশার আওয়াজ। রক্তটা টগবগিয়ে ওঠে। পাঁঠা বলি দেওয়ার ভঙ্গিতে দা-টাকে সপাৎ করে নামিয়ে আনে। এক কোপে পায়ের গোড়ালিটা আলগা হয়ে যায়। প্রথমে চুয়ে চুয়ে, তারপর কলকল করে রক্ত বের হতে থাকে। পুঁজ খাওয়া মাছিটা কোথায় যেন উড়ে যায়। উঠোন ভেসে যায় লাল রঙে। লাল রঙ রমিজের খুব প্রিয়।

নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘায়ে ধরা কাটা পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে রমিজ। প্রিয় রঙ দেখে হাসার চেষ্টা করে।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares