ভ্রমণ : সের্গেই ইয়েসিনিনের দেশে : শাহাব আহমেদ

রিয়াজান যাচ্ছি।

যেদিন থেকে কবি সের্গেই ইয়েসিনিনে মুগ্ধ হয়েছি, সেই থেকে স্বপ্ন ছিল যাব। হয়ে ওঠেনি। আগে যাওয়া যেত না। আজ যাচ্ছি। মস্কোর কাজানস্কি রেল স্টেশন থেকে সকাল ৮টা ১৪ মিনিটে চড়েছি ভারোনেঝগামী আধুনিক দোতলা ট্রেনে। দুটি করে চেয়ার দুই পাশে, মাঝখানে হাঁটা পথ। প্রশস্ত চেয়ার। প্রয়োজনে হেলান যায়। প্লেনের গাদাগাদি ভাব নেই। হাঁটু ঠেকে না সামনের সিটে গিয়ে।

আমাদের মুখগুলো অতিক্রান্তের দিকে তো পাশের সিটে মুখগুলো ভবিষ্যতে। পাশের সারিতে মুখোমুখি একটি টইটম্বুর মেয়ে বসে আছে, ওর সারসের  মতো লম্বা পা। জিনসের প্যান্টের ফ্যাশন-ছিদ্র দিয়ে উঁকি মেরেছে উরুর মধ্যভাগ, সাদা ও সুন্দর, আর হাঁটুর বঙ্কিমা। সে ফোনে কিছু পড়ছে আপন মনে, আর হাসছে মৃদু মৃদু, মাঝে মাঝেই। হয়তো হাসির কোনও গল্প, হয়তো কারও প্রেমপত্র, অথবা হয়তো ওসব কিছুই নয়, সস্তা কোন জোক।

পেছনে ৪ বছরের একটি মেয়ে আমারই চেয়ার ধরে দাঁড়ান। বাচ্চা হাঁসের মতো গলা বাড়িয়ে আমার কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে প্রশ্ন করছে, ‘তুমি কী লিখছ ?’

ফোনের স্ক্রিন এগিয়ে দিই, ‘পড়ো।’

‘অ-মা, আমি তো কিছুই বুঝি না, পড়ব কী করে ?’

বলি, ‘বাংলা বলে একটি ভাষা আছে, আমি ওই ভাষায় লিখছি।’

‘ও বুঝতে পারছি।’

আমি কী লিখছি, সে কিছুই বুঝছিল না কিন্তু এখন বুঝতে পেরেছে।

‘তোমার নাম কি ?’

‘সোনিয়া’

‘বয়েস কত ?’

এক এক করে আঙ্গুল বাঁকিয়ে বলে, ‘চিতিরি!’ (চার)

‘কোথায় যাচ্ছ ?’

‘ভারোনেঝ, বাবাকে দেখতে যাচ্ছি, বাবা সেই শীতকালে চলে গেছে, আর আসে নাই।’

আমারও বাবাকে দেখতে ইচ্ছে করে। সেই যে গেল ফেরার পথঘাট এবং আমাদের ভুলে…,

‘যাও দেখে আস, তোমার বাবা তবু ভারোনেঝে আছে, আমার বাবা যে কোথায়, কেউ জানে না।’

‘বাবাকে বলব, সে যেন তোমার বাবাকে খুঁজে দেয়।’

ইচ্ছে হয়, মাথায় হাত বুলিয়ে শিশু মেয়েটাকে আদর করি, কিন্তু সভ্য জগতে তা মন্দ দেখায়।

জানালার বাইরে ঝোপ-ঝাড় হিজি বিজি, মাঝে মাঝে ক্লাসিক্যাল রুশ ছোট ছোট বাড়ি-ঘর। কখনও কখনও ঝোপ সরে গিয়ে আকাশছোঁয়া প্রান্তর। এই মাত্র একটি নদী চলে গেল আমাদের নিচ দিয়ে, মোটা একটি অজগরের মতো। দূরে একটা সুদর্শন গির্জা হঠাৎ দেখা দিয়ে দৌড় দিল। একটা ট্রেন গেল পাশের লাইন দিয়ে গো গো করে তড়িঘড়ি। এমন প্রায়ই একটা বা অন্যটা যায়, আমাদের ফেলে আসা সময়ের খণ্ডগুলো কুড়াতে। আকাশে লাঙল চষে গেছে কোনও কৃষক, সাদা সাদা মেঘগুলো এবড়ো-খেবড়ো হয়ে মইয়ের আশায় থম্ করে পড়ে আছে আকাশ-জমিনে। নড়েও না, ওড়েও না।

গতকাল কাটিয়েছি ভাগানকভস্কোয়ে সমাধিক্ষেত্রে। হাজার হাজার মৃত মানুষের দেশে। প্রতিটি কবরে শুয়ে আছে কত কত জীবনের উপন্যাস। কত কত মেধাবী মানুষ সেখানে, কত প্রেম ভালোবাসা, লোচ্চামি ও লুণ্ঠনের গল্প। ৯০ এর দশকের রাশিয়ার সবচেয়ে বড় কিছু মাফিয়া-সর্দার ও তাদের হাতে নিহতরা শুয়ে আছে একই গোরস্তানে।

কম্যুনারকা বধ্যভূমিতে দেখেছি একই চিত্র, যাদের হত্যা করা হয়েছে এবং যারা হত্যা করেছে, সবাই একই জায়গায়। চোর আর ভালোমানুষ, খুনি আর তার শিকার, সবাই পাশাপাশি ঘুমায়। এমনটাই চলে এসেছে অনন্তকাল ধরে। বড় চোরের বড় সমাধিস্তম্ভ, সুন্দর ও নান্দনিক। ছোট চোরের ছোট অথবা নেই। নিরীহের শুধু মাটি অথবা সাদামাটা চিহ্ন।

ভাগানকভস্কোয়ের মাফিয়া সর্দারদের কবরগুলো ভীষণ সুন্দর, দামি দামি মনুমেন্টে তাকিয়ে তাক লেগে যায়। বিশাল একটি পাথরের ঘরে মর্মরের বিছানায় শুয়ে আছে ছোটখাটো হাতির মতো এক নারী, সম্ভবত খুব বেশি বিত্ত-বেসাতি ছিল তার অথবা তার স্বামীর অথবা পিতার। কোথা থেকে এত সম্পদ, সবাই সমান ছিল যে দেশে ?

কারও কবরে বিশাল পাখাওয়ালা এঞ্জেল নত মাথায় হাত উঁচিয়ে আশীর্বাদ করছে, হয়তো এঞ্জেলরাও জীবনের ভয় পেয়ে নয়, প্রাপ্তির আশায় মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে এখন।

আগে তো এদেরই পশ্চাতে ঝাড়ু মেরে….

‘পৃথিবীতে সবকিছুই ফিরে ফিরে আসে’-১)―ইয়েসিনিন বলেছিলেন কবিতায়, আর হর্হে বর্হেস গদ্যে।

আসলে কে বলে নাই ?

আরও সুদর্শন কবর অনেক, একই প্রাচুর্যের ছড়াছড়ি যেখানে।

টাকা টাকা টাকা, দেখো দ্বন্দ্ববাদী অন্ধের দল, মরে গিয়েও কত টাকা আমাদের!

যেন দুর্বৃত্ত নয়, বড় বড় সন্ত শুয়ে আছে বড় বড় কবরে।

সত্যিকারের সাম্যের দেশ হলো কবরস্থান। কেউ বিশ্বাস করতে চায় না যে, এই দুর্বৃত্তদের প্রায় সবাই পার্টি ও কমসোমলের নেতৃস্থানে থেকে সমাজতন্ত্র ও শোষণহীন সমাজ গড়েছে। মার্কস, লেনিন, স্তালিন ছিল তাদের ঠোঁটের আগায়।

সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার স্লোগান দিয়ে যেমন ফরাসি বিপ্লব জ্যাকোবিন সন্ত্রাসের জন্মভূমি হয়েছিল, তেমনি সাম্যের ঘোষণা দিয়ে রুশ বিপ্লব, দেশকে কবরস্থান বানানোর প্রোগ্রাম নিয়েছিল। ৩০ দশকের প্রথম দিকে, সাম্যবাদী দুর্ভিক্ষের সময়ে ভোলগা এলাকায়, ক্ষুধার্ত লোকজন মানুষের মাংস পর্যন্ত খেয়েছে বলে শোনা যায়। সত্য কি মিথ্যা, খুঁজে লাভ নেই, স্বদেশ ও পৃথিবীর মানুষকে মুক্ত করার মিশন হাতে নেওয়া পার্টির সৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষ যে হিংস্র ও প্রকট ছিল তা আর সপ্ত সিন্দুকের গোপন তথ্য নয়। ইউক্রেনের ‘হলোদামর’ ছিল এই দুর্ভিক্ষের অংশ। জারতন্ত্রে নিষ্পেষিত রাশিয়াও এমন দুর্ভিক্ষ দেখেছে কি না সন্দেহ। আমরা যে সমৃদ্ধ ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত সমাজ দেখেছি, তা যে কত মানুষের হাড়ের ওপরে তৈরি হয়েছিল তার কোনও হিসাব নেই। অথচ সমাজতান্ত্রিক সমাজ চীনের দেয়াল নয় যে, মানুষের হাড়ের ওপরে ফাউন্ডেশন গড়লেও তা হাজার বছর দাঁড়িয়ে থাকবে। থাকে নাই, ভেঙে খান খান হয়েছিল আমাদের উপস্থিতিতে, আমাদের চোখের সামনে।

ভাগানকভস্কোয়ে সমাধিক্ষেত্রে সের্গেই ইয়েসিনিন শায়িত। মূলত তার সমাধি দেখতেই যাওয়া। ইয়েসিনিন ছিলেন দুরন্ত, ডানপিটে ও স্ক্যান্ডালিস্ট কবি, ‘ মেঠোফুল, ঝোপঝাড় জঙ্গল, শস্য ও কৃষিপ্রধান রাশিয়ার সর্বশেষ চারণ কবি’ বলা হয় তাকে। বিপ্লবী রাশিয়ায় নিজের স্থান খুঁজে পাননি তিনি। একদিকে বিপ্লবকে সমর্থন করে বা লেনিনকে প্রশংসা করে কবিতা লিখেছেন, অন্যদিকে ধ্বংসযজ্ঞ, স্বেচ্ছাচারিতা, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও দুর্ভিক্ষকে বিপ্লব বলে মেনে নিতে পারেন নাই, প্রতিবাদ করেছেন। মদ-মত্ত দানবের মতো রেস্তোরাঁ বা আড্ডায় ভাঙচুর করেছেন। এক নারী থেকে অন্য নারীতে স্বস্তি খুঁজেছেন, ডিপ্রেশনের কৃষ্ণ-বিবরে পড়ে হ্যালুসিনেশনে আক্রান্ত অবস্থায় লিখেছেন হৃদয় খামচান কবিতা ‘কালো মানুষ।’

তারপরেও তার পাশে জড়ো হয়েছে একদল যুবক, প্রতিবাদী কবি, যারা হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন পার্টির নিয়ত চক্ষুশূল। যাদের বেশিরভাগই প্রতিবাদ করার কারণে একে একে ফায়ারিং স্কোয়াডে যায়, কবিকে আমৃত্যু কালো তালিকায় লিপিবদ্ধ করে।

রুশ বিপ্লবের স্লোগানে আকৃষ্ট হয়ে আমেরিকা থেকে আসা ভুবনজয়ী নর্তকী, রূপসী আইসোডোরা ডানকানকে হঠাৎ করেই বিয়ে করেছিলেন। আইসোডোরা রুশ জানতেন না, ইয়েসিনিন জানতেন না ইংরেজি, বয়সেও তিনি ইয়েসিনিনের চেয়ে বেশ বড় ছিলেন, কিন্তু প্রেমের পথে না-বয়েস, না-ভাষা, কিছুই প্রতিবন্ধক হয়নি।

এক সময় রাশিয়া ছেড়ে চলেও গিয়েছিলেন বিদেশি স্ত্রীর সঙ্গে। বিদেশে বসে বলেছিলেন, ‘যতদিন ট্রটস্কি-ব্রনস্টাইন রাশিয়ার শাসক, ততদিন আমি সেই দেশে ফিরে যাব না।’

কিন্তু ফিরে না এসে পারেননি। স্বদেশ যার বুকে, বিদেশে সে মৃত।

তিনি মরতেই এসেছিলেন। সত্যিই আত্মহত্যা করেছিলেন, না তাকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই বিতর্কের আজও নিষ্পত্তি হয়নি। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর, লেনিনগ্রাদের আঙ্গেলটের হোটেলে।

‘ইয়া ল্যুবলু রোদিনু

ইয়া অচিন ল্যুবলু রোদিনু!’

(ইয়া= আমি, ল্যুবলু= ভালোবাসি, রোদিনু= মাতৃভূমিকে।

অচিন= খুবই তীব্রভাবে।)

মাতৃভূমি ও তার শাসকগণ বাঁচতে না দিলেও কবিরা ভালোবাসার কলসির কানা পরে নিমাই হয়ে বেঁচে থাকেন।

শুনেছিলাম, জিনাইদা রাইখের কবরটি পাশেই, কিন্তু খুঁজে পাইনি। খুব তীব্র ছিল তাদের প্রেম। জিনাইদা নাকি তাকে বলেছিলেন, তুমিই আমার জীবনে প্রথম পুরুষ। সের্গেই বিশ্বাস করেছিলেন, মুগ্ধ হয়েছিলেন তার নেত্রপল্লব ও মুখাবয়বের মোহনীয়তায়। বিয়েও করেছিলেন। জন্ম হয়েছিল তাদের প্রথম সন্তানের কিন্তু সের্গেই এক নারীতে তৃপ্ত থাকার মানুষ ছিলেন না। ছিলেন কিউপিড দেবের মতো সুন্দর, অনুভূতিপ্রবণ। মেয়েরা তাকে একা থাকতে দিত না এবং তিনিও বিশ্বাসভঙ্গ করতেন অবিশ্বাস্য ইন্দ্রিয় আসক্তি ও নীতির তরলতায়। তিনি জিনাইদাকে ত্যাগ করেন। জিনাইদা অভিনয় করতেন মেয়েরহোল্ডের থিয়েটারে। বিশ্ববিখ্যাত থিয়েটার ডিরেক্টর, সাহসি ও মেধাবী। তিনি জিনাইদাকে বিয়ে করেন ইয়েসিনিনের সন্তানসহ। বলশেভিক পার্টি তখন কবি, লেখক, শিল্পী সাহিত্যিকদের কাঁধে চেপেছিল, কী লিখতে হবে, কী ধরনের ড্রামা থিয়েটারে যাবে, কী যাবে না, কে অভিনয় করবে এইসব আদেশ-নির্দেশ ছিল প্রতিনিয়ত। মেয়েরহোল্ড ছিলেন অত্যন্ত বড় মাপের মানুষ, কিন্তু বিপ্লব ক্ষমতায় এনেছে যাদের, তারা একচোখা, রুচিহীন, শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে আত্মম্ভরী অজ্ঞ। শক্ত মেরুদণ্ডের মেয়েরহোল্ডকে কোনও পরদেশি জুলুমবাজ নয়, স্বদেশের সাম্যবাদের পূজারীরা ধরে নিয়ে গিয়ে নিঁখোজ করে দেয় এবং জিনাইদা রাইখকে তারই বেডরুমে ছুরিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। যে দুটি সম্মোহনী চোখ কবিকে মুগ্ধ করেছিল, খুনিরা নাকি সেই দুটি চোখে ছুরির আঘাত করেছিল।

২.

১০৯৫ সালে রিয়াজান শহর প্রতিষ্ঠা করা হয়। মস্কোর চেয়েও প্রাচীন রিয়াজানের মাটি। ১২৩৭ সালে চেঙ্গিস খানের নাতি বাতুখান আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল। এরপর বার বার এই শহর মোঙ্গল লুণ্ঠনের শিকার হয়। ১৪৭২ সালে মোঙ্গল খান আখমেত রিয়াজানকে সর্বস্বান্ত করে। ধারণা করা হয় এই আখমেতই খান বাখমেত, যে প্রসঙ্গে পরে কথা হবে।

ট্রেন এসে রিয়াজান স্টেশনে থামে। আমরা প্রাচীন চারণগাথার ‘আভদোতিয়া রিয়াজানচানকা’র দেশে পা ফেলি। রিয়াজানচানকা মানে রিয়াজানের মেয়ে। আভদোতিয়া গিয়েছিল অকা নদীর অন্য পাড়ে গবাদিপশুর জন্য শীতের খড়-বিচালি প্রস্তুত করার কাজে। ফিরে এসে দেখে শহরে আগুন জ্বলছে, লোকজন মৃত। মোঙ্গল বাহিনী আক্রমণ করে শহর ধ্বংস করে গেছে, জীবিত যারা ছিল তাদের নিয়ে গেছে বন্দি করে।

কোমল হৃদয়ের নারী সে, প্রথমে বিলাপ করে কাঁদতে বসে, তারপরে খোঁজে স্বজনের লাশ। স্বামী, পুত্র, ভাইসহ স্বজনদের দেহ নেই মৃতের সারিতে, তার মানে বেঁচে আছে তারা।

সে ভাবে, ভাবে, আর ভাবে। স্বজন ছাড়া সে বেঁচেও মৃত।

তাহলে মৃত্যুকে ভয় কী ?

সে সিদ্ধান্ত নেয়, কঠিন সিদ্ধান্ত! যাবে সে তত দূরে যত দূরে প্রয়োজন, যদি শত্রু বাঘ হয় যাবে সে বাঘের খাঁচায়, যদি সে নেকড়ে হয় যাবে নেকড়ে-নখরে। প্রাণ দেবে, নয় স্বজনদের ফিরিয়ে আনবে।

হাঁটতে শুরু করে। হাঁটে, হাঁটে আর হাঁটে। দিন যায়, রাত্রি অতিবাহিত হয়। (তখনও জুতা আবিষ্কার হয়নি, ন্যাকড়া দিয়ে পা জড়িয়ে হাঁটতে হতো, রুশ ভাষায় পায়ে জড়ানোর বিশেষ এই ন্যাকড়াকে বলা হয় ‘লাপ্তি’)। পায়ের ন্যাকড়া ক্ষয় হয়ে যায়, কতবার যে তাকে ন্যাকড়া পরিবর্তন করতে হয়! বহু টিটকারি, তিরস্কার, অবহেলা, অপমান, রুক্ষèতা অতিক্রম করে অবশেষে সে পৌঁছায় গোল্ডেন হোর্ডে মোঙ্গল খান বাখমেতের দরবারে। এত দূর থেকে আসা সাহসী নারী খানকে বিস্মিত করে,

‘তুচ্ছ নারী, কী জন্য এসেছ

দূর থেকে এত দূরে ?’

‘আমার স্বজনদের ফিরিয়ে দাও।’

‘আছে স্বজন, স্বামী, পুত্র, ভাই,

একজন পাবে, কাকে তোমার চাই ?

যদি ঠিকভাবে চাও, পাবে

নইলে গর্দান যাবে।’

‘ভাই, ভাইকে চাই, আমি

থাকুক পুত্র আর স্বামী।’

‘বলে কী, বলে কী মূর্খ নারী,

পুত্র নয়, স্বামী নয়, ভাই,

খানের খঞ্জর থেকে ভাইকে বাঁচাতে চাই!’

‘তুমি বিজ্ঞ প্রাজ্ঞ খান,

এখনও দেখ যৌবন আছে শরীরে,

স্বামী হারালে স্বামী পাব,

পুত্র হারালে পুত্র পাব,

ভাইকে হারালে আমি ভাই পাব কী করে ?’

বাখমেত মুগ্ধ হয়, শুধু সাহসীই নয়, বুদ্ধিমত্তায় তীক্ষè রিয়াজানের এই নারী।

‘যাও তুমি যাও, মাঠ থেকে তুলে নাও ফুল,

সতেজ থাকবে সে যতক্ষণ, ততক্ষণই তোমার জীবন,

খুঁজে নাও স্বজন তোমার আছে যতজন,

তারপরে ছুটে যাও ত্বরা করে, দৃষ্টির বাইরে চলে যাও।’

মাঠে এসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নারী, দুহাতে আলিঙ্গন করে,

‘মা, মাগো, রুশ মাটি,

নিরন্তর দুগ্ধবতী,

সন্তানকে রক্ষা করো শত্রু-আস্তানায়!’

সে ফুল তুলতে যায়, সোনালি রৌদ্র-রঙের একটি ফুল যেন নিজে নিজেই হাতে এসে পড়ে।

‘বেস্মিয়ের্তনিক!’

(অনুবাদে মলিন হয় না যে ফুল, ইংরেজি রসসড়ৎঃবষষব)!

ফুল হাতে সে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায় শ্বদন্ত প্রহরীদের সঙ্গে,

‘এরা আমার আত্মীয়’, খুলে দাও হাতকড়া, 

‘ওরা আমার আত্মীয়’, উন্মুক্ত হোক কারা

‘এইজনও আমার আত্মীয়…

ছাড়ো, আমি ফিরব না তাকে ছাড়া…’

একে একে সে রিয়াজানের সমস্ত বন্দিদের মুক্ত করে যাত্রা শুরু করে। পথে বাখমেতের সৈন্যরা থামায়, ‘অমলিন’ ফুল এখনও সতেজ, খানের আদেশ অমান্য করে, সাহস কার!

কাফেলা এগিয়ে চলে, অন্য সৈন্যেরা থামায়,

ফুল এখনও সতেজ…

সেই প্রাচীনকালেও, মানুষ যখন সভ্যতায় অনেক পিছিয়ে ছিল, কথার দাম ছিল। প্রতিশ্রতির শক্তি ছিল। এবং তারা ফিরে এসে ধ্বংসপ্রাপ্ত পুরোনো শহর থেকে বহু কিলোমিটার দূরে নতুন শহরের গোড়াপত্তন করেছিল।

‘ব্যালাড অব আভদোতিয়া রিয়াজানচানকা।’

১৩-১৫ শতাব্দী, ভাবানুবাদ।

এবং এই শহরকে বলা হয়, মস্কো শহরের বড় বোন।

৩.

ট্রেন থেকে নেমে, আমরা প্রথমে আগামী কালের রিটার্ন টিকিট কাটি। রিয়াজান থেকে কনস্তান্তিনোভা যাবার বাস আছে তবে দিনে বার দুই যায়। হিসাব করে দেখলাম বাসের অপেক্ষা করলে চলবে না। এক ট্যাক্সিওয়ালাকে ধরলাম, সে বলল ১৫০০ হাজার রুবল (১৮ ডলার) দিলে সে ইয়েসিনিনের জন্মদিনটা ও মিউজিয়ামে নিয়ে যাবে, ২-৩ ঘণ্টা সময় দেবে, তারপরে শহরে ফেরত নিয়ে আসবে। বললাম শহরে ক্রেমলিন দেখাতে হবে। সে রাজি।

দিমিত্রি ওর নাম, বয়েস ৫০-৬০ এর মাঝামাঝি। জিজ্ঞেস করি, ‘দিনকাল কেমন যাচ্ছে ?’

‘কোনও রকমের খেটে খাওয়া জীবন।’

‘সোভিয়েত আমলের সঙ্গে তুলনা করলে ?’

‘তখন ভালো ছিলাম, দোকানে যদিও কিছু ছিল না, ফ্রিজ ভরা খাদ্য ছিল। এখন দোকান ভরা খাদ্য কিন্তু ফ্রিজ খালি।’

‘দোকানে খাদ্য না থাকলে ফ্রিজে আসত কোথা থেকে ?’

‘মস্কো এখান থেকে মাত্র ২০০ কিমি দূরে। আমরা মস্কো চলে যেতাম, বাজার করে ঘরে ফিরতাম। ট্রেনে ‘কালবাছার’ গন্ধ ছাড়া আর কোনও গন্ধ ছিল না। প্রচলিত ধাঁধা  ছিল : কালবাছার গন্ধে ভরা সবুজ এবং লম্বা, বলত সেটা কী ?’

সোভিয়েত ট্রেনগুলো ছিল লম্বা ও সবুজ রঙের।

বলি, তোমরা না হয় মস্কোতে যেতে পারতে, কিন্তু যারা মস্কোর থেকে দূরে, তাদের অবস্থা কী ছিল ?

সে উত্তর দিতে অক্ষম হয়। উত্তর আসলে ছিল না।

প্রশ্ন করি, ‘তোমাদের এখানে এক সময় পার্টির সেক্রেটারি ছিল লারিওনভ, নাম শুনেছ ?’

‘আ কাক্ ঝে? অবশ্যই চিনি, ক্রুশ্চেভের আমলে। আমার বয়েস কম ছিল, তবে বড়দের কাছে শুনেছি, ভালো মানুষ ছিল লারিওনভ কিন্তু তাকে বলির পাঁঠা বানিয়েছিল ক্রুশ্চেভ। সে আমাদের এখানকার সব গবাদিপশু জবাই করে সারা রিয়াজান পরিষ্কার করে ফেলেছিল কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি, আত্মহত্যা করতে হয়েছিল।’

লারিওনভ ছিল ৫০ দশকের বড় মাপের স্ক্যান্ডাল ‘রিয়াজান মিরাকলের’ মুখ্য চরিত্র। পরিকল্পিত অর্থনীতির কোনও রকমের হিসাব-নিকাশ ছাড়াই ক্রুশ্চেভ ঘোষণা দিয়েছিল আগামী তিন বছরে মাংসের সাপ্লাই তিনগুণ বাড়ান হবে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা ছিল অসম্ভব। পাগলের প্রলাপ আর প্রডাকশন সমান্তরালে হাঁটে না। মদ্যপ লারিওনভের সেক্রেটারির পদ যায় যায় অবস্থায় ছিল। ক্রুশ্চেভ তাকে আশ্বস্ত করে যে তার পদও থাকবে এবং সে তাকে সাহায্যও করবে ঘোষণা বাস্তবায়ন করার জন্য।

লারিওনভ টোপ গিলে।

তাকে অগ্রিম বেশ কিছু পুরস্কার দেওয়া হয়। ফলে যা করা সম্ভব ছিল না, সে বিভিন্ন ম্যানিপুলেশন, গোঁজামিল ও মিথ্যার মাধ্যমে আপাত দৃষ্টিতে তা করতে সক্ষম হয়। সমস্ত মিডিয়ায় ট্রাম্পেট বাজিয়ে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা হতে থাকে। কিন্তু পর্দার আড়ালে কিছু লোক তদন্ত শুরু করে। ধরা পড়ে লারিওনভের ধাপ্পা, তার পুরস্কার কেড়ে নিয়ে তার দীর্ঘস্থায়ী কয়েদবাসের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সে আত্মহত্যা করে রেহাই পায়। লেখকের  লেনিনগ্রাদ থেকে ককেশিয়া উপন্যাসে এ বিষয়ে বিস্তারিত আছে।

গাড়ি চলছে বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝ দিয়ে। ইয়েসিনিনের কবিতায় চক্রবাল ছোঁয়া যে মাঠেদের সঙ্গীত শোনা যায়, তারা এখনও হারিয়ে যায়নি। বিশাল এই দেশ এখনও অপূর্ব ও অকুমারী। এক সময় একটি নদী পার হয়ে যাই, মাঝারি সাইজের নদী। দিমিত্রি বলে, ‘ঐ যে দেখ নদীর দুই তীরে দুটি মনাস্টেরি আছে। এক তীরে পশুপভ পুরুষ মনাস্টেরি এবং অন্য তীরে সালোচে নারী মনাস্টেরি। শোনা যায়, নদীর তল দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের মাধ্যমে দুই মনাস্টেরি সংযুক্ত ছিল।’

‘বল কী ? কে বানিয়েছে এই টানেল ?’

‘আশ্রমের যোগীই হোক, আর যোগিনীই হোক, যৌন সঙ্গমে কার না ইচ্ছা হয়!’ সে শব্দ করে হাসে।

প্রেম ও যৌনতা বড় তীব্র জিনিস, তা মানুষের নখকে কোদালে পরিণত করতে পারে। দুই মনাস্টেরির কুমার ও কুমারীরা ঈশ্বরের আরাধনা করার ফাঁকে ফাঁকে মাটির নিচ দিয়ে গোপনে টানেল খুঁড়েছে একে অন্যের দিকে। প্রেম ঈশ্বরের বড় ভাই।

দিমিত্রির কথা সত্য কি না বলা মুশকিল। তবে নারী-পুরুষ একে অন্যের দেহ মন্থন করে ইন্দ্রিয় বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঈশ্বরের যত কাছে পৌঁছাতে পারে, অন্য কোনও সময় তা পারে কি না সন্দেহ।

‘তোমরা দূরের দেশ থেকে ইয়েসিনিনের গ্রাম দেখতে আস, অথচ জানও, ইয়েসিনিন যখন কনস্তান্তিনোভা আসত, গ্রামের লোকজন তাদের সুন্দরী মেয়েদের লুকিয়ে রাখত।’

‘কেন ?’

‘মেয়েরা ওর থেকে চোখ ফেরাতে পারত না, উন্মুক্ত আকাশের নিচে ফাঁকা ছিল সব, ঝোপঝাড়, শস্যের ক্ষেত, গোয়ালঘর। সে চোখ টিপলে কেউ না কেউ তার নীল চোখ ও সোনালি চুলের সম্মোহনে কিছুক্ষণের জন্য হলেও নির্জনে হারিয়ে যেতে ইতস্তত করত না। এমনি ছিল কবি, ইন্দ্রিয় সুখের রাজা ধিরাজ। আর রিয়াজান হলো চিরন্তন ভালোবাসার দেশ, তা তো নিশ্চয়ই তার কবিতা থেকেই বুঝতে পেরেছ।’

‘তুমি তার কবিতা পছন্দ কর ?’

‘অবশ্যই, রিয়াজানের কে ইয়েসিনিনকে নিয়ে গর্ব করে না। সূক্ষ্ম অনুভূতির এত বড় কবি রাশিয়ায় আর জন্মেছে কি ?’

৪.

আমাদের গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে কনস্তান্তিনোভার দিকে। দু’পাশে বন আর মাঠ। ইয়েসিনিনের কবিতার অবারিত উদার মাঠ।

ঘাস ফুলে হলুদের মঞ্জরি।

হিরণ¥য় রোদ, ঘাসের ডগা নাড়িয়ে ছুটে যাওয়া বাতাস।

একটি ছোট্ট ব্রিজের সামনে লেখা ভোঝা নদী, এতই ছোট যে ক্যামেরা বের করতে করতে ব্রিজ পার হয়ে গেলাম। দিমিত্রি বলে এখন প্রায় মৃত, এই ভোঝা নদী ছিল এক সময় বেশ বড় ও খরস্রোতা। এর তীরে তাতার মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল যা রুশ বাহিনীর বিজয় ও  মোঙ্গলদের সম্পূর্ণ পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। কিন্তু পরাজিত হয়েও ওরা নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে এসে রিয়াজান শহরকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল।

কত যুদ্ধ যে দেখেছে এই মাটি।

ঐতিহাসিক স্মৃতিময় এই স্থানটিতে একটা ছবি তুলতে চাই। দিমিত্রি বলে, পার হয়ে চলে এসেছি, হাইওয়ে দিয়ে ফিরতে অনেক সময় লাগবে। বরং ফেরার পথে থামাব।

কনস্তান্তিনোভা এসে পৌঁছলাম, ছবির মতো ছোট্ট সুন্দর সের্গেই ইয়েসিনিনের গ্রাম, সারা পৃথিবীর ইয়েসিনিনের কবিতার ভক্তদের তীর্থস্থান। ঘরবাড়ি নেই বললেই চলে।

টিকিট কাউন্টারে টিকিট কিনলাম। প্রবেশ ফি :

৬০ রুবল ইয়েসিনিনের বাড়ি

৬০ রুবল ইয়েসিনিন মিউজিয়াম

১১০ রুবল লিদিয়া কাসিনার ম্যানশন

সাকুল্যে ২৩০ রুবল প্রতিজনে।

একজন গাইডের ফি:

৩০০ রুবল ইয়েসিনিনের বাড়ি

৩০০ রুবল ইয়েসিনিন মিউজিয়াম

৩৫০ রুবল লিদিয়া কাসিনার ম্যানশন

সাকুল্যে ৯৫০ রুবল।

টিকিট দেখিয়ে প্রথমে ইয়েসিনিন মিউজিয়ামে ঢুকলাম। দেখি বর্ষার কদমফুলের মতো ঢল ঢলে পূর্ণ অথবা পূর্ণ চাঁদের মতো এক মেয়ে। মসৃণ মুখে এখনও করমচা লালের আনাগোনা দেখা যায়। নাম তার কাতেরিনা। বলল, ‘স্দ্রাস্তে, আমি আপনাদের গাইড।’

অবাক হলাম, এত ছোট, এত কচি, এত সুন্দর! জানে কি কিছু ?

বলি, প্রাস্তিতে, আপনার বয়েস কত ?

খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে, বিশ।

মেয়েদের বিশ, রাশিয়ার মে মাসের মতো। ফুল, ঘ্রাণ, রং, পাখি, মুকুল আর উষ্ণতা এক সঙ্গে নিয়ে।

জানা গেল, কাতেরিনা সের্গেই ইয়েসিনিনের নামে যে পেডাগগি ইনস্টিটিউট আছে তার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এটা তার প্র্যাকটিসের অংশ। প্রায় ৬ মাস ধরে এখানে কাজ করছে।

ঘুরে দেখি মিউজিয়াম, কাতেরিনা গরগর করে বলে যায়। কিছু জানা, কিছু অজানা। অনেক তথ্য, কাগজপত্র, ছবি দিয়ে ঠাসা। মিউজিয়ামের পেছনে উন্মুক্ত মঞ্চ, যেখানে প্রতিবছর ৩ অক্টোবর সন্নিহিত সপ্তাহান্তে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়, রাশিয়া ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইয়েসিনিন উৎসবে। তার কবিতা পাঠ হয়, অভিনয় ও গান হয়, তাকে নিয়ে গবেষণা বিষয়ক লেখা পাঠ হয়। ধীর ও নির্জন কনস্তান্তিনোভা শব্দময় ও ব্যস্ত হয়ে ওঠে। মঞ্চের পরে অনেক নিচুতে অকা নদী বইছে তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে। নদীর ওপারে অন্তহীন মাঠ।

‘অকা’ নদী সোজা পথে বয় না, এঁকেবেঁকে যায়। কাতেরিনা বলে, ‘অকা’ হলো ‘বোগো-রদিতসার পৈয়াস’, উনি তা হারিয়ে ফেলেছিলেন, তা-ই নদী হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং এই স্থানকে পবিত্র ও নিরাপদ রেখেছে। যুদ্ধ বিগ্রহ বিপদ, এই এলাকাকে এড়িয়ে যায়। অকা অমরাবতীর নদী।’

‘বোগো-রদিতসা’ একটি ইউনিক রুশ শব্দ। ‘বোগ’―ঈশ্বর, ‘রদিতসা’―যিনি ঈশ্বরের জন্ম দিয়েছেন। রুশ অর্থডক্স ধর্ম (এরা অর্থডক্স বলে না, বলে প্রাভাশ্লাভনি) অনুসারীরা ‘মাতা মেরি’ কে এই নামে ডাকে। অপূর্ব সুন্দর তার এই নামের দ্যোতনা । ‘পৈয়াস’ হলো কোমরের মেখলা।

মাতা মেরির হারানো মেখলা হলো অকা নদী। সেই নদী বয় দিগন্ত বিস্তারি মাঠেদের মধ্য দিয়ে। এখানে হাওয়া খেলে উচ্ছল, শস্য ফলে উদার, বর্ণাভার সমস্ত রং দেখিয়ে এখানে দিন হাঁটে সহস্র বছরের ইতিহাস ও অনুভূতি নিয়ে। তারপরে শীত এসে আদিগন্ত বিছিয়ে দেয় তুষারের মাদুর।

‘যদি ফেরেশতাও এসে বলে,

যারে তুই রুশ ছেড়ে স্বর্গে থাক গিয়ে

চাই না স্বর্গ আমার,

বলব, দাও রুশ ফিরিয়ে।’

সম্ভবত ইয়েসিনিনের ১৮ বছর বয়েস বয়স ছিল, যখন তিনি এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখানকার প্রকৃতি তার রঙের তুলি দিয়ে ইয়েসিনিনের অন্তরাত্মায় এঁকে দিয়েছিল মা রাশিয়ার অবয়ব, সেই অবয়ব সত্তায় ধারণ করে ধূমকেতুর মতো এসে তিনি ধূমকেতুর মতোই চলে গেছেন।

সের্গেই ইয়েসিনিন ১৮৯৫ সালের ৩ অক্টোবর লগ দিয়ে তৈরি যে ঘরে জন্মেছিলেন তা ঘুরে দেখি, কাঠের পাটাতনের সাধারণ কৃষকের প্রাচুর্যহীন ঘর, আসবাব-পত্র তেমন কিছু নেই। গাছগাছালিপূর্ণ বাগান, একটি শস্য রাখার ঘর, সঙ্গে গোয়াল। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির উৎপত্তিস্থল এই।

বাড়ির প্রাঙ্গণেই বার্চ ও অন্যান্য বৃক্ষে পরিবেষ্টিত হয়ে বিশাল ভাষ্কর্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কবি।

গায়ে তার বোতাম খোলা শরতের ওভারকোট, মুখে চিন্তার অভিব্যক্তি, তাকিয়ে আছেন স্থির।

দৃষ্টি তার কোথায়, অকা নদীতে, না নদী অতিক্রম করে দূরের প্রান্তরে, নাকি নিজস্ব মনোপদ্ম সরোবরে বলা মুশকিল।

আমরা গ্রামটি হেঁটে হেঁটে দেখি।

অপূর্ব সুন্দর রুশ গির্জা, তার অতি উঁচু ঘণ্টাঘর নিয়ে। কোলাকল―ঘণ্টা। রুশ ভাষার অপূর্ব একটি শব্দ। এর সৃষ্ট ধ্বনির মতোই। যখন সে বেজে ওঠে তার মিষ্টি ঝংকার ও প্রতিধ্বনি ইথারে ছড়িয়ে পড়ে বাধাহীন দূর-দূরান্তে, নদী অতিক্রম করে, মাঠ অতিক্রম করে, আকাশের ঈশ্বরের কানে গিয়ে সৃষ্টির প্রেরণা জোগায়, কৈশোরে যে ঈশ্বরকে ইয়েসিনিনের মনে হতো এক অভ্রবাসী আদিপুরুষ, সব শুরুর শুরু। আর মা মেরি বা ‘বোগো-রদিৎসা’ হচ্ছেন আর কেউ নয়, ধরণীমাতার কোল। কৃষিপ্রধান রাশিয়াকে তিনি কল্পনা করেন স্বপ্নে দেখা কোনও অকুমারী নারী বা ‘প্রিস্নাদেভা’ হিসেবে। এবং আশ্চর্য কৃষকপুত্রের চেতনায় সে নারী নয়, ‘পবিত্র গাভী।’

এবং তার কাছে এই গাভীর চোখের চেয়ে ভালো বা সুন্দরতর কিছু নেই, হতে পারে না। তার দিকে তাকিয়ে যে সুখ, তা অবিরল ও নিরন্তর! এই হলেন ইয়েসিনিন; বন, মাঠ, শস্য ও সুন্দরের কবি, রাশিয়ার প্রাণের অন্তঃস্তল থেকে উদগম যার।

এই গির্জায় ইয়েসিনিনের পিতা-মাতার বিয়ে হয়েছিল। ইয়েসিনিনকে ব্যাপটাইজ করা হয়েছিল এখানেই।

মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ইয়েসিনিন ছোটকাল থেকেই খুব দুরন্ত ও ডানপিটে ছিল। মারপিট করতে ওস্তাদ কিন্তু মুখে সবসময় থাকত ভুবনজয়ী হাসি। তৃতীয় শ্রেণিতে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সে তার দু’তিনজন বন্ধুকে নিয়ে শীতকালে জমে যাওয়া অকা নদীতে আইস স্ক্যাটিং করতে গিয়েছিল। পরের দিন শিক্ষক জিজ্ঞেস করে কে এই অপকর্মের সর্দার ?

ইয়েসিনিন তার বন্ধুদের বিপদে ফেলতে চায়নি, দাঁড়িয়ে বত্রিশ পাটি দাঁত খুলে বলেছিল ‘আমি।’

শাস্তি হিসেবে তাকে তৃতীয় শ্রেণিতে পাস করান হয় নাই, রেখে দেওয়া হয়েছিল দ্বিতীয়বারের জন্য।

গ্রীষ্মে সের্গেইকে খুঁজে পাওয়া যেত না, সকালে নাস্তা সেরেই তিনি উধাও হয়ে যেতেন, ছুটে বেড়াতেন অকার অন্য তীরের উন্মুক্ত প্রান্তরে, মাছ ধরতেন, সাঁতার কাটতেন, পাখির বাসায় হানা দিয়ে ডিম তুলে নিতেন। মাঠের শব্দ, বাতাসের সংগীত, মেঠোফুলের রূপ বৈভব তার মধ্যে জন্ম দিত অদ্ভুত সব চিত্রকল্প, ছন্দ ও ঝংকার।

এ সময়ে প্রেম আসে উথাল-পাথাল আছাড়-মারা অনুভূতির বৈকল্য নিয়ে। আন্না সারদানোভস্কায়া কনস্তান্তিনোভায় বেড়াতে এসেছিলেন তারই শিক্ষক ধর্মযাজক ইওয়ান স্মিরনভের বাসায়। গ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মূল পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। শুধু বাইবেল শেখানো নয়, কবিতা পাঠ, নাটক, অভিনয় ইত্যাদি সবকিছুতেই যুক্ত ছিলেন। তাই ইয়েসিনিনের ছিল নিয়মিত যাওয়া-আসা। সেখানেই দেখা হয় তাদের।

একজনের বয়েস ১৬, অন্যজনের ১৫।

অনুভূতির তীব্রতা ছিল, কিন্তু জ্বলে উঠেও আন্নার অনুভূতি নিভে যায় অতিদ্রুত। আর সের্গেই মনের দুঃখে গিলে বসেন এক বোতল কনসেন্ট্রেড ভিনেগার।

কিন্তু আন্না হারিয়ে যান না, পরবর্তীকালে ‘আন্না স্নেগিনা’ কাব্যোপন্যাসের একটি চরিত্রে ফিরে আসেন।

অল্পদিনের মধ্যেই মাশা বালজামোভা নামে আরও এক কিশোরী তার হৃদয় হরণ করেন। ইয়েসিনিন চিঠি লিখে তার বিষণ্নতা, মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা জানাতেন। লিখতেন, ‘বড় কষ্টকর এই বেঁচে থাকা, মাথাটি এলিয়ে দেওয়ার মতো কারও কাঁধ আমার জন্য নেই।’

কিন্তু তার চেয়েও বড় ভালোবাসা অপেক্ষা করছিল তার জন্য। লিদিয়া ইভানোভনা কাশিনা। কনস্তান্তিনোভার জমিদার।

আমরা এগিয়ে আসি তার বাড়ির মিউজিয়ামে।

ইয়েসিনিনের বাড়ির থেকে মিনিট দশেকের পথ। গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর বাড়ি হলেও চোখ ঝলসে দেবার মতো কিছু নয়। কিন্তু রুচিসম্পন্ন ঘরের আসবাব-পত্র ও আভিজাত্যের ছিলেন মস্কো আলেকসান্দ্রোভস্কি ইনস্টিউটের গ্রাজুয়েট। দুই সন্তানের জননী। তাদের নিয়ে প্রতিবছর শহর থেকে গ্রীষ্ম কাটাতে আসেন। স্বামী জেনারেল। সদাব্যস্ত, গ্রামে সে আসত না। সম্ভবত বিয়েও মধুর ছিল না। লিদিয়া ঘোড়া হাঁকাতেন কনস্তান্তিনোভার মুক্ত প্রান্তরে। ততদিনে ইয়েসিনিনের কবিতা ছাপা হতে শুরু করেছে। সাহিত্য পত্রিকায় সেই কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। অকার দিকে মুখ করা সুদর্শন ম্যানশন। ইয়েসিনিন একদিন কোনও কারণে সে বাড়িতে আসে। অবনম্র গৃহকর্ত্রীর অন্তর্মাধুর্য তাকে মুগ্ধ করে। ‘তোমার রূপের বৈভবে আমি এতই বিহ্বলিত যে, আমি ১০০ জোড়া চোখ দিয়ে তোমাকে দেখতে চাই।’ যেন রুমীর আত্মা জেগে ওঠে তার মধ্যে, যেন সে ফিস ফিস করে বলে ‘ঊাবৎু ভরনবৎ ড়ভ সু নবরহম রং রহ ষড়াব রিঃয ুড়ঁ.’- জঁসর

আছে তাদের গ্রামের ৩০ বছর বয়স্ক রূপসী জমিদার কাশিনা’র বাগানঘেরা বাড়ি। সেই বাড়ির বাগান থেকে চোখ যায় অকা নদীর বৈভবময় শরীরের দিকে। ইয়েসিনিনের বয়স যখন ১৭, তিনি ১০ বছর বেশি বয়সের বিবাহিতা ও ২ সন্তানের জননী কাশিনার প্রতি অনুভব করেছিলেন তীব্র অনুভূতি। 

‘বৃথাই বয়নি উতল হাওয়া

বৃথাই ডাকেনি বজ্র ঝড়ে

কে যেন গোপনে নীরব আলোয়

গিয়েছে দৃষ্টি মাতাল করে…’

বিপ্লবের পরে কাশিনা’র বাড়িঘর দখল করে নেওয়া হয়। কাশিনাকে মস্কো চলে যেতে হয়, সবকিছু হারিয়ে জীবন কাটে তার সামান্য একজন সেক্রেটারির কাজ করে।

গ্রামের বিপ্লবী কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কাশিনা’র সুন্দর বাড়িটিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে। ইয়েসিনিন প্রস্তাব করেছিলেন বাড়িটি রক্ষা করে, স্কুল, এতিমখানা বা হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করার। বাড়িটি রক্ষা পেয়েছিল বলশেভিক বিলুপ্তির হাত থেকে। উত্তরপুরুষ তাই আজও তা দেখতে পায়। এই বাড়ি ও তার গৃহিণী কাশিনাই হয় ইয়েসিনিনের মহান কাব্য-কাহিনি ‘আন্না স্নেগিনার’ জন্মস্থান। পুশকিনের ‘এভগেনিয়ি অনেগিন’ যেমন,  ইয়েসিনিনের ‘আন্না স্নেগিনা’ তেমনি কালজয়ী সৃষ্টি। প্রেম, বিপ্লবের ধ্বংস ও অপদার্থ অশিষ্টের ক্ষমতায় অংশগ্রহণ, মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদের বেদনা ও হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, মানবতার জয়গান কী নেই সেখানে ?

ধ্বংসের যুগের অসামান্য সৃষ্টি!

এই কাহিনি-কাব্যের আন্না স্নেগিনা এক অল্প বয়েসি জমিদার। তার প্রতি কবি অনুরক্ত। কিন্তু বিপ্লব সংঘটিত হবার পরে গ্রাম্য সোভিয়েত তার জমিদারি কেড়ে নেয় এবং কবিকেও যেতে হয় সবার সঙ্গে শ্রেণি-উচ্ছেদের সেই পবিত্র জবরদস্তি সম্পন্ন করার জন্য। অন্য অনেক অভিজাতের মতোই আন্না রাশিয়া ছেড়ে চলে যায় ইংল্যান্ডে। কিন্তু সে ভুলতে পারে না, ফেলে আসা মাতৃভূমির কথা, তীব্র নস্টালজিয়া তাকে তাড়া করে। উন্মূল অন্তর্যাতনার নরকে বেশ কয়েক বছর চলে গেছে। বিপ্লবী রাশিয়া গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়ে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তা আর রাশিয়া নয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন। কাস্তে হাতুড়ির লাল পতাকা উড়িয়ে সোভিয়েত জাহাজ এখন ইংল্যান্ডের নৌ-বন্দরে থামে। আর আন্না ছুটে ছুটে যায় সেই বন্দরে, দূর থেকে তাকিয়ে থাকে তার মাতৃভূমি থেকে আসা জাহাজের দিকে, সেখানে পত পত করে উড়ছে লাল পতাকা, যদিও এই পতাকা তার নয়, কিন্তু তা নিয়ে এসেছে তার মাতৃভূমির ঘ্রাণ, মাতৃভূমির স্পর্শ, সত্তার অন্তঃস্তল থেকে যাকে সে উৎপাটন করতে পারে না। স্বদেশ থেকে বিতাড়িত মানুষের হৃদয়ের হাহাকারকে ইয়েসিনিন অঙ্কন করেছেন অসামান্য মুন্সিয়ানায়।

কনস্তান্তিনোভা অনেক উঁচুতে। যেন পাহাড়ে, কিন্তু পাহাড় নয়। অকা বইছে বেশ নীচ দিয়ে। তিন তিনটি লম্বা সিড়ি, একটার থেকে অন্যটা বেশ দূরে, একটি দিয়ে নেমে অন্যটি ধরতে হয়। নদীর দূরত্ব কম করে হলেও এক কিমি দূরে। শ্বেতাকে বললাম, এতদূর যেতে না চাইলে ছায়ায় বসে থাক।

ছুটলাম নদীর দিকে। পদ্মায় জন্ম যার, নদী তাকে পাগল করতেই পারে। তার ওপরে সেই নদী যেখানে প্রিয় কবির শৈশব কেটেছে সাঁতার কেটে, মাছ ধরে বা হাঁসের ডিম কুড়িয়ে।

হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়াই, রোদ চেয়ে থাকে, রাশিয়ার জন্য অস্বাভাবিকভাবে গরম রোদ। আকাশে মেঘের তুলা ফেটছে অদৃশ্য ধুনকর। ঘাসফুল মাথা নেড়ে হাসে। আমি ছুটছি, কোথাও, না কোথা থেকে বোঝার বোধ নেই।

নদী হাতছানি দিচ্ছে।

জলের কাছে পৌঁছে দেখি একটি জেটির মতো তৈরি করা হয়েছে। পিকনিক করতে আসা হাঁসের মতো একদল নারী বসে কলকল করছে আর চা খাচ্ছে। ইয়েসিনিনের দেশের নারীরা, নদীর মতো যৌবনবতী ও সুন্দর। শ্যাম চামড়ার এক বিদেশি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সবাই ফিরে তাকায় কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে।

‘দ্রাস্তে!’ অভিবাদন করি।

(সুস্থ থাকো!-অর্থটা এমন)।

তাদের স্বাস্থ্যের কমতি নেই। কারও কারও বিকিনি উথলানো ভরাটত্ব, অনাবৃত ত্বকে রোদের রং, নাভির নিচের সংক্ষিপ্ত ত্রিকোণ আবরণ অতিক্রম করে অনাবৃত উরু থেকে উজ্জ্বল রং-করা পায়ের নখ পর্যন্ত। সুন্দর ও প্রস্ফুটিত।

মাথা নাড়ায়, কিন্তু কেউ কিছু মুখ দিয়ে বলে না।

আইফোন এগিয়ে দেই একজনের দিকে, চোখে তার সুধীর আসমান, বুকে নেশার নিষ্পেষ, বলি, ‘দয়া করে নদীসহ ছবি তুলে দাও।’

বলি, ‘ভালো করে তুলবে কিন্তু ফাঁকি দেওয়া চলবে না।’

এবার সে হেসে ওঠে।

‘আচ্ছা দিচ্ছি।’

সে মনোযোগ দিয়ে ছবি তোলে। ঢলঢলে নদী তার মতোই সুন্দর অথবা টলটলে সে-ই নদীর মতো।

‘কোথা থেকে এসেছ ?’

‘বলা মুশকিল, এক সময় তোমাদের দেশেই ছিলাম, এখন আমেরিকায়।’

‘তাই তো বলি এত সুন্দর রুস্কি শিখলে কোথায়!’

‘কোন্ দেশে বেশি ভালো লাগে ?’

‘যে দেশে আমরা নেই।’ রুশ প্রবাদ বাক্য ফিরিয়ে দিই।

এবার ওরা সবাই হেসে ওঠে শব্দ করে। একদল পাখি উড়লে যেমন হয়।

রোদ কাঁপে অকার জলে, কিন্তু জলের স্পর্শ পাই না। বেশ নিচে। স্পর্শ করতে চাই, মেয়েরা তাকায়, আজব বিদেশির দিকে। তারা জানবে কী করে বাঙালির জন্য নদী কী ?

নদী হলো নিরাময়হীন আময়। ধান কেটে নেওয়া মাঠের হাহাকারের মতো হাহাকার।

জেটি থেকে সরে খুঁজে বের করি মেঠো পথ, যেটা জলে নেমে গিয়েছে। গিয়ে হাত মুখ ধুই, শীতল স্বচ্ছ জল। শীতল, প্রাণ জুড়ান। সভ্যতার ক্লেদ বা কলঙ্ক নেই। বড়দা হলে লুঙ্গি পরে নেমে যেতেন, তার পণ আছে, যেখানেই নদী দেখবেন, অন্তত একটি ডুব তার দিতেই হবে। নদীতে স্রোত বেশ, কিন্তু কোনও খেয়া বা খেয়াঘাট জাল বা ভেসাল নেই। অকুমারী সৌন্দর্যের কুমারী অবয়ব।

ওপারে প্রান্তর শুয়ে আছে মহাদেবের বিশাল শরীরের মতো। ওপরে আকাশ, নিচে মাঠ, শেষ নেই, সীমা নেই। শতবর্ষ পার হয়ে গেছে, কনস্তান্তিনোভা তার মুখ বদলায়নি।

ইয়েসিনিন ফিরে এলে ঠিকই চিনে নিতে পারতেন তার দেশকে। আমার দেশ নদীতে ভেঙে গেছে। স্বৈরাচার, সন্ত্রাস ও অন্যায় একে অন্যে বিলীন হয়ে গেছে মিথ্যার কদর্য অন্ধকারে, যেখানে শাসক শাসিতকে হত্যা করে অকাতরে।

এবার ফিরে আসার পালা। গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ল দিমিত্রির গাড়ির ট্রাংকে আমাদের দুটো স্যুটকেস রেখে নেমে গিয়েছিলাম। আছে, না চলে গেছে-ভাবছি।

না, যায়নি। ড্রাইভার সিটে বসে সে তুমুল ঘুমের সপ্তডিঙ্গায় ভাসছে।

গাড়ি ছোটে আবার রিয়াজানের উন্মুক্ত প্রান্তর অতিক্রম করে। কথায় কথায় কখন ভোঝা নদী পার হয়ে গেছি টের পাইনি, কিন্তু দিমিত্রির মনে পড়ে। সে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আসে নলখাগড়ার জঙ্গলঘেরা জলাশয়ের কাছে। অল্প জল, ছোট নদী, এক সময়ে থল থল ভরা থাকলেও এখন সে মজা খাল কিংবা ডোবা। মানুষ বাঁচে না জানি, সময়ে নদীও মরে যায়।

যে নদীর তীরে অপরাজেয় মোঙ্গল বাহিনীর দর্পচূর্ণ করে তার সেনাপতিসহ প্রায় সবাইকে যমের দুয়ারে পাঠিয়েছিল দিমিত্রি দনস্কোয়ের সৈন্যরা (আগস্ট ১১, ১৩৭৮) এবং যা ছিল দীর্ঘকাল ধরে রাশিয়াকে পদানত করে রাখা এই দুর্ধর্ষ বাহিনীর বিরুদ্ধে রুশদের প্রথম বিজয়, সেই নদী মরে গেলেও বিজয়ের গৌরব আজও বেঁচে আছে। এখনও প্রতিবছর ১১ আগস্ট ‘ভোঝা নদীর যুদ্ধ’ নামে উৎসব  ও মেলা পালিত হয়। এই যুদ্ধ কার্ল মার্কসেরও দৃষ্টি এড়ায়নি। রুশিদের হাতে মোঙ্গলদের এই পরাজয়কে তিনি অত্যন্ত প্রশংসার সঙ্গে উল্লেখ করেন।

এই বিপুল বিজয় রুশ সৈন্যদের সাহস ও আত্মবিশ্বাসকে আকাশচুম্বী করে দেয়। উন্মুক্ত করে দেয় কুলিকভ যুদ্ধে (১৩৮০) মহান বিজয়ের পথ। রাশিয়ার ইতিহাসের মাইলফলক হচ্ছে কুলিকভ যুদ্ধ। মোঙ্গল শাসন বিলুপ্ত না করতে পারলেও এই যুদ্ধ জানিয়ে দেয় যে, মোঙ্গল বাহিনী আর অজেয় নয়, রুশ জাতির পরাধীনতার শিকল ভাঙার দিন খুব কাছে।

আমি গাড়ি থেকে নেমে জঙ্গল নাড়িয়ে জলের দিকে ছুটছি, পেছনে শ্বেতা চেচায়, ‘যেও না ওখানে, নদীকে সামনে থেকে দেখা আর দূর থেকে দেখা একই, কিন্তু জঙ্গলে সাপ-খোপে কামড়াবে।’

সাপের ভয়ে ভোঝা নদীর জল স্পর্শ না করে কি পারা যায় ? কত জল গড়িয়েছে এই নদী বয়ে, কত মানুষের রক্ত!

ভোঝা নদীর এই যুদ্ধেরও প্রায় ১৪০ বছর আগে (১২৩৭ সালে) যখন বাতুখানের বাহিনি এগিয়ে আসে, তখন রাশিয়া ছিলো খণ্ড খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত এবং পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ লিপ্ত। এদের শাসকদের টাইটেল ছিল প্রিন্স এবং এরা একে অন্যের হিতৈষী না হলেও অনাত্মীয় ছিল না। এই প্রথম কোনও বিদেশি শক্তি তাদের আক্রমণ করে।

রিয়াজানের শাসক প্রিন্স ইউরি চেরনিগভ ও ভøাদিমিরের জাতভাই-প্রিন্সদের কাছে সাহায্য চায় কিন্তু তারা সাহায্য করতে অস্বীকার করে। ইউরি তখন তার ছেলে ফিওদরকে বাতুখানের কাছে পাঠায় শান্তির প্রস্তাব নিয়ে। বাতুখান ফিওদরের সুন্দরী স্ত্রী ইওপ্রাক্সিয়াকে উপঢৌকন হিসেবে দাবি করে। ফিওদর ঘৃণাভরে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেলে, তাকে হত্যা করা হয়। ইওপ্রাক্সিয়া শিশু সন্তানসহ আত্মহত্যা করে এবং বাতুখান রিয়াজান অবরোধ করে। সংখ্যায় তারা ছিল বহুগুণ শক্তিশালী, ৫ দিনের জন্য তাদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও ষষ্ঠ দিনে রিয়াজানের পতন হয়, মোঙ্গলরা নির্মম হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংস-যজ্ঞ শুরু করে। বেশির ভাগ মানুষ নিহত হয়।

ইওপাতিয়িয়ি কলোভ্রাত নামে একজন মহাবীর এ সময়ে ছিল রিয়াজানের বাইরে। সে ফিরে এসে দেখে তার প্রিয় শহর ধ্বংসপ্রাপ্ত, পরিচিতরা মৃত। সে রাগে ফেটে পড়ে। ১৭০০ জনের একটি বাহিনী গঠন করে ছুটে যায় বাতুখানের পিছু পিছু। তার সৈন্যরা ইতোমধ্যেই আরও কিছু শহর ধ্বংস করেছে।

কলোভ্রাত অতর্কিত আক্রমণ করে বাতুখানের সৈন্যদের বহুজনকে হত্যা করে তাদের অবিচল আত্মবিশ্বাসে ত্রাসের সঞ্চার করে। ‘রিয়াজানের মৃত মানুষেরা দলে দলে জেগে উঠে প্রতিশোধ নিতে এসেছে’ তাদের মনে হয়। বাতুখান তার সবচেয়ে সাহসী, শক্তিশালী ও অপরাজেয় যোদ্ধা খস্তভ্রুলকে পাঠায় কলোভ্রাতকে জীবন্ত ধরে আনার জন্য। কলোভ্রাত তাকে দু’টুকরো করে ফেরত পাঠায়।

সামনাসামনি যুদ্ধে কলোভ্রাত ও তার সৈন্যদের সঙ্গে পেরে না উঠে বাতুখান শক্তিশালী দুর্গের দেয়াল ভাঙ্গার জন্য ব্যবহৃত পাথরের গোলা ছোড়ার আদেশ দেয় দূর থেকে। অসম যুদ্ধ। এবার বীর কলোভ্রাতকে ওরা হত্যা করতে সক্ষম হয়।

বাতুখানের কাছে তার মৃতদেহ নিয়ে আসা হয়। ‘সাহসী কলোভ্রাত, আমার যদি তোমার মতো যোদ্ধা থাকত, আমি তাকে হৃৎপিণ্ডের পাশে বেঁধে রাখতাম।’ বাতুখান নাকি শ্রদ্ধাভরে বলেছিল এবং কলোভ্রাতের মৃতদেহ বন্দি রুশ সৈন্যদের কাছে ফেরত পাঠিয়েছিল সসম্মানে সমাহিত করার জন্য।

রুশ সৈন্যরা মৃতদেহ নিয়ে রিয়াজানের দিকে রওনা হয়েছিল। এপ্রিল মাসের ভোঝা নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছিল ‘শ্রাবণের প্লাবনের মতো’। শোকার্ত সৈন্যরা বুঝতে পারে মহাবীরের দেহ নষ্ট হতে শুরু করেছে। তারা তাকে ভোঝা নদীর তীরে সমাহিত করে। সেটা ছিল ১২৩৮ সাল। রাশিয়ায় মোঙ্গল শাসন প্রতিষ্ঠার বছর।

এরপরে ৫ বছরের যুদ্ধের মাধ্যমে ( ১২৩৬-১২৪১ সাল) প্রাচীন রাষ্ট্র ভোলগা-বুলগেরিয়া, ককেশিয়া, রাশিয়া, পোল্যান্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া ইত্যাদি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাতুখানের বিশাল বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য ‘গোল্ডেন হোর্ড’ বা ‘ জোলাতাইয়া অর্দা’। কাজান শহর হয় তার রাজধানী।

১৩৫৫ সালে বাতুখানের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা তুষের আগুনের মতো নিয়ত জ্বললেও মাঝে মাঝেই তীব্র আকার ধারণ করে। এ রাশিয়ার মোঙ্গল শাসনের (গোল্ডেন হোর্ড বা জোলাতাইয়া অর্দা নামে পরিচিত) মূল কেন্দ্র কাজানে ক্ষমতার যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ‘তখতামিশ’ রুশ রাজ্যসমূহের ভাগ্যবিধাতায় পরিণত হয়।

সে তার পূর্বসূরিদের মতোই বিভিন্ন রাজ্যের প্রিন্স নিয়োগ, প্রত্যাহার, মৃত্যুদণ্ড, হত্যা, করারোপ ও লুণ্ঠন চালিয়ে যেতে থাকে। সে মস্কোর বীর ও সিংহাসনের বৈধ দাবিদার প্রিন্স দিমিত্রি দনস্কোয়ের বদলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে মস্কো ও ভøাদিমিরের গ্রান্ড প্রিন্স ঘোষণা করে। শুধু তাই নয় রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে হঠাৎ হঠাৎ হানা দিয়ে শহরগুলোকে নিঃস্ব করতে থাকে। শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে চলে আসছিল এই সন্ত্রাস। কিন্তু তাদের প্রতিহত করার শক্তি রুশদের ছিল না। তারা ছিল বিভক্ত, ক্ষমতালোভী ও আত্মকলহে নিমগ্ন প্রিন্সদের ইগোর বলির পাঁঠা।

৫.

ইয়েসিনিনের মাতৃভূমি থেকে ফিরে এসে বিকেলটা আমরা শহর ঘুরে দেখি। খুব বেশি সময় আমাদের হাতে ছিল না। মহাকাশ বিজ্ঞানের জনক সিওলকোভস্কি’র জন্মস্থান রিয়াজান। মনোবিজ্ঞানের কন্ডিশন্ড রেফলেক্সের জনক আইভান পাভলভেরও। রুশ জাতির আরও অসংখ্য মেধাবী মানুষ এসেছে এই রিয়াজান থেকে।

পুরোনো শহরে ১০৯৫ সাল থেকে নির্মিত ক্রেমলিন বা দুর্গ ঘুরে দেখি। অনেক উঁচু পাহাড়ি এলাকায় এর অবস্থান। খাড়া নিচে ত্রুবেঝ ও লিবেদ নদী, দুর্গটিকে পরিবেষ্টিত করে রেখেছে। এখন প্রায় মৃত হলেও এক সময়ে জাহাজ চলত এই নদীপথে। ক্রেমলিনের দেয়ালের পাশ থেকে দাঁড়িয়ে অনেক নিচুতে ঘন বন ছাড়া আমরা নদী দেখতেই পাইনি। পাহাড়ের ওপরেই দুটি পুকুর ছিল, দুর্গ অবরুদ্ধ হলে যেখান থেকে জল সংগ্রহ করা হতো, সম্ভবত এখন ভরাট হয়ে গেছে, আমরা দেখতে পাইনি।

ক্রেমলিনের অদূরেই আছে ইয়েসিনিনের বিশাল মন্যুমেন্ট যা দেখার জন্যই আমাদের সেখানে যাওয়া। কবির দাঁড়ানোর ভঙ্গিটি এমন, যেন তিনি দুই হাত ছড়িয়ে বিশাল মাতৃভূমিকে (অথবা পৃথিবীকে) আলিঙ্গন করছেন।

এই সেই কবি, যিনি ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে নিখুঁত শব্দের কারিগর, যার শব্দগুলো শুধু মাঠ নয়, মেঠো ফুল, মাঠের পাখি, শস্যের মাঠের হৃৎস্পন্দনের কথা বলে। প্রকৃতির কথা বলতে গিয়ে যে মানুষের কথা ভুলে গিয়ে নৈসর্গের স্বপ্নচারিতায় বিদ্রুত হয় না। শিল্পায়নের লৌহশকটের সামনে ছুটন্ত এক অশ্বশাবকের ক্রমে ক্রমে হেরে যাওয়ার অনিবার্যতা ও অসহায়ত্ব তিনি অনুভব করেছেন নিজের বুকে। তাই সহজ, সাবলীল শব্দে রাশিয়ার হৃদয়ের সূক্ষ্মতম অনুভূতি অবিনশ্বর হয়ে আছে তার কবিতায়। নারীর প্রতি ভালোবাসার তীব্রতা ও অন্তর্বাষ্পের অবিস্মরণীয় শিল্পী তিনি, যাকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করতে গেলে কবি ও কবিতার প্রতি অবিচার করার হয়।

‘শ্বেত লিন্ডেনের ফুল ঝরে গেছে

বুলবুলি-ডাকা ভোর গেছে মরে

বিগত দিনের হাসির ঝংকারে

বিষণ্নতা যাবে না মোটেও ঝরে।’

‘আমার বিষণ্নতা ভেঙে ঝুর ঝুর করে ছড়িয়ে পড়বে না’, তিনি এমনভাবে বলেছিলেন।

এবং পড়েওনি। বিশাল স্লোগানের এক্সপেরিমেন্টের বড় কঠিন সময় ছিল সেটা। বহু কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী সেই এক্সপেরিমেন্টের ভারে থেঁতলে গিয়ে শ্বাসহীনতায় মৃত্যুবরণ করেছে। যারা নিজেরা মরে নাই, তাদের দেয়ালে দাঁড় করিয়ে মারা হয়েছে।

সের্গেই ইয়েসিনিনও রেহাই পাননি।

লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক ও কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares