গল্প : একটি বাতিল নোটের গল্প : নাহিদ নার্ম

গ্রী ষ্মের দুপুরের সূর্যের তাপ আস্তে আস্তে কমে আসছে। আজ কয়েকদিন জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে আছে গরমে। প্রকৃতির ওপর মানুষের সব অমানবিক অত্যাচারের জবাব দিতেই যেন প্রকৃতি তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে। প্রকৃতি যেন সে দিক থেকে বেশ সফল বলতে হবে। কেননা, গ্রীষ্মের দাবদাহে মানুষের জীবন এখন বিপর্যস্ত।

আমি আমার নিত্যনৈমিত্তিক ডিউটি অর্থাৎ টিউশন শেষে আজিমপুর থেকে নীলক্ষেত মোড় হয়ে হেঁটে চলেছি,গন্তব্য টি.এস.সি। হঠাৎ নীলক্ষেতে রাস্তার পাশ ঘেঁষে যে তেহারির দোকানগুলো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সেই দোকানগুলোর পাশ থেকে বেশ চিৎকার চেঁচামেচি শুনলাম। আশেপাশের মানুষ অনেক ব্যস্ত, যতটা কাজে ব্যস্ত তার চেয়েও ব্যস্ত তারা গণ্ডগোল এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতায়। কে চায় নিজের টাকায় খেয়ে এই যান্ত্রিক শহরে হাজারো সমস্যায় পড়তে ? একটু এগিয়ে যেতেই দেখি মধ্যবয়স্ক একজন লোককে কিল, ঘুষিতে একাকার করে দেওয়া হচ্ছে এবং অশ্লীল ভাষায় বকা দেওয়া হচ্ছে। লোকটার পরনে একটা কালো মলিন পাঞ্জাবি। কালো বলে কি পরিমাণ ময়লা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একটা জিন্স প্যান্ট, এক পা বড় অন্য পায়ে হাঁটু পর্যন্ত ছিড়ে ঝুলছে, পা খালি।

লোকটার পাঞ্জাবির পকেট থেকে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু সে জীবন বাজি রেখে তা রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে, একসময় মলিন পাঞ্জাবিটা হার মানল, পকেটটা ছিঁড়ে গেল কিন্তু সে তার হাতের মুঠি এমনভাবে শক্ত করে ধরে রেখেছে যেন যক্ষের ধন আছে।

কাছে গিয়ে বললাম ‘কি হয়েছে ভাই উনাকে মারছেন কেন ?’

 দোকানের কর্মচারী ছেলেটা ধস্তাধস্তি বন্ধ করে হাঁসফাঁস করতে করতে বলতে থাকল,

‘চোর হালায়, পাগলের ভান ধরছে।’

‘শুধু চোর বললে ভুল হবে বাটপারও বটে, পকেটে টাকা থাকতে টাকা দিয়ে খাবে না হারামজাদা’ যোগ করল দোকান মালিক।

‘আমি উনার খাবারের দাম দিচ্ছি, উনাকে ছেড়ে দিন।’

দোকান মালিক বলল, ‘আরে না, টাকা দিতে হবে না, হারামজাদা প্যাকেট নিয়ে পালাতে পারলে তো! জহুরুইল্ল্যা থাকতে।’

পাশে চেয়ে দেখলাম সুঠাম দেহের জহুরুইল্ল্যা বুক ফুলিয়ে গর্বের হাসি হাসছে। বললাম ‘তাহলে উনাকে এভাবে মারছিলেন কেন ?’

 জহুরুইল্ল্যা বলল ‘তো, মারমু নাকি ওরে চুম্মা খামু! খাওনের প্যাকেট নিয়ে ন্যুর (দৌড়) দিছে আবার টেহ্যাও দেয় না’।

একবার তাকালাম দোকানির দিকে, তার ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি, আবার তাকালাম ঐ লোকটার দিকে তার ঠোঁটের কোণায় রক্ত। মনে মনে বললাম, হায় রে মানবতা, তুই বুঝি সত্যিই এখন জাদুঘরে!

‘আমাকে দুই প্যাকেট তেহারি দিন, ফুল করে দিবেন।’

পকেটে টাকা আছে, গতকালই একটা টিউশনির টাকা পেয়েছি। দুই প্যাকেট তেহারি আর একটা পানির বোতল নিয়ে লোকটাকে বললাম চলেন, সে বলল ‘খ ষ ৭৯৫৬৫৩০৬’, আমি কিছুই বুঝলাম না।

একটা রিকশা ডেকে সিনেট ভবনের পাশের মাঠে গিয়ে বসলাম।

বললাম, ‘নিন পানি দিয়ে হাত মুখটা ধুয়ে নিন, তারপর খাওয়া শুরু করুন।’ 

লোকটা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর ফিসফিস করে বলল ‘খ ষ ৭৯৫৬৫৩০৬’, আমি বুঝতে পারলাম না সে আসলে ঠিক কী বোঝাতে চাইছে। সে খুব দ্রুত খাচ্ছে, পেটের ক্ষুধা যে পৃথিবীর সবথেকে বড় দানব তা লোকটার খাওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এজন্যই হয়তো কবি ক্ষুধার্ত অবস্থায়, চাঁদকেও ঝলসানো রুটির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কিছু সময় খাওয়ার পর আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা ভাই আপনার নাম কি ?’

‘মো. শহিদুজ্জামান চৌধুরি’

‘আপনি কোথায় থাকেন ?’

সে বলল, ‘I am a man who live and eat on the street.’

‘জ্বি ?’

‘হ্যাঁ, আমি রাস্তায় হাঁটি এবং রাস্তায় থাকি।’ লোকটা উত্তর দিল।

আমি বললাম ‘আপনি রাস্তায় হাঁটেন কেন ?’

‘তাকে খুঁজি।’

‘কাকে খোঁজেন ?’

এবার সে বলল, ‘প্লিজ ডোন্ট ডিস্টার্ব মি। খাওয়ার সময় কোনও বহবসু-কেও ডিস্টার্ব করতে হয় না। এটা হচ্ছে মিনিমাম কার্টেসি।’

আমি আর কোনও কথা বললাম না।

সে খাওয়া শেষ করে পানি খেয়ে আমায় বলল, ‘থ্যাঙ্কস ইয়ংম্যান। আমি উঠছি।’

বললাম ‘একটু দাঁড়ান ভাই, এই প্যাকেটটা নিয়ে যান রাতে খাবেন। আর যদি কিছু না মনে করেন তাহলে আমি কি জানতে পারি আপনি কি লুকাতে চেয়েছেন দোকানির কাছ থেকে ? তারা বলল টাকা, আসলেই কি আপনার কাছে কোন টাকা আছে ?’

সে তখন বেশ মলিন একটা পঞ্চাশ টাকার কাগজের নোট বের করে আমার হাতে দিতে দিতে বলল, ‘ওঃ ধিং ঃযব ষধংঃ ংুসনড়ষ ড়ভ যবৎ.’

আমি হাতে নিয়ে দেখলাম টাকাটা ২০০৫ সালের, তার মানে আজ থেকে পনের বছর আগের। হঠাৎ টাকার গায়ের নাম্বারটা চোখে পড়ল ‘খ ষ ৭৯৫৬৫৩০৬’―বুঝতে বাকি রইল না আমার কেন সে নাম্বারটা বলছিল বার বার। সে টাকাটা নিতে হাত বাড়ালো এবং ফিসফিস করে বলতে থাকল ‘খ ষ ৭৯৫৬৫৩০৬’।

আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি! সে টাকাটা নিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে, তেহারির প্যাকেটটা নেয়নি, রেখে গেছে।

কথা বলার কোন ভাষা পেলাম না। ইট, পাথরের এই শহরে যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু স্বার্থের আদান-প্রদান, মানবতা যেখানে জাদুঘরে, সেখানে আজও কিছু সত্য ভালবাসা বেঁচে আছে শহিদুজ্জামান সাহেবের মতো মানুষের রক্তাক্ত ঠোঁটের কোণায়, মলিন পাঞ্জাবিতে, নয়তো স্মৃতি হয়ে ‘খ ষ ৭৯৫৬৫৩০৬’ নাম্বারের কাগজের কোনও নোটে।

শহিদুজ্জামান সাহেব চোখের আড়াল হয়ে গেলেন, তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু যেই স্মৃতি তিনি আজও বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন, তাঁর সেই প্রিয় মানুষটি কি আদৌ তা জানে ? বা, কখনও কি জানতে পারবে ?

ইচ্ছে হচ্ছে, পুরো বাংলাদেশে জানিয়ে দিই সত্যিকারের ভালোবাসা হারিয়ে যাইনি, শহিদুজ্জামানের সেই প্রিয় মানুষটিও জানুক সে কত বড় ভাগ্যবতী যে, এমন ভালোবাসার মানুষ পেয়েছিল।

না থাক, সত্যি ভালোবাসায় সব জানতে হয় না, তবু তা বেঁচে থাকে আজীবন, হয়তো কারও মনের গহিনে নয়তো স্মৃতি হয়ে কোনও বাতিল কাগজের নোটে।

লখেক : গল্পকার

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares