গল্প : পুলিশ বলল : আমি জানতাম না তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা : মাহফুজ রিপন

আমাদের পরিবারের সারা বছরের জমে থাকা আনন্দ ফোয়ারার মতো নেমে আসে ঈদের সময়। পরিবারের সবাই এক জায়গায় হই। আমার মামারা খুলনা থেকে গ্রামে চলে আসে। ঈদ এলে আম্মার কাজের গতি বেড়ে যায়। ঘরের টুকিটাকি কাজের মধ্যে সে মিটমিট করে হাসে। আম্মা যে কি কথা মনে করে মিটমিট করে হাসে সেটা আমি এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারিনি। ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরেছি দুই দিন হলো, কিন্তু আব্বার সঙ্গে দেখাই হচ্ছে না। ফজরের নামাজ পড়ে সে চলে যায় উপজেলা সদর থেকে তিন মাইল দূরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে। বিকেলে ক্ষেতের তৈরি তরিতরকারি নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন। সেবার আব্বাকে কেন যেন অতিশয় নীরব মনে হয়েছিল। ঈদের দিনটা কেটে গেল ঘরের মধ্যে। মুষলধারে বৃষ্টি। ঈদসংখ্যার পাতা উল্টাতে উল্টাতে ঘন হয়ে উঠি, বৃষ্টিও যেন আমার সঙ্গে সারা দিন পাল্লা দিয়ে চলল।

ঈদের পরদিন মামাবাড়ি দাওয়াত খেতে গেলাম। উঠোনে শামিয়ানা টানিয়ে মেজবানি চলছে। আমি আর মেজ মামা সবাইকে নিজের হাতে খাবার বেড়ে দিলাম। আমার মনে পড়ে সে-দিনই প্রথম নিজের হাতে আব্বার প্লেটে দু’পিস গোস্ত তুলে দিয়ে ছিলাম। আমরা পরিবারের সবাই আব্বাকে ভীষণ ভয় পেতাম, তিনি খুব রাগী মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর মনটা ছিল পাখির মতো উদার। ঈদ এলেই যেন গ্রামে বিয়ের ধুম পড়ে যায়। আমরা সবাই বাড়ি ফিরে গেলাম, আব্বা আর ছোট মামা গেলেন বিয়ে খেতে। আম্মা অবশ্য তাঁকে বারবার যেতে নিষেধ করেছিলেন। ছোট মামা এবং আব্বা মোটরসাইকেলে করে আমাদের অতিক্রম করে ভোঁ করে ছুটে গেল। সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা আব্বার দেহটা পেছন থেকে কিছুক্ষণ দেখা গেল। আমরা মনখরাপ ক’রে বাড়ি ফিরলাম। আব্বা ফিরে এলেন পরদিন বিকেলে। সন্ধ্যা হয়েছে। আম্মা আয় আয় টি টি বলে পালা মুরগিগুলোকে ঘরে তুলতে ব্যস্ত। রাস্তার বাল্বটা কেটে গেছে, সেটা আনতে বাজারে যেতে হবে। আব্বা চেয়ারে বসে মাথায় হাত দিয়ে কি যেন ভাবছেন। টাকা চাইতেই আমার দিকে ঘাড় কাত করে বললেন―পকেট থেকে নিয়ে যাও।

রাত তখন তিনটা বাজে। হঠাৎ আম্মা, চিৎকার―‘কই ওঠ তোর আব্বা যেন কেমন করছে। তাড়াতাড়ি ওঠ হাসপাতালে নিতে হবে’। দ্রুত কাছে গেলাম। দেখি বুকে হাত দিয়ে আব্বা বসে রয়েছেন। মধ্যরাত দোকানপাট সব বন্ধ, কোথাও একটি ভ্যান গাড়িও পেলাম না। কোনও উপায় দেখতে না পেয়ে আম্মা আর আমি আব্বার হাত ধরে উপজেলা হাসপাতালের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। সে রাতে পূর্ণিমা ছিল। হ্যালোজেনের আলোর মতো তীব্র জ্যোৎস্নায় সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সারা দিনের কর্মব্যস্ত রাস্তাটিকে মধ্যরাতে অনেক প্রশস্ত মনে হচ্ছিল। আব্বাকে নিয়ে ভ্যান স্ট্যান্ড পর্যন্ত যেতেই দুটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল। বাজার পাহারাদার বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছে। কুকুরের ডাক শুনে সজাগ হয়ে আমাদের দিকে টর্চ জ¦ালালো। সুনসান নীরবতা, আম্মার সেন্ডেলের চটপট শব্দে আমার চোখের ঘুম মিলিয়ে গেল।

হাসপাতালের ইমারজেন্সি রুমে ডাক্তার, চেয়ারে বসে মোবাইল ফোনে অলস সময় ব্যয় করছে। আমরা যেতেই তিনি আব্বার প্রেসার মাপলেন, আম্মার কাছ থেকে সব তথ্য নিয়ে কাগজে বেশ কিছু ওষুধের নাম লিখে বললেন―এই ওষুধগুলো এখন লাগবে আর সকালবেলা এই টেস্টগুলো করাতে হবে। আমি ছুটলাম ওষুধের দোকানে। রাত  তখন সাড়ে তিনটা। বাজারের চারদিক পাগলের মতো ছুটে চললাম কিন্তু কোথাও কোনও দোকান খোলা পেলাম না। কি করব মাথায় কাজ করছে না। হঠাৎ বুদ্ধি এল দোকানের ভেতরে হয়তো কোনও লোক ঘুমিয়ে থাকতে পারে। একে একে সকল দোকানের শাটারে দুহাত দিয়ে আওয়াজ শুরু করলাম, ‘ভেতরে কেউ আছেন, আমার আব্বা খুব অসুস্থ একটু ওষুধ দরকার’। কিন্তু ভেতর থেকে কোনও শব্দ ফিরে এল না। গভীর রাতে আমার চিৎকার শুনে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল। পাহারাদার মোতালেব পাঁচ ব্যাটারি টর্চের আলো আমার চোখের ওপর থেকে নামিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল―ওষুধের দোকান সব বন্ধ। জরুরি দরকার হলে নোমান মিয়ার বাড়ি যাওয়া লাগবি। মোতালেব ভাইকে নিয়ে ছুটলাম নোমান মিয়ার বাড়ির দিকে।

ঈদের সময় আসলে হাসপাতালের সকল সিট পূর্ণ থাকে। সতেরো ইউনিয়ানের কোনও না কোনও গ্রামে কাইজা ফ্যাসাদ লেগেই থাকে। এই সময়টাতে হাসপাতালের সিটগুলোতে রোগীতে ভ’রে যায়। অবশেষে হাসপাতালে আব্বার স্থান হলো বারান্দার মেঝেতে। ওয়ার্ড থেকে তোশক টেনে আনতে গিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় হলো। কথা ব’লে মনে হলো তিনি অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছেন, দু-এক দিনের মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারবেন। রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে সোনালি ভোর এল। আব্বার সমস্ত শরীর যেন মোমের মতো নরম হয়ে গেছে। ইসিজির রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন―এই রোগীকে এখানে আর রাখা যাবে না তাকে এখনই জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে আব্বাকে নিয়ে রওনা দিলাম রূপসা নদী পার হয়ে খুলনা শহরের দিকে। মাইক্রোবাস ছুটে চলছে। জানালার ভিতর দিয়ে র্শি র্শি বাতাস এসে লাগছে আব্বার শরীরে। মাথার রুক্ষ চুলগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে। গাড়ির লুকিংগ্লাসে তাঁর অভিমানী মুখটা শিশুর মতো মনে হচ্ছে।

‘আমি তখন প্রাইমারিতে পড়ি। আমাদের একটি জমি ছিল দক্ষিণ বিলে। সেবার আব্বা দুই মাসের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন। পাট কাটা চলছে। আব্বাও কৃষকদের সঙ্গে জমিতে গেলেন। মা আর আমি গেলাম মামা বাড়ি। পাট কেটে বাচাড়ি নৌকার মতো বিশাল একটি জাগ বাঁধলেন। তারপর সবাই মিলে বিলের পানির মধ্য দিয়ে  কাঁচা পাটের জাগ টানতে টানতে নিয়ে চললেন আমাদের বাড়ির দিকে। রোদের তাপ থেকে বাঁচতে লাল গামছা দিয়ে একটি পাগড়ি বানিয়ে মাথায় পরেছেন আব্বা। পাটের জাগ হাজিরবাগের খালে আসতেই দূর থেকে অতি সহজে আব্বাকে চিনে ফেললাম। আমার চিৎকার চেঁচামেচিতে মা আর নানু ঘাটে এসে দাঁড়ালেন। নানু হাত নেড়ে জামাইকে বাড়িতে আসতে বললেন আর আমি এক দৌড়ে খাল পাড়ের কাছে গিয়ে আব্বার জন্য দাঁড়িয়ে রইলাম। পাটের জাগ যখন আমাকে অতিক্রম করে যেতে লাগল আব্বা আমাকে কোলে করে বসিয়ে দিলেন পাটের জাগের ওপর। হাতে পাট কাঠি নিয়ে বসে রয়েছি আর পরনের হাফ প্যান্ট খালের পানিতে ভিজে যাচ্ছে। সে এক চরম মুহূর্ত, আব্বার কণ্ঠে তখন ধুয়ার সুর―

শোনেন শোনেন দেশবাসী শোনেন দিয়া মন

দুঃখের কাহিনি আমি করিব বর্ণন

শোনেন মনো দিয়া …

শোনেন মনো দিয়া যাই কহিয়া দুঃখেরও কাহিনি

এ কথা কইতে আমার চোক্ষে আসে পানি

চোক্ষে পানি আসে …’

আব্বাকে নার্গিস মেমোরিয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। একদিন ওয়ার্ডে রাখার পর নিয়ে যাওয়া হলো আইসিউতে। অক্সিজেন দেয়া হয়েছে, স্যালাইন চলছে, ডাক্তার মাহাবুবুর রহমান দিনে দুইবার এসে আব্বাকে দেখে যান, সাদা পোশাক পরা দুজন নার্স সার্বক্ষণিক দেখা শোনা করে। টানা সাত দিন ধ’রে হাসপাতালে রয়েছি। ডাক্তার ওষুধ লেখা মাত্র মেজ মামা আর আমি মোটরসাইকেলে করে ঝড়ের বেগে নিয়ে আসি। একদিন বিকেল বেলা আব্বা যে রুমটাতে ছিলেন তার সামনে ছোট্ট একটু ফাঁকা জায়গায় চেয়ার পেতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ নার্স এসে বলল―রোগী খাবার চাচ্ছে। মুহূর্তে আমার সমস্ত শিরাউপশিরায় রক্তে চমক খেলে গেল। মনে মনে ভাবলাম আব্বা তাহলে সুস্থ হতে চলেছেন। লিফটের অপেক্ষা না করে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলাম রেস্টুরেন্টে। আব্বার জন্য ভেজিটেবল স্যুপ নিয়ে আইসিউর ভেতরে ঢুকলাম। গরম স্যুপ নিয়ে শিয়রের কাছে আব্বার মুখের দিকে তাকিয়ে নার্সের অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছি। হাতের তালু পুড়ে যাচ্ছে। ঠিক এমন সময় ডাক্তার সাহেব রুমে ঢুকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন―রোগীর স্যালাইন চলছে এখন মুখে তোলা খাবার দেওয়া যাবে না। হতাশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। আব্বা আমার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে রইলেন।

‘ব্যালকোনিতে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে উদাস হয়ে গেলাম। হঠাৎ মনে পড়ল শৈশবের কথা। আমরা পরিবারের সবাই মিলে ময়মনসিংহ সেনানিবাসের ভেতর একটি মাটির ঘরে থাকতাম। ঘন বন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে রাঙামাটির রাস্তা সোজা চলে গেছে খাল-পাড়ের দিকে। বাতাবি লেবুর ঘ্রাণ আর চির সবুজ পেয়ারা বাগান আমাকে ইশারায় কাছে ডাকত। পড়ন্ত বিকেলে খাল পাড়ে বসে পালা মাছের বাহারি নৃত্য। সবুজ সেনানিবাসের ভেতর বাল্যশিক্ষা এবং প্রকৃতির রূপ রস নিংড়েই আনন্দে দিন কেটে যেত। একদিন আব্বা অফিস থেকে দ্রুত বেগে সাইকেল চালিয়ে ঘরে ফিরে উৎসাহ নিয়ে বললেন―অবশেষে দুই সপ্তাহের ছুটি পাস হয়েছে। সমস্ত সন্ধ্যা ধরে আমরা নিজেদের জামা কাপড় গুছিয়ে লাগেজে ভরেছি। সবার ভেতরে বাড়ি ফেরার একটা চাপা উষ্ণতা কাজ করছে। ভোর হলেই আমরা রওনা দেব গ্রামের দিকে। বাড়ি যাওয়ার জন্য চেয়ারের ওপরে লাগেজ গুছিয়ে রেখে আমরা ঘুমাতে যাই, কিন্তু দুচোখে ঘুম আসে না। মাথার ভেতর গোল গোল ছবি আঁকতে থাকি― বাড়ির পাশের পদ্ম বিল। ঠাইরেন তলার মেলা। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি টের পাই না। মধ্যরাতে হঠাৎ চোর চোর শব্দ। আমরা দুই ভাই মশারির ভেতর উঠে বসি। দেখি চেয়ারে লাগেজ নেই। ঘরের দরজা খোলা, আব্বা ঘরে নেই। তিনি চোরকে ধরতে পিছু নিয়েছেন। আম্মা চিৎকার করছেন। ভয় আতঙ্ক এবং শঙ্কা নিয়ে আমাদের প্রায় পনেরো মিনিট কাটল। অবশেষে আব্বা লাগেজ হাতে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ফিরে এসে বললেন―ধরতে পারলাম না, লাগেজ ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেছে।

কত বড় সুঠাম এবং সাহসী একজন মানুষ হাসপাতালে অসহায় শিশুর মতো পড়ে রয়েছে ভাবতেই চোখ ভিজে যায়। ডাক্তার সাহেব আব্বাকে হার্ট ফাউন্ডেশন ঢাকাতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। তাকে একপলক দেখার জন্য আত্মীয় স্বজনরা ভিড় জমালো। হাসপাতালের সামনে নীরবতা নেমে এল। আব্বাকে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠালাম সঙ্গে একজন এমবিবিএস ডাক্তার। সাইরেন বাজাতে বাজাতে অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলছে মাওয়া ঘাটের দিকে। পদ্মা নদী পার হতে ফেরিঘাটে দীর্ঘ গাড়ির লাইন। আমাদের অনেক সময় কেটে গেল গাড়ি ফেরিতে তুলতে। আব্বা যখনই অস্থির হয়ে ওঠেন তখনই হাত দিয়ে অক্সিজেনের নলটা খুলে ফেলতে যান। আব্বার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও সবাই অস্থির হয়ে উঠি। স্যালাইন চলছে। পদ¥া নদীর উজান বেয়ে আমাদের ফেরি ছুটে চলছে। দীর্ঘ দুই ঘণ্টার সে যাত্রা। মনটা উতালা হয়ে ওঠে। পদ্মা সেতুর কাজ চলছে, সেতুর স্প্যানের দিকে তাকিয়ে থাকি। আর কতক্ষণ! আল্লাহ কি আমাদের আর একটু সময় দেবেন আব্বার চিকিৎসার জন্য! ফেরি ঘাটে পৌঁছালো কিন্তু কোনও লাভ হলো না। রাস্তায় সারি সারি গাড়ির লাইন। ড্রাইভার কিছু সময় অপেক্ষা করল। কোনও উপায় দেখতে না পেয়ে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজিয়ে রাস্তার রং সাইড দিয়ে চলা শুরু করল। ড্রাইভারের সহযোগী অ্যাম্বুলেন্সের মাইক দিয়ে একের পর এক ঘোষণা দিতে লাগলেন―অ্যাম্বুলেন্সে জরুরি রোগী রয়েছে, আমাদের রাস্তা ছেড়ে দিন। গাড়ি বেশ কিছুদূর এগোল কিন্তু ক্রমেই আব্বার শরীর আরও অবনতি হতে লাগল। তীব্র যানজট, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, গাড়ির ভেতরে ভ্যাপসা গরম, আমরা যেন একটি ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলাম।

ডাক্তার সাহেব আমার কানে ফিস্্ ফিস্ করে বললেন―রোগীকে দ্রুত আশপাশের কোনও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। জ্যামের মধ্যে গাড়ি গাছের মতো দাঁড়িয়ে রইল। আব্বা ইশারা করলেন―আমাকে বাইরে নিয়ে চলো। গাড়ির দরজা খুলে দিলাম। তারপর একে একে গাড়ির সব গ্লাসগুলো খুলে দেওয়া হলো। আব্বা দীর্ঘ একটি শ^াস নিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। মুহূর্তে তাঁর সমস্ত শরীর নিথর হয়ে গেল। আব্বাকে চিরদিনের জন্য হারালাম। আমার সমস্ত শরীর হালকা হয়ে গেল। মনে হলো মাথার ওপর থেকে দীর্ঘ দিনের পরিচিত আকাশটা সরে গিয়েছে। পরিবারের সবাই চিৎকার করে কাঁদছে। অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার পেশাদার লোক। তিনি রাস্তা ঘুরিয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা করল। পদ্মার উথালপাথাল ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে ফেরি ছুটে চলল কাওড়াকান্দির দিকে।

অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলছে। আব্বার শিয়রের কাছে বসে রয়েছি। দুচোখ দিয়ে জল ঝরছে আর মনে পড়ছে পুরোনো দিনের কথা। ‘ছোটবেলায় আমি আর ছোট কাকা বাড়ির কাউকে কিছু না বলে চলে গিয়েছিলাম বেতালের ঘোড়া দাবড় দেখতে। গুনিনের পানি পড়া থেকে শুরু করে ঘোড়ার সোয়ারের সব কৌশল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। তখন মনে মনে ভাবতাম যদি ঘোড়ার সোয়ার হতে পারতাম তাহলে বেশ মজা হতো। ঘোড়া দৌড়ের (ছদ) এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত ঘুরতে ঘুরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সন্ধ্যায় মেলার মাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছি। হঠাৎ সাইকেল চালিয়ে আব্বা হাজির। ভয়ে বুকের ভেতর ধুকপুক করে উঠল। ছোট কাকা আব্বাকে দেখে দৌড়ে পালালো। কদমা, বাতাসা, গুড়ের জিলাপি কিনে সাইকেলে চড়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। বাড়ি থেকে না বলে যাওয়ার জন্য শাস্তিস্বরূপ সমগ্র রাস্তায় আমাকে আদর্শ লিপি মুখস্থ বলতে হয়েছিল।’

ফেরি ঘাটে এসে ভিড়ল, চারপাশে শোকের মাতম। বাড়িতে ফিরলাম। শতশত মানুষ। এত মানুষ কোথা থেকে এল আমরা কেউ জানি না। সারা রাতভর কুরআন খতম দেওয়া হলো, সকালবেলা উপজেলার কোর্ট মসজিদে প্রথম জানাজা শেষ করে কাওয়ালদিয়া আমাদের গ্রামের বাড়ির স্কুলমাঠে আব্বার দ্বিতীয় জানাজা হলো। একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং দু’জন পুলিশ সদস্য পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে বিউগলে করুণ সুর তুলল। আব্বার বুকের ওপর তখন লাল সবুজের পতাকা। হঠাৎ একজন পুলিশ সদস্য আমার কাঁধে হাত রাখলেন। ঘাড় ফিরিয়ে দেখি হাসপাতালের বেডে যে ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তিনি। বিদায় নেবার সময় আমার কানের কাছে এসে ফিস্ফিস্ করে শুধু একটি কথা বললেন―‘সেদিন হাসপাতালে আমার বেডটা ছেড়ে দেয়া উচিত ছিল, আসলে আমি জানতাম না আপনার আব্বা একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন’। গর্বে আমার বুকটা ফুলে উঠল। দীর্ঘ একটি নিঃশ^াস ফেলে এক ধ্যানে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares